Author Topic: পুকুরচুরি রুখবে কে? (The daily Kaler Kantho, 14.06.2019; page no. 15)  (Read 77 times)

Offline kekbabu

  • Newbie
  • *
  • Posts: 44
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
পুকুরচুরি রুখবে কে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
১৪ জুন, ২০১৯

বাংলা ব্যাকরণের ‘পুকুরচুরি’ নামক বাগধারাটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। আর এই পুকুরচুরি বলতে বড় রকমের চুরিমূলক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়। ফলে যারা পুকুরচুরির সঙ্গে জড়িত, তাদের পুকুরচোর বলা যায়। যেমন—যদি একটি আবাসিক ভবনের প্রতিটি বালিশের দাম দেখানো হয় পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা; ৩০টি চাদর আনতে একটি ট্রাক ভাড়া করাপূর্বক যদি খরচ দেখানো হয় ৩০ হাজার টাকা; কম্বল বা লেপ আনার জন্য যদি দেখানো হয় আরো ট্রাকভাড়া আর তার খরচ বাবদ যদি দেখানো হয় আরো ৩০ হাজার টাকা এবং সর্বোপরি প্রতিটি চাদর নিচ থেকে খাটে তোলার জন্য খরচ দেখানো হয় ৯৩১ টাকা—তবে এ ধরনের চুরিগুলোকে পুকুরচুরি না বলে সাগরচুরি বলাই ভালো। ওপরের ওই দুর্নীতির ঘটনাগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পজগতের বা সিনেমা, নাটক, সাহিত্যে উল্লিখিত কাল্পনিক কোনো জগতের ঘটনা নয়। বরং ওই ঘটনা হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশের এবং এই দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আবাসিক ভবনের বালিশ, চাদর ইত্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে। ওদিকে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ‘সাতক্ষীরায় হাসপাতালের ১৭ কোটি টাকার কেনাকাটায় ১২ কোটিই লোপাট। সাত কোটি টাকায় কেনা সফটওয়্যারের অস্তিত্ব নেই। সদর হাসপাতালে ১০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালামাল নেই।’ পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালের জন্য ১৭ কোটি টাকার কেনাকাটায় প্রায় ১২ কোটিই লোপাট হয়েছে। আবার পণ্য সরবরাহ ছাড়াই জাল স্বাক্ষরে বিল তুলে নিয়েছে এর সঙ্গে জড়িত চক্রটি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, জড়িতদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খবরে প্রকাশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ১৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাত কোটি টাকা দামের একটি সফটওয়্যার এবং প্রায় ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। কাগজে-কলমে এসব কেনা হলেও বাস্তবে  বেশির ভাগ যন্ত্রপাতির কোনো হদিস নেই এবং সাত কোটি টাকার সফটওয়্যারের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ১০ কোটি টাকার পণ্যের মধ্যে সন্ধান মেলেনি প্রায় পাঁচ কোটি টাকার পণ্যের। সব মিলিয়ে ১২ কোটি টাকাই লোপাট। আরো আশ্চর্যের বিষয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট একটি অসাধুচক্র যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

বলা বাহুল্য, এ ধরনের ঘটনা এ দেশে এই প্রথম নয়। এর আগেও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার ক্ষেত্রে এ ধরনের সাগরচুরির ঘটনা ঘটেছিল। ওখানে ঠাণ্ডা রক্তকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনার যন্ত্র ‘ব্লাড ওয়ারমার’-এর সর্বোচ্চ বাজারমূল্য যেখানে ১৫ হাজার টাকা, সেখানে ওই যন্ত্র যদি ৯ লাখ ৩২ হাজার টাকায় সরবরাহ করা হয় এবং কান পরীক্ষা করার অটোস্কোপ যন্ত্রের দাম যেখানে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে ওই যন্ত্র যদি সরবরাহ করা হয় তিন লাখ ৭০ হাজার টাকায়, তাহলে কী দাঁড়ায়। শুধু উপরোক্ত দুই হাসপাতালে যন্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে বা পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আবাসিক ভবনের বালিশ আর চাদর ক্রয়ের ক্ষেত্রেই যে এ ধরনের বড় বড় অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে তা নয়, ঠিক একইভাবে দেশের প্রায় সব সেক্টরেই অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে, যা পত্রিকার পাতায় ভালোভাবে চোখ রাখলেই দেখা যায়। এ ধরনের চুরি বা জোচ্চুরি যে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের অপরাধ, তা বলা বাহুল্য। আমাদের দেশে এ ধরনের অপরাধকে গতানুগতিক অপরাধের পর্যায়ভুক্ত করে সাধারণ আইনে বিচার করা হয় (যদিও এজাতীয় অপরাধ গতানুগতিক অপরাধ অপেক্ষা অনেক বেশি মারাত্মক)। কিন্তু আইনের পরিভাষায় এজাতীয় অপরাধকে বলা হয় ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’ বা ‘ভদ্রলোকের অপরাধ’। আর এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বলা হয় হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল বা ভদ্রবেশী অপরাধী। হোয়াইট কলার ক্রাইম গতানুগতিক অপরাধ থেকে ভিন্নধর্মী এক অপরাধ হলেও বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে হোয়াইট কলার ক্রাইম নামক অপরাধের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, যা দুঃখজনক।

