অসাধারন একটি সময়োপযোগী মূল্যবান বিশ্লষণ :

Author Topic: অসাধারন একটি সময়োপযোগী মূল্যবান বিশ্লষণ :  (Read 73 times)

Offline Md. Monir Hossain

  • Newbie
  • *
  • Posts: 20
  • Test
    • View Profile
অসাধারন একটি সময়োপযোগী মূল্যবান বিশ্লষণ

প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর পক্ষ থেকে পৃথিবীর সকল মুসলিমদের উদ্দেশ্য বলা কথা-
কোথার তুরস্ককে আমি কোথায় নিয়ে এসেছি, একবারও কি বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছেন??? যে দেশে মসজিদে আজান চালুর অপরাধে প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
যে দেশে ছোট্ট একটি ইসলামি কবিতা লেখার কারণে মেয়র কে জেলে দেয়া হয়। সেই দেশে কিন্তু আপনি জন্ম নেননি আমি জন্ম নিয়েছি। আপনি বড় হননি আমি বড় হয়েছি।
আমি দেখেছি ইসলামের উপর দমনপীড়ন হতে, আমি দেখেছি কাউকে নামাজ পড়ার আহ্বান জানালে সাজা ভোগ করতে। আপনি কিন্তু বাস্তবে কিছুই দেখেননি ! আমি আপনার মত শক্তিশালী নই। হয়তোবা আমি আপনার মত নিষ্পাপ নই, হয়তোবা আপনার একদিনের আমলের সোয়াবের কাছে আমার সারা জীবনের আমলের সোয়াব কিছু নয়। হয়তোবা আপনি কোরআনের পাশাপাশি পন্চাশ থেকে ষাট হাজার হাদিস তেলাওয়াত করেন প্রতিদিন।
আপনার আমলের শক্তি অনেক, আপনি আমলের শক্তির জোরে দোয়া করে ফেরেশতা নামাতে পারেন। আপনি চাইলেই কোটি কোটি ফেরেশতা দিয়ে ইসরাইলকে গুড়িয়ে দিতে পারেন। আপনার এতো ইমানি ক্ষমতা থাকতে, আপনি আমাকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে উস্কানি দেন কেন?আমি কি আপনার মত চুপ করে বসে আছি? সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কি আমাকে এমনি ভালোবাসে?
প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনার শরীর থেকে বেহেশতের সুগন্ধি বের হয় কিন্তু আমার শরীর থেকে এখনো সেকুলারের দুর্গন্ধ বের হয়।
হয়তোবা মাদ্রাসায় যাবার কারণে আপনার চাচা আপনাকে পুরস্কৃত করেছিল। আর আমার চাচা আমাকে বলেছিল, মাদ্রাসায় পড়ে কি হবে?এই দেশে কোন চাকরি পাবে না। বড় হয়ে কি মরা মানুষের গোসল করিয়ে সংসার চালাবে?
