Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - ashraful.diss

Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 10
31

অভ্যস্ত মাদকসেবী মূর্তিপূজক সমতুল্য। সে জান্নাতে যাবে না- পর্ব ২

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مُدْمِنُ الْـخَمْرِ كَعَابِدِ وَثَنٍ

“অভ্যস্ত (Addicted) মাদকসেবী মূর্তিপূজক সমতুল্য”।

আবু মূসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«مَا أُبَالِيْ شَرِبْتُ الْـخَمْرَ أَوْ عَبَدتُّ هَذِهِ السَّارِيَةَ مِنْ دُوْنِ اللهِ عَزَّ وَ جَلَّ»

“মদ পান করা এবং আল্লাহ তা‘আলা ব্যতিরেকে এ (কাঠের) খুঁটিটির ইবাদাত করার মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য করি না। কারণ, উভয়টিই আমার ধারণা মতে একই পর্যায়ের অপরাধ”।

আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لاَ يَدْخُلُ الْـجَنَّةَ مُدْمِنُ خَمْرٍ»

“অভ্যস্ত মাদকসেবী জান্নাতে প্রবেশ করবে না”।

তাছাড়া কোনো ব্যক্তি কোনো মাদকদ্রব্য সেবন করে নেশাগ্রস্ত বা মাতাল হলে আল্লাহ তা‘আলা চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার কোনো সালাত কবুল করবেন না। আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ شَرِبَ الْـخَمْرَ وَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا، وَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ، فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ، وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا، فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّـارَ، فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ، وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا، فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ، فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ، وَإِنْ عَادَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَّسْقِيَهُ مِنْ رَدْغَةِ الْـخَبَالِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، قَالُوْا: يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَمَا رَدْغَةُ الْـخَبَالِ؟ قَالَ: عُصَارَةُ أَهْلِ النَّارِ»

“কেউ মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হলে তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবে যদি সে খাঁটি তাওবা করে নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি সে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয় তাহলে আবারো তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবুও যদি সে খাঁটি তাওবা করে নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি সে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয় তাহলে আবারো তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবুও যদি সে খাঁটি তাওবা করে নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার তাওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি সে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয় তখন আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব হবে কিয়ামতের দিন তাকে ‘রাদগাতুল খাবাল’ পান করানো। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! ‘রাদগাতুল খাবাল’ কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পুঁজ”।

মদ্যপায়ী ব্যক্তি মদ পানের সময় ঈমানদার থাকে না

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لاَ يَزْنِيْ الزَّانِيْ حِيْنَ يَزْنِيْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلا يَشْرَبُ الْـخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ؛ وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيْهَا أَبْصَارَهُمْ حِيْنَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوْضَةٌ بَعْدُ»

“ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। লুটেরা যখন মানব জনসম্মুখে লুট করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়”।

অনুরূপভাবে কোনো এলাকায় মদের বহুল প্রচলন ঘটলে তখন পৃথিবীতে স্বভাবতই ভূমি ধস হবে, মানুষের আঙ্গিক অথবা মানসিক বিকৃতি ঘটবে এবং আকাশ থেকে আল্লাহর আযাব নিক্ষিপ্ত হবে। ইমরান ইবন হুসাইন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«فِيْ هَذِهِ الْأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْـمُسْلِمِيْنَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَمَتَى ذَاكَ؟ قَالَ: إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْـمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْـخُمُوْرُ»

“এ উম্মতের মাঝে ভূমি ধস, মানুষের আঙ্গিক অথবা মানসিক বিকৃতি এবং আকাশ থেকে আল্লাহর আযাব নিক্ষিপ্ত হবে। তখন জনৈক মুসলিম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেটা আবার কখন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন গায়ক-গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ্য প্রচলন ঘটবে এবং মদ্য পান করা হবে”।

এতদুপরি মদ পানের পাশাপাশি মদ পান করাকে হালাল মনে করা হলে সে জাতির ধ্বংস তো একেবারেই অনিবার্য। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِذَا اسْتَحَلَّتْ أُمَّتِيْ خَمْسًا فَعَلَيْهِمُ الدَّمَارُ: إِذَا ظَهَرَ التَّلاَعُنُ، وَشَرِبُوْا الْـخُمُوْرَ، وَلَبِسُوْا الْـحَرِيْرَ، وَاتَّخَذُوْا الْقِيَانَ، وَاكْتَفَى الرِّجَـالُ بِالرِّجَالِ، وَالنِّسَاءُ بِالنِّسَاءِ»

“যখন আমার উম্মত পাঁচটি বস্তুকে হালাল মনে করবে তখন তাদের ধ্বংস একেবারেই অনিবার্য। আর তা হচ্ছে, একে অপরকে যখন প্রকাশ্যে লা‘নত করবে, মদ্য পান করবে, সিল্কের কাপড় পরিধান করবে, গায়িকাদেরকে সাদরে গ্রহণ করবে, (যৌন ব্যাপারে) পুরুষ পুরুষের জন্য যথেষ্ট এবং মহিলা মহিলার জন্য যথেষ্ট হবে”।