সমাজের বিভিন্ন পেশার ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের অনেক লোক প্রতিনিয়তই এ ধরনের অপরাধ করে চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিনিয়ত সমাজে ঘটে চললেও এসব অপরাধীর হাত অনেক ‘লম্বা’ হওয়ায় তারা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এ ধরনের অপরাধীরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও তাদের এহেন অপরাধের ফলে সমাজ ও দেশ ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। সাধারণভাবে আইন দ্বারা স্বীকৃত আচরণ, নীতি বা কাজের পরিপন্থী কোনো কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এসব অপরাধ গতানুগতিক অপরাধের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু হোয়াইট কলার ক্রাইম গতানুগতিক অপরাধ থেকে ভিন্নধর্মী অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তরা আর্থ-সামাজিক এবং পেশাগত মর্যাদায় অনেক বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত। সাধারণ অপরাধীরা নিতান্তই আবেগের বশে, প্রয়োজনের তাগিদে, অভাবের তাড়নায় বা জীবিকার তাগিদে অপরাধ করে থাকে। তাদের অপরাধ সমাজে তাৎক্ষণিকভাবে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনলেও সরকারের পক্ষে তা দমন করা সম্ভব। কিন্তু হোয়াইট কলার ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা লোভ ও লালসার বশবর্তী হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে এবং প্রয়োজন ছাড়াই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে এ ধরনের অপরাধ করে থাকে বলে তাদের শাস্তি প্রদান করা তো দূরের কথা, অনেক সময় তাদের শনাক্ত করাই সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে নানা ধরনের হোয়াইট কলার ক্রাইম বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুতগতিতে, যা বাস্তব সত্য। আর এসব অপরাধ যে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার নামে অবৈধভাবে অর্থ নেওয়া, উন্নয়ন খাতের অর্থ আত্মসাৎ করা, অধিক মুনাফার লোভে পণ্যে ভেজাল মেশানো, নকল ওষুধ তৈরি করা এবং তা বাজারে বিক্রি করা, পণ্য মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, জনপ্রিয় ট্রেডমার্ক ব্যবহার করে নকল দ্রব্য উৎপাদন করা, চিকিৎসক কর্তৃক ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদান, বিনা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার, সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে রোগী না দেখে চিকিৎসকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখার প্রবণতা, প্রকৌশলী কর্তৃক অর্থ আত্মসাত্পূর্বক নিম্নমানের সেতু ও রাস্তাঘাট তৈরি, পুলিশ কর্তৃক ঘুষ গ্রহণ প্রভৃতি বিষয় আমাদের এ সমাজে আর নতুন কোনো বিষয় নয়। তা ছাড়া কর ফাঁকি দেওয়া, প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন, নিজের আয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান, অসৎ উপায়ে অর্থ বা সম্পত্তি অর্জন করা, অবৈধভাবে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ঘটনা অহরহই ঘটে চলছে। পাশাপাশি ব্যাংক, বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালতপাড়া, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ বিভাগসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও পেশায় আজ হাজারো রকমের হোয়াইট কলার ক্রাইম সংঘটিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে হোয়াইট কলার ক্রাইম সম্পর্কিত কোনো অপরাধ বা শাস্তির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও যারা হোয়াইট কলার ক্রাইম সংঘটন করে বা করছে তারা যে অপরাধী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ দ্রুতগতিতে দূর করতে পৃথক আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত করা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদান করা। সরকার কর্তৃক এসব পদক্ষেপ যথাযথভাবে গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই শুধু সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ দূর করা সম্ভব। আর তখনই শুধু সম্ভব হবে একটি সুখী, সুন্দর, শান্তিময় ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যে সমাজের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link:
https://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2019/06/14/779405

Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd