Author Topic: হাতে ফোন থাকার মানেই সঙ্গে চিকিৎসক  (Read 25 times)

Offline Sultan Mahmud Sujon

  • Administrator
  • Hero Member
  • *****
  • Posts: 2438
  • Sultan Mahmud Sujon,Admin Officer
    • View Profile
    • Higher Education


‘জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার কল সেন্টার স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-তে আপনাকে স্বাগতম। ডেঙ্গুবিষয়ক পরামর্শ পেতে অথবা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে সরাসরি শূন্য চাপুন।’ মুঠোফোন বা যেকোনো ফোন থেকে ১৬২৬৩ নম্বরে ডায়াল করলে নারী কণ্ঠের এই কথা কানে আসে। এরপর শূন্য ডায়াল করলে সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যায়। এখানকার চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা বলছেন, হাতে ফোন থাকার অর্থ সঙ্গে চিকিৎসক থাকা।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টেলিফোনের মাধ্যমে এই স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছিল, যা স্বাস্থ্য বাতায়ন নামে পরিচিত। এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৪ লাখ ৫৮ হাজার ৬৭৫ জন এই কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ নিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন দিনে এক লাখ কল গ্রহণ করার মতো প্রযুক্তি ও জনবলের সক্ষমতা তাঁদের আছে।

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার এই কল সেন্টার মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের উদ্যোগ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ যেন বিনা পয়সায় সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শ পায়—সেটাই ছিল স্বাস্থ্য বাতায়ন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি হাতুড়ে চিকিৎসকের খপ্পরে না পড়ে মানুষ যেন সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, তা নিশ্চিত করাও ছিল এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।’ সেই উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি বহুতল ভবনে ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’-এর কার্যালয়। কল সেন্টারের সঙ্গে ৮০ জন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক আছেন। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৭ দিনই এই কেন্দ্র খোলা থাকে। দিনে তিন পালায় চিকিৎসকেরা ফোনে কথা বলেন। এক পালায় ১২ থেকে ১৫ জন চিকিৎসক কাজ করেন।

স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩। দিনে-রাতে যেকোনো সময়, যেকোনো সমস্যায় ফোনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে। বিনা মূল্যে এই চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে সরকার।
সিনেসিস আইটি নামের একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সরকারের পক্ষে স্বাস্থ্য বাতায়ন পরিচালনা করে। সিনেসিস আইটি স্বাস্থ্য বাতায়ন পরিচালনার কাজটি পেয়েছে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. নিজাম উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে আরও বেশিসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্সকে স্বাস্থ্য বাতায়নের নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে। উবারের মতো সেবা এখান থেকে পাওয়া যাবে। ঢাকা শহরে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিককেও স্বাস্থ্য বাতায়নের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এতে কমিউনিটি ক্লিনিকে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রামের মানুষকে সেবা দিতে পারবেন।

এ পর্যন্ত আসা সব ধরনের ফোনের শ্রেণিবিভাজন করেছেন কর্মকর্তারা। তাতে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ ফোন আসে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য। এরপর বেশির ভাগ ফোন এসেছে স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য জানতে। আবার অনেকে ফোন করেন স্বাস্থ্য বাতায়ন কী, তা জানতে।

সারা দেশের মানুষই স্বাস্থ্য বাতায়নে ফোন করছে। তবে সবচেয়ে বেশি ফোন আসছে ঢাকা বিভাগ থেকে। এ পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ ফোন করেছে ঢাকা শহর ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার মানুষ। সবচেয়ে কম ফোন আসে রাজশাহী বিভাগ থেকে (৪ শতাংশ)। আর নারীর চেয়ে পুরুষের ফোন করার করার প্রবণতা বেশি (৬৫ শতাংশ)।