ফেরেশতাগণ মদ্যপায়ীর নিকটবর্তী হয় না

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«ثَلاَثَةٌ لاَ تَقْرَبُهُمُ الْـمَلاَئِكَةُ: الْـجُنُبُ وَالسَّكْرَانُ وَالْـمُتَضَمِّخُ بِالْـخَلُوْقِ»

“ফিরিশতারা তিন ধরনের মানুষের নিকটবর্তী হয় না। তারা হচ্ছে, জুনুবী ব্যক্তি (যার গোসল ফরয হয়েছে) মদ্যপায়ী এবং খালূক্ব (যাতে জাফ্রানের মিশ্রণ খুবই বেশি) সুগন্ধি মাখা ব্যক্তি”।

ঈমানদার ব্যক্তি যেমন মদ পান করতে পারে না তেমনিভাবে সে মদ পানের মজলিসেও উপস্থিত হতে পারে না। জাবির ও আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلاَ يَشْرَبِ الْـخَمْرَ، مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلاَ يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُشْرَبُ عَلَيْهَا الْـخَمْرُ»

“যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন মদ পান না করে এবং যে মজলিসে মদ পান করা হয় সেখানেও যেন সে না বসে”।

যে ব্যক্তি জান্নাতে মদ পান করতে ইচ্ছুক সে যেন দুনিয়াতে মদ পান না করে এবং যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করতে সক্ষম হয়েও তা পান করে নি আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই তাকে জান্নাতে মদ পান করাবেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَّسْقِيَهُ اللهُ الْـخَمْرَ فِيْ الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهَا فِيْ الدُّنْيَا، وَمَنْ سَرَّهُ أَنْ يَّكْسُوَهُ اللهُ الْـحَرِيْرَ فِيْ الْآخِرَةِ فَلْيَتْرُكْهُ فِيْ الدُّنْيَا»

“যার মন আনন্দিত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে আখিরাতে মদ পান করাবেন সে যেন দুনিয়াতে মদ পান করা ছেড়ে দেয় এবং যার মনে আনন্দ অনুভূত হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে আখিরাতে সিল্কের কাপড় পরাবেন সে যেন দুনিয়াতে সিল্কের কাপড় পরা ছেড়ে দেয়”।

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: مَنْ تَرَكَ الْـخَمْرَ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ لَأَسْقِيَنَّهُ مِنْهُ فِيْ حَظِيْرَةِ الْقُدُسِ»

“আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যে ব্যক্তি মদ পান করতে সক্ষম হয়েও তা পান করেনি আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র বিশেষ স্থান জান্নাতে মদ পান করাবো”।

যে ব্যক্তি প্রথম বারের মতো নেশাগ্রস্ত হয়ে সালাত পড়তে পারলো না সে যেন দুনিয়া ও দুনিয়ার উপরিভাগের সব কিছুর মালিক ছিলো এবং তা তার থেকে একেবারেই ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ تَرَكَ الصَّلاَةَ سُكْرًا مَرَّةً وَاحِدَةً؛ فَكَأَنَّمَا كَانَتْ لَهُ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا فَسُلِبَهَا، وَمَنْ تَرَكَ الصَّلاَةَ أَرْبَعَ مَرَّاتٍ سُكْرًا كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَّسْقِيَهُ مِنْ طِيْنَةِ الْـخَبَالِ، قِيْلَ: وَمَا طِيْنَةُ الْـخَبَالِ؟ قَالَ: عُصَارَةُ أَهْلِ جَهَنَّمَ»

“যে ব্যক্তি প্রথমবারের মতো নেশাগ্রস্ত হয়ে সালাত ছেড়ে দিলো সে যেন দুনিয়া ও দুনিয়ার উপরিভাগের সব কিছুর মালিক ছিলো এবং তা তার থেকে একেবারেই ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর যে ব্যক্তি চতুর্থ বারের মতো নেশাগ্রস্ত হয়ে সালাত ছেড়ে দিলো আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব হবে তাকে ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ পান করানো। জিজ্ঞাসা করা হলো: ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ কী? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পুঁজরক্ত”।

চলবে........


32

ইসলামে মাদকদ্রব্য সেবনের নিষেধাজ্ঞা - পর্ব ১

মদ্য পান অথবা যে কোনো নেশাকর দ্রব্য গ্রহণ তথা সেবন (চাই তা খেয়ে কিংবা পান করেই হোক অথবা ঘ্রাণ নেওয়া কিংবা ইঞ্জেকশান গ্রহণের মাধ্যমেই হোক) একটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ, যার ওপর আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিশাপ ও অভিসম্পাত রয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে মদ্যপান তথা যে কোনো নেশাকর দ্রব্য গ্রহণ অথবা সেবনকে শয়তানের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। শয়তান চায় এরই মাধ্যমে মানুষে মানুষে শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে মানুষকে গাফিল করতে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡخَمۡرُ وَٱلۡمَيۡسِرُ وَٱلۡأَنصَابُ وَٱلۡأَزۡلَٰمُ رِجۡسٞ مِّنۡ عَمَلِ ٱلشَّيۡطَٰنِ فَٱجۡتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٩٠ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُوقِعَ بَيۡنَكُمُ ٱلۡعَدَٰوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ فِي ٱلۡخَمۡرِ وَٱلۡمَيۡسِرِ وَيَصُدَّكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَعَنِ ٱلصَّلَوٰةِۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّنتَهُونَ ٩١﴾ [المائ‍دة: ٩٠، ٩١]

