Author Topic: ফেরেশতারা যেভাবে মানবজাতির সেবা করছেন  (Read 170 times)

Offline Md. Abul Bashar

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 78
  • Test
    • View Profile
ফেরেশতারা যেভাবে মানবজাতির সেবা করছেন

মানবজাতি ও ফেরেশতাকুলের মধ্যকার সম্পর্ক যেমন প্রাচীন, তেমনি গভীর। এই সম্পর্কের সূচনা হয় মানব সৃষ্টির আগেই, যা অক্ষুণ্ন থাকবে পরকালে জান্নাত ও জাহান্নামে প্রবেশের পরও। মূলত আল্লাহ তাআলা বিপুলসংখ্যক ফেরেশতাকে মানবজাতির সেবা ও কল্যাণে নিযুক্ত করেছেন; যারা একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মানবজাতির সেবা করে যাচ্ছে। যখন আল্লাহ ফেরেশতাদের মানব সৃষ্টির সংবাদ দেন তখন তারা মানব সৃষ্টির রহস্য জানতে চায়। কোরআনের ভাষায়, ‘যখন আপনার প্রভু ফেরেশতাদের বলেন, নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করব। তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কোনো সম্প্রদায়কে প্রেরণ করবেন, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, রক্তপাত করবে। অথচ আমরা আপনার প্রশংসা করি এবং পবিত্র ঘোষণা করি। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০)

মানব সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে ফেরেশতাদের এই কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা অব্যাহত থাকে। অতঃপর আল্লাহ মানবজাতিকে সম্মানিত করলেন। তিনি ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন প্রথম মানব আদম (আ.)-কে সিজদা করতে। কোরআনে যা এভাবে বিবৃত হয়েছে, ‘স্মরণ করুন! যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি গন্ধযুক্ত কাদার শুষ্ক ঠনঠনে মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করছি; যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে জীবন সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হবে। অতঃপর ফেরেশতাদের সবাই একত্রে সিজদা করল।’ (সুরা : হিজর, আয়াত ২৮-৩০)

কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুসারে মানুষ ও ফেরেশতার মধ্যকার এই সম্পর্ক পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে। যেমন—ফেরেশতা কর্তৃক আদম (আ.)-কে শিক্ষা দান, দাফন ও কাফন, মানবশিশুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা কাজে তাকে সহযোগিতা করা, তাদের নিরাপত্তায় আত্মনিয়োগ করা ইত্যাদি।

 

আদম (আ.)-কে শেখালেন ফেরেশতারা

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ আদমকে তাঁর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দৈর্ঘ্য ৬০ ফিট। তাঁকে সৃষ্টির পর বললেন, যাও! তাদের সালাম দাও, এক দল ফেরেশতা সেখানে বসা ছিল। তারা কী বলে তোমাকে অভিনন্দিত করে তা শুনবে। নিশ্চয় তা তোমার ও তোমার বংশধরদের জন্য অভিবাদন। তিনি তাদের বলেন, আসসালামু আলাইকুম, তারা বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। অর্থাৎ তারা ‘রহমাতুল্লাহ’ বৃদ্ধি করল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৮৮)

 

মৃত্যুর পর আদম (আ.)-কে গোসল ও দাফন

উবাই বিন কাব (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যখন আদম (আ.) মৃত্যু বরণ করেন ফেরেশতারা তাঁকে পানি দিয়ে বেজোড়সংখ্যক বার গোসল করান এবং তাঁকে লাহাদ (এক ধরনের) কবর দেন। অতঃপর ফেরেশতারা বলেন, আদমের সন্তানদের জন্য এটাই নিয়ম।’ (আল মুসতাদরিক আলাস সহিহাইন, হাদিস : ৩৯৩৬)

 

মাতৃগর্ভে মানবশিশুর পরিচর্যা

আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাতৃগর্ভের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। সে বলে, হে আমার প্রভু, এত বীর্য; হে আমার প্রভু, এত রক্তপিণ্ড; হে আমার প্রভু, এত মাংসপিণ্ড। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর আকৃতি দানের সিদ্ধান্ত নেন তখন সে বলে, হে আমার প্রভু, এই সন্তান পুরুষ, না নারী? সৌভাগ্যবান, না হতভাগ্য? তার রিজিক কী হবে? তার জীবনকালই বা কী? অতঃপর এসব বিষয় সে মাতৃগর্ভে থাকতেই নির্ধারিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৬)

 

