Author Topic: ভিক্ষা ছাড়লে লাখ টাকা  (Read 176 times)

Offline omarsharif

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 158
  • Everyday is a good day.
    • View Profile
ভিক্ষা ছাড়লে লাখ টাকা
« on: September 19, 2016, 10:59:29 AM »
ভিক্ষা করো ক্যান, কাজ করে খেতে পারো না?’ কারও কাছে ভিক্ষা চাইলেই এমন উপদেশমিশ্রিত মুখ ঝামটা প্রায়ই সহ্য করতে হতো আমেনা বেগমকে (৭০)। যে বয়সে একটু বিশ্রাম দরকার, তখন বাড়ি বাড়ি ঘুরে তিনি ভিক্ষা করেন। আট বছর আগে মারা যান উপার্জনক্ষম দিনমজুর স্বামী। একটি ঘর ছাড়া তখন কিছুই ছিল না। একমাত্র পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে ভিক্ষা ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না তাঁর।
কিন্তু ২০১২ সালে পাল্টে গেল পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া গ্রামে আমেনা বেগমের জীবন। সে বছর ওই ইউনিয়নে হলো ভিক্ষুক জরিপ। দেখা গেল, পুরো ইউনিয়নে ভিক্ষুকের সংখ্যা ৭৪। তাঁদের মধ্যে অবস্থা বিবেচনায় আমেনা বেগমসহ পাঁচজন পেলেন অর্থ। এক টাকা, দুই টাকা নয়; একেবারে এক লাখ টাকা। তবে নগদ নয়। এ টাকায় তাঁকে কিনে দেওয়া হলো দুটি গাভি, হাঁস-মুরগি, গাভির ঘর ও হাঁস-মুরগির ঘর। সেই সঙ্গে ওই টাকায় তাঁর বসতবাড়িও মেরামত করে দেওয়া হলো। প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে মা আমেনা বেগমের এক ভিন্ন জীবন শুরু হলো। সম্প্রতি আমেনা বেগমের গ্রাম টগড়ায় গিয়ে তাঁর বদলে যাওয়ার চিত্র চোখে পড়ল। আমেনা বেগম বলেন, ‘এখন মাসে চাইর হাজার টায়ার মতো আয় অয়। খারাপ নাই। অনেক ভালো আছি।’
আমেনা বেগমের মতো দেশের ১৫০টি ইউনিয়নের ৬২৫ জন একসময়ের ভিক্ষুক এখন স্বনির্ভর হওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত। জাতীয় প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) তাদের ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি’-এর আওতায় প্রকৃত ভিক্ষুকদের দিচ্ছে এক লাখ টাকা। পিকেএসএফের শর্ত একটাই—ভিক্ষা ছাড়তে হবে। জীবনে কখনোই আর এ পথে ফিরে আসা যাবে না। তবে ভিক্ষা আবার ধরলেই সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে—এমন ঘটনাও ঘটেছে।
কেন এই উদ্যোগ? পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষ অনেক উন্নয়ন বা ঋণ কর্মসূচির মধ্যেও থাকে না। তাই আমরা তাদেরই এই সহায়তার আওতায় এনেছি, যাদের সহায়তা করার কেউ নেই। দারিদ্র্য একেবারে নির্মূল করতে চাইলে এসব মানুষের অবস্থার পরিবর্তন দরকার।’
এ কাজ করতে গিয়ে পিকেএসএফ তাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সহযোগী সংগঠনগুলোর সহায়তা নেয়। সেই ২০১০ সাল থেকে ভিক্ষুক জরিপের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। এরপর প্রকৃত ভিক্ষুক নির্বাচন, যাচাই, তাদের চাহিদা নিরূপণ, অর্থ দেওয়া এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ—এভাবেই লাখ টাকা দেওয়ার কাজ করছে পিকেএসএফ। স্থানীয় সংগঠনগুলো ভিক্ষুকের ভিক্ষা করার ভিডিও ধারণ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এরপর স্থানীয় অন্তত পাঁচজন মানুষের কাছে থেকে প্রকৃত ভিক্ষুকের বিষয়ে মনোনয়ন নেয়। গ্রামে একটি কমিটি করার মাধ্যমে ভিক্ষুকের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে সেখানে থাকা পিকেএসএফের সংগঠনগুলো। ভিক্ষুকের শারীরিক অসুস্থতার জন্য অর্থ দেওয়া হয়। ভিক্ষা ছেড়ে দেওয়া প্রতিটি মানুষ পান একটি করে স্বাস্থ্য কার্ড।
লাখ টাকা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে পিকেএসএফ। প্রথমেই ভিক্ষাবৃত্তির কারণ নির্ণয় করা হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধীরা এই প্রকল্পে প্রাধান্য পান। যেমন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হরিহরনগরের সকিনা খাতুন (৩৬) এবং তাঁর স্বামী জাকির হোসেন দুজনই বাক্প্রতিবন্ধী। দুজনের প্রতিবেশী মনিরুল ইসলাম বলেন, ১০ বছর ধরে এই দম্পতি ভিক্ষা করে সংসার চালিয়েছেন। পিকেএসএফের জরিপের পর ওয়েভ ফাউন্ডেশন নামের সংগঠন বছর খানেক আগে বাছুরসহ গাভি, মালামালসহ মুদিদোকান ও বসতঘর তৈরি করে দেয়।
অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনে পিকেএসএফের লাখ টাকা দেওয়ার এই কর্মসূচিকে ‘ধারণাগত দিক থেকে বৈচিত্র্যময় কাজ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘ঋণ না দিয়ে এককালীন মূলধন দেওয়ার এ কর্মসূচি অনন্য।’ তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা এ কর্মসূচিতে ভিক্ষুক নির্বাচন, কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন চুয়াডাঙ্গা থেকে শাহ আলম, টাঙ্গাইল থেকে কামনাশীষ শেখর ও পিরোজপুর থেকে এ কে এম ফয়সাল)


Source: Prothom-alo