“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ (নেশাকর দ্রব্য), জুয়া, মূর্তি ও লটারীর তীর এ সব নাপাক ও গর্হিত বিষয়। শয়তানের কাজও বটে। সুতরাং এগুলো থেকে তোমরা সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকো। তাহলেই তো তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো এটিই চায় যে, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হোক এবং আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ ও সালাত থেকে তোমরা বিরত থাকো। সুতরাং এখনো কি তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকবে না?” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৯০-৯১]

উক্ত আয়াতে মদ্যপানকে শির্কের পাশাপাশি উল্লেখ করা, তাকে অপবিত্র ও শয়তানের কাজ বলে আখ্যায়িত করা, তা থেকে বিরত থাকার ইলাহী আদেশ, তা বর্জন সমূহে কল্যাণ নিহিত থাকা, এরই মাধ্যমে শয়তান কর্তৃক মানুষে মানুষে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ ও সালাত থেকে গাফিল রাখার চেষ্টা এবং পরিশেষে ধমকের সুরে তা থেকে বিরত থাকার আদেশ থেকে মদ্যপানের ভয়ঙ্করতার পর্যায়টি সুস্পষ্টরূপেই প্রতিভাত হয়।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَـمَّا حُرِّمَتِ الْـخَمْرُ مَشَى أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ e بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ، وَقَالُوْا: حُرِّمَتِ الْـخَمْرُ وَجُعِلَتْ عِدْلاً لِلشِّرْكِ»

“যখন মদ্যপান হারাম করে দেওয়া হলো তখন সাহাবীগণ একে অপরের নিকট গিয়ে বলতে লাগলো: মদ হারাম করে দেওয়া হয়েছে এবং সেটাকে শির্কের পাশাপাশি অবস্থানে রাখা হয়েছে”।

মদ বা মাদকদ্রব্য সকল অকল্যাণ ও অঘটনের মূল

আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আমার প্রিয় বন্ধু (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ মর্মে অসিয়ত করেন:

«لاَ تَشْرَبِ الْـخَمْرَ؛ فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَرٍّ»

“(কখনো) তুমি মদ পান করো না। কারণ, তা সকল অকল্যাণ ও অঘটনের চাবিকাঠি”।

একদা বনী ইসরাঈলের জনৈক রাষ্ট্রপতি সে যুগের জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তিকে চারটি কাজের যে কোনো একটি করতে বাধ্য করে। কাজগুলো হলো: মদ্যপান, মানব হত্যা, ব্যভিচার ও শূকরের গোশত খাওয়া। এমনকি তাকে এর কোনো না কোনো একটি করতে অস্বীকার করলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। পরিশেষে উক্ত ব্যক্তি বাধ্য হয়ে মদ্য পানকেই সহজ মনে করে তা করতে রাজি হলো। যখন সে মদ্য পান করে সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে গেলো তখন উক্ত সকল কাজ করাই তার জন্য সহজ হয়ে গেলো।

এ কথা সবারই জানা থাকা দরকার যে, হাদীসের পরিভাষায় সকল মাদক দ্রব্যকেই ‘খামর’ বলা হয় তথা সবই মদের অন্তর্ভুক্ত। আর মদ বলতেই তো সবই হারাম।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ ، وَفِيْ رِوَايَةٍ: وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ»

“প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই মদ বা মদ জাতীয়। আর প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই তো হারাম। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, প্রত্যেক মদ জাতীয় বস্তুই হারাম”।

আয়েশা, আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ, মু‘আবিয়া ও আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মধুর সুরার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

«كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ ، وَبِعِبَارَةٍ أُخْرَى: كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ»

“প্রত্যেক পানীয় যা নেশাকর তা সবই হারাম। অন্য শব্দে, প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই হারাম”।

তেমনিভাবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, যে বস্তুটি বেশি পরিমাণে সেবন করলে নেশা আসে তা সামান্য পরিমাণে সেবন করাও হারাম।

জাবির ইবন আব্দুল্লাহ্, আব্দুল্লাহ ইবন আমর ও আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ، وَمَا أَسْكَرَ كَثِيْرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَامٌ»

“প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই হারাম এবং যে বস্তুটির বেশি পরিমাণ নেশাকর তার সামান্যটুকুও হারাম”।

শুধু আঙ্গুরের মধ্যেই মদের ব্যাপারটি সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা যে কোনো বস্তু থেকেও বানানো যেতে পারে এবং তা সবই হারাম।

