Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - kekbabu

Pages: 1 ... 3 4 [5] 6
61
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল করা হয় কার স্বার্থে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
২৯ জানুয়ারি, ২০১৮

আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে উচ্চশিক্ষা প্রদান করাসহ বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজকর্ম করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করাসহ সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করে যোগ্য করে গড়ে তোলে। বিষয়ভিত্তিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে নানাভাবে ভাগ করা গেলেও সাধারণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা—পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। আর এই বিশ্ববিদ্যালয় নামক বিদ্যাপীঠে যারা পড়তে আসে, তাদের শিক্ষার্থী বলা হয়ে থাকে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যদি (যদিও সব শিক্ষার্থী নয়) বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-গবেষণাচর্চার পরিবর্তে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, পকেট ভরা নিয়ে ব্যস্ত থাকে; হাতে বই-খাতা আর কলমের পরিবর্তে লাঠিসোঁটা আর অস্ত্র নিয়ে মারামারি-ফাটাফাটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তবে অবশ্যই তা দেশ ও জাতির জন্য দুঃখজনক। আর এই দুঃখজনকের বিষয়টির পাল্লা ভারী দেখা যায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে। গত ২৩ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সহিংস ঘটনা ঘটল, তা অবশ্যই এ দেশ-জাতির জন্য লজ্জাজনক একটি বিষয়। এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেউ আশা করেন না। ওই দিন ছাত্রী নিপীড়নে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতাদের বহিষ্কারের দাবিসহ চার দফা দাবিতে প্রশাসনিক ভবনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানকে ‘উদ্ধার’ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অন্তত ৪০ জন আহত হয়। শুধু তা-ই নয়, ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ঘেরাও করে দরজা ও অফিস ভাঙচুর, অশালীন ভাষায় উপাচার্যকে গালাগাল ও তাঁর দিকে তেড়ে যাওয়া হয়, যা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। যদিও এসব ঘটনার জন্য ছাত্রলীগ ও বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা পরস্পরকে দায়ী করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে ভাঙচুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের ক্ষতিসাধন ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করাসহ উপাচার্যকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের চেষ্টা করে, তারা আর যা-ই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পারে না। কারণ ছাত্রের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, এসব বিষয় কোনোভাবেই ছাত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না। এ ক্ষেত্রে সরকারসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন যে ছাত্র নামক এসব সন্ত্রাসী দেশি-বিদেশি কোনো চক্র বা বিশেষ কোনো মহলের নীলনকশা বা ষড়যন্ত্র অনুযায়ী ষড়যন্ত্রকারীদের এজেন্ডা বা মিশন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে কি না। নাকি আসন্ন নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে? এসব প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের দায়িত্ব কোনো ছাত্রসংগঠনের হতে পারে কি না? আন্দোলনের নামে কেউ যদি বাড়াবাড়ি করে, তবে তা মোকাবেলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম-রীতি রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের দায়িত্ব কোনো ছাত্রসংগঠনের নিজের হাতে তুলে নেওয়াটা কাম্য হতে পারে না। আর এটি করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যদি হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়, তবে তা একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সবারই স্মরণ রাখা প্রয়োজন, আন্দোলনের নামে অশোভন আচরণ যেমন কাম্য নয়, তেমনি আন্দোলন দমনের নামে সহিংসতাও মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য কোনো দাবি থাকলে তা অবশ্যই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত এসব সহিংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তথা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নামক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ বা ভাবমূর্তি দেশি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানাভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের নানা অর্জন আজ যেন ম্লান হতে চলেছে।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের উচ্চশিক্ষার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই অনেক আগে থেকেই ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা অব্যাহতভাবে সন্ত্রাস, হত্যা, হামলা, ভাঙচুর, দখলদারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গ্রুপিং বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, নিয়োগ, ভর্তি ও সিট বাণিজ্যসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী ছাত্রের হতাহতের ঘটনাসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা অঙ্কের টাকার সরকারি সম্পদ বিনষ্ট করার খবর আজ আর কারো অজানা নয়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেও এসব সন্ত্রাসী বারবার রেহাই পেয়ে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আবার লিপ্ত হয়ে পড়ছে। আর এসব ঘটনার ফলে একদিকে যেমন দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, অপরদিকে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে বারবার মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে লেখাপড়ার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ। সৃষ্টি হচ্ছে সেশনজট, শিক্ষার্থীদের পেছনে তাদের অভিভাবকদের ব্যয় করতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যারা ঘটাচ্ছে, তারা কি অপ্রতিরোধ্য? এদের কি সামলানো সম্ভব নয়? যদি সামলানো সম্ভব হয়, তাহলে তাদের সামলানোর দায়িত্ব কার? রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেও ‘ছাত্র’ নামধারী সন্ত্রাসীরা বারবার রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। ছাত্র নামধারী এসব সন্ত্রাসীর অপকর্মের জন্য দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যয়নরত হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন আজ অনিশ্চিত পথের দিকে ধাবিত হচ্ছে। লেখাপড়া করার পরিবর্তে ক্যাম্পাসে কখন সংঘর্ষ বাধে—তাদের এই শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশি বহন করতে হচ্ছে সেশনজটের বোঝা। সর্বোপরি বিঘ্নিত হচ্ছে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ। নষ্ট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল টাকার সম্পদ।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধারাবাহিক ও চলমান এসব অস্থিরতা কিসের আলামত বহন করে এবং এর পেছনে স্বার্থ কী? শিক্ষাঙ্গনের এসব অস্থিরতার মাধ্যমে দেশ-জাতিকে মেধা ও নেতৃত্বশূন্য করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশি-বিদেশি কোনো অশুভ চক্রের যোগসূত্রতা রয়েছে কি না তা সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সবাইকে ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা বন্ধ করতে তথা ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে দেশের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে তাদের নিজেদের স্বার্থেই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য।
kekbabu¦yahoo.com
Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2018/01/29/595434

62
ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের দিন আজ
প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৮
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

আজ ২৯ জানুয়ারি। ১৭৮০ সালের এই দিনে ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র নামক জ্ঞানভা-ারের যিনি শুভ সূচনা করেছিলেন তিনি হলেন জেমস অগাস্টাস হিকি। কলকাতা হতে প্রকাশিত ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’। তিনি এ পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক তথা ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের শুভ সূচনাকারী হিসেবে সমধিক পরিচিত। সংবাদপত্রে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোসহীন, নির্ভীক, নিরপেক্ষ, সাহসী ও সংগ্রামী এক পুরুষ। হিকি ছিলেন জাতিতে ইংরেজ। ১৭৭৪ সালে তিনি ভাগ্য অন্বেষণে ইংল্যান্ডের বাকিংহাম হতে ভারতের হিজলিতে আসেন। কর্মজীবনের প্রথমে তিনি জাহাজের ব্যবসা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত এ ব্যবসাতে বড় ধরনের লোকসানের পর খবরের কাগজ বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই সিদ্ধান্তের ফসল হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’। ট্যাবলয়েড সাইজের দুই পাতা বিশিষ্ট ইংরেজী ভাষার প্রকাশনা সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটি হিকি কর্তৃক প্রকাশিত ও সম্পাদিত হতো বলে জনসাধারণের কাছে তা ‘হিকির গেজেট’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। হিকির গেজেটের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে থাকত বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন ছাড়াও প্রথম সংখ্যাতে সবার নজর কাড়ে ‘পোয়েট্স কর্নার’ বা কবিদের জন্য বিভাগটি। প্রেম-ভালবাসা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এ জাতীয় বিমূর্ত বিষয়সহ সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে এখানে কবিতা লিখতেন স্বয়ং হিকি এবং আরও কেউ কেউ। হিকির গেজেটের পাঠক শ্রেণীর অধিকাংশই ছিল বেসরকারী বণিক এবং ভারতবর্ষে বসবাসরত ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ। হিকির গেজেটে পাঠকদের নিয়মিত চিঠি প্রকাশিত হতো। আর এসব চিঠিতে যেমন থাকত কলকতা বা অন্যান্য জায়গায় বসবাসকারী ইউরোপীয়দের নানা প্রকার অভাব-অভিযোগ ও অসুবিধার কথা, তেমনি থাকত প্রশাসনের দুর্নীতি এবং অন্যায় আচরণের খবর। এমনিভাবে রোহিলা যুদ্ধ, মারাঠা যুদ্ধ এবং তৎকালীন গবর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের ভুল নীতির কঠোর সমালোচনা করে চিঠি ও খবর প্রকাশিত হতে থাকে এ গেজেটে। তাছাড়া সেনারা কিভাবে প্রবঞ্চিত হচ্ছে, সরকারী সিক্কা মুদ্রা বাতিলের ফলে লেনদেনে যে অসুবিধার সৃষ্টি হলো, আদালতে কি ধরনের বে-আইনী কাজকর্ম চলছে এবং ঘুষ না দিলে যে কিছুই হয় না তাও প্রকাশিত হতো হিকির গেজেটে।

হিকির গেজেটে বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদ প্রকাশের ফলে তার গুণাগ্রহীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সরকারের অপকর্মের কঠোর সমালোচনা করার জন্য হিকিকে জব্দ করার জাল যতই বিস্তৃত হতে থাকল হিকিও ততই মরিয়া ও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। বিশেষ করে গবর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস্ আর সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ইলিজা ইম্পে প্রচ-ভাবে ক্ষেপে যান হিকির ওপর এবং তাকে জব্দ করার উপযুক্ত সময়টুকুর জন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকেন। কলকতার প্রথম কমিশনার রবার্ট চেম্বারস ও সার্ভেয়ার এডওয়ার্ড টিবেট্রা (যার নামে আজকের টেরিটি বাজার) প্রণীত নগর উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত কর ধার্য প্রস্তাবের বিপক্ষে হিকি তার পত্রিকার মাধ্যমে জনমত ও আন্দোলন সংস্থা গড়ে তোলেন। শুধু তাই নয়, হিকি তার গেজেটের ৪৩তম সংখ্যাতে লিখলেন ‘কলকাতার ইংরেজরা দেশের মঙ্গলের জন্য এ ধরনের সংস্থা গড়ে তোলায় হেস্টিংস ভয় পেয়েছেন। তার আশঙ্কা, এতে তার (হেস্টিংসের) নাম কলঙ্কিত হবে।’ এ খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরই হেস্টিংস ভারতবর্ষের প্রথম খবরের কাগজটির ওপর সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারের কাছ থেকে পত্রিকাটি যেসব সুযোগ-সুবিধা পেত তা প্রত্যাহার করেন। ‘কাউন্সিল অব বেঙ্গল’-কে দিয়ে ১৭৮০ সালের ১৪ নবেম্বর তিনি পাস করিয়ে নেন যে, জেনারেল পোস্ট অফিসের মাধ্যমে হিকি আর তার কাগজ পাঠাতে পারবেন না গ্রাহকদের কাছে। এ ঘটনার পর হিকি তার গেজেটে ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তাকে হোমারের মতো ছোট ছোট গাথা রচনা করে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করে বেড়াতে হয় তবুও তিনি সরকারের অন্যায় কাজের বিরোধিতা করা বন্ধ করবেন না।’ এরপর শুধু হেস্টিংস নন, হেস্টিংসের পতœীর বিরুদ্ধেও হিকি তার গেজেটে তোলেন সমালোচনার ঝড়। হেস্টিংসের পতœী সম্পর্ক হিকি লিখলেন, ‘সেই সহৃদয়া মহিলার কথা যা শুনেছি তাতে তার প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি, তার উদার স্বভাবের সুযোগ নিয়ে যদি তার স্বামীকে প্রভাবিত করে আমাকে কোন সুযোগ দিতে বলি এবং তার স্বামীও স্ত্রীর প্রতি অসন্দিগ্ধ ভালবাসায় অভিভূত হয়ে তার অন্যায় অনুরোধ মেনে নেন তবে সেটা খুব সুখের হবে না।’ কলকাতার মানুষ ১৭৮০ সালের অক্টোবর সংখ্যায় হিকির গেজেটে খবরের এ অংশটা দেখে টানটান হয়ে বসল। স্ত্রীর প্রতি এই আক্রমণে হেস্টিংস যখন আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ হিকি তখন নাটকীয়ভাবে তার গেজেটের প্রথম বছরের ৪৩তম সংখ্যায় লিখলেন, ‘কাগজের জন্য তার এখন তিনটি জিনিস হারাবার আছে। সে তিনটি জিনিস হলো তার সম্মান, তার স্বাধীনতা এবং তার জীবন। প্রথমটির জন্য তিনি পরের দুটি হারাতে রাজি আছেন। তাকে অন্যায়ভাবে আটক রেখেও তার ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে, সন্ত্রাস, অত্যাচার চালিয়েও তাকে নিরস্ত্র করা যাবে না। তার যে সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষমতা আছে তা কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা তার প্রভু সম্রাটও কেড়ে নিতে পারবে না। কোম্পানি বা তার কর্মচারীদের এমন ক্ষমতা দেয়াটা ব্রিটিশ সম্রাটের অভিপ্রেতও নয়।’ হিকি তার গেজেটে এরপর থেকেই হেস্টিংস, কর্নেল পিয়ার্স, সিমন ড্রোজ প্রমুখের বিরুদ্ধে সরাসরি লিখতে থাকলেন। তার আক্রমণের আঘাতটা বেশি করে পড়তে থাকল হেস্টিংস পতœীর ওপর। আর তাতেই কিছুটা পতœীপ্রেমে বশংবদ হেস্টিংস মামলা দায়ের করলেন হিকির বিরুদ্ধে। মামলায় দু’দফা অভিযোগের জন্য ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার টাকায় জামিন দেয়া হলো তাকে। টাকা দিতে না পারায় তাকে জেলেই থাকতে হলো গবর্নর হেস্টিংসের দায়ের করা মামলায়। জেলে থেকেই হিকি চালাতে থাকলেন তার কাগজ। আক্রমণের ধার তাতে হলো আরও তীক্ষè। জেল থেকে এক সময় হিকি ছাড়া পেলেও হেস্টিংস তার এই পরম সমালোচকটির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এবার হিকির বিরুদ্ধে দায়ের করলেন ক্ষতিপূরণের মামলা। আর বিচারপতি ইম্পেকে দিয়ে (যে ইম্পেকে দিয়ে হেস্টিংস একদিন নন্দকুমারকে জালিয়াত প্রমাণিত করে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ জারি করেছিলেন) হেস্টিংস কৌশল খাটিয়ে বিচার করালেন হিকির বিরুদ্ধে। শত্রুর মুখ বন্ধ করার জন্য হেস্টিংসের ইঙ্গিতেই ১৭৮২ সালের মার্চ মাসে প্রধান বিচারপতি ইম্পে বাজেয়াফত করালেন হিকির প্রেস, ছাপার কাগজ, যন্ত্রপাতিসহ সবকিছু। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হিকিকে তারা করে দিলেন একেবারে নিঃস্ব। পরবর্তীতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও হিকি তার সংবাদপত্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু টাকার অভাবে তা আর হিকির পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর এভাবেই অস্তমিত হয়ে গিয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্রের রক্তিম সূর্য। এক সময় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে নিজ মাতৃভূমি ব্রিটেনে যাওয়ার অর্থ সংগ্রহের জন্য চীনের উদ্দেশে জাহাজে যাত্রা করেন জাতির জাগ্রত বিবেক জেমস অগাস্টাস হিকি। কিন্তু তার আর চীনে যাওয়া হয়নি। তার আগেই সারা জাগানো বহু খবরের সাংবাদিক হিকি নিজেই হয়ে গেলেন সংবাদ। ১৮০২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ প্রকাশিত হলো ছোট্ট একটি খবর-‘চীনে যাওয়ার পথে সমুদ্রে জাহাজের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন জেমস অগাস্টাস হিকি।’

