Daffodil International University

Faculties and Departments => Business and Economics => Topic started by: Md. Alamgir Hossan on April 11, 2017, 03:42:29 PM

Title: আন্তর্জাতিক সালিসিই এখন তিস্তার ভরসা?
Post by: Md. Alamgir Hossan on April 11, 2017, 03:42:29 PM
তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি যে ঘটল না, বরং সেটা যে নতুন করে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল, সেটা দুই বন্ধুপ্রতিম দেশকে বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসকে অবশ্যই আমরা গুরুত্ব দেব। কিন্তু তার পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সালিসি ব্যবস্থার আশ্রয় নেওয়ার একটা চিন্তাভাবনা এখনই শুরু করতে হবে। ভারতের সম্মতিতে বহুপক্ষীয় ভিত্তিতে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সুরাহায় নতুন উদ্যোগ নিতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প প্রস্তাবকে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে প্রথম আলো, আনন্দবাজারসহ গণমাধ্যম যে খবর দিয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে দ্বিপক্ষীয় সমাধানের আশায় আরও কালক্ষেপণ করা সমীচীন হবে না। মমতার প্রস্তাব যেকোনো পানি বিশেষজ্ঞকেই বিস্মিত করবে। অথচ ভারতে এখন পর্যন্ত তেমন লক্ষণীয় কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এমনকি ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য মমতার নিন্দা করতে আমরা দেখিনি। মমতা তিস্তার পরিবর্তে তোর্সা, ধানসিঁড়ি, মানসিঁড়ি ও জলঢাকার পানি নিতে বলেছেন। মানসিঁড়ি অস্তিত্বহীন। অন্যগুলো অভিন্ন ৫৪ নদীর তালিকাভুক্ত। ধরলা, দুধকুমার কুড়িগ্রাম দিয়ে ঢুকে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে।

তিস্তা চুক্তির ২০১১ সালের খসড়া চূড়ান্ত করেছেন যাঁরা, তাঁদের একজনের সঙ্গে আমরা কথা বলি। তিনিই জানালেন, দুধকুমার ও ধরলা এবং এ দুটি নদীর হিস্যা নিয়ে আলোচনার উল্লেখ যৌথ বিবৃতিতে আছে। ভারতে যথাক্রমে তোর্সা ও জলঢাকা হিসেবে পরিচিত। সে কারণেই আমরা বলব, মমতা যে অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, সেটা আমরা ভারতের রাজনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে ভারতের যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তাদের জবানিতে শুনতে উন্মুখ থাকব।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় এসেছিলেন পাঁচজন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু এবার দিল্লিতে ডাক পড়ল শুধু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর। আর ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পরিবর্তে শুধু নির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত হলো তিস্তা চুক্তির। আশা করেছিলাম, তিস্তা চুক্তি এখনই না হওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া যাবে যদি যৌথ ইশতেহারে তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর বিষয়ের উল্লেখ থাকে। কিন্তু তা থাকল না। গঙ্গা ব্যারাজের প্রতি মমতার মনোভাবও ঊহ্য থাকল। কবে তিস্তা হবে তা-ও বলা হলো না। কিন্তু  ইঙ্গিত মিলল মমতার অমতে তিস্তা হবে না।

২০১১ সালেও শুনতাম তিস্তা না হলে বাংলাদেশ ট্রানজিট দেবে না, এরপর তা ১৯২ টাকা দরে (টনপ্রতি ১ হাজার ৫৮ টাকার পরিবর্তে) ভারত পেয়েছে। কংগ্রেস থাকতেও ভারতীয় কর্মকর্তারা মমতার দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন, ‘মতৈক্যের’ জন্য ‘কিছুটা সময়’ দরকার। মনমোহন সিং ঢাকায় আসার আগেই পররাষ্ট্রসচিব রঞ্জন মাথাই সাংবাদিকদের সাফ বলেছিলেন, রাজ্য সরকার রাজি না হলে তিস্তা তাঁরা করতে পারবেন না। ‘অ্যানি অ্যাগ্রিমেন্ট উই কনক্লুড উইল হ্যাভ টু বি অ্যাকসেপ্টেবল টু দ্য স্টেট গভর্নমেন্ট।’ ভারতের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পরও মোদি সরকার তার অবস্থান পাল্টায়নি।

