গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা রোধের দায়িত্ব কার? যুগান্তর, (২৯ জুন ২০২১, পৃষ্ঠা ৫)

Author Topic: গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা রোধের দায়িত্ব কার? যুগান্তর, (২৯ জুন ২০২১, পৃষ্ঠা ৫)  (Read 110 times)

Offline kekbabu

  • Jr. Member
  • **
  • Posts: 76
  • Test
    • View Profile
    • https://daffodilvarsity.edu.bd/
গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা রোধের দায়িত্ব কার?
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভির পর্দায় চোখ রাখলে প্রায়ই দেখা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের খবরাখবর। গত রোববার রাজধানীর মগবাজারে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিস্ফোরণও গ্যাসজনিত। এ বিস্ফোরণে আশপাশের সাতটি ভবন ও তিনটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত সাতজন, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এ দেশে গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার এবং জনগণের অসচেতনতার কারণে এ ধরনের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে চলেছে। আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে থাকেন, যা এলপিজি বা এলপি গ্যাস নামে পরিচিত। এটি মূলত দাহ্য হাইড্রোকার্বন গ্যাসের মিশ্রণ এবং জ্বালানি হিসাবে রন্ধন কার্যে, গাড়িতে ও ভবনের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়। ১৯১০ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১৯১২ সালে এ গ্যাস বাণিজ্যিকরূপে উৎপাদন শুরু হয়।

এলপিজি প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো নয়; বরং বাতাসের চেয়ে ভর বেশি হওয়ায় এটি নিচু স্থান ও বেজমেন্টে জমে থাকতে পারে। এর বিপদ হলো, বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার পর আগুনের সংস্পর্শে জ্বলে উঠে এবং অক্সিজেনের স্থান দখল করে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসরোধ করতে পারে। অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য বিশ্বের অনেক দেশে রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করা হয় এবং জ্বালানির উৎস হিসাবে কোনো কোনো দেশে এটি চাহিদার প্রথমে থাকে।

বাংলাদেশেও, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এর ব্যবহার বেশ উল্লেখযোগ্য। বলা বাহুল্য, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ার কারণে সিলিন্ডারে বাজারজাত এলপি গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্নার প্রচলন দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। শহরাঞ্চলের বাসাবাড়ি, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় রান্নার কাজে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

বর্তমান যুগে গ্রামাঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অনেক পরিবারই এখন কাঠ-লতা-পাতানির্ভর জ্বালানির চুলা ব্যবহারের পরিবর্তে গ্যাসের চুলায় রান্না করছেন। কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাসের চুলা ব্যবহারে যে ঝুঁকি আছে এবং সেই ঝুঁকি এড়ানোর জন্য যে ধরনের সচেতনতার প্রয়োজন, তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে দেশের জনগণের মাঝে। ফলে আমাদের দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রায়ই মানুষ মারা যাচ্ছে, গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারাচ্ছে। যারা গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, তাদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে অনেক সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা রোধে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কিছু নিয়মকানুন আছে, যা ব্যবহারকারীদের অবশ্যই মেনে চলা উচিত।

সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে দেশে গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৭৮টি, যা ২০১৭ সালের তুলনায় অন্তত ১০০ বেশি। ২০১৬ সালে দেশে গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৩১টি। আর ২০১৫ সালে ৮০টি গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কারিগরি ত্রুটি, অসচেতনতা ও অসতর্কতার ফলেই দেশে এ ধরনের গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটছে এবং তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে; যা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বা নেয় বলে মনে হয় না। দেশে গ্যাস দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের খবর পেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে ছুটে যান। তবে কথায় আছে, ‘Prevention is better than cure’ অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত জনস্বার্থে একটি রিট করেছিলেন। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুলও জারি করেন। প্রাকৃতিক গ্যাস বিতরণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে বিবাদীদের ব্যর্থতাকে কেন ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’ বলা হবে না এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল ওই রুলে। জ্বালানি বিভাগ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে একটি পরিপত্র জারি করেছে। ওই পরিপত্রে তিনটি ধাপে সতর্কতা অবলম্বনের উপায় বলে দেওয়া হয়েছে।

সেগুলো হলো- ১. সিলিন্ডার রাখার জন্য নিরাপদ জায়গা নির্ধারণ করা; ২. রান্না শুরুর আগে ও শেষ হওয়ার পরে গৃহীত সতর্কতা এবং সিলিন্ডার রাখার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং ৩. রেগুলেটরসহ সিলিন্ডারের খুঁটিনাটি সব পরীক্ষা করে রান্নাঘরে যথাযথভাবে বাতাস আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। এর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে নিশ্চয়ই আরও বড় উদ্যোগ নেওয়া হবে। যেমন : সিলিন্ডার ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা; সব সিলিন্ডার ব্যবসায়ীকে এ ধরনের আদেশ দেওয়া যে, সিলিন্ডার বিক্রির আগে তারা অবশ্যই ক্রেতাকে এমএসডিএস (ম্যাটেরিয়াল সেফটি ডেটা শিট) দেখাতে হবে এবং সিলিন্ডারের সঙ্গে তা ব্যবহারের নিয়মকানুন ও প্রয়োজনীয় সতর্কতাসংবলিত লিফলেট বিতরণ করতে হবে ইত্যাদি।