ভারবর্ষের সর্বপ্রথম এ সংবাদপত্রটির অতিমাত্রায় স্পষ্টবাদিতা, বস্তুনিষ্ঠতা আর রাষ্ট্রীয় বিরুদ্ধকেন্দ্রিকতা একে বেশিদিন টিকতে দেয়নি এ কথা সত্যি; তবে এর চেয়ে আরও বেশি সত্যি এই যে, হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ ভারতীয় উপমহাদেশে এমন এক সংবাদ বিপ্লবের শুভ সূচনা করে দেয়, যার ঢেউ ক্রমান্বয়ে বিকাশ লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশের (বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) সংবাদপত্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি রন্ধ্রে কোন না কোনভাবে। বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সংবাদ পরিবেশন এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জেমস অগাস্টাস হিকি আজ আর কেবলমাত্র একটি নাম নয়, ইতিহাসও বটে। আজ ২৯ জানুয়ারি হিকির বেঙ্গল গেজেট প্রকাশের ২৩৮ বছর পূর্তিতে তাকে স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com
Link:http://www.dailyjanakantha.com/details/article/324341/%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%9C


63
পরিবেশ রক্ষায় সকলকে সচেতন হতে হবে
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু ২৭ জানুয়ারী, ২০১৮ ইং, দৈনিক ইত্তেফাক (পৃ.৯)

বিশ্বখ্যাত চিকিত্সাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে বলেছিলেন, মানুষের ভেতরে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে যদি ধূলি-বালি কণা না ঢুকতো, তবে মানুষ লাখ লাখ বছর বাঁচতেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘায়ু লাভের ক্ষেত্রে ধূলি-বালি কণামুক্ত নির্মল ও বিশুদ্ধ বায়ুর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ঠিক উল্টোদিক থেকে বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, দূষিত বাতাস বা দূষিত পরিবেশ দীর্ঘায়ু কমানোর ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, ধূমপান এবং ডায়াবেটিসে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায়, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় বায়ু দূষণের কারণে। পরিবেশ ও চিকিত্সাবিদ্যা মতে, বায়ু দূষণ থেকে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিস (সিওপিডি) নামে শ্বাসতন্ত্রের যে রোগ হয়, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। ২০১২ সালে শুধুমাত্র এই রোগেই পৃথিবীতে যে পাঁচটি দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। কারণ, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ এদেশের বড় বড় শহরগুলোয় বায়ু দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। ২০১৫ সালে বিশ্ব ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) বসবাসের দিক বিবেচনা করে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের ওপর যে জরিপ চালায় তাতে দেখা যায়, বিশ্বে বসবাসের জন্য সবচেয়ে অনুপযোগী শহর হিসেবে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়।

বলা হয়ে থাকে, বিপদ-আপদ, দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, সুনামির ওপর কারো হাত নেই এবং তা রোধ করাও সম্ভব নয়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ, অপরিকল্পিত ফ্যাক্টরি-কারখানা নির্মাণ করে একটি শহরের উপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করা, একটি শহরকে জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত করা, এক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে পুরো একটি শহরকে পানির নিচে তলিয়ে দেওয়া, একই রাস্তা অসত্ উদ্দেশে বার বার খোঁড়া-খুঁড়ি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভাগাড় সৃষ্টি করে দুর্গন্ধময় পরিবেশ তৈরি করা, যানজট, ধূলাবালি, ধোঁয়া আর মশার উপদ্রবকে জনগণের নিত্যসঙ্গী বানানো, পানি-বিদ্যুত্-গ্যাস সংকটে শহরবাসীকে ভোগান্তির হাত থেকে তো অন্তত রক্ষা করা যেতে পারে। দূষণের দিক থেকে ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা এসব জনবহুল ও শিল্পঘন শহরগুলোর বাতাসে ক্ষতিকর মিহি ধূলিকণা রয়েছে। এছাড়াও এসব শহরগুলোর বাতাসে রয়েছে বিপজ্জনক মাত্রায় কার্বন মনো-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ অনেক ক্ষতিকর দূষণকারী পদার্থ। ঢাকাকে আতঙ্কিত ও অপ্রস্তুত শহর হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। আর এ নিয়ে লেখালেখিও কম হয় না। কিন্তু বিষয়টি ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে’-অবস্থার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিকেন্দ্রিকরণ ও যানজটমুক্ত করতে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে নিত্য-নতুন পরিকল্পনা তৈরি হয়, সভা-সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওইসব উদ্যোগের ফলাফল অজ্ঞাতকারণে শূন্যের কোটাতেই বিরাজ করতে দেখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ১৭ জুন যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয় যে, বাতাসে ভাসমান মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মিহি ধূলিকণার মাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাজশাহী শহর বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক সাফল্য অর্জন করেছে। সারা বিশ্বের শহরগুলোয় বায়ু দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে রাজশাহীর এই গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থেকে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সত্যিকার অর্থে আন্তরিক প্রয়াস এবং সকলের সহযোগিতা থাকলে একটি শহরের শুধু বায়ু দূষণ কমানোই নয়, ওই শহরকে ভালোভাবে বসবাস উপযোগীও করে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে যদি ঘটনা উল্টোভাবে ঘটে, তাহলে এই জায়গায় রাজশাহীকে দেখতে না পেয়ে প্রথমেই দেখা যাবে ঢাকা এবং এরপর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনার ন্যায় অন্যান্য শহরকে-যা মাত্রাতিরিক্ত দূষণে পরিপূর্ণ। এ যেন ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন কতিপয় ব্যক্তিকে নরকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর কয়েকদিন পর নরকটি স্বর্গে পরিণত হওয়া এবং নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন কতিপয় ব্যক্তিকে স্বর্গে পাঠিয়ে দেওয়ার পর স্বর্গটি নরকে পরিণত হওয়ার গল্পের ন্যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাজশাহী শহর বায়ু দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে যদি সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়; তাহলে কেন ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের অন্য শহরগুলোতে বায়ু দূষণসহ পরিবেশ দূষণ কমানো যাচ্ছে না? নাকি ওই শহরগুলোয় বসবাসরত লোকজন পরিবেশ দূষণ পছন্দ করেন? নিশ্চয় না। দেশের অন্যান্য শহরে বায়ু দূষণ বা অন্যান্য দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে কোনো যাদুর কাঠির প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক হওয়া, প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া, সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরায়ন করা, আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটানো ইত্যাদি। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু সরকার নয়, ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষায় সারা দেশে বাস্তবমুখী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে নিশ্চয় রাজশাহীর ন্যায় সারা দেশেও বায়ু দূষণসহ অন্যান্য দূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব, সম্ভব সারা দেশকে নির্মল পরিবেশে বাসযোগ্য করে তোলা। আর এ লক্ষ্যে এখন থেকেই আমাদের সকলকে একযোগে এগিয়ে এসে কাজ শুরু করতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
ই-মেইল: kekbabu@yahoo.com
Link: http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/drishtikon/2018/01/27/253106.html

64
মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে সমাজকে বাঁচাতে হবে
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
১১ জানুয়ারি, ২০১৮
মাদককে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে মাদকের সঙ্গে যুক্তদের ধরে ধরে গুলি করাই একমাত্র সমাধান হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। এটি অবশ্যই তাঁর ক্ষোভের কথা। ২ জানুয়ারি ঢাকার তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে সংস্থাটির ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনাসভায় মন্ত্রী এ কথা বলেন। বলা বাহুল্য, দেশের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আজ মাদক নেই। মাদকের ছোবলে আজ যেন জাতি ডুবতে বসেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, আমাদের সমাজে মাদক ব্যবসায়ীরা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তাদের হাত অনেক লম্বা হওয়ায় বেশির ভাগ সময়ই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আবার মাদক নির্মূলের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও পুলিশের কিছু অসাধু কর্তাব্যক্তি মাদক গ্রহণ ও ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। রক্ষকই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় থাকে, তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। একেই বুঝি বলে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা?’ আবার মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার কর্তৃক মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু এ অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই ঘুষ খেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্ন করতে সহযোগিতা করেন—এ যেন সরষের মধ্যে ভূত। সরষের মধ্যে ভূতের বাস্তব দেখা মেলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুল কবীরকে ৩ জানুয়ারি বিকেলে যশোর থেকে ঘুষের দুই লাখ টাকাসহ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক গ্রেপ্তার করার ঘটনার মধ্য দিয়ে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে দেশে মাদক নির্মূলের জন্য আলাদা বাহিনী, আলাদা বিপুলসংখ্যক পুলিশ দেওয়াসহ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হলেও দেশ থেকে যেন কিছুতেই মাদক বন্ধ হচ্ছে না। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি লোক মাদকাসক্ত। সমাজের প্রতিটি স্থানে যেন আজ মাদকের অভয়ারণ্য। সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার লোক মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত। মাদক গ্রহণ থেকে বাদ যান না পুলিশ, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, রিকশাচালক, দিনমজুর—কেউই। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে মাদক এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে সমাজে দিন দিন বেড়ে চলছে চুরি, ছিনতাই, খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ। আর কোনো সংসারে যদি মাদকাসক্ত কোনো ব্যক্তি থাকেন, তাহলে ওই সংসারে যে চিতার আগুন (চির-অশান্তি) বিরাজ করে, তা বলাই বাহুল্য। মাদকের সর্বনাশা নীল ছোবলে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। অনেক সুখের সংসারও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং অনেক সংসারই যাওয়ার পথে। মাদকের কারণে সমাজে ঘটছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, যা এ জাতির জন্য বড় অশনিসংকেতই বটে।