নু‘মান ইবন বাশীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ مِنَ الْعِنَبِ خَمْرًا، وَإِنَّ مِنَ التَّمْرِ خَمْرًا، وَإِنَّ مِنَ الْعَسَلِ خَمْرًا، وَإِنَّ مِنَ الْبُرِّ خَمْرًا، وَإِنَّ مِنَ الشَّعِيْرِ خَمْرًا، وَفِيْ رِوَايَةٍ: وَمِنَ الزَّبِيْبِ خَمْرًا»

“নিশ্চয় আঙ্গুর থেকে যেমন মদ হয় তেমনিভাবে খেজুর, মধু, গম এবং যব থেকেও তা হয়। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, কিসমিস থেকেও মদ হয়।

নু‘মান ইবন বাশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ الْـخَمْرَ مِنَ الْعَصِيْرِ، وَالزَّبِيْبِ، وَالتَّمْرِ، وَالْحِنْطَةِ، وَالشَّعِيْرِ، وَالذُّرَةِ، وَإِنِّيْ أَنْهَاكُمْ عَنْ كُلِّ مُسْكِرٍ»

“নিশ্চয় মদ যেমন যে কোনো ফলের রস বিশেষভাবে আঙ্গুরের রস থেকে তৈরি হয় তেমনিভাবে কিসমিস, খেজুর, গম, যব এবং ভুট্টা থেকেও তা তৈরি হয়। আর আমি নিশ্চয় তোমাদেরকে প্রত্যেক নেশাকর দ্রব্য গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করছি”।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মিম্বারে উঠে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পাঠের পর বললেন,

«نَزَلَ تَحْرِيْمُ الْـخَمْرِ وَهِيَ مِنْ خَمْسَةٍ: الْعِنَبِ وَالتَّمْرِ وَالْعَسَلِ وَالْحِنْطَةِ وَالشَّعِيْرِ، وَالْـخَمْرُ مَا خَامَرَ الْعَقْلَ»

“মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তখন পাঁচটি বস্তু দিয়েই মদ তৈরি হতো। আর তা হচ্ছে, আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম এবং যব। তবে মদ বলতে এমন সব বস্তুকেই বুঝানো হয় যা মানব ব্রেইনকে প্রমত্ত করে”।

আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির লোককে লা‘নত তথা অভিসম্পাত করেছেন, আনাস ইবন মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম থেকে বর্ণিত, তারা বলেন

«لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ رسول الله صلى الله عليه وسلم فِيْ الْـخَمْرِ عَشْرَةً: عَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَشَارِبَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالْـمَحْمُوْلَةَ إِلَيْهِ، وَسَاقِيَهَا، وَبَائِعَهَا، وَآكِلَ ثَمَنِهَا، وَالْـمُشْتَرِيَ لَهَا، وَالْـمُشْتَرَاةَ لَهُ، وَفِيْ رِوَايَةٍ: لُعِنَتِ الْـخَمْرُ بِعَيْنِهَا، وَفِي رِوَايَةٍ: لَعَنَ اللهُ الْـخَمْرَ وَشَارِبَهَا»

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদের ব্যাপারে দশজন ব্যক্তিকে লা‘নত বা অভিসম্পাত করেন: যে মদ বানায়, যে মূল কারিগর, যে পান করে, বহনকারী, যার নিকট বহন করে নেওয়া হয়, যে অন্যকে পান করায়, বিক্রেতা, যে লাভ খায়, খরিদদার এবং যার জন্য খরিদ করা হয়।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, সরাসরি মদকেই অভিসম্পাত করা হয়।

কোনো কোন বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা অভিসম্পাত করেন মদ ও মদপানকারীকে ...”।

কেউ দুনিয়াতে মদ পান করে থাকলে আখিরাতে সে আর মদ পান করতে পারবে না। যদিও সে জান্নাতী হোক না কেন। যদি না সে দুনিয়াতে তা থেকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট খাঁটি তাওবা করে নেয়। কারণ, আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ شَرِبَ الْـخَمْرَ فِيْ الدُّنْيَا لَمْ يَشْرَبْهَا فِيْ الْآخِرَةِ إِلاَّ أَنْ يَّتُوْبَ، وَفِيْ رِوَايَةِ الْبَيْهَقِيْ: وَإِنْ أُدْخِلَ الْـجَنَّةَ»

“যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করলো সে আর আখিরাতে মদ পান করতে পারবে না; যদি না সে দুনিয়াতে তা থেকে খাঁটি তাওবা করে নেয়। ইমাম বায়হাক্বীর বর্ণনায় রয়েছে, যদিও তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়”।

চলবে…………


33

৫ টি নৈতিক মূল্যবোধ যা শিশুদের অবশ্যই শেখানো উচিত

শিশুদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গেঁথে দেওয়ার উপায়

আমাদের দায়িত্ব কেবলমাত্র একটি শিশুর শারীরিক বিকাশের যত্ন নেওয়া নয় – শিশুর মানসিক বৃদ্ধি উন্নত করার ক্ষেত্রে সুষ্ঠ ভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যা শিশুদের চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে এবং শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে, জীবনে সে কি রকম মানুষ হয়ে উঠবে তার উপর সর্বাধিক প্রভাব ফেলে।

