‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি কোথা থেকে এল?

Author Topic: ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি কোথা থেকে এল?  (Read 2253 times)

Offline Md. Abul Bashar

  • Full Member
  • ***
  • Posts: 174
  • Test
    • View Profile
স্কুলের শিক্ষকেরা ‘পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ’ পড়ানোর সময় ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁরা বলেন, কিছু শব্দ একই সঙ্গে পুরুষ ও স্ত্রী বোঝায়; যেমন শিশু, সন্তান, রাষ্ট্রপতি ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরাও সরল বিশ্বাসে ‘শিশু’, ‘সন্তান’ আর এ জাতীয় শব্দের মতো করে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটিকে পাঠ করে। কিন্তু শব্দটির মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রীবাচকতার যে জটিল দ্বন্দ্ব গাঁথা হয়ে আছে, সেটি কোমলমতি শিক্ষার্থীরা হয়তো টের পায় না। কিন্তু যাদের আমরা ‘কোমলমতি’ বলে অনেক জটিল তর্ক থেকে দূরে রাখি, তারা কি কখনোই এই জটিলতা টের পায় না?

একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। বছর দশেক আগে ভাষা প্রতিযোগের উৎসবে গেছি যশোরে। এই অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করার সুযোগ পায়; শিক্ষকেরা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। তো ‘প্রশ্নোত্তর’ পর্বে স্কুলপড়ুয়া এক ছাত্রী জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, দেশকে যারা ভালোবাসে, তাদের বলে দেশপ্রেমিক। আমরা জানি, ছেলেদের বলে প্রেমিক আর মেয়েদের বলে প্রেমিকা।...তাহলে যে মেয়ে দেশকে ভালোবাসে, তাকে কেন দেশপ্রেমিকা বলা হবে না?’
মঞ্চে বসে থাকা শিক্ষকেরা তখন আঁতিপাঁতি করে উত্তর খুঁজছেন। এর মধ্যে বয়সে প্রবীণ ভাষাবিজ্ঞানের এক অধ্যাপক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ধীর গলায় বললেন, ‘দেশকে তুলনা করা হয় মায়ের সঙ্গে। তার মানে, দেশ হলো নারী। এখন এই দেশকে যে ভালোবাসবে, সে তো পুরুষই হবে।’ তারপর তিনি কথার উপসংহার টানলেন, ‘...তাই “দেশপ্রেমিক” শব্দটি ঠিকই আছে।’

মেয়েটি কী বুঝল জানি না, উত্তর শুনে বসে পড়ল। একই রকম প্রশ্ন তুলে তসলিমা নাসরিন তাঁর বইয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘মেয়েবেলা’। সেই নাম দেখে ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের অনেকেও ঠোঁট উল্টেছিল। আবার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মূল্যবান লেখার শিরোনাম ‘ছেলেভুলানো ছড়া’। ওটির নাম কেন ‘মেয়েভুলানো’ নয়, এই প্রশ্ন অবশ্য কেউ তোলেননি। তবে এখানেও একই সমস্যা। একসময় ‘ছেলেধরা’ শব্দটিও সমাজে বহুল প্রচলিত ছিল। আজকাল ঠিক ওই ধরনের মানুষ দেখা যায় না; থাকলে এ শব্দ নিয়েও প্রশ্ন উঠত। তবে আসল প্রশ্ন, ‘লৈঙ্গিক সংবেদনশীল’ এসব শব্দ কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না, এগুলো কতটা ‘পুরুষতান্ত্রিক’?
একটি ভাষায় সচেতন ও অসচেতন—দুই রকম প্রয়াসেই শব্দ তৈরি হতে থাকে। এসব শব্দ এক বা একাধিক সাধারণ ও বিশেষ অর্থ ধারণ করে। তবে সময়ের ফেরে অর্থের অনেক রকম বদলও ঘটে। এর মধ্যেও ভাষায় ব্যবহৃত বহু শব্দ সময় ও সমাজবাস্তবতার চিহ্ন ধরে রাখে। পরিবর্তিত সময় ও সমাজে অনেক শব্দ তার মূল গুণ বা সত্তা হারিয়ে ফেলে। যেমন, মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদকর্তাদের বহুল ব্যবহৃত ‘অবলা’ শব্দটি হাল আমলে ন্যূনতম ব্যবহারের ক্ষমতাও হারিয়েছে। এভাবে আমরা ধরে নিতে পারি, বর্তমানের অনেক শব্দ অদূর ভবিষ্যতে ভিন্নতর দৃষ্টিকোণে পাঠ করা হবে। তবে আপাতত ‘রাষ্ট্রপতি’ আর শব্দের লিঙ্গগুণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

