Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - kekbabu

Pages: [1] 2 3 ... 5
1
দায়ীদের শাস্তি না হওয়া নৌ-দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ৬ এপ্রিল ২০২১

লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির ঘটনা এ দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় প্রতিবছরই লঞ্চডুবিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সে সময় দেখা যায় স্বজনহারানো ব্যক্তিদের আর্তনাদ। এ নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। গণমাধ্যমগুলোয় ফলাও করে খবরাখবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথারীতি গঠিত হয় তদন্ত কমিটি।


চিরায়িত প্রথা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন, ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যস, হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই দেশে ঘটে যায় আরেকটি নৌ-দুর্ঘটনা। তখন চাপা পড়ে যায় লঞ্চডুবি বা নৌ-দুর্ঘটনার আগের ঘটনাগুলো।

যখন অন্য একটি ঘটনার রেশে লঞ্চডুবি বা নৌ-দুর্ঘটনার ঘটনা চাপা পড়ে যায়, তখন আর কেউ জানতে পারে না ওই লঞ্চডুবির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। কিংবা লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আদৌ আলোর মুখ দেখেছে কি না। এই হচ্ছে বাস্তবতা।

দেশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে লঞ্চডুবির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত নৌ-দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না-করা, লঞ্চ চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করার ‘সুযোগ’সহ ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করাই যে লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির অন্যতম প্রধান কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই প্রায় প্রতিবছরই ঘটে চলেছে লঞ্চডুবির ঘটনা।

এ বছরও দেশবাসী লঞ্চডুবির ঘটনা প্রত্যক্ষ করল গত ৪ এপ্রিল। ওইদিন নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে রাফিত আল হাসান নামে মুন্সীগঞ্জগামী একটি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় এস কে ৩ কোস্টার জাহাজের ধাক্কায়। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৫ যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনার প্রায় ঠিক এক বছর আগে (৩০ জুন ২০২০) ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামক একটি লঞ্চকে ময়ূর-২ নামের অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি নদীতে ডুবে যায়। এতে প্রাণ হারান কমপক্ষে ৩২ জন।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে: ‘What is lotted cannot be blotted.’ এর অর্থ হলো, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নৌ-পথগুলোয় প্রায় প্রতিবছরই ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি জনগণের কপালের লিখন? যদি তা-ই হয়, তাহলে তা খণ্ডনীয় নয়। আবার এসব দুর্ঘটনাকে যদি এদেশের পরিপ্রেক্ষিতে না-দেখে উন্নত দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে উন্নত দেশে নৌ-দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম; যা আমি জার্মানি, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে থাকাকালীন ব্যক্তিগতভাবে খোঁজখবর নিয়েও দেখেছি।

তাহলে কপালের লিখন কি দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয় না। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে, সার্বিক নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, লঞ্চের ফিটনেস, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লঞ্চ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, সঠিকভাবে নৌ-আইন না-মানা ইত্যাদি।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে ৬৬০টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ। আহত হয়েছেন অসংখ্য। দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ হয়েছেন আরও প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। ২০১৫-পরবর্তী সময়গুলোতেও দেশে থেমে থাকেনি লঞ্চডুবির ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ প্রাণ হারানো ছাড়াও নিখোঁজ হয়েছেন অনেকে, যাদের লাশ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সময়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক পরিবার। আবার লঞ্চডুবিতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হয়েছে শত শত পরিবার।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশিরভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে চলছে কয়েকগুণ নৌযান। তা ছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌ-পুলিশ থাকা প্রয়োজন তা নেই। এসব নৌ-পুলিশকে বিআইডবিউটিএ-র কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও সেসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান।

লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটি নিয়ে চনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব কমিটি দুর্ঘটনা রোধে একগুচ্ছ সুপারিশ করে। এরপর রহস্যজনক কারণে বিষয়টি আর সামনের দিকে সেভাবে এগোয় না। দেশের কোথাও যখন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আর তেমন কিছু হয় না। ফলে এসব দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তিও পায় না। অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আটক হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকরে বা রাজনৈতিক প্রভাবে কিংবা কালো টাকার জোরে অথবা প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে পার পেয়ে যায়।

এসব কারণে নৌ-দুর্ঘটনা কমে না। বরং বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিল। স্বজনহারানোদের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি খুব একটা হয় না, এটা দুঃখজনক। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না। বিদ্যমান আইনে লঞ্চ মালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তা ছাড়া এ আইনের ফাঁকফোকরও অনেক বেশি। ফলে আইনটির পরিবর্তন বা সংশোধন করা সময়ের দাবি।

দেশের নৌপথগুলোয় লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা রোধে গণমাধ্যমে নিয়মিত সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদীবন্দর টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধ করা, লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কি না-এসব মনিটর করা জরুরি। কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ওই লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্তসংখ্যক সরঞ্জামাদি না-থাকলে সেই লঞ্চের যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা দায়ের করা আবশ্যক।

আর নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষাপূর্বক ফিটনেস সংবলিত নৌযানগুলোয় দক্ষ, সৎ ও দায়িত্ববান চালক নিযুক্ত করা অতি জরুরি। সেইসঙ্গে নৌযানে কর্মরত মাস্টার, ড্রাইভার, সুকানি ও আনসারদের জন্য নদীবন্দরগুলোয় নিয়মিত নৌ-নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মশালার আয়োজন করাও প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন নৌপথে নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে পর্যাপ্তসংখ্যক আধুনিক নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা দরকার।

পাশাপাশি নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক সৎ, মেধাবী ও দক্ষ নৌ-পুলিশ নিয়োগ দেওয়া। এসবের পাশাপাশি ঈদসহ বিভিন্ন ছুটি ও উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহন পরিহারের লক্ষ্যে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিসের সুব্যবস্থা করা আবশ্যক।

কোথাও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার অভিযানের লক্ষ্যে প্রয়োজন আধুনিক জাহাজ, স্পিডবোট, হেলিকপ্টার ও সিপেন। এসব ছাড়া দেশের এই বিশাল নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে সঠিক নকশা অনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে কি না, লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে কি না-এসবও নিয়মিতভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে তদারক করা আবশ্যক। সর্বোপরি, যাত্রীদেরও সতর্ক হতে হবে, তারা যেন কখনোই অতিরিক্ত যাত্রী হিসাবে লঞ্চে না-ওঠেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে-আশা করা যায়।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/409017/%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A7%8C%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A7%9C-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3?fbclid=IwAR1vqhiCL0F8ZAotbdCr96p9ccqBe0u8hj9VS-zJ-tL8iyCSj-HoSwHZmJ0

2
ভেজাল খাদ্য কমিয়ে দিচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু ২৮ মার্চ, ২০২১

মানুষের জীবন ধারণের জন্য যতগুলো চাহিদা রয়েছে, তার মধ্যে খাদ্য হচ্ছে প্রধান মৌলিক চাহিদা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশের জনগণ প্রতিদিন যেসব খাবার খাচ্ছে, তা কি সম্পূর্ণরূপে ভেজালমুক্ত? নিশ্চই না। অর্থাত্, জনগণ প্রতিনিয়তই ভেজাল খাবার খাচ্ছে। ভেজালযুক্ত খাদ্য থেকে জনগণ মুক্তি চাইলেও যেন পাচ্ছে না। তবে এক দিনে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, অসাধু ও অতিমুনাফালোভী ব্যক্তিদের কারণে মূলত এই আবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভেজালমুক্ত খাদ্য যেমন দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধান এবং রোগ প্রতিরোধ করে; তেমনি ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন বিপন্ন পর্যন্ত হতে পারে। তাই ‘সকল সুখের মূল’ নামক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে ভেজালমুক্ত খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশে শাক-সবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ, গুড়, মসলা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যই যেন ভেজালে পরিপূর্ণ। এমনকি এ দেশে শিশুখাদ্যসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মেশানো হয়েছে এবং ভেজালযুক্ত ওষুধ খেয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। আবার শেষ পর্যন্ত এসব অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়ও পেয়েছেন, যে লজ্জা গোটা জাতির। অথচ নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত এমনই এক বিষয় যে, এ ক্ষেত্রে কাউকে ন্যূনতম ছাড় পর্যন্ত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ এ দেশে ঘটে উলটো ঘটনা। বর্তমানে দেশে চলছে মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের দ্বিতীয় পর্যায়, যা প্রথম পর্যায়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভয়াবহ। একটু ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই কঠিন সময়েও এ দেশে থেমে নেই খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার প্রবণতা। করোনার হাত থেকে যখন মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে; কোয়ারেন্টাইন ও সোশ্যাল ডিসটেন্সিংসহ নানা রকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে; সরকার জনগণকে নানাভাবে সতর্ক করছে, চিকিত্সকেরাও শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা (ইমিউনিটি) কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে দেশে চলছে বিভিন্ন খাদ্রদ্রব্যে ভেজাল মেশানোর সেই চিরপরিচিত খেলা। চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের মতে, শরীরে ইমিউনিটি ভালো থাকলে এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চললে করোনা সহজে কাউকে সংক্রমিত করতে পারবে না। প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব বা পাকানো ফল ও শাকসবজির মধ্যে ইমিউনিটি বাড়ানোর অসীম ক্ষমতা থাকে। তাই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে অবশ্যই প্রত্যেকের শরীরে ইমিউনিটি বাড়ানো জরুরি। কিন্তু ফরমালিন মেশানো বিভিন্ন ফল, শাকসবজি ও ভেজাল মেশানো খাদ্যদ্রব্য খেয়ে সেই ইমিউনিটি বাড়ার বদলে নিজের অজান্তেই কমে যাচ্ছে, যা সবার জন্যই চিন্তার বিষয়।

খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল (যেমন : ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম পাউডার, ইথেফেন ইত্যাদি) মেশানোর বিষয়টি দেশে দীর্ঘদিন ধরেই নিন্দিত হয়ে আসছে। অথচ জনগণ যেন এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, দেশে শিল্প খাতে ফরমালিনের প্রয়োজন ৪০-৫০ টন। কিন্তু প্রতি বছর ফরমালিন আমদানি করা হয় প্রায় ২০৫ টন। অর্থাত্, বাড়তি ১৫০ টনের বেশি ফরমালিন বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে দেশবাসীর পেটে গেছে। অনেক সময় বিভিন্ন বাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করতে দেখা যায়। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ঐ বাজার আগে যা ছিল, কয়েক দিন পরে আবার তা-ই হয়েছে। ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণের কারণে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে, বিশেষ করে করোনার এই সময়ে। তবে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে অগণিত শিশু, যাদের বলা হচ্ছে আগামীর ভবিষ্যত্। এ ধরনের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। আমাদের পুরো খাদ্যচক্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত যেভাবে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে মনে হয় জাতি হিসেবে আমারা দ্রুতগতিতে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর ভেজাল খাদ্য খেয়ে ৩ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে মরণব্যাধি ক্যানসারে, প্রায় দেড় লাখ আক্রান্ত হচ্ছে ডায়াবেটিসে এবং প্রায় ২ লাখ আক্রান্ত হচ্ছে কিডনি রোগে। তবে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ভেজাল খাদ্যের কারণে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয় এবং গর্ভজাত অনেক শিশু বিলাঙ্গ হয়ে পড়ে।

ভেজাল খাদ্যের কারণে শিশু বিকলাঙ্গ হওয়া এবং শিশুখাদ্যে ভেজাল মেশানো আগামী প্রজন্মের জন্য নিশ্চয় কোনো শুভ বিষয় নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীতে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে অধিক মুনাফার লোভে খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। অনেক সময় কাউকে আটক করা হলেও পরে তারা ঘুষ, পেশিশক্তিসহ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়, যা দুঃখজনক। খাদ্যে ভেজাল রোধে নিরাপদ খাদ্য আইনের সঠিক প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা ও ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা পরিহার করাও আবশ্যক। সেই সঙ্গে প্রয়োজন জনগণ কর্তৃক সচেতন ও সোচ্চার হওয়া। তাছাড়া খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো রোধে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আশা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজের নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করা, নিজের বিবেক জাগ্রত করা।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Link: https://www.ittefaq.com.bd/print-edition/opinion/232520/%E0%A6%AD%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7-%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%AE%E0%A6%A4%E0%A6%BE

