Author Topic: মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করার কিছু সহজ উপায়  (Read 603 times)

Offline Mafruha Akter

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 264
    • View Profile
সন্তান জন্মানোর পর নতুন মায়েরা এমনিতেই উদ্বিগ্ন থাকেন। এই উদ্বেগ আর অস্থিরতা থেকে প্রায় সময় মায়েরা বলেন যে, তাদের সন্তান ঠিক মতো দুধ পাচ্ছে না। অনেকে আবার মনে করেন সিজারিয়ান অপারেশন করালে বুকের দুধ দেওয়া যাবে না। এটা একেবারেই ভুল ধারণা। প্রসবের পর নতুন মা ও নবজাতক শিশু উভয়ের কাছে বুকের দুধ সঠিকভাবে পান করানোর বিষয়টি রপ্ত করতে কিছুটা সময় লাগে।মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করার কিছু সহজ উপায় নিয়েই আজকের আলোচনা।

শিশুর জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধই তার জন্য যথেষ্ট। আর কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। দুধ ঠিকমতো না এলে বা শিশু দুধ না পেলে অনেক মা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ রকমটি মনে হলে কী করবেন? তাঁর আগে আসুন জেনে নিই কী কী কারণে বুকের দুধ কমে যেতে পারে।

বুকের দুধ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সমূহ
মায়ের বুকে দুধ তৈরি হওয়া একটা ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই সিস্টেম’ অনুসরণ করে। অর্থাৎ শিশু যত দুধ টানবে, তত মায়ের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দীপ্ত হয়ে বেশি বেশি প্রলেকটিন হরমোন তৈরি করবে। তত বেশি দুধ উৎপাদিত হবে। বুকের দুধ তৈরির একমাত্র উদ্দীপক বা স্টিমুলাস হলো শিশুর দুধ টানা। তাই যে মায়েরা একেবারে শুরু থেকেই বারবার দুধ দেননি, তাঁদের এই উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

বুকের দুধ খাওয়ানোর ভুল পদ্ধতিও দুধ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়। বিশেষ করে নতুন মায়েরা এই সমস্যায় ভোগেন। দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর মাথা ও কাঁধ সমান্তরালে থাকবে, বাঁকা হবে না, দুধের বোঁটার চারপাশে এক ইঞ্চি পর্যন্ত পুরোটা শিশুর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হবে।

কিছু কিছু ওষুধ, যেমন ডাইউরেটিক, সিউডোএফিড্রিন বা ইস্ট্রোজেনসমৃদ্ধ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দুধ উৎপাদন কমিয়ে দেয়। মায়ের অসুস্থতা, থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি, প্রসব-পরবর্তী বেশি রক্তক্ষরণ, রক্তশূন্যতা এবং পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যাও দুধ কম হওয়ার জন্য দায়ী। নিকোটিন ও অ্যালকোহলও এ জন্য দায়ী।

শিশুকে একই সঙ্গে মায়ের বুকের দুধ এবং ফিডারে দুধ খাওয়ালে শিশুর বুকের দুধ খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শিশুর জন্মের প্রথম দিনগুলোতে ২/১ বোতল দুধ খাওয়ালেই বুকের দুধ খাওয়ানোর সম্ভাবনা এক তৃতীয়াংশ কমে যায়। ফিডারের নিপল আর স্তন চোষার মধ্যে পার্থক্য আছে। স্তন চোষা আর ফিডার এর নিপল চোষা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগলে সে শিশু মায়ের দুধ কম খেতে পারে। এর ফলে মায়ের বুকের দুধ তৈরি কমে যায়।

কিছু কিছু মায়েদের স্তন বিভিন্ন কারনে ঠিকভাবে গড়ে ওঠেনা। তাদের স্তনে বাচ্চার প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে দুধ উৎপাদনকারী নালী ও টিস্যু থাকেনা। তবে প্রত্যেকটি গর্ভধারণে এসব নালী এবং টিস্যু তৈরি হতে থাকে।  তাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে এ সমস্যা অনেকটা ঠিক হয়ে আসে।

হরমোনের সমস্যা গর্ভধারণে যেমন প্রতিকুলতার সৃষ্টি করতে পারে তেমন এটি বুকের দুধ উৎপাদনেও সমস্যার সৃষ্টি করে। এর কারন হলো- হরমোনের সমস্যা থাকলে মায়ের স্তনে দুধ উৎপাদনের সিগন্যাল ঠিকমতো পৌছায় না।

