Author Topic: বিস্ময়কর নাল কাঁকড়া: হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচানো মূল্যবান জীবন্ত ফসিল  (Read 134 times)

Offline mosharraf.xm

  • Newbie
  • *
  • Posts: 49
    • View Profile
ফ্লোরিডার সমুদ্র সৈকতে নাকি ইতিহাসের সাক্ষীর দেখা মিলে। সেই ইতিহাসের সাক্ষীকে দেখার জন্য যেকোনো সময়ে সেখান ঢুঁ মারলেই হবে না। সেজন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণিমার চাঁদের জন্য। জ্যোৎস্নার আলোয় স্নাত সেই সৈকতের চিকচিক করা বালিতে সেই ইতিহাসের সাক্ষীরা ধীরে ধীরে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। প্রায় ৪৪৫ মিলিয়ন বছরের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে এসেছে এদের পূর্বপুরুষেরা। এদের চোখের সামনে পৃথিবীর বুকে দাপটের সাথে রাজত্ব করেছে বিশালদেহী ডায়নোসররা। এরা তখন নীরব দর্শক হিসেবে শুধু তাদের গর্জন শুনেছে। এরপর পৃথিবীর বুকে হাজারো প্রাণীর উত্থান আর পতন হয়েছে। যুগের আবর্তে পৃথিবীতে আসলো দু'পায়ে হাঁটা মানুষ। আদিম বন্য প্রাণী থেকে সেই মানুষ আজ সভ্যতার ভাস্কর হিসেবে পৃথিবীর সিংহাসনে আসীন হয়েছে। সবকিছু বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি সেই ইতিহাসের সাক্ষী আর তার বংশধরেরা। অশ্বখুরের ন্যায় দেখতে উপবৃত্তাকার এই 'জীবন্ত ফসিল' খ্যাত ইতিহাসের সাক্ষীর নাম 'Horseshoe Crab' কিংবা নাল কাঁকড়া।

পৃথিবীর সৃষ্টির প্রথমদিকে আবির্ভূত হওয়া জীবগুলোর মাঝে এই প্রজাতির প্রাণীগুলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে নয়, এরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এদের রক্তের ঔষধি গুণে জীবন বাঁচছে লক্ষ লক্ষ মুমূর্ষ রোগীর। আমাদের আজকের আলোচনায় থাকছে সেই ঐতিহাসিক দর্শকদের জীবনবৃত্তান্ত।

নাল কাঁকড়া সমাচার
বিজ্ঞানীরা বলেন, নাল কাঁকড়া নাকি প্রজাতিগত দিক থেকে কাঁকড়ার চেয়ে বিভিন্ন মাকড়শা এবং বৃশ্চিকের সাথে বেশি সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দেখতে সামুদ্রিক কাঁকড়ার সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ। এদের দেহ দেখতে অনেকটা সৈনিকের হেলম্যাটের ন্যায়। শক্ত খোলসের ভেতর থেকে বেড়িয়ে এসেছে দশটি পা। এগুলোর সাহায্যে এরা চলাচল করে থাকে। এর মাথা দেখতে অনেকটা অশ্বখুরের ন্যায় বলে ইংরেজিতে এর নাম রাখা হয় 'হর্স শু ক্র্যাব'। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, নাল কাঁকড়ার মাথায় সর্বমোট নয়টি চোখ থাকে। চোখগুলো পুরো দেহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিস্তৃত রয়েছে। তবে এর প্রধান দুটো চোখ মাথার সম্মুখে থাকে যা দ্বারা সে সঙ্গীদের অনুসন্ধান করে থাকে। আর অন্যান্য চোখগুলো সাধারণত আলোর উৎস সন্ধানে সাহায্য করে।

নাল কাঁকড়ার গঠন; Source: Screa News
এছাড়া নাল কাঁকড়ার দেহে একটি সরু লেজও রয়েছে। দেখতে ভীতিকর হলেও এরা বেশ নিরীহ প্রাণী। সামুদ্রিক স্রোতের কারণে কাঁকড়া উল্টো হয়ে গেলে, তারা লেজের সাহায্যে সোজা হওয়ার চেষ্টা করে। স্ত্রী নাল কাঁকড়ারা পুরুষদের তুলনায় আকারে যথেষ্ট বড় হয়ে থাকে। এরা বসন্তের শেষদিকে সৈকতের বালিতে ডিম পাড়ে। সেখান থেকে জন্ম ন্যায় নতুন কাঁকড়া। পৃথিবীতে সর্বমোট চার প্রজাতির নাল কাঁকড়ার সন্ধান পাওয়া যায়। এদের প্রধান প্রজাতি Limulus polyphemus, যাদের আবাসস্থল উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃত। বাকি তিন প্রজাতির কাঁকড়ার সন্ধান পেতে আপনাকে চলে আসতে হবে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, এত লম্বা সময় ধরে পৃথিবীর বুকে বসবাস করার পরেও পূর্বপুরুষদের সাথে এদের শারীরিক গঠনে খুব কম পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জানান, এদের বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই তেমন কোনো বিবর্তন হয়নি।

