Author Topic: বৃদ্ধাশ্রমে কেমন কাটবে প্রবীণদের ঈদ?  (Read 297 times)

Offline Nahian Fyrose Fahim

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 305
  • Test
    • View Profile
আসুন আর একবার ভাবী। লিখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালে দৈনিক ভোরের কাগজে। এখন ২০১৮ ... আমাদের সমাজে বৃদ্ধ দের প্রতি অবহেলা বাড়ছে দিন দিন... আবার ঈদ  আসছে ...

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে নাড়ির টানে বাড়ি ছুটছেন অসংখ্য মানুষ। আবার অনেকে ব্যস্ত রয়েছেন কেনাকাটা আর পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়ে। বাবা-মা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন সবাই। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা তাদের পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দূরে একা ঈদ করবেন, কেমন কাটবে তাদের ঈদ? বলছি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অসহায় সেই বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের কথা। আর কদিন পরেই ঈদুল ফিতর। তবুও দীর্ঘ দিন ধরে বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ পালন করেছেন অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত বাবা-মা। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বৃদ্ধদের সন্তানরা বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত। এর পরও তাদের ঈদ করতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আর এই বিশেষ দিনটিতে হতাশা আর শূন্যতা নিয়ে সন্তানের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এসব মানুষ।

বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের চরম অবহেলা-অবজ্ঞার চিত্র ধরা পড়ে বৃদ্ধাশ্রমে। অসংখ্য সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে পরিবারের পরিত্যক্ত বস্তু ভেবে পাঠিয়ে দেন বৃদ্ধাশ্রমে। সমাজের নিম্নবিত্ত পরিবার ছাড়িয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রবীণ মায়েরা রয়েছেন এসব বৃদ্ধাশ্রমে। কেমন রয়েছেন তারা তা জানার জন্য তা জানতে গিয়েছিলাম গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত প্রবীণ হিতৈষী ও জরা বিজ্ঞান সংঘে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ প্রবীণ নিবাস। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সংসার বিচ্ছিন্ন লোকচক্ষুর আড়ালে পরবাসে থাকা বাবা-মায়েদের। নিষ্প্রাণ, বোধশূন্য, গতানুগতিক জীবনযাত্রার বাইরে থাকা ওইসব বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়। কেমন আছেন তারা জানতে চাইলে অনেকেরই চোখে পানি এসে যায়। কেউ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন, ভাষা খুঁজে পান না। আবার কেউ সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানের মানহানি হয় কিংবা ছেলের রক্তচক্ষু দেখতে হয় সেই ভয়েও গণমাধ্যমে কথা বলতে চাননি।

প্রায় প্রতিদিনিই বুকের ভেতর পাথর চাপা কষ্ট, হতাশা ও শূন্যতা নিয়ে প্রিয়জনের পথ চেয়ে বসে থাকেন প্রবীণ নিবাসের বৃদ্ধরা। কথা হয় ৬৮ বছর বয়স্ক আশরাফ দেওয়ান নামক এক বৃদ্ধের সঙ্গে। ঈদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পরে তিনি বলেন, ঈদ আর আমাদের জন্য নয়। ঈদের খুশি বিগত ১০ বছর আগেই ভুলে গেছি। এখন জীবনের শেষ সময়টুকু থাকতে চাই এভাবেই।

এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক কষ্টে গড়া নিজের সুখের ঘরে তার স্থানটিই শূন্য। ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও আজ আমি এই পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ জীবনের বাসিন্দা। তবে এটাই কি আমার সারা জীবনের কষ্টের উপহার। যে সন্তানকে নিজে না খেয়ে লালন-পালন করে বড় করে তুলেছি, সেই সন্তানই আজ অচেনা মানুষ।

এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আগে ঈদে সবাই বাসায় আসত। আমাকে সালাম করত। আমি সালামি দিতাম কিন্তু এখন কেউ আসে না বলতেই অঝরে কাঁদতে শুরু করেন।

