Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - kekbabu

Pages: 1 2 3 [4] 5 6
46

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহীরা জেনে নিন
কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 
আমাদের অনেক বন্ধুই আছেন, যাঁরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দেখেন। আবার অনেকেরই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন হচ্ছে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। তবে এ ক্ষেত্রে অনেক বন্ধুরই সঠিক তথ্য জানা না থাকার কারণে বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক। দেশের বাইরে পড়াশোনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বেশ আগে থেকে প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষার ভালো ফল নয়, ভালো একটা গাঁথুনিরও দরকার হয়। নিচের বিষয়গুলো সম্পর্কে আগে থেকে ভালোভাবে জানা থাকলে এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ ও প্রতারিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা
অনেকেই খুব অল্প বয়সেই সন্তানদের বিদেশে পাঠান লেখাপড়ার জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার ঘটনা ঘটে সাধারণত উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনার পর। অবশ্য কেবল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়েই নয়, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বা ডক্টরেট (পিএইচডি) করতেও বিদেশে যান অনেকে। যা হোক, এ কথা সবারই জানা, শিক্ষার ক্ষেত্র সব সময়ের জন্যই সম্প্রসারণশীল। শিক্ষার ক্ষেত্র কখনোই নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশ–কাল-জাতি-সংস্কৃতি প্রভৃতির মধ্যে বিস্তৃতিই শিক্ষার মৌলিক ক্ষেত্র ও সীমানা হিসেবে বিবেচিত হয়। কেউ যদি প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচিত্র দক্ষতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চান, তবে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়ার পক্ষে কয়েকটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো-
ক. আত্মসমৃদ্ধি: যাঁরা বিদেশে লেখাপড়া করেন, তাঁরা নানা ধরনের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিমাত্রা ও মননশীলতার দিক থেকে অধিকতর সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো কিছু সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবতে শেখা এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার ফলে তাঁরা অধিক স্বাধীন এবং অধিক দক্ষভাবে চিন্তা ও কাজ করতে শেখেন। যেকোনো চ্যালেঞ্জিং কাজ বা পেশায় সফল হওয়ার জন্য অনেক গুণ তাঁদের মধ্যে বিকশিত হয়। তাই দেখা যায়, বিদেশে থাকার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এমনকি কখনো কখনো তা ব্যক্তির সামগ্রিক জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বিদেশের মাটিতে নতুন একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় এবং সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান অবশ্যই বিদেশ পড়ুয়াকে অধিকতর আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। ফলে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর আপনার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
খ. বিশ্ব সম্পর্কে তৈরি হবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি: বিদেশে অবস্থানের ফলে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো সম্পর্কে আপনার জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। ফলে বিদেশে অবস্থানের কারণে বিশ্ব সম্পর্কে আপনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরে আসবেন। একটি ভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন, তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাসংশ্লিষ্ট নানা সমস্যা মোকাবিলার রীতিনীতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে বিশ্ব সংস্কৃতির বিষয়টি আপনি স্পষ্টভাবে অনুভব করবেন। বিদেশে বসবাস করতে গিয়ে আপনাকে বিদেশি ভাষা শিখতে হবে। ফলে নতুন ভাষা শেখা এবং এর গুরুত্বও আপনি উপলব্ধি করবেন।
গ. পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি: বিদেশে উচ্চশিক্ষা শুধু শিক্ষা এবং ব্যক্তিত্বকেই সমৃদ্ধ করবে না, আপনার পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতেও বিশেষ সহায়তা করবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং চাকরির ক্ষেত্রে আপনার পেশাগত দক্ষতা খুবই মূল্যবান ভূমিকা রাখবে। চাকরির বাজারে আপনার চাহিদা ও বিশেষ গুরুত্ব থাকবে। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বিদেশফেরত গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও কৃষ্টি–কালচারে সমৃদ্ধ এবং মাতৃভাষা ছাড়াও এক বা একাধিক ভাষাতে দক্ষ—মূলত এই দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে থাকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া এসব গ্র্যাজুয়েট আন্তসাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জ্ঞাত ও দক্ষ। এঁদের পক্ষে নতুন পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায় ভাবা এবং ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হয় বলেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব গ্র্যাজুয়েটের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব দিয়ে থাকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে রাখার জন্য।
লক্ষ্য নির্ধারণ করা ও লক্ষ্যে পৌঁছবেন যেভাবে-
বিদেশে পড়তে যাওয়ার সম্ভাব্য বিষয়গুলো বিবেচনার পর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কেন বিদেশে পড়তে যেতে চান। এর কারণগুলো খুঁজে বের করার জন্য অবশ্যই সময় নিন। কেননা, এই কারণগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপনার ভবিষ্যৎ। হয়তো আপনি নতুন একটি সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক অথবা নতুন ভাষা শিখতে চান, কিংবা আপনি আপনার পড়ালেখার ক্ষেত্রটিকে ভিন্নমুখী করতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি ডিগ্রি অর্জন করতে চান ইত্যাদি। কারণ যাই হোক না কেন, তা ভালোভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখুন। বিদেশে যাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে তা যেন সার্থক ও ইতিবাচক হয়। এ ক্ষেত্রে সবাইকে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, একটি ভিন্ন দেশের মাটিতে জীবন যাপন এবং শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটা অনেক সময় কঠিন ও শ্রমসাধ্য হয়ে ওঠে। তাই আপনি আপনার লক্ষ্যের ব্যাপারে যত বেশি সচেতন ও উদ্যোগী হবেন, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তত বেশি লাভবান হবেন।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি-
ক. আগে প্রস্তুত করুন নিজেকে: যেকোনো চ্যালেঞ্জিং পেশায় সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন জরুরি সৃষ্টিশীল গুণ। আর সেই গুণ কমবেশি সবার মধ্যেই থাকে। আর এ গুণগুলোকে শাণিত করার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব। বিদেশে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রেও দরকার হয় তেমনি কিছু গুণের। এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রস্তুতি হতে পারে পড়াশোনার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করা। আপনি যে প্রোগ্রাম বা কোর্সের জন্যই বিদেশে যান না কেন, আপনার সিজিপিএ যত ভালো হবে, বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আপনার ভর্তির সুযোগ এবং স্কলারশিপের সুযোগ তত সহজেই মিলে যাবে। শুধু পড়াশোনাই যথেষ্ট নয়, এ ক্ষেত্রে বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীকে এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটির সঙ্গেও জড়িত থাকা প্রয়োজন। সেটা হতে পারে নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলায় পারদর্শী, স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করার অভিজ্ঞতা, বিতর্ক বা ডিবেট, ম্যাথ অলিম্পিয়াড, ফিজিকস অলিম্পিয়াডের মতো বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিষয় ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো বাইরে পড়তে যাওয়ার জন্য বিশেষ সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এসবের পাশাপাশি কোথাও পার্টটাইম কাজ করার অভিজ্ঞতাও একটি ভালো যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
খ. দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে ইংরেজি ভাষায়: বিদেশে পড়তে চাইলে অবশ্যই আপনাকে ইংরেজি ভাষায় ভালো দখল থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে GRE, SAT, GMAT, IELTS কিংবা TOFEL -এ ভালো স্কোর থাকতে হবে। ইংরেজিতে দক্ষতা যাচাই করার জন্য বিশ্বজুড়ে সাধারণত দুটি পদ্ধতি বেশি প্রচলিত। একটি হচ্ছে আইইএলটিএস এবং অন্যটি হচ্ছে টোফেল। যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে পড়তে যেতে চাইলে ইংরেজিতে দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে আপনাকে আইইএলটিএস স্কোরের তথ্য দিতে হয়। আর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি দেশে টোফেল স্কোর প্রয়োজন হয়। আবার কোনো কোনো দেশে দুটি পদ্ধতিই গ্রহণযোগ্য। আর ইংরেজি ভাষা দক্ষতার এসব স্কোরের মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে (উল্লেখ্য, আইইএলটিএস এবং টোফেলের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে)। তবে চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে যেতে চাইলে ওই সব দেশের ভাষা আগেভাগে শিখে নেওয়াটা ভালো (যদিও এসব দেশেও ইংরেজিতে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে)। ইংরেজিতে দক্ষতার পাশাপাশি জার্মান, ফ্রেঞ্চ কিংবা চাইনিজ ভাষা জানা থাকলে এই ভাষাভাষীর দেশগুলোতে বৃত্তি পাওয়া অনেক সহজ হয়, আবার পার্টটাইম কাজের ক্ষেত্রেও এই ভাষার দক্ষতা বিশেষ উপকারে আসে।
ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
১. নিজের আপডেটেড সিভি ও কাভার লেটার
২. সব শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র ইংরেজিতে করিয়ে নেওয়া।
৩. পাসপোর্টে যেন কোনো সমস্যা না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা।
৪. বিদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার খরচ বহন করা সম্ভব কি না, সেটা আগে থেকেই যাচাই করা। এ ক্ষেত্রে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো স্কলারশিপ পাওয়া যাবে কি না, এবং পাওয়া গেলেও তার পরিমাণ কত এবং কত দিনের জন্য পাওয়া যাবে, তা দিয়ে সেখানে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, ইত্যাদি বিষয় আগে থেকেই জানা উচিত।
গ. প্রোগ্রাম/কোর্স নির্ধারণ: পেশাগত উন্নতি ও লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য কোন ধরনের প্রোগ্রাম বা কোর্স আপনার জন্য উপযুক্ত তা আগে খুঁজে বের করুন। পেশাগত সফলতা বা আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কোর্সে/প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বর্তমান এই বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষার অনেক কোর্সের মধ্যে আপনাকে এমন একটি কোর্স বেছে নিতে হবে, যা আপনার ভবিষ্যৎ পেশাগত দক্ষতার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হয়। তা ছাড়া বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আপনি একেবারে একটি নতুন বিষয়ও বেছে নিতে পারেন। আমাদের দেশে প্রচলিত নয় কিন্তু বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তা গুরত্বপূর্ণ এবং চাহিদা সম্পন্ন এ রকম কোনো বিষয়ও আপনি পছন্দ করতে পারেন। তবে সাধারণত বিদেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও যথেষ্ট চাহিদা আছে, এমন কোনো কোর্সকে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচন করাই ভালো। কোর্স নির্বাচনের সময় অবশ্যই নিচের বিষয়গুলো সম্পর্কে খেয়াল রাখবেন—

ভবিষ্যতে আপনি পেশাগত জীবনে কোন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী এবং সে অনুযায়ী আপনার বর্তমান যোগ্যতা সাপেক্ষে কোন কোর্সটি আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী?
ওই কোর্সের কোনো বিকল্প কোর্স আছে কি না?
আপনি যে দেশে পড়তে যেতে আগ্রহী, সেই দেশে ওই কোর্সে উচ্চশিক্ষার মান বা পদ্ধতি বিশ্বে কতটুকু গ্রহণযোগ্য বা কতটুকু সময়োপযোগী?
কাঙ্ক্ষিত কোর্সটিতে পড়াশোনা শেষে কোথায় কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলবেন এবং সেখানে এর সুবিধা বা সম্ভাবনা ও অসুবিধা বা প্রতিবন্ধকতার মাত্রা কতটুকু?
আপনি যে দেশে পড়তে যাচ্ছেন, সেখানে ওই কোর্সটি কত বছর মেয়াদি এবং টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ আপনার সামর্থ্যরে মধ্যে আছে কি না?
ওই কোর্সে পড়াকালীন কোনো আর্থিক সহায়তা বা বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে কি না?
উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য আপনি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিতে পারেন। এ ছাড়া ওই কোর্সে পড়াশোনা করেছেন বা করছেন এ রকম কোনো বিদেশি বা দেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় থাকলে আগে থেকেই আলাপ করে নিতে পারেন।
ঘ. ক্রেডিট ট্রান্সফার: মনে করুন, আপনি বাংলাদেশেরই কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কোর্সে কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন বা করছেন। কিন্তু এখন আপনি ওই কোর্সেই বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী (তবে এ ক্ষেত্রে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ থাকতে হবে)। সে ক্ষেত্রে দেশে সম্পন্ন করা কোর্সটির ক্রেডিটগুলো গ্রহণ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এক্সামশন দাবি করতে পারেন। আপনার কৃত কোর্সটির জন্য কতটুকু ক্রেডিট পাবেন, তা নির্ধারণ করবে ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আপনাকে কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার কৃত কোর্স স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা এবং এই বিষয়গুলো বিদেশের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত বিষয়েরই অনুরূপ। ক্রেডিট ট্রান্সফারের জন্য যে সনদ ও কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপনার কাছে চাইতে পারে, সেগুলো হলো একাডেমিক সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট, প্রত্যয়নপত্র; কোর্সের আউটলাইন, পাঠ্যতালিকা; কোর্স লেভেল–সম্পর্কিত তথ্যাদি; কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় অনুষদ কর্তৃক সুপারিশনামা; কোর্স অ্যাসেসমেন্টের পদ্ধতি (পরীক্ষা, রচনা, প্রজেক্ট ওয়ার্ক ইত্যাদি); গ্রেডিং সিস্টেম–সংক্রান্ত তথ্য; কোর্সের মেয়াদ, লেকচার-ঘণ্টা, ল্যাবরেটরিতে কাজের ঘণ্টা, ফিল্ড-ওয়ার্ক ইত্যাদি।
ঙ. দেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন: বিদেশে পড়াশোনার জন্য দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, সব দেশে পড়াশোনার সুযোগসুবিধা এক রকম নয়। যেমন কোন দেশে টিউশন ফি বেশি আবার কোনো দেশে টিউশন ফি কম। আবার কোনো দেশে টিউশন ফি লাগে না। কোথাও পার্টটাইম কাজ করা যায়, কোথাও পার্ট টাইম কাজ করা যায় না। আবার কোথাও পার্টটাইম কাজ করা নিষিদ্ধ। কোনো দেশে সহজেই স্কলারশিপ পাওয়া যায়, আবার কোনো দেশে স্কলারশিপ পাওয়া বেশ কঠিন। কোনো দেশের আবহাওয়া খুবই বিরূপ, আবার কোনো দেশের আবহাওয়া ভালো ও স্বাস্থ্যকর। আবার এমনও অনেক দেশ আছে, যেখানে পড়াশোনার সময়ই নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং এসব বিষয় মাথায় রেখে এবং তা সময় নিয়ে ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে দেশ নির্বাচন করুন। আপনি যে দেশে পড়ালেখার জন্য যেতে চাচ্ছেন, সেই দেশে আপনার আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজন কেউ থাকলে আপনার উচিত হবে, তাদের কাছ থেকে এসব বিষয়ে আগে থেকেই ভালোভাবে জেনে নেওয়া। বর্তমানে প্রত্যেকটি দেশেরই বিভিন্ন বিভাগের নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইট আছে। যদি আপনার জানা না থাকে তবে Google বা Yahoo এ রকম সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটগুলো ভিজিট করুন এবং সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খরচ, স্কলারশিপ তথ্য, আবাসনব্যবস্থা, জীবনধারা, আবহাওয়া, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানার পর আপনার জন্য উপযুক্ত দেশ নির্বাচন করুন। এ ক্ষেত্রে দুই-তিনটি দেশ নির্বাচন করা ভালো। কারণ, একটি মাত্র দেশ পছন্দ করলে সেখানকার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরও ভিসা পেতে ব্যর্থ হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনার বিদেশযাত্রা বিলম্বিত হতে পারে। দেশ নির্বাচনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করুন। কারণ, অধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শর্ত জানা থাকলে আপনার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা সহজ হবে।
যাঁরা স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাবেন, তাঁদের যে বিষয়গুলো ভাবতে হবে—
* স্কলারশিপের মেয়াদ কত এবং নবায়ন করা যাবে কি না, যদি যায় তবে কী ধরনের যোগ্যতার ভিত্তিতে? স্কলারশিপের অর্থে কী কী খরচ করা যাবে?
* সেখানকার জীবনযাত্রা কেমন ব্যয়বহুল এবং আপনার পক্ষে স্কলারশিপের অর্থে তা নির্বাহ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না?