3
আসামিরা পালানোর সুযোগ পায় কীভাবে
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
১৩ মার্চ ২০২১

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ হচ্ছে প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। ইংরেজিতে POLICE শব্দটির পূর্ণরূপ করলে দাঁড়ায় P= Polite, O= Obedient, L= Loyal, I= Intelligent, C= Courageous, E= Eager to help or Efficient. পুলিশ জনগণের বন্ধু তথা জনগণের সেবক হিসাবে কাজ করবে এবং তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করবে- জনগণ এমনটাই প্রত্যাশা করে।


কিন্তু যখন দেখা যায় কতিপয় পুলিশ সদস্য তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেন, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। ইদানীং দেশের কারাগার, হাসপাতাল ও আদালত থেকে প্রায়ই কারাবন্দি পালানোর ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যসহ জেলারদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তেমনি কারাগারের বা পুলিশি হেফাজতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তাও ফুটে ওঠে।

পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হচ্ছে, পুলিশি হেফাজত থেকে আসামির পলায়নের ঘটনা। আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়, যা দুঃখজনক। পুলিশ হেফাজত থেকে যদি আসামি পলায়ন করে বা ‘বিশেষ সুবিধা’র কারণে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য কর্তৃক আসামিকে পালানোর সুযোগ(!) করে দেওয়া হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে একদিকে যেমন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা কঠিন বিষয় হয়ে পড়ে, তেমনি অপরদিকে ভুক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় ন্যায্য প্রতিকার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন।

সর্বোপরি, পলায়নকারী আসামি ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা সাক্ষীদের জন্য এবং সাক্ষ্যের জন্য বিরাট হুমকি বা ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তা ক্ষতির কারণ হিসাবেও দেখা দেয়। এ দেশে পুলিশি হেফাজত ও কারাগার থেকে অনেক সময় সাধারণ আসামি থেকে শুরু করে হত্যা মামলার আসামি পর্যন্ত পলায়নের নজির রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

যেমন- গত ৬ মার্চ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরহাদ হোসেন রুবেল নামের এক বন্দি উধাও হয়ে যায়। এর আগে গত বছরের ৬ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে মইয়ের সাহায্যে পালিয়ে যান যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি আবু বক্কর ছিদ্দিক। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত মো. পলাশ নামের এক আসামি। এর আগে চাঁদপুর জেলা কারাগার থেকে মোখলেছুর রহমান নামের বিচারাধীন মামলার এক আসামি দেওয়াল টপকে পালিয়ে যায়।

এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৮ জুন নোয়াখালী জেলা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে হাতকড়াসহ পালিয়ে যায় সাহাব উদ্দিন ওরফে সুজন নামের মাদক মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। হত্যা মামলার আসামি কিংবা পুলিশের হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসামি পলায়নের পাশাপাশি ধর্ষণ মামলার আসামি পলায়নের ঘটনাও রয়েছে।

যেমন- ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর রাজধানী ঢাকার উত্তর বাড্ডায় এক গারো তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে এক ডজন মামলার আসামি রাফসান হোসেন রুবেলকে গ্রেফতারের জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক পর্যায়ে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে রুবেল। পরে তাকে আদালতে তোলা হয় এবং পুলিশের কর্তব্যরত দুজন সদস্যের ‘চোখ ফাঁকি’ দিয়ে হাতকড়াসহ আদালত থেকে পালায় রুবেল। আবার থানা থেকেও আসামি পালানোর ঘটনা দেখা যায় অনেক সময়।

যেমন- ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্লবী থানা থেকে আতিকুর রহমান ওরফে সূর্য নামে রিমান্ডে থাকা এক আসামি পালিয়ে যায়। আতিকুর দীর্ঘদিন ধরে পল্লবীর এভিনিউ ৫ এলাকায় একটি বাসায় অসামাজিক কার্যকলাপ করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে আতিকুরসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়। ওই বাসা থেকে এক নারীকেও উদ্ধার করা হয়।

বিচারের কাঠগড়া থেকে আসামি পালানোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের হত্যা মামলার চার আসামির আদালত থেকে পালানোর ঘটনা। জুবায়ের হত্যা মামলার চার আসামি আশিকুর রহমান, খান মোহাম্মদ ওরফে রইস, মাহবুব আকরাম ও ইশতিয়াক ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতের কাঠগড়া থেকে পালিয়ে যায়। ওইদিন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ৪-এ এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ছয় আসামির জামিন বাতিলের বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য ছিল।

বিচারক এবিএম নিজামুল হক আসামিদের জামিন বাতিলের আদেশ দেওয়ার পর আদালতে উপস্থিত ওই চার আসামি কাঠগড়া থেকে পালিয়ে যায়। উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদকে কুপিয়ে জখম করে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা। পরদিন ভোরে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জুবায়ের। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ডেপুটি রেজিস্ট্রার হামিদুর রহমান বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এসবের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীও পুলিশের হেফাজত থেকে পালানোর ঘটনা ঘটেছে। যেমন- ২০১৬ সালের ১১ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফে আটকের পর থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় হাতকড়া পরা অবস্থায় পালিয়ে যায় ইয়াবা ব্যবসায়ী নুরুল হুদা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে নুরুল হুদার নাম ছিল ১ নম্বরে।

উল্লিখিত ঘটনাগুলো ছাড়াও পুলিশি হেফাজত থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়ার অনেক ঘটনার নজির রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশি হেফাজত কিংবা কারাগার থেকে আসামি পালিয়ে যাওয়া বা উধাও হওয়ার ঘটনার মাধ্যমে কি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যসহ জেলারদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার বিষয়টি ফুটে ওঠে না এবং তা কি কারাগারের দুর্বল নিরাপত্তার চিত্র তুলে ধরে না?

১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্টের ২৯ ধারায় পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য সুস্পষ্টভাবে শাস্তির কথা বলা আছে। অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে শাস্তি হিসাবে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় অথবা জেলার বা ডেপুটি জেলারকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলাকারীরা ‘ছাড়’ পেয়েও যায়।

পুলিশি হেফাজত থেকে আসামির পালিয়ে যাওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা আসামির পক্ষ থেকে ‘বিশেষ সুবিধা’ নিয়ে থাকেন কিনা, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার ভালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। আর এ ধরনের ঘটনা কেউ ঘটিয়ে থাকলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে সঠিক তদন্তপূর্বক দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি জেল সুপার ও জেলার যদি কারা অভ্যন্তরে নিয়মিত তদারকি করেন, ডেপুটি জেলাররা যদি তাদের নির্দিষ্ট এলাকাগুলো নিয়মিত তদারকিপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন এবং কারারক্ষীরা যদি নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার সঙ্গে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে কারাগারের ভেতর থেকে আসামিরা পালানোর সুযোগ পাবে বলে মনে হয় না।

পুলিশ বাহিনী এবং জেলার সম্পর্কে জনগণের ভালো ধারণা বজায় রাখতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যসহ জেলারদের দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিতে ভবিষ্যতে আর কোনো আসামি যেন পুলিশি হেফাজত থেকে পালানোর সুযোগ না পায়, সেদিকে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/401312/%E0%A6%86%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%95%E0%A7%80%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87

4
 দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 যুগান্তর, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সম্প্রতি জার্মানির বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বার্ষিক দুর্নীতির ধারণাসূচক-২০২০ প্রকাশ করেছে। টিআইর ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৬ স্কোর পেয়েছে, যা ২০১৯-এর সমান।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর বাড়েনি; বরং সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে হিসাব করলে দুর্নীতির র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৯-এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে (দ্বাদশ স্থানে), যা হতাশাব্যঞ্জক।

সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্তের অবস্থান থেকে গণনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান গতবারের মতো ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম। সূচকের নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান শুধু দুই ধাপ নিচে নেমেছে, তা-ই নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরের মতো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, শুধু যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্তানের ওপর।

আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্নে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্কোর বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর অনেক পেছনেই রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং অনেক আগে থেকেই তা চলে আসছে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেকের বড় ধরনের দুর্নীতির বিষয় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে।

এর আগে রিজেন্ট সাহেদের ‘কারবার’, স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ‘মিঠু চক্রের’ বিপুল দুর্নীতি, যুবলীগের ক্যাসিনো সম্রাট-খালেদের তেলেসমাতি, নরসিংদীর পাপিয়া-কাণ্ড, ফরিদপুরের দুই ভাইয়ের দিনকে রাত রাতকে দিন করার ক্ষমতাবাজির বিষয়সহ বালিশ-কাণ্ড, নারিকেল গাছ-কাণ্ড, কয়লা-কাণ্ড, লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ-কাণ্ডসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয় দেখতে দেখতে দেশের জনগণ আজ যেন বিষিয়ে উঠেছেন।

এর আগে বিগত বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফলাফল প্রকাশ করেছিল, তাতে পরপর টানা পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং তখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত সরকারকে তখন দেশ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করার চেয়ে টিআইকে দোষারোপ করতে এবং টিআই কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ পাঠাতে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। বাস্তব অবস্থা এই যে, এ দেশে দুর্নীতি কখনোই থেমে থাকেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কি অসম্ভব? এ কথা অনস্বীকার্য, আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে এবং দিনে দিনে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ব্যবহার কোথায় হচ্ছে এবং কারা ভোগ করছে, তা সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না ইত্যাদি বিষয় জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট সবার ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি থাকায় এর সুফল জনগণ সঠিকভাবে পাচ্ছেন না। তবে দুর্নীতি না থাকলে আমাদের দেশ অনেক আগেই মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশ হয়ে উঠত, সে কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের সবার প্রিয় এ দেশে যত সমস্যা জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতি তার মধ্যে অন্যতম। জনসংখ্যাধিক্য ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশটির একদিকে যেমন বিরাজ করছে সম্পদের অভাব, তেমনি অপরদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজ করছে দুর্নীতির কালো ছায়া।

দুর্নীতি নামক সমাজের সর্বগ্রাসী এই কালোব্যাধিটি যে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে দিনে দিনে রাঘববোয়ালের মতো গ্রাস করেই চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে আশার কথা এই যে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের চেয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় তথা বর্তমান সরকারের আমালে টিআই-এর জরিপে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকাংশে নিচের দিকে।

অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত ভালো পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার তখন দেশে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে ‘আস্থাহীন দেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

শুধু তাই নয়, দুর্নীতি নামক এই কালোব্যাধির কারণে একদিকে যেমন জিডিপি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফলতা পায়নি; তেমনি অপরদিকে জীবনযাত্রার মানও হয়েছিল নিম্নগামী। দুর্নীতির কারণে তখন বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছিল নাটকীয়ভাবে।

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, বন ও পরিবেশ, জেলা-উপজেলা, কর্মকর্তাভিত্তিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির মহোৎসব চলতে দেখা গেছে। তবে এ অবস্থার যে এখন উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি (অর্থাৎ, দুর্নীতিকারী যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে, তার কোনো ছাড় নেই) ঘোষণা করেছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর থাকলে আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সঠিকভাবে অব্যাহত থাকলে নিশ্চয় এই দেশ থেকে দুর্নীতি নামক কালোব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ইতঃপূর্বে আইডিবি, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা দুর্নীতি হ্রাস করার উপায় হিসাবে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। টিআইবিও বিভিন্ন সময়ে সভা, সেমিনার ও রিপোর্টের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ বর্তমান সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচনা করা যেতে পারে।

যেমন: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো; দুদককে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং অবাধ গণমাধ্যম ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যথাযথ ব্যবস্থা করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং দুর্নীতি বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।

পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদেরকে শুধু ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করাসহ তাদেরকে সামাজিকভাবে বর্জন করার ব্যবস্থা করা দরকার।

দুর্নীতি রোধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার, সুশীল সমাজ গঠন, ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও তা দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও আবশ্যক। এ ছাড়া গণমাধ্যমকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন করা এবং সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো জরুরি।

