যেভাবে রক্ষা পেয়েছিল কাবা ঘর

Author Topic: যেভাবে রক্ষা পেয়েছিল কাবা ঘর  (Read 468 times)

Offline Akter Hossain

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 88
  • Test
    • View Profile
প্রবাস জীবন শুরুর একটি দিন। সৌদি আরবের জেদ্দায় এক ঝলমলে সন্ধ্যায় টেক্সি এসে থামে 'বাব-মক্কা'য়।


ততোদিনে 'বাব' মানে 'দরজা বা তোরণ'- এতটুকু আরবি শিখেছি। 'বাব-মক্কা'য় দাঁড়িয়ে তখন আমি পুলকিত!

প্রাচীন জেদ্দার নগর দেয়ালের একটি তোরণ 'বাব-মক্কা' তথা 'মক্কা-তোরণ'। এখান থেকে শুরু হয়েছে মক্কা যাওয়ার সড়কপথ। আগে জেদ্দাবাসী এবং জলপথে আসা হাজিরা 'বাব-মক্কা' থেকেই রওনা দিতেন মক্কার উদ্দেশ্যে।

সেই প্রাচীন 'বাব-মক্কা' এখনও আগের মতো আছে, অবকাঠামো অবশ্য সামান্য পরিমার্জন হয়েছে। জেদ্দায় আমার প্রবাস জীবনের দেড় যুগ পরও 'বাব-মক্কা'র স্মৃতি এতটুকু মলিন হয়নি।

মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান মক্কা। আমার অন্তরের অনেকখানি জায়গা অধিকার করে আছে মক্কা তথা কাবা। সেই যুবক বয়সে বাব-মক্কার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে তখন ভাগ্যবান মনে হয়েছিল। আন্দোলিত হয়েছি, কারণ মক্কা-তোরণ থেকে ৭০-৭৫ কিলোমিটার দূরেই মক্কা। মাত্র এক ঘণ্টার পথ!

অল্পদিনের মধ্যেই মক্কায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয় আমার। সেলাইবিহীন সাদা থানের 'ইহরাম' পরে উমরাহ্‌ পালন করতে উপস্থিত হই মক্কায়। মক্কা ইসলামের প্রাণকেন্দ্র, এখানে অবস্থিত কাবা, মুসলিম ধর্মমতে আল্লাহর ইবাদতের জন্য তৈরি প্রথম ঘর।

এখানে মুসলমানরা হজ পালনের জন্য আসেন।

মক্কার উদ্দেশ্যে বাব-মক্কা থেকে রওনা দিয়ে জেদ্দা নগরীর প্রান্ত-সীমানায় দেখা মিলবে আরব ঐতিহ্যের অনুরূপ একটি তোরণ। আরও এগিয়ে গেলে মক্কা নগরীর উপকণ্ঠে চেকপোস্ট পার হয়ে মিলবে একটি তোরণ, যা 'হারাম সীমানা তোরণ' হিসেবে পরিচিত।

মক্কার আরেক নাম 'হারাম'। কাবা ঘরের চারপাশ ঘেরা মসজিদ হচ্ছে 'মসজিদুল হারাম'।
'হারাম সীমানা তোরণ' পার হওয়ার পর আরেকটি সুদৃশ্য তোরণ রয়েছে, যা কোরআন শরীফ রাখার কাঠের রেহাল সদৃশ। এর উপরে কোরআনের নমুনা স্থাপিত রয়েছে। এরপর মক্কা নগরীর ঠিক প্রবেশমুখে সড়কদ্বীপে রয়েছে বেশকিছু আলোকিত অভ্যর্থনা যা সহজেই নজর কাড়ে।

গাড়ি থেকে নেমে সামনেই 'মসজিদুল হারাম', সুউচ্চ মিনার। কিং আবদুল আজিজ দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম মসজিদে। বর্তমানে নির্মাণ কাজের জন্যে এই দরজাটি বন্ধ রয়েছে। কিং ফাহাদ দরজা বর্তমানে প্রধান দরজা হিসেবে ব্যবহৃত। মসজিদুল হারামে এমন অসংখ্য দরজা রয়েছে। এর যে কোন একটি দিয়ে প্রবেশ করা যায়।