যাঁরা নিজ খরচে পড়াশোনা করতে যাবেন তাঁদের যে বিষয়গুলো ভাবতে হবে—
আপনার পছন্দের কোর্সটিতে সর্বমোট খরচ কত এবং তা কীভাবে পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ে ই-মেইল করলে তারা মোট খরচের একটি খসড়া হিসাব ও পরিশোধের পদ্ধতি আপনাকে জানিয়ে দেবে। এতে যে বিষয়গুলো সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে, তা হচ্ছে টিউশন ফি, আবাসন খরচ, খাবার খরচ, বইপত্র বাবদ খরচ, ইনস্যুরেন্স খরচ ইত্যাদি।

 খরচগুলো কমানোর কোনো বিকল্প উপায় আছে কি না। যেমন অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে না থেকে কোনো পরিবারের সঙ্গে থাকলে খরচ কম লাগে। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সেমিস্টারের টিউশন ফি একসঙ্গে পরিশোধ করলে কিছুটা ছাড় পাওয়া যায়।
আর্থিক সহায়তা, ঋণ বা স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। যদি থাকে, তবে তা কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হবে।
দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয় কেমন এবং আপনার পক্ষে তা নির্বাহ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না, ইত্যাদি।
চ. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি: বিদেশে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই আপনাকে আপনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব কাগজপত্র (যেমন: সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট ইত্যাদি) ইংরেজি ভাষায় হতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশের সব শিক্ষা বোর্ড কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পরীক্ষার সনদপত্র বা নম্বরপত্রগুলো ইংরেজিতে করে থাকে, যা এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক। তবে যেসব কাগজপত্র ইংরেজিতে করা নেই সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে নিতে হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অথবা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে। নোটারির ক্ষেত্রে আগের মূল কপি এবং অনুবাদ করা কপি একসঙ্গে রাখতে হয়। উল্লেখ্য, ছবি এবং প্রয়োজনীয় সব ফটোকপি অবশ্যই সত্যায়িত করে নিতে হবে। সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ শাখা থেকে সব কাগজপত্রের মূল কপি দেখানো সাপেক্ষে বিনা মূল্যে সত্যায়িত করা যায়। এ ছাড়া নোটারি পাবলিক থেকেও সত্যায়িত করা যায়।
ছ. আবেদন এবং ভর্তি প্রসেসিং: নির্দিষ্ট দেশের বাছাই করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য প্রথমে আপনাকে ভর্তির তথ্য, প্রসপেক্টাস ও ভর্তি ফরম চেয়ে আবেদন করতে হবে। তবে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেই এ–সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য উল্লেখ করা থাকে। আবেদনপত্র কুরিয়ারযোগে, ফ্যাক্স বা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো যায়। তবে ই-মেইলে পাঠানোই ভালো। আপনার আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আপনার ঠিকানায় ভর্তির আবেদন ফরম ও প্রসপেক্টাস পাঠিয়ে দেবে। এতে সাধারণত দুই-তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আপনার ই-মেইল আড্রেস দিলে সেখানেও তারা আবেদন ফরম দিতে পারে। আবার কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটে আবেদন ফরম দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তা ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে হবে। এরপর আবেদন ফরমটি প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিয়ে নির্ভুলভাবে পূরণ করে সঠিক নির্দেশনা অনুসারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদন ফি/ব্যাংক ড্রাফট কোনো আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস (ডিএইচএল বা ফিডেক্স) বা রাষ্ট্রীয় ডাকের মাধ্যমে নির্দেশিত ঠিকানায় পাঠাতে হবে। উল্লেখ্য, আবেদন ফি অফেরতযোগ্য। আর ফরম পূরণের সময় কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য দিলে ভর্তি অনিশ্চিত বা পরবর্তী সময়ে তা বাতিলের সম্ভাবনা থাকে এবং ভিসা পেতে সমস্যা হতে পারে। তাই ভর্তি ফরম পূরণের সময় কোনো ধরনের মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে সাধারণত নিচের কাগজপত্র পাঠাতে হয়-
১. সব একাডেমিক কাগজপত্র: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বা তদূর্ধ্ব সব সনদপত্র ও নম্বরপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি এবং সাবেক বা বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের সুপারিশপত্র।
২. ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণপত্র: নির্বাচিত দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তানুযায়ী যে ভাষার দক্ষতা থাকতে হবে সেই ভাষায় দক্ষতার প্রমাণস্বরূপ ভাষাশিক্ষা কোর্সের সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি।
৩. উল্লেখ্য, ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার ক্ষেত্রে যদি সে দেশে গিয়ে শিখতে চান তবে তার পূর্বতন ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে দক্ষতার প্রমাণস্বরূপ IELTS/TOFEL–এর সনদপত্রের সত্যায়িত কপি পাঠাতে হবে। তবে কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার সনদপত্র লাগে না।
৪. আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণপত্র: যিনি আপনার বিদেশে পড়াশোনাকালীন যাবতীয় খরচ বহন করবেন, তাঁর অঙ্গীকারপত্র, আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণস্বরূপ ব্যাংক গ্যারান্টিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। নিজ খরচে পড়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণস্বরূপ স্পন্সরের নামে দেশভেদে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থের ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট এবং অনেক ক্ষেত্রে এই সলভেন্সি সার্টিফিকেটের বৈধতার পক্ষে বিগত ছয় মাসের ব্যাংক লেনদেন রিপোর্টের সত্যায়িত কপি পাঠাতে হয়।
৫. আবেদন ফি-এর ব্যাংক ড্রাফট: দেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে আবেদন ফি বিভিন্ন পরিমাণের হয়ে থাকে। তবে তা সাধারণত ৭০০ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

জ. ভর্তির অনুমতিপত্র পাওয়ার পর আপনার করণীয়: সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির অনুমতিপত্র বা অফার লেটার পাওয়ার পর সাধারণত অফার লেটারে বা প্রসপেক্টাসে উল্লেখিত টিউশন ফির সমপরিমাণ অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ড্রাফট করতে হবে, যা ভিসা ইন্টারভিউর সময় দূতাবাসে দেখাতে হয় এবং ভিসা পেলে পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হবে। কিন্তু টিউশন ফি বা এ রকম বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যাংক ড্রাফট করতে হলে ব্যাংকে নিজের নামে একটি স্টুডেন্ট ফাইল চালু করতে হবে এবং সেখান থেকেই বিদেশে পড়াশোনাকালীন সব আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা যাবে। ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খোলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রসপেক্টাস বা ভর্তির প্রমাণপত্র বা ভর্তি ফরম, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদপত্র, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। উল্লেখ্য, বিভিন্ন ব্যাংকের বৈদেশিক বিনিময় শাখাগুলোতেও স্টুডেন্ট ফাইল খোলার জন্য আলাদা কেন্দ্র রয়েছে।
ঝ. ভিসা প্রসেসিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর তাদের পাঠানো অফার লেটার বা ভর্তির অনুমতিপত্রে উল্লেখিত ডেডলাইনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় ভর্তি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই নির্দিষ্ট তারিখের আগেই আপনাকে সেই দেশের ভিসা সংগ্রহ করতে হবে। ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও নিয়ম প্রায় একই রকম। কোনো দেশে ভিসা পেতে হলে প্রথমে সে দেশের ভিসার আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে ভিসার আবেদনপত্র সরবরাহ করে থাকে। তা না হলে নির্দিষ্ট দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে বা ভিসা এজেন্টের মাধ্যমে ভিসার আবেদনপত্র সংগ্রহ করে সঠিক তথ্য দিয়ে পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ দূতাবাসে জমা দিতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দিনে ভিসা ইন্টারভিউর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে গিয়ে দূতাবাস বা অ্যাম্বাসি ফেস করে ভিসা সংগ্রহ করতে হবে। ভিসার জন্য সাধারণত শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র যেমন: সনদপত্র, নম্বরপত্র, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের প্রশংসাপত্রের সত্যায়িত ফটোকপিসহ মূলকপি এবং পাসপোর্ট (পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়াদ কমপক্ষে এক বছর থাকতে হবে) প্রয়োজন। সে সঙ্গে পেশা, জন্মতারিখ ও অন্য সব তথ্যের সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্রের মিল থাকতে হবে। তা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রমাণপত্র বা অফার লেটার; আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণপত্র; ছবি; টিউশন ফির ব্যাংক ড্রাফট; ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণপত্র; পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ইত্যাদি কাগজপত্র ভিসা ইন্টারভিউর সময় সঙ্গে রাখতে হবে।
ঞ. ভিসা হয়ে যাওয়ার পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি: ভিসাপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থাৎ ভিসা পাওয়ার পরের পালা হচ্ছে বিদেশযাত্রা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ভিসার ডেডলাইন যাই হোক না কেন, তার কয়েক দিন আগে দেশ ত্যাগ করাই ভালো। কারণ, অনেক সময় আবহাওয়াজনিত ও অন্য কোনো কারণে যাত্রাপথে বিলম্ব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে হাতে সময় না থাকলে বিপদ হতে পারে। দেশ ছাড়ার আগে আপনার পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদি যথাযথ অবস্থায় আছে কি না, ভালোভাবে দেখে নিন। বিদেশে অবস্থানের সময় এসব দলিলপত্র অবশ্যই আপনাকে সঙ্গে রাখতে হবে। আপনি কোন পথে বিদেশে যেতে চান, তা নির্ধারণ করবেন আগে থেকেই। বিমানযোগে ভ্রমণ করতে চাইলে অনেক সময় বিভিন্ন এয়ারলাইনস ডিসকাউন্ট রেটে টিকিট দিয়ে থাকে। আপনি নির্ধারিত দিনের টিকিট যদি আগে কেটে রাখেন, তাহলে ছাড় পেতে পারেন। বিদেশে গিয়ে কোথায় থাকবেন এবং আপনার আবাসনের বিষয়টি কেমন হবে, তা সম্পর্কেও খোঁজখবর নিন। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক ইস্যুগুলো সম্পর্কে জেনে নিন। যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের আইন অনুযায়ী কী করা যাবে, কী করা যাবে না, সে সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকা জরুরি। সর্বোপরি, আপনি যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, আইনকানুন, রীতিনীতি প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব আগে থেকেই জেনে নিন।

এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস আপনি যখন সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন, তখন আপনার সেই দেশে আসার উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য অবস্থানের সময়-কাল ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞাসা করবেন। সে সঙ্গে আপনার পাসপোর্ট, ভিসা ইত্যাদি বিষয়গুলোও পরখ করবেন ইমিগ্রেশন অফিসার। এসব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তা সন্তোষজনক হলে আপনাকে ওই দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। মনে রাখবেন, ইমিগ্রেশন অফিসার যখন আপনাকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, তখন নম্রভাবে ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিন। ইমিগ্রেশনের পর আসবে কাস্টমস। আপনার যাত্রাকালে কী কী জিনিস আপনি বহন করছেন, তার একটি তালিকা আপনাকে কাগজে লিখতে হতে পারে। এখানেও সব প্রশ্নের প্রয়োজনীয় ও সঠিক উত্তর দিতে হবে। কাস্টমস অফিসার প্রয়োজনে আপনার ব্যাগ তল্লাশি করতে পারেন।

