ইন্টারনেটকে বলির পাঁঠা বানানো যাবে না

Author Topic: ইন্টারনেটকে বলির পাঁঠা বানানো যাবে না  (Read 247 times)

Offline Mst. Eshita Khatun

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 149
    • View Profile
আমরা এমন এক বিস্ময়–জাগানিয়া জমানায় বাস করছি, যখন বিশ্বের অর্ধেকের বেশি অংশে একটি প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে। সেই প্রযুক্তির নাম ইন্টারনেট। এটি এমন এক প্রযুক্তি, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় প্রতিটি খাতে এখন নিয়ামক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে; যা মহাদুর্যোগ থেকে মহামারির সময় মানুষের প্রাণ সঞ্জীবনী হিসেবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর এমনভাবে এর ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি মানুষের জন্য তা অবারিত থাকবে কিন্তু কেউ তার মালিক হতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর আমরা ইন্টারনেটের উপযোগিতা সম্পর্কে আন্দাজ করতে পেরেছি। শারীরিকভাবে একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা করা ছাড়াই দূর থেকে এই সময়টাতে আমরা আমাদের হাজারো দাপ্তরিক কাজ সেরে ফেলতে পেরেছি। খুব দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমরা এমন এক জমানাতেও বাস করি যেখানে ভয়, আতঙ্ক ও সন্দেহের ধোঁয়া আমাদের সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ইতিপূর্বে সংঘটিত যেকোনো যুদ্ধ বা মহামারির চেয়েও নিকৃষ্ট জিনিস হলো ইন্টারনেট—এমন দাবির সন্ধান পেতে আপনাকে গুগলে আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে হবে না। সাধারণ অনুসন্ধানেই এ ধরনের দাবির কথা খুব সহজেই পাওয়া যাবে। সন্ত্রাসবাদ, শিশু পীড়ন এবং এমনকি গণতন্ত্রের অপব্যবহারসহ বহু সমস্যার বলির পাঁঠা হয়ে থাকে ইন্টারনেট।

আসুন একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখি। যদি আমরা ফেক নিউজ বা ভুয়া খবরকে ইন্টারনেটের ত্রুটি বলে বিশ্বাস করি, তাহলে তা বিংশ শতকের রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা যন্ত্রের ক্রমাগত মিথ্যা প্রচারের কথা ভুলে যাওয়ারই নামান্তর হবে। অনেকে সামাজিক মূল্যবোধর অবনমনের জন্য ইন্টারনেটকে দায়ী করে থাকেন। ভাবটা এমন যেন টুইটার আসার আগে মিথ্যুক রাজনীতিকেরা মিথ্যা ও ঘৃণা ছড়ানো কথা বলতেন না। সমাজ ও ব্যক্তির ওপর নিয়ত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। আমরা ক্ষিপ্রগতিতে বিবর্তিত হচ্ছে এমন একটি সমাজবাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই বিবর্তনে প্রশ্নাতীতভাবে ইন্টারনেটের উত্থান একটি বড় ভূমিকা রাখছে। কারণ, ইন্টারনেট দ্রুত নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যদি আমরা ফেক নিউজ বা ভুয়া খবরকে ইন্টারনেটের ত্রুটি বলে বিশ্বাস করি, তাহলে তা বিংশ শতকের রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা যন্ত্রের ক্রমাগত মিথ্যা প্রচারের কথা ভুলে যাওয়ারই নামান্তর হবে। অনেকে সামাজিক মূল্যবোধর অবনমনের জন্য ইন্টারনেটকে দায়ী করে থাকেন। ভাবটা এমন যেন টুইটার আসার আগে মিথ্যুক রাজনীতিকেরা মিথ্যা ও ঘৃণা ছড়ানো কথা বলতেন না।
এই সব সুযোগকে ভালো এবং মন্দ—উভয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষ এই প্রযুক্তির কারণে এখন আগের চেয়ে অনেক সহজে এবং অনেক কম খরচে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। আবার প্রতারক চক্র এই ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে অসাধু উপায়ে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেয়। প্রথাগত কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকেরা ইন্টারনেটের কারণে তঁাদের এত দিনকার তথ্য
নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। কারণ, জনসাধারণ ইন্টারনেটের সুযোগে নানা ধরনের বিকল্প পথে তথ্য পেয়ে যাচ্ছে।