কিছু লোক যুক্তি দেয় যে শিশুরা নিজেরাই নৈতিকতা শেখে, বা প্রি-স্কুলার শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ এবং ধারণা শেখার পক্ষে বেশিই তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ভুল; অল্প বয়সেই শিশুদের মূল্যবোধ শেখানো ভাল, যাতে তারা বড় হওয়ার সাথে সাথে সেগুলি তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে যায়।

আসুন এমন পাঁচটি নৈতিক মূল্যবোধ দেখে নেওয়া যাক যা প্রত্যেক দায়িত্বশীল তাদের শিশুদেরকে শেখাতে হবে।

১. আপনি যা উপদেশ দেন তা অনুশীলন করুন

শিশুরা আশেপাশের লোকদের কাছ থেকে শেখে, তাই শিশুদের ভালো মূল্যবোধ শেখানোর জন্য আপনাকে প্রথমে সেগুলিকে আপনার নিজের জীবনে মডেল করতে হবে। আপনি মৌখিকভাবে অসংখ্য মূল্যবোধ ব্যাখ্যা করতে পারেন, তবে শিশুরা কেবলমাত্র সেগুলিই বেছে নেবে যেগুলি আপনি আপনার নিজের আচরণের মাধ্যমে দেখাবেন।


২. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করুন

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গল্পের মতো হয় এবং সমস্ত শিশুরা গল্প শুনতে পছন্দ করে। আপনার নিজের জীবন থেকে গল্প শিশুদের সাথে শেয়ার করুন, যেখানে নৈতিক মূল্যবোধ মেনে চলার ফলে আপনার জীবনে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়েছিল এবং এইভাবে শিশু আরও ভালভাবে বুঝতে বাধ্য।

৩. ভাল আচরণের পুরস্কার দিন

এমন একটি সিস্টেম নিয়ে আসুন, যেখানে আপনি শিশুকে তার জীবনে এই মূল্যবোধগুলি ব্যবহার করার জন্য পুরস্কৃত করবেন। প্রশংসা এবং পুরস্কার হল ইতিবাচক শক্তিবৃদ্ধি যা শিশুদের গঠনে অবিশ্বাস্য ভাবে ভাল কাজ করে।

৪. কার্যকরভাবে কথাবার্তা বলুন

এই নৈতিক মূল্যবোধগুলি কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে কাজ করে তা সম্পর্কে আপনি শিশুর সাথে প্রতি দিনই কথোপকথন করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি খবরের কাগজের একটি নিবন্ধ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন এবং আপনি শিশুদেরকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে সে এই একই পরিস্থিতিতে কী করত।

৫. টেলিভিশন এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার নিরীক্ষণ করুন

টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট থেকে কোনভাবেই রেহাই পাওয়া যায় না, তবে শিশু যা দেখছে তা আপনি অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। নিশ্চিত হয়ে নিন যে শো-টি ভাল মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রচার করে এবং তার বয়সের জন্য উপযুক্ত হয়।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের কবুল করে নিন আমরা যেন আমাদের শিশুদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গেঁথে দিতে পারি। আমীন!

34

শিশুদের জন্য কিছু উপদেশ

প্রতিদিনের জন্য একটি রুটিন তৈরি করে ফেলুন। যতটা সম্ভব সেই রুটিনে রাখার চেষ্টা করলে সুফল মিলবে। বিশেষ করে খাওয়া ও ঘুমানোর সময়টা। মাঝে মাঝে তো একটু পরিবর্তন আসবেই। ক্লান্তি, সময়মতো না ঘুমানো ও খিদে শিশুদের খিটখিটে করে তোলে। রুটিন মাফিক ঘুম আর খাওয়া হলে অনেকাংশেই সেটা কমে আসবে।

কারণটা বোঝার চেষ্টা

ঘুম, খিদে বাদ দিয়ে শিশুর পেছনে আর কোনো কারণ আছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। ডায়াপার ভারী হয়ে থাকা, পেটব্যথা অথবা শারীরিক কোনো সমস্যার কারণেও শিশু কাঁদতে পারে। কিন্তু কোনো একটা জিনিস চাইছে, সেটা তাকে দেওয়া হচ্ছে না—কান্নার কারণ যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে কিছুক্ষণ কাঁদলেও ক্ষতি নেই। বরং এতে পরবর্তী সময়ে সে বুঝবে, কাঁদলেই সব জিনিস তাকে দেওয়া হবে না।

ভালো কাজে প্রশংসা

যত ছোটই হোক না কেন, প্রশংসা করলে সবাই বোঝে। শিশু ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করুন। জড়িয়ে ধরুন। আপনার কথামতো কোনো কাজ করলে আপনি যে খুশি হয়েছেন, সেটা তাকে বোঝান হাত তালি দিয়ে।