প্রয়োজনীয় কিছু লিঙ্ক:
১. জার্মানির আন্তর্জাতিক কোর্সগুলোর বিস্তারিত তালিকার জন্য ভিজিটি করুন: http://www.daad.de/idp
২. জার্মানিতে পড়াশোনা এবং গবেষণা–সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার জন্য ভিজিট করুন: http://www.daad.de/deutschland/index.en.html
৩. বৃত্তি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য ভিজিট করুন: http://www.daad.org.uk/en/12703/index.html
৪. ঢাকার জার্মান দূতাবাস: http://www.dhaka.diplo.de/
৫. যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার জন্য ভিজিটি করুন নিচের ওয়েবসাইটগুলো
http://www.ukcisa.org.uk,
http://www.ucas.com, http://www.educationuk.org
৬. অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে http://studyinaustralia.gov.au সাইটে
৭. বিভিন্ন দেশে ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন: https://studyabroad.shiksha.com
৮.বিদেশে পড়ালেখা ও স্কলারশিপের জন্য ভিজিট করুন: https://www.studyabroad.com/study-abroad-scholarships
৯.বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের স্কলারশিপ ও ফেলোশিপের জন্য ভিজিট করুন: https://scholarship-positions.com/
১০. এ ছাড়াও আপনি https://www.google.com- গিয়ে আপনি যে দেশে যেতে ইচ্ছুক, সে দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে University List of .... (দেশের নাম) লিখে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন ওই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা। এরপর আপনি আপনার পছন্দসই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে পারবেন ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই।
উল্লেখ্য, বিদেশে পড়ালেখা করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে বা জানার থাকলে ই-মেইল করুন: kekbabu@yahoo.com এই ঠিকানায়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রতিনিধি, প্রথম আলো

Link: https://www.prothomalo.com/bondhushava/article/1571408/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A6%A3-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A7%80%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A8?fbclid=IwAR35EKJvhEIttD1tqilnbG88sdH6OROOeBKcFcvLycZZNjr1zIOE_6WhABM

47
আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস
আসুন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

আমাদের প্রিয় এ বাংলাদেশে যতগুলো সমস্যা জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। চলতি বছরের ২২ ফেব্র“য়ারি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৭ অনুযায়ী, শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে বাংলাদেশ ২৮ স্কোর পেয়েছে, যা ২০১৬-এর তুলনায় ২ পয়েন্ট বেশি। ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকায় নিু অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৭তম স্থান পেয়েছে, যা ২০১৬-এর তুলনায় ২ ধাপ ওপরে। উচ্চ অবস্থান অনুযায়ী এবার বাংলাদেশ ১৪৩তম, যা ২০১৬-এর তুলনায় ২ ধাপ উপরে। ২০০১-এ প্রথমবারের মতো এই সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের এবারের স্কোর সবচেয়ে বেশি। এবার বাংলাদেশের সমান স্কোর পেয়েছে গুয়াতেমালা, কেনিয়া, লেবানন ও মৌরিতানিয়া। বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর এখনও অনেক কম। অর্থাৎ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে মধ্যম মাত্রায় সাফল্য অর্জন থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তদুপরি, দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের মধ্যে এবারও বাংলাদেশের অবস্থান আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিু এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিু। আফগানিস্তান ছাড়া অপর যে দুটি এশীয় দেশ বাংলাদেশের তুলনায় নিুতর অবস্থানে রয়েছে- সেদেশ দুটি হল উত্তর কোরিয়া ও কম্বোডিয়া।


বলাবাহুল্য, জনসংখ্যাধিক্য ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশটির একদিকে রয়েছে দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অপুষ্টি, সম্পদের অভাব, অপরদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে দুর্নীতির কালো ছায়া। দুর্নীতি নামক কালোব্যাধি যে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে দিন দিন গ্রাস করে চলেছে তা সহজেই অনুমেয়। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফল প্রকাশ করেছিল, তাতে পরপর টানা পাঁচ বছরই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির কারণে জিডিপির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বিভিন্ন সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।

দেশের সমস্যা আর সম্ভাবনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তা হল ‘দুর্নীতি’। আইডিবি, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতাসংস্থা বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোকে দুর্নীতি হ্রাস করার জন্য অনেক পরামর্শ দিয়েছে এবং সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এ বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও রিপোর্টের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানাভাবে সরকারসহ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এতকিছুর পরেও বিভিন্ন সরকারের আমলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি নামক কালোব্যাধির ‘পাগলা ঘোড়া’কে বাগে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটেছে, জন্ম নিয়েছে অসংখ্য নতুন নতুন দুর্নীতিবাজ।

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়-বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করা, দুর্নীতি বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে শুধু ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানসহ তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করা দরকার। গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং তা দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়া দরকার। টিআই জরিপ অনুসারে, দেশ আগের চেয়ে কিছুটা হলেও দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়েছিল। এখনও অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজ দুর্নীতির দায়ে কারাগারে আটক থাকার পাশাপাশি তাদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সরকার কঠোরহস্তে দুর্নীতি দমনের ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ ঘোষণার যথাযথ বাস্তবায়ন হবে, এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

বর্তমানে দুর্নীতি প্রতিরোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলছে শোভাযাত্রা-সমাবেশ-আলোচনা সভা ইত্যাদি। এসব কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন, যা অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। সর্বোপরি, দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য দেশের সর্বত্র প্রয়োজন ‘সততা’র একটি আবহ তৈরি করা। দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি সুষ্ঠু-সুন্দর পরিবেশ। সবারই স্মরণ রাখা দরকার, এ দেশটি আমার, আপনার, সবার। স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে হলে ‘দুর্নীতি’ নামক ব্যাধিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিরোধ করা ছাড়া উপায় নেই। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে সম্মিলিত কণ্ঠে দুর্নীতিকে ‘না’ বলি। দুর্নীতির পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করি এবং তাদের কঠোরহস্তে প্রতিরোধ করি। আর চেষ্টা করি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে। সরকারসহ আমাদের সবার প্রয়াসে এ দেশকে দ্রুততম সময়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সবার উচিত হবে এখন থেকেই সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করা।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/120082/%E0%A6%86%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%97%E0%A7%9C%E0%A6%BF?fbclid=IwAR3_11snF-ToYKK2-XZWJdPyXjnQ9V4tfzVLfKXU4Zy4lPo83DY5_kMTxBE

48
আবাসিক হলের খাবার মেধা বিকাশে কতটা সহায়ক?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
দৈনিক কালের কণ্ঠ (২৭ নভেম্বর, ২০১৮)
 
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৪২টি পাবলিক ও ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, দুই হাজার ৩০০ কলেজ ও ইনস্টিটিউট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এককভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও উল্লিখিত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউটগুলোয় অধ্যয়ন করছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী। আর এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলগুলোয় কিংবা মেসে থেকে তাঁদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব আবাসিক হলের ডাইনিং ও মেসে শিক্ষার্থীদের যে খাবার দেওয়া হয় তা মেধা বিকাশে কতটুকু সহায়ক? একজন পুরুষ শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের জন্য প্রতিদিন দুই হাজার ৪০০ কিলো ক্যালরি এবং নারী শিক্ষার্থীর জন্য এক হাজার ৯০০ কিলো ক্যালরি খাবার প্রয়োজন। আদর্শ খাদ্য তালিকা ‘চার্ট ইজ রিকোমেন্ডেড বাই দ্য নিউট্রিশন এক্সপার্ট গ্রুপ’ অনুযায়ী  প্রতিদিনের খাবারের মধ্যে মাংস ৬০ গ্রাম, মাছ ৬০ গ্রাম, তেল ৪০ গ্রাম, ডাল ৭০ গ্রাম, শাক ১০০ গ্রাম, ফল ৬০ গ্রাম এবং দুধ ৬০০ গ্রাম থাকা বাঞ্ছনীয়। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের লক্ষ্যে আবাসিক হল বা হোস্টেলের ডাইনিংয়ে পরিবেশিত খাবারের এ মান নির্ণয় করা জরুরি।

পুষ্টিবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবারের এ মান নিয়ন্ত্রণ করা না হলে কিংবা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় উপরোক্ত খাদ্যমান না থাকলে তা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে যথেষ্ট নয় বলে বিবেচিত হবে। এসব হল বা হোস্টেলের ডাইনিংয়ে প্রতিনিয়ত যে ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়, তা কি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক? নিশ্চয়ই না। বিভিন্ন আবাসিক হল বা হোস্টেলের ডাইনিংয়ে খাবারের ব্যাপারে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দুপুরে খাবার হিসেবে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যের চালের ভাত, ছোট এক টুকরা মাছ বা ছোট এক বা দুই টুকরা মাংস আর এর সঙ্গে পানির মতো পাতলা ডাল দেওয়া হয়। রাতেও ঠিক একই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। আর সকালের নাশতা হিসেবে দেওয়া হয় এক-দুটি রুটি বা পরোটা এবং এর সঙ্গে যৎসামান্য ডাল। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন আবাসিক হল বা হোস্টেলের ডাইনিংয়ে প্রতিদিন যেসব খাবার দেওয়া হয়, তা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে যথেষ্ট সহায়ক নয়।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ডাইনিংগুলোয় খাবারের নিম্নমান সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা আর সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিমানহীন খাবার খেতে হচ্ছে। প্রকৃত অবস্থা এই যে ডাইনিংয়ের খাবারের যে অবস্থা তা দিয়ে মেধা ভালোভাবে বিকাশ হওয়া তো দূরের কথা, জীবন বাঁচানোই অনেকটা দায় হয়ে যায়। তবে এর মাঝেও যেসব শিক্ষার্থী ডাইনিংয়ের খাবার খেয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন এবং রাখছেন, তাঁদের অতি মেধাবীই বলতে হবে। ডাইনিংয়ে বারবার খাবারের দাম বাড়ানো হলেও খাবারের মান বিন্দুমাত্র বাড়ে না, বরং তা কমে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ডাইনিং-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সুদৃষ্টির অভাব আর পুষ্টিমানহীন খাবারের কারণে দেশের অনেক শিক্ষার্থীই আজ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা যে মেধা ও স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে থাকেন, কিছুদিন যেতে না যেতেই তাঁদের অনেকের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে অবস্থানরত আবাসিক শিক্ষার্থীর অনেককেই হল বা হোস্টেলে সিট পাওয়ার আগে প্রথম দুই-তিন বছর ভাড়া বাসায় থাকতে হয় বা হয়েছে। তাঁরা প্রথম দুই-তিন বছর বাসাবাড়িতে বা মেসে থেকে তুলনামূলক ভালো ফল করলেও পরবর্তীকালে হলে বা হোস্টেলে সিট পাওয়ার পর তাঁরা আর আগের মতো ফল ধরে রাখতে পারেননি। ডাইনিংয়ের পুষ্টিমানহীন খাবার এ জন্য অন্যতম প্রধান কারণ বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসে শিক্ষার্থীদের যত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, খাবারের সমস্যা তার অন্যতম। দুঃখের বিষয় এই যে ডাইনিংয়ের খাবারের মান নির্ণয় করা তো দূরের কথা, শিক্ষার্থীরা কী খাচ্ছেন তা দেখতে বছরান্তেও কোনো আবাসিক শিক্ষক বা হল প্রাধ্যক্ষ হলের ডাইনিংয়ে উঁকি পর্যন্ত দিতে আসেন না। অনেকে এ ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টিকে দায়ী করলেও বলা যায়, শুধু বাজারমূল্যই পুষ্টিহীন খাবারের প্রধান কারণ হতে পারে না। ডাইনিংয়ের খাবারের পরিবর্তে হোটেলে খেতে গেলে তাঁদের দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা গুনতে হয়, অতিরিক্ত সময় নষ্ট করতে হয়। শিক্ষার্থীরা খাবারের মান বৃদ্ধির ব্যাপারে বারবার দাবি জানিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয় না—যেন এ বিষয়টি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। বলা বাহুল্য, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার মেধা বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আর শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ভালোভাবে না ঘটলে তা দেশ ও জাতির জন্য অবশ্যই অনেক বড় ক্ষতির কারণ, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের লক্ষ্যে ডাইনিংগুলোয় পরিবেশিত খাবারের মান নির্ণয় করা অত্যাবশ্যক। আর এ কাজটি শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর কল্যাণেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনীহা বা গাফিলতি করা মোটেও উচিত হবে না। কারণ, এ কাজটি যত দ্রুত করা সম্ভব হবে ততই তা শিক্ষার্থীদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ডাইনিংয়ের নিম্নমানের খাবারের হাত থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষার্থী কক্ষে হিটার ব্যবহার করে রান্না করে খান। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ গুনতে হয়। অথচ ডাইনিংয়ের খাবারের বিষয়ে যদি সঠিকভাবে তদারকি করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা পুষ্টিযুক্ত খাবার খেতে পারতেন, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খরচও সাশ্রয় হতো। ডাইনিংয়ের খাবারের এ সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ শিক্ষার্থীরা একযোগে এগিয়ে এসে তা দ্রুত সমাধান করতে যথেষ্ট আন্তরিক হবেন, এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/11/27/708003

49
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিল প্রসঙ্গে কিছু কথা
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
৮ নভেম্বর, ২০১৮

