যে কোম্পানিতে চার দিনে সপ্তাহ, তবু উৎপাদনে ৪০% প্রবৃদ্ধি

Author Topic: যে কোম্পানিতে চার দিনে সপ্তাহ, তবু উৎপাদনে ৪০% প্রবৃদ্ধি  (Read 425 times)

Offline Md. Abul Bashar

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 165
  • Test
    • View Profile
যে কোম্পানিতে চার দিনে সপ্তাহ, তবু উৎপাদনে ৪০% প্রবৃদ্ধি

সাধারণত মালিকেরা কর্মীদের বেশি সময় কাজ করিয়ে পয়সা উশুল করে নেন। তবে আজকাল এমন মালিকও অনেক আছেন, যাঁরা মনে করেন, কর্মীদের প্রতি সদয় হয়ে একটু ছাড় দিলে বছর শেষে মোট কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। তেমনটাই করে দেখিয়েছেন ফরাসি প্রযুক্তি কোম্পানি এলডিএলসির প্রতিষ্ঠাতা লরাঁ ভিলেমন্তে দে লা ক্লার্জারি

ফরাসি কোম্পানি লরাঁ দে লা ক্লার্জারির (এলডিএলসি) বস যখন তাঁর কর্মীদের আগের মতো একই বেতনে সপ্তাহে চার দিন কাজ করতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন অনেকেই তাঁকে পাগলই ভেবেছিলেন। কিন্তু এক বছর পর দেখা গেল, তিনি বাজিমাত করে বসে আছেন। তাঁর কনজ্যুমার টেকনোলজি তথা ভোক্তাপ্রযুক্তি বিক্রির প্রতিষ্ঠান এলডিএলসির বার্ষিক লেনদেন ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে তিনি কোম্পানিতে অতিরিক্ত কোনো কর্মীও নিয়োগ করেননি।

এমন সাফল্য বেশ উচ্ছ্বসিত এলডিএলসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লরাঁ ভিলেমন্তে দে লা ক্লার্জারি। তিনি বলেন, ‘তখন আমার মনে হয়েছিল, অভিনব এই সিদ্ধান্ত কাজ করবে। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আমি কেবল কোম্পানির ভালো ফলই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম।’ তিনি বলেন, যেহেতু পৃথিবী একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট থেকে বেরিয়ে আসছিল, সেহেতু অনেকের মনেই কর্মজীবনে ভারসাম্যের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছিল। বিশ্বজুড়েই কোম্পানির মালিক থেকে শুরু করে শ্রমিক-কর্মচারী নির্বিশেষে সবার মনেই এমন আশঙ্কা দানা বেঁধে উঠছিল, তাঁরা কি কম কাজ করতে পারবেন? অফিসের কর্মদিবস কমানোর আগে দে লা ক্লার্জারিও সেই হিসাব-নিকাশ করে দেখেছেন বলে জানান।

এলডিএলসিতে কর্মিসংখ্যাও নেহাত কম নয়। বর্তমানে কোম্পানিটিতে আনুমানিক এক হাজার লোক কাজ করছেন। দে লা ক্লার্জারি জানান, তিনি হিসাব-নিকাশ করে দেখেছেন যে কর্মদিবসের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিও যদি আসে, তাতে বছরে কোম্পানির ব্যয় সর্বোচ্চ ১৬ লাখ মার্কিন ডলার বাড়তে পারে। এই অর্থ বাংলাদেশের ১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার মতো (প্রতি ডলার ৯১ টাকা ধরে)।

সম্ভাব্য বাড়তি খরচকে দে লা ক্লার্জারি পরিচালনযোগ্য, অর্থাৎ মেনে নেওয়ার মতো ঝুঁকি বলে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে আমি সিসাকে সোনায় পরিণত করতে পেরেছি। আমি মনে করি না যে ব্যাপারটা সে রকম। বরং আমি বিশ্বাস করি, আপনি যখন কর্মক্ষেত্রে সুস্থতা বজায় রাখায় জোর দেন এবং আপনি আপনার দলের যত্ন নেন, তখন জোরের সঙ্গেই ভাবতে পারেন যে আপনি প্রকারান্তরে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন। বুঝতে হবে, উৎপাদনশীলতার সমীকরণটা শুধু কয়েক ঘণ্টা কাজ করার মধ্য দিয়ে মেলানো যায় না।’