সন্তানের প্রতি নিজের অভিমানের কথা এভাবেই বলছিলেন প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী সাবেক স্কুলশিক্ষক রনি সিকদার (৬৪) (ছদ্মনাম)। স্ত্রী মারা গেছেন ১০ বছর আগে। একমাত্র ছেলে ডাক্তার। থাকেন জার্মানিতে। সন্তানের অবহেলা আর নিজের একাকিত্বের কছে হার মেনে অবশেষে ঠাঁই নিয়েছেন প্রবীণ নিবাসে।

তার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি জানান, জীবনে অনেক আপনজনকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছি। খুব একটা কষ্ট হয়নি। কারণ তারা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। কিন্তু ছেলে থাকার পরও মনে হচ্ছে সে নাই। এখানে (বৃদ্ধাশ্রম) থাকাটা কষ্টের। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর ভেবেছিলাম জীবনের শেষ সময়টুকু ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কাটাব। কিন্তু আমাকে তাদের সহ্যই হয় না। সে কারণেই সে আমাকে এখানে রেখে গেছে। মাসে মাসে এখানকার খরচ পাঠিয়ে দেয়। এক বছর হলো তাকে আমি দেখি না। আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখে সেই দোয়াই করি সর্বদাই। ঈদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে একবার ঈদ করার ইচ্ছে আছে সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে। জানি না করতে পারব কিনা, বলতেই কেঁদে দেন তিনি। তার কান্না দেখে আর কোনো প্রশ্ন করার ইচ্ছে হলো না।

প্রাচীন চীনে পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ শতকে শান রাজবংশ ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করেছিল। শান রাজবংশ বিভিন্ন পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে ইতিহাসে আলাদা জায়গাই দখল করে নিয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত সেই বৃদ্ধাশ্রমে ছিল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আরাম-আয়েশের সব রকম ব্যবস্থাই। ছিল খাদ্য ও বিনোদন ব্যবস্থা। ইতিহাসবিদরা এই বৃদ্ধাশ্রমকে প্রাচীন চীনে গড়ে ওঠা সভ্যতারই অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করেছেন। বৃদ্ধাশ্রম বৃদ্ধ নারী-পুরুষের আবাসস্থল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সমগ্র বিশ্বে জীবন প্রত্যাশার মান বৃদ্ধি করে জনমিতিক ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে সমগ্র বিশ্বে বৃদ্ধ নর-নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নর-নারীর গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। একবিংশ শতাব্দীকে কেউ কেউ বার্ধক্যের যুগ বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে বার্ধক্যের মোকাবেলা করা বিশ্ব সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

প্রবীণ নিবাস থেকে আসার আগে কথা হয় আরেক বৃদ্ধা ফাতেমা খাতুনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তার এক ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন আর ছেলে গার্মেন্টসে চাকরি করে। তিনি প্রায় তিন বছর ধরে প্রবীণ নিবাসে রয়েছেন। অঝোরে চোখের পানি ছেড়ে একমাত্র পুত্রসন্তানের বাড়ি থেকে নিজের বিতাড়িত হওয়ার বর্ণনা দেন। তার কাছে বিস্তারিত জানার সময় মনে হয়েছে যেন আল্লার আরশ কাঁপছে। ছেলেবেলায় সন্তানদের একমাত্র আশ্রয়স্থল পিতা-মাতা অথচ বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার আশ্রয়স্থল সন্তানরা কেন হয় না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি কেঁদে ফেলেন। তিনি ছেলের প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমার এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না। এর পরও কেন সে এখান থেকে আমাকে নিয়ে যায় না। আমার এখানে থাকতে মন চায় না। আমি এখানে মরতে চাই না।এদিকে প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এ এস এম আতীকুর রহমান বলেন, প্রবীণদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসাসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। এখানে যারা থাকেন যদিও তারা পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকেন, এর পরও এখানে পরিবারের মতোই থাকেন। অন্যদিকে আবার ঈদের দিনে তাদের অনেকেই মনে করেন একা থাকতে চান। তিনি আরো জানান, এখানে যারা আছেন, তারা উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবনে তারা অনেক দিন কাজ করেছেন। আমি লক্ষ করেছি, অনেকে একা থাকতে পছন্দ করেন। অনেকের আত্মীয়স্বজন থাকলেও তারা ঈদের দিন দেখা করতে আসেন না। এটাও অনেকটাই বাস্তব।