স্তনে কোন সার্জারি করা হলে স্তনের দুধ উৎপাদনকারী নালীগুলো খতিগ্রস্থ হতে পারে। এর ফলে মায়ের বুকের দুধ কম আসতে পারে।

এছারাও মায়ের অপুষ্টি,উদ্বেগ বা পারিবারিক অশান্তি,দুশ্চিন্তা, ভয়ভীতি, কুসংস্কার, মায়ের ঘুম ঠিক মত না হওয়া ইত্যাদি কারনে বুকের দুধ কমে যেতে পারে।

মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করার উপায়
দেখা গেছে মায়ের বুকে প্রচুর দুধ থাকা সত্ত্বেও মায়ের আত্মবিশ্বাস ও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে শিশু মায়ের দুধ খেতে পারে না। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর কিছু নিয়ম পালন করলে মায়ের দুধ কমে যাওয়ার কোন ভয় থাকে না এবং সকল মা-ই তার চাহিদামত বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।

মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করতে কিছু পরামর্শ এখানে তুলে ধরছি –

নবজাতককে ঘন ঘন বুকের দুধ চোষাতে হবে। চুষলেই মায়ের বুকের দুধ আসবে। না চুষলে বুকের দুধ আসবে না। বুকের দুধ হওয়ার জন্য দুটি হরমোনের খুব প্রয়োজন। একটি অক্সিটোসিন। আরেকটি প্রলেকটিন। শিশু যত দুধ টানবে, তত মায়ের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দীপ্ত হয়ে বেশি বেশি প্রলেকটিন হরমোন তৈরি করবে। তত বেশি দুধ উৎপাদিত হবে। বুকের দুধ তৈরির একমাত্র উদ্দীপক বা স্টিমুলাস হলো শিশুর দুধ টানা।

সময় বেঁধে নয়, বারবার এবং যতবার শিশু চায়, ততবারই দুধ দিতে হবে। ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে, আগেই সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। মনে রাখতে হবে শিশু দুধ খেয়ে বুক খালি করলেই আবার দুধ তৈরি হয়। কখনোই বুকে দুধ জমিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। বরং দুধ জমে থাকলেই দুধ তৈরি কম হয়। তাই শিশুকে বার বার মায়ের দুধ খাওয়ানো দরকার।

দুধ পাচ্ছে না বলে ফমুর্লা বা কৃত্রিম দুধ কিছুতেই দেবেন না, এতে মায়ের দুধ আরও কমে যাবে এবং শিশুর বুকের দুধ টানার অভ্যাসটাও চলে যাবে। শিশুর কান্না থামাতে মুখে পেসিফায়ার দেবেন না, এতে নিপল কনফিউশন হয়। কখনো কখনো পাম্প ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায়, এতে ব্রেস্ট স্টিমুলেশন হওয়ার পাশাপাশি পাম্প করা দুধ প্রয়োজনে বাটি-চামচ দিয়ে শিশুকে দেওয়া যায়।

একটি স্তনের দুধ সম্পূর্ণ খাওয়া হয়ে গেলে তবে আরেকটি স্তনে দুধ খেতে দেবেন। খুব ঘন ঘন স্তন পরিবর্তন করবেন না। একটি স্তন অন্তত ১৫ মিনিট খাওয়াবেন। এতে উভয় স্তনে মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি পাবে।এর আরেকটি কারণ হোলো, প্রথম দিকের দুধে পানির পরিমাণ বেশি থাকে আর শেষ দিকের ঘন দুধে পুষ্টি বেশি থাকে। এতে বাচ্চার পেটও ভরে। কিন্তু অর্ধেক খাওয়ানোর পর পরিবর্তন করে আরেক দুধে চলে গেলে বাচ্চা শেষ দিকের পুষ্টিকর দুধ থেকে বঞ্চিত হয়।

দু’দিকের স্তন থেকেই শিশুকে পর্যায়ক্রমে দুধ খাওয়ানো দরকার। কোন কোন মায়েদের যে কোন একদিকের (ডান বা বাম) দুধ খাওয়াতে সুবিধা মনে হয়। তাই একদিকের দুধ বেশি খাওয়ান। অপরদিকে স্তন থেকে কম খাওয়ানোর ফলে সেটিতে দুধ তৈরি ও সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং শিশুটিও একদিকের দুধ খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে প্রতিবারে দু’দিকের স্তন থেকে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। একদিকের স্তন থেকে শিশুর পেট ভরে গেলে অপরটি পরবর্তী সময়ে খাওয়াতে হয়।

