ক্লেপটোম্যানিয়া: নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চুরি

Author Topic: ক্লেপটোম্যানিয়া: নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চুরি  (Read 963 times)

Offline Abu Tareque

  • Newbie
  • *
  • Posts: 18
    • View Profile
ক্লেপটোম্যানিয়া: নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চুরি

                 

স্বল্প মূল্যের বিভিন্ন জিনিস চুরি করলেও  আমি নিজেকে চোর বলতে নারাজ। কারণ আমার কোন অভাব নেই। কোন জিনিস চুরি করার প্রয়োজন নাই। আবার চুরি করা জিনিস যেহেতু আমি ব্যবহার  করিনা তাই আমার মনে হয় আমি চোর না। তবে আমার এই বিষয়টি আমার কাছেই খুব জটিল মনে হয়। এ বিষয়ে আমি  নিজেকে বিভিন্ন প্রশ্ন করি।  নিজে নিজে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেই। কিন্তু আমি সেই জটিলতার কোন সমাধান খুঁজে পাইনা।  আসল ব্যাপারটা হলো আমার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করার অদম্য এক আকাঙ্খা কাজ করে। চুরি করার আগে আমি নিজের মধ্যে অত্যাধিক চাপ এবং উদ্বেগ বোধ করি।  আবার চুরি করার পর  আমি  সাময়িক স্বস্তি  অনুভব করি। আমি যখন নিরাপদ স্থানে আসি  তখন দুনিয়ার সব অপরাধবোধ এবং লজ্জা আমাকে ঘিরে ধরে। ফলে  কোন কোন দিন  সম্ভব হলে  চুরি করা জিনিস আবার ফেরৎ দিয়ে আসি।  দুদিন আগের একটি  ঘটনা বলি আমি শপিং মলে গিয়েছিলাম । সেদিন  শপিং মলে তুলনামূলক  কম লোকজন ছিল। সারি সারি  সাজানো চকলেট  দেখে আমার মধ্যে একটা মানসিক চাপ তৈরী হয় । বলে রাখি যে আমি চকলেট খুব একটা পছন্দ করি না।  যাইহোক এক পর্যায়ে  ২০ কিম্বা ৩০ টাকা দামের একটা চকলেট আমার কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখি।  সম্ভবত সেদিন দোকানের কর্মচারীরা এই বিষয়টি টের পেয়েছিল। কারণ অন্যান্য জিনিসের  বিল পরিশোধ করার সময়  তারা আমার কাছে জানতে চেয়েছিল যে আমি  চকলেট জাতীয় কিছু নিয়েছি কিনা?  আমি সম্পূর্ণ অস্বীকার করি। ধরা পড়ার ভয়ে সেদিন আমার বুক ধড়ফড় করছিল। তারপর থেকে আমি ওই দোকান এড়িয়ে চলি।  আমি যে শুধু শপিং মলে চুরি করি তা নয়।  আমি আমার আত্মীয়-স্বজনদের  বাসা থেকেও  বিভিন্ন সময় ছোটোখাটো অনেক  কিছু চুরি করেছি।  চুরি করে কয়েকবার  ধরাও পড়েছি।  বিভিন্ন কৌশলে আমি পরিস্থিতি আমার অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অনেক মানুষ আমাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা  শুরু করে।  এই চুরির স্বভাবের কথা ভেবে নিজের উপর নিজের ঘৃণা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আবার  চুরি করার অনুকুল পরিবেশ তৈরী হলে আমি সাময়িকভাবে অতীতের  সব ঘটনা ভুলে যাই।  আমার টার্গেট করা ওই জিনিস চুরি করার জন্য আমি  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। কোন প্রকার পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই আমি এসব চুরি করে থাকি।

এই বিষয়টি  নিয়ে আমি লজ্জায় কারও  কাছে মন খুলে কথা বলতে পারিনা। চোর চুরি করে তার প্রয়োজনের কারণে, আর আমি চুরি করি অকারণে । আমার এই চুরির স্বভাবের কারণে আমি বিভিন্ন জায়গায় অপমান অপদস্ত হয়েছি,  সামাজিক মর্যাদাহানির স্বীকার হয়েছি। কিন্তু এই স্বভাব ছাড়তে পারিনি।  যেভাবেই  হোক সবসময় আমি যেখানকার ঘটনা সেখানেই মিটিয়ে এসেছি। কিন্তু এক কান থেকে আরেক কান করে বিভিন্ন চুরির ঘটনা  আমার পরিবারের সদস্যদের কাছে কথা আসতে থাকে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে আমার একটায় কৌশল অস্বীকার করা।  কিন্তু শেষবার আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে হারিয়ে যাওয়া জিনিস আমার রুমে পাওয়া গেলে পরিবারের সদস্যরা পূর্বের সব অভিযোগ সত্য বলে ধরে নেয়। আমি ভীষণ লজ্জিত হই। এদিন আমি আর কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারিনি। এই ঘটনার পরও আমি চুরি করা বন্ধ করতে পারিনি। তবে সবসময় ধরা পড়ার ভয়ে আমি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকি । ধীরে ধীরে বিষন্নতা আমাকে ঘিরে ধরতে থাকে।