এদিকে প্রবীণ নিবাসের কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য রেখেছেন দুদিনব্যাপী বাড়তি আয়োজন। কিন্তু যতই আয়োজন থাকুক, ফেলে আসা দিনে সন্তানদের নিয়ে কাটানো ঈদের আনন্দস্মৃতি তাড়া করে বেড়ায় এই হতভাগা মা-বাবাদের। কথা হয় এই প্রবীণ হাসপাতালের ডাক্তার মো. আমানুল্লার সঙ্গে তিনি জানান, এখানে প্রবীণরা এক সঙ্গে থাকার ফলে তাদের কষ্টটা অনেকাংশেই দূর হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা এখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদের চিকিৎসার জন্য এখানে হাসপাতাল রয়েছে। প্রায় ২৫ জন চিকিৎসক তিন সিফটে এখানে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় তাদের। তিনি আরো জানান, বৃদ্ধরা তাদের একাকিত্ব দূর করার জন্য বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। কারণ তাদের সন্তানরা তাদের সময় দিতে পারেন না। তারা কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন। এ সময় তাদের মধ্যে নানা রকম সমস্য দেখা দেয়। তাই তাদের বেশির ভাগই এখানে ভালো থাকার জন্য আসেন।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ কোটি ৩০ লাখের মতো প্রবীণ রয়েছেন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ শতাংশ প্রবীণ এবং বাংলাদেশের প্রবীণদের ৭৮ শতাংশ বিধবা। রাজধানীর আগারগাঁও প্রবীণ হাসপাতাল নিবাসে (বৃদ্ধাশ্রমে) ৪৫ জন নারী রয়েছেন। আরো বাড়ছে বলে কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। গাজীপুরের হোতাপাড়ার মনিপুর এলাকায় মুকুলের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে মোট ১ হাজার ২০০ মানুষ থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে বসবাসরত এই কেন্দ্রে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নারী। সাভার বৃদ্ধাশ্রম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের বৃদ্ধাশ্রমেও বাড়ছে বৃদ্ধ মায়েদের মুখ।

ঈদের দিনটাও তাদের কাছে অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক কাটে। বিশেষ দিনগুলোতে একবুক শূন্যতা নিয়ে সন্তানের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান তারা। বুকের ভেতর পাথর চেপে, হতাশা নিয়ে এমনি করে পথের দিকে প্রতিদিনই চেয়ে থাকেন তারা, কারো জন্য প্রতীক্ষা, ঈদের দিনটিতে হয়তো কোনো প্রিয়জনের পথ চেয়ে একটু বেশি প্রত্যাশা। কারো কারো প্রিয়জন আসেন, কেউ কেউ একাই কাটিয়ে দেন। আবার কারো ১২ বছরেও খোঁজ তো দূরের কথা ফোনালাপ পর্যন্ত হয় না। এ রকম এক খুশির দিনে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষগুলোর কষ্টের সীমা থাকে না। এটাই মনে হয় জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। তবুও সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে জীবনের বাকি সময়গুলো ভালো থাকতে চান এখানকার প্রবীণরা।

--আফিফ ফারুকী অভি

Source: http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2016/07/05/96712.php
« Last Edit: April 16, 2018, 11:20:26 AM by Nahian Fyrose Fahim »
Nahian Fyrose Fahim
Lecturer ( Employee ID# 710001914)
Department of Pharmacy
Daffodil International University
Email: fyrose.ph@diu.edu.bd