Author Topic: বিকল্প জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনের কতটা কাছে বিশ্ব?  (Read 578 times)

Offline Md. Abul Bashar

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 77
  • Test
    • View Profile
বিকল্প জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনের কতটা কাছে বিশ্ব?

কার্বনমুক্ত বিকল্প জ্বালানির কথা বহু বছর ধরেই ভাবছে বিশ্ব। হালে এই খোঁজাখুঁজির কারণ হিসেবে পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষার কথা এলেও শুরুতে কারণটি ছিল সম্পদের সীমা। এখন পর্যন্ত মোটাদাগে শক্তির উৎস ওই খনি। কিন্তু খনি তো আর অসীম নয়। সেখানে থাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুত, যা টিপে টিপে খরচ করতে হয়। তাই একটা সময় এই মজুত ফুরিয়ে যাবে—এ বিবেচনাতেই প্রথম নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধানে নামে মানুষ। এ ক্ষেত্রে মানুষ বরাবরই তাকিয়ে ছিল ওই সূর্যের দিকে, যাকে আদি থেকেই মানুষ বিবেচনা করে এসেছে শক্তির এক অফুরান উৎস হিসেবে।

এই সূর্যই অবশ্য শক্তির একটি বড় উৎসের সন্ধান দেয় মানুষকে। আর তা হলো ফিউশন রিঅ্যাক্টর। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ১৯২০ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন প্রথম এই উৎসের খোঁজ দেন। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি তুলে ধরেন তারকাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো। সেখানে তিনি সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের উৎস সম্পর্কে আলোকপাত করেন।

শক্তির এক অফুরান উৎস হিসেবে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে আর্থার এডিংটন বলেন, এই উৎস বিস্ময়কর হলেও রয়েছে সব বস্তুর মধ্যেই। মানুষ একদিন এই শক্তিকে মুক্ত করার কৌশল নিশ্চয় শিখবে। আর এটি সম্ভব হলে মানুষ পেয়ে যাবে এমন এক মজুতাগার, যার সঞ্চয় কখনো ফুরোয় না।

এডিংটন সেই সময়েই হাইড্রোজেনের সংযোগে হিলিয়াম তৈরি হওয়ার সময় শক্তির মুক্ত হওয়ার কথা বলেন, যা সূর্যের শক্তির উৎস। সেই সময় বিখ্যাত E=mc2 সমীকরণ দিয়ে এর ব্যাখ্যাও হাজির হলো। অন্য বিজ্ঞানীরা সন্তুষ্ট হলেন। নেমে গেলেন এই অফুরান শক্তি উৎসকে বশে আনতে। কিন্তু ওটুকুই। আজও এর দেখা মেলেনি। মাঝখানে চলে গেছে একটা গোটা শতাব্দী। এখনো ভারত, চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের প্রতিটি দেশ এবং অতি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান এমন একটি ফিউশন চুল্লি তৈরির স্বপ্ন দেখছে, যা থেকে শক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পুরোনো কৌতুককে হার মানাতে পারেনি কেউ, যেখানে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ফিউশন শক্তির উৎপাদন থেকে বিজ্ঞানীরা সব সময়ই ৩০ বছর দূরে থাকবে।

এখন পর্যন্ত এ ধরনের রিঅ্যাক্টর তৈরি সম্ভব হয়নি। কোনো বাণিজ্যিক উৎপাদন তো দূরের কথা; মূল সংকট ব্যয় ও মুনাফার সমীকরণ না মেলা। কিন্তু আশা রয়ে গেছে। বর্তমানে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বহু দেশের প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। তাদের আশা, অচিরেই একটি লাভজনক রিঅ্যাক্টরের নকশা তাদের হাতে চলে আসবে। আর তারপর শুধু মুনাফা আর মুনাফা।

কথা হচ্ছে—ফিউশন কী? ফিউশন মিউজিক তো চেনেন? ওই যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সংগীত মিলিয়ে একটা নতুন স্বাদের সংগীত। সে রকমই একটা ব্যাপার। তবে তা ঘটে পরমাণু নামক অতি ক্ষুদ্র কণার ভেতর মহলে। দুটি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস মিলে একটি হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি—এটাই ফিউশন।

