দায়ীদের শাস্তি না হওয়া নৌ-দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ (যুগান্তর, ৬ এপ্রিল ২০২১)

Author Topic: দায়ীদের শাস্তি না হওয়া নৌ-দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ (যুগান্তর, ৬ এপ্রিল ২০২১)  (Read 159 times)

Offline kekbabu

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 76
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
দায়ীদের শাস্তি না হওয়া নৌ-দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ৬ এপ্রিল ২০২১

লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির ঘটনা এ দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় প্রতিবছরই লঞ্চডুবিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সে সময় দেখা যায় স্বজনহারানো ব্যক্তিদের আর্তনাদ। এ নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। গণমাধ্যমগুলোয় ফলাও করে খবরাখবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথারীতি গঠিত হয় তদন্ত কমিটি।


চিরায়িত প্রথা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন, ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যস, হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই দেশে ঘটে যায় আরেকটি নৌ-দুর্ঘটনা। তখন চাপা পড়ে যায় লঞ্চডুবি বা নৌ-দুর্ঘটনার আগের ঘটনাগুলো।

যখন অন্য একটি ঘটনার রেশে লঞ্চডুবি বা নৌ-দুর্ঘটনার ঘটনা চাপা পড়ে যায়, তখন আর কেউ জানতে পারে না ওই লঞ্চডুবির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। কিংবা লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আদৌ আলোর মুখ দেখেছে কি না। এই হচ্ছে বাস্তবতা।

দেশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে লঞ্চডুবির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত নৌ-দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না-করা, লঞ্চ চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করার ‘সুযোগ’সহ ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করাই যে লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির অন্যতম প্রধান কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই প্রায় প্রতিবছরই ঘটে চলেছে লঞ্চডুবির ঘটনা।

এ বছরও দেশবাসী লঞ্চডুবির ঘটনা প্রত্যক্ষ করল গত ৪ এপ্রিল। ওইদিন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে রাফিত আল হাসান নামে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এস কে ৩ কোস্টার জাহাজের ধাক্কায়। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৫ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনার প্রায় ঠিক এক বছর আগে (৩০ জুন ২০২০) ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামক একটি লঞ্চকে ময়ূর-২ নামের অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি নদীতে ডুবে যায়। এতে প্রাণ হারান কমপক্ষে ৩২ জন।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে: ‘What is lotted cannot be blotted.’ এর অর্থ হলো, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নৌ-পথগুলোয় প্রায় প্রতিবছরই ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি জনগণের কপালের লিখন? যদি তা-ই হয়, তাহলে তা খণ্ডনীয় নয়। আবার এসব দুর্ঘটনাকে যদি এদেশের পরিপ্রেক্ষিতে না-দেখে উন্নত দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে উন্নত দেশে নৌ-দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম; যা আমি জার্মানি, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে থাকাকালীন ব্যক্তিগতভাবে খোঁজখবর নিয়েও দেখেছি।

তাহলে কপালের লিখন কি দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয় না। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে, সার্বিক নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, লঞ্চের ফিটনেস, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লঞ্চ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, সঠিকভাবে নৌ-আইন না-মানা ইত্যাদি।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে ৬৬০টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ। আহত হয়েছেন অসংখ্য। দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ হয়েছেন আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। ২০১৫-পরবর্তী সময়গুলোতেও দেশে থেমে থাকেনি লঞ্চডুবির ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ প্রাণ হারানো ছাড়াও নিখোঁজ হয়েছেন অনেকে, যাদের লাশ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক পরিবার। আবার লঞ্চডুবিতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হয়েছে শত শত পরিবার।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশিরভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে চলছে কয়েকগুণ নৌযান। তা ছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌ-পুলিশ থাকা প্রয়োজন তা নেই। এসব নৌ-পুলিশকে বিআইডবিউটিএ-র কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও সেসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান।

লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটি নিয়ে চনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব কমিটি দুর্ঘটনা রোধে একগুচ্ছ সুপারিশ করে। এরপর রহস্যজনক কারণে বিষয়টি আর সামনের দিকে সেভাবে এগোয় না। দেশের কোথাও যখন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আর তেমন কিছু হয় না। ফলে এসব দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তিও পায় না। অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আটক হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকরে বা রাজনৈতিক প্রভাবে কিংবা কালো টাকার জোরে অথবা প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে পার পেয়ে যায়।

এসব কারণে নৌ-দুর্ঘটনা কমে না। বরং বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিল। স্বজনহারানোদের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি খুব একটা হয় না, এটা দুঃখজনক। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না। বিদ্যমান আইনে লঞ্চ মালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তা ছাড়া এ আইনের ফাঁকফোকরও অনেক বেশি। ফলে আইনটির পরিবর্তন বা সংশোধন করা সময়ের দাবি।

দেশের নৌপথগুলোয় লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা রোধে গণমাধ্যমে নিয়মিত সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদীবন্দর টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধ করা, লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কি না-এসব মনিটর করা জরুরি। কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ওই লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্তসংখ্যক সরঞ্জামাদি না-থাকলে সেই লঞ্চের যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা দায়ের করা আবশ্যক।

আর নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষাপূর্বক ফিটনেস সংবলিত নৌযানগুলোয় দক্ষ, সৎ ও দায়িত্ববান চালক নিযুক্ত করা অতি জরুরি। সেইসঙ্গে নৌযানে কর্মরত মাস্টার, ড্রাইভার, সুকানি ও আনসারদের জন্য নদীবন্দরগুলোয় নিয়মিত নৌ-নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মশালার আয়োজন করাও প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন নৌপথে নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে পর্যাপ্তসংখ্যক আধুনিক নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা দরকার।

পাশাপাশি নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক সৎ, মেধাবী ও দক্ষ নৌ-পুলিশ নিয়োগ দেওয়া। এসবের পাশাপাশি ঈদসহ বিভিন্ন ছুটি ও উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহন পরিহারের লক্ষ্যে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিসের সুব্যবস্থা করা আবশ্যক।

কোথাও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার অভিযানের লক্ষ্যে প্রয়োজন আধুনিক জাহাজ, স্পিডবোট, হেলিকপ্টার ও সিপেন। এসব ছাড়া দেশের এই বিশাল নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে সঠিক নকশা অনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে কি না, লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে কি না-এসবও নিয়মিতভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে তদারক করা আবশ্যক। সর্বোপরি, যাত্রীদেরও সতর্ক হতে হবে, তারা যেন কখনোই অতিরিক্ত যাত্রী হিসাবে লঞ্চে না-ওঠেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে-আশা করা যায়।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/409017/%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A7%8C%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A7%9C-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3?fbclid=IwAR1vqhiCL0F8ZAotbdCr96p9ccqBe0u8hj9VS-zJ-tL8iyCSj-HoSwHZmJ0
Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd