Daffodil International University

Open your minds => Humantities => Topic started by: shawket on December 07, 2015, 09:17:48 AM

Title: যাকাত প্রদান করুণা নয় দায়মুক্তি
Post by: shawket on December 07, 2015, 09:17:48 AM
যাকাত প্রদান করুণা নয় দায়মুক্তি

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : ইসলাম আল্লাহর দেয়া এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এ জীবন ব্যবস্থায় এক সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি ছাড়াও সামাজিক ন্যায়বিচারকে নিশ্চিত করার জন্য যাকাত একটি চমৎকার কর্মসূচির বিধান রাখা হয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও সচ্ছল লোকদের বাড়তি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মমাফিক আদায় করে দরিদ্র ও বঞ্চিত লোকদের মাঝে যথাযথ বণ্টন করাই এ কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেহের সাথে সম্পর্কিত ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নামাজ, আর ধন-সম্পদের সাথে সম্পর্কিত ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ হল যাকাত। উভয়টি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম।

আভিধানিক অর্থে ‘যাকাত’ বলা হয়, যে জিনিস ক্রমশ বৃদ্ধি পায় ও পরিমাণে বেশি হয়। আরবি ভাষায় ‘যাকা ফুলানুন’ বাক্যের অর্র্থ হল, অমুক ব্যক্তি যাকাত দিয়েছে। অর্থাৎ সুস্থ ও সুসংবদ্ধতা হয়েছে। অতএব ‘যাকাত’ শব্দের অর্থ হলোÑ বরকত, পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়া, প্রবৃদ্ধি লাভ, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, শুদ্ধতা, সুসংবদ্ধতা ইত্যাদি। আর শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে প্রাপ্য ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়াকে যাকাত বলে। যাকাত ইসলামের গুরত্বপূর্ণ একটি কাজ। যাকাত ব্যয়িত হয় অভাবী ও বঞ্চিতদের জন্য। এর দ্বারা দরিদ্র ও ধনীদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হয়।

পবিত্র রমজানের জতীয় চাঁদ দেখা বগুড়া জেলা কমিটির ২০১৫ইং সভা ইসলামিক ফাউন্ডেশন জেলা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বগুড়ার ডিডি আলহাজ আজমল হক, আবহাত্তয়া বগুড়া জেলা কর্মকর্তা হারুনর রশিদ বুলবুল, বগুড়া আজিজুল হক কলেজে ইসলাম শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রশিদ, জেলা তথ্য কর্মকর্তা আব্দুর রহিমসহ বেশ কয়েকজন গুরত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আজমল সাহেব আমাকে বলেন যাকাত সম্পর্কে পত্রিকায় কিছু লিখতে। তাই কলম ধরলাম। এই অল্প পরিসরে ইসলামী অর্থনীতির প্রধান হাতিয়ার যাকাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তথাপি সংক্ষিপ্ত ও তথ্যনির্ভর আলোচনা জ্ঞান পাঠক সমাজের নিকট উপস্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ।

মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ইবাদত শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশির জন্যই করতে হবে। খালেছ নিয়তে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায় করতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে ইবাদতের নামে কিছু কাজ লোক দেখানো এবং আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে আর্থিক ইবাদত তথা যাকাত ও হজ। যাকাত প্রদানে অনেকেই নিজেদেরকে বাহাদুর মনে করেন। যাকাত প্রদানের বিজ্ঞাপনও দেখা যায় পত্রিকার পাতায়। যাকাত নিতে গিয়ে মৃত্যু বরণের ঘটনাও আলোচিত হয়েছে আমাদের দেশে। মনে রাখতে হবে, যাকাত দেয়া গরিরের প্রতি করুণা নয় বরং যাকাত গরিবের অধিকার। যাকাত প্রদান করে ধনিরা দায়মুক্ত হয়। গরিবরা যাকাত গ্রহণ করে বিত্তশালীদেরকে দায়মুক্ত করেন।

 দান-সাদকার বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি বিশেষ ফজিলত আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে- ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। (সূরা ২ বাকারা) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলূল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘একমাত্র দুই ব্যক্তি ঈর্ষণীয়। এক হলো যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন। আর হক কাজে সেই সম্পদ ব্যয় করার জন্য তাকে নিযুক্ত করেছেন। আর এক ব্যক্তি হলো যাকে আল্লাহ হেকমত তথা কোরআন-হাদীসের ইল্ম দান করেছেন অতঃপর সে সেই ইল্ম অনুযায়ী সবকিছুর ফয়সালা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়’ (বুখারী শরীফ, ১৩২৬)। অন্যত্র রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, দান-সাদকা সম্পদকে হ্রাস করে না, আর ক্ষমা করার দ্বারা আল্লাহ বান্দার ইজ্জত বৃদ্ধি করেন। আর কেউ আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাওয়াজু বা বিনয় অবলম্বন করলে আল্লাহ তার মর্যাদাকে উঁচু করে দেন (মুসলিম শরীফ)। অনুরূপভাবে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহর বান্দাগণ যখনই ভোরে উঠে আকাশ থেকে দু’জন ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। তাদের একজন বলেন হে আল্লাহ! দাও তুমি দাতাকে প্রতিদান এবং অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! দাও তুমি কৃপণকে সর্বনাশ।

হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, নামাজ, রোজা, সাদকা ও ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে বারণ (এসব আমল) মানুষের পরিবার, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশী সংক্রান্ত গুনাহসমূহ মোচন করে দেয়। আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন বের হয়ে মহিলাদের কাছে গেলেন এবং (তাদেরকে লক্ষ্য করে) বললেন, হে মহিলা সমাজ! তোমরা দান কর, কেননা আমাকে দেখানো হয়েছে যে, জাহান্নামের সিংহাভাগ হলো নারী। মহিলাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, তার কি কারণ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! তিনি বললেন, তার কারণ হলো তোমরা বেশি বেশি অভিশাপ দাও এবং স্বামীর নাফরমানি কর (বুখারী শরীফ)। হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, একটা খেজুর দান করে হলেও তোমরা জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা করো। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ১৩৩৪)। রাসূল (সা.) আরো ইরশাদ করেন, দাতা ব্যক্তি আল্লাহর নিকটে, জান্নাতেরও নিকটে, মানুষেরও নিকটে, অথচ জহান্নাম থেকে দূরে। পক্ষান্তরে কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহর থেকে দূরে, জান্নাত থেকেও দূরে, মানুষ থেকেও দূরে, অথচ জাহান্নামের নিকটে। নিশ্চয়ই মূর্খ দাতা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় কৃপণ ইবাদতকারীর চেয়ে (তিরমিযী শরীফ)। যাকাত না দেয়ার শাস্তি সম্পর্কে আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, যারা স্বর্ণ-রৌপ্য বা টাকা-পয়সা সঞ্চয় করে রাখে, আল্লাহর রাস্তায় সেটা ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ (?) দিয়ে দাও “ঐ স্বর্ণ-রৌপ্য জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে এবং তা দ্বারা তার কপালে, তার পাঁজরে ও পিঠে (অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন স্থানে) সেক দেয়া হবে এবং বলা হবে, নিজেদের জন্য যেটা সঞ্চয় করে রেখেছিলে এটাতো তা-ই”! (সূরা তাওবা, আয়াত-৩৫)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, যারা কার্পণ্য করে ঐ সম্পদ নিয়ে যা নিজ অনুগ্রহে আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন, তারা যেন মনে না করে যে, সেটা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং সেটা তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরিয়ে দেয়া হবে (সূরা ৩ আলে-ইমরান, আয়াত- ১৮০)। হাদীস শরীফেও যাকাত দান-সাদকা না করার বিষয়ে ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন, আর সে তার যাকাত দেয় না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে তার জন্য মাথায় টাক পড়া সাপের রূপে দেয়া হবে, যার চক্ষুর উপর দুটি কালো দাগ থাকবে (অর্থাৎ প্রচ- বিষাক্ত হবে) ঐ সাপকে তার গলায় বেড়িস্বরূপ করে দেয়া হবে। অতঃপর ঐ সাপ তার দুই গালে দংশন করতে থাকবে। আর বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ! আমি তোমার সঞ্চয় করে রাখা সম্পদ! (বুখারী শরীফ, হাদীস নং-১৩২১)।

নিন্মোক্ত শর্তাবলী পূর্ণভাবে পাওয়া গেলে যাকাত ফরজ হবে। ১. ইসলাম (অর্থাৎ মুসলমান হওয়া)। ২. স্বাধীন হওয়া। ৩. বালেগ হওয়া। ৪. জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া। ৫. সম্পদের পূর্ণ মালিকানা হওয়া। ৬. মালিকানাধীন সম্পদ নেসাব পরিমাণে পৌঁছা। ৭. সম্পদ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের উদ্বৃত্ত হওয়া। ৮. সম্পদ ঋণমুক্ত হওয়া ৯. সম্পদ বর্ধিঞ্চু হওয়া। চাই সম্পদ প্রকৃত বর্ধিঞ্চু হোক যেমন, গৃহপালিত পশু অথবা স্বর্ণ-রৌপ্য। স্বর্ণ-রৌপ্যকে বুর্ধিঞ্চু ধার্য করা হয়েছে তা পাকা হোক বা কাঁচা অবস্থায় হোক অলঙ্কার রূপে হোক অথবা পাত্ররূপে হোক, ব্যবহারের জন্য হোক বা না হোক, তার উপর যাকাত ফরজ হবে। মণি-মাণিক্য-জহরতের উপর যাকাত ফরজ হবে না, যদি তা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে না হয়। যাকাত আদায় ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলো, নেসাব পরিমাণ সম্পদের উপর চন্দ্র বছর হিসাব (৩৫৪ দিন) এক বছর অতিবাহিত হওয়া অর্থাৎ, বছরের মাঝে পরিপূর্ণ থাকুক বা না থাকুক। এই হিসাবে কেউ যদি সৌর বছর গণনা করে যাকাত দেয় তাহলে প্রকৃত তিন সৌরবর্ষে এক মাসের যাকাত বাদ পড়ে যাবে। কেননা, প্রতি সৌরবর্ষ চন্দ্র বর্ষের চাইতে ১১ দিন বেশি হয় তাহলে ৩ বছরে ৩৩ দিনের যাকাত বাদ থেকে যাবে তেমনিভাবে সৌর বছরের ৩৩ বছর হবে চন্দ্র বছরের ৩৪ বছরের সমান। অর্থাৎ বর্ধিঞ্চু সে বছরের ৩৩ বছরে এক বছর বাদ পরে যাবে যাকাত থেকে। ফলে একদিকে গরিব বঞ্চিত হবে ১ বছর অন্যদিকে ধনীরা একবছর যাকাত না দেয়ার কারণে পাপী হবেন, তাই ইবাদত চন্দ্র মাসের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

Source: www.dailyinqilab.com/details/44130/যাকাত-প্রদান-করুণা-নয়-দায়মুক্তি-