ইয়াবা, কোকেন, হেরোইন ও পেথিডিনজাতীয় মাদকের ব্যবহার, পরিবহন, চাষাবাদ, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি বা বাজারজাত করার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গত ২৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিল ২০১৮ পাস হয়েছে। মাদকের পরিমাণ ২৫ গ্রাম বা তার বেশি হলেই এই সাজা দেওয়া যাবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে বিলটি দ্রুতই আইনে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে নিষ্ঠুর ও কঠোর আইন বলে মনে হলেও মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে সমাজ, দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে এ ধরনের একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা যায় না। তবে কোনোভাবেই যেন এ আইনের অপপ্রয়োগ করা না হয়, তা সর্বাগ্রে নিশ্চিত করা আবশ্যক। পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কিংবা নিরপরাধ-নিরীহ কোনো ব্যক্তির হাতে মাদক ধরিয়ে দিয়ে তাকে যেন এ আইনে ফাঁসিয়ে দেওয়া না হয় সে বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। দেশে প্রচলিত ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে, ৫০ গ্রাম মাদক পাওয়া গেলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। ১৯৯০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫৯৬ জনকে বিভিন্ন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারোরই মাদক আইনে মৃত্যুদণ্ড হয়নি। তবে সদ্য পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিলে (আইনে) ইয়াবার ব্যবহারের বিষয় এবং মাদকে অর্থলগ্নিকারীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের ৯ ধারায় বলা হয়, অ্যালকোহল ছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্যের উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয় এমন কোনো দ্রব্য বা উদ্ভিদের চাষাবাদ, উৎপাদন, বহন, পরিবহন বা আমদানি-রপ্তানি, সরবরাহ, বিপণন, গুদামজাত, সেবন বা ব্যবহার, অর্থ বিনিয়োগ বা পৃষ্ঠপোষকতা করা যাবে না। বিলের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আইনের এই বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বিলের ১১ ধারায় বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি অ্যালকোহল পান করতে পারবেন না। চিকিৎসার প্রয়োজনে সিভিল সার্জন বা সরকারি মেডিক্যাল কলেজের কমপক্ষে সহযোগী অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো মুসলমানকে অ্যালকোহল পানের পারমিট দেওয়া যাবে না। তবে মুচি, মেথর, ডোম, চা শ্রমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তাড়ি ও পঁচুই এবং পার্বত্য জেলা বা অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগতভাবে তৈরি করা মদ পান করার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। বিলের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, তদন্ত  কর্মকর্তার যদি এই মর্মে সন্দেহ হয় যে কোনো ব্যক্তি শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মাদকদ্রব্য লুকিয়ে রেখেছেন, সে ক্ষেত্রে ওই কর্মকর্তা সন্দেহজনক ব্যক্তির শরীরে এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোসকপি এবং রক্ত ও মলমূত্র পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। আর বিলটির ৩৩ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি মাদকদ্রব্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থেকে অবৈধ অর্থ ও সম্পদ সংগ্রহে লিপ্ত রয়েছেন—মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার এমন সন্দেহ হলে তিনি সন্দেহজনক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব বা আয়কর নথি পরীক্ষার প্রয়োজনে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

দেশ থেকে যদি এখনই মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে, পারিবারিক কলহ, সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। এ দেশে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সেবন একসময় উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মাদক পাওয়া এখন সহজলভ্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে সবার মধ্যে মাদকের বিস্তার ঘটছে রকেটের গতিতে। পুরুষের পাশাপাশি আজকাল মহিলাদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের আগমন ও বিস্তারের পথ ছড়িয়ে পড়ছে শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি পর্যন্ত। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের কারাগারের মধ্যে বন্দি থেকেও অনেক আসামি বা কয়েদি মাদকের সঙ্গে যুক্ত। তারা হয় মাদক গ্রহণ করে, না হয় এর কারবারের সঙ্গে যুক্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারাগারের মধ্যে বন্দি থেকেও কিভাবে মাদক কারবার কিংবা মাদক গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়? এ ক্ষেত্রে দায়ী যে কে বা কারা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বা মাদকের গডফাদাররা মাদক চোরাচালানের উপযুক্ত ট্রানজিট বা করিডর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী থাইল্যান্ড, লাওস, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, নেপাল, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। ফলে মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিরা এ দেশকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা কারখানায় উৎপাদিত ফেনসিডিল আর ইয়াবা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের দেশে। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থেই দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে মাদকপাচার রোধে কাজ করে থাকেন, তাহলে দেশের মধ্যে মাদক প্রবেশ করা কি সম্ভব? নিশ্চয়ই সম্ভব নয়।

মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহারজনিত সব কর্মতৎপরতায় জড়িত লোকজন ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত। তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছুদিন পর এসব মাদক কারবারি ও মাদকাসক্ত আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক কারবার ও মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ থেকে কখনো মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে হয় না। মাদক কারবারি বা মাদকাসক্তরা যেন সহজেই জামিন না পায় কিংবা সহজেই ছাড় না পায়, সেদিকটায় খেয়াল রাখা উচিত। কারণ তারা সমাজ, দেশ ও জাতির শত্রু। মাদক কারবারিদের শক্তির উৎসগুলো শনাক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে ওই শক্তির উৎসগুলো যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা আবশ্যক। দেশ থেকে মাদক নির্মূলে আইনের সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক মানুষের অতীব মূল্যবান জীবনকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। নীরব ঘাতকের মতো মাদকাসক্তি প্রসার লাভ করছে আমাদের সমাজে। মাদকাসক্তি কর্মশক্তির বড় একটি অংশ গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজের সম্ভাবনাময় শক্তি। মাদকাসক্তদের নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক বিকৃতিও ঘটে। মাদকের ফলে জাতি হাঁটছে অন্ধকারের দিকে, মৃত্যুর দিকে হাঁটছে নৈতিক মূল্যবোধ এবং জন্ম নিচ্ছে ঐশীর মতো মা-বাবা হত্যাকারী সন্তান। তাই সমাজ ও জাতির স্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন মাদক নামক মরণ নেশা প্রতিরোধে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন এ বিষয়ে ব্যাপক হারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাদককে ‘না’ বলুন—ঘরে ঘরে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করাও জরুরি। যে যুবসমাজের ওপর দেশের শিক্ষা-দীক্ষা, উন্নতি-অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, তারাই যদি মাদকের ফলে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাই মাদকের এই ভয়ংকর অভিশাপ ও সর্বনাশা ছোবল থেকে দেশ, জাতিকে বাঁচাতে সরকারসহ আমাদের সবারই একযোগে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/11/08/701034

50
কিউএস র‌্যাংকিংয়ে দেশের ছয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমাদের প্রত্যাশা
 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
২৯ অক্টোবর ২০১৮

শিক্ষাবিষয়ক যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কুয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) প্রতিবছর মোট ১১টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। এ এগারোটি মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে : প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাফল্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাফল্য, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা প্রবন্ধের সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময়ের হার ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, কিউএসের র‌্যাংকিং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। প্রতিবছরের মতো প্রতিষ্ঠানটি ২৪ অক্টোবর বুধবার তাদের ওয়েবসাইটে ২০১৯ সালের এশিয়ার সেরা ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় তিন হাজার আটশ’র বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টি দেশের ৯১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে। কিউএসের ওই তালিকায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছয়টি হচ্ছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

বাংলাদেশে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অবস্থান ষষ্ঠ, যা একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক বিরাট ও অনন্য অর্জনই বটে। কিউএস র‌্যাংকিংয়ে যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামব্রিজে অবস্থিত বেসরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। আর তৃতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। আর যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তালিকার চতুর্থ নম্বরে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তালিকার ছয় নম্বরে। কিউএসের নতুন এ র‌্যাংকিংয়ে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় যেসব দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে, সেসব দেশের শিক্ষার মানও উন্নত হচ্ছে। উন্নতি করা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উল্লেখযোগ্য। আর পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো। বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪ হাজার ৬৫১ জন শিক্ষক ও ৩৭ হাজার ৭৮১ জন কর্মকর্তা কিউএসের তালিকা তৈরিতে সহায়তা করেছেন। এক কোটি তিন লাখ গবেষণাপত্র ও এসব গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে- এমন ছয় কোটি ৬৩ লাখ উদ্ধৃতিপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে তালিকা তৈরির সময়। গবেষণা, শিক্ষকতা, ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার হার- ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে কিউএস কর্তৃক এ র‌্যাংকিংয়ের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। কিউএস র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া আমাদের দেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এখন থেকে এ ছয়টি বিশ্বদ্যিালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিশ্চয় একটু হলেও বিশেষ মর্যাদার দেখা হবে সমাজে তথা দেশে কিংবা বিদেশে। তাছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কারও কাছে তাদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম-পরিচয় দিতে গিয়ে একটু হলেও গর্ব অনুভব করবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গৌরবময় অর্জন সম্ভব হয়েছে নিশ্চয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সার্বিক সহযোগিতার ফলে। কিউএসের র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর আন্তরিকতা থাকলে এগিয়ে যাওয়া যায় অনেক দূর, সগৌরবে দাঁড়ানো যায় মাথা উঁচু করে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, এ প্রাপ্তি ও অর্জন এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল। কারণ ভালোর কোনো শেষ নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সবার বিবেচনায় রাখতে হবে, এখানেই শেষ নয়, যেতে হবে বহুদূর। এ যেন আমেরিকান বিখ্যাত কবি Robert Frost iwPZ Stopping by Woods on a Snowy Evening শীর্ষক কবিতার বিখ্যাত সেই লাইন ‘And miles to go before I sleep, And miles to go before I sleep’কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রয়েছে তিনটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীর তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসন সংখ্যা অনেক কম। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল নিয়ে পাস করা বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘকাল থেকেই দেশে এ অবস্থা চলে আসছে। এ অবস্থার কারণে অতীতে দেশের অনেক শিক্ষার্থী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাতেন। এতে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং মেধা উভয়ই বিদেশে পাচার হতো। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং দেশে মানসম্মত শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে দেশে প্রথমবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালে আগের আইনের স্থলে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ প্রণয়ন করা হয়। এ কথা সবারই জানা আছে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) হচ্ছে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পৃথকভাবে নিয়ে ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ও সমসাময়িক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কিউএসের মতো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে এ ধরনের র‌্যাংকিং করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে তা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন তথা উন্নয়ন ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৮ জুন অনুষ্ঠিত ইউজিসির এক সভায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং (অবস্থান নির্ধারণ) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত হয়নি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংবিষয়ক ওই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে ইউজিসির দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে এ ধরনের র‌্যাংকিং করার প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।
সম্ভবত এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাংকিং নির্ণয়বিষয়ক এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড পরিচালিত বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাংকিং নির্ণয়বিষয়ক ওই গবেষণাপত্রে প্রাসঙ্গিক অনেক কিছুই আসেনি। পাশাপাশি ওখানে র‌্যাংকিংয়ের জন্য যেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, তা অনেকটাই ছিল অসম্পূর্ণ; র‌্যাংকিং পদ্ধতির বিবেচ্য অনেক বিষয়, নানা গাণিতিক ফলসহ অনেক তথ্য-উপাত্তও অস্পষ্ট ছিল। ফলে ওই গবেষণাপত্র প্রকাশের পর থেকে তা নিয়ে অনেকের মাঝেই (বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক) নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল।

তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিউএস কিংবা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) কর্তৃক পরিচালিত ও প্রকাশিত র‌্যাংকিং নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও সর্বজনগ্রাহ্য। কিউএস কিংবা টিএইচই-এর র‌্যাংকিং যেহেতু সমসাময়িক, বস্তুনিষ্ট ও নিরপেক্ষ, তাই কিউএসের এ ধরনের র‌্যাংকিং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এবং তা আন্তর্জাতিক মানেরও বটে। এ ধরনের র‌্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি প্রাইভেট এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান বুঝে র‌্যাংকিংয়ে উঠে আসার চেষ্টা করতে পারে। এবং র‌্যাংকিংয়ের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়, যা উচ্চশিক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সর্বোপরি এ ধরনের র‌্যাংকিং অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ভালো করার চাপ থাকে। মূলত এভাবেই সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং শুরু হয়েছে এবং তা মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছেছে। সুতরাং, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গুণগত ও মানসম্মত আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে এ জাতীয় র‌্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিউএস র‌্যাংকিংয়ে স্থান পাওয়া দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ যদি দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দেশ ও জাতি গঠনে সত্যিকার অর্থেই আন্তরিকভাবে একযোগে এগিয়ে আসে এবং এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত জ্ঞান যদি দেশের কাজে লাগানো যায়, তাহলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সগৌরবে মাথা আরও উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে; যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/105841/%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%8F%E0%A6%B8-%E0%A6%B0%E2%80%8C%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9B%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%9F-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%BE

51
স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা                                                                 
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

সুশৃঙ্খলভাবে সমাজে বসবাসের জন্য এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আইনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল, বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাইতো মানবজীবনে আইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘Ignorance of law is no excuses.’ অর্থাৎ আইন না জানা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আবার আইন না জানার কারণে কৃত অপরাধ থেকে মাফও পাওয়া যায় না এবং এ জন্য কাউকে ক্ষমা করা যায় না। সুতরাং দেশের নাগরিক হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে জানা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব এবং কর্তব্য।