সর্বোপরি, দুর্নীতি থেকে এ দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে সর্বত্র প্রয়োজন ‘সততা’র একটি আবহ, দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিমণ্ডল। এ কথা সবারই স্মরণে রাখা দরকার, এ দেশটি আমার, আপনার, সবার।

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্ত ও লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যেসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ দেশটির জন্ম হয়েছিল, সেসব উদ্দেশ্য সফল করার পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে হলে এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত এ দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে হলে দেশ থেকে ‘দুর্নীতি’ নামক এই কালো, ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী ব্যাধিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

তাই আসুন, আমরা সবাই সম্মিলিত কণ্ঠে দুর্নীতিকে ‘না’ বলি, দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করি আর দুর্নীতিবাজদের কঠোর হস্তে দমন করি। আর নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে তুলে ধরতে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে; যে দেশের স্বপ্ন আমি, আপনি সবাই দেখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/391979/%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A8

5
কিউএস র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশকে আরও ভালো করতে হবে
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
424
Shares
facebook sharing buttonmessenger sharing buttontwitter sharing buttonpinterest sharing buttonlinkedin sharing buttonprint sharing button
ক্ষাবিষয়ক যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) প্রতি বছর মোট ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। এ ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাফল্য; শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য; আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক; গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন; পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংখ্যা; আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়ের হার ইত্যাদি।
শিক্ষাবিষয়ক যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) প্রতি বছর মোট ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। এ ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাফল্য; শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য; আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক; গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন; পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সংখ্যা; আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়ের হার ইত্যাদি।


বলা বাহুল্য, টাইমস হায়ার এডুকেশনের (টিএইচই) পাশাপাশি কিউএসের র‌্যাংকিংও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, জনপ্রিয় ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। প্রতি বছরের মতো প্রতিষ্ঠানটি ২৩ নভেম্বর তাদের ওয়েবসাইটে ২০২১ সালের এশিয়ার সেরা ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় তিন হাজার আটশ’র বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টি দেশের প্রায় এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে।

কিউএসের ওই তালিকায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ৩টি পাবলিক ও বাকি ৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে কিউএস র‌্যাংকিংয়ে জায়গা পেলেও দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এশিয়া অঞ্চলের সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পায়নি বা জায়গা করে নিতে পারেনি। কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ে (এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে) প্রতিবারের মতো এবারও সবার ওপরে আছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর।

আর এবারের র‌্যাংকিংয়ের আন্তর্জাতিক তালিকায় সেরা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি। কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং-২০২১-এ স্থান পাওয়া আমাদের দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), আহ্ছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি)। তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৩৪তম; গত বছর যা ছিল ১৩৫তম অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবার এক ধাপ ওপরে উঠেছে। র‌্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), যার অবস্থান ১৯৯তম। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ), র‌্যাংকিংয়ে যার অবস্থান ২২৮তম। দেশের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির র‌্যাংকিং ২৭১-২৮০তম। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান ৩৫১-৪০০তম। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)।

র‌্যাংকিংটিতে ডিআইইউর অবস্থান ৪০১-৪৫০তম। একই অবস্থানে রয়েছে ইস্ট ওয়েস্ট ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও। এছাড়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) র‌্যাংকিংয়ে ৪৫১-৫০০তম, আহ্ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ৫৫১-৬০০তম ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি) ৫৫১-৬০০তম স্থান পেয়েছে। গত বছর চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছিল এ র‌্যাংকিংয়ে। এবার সেটি বেড়ে ১১-তে দাঁড়িয়েছে; যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বিষয়।

এবারের র‌্যাংকিং পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অবস্থান চতুর্থ; যা একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক বিরাট ও অনন্য অর্জনই বটে। যা হোক, কিউএস র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া আমাদের দেশের ৩টি পাবলিক ও ৮টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এখন থেকে এ ১১টি বিশ্বদ্যিালয়সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমাজে নিশ্চয়ই একটু হলেও বিশেষ মর্যাদায় দেখা হবে। তাছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কারও কাছে তাদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-পরিচয় দিতে গিয়ে একটু হলেও গর্ব অনুভব করবেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গৌরবময় অর্জন সম্ভব হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সার্বিক সহযোগিতার ফলে। কিউএসের র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর আন্তরিকতা থাকলে এগিয়ে যাওয়া যায় অনেক দূর, সগৌরবে দাঁড়ানো যায় মাথা উঁচু করে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, এ প্রাপ্তি ও অর্জন এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল।

কারণ, ভালোর কোনো শেষ নেই এবং স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে মাথায় রাখতে হবে, এখানেই শেষ নয়, যেতে হবে বহুদূর। এ যেন আমেরিকান বিখ্যাত কবি Robert Frost রচিত Stopping by Woods on a Snowy Evening শীর্ষক কবিতার বিখ্যাত সেই লাইন ‘And miles to go before I sleep, And miles to go before I sleep’ কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১০৭টি প্রাইভেট এবং ৪৬টি পাবলিক ইউনিভার্সিটি রয়েছে। এসব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীর তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসন সংখ্যা অনেক কম। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে পাস করাও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুয়োগ থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘকাল থেকেই দেশে এ অবস্থা চলে আসছে।

এ অবস্থার কারণে অতীতে দেশের অনেক শিক্ষার্থী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাতেন। এতে করে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং মেধা উভয়ই বিদেশে পাচার হতো। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং দেশে মানসম্মত শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালে আগের আইনের স্থলে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়।

এ কথা সবারই জানা আছে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) হচ্ছে দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পৃথকভাবে নিয়ে ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ও সমসাময়িক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কিউএসের মতো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে এ ধরনের র‌্যাংকিং করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের ইতিবাচক পরিবর্তন তথা উন্নয়ন ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৮ জুন অনুষ্ঠিত ইউজিসির এক সভায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং (অবস্থান নির্ধারণ) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংবিষয়ক ওই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে ইউজিসির দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে এ ধরনের র‌্যাংকিং করার প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিউএস কিংবা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) কর্তৃক পরিচালিত ও প্রকাশিত র‌্যাংকিং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও সর্বজনগ্রাহ্য। কিউএস কিংবা টিএইচই-এর র‌্যাংকিং যেহেতু সমসাময়িক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ, তাই কিউএসের এ ধরনের র‌্যাংকিং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এবং তা আন্তর্জাতিক মানেরও বটে।

এ ধরনের র‌্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি প্রাইভেট এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান বুঝে র‌্যাংকিংয়ে উঠে আসার চেষ্টা করতে পারে এবং র‌্যাংকিংয়ের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়; যা উচ্চশিক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সর্বোপরি এ ধরনের র‌্যাংকিং অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ভালো করার চাপ থাকে।

মূলত এভাবেই সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং শুরু হয়েছে এবং তা মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছেছে। সুতরাং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গুণগত ও মানসম্মত আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে এ জাতীয় র‌্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

কিউএস র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যদি নোংরা রাজনীতি, দলবাজি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিহার করে একযোগে দেশ ও জাতি গঠনে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত জ্ঞানকে দেশ ও জাতি বিনির্মাণে ভালোভাবে কাজে লাগানো যাবে। ফলে তখন খুব দ্রুত এবং খুব সহজেই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে; যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমি, আপনি, সবাই দেখি।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্টের সহযোগী সদস্য
kekbabu@yahoo.com

 Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/369247/%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%8F%E0%A6%B8-%E0%A6%B0%E2%80%8C%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%B0%E0%A6%93-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87?fbclid=IwAR24rkizm3xvUHV54jE7Z0lB7QJoW4uQkpDl0mlTfN9H8OaQk5RWPijKDuk

6
ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না কেন
প্রকাশিতঃ অক্টোবর ০৪, ২০২০
 
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে দেশের সচেতন জনগণ এবং ফেসবুক থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমগুলো। এ ঘটনার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। সিলেটের ওই ঘটনায় ধর্ষকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে দুজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। শুধু দেশেই আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলছে ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ও নির্যাতন। এ দেশে ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে দুই-তিন বছরের কোমলমতি শিশু পর্যন্ত কেউ-ই রেহাই পাচ্ছে না। অনেক সময় অনেক হুজুর দ্বারাও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ধর্ষণ বা বলাৎকারের ঘটনা ঘটে। আর এ সমাজে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও ধর্ষণ করার ঘটনাতো অহরহই ঘটে চলেছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সমাজ ও মান-সম্মানের ভয়ে ধর্ষণের বিষয় কাউকে জানান না। তখন বিষয়টি লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। অনেক সময় এ-ও দেখা যায়, ধর্ষণ করার ঘটনা ধর্ষক বা তার সহযোগী কর্তৃক ভিডিও আকারে ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে কিংবা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয়-ভীতি দেখিয়ে ওই মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, তার কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়া হচ্ছে। একজন মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা কি আমাদের ভেবে দেখা উচিত নয়? পাশাপাশি ওই মেয়েটিকে বা ওই মেয়েটির পরিবারকে আমাদের ’সমাজ’-ই বা কোন চোখে দেখে থাকে, তা কি আমরা ভেবে দেখি? আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, একজন মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ধর্ষণের ওই ঘটনা তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ানোর ফলে তার মানসিক শান্তি থাকে না। থাকে না ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন এবং শেষ পর্যন্ত তার আত্মবিশ্বাসটুকুও দিনে দিনে লোপ পেতে থাকে। সর্বোপরি, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি মানসিকভাবে এমন অশান্তি এবং যন্ত্রণাময় জীবন অতিবাহিত করেন যে, তিনি যেন জীবিত থেকেও মৃত। আবার অনেক সময় অনেক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে থাকেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ধর্ষণের মতো ফৌজদারী অপরাধ, ন্যক্কারজনক ও জঘন্য ঘটনা ঘটলেও ধর্ষিতা কিংবা তার পরিবার অনেক সময় ন্যায়বিচারটুকু পর্যন্ত পান না। একটি স্বাধীন, সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এর চেয়ে বড় লজ্জার, দুঃখের ও আশ্চর্যের বিষয় আর কি হতে পারে?

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০১৯ সালে দেশে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২জন। অর্থাৎ, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ, যা প্রকৃত পক্ষেই ভয়াবহ একটি বিষয়। ওই সংস্থার হিসাব মতে, ২০১৭ সালে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। অপর এক হিসেবে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০জন নারী। নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ। ২০১৯ সালে যৌন হয়ানারীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪জন পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশব্যাপী ধর্ষণ, হত্যা এবং নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় সচেতন দেশবাসী ও অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থা নিঃসন্দেহে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অশনিসংকেতই বটে। আমাদের দেশে আশঙ্কাজনক হারে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাসমূহ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। বলাবাহুল্য, কোন সমাজে ধর্ষণ বিস্তৃত হলে এবং ধর্ষকদের কঠোর সাজার ব্যবস্থা করা না হলে সেই সমাজে নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বলে কিছুই থাকে না। এ ধরনের ঘটনা পুরো সমাজ, দেশ ও জাতিকে বিশৃঙ্খলা ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে, যা কখনোই শুভ কোন বিষয় নয়। এমতাবস্থায় সমাজ থেকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও ভয়ানক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে।