২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মনমোহন-হাসিনা শীর্ষ বৈঠকের পরের যৌথ বিবৃতিতে বলা হলো, যদিও তিস্তা হলো না, তবে সেটা ‘উড অলসো বি সাইন্ড সুন।’ আমরা শিগগির সই করব। এখন আমরা এটাও মানব যে, কংগ্রেস থাকলে তারা সংবিধানের ২৫৩ অনুচ্ছেদটা (এই বিধান অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে রাজ্যকে অগ্রাহ্য করা যাবে) প্রয়োগ করত, সেটা মনে হয় না। কংগ্রেসের কেউ এখনো এদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছে না।

২০১৫ সালের ৬ জুন মোদি ঢাকায় যৌথ বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘আমি আস্থাশীল, ভারতের রাজ্য সরকারগুলোর (শুধু একটি নয়!) সহায়তায় তিস্তা ও ফেনী নদীর বিষয়ে (পানিবণ্টন কথাটি ঊহ্য ছিল) একটা ন্যায্য সমাধানে পৌঁছাব।’ এরপর শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণার ১৯ দফায় বলা হলো, ‘শেখ হাসিনা অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন তিস্তা চুক্তি চাইলে মোদি বলেছেন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা (পড়ুন মমতার মত সাপেক্ষে) করে তিনি ‘অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল’ চুক্তিটা করবেন। ২০১৭ সালের যৌথ বিবৃতিতে ‘অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল’ কথাটি তুলে দেওয়া হয়েছে।

দুই শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে যৌথ প্রেস বিবৃতিতে যা বলা হয়, সেটা খুব দামি সরকারি ভাষ্য নয়। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল হলো শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহার বা ঘোষণা। ‘আমরা তিস্তা চুক্তি সই করব’, বলে প্রথম আলোয় যে প্রধান শিরোনাম আমরা পেলাম, সে কথাটা কিন্তু আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতিতে নেই। সেটা আছে বক্তৃতায়। দুইয়ের মধ্যে মৌলিক তফাত আছে। যখন যৌথ বিবৃতি হয়, তখন বক্তৃতার গুরুত্ব কমে যায়। তাই তিস্তা সম্পর্কে যৌথ বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে, সেটাই ভারতের অবস্থান। বক্তৃতার উদ্দেশ্য প্রধানত রাজনৈতিক। তিস্তার বিষয়ে ভারতীয় বিশ্বস্ততা এখন তাই গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন।

আমরা যদি ২০১৫ সালের ঢাকায় শেখ হাসিনা-মোদি যৌথ বিবৃতির সঙ্গে সদ্য সই হওয়া ২০১৭ সালের ওই একই ধরনের দলিলটির তুলনা করি তাহলে দেখি, তিস্তাবিষয়ক চুক্তি দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে দালিলিক অঙ্গীকারের ব্যাপারেও একটা অবনতি ঘটেছে। দুই বছর আগে তিস্তা ছিল ১৯তম দফায়, এবার তা ৪০তম দফায়। বাক্য গঠনশৈলী বা গৎটা আরও নির্জীব করে একই ধরনের রাখার একটা চেষ্টা চোখে পড়েছে।

আগে শেখ হাসিনার বরাতে দুই সরকার ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তিতে একমত হয়েছিল, সে কথাটি বসানো হয়েছিল। এবারও দ্বিতীয়বারের মতো শেখ হাসিনার মুখেই তা বসানো হলো যে, দুই সরকার ২০১১ সালে একমত হয়েছিল। তফাতটি হলো যদি এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মুখে বসানো হয়, তাহলে একটা আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ২৫৩ অনুচ্ছেদ, যেখানে বলা আছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারকে অগ্রাহ্য করা যাবে, সেটা আপনাআপনি খেলা করতে শুরু করবে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতির বিষয়টি শেখ হাসিনার মুখে বসানো হয়েছে। অনুমেয়, আমাদের কূটনীতিকেরা খসড়া নিয়ে কোনোরকম জোরাজুরি করেননি, বা করলেও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।