মসজিদুল হারামের ভেতরে রয়েছে বড় প্রাঙ্গণ, এটা 'মাতাফ' বা তাওয়াফের জায়গা। প্রাঙ্গনের মাঝখানে অবস্থিত কাবা। সিল্কের তৈরি ঘনকালো 'কিসওয়া' বা গেলাফ দিয়ে ঢাকা কাবা।
সেই প্রথমবার কাবা শরীফের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম পার্থিব জগৎ থেকে। তখনকার সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার নয়, কেবল অন্তর দিয়ে অনুভব করার।

তারপর থেকে সময় সুযোগ হলেই ছুটে যাই মক্কায়। কাবা ঘরের একটি মাত্র দরজা, উত্তর পাশের দেয়ালের পূর্বকোণে। আর এই কোণেই স্থাপিত 'আসওয়াদ পাথর'। মেঝে থেকে প্রায় সাত ফুট উঁচুতে কাবা ঘরের দরজা। স্বর্ণনির্মিত, কোরআনের আয়াত কারুকাজ খচিত দরজায় রয়েছে সুদৃশ্য আচ্ছাদন, স্বর্ণ-রৌপ্য সুতোয় বোনা কারুময় কোরআনের আয়াত।

কাবার দরজা সাধারণত বন্ধ থাকে। বিশেষ দিনে কাবা ঘর ধোয়া বা বিশিষ্টজনের ভেতরে প্রবেশের জন্য কাঠের উঁচু সিঁড়ি ব্যবহার করে দরজা খোলা হয়।

কাবা ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে 'সুরা ফিল' পাঠ করেছিলাম।

শোনা যায়, আবরাহা বাদশাহ কাবা ঘর ধ্বংস করতে এসেছিলেন হস্তি-বাহিনী নিয়ে। নবী মুহম্মদের জন্মের আগের ঘটনা। নবীর দাদা কোরাইশ গোত্রপতি আবুদল মুত্তালিব আমন্ত্রিত হয়ে আবরাহার তাবুতে উপস্থিত হয়ে দাবি পেশ করেছিলেন, "আমি আমার সম্পদ ফেরত চাই, দুইশ' উট, যা আমার এবং আপনি তা নিয়ে এসেছেন।"
আবরাহা আশ্চর্য হয়ে বললেন, "আপনি বলছেন আপনার দুইশ' উটের কথা। কিন্তু আপনি কিছুই বলেননি আপনার ও আপনার পিতা-পিতামহের ধর্মীয় উপাসনাঘরের কথা, যা আমি ধ্বংস করতে এসেছি!"

জবাবে আবদুল মুত্তালিব বললেন, "আমি উটের মালিক। ঘরের মালিক আছেন, যার ঘর তিনিই তা রক্ষা করবেন।"

আবরাহা দম্ভ করে বললেন, "কেউ আমাকে সেখানে পৌঁছনো থেকে আটকাতে পারবে না।"

আবদুল মুত্তালিব বললেন, "আপনি তা দেখবেন।"

তারপর আবদুল মুত্তালিব ও কোরাইশের অন্যান্য গোত্রের লোকেরা নাকি কাবা শরীফের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আবরাহা ও তার সেনাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।

সেদিন রক্ষা পেয়েছিল কাবা ঘর এবং মক্কাবাসী। পরাজিত ও ধ্বংস হয়েছিল আবরাহা ও হস্তি-বাহিনী। এমনি করে প্রচলিত আছে মুসলিম ঐতিহ্যের কাহিনী।

সেই কাবা ঘরের দরজার নিচে দাঁড়িয়ে, কাবা ছুঁয়ে, দরজার চৌকাঠ ছুঁয়ে, হাজিরা দোয়া-দরুদ পড়েন, চোখের জলে বুক ভাসান।

প্রতিবার ছুটিতে বাংলাদেশে যাওয়ার আগে উমরাহ্‌ ও বিদায় তওয়াফ করি। কাবার দরজায় চোখ রেখে এক অজানা আবেগে হৃদয় তোলপাড় করে ওঠে। মনে শঙ্কা জাগে, এমন সৌভাগ্য আর কতোদিন পাব এ জনমে!

লেখক: প্রবাসী বাংলাদেশি
Mr. Akter Hossain
Physics (C.U)
Email : akter@daffodilvarsity.edu.bd