ধর্ষণের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় : ১. ধর্ষণকারীদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না থাকার কারণে নির্দ্বিধায় ধর্ষণ করতে উদ্যোগী হচ্ছে। ২. যে সমাজে আইনের শাসন নেই কিংবা থাকলেও তা দুর্বল বা ভঙ্গুর, সেই সমাজের লোকেরা ধর্ষণ উপযোগী পরিবেশ পায় এবং ধর্ষণ করে। সুতরাং, সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনের শাসনের অভাব ধর্ষণের জন্য দায়ী। ৩. পর্নোগ্রাফি, সেসব দেখে অনেক পুরুষ ধর্ষণে উৎসাহিত বোধ করে। ৪. মেয়েদের ওপর আধিপত্য বিস্তার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতাও ধর্ষণের অন্যতম কারণ। ৫. ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে কোন দুর্বল মেয়ে, শিশু বা ছেলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটায় ধর্ষণের মাধ্যমে। ৬. অনেক সময় বন্ধুবান্ধব একসঙ্গে হয়ে আকস্মিকভাবে কোন অসহায় মেয়েকে একা পেয়ে আনন্দ-ফুর্তি করার জন্যও ধর্ষণ করে। এ ছাড়া বর্তমানে ইন্টারনেটসহ নানা ধরনের তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াসহ পারিপার্শ্বিক আরও অনেক কারণে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে যেভাবেই ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন হোক না কেন, তা গুরুতর ফৌজদারী অপরাধ। বাংলাদেশ দ-বিধির ৩৭৫ ধারা মোতাবেক, যদি কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সম্মতি ব্যতিরেকে, সম্মতিক্রমে-যে ক্ষেত্রে তাকে মৃত্যু বা আঘাতের ভয় প্রদর্শন করে তার সম্মতি আদায় করা হয়, তার সম্মতিক্রমে-যে ক্ষেত্রে লোকটি জানে যে সে তার স্বামী নয় এবং নারীটি এ বিশ্বাসে সম্মতিদান করে যে পুরুষটির সঙ্গে সে আইনানুগভাবে বিবাহিত অথবা সে নিজেকে আইনানুগভাবে বিবাহিত বলে বিশ্বাস করে এবং পঞ্চমত: তার সম্মতিক্রমে বা ব্যতিরেকে-যেক্ষেত্রে সে ১৪ বছরের কম বয়স্ক হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ ধারা মোতাবেক ধর্ষণের অপরাধের যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছে, ধর্ষণের ফলে কোন নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে। তবে শিশু ধর্ষণ বা নির্যাতন বা হত্যা বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন এ ধরনের ঘটনা কোনভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা করা অধিকতর মঙ্গলজনক। কারণ চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎবৎ. ধর্ষণের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের দর্শন ও নৈতিকতার উন্নয়ন করতে হবে, আমাদের মনের অশুভ চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় সমাজে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ হওয়াটা খুবই জরুরী। ধর্ষকরা অনেক সময় উপযুক্ত শাস্তি পায় না বলেই পরবর্তীকালে তারা আবারও বীরদর্পে ধর্ষণ করে। আর তাদেরকে দেখে অন্যরাও ধর্ষণ করতে উৎসাহিত হয়। এভাবে চলতে থাকলে এ সমাজ, দেশ ও জাতি কলুষিত হবে। দেশ পরিণত হবে মগের মুল্লুকে। তাই ধর্ষণ রোধে প্রতিটি পরিবার থেকে প্রতিটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন, যেন বড় হয়ে সে কোনভাবেই এ পথে পা না বাড়ায়। পরিবারই শিশুর আচরণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদির ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সর্বোপরি, ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারসহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সুধীসমাজসহ সকলের একযোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন ধর্ষণকে যে কোন মূল্যে প্রতিহত করা। এ দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ঘটানোসহ সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই ধর্ষণকে কঠোর হস্তে প্রতিহত করা এখন সময়ের দাবি এবং তা অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com

 Link: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/527895/%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8/

7
অসচ্ছল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করণীয়
প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০   

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

কিছু দিন আগে একটি টেলিভিশনে দেশের অসহায় ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাতকারভিত্তিক একটি বিশেষ প্রতিবেদন দেখছিলাম। ওই প্রতিবেদনের মাধ্যমে উঠে আসে দেশের অসহায় ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে এই দ্রব্যমূল্যের উর্র্ধগতির বাজারে কত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। অপর এক প্রতিবেদনে এক অসহায় মুক্তিযোদ্ধার ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করার করুণ বিষয় উঠে আসে। এরপর মনে মনে ভাবলাম, ‘হায় সেল্যুকাস! সত্যিই বিচিত্র এই দেশ। কারণ, এ দেশে কোন রাজাকারকে ভিক্ষা করতে দেখা যায় না এবং কেউ কখনও কোন রাজাকারকে ভিক্ষা করতে দেখেছে বলে মনেও হয় না। অথচ এ দেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করেন। কারণ, তাঁদের সামনে আর বিকল্প কোন উপায় থাকে না। একটি স্বাধীন দেশে এর চেয়ে বড় কষ্টের বিষয় আর কি হতে পারে? এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রেখে ও বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ দেশকে স্বাধীন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধারা নিঃসন্দেহে এ দেশের বীর সন্তান। সব বাধাবিপত্তি আর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে যাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন, অসম্ভবকে সম্ভব করার কল্পনা করতে পারেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন, কেবল তাঁরাই পারেন বিপ্লব আনতে, বিপ্লব সংঘটিত করতে। ১৯৭১ সালে এ বিষয়টিই আরেকবার প্রমাণ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নামক এ দেশের বীরসন্তানেরা। ১৯৭১ সালে তাঁরা সমরাস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষিত পাক হানাদার বাহিনীর হিংস্রতার সামনে শুধু দেশপ্রেমকে পুঁজি করে যুদ্ধে নেমেছিলেন। সেই বীর সংশপ্তকেরা সেদিন সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন শুধ দেশমাতৃকার জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য। এহেন গর্বিত সন্তান বিশ্বের ইতিহাসে অনেকটাই বিরল। একাত্তরের সেই উত্তাল ও অগ্নিঝরা দিনগুলিতে কিভাবে এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন প্রশিক্ষিত হিংস্র হায়েনাদের সঙ্গে তা ভাবতেই অবাক লাগে। বৃষ্টিতে ভিজে, কনকনে শীতের রাতে খালি গায়ে, নগ্ন পায়ে, কখনও বা বনে-জঙ্গলে, কখনও বা পচা পুকুর-ডোবায় গলা ডুবিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন এ দেশের দামাল সন্তানেরা। মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর বুলেট-বেয়নেটের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধাই যুদ্ধের মাঠে শত্রুর আঘাতে আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। পঙ্গুত্ব বরণকারী এসব মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি দেশে রয়েছে অনেক অসহায় ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্মৃতির পাতায় পাতায় এসব বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরগাঁথা কাহিনী লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে আছে যুদ্ধাহত পরিবারের কথা। লুকিয়ে আছে পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর গণহত্যার কথা। আরও লুকিয়ে আছে সম্ভ্রম হারানো মা-বোনের অজানা বেদনার কথা, অব্যক্ত ব্যথার কথা। অথচ আমরা বর্তমান প্রজন্ম দেশের এসব বীর সন্তানের স্মৃতিকথাগুলো রক্ষা করার চেষ্টা কতটুকু করছি? যদি অবহেলায় হারিয়ে যায় এসব মানুষ, তা হলে আমাদের গৌরবময় স্মৃতি পরিণত হবে শুধু আনুষ্ঠানিকতায়। আর আজ যারা অসহায়, অসচ্ছল ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন, তাঁদের জন্যই বা আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? শুধু বিশেষ দিনগুলোতে বা ডিসেম্বর কিংবা মার্চ মাসে আমরা স্মরণ করি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। প্রকৃতপক্ষে দেশমাতৃকার এসব বীর সন্তানের জন্য আমরা স্থায়ীভাবে কতটুকু করতে পেরেছি তা ভেবে দেখা দরকার। মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও যে সমস্ত পরিবার ১৯৭১ সালে গণহত্যার শিকার হয়েছেন, তাঁরা সরকার থেকে যা অনুদান বা সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন (যদিও পূর্বের তুলনায় সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি পেয়েছে), তা দিয়ে এই দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির বাজারে তাঁদের সংসারের প্রয়োজন মেটানো, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোসহ জীবন ধারণ করা অনেকটাই কষ্টকর।

এসব বিষয় ভাবতেই যেন অবাক লাগে। গা শিউরে ওঠে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধা নামক বীর সন্তানদের জন্য আমাদের যদি কিছু করার থাকে, তবে এখনই তার উপযুক্ত সময়। এরই প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, আনসার বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর উন্নয়নের জন্য ব্যাংক থাকলেও এখন পর্যন্ত অসহায়, অসচ্ছল ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সব মুক্তিযোদ্ধার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আজ পর্যন্ত কোন ব্যাংক চালু করা হয়নি। আনসার উন্নয়ন ব্যাংক, সেনাবাহিনীর জন্য মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড (এমটিবিএল) ব্যাংকের মতো মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংক কিংবা অসহায়-যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংক গড়ে তোলা যেতে পারে। কেননা দেশের অসংখ্য অসহায়-দুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা সরকারীভাবে মাসিক যে অনুদান বা সম্মানী ভাতা পেয়ে থাকেন, তা দিয়ে বর্তমান বাজার মূল্যে দিনাতিপাত করা কঠিন। আবার বাংলাদেশ যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং এখানে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাসহ অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই সরকারের পক্ষেও দেশের সব অসহায়-দুস্থ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করা বাস্তবিক অর্থে সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থসংস্থান দু’ভাবে হতে পারে। প্রথমত, সব মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে এককালীন ৫০০ টাকা (নির্ধারিত) সংগ্রহ করে একটি ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে। থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা এ টাকা প্রত্যেকের কাছ থেকে তালিকার মাধ্যমে সংগ্রহ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে এককালীন ফান্ড হিসেবে জমা দিতে পারেন। বাকি টাকা সরকার জোগান দিয়ে ব্যাংকটি চালু হতে পারে। এক্ষেত্রে সন্দেহ দূর করার জন্য তালিকা অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়ে টাকা পৌঁছানোর পর প্রত্যেকে যেহেতু একই পরিমাণ অর্থ দিচ্ছেন, তাই অর্থ মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে সমগ্র দেশের এককালীন সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করবে। অথবা সমস্ত টাকাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে : * ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারকে হতে হবে সচেতন। কারণ, পরবর্তীতে যেন অন্য কোন সরকার মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা দিতে না পারে। এ ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। * এ ব্যাংকে যোগ্যতার ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা ও আত্মীয়স্বজনদের চাকরির সুযোগ থাকবে শতকরা ৯০-১০০ ভাগ। এ ক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ, তাঁদের সন্তান ও আত্মীয়স্বজনদের এ সুযোগ-সুবিধাটুকু দেয়া খুব একটা বেশি অনুচিত হবে না। * দেশের প্রতিটি থানা, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে অসহায়-দুস্থ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গণহত্যার শিকার পরিবারের সন্ধান করতে হবে। এ দায়িত্ব পালন করতে পারে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী বা যে সব সংস্থা, সংগঠন, লেখক বা গোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করেছেন অথবা করছেন এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এসব পরিবারের সদস্যদের সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ও সহজ কিস্তিতে ঋণ শোধের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে হবে। স্বাধীনতার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এসব পরিবারকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। কারণ, স্বাধীনতা প্রাপ্তির সমস্ত কষ্ট এঁরা বুকে ধারণ করলেও এখন পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবাতাস পাননি।

* ব্যাংকের উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে এ ব্যাংকের অর্থ মুনাফাভিত্তিক শর্তে বিনিয়োগ করতে পারেন।

* সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা মুনাফাভিত্তিক শর্তে অন্যান্য ব্যাংকের মতো এ ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে পারেন।

* ব্যাংকের উপার্জিত/লভ্যাংশের একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক বেতন হিসেবে দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যয়ভার কমে যেতে পারে।

* সরকার যদি ব্যাংকের লভ্যাংশ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক অনুদান বৃদ্ধি করে, তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা সুবিধা পাবেন এবং সরকারও তাতে লাভবান হবে।

বর্তমানে দেশের স্থানে স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যাংক। তাহলে কেন আমরা এ দেশের অবহেলিত, বঞ্চিত, নিঃস্ব যোদ্ধাদের বস্তুত সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ‘ম্ুিক্তযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত করতে পারব না। পাশাপাশি, হিসেব করলে দেখা যাবে, এদেশে বিত্তশালীদের সংখ্যা নেহায়তই কম নয়। এসব বিত্তশালী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের বীর সন্তানদের অবদানকে সম্মান জানাতে এবং সর্বোপরি অসহায় ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মানবেতর তথা কষ্টের জীবনের অবসান ঘটাতে স্থায়ীভাবে যেমন : হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগলের খামার করে দিয়ে, দোকানপাট বা ব্যবসা-বাণিজ্য করার মতো কিছু ব্যবস্থা করে দিয়ে বা কুটির শিল্প জাতীয় কিছু করে দিয়ে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারেন। এতে করে অবশ্যই ওই অসহায় ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যদের স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হবে এবং তখন আর ওইসব অসহায় ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে আর মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে যাঁদের রক্ত উষ্ণ হয়েছিল স্বাধীনতার প্রত্যাশায়, বর্তমান সরকারের সময়ে আজ তাঁরা অবার অনেক স্বপ্ন নিয়ে বুক বাঁচতে শুরু“ করেছেন। বর্তমান সরকারসহ সব দেশপ্রেমিক জনগণের আন্তরিক সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক কল্যাণে ‘মুক্তিযোদ্ধা উন্নয়ন ব্যাংক’ গড়ে তোলা কি অসম্ভব? নিশ্চয় নয়। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। আর এগুলো সম্ভব হলেই অসহায়, অসচ্ছল ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্টের জীবনের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির (যুক্তরাজ্য) সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্টের সহযোগী সদস্য

