Author Topic: বিষয় ভ্রমণ পরিকল্পনা  (Read 94 times)

Offline SabrinaRahman

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 333
  • Never give up because great things take time
    • View Profile
বিষয় ভ্রমণ পরিকল্পনা
« on: April 24, 2017, 10:54:58 AM »
বিষয় ভ্রমণ পরিকল্পনা

 ভ্রমনে পরিকল্পনা খুব খুব গুরুত্বপুর্ণ একটা বিষয়। পরিকল্পনা হলো ভ্রমণের প্রথম ধাপ। পরিকল্পনা ভালো মতো না হলে একদিকে যেমন ভ্রমণটাই বিফল হয়ে যেতে পারে বা আনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারে তেমনি অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন ভ্রমণের কারনে ভ্রমণ গন্তব্যের প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং সার্বিক পরিস্থিতির উপরে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ছোট উদাহরণ দেয়া যাক
 
- এক ব্যাক্তি ‘ক’ ইন্টারনেটে একটা ঝর্ণার এডিটেড অতি সুন্দর জনমানবহীন ছবি দেখলেন। দেখেই ঠিক করলেন সেখানে যাবেন।একজনকে জিজ্ঞেস করে তিনি জানতে পারলেন কাছেই কিছু হোটেল আছে থাকার মতো । এই শুনে ছুটি ম্যানেজ করে বন্ধুদের নিয়ে টিকেট কিনে চলে গেলেন যায়গাটি দেখতে । গিয়েই পড়লেন বিপদে। ঠি ওই সময়ে অনেক লোক সমাগমের জন্য হোটেল গুলোতে কোনো যায়গা নেই। সাথে বড় বড় স্যুটকেস , এগুলো কোথাও না রেখে নড়বার জো ও নেই। তখন তিনি ২-৩ ঘন্টা সময় নস্ট করে পরিচিত নানা মানুষকে ফোন করে বেশী টাকা খরচ করে আরো কিছু দূরে একটা হোটেল এ থাকার ব্যবস্থা করলেন।  অযাচিত সময় নষ্ট হলো আর যাতায়াত ভাড়া খরচ হলো। টেনশনে খাওয়া ও হলো না ঠিক মত। এই সব শেষ করে তাড়াহুড়া করে গেলেন ঝরনা দেখতে। ভেবেছিলেন গাড়ি করেই ঝর্নাতে যাওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো ২ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হবে পাহাড়ি পথে। পাহাড় রাস্তায় হাঁটার মতো স্যান্ডেল ও পোষাক নিয়ে যান নাই বলে হাঁটতে অনেক কষ্ট হলো, অন্যরা অভিযোগ করা শুরু করলো সে কেনো আগে থেকে বলে নাই এই সব কথা। তখন ছিলো বর্ষাকালের শেষের দিকে। সাধারনত বৃষ্টি না হলেও ওই দিন খুব বৃষ্টি নামলো। তারা যেহেতু আবহাওয়া সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না তাই পথে অপ্রস্তুত অবস্থায় বৃষ্টিতে ভিজলেন কিছুক্ষন। হাঁটার সময় পান করার পানি ছিলো না সাথে ফলে রাস্তায় সবার কস্ট হলো।  গিয়ে দেখলেন সেখানে হাজার হাজার মানুষ। ঝর্নার সামনে দাঁড়ানোর যায়গা ই নাই। মানুষ এর কারনে ঝর্না দেখাই দায় । চারিদিকে নোংরা ময়লা আর প্রচুর হৈচৈ। বেশীরভাগ মানুষ ই যেহেতু তাদের মতোই অপ্রস্তুত অনেকের ই পানি ও খাবার এর চাহিদা দেখতে পেলেন তারা সেখানে। যেহেতু খাবার ও পানির চাহিদা আছে সেখানে চিপস/বিস্কিট/পানির হকারদের পেলেন তারা, সেখানে পরিবেশের বারোটা নাজিয়ে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে দিয়েছে কেউ কেউ। বিরক্তি্‌ ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তারা ইচ্ছা মতো চিপ্স, বিস্কিট ও পানি খেলেন। খেয়ে পানির বোতল, চিপ্স-বিস্কিট এর প্যাকেট সব ছড়িয়ে ফেললেন ঝর্না এলাকায়। সাথে একজনের ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডেল ও ফেলে এলেন সেখানে। না ফেলে কি ই বা করবেন তাদের তা জানাও নেই। মুখ বড় করে যাদের নিয়ে এসেছিলেন সাথে  করে, তারা বিরক্ত হলেন। নিজেও বিরক্ত হলেন। কথা কাটাকাটিতে নিজেদের মধ্যে তিক্ততা হলো। রাতে আবার লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে দামি হোটেলে থাক্লেন তারা। খাবার খরচ ও গেলো অনেক। পরদিন আর কেউ ঝর্নায় যেতে চাইলো না আগের দিনে অভিজ্ঞতা থেকে । সব মিলিয়ে তাদের ভ্রমণটা বরক্তিতে শেষ হলো। খরচ ও হলো বিস্তর।

