দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন: আশায় বাঁচো

Author Topic: দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন: আশায় বাঁচো  (Read 524 times)

Offline 710001113

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 493
    • View Profile
দেখা হয়ে গেল খুবই অসাধারণ একটি চলচ্চিত্র। অনেকদিন ধরে দেখব দেখব করছিলাম। ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেস (IMDB)-তে বিশ্বের সমস্ত চলচ্চিত্রের মাঝে এটি আছে এক নম্বরে। বলা যায় এক নম্বরে থাকার কারণেই অনেকদিন ধরে ফেলে রেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল এখন ভালো মানসিকতা নেই, বাজে মানসিকতায় এক নম্বর মুভিটা দেখে তার মজা নষ্ট করে ফেলবো? আবার মনে হচ্ছিল এক নম্বরে আছে এই কারণে দেখলে আশা বেশি থাকবে, যার ফলে আশা অনুরূপ প্রাপ্তি নাও হতে পারে। এক সময় মনে হলো কোনো কাজ নেই, অবসর আছি, মাথা একদম পরিষ্কার। এই মুহূর্তে ড্রামা ধাঁচের সিনেমা দেখা যায়। তাই হলো, ঠাণ্ডা মাথায় ‘শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ দেখা শুরু করে দিলাম। মাত্র দশ পনের মিনিটেই ভেতরে প্রবেশ করে ফেললাম।

দেখতে খুবই ভালো লাগছিল। ধারণা ছিল এটা বুঝি ‘প্রিজন ব্রেক’ সিজনের মতো জেলখানা থেকে পালানোর কাহিনী। ফক্স টিভিতে প্রচারিত বিখ্যাত প্রিজন ব্রেক ছিল ছিল থ্রিলার ধাঁচের নাটক। শশাঙ্ক রিডেম্পশনও জেলখানা থেকে মুক্তির কাহিনী। কিন্তু সেটি মোটেও প্রিজন ব্রেকের মতো নয়। একদমই ড্রামা ধাঁচের চলচ্চিত্র। মূলত জেলখানা থেকে মুক্তিই সিনেমার মূল বক্তব্য নয়। এখানে যেন বলা হচ্ছে জীবন থেকে বাঁচো। জীবনকে তার চাহিদার পথে উন্নীত করো। আশায় বাঁচো। কখনো হাল ছেঁড়ে দিও না। তার উপর তুলে ধরা হয়েছে জেলখানার পরিবেশের নাটকীয় বাস্তবতা। জেলখানা সম্পর্কে বিস্তৃত ও বাস্তবধর্মী ধারণা থাকলেই তবে এমন চমৎকার কাহিনীর প্লট সাজানো যায়। আসলে প্লট বললেও ভুল হবে, বলতে হবে জেলখানার মন ছুঁয়ে যাওয়া বাস্তবতা।

আশা, ধৈর্য আর সাধনার মাধ্যমে মুক্তির হাতিয়ার।

মাঝে মাঝে এমন কিছু সিনেমা দেখি যেগুলো সমালোচকদের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক ভালো, কিন্তু দর্শক হিসেবে আমার দিক থেকে ভালো লাগে না। আবার ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেসে রেটিং ভালো, কিন্তু আমার কাছে একটুও ভালো লাগে না। পাশাপাশি এমন সিনেমাও দেখি আমার কাছে অসাধারণ লাগে কিন্তু রেটিং তেমন ভালো না। এই সিনেমাটি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। এটা ইতিহাসের সমস্ত সিনেমার মাঝে এক নম্বরে আছে, এটা দেখে আমার মন কি একে এক নম্বরে রাখবে? দেখার পর মনে হলো অবশ্যই এটা এক নম্বরে থাকার যোগ্য। মনে হয় আরো অনেকদিন এক নম্বরে থাকবে। আরো অনেক দিন ধরে এক নম্বরে থাকার যোগ্যতা আছে এর।
সিনেমাটিতে প্রথম থেকেই ভালো লাগা শুরু হয়। ৩০/৪০ মিনিট যাবার পরে মনে হলো এই সিনেমা আড়াই ঘণ্টা নয়, দশ-পনেরো ঘণ্টা ধরে চললেও ক্লান্তিহীন চোখে দেখে যেতে পারবো। সবার অভিনয়ই অসাধারণ হয়েছে, বিশেষ করে কিংবদন্তী অভিনেতা মর্গান ফ্রীমান যে কী চমৎকার অভিনয় করেছে বলার মতো না। সিনেমায় তার নাম থাকে রেড। খুনের মামলায় জেল খাটে। লাইফ ইনস্যুরেন্সের টাকা পেতে স্ত্রীকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সব প্ল্যান মতো না যাওয়াতে ধরা খেয়ে যায়।
সিনেমাটিকে মনে ধরিয়ে দিতে যেটা মূল চালিকা হিসেবে কাজ করছে সেটা হচ্ছে এর ন্যারেটর বা কথক। সিনেমার বেশিরভাগ অংশই মর্গান ফ্রীমানের ভাষ্যে। মর্গান ফ্রীমানের প্রভাব বিস্তারকারী কণ্ঠ সারা বিশ্বে বিখ্যাত। বলা যায় তার মতো কণ্ঠ হলিউডে একটাই আছে। তার কণ্ঠ তাকে অনন্যতা দান করেছে। এই সিনেমায় তার ভাষ্যগুলো এতোটাই কাব্যিক যে ভালো না লেগে উপায় নেই। আমার অবস্থাটা বলি, আমার কাছে ছিল 720P এর একটি রিপ। দেখার সময় মনে হচ্ছিল এই সিনেমাটা আরো ভালো ও পরিষ্কার প্রিন্টে দেখা উচিৎ। আবার মন বলছে কীভাবে এই অবস্থায় সিনেমাটা ফেলে রাখি? ভালো প্রিন্টের রিপ নামতেও তো কিছুটা সময় লাগবে!

মর্গান ফ্রীমানের ভরাট গলার প্রভাব বিস্তারকারী ভাষ্য মুভিটিকে দিয়েছে অনন্য এক মাত্রা।
প্রতিটি চরিত্র মানবিক দিক থেকে অনেক আবেদন তুলে। আচ্ছা, একজন কয়েদী যদি তার জীবনের ৪০ টা বছরই জেলে কাটিয়ে দেয় তাহলে কেমন হয় তার চিন্তাধারা? বাকি জীবনটা নিয়ে কী হয় তার পরিকল্পনা? একটু একটু করে মানিয়ে নিয়ে একসময় দেখতে পায় জেলখানাটাই তার সব। জেলখানার বাইরে গেলে তার পৃথিবীটা হয়ে যাবে সম্পূর্ণই ভিন্ন এক জগত। মানুষের মন এত বিচিত্র কেন? এই সিনেমার প্রাণকে আরো শক্তিশালী করেছে এইসব ব্যাপারগুলো। জেলখানার বাস্তবতায় একেকজন মানুষের মন, একেকজনের চিন্তাধারা। যার কারণে সিনেমার টুকটাক প্রতিটি চরিত্রই শক্তিশালী। জেলের সাথে কতটা মিশে গেলে একজন লোক মুক্তি পেতে চায় না? কতটা মিশে গেলে একজন লোক বাকি জীবন জেলে থাকার জন্য আবার নতুন করে অপরাধ করতে চায়? কতটা মিশে গেলে জেলের বাইরের জীবন পানসে হয়ে যায়? কতটা হলে বাইরের জীবনকে পানসে মনে করে নিজেকে শেষ করতে পারে?

জেলখানার সাথে কতটা মিশে গেলে সারাজীবন জেলে থাকার জন্য নতুন করে অপরাধ করতে চায় মানুষ?

কতটা মিশে গেলে মুক্ত জীবন একদম পানসে হয়ে যায়?

এই সিনেমার কাহিনী, চরিত্র, কথোপকথন, ধারাভাষ্য, পরিচালনা ও সমন্বয় সবকিছুই অসাধারণ হয়েছে। একসাথে সবগুলো দিকের এমন অনবদ্য সম্মিলন খুব কম সিনেমাতেই হয়। মজার ব্যাপার হলো এই সিনেমাটা যখন প্রথম বড় পর্দায় মুক্তি পায় তখন ফ্লপ করেছিল! পরে ক্যবল টেলিভিশন, ভিএইচএস, ডিভিডি এবং ব্লু-রে সংস্করণে অনেক সাফল্য পায়। পরিচালক ফ্রাঙ্ক ডারাবন্ট তার জীবনে পরে আরো অনেক সিনেমা তৈরি করেছেন। ভালোও হয়েছে। কিন্তু এই সিনেমাটির মতো অসাধারণ আর কোনোটি হয়নি। সিনেমার অভিনেতারাও এই সিনেমার পরে আরো অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন কিন্তু এর মতো অসাধারণ আর কোনোটিতেই করা হয়নি। আসলে এই সিনেমাটা সবদিক থেকে এতই উত্তীর্ণ যে সেরাদের সেরাকেও হার মানিয়ে দেয়। এই সিনেমার বড় একটা মেসেজ ‘আশায় বাঁচো’। সিনেমায় একসময় অতি বিখ্যাত এই বাক্যটি উচ্চারিত হয়- Hope is a good thing, May be the best of things, And no good things ever dies.

সিনেমাটা স্টিফেন কিং এর উপন্যাসিকা ‘রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশ্ঙ্ক রিডেম্পশন’ অবলম্বনে নির্মিত। গল্পের চেয়ে বড় কিন্তু উপন্যাসের চেয়ে ছোট এরকম সাহিত্যকর্মকে উপন্যাসিকা বা Novela বলে।
কিছু কিছু মুভি আছে দেখার পর তার ভালোলাগাটা অনেকক্ষণ, অনেক দিন থেকে যায়। এই মুভিটি এ ধরনের। একদম অন্যরকম। যারা সিনেমা দেখে তাদের প্রত্যেকরই এটা দেখা উচিৎ। না দেখাটা দর্শক হিসেবে অনুচিত কাজের মধ্যে পড়ে। তবে ব্যক্তিগত পরামর্শ থাকবে, যখন কোনো কাজ থাকবে না, মস্তিষ্ক একদমই অবসর থাকবে তখন দেখলে ভালো হবে। হ্যাপি ওয়াচিং।