Author Topic: নতুন সরকারের করণীয়  (Read 144 times)

Offline alsafayat

  • Newbie
  • *
  • Posts: 22
  • Seeker of the Unknown
    • View Profile
    • Al Safayat
নতুন সরকারের করণীয়
« on: January 02, 2019, 11:25:40 AM »
পর পর তিনবার নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের মধ্যে অতি আস্থা ও  অহমিকা দ্বারা তাড়িত হয়ে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার যে ঝুঁকি থাকে, আওয়ামী লীগ বস্তুত সে ঝুঁকি মাথায় নিয়েই নতুন করে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। তবে এ ঝুঁকির বিপরীতে তাদের সামনে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশ ও জনগণের জন্য অভূতপূর্ব কিছু করার অসামান্য সুযোগও রয়েছে। তারা যদি আবেগপ্রবণ ও উন্নাসিক না হয়ে ধীরস্থিরভাবে সে সুযোগগুলোকে পরিপক্বতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে তাদের পক্ষে বাংলাদেশকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়—পুরো এশিয়ারই অন্যতম মর্যাদাবান রাষ্ট্রে উন্নীত করা সম্ভব। আর তা করার ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই যে বিগত দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে অধিকাংশ হোমওয়ার্ক তাদের করাই আছে, যা একটি সম্পূর্ণ নতুন সরকার হলে সম্পূর্ণ নতুনভাবে করতে হতো। এখন তাই তাদের দরকার শুধু আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে প্রতিজ্ঞা ও প্রত্যয় নিয়ে কাজে নেমে পড়া। আর সে কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হলে হতেও পারে, এমন কিছু চিন্তাভাবনা এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রথমেই শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এমন একটি বার্তা সরকারি দল, মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ সদস্য, নির্বাহী বিভাগ ও জনগণের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারলে ভালো হয় যে আগে যখন যা-ই কিছু ঘটে থাকুক না কেন, এখন থেকে রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে যার যার অবস্থান নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী। মন্ত্রিপরিষদকে দক্ষ করে তোলার জন্য অবিলম্বে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মন্ত্রীদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বলি, যাঁরা নতুন মন্ত্রী হবেন তাঁরা তো বটেই, এমনকি যাঁরা এর আগে মন্ত্রী ছিলেন তাঁরাও অনেকে দক্ষতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় পরিচালনাসংক্রান্ত সমুদয় খুঁটিনাটি আইন-কানুন, বিধিবিধান, প্রক্রিয়া-পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত নন। এ ক্ষেত্রে তাই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণসূচি তৈরি করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে এ প্রশিক্ষণ আয়োজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরবর্তীকালে মন্ত্রিপরিষদবহির্ভূত অন্য সংসদ সদস্যদের জন্যও প্রযোজ্য বিষয়সূচি তৈরি করে অনুরূপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের বিদ্যমান দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে এটিকে আরো আধুনিক ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন করে তুলতে হবে। বিশেষত দ্রুত পরিবর্তমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবস্থার আওতায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে তাঁদের সামর্থ্যবান করে তুলতে হবে। আর দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত আলোচনা ও অনুচ্ছেদের আওতায় অন্য একটি প্রস্তাব এই যে দলকে সরকার থেকে আরো সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা করতে হবে এবং মন্ত্রী, সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের সদস্যদের মতোই দলীয় কর্মীদের জন্যও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মানহীন নামসর্বস্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (মানসম্পন্ন ১০-১২টি বাদে) থেকে প্রায় শিক্ষা লাভ ছাড়াই সনদ নিয়ে বেরোনো স্নাতকের সংখ্যা কমাতে না পারলে দেশ ও সরকার উভয়ের জন্যই তা এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে বাধ্য। এরই মধ্যে প্রচলিত অভিমত দাঁড়িয়ে গেছে যে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ বেকারত্ব মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সরকার তাদের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। অথচ প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এই যে দেশে যত কর্মের সুযোগই তৈরি হোক না কেন, সেসব পদের চাহিদা পূরণের মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা তথাকথিত এ শিক্ষিত তরুণদের নেই। আর সে কারণেই বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চ বেতন দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে হচ্ছে। অতএব শিক্ষার সঠিক মান রক্ষার স্বার্থে তো বটেই, অহেতুক বদনামের হাত থেকে বাঁচার জন্য হলেও সরকারের উচিত হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহীন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর নতুন সরকারের উচিত হবে কাজটি গোড়াতেই সেরে ফেলা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে জানিয়েছেন, তাঁর সরকার নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির ব্যাপারে ‘শূন্য সহনীয়তা’ নীতি গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে উল্লেখ করাটা প্রাসঙ্গিক হবে যে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত একটি অপরাধের ক্ষেত্রেই শুধু ‘শূন্য সহনীয়তা’ নীতি বাস্তবায়ন করে দেখাতে পেরেছে এবং সেটি হচ্ছে, বর্তমান সরকারের অধীনে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। আমরা আশা করব, এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সার্থকতাটি আসবে নতুন সরকারের আওতায় দুর্নীতির ব্যাপারে ‘শূন্য সহনীয়তা’ নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে। আশা করি আইন ও নির্বাহী বিভাগ উভয় ক্ষেত্রের সমুদয় দুর্নীতিই এ নীতির আওতায় স্থান পাবে। আর তা পেলে বেসরকারি খাতের দুর্নীতিও বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