 অনেক কষ্ট করে কোরআনের হাফেজ হয়েছি। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু মহল আমাকে ভালো চোখে দেখত না। তারা ভাবতো আমি তুর্কির জাতির পিতা কামাল পাশা আতাতুর্কের সংবিধান বিরোধী। তারা ভাবতো আমি আতাতুর্কের সংবিধান বুকে ধারণ করি না, বুকে ধারণ করি ইসলাম প্রীতি।
তারা সেদিন ঠিকই ধারণা করেছিল কিন্তু আমি তাদের কাছে ধরা দিতাম না। তাদের কাছে ধরা দিলে আমার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তখন আপনি দোয়া করে হাজার হাজার ফেরেশতা নামিয়ে আমাকে বাঁচাতে পারতেন না।
প্রিয় দ্বীনি ভাই, আমি যখন মেয়র ছিলাম। ছোট্ট একটি ইসলামী কবিতা লেখার কারণে আমাকে জেলে দেওয়া হলো। আমার মেয়রের দায়িত্ব কেড়ে নেয়া হলো, তখন কোথায় ছিলেন আপনি? জেলের ওই অন্ধকার কারাগারে মশা গুলো কে ও মনে হচ্ছিল আতাতুর্কের সংবিধানের পাহারাদার।
প্রিয় দ্বীনি ভাই, আমি যখন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হলাম। তখন একটি অনুষ্ঠানে আমার_ছোট্ট_মেয়েটি কে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আতাতুর্কের সংবিধান আমার ছোট্ট মেয়েটি কে অনুষ্ঠানে ঢুকতে দেয়নি। আমার ছোট্ট মেয়েটির অপরাধ কি ছিল আপনারা কি জানেন??? আমার ছোট্ট_মেয়েটির_অপরাধ_হল_তার_মাথায়_হিজাব পড়া ছিল।
আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়েকে অনুষ্ঠানের ভিতরে নিতে পারেনি। এত কিছুর পরেও আমাকে বাধ্য হয়ে আতাতুর্কের সংবিধানের প্রতি অনুগত্য প্রকাশের অভিনয় করে যেতে হয়েছে। আমার কিছুই করার ছিল না, তখন আমি ছিলাম একা, শুধুই একা। আমাকে_নিজের_কাছে_সংখ্যালঘু_মনে_হতো।
আপনাকে আমি তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনি আসুন, দেখে যান,
আজ তুরস্কের প্রত্যেকটি মসজিদের মাইকে আজান হচ্ছে। মা বোনরা এখন আর প্রকাশ্যে বিকিনি ড্রেস পড়ে সমাজে ঘোরাঘুরি করে না। মা বোনরা এখন তাদের নতুন ইসলামী প্রজন্মের সামনে বিকিনি ড্রেস পরতে লজ্জা অনুভব করে।
এখন মাদ্রাসায়_আনন্দ_উৎসব_সহকারে_কোরআন_শিক্ষা হচ্ছে। এখন আর মাদ্রাসার ছাত্ররা নিজেকে কোরআনের হাফেজ দাবি করতে ভয় করে না।
এখন তুরস্কের আলেমরা নির্ভয়ে ইসলাম প্রচার করছে। এখানের হাফেজরা, আলেমরা তারা জানে তাদের একজন এরদোগান আছে,
কিন্তু আমার সময় কে ছিল?
 আপনি প্রশ্ন করেন তুরস্কে শরিয়া আইন নেই কেন? তুরস্ক ইজরাইলকে আক্রমণ করে না কেন? তুরস্কে অবস্থিত আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করি না কেন? তুরস্ক কেন ন্যাটোর সদস্য। অনেকে বলেন তুরস্কের যতটুকু ভূমি ইউরোপের ভিতরে পড়েছে, ততটুকু ভূমি ইউরোপের কাছে বিক্রি করে দিলে তো অটোমেটিক তুরস্ক ন্যাটো থেকে বাদ পরবে। মুসলিমদের খুনি ন্যাটো জোটে এরদোগানের থাকা মুনাফিকি ছাড়া আর কিছুই নয়।
অনেকে বলেন তুর্কিতে সমকামীতা লিগ্যাল কেন? এটা নাস্তিক আতাতুর্ক করে গেছে,  তার সংবিধানে। সময়ের সাথে এটাও তুলে ফেলব।   
প্রিয় দ্বীনি ভাই, আপনার প্রতিটি উস্কানির উত্তর আমি দিবো সময় আসতে দিন।
হয়তোবা আপনি ভুলে গেছেন যখন আমি বালক বয়সে বুকে কুরআন ধারণ করতাম, ইসলাম ধর্ম পালন করতাম। তখন গোটা সেকুলার সমাজ ও আতাতুর্কের সংবিধান আমাকে দমাতে পারেনি, আতঙ্কিত করতে পারেনি। আমার চাচা বলেছিল মাদ্রাসায় পড়ে হাফেজ হয়ে কি মরা মানুষের গোসল করিয়ে সংসার চালাবে??