আইনের পরিধি অনেক বিস্মৃত হওয়ায় আইন নামক বিষয়টিকে নির্ধারিত কোনো সীমা বা গণ্ডির মধ্যে ফেলা যায় না। এ কারণে আইন বিষয়কে অনেকে ‘এভার গ্র্রিন’ বিষয় হিসেবেও আখ্যায়িত করে। আর আইনের ব্যাপ্তি সম্পর্কে প্রবাদ আকারে বলা হয়, ‘আকাশে যত তারা আইনের তত ধারা।’ অর্থাৎ আকাশের তারা যেমন গণনা করে শেষ করা যায় না, ঠিক তেমনি আইনের ধারাও গণনা করে শেষ করা যায় না। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের আগে শুধু কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হতো। কিন্তু ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও চার বছর মেয়াদি সম্মান ও এক বছর মেয়াদি এলএলএম প্রগ্রামে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন (প্রথমে ১৯৯২ সালে এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে) পাস হওয়ার পর দেশে আইন শিক্ষার দ্বার অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়; যদিও বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার মান নিয়ে শুরু থেকেই যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদানের ফলে অনেক শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে নিজেদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে চলেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারীরা পরবর্তী সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি (এমফিল/পিএইচডি) অর্জন করার সুযোগ পেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ পায় না। কারণ যৌক্তিক বিবেচনায় এবং শিক্ষার মানদণ্ডের নিরিখে এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল বা পিএইচডি করার কোনো বিধান রাখা হয়নি। যা হোক, আইনের একজন শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর সে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের  (জেএসসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হওয়ার সুযোগ পায়। এতে অন্য কোনো বিষয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে না, যা আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগই বটে। অন্যদিকে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবং এখানে আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও  অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। আবার আইনের শিক্ষার্থীরা আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়ার পর আইনজীবী হওয়া ছাড়াও ব্যারিস্টার হওয়ার সুযোগ পায়, যা অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা পায় না। তা ছাড়া আইনে ডিগ্রিধারী একজন শিক্ষার্থী ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রিসার্চ ফার্মসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা বা সংগঠনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও সহজেই বিভিন্ন পদে কাজ করার সুযোগ পায়। এদিক থেকে বলা যায়, আইন বিষয়ের ক্ষেত্র অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন—কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তা ছাড়া দেশে একাধিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আইন বিষয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় দেশে এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্রভাবে কোনো আইন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করতে এবং দেশে আইনের শাসন আরো সুদৃঢ় করতে অধিকসংখ্যক দক্ষ বিচারক ও দক্ষ আইনজীবী দরকার। দেশে যত বেশি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও উত্কৃষ্ট মানের বিচারক ও আইনবিদ থাকবেন তত দ্রুতই সম্ভব হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইন বিষয়ে সচেতন প্রত্যেকেই এ কথা জানেন যে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে আইনব্যবস্থা মূলত ‘কমন ল’ ভিত্তিক। এখানে আনীত অপরাধীকে এ ব্যবস্থায় নিরপরাধ ভেবে আদালতে বিচার হয়। অভিযোগকারীকে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা আর ঝামেলার যেন অন্ত থাকে না। বিচারকের এ ক্ষেত্রে কোনো কিছু করার থাকে না।

অহেতুক আন্দোলন ও নানা অপরাধ-সম্পৃক্ত কার্যকলাপ ‘সিভিল ল’ ব্যবস্থায় যথাসময়ে প্রশমিত করা সম্ভব হয়। আর সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা প্রবর্তনে গতিশীল আইন ব্যবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। এদিক বিবেচনায়, আমাদের দেশে স্বতন্ত্রভাবে অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বর্তমানে আমাদের দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী। তুলনামূলক কম খরচে দেশে আইনে পড়াশোনা করে ছাত্র-ছাত্রীরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ বিচারক ও আইনজীবী তৈরি করতে দেশে মানসম্পন্ন স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এর আগে এ বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে, আবার সমাজের বিশিষ্টজনরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবিও জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফল শূন্য। ভারতের নয়াদিল্লি, বিশাখাপত্তম, হায়দরাবাদ, পাটনা, রায়পুর, গান্ধীনগর, বেঙ্গালুরু, কোচিন, ভূপাল, পুনা, চণ্ডীগড়, মাদ্রাজ, কলকাতা ও অন্যান্য শহরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এগুলো মানসম্পন্ন আইন শিক্ষা জাতিকে উপহার দিয়ে আসছে। এসবের প্রাসঙ্গিকতায় বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি দেশের জন্য অপরিহার্য বিষয় হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার এ দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আইন ও আইন বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক দেশে অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার লক্ষ্যে দ্রুত এগিয়ে আসবে—এমনটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/10/21/693951

52
সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং (ইত্তেফাক)

এবারের ঈদ যাত্রায় (১৬-২৮ আগস্ট পর্যন্ত) সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় ২৭৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সড়ক পথেই দুর্ঘটনার হার বেশি। গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এ তথ্য প্রকাশ করে। বলা বাহুল্য, নিরাপদ সড়কের দাবিতে চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনসাধারণ অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসলেও এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্য। নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়িত না হওয়ায় দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার ফলে প্রতিনিয়ত আহত-নিহত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। তাছাড়া দেশের সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এসব দুর্ঘটনা মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেন। রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে গত ৩০ জুলাই বাস উঠিয়ে দিয়ে দুই শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদে এ আন্দোলন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সচেতন জনগণ মাত্রই দেখে থাকবেন, ঢাকায় চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতা চলে।

দেশের গণপরিবহন খাতে প্রশিক্ষিত ড্রাইভার না থাকা এবং চুক্তি ভিত্তিক ড্রাইভারের হাতে মালিকপক্ষ বাস ছেড়ে দেওয়ার কারণেই মূলত বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, পণ্যবাহী পরিবহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক, মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নসিমন-করিমন চলাচল, বিরতিহীনভাবে যানবাহন চালানো ইত্যাদি। রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা যেন কিছুতেই ফলপ্রসূ হয়নি। মূলত রাজনীতি এবং চাঁদাবাজির কারণে এই ধরনের উদ্যোগ অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভেস্তে গেছে। সড়ক পরিবহনে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের সড়ক-মহাসড়কে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তা কমাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ২৫ জুন ছয়টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে; দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখা, একজন চালকের পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, গাড়ির চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রাক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাধা নিশ্চিত করা।

সড়ক দুর্ঘটনা এ দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিদিনই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবরা-খবর। এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর এতে প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসেব অনুযায়ী, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের (২০১৮)  প্রথম ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে কমপক্ষে দুই হাজার ৪৭১ জন নিহত হয়েছেন। সুতরাং, দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে এতে মনে হয়, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো নিরাপদে চলার পথ না হয়ে তা দিনে দিনে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে এখন যাত্রা করা মানেই যেন নিজের জীবন বাজি রাখা। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই জনগণের কপালের লিখন বলা যায় না। বরং তা এক প্রকার হত্যাকাণ্ড।

আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ, ঝুঁঁকপূর্ণ ও অব্যবস্থাপনাজনিত কারণে পরিপূর্ণ। আর এর মধ্য দিয়েই যাত্রীদের নিকট হতে আদায় করা হচ্ছে গলাকাটা ভাড়া আর অদক্ষ চালককে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়ে, ট্রাফিক আইন না মেনে এবং ফিটনেসহীন গাড়ি চালানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে সরকার ও জগগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। রাস্তার ওপর ফুটপাতে দোকানপাট স্থাপনসহ ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হকারদের ব্যবসা করার ‘সুযোগ’ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশি মতো যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করা, সড়ক-মহাসড়কের ওপর রিক্সা, ভ্যান, টেম্পো, ম্যাক্সি, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড স্থাপন করা, রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন স্থাপন করা, সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা এবং অসত্ উদ্দেশ্যে একই রাস্তা বছরে বারংবার খনন করা, জনগণ কর্তৃক রাস্তা পারাপারের নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে না মানার কারণে এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে।

দেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয় বা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু জবাবদিহির জায়গাটি নিশ্চিত করা হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে যারা নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই  মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি। জবাবদিহির ব্যাপারে যে অনাগ্রহ রয়েছে, এর মূলে রয়েছে এই স্বার্থের সংঘাত। যা হোক, সড়ক দুর্ঘটনারোধে সর্বাগ্রে চালকদেরকে হতে হবে বেশি দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তা চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি না চালানো এবং গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘অভার টেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা আবশ্যক।

মোটকথা, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। সর্বোপরি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে ওঠবে নিরাপদে চলার পথ-যা আমাদের সকলেরই একান্ত কাম্য।

লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
ই-মেইল: kekbabu@yahoo.com

53
সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন কি চলতেই থাকবে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ (কালের কণ্ঠ)

আমাদের দেশে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। অনেক আগে থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে চললেও বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা দেশের গণমাধ্যমজগতের জন্য এক অশনিসংকেতই বটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সংবিধানস্বীকৃত স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করে, যা কোনো সুশাসিত ও গণতান্ত্রিক দেশে কাম্য নয়। দেশে সাংবাদিক হত্যার সর্বশেষ ঘটনা ঘটল গত ২৮ আগস্ট রাতে। ওই দিন পাবনা পৌর সদরের রাধানগর এলাকার পাওয়ার হাউস পাড়ায় সুবর্ণা নদী নামের এক নারী সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত ওই নারী সাংবাদিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আনন্দ টিভি ও দৈনিক জাগ্রত বাংলা পত্রিকার পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন।

বাক্স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকল ১৯-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২.৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে এই হার হয় ৩৩.৬৯ শতাংশ। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সাংবাদিকদের হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে ১০৬ শতাংশ। হয়রানির মধ্যে মানহানির দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে মোট ২১৩ জন সাংবাদিক ও আটজন ব্লগার বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে চারজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, গুরুতর জখম হয়েছেন ৪০ জন। আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬২ জন সাংবাদিক। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পেশাগত কারণে ২৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে শুধু সমকাল পত্রিকার ফরিদপুর ব্যুরোপ্রধান গৌতম দাস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় ঘটনার প্রায় সাড়ে সাত বছর পর ২০১৩ সালের ২৬ জুন ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের হাতে চারজন খুন ও দুজন অপহরণসহ ৩০১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ওই সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২০১৪ সালে দুজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, ২৩৯ জন সংবাদকর্মী বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থা ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টারের (এমএমসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১২ সালে ২১২টি ঘটনায় ৫১২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতিসহ খুন হয়েছেন পাঁচ সাংবাদিক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের ২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিচারে বিশ্বের ১৯৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫। এর আগে ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১২। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স প্রকাশিত ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৪ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬। সূচকে বাংলাদেশের অবনতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এর আগে ২০১৩ সালে ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৪।

সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হামলাকারীরা ‘অদৃশ্য শক্তির’ প্রভাবে ছাড় পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানিকে ত্বরান্বিত করছে। আর এ কারণেই হয়তো সাংবাদিক সাগর-রুনি, শামসুর রহমান, মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালুসহ অনেক সাংবাদিক পরিবার দীর্ঘদিনেও তাদের স্বজন হারানোর বিচার পায় না। আর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের এই স্লোগান লিখতে হয়, ‘বিচার পাই না—তাই বিচার চাই না’। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে?

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, দেশে অগণতান্ত্রিক চর্চা, স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যম সব সময়ই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সোচ্চার ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে হ্যাঁ, যদি কখনো কোনো সংবাদপত্রে বা কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অসত্য ও ভিত্তিহীন হয়, তাহলে যাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তিনি বা সেই সংস্থা বা সংগঠনের সঙ্গে সংশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। সে ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধরা প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ পাঠালে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বা গণমাধ্যম ওই প্রতিবাদ ছাপাতে বাধ্য। এ ছাড়া তাঁরা প্রতিকারের জন্য প্রেস কাউন্সিল বা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারেন।

দেশে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাবলিকে আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। দেশের সরকার ও জনগণ নিশ্চয় সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। দেশ ও জনগণের সার্বিক মঙ্গলের স্বার্থেই সাংবাদিক ও সংবাদপত্র দমননীতির মনোভাব প্রকাশ থেকে সবারই দূরে থাকা উচিত। ভবিষ্যতে আর যেন কোনো সাংবাদিককে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হতে না হয়, তাঁদের ওপর আর যেন কোনো প্রকার অন্যায়, জুলুম, নির্যাতন, হয়রানি না চলে সে বিষয়গুলো সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দেশে সংঘটিত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা তথা তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশসহ সব কিছুই বাধাগ্রস্ত হবে—যা কারো কাম্য নয়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ,ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/09/04/676186


54
ঢাকা বাসযোগ্য হবে কবে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বে বাসযোগ্য ১৪০টি নগরের তালিকায় দ্বিতীয় সর্বনিু স্থানে রয়েছে (১৩৯তম)। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইইইউ) বার্ষিক বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক ২০১৮-এর প্রতিবেদনে গত ১৪ আগস্ট এ তথ্য জানা যায়। সূচকে ঢাকার পরে রয়েছে শুধু গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। কিন্তু ঢাকায় যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো সমস্যা না থাকলেও প্রতিটি মানদণ্ডেই আমাদের ঢাকা খারাপ স্কোর করেছে। আর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা এবার বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য নগরের মর্যাদা লাভ করেছে। ইইইউ প্রতিবছরই স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো- এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক’ তৈরি করে।

এই মানদণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো ঘটনায় চরম অস্থিতিশীলতার ফলে দামেস্ক সর্বনিুে অবস্থান করছে। আর স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণেই মূলত বেশি পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা।