সংবাদপত্রের পাতা খুললে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় তাকালেই চোখে পড়ে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তবে দেশ থেকে মাদকদ্রব্য চিরতরে নির্মূলে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে মাদকে বুঁদ বাংলাদেশ। যেন মাদক নামক এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। দেশ থেকে এখনই যদি মাদকের বিস্তার নিযন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক অবক্ষয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে, পারিবারিক কলহ, সন্তানের হাতে মা-বাবার খুন হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। এ দেশে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সেবন একসময় উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মাদক পাওয়া এখন সহজলভ্য হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে সবার মধ্যে মাদকের বিস্তার ঘটছে রকেটের গতিতে। পুরুষদের পাশাপাশি আজকাল মহিলাদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের আগমন ও বিস্তারের পথ ছড়িয়ে পড়ছে শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রামের অলিগলি পর্যন্ত। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কারাগারে বন্দি থেকেও অনেক আসামি বা কয়েদি মাদকের সঙ্গে যুক্ত। তারা হয় মাদক গ্রহণ করে, না হয় মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বা মাদকের গডফাদাররা বাংলাদেশকে মাদক চোরাচালানের উপযুক্ত ট্রানজিট বা করিডর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী থাইল্যান্ড, লাওস, মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, নেপাল, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। ফলে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা এ দেশকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠা কারখানায় উৎপাদিত ফেনসিডিল আর ইয়াবা ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের দেশে। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সত্যিকার অর্থেই দেশের স্বার্থে, দেশের জনগণের স্বার্থে মাদকপাচার রোধে কাজ করে থাকেন, তাহলে দেশের মধ্যে মাদক প্রবেশ করা কি সম্ভব? নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। তথ্যানুসারে মাদকাসক্তদের মধ্যে আশি ভাগই দেশের যুবসমাজ, যাদের ভবিষ্যতে দেশ বিনির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা। অথচ আজ তারা মাদকাসক্ত হয়ে ঝিমোচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা সমাজ ও পরিবারে নানা ধরনের জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে বাড়ছে খুন-জখম, অপহরণ, ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ।

মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবহারজনিত সব কর্মতৎপরতায় জড়িত লোকজন ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত। এদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছুদিন পর এসব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার মাদক ব্যবসা ও মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ থেকে কখনো মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মনে হয় না। মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকাসক্তরা যেন সহজেই জামিন না পায় কিংবা সহজেই ছাড় না পায়, সেদিকটা খেয়াল রাখা উচিত। কারণ এরা সমাজ, দেশ, জাতি ও পরিবারের শত্রু। পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের শক্তির উৎসগুলো শনাক্ত করে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের শক্তির উৎসগুলো যেকোনো মূল্যে চিরতরে বন্ধ করা আবশ্যক। দেশ থেকে মাদক নির্মূলে কঠোর থেকে কঠোরতর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

স্মরণ রাখতে হবে, মাদক ও মাদকাসক্তি এখন বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মাদক একটি অভিশাপ। মাদক মানুষের অতীব মূল্যবান জীবন তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। নীরব ঘাতকের মতো মাদকাসক্তি প্রসার লাভ করছে আমাদের সমাজে। মাদকাসক্তি কর্মশক্তির বড় একটি অংশ গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজের সম্ভাবনাময় শক্তি। মাদকের ফলে জাতি হাঁটছে অন্ধকারের দিকে, মৃত্যুর দিকে হাঁটছে নৈতিক মূল্যবোধ এবং জন্ম নিচ্ছে ঐশীর মতো মাতা-পিতা হত্যাকারী সন্তান। তাই সমাজ ও জাতির স্বার্থে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। প্রয়োজন মাদক গ্রহণকারীদের সংশোধনকেন্দ্রের মাধ্যমে সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মাদক নামক মরণনেশা প্রতিরোধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন ব্যাপকহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। মাদককে না বলুন—ঘরে ঘরে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করাও অতীব জরুরি। যে যুবসমাজের ওপর দেশের শিক্ষাদীক্ষা, উন্নতি-অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল, তারাই যদি মাদকের ফলে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাই মাদকের এই ভয়ংকর অভিশাপ থেকে জাতিকে বাঁচাতে সরকারসহ সবার আন্তরিকভাবে দ্রুত এগিয়ে আসা আবশ্যক।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2018/01/11/588132

65
সরকারি চিকিৎসক ও জনগণের সুচিকিৎসা
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
৩ জানুয়ারি, ২০১৮ (দৈনিক কালের কণ্ঠ)

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডাক্তার ধরে রাখার জন্য এমপিদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তার আগে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিৎসকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ জনগণকে সেবা দিতে সব চিকিৎসকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ২৯ ডিসেম্বর (২০১৭) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাতটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যাম্বুল্যান্সের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন। সরকারি চিকিৎসকদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের নির্দেশের মাধ্যমে মফস্বল পর্যায়ে চিকিৎসকদের থাকতে না চাওয়ার প্রবণতার বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট  ধারণা পাওয়া যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকায় অবস্থানরত বেশির ভাগ চিকিৎসকই সাধারণত ঢাকার বাইরের জেলায় কাজ করতে চান না। আর এমন অভিযোগ বেশ প্রবল এবং এ ধরনের অভিযোগ অনেক আগে থেকেই উত্থাপিত হয়ে আসছে। অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁরা প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর রাজধানীতে কাজ করছেন। আবার অনেক চিকিৎসকই বাইরের জেলা থেকে ঢাকায় আসতে আদা-জল খেয়ে চেষ্টা-তদবির করেন। আর এ কারণেই রাজধানী ঢাকা যেন ডাক্তারদের যানজটে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঢাকার বাইরে কাজ করতে পারেন, তাহলে ডাক্তাররা পারবেন না কেন? কী কারণে সরকারি চিকিৎসকরা ঢাকার বাইরের জেলায় কাজ করতে চান না কিংবা কী কারণে তাঁরা ঢাকায় থাকার ব্যাপারে এতটা মরিয়া, তা বুঝতে বোধ হয় কারো বাকি থাকার কথা নয়। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিয়ে যাঁরা আন্দোলন করেন তাঁদের অভিযোগ হচ্ছে, বড় শহরগুলোর বাইরে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ কম থাকায় চিকিৎসকরা সেদিকে যেতে অনাগ্রহী। গত ২৭ ডিসেম্বর (২০১৭) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকায় কর্মরত ১১০ জন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বদলি করেছে। বদলির আদেশে বলা হয়েছে, ডাক্তাররা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাঁরা কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না। কিন্তু অনেক ডাক্তার এখনো নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। বরং অনেক ডাক্তার প্রভাব খাটিয়ে বদলির আদেশ ঠেকাতে তত্পর।
রাষ্ট্রের কাছে জনগণের অন্যতম চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। আর স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। আর এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এ দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না। বিশেষ করে জনগণ যদি যান কোনো সরকারি হাসপাতালে। এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি আজ আর কোনো নতুন বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এসংক্রান্ত নানা খবর। মফস্বল পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, হাসপাতালের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব, ডাক্তার সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি গায়েব করা, বেশি অর্থের লোভে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে চিকিৎসকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে বেশি মনোযোগী ও যত্নবান হওয়া, সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাব, ভুল চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর এসব খবরের মধ্যে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ফলে রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যু হওয়া সবচেয়ে দুঃখজনক। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে বা আঘাত পেলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটা বা ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে এ দেশে আইনের তেমন একটা প্রসার ঘটেনি। তা ছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিও খুব কম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে অনেক মামলা হয়েছে। ‘কনজিউমার প্রোটেকশন অ্যাক্ট (১৯৮৬)’-এর আওতায় চিকিৎসকের অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীরা কনজিউমার আদালতে গিয়ে কোনো প্রকার ফি ছাড়াই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারেন এবং অনেক রোগী এ বিষয়ে প্রতিকারও পেয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো আইন নেই। যেহেতু এ দেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অহরহই চিকিৎসকের অবহেলার ঘটনা ঘটছে, ফলে এ ধরনের একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। কোনো চিকিৎসকের অবহেলার কারণে যদি ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অন্য চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে সজাগ হবেন, চিকিৎসার সময় যথাযথ মনোযোগ  দেবেন, যত্নবান হবেন।

বর্তমান সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভূমিকা অগ্রণী ও অপরিসীম। কারণ চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা যদি শুধু ঢাকামুখী হন কিংবা ঢাকায়ই থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠেন, তাহলে সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নসহ সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী এর আগেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। কিন্তু তেমন একটা লাভ হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। ফলে সার্বিক দিক বিবেচনায় এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসকরা গ্রামীণ এলাকায় থেকে কাজ করতে বাধ্য হন। আর বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনায় এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের মনমানসিকতার ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো প্রয়োজন। প্রয়োজন বেশি অর্থের লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করা; প্রয়োজন দায়িত্ব-কর্তব্যে আন্তরিক ও সতর্ক হওয়া। কারণ চিকিৎসা একটি মহান পেশা, সেবামূলক পেশা। চিকিৎসকরা যদি ব্যক্তিস্বার্থ ও অর্থলোভ পরিহার করতে না পারেন, তাহলে কোনো সতর্কবাণী কিংবা কোনো নির্দেশই কাজে আসবে বলে মনে হয় না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2018/01/03/585044

66
এই নির্দেশ পালিত হোক অক্ষরে অক্ষরে (The daily Ittefaq)
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
গত ২৯ ডিসেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাতটি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যাম্বুলেন্সের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিত্সকদের কর্মক্ষেত্রে থেকে যথাযথভাবে মানুষকে সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা যখন উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সকদের নিয়োগ  দেই, তখন অনেকেই আছেন যাঁরা কর্মক্ষেত্রে থাকতে চান না। বরং তাঁরা যেকোনো উপায়েই ঢাকায় থাকেন। যদি চিকিত্সকদের ঢাকাতেই থাকার ইচ্ছা হয়, তাহলে তাঁদের সরকারি চাকরি করার প্রয়োজন নেই। রাজধানীতে বসে প্রাইভেট রোগী দেখে তাঁরা অনেক টাকা উপার্জন করতে পারেন। তাই তাঁদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে চলে যাওয়াই ভালো। আমরা তাঁদের স্থানে নতুন নিয়োগ দেব।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্যের মাধ্যমে মফস্বল পর্যায়ে চিকিত্সকদের না থাকতে চাওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে চিকিত্সা অন্যতম। আর এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে দেশের জনগণকে অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হয় যা কাম্য নয়। মফস্বল পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা, হাসপাতালের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দালাল কর্তৃক প্রতারিত হওয়া, চিকিত্সা সরঞ্জামাদির অভাব, ডাক্তার সংকট, ঔষধ ও চিকিত্সা সরাঞ্জামাদি গায়েব করা, অধিক অর্থের লোভে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে চিকিত্সকদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে অধিক মনোযোগী ও যত্নবান হওয়া, সরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবার ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাব, ভুল চিকিত্সা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর এসব খবরের মধ্যে চিকিত্সকের অবহেলা বা ভুল চিকিত্সার ফলে রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যু হওয়া সবচেয়ে দুঃখজনক। চিকিত্সকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটলে বা আঘাত পেলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিত্সকের অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটা বা ক্ষতি হওয়ার ক্ষেত্রে এদেশে আইনের তেমন একটা প্রসার ঘটেনি। তাছাড়া চিকিত্সার ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতাও খুব কম। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তির অবহেলাজনিত কারণে যদি কারো মৃত্যু ঘটে, তবে ওই ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা দুটোই একসঙ্গে শাস্তি হিসেবে দেওয়া যাবে। চিকিত্সকের অবহেলার জন্য দণ্ডবিধির আওতায় এবং টর্ট (দেওয়ানি প্রতিকার) আইনের আওতায় মামলা করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণই সচেতন নন।

২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী  জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ডাক্তার ধরে রাখার জন্য এমপিদের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন। এরপূর্বে ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে অবহেলাকারী চিকিত্সকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘চিকিত্সকদের দায়িত্বে অবহেলাজনিত অপরাধের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। জনগণকে সেবা দিতে সব চিকিত্সককে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব সতর্ক ও নির্দেশ কতটুকু কাজে এসেছে এবং চিকিত্সকেরা কতটুটু সতর্ক হয়েছেন, তা জনগণই ভালো বলতে পারবেন। জনগণের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিত্সকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। আশা করি, এবার এর ব্যত্যয় হবে না। আসলে জনগণের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি চিকিত্সকদের মন-মানসিকতায় ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন ঘটানো।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
ই-মেইল: kekbabu@yahoo.com
Link: http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/sub-editorial/2017/12/30