 চাচা আপনি দেখে যান, মাদ্রাসায় পড়ে বড় হয়ে আমি কি করে সংসার চালাচ্ছি।
ওহে নাস্তিক আতাতুর্ক, সেদিন আমাকে দমাতে না পারার কারণে আজ তোমার সংবিধান হুমকির মুখে, সেদিন তোমার সংবিধান হিজাব পরার কারণে আমার মেয়েকে অনুষ্ঠানে ঢুকতে দেয়নি। আজ আমার লক্ষ মেয়ে হিজাব পড়ে অনুষ্ঠানে ঢুকে। সেদিনের আমি, আর আজকের আমি এক জিনিস নই। তোমার সংবিধান হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
 প্রিয় দ্বীনি ভাই, আজকে আপনারা যারা আমাকে উস্কানি দিয়ে হত্যা করতে চান, সারা পৃথিবীর অমুসলিমদের আমাকে একা ধ্বংস করতে বলেন। আপনাদের কথা না শুনলে আমাকে মোনাফেক বলেন। আপনারা এসব কেন বলেন? তাহা কিন্তু আমি বুঝি।
 আপনারা কি আমাকে মুরসির মতো আবেগী ভাবছেন??? আপনাদের মত কিছু ফেরেশতার উস্কানিতে মুরসি ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুংকার দিয়েছিল।
আর যারা এরদোগান কে ভালোবাসেন, তারা এরদোগানের সময় উপযোগী পদক্ষেপ এবং কৌশলের উপর আস্থা রাখুন। মনে রাখবেন, তুরস্কে কোন খনিজ_সম্পদ নেই, বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা করে এরদোগান টিকে আছে। তাও আবার মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং কোরআনের হাফেজ মুরসির বিরুদ্ধে যেসব দেশ সামরিক অভ্যুত্থান করেছে, সেই সব দেশগুলোর সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করেন না। এরদোগানের সব থেকে বড় সম্পদ হচ্ছে কৌশল। কৌশলের মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি করে আল্লাহর সৈনিক এরদোগান সারা বিশ্বের মজলুম মুসলিমদের সাহায্য করছেন।
অতএব এরদোগানের সমালোচনা নয়, শুধু দোয়া আর দোয়া চাই। সবাই মন থেকে বলি ইয়া আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতে তুমি তোমার সৈনিক এরদোগান কে সাফল্য এবং বরকত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দাও আমিন।
নয়া তুরস্কে ধর্ম–অধর্মের যুদ্ধ ও দুটি সাম্প্রতিক ঘটনা
এই তো গেলো রমজানের ঘটনা। তুরস্কের ইজমির প্রদেশের বেশ কিছু মসজিদ থেকে আজানের পরিবর্তে শোনা গেলো গানের শব্দ। হ্যা, সত্যি সত্যি গান বেজে উঠল মসজিদের মাইক থেকে। বিশ্বব্যাপী বামপন্থীদের অ্যান্থম হিসেবে পরিচিত ইতালির ‘বেলা চিও’ নামের একটি গান। মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ দৃশ্য রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেওয়া হলো অনলাইনে এবং সারা দেশে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, চরম ঘৃণ্য এ কাণ্ডের পেছনে যার হাত আছে সে তুরস্কের প্রধান বিরোধী সেক্যুলার দল জেহেপের একজন নারী প্রসিকিউটর। তার সাজেশেই একযোগে ইজমির প্রদেশের প্রায় দশ বারোটি মসজিদ থেকে মাইকে এসে গান ছেড়ে দেয় উগ্র বামপন্থী কিছু যুবক। এটা করে তারা তুরস্কের ইসলামপ্রিয় সমাজকে ও ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া ছিল কঠিন। তুরস্কের ধর্মপ্রাণ জনগণ এই ঘটনার যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তাতেই এর তীব্রতা ফুটে ওঠে। তারা এর জবাবে সবাই যার যার ঘর থেকে জানালার সামনে এসে কিংবা ছাদে ওঠে একযোগে আজান দিয়েছেন। হাজারো কণ্ঠে একসাথে বেজে ওঠেছে আজানের সুর! তুরস্কের বামপন্থী সেক্যুলারদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ‘ইজমির’ প্রদেশ যেন আজানময় হয়ে উঠেছিল সেদিন।
