শিশু সুরক্ষায় ইসলামের শিক্ষা

Author Topic: শিশু সুরক্ষায় ইসলামের শিক্ষা  (Read 158 times)

Offline ashraful.diss

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 104
  • 'শীঘ্রই রব তোমাকে এত দিবেন যে তুমি খুশি হয়ে যাবে'
    • View Profile
শিশু সুরক্ষায় ইসলামের শিক্ষা

ইসলাম হচ্ছে ন্যায় ও শান্তির ধর্ম। ইসলাম সব মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। ইসলামে রয়েছে ক্ষমা, ধৈর্য, সহনশীলতা, সহযোগিতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা ও মহান আদর্শ। আজ সারা বিশ্বে বিচিত্র সামাজিক সমস্যা যেমন: শিশু ও নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, শিশু ও নারী পাচার, অ্যাসিড নিক্ষেপ, অনৈতিক ও শ্রমসাধ্য কাজে শিশুদের ব্যবহার করে অধিক মুনাফা এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন বেড়ে চলেছে। মিথ্যাচার, অহংকার, পরনিন্দা, লোভ, হিংসা, যৌন অনাচার ইত্যাদি মহামারি রূপ ধারণ করেছে।

মোমিন বা বিশ্বাসী তথা ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ কখনোই এহেন অনৈতিক কাজ যেমন: শিশুদের সঙ্গে সহিংস আচরণ, তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পাচার, হত্যা, গুম এবং শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে না। শিশু ও নারীদের যৌন নির্যাতন ও তাদের সঙ্গে ব্যভিচার করা জঘন্য অপরাধ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘চরিত্রের বিচারে যে লোকটি উত্তম, মোমিনদের মধ্যে সে–ই পূর্ণ ইমানের অধিকারী।’ (তিরমিজি)।

তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই লোকটিই আমার কাছে বেশি প্রিয়, যার নৈতিক চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।’ (বুখারি)।

আল্লাহ–নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কারও জীবন রক্ষা করা শরিয়া নির্দেশিত একটি পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুদের এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যা তার ক্ষতির কারণ হয়। এতে শিশুদের শিক্ষার অধিকার দেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য জ্ঞানার্জন বাধ্যতামূলক এবং শিক্ষার সুব্যবস্থা করার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।

হজরত বেলাল (রা.) ক্রীতদাস ছিলেন, কিন্তু তিনি ইসলামে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আজকের দিনে দাসপ্রথা নেই, তবে দরিদ্র পরিবারের সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত যেসব শিশু গৃহকাজে নিয়োজিত, তাদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে দাসের মতোই আচরণ করতে দেখা যায়। ইসলামে এতিম, শিশু, নারী, বৃদ্ধ, বিপদগ্রস্ত, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ প্রত্যেকের অধিকার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। জুলুম, নিপীড়ন, অত্যাচার, অনাচার, ভয়ভীতি সঞ্চার, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ফিতনা-ফ্যাসাদ কোরআনের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ফিতনা হত্যার চেয়েও জঘন্য।’ (বাকারা: ১৯১)।

শিশুদের সঙ্গে সহিংস আচরণ, তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, পাচার, হত্যা, গুম ইত্যাদি করা সম্পূর্ণ ইসলামি শিক্ষার বিপরীত, অনৈতিক ও হারাম। জীবন হলো আল্লাহর দান, তাই কারও জীবনকে যেকোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তাই বাবা-মায়ের প্রতি আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন বৈধ দাম্পত্য জীবনযাপনের। কারণ, পিতৃমাতৃহীন সন্তান সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন, অভিভাবকহীন, আশ্রয়হীন ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। মানবশিশু অসহায় ও দুর্বল বলে তাদের নিরাপত্তাদান প্রাথমিকভাবে পিতা-মাতার দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অভাবের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কোরো না। তাদের জীবিকা আমি দিই এবং তোমাদেরও আমিই জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা ভয়ানক অপরাধ।’ (ইসরা: ৩১)।