দে লা ক্লার্জারি জানান, তিনি ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রমে কর্মীদের অনুপস্থিতি ও অসুস্থতার হার ব্যাপক হারে কমে গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, কর্মদিবস বা কর্মঘণ্টা কমানোর পর কিন্তু এলডিএলসির কর্মিসংখ্যা বাড়াতে হয়নি। অর্থাৎ একজন নতুন কর্মীও নেওয়া হয়নি। তারপরও ফরাসি কোম্পানিটি ব্যাপক ব্যবসায়িক সফলতা পেয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এলডিএলসির বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ৫৫ কোটি ডলার থেকে ২২ কোটি ডলার বেড়ে একলাফে প্রায় ৭৭ কোটি ডলারে উঠে গেছে।

এলডিএলসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লরাঁ ভিলেমন্তে দে লা ক্লার্জারি বলেন, ‘মতাদর্শগতভাবে আমরা পুঁজিবাদী কিংবা সমাজতান্ত্রিক হতে পারি। তাতে কিন্তু একজন আরেকজনকে বাতিল করে দিতে পারি না। আমি যখন দেখলাম, আমার সিদ্ধান্তটি আজ কাজে এসেছে, অর্থাৎ ফল দিয়েছে, তখন আমি আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি। যদি আপনি সমাজতান্ত্রিক হন, তবে এই ধরনের কাজ আপনাকে পুঁজিবাদী হতে বাধা দেয় না। বিপরীতভাবে বলা যায়, আপনি যদি পুঁজিবাদী হন, তাহলে নতুন কাজের ধরন আপনাকে সমাজতান্ত্রিক হতেও বাধা দেবে না। মোদ্দাকথা, এটি আপনাকে আরও ভালো পারফর্ম করা মানে অধিকতর নৈপুণ্য দেখানোর সুযোগ করে দেবে, যা আমাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে।’

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লিওঁ শহরের এক পাশে, অর্থাৎ শহরতলিতে অবস্থিত এলডিএলসির প্রধান কার্যালয়ের কাছের একটি স্টোরের কর্মি জোহান পিটার্স বলেন, ‘অতিরিক্ত সাপ্তাহিক ছুটি যেন ঈশ্বরই আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনের জন্য, নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য এবং সর্বোপরি, সন্তানদের যত্ন নেওয়ার জন্য আমার আরও বেশি সময়ের প্রয়োজন। আগে আমি কেবল প্রতি রোববার আমার মেয়েকে দেখতে পেতাম। এটি খুব কম সময় ছিল।’

শুধু এলডিএলসিই ফ্রান্সে এ ধরনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। বরং বিশ্বের সবচেয়ে কর্মবান্ধব কাজের অনুশীলন রয়েছে, এমন আরও অনেক কোম্পানি আছে সেই দেশে। আইনগতভাবে এসব কোম্পানির কর্মীদের প্রতি সপ্তাহে ৩৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয় না। তবে ওই সব কোম্পানির চেয়ে দে লা ক্লার্জারির কর্মপরিবেশে আরও বেশি ছাড় রয়েছে।

আজকাল বিশ্বের অনেক কোম্পানিই এ ধরনের সুবিধা আরও দেয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট ২০১৯ সাল থেকে তার জাপানভিত্তিক কর্মীদের শুক্রবার বাড়তি ছুটি দিচ্ছে। এর ফল হিসেবে সেখানে তাদের উৎপাদনশীলতা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানায় বৈশ্বিক কোম্পানিটি।

কনজ্যুমার গ্রুপ ইউনিলিভার নিউজিল্যান্ডে স্থানীয় কর্মীদের জন্য চার দিনের সাপ্তাহিক ট্রায়াল চালু করেছে। অর্থাৎ পরীক্ষামূলকভাবে সেই দেশে ইউনিলিভারের কর্মীরা সপ্তাহে চার দিন কাজ করছেন। আবার স্প্যানিশ টেলিকম কোম্পানি টেলিফোনিকা তাদের গার্হস্থ্য কর্মশক্তির ১০ শতাংশের জন্য পরীক্ষামূলভাবে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। ইউনিলিভারের উদ্যোগ সফল হলে নিউজিল্যান্ডে তাদের কর্মীদের কর্মদিবসের সংখ্যা যে কমবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একই কথা প্রযোজ্য হবে টেলিফোনিকার বেলায়ও। রয়টার্স, ইয়াহু!নিউজ।