তাওয়াক্কুলের মর্মকথা

Author Topic: তাওয়াক্কুলের মর্মকথা  (Read 130 times)

Offline Mrs.Anjuara Khanom

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 218
  • Test
    • View Profile


ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। এ শান্তির প্রথম শর্ত আনুগত্য। গভীর বিশ্বাস এবং শর্তহীন আনুগত্য মিলিয়েই এ ইসলাম ও ঈমান। যে কয়েকটি মৌলিক উপাদানের সমন্বয়ে পুরো ঈমান ও ইসলামের অস্তিত্ব, সেগুলোর অন্যতম একটি তাওয়াক্কুল।

ইমাম ইবুনল কাইয়্যিম বলতেন, দ্বীনের অর্ধেকটাই হচ্ছে তাওয়াক্কুল। ইমাম গাজালী রহ. বলে গেছেন, তাওয়াক্কুল এমন এক অবস্থানের নাম, যা আল্লাহ পাকের নৈকট্যপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ গন্তব্যসমূহের একটি অন্যতম স্থান।

আরেক সাধক হজরত বিশর হাফী বলেছেন, লোকে বলে, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করলাম’, সে যদি ভাগ্যের উপর বিশ্বাসী না হয়ে এ কথা বলে থাকে, তবে সে চরম মিথ্যাবাদী একজন।

তাওয়াক্কুলের অর্থ নিয়ে নানারকম উদাহরণ আছে। এসবের মধ্যেই এর প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। এমনই একটি সংজ্ঞা ও উদাহরণ হলÑ মৃতব্যক্তি যেভাবে তার নিথর দেহটি ধৌতকারীর হাতে ছেড়ে দেয়, শক্তিমান রবের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের কাছে নিজের ইচ্ছা ও কর্মকে সেভাবে সঁপে দেয়ার নাম ‘তাওয়াক্কুল’।

জীবনযাপনের বেলায় সাধারণত আমরা রিজিক বা ভরণ-পোষনের ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুল প্রসঙ্গ টেনে থাকি। কথায় কথায় কোথাও যাওয়ার প্রাক্কালে স্বজন ও অন্য কাউকে বিদায় দেবার সময় বলি, ‘আল্লাহ ভরসা’। কিন্তু শুধু তো আমার-আপনার রিজিকের বেলায় নয়, এদিক-ওদিক যাবার বেলায়ও নয়, বরং আমাদের এ ভূখণ্ডের প্রতিটি জীব-জানোয়ারের রিজিক থেকে নিয়ে শুরু করে তার জীবনচাহিদার শেষ প্রয়োজনটুকু এক শক্তিমান আল্লাহর হাতে সুনিয়ন্ত্রিত।

কাজেই জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাওয়াক্কুলের চর্চা ও স্মরণ বিশেষ প্রয়োজন। আল্লাহ পাক বলেন, যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তো এবার আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক ভরসাকারীদেরকে ভালোবাসেন। (আলে ইমরান-১৫৯)

চারিদিকে নিত্য নতুন আবি®কৃত প্রযুক্তি ও যন্ত্র-সরঞ্জামাদির ভিড়ে দিনদিন আল্লাহ পাকের ওপর অগাধ বিশ্বাস ও গভীর ভরসার ভিত্তি হয়তো নড়বড়ে হয়ে আসছে। কেউ অসুস্থ হলে আগে মনে আসে অপারেশনের কথা, তারপর সেটি বিফলে গেলে আল্লাহ পাকের নামে খতম জপা। কাউকে বিদায় দেবার প্রাক্কালেও চিরন্তন দুআ ও তাসবীহের বদলে মোবাইলই এখন ভরসা হয়ে আসছে।

কিন্তু এতোসব করেও কি কেউ তার ভাগ্য বদলাতে পারে? যা হবার, তা যেহেতু হবেই, তাই তাওয়াক্কুলই সর্বশ্রেষ্ঠ দাওয়া ও সমাধান। শুধু সমাধান কিংবা সান্ত্বনার ব্যবস্থা নয়, বরং এ তাওয়াক্কুলকে আল্লাহ পাক ঈমান ও ঈমানদারীর আলামত ও শর্ত বলে সাব্যস্ত করেছেন। সূরা মায়েদার ২৩ নং আয়াতে আল্লাহ পাক স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, ‘আল্লাহর উপরই ভরসা করো যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’

