কোরআন-হাদিসে আলেমদের সম্মান ও মর্যাদা

Author Topic: কোরআন-হাদিসে আলেমদের সম্মান ও মর্যাদা  (Read 318 times)

Offline ashraful.diss

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 119
  • 'শীঘ্রই রব তোমাকে এত দিবেন যে তুমি খুশি হয়ে যাবে'
    • View Profile

কোরআন-হাদিসে আলেমদের সম্মান ও মর্যাদা


নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকার : আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের সম্মানিত করেছেন ওহির জ্ঞান ও জীবন-বিধান দিয়ে। সেই ওহির জ্ঞান ও বিধি-বিধান মানবজাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি প্রেরণ করেছেন যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল। তাঁরা ছিলেন জগৎবাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় করুণা ও রহমতস্বরূপ। আল্লাহর রহমতের সেই নবুয়তি ধারা আদম (আ.) থেকে শুরু হয়ে সমাপ্ত হয়েছে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনি শেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী এই দুনিয়াতে আগমন করবেন না।

আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্যদাতা : যুগে যুগে যাঁরা এই নবীদের জ্ঞান ধারণ করে আসছেন তাঁরাই যুগের হক্কানি উলামায়ে কেরাম। যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজ আমাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছেছে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্রের সুবিন্যস্ত বিশাল বিশাল গ্রন্থাবলি। আল্লাহ তাআলা তাঁদের বানিয়েছেন নিজ একত্ববাদের অন্যতম সাক্ষী। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা : আলে ইমরান : ১৮)

আলেমদের আনুগত্য : তাঁরা আম্বিয়ায়ে কেরাম থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাঁদের কাছেই মানুষ লাভ করে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান। চিনতে নিজের প্রভুকে, শিখতে পারে আল্লাহর বিধি-বিধান। বুঝতে পারে শরিয়তকে। মানতে পারে হালাল-হারামকে। তাঁদের মাধ্যমেই মানুষ খুঁজে পায় নিজের আসল পরিচয়। যাঁদের সংস্পর্শে এসে অন্ধকার জগতের মানুষগুলো সন্ধান পায় আলোকিত জীবনের। মৃত হৃদয়গুলো হয় পুনর্জীবিত। তাঁরা পৃথিবীর জন্য রহমত। তাঁরা উম্মতের জন্য বরকত। পরম হিতৈষী ও মঙ্গলকামী। আল-কোরআনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গেই তাঁদের আনুগত্যেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, অনুসরণ করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বসম্পন্ন (ন্যায়পরায়ণ শাসক ও আলেম) তাদের।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা : আলেমদের কাছে ইসলাম সবার আগে। তাঁরা দ্বিনের অতন্দ্র প্রহরী। দ্বিন রক্ষার ঢাল ও সুদৃঢ় প্রাচীর। ইসলামের বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়ষন্ত্রের মোকাবেলায় তাঁরা সর্বদা সচেষ্ট। তাঁরা নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করে সব ধরনের বাতিল মতবাদকে রুখে দেওয়ার জন্য সর্বদা অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়ে যান। তাঁরা হক কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। হক প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জান-মাল ব্যয় করাটা গৌরব মনে করেন। বাতিলের মুখোশ উন্মোচন করতে কালক্ষেপণ করেন না। তাঁদের হাতেই জিন্দা হয় সুন্নত। দূরীভূত হয় বিদআত। যেকোনো শরয়ি সমস্যা নিরসনে তাঁদের দ্বারস্থ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব আলেম-জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।’ (সুরা : নাহল : ৪৩)

হাদিসের আলোকে আলেমদের মর্যাদা : উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওই ব্যক্তি আমার আদর্শের ওপর নাই, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের আলেমদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২১৪৩, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৩৮৪)

আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৃদ্ধ মুসলমান, কোরআনের আদব রক্ষাকারী ও কোরআন অনুযায়ী আমলকারী হাফেজ এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর সম্মান করা মহান আল্লাহর সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৫৩)

আলেমরা আল্লাহর ওলি বা বন্ধু। তাঁদের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করা আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার শামিল। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করবে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