67
আদালতপাড়ার দুর্ভোগ দূর করবে কে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
২২ ডিসেম্বর, ২০১৭; কালের কণ্ঠ (পৃষ্ঠা: ১৪)
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই আদালতকে অবমাননা করা নয় কিংবা আদালতের ভাবমূর্তি নষ্ট করা নয়। বরং দেশের আদালত অঙ্গনে বাহ্যিকভাবে যেসব সমস্যা বিরাজমান, তা তুলে ধরা, যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে আদালতের কার্যক্রম গতিশীল করে এবং সঠিক সময়ে জনগণের ন্যায়বিচারের পথ সুগম করে। যা হোক, আমরা সবাই জানি যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের তিনটি বিভাগ রয়েছে। যথা—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। সরকারের তিনটি বিভাগই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের কাজ পারস্পরিক নির্ভরশীল ও একে অপরের পরিপূরক। আইনসভার আইন ও বিচার বিভাগের আদেশগুলো নির্বাহী বিভাগ বাস্তবায়ন করে। বিচার বিভাগ আইনসভা প্রণীত আইন অনুসারে আদেশ দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের আদালত অঙ্গনগুলো বাহ্যিকভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত, যা বিচার বিভাগের কাজের গতিশীলতা চরমভাবে হ্রাস করে। দেশের আদালত অঙ্গনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, বিচারক সংকট, এজলাস সংকট, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, জরাজীর্ণ ভবন, বিশ্রামাগার ও টয়লেটের অভাবসহ নানা সমস্যা। আর এসব সমস্যা মাথায় নিয়েই চলছে দেশের আদালত। দেশের আদালতপাড়ায় বহু ধরনের সমস্যা বিদ্যমান থাকার কারণে বিচারপ্রার্থীদের প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, শিকার হতে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনার। অনেক সময় দেখা যায়, বিচারকদের একই এজলাস পালাক্রমে ব্যবহার করতে হয়। যেমন দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে কোনো আদালত সকাল পৌনে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে। আবার ওই একই এজলাস দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় অন্য আদালত হিসেবে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও একই এজলাস পালাক্রমে অনেক সময় ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি এমন যে একজন বিচারক এজলাস ছেড়ে দিলে তবেই আরেকজন বিচারক ওই এজলাসে বিচারকাজ পরিচালনা করেন। একই এজলাস দিনে দুইবার দুই আদালতের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কারণে অনেক মানুষকেই বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ এজলাস সংকটের কারণে বিচারকরা তাঁদের পুরোটা সময় বিচারকাজ করতে পারছেন না। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিচারকদের এজলাস ত্যাগ করতে হয় মামলা নিষ্পত্তি করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও। গুরুত্বপূর্ণ মামলা রেখেই বিচারকদের এজলাস ত্যাগ করার ফলে বিচারপ্রার্থীরা সঠিক সময়ে বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তা ছাড়া বিচারপ্রার্থীদের অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ সময়ের অপচয় বা লয় (ধ্বংস) তো রয়েছেই। পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের ১৭১টি আদালতে এজলাস নেই, যা দুঃখজনক বিষয়। আর এসব সমস্যা মোকাবেলা করেই সংশ্লিষ্ট বিচারককে মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মাসিক প্রতিবেদন পাঠাতে হচ্ছে।

অনেক আদালতে চেয়ার-টেবিল সংকটের কারণে মামলার কার্যক্রম চলার সময় বিচারপ্রার্থীসহ আইনজীবীদেরও আদালতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দীর্ঘ সময় ধরে। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী কিংবা অসুস্থ কোনো ব্যক্তি হন, তাহলে তাঁদের সমস্যার অন্ত থাকে না। আবার বৃষ্টির দিনে দেশের অনেক আদালতপাড়ায় বিচারক, বিচারপ্রার্থী জনগণ, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কারণ বিভিন্ন আদালতে যাওয়ার রাস্তায় পানি ও কাদা জমে থাকা। সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে বা বৃষ্টির দিনে এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া দেশের অনেক আদালত ভবন জরাজীর্ণ ও টিনশেডের। বৃষ্টির দিনে বা বর্ষাকালে এসব জরাজীর্ণ ভবনের ছাদের পানি চুইয়ে কিংবা টিনের ফুটো দিয়ে পানি নিচে (আদালতের মধ্যে) পড়ার কারণে আদালত মুলতবি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তা ছাড়া এ অবস্থার ফলে আদালতে সংরক্ষিত ফাইলপত্র বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, দেশের অনেক আদালতে নেই কোনো বিশ্রামাগার, নেই কোনো ট্রায়াল রুম, আবার অনেক আদালতে এপিপিদের জন্য আলাদা চেম্বার এবং আদালতে আসা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য নেই কোনো কক্ষ বা জায়গা। এসব সমস্যার ফলে আদালতের বিচার কার্যক্রম শুরুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিচারপ্রার্থীদের বাইরে ঘুরে বেড়াতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় অসুস্থ ব্যক্তি ও ব্রেস্ট ফিডিং করা মায়েদের। আদালতে বিশ্রামাগার না থাকার কারণে বিচারপ্রার্থী অসুস্থ ব্যক্তিদেরও দুর্ভোগের সীমা থাকে না। আবার আদালতের সামনে সাক্ষীদের ভালোভাবে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ট্রায়াল রুমের প্রয়োজন থাকলেও দেশের অনেক আদালতেই তা নেই। ফলে অনেক সময় আদালতের সামনে ভালো সাক্ষ্য না হওয়ায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, অনেক আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) জন্য বসার আলাদা চেম্বার থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এপিপিদের বসার জন্য আলাদা কোনো চেম্বার নেই, যা এপিপিদের জন্য নিঃসন্দেহে মানসিক কষ্টের বিষয়।

দেশের অনেক আদালতেই নেই পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক যানবাহন। প্রয়োজনীয়সংখ্যক যানবাহন না থাকায় অনেক সময় বিচারকদের একই গাড়িতে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে আদালতে যাওয়া-আসা করতে হয়, যা একই সঙ্গে যেমন শারীরিক ও মানসিক কষ্টের বিষয়। যানবাহন সংকটের কারণে অনেক সময় অনেক বিচারক নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। কারণ আদালতের কাজকর্ম শেষ করে অনেক বিচারক আদালতপাড়া থেকে জেলা শহরে থাকেন আর কোনো বিচারককে যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করতে হয়, তাহলে অবশ্যই তিনি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করবেন। কারণ তাঁর দেওয়া মামলার রায়ে সংক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা তিনি হামলার শিকার হতে পারেন। যানবাহন সংকটের পাশাপাশি বিচারকদের আবাসন সমস্যার বিষয়টিও বেশ প্রকট। বিচার বিভাগ পৃথক্করণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের বাসস্থান নির্মাণের আদেশ দিলেও এখনো সব বিচারকের বাসস্থান নিশ্চিত করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি জেলায় কর্মরত সব বিচারকের জন্য যদি একই স্থানে বসবাসের লক্ষ্যে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তাঁদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে। 

‘সময় অত্যন্ত মূল্যবান’—এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, ‘অজ্ঞাত কারণে’ অনেক আদালত নির্ধারিত সময়ে বসে না। একজন আইনজীবীর প্রতিদিন বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু আদালত সঠিক সময়ে না বসার কারণে আইনজীবীরা সঠিক সময়ে বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করতে সক্ষম হন না। ফলে আইনজীবীসহ বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। আবার মামলাজট নিরসনের উপায় হিসেবে আদালতে সাক্ষী হাজির করতে দেশের বেশির ভাগ আদালতে এখন পর্যন্ত চালু হয়নি ই-ডেস্ক। আইন-আদালত সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন যে ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে হাজির না করা। আর সাক্ষীদের হাজির করার বিষয়ে আদালত পুলিশের ওপর নির্ভরশীল। পুলিশ সাক্ষী হাজির না করলে আদালতের শুনানির তারিখ পেছানো হয় এবং শুরু হয় মামলার দীর্ঘসূত্রতা। এই সমস্যা সমাধানকল্পে আদালতগুলোতে ই-ডেস্ক চালু করা, ই-ডেস্ক থেকে আদালতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্ধারিত তারিখের আগে সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগপূর্বক আদালতে সাক্ষীর হাজির হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইন সংশোধনপূর্বক এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন পুলিশ আদালতে চার্জশিট দেওয়ার সময় সাক্ষীর মোবাইল-টেলিফোন নম্বরসহ পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা উল্লেখ করতে বাধ্য হয়।     

অভিযোগ পাওয়া যায়, আদালতের বেশির ভাগ পিয়ন, পেশকার, জারিকারক ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই ঠিকমতো করতে চান না, যেন এটি একটি অলিখিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় বিচারপ্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, পিয়ন-পেশকারদের কাছে বিচারপ্রার্থীরা মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিতে গেলে বা কোনো সহযোগিতা চাইতে গেলে তাঁরা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই করতে চান না। ফলে বাধ্য হয়েই ঘুষ দিতে হয়। এসব পিয়ন, পেশকার ও জারিকারকের জমিজমা, বাড়ি, সম্পদ ও টাকা-পয়সার সঠিকভাবে হিসাব নিলে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলবে বলেই আশা করা যায়। এ সমস্যা ছাড়াও আদালত অঙ্গনে রয়েছে টাউট-দালালদের দৌরাত্ম্য; আইনজীবী না হয়েও কালো কোট, টাই ও গাউন পরিধান করে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা বিচারপ্রার্থী সহজ-সরল ব্যক্তিদের নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ‘মক্কেল সংগ্রহ’ করা; মানসম্মত খাবারের হোটেলের অভাব, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন টয়লেটের অভাব; বার ও বেঞ্চের দূরত্ব বিদ্যমান থাকা; বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) উদ্যোগ কম থাকা ইত্যাদি।

বিচার বিভাগের কাজকে গতিশীল করাসহ সঠিক সময়ে জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে দেশের আদালত অঙ্গনে বিরাজমান সমস্যাগুলো শনাক্ত করে তা দূর করার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার তথা আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। এ কথা সবার মনে রাখতে হবে যে আদালতই হচ্ছে জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল; শেষ আশা-ভরসার জায়গা। তাই আদালত অঙ্গনে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান রেখে সঠিক সময়ে, সঠিকভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2017/12/22/580272