এর আগে রমজানের শুরুতে তুরস্কের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রধান মুফতী আলী এরবাশের একটি বক্তব্য নিয়ে তুমুল হৈচৈ কাণ্ড বাধায় সেক্যুলারদের একটি মহল।
প্রফেসর আলী এরবাশ রমজানের প্রথম জুমায় ইসলামে ব্যভিচার ও হোমোসেক্স হারাম— এ মর্মে বক্তব্য দিলে চটে যায় কট্টর ধর্মবিদ্বেষী ওই শ্রেণিটি। তারা এই বক্তব্যকে চরম অপমানকর আখ্যা দিয়ে আলী এরবাশের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। দাবী তোলে— ভুল স্বীকার করে পদত্যাগ করতে হবে। তাদের সমর্থন দিতে থাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মদদপুষ্ট বিভিন্ন সংগঠন, বামপন্থী রাজনীতিক ও উকিলরা। আস্কারা পেয়ে এক পর্যায়ে এই শ্রেণিটি যিনা–ব্যভিচার হারাম হওয়া সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াত মুছে ফেলার দাবিও তোলে প্রকাশ্যে।
এমন পরিস্থিতিতে এরদোয়ান বক্তব্য দেন যে, প্রফেসর আলী এরবাশ যা বলেছেন সেটাই ইসলামের বক্তব্য। সুতরাং আলী এরবাশের বিরোধিতার মানে হবে ইসলামের বিরোধিতা। আর ইসলামের বিরোধিতার মানে হবে রাষ্ট্রের বিরোধিতা। সুতরাং সবাই যেন সীমা বজায় রেখে চলে।
পরিবর্তনের হাতিয়ার : শিক্ষা ও সংস্কৃতি
সেক্যুলারিজম ও ধর্মহীনতার সাথে টেক্কা দিয়ে দীর্ঘ সতেরো বছরের শাসনে এরদোয়ানের আকপার্টি পাবলিক প্লেসে ইসলামকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবং সেই চেষ্টার কল্যাণে শুধু তুরস্কের ভিতরেই নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে একটা বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে এরদোয়ানের। এক্ষেত্রে সামাজিকভাবে পরিবর্তনের এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে মোক্ষম যে হাতিয়ারগুলো এরদোয়ান কৌশলে ব্যবহার করেছেন সেগুলো হলো শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষাই একটি জাতির ভবিষ্যত রোডম্যাপ। জাতির প্রজন্ম যে শিক্ষায় গড়ে ওঠে, সেই শিক্ষাকেই ধারণ করে পরিবার, সমাজ, প্রশাসন, রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রব্যবস্থা। এরদোয়ান বুদ্ধিমত্তার সাথে এ খাতটিকে কাজে লাগিয়েছেন। বিগত সতেরো বছরের শাসনে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক কাজ করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, যেখানে তুরস্কে ২০০২ সালে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪৫০, সেখানে ২০১৮ সালে এসে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫০০ তে। অন্যদিকে রয়টার্সের একটি রিপোর্ট বলছে, ২০১২ সালে ৪ হাজার ইমাম হাতিপ স্কুলের যে পরিমাণ শিক্ষার্থী ছিল, ২০১৮ সালে সে সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী। এসবের বাইরে সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতেও জোরদার করা হয়েছে ধর্মীয় শিক্ষা। এই তো কিছুদিন আগেও তুরস্কে একধরনের এলিট স্কুলের প্রচলন ছিল। যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করত আর্মি ও বিমানবাহিনী। ওখানে শুধু সামরিক বাহিনীর সন্তনরাই পড়তে পারত। আতাতুর্কের নীতি অনুসারে তাদেরকে এন্টি ইসলামিক ভাবধারায় গড়ে তোলা হত। এবং একসময় তারাই ভর্তি হত মিলিটারিতে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব স্কুলও এখন বন্ধ করা হয়েছে। ২০১৬ এর সেনা অভ্যুত্থানের কারণে এসব এলিট স্কুল আর নেই এখন।
ধার্মিক প্রজন্মের উত্থান
এসবের ফল হয়েছে এই যে, তুরস্কে মোটামুটি ধার্মিক প্রজন্ম গড়ে ওঠেছে। এখন যারা সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছে, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রজন্মের। এবং সন্দেহ নেই এই প্রজন্মের হাতেই পুরো তুরস্কের নেতৃত্ব চলে আসবে আগামি দশকগুলোতে। উগ্র সেক্যুলার কামাল আতাতুর্ক তার আঠারো বছরের শাসনে (১৯২২-১৯৩৮) তুরস্ককে যেমন একটি আপাদমস্তক সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছে, এরদোয়ান তার সতেরো বছরের শাসনে ঠিক তার উল্টো ইসলামঘনিষ্ঠ তুরস্ক গঠনের চেষ্টায় নিয়োজিত থেকেছে। এর ফলে সেনাবাহিনী থেকে সরকারি অফিসার, ডাক্তার থেকে ইঞ্জিনিয়ার, এবং কৃষক থেকে ব্যবসায়ী সর্বস্তরে মোটামুটি ধর্মীয় আবহে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। আর এসবের মূলে কাজ করেছে এরদোয়ানের ‘ধর্মভীরু প্রজন্ম’ গড়ার পরিকল্পনা।
ধর্মের সামাজিক প্রয়োগ
কিছুদিন আগে এরদোয়ান তার শৈশবের ইমাম হাতিপ স্কুল পরিদর্শনে যান। যে প্রতিষ্ঠান থেকে ধর্মীয় পড়াশোনার হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি নিজে বাচ্চাদেরকে কুরআন শরীফ পড়ান। তাদেরকে পড়াশোনায় উৎসাহিত করেন। খোঁজ খবর নেন। সেখানে এক কনফারেন্সে তিনি বলেন, ‘ইমাম হাতিপ সহ আমাদের সকল শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ হল, এই প্রজন্মকে জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে সাথে আপন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর গড়ে তোলা।’
তবে এসব প্রতিষ্ঠানেই সীমিত না থেকে বাস্তব জীবনে বাচ্চাদেরকে ধর্মীয় আবহে গড়ে তোলার উদ্যোগও গ্রহণ করেছে তুরস্কের সরকার। লাগাতার চল্লিশ দিন ফজরের নামাজ জামাতে পড়তে পারলে সাইকেল উপহার দিচ্ছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। মসজিদের পাশেই বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তৈরি করা হচ্ছে খেলার মাঠ। যেন খেলার মত মসজিদও প্রিয় হয়ে যায় বাচ্চাদের কাছে। এসব ছাড়াও পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে । শিক্ষাব্যবস্থার কোন ফাঁক ফোকরে যেন নাস্তিকতার বীজ না থাকে, নেওয়া হচ্ছে সেই ব্যবস্থাও। ২০১৭ সালে তুরস্কের শিক্ষা কারিকুলাম থেকে ডারউইনের বিবর্তন মতবাদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
শুধুই কি ধর্মশিক্ষা?