তবে এমন অনেক ক্ষতির বিষয় আছে, যার জন্য ইন্টারনেটকে দায়ী করা হলেও আদতে তার জন্য ইন্টারনেট মোটেও দায়ী নয়। ইন্টারনেটকে দোষারোপ করার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের দিক থেকে ইন্টারনেটের ওপর দোষ চাপানো হয়। কিন্তু কোনো কিছু বন্ধ করা বা নিয়ন্ত্রণ করার আগে আমাদের ভালো করে বুঝে নিতে হবে, আমরা ঠিক যন্ত্রটি বন্ধ করছি কি না। আজকের দিনের বৃহৎ প্রযুক্তি করপোরেশনগুলোর সমস্যা এবং বাণিজ্য ও জনপরিসরের আলোচনায় তাদের প্রভাবের বিষয় চিন্তা করে দেখুন। যখন এসব কোম্পানি কোনো নির্দিষ্ট বাজার দখল করে ফেলে বা কোনো নির্দিষ্ট মাত্রার মুনাফা অর্জন করে, তখন কেউ কেউ সেসব কোম্পানির ওপর বিশেষ বিধি আরোপ করা উচিত বলে মত দেন। কিন্তু করপোরেট পুঁজির একচ্ছত্র বিস্তৃতি যে শুধু এখনই হচ্ছে তা নয়।

উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য অনেক দেশের পেট্রোলিয়াম শিল্পে স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল প্রাধান্য বিস্তার করার পর অনেক দেশ এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির আধিপত্যকে আতঙ্কের চোখে দেখা শুরু করেছিল। তখন তারা বলেছিল, স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল ‘তেল নীতি’ চর্চা করে না, তারা ‘অবিশ্বস্ততার নীতি’ চর্চা করে। অনেকে ইন্টারনেটনির্ভর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই এই উদ্বেগ প্রকাশ ভুল। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং চীন প্রত্যেকেই ইন্টারনেট-পূর্ব জমানায় সহিংস আন্দোলনের মুখে পড়েছে। ইন্টারনেট আসার আগে থেকেই এক দেশ অন্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে, বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দাবৃত্তি করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক আচরণ আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে গণতন্ত্র নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের বৈধতা ও কার্যকর থাকার ক্ষমতার ওপর। কোনো সরকারের ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ হলে সেই ক্ষোভ দমন করে বা দেশের তথ্য বিদেশের মানুষকে জানতে না দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এটি সত্য যে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন ইন্টারনেট প্রযুক্তির কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে তথ্য আদান–প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যে আইডি থেকে কোনো তথ্য ছড়াচ্ছে, সেই আইডির মালিক যে সত্যিই আইডিতে উল্লেখিত পরিচয়ের আসল ব্যক্তি, তা নিশ্চিত হওয়া অনেক সময়সাপেক্ষ।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ইন্টারনেটের বৃহৎ জগতের কাছে এগুলো খুবই সংকীর্ণ ইস্যু। আদতে ইন্টারনেট হলো একটি বাস্তুসংস্থান (ইকোসিস্টেম) ব্যবস্থা, যার সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। ইন্টারনেটকে কোনোভাবেই বলির পাঁঠা বানানো যাবে না। অর্থাৎ, এই প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ, এটি আমাদের সবার সম্পদ। এটিকে ঠিকমতো সুরক্ষা দেওয়ার মানে হলো আমাদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষা দেওয়া।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
Mst. Eshita Khatun
Lecturer
Dept. of Computer Science & Engineering
Daffodil International University
102, Sukrabad, Mirpur Rd, Dhanmondi, Dhaka 1207, Bangladesh
eshita.cse@diu.edu.bd