আরেক ব্যাক্তি –‘খ’। তিনিও এই ঝর্নাটির কথা জানতে পারলেন আর ঠিক করলেন ওই অঞ্চল টা ঘুরে দেখবেন। তিনি এই জায়গাটা নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করলেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে যা তথ্য পাওয়া যায় এক যায়গায় করলেন। গুগল ম্যাপে  ভাল করে খুঁজে দেখলেন যায়গা টা। নিজে ঘুরে এসেছেন এমন একজন এর সাথে একটা মিটিং করে যতো সম্ভব টুকিটাকি তথ্য জেনে নিলেন ও নোট করে নিলেন। অনুসন্ধান করতে গিয়ে একজন তাকে একটা বই এর নাম জানালো যেখানে ওই যায়গা নিয়ে প্রায় তিরিশ বছর আগের কিছু লেখা রয়েছে। সে বইটাসও তিনি যোগাড় করে ফেললেন। বইটা পড়ে তিনি কিছু চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারলেন ওই অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে। খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, এখন জায়গাটা খুব জনপ্রিয়। তাই প্রতিদিন অনেক মানুষের চাপ পড়ে এখানে। ফলে সেখানে থাকার জায়গার সংকট হতে পারে সেটা আন্দাজ করে নিলেন।  গুগল ম্যাপে দেখে তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হতে পারে , এখন আরো একটু বেশি করে ম্যাপ ঘেটে তিনি ঝর্না থেকে ঘন্টা দুয়েক হাঁটা পথ দুরত্বে একটা গ্রাম দেখতে পেলেন । এমনকি গ্রামের আশে পাশে ক্যাম্প করবার মতো কিছু  যায়গাও ভেবে রাখলেন। যাতায়াত এ কেমন সময় লাগবে তা জেনে নিলেন খোঁজ করে। সমস্ত তথ্য নিয়ে  টিম-মেট দের সাথে বসলেন পরিকল্পনা করতে। পরিকল্পনা করলেন- কে কে সেখানে যেতে পারবেন, টিম সাইজ কত হবে, কার কি দায়িত্ব থাকবে, কিভাবে কখন যাত্রা শুরু করবেন, কিভাবে যাবেন, কোথায় কোথায় যাবেন, কি কি নিবেন,খাবার দাবার কিভাবে হবে, খরচ কেমন হবে, কি কি সমস্যা হতে পারে আর তার প্রতিকার কি হবে,  আবহাওয়ার অনুযায়ী প্রস্তুতি ইত্যাদি।
 
এই ‘খ’ দলটি ‘ক’ দলের ভ্রমণ সময়েই সেই এলাকায় যায়। তারা ভোরে বাস থেকে নেমেই পরিকল্পনা অনুয়ায়ী পিঠে ব্যাগ নিয়ে হাঁটা পথে চলে যান ঝর্না এলাকায়। যখন ভোরে তেমন মানুষ আসা শুরু করে নাই সেখানে। তাদের প্রস্তুতি থাকার কারনে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে বা তৃষ্ণায় কোনো সমস্যায় পড়তে হলো না । সাথে আনা শুকনা খাবার খেয়ে নেন তারা যাত্রাপথে আর নিজেদের তৈরী করা ময়াল সাথে করে ফেরত নিয়ে যাবার ডাম্পিং ব্যাগ সাথেই নিয়ে এসেছেন তারা। সব ময়লা তারা ডাম্পিং ব্যাগে রাখলেন। তারা জনবিরল ঝর্নায় প্রকৃতির সাথে সময় কাটান অনেক্ষণ। এমনকি কিছুক্ষণ ঝর্নার পাশ দিয়ে ক্লাইম্ব ও করেন পরিকল্পনা অনুযায়ী। লোক বাড়তে শুরু করলেই ট্রেক করে চলে যান গ্রামের দিকে। যাবার পথে নিজেদের সাথে থাকা খাবার রান্না করে খেয়ে নেন পথে। গ্রামে গিয়ে গ্সারামবাসিদের সাথে কথা বলেন। জানালেন তাদের ভ্রমণ সম্পর্কে আর অনুরোধ করেন গ্রামের পাশে তাবু ফেলার অনুমতির জন্য। এই অঞ্চল সম্পর্কে বই থেকে যে সব তথ্য তারা জানতেন তার সুত্র ধরে অনেক খাতির হয়ে যায় কয়েকজন এর সাথে। তারা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আরো অনেক গল্প করেন তাদের সাথে। গ্রামবাসিদের আথিতেয়তায় সুন্দর সময় কাটান তারা। গ্রামের লোকেরা তাদের ঘুরিয়ে দেখায় আশে পাশের পাহাড়ের লুকানো সুন্দর সব যায়গা।  সকলে মিলে করে রান্না করে কয়েকজন গ্রামবাসিকে সাথে নিয়ে রাতের খাবার সারেন আনন্দ মুখর পরিবেশে। পরদিন ভোরে তারা আবার ঝর্নায় গেলেন। সাথে আনা বড় বড় ডাম্প ব্যাগ বের করে তারা সেখানে ফেলা পানির বতোল, প্লাস্টিকের প্যাকেট ইত্যাদি ভরে নিলেন। সবার একটা করে ডাম্প ব্যাগে ময়লা ভরে- তারা ভালো একটা কাজ করার অনন্দ নিয়ে লোকালয়ে ফিরে এলেন। লোকালয়ে ফিরে এসে সেই ময়লা ডাম্প করলেন ময়লা ফেলবার যায়গায়।
তাদের যাত্রা শেষ হলো অপার আনন্দ আর সুন্দর অভিজ্ঞতা নিয়ে। খরচ ও হলো অনেক কম।
Sabrina Rahman
Lecturer
Department of Architecture, DIU