মাদক প্রতিরোধে ইসলাম

Author Topic: মাদক প্রতিরোধে ইসলাম  (Read 237 times)

Offline ishaquemijee

  • Sr. Member
  • ****
  • Posts: 301
    • View Profile
মাদক প্রতিরোধে ইসলাম
« on: July 16, 2022, 09:23:25 AM »


মাদকাসক্তি আধুনিক সভ্যতার ভয়ংকরতম ব্যাধিগুলোর অন্যতম। বলারও অপেক্ষা রাখে না, মাদক পরিবার-পরিজন ও জ্ঞাতি-বংশকে এমন বিপদ-বিপর্যয়ের মাঝে ফেলে দেয়, যা থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।


অন্ধকার যুগে আরবরা ছিল মদ পানের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত। তারা তাদের এ আসক্তি কথাসাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নানাভাবে ফুটিয়ে তুলত। মদের গুণাগুণে রচিত কবিতাগুলো তাদের মজলিসে ছন্দের ঝংকার তুলত। বিভিন্ন আসরে আসরে বর্ণিত হতো এর রকমারি চমক ও চানোক্য। এমনকি মদের শ’খানেক নামও দিয়েছিল তারা।

ইসলাম এসে ক্রমান্বয়ে তাদের ওপর মদকে হারাম করে দিল। তাদের প্রথম ধাপে মদে মত্ত অবস্থায় নামাজ পড়া থেকে নিষেধ করা হলো। এরপর তাদের বলে দেওয়া হলো, মদের মধ্যে যেসব উপকারিতা রয়েছে, তার তুলনায় এর গোনাহ ও অপরাধের দিকটিই অধিক মারাত্মক। এরপর আল্লাহতায়ালা সূরা মায়িদার নিুোক্ত ব্যাপক তাৎপর্যবহ ও অকাট্য আয়াতটি নাজিল করলেন-‘হে ইমানদারগণ! নিশ্চয়ই খামরুন (মদ ও মাদক), মাইসিরুন (জুয়া), আনসাব্ (বলিদানের স্থান) এবং আজলাম (ভাগ্য গণনার শর)-শয়তানের অপবিত্র সব কাজ। বিধায় তোমরা তা পরিহার করে চলো। আশা করা যায়, তোমরা সফলতা লাভ করতে পারবে। নিশ্চই শয়তান চায়, মদ ও জুয়ার আবর্তে ফেলে সে তোমাদের পরস্পরের মাঝে দুশমনি ও জিঘাংসা সৃষ্টি করে দেবে এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। সুতরাং, (এখন এসব থেকে) তোমরা বিরত হবে কি? [সূরা মায়েদাহ- ৯০, ৯১]।

আল্লাহতায়ালা এ আয়াত দুটিতে মদ ও জুয়াকে একেবারে চূড়ান্ত ও কঠোর ভাষায় হারাম করে দিয়েছেন এবং একে বলিদানের স্থান এবং ভাগ্য গণনার শরের সঙ্গে উল্লেখ করে এ কাজ দুটিকে অপবিত্র ও পঙ্কিলতাপূর্ণ হিসাবে গণ্য করে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, রিযসুন কথাটি যখন কুরআনে ব্যবহৃত, তখন সেটা শুধু অশ্লীল, জঘন্য, বীভৎস ও পঙ্কিল জাতীয় কিছু বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তদুপরি এ কাজ দুটিকে আবার শয়তানের কাজ বলে অভিহিত করেছেন; আর শয়তানের কাজই হলো অশ্লীল ও অসৎ কাজ করা। এখানে মদ্য পান ও জুয়াকে পরিহার করে চলার আহ্বান জানান হয়েছে; সঙ্গে এই পরিহারকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের পানে ধাবিত হওয়ার পথ। আরও বলা হয়েছে, এ দুকাজের বিভিন্ন সামাজিক ক্ষতির কথা। বলা হয়েছে, এসব কাজ নামাজ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, সৃষ্টি করে একে-অপরের মাঝে দুশমনি ও জিঘাংসা। মাদক এবং জুয়ার আরও অন্যতম ক্ষতি এই যে, তা নামাজ এবং আল্লাহর স্মরণের মতো দ্বীনের বিভিন্ন অপবিহার্য বিষয়-যা আত্মার রুহানি খোরাক-তা থেকে মানুষকে দূরে রাখে।