আগে শেখ হাসিনার মুখে ছিল তিনি ‘অনতিবিলম্বে’ চুক্তি চান। এবার সেই শব্দ কর্তন করা হয়েছে। ঢাকায় মোদি বলেছিলেন এটা হবে ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’, এবার তার বিলোপ ঘটেছে। বলা হয়েছে, ‘তিনি পুনর্ব্যক্ত করছেন যে যথাসময়ের আগে চুক্তি সম্পন্ন করতে তাঁর সরকার ভারতের সব অংশীজনের সঙ্গে কাজ করছেন।’ তার মানে এর আগে নির্দিষ্টভাবে ‘যথা শিগগিরই তিস্তা চুক্তি’ করার অঙ্গীকার থেকে ভারত সরকার সরে এসেছে। সুতরাং সমুদ্রের সীমা বা পানিবণ্টনের মতো নদীর পানিবণ্টনেও ভারতের অপারগতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আর কালক্ষেপণ করা ঠিক হবে না।

মোদি প্রেস বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একমাত্র আমার সরকার এবং মান্যবর শেখ হাসিনার সরকার, তারাই তিস্তার পানি বণ্টনে আশু সমাধানে পৌঁছাতে পারে এবং পৌঁছাবে।’ কিন্তু সেই চুক্তিতে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ থাকবে কি না, সেই ভরসা আমাদের কেউ দিচ্ছে না। ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি করে আমরা শুনেছি এটা ঐতিহাসিক। কিন্তু তাতে গ্যারান্টি ও আরবিট্রেশন ক্লজ ছিল না। চুক্তি সই করতে গিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে শেখ হাসিনা ও আই কে গুজরালের উপস্থিতিতে তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব কথাটি তুলেছিলেন। ওই ক্লজ দুটি না থাকার কারণে ‘বিস্মিত’ মি. গুজরাল এ জন্য তাঁদের আমলাদের দুষেছিলেন বটে কিন্তু তিনটি ‘যদি’সংবলিত গঙ্গা চুক্তির সেই খসড়াই সই হয়ে গেছে।

এখন আরও মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে গুনে গুনে ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে শেষতক ৫৪টি পৃথক চুক্তিতে যেতে হবে!ভারতের এই মনোভাব পুনর্বার প্রকাশিত হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের রূপান্তরকরণ, যেটা দাবি করা হয়েছে, সেটা রূপায়ণের কাজ বাকি থাকতেই বাধ্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় ৮ এপ্রিল যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন প্রভাস কে দত্ত। তাঁর মতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাকি একটা পয়েন্ট আছে। সেটা হলো তিস্তায় পানি নেই। তারপর বাংলাদেশ তিস্তার পানিপ্রবাহের আধাআধি (৫০: ৫০) ভাগ চাইছে। সেখানেই মমতার আপত্তি। এটা নাকি প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল জাস্টিসের পরিপন্থী। মি. দত্ত একটা নতুন ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হলে ভারতকে উজানে নতুন আটটি বাঁধ তৈরি করতে হবে। সুতরাং যেনতেনভাবে একটা তিস্তা চুক্তি পেলেই সমস্যা মিটছে না। এরশাদ আমলে তিস্তা চুক্তি করেও কিন্তু তা বাস্তবায়িত না হওয়ার নজির আছে। আমরা আশঙ্কা করি জোরাজুরির মুখে একটা জোড়াতালির চুক্তি আমাদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করবে না।

শুনেছি, মনমোহন আমলে জেআরসি বৈঠকে তিনটি সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছিল। তিস্তার ইতিহাসে যা কখনো ঘটেনি। প্রথমত উজানে পানি প্রত্যাহার চলবে না, এটা সীমিত থাকবে। দ্বিতীয়ত, নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি থাকবে। তৃতীয়ত অবশিষ্ট পানি বণ্টন করা হবে। অবশ্য এটা দুর্ভাগ্যের যে উজানে পানি প্রত্যাহারের কোনো তথ্য ভারত আগেও দিত না, এখনো দেয় না। তাই অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ন্যায্য সমাধান (চুক্তি আপনাআপনি সেই গ্যারান্টি দেবে না) চাইলে একটা আন্তর্জাতিক সালিসি ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য নীরবে প্রস্তুতি শুরু করাটাই একটা উত্তম বিকল্প হতে পারে।

আমরা অবশ্যই বিশ্বাস হারাতে চাই না। ধরে নেব ভারত রাষ্ট্র হিসেবে আন্তরিকভাবে পানি সমস্যার সমাধান চায়। কিন্তু তারা কোনো কারণে আটকে গেছে। তাই সালিসি ব্যবস্থায় গেলে আমরা সব পক্ষই জয়ী হতে পারি। আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব উঁচুতেই রাখতে আগ্রহী।