আধুনিক অন্য সব ভাষার মতো বাংলা শব্দেরও লিঙ্গপরিচয় নেই। শব্দের লিঙ্গপরিচয় না থাকুক, সমাজের মানুষের তো লিঙ্গপরিচয় আছে। তাই মানুষের নারী-পুরুষ ভেদে বাংলা শব্দেরও লিঙ্গান্তর ঘটে। যেমন, চাচার পত্নী চাচি, মামার পত্নী মামি। বিপরীতভাবে, খালার পতি খালু, ফুফুর পতি ফুফা। এখন রাষ্ট্রের যিনি প্রধান, তাঁকে কেন রাষ্ট্রপতি বলতে হবে? যদি রাষ্ট্রপতি বলতেই হয়, তবে মহিলা রাষ্ট্রপতিকে কেন রাষ্ট্রপত্নী বলা যাবে না? বলা যাবে না, কারণ একজন ভাষাবিশেষজ্ঞের সোজসাপটা উত্তর হতে পারে, শব্দটি একটি পরিভাষা। বেশ, রাষ্ট্রপতি তাহলে শুধুই ‘রাষ্ট্রপতি’—মহামান্য বা মাননীয় রাষ্ট্রপতি। নারী হলেও তাঁকে ‘মহামান্যা’ বা ‘মাননীয়া’ বলা সমীচীন হবে না। কিন্তু নিতান্ত পরিভাষা হিসেবে তৈরি করা রাষ্ট্রপতি শব্দটি একেবারে ‘নির্বিষ’ নয়। ‘রাষ্ট্রপতি’র মতো ‘দেশনায়ক’, ‘দলনায়ক’, ‘দলনেতা’, ‘সভাপতি’ ইত্যাদি শব্দ পুরুষের দম্ভ প্রকাশ করে চলেছে।
এখন আসা যাক, ‘রাষ্ট্রপতি’ এবং এ রকম কিছু তৈরি শব্দ কোন সময়ে এবং কীভাবে বাংলা ভাষায় ঢুকেছে!
এটি সচেতন প্রয়াসে তৈরি করা একটি শব্দ। ইংরেজি ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দের বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি। এই ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দটির প্রয়োগ হয়ে আসছে চৌদ্দ শতক থেকে। ইউরোপে ছোট বা বড় কোনো রাজ্যের প্রধান বোঝাতে ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। আজকাল এ ধরনের শব্দের আগে ‘অনারেবল’, ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ ইত্যাকার শব্দ যোগ করা হয়। তবে প্রথম দিকে শব্দটি এত ‘উচ্চমর্যাদা’র ছিল না। কোনো সভা বা সমাবেশে যিনি আগে বসতেন, তাঁকেই বলা হতো প্রেসিডেন্ট। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থই ছিল এমন—‘যিনি আগে বসেন’। রাষ্ট্রের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা বোঝাতে শব্দটির প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে, ১৭৮৭ সালে।