সব ধরনের রোগের চিকিৎসা পেতে মানুষ ১৬২৬৩-তে ফোন করে। এর মধ্যে প্রধান ১০টি রোগের তালিকা করেছে সিনেসিস আইটি। তালিকার শীর্ষে আছে ডায়রিয়া। এরপর আছে ভাইরাসজনিত রোগ, ঠান্ডাজনিত রোগ।

স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে চিকিৎসাসেবা নিলে মুঠোফোনে ছোট একটি ব্যবস্থাপত্র চলে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তাতে ওষুধের নাম, সেবনবিধি, চিকিৎসকের নাম ও চিকিৎসকের মুঠোফোন নম্বর থাকে।  প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ বিপণন ব্যবস্থাপক কাজী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এটা আমরা করেছি দুটি কারণে। প্রথমত, জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য। দ্বিতীয়ত, সেবাগ্রহীতারও সন্তুষ্টি এতে বৃদ্ধি যায়।’ ওই মুঠোফোনের বার্তা দেখিয়েই রোগী দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারেন।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের ফোন করে পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনেকে মাদকের সমস্যার সমাধান খুঁজতে ফোন করেন। অনেক কিশোরী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে এখানকার চিকিৎসকদের সঙ্গে মনের কথা খুলে বলে। কারণ, এখানে পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

একইভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখানে বহু মানুষ নিয়মিত সহায়তা খোঁজে। নিজাম উদ্দীন আহমেদ বলেন, মানসিক সমস্যা নিয়ে কলের পরিমাণ বাড়ছে। মনে হচ্ছে, এর মধ্যে আলাদা বিভাগ করার সময় এসেছে।

ফোনে যাঁরা চিকিৎসা দেন, তাঁদের কথাই রোগীদের কাছে ওষুধ। রোগী চিকিৎসককে দেখেন না, শুধু তার কথা শুনেই সন্তুষ্ট হন, তাকে বিশ্বাস করেন। তাই এখানে যাঁরা রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের বাচনভঙ্গি অন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ব্যক্তিগত চেম্বারের চিকিৎসকদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা।

ফাহিম হায়দার খান এই স্বাস্থ্য বাতায়নের একজন চিকিৎসক। এফসিপিএস প্রথম পর্ব পাস করেছেন, এখন দ্বিতীয় পর্ব পাস করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কখনো সকাল থেকে বিকেল, কখনো সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ফাহিম হায়দার খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে কাজ করে নিজের কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের কথা ধৈর্য ধরে শুনি, দ্রুত সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করি। এখানে রূঢ় ভাষা ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই।’

এখানে যা কিছু হয়, সবকিছু রেকর্ড হয়। প্রতিটি ফোনের তথ্য, রোগীর সমস্যা, চিকিৎসকের বক্তব্য, ব্যবস্থাপত্র—সবকিছুরই রেকর্ড থাকছে। কোনো রোগী দ্বিতীয়বার ফোন করলে তার আগের ব্যবস্থাপত্রও চিকিৎসকের সামনে থাকা কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠে।

এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় এখানকার চিকিৎসকেরা প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ও সেবা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সাধারণভাবে প্রতি মাসে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ছে। আরও কিছু সেবা এর সঙ্গে করার পরিকল্পনা আছে। তাতে দৈনিক সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবস্থাপকেরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, সারা বিশ্বে এখন টেলিমেডিসিন বা ইমেডিসিন স্বীকৃতি পাচ্ছে। তবে সরাসরি রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগনির্ণয়ভিত্তিক যে চিকিৎসা, তা হয়তো এই ব্যবস্থা থেকে পাওয়া যায় না। ১৬২৬৩ থেকে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ নিলে সময় ও অর্থ—দুয়েরই সাশ্রয় হয়। আবার মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে নিজে ওষুধ না খেয়ে, ওষুধের দোকানির পরামর্শমতো না চলে বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে চিকিৎসা নেওয়া নিরাপদ।


Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1625274/%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AB%E0%A7%8B%E0%A6%A8-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%B8%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A7%87-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A7%8E%E0%A6%B8%E0%A6%95