কর্তৃত্ব ফলানো

ছোট ছোট বিষয়ের ওপর তার মতামত নিন। যদিও সে হয়তো অনেক কিছুই বুঝতে পারবে না। কোন জামাটা পরতে চাও? কোন জুস খাবে? এখন কী করতে চাও? তাকেও যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এটা ভেবেই কিছুক্ষণ শান্ত থাকবে।

অন্যদিকে মন নেওয়া

মাঝে মাঝে কোনোভাবেই শিশু শান্ত হতে চায় না। হতাশ না হয়ে চেষ্টা করতে হবে তার মন অন্যদিকে ফেরানো যায় কি না। বাইরে নিয়ে যান প্রয়োজনে।

ক্লান্ত হয়ে থাকলে

শিশু ক্লান্ত হয়ে থাকলে ওকে আরামদায়ক পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করুন। শিশু ক্লান্ত থাকলে সেই মুহূর্তে তাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, দোকানে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা থাকলে বাদ দিন।

শান্ত থাকুন

শিশুদের কান্না থামানো খুবই কঠিন কাজ। আর কিছু না হোক, দরকার পাহাড়–পর্বতসমান ধৈর্য। তাই শিশু যখন অস্থির থাকবে, আপনাকে তখন সুস্থির থাকতে হবে। মাথা গরম করে ফেললেই কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যাবে!

মনোযোগ দিন

বেচারা ছোট মানুষটা অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে। আপনি হয়তো ফিরেও তাকাচ্ছেন না। আর পায় কে! কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল চিৎকার–চেঁচামেচি। অনেক সময় শিশুদের প্রতি মনোযোগ না দেওয়াও তাদের একটি কারণ হয়ে থাকে। মনোযোগ দিয়ে তার কথা না শোনা, উত্তর না দেওয়াও তার খারাপের একটি কারণ। তাই তার প্রতি মনোযোগ দিন, সমাধান মিলবে।

‘হ্যাঁ’ বলুন

শিশু কিছু করতে চাইলেই তাকে ‘না’ বলবেন না। ক্ষতি হবে না, এমন কাজ করতে দিন। এর মধ্যে দিয়েই সে অনেক কিছু শিখবে। খেতে বসলে যতই খাবার ছড়াক না কেন, নিজ হাতে খেতে উত্সাহ দিন। সব সময় ‘না’ শুনতে শুনতে তারও হয়তো ‘না’ শব্দটির প্রতি ভালোবাসা জন্মে যাবে! একান্তই যদি কোনো বিষয়ে ‘না’ বলতে হয়, বুঝিয়ে বলুন কেন সেটি করা যাবে না। বেশির ভাগ সময় ‘না’ শুনলে তারা বিষয়টি আরও বেশি করে করতে চায়। আমরা যেন আমাদের শিশুদের আদর্শবান সুশিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে পারি। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন!



35

শুদ্ধাচার ও শিষ্টাচার মানবজীবনের অলংকার


শুদ্ধাচার ও শিষ্টাচার মানবজীবনের অলংকার। শুদ্ধাচার বেশ রাশভারী একটি শব্দ। শুদ্ধ ও আচার শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি শুদ্ধাচার শব্দের। এর অর্থ চরিত্রনিষ্ঠা। সাধারণত ‘নৈতিকতা ও সততা’ দ্বারা প্রভাবিত আচরণ ও উৎকর্ষ সাধনকে শুদ্ধাচার বলা হয়। শুদ্ধ বলতে সহজ ভাষায় বুঝি পবিত্র, সাধু, খাঁটি, পরিষ্কার, শোধিত, নিষ্কলুষ, নিষ্কণ্টক, নির্ভুল ও নির্দোষ ইত্যাদি। একজন মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য যখন সমাজ এই অভিধাগুলোর ব্যবহার ও প্রয়োগ করে, তখনই সেই মানুষ ‘শুদ্ধ মানুষ’ হিসেবে গণ্য হন। এ জন্য সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর, নৈতিক আদর্শকে চরিত্রে ধারণ ও বাস্তবে রূপায়ণ করতে হয়। ব্যক্তি ও পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জীবন ধারণের জন্য ভালো আচরণ, ভালো রীতিনীতি, ভালো অভ্যাস রপ্ত ও পরিপালন করা অত্যাবশ্যক।

শুদ্ধাচারের বিপরীত গর্ব, অহমিকা, দুরাচার কলঙ্ক ও অন্ধকার। এর সবগুলোই মানুষের মন্দ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত। এ প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা আমল করে নাও এসবের আগেই। ওই দারিদ্র্য, যা আত্মবিস্মৃৃত করে দেয়, ওই প্রাচুর্য যা দাম্ভিক করে তোলে, ওই রোগব্যাধি যা জরাগ্রস্ত করে ফেলে, ওই বার্ধক্য যা বুদ্ধিহীন করে ছাড়ে।(’সুনানে তিরমিজি: ২৩০৬)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসের মূল্যায়ন করো। যৌবনকে বার্ধক্যের আগে, অবসরকে ব্যস্ততার আগে, সময়কে সময় চলে যাওয়ার আগে, সুস্থতাকে অসুস্থতার আগে, জীবনকে মৃত্যুর আগে।(’সুনানে তিরমিজি ও আবু দাউদ)