Link: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/525071/%E0%A6%85%E0%A6%B8%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A6%B2-%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%A4-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%80%E0%A7%9F/
 

8
জীবনকে ভালোবাসতে শিখতে হবে
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
8
Shares
facebook sharing buttonmessenger sharing buttontwitter sharing buttonpinterest sharing buttonlinkedin sharing buttonprint sharing button
বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস
আজ ১০ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় বিধানের আলোকে ছোটবেলা থেকেই আমরা ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’- এ কথা শোনার পাশাপাশি বিশ্বাস করে আসছি এবং আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধও বটে। তা সত্ত্বেও সমাজে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে।


সম্প্রতি বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। আবার অনেকেই হয়েছেন বিমোহিত। কারণ প্রিয় নায়কের অস্বাভাবিক মৃত্যু মন থেকে মেনে নেয়া যায় না। সুশান্তের বাসা থেকে তার লাশসহ অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন উদ্ধারের মাধ্যমে ধরে নেয়া যায়, এটি একটি আত্মহত্যা। শুধু বলিউড তারকা সুশান্ত-ই নয় বরং পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

এ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। বলাবাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেয়া হয়, তেমনি অপরদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যা নামক এ মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে। যদিও এটিকে কোনো সমাজই কখনও ভালো চোখে দেখেনি এবং আগামীতেও দেখবে বলে মনে হয় না। একজন ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে সাধারণত যে কারণগুলো থাকে তা হচ্ছে- বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনোকষ্ট, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা, গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্তহীন দিনযাপন ইত্যাদি মানব মস্তিষ্ককে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত করে), পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, এনজাইটি ডিসঅর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ২০২০ সালের মধ্যেই হৃদরোগের পরেই বিষণ্নতা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০১২ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮ লাখ ৪ হাজারটি।

প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০টি, যার মধ্যে ৫৮-৭৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারীই নারী। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। তথ্যপ্রযুক্তির বহুমাত্রিক অপব্যবহারসহ নানা কারণে আগের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ অবস্থা অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রেমে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ধরনের প্রবণতা বেড়েই চলছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আত্মহত্যাচেষ্টার প্রবণতা বেড়ে চলা এবং অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতায় ভুগলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর।

কোনো শিক্ষার্থী যদি আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তবে তা হবে সমাজ-দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। কারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাদের পরিবারসহ সমাজ, দেশ ও জাতি ভালো অনেক কিছু আশা করেন। একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ ওই শিক্ষার্থীকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। এ বিষয়গুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীরই উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে তাদের বাবা-মা, অভিভাবকরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেখাতে পাঠান।

মানুষের জীবনেই সমস্যা আছে এবং সমস্যা আসবে- এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে, জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে সমস্যা এলে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে ও বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান খোঁজা দরকার। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। যখন কেউ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তখন ধরে নেয়া হয় এটি তার মানসিক অস্থিরতা বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটা, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল লাভ করতে না পারা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, ধর্ষণ, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তিসংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি।

এসবের পাশাপাশি রয়েছে প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যুর খবর; কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা, ‘এ পৃথিবীতে কেউ আমাকে চায় না’; ‘এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার কোনো লাভ নেই’- এ জাতীয় বদ্ধমূল চিন্তাভাবনা ইত্যাদি। এসব চিন্তার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। আর তখনই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতাও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। পরিবারের সব সদস্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারা এবং দীর্ঘদিনেও ঋণমুক্তির উপায় খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদিও রয়েছে আত্মহত্যার কারণের মধ্যে। এছাড়াও প্রেমে ব্যর্থতাসহ প্রেমিক-প্রেমিকার ইচ্ছাপূরণের জন্য জেদের বশবর্তী হয়েও অনেক তরুণ-তরুণীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন- জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। তাছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যা প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে।

এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা প্রবণতা কমায়। সুতরাং শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি, আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিয়মিতভাবে তা প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে তা আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনটিকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায় তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই আসুন, আত্মহত্যার চিন্তা ও আত্মহত্যার পথ পরিহার করে এখন থেকেই আমরা আমাদের জীবনকে ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখি।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির (যুক্তরাজ্য) সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্টের সহযোগী সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/343158/%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87

9
চামড়া ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙা কি অসম্ভব?
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ২৮ জুলাই ২০২০,

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি হচ্ছে ঈদুল আজহা। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ এবং প্রতিবছর এ দেশে ঈদুল আজহায় ত্যাগের মহিমায় লাখ লাখ পশু তথা গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কোরবানি করা হয়। ইসলাম ধর্মের বিধান মোতাবেক, কোরবানিকৃত এসব পশুর চামড়ার টাকা গরিব, এতিম, অসহায়, দুস্থ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য। সহজভাবে বলতে গেলে কোরবানির পশুর চামড়ার টাকা গরিবের হক। অথচ কয়েক বছর ধরে এ দেশে কোরবানির সময় পশুর চামড়া ন্যায্যমূল্যে বিক্রি না হওয়ায় গরিব-দুঃখী, অসহায় ও দুস্থরা তাদের প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা দুঃখজনক। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তার ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় ঈদুল আজহার সময়; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ সময়টাতেই ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চামড়ার দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করে।

অসাধু ও ‘শক্তিশালী’ সিন্ডিকেটের বেড়াজালে দেশে কয়েক বছর ধরে ঈদের আগেই কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে আসছে। গত বছর স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার। তারল্য সংকটের অজুহাত তুলে চামড়ার বাজার বিপর্যয়ের মুখে ফেলা হয়।

গত বছর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে লক্ষাধিক পিস পশুর চামড়া ফেলে দেয়, যার অধিকাংশই মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়। আবার কিছু ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে। আর রাস্তায় ফেলে যাওয়া চামড়ার পচা-দুর্গন্ধ এখনও জনগণ ভোলেনি। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে ‘চামড়া সিন্ডিকেট’কে দায়ী করে তখন এ বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, চামড়া শিল্পের এ অবস্থার কারণে এ খাতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে গেছে। দুই-তিন বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। গ্রামাঞ্চলে ক্রেতার অভাবে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। গত বছরের মতো এ বছরও যদি চামড়া নিয়ে ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ খাতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। সর্বোপরি, দেশের বিপুলসংখ্যক অসহায়, দরিদ্র, দুস্থ ও এতিমরা তাদের ন্যায্য হক থেকে বঞ্চিত হবেন, যা কাম্য নয়।

একটা সময় ৭০-৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গরুর চামড়া ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে; কিন্তু বিগত বছর এবং তার আগের বছরে চামড়ার দাম এতটাই নিুমুখী ছিল যে, ওই ধরনের গরুর চামড়া ৪-৫শ’ টাকাতেও বিক্রি হয়নি। গত বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ টাকা, খাসি ১৮ টাকা ছিল, যা ২০১৭ সালের চেয়ে ৫ টাকা কম। অন্যদিকে, কাঁচা চামড়ার দাম অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও দেশে চামড়ার তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র তথা মানিব্যাগ, জুতা, স্যান্ডেলসহ চামড়াজাত অন্যান্য পণ্যের বাজারমূল্য বেশ চড়া।

দেশে চামড়া বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে ২০১৮ সালে বিক্রেতাদের অনেকেই ৩০ শতাংশ কম মূল্যে পশুর চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে ট্যানারি মালিকসহ এ শিল্পসংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও দেশের গরিব, এতিম ও অসহায় মানুষ তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। চলতি বছর করোনা মহামারীর মধ্যে পালিত হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা।

করোনার প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই দেশের গরিব, দুঃখীদের অবস্থা আগের তুলনায় অনেকাংশে খারাপ। এর মধ্যে তারা যদি কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা হক হিসেবে একটু বেশি পরিমাণে পান, তাহলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। কিন্তু চামড়ার মূল্য গত বছরের মতো হলে ওইসব গরিব-দুঃখীর কষ্ট লাঘব হবে না। সার্বিক দিক বিচেনায় দেশের চামড়া বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার সঠিক বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে কয়েক বছর ধরে ঈদ মৌসুমে চামড়ার দাম কেন প্রবল মাত্রায় কমে যাচ্ছে? কারা রয়েছে ‘নেপথ্যের কারিগর’ হিসেবে? এদের খুঁজে বের করা কি অসম্ভব? দেখা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে দুটি সিন্ডিকেট সর্বদা সক্রিয়। একটি হচ্ছে ট্যানারি মালিকপক্ষ। আরেকটি হচ্ছে আড়তদার পক্ষ। চামড়ার বাজারে করুণ অবস্থার পেছনে অবশ্যই এসব সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কোরবানিদাতা থেকে শুরু করে সবাই কথিত এ ‘সিন্ডিকেট’কে দোষারোপ করে আসছেন।

বিগত বছরগুলোয় চামড়ার দাম কমে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা পরস্পরকে দায়ী করতে দেখা গেছে। কাঁচা চামড়ার দাম কমানোর নেপথ্যে একদিকে আড়তদারদের দায়ী করে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’ চামড়ার দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে। তাদের অভিযোগ, আড়তদাররাই ‘সিন্ডিকেট’ করে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের ঠকাচ্ছে।

ট্যানারি ও আড়তদার ছাড়াও এর সঙ্গে সম্প্রতি নতুন একটি ‘সিন্ডিকেট’ যোগ হয়েছে। সেটি হচ্ছে লবণ ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট। ঈদের রাতে বা তার আগের রাতে ৬০ কেজির এক বস্তা লবণের দাম এক হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করা হয়েছে। অথচ, এক সপ্তাহ আগে ওই লবণের দাম ছিল তার অর্ধেক। ত্বরিত গতিতে লবণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই সংরক্ষণের জন্য চামড়া কিনতে সাহস পায়নি।

চামড়ার বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের জন্য এটিও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। চামড়া বাজারের নেপথ্যে থাকা এসব ‘সিন্ডিকেট’-এর সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এদের খুঁজে বের করতে প্রয়োজন শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা।

সরকার কর্তৃক দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও ঈদের দু’দিন আগে থেকেই বেশি দামে চামড়া না কেনার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একের পর এক পরামর্শ দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য দিতে দেখা গেছে চামড়া খাতের নেতাদের। ওই সময় ‘বেশি দামে চামড়া কিনলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে’, ‘আড়তদারদের হাতে চামড়া কেনার মতো নগদ টাকা নেই’, ‘আড়তদাররা এবার সব চামড়া কিনতে পারবেন না’, ‘কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে হতে পারে’, ‘লবণ ব্যবসায়ীরা ঈদের আগে থেকেই লবণের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, তাই কাঁচা চামড়া কম দামে কিনতে হবে’- এমন সব মন্তব্য তারা আগে থেকেই করেছেন।

ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাবান্বিত হন। অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে তারা ৮০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়ার দাম ২০০ টাকার বেশি বলেননি। কিন্তু এত কম দামে চামড়া কিনেও তা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে তারাই উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, তখন দেশের অনেক জায়গায় আড়তদাররা চামড়াই কিনতে চাননি।