জীবনচক্র
বসন্তের শেষ দিকে পুরুষ কাঁকড়ারা সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসে সৈকতে অবস্থান করে। এরপর শুরু হয় স্ত্রী কাঁকড়ার আগমনের অপেক্ষা। অপরদিকে স্ত্রী কাঁকড়ারা সৈকতে আগমনের পর নিজেদের দেহ থেকে ফেরোমোন নামক রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরণ করে যা পুরুষদের আকৃষ্ট করতে সহায়তা করে। এরা সাধারণত সৈকতের বালিতে ছোট বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে এবং তা সংরক্ষণ করে। একটি স্ত্রী কাঁকড়া প্রায় দশ হাজার পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে।

লার্ভা থেকে সদ্য পরিণত নাল কাঁকড়া; Source: Big Ten Network
তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বিভিন্ন ডিমখেকো পশু এবং পাখির আক্রমণের ফলে অধিকাংশ ডিমই নষ্ট হয়ে যায়। যদি ভাগ্যক্রমে কোনো ডিম বেঁচে যায়, সেক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ পরে তা লার্ভাতে পরিণত হয়। নির্দিষ্ট সময়ে লেজবিহীন বাচ্চা কাঁকড়ার ন্যায় দেখতে এই লার্ভা ডিম ফেটে বেরিয়ে আসে। তারপর শুরু হয় সমুদ্রযাত্রা। সমুদ্রের গভীরে সমতল স্থানে তারা নতুন আস্তানা গাড়ে। পরবর্তী দশ বছরে এরা পরিণত নাল কাঁকড়ায় রূপান্তরিত হয়। প্রাপ্তবয়স্ক কাঁকড়ার ন্যায় একটি লেজও জুড়ে যায় ততদিনে। এরা এই সময়ে বেশ কয়েকবার খোলস পরিবর্তন করে থাকে। একটি নাল কাঁকড়া গড়ে প্রায় বিশ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক কাঁকড়ারা বিভিন্ন সময় দল বেঁধে ডাঙায় উঠে আসে। বিশেষ করে আটলান্টিক উপকূলে নিউ জার্সি, ফ্লোরিডা এবং ডেলাওয়ার সমুদ্র সৈকতে এদের ভিড় জমে।



'দ্য ইনক্রেডিবল' নাল কাঁকড়া
প্রায় ৪৪৫ মিলিয়ন বছর ধরে বংশ পরম্পরায় পৃথিবীর বুকে টিকে থাকলে হলে যেকোনো প্রাণীর কিছু বিশেষ গুণ থাকা প্রয়োজন। নাল কাঁকড়ারা সকল বিপর্যয় এবং ভয়ংকর রোগ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে বেশ পটু। আর এই রহস্যময় প্রতিরোধের মূলে রয়েছে নাল কাঁকড়ার বিশেষ 'নীল রক্ত'। এই রক্তের অসাধারণ ক্ষমতাবলে নাল কাঁকড়ারা যেকোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করতে পারেন, এদের রক্তের রঙ নীল কেন? বিজ্ঞানীরা জানান, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা সাধারণত হিমোগ্লোবিনে লৌহের উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করে থাকে। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। এরা কপারভিত্তিক একপ্রকার হিমোসায়ানিনের সাহায্যে অক্সিজেন পরিবহন করে। এর উপস্থিতির কারণে নাল কাঁকড়ার রক্তের রঙ নীল দেখা যায়।

নাল কাঁকড়ার নীল রক্ত; Source: Mapping Ignorance
বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহে শ্বেত রক্তকণিকার পরিবর্তে 'অ্যামিবোসাইট' নামক একপ্রকার বিশেষ কোষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আশ্চর্যজনকভাবে নাল কাঁকড়ার রক্তে অ্যামিবোসাইটের উপস্থিতি রয়েছ। এই অ্যামিবোসাইট এদেরকে অদম্য করে তুলেছে। নাল কাঁকড়ার অ্যামিবোসাইটে মাত্র এক ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, স্তন্যপায়ী প্রাণীর ন্যায় এই বিক্রিয়া সম্পন্ন হতে ৪৮ ঘণ্টার কোনো প্রয়োজন হয় না। মাত্র ৪৫ মিনিটে এরা রক্তে উপস্থিত যেকোনো জীবাণুর মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু এই বিশেষত্বের কারণ কী? বিজ্ঞানীরা জানান, এদের অ্যামিবোসাইটে 'Coagulon' নামক এক রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির ফলেই এরূপ সম্ভব হয়েছে। মূলত, এ ধরনের সূক্ষ্ম রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাই নাল কাঁকড়াকে অদম্য করে তুলেছে।