শুদ্ধাচার দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদন্ড, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য বোঝানো হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে শুদ্ধাচারের অর্থ হলো কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেবা খাতে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নমুখী আলোচনা হচ্ছে। বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, অসাধুতা ও অনৈতিকতার চর্চারোধে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমনে শুদ্ধাচার প্রতিপালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেবা খাত। শৃঙ্খলা, সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া উন্নয়নের আশা করা বৃথা। শুদ্ধাচারের চর্চা না থাকলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি সহসাই বাসা বাঁধে। ফলে সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া চরম হুমকির মধ্যে পড়ে।

বিবেকবোধই হলো নৈতিকতার ‘উৎস’। বিবেকও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাহীন। তবে বিবেক বলতে নিজের জন্য যা প্রত্যাশা, তা অন্যের জন্যও চাওয়া। বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হয়ে ভালো কাজ করতে, সৎপথে চলতে মানুষ উৎসাহিত হয়। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ, পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ঠ জিনিসটি পেতে চায়। বর্ণ, রং, উচ্চতা, চিন্তাশক্তি, আকৃতি, গঠনভেদে মানুষ আলাদা হলেও সব মানুষের চাওয়া অভিন্ন। মন্দ জিনিসটি নিজের জন্য নিতে চায় না, সবাই ভালোটি পেতে চায়। কেউ চায় না তার সঙ্গে কেউ দুর্ব্যবহার করুক কিংবা কেউ তার ক্ষতি করুক। নৈতিকতা হলো মানুষের মনের এই নিরন্তর চাওয়া-পাওয়ার নীতি। নৈতিকতার চর্চা আমাদের অন্যের প্রতি যত্নশীল, সহমর্মী, দয়ালু ও অন্যের অধিকার বজায় রাখার ও অন্যের ক্ষতি হতে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। প্রেরণা যোগায় সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজ করার।

নৈতিকতা থেকে উৎসারিত হয় সৎসাহস, দেশপ্রেম সত্যবাদিতা ও দৃঢ় প্রত্যয়। যা একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং শুদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম শর্ত। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তির সমষ্টিতে যেমন প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়। তেমনি ব্যক্তির সম্মিলিত লক্ষ্যই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষের নৈতিকতা শিক্ষা শুরু হয় পরিবারে এবং শুদ্ধাচার অনুসরণের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নৈতিক জীবন গঠনে যার গুরুত্ব অপরিসীম। তৃতীয় ধাপে রয়েছে তার কর্মস্থল। শুদ্ধাচার নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক চর্চার ওপর। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে ইসলামসহ প্রত্যেক ধর্মেই নির্দেশনা রয়েছে।

ইসলামি স্কলারদের মতে, আত্মপর্যালোচনা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শুদ্ধাচারের যথাযথ চর্চা সম্ভব। কোরআনে কারিমে শুদ্ধাচার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করো এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।(’সুরা আলে ইমরান: ১০২)

কোরআনে কারিমের অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি শুদ্ধাচার করেছে সেই সফল, আর যে নিজেকে কলুষিত করেছে সে ব্যর্থ মনোরথ হয়েছে।’

উল্লিখিত আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, পরকালে মুক্তির জন্য শুধু বাহ্যিক আমল যথেষ্ট নয়, বরং শুদ্ধাচার জরুরি। তাই নবী করিম (সা.) নিজের অন্তরকে ঠিক করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অন্তরের শুদ্ধতা করে নৈতিকতা শিক্ষার পূর্ব শর্ত। সততা ও নৈতিকতা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষই মূল শুদ্ধাচার। শুদ্ধাচার ছাড়া সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর শুদ্ধাচার অর্জনে ধর্মচর্চা ও নৈতিকতা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।


36

ইয়াসরিবের অধিবাসীরা

বুয়াস নামে এক মরুদ্যান ছিল ইয়াসরিবে। ইয়াসরিবের লোকেরা শহরের বাইরে প্রায় এ মরুদ্যানে গিয়ে আরাম করত। মেষপালক আর রাখালেরা তাদের পশুদের এখানে ছেড়ে দিয়ে বিশ্রাম নিত।

কিন্তু এ বুয়াসেই ঘটে যায় এক বিরাট কান্ড! আজ থেকে অনেক অনেক বছর পূর্বের ঘটনা। ৬১৭ সালের ঘটনা। চৌদ্দশত বছরেরও আগের কথা। সে সময় ইয়াসরিবে আওস ও খাজরাজ নামে বড়ো বড়ো দুটি আরব গোত্র ছিল। এ ছাড়া ইহুদিদের তিনটি গোত্রও সেখানে বসবাস করত। গোত্র তিনটি হলো-বনু কুরায়জা, বনু নাজির ও বনু কায়নুকা। এরা ছিল ভীষণ দুষ্ট।