বলা হয়ে থাকে, সাবধানতার মার কম। সুতরাং, গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ রোধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেমন যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, ঠিক তেমনই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদেরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও যথাযথ নিয়মকানুন মেনে চলা উচিত; যেমন: নতুন সিলিন্ডার নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করার আগে অবশ্যই কিছু বিষয় ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।

চুলার পাশে আগুনের উৎস থেকে কমপক্ষে ২-৩ মিটার দূরত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় সিলিন্ডার স্থাপন করা প্রয়োজন। সিলিন্ডারের মুখে কাগজে মোড়ানো সিল আছে কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত। সিল থাকার অর্থ হচ্ছে, ভেতরে গ্যাস যথাযথভাবে পরিপূর্ণ আছে। এরপর সিল সরিয়ে প্রেসার রেগুলেটরের ওপর সংযোগ ক্লিপ লাগাতে হবে। সুইচ অন করে দেখতে হবে, ক্লিপের সঙ্গে রেগুলেটর ঠিকঠাকভাবে লেগেছে কি না। এসব কাজ দক্ষ বা পারদর্শী কাউকে দিয়ে দিয়ে করিয়ে নেওয়া উত্তম।

পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, রান্নার জায়গাটি যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাসযুক্ত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে; রান্নাঘরের জানালা যেন খোলা থাকে। এছাড়া মানসম্মত রাবার টিউব অথবা হোস পাইপ ব্যবহার করা, রাবার টিউব অথবা হোস পাইপে সাবানের ফেনা লাগিয়ে লিকেজ চেক করা, দুই বছর পরপর নতুন রাবার টিউব লাগানো উচিত। এলপিজি সিলিন্ডার যদি অব্যবহৃত থাকে অথবা গ্যাসহীন অবস্থায় থাকে, তাহলে রেগুলেটরের নব বন্ধ করে রাখা প্রয়োজন।

প্রয়োজনবোধে সিলিন্ডার ভর্তি থাকার সময় সেফটি ক্যাপ ব্যবহার করা, রান্না শেষে চুলা ও রেগুলেটর উভয়ের সুইচ বন্ধ করে রাখা, টিউবে লিকেজ হয়েছে কিনা, তা নিয়মিত চেক করা এবং এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তা দ্রুত পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এসবের পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার অবশ্যই শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। কারণ, এক্ষেত্রে একটু অসতর্ক হলেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। গ্যাস সিলিন্ডার ক্রয়ের আগে অবশ্যই তা অনুমোদিত ডিলার বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা প্রয়োজন।

গ্যাস ব্যবহারকারীর সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত- গ্যাস সিলিন্ডার সর্বদা সোজা বা খাড়া করে রাখতে হবে, বাঁকা বা শুইয়ে রাখা যাবে না। টিউব, রেগুলেটর কিংবা অন্য কোনো অংশ লিকেজ হয়েছে কিনা, তা চেক করতে ম্যাচের কাঠি বা লাইটার অথবা আগুন জ্বালানো যাবে না। সিলিন্ডার ও চুলার সংযোগ পাইপের সঙ্গে কোনো কিছু প্যাঁচানো যাবে না। একটি সিলিন্ডার থেকে একাধিক সংযোগ দেওয়া যাবে না। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা থেকে সর্বদা বিরত থাকতে হবে।

এছাড়া গরম টিউব ব্যবহার না করা এবং টিউব গরম হলে তা দ্রুত পরিবর্তন করা; সিলিন্ডারের আশপাশে মোবাইল ফোন, ক্যামেরা ও অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করার পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত আগুনের সূত্রপাত হলে তা নিভিয়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে হাতের কাছে সর্বদা দুই-এক বালতি পানি রাখা শ্রেয়। পরিস্থিতি বিবেচনাসাপেক্ষে দ্রুত বাসার বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অথবা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া প্রয়োজন। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা উপরোক্ত সতর্কতা ও নিয়মকানুন সঠিকভাবে মেনে চললে দেশে গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ভিজিটিং প্রফেসর, লাইসিয়াম অব দ্য ফিলিপিন্স ইউনিভার্সিটি, ফিলিপাইন
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/436961/%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0
Dr. Kudrat-E-Khuda (Babu).
Associate Professor (Dept. of Law), Daffodil International University;
International Member of Amnesty International;
Climate Activist of Greenpeace International; Column Writer;
Mobile Phone: +8801716472306
E-mail: kekbabu.law@diu.edu.bd