প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হরিণের চারণভূমি মনপুরা

Author Topic: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হরিণের চারণভূমি মনপুরা  (Read 1829 times)

Offline Alamgir240

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 84
  • Test
    • View Profile
বাংলাদেশের বৃহওম দ্বীপ ভোলা জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রূপালী দ্বীপ মনপুরা। চতুর্দিকে মেঘনা নদীবেষ্টিত সবুজ শ্যামল ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি মনপুরা। মনপুরা উপজেলা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে যেমন আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় জায়গা তেমনি বিদেশিদের কাছেও। যেসব জেলার বা বিভাগের লোকজন মনপুরা ভ্রমণে বা কাজের জন্য এসেছেন বা অবস্থান করেছেন এখানকার মানুষকে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন এবং ভালবেসেছেন এখানে না আসলে বোঝাই যাবে না সবুজের দ্বীপ মনপুরায় কি সৌন্দর্য লুকায়িত আছে। পর্যটনের কি অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে পুরানো এ দ্বীপে। পর্যটক আর ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে মুগ্ধতার বন্ধনে আটকে দেয়ার বহু উপকরণ রয়েছে এ দ্বীপে। এখানে সকাল বেলার সূর্য যেমন হাসতে হাসতে পূর্বদিকে উদিত হতে দেখা যায়, তেমনি বিকাল বেলাও লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে পশ্চিম আকাশে মুখ লুকায়। মনপুরাতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করা যায়।

ভোলা জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মেঘনার মোহনায় তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মনপুরা উপজেলায় দেড় লক্ষাধিক লোকের বসবাস। মিয়া জমিরশাহ'র স্মৃতি বিজড়িত মনপুরা দ্বীপ অতি প্রাচীন। একসময় এ দ্বীপে পর্তুগীজদের আস্তানা ছিল। তারই নিদর্শন হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় কেশওয়ালা কুকুর। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সারি সারি বাগান। মনপুরায় ছোট-বড় ৮-১০টি চর ও বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজ বিপ্লব। শীত মৌসুমে শত শত পাখির কল-কাকলিতে মুখরিত থাকে এসব চরাঞ্চল। এই চরগুলো হলো চরতাজাম্মুল, চর পাতালিয়া, চর পিয়াল, চরনিজাম, চর সামসুউদ্দিন, লালচর, ডাল চর, কলাতলীর চর ইত্যাদি। মনপুরা সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব পাশে গড়ে উঠেছে মনপুরা ফিশারিজ লিঃ। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২১০ একর জমিতে গড়ে উঠা খামারবাড়িটি গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। খামারবাড়িতে সারি সারি নারিকেল গাছ ও বিশাল ৪-৫টি পুকুর রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন খামারবাড়িটি হতে পারে পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ। খামারবাড়িটির পূর্ব পাশেই বিশাল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বাগান। মাঝে-মধ্যে এখানে হরিণ দেখা যায়। এখানে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই দেখা যায় না এখানে খাবারের রীতিমত আইটেম ছাড়াও বিশেষ বিশেষ কিছু খাবার লক্ষ্য করা যায়। শীতের হাঁস, টাটকা ইলিশ, বড় কই, জাগুর, কোরাল, বোয়াল ও গলদা চিংড়ি। স্থানীয়দের মতে, এখানকার খাঁটি দুধ খেয়ে ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলা দেখে মানুষের মন ভরে যেত। এজন্য এর নামকরণ করা হয় মনপুরা। তবে মনপুরার নামকরণ নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে।

১৮৩৩ সালে মনপুরাকে ভোলা জেলার অধীনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে মনপুরাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। এভাবে এগিয়ে যায় আজকের মনপুরা। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাই মনপুরার প্রধান সমস্যা। মন চাইলে যে কেউ মনপুরা আসতে বা যেতে পারবে না। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে রুটিনমাফিক। প্রতিদিন ঢাকা থেকে একটি লঞ্চ বিকাল সাড়ে ৫টায় হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে মনপুরা হয়ে পরদিন সকাল ৯টার সময় হাতিয়া পৌঁছে। ঐ লঞ্চটি আবার হাতিয়া থেকে ছাড়ে দুপুর ১২টায়। মনপুরাতে আসে দুপুর ১টায় এবং ১ ঘণ্টা যাত্রা বিরতি থাকে রামনেওয়াজ লঞ্চঘাটে। মনপুরার মানুষ যে লঞ্চে করে ঢাকা থেকে মনপুরা আসেন আবার ঐ একই লঞ্চে করে ঢাকায় চলে যান। এছাড়া ঢাকা কিংবা বরিশাল থেকে ভোলা হয়ে তজুমুদ্দিন সি-ট্রাক ঘাট থেকে মনপুরা যাওয়া যায়। অপরদিকে চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাট থেকে মনপুরার সাকুচিয়া জনতা বাজার রুটে দৈনিক ২টি লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া প্রতিদিন সাকুচিয়া থেকে রামনেওয়াজ হয়ে আলেকজান্ডারের উদ্দেশে একটি লঞ্চ যাত্রা করে। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে ২টি স্পিডবোড চলাচল করছে। ঐ রুটে দৈনিক শত শত মানুষ যাতায়াত করে। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নদী পথটি ভয়ানক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এ সময়ে এই রুটে আরেকটি সি-ট্রাক চলাচলের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মনপুরাতে ভাল মানের পর্যটন হোটেল না থাকায় পর্যটকরা যেতে খুব একটা আগ্রহী হন না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে তজুমুদ্দিন রুটে এবং চরফ্যাশন মনপুরা রুটে স্পিডবোট সার্ভিস চালু করলে পর্যটকরা কম সময়ে মনপুরা আসতে পারবেন। মনপুরায় ভাল মানের হোটেল গড়ে উঠলে পর্যটকদের আগমন বাড়বে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলে মনপুরা হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

মনপুরার মানুষ সহজ-সরল প্রকৃতির। মনপুরার শতকরা ৮০ ভাগ লোক কৃষক ও মত্স্যজীবী। মনপুরার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ হয় মনপুরায় পর্যটন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে। মনপুরা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জানান, এখানকার অপার সম্ভাবনা নিয়ে মানুষ তেমন ভাবছে না। উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসলে এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।

মনপুরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্যাহ আল বাকী জানান, এ দ্বীপটি ভোলা জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও নানা উপকরণ ছড়িয়ে আছে এ দ্বীপে। মনপুরার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, ভাল মানের হোটেল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ বিভিন্ন সুবিধা বাড়াতে পারলে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মনপুরায়। মনপুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নজির আহমেদ মিয়া জানান, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার একটি স্বপ্ন মনপুরাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।