68
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু    |    প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭; 'যুগান্তর'; পৃ. ৪
গ্রাম পুলিশের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে কবে?
বাংলা সাহিত্যের সুসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিত মশাই’ গল্পের কথা অনেকেরই মনে আছে। তৎকালীন উপমহাদেশে যখন ইংরেজদের শাসন চলছিল, তখন তারা ক্ষমতার মঞ্চে অধিষ্ঠিত হয়ে ধীরে ধীরে এ উপমহাদেশের ভাষা ইংরেজিতে রূপান্তর করে। সেই যুগে ইংরেজি শিখলে ভালো চাকরি পাওয়া যেত। আর ইংরেজি শেখা সহজলভ্যও ছিল। প্রথমদিকে মুসলমান জনগোষ্ঠী ইংরেজিকে বিজাতীয় ভাষা মনে করে তা বর্জন করত। নানা সুবিধা দেখে এ দেশের হিন্দুরা ইংরেজি ভাষাশিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করে। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার যখন জয়-জয়কার পড়ে গেল, তখন ইংরেজরা কিছু জায়গায় হাইস্কুল স্থাপন করল। আর এসব স্কুলে স্থান হয় বাংলা ও সংস্কৃত বিষয়ের কিছু শিক্ষকের (পণ্ডিত)। তবে দেখা গেছে, অন্য শিক্ষকদের চেয়ে পণ্ডিত মশাইদের পড়াশোনা বেশি, জ্ঞান-গরিমা বেশি; অথচ তাদের পারিশ্রমিক অনেক কম। ফলে তখনকার পণ্ডিত মশাইদের খেয়ে-না খেয়ে কোনোমতে জীবন ধারণ করতে হতো।
তৎকালীন পণ্ডিত মশাইদের জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের গ্রাম পুলিশদের মিল অনেক। গ্রাম পুলিশ বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী একজন গ্রাম পুলিশকে যেসব দায়িত্ব পালন করতে হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে : ১. দিনে ও রাতে ইউনিয়নে পাহারা ও টহলদারী করা, ২. অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় অনুসন্ধান ও দমন করা এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পুলিশকে সহায়তা করা, ৩. চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদকে সরকারি দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা, ৪. পনেরো দিন পরপর এলাকার অবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা, ৫. ইউনিয়নের খারাপ চরিত্রের লোকদের গতিবিধি লক্ষ করা এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা, ৬. পাশের এলাকা থেকে আগত কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা, ৭. ইউনিয়নে লুকিয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি, যার জীবন ধারণের জন্য প্রকাশ্য কোনো আয় নেই বা যে তার নিজের পরিচয় সম্পর্কে সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারে না, এমন লোক সম্পর্কে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে রিপোর্ট প্রদান করা, ৮. বিরোধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা তুমুল কলহ সৃষ্টি করতে পারে এবং জনগণের শান্তি বিঘিœত করতে পারে- এমন বিষয় বা ঘটনা সম্পর্কে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা, ৯. দাঙ্গা-হাঙ্গামা, গোপনে মৃতদেহ সরিয়ে জন্ম-সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা, কোনো শিশুকে বাড়ি থেকে বের করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া, আগুনের সাহায্যে সংঘটিত ক্ষতি, বিষ প্রয়োগে গবাদিপশুর অনিষ্ট বা ক্ষতি করা, নরহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা সম্পর্কিত অপরাধের ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করা, ১০. আমলযোগ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা যার বিরুদ্ধে যথার্থ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে বা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে বা কোনো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পুলিশকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা, ১১. জন্ম ও মৃত্যু রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদকে অবহিত করা, ১২. মানুষ বা পশু বা ফসলের মধ্যে কোনো মহামারী বা সংক্রামক রোগ বা পোকার আক্রমণ ব্যাপক আকারে দেখা দিলে দ্রুত ইউনিয়ন পরিষদকে এ সম্পর্কে অবহিত করা, ১৩. কোনো বাঁধে বা সেচে ক্ষতি বা ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ইউনিয়ন পরিষদকে অবহিত করা, ১৪. সরকারি কাজের উদ্দেশ্যে যে কোনো স্থানীয় তথ্য সরবরাহ করা, ১৫. খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর, স্থানীয় কর, ফি বা অন্য পাওনা সংগ্রহ ও আদায়ে রাজস্ব কর্মচারীদের সহায়তা করা, ১৬. কোনো অপরাধ সংঘটন বা সংঘটনের অভিপ্রায় সম্পর্কে জ্ঞাত হলে তা ইউনিয়ন পরিষদকে অবহিত করা, ১৭. ইউনিয়ন পরিষদের বা ইউনিয়ন পরিষদের অধিকারে ন্যস্ত কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিসাধন বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা অন্যায় দখল সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদকে অবহিত করা এবং এ ধরনের ক্ষতি, প্রতিবন্ধকতা বা অন্যায় দখল রোধ করার জন্য মধ্যস্থতা করা, ১৮. ইউনিয়ন পরিষদের নির্দেশে কোনো বাসিন্দার আবাসস্থল বা সম্পত্তির ওপর পরোয়ানা জারি করা, ১৯. এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা, ২০. অস্বাভাবিক মৃত্যু বা খুনের ক্ষেত্রে লাশ পাহারা দেয়া এবং থানায় পৌঁছানো পর্যন্ত লাশের সঙ্গে থাকা, ২১. এলাকায় পুলিশ এলে সবসময় পুলিশের সঙ্গে থাকা, ২২. উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা গ্রাম পরিদর্শনে এলে তাদের সার্বিক সহায়তা করা, ২৩. আদালতের মামলা-মোকদ্দমার তারিখ জারি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আদেশ অনুসারে কাজ করা, ২৪. গ্রাম আদালতে বিচার চলাকালে উপস্থিত থাকা ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উপরোক্ত দায়িত্ব পালন করার পর একজন গ্রাম পুলিশ যদি মাস শেষে মাত্র তিন হাজার ছয়শ’ টাকা বেতন পান, তাহলে তা দিয়ে তিনি কীভাবে সংসার চালাবেন? বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে একজন গ্রাম পুলিশ যখন মাত্র তিন হাজার ছয়শ’ টাকা বেতন পান, তখন তা আদি যুগের স্কুলের পণ্ডিত মশাইদের মাসিক পাঁচ টাকা বেতনের কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, মাসিক তিন হাজার ছয়শ’ টাকায় বর্তমান সময়ে কোনো ব্যক্তির পক্ষে সংসার চালানোসহ জীবন নির্বাহ করা সম্ভব কিনা? উত্তর আসবে, না, সম্ভব নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাসিক তিন হাজার ছয়শ’ টাকা বেতন দিয়ে সংসার চালানো, জীবন ধারণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর ওপর যদি গ্রাম পুলিশের ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে, তাহলে ওই গ্রাম পুলিশের চোখে সরষের ফুল দেখা আর হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
স্থানীয় সরকারের তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৪৪৫। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন দফাদার ও ৯ জন মহল্লাদারের সমন্বয়ে গ্রাম পুলিশ রয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী দেশে গ্রাম পুলিশের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৪৫০। গ্রাম পুলিশদের বেতন-ভাতার মধ্যে ৫০ শতাংশ সরকার দেয় এবং বাকি ৫০ শতাংশ দেয় ইউনিয়ন পরিষদ। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে ২০১৬ সালে। কিন্তু জাতীয় বেতন স্কেলে এখন পর্যন্ত গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর এখানেই গ্রাম পুলিশদের দুঃখ সবচেয়ে বেশি। গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা অনেক আগে থেকেই জাতীয় বেতন স্কেলে গ্রাম পুলিশদের অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। বলাবাহুল্য, এত কম বেতনে চাকরি করে খেয়ে না-খেয়ে তারা বেঁচে থাকছেন। গ্রেড যাই হোক না কেন, জাতীয় বেতন স্কেল পেতে চান গ্রাম পুলিশরা। এ বিষয়ে এমপি-মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একের পর এক আশ্বাস দিলেও গ্রাম পুলিশদের ভাগ্যের এখন পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি। দুঃখের বিষয়, একাধিক এমপি-মন্ত্রী গ্রাম পুলিশ সংক্রান্ত সংগঠনের উপদেষ্টা হলেও এক্ষেত্রে গ্রাম পুলিশদের কোনো লাভ হচ্ছে না।
খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বর্তমানে গ্রাম পুলিশরা সবচেয়ে বেশি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অন্যসব পেশায় অধিকার আদায়ে সংশ্লিষ্টরা রাজপথে নামতে পারলেও এ পেশার মানুষরা শুধু পোশাকের কারণে আন্দোলন করতে পারছেন না। আবার এত কম বেতন দিয়ে তাদের জীবন-সংসারও চলছে না। বিষয়টি যেন ‘না পারা যায় কইতে, না পারা যায় সইতে’ অবস্থার মতো। বর্তমান সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো পদক্ষেপ। বর্তমান বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার গ্রাম পুলিশদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে তাদের ভাগ্য উন্নয়নে এগিয়ে আসবে, এটাই প্রত্যাশা।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য
kekbabu@yahoo.com

Link: https://www.jugantor.com/sub-editorial/2017/12/24/181876/%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%A8-%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A7%87?

69
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং নিয়ে প্রশ্ন
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু    |    প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর, ২০১৭  (দৈনিক যুগান্তর, পৃ. ৪)

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে চলতি বছরের ১০ নভেম্বর বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাঙ্কিং নির্ণয়বিষয়ক এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। বস্তুগত ও ধারণাগত তথ্য থেকে প্রাপ্ত স্কোরের সমন্বয়ে এই র‌্যাঙ্কিং করা হয়, যার মধ্যে বস্তুগত তথ্য থেকে ৪০ শতাংশ এবং ধারণাগত তথ্য থেকে ৬০ শতাংশ স্কোর নিয়ে মোট ১০০ স্কোরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণ করা হয়েছে। বস্তুগত তথ্যের ক্ষেত্রে ইউজিসি থেকে প্রাপ্ত ২০১৪ সালের তথ্য নেয়া হয়েছে। অপরদিকে ধারণাগত তথ্যের ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদ (ডিন, বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক, রেজিস্ট্রার) এবং চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর জরিপ পরিচালিত হয়। ধারণাগত জরিপটি মোট ৩০০ জনের ওপর পরিচালনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫০ জন শিক্ষাবিদ এবং ১৫০ জন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক। বাংলাদেশের ৮৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ৩২টি বাছাই করে নেয়া হয়। তার মধ্যে থেকেই গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে সেরা ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এতে প্রথম হয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে অবস্থান করছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আর দশম স্থানে রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সংখ্যা, গবেষণা, ক্যাম্পাস, শিক্ষা কার্যক্রম, লাইব্রেরির অবস্থা, পাস করা শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে শিক্ষক ও চাকরিদাতাদের ভাবনার ভিত্তিতে এই র‌্যাঙ্কিং হয়েছে।
গত ১১ নভেম্বর গবেষণাপত্র প্রকাশের পর থেকেই এ গবেষণা নিয়ে অনেকের মাঝেই (বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক) নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং প্রশংসনীয় এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান বুঝে র‌্যাঙ্কিং-এ ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করতে পারে। এ ধরনের গবেষণা বা র‌্যাঙ্কিংয়ের ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়, যা উচ্চশিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সর্বোপরি, এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর ভালো করার চাপ থাকবে। মূলত এভাবেই সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং শুরু হয়েছে এবং তা মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছেছে। সুতরাং বাংলাদেশে গুণগত ও মানসম্মত আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের গবেষণার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে তা অবশ্যই হতে হবে সমসাময়িক, বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ তথা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড এবং বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে র‌্যাঙ্কিং নির্ণয়বিষয়ক গবেষণাপত্রে এগুলোর অনেক কিছুই আসেনি। যেমন : এখানে র‌্যাঙ্কিংয়ের জন্য যে সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে তার অনেকটাই অসম্পূর্ণ; র‌্যাঙ্কিং পদ্ধতির বিবেচ্য অনেক বিষয়, নানা গাণিতিক ফলাফলসহ অনেক তথ্য-উপাত্ত অস্পষ্ট। প্রশ্ন থেকে যায়, এই র‌্যাঙ্কিংয়ে ধারণাগত ডাটাগুলো ভালো হলেও একাডেমিক তথ্য যারা দিয়েছেন, তারা অন্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য কি দিতে পারবেন? পাশাপাশি এই র‌্যাঙ্কিং করার ক্ষেত্রে এতে কতটুকু সমসাময়িক ও নিরপেক্ষ ডাটা বা তথ্য ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে এটিও একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশের এত বিশাল উচ্চশিক্ষার পরিমণ্ডলের মধ্যে মাত্র ১৫০ জন শিক্ষাবিদ এবং ১৫০ জন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের মতামত কি এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হতে পারে? সর্বোপরি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসি ছাড়া এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং করার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কিনা তাও প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। বলা বাহুল্য, এ সব র‌্যাঙ্কিং তখনই সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে যখন এতে বাস্তব অবস্থা এবং সমসাময়িক তথ্য-উপাত্তের ব্যবহার করা হবে।
গবেষণায় ধারণাগত স্কোরের ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকদের মান, চাকরি ক্ষেত্রে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ইত্যাদি দেখানো হয়েছে। কিন্তু কাদের কাছ থেকে এবং কিসের ভিত্তিতে এসব জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই এই গবেষণাপত্রে। উন্নত বিশ্বে র‌্যাঙ্কিংয়ে যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়, তার অনেক কিছুই এ গবেষণায় আসেনি। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, এই গবেষণায় প্রকৃত তথ্যের প্রতিফলন ঘটেনি এবং এই র‌্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে এক অর্থে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষা খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর ফলে সত্যিকার অর্থে গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবমূল্যায়িত হয়েছে।
বর্তমান যুগ চরম এক গতিশীল একটি যুগ। প্রতিনিয়তই এখানে তথ্য-উপাত্তের পরিবর্তনসহ নানা কিছুরই পরিবর্তন ঘটছে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। যেমন : বর্তমান সময়ে সকালে কেনা একটি মোবাইল ফোন ওইদিন বিকালেই পুরনো হয়ে যাচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে ওই মোবাইল ফোনের আপডেটেড সংস্করণ বের হয়ে গেছে। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ের বাস্তব অবস্থা এবং তা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। এই সময়ে চার বছর আগের তথ্য দিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশপূর্বক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে র‌্যাঙ্কিং করা কতটুকু যৌক্তিক এবং তা সবার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে বা হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর এ ধরনের গবেষণা বা র‌্যাঙ্কিং কি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বর্তমান প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবে না? যদি বিভ্রান্ত করেই থাকে, তাহলে এর জন্য দায়ী কে এবং এই দায় কে বহন করবে?
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন হচ্ছে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পৃথকভাবে নিয়ে ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত ও সমসাময়িক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষভাবে এ ধরনের র‌্যাঙ্কিং করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে তা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন তথা উন্নয়ন ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৮ জুন অনুষ্ঠিত ইউজিসির এক সভায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং (অবস্থান নির্ধারণ) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন জনগণের চোখে পড়েনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং বিষয়ক ওই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে ইউজিসির দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সদস্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
kekbabu@yahoo.com

https://www.jugantor.com/sub-editorial/2017/11/27/175137/%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B8%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E2%80%8C%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%82-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%A8