গৃহকর্মীদের অধিকার ও সম্মান

সমাজের দরিদ্র পরিবারের শিশু বা এতিম শিশুরাই প্রধানত গৃহকাজের সঙ্গে যুক্ত। কাজে সামান্য ত্রুটির জন্য তারা কতভাবেই না শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং তাদের উপযুক্ত মজুরিও তারা পায় না। তাদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ দিয়ে দাও আর ভালো সম্পদের সঙ্গে খারাপ সম্পদ বদল কোরো না। তোমাদের সম্পদের সঙ্গে এতিমদের সম্পদ মিলিয়ে তাদের সম্পদ আত্মসাৎ কোরো না। নিশ্চয় এমন করা অত্যন্ত বড় রকমের অপরাধ।’ (নিসা, ২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তারা (কাজের মানুষ) তোমার ভাই! তাই যখন সে তোমার জন্য খাবার প্রস্তুত করে তখন তাকে তোমার সঙ্গে বসাও, যদি সে অস্বীকার করে তবু তাকে খাবার দাও। আর তাদের মুখে মারবে না।’ (কাফি, সিলসিলাতুস, আলবানি)।

নারী ও কন্যাশিশুর বিশেষ গুরুত্ব

আমাদের সমাজে মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হয়। ঘরে, স্কুলে, কলেজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিস-আদালতে কোথাও তাদের নিরাপত্তা নেই। নারীদের ইভ টিজিং, যৌন নির্যাতন, অ্যাসিড নিক্ষেপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্নভাবে তারা মর্যাদাহানির শিকার হচ্ছে। অথচ ইসলামে নারী বা মেয়েদের অনেক উচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে জীবন যাপন করবে।’ (নিসা: ১৯)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি)।

যে ব্যক্তির কন্যাসন্তান আছে আর সে তাকে জীবন্ত কবর দেয় না, তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না, ছেলেসন্তানকে কন্যাসন্তানের ওপর প্রাধান্য দেয় না, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু দাউদ)।

তাই নারী বা মেয়েশিশুদের প্রতি উত্তম ব্যবহার করা প্রতিটি মোমিনের ইমানি দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য।

শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়

শিশুদের প্রতিপালন, শিক্ষা, সংশোধন ও গঠন বিষয়ে নির্দেশনাও ইসলামে রয়েছে। শিশুর প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার। এরপর মক্তব বা পাঠশালা। শিশুর সুশিক্ষার জন্য পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা প্রধান। তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে তা হলো শিশুর মাথায় আঘাত করা যাবে না। মুখমণ্ডল বা চেহারায় চপেটাঘাত করা যাবে না। কান টানা বা কান মলা ও নাক মলা যাবে না। চামড়া মোচড়ানো ও গাল টানা যাবে না।। শিশুদের প্রহারের জন্য কোনো দড়ি, ছড়ি, লাঠি, কাঠি, বেত, স্কেল ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না। ডাস্টার, চক, মার্কার পেন ইত্যাদি ছুড়ে মারা যাবে না। রাগের বশীভূত হয়ে শাস্তি প্রদান করা যাবে না।

শিশুদের সঙ্গে যেসব আচরণ করা যাবে না

শিশুদের জন্ম নিয়ে অশোভন কথা বলা যাবে না। শিশুদের বাবা-মাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা যাবে না। শিশুদের জন্মস্থান বা এলাকা নিয়ে অসম্মানজনক কথা বলা যাবে না। শিশুদের বংশ, জাত, বর্ণ, পদবি নিয়ে উপহাস করা যাবে না। শিশুদের শারীরিক গঠন, আকার-আকৃতি ও গায়ের রং নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা যাবে না। শিশুদের বিশেষ কোনো স্বভাব বা মুদ্রাদোষ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা যাবে না। শিশুর জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো অযাচিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় উল্লেখ করে তাকে লজ্জা দেওয়া যাবে না। শিশুদের মেধা নিয়ে কটু মন্তব্য করা যাবে না। কোনো শিশুকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। শিশুদের পশু বা প্রাণীর নামে অভিহিত করা যাবে না। শিশুদের জন্য এমন বাক্য বা এমন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণত কোনো প্রাণী বা পশুর জন্য ব্যবহৃত হয়। শিশুর সঙ্গে খেলার ছলে তাকে বিরক্ত বা বিব্রত করা যাবে না।

ইসলামের শিক্ষা তথা আল্লাহ তায়ালার ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেওয়া বিধিবিধান মেনে চললে সমাজে শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধ হবে।
Mufti. Mohammad Ashraful Islam
Ethics Education Teacher, DISS
Khatib, Central Mosque, Daffodil Smart City
Ashuli , Savar, Dhaka