একদিন আমার ভাইয়ের সাথে একটি সুপারশপে বাজার করছিলাম। একটা পিন বক্স চুরি করার সময় আমার ভাই তা দেখে ফেলে। সেদিন আর মিথ্যা বলার কোন সুযোগ ছিলনা। সেদিন রাতে আমার ভাই আমাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে খুব শান্ত স্বরে আমার কাছে চুরির বিষয়টি  জানতে চায়। অনুরোধ করে বলে জেসি আজ তুই আমার কাছে কিছুই গোপন করবিনা প্লিজ। তার প্রশ্ন শুনে আমার খুব কান্না পায়।  কিছুক্ষন চুপ করে বসে থেকে আমি তাকে আমার মনের অবস্থা বলি।  আমি যে আমার ইম্পালস কন্ট্রোল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তা তার কাছে বলি।  আমার সব কথা শোনার পর সেও খুব চিন্তিত হয়ে পরে। কয়েকদিন পর তিনি  আমাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। আমি তার কাছে আমার মনের সব কথা গোপন রাখার শর্তে প্রকাশ করি। আমার কথা বলা শেষ হলে তিনি বললেন যে আপনি "ক্লেপটোম্যানিয়া" নামক একটি মানসিক রোগে আক্রান্ত।  আমি প্রয়োজনীয় মেডিসিন লিখে দিয়েছি।  এগুলি খাওয়ার পাশাপাশি আপনি একজন সাইকোলজিস্টের কাছে সাইকোথেরাপি গ্রহণ করতে পারেন। 

ডাক্তার আমাকে বললেন যেহেতু আপনার পরিবারে এই রোগের কোন ইতিহাস নেই। আবার আপনি কোন মানসিক চাপ বা অন্য কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত না তাই বলা যেতে পারে আপনার মস্তিষ্কের সামনের অংশ অথাৎ ফ্রন্টাল লোবে নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার কারণে  আপনার ক্লেপটোম্যানিয়া নামক এই রোগ দেখা দিতে পারে। কারণ আমাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল লোব আমাদের ইছাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

বাসায় এসে আমি এই রোগ নিয়ে ইন্টারনেটে  সার্চ করি। রোগটি কি, কাদের এই রোগ হয়, কত সালে সর্বপ্রথম রোগটিকে মানসিক বিকারের তালিকাভুক্ত করা হয় ইত্যাদি ।বিখ্যাত বিত্তবানদের তুচ্ছ জিনিস চুরির বাতিকও এই ক্লেপটোম্যানিয়ার ফসল। বিশ্বখ্যাত অভিনেতা, রাজনীতিক, খেলোয়াড়, গায়ক, ব্যাংকার সব পেশার মানুষই এ তালিকায় আছেন। এই সমস্যা অনেকের আছে জেনে একটু ভালো অনুভব করি। এটি প্রধানত পশ্চিমের দেশগুলিতে দেখা গেলেও ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ ক্লেপটোম্যানিয়ার কেস রিপোর্ট করা হয়। আমি তার কথা মতো মেডিসিন গ্রহণ করেছি। ডাক্তারের কথা অনুসারে একজন সাইকোলজিস্টকে দিখিয়েছি। কিভাবে ইমপালস কন্ট্রোল করতে পারি , কিভাবে চিন্তা অন্যদিকে সড়িয়ে নিতে পারি তা শিখতে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন। 

এখন আমি অনেকটা স্বাভাবিক লাইফ লিড করছি। আমার এই সমস্যাকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে গ্রহণ করেছি। কোন কোন সময়  আমার ইম্পালস কন্ট্রোল করতে আসুবিধা হয় তার তালিকা করেছি। সপ্তাহে একবার তালিকা চেক করে আমার অগ্রগতি দেখি, ফলে আমি আরও উৎসাহ বোধ করি।  আমি যেসব স্থানে গেলে আমার মধ্যে চুরির প্রবণতা তৈরী হয় সেসব স্থান এড়িয়ে চলি। যদি একান্ত যেতেই হয় তাহলে একা না গিয়ে কাছের কাউকে সাথে রাখি যাতে সে আমার গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারে। মাঝে মাঝে মনে করে দেয় । আমি মনে করি যদি কারো মধ্যে ক্লেপটোম্যানিয়ার লক্ষণ থাকে তাহলে লজ্জা না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন এবং একজন সাইকোলজিস্ট এর কাছ থেকে সেকাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি গ্রহণ করতে পারেন।


লেখক : আবু তারেক, সাইকোলজিস্ট, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
« Last Edit: October 10, 2022, 09:56:33 AM by Abu Tareque »
Psychologist