70
ছিনতাইকারীদের হাতে ঝরবে আর কত প্রাণ?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
জনসংখ্যাধিক্য ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং মাদকের সহজলভ্যতা সম্বলিত ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশে ছিনতাই-রাহাজানি দিনে দিনে বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে ছিনতাই-রাহাজানির ঘটনা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। বাস্তব অবস্থা এই যে, প্রতিনিয়তই দেশের সাধারণ মানুষ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছে। আর এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে হেঁটে কিংবা রিকশায়, বাসে কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাফেরা করার সময়, সকালে-দুপুরে-সন্ধ্যায়-রাতে, জনাকীর্ণ স্থানে কিংবা ফাঁকা জায়গায়। এক কথায় সর্বদা-সর্বত্র। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, ছিনতাইকারীরা এখন শুধু লোকজনের টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্রই ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না, ছুরিকাঘাত করে আহত করছে, হত্যা করছে। এমনকি গুলি করতেও এখন দ্বিধা করছে না ছিনতাইকারীরা।  ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় অকালে প্রাণ হারালেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহা। ওইদিন ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তিনি দেখতে পান, রাস্তায় এক রিক্সাযাত্রী ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছে। তখন তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলে ছিনতাইকারীরা তালহাকে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায়। এসময় কেউ তালহাকে বাঁচাতে এগিয়ে না আসলে আহত তালহা নিজেই ফিরে যায় তার বাসায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আর এভাবেই ছিনতাইকারীদের ছুরির নিচে একটি মূল্যবান জীবনসহ একটি পরিবারের স্বপ্ন-সাধ নিমিষেই মাটিতে মিশে গেলো।

শুধু তালহা-ই নন, তালহার মতো দেশের অনেককেই মূল্যবান জীবন হারানোসহ আহত হয়ে সর্বস্ব খোয়াতে হয়েছে ছিনতাইকারীদের হাতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চলতি বছরের ২৪ আগস্ট রাতে নেত্রকোনার পূর্বধলায় কাকন মিয়া নিহত; ২৫ আগস্ট রাজধানীর শনির আখড়ার শেখদী এলাকায় বদরুল আজিজ নামের এক ব্যক্তি আহত; ১ অক্টোবর রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে মোঃ আরিফ  নামের এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয় ছিনতাইকারীদের হাতে। দেশের অন্যান্য স্থানেও থেমে নেই ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ আজ নির্বিঘ্নে-নিরাপদে চলাফেরা করার সাহস করতে পারছেন না। আর এ ধরনের ঘটনা যে নিঃসন্দেহে একটি দেশের নাজুক, দুর্বল ও ভঙ্গুর আইন পরিস্থিতিরই চিত্র তুলে ধরে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  দেশে ছিনতাইকারীদের ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক দৌরাত্ম্যের মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার, আর তা হচ্ছে-এসব পেশাদার ছিনতাইকারীর কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এখন অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি এসব অপরাধীর মধ্যে শাস্তির ভয়ও সম্ভবত কমে গেছে। সর্বোপরি, তারা ছিনতাই-ডাকাতির কাজে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে তথা হত্যার ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করছে না। এসবের কারণ হতে পারে আইনের ফাঁক-ফোকর থাকাসহ রাজনৈতিক ও ক্ষমতাবান দাদা ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয় তথা সান্নিধ্য লাভ। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে আশঙ্কাজনক হারে ছিনতাই-ডাকাতি আর নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটে চললেও সেই তুলনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ঘটনা খুবই কম চোখে পড়ে। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা ‘প্রশাসন ম্যানেজ পদ্ধতি’, আইনের ফাঁক-ফোকর ও ক্ষমতাবান দাদা ভাইদের কারণে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তীতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার লক্ষ্যে তাদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে এবং তাদেরকে দেখে এ ধরনের অপরাধ করতে অন্যরাও পা বাড়াচ্ছে।

অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ছিনতাইকারীকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার করে  আদালতে পাঠানোর পরও সে জামিনে বেরিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে তাহলে পুলিশ কি প্রতিবেদনে এমন কোনো ফাঁক-ফোকর রেখে দেয়, যাতে আদালত থেকে ছিনতাইকারীদের জামিন পেতে কোনো অসুবিধা না হয়? এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের মনে এ জাতীয় ক্ষোভ দেখা দেওয়াটাই স্বাভাবিক। অপরদিকে ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও যেন প্রতিরোধ করার মানসিকতা গড়ে উঠছে না- ঠিক যেন ঝড়ের সময় মরুভূমির উটপাখির ন্যায়। তালহার ঘটনা থেকে যা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়। দেশে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটবে, তালহার মতো সাহসী তরুণদের জীবন দিতে হবে, জনগণকে হতে হবে আহত আর খোয়াতে হবে সর্বস্ব? এসব ঘটনার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। তবে দেশের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং নির্বিঘ্নে জনগণের চলাচলের পথকে সুগম করতে জনগণের টাকায় পরিচালিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছিনতাইকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে একযোগে দ্রুত এগিয়ে আসবে-এমটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; বর্তমানে ফিলিপাইনের লাইসিয়াম অব দ্য ফিলিপাইন্স ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত।
ই-মেইল: kekbabu@yahoo.com

http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/sub-editorial/2017/10/13/228688.html

71
নতুন আতঙ্ক ঘাতক গেম ব্লু হোয়েল
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
       
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী এখন চলছে ব্লু হোয়েল গেম আতঙ্ক। ব্লু-হোয়েল বা নীল তিমি নামক এক অনলাইন গেমের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ দেয়া হচ্ছে আত্মহত্যার। আর এ খেলায় অনেকেই বিশেষ করে স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়পড়য়া অনেক শিক্ষার্থীই জড়িয়ে পড়ছে। তবে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, এই গেম খেলায় মত্ত হয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইতোমধ্যে বেশকিছু শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ভারতে এ বিষয়ে মামলা গড়িয়েছে সর্বোচ্চ কোর্ট তথা সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত। ব্লু-হোয়েল নামক এই মরণ গেমে রয়েছে ৫০টি ধাপ। একেক ধাপে দেয়া হয় একেক রকম চ্যালেঞ্জ-যা কঠিন সব চ্যালেঞ্জের সমাহার এবং ভয়কে জয় করার প্রচেষ্টা। আর সর্বশেষ ধাপে রয়েছে অবধারিত মৃত্যু। এই গেমের নিয়ম হচ্ছে, একবার কেউ চ্যালেঞ্জে ঢুকে পড়লে তাকে শেষ করতেই হবে। আর চ্যালেঞ্জের শেষে রয়েছে প্রতিযোগী মুক্ত হবে সকল জাগতিক ভয় থেকে অর্থাৎ প্রতিযোগীকে আত্মহত্যা করতে হবে। এই গেম আগে পাওয়া যেত গুগল প্লে স্টোরে। তবে তা মরণ গেম হওয়ায় এখন গুগল প্লে স্টোর থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরেও অবাধ এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে থেমে থাকেনি এই গেমের বিস্তার। ইতোমধ্যে তা ছড়িয়ে পড়েছে একজনের মোবাইলফোন থেকে অপরজনের মোবাইলফোনে। বাংলাদেশেও এখন অনেকের ফেসবুক এ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছে এই গেমের বিষয়ে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে-যা নিঃসন্দেহে একটি ভাল ও ইতিবাচক দিক। এই গেমের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার ন্যায় দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা যদি সমাজের বিভিন্ন অন্যায়-অনিয়ম, অবিচার, সহিংসতা, হানাহানি, বিদ্বেষ, দুর্র্নীতি, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকেন এবং সতর্ক বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেন, তাহলে আমাদের সমাজ থেকে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- যেমন একদিকে হ্রাস পাবে, তেমনি প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকেও অনেকে রেহাই পাবেন। যা হোক, বাংলাদেশে এই ব্লু-হোয়েল গেম বিষয়ে সতর্ক বার্তা সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম বড় মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই বিশেষ করে অনেক অভিভাবকই আতঙ্কিত হচ্ছেন, বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে এ ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে এই গেমের বিষয়ে সকলের সচেতন থাকাটা বেশি জরুরী।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়পড়–য়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যেই পড়াশোনা, প্রেম-ভালবাসা, মাদক, ক্যারিয়ার, হতাশা ইত্যাদি বিষয়ক চাপ দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। ফলে তারা খোলা মাঠে-ময়দানে খেলাধুলা করার ও সুষ্ঠু বিনোদনের সময়-সুযোগ খুব একটা পাচ্ছে না। ফলে টাচ ষ্ক্রীননির্ভর জীবন তথা ভার্চুয়াল জগতকেই (যেমন : ফেসবুক, ইমো, ইনস্টাগ্রাম, ভাইবার, টুইটার, স্কাইপ ইত্যাদি) তারা বেছে নিচ্ছে একমাত্র বিনোদন মাধ্যম হিসেবে। ফলে বাস্তবে তারা কোন সমস্যার মুখোমুখি হলেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে। মানসিক সমস্যার কথা অনেক সময় তারা কাছের মানুষকেও জানাতে ভয় পায়। কিন্তু দেশ গড়ার কা-ারি তথা নতুন প্রজন্মের এ বিষয়ে সকলে সজাগ হওয়া খুবই জরুরী। আমাদের দেশে দেখা যায়, কেউ মন খারাপের কথা জানাতে ভয় পায়, আবার কেউ পরীক্ষায় ভাল ফল করতে না পেরে মানসিক অশান্তিতে ভোগে (এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছে-যা খুবই দুঃখজনক), আবার অনেকেই ভাল ফল করার চাপ নিতে না পেরে বাড়ি থেকে লাপাত্তা হয়ে যায় ইত্যাদি। মনের এমনই নানা সমস্যায় আক্রান্ত তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ^ব্যাপীই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক অবসাদের বিষয়টি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আর তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রবল আসক্ত হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে, মত্ত হয়ে উঠছে ব্লু-হোয়েল নামক মরণ খেলায়। তবে এই প্রবণতা রোধকল্পে এবং তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ-সুন্দর রাখতে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে সকলের অংশগ্রহণে কর্মশালা, সেমিনার ইত্যাদির আয়োজনপূর্বক করণীয় নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন ঘটানো এখন অতীব জরুরী। এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ গণমাধ্যম যেন প্রচার করতে পারে যে, ব্লু-হোয়েল গেম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই এবং এ বিষয়ে অবশ্যই সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে উঠতি বয়সীদের দিকে ভালভাবে খেয়াল রাখা উচিত- যাদের মধ্যে ‘দেখি কী হয়’Ñ এই কৌতূহল রয়েছে বিশেষভাবে। বলা বাহুল্য, ভুল তথ্য প্রচার বা গুজব রটানো উল্টো ব্লু-হোয়েল নামক এই গেমটির প্রচারে বেশি ভূমিকা রাখবে, যার দরকার নেই মোটেও। ফলে, সঠিক তথ্য জেনে রাখাটাই হচ্ছে বেশি দরকার। আর অনলাইনে যেন এই গেম কোনভাবেই পাওয়া না যায় সে বিষয়ে সরকার তথা তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে এই গেম খেলার ওপর সরকারের তরফ থেকে আগাম নিষেধাজ্ঞাও জারি করা যেতে পারে। কারণ এই গেমটি মানুষকে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করছে। এটি এমন কিছু চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে, যা পরে খেলোয়াড়কে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। বাংলাদেশে যদিও এখন পর্যন্ত এই গেম খেলে কেউ আত্মহত্যা করেনি, তারপরেও এ গেম বন্ধে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। ব্লু-হোয়েলের পাশাপাশি এ জাতীয় অন্যান্য গেমের (যেমন : দ্য চোকিং গেম/চ্যালেঞ্জ, ডাক্ট টেপ চ্যালেঞ্জ, ঘোস্ট পেপার চ্যালেঞ্জ, আইস সল্ট চ্যালেঞ্জ, আইবল চ্যালেঞ্জ, দারুচিনি চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি) বিষয়েও সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। এ জাতীয় গেমের নেশায় যেন দেশের কিশোর-কিশোরীরা বা অন্য কেউ জড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। সর্বোপরি, স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ দেশের তরুণ সমাজের জন্য সুষ্ঠু চিত্তবিনোদন ও খেলাধুলার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলাসহ এসব বিষয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করণ; অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক তৈরিকরণ; অভিভাবক কর্র্তৃক সন্তানদের সঠিকভাবে ও নিয়মিত দেখভাল করা, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তরুণ সমাজের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার যথেষ্ট বিকাশ ঘটানোর ব্যবস্থা করার বিষয়গুলোও সুনিশ্চিত করা জরুরী- যেন দেশের তরুণ সমাজ হতাশায় না ভোগে, তারা যেন কেবল ভার্চুয়াল জগতকে তাদের একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত না করে এবং সর্বোপরি তারা যেন ব্লু-হোয়েল তথা এ জাতীয় কোন ক্ষতিকর গেমের প্রতি কোনভাবেই আসক্ত হতে না পারে।
লেখক : ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
ই-মেইল: kekbabu@yahoo.com

http://www.dailyjanakantha.com/details/article/300174/%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%A4%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%95-%E0%A6%98%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%95-%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%AE-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%81-%E0%A6%B9%E0%A7%8B%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B2