উপরের আলোচনা থেকে যদি একথা মনে হয় যে, তিনি শুধু ধর্মীয় শিক্ষাকেই প্রধান্য দিচ্ছেন, তাহলে ভুল হবে। বরং তিনি শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মের প্রতি শত্রুতা লালনকারী দৃষ্টিভঙ্গিকে ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীলতার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। এই যা, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। তা না হলে, শিল্প ও প্রযুক্তিতে এমন শক্তিশালী তুরস্ককে দেখতো না আজকের বিশ্ব। আজকের তুরস্ককে বিশ্ব দেখছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অনন্য মডেল রূপে। যে দেশ তার একজন মাত্র নাগরিককে করোনা থেকে উদ্ধার করতে পুরো একটি অ্যাম্বুলেন্স বিমান পাঠায় সুইডেনে, বাংলাদেশ ও মিশরে। আঙ্কারার বিমানবন্দরে যখন আমেরিকা ও বৃটেনের চিকিৎসা সাহায্যপ্রার্থী কার্গোবিমান অপেক্ষা করছে, তখন তুরস্কের জনগণ হ্যাশট্যাগ দিয়ে «Biz bize yeteriz Türkiyem» তথা ‘আমরাই আমাদের জন্য যথেষ্ট’ বলে সামাজিক প্রচার অভিযান শুরু করেছে। সাহায্য না পেয়ে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট যখন ‘ইউরোপীয় ঐক্যে’র ধারণাকে ‘রূপকথা’ বলে শোরগোল তুলেছেন, তখন তুরস্কের কাছে চিকিৎসা সহায়তা চেয়ে আবেদন জানিয়েছে পৃথিবীর ১০০ টিরও বেশি দেশ। রোম আর মাদ্রিদ যখন করোনার আগুনে পুড়ছে তখন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল নির্মিত হচ্ছে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে।
এ তো গেলো স্বাস্থ্যখাত। নতুন তুরস্ক প্রযুক্তিতেও টেক্কা দিয়ে চলছে ইউরোপ ও রাশিয়াকে। সিরিয়ার ইদলিবকে স্বৈরাচারী আসাদ বাহিনির হামলা থেকে রক্ষার্থে তুর্কি ড্রোন যখন তার শৌর্য দেখাচ্ছে, তখন মস্কো থেকে এসেছে যুদ্ধবিরতি দিয়ে আলোচনায় বসার আহবান। লিবিয়ার যুদ্ধবাজ জেনারেল হাফতারের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকিয়েছে ‘বায়রাকদার’ নামের ড্রোন, তখন পঞ্চম প্রজন্মের ‘আকিঞ্জি’ নামের নতুন বিশেষ ড্রোনের ডকুমেন্টস উন্মোচন হয়েছে আনকারায়। তেলসম্পদে ভরপুর একনায়ক আরবদেশগুলো যখন প্রযুক্তির জন্য বেইজিংয়ের কাছে ধর্না দিচ্ছে, তখন শতভাগ তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক বিদ্যুৎচালিত কার ‘টগে’র কয়েক হাজার অর্ডার এসেছে ইউরোপ থেকে। এ সবই প্রমাণ করে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, আধুনিক ও প্রযুক্তিগত বহুমুখি শিক্ষায়ও এরদোয়ান কী পরিমাণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
পুনশ্চ :
তুরস্ককে নিয়ে এসব আলোচনার কারণ, মুসলিম জাহানের ক্রমশ যে অধঃপতন, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আশাবাদের একটা জায়গা তৈরি করতে পেরেছে তুরস্ক। এজন্য আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তালেবানের বিজয়ে যেভাবে আমরা উচ্ছ্বসিত হই, সেভাবে আমেরিকা ইসরায়েলের এজেন্ট আরব স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ‘পলিটিক্যাল ইসলামের ’ (পলিটিক্যাল ইসলাম’ পরিভাষাটি পশ্চিমারা ব্যবহার করে) যে জাগরণ তুরস্ককে কেন্দ্র করে, তাতেও আমরা উদ্বুদ্ধ হই। খোরাসানি সেনারা যেমন বর্তমান সময়ে উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ পার্ট তেমনি তুর্কিরাও। এজন্য তাদের সকলের সফলতা ও কর্মকৌশলের পেছনের ইতিহাস আলোচনায় আসা দরকার বলে মনে করি। আরো দরকার মনে করি, বিভক্তি না বাড়িয়ে ঐক্যের সূত্রগুলো খুঁজে বের করে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করার।

—Rumaisa Eva এর পোস্ট হিমালয় থেকে হিমু