বায়ুদূষণ রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতদূর? (যুগান্তর,২১ জানুয়ারি ২০২০

Author Topic: বায়ুদূষণ রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতদূর? (যুগান্তর,২১ জানুয়ারি ২০২০  (Read 112 times)

Offline kekbabu

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 59
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
বায়ুদূষণ রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতদূর?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
২১ জানুয়ারি ২০২০
চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে বলেছিলেন, মানুষের ভেতরে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে যদি ধুলাবালি কণা না ঢুকত, তবে মানুষ লাখ লাখ বছর বাঁচতেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘায়ু লাভের ক্ষেত্রে ধুলাবালি কণামুক্ত নির্মল ও বিশুদ্ধ বায়ু বা বাতাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
ঠিক একইভাবে উল্টোদিক থেকে বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, দূষিত বাতাস বা দূষিত পরিবেশ দীর্ঘায়ু কমানোর ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, ধূমপান এবং ডায়াবেটিস- এ তিনটি কারণে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায়, তারচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় বায়ুদূষণের কারণে।

পরিবেশ ও চিকিৎসাবিদ্যা মতে, বায়ুদূষণ থেকে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিস (সিওপিডি) নামে শ্বাসতন্ত্রের যে রোগ হয়, তা বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। আর ২০১২ সালে শুধু এ রোগেই পৃথিবীতে যে পাঁচটি দেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় বায়ুদূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। এয়ার ভিজুয়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে ছিল ঢাকা। এর আগে গত বছরের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর, ১৭ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল শীর্ষে।

শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই হচ্ছে পরিবেশ দূষণ। বিশ্বের প্রভাবশালী স্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ২০১৭ সালে এক প্রতিবেদনে জানায়, পরিবেশ দূষণের ফলে মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে। আর রাজধানী ঢাকা তো অনেক বছর ধরেই বসবাসের অযোগ্য ও নিকৃষ্টতম শহরগুলোর একটি, যার অন্যতম কারণ পরিবেশ দূষণ।

অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, বাড়ি ও কলকারখানার দূষিত ও রাসায়নিক পদার্থ নির্গমন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাগরিক অসচেতনতা ইত্যাদি পরিবেশ দূষণের কারণ। ২০১৯ সালে WHO ১০টি স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করেছে।

এর মধ্যে এক নম্বর ঝুঁকি হল বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন। আর ২০১৮ সালে সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা ছিল তৃতীয়।

ঢাকার বায়ুদূষণের এ চিত্র সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে ঢাকার বায়ুমান মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। ঢাকা শহরের বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫।

WHO-এর তথ্যানুসারে, পিএম ২.৫ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে তা শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগসহ হৃদরোগের পরিমাণ বাড়ায় এবং পিএম ২.৫-এর কারণে অ্যাজমা ও ফুসফুসের ক্যান্সারও হতে পারে। উল্লেখ্য, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

ঢাকার বাতাস দূষিত হওয়ার কারণ কী এবং তা রোধে পরিবেশ অধিদফতর কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানাতে ১৩ জানুয়ারি মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব পরিবহন নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে, সেসব যানবাহন জব্দ করতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে সুপারিশ সংবলিত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপনের পর আদালত ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে মোট ৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিট আবেদনের ধারাবাহিকতায় বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশনা দিয়েছেন।

নির্মল বায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এ টাকা পরিবেশ অধিদফতর কীভাবে ব্যয় করেছে, পরিবেশ উন্নয়নে কী ধরনের ভূমিকা রেখেছে, এতে জনগণ কী ধরনের সুফল পাচ্ছে অর্থাৎ পুরো প্রকল্পের টাকা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।