আলেমদের অপমান ও সমালোচনার পরিণতি : ইমাম হাফেজ আবুল কাসেম ইবনে আসাকির (রহ.) বলেন, হে ভাই জেনে রাখো, উলামায়ে কেরামের দোষ চর্চা করা বিষাক্ত জিনিস। আল্লাহ তাআলার অভ্যাস হলো উলামায়ে কেরামের কুৎসা রটনাকারীকে তিনি লজ্জিত করেন (এটা কারো অজানা নয়)। যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের সমালোচনা করবে আল্লাহ তার মৃত্যুর আগে তার অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেবেন। (আত-তিবয়ান ফি আদাবে হামালাতিল কোরআন : ২৭-২৯)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) (৮৫২ হি.) বর্ণনা করেছেন, ইয়েমেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস কাজি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ জাবিদি আশ-শাফেঈ (৭১০-৭৯২ হিজরি) যিনি ২৪ খণ্ড বিশিষ্ট ফিকহে শাফেঈর ‘আত-তাফকিহ ফি শরহিত তানবিহ’ নামক বিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থের রচয়িতা। মৃত্যুর সময় তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এমন কি তাঁর জিহ্বা কালো হয়ে থুতনি পর্যন্ত বেরিয়ে যায়। উপস্থিত সবাই ধারণা করে তিনি জীবদ্দশায় ইমাম মুহিউদ্দীন নববী (রহ.)-এর অধিক সমালোচনা ও অপমান করার কারণে আজ তাঁর এ দুরাবস্থা বরণ করতে হলো। (আদ্দুরারুল কামেনা : ৪/১০৬)

উলামা কেরামের প্রতি অবজ্ঞা করা এবং তাঁদের সঙ্গে উপহাস ও তাঁদের শানে বেআদবি করার প্রথম ফল হলো অন্তর মরে যাওয়া এবং এর সর্বশেষ পরিণাম অনেক ভয়াবহ। কেননা অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা প্রমাণিত যে যারা কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের বিধি-বিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে তাদের বেশির ভাগের সূচনা হয়েছে কোরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক উলামায়ে কেরামের সমালোচনা করা এবং অবজ্ঞা দিয়ে। কেননা কোরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহকদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও অবজ্ঞা করতে করতে তাদের অন্তর থেকে মূল কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের প্রতি প্রকৃত মূল্যবোধ দূর হয়ে যায়। এভাবেই তারা ধীরে ধীরে সিরাতে মুস্তাকিম ও আবার কেউ একেবারে ইসলাম থেকেই সটকে পড়ে।

আলেমদেরকে গালি দেওয়ার শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি : যেকোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষী মনোভাব, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা নাজায়েজ ও ফাসেকি কাজ। সুতরাং উম্মতের শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায় উলামায়ে কেরামকে গালি দেওয়া, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা আরো জঘন্যতম কাজ তা বলাই বাহুল্য। আলেমের সঙ্গে দুশমনি ও গালি দেওয়ার কারণ দুটি হতে পারে। যথা—১. ব্যক্তিগত কোনো কারণে। ২. আলেম হওয়ার কারণে। কোনো আলেমকে আলেম হওয়ার কারণে গালি দেওয়া, তাঁর সঙ্গে শত্রুতা বা বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা একটি কুফরি কাজ। এটি খুবই ভয়াবহ মানসিকতা। এমন মানসিকতা লালনকারী ব্যক্তি তাওবা না করলে ঈমানের সঙ্গে তার মৃত্যু হবে কি না ঘোর সন্দেহ আছে।

আল্লামা জাইনুদ্দিন ইবনে নুজাইম মিসরি (রহ.) (৯৭০ হি.) বলেন, যদি কেউ কোনো আলেম বা ফকিহকে ব্যক্তিগত কোনো কারণ ছাড়া (আলেম হওয়ার কারণে) গালি দেয়, তাহলে সে কাফির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ (আল-বাহরুর রায়েক : ৫/১৩২)

উলামায়ে কেরাম হলেন আম্বিয়া কেরামের ওয়ারিশ ও তাঁদের প্রতিনিধি। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মনোনীত করেছেন দ্বীনের জন্য। তাই আলেমদের সঙ্গে বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা, তাঁদের গালি দেওয়া পরোক্ষভাবে ইসলামের নিদর্শন অসম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।

যারা আলেমদের সম্মান নষ্ট করে ও কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের হেদায়েত দিয়ে দ্বীনের রাস্তায় কবুল করুন। আল্লাহুম্মা আমিন!
Mufti. Mohammad Ashraful Islam
Ethics Education Teacher, DISS
Khatib, Central Mosque, Daffodil Smart City
Ashuli , Savar, Dhaka