আবার কেউ কেউ তাওয়াক্কুলের অর্থ বলতে গিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কথা বলেন। আদৌ কি বিষয়টি এমন? তিরমিজি শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে প্রিয়নবী সা. বলেছেন, তোমরা যদি আল্লাহ পাকের ওপর পূর্ণমাত্রায় ভরসা করতে পারো, তবে অবশ্যই তিনি তোমাদেরকেও পাখির মতো করে রিযিক দান করবেন। এরা খালিপেটে সকালে বের হয়, ভরপেটে সন্ধ্যায় ফেরত আসে।

উল্লেখ্য, এ হাদীসে রাসুল সা. ভরসা করে বসে থাকার কথা বলেননি, বরং হাদীসের শেষাংশে পাখির বের হওয়া ও ফেরত আসার কথা এনেছেন। এ বের হওয়া ও ফেরত আসার মধ্যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা লুকিয়ে আছে।

এক লোক উটের পিঠে চড়ে রাসুল সা. এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি কি এখন উটটি ছেড়ে দিয়ে তাওয়াক্কুল করবো? রাসুল সা. তাকে বললেন, না, বরং এটি বেঁধে রেখে এবার তাওয়াক্কুল করো। (তিরমিজি)

এভাবেই রাসুল সা. কর্ম ও উপাদানবিহীন আলস্য থেকে বের হয়ে উম্মতকে কর্মচঞ্চল হতে শিক্ষা দিয়েছেন।

হজরত উমর রা. একদল অলস ইয়ামানী লোককে দেখার পর তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তাওয়াক্কুলকারী হচ্ছে ওই লোক যিনি মাটিতে বীজ বপন করেন এবং এরপর আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে অপেক্ষা করেন।’

পবিত্র কুরআনেও সূরা আনফালের ৬০ নং আয়াতে কাফিরদের বিপক্ষে শক্তি অর্জনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ এসেছে, শুধু আল্লাহ পাকের উপর ভরসা করে বসে থাকার জন্য নয়।

সূরা মুলকের ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ পাক আমাদেরকে কর্ম ও উপায় অবলম্বনের আরও আদেশ করে বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, তোমরা এর দিগ-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তার দেয়া রিযিক থেকে আহার করো।’ এখানে বিচরণের অর্থ আহার অন্বেষণে কর্ম-প্রচেষ্টার কথা উদ্দেশ্য।

সূফী শকীক বলখী তার বন্ধু প্রখ্যাত সাধক ইবরাহীম বিন আদহামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কিছুদিন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কোথাও রওয়ানা হলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তিনি ফিরে এলেন।

ইবরাহীম বিন আদহাম তার দ্রুত ফিরে আসা দেখে অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলেন। শকীক বলখী জানালেন, আমি কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখি, একটি অন্ধ পাখি বসে আছে এবং আরেকটি পাখি উড়ে এসে এসে তার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। এভাবেই অন্ধ দুর্বল পাখিটিকে খাইয়ে খাইয়ে উড়ন্ত পাখিটি তৃপ্ত করছে। এ দৃশ্য দেখে আমার মনে পরিবর্তন আসলো। প্রশ্ন জাগলো, যে আল্লাহ অন্ধ পাখিটিকে এভাবে খাওয়াচ্ছেন, সেই শক্তিমান আল্লাহ কি আমাকে খাওয়াবেন না? আমি তাই ফিরে চলে এলাম।

ইবরাহীম বিন আদহাম অবাক হয়ে তাকে বললেন, আমিও অবাক হলাম তোমার কাণ্ড দেখে। তুমি নিজেকে ওই অসহায় অবলা অন্ধ পাখি ভাবতে গেলে কেন? আরেকটি শক্তিশালী পাখি যে তাকে সাহায্য করছে এবং তার জন্য খাবার নিয়ে আসছে- তোমার দৃষ্টি কি এই পাখিটির দিকে পড়েনি? তুমি কেনো ওরকম পাখি হতে চাওনি যে নিজের সাধ্য দিয়ে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসছে! তুমি কি শোনোনি, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন, ‘দাতার হাত গ্রহিতার হাতের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।’

তাওয়াক্কুলের নামে যারা অলস পড়ে আছেন এখানে ওখানে, তাদের জন্য এ ঘটনাটি অনেক সবক দিয়ে যায়।


 Source:  https://robiulislam167.wordpress.com/category/%E0%A6%87%





Mrs, Anjuara Khanom
Assistant Officer, Information Desk
Daffodil International University
Main Campus
9138234-5