প্রথম দিকে ফিউশন রিঅ্যাক্টর তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সূর্যের দিকেই তাকিয়েছিলেন। সেখানে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরির পথে বিপুল পরিমাণ শক্তির নির্গমন হয়। আর এই ঘটনা ঘটে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে দুটি ইলেকট্রনের (ঋণাত্মক কণা) কক্ষত্যাগের মধ্য দিয়ে, যা প্রতিকণা (অ্যান্টিমেটার) পজিট্রনের প্ররোচনায় ঘটে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াসে এই বিক্রিয়া ঘটতে গড়ে শতকোটি বছর লাগে। সৌভাগ্য এই যে একটি শর্টকাটের দেখা পেয়ে যান বিজ্ঞানীরা। আর তা ধরা দেয় হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের হাত ধরে।

পৃথিবীতে প্রতি ছয় হাজার কণায় একটি করে ডিউটেরিয়ামের দেখা মেলে। তবে ট্রিটিয়াম তেজস্ক্রিয় হওয়ায় এর দেখা সহজে মেলে না। কিন্তু এরও একটা সুরাহা হলো ট্রিটিয়ামের পরীক্ষাগার সংশ্লেষ সম্ভব হওয়ায়, যা পৃথিবীতে বিদ্যমান লিথিয়ামসহ বিভিন্ন কাঁচামালের প্রাচুর্যের কারণে সহজও। এই ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম প্রোটনের (ইলেকট্রনবিহীন ধনাত্মক চার্জযুক্ত হাইড্রোজেন পরমাণু) চেয়ে ঢের গতিতে বিক্রিয়া করে। আর কোনো পজিট্রনের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না। এই সংযোগের ফলে হিলিয়াম যেমন পাওয়া গেল, তেমনি ‘হাতের পাঁচ’ হিসেবে পাওয়া গেল একটি নিউট্রন। অর্থাৎ, মোটামুটি ফিউশন মানুষের দখলে এল। এখন শুধু দরকার একটি চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরের, যা ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের একটি অত্যনুকূল মিশ্রণ ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত উৎপন্ন করতে পারবে সরবরাহকৃত শক্তি থেকে বেশি শক্তির। সুবিধাটি হলো এই, অত্যনুকূল মিশ্রণ ও প্রয়োজনীয় অবস্থাটি সম্পর্কে মানুষ এরই মধ্যে অবগত জন লসনের কল্যাণে, যিনি ভারতে জেটা প্রকল্পের সঙ্গে ছিলেন।

বর্তমানে জন লসনের প্রস্তাবিত এই বিশেষ অবস্থা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে টোকাম্যাক নামের একটি যন্ত্র। এই টোকাম্যাক সম্পর্কে প্রথম ধারণাটি দিয়েছিলেন আন্দ্রেই সাখারভ সেই ১৯৫০-এর দশকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পদার্থবিদের দেখানো পথেই এখনো হাঁটছেন বিজ্ঞানীরা। এই পথ ধরেই দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকটি ফিউশন চুল্লির সম্ভাব্য নকশা। এরই একটি হচ্ছে কমনওয়েলথ ফিউশন সিস্টেম (সিএফএস), যা হাজির করেছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) পরীক্ষাগার। আর টোকাম্যাক নামেই আরেকটি নকশা হাজির করেছে ব্রিটেনের কালহামের অ্যাটমিক এনার্জি অথোরিটি, যা ১৯৫০-এর দশকে স্থাপিত হারওয়েল ল্যাবরেটরির উত্তরসূরি বলা যায়।

টোকাম্যাকের নকশাটি দাঁড়িয়ে আছে একটি টোরাস আকৃতির কাঠামোর ওপর। টোরাস কাঠামোটি সহজভাবে বুঝতে ডোনাটের কাঠামোটি মাথায় আনলেই হবে। এই টোরাসের চারপাশে এবার কল্পনা করুন একটি ভীষণ শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। এই টোরাসেই থাকবে জ্বালানি। আর জ্বালানি বলতে ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের প্লাজমা, যা একটি গ্যাসীয় দশা, যেখানে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস পৃথকভাবে অবস্থান করে। চৌম্বক ক্ষেত্রটি এই প্লাজমাকে উত্তপ্ত করতে ও তাকে ওই টোরাসের দেয়াল স্পর্শ থেকে বিরত রাখতে ভূমিকা রাখে। কারণ, টোরাসের গায়ে লেগে গেলেই প্লাজমার তাপমাত্রা যাবে কমে, আর হবে শক্তির অপচয়। এই টোকাম্যাক কিন্তু ছোটখাটো কোনো যন্ত্র নয়। এর মূল কাঠামো টোরাসেরই আয়তন হতে পারে ৮৩০ ঘনমিটার। এই আকৃতির টোরাস ব্যবহার করে আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইটার’স। তবে সিএফএসের টোরাসের আকার এর ৬০ ভাগের ৫ ভাগ। এই ক্ষুদ্র টোরাসের জন্য সিএফএসের অবশ্য অনেক বেশি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রয়োজন পড়ে। তুলনামূলক উচ্চ তাপমাত্রায় এই চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা বাড়ে। সময় বুঝে একে ঠান্ডা করে আনলেই হলো। ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহার করা হয় তরল নাইট্রোজেন, যা আরেক কুলার হিলিয়ামের চেয়ে অনেক সস্তা।