মানুষের প্রাণ বাঁচাতে নাল কাঁকড়া
বিজ্ঞানী হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান গ্রাম ব্যাকটেরিয়াদের দু'ভাগে ভাগ করেছেন- গ্রাম পজিটিভ এবং গ্রাম নেগেটিভ। গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের গায়ে লেগে থাকে একধরনের শর্করা। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন 'Endotoxin' (এন্ডোটক্সিন)। বহু বছর ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই এন্ডোটক্সিন এক 'জম্বি' হয়ে হুমকি দিচ্ছে শত শত মানুষের প্রাণকে। পরীক্ষা করে দেখা যায়, অতি উচ্চ তাপমাত্রায় এরা নষ্ট হয় না। তাই যখন চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীগণ যখন উচ্চ তাপমাত্রায় বিভিন্ন সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করেন, তখন এন্ডোটক্সিনের উপস্থিতি পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীর রক্তে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই যেকোনো প্রক্রিয়ার পূর্বে এর উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের নিকট তেমন কোনো সূক্ষ্ম পদ্ধতি জানা ছিল না। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে রক্ষাকর্তার মতো আবির্ভূত হলো নাল কাঁকড়া। এদের নীল রক্ত সামান্য পরিমাণ এন্ডোটক্সিনের উপস্থিতিতে জমাট বেঁধে যায়, যার দ্বারা চিকিৎসা সরঞ্জামের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা যায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে LAL (Limulus Amoebocyte Lysate)-নামক একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরঞ্জামের বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার (যেমন- ই কোলাই) উপস্থিতি নির্ণয় করতেও এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।

গবেষণাগারে নাল কাঁকড়ার রক্ত সংগ্রহের দৃশ্য; Source: CNN
কিন্তু এখানেও সমস্যা দেখা দিলো। গবেষণাগারে নাল কাঁকড়ার অ্যামিবোসাইট প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হলেন বিজ্ঞানীরা, যার খেসারত দিতে হচ্ছে এই অনন্য নাল কাঁকড়াদের। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার নাল কাঁকড়া আটক করা হয় মানুষের জীবন রক্ষাকারী LAL তৈরির উদ্দেশ্যে। এর ফলে এদের পুরো অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে পড়েছে। ওদিকে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, খুব দ্রুত এই পদ্ধতির বিকল্প ব্যবস্থা আবিষ্কৃত না হলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে পুনরায় সেই এন্ডোটক্সিনের জম্বির হাতে ধরা পড়তে হবে আমাদের। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় এখনো জানা যায়নি। ঠিক কবে এর সমাধান বের হবে, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত নয় কেউ।

হুমকির মুখে নাল কাঁকড়াদের অস্তিত্ব; Source: ThoughtCo
ফ্লোরিডার শান্ত সৈকতে হাজারো নাল কাঁকড়ার উপস্থিতিতে এক অপরূপ দৃশ্য অঙ্কিত হয়। এই নাল কাঁকড়াদের শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানেই ব্যবহার করা হয় না। বিবর্তনবাদ, ইতিহাসবিদ্যা থেকে শুরু করে সমুদ্রবিদ্যার নানা রহস্য উদ্ঘাটনে আমাদের সাহায্য করছে এরা। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা নাল কাঁকড়া নিধনের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হয়তো মানুষ নামক এক প্রাণীর জীবন রক্ষায় জীবন দিতে হবে এই নাল কাঁকড়াদের।

সূত্রঃ ইন্টারনেট
« Last Edit: June 26, 2018, 05:25:37 PM by mosharraf.xm »
Md. Mosharraf Hussain
Senior Assistant Controller of Examinations
Office of the Controller of Examinations
Daffodil International University
Email: mosharraf.exam@daffodilvarsity.edu.bd
Cell: 01847140069

Offline Sharminte

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 246
  • Test
    • View Profile
Sharmin Akter
Lecturer
Department of Textile Engineering
Permanent Campus
Email: sharmin.te@diu.edu.bd