রেড কান্ট্রি থেকে বলছি...

Author Topic: রেড কান্ট্রি থেকে বলছি...  (Read 12 times)

Offline Faruq Hushain

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 83
  • Test
    • View Profile
ইউরোপ, একটি মহাদেশ। বস্তুত এখানের অধিবাসীদের কাছে সমগ্র ইউরোপ মিলে একটি দেশের মতোই। বিশেষ করে শেনজেন আওতাভুক্ত দেশগুলোর অবাধ যাতায়াতব্যবস্থা দেখে কখনোই মনে হয় না যে একটি দেশ থেকে আরেকটি দেশে কেউ যাচ্ছে! বরং মনে হয় একটি দেশেরই এক শহর থেকে অন্য শহরে কেউ যাচ্ছে।

ইউরোপে আমার প্রবাসজীবনের বয়স মাত্র দুই বছর। মধ্য ইউরোপের একটি দেশ, ইতালি। রূপেগুণে অনন্যই বলা যায় যাকে। যার প্রতিটা রাস্তা কোনো একটা ইতিহাসের কথা বলে, প্রতিটা অলিগলিতে রচিত হয়েছিল বিপ্লব, যে দেশের আনাচকানাচ ভরপুর ভিন্ন মাত্রার সংস্কৃতি, অসাধারণ রান্নার সুখ্যাতি আর অপ্রতুল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
এ দেশে দুই বছর ধরে বাস করি, মন চাইলে ছুটে চলে গিয়েছি পাশের দেশে; বেড়াতে অথবা কাজে! ইউরোপে বসবাস করার এইটাই মজা, সকালবেলা পরিকল্পনা করে ঘুরে আসা যায় লাগোয়া কোনো দেশ থেকে। যতটা লাগোয়া এক–একটা দেশ, ততটাই ভিন্ন এক–একটা দেশের ভাষা, মানুষ, সংস্কৃতি, বৈশিষ্ট্য। যার কারণে উপভোগ করা যায় বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা।

স্বপ্নেও কি কেউ ভেবেছিল, এ রকম অবাধ চলাফেরার সুবিধাসম্পন্ন একটা দেশের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করবে আশপাশের সব দেশ? শুধুই কি আশপাশের দেশ, বলা যায় সমগ্র বিশ্বের কাছ থেকে ইতালি এখন আলাদা! ইতালি এখন আতঙ্কের নাম। ইতালির রং এখন লাল।

এই আতঙ্কের নাম কোভিড–১৯ কিংবা সোজা বাংলায় করোনাভাইরাস। ছোট একটি ভাইরাস, কাবু করেছে পুরো দেশটিকে। দেশটি বাধ্য হয়েছে লকড ডাউন হতে!

পুরো একটি দেশ, পুরো দেশটির জনগন এখন বন্দী। একান্ত কোনো জরুরি অবস্থা ছাড়া কেউ যেতে পারবে না ইতালির বাইরে। কারও জরুরি অবস্থা থাকলেও সেটা খতিয়ে দেখা হবে আদতে কতটুকু জরুরি? নইলে মিলবে না ইতালির বাইরে পা দেওয়ার সুযোগ।

বেশি না, মাত্র সপ্তাহ তিনেক আগে উত্তর ইতালির কিছু শহরে পাওয়া যায় করোনা আক্রান্তের সন্ধান। বিপদ মোকাবিলা করতে মুহূর্তেই বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশটির উত্তরাঞ্চলের কিছু বড় বড় শহর। বন্ধ করে দেওয়া শহরগুলোকে বলা হতো রেড জোন।

মিলান, ইতালির বেশ ব্যয়বহুল এবং অভিজাত শহর, যা গোটা বিশ্বে পরিচিত ফ্যাশন সিটি হিসেবে। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় মিলানেও। ফলাফল মিলানও রেড জোনের কবলেই পড়ে।