আবার কেউ কেউ চামড়া কিনলেও যা দাম বলেছিল, তা দিয়ে অধিকাংশ মৌসুমি চামড়া ক্রেতাদের গাড়ি ভাড়ার খরচও ওঠেনি। ফলে যারা সংরক্ষণের কথা ভেবেছিলেন, তারা উল্টো পথে গাড়ি ভাড়ার খরচসহ লবণ কেনা ও মাখিয়ে সংরক্ষণ করার খরচ, এরপর আবারও গাড়ি ভাড়া দিয়ে পরে এর চেয়ে বেশি দাম পাবেন কি-না বা সেই দামে পোষাবে কিনা ইত্যাদি বিষয় ভেবে অনেকে রাস্তাতেই কাঁচা চামড়া ফেলে চলে যান। অনেকে চামড়ার দামের কথা শুনে মাটিতে পুঁতে ফেলেন।

বিগত কয়েক বছর দেশব্যাপী চামড়া নিয়ে যে অসন্তোষ দেখা গেছে, তা যেন এ বছর কোনোভাবেই দেখা না যায়, সেই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবশ্যই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা প্রতিবছরই একে অপরকে দোষারোপ করে পার পেয়ে যায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয় মৌসুমি ব্যবসায়ী আর বঞ্চিত হয় কোরবানিদাতা এবং গরিব ও এতিমরা। তাই অবিলম্বে এ অবস্থার অবসান ঘটাতে সরকারের পাশাপাশি দেশের সচেতন জনগণ, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিতভাবে দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/330182/%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%9C%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%9F-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%BF-%E0%A6%85%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AD%E0%A6%AC


10
দেশে এত বেশি লঞ্চ দুর্ঘটনা কেন?
প্রকাশিতঃ জুলাই ২৬, ২০২০         

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির ঘটনা এদেশে নতুন কোন বিষয় নয়। প্রায় প্রতিবছরই লঞ্চডুবিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হন। তখন চোখে পড়ে স্বজন হারানো ব্যক্তিদের আহাজারির দৃশ্য। এ নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ হয়। গণমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে এ সংক্রান্ত খবরা-খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। আর যথারীতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তখন চিরায়িত প্রথা অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন, ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর কিছুদিন পরেই দেশে ঘটল অন্য একটি বড় ঘটনা। তখন চাপা পড়ে গেল লঞ্চডুবি বা নৌদুর্ঘটনার ঘটনা। যখন অন্য একটি ঘটনার রেশে লঞ্চডুবি বা নৌদুর্ঘটনার ঘটনা চাপা পড়ে গেল, তখন আর কেউ জানতে পারে না ওই লঞ্চডুবির পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আদৌ নেয়া হয়েছে কি না। কিংবা লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আদৌ আলোর মুখ দেখেছে কি না। এই হচ্ছে বাস্তব অবস্থা। দেশে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে লঞ্চডুবির ন্যায় মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত লঞ্চ বা নৌ-দুর্ঘটনা রোধে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও দেশবাসী লঞ্চডুবির ঘটনা প্রত্যক্ষ করল গত ৩০ জুন। ওই দিন ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামক একটি লঞ্চকে ময়ূর-২ নামের অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড নামের ওই লঞ্চটি নদীতে ডুবে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এতে প্রাণ হারান ৩৪জন। ইংরেজীতে ‘ডযধঃ রং ষড়ঃঃবফ পধহহড়ঃ নব নষড়ঃঃবফ’ নামক একটি প্রবাদ আছে। যার অর্থ, কপালের লিখন না যায় খ-ন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নৌ-পথগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এদেশের জনগণের কপালের লিখন? আবার এসব দুর্ঘটনাগুলোকে যদি এদেশের প্রেক্ষিতে না দেখে যদি উন্নত দেশের প্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে উন্নত দেশে লঞ্চডুবি বা নৌ-দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম; যা আমি জার্মানি, তাইওয়ান, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে থাকাকালীন ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ-খবর নিয়েও দেখেছি। তাহলে কপালের লিখন কি দেশ ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয় না। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে; সার্বিক নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার ধরন, চালকদের অদক্ষতা, লঞ্চের ফিটসেন, ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা, লঞ্চ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, সঠিকভাবে নৌ-আইন না মানা প্রভৃতি। যেমন: মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড নামের যে লঞ্চটি সদরঘাটে ডুবে গেল, সেই লঞ্চের চালকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ওই লঞ্চে থাকা রিফাত আহমেদ নামক এক যাত্রী যিনি গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্টভাবে বলেছেন, যে চালক মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি চালিয়েছেন, আদৌ তার লঞ্চ চালানোর সনদ আছে কি না? কারণ মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসার পর মাঝপথে লঞ্চটি আরেকটি বালুবাহী জাহাজকে (বাল্কহেড) ধাক্কা দিয়েছিল। তখন সবাই ভয় পেলেও ভাগ্যক্রমে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। আবার সদর ঘাটের কাছাকাছি আসার পর মর্নিং বার্ড নামক লঞ্চের চালক যদি সতর্ক থাকতেন, তাহলে কিন্তু এই দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত না।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে ৬৬০টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ, আহত হয়েছেন অসংখ্য আর নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬শ’ জন। ২০১৫ সাল পরবর্তী সময়গুলোতেও দেশে থেমে থাকেনি লঞ্চডুবির ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ আহত-নিহত হওয়া ছাড়াও নিখোঁজ হয়েছেন অনেকে, যাদের লাশ আর কখনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন সময়ে লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে অসংখ্য পরিবার। আবার লঞ্চডুবিতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হয়েছে অসংখ্য পরিবার। দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশিরভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে চলছে কয়েকগুণ নৌযান। তাছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌ-পুলিশ থাকা প্রয়োজন তা নেই। এসব নৌ-পুলিশকে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেয়া হলেও এসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক যান। প্রতিবছর লঞ্চ দুর্ঘটনার ঘটনাসহ হতাহতের ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনা রোধে একগুচ্ছ সুপারিশ করা হয়। এরপর রহস্যজনক কারণে বিষয়টি আর সামনের দিকে ঠিক ওইভাবে এগোয় না। দেশের কোথাও যখন বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকদিন ধরে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এ নিয়ে আর তেমন কিছু একটা হয় না। অনেক সময় দুর্ঘটনায় জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আটক হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাকফোকরে বা রাজনৈতিক প্রভাবে কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে ছাড় পেয়ে যায়। লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লঞ্চ মালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না। মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির খুবই কম। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউ-ই শেষ পর্যন্ত তেমন কোন শাস্তি পায় না। বিদ্যমান আইনে লঞ্চমালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। তাছাড়া এই আইনের ফাঁকফোকরও অনেক বেশি। ফলে আইটির সংশোধন হওয়াটা জরুরী।

দেশের নৌপথসমূহে লঞ্চ দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌদুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচারসহ নদী বন্দর টার্মিনালে মেগাফোনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরী। অতিরিক্ত যাত্রীবহন রোধ করা, লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামাদিসহ সার্ভে সনদ অনুযায়ী মাস্টার ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছে কি না নিশ্চিত করাও জরুরী। কোন লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এবং ওই লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত পরিমাণ সরঞ্জামাদি না থাকলে ওই লঞ্চের যাত্রা স্থগিত করাসহ সংশ্লিষ্ট নৌ-আদালতে মামলা দায়ের করা আবশ্যক। আর নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের ফিসনেট পরীক্ষাপূর্বক ফিসনেস সংবলিত নৌযানগুলোতে দক্ষ, ও দায়িত্ববান চালক নিযুক্ত করা অতি জরুরী। সেই সঙ্গে নৌপথে চলাচলকারী নৌযানে কর্মরত মাস্টার, ড্রাইভার, সুকানি ও আনসারদের জন্য নিয়মিতভাবে নদী বন্দরগুলোতে নৌনিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মশালার আয়োজন করাও আবশ্যক। দেশের বিভিন্ন নৌপথে নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক নৌসহায়ক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা দরকার। পাশাপাশি নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক সৎ, মেধাবী ও দক্ষ নৌপুলিশ নিয়োগ দেয়া। এসবের পাশাপাশি ঈদসহ বিভিন্ন ছুটি ও উৎসবের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন পরিহারের লক্ষ্যে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিসের সুব্যবস্থা করাও আবশ্যক। কোথাও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারাভিযানের লক্ষ্যে প্রয়োজন আধুনিক জাহাজ, স্পিডবোট, হেলিকপ্টার ও সিপ্লেন। তাছাড়া দেশের বিশাল নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে সঠিক নকশা অনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ করা হচ্ছে কি না, লঞ্চের ফিটনেস ঠিক আছে কি না নিয়মিতভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তদারকি করা আবশ্যক। সর্বোপরি, যাত্রীদেরকেও এক্ষেত্রে হতে হবে আরও বেশি সতর্ক। তারা যেন কখনোই লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে লঞ্চে না ওঠেন। উপরোক্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, গণমাধ্যম ও জনগণ কর্তৃক সুনিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশে লঞ্চডুবি তথা লঞ্চ দুর্ঘটনা নিশ্চয় অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com
Link: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/513760/%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%8F%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF-%E0%A6%B2%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9A-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8/

11
স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং জনগণের সুচিকিৎসা
ড. কুদরাত-ই-খুদা
১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০

একটি রাষ্ট্রের কাছে ওই রাষ্ট্রের জনগণের যত চাহিদা থাকে, স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে তার অন্যতম। স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ১৮(১)-এ চিকিৎসাসেবা ও জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা নামক এই মৌলিক চাহিদাটি পূরণ করতে গিয়ে দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না, বিশেষ করে জনগণ যদি যায় কোনো সরকারি হাসপাতালে। এ দেশে চিকিৎসাক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এসংক্রান্ত খবরাখবর।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট একটি অসাধুচক্র যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এ ধরনের দুর্নীতিগুলোকে বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘পুকুরচুরি’ না বলে ‘সাগরচুরি’ বলাই ভালো। ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছুসংখ্যক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। ‘শক্তিশালী’ এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ওষুধ, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘সিন্ডিকেট’ গঠন করে স্বাস্থ্য খাতে জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে। গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করে ওই সংস্থা। তখন স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে সংসদেও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি থেমে নেই। বরং তা পাগলা ঘোড়ার মতো দ্রুত বেগে চলমান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা, ঋণ ব্যবহারসহ যেসব বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে এবং দুর্নীতি হচ্ছে, তা দ্রুত ভালোভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক।

তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই ক্রান্তিলগ্ন দেশের চিকিৎসকদের  জন্য অনেক বেশি সংকটপূর্ণ সময় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ করোনার এই মহামারির সময়ে তাঁরা সম্মুখযোদ্ধা বা ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করছেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরই মধ্যে দেশে অনেক চিকিৎসক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। আবার অনেক চিকিৎসকই রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা নিয়ে এরই মধ্যে সুস্থ হয়েছেন। বলা বাহুল্য, রোগীদের খুব কাছাকাছি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হয় চিকিৎসকদের। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। অন্যথায় তাঁরা চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করবেন না। বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার বিরুদ্ধে জিততে হলে অবশ্যই চিকিৎসক আর নার্সদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল স্টাফসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের সবারই সুনজর দেওয়া উচিত। যেসব চিকিৎসক বর্তমান সময়ে খেয়ে-না খেয়ে, না ঘুমিয়ে করোনা মোকাবেলায় আন্তরিকভাবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, যাঁরা দিনের পর দিন করোনার বিরুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলেছেন, চিকিৎসক নামক সেই মহৎ মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সবারই শ্রদ্ধা নিবেদন করা নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের যেকোনো সমস্যা বা চাহিদা অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এরই মধ্যে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় যেসব চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন, তাঁদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। চিকিৎসকদের কাছে জনগণের এখন একটি বিশেষ প্রত্যাশা রয়েছে, আর তা হচ্ছে করোনাকালীন এই সংকটময় মুহূর্তে যেন কোনো রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে না হয়। কারণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে একটু ভালো সেবা আর যত্ন পেলে করোনা আক্রান্ত অনেক মানূষ সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারবে। করোনা মোকাবেলায় চিকিৎসক, নার্স আর মেডিক্যাল স্টাফদের আন্তরিক নিরলস লড়াই এবং সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার দায়িত্বশীল কর্তব্য পালন এবং সর্বোপরি জনগণ কর্তৃক সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হলে করোনার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে আমাদের জয় সুনিশ্চিত।