এরপর থেকে শব্দটির উচ্চতা অসীমভাবে বেড়ে যায় এবং দেশে দেশে ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় প্রেসিডেন্ট শব্দের বাংলা হিসেবে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি তৈরি হয়েছে উনিশ শতকের প্রথম দিকে। ১৮১৭ সালে বাংলা পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি কিছু পরিভাষা তৈরি করে। এর আগে-পরে ব্যক্তিগতভাবে বাংলা পরিভাষা তৈরির কাজ করেন ফেলিক্স কেরি, পিটার ব্রিটন, জন ম্যাক, উইলিয়াম কেরি, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাজশেখর বসুসহ বেশ কয়েকজন ইংরেজ ও বাঙালি পণ্ডিত।
বলতে হয়, পরিভাষা তৈরির প্রথম যুগেই সমস্যার সূত্রপাত। সংস্কৃত ভাষাপ্রীতি বাংলা পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করে। উনিশ শতকজুড়ে মনে করা হতো, বাংলা ভাষা এসেছে সংস্কৃত থেকে। এই যুক্তিতে বাংলা শব্দের মান্যায়নের ক্ষেত্রে বরাবরই সংস্কৃত ভাষার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এমনকি উনিশ শতকে বাংলা পরিভাষা তৈরির সময়ও পণ্ডিতেরা সংস্কৃত শব্দের দ্বারস্থ হয়েছেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কিংবা রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীরা তাত্ত্বিকভাবে মনে করতেন, বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ভাষার ‘রাহুমুক্ত’ করতে হবে। কিন্তু বাংলা পরিভাষা তৈরির জন্য ১৮৯৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে যে মূলনীতি করা হয়, সেখানে ‘ধ্রুপদি’ ভাষা সংস্কৃতর কাছে বাংলাকে একরকম সঁপে দেওয়া হয়। ওই সময়ই রাষ্ট্রপতি, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সম্পাদক, পরীক্ষক, প্রত্যবেক্ষক, পরিদর্শকের মতো অজস্র বাংলা পরিভাষা তৈরি হয়, যেগুলো মূল সংস্কৃতে নরবাচক শব্দের প্রতিনিধিত্ব করে।
আজকের দিনে শিক্ষকেরা ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটিকে উভলিঙ্গ বলে বেশ চালিয়ে দিতে চান। কিন্তু সমাসনিষ্পন্ন এই শব্দের দ্বিতীয় অংশেই পুরুষবাচক ‘পতি’ শব্দটি গোঁফ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে। ‘লিঙ্গ’ প্রসঙ্গটি সামাজিক ক্ষেত্রে আরও বেশি জটিল। কারণ, লিঙ্গের ধারণা কেবল শরীরী নয়, মনোগতও। এমনকি এর ধরনও বিচিত্র। সমাজে একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে চান বা সমাজ তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করে, এর মধ্য দিয়েই সামাজিক লিঙ্গপরিচয় নির্ধারিত হয়।

নজরে রাখা দরকার, শব্দের লিঙ্গসংবেদনশীলতা দূর করতে এখন ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’কে বলা হচ্ছে, ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’, ‘ব্যাটসম্যান’কে বলা হচ্ছে ‘ব্যাটার’, ‘বিজনেসম্যান’কে বলা হচ্ছে ‘বিজনেস এক্সিকিউটিভ’, ‘চেয়ারম্যান’কে বলা হচ্ছে ‘চেয়ারপারসন’ বা ‘চেয়ার’। এ রকম অনেক শব্দই বদলে গেছে। এখন ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে কি না, তা সময়ের সন্তানেরাই ভালো বলতে পারবেন।
আরেকটি কথা; পরিভাষা তৈরির সময় আমাদের একটি সহজ সূত্র মেনে নিলে সমস্যা কমে যায়। এ ক্ষেত্রে যেমন অনুবাদনীতি আছে, তেমনি আছে স্বীয়করণ নীতি। অনুবাদনীতিতে শব্দের আচরণ বা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে তার বাংলা করা হয়। যেমন, ‘রেডিও’ শব্দটি অনুবাদনীতিতে হয়েছে ‘বেতার’। আর স্বীয়করণনীতির ক্ষেত্রে বিদেশি শব্দ জনসাধারণের অনায়াস উচ্চারণে দেশি রূপ লাভ করে। এভাবে ইংরেজি ‘হসপিটাল’ হয়েছে ‘হাসপাতাল’, ‘বোম’ হয়েছে ‘বোমা’, ‘লাইফবয়’ হয়েছে ‘বয়া’, ‘জেনারেল’ হয়েছে ‘জাঁদরেল’, ‘আর্মচেয়ার’ হয়েছে ‘আরামকেদারা’ ইত্যাদি। ভবিষ্যতে পরিভাষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত বিদেশি শব্দকে পরিবর্তিত দেশি উচ্চারণে গ্রহণ করা যেতে পারে। আর নতুন করে অনুবাদের মাধ্যমে পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রে সচেতনভাবে শব্দের লিঙ্গপরিচয় অগ্রাহ্য করতে হবে।



Source: Prothom Alo