ইইইউ স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোর মতো পাঁচটি বৃহৎ মানদণ্ড সামনে রেখে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩০টি গুণগত ও পরিমাণগত সুযোগ-সুবিধা যাচাই-বাছাই করে। এ জন্য প্রতিটি শহরের জন্য ধরা হয় সর্বমোট স্কোর ১০০। প্রতিটি মানদণ্ডের জন্যও পৃথকভাবে ১০০ স্কোর নির্ধারণ করা হয়।

আবার প্রতিটি মানদণ্ডকেই ‘গ্রহণযোগ্য, সহনীয়, অস্বস্তিকর, অবাঞ্ছনীয় ও অসহনীয়- এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। সূচক প্রতিবেদনে দেখা গেছে- সর্বমোট ১০০ স্কোরের বিপরীতে ঢাকা পেয়েছে ৩০ পয়েন্ট। এর মধ্যে স্থিতিশীলতায় ঢাকার পয়েন্ট ৫০, স্বাস্থ্যসেবায় ২৯.২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪০.৫, শিক্ষায় ৪১.৭ এবং অবকাঠামোয় ঢাকা পেয়েছে ২৬.৮ পয়েন্ট।
ইইইউর প্রতিবেদনে বিগত বছরগুলোয়ও ঢাকার অবস্থান চলতি বছরের ন্যায় খারাপ অবস্থানে বিরাজ করতে দেখা গেছে। গত বছরও ঢাকার অবস্থান খারাপ ছিল। ২০১৫ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের জরিপে সারা বিশ্বে বসবাসের জন্য সবচেয়ে অনুপযোগী (দ্বিতীয়) শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল ঢাকা। ২০১৪ সালে বসবাসের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে অযোগ্য শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এ ধরনের খবরগুলো ঢাকাবাসী তথা এ দেশবাসীর জন্য নিশ্চয় ভালো কোনো খবর নয়। বরং তা উদ্বেগের এবং নিরানন্দের। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকার এ অবস্থানের মূল কারণ ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতি। ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতির বিষয়টি আজ হতে বহুকাল পূর্বেই হয়তো গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন- ‘ভাইসব, তোমরা প্রাচুর্য, সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রত্যেকটি ইট, পাথর উল্টিয়ে আছড়ে দেখছ; কিন্তু যাদের জন্য তোমাদের সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য কতটুকু সঠিক পরিকল্পিত নগরায়ণ করেছ!’ ঢাকার ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন নীতির দিকে তাকালে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথার শতভাগ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে, বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, সুনামি ইত্যাদির ওপর কারও হাত নেই এবং তা রোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটু সচেতন হলে জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ, অপরিকল্পিত ফ্যাক্টরি-কারখানা নির্মাণ করে একটি শহরের ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করা; একটি শহরকে জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত করা; এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো একটি শহরকে পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেয়া; একই রাস্তা অসৎ উদ্দেশ্যে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা; যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে দুর্গন্ধময় পরিবেশ তৈরি করা; যানজট, ধুলা-বালি, ধোঁয়া আর মশার উপদ্রবকে জনগণের নিত্যসঙ্গী বানানো; জনগণের চলাচলের রাস্তার ওপর হাটবাজার বসানো; পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট ইত্যাদির ভোগান্তি থেকে শহরবাসীকে তো অন্ততপক্ষে রক্ষা করা যেতে পারে। নাকি সেগুলোও পারা যায় না?

ঢাকাকে আতঙ্কিত ও অপ্রস্তুত শহর হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও কম হয় না। কিন্তু বিষয়টি যেন ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে’- এ অবস্থার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ ও যানজটমুক্ত করতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নিত্যনতুন পরিকল্পনাও নেয়া হয়। এসব নিয়ে প্রায়ই সভা-সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেসব পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

ইইইউর গত কয়েক বছরের জরিপ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট আর তা হচ্ছে- ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণ টেকসই নয়, যা প্রত্যেক সচেতন নগরবাসীই উপলব্ধি করতে পারেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমরা এত পিছিয়ে? স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অবস্থা তো ভালোই। ঢাকায় নেই কোনো সামরিক যুদ্ধের হুমকি বা বড় ধরনের সহিংস অপরাধের উপস্থিতি, নেই কোনো সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড, ঢাকার প্রতি পশ্চিমাদের নেই তেমন কোনো বিদ্বেষ। এখানে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধনী দেশগুলোর মতো না হলেও একবারে যে অপ্রতুল, তা কিন্তু নয়। কিন্তু পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, তা ঢাকায় নেই।

প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থা, জনগণ কর্তৃক ট্রাফিক আইন না মানার পাশাপাশি সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থার অভাবে ঢাকার রাস্তাঘাটে নিত্য সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। যানজটের কারণে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ। ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য সামান্যতম যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত, সেটুকুও নেই। যতটুকু আছে- সেখানেও হকাররা পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের ‘ম্যানেজ’ করে বসায় হাট-বাজার, দোকানপাট। ঢাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এখানে বড় আকারের অঘটন ঘটলে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে, তা হবে অকল্পনীয়।

শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির কারণে ওই অংশে টিউমার, গোদ রোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ যেমন স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়, ঠিক তেমনিভাবে ঢাকার ওপর নানাদিক থেকে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ যেন টিউমার, গোদ রোগ বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের মতোই অবস্থা, যা ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন
নীতিরই প্রতিচ্ছবি।

রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুলস ফর ডায়াগনসিস অব আরবান এরিয়াসের জরিপে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ঢাকার প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার পাকা ভবনের মধ্যে ৭২ হাজার ভূমিকম্প ঝুঁকি মধ্যে আছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে ২৫ কিলোমিটার বিস্তৃত ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিলেন ৩ লক্ষাধিক মানুষ। গৃহহীন হয়েছিলেন ১০ লক্ষাধিক এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস, অ্যাসেম্বেলি বিল্ডিং, প্রিন্স ক্যাথেডাল ও মেইন জেলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। দেশের বিপুলসংখ্যক জনগণ কর্মসংস্থানের জন্য রাজধানীমুখী হওয়ায় এ সংখ্যা প্রতিদিনই অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ঢাকার ওপর বর্তমানে জনসংখ্যার চাপ যে হারে বাড়ছে, তাতে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকায় হলে এবং তা রিখটার স্কেলে ৭ কিংবা তার একটু ওপরের মাত্রার হলেই ঢাকা ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ ঘটলে বাড়িঘর, অফিস-আদালত, ফ্যাক্টরি, শিল্পকারখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে এবং পানি ও গ্যাসের পাইপলাইন ফেটে গেলে যে কী ভয়াবহ অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ এখন অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। বাস্তবে কতটুকু পরিষ্কার হয়েছে, তা সচেতন ব্যক্তিরাই ভালো বলতে পারবেন। ঢাকাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ইতঃপূর্বে বলেছিলেন, ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে প্রত্যেককে মেয়রের ভূমিকা পালন করতে হবে। ঢাকাকে বসবাসের একটি যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সবাই মিলে ঢাকাকে নিজের ঘরের মতো সাজানোরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের পক্ষ থেকেও এ ধরনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করাসহ নানা কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে- যা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এসব বক্তব্য ও পরিষ্কারকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঢাকাকে পরিষ্কার রাখাসহ এটিকে বসবাসের যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু শুধু মেয়রের পক্ষে কি ঢাকাকে পরিষ্কার রাখা ও বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব? নিশ্চয় না। তাই ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করে তোলার জন্য নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ কতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম, সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা আবশ্যক; যেন সত্যিকার অর্থেই বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা। এ জন্য আমাদের প্রত্যেককেই এসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি মেয়রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কাজ শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/81380/%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A7%87

55
নিরাপদ সড়ক সবার দাবি                                       (দৈনিক কালের কণ্ঠ, তারিখ: ১২ আগস্ট, ২০১৮; পৃ.১৫)
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

নিরাপদ সড়কের দাবিতে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন অনেক আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছেন। দেশের আপামর জনসাধারণও নিরাপদ সড়কের দাবিতে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়িত না হওয়ায় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে দুর্ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনার ফলে প্রতিনিয়ত আহত-নিহত হচ্ছে দেশের অসংখ্য মানুষ এবং দেশের সার্বিক যোগাযোগ ও উন্নতি-অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এসব দুর্ঘটনা মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আবার সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান অনেক সম্পদ। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিসহ নানা দাবিতে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে। রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে গত ৩০ জুলাই বাস উঠিয়ে দিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে হত্যা ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার প্রতিবাদে এ আন্দোলন এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে আসছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের কারণে কয়েক দিন ধরে রাজধানী ঢাকা একপ্রকার অচল হয়ে পড়ে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ২ আগস্ট দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের সচেতন মানুষমাত্রই দেখে থাকবেন যে ঢাকা শহরের মধ্যে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে এক ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতা চলে। এ ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতার করুণ পরিণতি শুধু ঢাকার কুর্মিটোলার বিমানবন্দরের সড়কেই প্রথম নয়, বরং এ ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দুটি বাসের চাপায় তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং পরিণামে করুণ মৃত্যুর ঘটনাও দেশবাসী এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের গণপরিবহন খাতে প্রশিক্ষিত ড্রাইভার না থাকা এবং চুক্তিভিত্তিক ড্রাইভারের হাতে মালিকপক্ষ কর্তৃক বাস ছেড়ে দেওয়ার জন্যই মূলত দেশের বিভিন্ন সড়কে নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা যেন কিছুতেই ফলপ্রসূ হয়নি।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিদিনই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবরাখবর। দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঘটে চলেছে হতাহতের ঘটনা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর এ দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর এতে প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ মারা যায়। দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে মনে হয়, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো নিরাপদে চলার পথ না হয়ে তা দিন দিন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে এখন যাত্রা করা মানেই যেন নিজের জীবন বাজি রাখা। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই এ দেশের জনগণের কপালের লিখন বলা যাবে না, বরং তা একপ্রকার হত্যাকাণ্ড। সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ধরন, ড্রাইভারদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ড্রাইভারদের ওভারটেকিংয়ের মানসিকতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব (যেমন—১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের দেওয়া তালিকা ধরে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার ড্রাইভারকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে), জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন না মানা প্রভৃতি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য; আর ড্রাইভারদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান গোটা বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন যে হারে বাড়ছে, তা যদি অতি দ্রুত রোধ করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করা হয়, তাহলে যে আগামী দিনেও ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

সড়ক দুর্ঘটনারোধকল্পে প্রধানমন্ত্রী যে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, তা এখন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া বাস চালানো বন্ধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামতে পারবে না, এটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে রাস্তা পারাপারে জেব্রাক্রসিং, আন্ডারপাস ও ফ্লাইওভারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এসবের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোও নিবিড়ভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র ভয়াবহ। অদক্ষ ড্রাইভার কর্তৃক গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়ে, ট্রাফিক আইন না মেনে এবং ফিটনেসহীন গাড়ি চালানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য কোনো কঠিন বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জগগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন। রাস্তার ওপর ফুটপাতে দোকানপাট স্থাপনসহ ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হকারদের ব্যবসা করার ‘সুযোগ’ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বাগ্রে ড্রাইভারদের হতে হবে দক্ষ ও সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তা চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো এবং গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ ড্রাইভারদের ‘ওভারটেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা বা শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক। সর্বোপরি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে ও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ হিসেবে, যা সবারই একান্ত কাম্য।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/08/12/668576

56
অবনতিশীল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
 
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন কোনো এক শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে কবি কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ নামক একটি কবিতা পড়েছিলাম। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এরকম : দিল্লির এক মৌলভী (শিক্ষক) বাদশাহ আলমগীরের পুত্রকে পড়াতেন। একদিন প্রভাতে বাদশাহ লক্ষ করলেন, তার পুত্র ওই শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছেন আর শিক্ষক তার পা নিজেই পরিষ্কার করছেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর বাদশাহ দূত মারফত ওই শিক্ষককে কেল্লাতে ডেকে নিয়ে যান। তারপর বাদশাহ ওই শিক্ষককে বলেন, ‘আমার পুত্র আপনার কাছ থেকে সৌজন্য না শিখে বেয়াদবি আর গুরুজনের প্রতি অবহেলা করা শিখেছে। কারণ, সেদিন প্রভাতে দেখলাম, আমার পুত্র শুধু আপনার পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর আপনি নিজেই আপনার পা পরিষ্কার করছেন। আমার পুত্র কেন পানি ঢালার পাশাপাশি আপনার পা ধুয়ে দিল না- এ কথা স্মরণ করলে মনে ব্যথা পাই।’ বাদশাহর মুখে এ কথা শোনার পর ওই শিক্ষক অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির; সত্যিই তুমি মহান, উদার, বাদশাহ্ আলমগীর।’
 