72
শিক্ষা আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন ("কালের কন্ঠ" ১১ অক্টোবর, ২০১৭; পৃ.১৫)
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন কোনো মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, ঠিক তেমনি শিক্ষা ছাড়াও কোনো জাতি উন্নতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, একটি জাতি বা দেশকে ভালোভাবে এগিয়ে নিতে শিক্ষার কোনোই বিকল্প নেই। আর দেশের এই শিক্ষাব্যবস্থা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্যে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-রীতি তথা আইন-কানুন থাকা অত্যাবশ্যক। তা না হলে এ ক্ষেত্রে যে সহজেই হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হবে তা বলাই বাহুল্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এত দিন পর্যন্ত শিক্ষা আইন ছিল না, ছিল কিছু শিক্ষানীতি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট আইন ছাড়া শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন কাজ। তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশেষে শিক্ষা আইনের একটা খসড়া চূড়ান্ত করেছে; যদিও অনেক আগে থেকেই দেশে এ ধরনের একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল বেশ প্রকটভাবেই। গত বছর মে মাসে সরকার শিক্ষা আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে সুচিন্তিত মতামত আহ্বান করেছিল। সেখানে প্রায় ৩০০ মতামত জমা পড়ে এবং মত প্রদানকারীদের বেশির ভাগই প্রাইভেট, টিউশনি, কোচিং, নোট বই, গাইড বই ইত্যাদি নিষিদ্ধ করার পক্ষে সোচ্চার ছিল। পাশাপাশি তারা বেশ জোরালোভাবেই শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য ক্ষতিকর এসব বিষয় চিরতরে বন্ধের সুপারিশ করেছে। দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব প্রাইভেট, টিউশনি, কোচিং, নোট বই, গাইড বই ইত্যাদি ক্ষতিকর চর্চা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য দেশের সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে যে জোরালো জনমত রয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শিক্ষা আইনের খসড়ার বিপরীতে জনগণের মতামতেই (ফিডব্যাক) তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোচিং, প্রাইভেট, গাইড বই, নোট বই ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রবণতা রোধ করার জন্য কোনো আইন নেই, আইন ছিল না। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে শিক্ষা আইনের একটা খসড়া ‘নমনীয়’ আকারে তৈরি করা হয়েছিল। আর এতে মূল পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ‘সহায়ক বই’ বা ‘অনুশীলন বই’ প্রকাশ করার সুযোগ রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির সুযোগ চালু রাখার উদ্দেশ্যে ওই আইনের খসড়ায় ‘ছায়া শিক্ষা’র কৌশল প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট সহায়ক ছিল। তখন ওই ধরনের একটি শিক্ষা আইনের খসড়া কাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে করা হয়েছিল, তা জনগণের বুঝতে বাকি নেই এবং বাকি থাকার কথাও নয়। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাবিদসহ সচেতন মহলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শিক্ষা আইনের ওই খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ফেরত এনে পর্যালোচনা করা হয়। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষা আইনের নতুন খসড়ায় কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট, টিউশনি, নোট বই, সহায়ক বা অনুশীলন বই নিষিদ্ধ করার বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে—যা দেশের শিক্ষা খাতের জন্য, দেশের জনগণের জন্য এক সুসংবাদই বটে।

শিক্ষা আইনের পরিমার্জিত এই খসড়ায় জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে, এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। শিক্ষা আইনের এ খসড়ায় কেউ প্রাইভেট, টিউশিন ও কোচিং করালে তাঁর ন্যূনতম ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিক শাস্তি দিলে শাস্তিদাতা ব্যক্তির ন্যূনতম তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হবে। পাশাপাশি নোট বই, গাইড বই ইত্যাদি প্রকাশ ও বিপণনের ক্ষেত্রেও কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে এ খসড়ায়। ফলে এ কথা স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, এই আইন জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত করবে এবং এই খসড়ায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষাকে একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) এটিকে অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত করা হলে অত্যন্ত ভালো হবে। খসড়াটি চূড়ান্ত করার সময় যেন এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। বড় কথা হচ্ছে, এই যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংশ্লিষ্ট কোনো শিক্ষক কিংবা কেউ এসব কাজ করলে কারাদণ্ড, জরিমানা ও সরকারি চাকুরের ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির বিধান করা হয়েছে। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য আট ধরনের অপরাধের দায়ে এমপিও বাতিল করা পর্যন্ত যেসব শাস্তির বিধান এই খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোও নিঃসন্দেহে যথার্থ।

সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, শিক্ষা আইনের খসড়াটি নানা দিক থেকেই উপকারী হবে। তবে এই শিক্ষা আইনটি উচ্চশিক্ষার ফেরিওয়ালাদের রুখতে সহায়ক হবে কি না তা এখনো বোধগম্য হচ্ছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারের নমনীয় অবস্থান তথা নমনীয় মনোভাবের কারণে এক শ্রেণির অসাধু লোক উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফেরিওয়ালার মতো দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য করে চলেছে। আবার উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে দেশের ভেতরে অবস্থিত প্রায় ৫০০ স্টুডেন্টস কনসালট্যান্সি ফার্ম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লাগামহীনভাবে প্রতারণা করেই চলেছে। অথচ এ বিষয়গুলো দেখার যেন কেউ নেই। এসব স্টুডেন্টস কনসালট্যান্সি ফার্ম কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, এরা শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে যাচ্ছে। আর উচ্চশিক্ষার এসব ফেরিওয়ালা তথা এসব প্রতারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেশে স্পষ্ট তথা সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। শিক্ষা আইনে যদি এসব ব্যাপারে আলোকপাত করাপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়, তাহলে তা অবশ্যই মঙ্গলজনক হবে।

আশা করা যায়, শিক্ষা আইনের খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন পেয়ে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ও গৃহীত হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, শুধু আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, প্রণীত আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন ঘটানোই বড় কথা, বড় বিষয়, বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, যেকোনো ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে একটি প্রাথমিক ধাপ বা পদক্ষেপ মাত্র। এরপর যা থাকে তা হচ্ছে, প্রণীত আইনের সুষ্ঠু তথা যথাযথ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কাজ। বিশেষত শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতিকর চর্চাগুলো (যথা—প্রাইভেট, টিউশনি, কোচিং, গাইড বই, নোট বই ইত্যাদি) বন্ধ করতে হলে শিক্ষা আইনের অবশ্যই যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রাইভেট, টিউশনি ও কোচিং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকে গৌণ বিষয়ে পরিণত করেছে এবং নোট বই, গাইড বই ইত্যাদি শিক্ষার্থীদের মূল পাঠ্য বইয়ের প্রতি বিমুখ করেছে—যা এ জাতির জন্য বড় ধরনের একটি অশনিসংকেত। শিক্ষাক্ষেত্রের এসব ক্ষতিকর চর্চা চিরতরে বন্ধ করতে শিক্ষা আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি জাতির বহুল প্রত্যাশিত শিক্ষা আইনের যেন যথাযথ ও সুষ্ঠু প্রয়োগ ঘটে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাকেই ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ  ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com

http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2017/10/11/552278

73


মামলাজট কমাতে ঢাকার সিএমএম কোর্ট হতে পারে রোল মডেল
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু, দৈনিক জনকন্ঠ, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ (পৃ.৭)
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিচার বিভাগের কাঁধে প্রায় ৩১ লাখ মামলার ভার। অর্থাৎ দেশের আদালতগুলো যেন মামলার ভারে ভারাক্রান্ত। তবে মামলাজট কমাতে তথা মামলা নিষ্পত্তি করতে সঠিক সময়ে সঠিক কর্মকৌশল গ্রহণসহ তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটালে এবং সর্বোপরি নিরলস ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে সহজেই যে মামলাজট দূর করা যায়। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) কোর্ট। ঢাকার মাননীয় সিএমএম শেখ হাফিজুর রহমান ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট সিএমএম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক বছরের মাথায় তার নেতৃত্বে প্রায় সোয়া দুই লাখ মামলা নিষ্পত্তি করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। উল্লেখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি ঢাকার সিএমএম কোর্টে দালাল-টাউটদের দৌরাত্ম্য কমানো, আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রেকর্ড সংরক্ষণ, নকল (মামলা সংক্রান্ত কপি) সরবরাহ, মালখানা ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সিএমএম যোগদানের সময় ওই কোর্টে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ৪১৮টি। মামলার শ্রেণী ও প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে তার নেতৃত্বে দ্রুত ওই মামলাসমূহ নিষ্পত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৯৫ হাজার ৯২২টি মোটরযান মামলাসহ মোট ১ লাখ পনের হাজার ৭৫৪টি মামলা নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় ঢাকাস্থ সিএমএম আদালত। অপর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ঢাকার সিএমএম কোর্টে মোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ এক হাজার ১৪৯টি। আর ২০১৫ সালে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৮টি। ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট বর্তমান সিএমএম দায়িত্ব গ্রহণের পর হতে চলতি বছরের (২০১৭) জানুয়ারি মাস পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৫ হাজার ২২১টি। মামলা নিষ্পত্তির এ ধারাবাহিকতা বর্তমানেও বহমান রয়েছে। ঢাকার সিএমএম কোর্টের উদ্যোগে বর্তমানে জামিন, রিমান্ড শুনানিসহ বিভিন্ন আমলি আদালতের প্রাত্যহিক বণ্টন সম্পর্কিত তথ্যাদি সিএমএম কোর্টে রক্ষিত মনিটর ও নোটিস বোর্ডের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী জনগণকে প্রতিদিন অবহিত করা হচ্ছে। এছাড়াও ঢাকার সিএমএম কোর্টের উদ্যোগে ওই কোর্টে অন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে: ১. আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ওই আদালতে ১৬টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন; ২. বিভিন্ন আদালতের কম্পিউটার কম্পোজকৃত রায় ও আদেশের সই মহুরি নকল চাওয়া মাত্র দেয়ার লক্ষ্যে সার্ভার স্থাপন; ৩. বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের অনলাইন সার্ভারে সিএমএম কোর্টের মামলার ফলাফল যথাসময়ে প্রতিনিয়ত পোস্ট করার ব্যবস্থা গ্রহণ; ৪. ওই ম্যাজিস্ট্রেসিতে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি সংক্রান্ত ডাটাবেজ প্রস্তুতকরণ; ৫. বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ওই ম্যাজিস্ট্রেসির জন্য স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট খোলার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; ৬. মামলার শুনানির সুবিধার্থে সিএমএর-এর এজলাসসহ মোট তিনটি এজলাসে মাইক্রোফোন স্থাপন; ৭. আদালতের মূল ভবনে আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের উঠা-নামার সুবিধার্থে কার্গোলিফট স্থাপন; ৮. পেন্ডিং মামলার আলামত সপ্তাহে তিনদিন নিয়মিতভাবে ধ্বংস করা এবং আলামত সুষ্ঠুভাবে ধ্বংসের সুবিধার্থে চুল্লি স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ; ৯. রেকর্ডরুমের আধুনিকায়ন করা, সংশ্লিষ্টদের একটি পূর্ণাঙ্গ রেজিস্ট্রার তৈরিকরণ এবং রেকর্ড সম্পর্কিত তথ্যাদি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ; ১০. সিএমএম আদালতের হাজতখানায় কয়েদিদের জন্য নিরাপদ পানি এবং শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পান কক্ষ নির্মাণ; ১১. হাজতিদের পরিচ্ছন্ন বাথরুম সুবিধা নিশ্চিতকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ; ১২. মাসিক Disposal Meeting-এর মাধ্যমে সিএমএম কোর্টের প্রত্যেকটি কোর্টের মাসিক Disposal Report পর্যালোচনা ও মূল্যায়নপূর্বক অধিকতর মামলা নিষ্পত্তির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের উৎসাহ ও তাগিদ প্রদান করা; ১৩. ওই ম্যাজিস্ট্রেসির গুরুত্বপূর্ণ শাখাসমূহ (যেমন: নকলখানা, মালখানা, নেজারত, রেকর্ডরুম, এফিডেভিটসহ অন্য বিভাগ) নিয়মিত পরিদর্শনপূর্বক সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ; ১৪. সিএমএম আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঠিক সময়ে আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালতে ডিজিটাল এটেনডেন্স মেশিন স্থাপনকরণ; ১৫. বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগ লাঘবকল্পে আদালতে দুটি হেল্পডেস্ক খোলার উদ্যোগ গ্রহণ ইত্যাদি। তবে ঢাকার বর্তমান সিএমএম শেখ হাফিজুর রহমানের যে অভিনব উদ্যোগটি সর্বমহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে, তা হচ্ছে জনসাধারণের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিদিন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্টেটদের রিমান্ড ও জামিন শুনানির অধিক্ষেত্র পরিবর্তন করেন। প্রতিদিন সকাল ১০টায় বিচার শুরুর পূর্বে পর্যন্ত মামলার কোন পক্ষই জানতে পারেন না যে, তার বা তাদের মামলার বিচার করবেন কোন্ বিচারক। এই অভিনব কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে বিচারে অহেতুক হস্তক্ষেপ ও দালাল-টাউটদের দৌরাত্ম্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ঢাকার সিএমএম আদালতের উদ্যোগে গৃহীত উপরোক্ত বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে একটি দেশে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য অপরিহার্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। ঢাকার সিএমএম কোর্টের ন্যায় দেশের সকল কোর্ট যদি এই ধরনের কর্মকৌশল অনুকরণপূর্বক গ্রহণও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করে, তবে দেশের কোন আদালতকেই সহজে আর মামলার ভারে ভারাক্রান্ত হতে হবে না বলে আশা করা যায়।
লেখক : ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষক; বর্তমানে ফিলিপিন্সের লাইসিয়াম অব দ্য ফিলিপিন্স ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত।
kekbabu@yahoo.com
http://www.dailyjanakantha.us/details/article/296320/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%9F-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%8F%E0%A6%AE%E0%A6%8F%E0%A6%AE-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9F-%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87