নবি করিম (সা.) যখন প্রথম মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেন, তখন তিনি এদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেননি যে, কোন্ কোন্ জিনিস থেকে মদ তৈরি করা হয়, বরং তার মূল দৃষ্টি ছিল-মদ মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া ঘটায় সে দিকে; আর সেটা হলো উন্মাদনা, নেশা ও মাদকতা। কাজেই যে জিনিসের মধ্যেই এ মাদকতা, নেশা ও মাতালতার শক্তি বিদ্যমান থাকবে, সেটিই খামরুন/মাদক/মদ হিসাবে বিবেচিত হবে-চাই মানুষ সেটাকে যে নাম বা উপনামে ডাকুক না কেন। চাই তা যে জিনিস থেকেই প্রস্তুত করা হোক না কেন। নবি করিম (সা.)-এর কাছে ‘মধু’ থেকে প্রস্তুতকৃত, কিংবা ‘ভুট্টা’ ও ‘যব’ ভিজিয়ে পরে তা ঘন করে যে মদ প্রস্তুত করা হয়-সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, বলেছিলেন ‘প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই খামরুন (মাদক/মদ)। আর প্রত্যেক খমরুনই হারাম। [সহিহ মুসলিম-৩/১৫৮৮]।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে হজরত ওমর (রা.) লোকজনের সামনে এ ঘোষণা দিয়েছিলেন-‘খামরুন (মদ/মাদক) হলো তা, যা মস্তিষ্কে মাদকতা আনয়ন করে’। [সহিহ বুখারি-৪৩৪৩]। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-‘যে জিনিসের অধিক পরিমাণ মাতালতা/নেশা/মাদকতা সৃষ্টি করে, তার সামান্য পরিমাণও হারাম’। [সুনানে আবু দাউদ-৪/৮৭]।

মদ/মাদক চাই কম হোক বা বেশি। নবি করিম (সা.) সেটাকে শুধু হারাম করে দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং মাদক ব্যবসাকেও তিনি হারাম করে দিয়েছেন-চাই সেই ব্যবসাটি অমুসলিমদের সঙ্গেই করা হোক না কেন। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্যই এ কাজ জায়েজ নয়, সে মাদক আমদানি-রপ্তানির কাজ করবে, অথবা মাদক বিক্রির দোকান দিয়ে বসবে, কিংবা কোনো মদের দোকানে চাকরি করবে। এ পর্যায়ে নবি করিম (সা.) মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির ব্যক্তির ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। তারা হলো-‘যে (মাদক তৈরির জন্য দ্রব্য নিংড়িয়ে/প্রক্রিয়াজাত করে) তা উৎপাদন করে, যে তা উৎপাদন করিয়ে নেয়, (অর্থাৎ যে মাদক উৎপাদন করতে বলে), যে তা সেবন করে, যে তা বহন করে, যার কাছে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যে তা পরিবেশন করে, যে তা বিক্রি করে, যে তার মূল্য খায়, যে তা ক্রয় করে, এবং যার জন্য তা ক্রয় করা হয়’। [সুনানে তিরমিজি-১/২৪৩]।

সূরা মায়িদার পূর্বোল্লিখিত আয়াতটি যখন নাজিল হয়, তখন নবি করিম (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ খামরুন (মদ/মাদক) হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং, যে ব্যক্তিই এই আয়াতের কথা জানতে পারবে, তার কাছে এর কোনো কিছু থেকে থাকলে-সে আর (তা) সেবনও করতে পারবে না, (সেটা) বিক্রিও করতে পারবে না’। হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, লোকজন এ নির্দেশকে (তৎক্ষণাৎ সাদরে) গ্রহণ করে নিলেন। মদিনার রাস্তায় রাস্তায় তাদের যার কাছে এর যা কিছু ছিল, তারা তা বহিয়ে দিলেন’। [সহিহ মুসলিম ১৫৭৮]।

শেষ কথা হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রে থেকে মাদক নির্মূলে ইসলাম নির্দেশিত পথের কোনো বিকল্প নেই এবং আল্লাহতে বিশ্বাসী কোনো মুমিন মুসলমানের জন্য মাদক সেবনের কোনো সুযোগ নেই।

 ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