আগের যুগে সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা যে কত উঁচুমানের ও সম্মানের ছিল, তা ওই কবিতাটির মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিছুকাল আগেও দেশে ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটিকে অভিভাবকরা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের আদর্শ রূপ বলে মনে করতেন। আর এখনকার দিনে শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষকের ওপর হামলা চালানো, তাদের হুমকি প্রদান ও লাঞ্ছনা করার ঘটনা যেন নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার আমাদের সমাজের সব শিক্ষকই যে ধোয়া তুলসি পাতা, তাও নয়। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধেই অনিয়ম-দুর্নীতি, যৌন হয়রানি, ক্লাসে সঠিকভাবে না পড়িয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা, নিয়মিতভাবে ক্লাস না নেয়া, সঠিক সময়ে খাতা না দেখা ও রেজাল্ট প্রকাশ না করে শিক্ষার্থীদের সেশনজটে ফেলানো, মাদক গ্রহণ, শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিনাশ করাসহ নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরস্পরের প্রতি এ ধরনের আচরণ নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক আর এ লজ্জা যে গোটা জাতির, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের দেশে একটা সময় যখন শিক্ষকদের বেতন খুবই কম ছিল, তখন শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আসত না বললেই চলে। তখন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল : ‘যার নাই কোনো গতি, তিনি করেন পণ্ডিতি’। তবে শিক্ষকতা সম্মানিত পেশা হওয়ায় সেবার ব্রত নিয়ে অনেকে এ পেশায় আসতেন, যারা টাকা উপার্জনকে গুরুত্ব না দিয়ে সমাজের মর্যাদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিতেন। একটা সময় মহৎ পেশা হিসেবে গর্ব করে বলা হতো, আমি শিক্ষকতা করি। এখনও সবচেয়ে সম্মানের পেশা শিক্ষকতা হলেও এ পেশাটাকে কিছুসংখ্যক সুবিধাভোগী শিক্ষক নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে এ মহৎ পেশার গায়ে কালি লেপন করছেন, যা মোটেই কাম্য নয়। সদাচরণ, গুরুভক্তি, বড়দের সম্মান করা ইত্যাদি বিষয় একটা সময় আদর্শ ছাত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। এ জন্য অবশ্য অনেক শিক্ষকও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী। যখন কোনো শিক্ষক পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করেন, তখন ছাত্রছাত্রীদের কাছে ওই শিক্ষকের মর্যাদা থাকে না। আজকাল ইন্টারনেট, ফেসবুক, মাদক, ইভটিজিং ইত্যাদি বিষয় শিক্ষার্থীসহ কিশোর ও যুবসমাজকে কলুষিত করছে। ফলে নীতি-নৈতিকতা যেন ছাত্রজীবন থেকে বিলীন হতে চলেছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়ের হাতে পিতা-মাতার নির্যাতনের শিকার হওয়া (এমনকি খুন পর্যন্ত হওয়া। যেমন : ঐশী), ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে নির্যাতন করা, নানাভাবে নাজেহাল করার মতো ঘটনাও এখন ঘটছে। বর্তমানে সমাজব্যবস্থা এতটাই পাল্টেছে যে, প্রায়ই শিক্ষকদের অপমান করে একশ্রেণীর শিক্ষার্থী (বিশেষ করে যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত) নিজেদের হিরো মনে করেন।
 
বলা বাহুল্য, এ দেশে অনেক শিক্ষক হত্যা হওয়াসহ অনেকবার শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানো ও তাদেরকে বারবার লাঞ্ছনার শিকার হতে হলেও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনারই বিচার হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাসে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ককটেল হামলা চালিয়ে ১২ জন শিক্ষককে আহত করার ঘটনা; ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের ‘বহিরাগত’ কর্মীর হামলায় দুই শিক্ষক আহত হওয়ার ঘটনা; এর একদিন পর ১২ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারীরা বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ফিল্মি-স্টাইলে শিক্ষক লাউঞ্জে ঢুকে ইট-পাটকেল ছুড়ে ২০ জন শিক্ষককে আহত করার ঘটনা ইত্যাদি। শুধু শিক্ষক লাঞ্ছনাই নয়, শিক্ষকদের হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করা হয় না। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত এক যুগে চারজন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এসব হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েকটির সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কতিপয় শিক্ষার্থীর যোগসাজশ ছিল, যা আদালতের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এডুকেশন ওয়াচ ২০১৭-এর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এখন আর শিক্ষকদের আদর্শ মনে করে না।’ প্রকাশিত ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এখানে মতামত শুধু শিক্ষার্থীরাই দেননি, মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্ত ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং অনেক শিক্ষকও। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এবং রিপোর্ট আমাদের দেশের শিক্ষাপদ্ধতি এবং শিক্ষাব্যবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে আমাদের দেশে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। সত্যি বলতে কি, এখনকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শিক্ষকদের আদেশ-উপদেশ পূর্ববর্তী সময়ের মতো মেনে চলেন না, মেনে চলতে চান না। যদিও এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এখনকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বেশি ক্লাস করতে বা বেশি পড়তে আগ্রহী নন। কম ক্লাস নেয়া, কম পড়ানো আর বেশি নম্বর দেয়া শিক্ষকরাই যেন আজ অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ‘জনপ্রিয়’ শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। যেসব শিক্ষক এ অবস্থার বিপরীতে চলেন, তারা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে ওঠেন চরম যন্ত্রণাদায়ক এবং চরম অপছন্দের।

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষকদের বলা হয়, জাতি গঠনের কারিগর। তাহলে উপরোক্ত ঘটনাগুলো নিশ্চয় জাতির মেরুদণ্ড এবং জাতির কারিগরের ওপর চরম আঘাত। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে বিষয়গুলোকে চলতে দেয়া যায় না। এ বিষয়গুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্ট সবারই গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সবার স্মরণ রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়েছেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, যাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে (যেমন: অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটো প্রমুখ) তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষাগুরুর (শিক্ষক) প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এ কথা সত্য যে, এক প্রজন্ম থেকে আরেকটি প্রজন্মের মধ্যে ফারাক থাকবে এবং কথাবার্তায়, চিন্তাভাবনায়, চলনে-বলনে তার প্রকাশ ঘটবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের দেশে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই প্রজন্মেরই চলমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজেদের সমালোচনার পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। কারণ, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার সুসম্পর্কই কেবল সারিয়ে তুলতে পারে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অসহনীয় ও অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে। পুরো ব্যবস্থাপনা পাল্টাতে হলে অবশ্যই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করতে হবে।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/window/77826/%E0%A6%85%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%80%E0%A6%B2-%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%95-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95

57
সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ    (দৈনিক কালের কণ্ঠ, তারিখ: ১১ জুলাই, '১৮; পৃ. ১৪)
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে তথা সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ২৫ জুন ছয়টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখা, একজন চালকের পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, গাড়ির চালক ও তাঁর সহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রাক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করা।

এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভি চ্যানেলের সংবাদের দিকে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবরাখবর। দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঘটে চলছে হতাহতের ঘটনা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর এ দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর এতে প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২ হাজার ৭৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছেন। এ হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন হাজার ২৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন হাজার ৭৭০ জন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আট হাজার ৬৪২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। মোট দুর্ঘটনা হয়েছে ছয় হাজার ৫৮১টি। আর ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত হয়েছেন অর্থাৎ দিনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯১৪ জন। দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, তাতে মনে হয় দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো নিরাপদে চলার পথ না হয়ে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে এখন যাত্রা করা মানেই জীবন বাজি রাখা।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এ দেশের জনগণের কপালের লিখন? নিশ্চয়ই না। উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। সুতরাং এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনা জনগণের কপালের লিখন নয়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো বিদেশের সঙ্গে পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে, সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারটেকিং করার মানসিকতা ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন কিংবা রাস্তায় চলাচলের নিয়ম না মানা প্রভৃতি। এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত দেড় বছরে শুধু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত ২০০ জন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা অনেক বেশি।

সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ যে কঠিন ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হচ্ছে সেসব বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিনে দিনে যে হারে বাড়ছে তা যদি অতিদ্রুত রোধ করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী  পদক্ষেপ গ্রহণ ও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করা হয়, তাহলে যে ভবিষ্যতেও ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি জনগণ আহত-নিহত হতেই থাকবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণও চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুপযুক্ত সড়ক-মহাসড়ক, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক থাকা, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ নকশা থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুলপথে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বেশি গতির বড় গাড়িগুলোর অপেক্ষাকৃত কম গতির ছোট গাড়িগুলোকে ওভারটেকিং করার প্রবণতা, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করা, রাস্তা পারাপারের জন্য অনেক সময় ওভারব্রিজ থাকলেও ব্যবহার না করা, রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলের জন্য যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে তা না মানা।

অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। এককথায় করুণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অব্যবস্থাপনাজনিত কারণে পরিপূর্ণ। আর এর মধ্য দিয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে গলা কাটা ভাড়া সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে স্মরণে রাখতে হবে, দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি মানে শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়, বরং সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষের অমূল্য জীবন দুর্ঘটনামুক্ত রাখাটা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের হতে হবে বেশি দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তায় চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো এবং গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘ওভারটেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে সে বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা বা শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2018/07/11/656585

58
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার পরামর্শক থাকা বাঞ্ছনীয় (দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৯ জুন, ২০১৮ ; পৃষ্ঠা নং ১২)
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই চোখে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যাসংক্রান্ত খবরাখবর। তা ছাড়া ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা, মানসিক অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে। সংগত নানা কারণে আগের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ অবস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেই মনে হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চললেও দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার পরামর্শদাতা বা কাউন্সেলর নিয়োগ করা হলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতাসহ তাদের মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা অনেকটাই কমে আসবে। এ কথা ধ্রুব সত্য যে একজন শিক্ষার্থীকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে তাদের মা-বাবা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পাঠান। পাশাপাশি দেশ-জাতিও তাদের কাছ থেকে ভালো অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। এ কথা সত্য, মানুষের জীবনেই সমস্যা আসে এবং সমস্যা আসবেই—এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে হবে। বরং জীবনে সমস্যা এলে বা সমস্যায় পড়লে শিক্ষার্থীসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত বা সেই সমস্যা প্রতিহত করা উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউন্সেলরেরও শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থী বা অন্য কেউ যখন আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে তখন স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া হয় যে এটি তার মানসিক অস্থিরতা বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল।

বলা বাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই এবং কোনোভাবেই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, তেমনি অন্যদিকে একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে ‘আত্মহত্যা’ নামক এই মহাপাপ সংঘটিত হয়ে আসছে এবং এটিকে কোনো দেশ কিংবা কোনো সমাজ কখনোই ভালো চোখে দেখেনি এবং ভবিষ্যতেও দেখবে না। কোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ নিহিত থাকে তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা বা Depression, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনঃকষ্ট, বাইপোলার ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া (দীর্ঘদিন ধরে ব্যর্থতা, গ্লানি বা হতাশা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অনাগত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, কর্মব্যস্ততাহীন দিন যাপন ইত্যাদি মানবমস্তিষ্ককে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত করে), পার্সোনালিটি ডিস-অর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিস-অর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহারজনিত ডিস-অর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। WHO-এর বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ২০২০ সালের মধ্যে হৃদেরাগের পরেই বিষণ্নতা মানবসমাজের বিপন্নতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হবে। WHO-এর জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০১২ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ চার হাজারটি। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০টি, যার মধ্যে ৫৮ থেকে ৭৩ শতাংশ আত্মহত্যাকারীই নারী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে : পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তিসংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ, কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা, ‘এ পৃথিবীতে কেউ আমাকে চায় না’ বা ‘আমি সবার বোঝাস্বরূপ’ কিংবা ‘আমি পরিবারের কলঙ্ক’ বা ‘এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে আমার কোনো লাভ নেই’—এজাতীয় বদ্ধমূল চিন্তা ইত্যাদি। এসব চিন্তার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। আর তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতাও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।

আত্মহত্যার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেকাংশে এগিয়ে রয়েছে এবং এসংক্রান্ত খবরাখবর প্রায় সময়ই পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও আত্মহত্যা চেষ্টার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চললেও এবং তাদের অনেকেই মানসিক অশান্তি ও অস্থিরতায় ভুগলেও আজ পর্যন্ত দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো পেশাদার পরামর্শক বা কাউন্সেলর। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। বেশির ভাগ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে প্রটেকটিভ ফ্যাক্টর বা রক্ষাকারী বিষয় বলা হয়। যেমন—জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তা ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। তা ছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়।

সুতরাং শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হলেই শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। সর্বোপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আত্মহত্যা যে মহাপাপ এবং আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিয়মিতভাবে তার প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি শিক্ষার্থীসহ সবাইকেই জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সবারই স্মরণ রাখা প্রয়োজন, জীবনটিকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে একে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি;
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://kalerkantho.com/online/sub-editorial/2018/06/19/648719

59
বন্য প্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের দায়িত্ব কার?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু          ১৫ মার্চ, ২০১৮ (কালের কণ্ঠ)

