Author Topic: বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পথে অদ্ভুতুড়ে কিছু কাণ্ড  (Read 84 times)

Offline provakar_2109

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 124
  • Test
    • View Profile
বিজ্ঞানীদের এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষার কথা ভাবলে আমাদের মাথায় কেমন চিত্র ভেসে ওঠে? মনে হয় গোমড়ামুখো কিছু বিজ্ঞানী রাত-দিন এক করে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে জটিল সব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন আর গাদা গাদা অংক কষছেন। কিন্তু বিজ্ঞানের সব পরীক্ষা এমন রসকষহীন ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া নয়। কিছু পরীক্ষা অনেকটা অদ্ভুতুড়ে ধরণের হয়, কিছু পরীক্ষা আবার মানুষকে বিনোদনও দেয়। আজকের লেখায় আমরা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের প্রথমদিকের এমন কিছু কাণ্ড-কারখানা সম্পর্কে জানবো।

আনন্দদায়ক বা ততটা জটিল ছিল না বলে এসব পরীক্ষা কিন্তু হেলাফেলা করার মতো কোনো বিষয় নয়। বিদ্যুৎ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে এদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক এমন তিনটি অদ্ভুত বিষয় সম্পর্কে।

দ্য ফ্লাইং বয় এক্সপেরিমেন্ট
একে পরীক্ষা না বলে হয়তো প্রদর্শনী বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ বিজ্ঞানী স্টিফেন গ্রে এটিকে ঠিক পরীক্ষা হিসেবে পরিচালনা করতেন না। তিনি তার বিদ্যুৎ বিষয়ক জ্ঞান ব্যবহার করে জনতাকে বিনোদন দেয়ার জন্য এটি পরিচালনা করতেন। দর্শকরা বিদ্যুতের জাদু দেখে আনন্দ পেলেও এ পরীক্ষায় অংশ নেয়া ছেলেটির জন্যও যে এটি আনন্দদায়ক হতো এমনটি বলা চলে না। পরীক্ষাটি সম্পর্কে জানার আগে চলুন বিদ্যুৎ বিষয়ে তখনকার জ্ঞান কোন স্তরে ছিল তা একটু জেনে নেই।

সময়টা ছিল আঠারো শতকের শুরুর দিকে, বিদ্যুৎ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের উল্লেখযোগ্য অর্জন বলতে ছিল কেবল অটো ভন গুয়েরিকের সালফার বল। কাপড়ের সাথে ঘষে এতে বেশ ভালো পরিমাণ বৈদ্যুতিক আধান জমা করা যেত। তবে বিদ্যুৎ পরিবহন সম্পর্কে জ্ঞান তখন ছিলো প্রায় শূন্যের কোঠায়। ১৭২৯ সালের দিকে স্টিফেন গ্রে প্রথম লক্ষ্য করেন বিভিন্ন পদার্থ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যুৎ পরিবাহী। যেমন ধাতব বস্তু বেশ ভালো বিদ্যুৎ পরিবহণ করে, অন্যদিকে কাঠ বা কাপড় বিদ্যুৎ পরিবহনে তেমন একটা সায় দেয় না।

তিনি আরো লক্ষ্য করলেন, ভূমি নিজেও বিদ্যুৎ পরিবাহীর ন্যায় আচরণ করে। কপার তার ব্যবহার করে তিনি প্রায় ৩০০ ফুট দূরের এক গুয়েরিক বল থেকে আরেক গুয়েরিক বলে বিদ্যুৎ পরিবহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তার এ জ্ঞানকে জনতার সামনে প্রদর্শনের জন্য একটি পরীক্ষার ছক সাজালেন। এটি করার জন্য তিনি একটি বালককে সিল্কের দড়ির সাহায্যে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ পরিবাহী ভূমি থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেকোনো ধরনের পরিবাহী থেকে সে সম্পূর্ণ পৃথক থাকতো।

