যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত

Author Topic: যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত  (Read 287 times)

Offline ashraful.diss

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 148
  • 'শীঘ্রই রব তোমাকে এত দিবেন যে তুমি খুশি হয়ে যাবে'
    • View Profile

যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত

বাকশক্তি আল্লাহ তাআলার বড় নিআমত ও মহা দান। বান্দার বহুবিধ কল্যাণ এতে নিহিত। বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তিনি এ নিআমত বান্দাকে দান করেছেন। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে এসব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। যবানের নিআমত থেকে বঞ্চিত হলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। কোনো কিছুই যবানের বিকল্প হতে পারে না।

মানুষের মনের ভাব, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশে যবান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বলতে গেলে যবান সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মুখপাত্র। বোবার মনের কত দুঃখ-কষ্ট, কত আনন্দ-বেদনা, কিন্তু কাউকে জানাতে পারে না, জীবনের প্রতিটি ধাপে যার বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যে বাকশক্তি হারিয়েছে সে-ই উপলদ্ধি করতে পারে- যবান কত বড় নিআমত!

সাধারণত যার মুখে জড়তা আছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারে না তার জীবনেই তো কত সমস্যা। কত কষ্ট পেতে হয় তাকে। কত জায়গায় লজ্জা পেতে হয়। অথচ আমরা নির্বিচারে যত্রতত্র যবানের অপব্যবহার করে চলেছি। বস্তুত এত বড় নিআমতের উপলদ্ধি আমাদের মাঝে না থাকার কারণ হল, বিনামূল্যে কোনো কষ্ট স্বীকার ছাড়াই এ নিআমত আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন।

হায়! আমরা যদি একটু বুঝতাম, কত দামী এ নিআমত! রব্বে কারীমের কত বড় দান! একটু ভেবেছি কি- কীভাবে কথা বলছি? এত সুন্দর আওয়াজ কীভাবে বের হয়? কোথা থেকে এ ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়? আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কত বড় নিআমত দান করেছেন আর আমরা তাঁর নাফরমানিতে লিপ্ত। এ যবানের কত অপব্যবহার করছি হিসাবও নেই। কত পাপ এ যবান দিয়ে হচ্ছে, আমাদের অনুভূতিও নেই। একটু ভেবেছি কি, কথা বলার জন্য যদি মিনিট হিসাব করে বিল পরিশোধ করতে হত, তাহলে জীবনটা কত দুর্বিষহ হত।

আল্লাহ আমাদের এই নিআমত এমনিতেই দিয়ে দিয়েছেন। কথা বলতে কোনো কষ্টও পোহাতে হয় না। তাই অনেক বেশি শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন। অথচ আমরা নির্বিচারে যবানের প্রতি জুলুম করে যাচ্ছি। নাফরমানির কাজে ব্যবহার করছি। এ যবান দিয়ে খালেকের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এমনকি শিরকী-কুফরী কথাও যারা বলছে এই যবান ব্যবহার করেই বলছে। অনুভূতি-অনুশোচনাও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنّ العَبْدَ لَيَتَكَلّمُ بِالكَلِمَةِ، مَا يَتَبَيّنُ فِيهَا، يَزِلّ بِهَا فِي النّارِ أَبْعَدَ مِمّا بَيْنَ المَشْرِقِ

অর্থাৎ বান্দা চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে ফেলে, যার কারণে সে (পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৭)

বহু ক্ষেত্রে যবানের অপব্যবহার গভীর সম্পর্ককেও তছনছ করে দেয়। নিবিড় বন্ধুত্বের মাঝেও ফাটল ধরায়। দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাকে মুহূর্তে শেষ করে দেয়। হৃদয়কে জর্জরিত করে। অন্তরকে ক্ষত বিক্ষত করে, যা কখনও মানুষ ভুলতে পারে না। কারণ, যবানের আঘাতের ঘা শুকায় না। কবি বলেছেন-

جراحات السنان لها التئام + ولا يلتام ما جرح اللسان

বর্শার ফলার আঘাতের উপশম হয়। তবে যবানের আঘাতের কোনো উপশম নেই।

যবানের সঠিক ব্যবহার যেমন প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে তেমনি এর অপব্যবহার ধ্বংস ডেকে আনে। এজন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের যবানের ব্যবহার নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতেন।

عَنْ سُفْيَانَ بْنِ عَبْدِ اللهِ الثّقَفِيِّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيّ؟ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِسَانِ نَفْسِهِ، ثُمّ قَالَ: " هَذَا ".

হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আসসাকাফী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আমার কোন বিষয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি আশংকা করেন। তখন তিনি নিজ জিহ্বা ধরলেন এরপর বললেন, এটা। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৪১৯)

যবান খুব দামী নিআমত। সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝে যবানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। পরস্পরিক কথাবার্তা, লেনদেন, আলাপ-আলোচনা, সব কিছুতেই মুখের ভূমিকা অপরিসীম। এটা সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র।

যবানের যথাযথ ব্যবহারের দ্বারা দুনিয়া-আখেরাতে মানুষ যেভাবে উপকৃত হতে পারে তদ্রূপ এর অপব্যবহার দ্বারা ডেকে আনতে পারে ধ্বংস। এই যবান যেমন সত্তর বছরের বৃদ্ধকে ঈমানের স্বীকারোক্তি দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয় তেমনি কুফরের উচ্চারণ দ্বারা তা মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

যার বাকশক্তি মজবুত এবং যে সুন্দর উপস্থাপনে পারঙ্গম যবানের অপব্যবহারে তার ক্ষতির আশংকাও তত বেশি। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দরজায় কিছু মানুষকে বিবাদে লিপ্ত দেখে বললেন-

إِنّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلّ بَعْضَهُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبَ أَنّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنَ النّارِ فَلْيَأْخُذْهَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا.

আমিও মানুষ। আমার কাছে (বিচার নিয়ে) বাদী-বিবাদী আসে। কখনো এমন হয় যে, তোমাদের একজনের চেয়ে অপরজন দলীল উপস্থাপনে বেশি পারঙ্গম। ফলে (দলীল উপস্থাপন থেকে) আমি কাউকে সত্যবাদী মনে করি আর (সেই ভিত্তিতে) কারো পক্ষে ফয়সালা করি। কখনো যদি এমন ঘটে- আমি অপর মুসলিমের হক কারো জন্য ফয়সালা করে দিলাম তাহলে (শুনে রাখ) তা হবে জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরা। (এখন তার ইচ্ছা, চাইলে) সে তা গ্রহণ করুক অথবা তা থেকে নিজেকে রক্ষা করুক। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১৮১)

প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট ভাষা আল্লাহর মহা দান। তেমনি এর সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার অত্যাবশ্যক। নতুবা জাহান্নামের আগুনই হবে ঠিকানা। সাধারণত আমাদের কথা চার ধরনের হয়।

১. পুরো কথাই কল্যাণকর।
২. পুরো কথাই ক্ষতিকর।
৩. যে কথাতে কল্যাণ-অকল্যাণ মিশ্রিত থাকে।
৪. যে কথাতে দুনিয়া-আখেরাতের লাভ-ক্ষতি কিছুই নেই। অর্থাৎ অনর্থক কথা।

কল্যাণকর কথার ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান হল পুরোপুরি জেনেশুনে কথা বলা। অনুমান করে কথাবার্তা বলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ  اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ اُولٰٓىِٕكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـُٔوْلًا

যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না। জেনে রেখো, কান, চোখ হৃদয়- এর প্রতিটি সম্পর্কে  (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৩৬

আমাদের অনেকের মাঝেই একটি প্রবণতা খুব লক্ষ করা যায়। আমরা যা শুনি তাই বিশ্বাস করি এবং প্রচার করতে শুরু করি। যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করি না। কোনো তথ্য বা সংবাদ বর্ণনা করার আগে যাচাই-বাছাই করা কর্তব্য। অন্যথায় মিথ্যা হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ

ব্যক্তি যা শুনে তা বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪)

যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলতে থাকা কিংবা সে অনুযায়ী কর্মনীতি নির্ধারণ করতে থাকা চরম বোকামী। পরিণামে তা আক্ষেপের কারণ হয় এবং ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। মহান আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ جَآءَكُمْ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوْۤا اَنْ تُصِیْبُوْا قَوْمًۢا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلٰی مَا فَعَلْتُمْ نٰدِمِیْنَ

হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ৬

যে কথায় কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়টাই রয়েছে, বিশেষ প্রয়োজনে তা বলা যাবে। যেমন, বললে কারো গীবত হয়, না বললে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কথা।

ক্ষতিকর ও অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। মুমিন তো ক্ষতিকর কথা বলতেই পারে না। এসব বলে মুমিন কেন জাহান্নামে যাবে? মুমিন তো অনর্থক কথা থেকেও বেঁচে থাকে। এজন্যে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ

যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ৩

বিজ্ঞজনের উক্তি-

في اللسان آفتان عظيمتان، إن خلص من إحداهما لم يخلص من الأخرى، آفة الكلام وآفة السكوت

‘যবানের দুটি বিপদ। কথার বিপদ ও চুপ থাকার বিপদ! একটি থেকে মুক্তি পেলেও অপরটি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।’

কখনো একটি আরেকটির চেয়ে বড় বিপদ হয়ে সামনে আসে। সত্য থেকে যে চুপ থাকে সেও তো অপরাধী। আর যে বাতিল কথা বলে সে আল্লাহর অবাধ্য, শয়তানের মুখপাত্র।

চলবে..............
Mufti. Mohammad Ashraful Islam
Ethics Education Teacher, DISS
Khatib, Central Mosque, Daffodil Smart City
Ashuli , Savar, Dhaka