 
আমাদের দেশে বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার, নিধন ও পাচারের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই দেখা যায় নানা ধরনের বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার, নিধন ও পাচারসংক্রান্ত খবরাখবর। সমাজের এক শ্রেণির অসাধু, অর্থলোভী, অসচেতন ও ‘শিকারপ্রিয়’ লোকজন এসব বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার, পাচার ও নিধনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার, পাচার ও নিধনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতনতার অভাবে দেশে বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার, পাচারসহ নিধনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বন বিভাগের গবেষণা ও পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী গত সাত বছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৪২ হাজার বন্য প্রাণী পাচারের সময় আটক হয়েছে। এর মধ্যে সুন্দরবনের ১৩টি বাঘসহ বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে। পাচার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপের পরিমাণ বেশি। এসব বন্য প্রাণীর একটি অংশ দেশের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য এবং বাকিগুলো দেশের বাইরে পাচারের চেষ্টা হচ্ছিল। তবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের ভেতরে যেসব বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার হয়, তার বড় অংশই ধরা পড়ে না এবং এগুলো বিদেশে পাচার হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের কোন এলাকা থেকে কোন ধরনের বন্য প্রাণী পাচার হয়, তা নিয়ে যৌথভাবে একটি গবেষণা চূড়ান্ত করে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডাব্লিউসিএ) বাংলাদেশ এবং ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)। ‘বাংলাদেশের বন্য প্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই : বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তীতে করণীয়’ শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্য প্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী দুই বিভাগ খুলনা ও বরিশাল। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকার আশপাশের বনাঞ্চল থেকে বন্য প্রাণী পাচার হয়। পাচার হওয়া বন্য প্রাণীর ৮২ শতাংশই হরিণ। এ ছাড়া রয়েছে তক্ষক, সাপ, কচ্ছপ ও বাঘজাতীয় প্রাণী। বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিলের হিসাব অনুযায়ী ১৯০০ সালে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। ২০১৪ সালে তা কমে চার হাজারে নেমে আসে। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে পায়ের ছাপ গুনে বাঘের সংখ্যা নির্ণয় করার জরিপে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। বলা বাহুল্য, বন্য প্রাণী ও পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দিন দিন অব্যাহতভাবে বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তা আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর এর কুফল ভোগ করতে হবে আমাদের সবাইকে। নির্বিচারে বন্য প্রাণী ও পাখি শিকারের ফলে আমাদের দেশ থেকে দ্রুত বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। Red Book of The Threatened Animals : IUCN-Bangladesh নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত শতাব্দীতে এ দেশের বনাঞ্চল থেকে প্রায় এক ডজনেরও বেশি প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮৮ প্রজাতির দেশীয় পাখি রয়েছে। এ ছাড়া শীতকালে প্রায় ২৪০ প্রজাতির অতিথি পাখি প্রতিবছর বাংলাদেশে আসে। কিন্তু নির্বিচারে বনভূমি উজাড়, জলাশয় ভরাট, পাখি শিকার এবং পরিবেশদূষণের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় নানা জাতের পাখি যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তেমনি অতিথি পাখির আগমনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। অথচ দেশীয় এবং অতিথি পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বন্য প্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য দেশে অনেক আগে থেকেই আইন রয়েছে। ব্রিটিশ আমলেও এ সম্পর্কিত বিশেষ আইন ও বিধিমালা ছিল। এ আইনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে Act for the Preservation of Wild Elephants, 1879; The Wild Birds and Animals Protection Act, 1912; The Bengal Rhinoceros Preservation Act, 1932 প্রভৃতি। এ ছাড়া The Indian Forest Act, 1927-এর মাধ্যমে কোন কোন বনাঞ্চলে শিকার করা যাবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিধিবিধান করা হয়েছিল এবং সে অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এ আইনটি বাংলাদেশে The Forest Act, 1927 নামে কার্যকর আছে। পাশাপাশি দেশে ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ নামেরও একটি আইন আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অজ্ঞাত কারণে এসব আইন বন্য প্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি কিংবা পারছে না। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে Bangladesh Wildlife (Preservation) Act পাস করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে এ আইনের কিছু সংশোধন করা হয়। এ আইনটির মাধ্যমে Bangladesh  Wildlife Advisory Board গঠনসহ ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা ও প্রাণী অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এ আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা ধরনের শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থাপন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্বসহ বন্য প্রাণী সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে আইনটিতে। কোনো বন্য প্রাণীর বৃদ্ধি যদি সেই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় হুমকি হিসেবে দেখা দেয়, অথবা কোনো বন্য প্রাণী যদি মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়। তবে সেই ধরনের প্রাণী হত্যা করা যাবে। আইনের দ্বিতীয় তফসিলে কিছু প্রাণীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর চামড়া আইনগত সার্টিফিকেট ছাড়া কোনোভাবেই দখলে রাখা যাবে না। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া ঘরের শোভা বৃদ্ধি করার জন্য হরিণ বা বাঘের চামড়া দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন, তবে তা বেআইনি হবে। তৃতীয় তফসিলে ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৬১ প্রজাতির পাখি এবং ৬৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে; যেগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং এগুলো কোনোভাবেই শিকার, হত্যা বা ধরা যাবে না। এ প্রাণীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, বনরুই, উল্লুক, লজ্জাবতী বানর, হাতি, হনুমান, চিত্রা হরিণ, মায়ামৃগ, কুমির, শকুন, বাজ, ধনেশ, মদনটাক, নীলকণ্ঠ, বেগুনি কবুতর, লাল ঘুঘু, ময়ূর, কোকিল ইত্যাদি। আইনটির ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সরকারের অনুমতি ছাড়া বন্য প্রাণী আমদানি বা রপ্তানি করতে পারবে না। ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পেশা বা ব্যবসা হিসেবে বন্য প্রাণী ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না, করলে ছয় মাসের জেলসহ জরিমানা হবে। আবার কোনো ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা ফাঁদ বা অন্য কোনো উপায়ে বন্য প্রাণী শিকার করলে তার এক থেকে দুই বছরের জেলসহ জরিমানা হবে।
দেশে বন্য প্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সেগুলো পর্যাপ্ত লোকবল সংকট, সচেতনতা, তদারকি ও জবাবদিহির অভাব; রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা কারণে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দিন দিন দেশে বন্য প্রাণী ও পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা পরিবেশের জন্য এক অশনিসংকেতই বটে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ জরুরি ভিত্তিতে এসব বন্য প্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। প্রয়োজন বন্য প্রাণী অপরাধ দমন বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা। সর্বোপরি সরকার, বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সবারই এ ক্ষেত্রে দ্রুত একযোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন; যেন বাংলার এই সবুজ প্রাকৃতিক ভূমি বন্য প্রাণী ও পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2018/03/15/613446

60
চিকিৎসাসেবা এবং টিআইবির প্রতিবেদন   [দৈনিক যুগান্তর, তারিখ: ৯.২.২০১৮ (পৃ.৪), প্রিন্ট সংস্করণ]
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৭ ফেব্র“য়ারি ‘বেসরকারি চিকিৎসাসেবা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় বেসরকারি পর্যায়ের ৬৬টি হাসপাতাল এবং ৫০টি রোগনির্ণয় কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং এতে বেসরকারি চিকিৎসা খাতসংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি পর্যালোচনা, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, এসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবা, বেসরকারি চিকিৎসাসেবার বিপণনব্যবস্থা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং তদারকির বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতে বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা প্রকট এবং বেসরকারি চিকিৎসাসেবায় সরকারের যথাযথ মনোযোগেরও ঘাটতি রয়েছে। এতে একদিকে এটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কিছু ব্যক্তির এ খাত থেকে বিধিবহির্ভূত সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১১৬টির মধ্যে ৯৭টি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেয়নি। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধান আইন ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’ প্রণয়নের পর এখন পর্যন্ত হালনাগাদ (আপডেট) করা হয়নি। এ আইনের কোনো বিধিমালাও করা হয়নি। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা আইনের খসড়া নিয়ে কাজ করা হলেও তা এখনও আইন হিসেবে প্রণয়ন করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী জনসংখ্যার প্রায় ৬৩.৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নেন। সুতরাং এ খাতের এ ধরনের ভয়াবহ চিত্র নিশ্চয়ই দেশবাসীর জন্য, বিশেষ করে এ খাত থেকে সেবাগ্রহণকারীদের জন্য উদ্বেগজনক এবং আতঙ্কেরও বটে। বাস্তবতা হচ্ছে, বেসরকারি চিকিৎসা খাতে সরকারি পর্যায়ে তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব থাকায় এ খাত থেকে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে উচ্চ মুনাফা অর্জন করছে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়েছে।

শুধু বেসরকারি পর্যায়েই নয়, সরকারি পর্যায়েও দেশের চিকিৎসাসেবার চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডাক্তার ধরে রাখার জন্য এমপিদের দায়িত্ব নেয়ার কথা বলেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর আগে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ জনগণকে সেবা দিতে সব চিকিৎসকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাছাড়া গত বছরের (২০১৭) ২৯ ডিসেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাতটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অ্যাম্বুলেন্সের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় তারা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমরা যখন উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের নিয়োগ দিই, তখন অনেকেই আছেন যারা কর্মক্ষেত্রে থাকতে চান না। বরং তারা যে কোনো উপায়েই ঢাকায় থাকেন। যদি চিকিৎসকদের ঢাকায়ই থাকার ইচ্ছা হয়, তাহলে তাদের সরকারি চাকরি করার প্রয়োজন নেই। রাজধানীতে বসে প্রাইভেট রোগী দেখে তারা অনেক টাকা উপার্জন করতে পারেন। তাই তাদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে চলে যাওয়াই ভালো। আমরা তাদের স্থানে নতুন নিয়োগ দেব।’ বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকায় অবস্থানরত অধিকাংশ চিকিৎসকই ঢাকার বাইরের জেলায় সাধারণত কাজ করতে চান না। আর এমন অভিযোগ বেশ প্রবল এবং এ ধরনের অভিযোগ অনেক আগে থেকেই উত্থাপিত হয়ে আসছে। অনেক চিকিৎসক আছেন যারা প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর রাজধানীতে কাজ করছেন। আবার অনেক চিকিৎসকই বাইরের জেলা থেকে ঢাকায় আসতে আদা-জল খেয়ে চেষ্টা-তদবির করেন। আর এ কারণেই রাজধানী ঢাকা যেন ডাক্তারদের যানজটে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঢাকার বাইরে কাজ করতে পারেন, তাহলে ডাক্তাররা পারবেন না কেন? কী কারণে সরকারি চিকিৎসকরা ঢাকার বাইরের জেলায় কাজ করতে চান না কিংবা কী কারণে তারা ঢাকায় থাকার ব্যাপারে এতটা মরিয়া, তা বুঝতে বোধ হয় কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিয়ে যারা আন্দোলন করেন তাদের অভিযোগ হচ্ছে, বড় শহরগুলোর বাইরে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ কম থাকায় চিকিৎসকরা সেদিকে যেতে অনাগ্রহী। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকায় কর্মরত ১১০ চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বদলি করেছে। বদলির আদেশে বলা হয়েছে, ডাক্তাররা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তারা কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না। কিন্তু অনেক ডাক্তার নির্ধারিত সময়ে তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। বরং অনেক চিকিৎসক প্রভাব খাটিয়ে বদলির আদেশ ঠেকাতে তৎপর হয়ে উঠেন। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকসহ সবারই স্মরণ রাখা প্রয়োজন, শুধু ঢাকায়ই নয়, দেশের উপজেলা পর্যায়ে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও চিকিৎসাসেবা পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার।

রাষ্ট্রের কাছে জনগণের অন্যতম মৌলিক চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। আর স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের ১৫(ক) এবং ১৮(১)- অনুচ্ছেদে চিকিৎসাসেবা এবং জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আর মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম, যা সবাই জানেন। আর চিকিৎসা নামক এ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এ দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না, বিশেষ করে তারা যদি কোনো সরকারি হাসপাতালে যান। এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি আজ আর কোনো নতুন বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এ সংক্রান্ত নানা খবর। মফস্বল পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, হাসপাতালের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব, ডাক্তার সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি গায়েব করা, অধিক অর্থের লোভে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে চিকিৎসকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে অধিক মনোযোগী ও যতœবান হওয়া, সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাব, ভুল চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর এসব খবরের মধ্যে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ফলে রোগীর শারীরিক ক্ষতি বা মারা যাওয়ার মতো দুঃখজনক খবরও থাকে। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে বা আঘাত পেলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটা বা ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশে আইনের তেমন একটা প্রসার ও প্রয়োগ ঘটেনি। তাছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতাও খুব কম। ফলে চিকিৎসকের গুরুতর অবহেলার কারণে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু ঘটলেও বা রোগী মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়লেও চিকিৎসকরা খুব সহজেই পার পেয়ে যান। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তির অবহেলাজনিত কারণে যদি কারও মৃত্যু ঘটে, তবে ওই ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা দুটোই একসঙ্গে শাস্তি হিসেবে দেয়া যাবে। চিকিৎসকের অবহেলার জন্য দণ্ডবিধির আওতায় এবং টর্ট (দেওয়ানি প্রতিকার) আইনের আওতায় মামলা করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণই সচেতন নন। অবহেলার সরাসরি প্রমাণ রয়েছে- এমন ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যদি ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা রোগীর অভিভাবক আইনগত ব্যবস্থা নিতে না চান। প্রথম থেকেই তাদের ধারণা জন্মে যে, এ জন্য কিছুই হবে না। আর এ বিষয়ে আইনের অগ্রগতিটাও এ দেশে তেমনভাবে হচ্ছে না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে অনেক মামলা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভারতের আদালত এসব মামলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রোগী বা ব্যক্তির উপকারও করেছেন।

বর্তমান সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা অগ্রণী এবং অপরিসীম। কারণ, চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা যদি শুধু ঢাকামুখী হন কিংবা কেবল ঢাকায়ই থাকতে মরিয়া ওঠেন, তাহলে সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নসহ সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। কিন্তু তেমন একটা লাভ হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে সার্বিক দিক বিবেচনায় এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা প্রয়োজন যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসকরা গ্রামীণ এলাকায় থেকে কাজ করতে বাধ্য হন। আর বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন কমিশন তৈরি করাটা সার্বিক দিক থেকেই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি, জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের মন-মানসিকতার ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজন অধিক অর্থের লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করা, দায়িত্ব-কর্তব্যে আন্তরিক ও সতর্ক হওয়া। কারণ চিকিৎসা একটি মহান পেশা, সেবামূলক পেশা।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/todays-paper/sub-editorial/15711/%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A7%8E%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A6%BE-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A6%E0%A6%A8/print


Pages: 1 2 3 [4] 5 6