বর্তমান সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসকরা গ্রামীণ এলাকায় থেকে কাজ করতে বাধ্য হন। আর বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, একটা খারাপ সময়ও অনেক ভালো ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়। করোনাকালের সমাপ্তি শেষে এ দেশ একদিন নিশ্চয়ই আলোকিত হবে। সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সেই আলোকিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আর কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটবে না এবং চিকিৎসকরাও দায়িত্বে অবহেলা না করে জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আন্তরিক হবেন—এমনটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2020/07/13/934037?fbclid=IwAR2fDk90N9mSm0Mt9_8pQcCF_Eww-U_V9IB4Ter3Qw4xG5h_x1z3R5Q1T7U
 

12
ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না কেন
প্রকাশিতঃ অক্টোবর ০৪, ২০২০

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
সম্প্রতি সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে দেশের সচেতন জনগণ এবং ফেসবুক থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমগুলো। এ ঘটনার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। সিলেটের ওই ঘটনায় ধর্ষকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে দুজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। শুধু দেশেই আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলছে ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ও নির্যাতন। এ দেশে ধর্ষণের হাত থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে, গৃহবধূ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে দুই-তিন বছরের কোমলমতি শিশু পর্যন্ত কেউ-ই রেহাই পাচ্ছে না। অনেক সময় অনেক হুজুর দ্বারাও মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ধর্ষণ বা বলাৎকারের ঘটনা ঘটে। আর এ সমাজে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও ধর্ষণ করার ঘটনাতো অহরহই ঘটে চলেছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সমাজ ও মান-সম্মানের ভয়ে ধর্ষণের বিষয় কাউকে জানান না। তখন বিষয়টি লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। অনেক সময় এ-ও দেখা যায়, ধর্ষণ করার ঘটনা ধর্ষক বা তার সহযোগী কর্তৃক ভিডিও আকারে ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে কিংবা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয়-ভীতি দেখিয়ে ওই মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, তার কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়া হচ্ছে। একজন মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা কি আমাদের ভেবে দেখা উচিত নয়? পাশাপাশি ওই মেয়েটিকে বা ওই মেয়েটির পরিবারকে আমাদের ’সমাজ’-ই বা কোন চোখে দেখে থাকে, তা কি আমরা ভেবে দেখি? আমরা কি ভেবে দেখেছি যে, একজন মেয়ে যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ধর্ষণের ওই ঘটনা তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ানোর ফলে তার মানসিক শান্তি থাকে না। থাকে না ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন এবং শেষ পর্যন্ত তার আত্মবিশ্বাসটুকুও দিনে দিনে লোপ পেতে থাকে। সর্বোপরি, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি মানসিকভাবে এমন অশান্তি এবং যন্ত্রণাময় জীবন অতিবাহিত করেন যে, তিনি যেন জীবিত থেকেও মৃত। আবার অনেক সময় অনেক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে থাকেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ধর্ষণের মতো ফৌজদারী অপরাধ, ন্যক্কারজনক ও জঘন্য ঘটনা ঘটলেও ধর্ষিতা কিংবা তার পরিবার অনেক সময় ন্যায়বিচারটুকু পর্যন্ত পান না। একটি স্বাধীন, সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এর চেয়ে বড় লজ্জার, দুঃখের ও আশ্চর্যের বিষয় আর কি হতে পারে?

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০১৯ সালে দেশে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২জন। অর্থাৎ, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ, যা প্রকৃত পক্ষেই ভয়াবহ একটি বিষয়। ওই সংস্থার হিসাব মতে, ২০১৭ সালে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। অপর এক হিসেবে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০জন নারী। নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ। ২০১৯ সালে যৌন হয়ানারীর শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪জন পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশব্যাপী ধর্ষণ, হত্যা এবং নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় সচেতন দেশবাসী ও অভিভাবক মহল আজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থা নিঃসন্দেহে একটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অশনিসংকেতই বটে। আমাদের দেশে আশঙ্কাজনক হারে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাসমূহ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। বলাবাহুল্য, কোন সমাজে ধর্ষণ বিস্তৃত হলে এবং ধর্ষকদের কঠোর সাজার ব্যবস্থা করা না হলে সেই সমাজে নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বলে কিছুই থাকে না। এ ধরনের ঘটনা পুরো সমাজ, দেশ ও জাতিকে বিশৃঙ্খলা ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে, যা কখনোই শুভ কোন বিষয় নয়। এমতাবস্থায় সমাজ থেকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও ভয়ানক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে।

ধর্ষণের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় : ১. ধর্ষণকারীদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ না থাকার কারণে নির্দ্বিধায় ধর্ষণ করতে উদ্যোগী হচ্ছে। ২. যে সমাজে আইনের শাসন নেই কিংবা থাকলেও তা দুর্বল বা ভঙ্গুর, সেই সমাজের লোকেরা ধর্ষণ উপযোগী পরিবেশ পায় এবং ধর্ষণ করে। সুতরাং, সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনের শাসনের অভাব ধর্ষণের জন্য দায়ী। ৩. পর্নোগ্রাফি, সেসব দেখে অনেক পুরুষ ধর্ষণে উৎসাহিত বোধ করে। ৪. মেয়েদের ওপর আধিপত্য বিস্তার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতাও ধর্ষণের অন্যতম কারণ। ৫. ক্ষমতাশালী ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে কোন দুর্বল মেয়ে, শিশু বা ছেলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটায় ধর্ষণের মাধ্যমে। ৬. অনেক সময় বন্ধুবান্ধব একসঙ্গে হয়ে আকস্মিকভাবে কোন অসহায় মেয়েকে একা পেয়ে আনন্দ-ফুর্তি করার জন্যও ধর্ষণ করে। এ ছাড়া বর্তমানে ইন্টারনেটসহ নানা ধরনের তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াসহ পারিপার্শ্বিক আরও অনেক কারণে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে যেভাবেই ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন হোক না কেন, তা গুরুতর ফৌজদারী অপরাধ। বাংলাদেশ দ-বিধির ৩৭৫ ধারা মোতাবেক, যদি কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সম্মতি ব্যতিরেকে, সম্মতিক্রমে-যে ক্ষেত্রে তাকে মৃত্যু বা আঘাতের ভয় প্রদর্শন করে তার সম্মতি আদায় করা হয়, তার সম্মতিক্রমে-যে ক্ষেত্রে লোকটি জানে যে সে তার স্বামী নয় এবং নারীটি এ বিশ্বাসে সম্মতিদান করে যে পুরুষটির সঙ্গে সে আইনানুগভাবে বিবাহিত অথবা সে নিজেকে আইনানুগভাবে বিবাহিত বলে বিশ্বাস করে এবং পঞ্চমত: তার সম্মতিক্রমে বা ব্যতিরেকে-যেক্ষেত্রে সে ১৪ বছরের কম বয়স্ক হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ ধারা মোতাবেক ধর্ষণের অপরাধের যেসব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছে, ধর্ষণের ফলে কোন নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে। তবে শিশু ধর্ষণ বা নির্যাতন বা হত্যা বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন এ ধরনের ঘটনা কোনভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা করা অধিকতর মঙ্গলজনক। কারণ চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎবৎ. ধর্ষণের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের দর্শন ও নৈতিকতার উন্নয়ন করতে হবে, আমাদের মনের অশুভ চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় সমাজে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠে প্রতিবাদ হওয়াটা খুবই জরুরী। ধর্ষকরা অনেক সময় উপযুক্ত শাস্তি পায় না বলেই পরবর্তীকালে তারা আবারও বীরদর্পে ধর্ষণ করে। আর তাদেরকে দেখে অন্যরাও ধর্ষণ করতে উৎসাহিত হয়। এভাবে চলতে থাকলে এ সমাজ, দেশ ও জাতি কলুষিত হবে। দেশ পরিণত হবে মগের মুল্লুকে। তাই ধর্ষণ রোধে প্রতিটি পরিবার থেকে প্রতিটি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন, যেন বড় হয়ে সে কোনভাবেই এ পথে পা না বাড়ায়। পরিবারই শিশুর আচরণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদির ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সর্বোপরি, ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারসহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সুধীসমাজসহ সকলের একযোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন ধর্ষণকে যে কোন মূল্যে প্রতিহত করা। এ দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ঘটানোসহ সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই ধর্ষণকে কঠোর হস্তে প্রতিহত করা এখন সময়ের দাবি এবং তা অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/527895/%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A3-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8/

13
জীবনকে ভালোবাসতে শিখতে হবে
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজ ১০ সেপ্টেম্বর। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিবসটি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় বিধানের আলোকে ছোটবেলা থেকেই আমরা ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’- এ কথা শোনার পাশাপাশি বিশ্বাস করে আসছি এবং আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধও বটে। তা সত্ত্বেও সমাজে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। সম্প্রতি বলিউড তারকা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। আবার অনেকেই হয়েছেন বিমোহিত। কারণ প্রিয় নায়কের অস্বাভাবিক মৃত্যু মন থেকে মেনে নেয়া যায় না। সুশান্তের বাসা থেকে তার লাশসহ অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ওষুধ ও প্রেসক্রিপশন উদ্ধারের মাধ্যমে ধরে নেয়া যায়, এটি একটি আত্মহত্যা। শুধু বলিউড তারকা সুশান্ত-ই নয় বরং পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মহত্যাসংক্রান্ত নানা খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। বলাবাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেয়া হয়, তেমনি অপরদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যা নামক এ মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে। যদিও এটিকে কোনো সমাজই কখনও ভালো চোখে দেখেনি এবং আগামীতেও দেখবে বলে মনে হয় না। একজন ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে সাধারণত যে কারণগুলো থাকে তা হচ্ছে- বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনোকষ্ট, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা, গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্তহীন দিনযাপন ইত্যাদি মানব মস্তিষ্ককে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত করে), পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, এনজাইটি ডিসঅর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ২০২০ সালের মধ্যেই হৃদরোগের পরেই বিষণ্নতা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০১২ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮ লাখ ৪ হাজারটি।
প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০টি, যার মধ্যে ৫৮-৭৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারীই নারী। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। তথ্যপ্রযুক্তির বহুমাত্রিক অপব্যবহারসহ নানা কারণে আগের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ অবস্থা অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রেমে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতার ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ধরনের প্রবণতা বেড়েই চলছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আত্মহত্যাচেষ্টার প্রবণতা বেড়ে চলা এবং অনেক শিক্ষার্থী মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতায় ভুগলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর। কোনো শিক্ষার্থী যদি আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তবে তা হবে সমাজ-দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। কারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাদের পরিবারসহ সমাজ, দেশ ও জাতি ভালো অনেক কিছু আশা করেন। একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ ওই শিক্ষার্থীকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। এ বিষয়গুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীরই উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে তাদের বাবা-মা, অভিভাবকরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেখাতে পাঠান।

মানুষের জীবনেই সমস্যা আছে এবং সমস্যা আসবে- এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে, জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে সমস্যা এলে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে ও বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান খোঁজা দরকার। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। যখন কেউ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে, তখন ধরে নেয়া হয় এটি তার মানসিক অস্থিরতা বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটা, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল লাভ করতে না পারা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, ধর্ষণ, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তিসংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি রয়েছে প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যুর খবর; কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা, ‘এ পৃথিবীতে কেউ আমাকে চায় না’; ‘এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার কোনো লাভ নেই’- এ জাতীয় বদ্ধমূল চিন্তাভাবনা ইত্যাদি। এসব চিন্তার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। আর তখনই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতাও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। পরিবারের সব সদস্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারা এবং দীর্ঘদিনেও ঋণমুক্তির উপায় খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদিও রয়েছে আত্মহত্যার কারণের মধ্যে। এছাড়াও প্রেমে ব্যর্থতাসহ প্রেমিক-প্রেমিকার ইচ্ছাপূরণের জন্য জেদের বশবর্তী হয়েও অনেক তরুণ-তরুণীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোকে প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন- জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। তাছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যা প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যে কোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা প্রবণতা কমায়। সুতরাং শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি, আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিয়মিতভাবে তা প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীসহ সবাইকে জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। সবাইকে বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে তা আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। জীবনটিকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায় তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই আসুন, আত্মহত্যার চিন্তা ও আত্মহত্যার পথ পরিহার করে এখন থেকেই আমরা আমাদের জীবনকে ভালোভাবে ভালোবাসতে শিখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির (যুক্তরাজ্য) সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্টের সহযোগী সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/343158/%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87