এরপর তিনি ছেলেটির পায়ে একটি চার্জিত গুয়েরিক বল স্পর্শ করতেন। এতে ছেলেটির শরীর চার্জিত হতো। এবার শুরু হতো তার বিদ্যুতের জাদু দেখানোর পালা। কখনো তিনি ছেলেটির নিচে মেঝেতে ফুলের পাপড়ি রেখে দিতেন। ছেলেটির শরীর চার্জিত হওয়ায় ফুলের পাপড়িগুলো তার দিকে আকর্ষিত হতো এবং ছেলেটিকে কেন্দ্র করে শূন্যে ভাসতে থাকতো। কখনো বা তিনি একটি বই মেলে ধরতেন ছেলেটির হাতের সামনে। ছেলেটি বইয়ের পাতা স্পর্শ না করেই পাতা ওল্টাতে পারতো। জনতা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেত এসব দৃশ্য দেখে।

কখনো এ ক্ষমতা ছেলেটি দর্শকসারির কাউকেও দিত। আগ্রহী কাউকে ডেকে এনে তাকে একটি অপরিবাহী ড্রামের ওপর দাঁড় করানো হতো। তারপর ছেলেটি তাকে স্পর্শ করতো। অপরিবাহী বস্তুর ওপর দাঁড়ানো বলে তিনি কিছু অনুভব করতেন না, কিন্তু চার্জিত হতেন। একটু পর দেখা যেত সে দর্শকও বালকটির মতো বৈদ্যুতিক ক্ষমতা লাভ করেছেন। তবে স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণের খেলা এখানেই শেষ নয়। তার সর্বশেষ পরীক্ষাটা অন্যগুলোর মতো নিরীহ ছিল না।

তিনি জানতেন চার্জের পরিমাণ অধিক হলে ডিসচার্জের সময় স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়। তিনি ছেলেটিকে আরো চার্জিত করতেন। হলের বাতি ঢিম করে দেয়া হতো। এরপর ডেকে আনা দর্শককে অপরিবাহী বস্তু থেকে নামিয়ে এনে বলতেন ছেলেটিকে স্পর্শ করতে। যখন লোকটির আঙ্গুল ছেলেটির আঙ্গুলের দিকে এগোত, সবাই একটি জোরালো শব্দ শুনতে পেতো আর দেখতো উজ্বল বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ খেলে যাচ্ছে দু’জনের আঙ্গুলের মাঝে। এ শক ছেলেটির জন্য সুখকর হতো বলে মনে হচ্ছে?

তবে স্টিফেন গ্রে’র এ পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ বিদ্যুতকে আরো ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। এটি সেসময়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় হয়ে উঠছিল। গোটা ইউরোপেজুড়ে এ নিয়ে আলোচনা, লেখালেখি হতে শুরু করে। ১৭৩১ সালে তার এ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ রয়্যাল সোসাইটি তাকে সর্বপ্রথম কপলি পদক প্রদান করে। বিজ্ঞানের যেকোনো শাখায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য এ পদকটি এখনো দেয়া হয়ে থাকে।


লেইডেন জার ও এক পাদ্রীর গল্প
১৭৪৫ সালের দিকে ডাচ অধ্যাপক পিটার ভন ম্যাশেনব্রোক বৈদ্যুতিক আদান জমা রাখার বিষয়টিকে সাধারণ গুয়েরিক গোলক থেকে আরো একটু এগিয়ে নিয়ে আসেন। বিশেষভাবে নির্মিত কাঁচের বোতলের মাধ্যমে ‘লেইডেন জার’ তৈরি করেন তিনি। এর গঠন ছিল একদমই সাধারণ। একটি কাঁচের বোতলের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে ধাতব পদার্থ দিয়ে ঘিরে রাখা হতো। ক্যাপাসিটরের গঠন সম্পর্কে ধারণা থাকলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, এটিই ছিল ক্যাপাসিটরের সর্বপ্রথম সংস্করণ। কাঁচের দেয়ালের দু’পাশের পরিবাহী ধাতব পাতগুলো কাজ করতো তড়িৎদ্বার হিসেবে, আর মাঝখানে কাঁচ ডাই-ইলেকট্রিক পদার্থ।

