আম: পরিমাণ ও পরিণাম

Author Topic: আম: পরিমাণ ও পরিণাম  (Read 272 times)

Offline Sahadat Hossain

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 323
  • Test
    • View Profile
আম: পরিমাণ ও পরিণাম
« on: May 10, 2016, 05:17:38 PM »
প্রকৃতির এক সুস্বাদু, সুন্দর, সুগন্ধময় ও পুষ্টিমান সমৃদ্ধ ফল আম। আম আমাদের জাতীয় ফল না হলেও আমগাছ আমাদের জাতীয় বৃক্ষ আর আমকে বলা হয় ফলের রাজা। ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল আম। আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকায় কমবেশি আম জন্মালেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে উন্নত মানের আম উৎপন্ন হয়। অবশ্য সারা দেশে উৎপাদিত আমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমই উৎপন্ন হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এ জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানীও বলা হয়।
দেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গিয়ে ইত্যাদি ধারণের ধারাবাহিকতায় আমরা ৮ এপ্রিল গিয়েছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইত্যাদি ধারণ করতে। ভূমি গঠন ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী এই এলাকাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ভূ-ভাগ বলা হয়। বরেন্দ্র অঞ্চল গৌড়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ এই জেলা সুলতানি আমলেই গৌরবের উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিশাল এলাকাজুড়ে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন সব আমবাগান। যেহেতু আমের রাজধানীতে এসেছি, তাই অনুষ্ঠানের স্বার্থেই আমের ওপর একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে কথা বলেছিলাম বেশ কজন আম গবেষক, আম ব্যবসায়ী, বাগানমালিক ও আমচাষির সঙ্গে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানা গেল, প্রতিবছর আমের মৌসুমে এ জেলার ৮ থেকে ১০ লাখ লোক আমগাছ পরিচর্যা, বাগান পরিষ্কার রাখা, আম সংগ্রহ, বিক্রি ও পরিবহন ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। প্রতিবছর এ জেলা থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। ২০১১ সালের এফএওর দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিশ্বের সেরা ১০টি আম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অষ্টম স্থানে। তবে বিশ্বের আম রপ্তানিকারক ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো স্থান নেই। কৃষিবিজ্ঞানীরা এ জন্য বেশ কিছু বিষয়কে দায়ী করেছেন। যেমন আমের মুকুল আসার পর থেকেই আমগাছের কিছু নিয়মতান্ত্রিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, যা সবারই মেনে চলা উচিত। আম গবেষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এবং তাঁদের অনুমোদিত পদ্ধতিতে ঝুঁকিমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন সম্ভব।
বেশি ফলনের আশায় আমগাছের গোড়ায় কালটার বা লবণ দেওয়া যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি বেশি মুনাফার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রয়োগ করে অসময়ে আম পাকানো এবং ফরমালিন ব্যবহার করে বেশি দিন আম সংরক্ষণ করার পদ্ধতিও পরিহার করতে হবে। এসব পদ্ধতি আমশিল্পের জন্য যেমন বিপজ্জনক তেমনি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফউদ্দিন বললেন, বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য বর্তমানে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিটি অত্যন্ত সফল ও সম্ভাবনাময়। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তিতে শতভাগ রোগ ও পোকামাকড় দমন করা যায়। এই প্রযুক্তিটি বিভিন্ন আম রপ্তানিকারক দেশে বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত পদ্ধতি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ১০০ ভাগ রোগ ও পোকামাকড়মুক্ত আম উৎপাদন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তবে বাংলাদেশে কী পরিমাণ জমি এবং ওই জমিতে প্রতিবছর কী পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়, তার সঠিক তথ্য জানা গেলে বাংলাদেশের অবস্থান আট থেকে আরও ওপরে উঠে আসতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১২ সালের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর ২৭ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমি থেকে মোট ৮ লাখ ৮৯ হাজার ১৭৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয় এবং শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয় বলে জানানো হয়েছে; কিন্তু বেশ কয়েকজন কৃষিবিজ্ঞানী ও আম গবেষক এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। কারণ, মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে বাংলাদেশে চাষাবাদের এলাকাটা আরও বেশি।
শরফ উদ্দিনের দেওয়া এক তথ্যে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৪ হাজার ২৬০ হেক্টর, রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর, নাটোরে ৪ হাজার ১০০ হেক্টর ও নওগাঁয় ৯ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয় অর্থাৎ এই চার জেলাতেই ৫০ হাজারেরও বেশি হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রচুর আম চাষ হচ্ছে। সেই হিসাবে সঠিক পরিসংখ্যান হলে দেখা যাবে, সারা দেশে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে এবং এই পরিমাণ জমিতে উৎপাদিত আম হিসাব করলে উৎপাদনের পরিমাণও বেড়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে যদি প্রকৃত তথ্যটা উপস্থাপন করা হয়, তাহলে আম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ওপরে উঠে আসবে এবং সেটা পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ স্থানে পৌঁছে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের আমের প্রতি সবার উৎসাহ বেড়ে যাবে এবং আমদানিকারকদের দৃষ্টি পড়বে বাংলাদেশের দিকে। ফলে আম রপ্তানি বেড়ে যাবে, চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং দেশও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে।
গাছ থেকে আম সংগ্রহ করা নিয়েও কিছুটা মতভেদ রয়েছে। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব ও গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফাহিম রেজা বলেন, পাকা আম সংগ্রহের ব্যাপারে কখনোই নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া ঠিক নয়। প্রাকৃতিকভাবে পাকার পরেই আম সংগ্রহ করা উচিত। কারণ, তাপমাত্রা, পরিবেশ, আমের জাত ও অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতের আম পাকে। তাই বিভিন্ন স্থানে এসব আম সংগ্রহ করার সময়েরও তারতম্য ঘটে।
তবে আম সংগ্রহের মৌসুমে আমে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রয়োগ ঠেকাতে আম সংরক্ষণাগার বা বিভিন্ন আড়তে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মিডিয়াতে আমের বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য ও সঠিক তথ্য প্রচার করা উচিত বলে মনে করেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। নইলে আমচাষি ও আম ব্যবসায়ীরা তথ্য বিভ্রান্তির শিকার হন। কারণ, গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে কৃষক ও সাধারণ মানুষ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। মনে রাখতে হবে আম আমাদের অত্যন্ত প্রিয় একটি ফল এবং এটি একটি অর্থকরী ও লাভজনক ফসল। আমবাগান অনেকটা স্থাবর সম্পত্তির মতো, কারণ প্রতিবছরই আমবাগান থেকে আয় আসতে থাকে। কাজেই আমগাছের বৃদ্ধি ও নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য সবারই সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ, আমের মৌসুমে সবাই চায় ভেজালমুক্ত আম পেতে ও খেতে।
পরিশেষে দুটি আম–বিষয়ক পরামর্শ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষকেরা আমপ্রিয় মানুষের জন্য দুটি পরামর্শ দিয়েছেন—
একটি হলো, আম কেনার সময় অবশ্যই আঘাতপ্রাপ্ত, বেশি নরম ও দাগযুক্ত আম না কেনা। আরেকটি হলো, বেশি পরিমাণে আম কেনার ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি আম খেয়ে তারপর কেনা। এই দুটি পরামর্শ মেনে চললে খারাপ আম পাওয়ার ও খাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকর্মী।
Md.Sahadat Hossain
Asst. Administrative Officer
Office of the Director Administration
Daffodil Tower(DT)- 4
102/1, Shukrabad, Mirpur Road, Dhanmondi.
Email: da-office@daffodilvarsity.edu.bd
Cell & WhatsApp: 01847027549