14
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 
এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভি চ্যানেলের সংবাদের দিকে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবরাখবর। দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও তা রোধে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না এবং সেই সঙ্গে জনগণও ট্রাফিক আইন ভালোভাবে মানে না। তাই প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে মনে হয় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো নিরাপদে চলার পথ না হয়ে তা দিনে দিনে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এ দেশের জনগণের কপালের লিখন? দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোকে যদি এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে না দেখে উন্নত দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং, এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনা জনগণের কপালের লিখন নয়, কিংবা ভাগ্যদেবীর নির্মম পরিহাসও নয়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে; সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারট্রেকিং করার মানসিকতা প্রবল মাত্রায় বিদ্যমান থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, জনগণ কর্তৃক ট্রাফিক আইন কিংবা রাস্তায় চলাচলের নিয়ম না মানা প্রভৃতি। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ হলো চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি। এদেশে লাইসেন্সবিহীন ও ট্রাফিক আইন না জানা চালকের সংখ্যাই বেশি। সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।

এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয়। বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতি বছর দেশের সড়কপথে অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা ঘটছে আর এক বছরেই দেশে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং পঙ্গুত্ব বরণ করছে এর দ্বিগুণ। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিনে দিনে যে হারে বাড়ছে, তা যদি অতি দ্রুত রোধ করার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে যে ভবিষ্যতেও ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি জনগণ আহত-নিহত হতেই থাকবে। সুতরাং, সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা এখন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণও নিবিড়ভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে সঠিক পরিকল্পনাহীন দেশে অনেক অনুপযুক্ত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ নকশা থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুল পথে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বেশি গতির বড় গাড়িগুলোর অপেক্ষাকৃত কম গতির ছোট গাড়িগুলোকে ওভারটেকিং করার টেনডেন্সি থাকা, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাস্তার ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে জনগণের চলাচল করা, রাস্তা পারাপারের জন্য অনেক সময় ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়া, রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিকব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলের জন্য যেসব নিয়মকানুন রয়েছে, তা না মানা।

সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য কোনো কঠিন বিষয় নয়। এজন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। রাস্তার ওপর ফুটপাতে দোকানপাট স্থাপনসহ ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হকারদের ব্যবসা করার ‘সুযোগ’ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিকব্যবস্থা, চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশি মতো যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করা, সড়ক-মহাসড়কের ওপর রিকশা, ভ্যান, টেম্পো, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড স্থাপন করা, সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা এবং একই রাস্তা বছরে বারবার খনন করা, জনগণ কর্তৃক রাস্তা পারাপারের নিয়মকানুন সঠিকভাবে না মানার কারণে এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বাগ্রে চালকদের হতে হবে বেশি দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। আর জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তায় চলাচলের আইনকানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে দুর্নীতিমুক্তভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এখন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। সর্বোপরি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাই সচেতন হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিশ্চয় অনেকাংশে কমে আসবে।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Link: https://www.ittefaq.com.bd/print-edition/opinion/180395/%E0%A6%B8%E0%A7%9C%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%AF%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%A5-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BF

15
এ সময়ে ভেজাল খাদ্য (দৈনিক জনকন্ঠ, ১২ জুলাই ২০২০, পৃ. ৫)

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

মানুষের জীবন ধারণ ও জীবন যাপনের জন্য যতগুলো চাহিদা রয়েছে, তার মধ্যে খাদ্য হচ্ছে প্রথম ও প্রধান মৌলিক চাহিদা। কিন্তু এ দেশের জনগণ প্রতিদিন যেসব খাবার খান, তা কি সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ বা ভেজালমুক্ত? নিশ্চয় না। তার মানে, জনগণ প্রতিনিয়তই ভেজাল খাবার খাচ্ছেন। ভেজালযুক্ত খাদ্য থেকে জনগণ মুক্তি চাইলেও যেন কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছেন না। তবে একদিনে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, অসাধু ও অতি মুনাফালোভী ব্যক্তিদের ফলে মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভেজালমুক্ত খাদ্য যেমন দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধন এবং রোগ প্রতিরোধ করে, তেমনি ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন বিপন্ন পর্যন্ত হতে পারে। তাই ‘সকল সুখের মূল’ নামক স্বাস্থ্যকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে ভেজালমুক্ত খাবার গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশে শাক-সবজি, ফল-মূল, মাছ-মাংস, দুধ, গুড়, মসলা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যই ভেজালে পরিপূর্ণ। এমনকি এ দেশে শিশুখাদ্যসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মেশানো হয়েছে এবং ভেজালযুক্ত ওষুধ খেয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। আবার এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত ছাড়ও পেয়েছেন, যা গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বিষয়। বলাবাহুল্য, নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত এমনই এক বিষয় যে, এ ক্ষেত্রে কাউকে ন্যূনতম ছাড় পর্যন্ত দেয়ার কোন সুযোগ নেই। অথচ আমাদের দেশে বাস্তবে ঘটছে উল্টো ঘটনা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই কঠিন সময়েও এ দেশে থেমে নেই খাদ্যে ভেজাল দেয়ার প্রবণতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ১০ মে রাজধানীর বাদামতলীতে র‌্যাব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর অভিযান চালায়। র‌্যাবের ভাষ্য মতে, আরও সপ্তাহখানেক আগে থেকেই সেখানে রঙিন কাঁচা আম আড়তগুলোতে বিক্রি হচ্ছিল। অথচ তখন পর্যন্ত আম পাকার বা আম গাছ থেকে নামানোর সময় হয়নি। করোনার হাত থেকে যখন মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে; কোয়ারেন্টাইন ও সোশ্যাল ডিসটেন্সিংসহ নানা রকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে; সরকার যখন মানুষকে নানা বিষয়ে সতর্ক করছে; বিজ্ঞানীরাও যখন মানুষকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন, ঠিক তখনই এ দেশে চলছে বিভিন্ন খাদ্য-দ্রব্যে ভেজাল মেশানোর চির পরিচিত খেলা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, শরীরে ইমিউনিটি ভাল থাকলে ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চললে করোনা সহজে কাউকে সংক্রমিত করতে পারবে না। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যখন করোনার কোন টিকা বা ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, তখন যার যার শরীরের ইমিউনিটিকে রক্ষা করার জন্য সবাই কত চেষ্টাই না করছে। কারণ, এটাই এখন আত্মরক্ষার জন্য অন্যতম প্রধান বর্ম। সুতরাং, একে কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না, বরং শরীরে এই ইমিউনিটি কিভাবে বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। আমাদের দেশে এখন চলছে আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের মৌসুম। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রাকৃতিকভাবে পরিপক্ব বা পাকানো ফল ও শাকসবজির মধ্যে ইমিউনিটি বাড়ানোর অসীম ক্ষমতা থাকে। তাই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে অবশ্যই আমাদের প্রত্যেকের শরীরে ইমিউনিটি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরী বিষয়। কিন্তু ফরমালিন মেশানো আমসহ বিভিন্ন ফল, শাক-সবজি এবং ভেজাল মেশানো বিভিন্ন খাদ্য-দ্রব্য খেয়ে সেই ইমিউনিটি বাড়ানোর বদলে নিজের অজান্তেই কমে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তা আমাদের সকলের জন্যই এক অশনিসংকেত বটে।

অনেক সময় দেখা যায়, ফল পাকানোর ক্ষেত্রে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ফল পাকানোয় ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিকের কিছু অংশ ফলের খোসার সূক্ষè ছিদ্র দিয়ে ফলের ভেতরে প্রবেশ করে। আর এ ধরনের ফল খাবার ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের অংশ বিশেষ শরীরে ঢুকে পড়ে লিভার, কিডনিসহ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে থাকে। বিকল্প উপায় না থাকায় জনগণকে এক প্রকার বাধ্য হয়েই এসব ভেজাল খাদ্য খেতে হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালেই মারা যাচ্ছেন। খাদ্য-দ্রব্যে ভেজাল (যেমন ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম পাউডার বা পিপিটি, ইথেফেন ইত্যাদি) মেশানোর বিষয়টি দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ও নিন্দিত হয়ে আসলেও জনগণ যেন এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে শিল্প খাতে ফরমালিনের প্রয়োজন ৪০-৫০ টন। কিন্তু প্রতি বছর ফরমালিন আমদানি করা হয় প্রায় ২০৫ টন। তার মানে বাড়তি ১৫০ টনের বেশি ফরমালিন বিভিন্ন খাদ্য-দ্রব্যের সঙ্গে দেশবাসীর পেটে গেছে। অনেক সময় বিভিন্ন বাজারকে ফরমালিন মুক্ত ঘোষণা করতে দেখা যায়। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আগে যা ছিল কয়েকদিন পরে আবার তা-ই হয়েছে। ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে দেশের জনগণ স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন, বিশেষ করে এই করোনার সময়ে। তবে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে অগণিত শিশু, যাদেরকে বলা হচ্ছে আগামীর ভবিষ্যত। এ ধরনের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে সকলের জন্যই উদ্বেগজনক। আমাদের পুরো খাদ্যচক্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত যেভাবে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাতে করে মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা বেশ দ্রুত গতিতেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তাই, এসব বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দ্রুত বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়নি ‘ফুড এ্যান্ড ড্রাগ প্রশাসন’ ধরনের কোন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের নির্দেশ জারির দীর্ঘদিনেও খাদ্যে ভেজাল রোধে সারাদেশে স্বতন্ত্রভাবে খাদ্য আদালত গঠন করা হয়নি। অবস্থা এমন যে, খাদ্যে ভেজাল রোধে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মধ্যেই যেন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। প্রতি বছর ১৫ মার্চ এলে ভোক্তা অধিকার দিবস পালন করা হয়। সারাদেশ যখন ভেজালযুক্ত খাদ্যে ভরে গেছে, তখন এমনি পরিস্থিতিতে কনজ্যুমার রাইটস সোসাইটি ও কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) একসঙ্গে আন্দোলন করার পর ২০১০ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর গঠন করা হয়।

জনগণের সচেতনার অভাবসহ কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বহীনতার কারণে কোনভাবেই খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এভাবেই চলছে মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর ভেজাল খাদ্য খেয়ে তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন মরণব্যাধি ক্যান্সারে। আর প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশু ও গর্ভবতী মহিলারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ভেজাল খাদ্যের ফলে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয় এবং গর্ভজাত অনেক শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। ভেজাল খাদ্যের কারণে শিশু বিকলাঙ্গ হওয়া এবং শিশুখাদ্যে ভেজাল মেশানো আগামী প্রজন্মের জন্য নিঃসন্দেহে এক অশনিসংকেতই বটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীতে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে অধিক মুনাফার লোভে খাদ্য-দ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা সমাজের শত্রু, জনগণের শত্রু এবং এরা করোনার চেয়ে কোন অংশেই কম ক্ষতিকর নয়। অনেক সময় এদের কাউকে হাতেনাতে ধরা হলেও তারা ঘুষ, পেশী শক্তিসহ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়। নিরাপদ খাদ্য আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা এবং জনগণ সচেতন ও সোচ্চার না হওয়ায় খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয়। অতি দ্রুত যদি এ অবস্থার যদি ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো না হয়, তাহলে আগামীতে এর কুফল যে কী ভয়ানক ও বিপজ্জনক হবে, তা সময়মতোই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে। তাই খাদ্য-দ্রব্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো রোধে খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সচেতন সকলের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আশা প্রয়োজন। প্রয়োজন এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। তবে খাদ্যে ভেজালরোধে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নৈতিকতাবোধকে জাগ্রত করা, নিজের বিবেককে জাগ্রত করা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Link: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/510584/%E0%A6%8F-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF/

Pages: [1] 2 3 ... 5