এ তড়িৎদ্বারগুলোকে গুয়েরিক গোলকের মাধ্যমে চার্জ দেয়া যেতো। এরপর যখন একটি পরিবাহী তার দ্বারা ভেতরে ও বাইরের দেয়ালকে যুক্ত করে দেয়া হতো তখন এটি স্ফুলিঙ্গ ও শক সহ ডিসচার্জ হতো। লেইডেন জার অসাধারণ এক উদ্ভাবন ছিল সে সময়, কারণ এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক চার্জ কেবল জমা করে রাখাই যেত না, পাশাপাশি একে বহন করে অন্য কোথাও নিয়েও যাওয়া যেত ডিসচার্জের জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কৌতূহলী মানুষজন এ নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন তখন। তবে এক খ্রিস্টান পাদ্রী যা করেছেন তার জুড়ি মেলা ভার।

১৭৪৬ সালে ফরাসী পাদ্রী জ্যান-অ্যান্টোনি নোলেট তার আশ্রমে এক পরীক্ষার আয়োজন করেন। তিনি প্রায় এক মাইল জায়গা জুড়ে দু’শ পাদ্রীকে বৃত্তাকারে দাঁড় করিয়ে দেন। এরপর তাদের প্রত্যেকের হাতে পঁচিশ ফুট লম্বা পিতলের পাত ধরিয়ে দেয়া হলো, পাশাপাশি দুজন একই পাত ধরে দাঁড়ালেন। এভাবে সবাই সংযুক্ত হলেন একে অপরের সাথে। নলেট এবার বিশেষভাবে নির্মিত, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং পুরোপুরি চার্জড একটি লেইডেন জার নিয়ে হাজির হলেন। তিনি প্রথম ও শেষ পিতলের পাতকে যুক্ত করে দিলেন লেইডেন জারের দুই তড়িৎদ্বারের সাথে।

মুহূর্তের মধ্যে লেইডেন জার থেকে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ল বেচারা পাদ্রীদের শরীরে। তারা সবাই যেন সাময়িকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেলেন, বজ্রাহত ব্যক্তির মতো তাদের মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে জমাট বেঁধে গেল। নোলেট তার এ পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে বুঝতে চেয়েছিলেন, মানুষের শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ কতটা দ্রুত প্রবাহিত হয়। এ পরীক্ষা শেষে স্বাভাবিকভাবেই তার সিদ্ধান্তে ছিল ‘অতি দ্রুততার সাথে’।

নোলেটের মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে দ্রুত বার্তা আদান-প্রদানের জন্য বিদ্যুৎকে ব্যবহার করা যায়। এ জন্য তিনি এ নিয়ে আরো পরীক্ষা করতে আবার পাদ্রীদের সাহায্য চাইলেন। কিন্তু ন্যাড়া আর কয়বার বেলতলায় যায়? পাদ্রীরা প্রথমবারের ‘সুখকর’ অভিজ্ঞতা ভোলেননি, তাই তারা সহায়তা করতে অস্বীকার করলেন। আর কোথাও কোনো সুযোগ না পেয়ে শেষে তিনি ধর্না দিয়েছিলেন ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের কাছে। রাজা তার কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করে তার পরবর্তী পরীক্ষার জন্য ১৮০ জন রাজকীয় পাহারাদার দিলেন। বেচারা পাহারাদারদের কপাল!


ইলেকট্রিক কিস
সেসময় বিদ্যুৎ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের এসব গবেষণা মানুষকে আকৃষ্ট করে, নোলেট, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, কুলম্বদের মতো বিজ্ঞানীদের কাজ দেখে সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে বিদ্যুৎ নিয়ে। এ আগ্রহের ফলে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে, ছোটখাট বৈদ্যুতিক শক নেওয়া তখন ফ্যাশন হয়ে ওঠে। বার বা পাবে রাখা লেইডেন জার থেকে মানুষ এ শক নিত। এ শক নেয়ার বিষয়টিই পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ইলেকট্রিক কিস’ নামে।

ওপরের এসব পরীক্ষা বা প্রদর্শনীগুলো উদ্ভট হলেও এসব বিদ্যুৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে। কৌতূহলি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে বিদ্যুৎ নিয়ে জানতে, কাজ করতে। এসময়টি ছিল এ বিষয়ে জ্ঞানের ভিত গড়ার সময়। সে ভিতের ওপরই আরো বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ভিশনারিদের কাজের ফলে সম্ভব হয়েছে আজকের ইলেকট্রনের যুগ, আমাদের আধুনিক সভ্যতা।

Offline S. M. Enamul Hoque Yousuf

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 106
  • Test
    • View Profile