এখন অবশ্য সর্পিলাকার টোরাসের ধারণা এসেছে। এর প্রতি অনেক গবেষকই আগ্রহী। কারণ, এ আকৃতির টোরাসে প্লাজমা অনেক বেশি স্থিতিশীল আচরণ করবে বলে মনে করেন তাত্ত্বিকেরা। ফলে, ডোনাট আকৃতির টোরাসকে এ ধরনের টোরাস প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে বলাই যায়। এরই মধ্যে টোকাম্যাক এনার্জি এ ধরনের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। সর্বশেষ এসটি ৪০ নামের নকশায় এখন পর্যন্ত প্লাজমার তাপমাত্রা ১৫ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করা গেছে। শক্তি উৎপাদনের জন্য এটি নিতে হবে ১৫০ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বোঝাই যাচ্ছে, এখনো কত দূরে মানুষ। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যেই ১০০ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর লক্ষ্য ঠিক করেছে।

এখানে বলা দরকার, টোকাম্যাকই একমাত্র রিঅ্যাক্টর নয়। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ফিউশন যেমন কাজ করছে ভিন্ন আরেক ধরনের ফিউশন চুল্লি নিয়ে, যাকে তারা বলছে ‘ম্যাগনেটাইজড টার্গেট ফিউশন’ হিসেবে। এতে প্লাজমায় বিদ্যমান চার্জগুলো দিয়েই চৌম্বক ক্ষেত্র উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে। এতে করে লসন নির্ধারিত তাপমাত্রা উৎপন্ন করা তুলনামূলক সহজ বলে মনে করেন জেনারেল ফিউশনের প্রধান ক্রিস্টোফার মোরি। তাঁরা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই সুসংবাদ দিতে পারবেন বলে আশাবাদী। আবার ক্যালিফোর্নিয়ার টিএই টেকনোলজিস কাজ করছে নতুন আরেক ধরনের নকশা নিয়ে। সব মিলিয়ে এখন সারা বিশ্বেই নতুন নতুন চুল্লির নকশা নিয়ে কাজ চলছে। কোনটি শেষ পর্যন্ত কাজ করে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলার কিছু নেই। এমনকি আদৌ কোনোটি কাজ করবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।

সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক নকশাটি নিয়ে এসেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট লাইট ফিউশন। তারা যে নকশাটির প্রস্তাব করছে, তা উঠে এসেছে প্রকৃতি থেকেই। সামুদ্রিক এক ধরনের চিংড়িই মূল ভিত্তি। এ চিংড়ি শিকারের জন্য নিজের শুঁড়গুলো দিয়ে অনেকটা তালির মতো দেয়, যা এতটাই জোরে যে তা কিছু বাবলের সৃষ্টি করে। এগুলো ফেটে গেলে একটি শকওয়েভের সৃষ্টি হয়, যার কারণে চিংড়িটির উদ্দিষ্ট শিকার মারা যায়। এই ভিত্তিটির দিকেই তাকিয়ে ফার্স্ট লাইট ফিউশন। এই বছরই এর সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানা যাবে।

এখন পর্যন্ত ফিউশন শক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৫-৩০ সালের মধ্যে একটি আশাব্যাঞ্জক ফল এনে দেওয়ার কথা বলছে। অনেক বিনিয়োগও আসছে। টিএইতেই যেমন এসেছে ৬০ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ। জেনারেল ফিউশন নতুন করে পেয়েছে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগগুলো থেকে মুনাফা গুনতে বসে আছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা সময়ই বলে দেবে। সম্ভব হলে তা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের চেহারা বদলে দেবে।



Source: Prothom Alo