মানুষের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দান

সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের জন্য এক ও একাধিক ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। যাঁরা তাকে সমুদয় বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরা কখনো কখনো নিষ্ক্রিয় হন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের জন্য তাদের সামনে ও পেছনে একের পর এক প্রহরী থাকে; তারা আল্লাহর নির্দেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায় সম্পর্কে যদি আল্লাহ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন, তবে তা থেকে কোনো রক্ষাকারী নেই এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো অভিভাবক নেই।’ (সুরা রদ, আয়াত : ১১)

মুজাহিদ (রহ.) বলেন, আল্লাহর এমন কোনো বান্দা নেই, যার জন্য একজন নিরাপত্তা দানকারী ফেরেশতা নিযুক্ত নেই; যিনি তাকে ঘুমে ও জাগ্রত অবস্থায় জিন, মানুষ ও অন্য ক্ষতিকর বিষয় থেকে রক্ষা করেন। যখন কোনো ক্ষতিকর বিষয় তার দিকে এগিয়ে আসে তখন তিনি সতর্ক করে দেন। কিন্তু যে বিষয়ে আল্লাহর অনুমতি থাকে সে ব্যাপারে তিনি চুপ থাকেন। ফলে বান্দা তাতে আক্রান্ত হয়।

 

ভালো কাজে উৎসাহ প্রদান

অনেক সময় মানুষ অন্তরে ভালোর প্রতি, সত্যের প্রতি, ঈমান ও আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ বোধ করে। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ফেরেশতারা মানুষের অন্তরে ভালো কাজের এই অনুপ্রেরণা দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আদমসন্তানের ওপর শয়তানের একটি প্রভাব রয়েছে এবং ফেরেশতার একটি প্রভাব রয়েছে। শয়তানের প্রভাব হলো, মন্দের প্রতি ধাবিত করা এবং সত্য অস্বীকার করা। ফেরেশতার প্রভাব হলো, কল্যাণের প্রতি ধাবিত করা এবং সত্য স্বীকার। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্তরে ভালো কাজের অনুপ্রেরণা পাবে সে জেনে রাখুক এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতএব সে আল্লাহর প্রশংসা করবে। আর যে ব্যক্তি বিপরীত কিছু অনুভব করে, সে যেন আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চায় (‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ পড়ে)। অতঃপর তিনি (সুরা বাকারার ২৬৮ নম্বর আয়াত) পাঠ করেন, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, আয়াত : ২৯৩৩)

 

মুমিন বান্দার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা

ফেরেশতারা আল্লাহর অনুগত মুমিন বান্দাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আরশ বহন করছে এবং তার পাশে রয়েছে, তারা তাদের প্রভুর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে, তার প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের প্রভু, আপনার জ্ঞান ও অনুগ্রহ সব কিছুকে আবৃত করে রেখেছে। আপনি তাদের ক্ষমা করুন যারা তওবা করেছে ও আপনার পথ অনুসরণ করেছে। তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ৭)

এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, মসজিদে পবিত্র অবস্থায় নামাজের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তি, নামাজের পর মসজিদে অবস্থানকারী, রাতে অজু করে ঘুমানো ব্যক্তি, অসুস্থ ব্যক্তির সেবাকারী, দ্বিনি ইলম অন্বেষণকারীর জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন।

 

ভালো-মন্দ কাজের হিসাব সংরক্ষণ

মানুষের ভালো-মন্দ কথা-কাজের হিসাব সংরক্ষণের জন্য আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সব আমল তাঁরা লিপিবদ্ধ করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে সংরক্ষণকারী—সম্মানিত লেখকরা। তাঁরা জানেন যা তোমরা করো।’ (সুরা ইনফিতার, আয়াত : ১০-১২)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, ‘আহনাফ ইবনে কায়েস বলেছেন, ডান পাশের ফেরেশতা ভালো কাজের হিসাব রাখেন। তিনি বাঁ পাশের ফেরেশতার নেতাও। যখন বান্দা কোনো ভুল করে ডান পাশের ফেরেশতা তাকে বলেন, অপেক্ষা করো। যদি বান্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে তা লিখতে নিষেধ করেন। আর যদি ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকার করে, তবে তা লেখা হয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, ১৩/১৮৭)

 

জীবন সংহার

মাতৃগর্ভে ফেরেশতাদের পরিচর্যার মাধ্যমে মানবদেহে জীবন সঞ্চার করেন মহান আল্লাহ। আবার সেই ফেরেশতাদের মাধ্যমেই তিনি মানুষের জীবন সংহার করান। মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা আল্লাহর দরবারে ফেরেশতারাই উপস্থাপন করে থাকেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতারা তোমাদের জীবন সংহার করবেন। অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুরা সেজদা, আয়াত : ১১)