অনুসন্ধানকৃত তেল-গ্যাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির নিকট-ভবিষ্যতের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হচ্ছে বঙ্গোপসাগরসহ দেশের অন্যত্র তেল-গ্যাসের নতুন সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে দেখা। এ কাজটি যথেষ্ট দক্ষতা ও উদ্যমের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করি। দ্বিতীয়ত, অতীতে এ ক্ষেত্রে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-পিএসসি) নিয়ে সংঘটিত নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা সংশ্লিষ্টরা তো বটেই, দেশের সাধারণ মানুষেরও অনেকটা জানা হয়ে গেছে। ফলে ভবিষ্যতে যাতে আর এমনটি না ঘটে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য নতুন সরকারের প্রতি এখনই আহ্বান রাখছি।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে ‘মানবতার মা’ নামে খ্যাত হয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে দেশ ও জাতির জন্য গৌরবের। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্য যে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরো বেশি দক্ষতার পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল বলে সরকার সমর্থক কূটনীতিকদের মধ্যেই অভিমত রয়েছে। ফলে এ অসম্পূর্ণতার জায়গাটি কিভাবে সমন্বয় ও সংশোধন করা হবে, সে বিষয়টির প্রতি নতুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

ডাকসু একটিমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় হলেও ইতিহাসের পথপরিক্রমায় ডাকসু আজ বাঙালি তরুণের আদর্শ ও চেতনার এক মহত্তম তীর্থক্ষেত্র। ফলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাকসু আয়োজনের ব্যবস্থা করতে পারলে সেটি নতুন সরকারের জন্য একটি চমৎকার নতুন যাত্রা হবে বলে মনে করি। ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের পর ক্রমান্বয়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও অনুরূপ নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে।

ঢাকা শহরে নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন, নিয়নবাতি জ্বালিয়ে সৌন্দর্যবৃদ্ধিকরণ ও নিরাপত্তার কথা বলে জেনারেল জিয়াউর রহমান অকাতরে রাজধানীর কয়েক হাজার বৃক্ষনিধনের উৎসব করেছিলেন। বর্তমানে নির্বাচনী ইশতেহারের উল্লিখিত ঘোষণাকে কাজে লাগিয়ে অন্য সুবিধাবাদী কেউও এটি করে বসতে পারে। অতএব সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

পরিশেষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে এই মর্মে একটি প্রস্তাব করতে চাই যে নতুন সংসদের সদস্যদের চিন্তায় নিজেদের স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ভাবার চেয়ে আইনপ্রণেতা ভাবার বোধটি যেন অধিকতর গুরুত্ব পায়, যা একদিকে তাঁদের সম্মানকে যেমন বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাটিও আরো শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। দুর্নীতির ব্যাপারে শূন্য সহনীয়তার মতোই এটিও হয়ে উঠুক নতুন সরকারের একটি যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গি।

লেখক : পরিচালক
আবু তাহের খান
ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
atkhan56@gmail.com

Source: https://www.ekalerkantho.com/home/page/2019-01-02/14
Al Safayat
Administrative Officer, CDC, DIU
Cell: +8801991195579
www.safayat.info