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ফ্যাশন উইক চলাকালীন এমন সংবাদ সত্যিই মিলানের জন্য অভিশাপ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় ব্র্যান্ডকে প্রচার করতে বড় ফ্যাশন ডিজাইনারদের মিলনমেলার মোক্ষম সময় এটা।
কিন্তু শারীরিক সুস্থতার থেকে বড় কিছুই নয়। তাই তো ফ্যাশন উইক অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ করতে হলো। বন্ধ করা হলো মিলান শহরের সবচেয়ে বড় চার্চ এবং পর্যটন এলাকাগুলো। একে একে বন্ধ হলো সব বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিং মল। অফিসগুলো যতটা সম্ভব বাসায় বসে কাজ করার সুযোগ প্রদান করছে। তবু কেউ যেন অপ্রয়োজনে বের না হয়।

মিলানের অধিবাসী হয়ে এ রকম বন্দিজীবন দেখছিলাম আর ভাবছিলাম শিগগিরই হয়তো পরিস্থিতি মোকাবিলা হবে। সেই আশার গুড়ে বালি দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে জানলাম নতুন খবর, সমগ্র ইতালি লকড ডাউন, যার অর্থ ইতালি থেকে না পারবে কেউ বেরোতে, না পারবে কেউ প্রবেশ করতে।

প্রথম দিকে মিলান অর্থাৎ উত্তর ইতালির সঙ্গে সব দেশের যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ ছিল, এখন পুরো ইতালির সঙ্গেই যোগাযোগ বন্ধ। মিলানের সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট মালপেনসা থেকে সব দূরবর্তী এয়ারলাইনস তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। আস্তে আস্তে সমগ্র ইতালির সঙ্গেই ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দেশটিতে অবস্থানরত সব দেশের কনস্যুলেট সেবা।

প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা হাজার পেরোচ্ছে। টিভি কিংবা নিউজে এখন আক্রান্তের সংখ্যা দেখতে ভয় করে। মৃতের সংখ্যা নাই–বা মনে করলাম। সরকার থেকে কিছু নির্দেশ জারি করা হয়েছে, যেমন আপাতত এপ্রিল মাস পর্যন্ত কোনো বিয়ে কিংবা অনুষ্ঠানের জন্য চার্চ ব্যবহার করা যাবে না। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া যে যে যার যার রেসিডেন্স এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারবে না। যদি কাউকে অযথা ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়, তার জন্য ধার্য আছে নির্দিষ্ট একটা জরিমানা। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় কবে খুলবে, সঠিক কোনো তথ্য নেই। হাসপাতালগুলো অক্লান্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মানুষ আতঙ্কিত ও বিব্রত। স্বাভাবিকভাবেই স্কুল বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের সময় কাটছে না। অনেক রেস্তোরাঁ এবং ছোটখাটো দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে প্রচুর মানুষ।

ইউরোপে অবস্থান করে যারা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে কাজ করে, ব্যবসা করে, ঘুরে বেড়ায়, এমন বন্দী অবস্থা সত্যিই তাদের জন্য দুঃখজনক। একই সঙ্গে বিশাল একটা শঙ্কা, কবে মিলবে মুক্তি? আদৌ মিলবে কী? কবে এই ভয়ংকর পরিস্থিতির অবসান হবে?

তবু সবাই মেনে নিচ্ছি নিয়তি। তবু সবাই চাই করোনা–মুক্ত থাকুক অন্য দেশের মানুষগুলো। সুস্থ হয়ে উঠুক এ দেশের আক্রান্ত সব রোগী। নতুন করে আক্রান্ত না হোক আর একটি মানুষও।

হয়তো এক মাস, দুই মাস কিংবা আরও বেশি; পুরো বছর বন্দী থাকতে রাজি। তবু বিপদমুক্ত হতে চাই। কদিন আগে যখন চায়নায় করোনার শুরু হলো, আমরা সবাই আতঙ্কিত ও চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু আজ যখন নিজে যে দেশে বসবাস করি, সে দেশটিতে রেড অ্যালার্ট চলছে, তখন মনের ভেতরে কেমন অশান্তি চলে; সেটা হয়তো আপাতত ইতালিবাসী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না।

চলুন সবাই সবার জন্য প্রার্থনা করি। রেড কান্ট্রির প্রতিটি মানুষের পক্ষ থেকে এটি একটি ক্ষুদ্র আকুতি।