মহামান্য হাইকোর্টের দেয়া ৯ দফা নির্দেশনায় সড়ক পরিবহন আইনের বিধান অনুযায়ী পরিবহনের ‘ইকোনমিক লাইফ’ নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। যেসব পরিবহনের ইকোনমিক লাইফের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেসব পরিবহন চলাচলে নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া চলমান টায়ার পোড়ানো ও ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ আদেশ বাস্তবায়ন করে পরিবেশ অধিদফতরকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি ঢাকার পাশের চার জেলা গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে যেসব অবৈধ ইটভাটা এখনও বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকায় বালু, ময়লা, বর্জ্য বহনের সময় বহনকারী ট্রাকসহ সংশ্লিষ্ট যানবাহনগুলো ঢেকে চলাচল করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দোকান বা মার্কেটের ময়লা যাতে সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত স্থানে ফেলা হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সিটি কর্পোরেশনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ এলাকায় বালু, সিমেন্ট, মাটিসহ নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ যাতে আইন ও দরপত্রের শর্তানুযায়ী নিশ্চিত করা হয়, তারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সিটি কর্পোরেশনের যেসব ধুলাবালিপ্রবণ এলাকায় এখনও পানি ছিটানো হয়নি, সেসব এলাকায় নিয়মিত পানি ছিটাতেও বলা হয়েছে।

ঢাকার বাতাসের এই যখন অবস্থা, তখন বাতাসে ভাসমান মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মিহি ধূলিকণার মাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাজশাহী শহর বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। সারা বিশ্বের শহরগুলোয় বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে রাজশাহীর এ গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থেকে একটা বিষয় সবার কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আর তা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সত্যিকার অর্থে আন্তরিক প্রয়াস এবং সবার সহযোগিতা থাকলে অবশ্যই একটি শহরে শুধু বায়ুদূষণ কমানোই নয়, বরং ওই শহরকে সবচেয়ে ভালোভাবে বসবাস উপযোগী করে তোলাও সম্ভব। এমনকি সারা বিশ্বের মধ্যে ওই শহরকে সবচেয়ে সুখী শহরেও পরিণত করা সম্ভব।

আবার এ ক্ষেত্রে যদি ঘটনা উল্টোভাবে ঘটে, তাহলে এ ক্ষেত্রে রাজশাহীকে দেখতে না পেয়ে প্রথমেই দেখা যাবে ঢাকা এবং এরপর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো অন্যান্য শহরকে; যা মাত্রাতিরিক্ত দূষণে পরিপূর্ণ।

এ যেন ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন কতিপয় ব্যক্তিকে নরকে পাঠিয়ে দেয়ার পর কয়েকদিন পর নরকটি স্বর্গে পরিণত হওয়া এবং নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন কতিপয় ব্যক্তিকে স্বর্গে পাঠিয়ে দেয়ার পর স্বর্গটি নরকে পরিণত হওয়ার গল্পের মতো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোর ক্ষেত্রে যদি রাজশাহী শহর সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়; তাহলে কেন ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা দেশের অন্য শহরগুলোয় বায়ুদূষণ কমানো যাচ্ছে না?

নাকি ওই শহরগুলোয় বসবাসরত লোকজন দূষণ পছন্দ করেন? নিশ্চয়ই পছন্দ হওয়ার কথা নয়। দেশের অন্যান্য শহরে বায়ুদূষণ বা অন্যান্য দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে কোনো জাদুর কাঠির প্রয়োজন নেই।

ঢাকার বায়দূষণ রোধে মহামান্য হাইকোর্টের ৯ দফা নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে এসে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরায়ণ করা প্রয়োজন।

এক কথায়, বাস্তবমুখী জোরালো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। আর তা সম্ভব হলেই রাজশাহী শহরের মতো ঢাকা শহরসহ দেশের অন্য শহরগুলোয়ও বায়ুদূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে ওই শহরগুলোকে সত্যিকার অর্থেই সুখে ও শান্তিতে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলা।

সুতরাং, এ লক্ষ্যে এখন থেকেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ সরকার, গণমাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ শুরু করা আবশ্যক।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/269364/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%82%E0%A6%B7%E0%A6%A3-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A6%A6%E0%A7%82%E0%A6%B0
Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd