দেখে এলাম দেবতাখুম-নিগার সুলতানা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Author Topic: দেখে এলাম দেবতাখুম-নিগার সুলতানা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি  (Read 37 times)

Offline Niger

  • Newbie
  • *
  • Posts: 16
  • Travel Story
    • View Profile
দেখে এলাম দেবতাখুম
নিগার সুলতানা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল  ইউনিভার্সিটি



গেল ২ ডিসেম্বরের বিকেলটা ছিল একটু ভিন্ন। একটু অন্যরকম। ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা। হঠাৎ মনে পড়ল আমরা তো আজ রাত এগারোটার নাইটকোচে বান্দরবানের টিকিট কেটেছি! উদ্দেশ্য দেবতাখুম ঘুরে আসা। অথচ সব ভুলে অফিসে নাক গুজে বসে আছি। ধুর! কোনো মানে হয়? হাতের কাজটা দ্রুত শেষ করেই তাড়াহুডড়ো করে অফিসের গাড়িতে উঠে পড়লাম। বাসায় গিয়ে কিছু জামা কাপড় আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে রওনা দিলাম শহীদ মিনারের দিকে। ওখান থেকেই তো বাসটা ছাড়বে।
নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই শহীদ মিনারের সামনে পৌঁছলাম। তারপর রাত এগারোটার নাইটকোচে আমরা ঢাকা থেকে রওনা দিলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। ভোর ছয়টায় পৌঁছে গেলাম বান্দরবান শহরে। এত সুন্দর! এত আলোঝলমলে! কি পবিত্র একটা সকাল! ফুরফুরে মন নিয়ে আমরা চাঁন্দের গাড়িতে করে রোয়াংছড়ি উপজেলার দিকে রওনা দিলাম। চাঁন্দের গাড়ির বদলে সিএনজিও নেওয়া যেত, তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে চাঁন্দের গাড়িটাই বেশি ভালো লেগেছে।
বান্দরবান শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে রোয়াংছড়ি। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে  সংঘর্ষ লেগেই থাকে। এজন্য সমস্ত এলাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন। মোড়ে মোড়ে সেনা টহল। নিরাপত্তার খাতিরে স্থানীয় থানা থেকে একটি নির্ধারিত ফরম ফিলাপ করে দেবতাখুম যাওয়ার জন্য ন্যাশনাল আইডি কার্ডের দুই কপি ফটোকপি ও  সাথে পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিতে হয়। দিলাম। কি আর করা! এরপর আমরা কচ্ছপতলির উদ্দেশে রওনা দিলাম। আশেপাশের উঁচু-নিচু পাহাড় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন কচ্ছপতলি পৌঁছে গেছি টেরই পাইনি। এরপর লিরাগাও আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হয়।
দেবতাখুম ট্রেকিংয়ের পূর্বে এই আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। আমরা যে গাইডের অধীনে এসেছিলাম তিনি আমাদেরকে এসব ব্যাপারে প্রাণপনে সাহায্য করলেন। কচ্ছপতলি থেকে দেবতাখুমের ট্রেইলটি শুরু হয়েছে এখান থেকে। এখন আমরা যাচ্ছি শীলবান্ধা পাড়ার দিকে। শিলবান্ধা পাড়াতে যাওয়ার জন্য দুইটা ট্রেইল আছে। একটি হচ্ছে পাহাড়ের ট্রেইল আর একটি হচ্ছে ঝিরি ট্রেইল। আমরা যাচ্ছি ঝিরি ট্রেইল দিয়ে। ঝিরি পথ দিয়ে শিলবান্ধা পাড়া যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা আর পাহাড়ি ট্রেইল দিয়ে গেলে শিলবান্ধা ঝর্ণা নামের একটি ঝর্ণা দেখতে পাওয়া যেত। বর্ষাকালে ঝিরিপথ দিয়ে যাওয়াটা নিরাপদ না। যারা ঢাকা থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে বান্দরবানের ট্র্যাকিংয়ের রুদ্ধশ্বাস অনুভূতি নিতে চান তাদের জন্য দেবতাখুম খুবই উৎকৃষ্ট একটি জায়গা ।
আমরা চলে এসেছি শিলবান্ধা পাড়া। এখানে ঝিরিতে অনেকগুলো শিল্ ছিল। সেজন্য এর নামকরণ করা হয় শিলবান্ধা পাড়া। এ পাড়াতে সব মিলিয়ে কুড়ি থেকে তিরিশটি পরিবার থাকে এবং দুই থেকে তিনটি দোকান ও একটি হোটেল আছে। দেবতাখুম ট্র্যাকিং শেষে এখানে এসে মধ্যাহ্নভোজ সারা যাবে। সেজন্য আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখতে হবে। শিলবান্ধা পাড়া থেকে আমরা লাইফ জ্যাকেট এবং ভেলার বন্দোবস্ত করলাম। এরপর এখান থেকে ছোট্ট একটি নৌকাতে করে দেবতাখুমের মেইন পয়েন্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। এখান থেকে খুমের রাজ্যে প্রবেশ করার পর মনে হলো এ এক অসাধারণ অনুভূতি। ঠিক যেন কোনো এক অপূর্ব সৌন্দর্যভরা নগরী আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।  সে ডাকে সাড়া না দিয়ে কোনো উপায় নেই। প্রকৃতি তার রূপের ডালা সাজিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে । এই খুমের গভীরতা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ফুট।
ভেলায় ভাসতে ভাসতে চোখে পড়ল পাথরের উপর হিন্দু ধর্মালম্বীদের পূজার কিছু জিনিসপত্র। কি সুন্দর প্রত্যেকটা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আমরা একসাথে প্রকৃতির সাথে মিশে যাই। প্রায় বিশ মিনিট পর দেবতাখুমের মূল জায়গায় এসে পৌছালাম। দেবতাখুম আসার মূল সময় হলো ডিসেম্বর জানুয়ারি। এ সময় বৃষ্টিপাত হয় না তাই উপর থেকে কোনো পানি পড়ে না । প্রায় এক ঘন্টা খুমের পানিতে গা এলিয়ে অপলক দৃষ্টিতে স্নিগ্ধ প্রকৃতির রূপ দুচোখ ভরে গ্রহণ করলাম। ঠিক এই মুহূর্তটা যদি জীবনে আর কখনো না আসে তাই প্রতিটি পরতে পরতে থাকা সৌন্দর্য অবলোকন করে মনকে প্রশান্ত করলাম।
অনেক বেলা হয়ে গেল। এবার যে ফিরতে হবে! কিছুতেই ফিরতে ইচ্ছা করছিল না। এতক্ষণ ভেলা বয়ে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই হালকা কিছু খেয়ে নিলাম। তারপর আবারও ট্রেকিং শুরু। টানা এক ঘন্টা ট্রেকিং করে শিলবান্ধা পাড়া হয়ে পৌঁছে গেলাম কচ্ছপতলি।
খুব ভালো লাগার একটা মুহূর্ত বলতে ভুলে গেছি। সকালে যখন বান্দরবানে বাসটি থামল, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, টাটকা খেজুরের রস নিয়ে বসে আছে একজন। রস খাওয়ার এই সুযোগটা কি হাতছাড়া করা যায়? দ্রুত বাস থেকেই নেমেই দৌড়। হিম শীতল রসে চুমুক দিয়েই মনে হলো, যেন অমৃত!
পার্বত্য জেলাগুলোর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অপূর্ব নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য। এইসব সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।