74
"দৈনিক জনকন্ঠ" তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ (পৃ.৬)
অভিমত ॥ গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা আর কতদূর?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু
‘লালন তোমার আরশিনগর আর কতদূর, আর কতদূর...’ শীর্ষক লালনগীতির ন্যায় আমাদের দেশের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় চলতি বছর উত্তীর্ণ হওয়া কয়েক লাখ শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকদের মনেও যেন এখন উদিত হচ্ছে, ‘গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা আর কতদূর... আর কতদূর।’ গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতির পরীক্ষায় মূলত একই প্রশ্নপত্রে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেয়া হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে সবচেয়ে লাভবান হবেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন- সিলেটে অবস্থিত কোন একটি বিশ^বিদ্যালয়ে সারাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন, যার অর্থ সারাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষা দিতে সিলেটে আসতে হয়। কিন্তু সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের কষ্ট অনেক কমে যাবে। কারণ, তখন সেই উত্তরবঙ্গের বা দক্ষিণবঙ্গের ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের আর কষ্ট করে সিলেটে যেতে হবে না। তাঁরা তাঁদের কাছাকাছি রাজশাহী বা যশোর ক্যাম্পাসেই পরীক্ষা দিতে পারবে। ঠিক একইভাবে সিলেট এলাকার কোন ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রী যদি যশোরে অবস্থিত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান তাঁকে তখন আর কষ্ট করে যশোর যেতে হবে না, তিনি সিলেটে বসেই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবেন। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন বিভাগের জন্য বিবেচিত হতে পারবেন। যা হোক, সমন্বিত বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকে আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উপাচার্যদের সভায় বেশির ভাগ উপাচার্য সমন্বিত বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছিলেন। এরপর এ নিয়ে আরও কয়েক দফা আলোচনাও হয়। কিন্তু ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। বছর দুয়েক আগে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ‘অজ্ঞাত কারণে’ শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল কলেজের মতো ক্লাস্টার বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার কথা গত নয় বছর ধরে আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্যের কোঠাতেই বিরাজ করছে। অর্থাৎ গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা এবারও চালু হচ্ছে না। আগামীতেও তা চালু হবে কিনা কিংবা আদৌ চালু হবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ফলে বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবারও দুর্ভোগ পোহাতে হবে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন। চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ভাল ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরা ভর্তিযুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাফল্যের সিংহ দরজা অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষার নতুন ভুবনে প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়া লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে এখন ভর্তি পরীক্ষা নামক বিরাট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে আরামের ঘুম হারাম করে, খেলাধুলা বন্ধ করে, প্রচ- মানসিক চাপ নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে বেড়াতে হবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পাশাপাশি ‘ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদ’ হিসেবে থাকবে ভর্তিচ্ছুদের অভিভাবকদের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়। আমাদের দেশে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় পৃথক পৃথক দিনে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে থাকলেও আজ একটিতে পরীক্ষা দিল তো আগামীকাল আবার আরেকটিতে পরীক্ষা দিতে যথাসময়ে পৌঁছানোর জন্য বেশ তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকতে হয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রান্ত বা সীমানা পাড়ি দিতে হয় কখনও নদীপথে, কখনও সড়কপথে আবার কখনও রেলপথে। এ জন্য প্রায় একটা লম্বা সময় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পথে পথেই কাটাতে হয়। এতে করে না হয় ঠিকমতো ঘুম, না থাকে গোসল, না থাকে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া। দীর্ঘ পথ ভ্রমণে অনেকেরই থাকে অনভ্যস্ততা। আর এ কারণে তাঁরা অনেক সময় স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়ে থাকেন।

আগে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম থাকায় পৃথক পৃথক পরীক্ষা হলেও খুব একটা বেশি সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে দেশে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ভর্তি করে। ইতোমধ্যে চলতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখও ঘোষণা করেছে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়। এখানে আগের মতোই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক পৃথক ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এবারও লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সরকারী ও বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজগুলো যদি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা নিয়ে ফলাফলের ভিত্তিতে কে কোন্ মেডিক্যালে পড়বেন তা ঠিক করে দিতে পারে, তাহলে কেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্লাস্টার বা গুচ্ছ কিংবা সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করে না বা করতে পারে না? এক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়? বলাবাহুল্য, ইউজিসির একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতিকে ত্রুটিপূর্ণ, ব্যয়বহুল ও কোচিংনির্ভর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া ইউজিসির উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) এক গবেষণায় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়- এ তিনটিকে গুচ্ছ করে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। মেডিক্যাল কলেজগুলোর উদ্যোগে পরিচালিত কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা পদ্ধতি স্বচ্ছ হওয়ায় ইতোমধ্যে তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দেশের শিক্ষাবিদরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পদ্ধতি চালু করার পক্ষে গত নয় বছর ধরে প্রস্তাব ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করে আসলেও এক্ষেত্রে যেন কোনই লাভ হচ্ছে না। কারও কারও অভিমতÑ দেশের ৪০টি সরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা একসঙ্গে নেয়া সমস্যা। যদি তা-ই হয় তাহলে সেক্ষেত্রে গুচ্ছ পদ্ধতি শ্রেয়। এক্ষেত্রে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একেকটি গুচ্ছের মধ্যে নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। সরকার যদি একযোগে মাসব্যাপী আট-নয় লাখ শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন তাদের ভর্তি পরীক্ষা একযোগে সফলভাবে নিতে পারবে না?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, জেএসসি প্রবর্তন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পাসের হার বাড়ানোসহ বেশকিছু ইতিবাচক অর্জন রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও প্রশংসা এবং সাধুবাদ পাবে যদি দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ক্লাস্টার বা গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালনার পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকরা যদি ভর্তি ফরম বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ের বিষয়টি মাথা বাদ দিতে পারেন এবং ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের সীমাহীন দুর্ভোগ এবং কষ্টের বিষয়গুলো সুবিবেচনা করে এগিয়ে আসতে পারেন, তাহলেই কেবল গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি সম্ভব। অন্যথায় তা সম্ভব নয়। গুচ্ছ পদ্ধতিতে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভর্তি প্রার্থী নির্বাচন করা হলে ছাত্রছাত্রীরা মানসিক চাপ ও অহেতুক হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন এবং তাঁদের অভিভাবকদেরও মানসিক ও আর্থিক চাপ কমবে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে দেশ ও জাতি হবে উপকৃত। তবে এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক সহযোগিতা এবং আন্তরিকতা।
লেখক : ফিলিপিন্সের লাইসিয়াম অব দ্য ফিলিপিন্স ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর।
kekbabu@yahoo.com

http://www.dailyjanakantha.us/details/article/292886/%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%A4-%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B-%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%B0

75
সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি মিলবে কি?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

"কালের কন্ঠ" (৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭)

http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2017/09/05/539163

ঈদ অর্থ আনন্দ, ঈদ অর্থ খুশি। ঈদের দিন কিংবা ঈদ মৌসুমে সাধারণত এ দেশের প্রতিটি মুসলিম পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু ঈদের এই আনন্দ-খুশির মুহূর্তেই কোনো কোনো পরিবার বিষাদে পরিণত হয়ে ওঠে, যখন ঈদের দিন বা ঈদের আগের দিন কিংবা ঈদ মৌসুমে ওই পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু ঘটে। আর এই মৃত্যু যদি হয় সড়ক দুর্ঘটনায়, তাহলে তা হয়ে ওঠে অত্যন্ত বেদনার, অত্যন্ত বিষাদের। এ দেশে ঈদের দিনও থামে না সড়ক দুর্ঘটনা, থেমে থাকে না মৃত্যু। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বিকেল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন ও ঈদের আগের দিন ১৩ জন নিহত হয়েছে।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিত ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এ দেশের জনগণের কপালের লিখন? উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। তাহলে কি কপালের লিখন দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয়ই না। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারটেক করার মানসিকতা প্রবল মাত্রায় বিদ্যমান থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন কিংবা রাস্তায় চলাচলের নিয়ম না মানা প্রভৃতি। এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই কিংবা টিভি চ্যানেলের সংবাদের দিকে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবর।

দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর এ দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং এতে প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত হয়েছে; অর্থাৎ দিনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৪ জন।
এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত দেড় বছরে শুধু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে অন্তত ২০০ জন। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবছর দেশের সড়কপথে অন্তত পাঁচ হাজার দুর্ঘটনা ঘটছে আর এক বছরেই দেশে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং পঙ্গুত্ববরণ করছে এর দ্বিগুণ। এ ক্ষেত্রে সরকারি আর বেসরকারি হিসাবের সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও দেশে যে প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেক লোকের প্রাণহানি বা পঙ্গুত্ববরণের ঘটনা ঘটছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে; সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ যে কঠিন ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কি ধারাবাহিকভাবে ঘটতেই থাকবে? প্রত্যেক ব্যক্তিই এ প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, ‘না, এ অবস্থা আর কোনোভাবেই চলতে পারে না এবং চলতে দেওয়া যায় না। ’ সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারসহ সবার পক্ষ থেকে অতিদ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাসহ তার বাস্তবায়ন অতীব জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের উপায় খুঁজতে হলে সর্বাগ্রে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশে অনেক অনুপযুক্ত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ নকশা থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুলপথে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যথেচ্ছ ওভারটেকিং, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাস্তার ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করা, রাস্তা পারাপারের জন্য অনেক সময় ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে জনগণ কর্তৃক রাস্তা পার হওয়া, রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলের জন্য যে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-রীতি রয়েছে তা জনগণ কর্তৃক না মানার প্রবণতা বিদ্যমান থাকা ইত্যাদি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র অত্যন্ত করুণ। অন্যদিকে অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়ে, ট্রাফিক আইন না মেনে ও ফিটনেসহীন গাড়ি চালানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও যেন ‘অজ্ঞাত কারণে’ এসব বিষয় দেখেও দেখে না। সরকার তথা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন। রাস্তার ওপর বা ফুটপাতে হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিকব্যবস্থা, ট্রাফিক পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশিমতো যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করা, সড়ক-মহাসড়কের ওপর রিকশা, ভ্যান, টেম্পো, ম্যাক্সি, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড ‘স্থাপন’ করা, রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন স্থাপন করা, সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা এবং একই রাস্তা বছরে বারবার খনন করা, জনগণ কর্তৃক রাস্তা পারাপারের নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে না মানাসহ নানা কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অতিদ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বাগ্রে চালকদের হতে হবে আরো দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তা চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো ও গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘ওভারটেক’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে, সে বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা আবশ্যক। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আর এই পদক্ষেপগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
kekbabu@yahoo.com

Pages: 1 ... 3 4 [5] 6