শিশু স্তন চুষবার সময় মাকে অবশ্যই নিরুদ্বিগ্ন এবং চিন্তামুক্ত থাকতে হবে। শিশু যদি মায়ের বুক না টানতে চায় তবে জোরাজুরি করা উচিত নয়। বরং নিরিবিলি ঘরে বসে মা আস্তেআস্তে তার মাথায় হাত বুলিয়ে কথা বলে ধৈর্যের সাথে চেষ্টা করবেন। যখন সে মুখ হা করবে তখন শিশুকে বুকের সাথে মিশিয়ে ধরতে হবে। মায়ের শিশুর দিকে ঝুঁকে যাওয়ার দরকার নেই।

অনেক সময় মা ভাবেন যে দুধ কম হচ্ছে, কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়। লক্ষ রাখুন, শিশু সপ্রতিভ আছে কি না, ওজন বাড়ছে কি না। নবজাতক শিশু দিনে সাত-আটবার প্রস্রাব করে এবং দুই-তিনবার মলত্যাগ করে। দুধ খাওয়ার সময় খেয়াল করুন দুধ গিলে ফেলার শব্দ হচ্ছে কি না বা ঠোঁটের কোণে মুখের ভেতর দুধ দেখা যাচ্ছে কি না। অনেক সময় শিশু দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে, এই সময়ও তাকে দুধ দিতে হবে। প্রয়োজনে কানের পেছনে বা পায়ের নিচে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগাতে হবে। যথেষ্ট দুধ তৈরি করতে হলে দিনে অন্তত আট থেকে ১০ বার (দিনের বেলা দুই ঘণ্টা পরপর ও রাতে ৪ ঘণ্টা পরপর) দুধ দিতে হবে।

আরও জানতে পড়ুন- শিশু মায়ের দুধ ঠিকমতো পাচ্ছে তো?

বুকে দুধ কম এলে অনেক ক্ষেত্রে মাকে ‘অপয়া’ হিসেবে অপবাদ দেয়া হয়। এরূপ অপবাদে মা মানসিকভাবে আরও বেশি ভেঙে পড়েন এবং এই মানসিক সমস্যাই মায়ের বুকে দুধ না আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এক্ষেত্রে মা এবং পরিবারের সবাইকে মনে রাখতে হবে যে, বাচ্চা জন্মগ্রহণের পর দুধ আসা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং মায়ের পুষ্টি যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে দুধ আসবে। অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক অশান্তি মায়ের বুকের দুধ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। এ জন্য মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। মাকে প্রচুর পানি, তরল, দুধসহ আমিষসমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এ সময় মায়ের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ক্যালরি দরকার হয়। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের সাহায্য নিতে হবে।

মাকে যতটুকু সম্ভব বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার (যেমন- মাছ, ডিম, দুধ প্রভৃতি) খেতে হবে। মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করতে যে খাবারগুলো সরাসরি সহযোগিতা করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজর, শিম, বাদাম (চীনাবাদাম, কাজুবাদাম), কালোজিরার ভর্তা, লাউ, ডুমুর, পালংশাক, কলমিশাক, টমেটো প্রভৃতি।

ডেলিভারির দুই সপ্তাহ পর এসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি না পায় বা কম আসে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে প্রায় সময় দেখা যায় ওপরের নিয়মগুলো পালন করলে আর এক থেকে দুই সপ্তাহ ধৈর্য ধরলে এমনিতেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এ সময় শিশু কম দুধ পাচ্ছে বলে উদ্বিগ্ন হয়ে কৌটার দুধ দেওয়া হবে আত্মঘাতী। কারণ, প্রথম দিকে এমনিতেই শিশুর চাহিদা কম থাকে আর একবার কৌটার দুধ দিলে তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে খুব কষ্ট হয়।

আজকাল সরকারি হাসপাতালগুলোতে এবং ক্লিনিকেও ‘ব্রেস্ট  ফিডিং কাউন্সেলিং’-এর জন্য আলাদা সেন্টার বা বুথ থাকে। এসব স্থানে গিয়ে মায়েরা সাহায্য চাইতে পারেন।সাধারণত একজন সুস্থ মায়ের বুকে দুধ না আসার তেমন কোনো কারণ নেই। এ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা না করে ধৈর্য ধরে চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের আর কোনোই বিকল্প নেই।
Mafruha Akter
Sr. Library officer
Daffodil International University
(Uttara Campus)