এরা সুদের টাকার ব্যাবসা করত। কিছু টাকা ধার দিয়ে তার বিনিময়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা আদায় করত। এভাবে দুষ্ট ইহুদিরা ইয়াসরিবের আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকদের বোকা বানিয়ে ফায়দা লুটত।

তিনটি ইহুদি গোত্র বন্ধুত্ব করতে আওস ও খাজরাজ গোত্র দুটিকে ভাগ করে নিয়েছিল। বনু কুরায়জা ও বনু নাজির ছিল আওস গোত্রের বন্ধু, আর বনু কাইনুকা ছিল খাজরাজ গোত্রের বন্ধু।

এই ইহুদিরা সব সময় আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে মারামারি, হানাহানি লাগিয়ে রাখত। কোনো ঠুনকো ঘটনা বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। মারা যেত শত শত লোক। ধন-সম্পদ শেষ হতে থাকত। আরো গরিব হয়ে যেত আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা।

অন্যদিকে, ইহুদিদের ফায়দা হতো অনেক। তারা টাকা ধার দিত যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে। অনেক অনেক টাকা ধার! সে ধারের টাকায় অনেক লাভ নিত।

ইহুদিরা ভালো অস্ত্র বানাত। যুদ্ধ না থাকলে অস্ত্র কিনবে কারা? এসব অস্ত্র দুই পক্ষের কাছেই বিক্রয় করত। এভাবে দুর্বল ইয়াসরিববাসীরা সংখ্যায় অনেক বেশি হয়েও ইহুদিদের অধীনে থাকত সব সময়।

হঠাৎ একদিন শান্ত বুয়াসেই যুদ্ধ লেগে যায়। আওস ও খাজরাজ গোত্র একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধ ভয়ংকর রুপ নেয়। খাজরাজ ছিল আওসের চেয়ে বড়ো গোত্র।
তারা তীব্র আক্রমণ চালিয়ে আওস গোত্রকে পরাজিত করে। আওস গোত্রের নেতা হুদাইরকে হত্যা করে।

আওস গোত্রও দমবার পাত্র নয়। তারা তাদের নেতা হত্যার বদলা নিতে উঠেপড়ে লাগে। তারা কয়েকটি বেদুইন গোত্রের সহায়তা নেয়। আবার যুদ্ধ শুরু হয়। এবার আওস গোত্রের প্রচণ্ড আক্রমণে খাজরাজ বাহিনী লন্ডভন্ড হয়ে যায়। তাদের অনেক যোদ্ধা মারা যায়।

যুদ্ধ আর শেষ হতে চায় না। খাজরাজ বাহিনীও পালটা আক্রমণ করে। এভাবে একাধারে পাঁচ বছর যুদ্ধ চলতে থাকে। তারপরও যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। আওস ও খাজরাজ গোত্র এভাবে সব সময় যুদ্ধে লেগে থাকত। একই জাতি হয়েও ওরা ছিল চিরশত্রু। যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ চলত। একবারের যুদ্ধ তো একশত বিশ বছর পর্যন্ত চলেছিল!

এদিকে মক্কায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়। একসময় আওস ও খাজরাজ উভয় গোত্রের একদল লোক ইসলাম গ্রহণ করে। তারা নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইয়াসরিবে আসার জন্য অনুরোধ করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে মক্কা থেকে ইয়াসরিবে হিজরত করেন।

আর তখন থেকেই ইয়াসরিবের নাম হয়ে যায় মদিনাতুন্নবি বা নবির শহর; সংক্ষেপে মদিনা। আল্লাহর নবি মদিনায় এসে তাদের সবার সাথে মিলমিশ করে দেন। তাদের সবাইকে নিয়ে একটা সনদ রচনা করেন। সবাই সেই সনদ মেনে চলে। মারামারি-শত্রুতা ভুলে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যায়। এ সময় চরম শত্রু আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরাও একে অপরের পরম বন্ধু ও ভাই হয়ে যায়। ইসলামের কল্যাণের যুদ্ধবাজ এ জাতিগুলো শান্তির পথে চলে আসে।

এভাবে আল্লাহ তায়ালা তাদের এক করে দিয়ে, শত্রুতা ভুলিয়ে, ভাই-ভাই বানিয়ে কতই না অনুগ্রহ করেছেন! তাদের দুনিয়ায় ও আখিরাতে ধ্বংস হওয়া থেকে তিনিই তো রক্ষা করেছেন! তাদের এ অবস্থার কথাই স্বরণ করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-

وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا وَّلَا تَفَرَّقُوْا ۖوَاذْكُرُوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ عَلَيْكُمْ اِذْ كُنْتُمْ اَعْدَاۤءً فَاَلَّفَ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهٖٓ اِخْوَانًاۚ وَكُنْتُمْ عَلٰى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنْقَذَكُمْ مِّنْهَا ۗ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللّٰهُ لَكُمْ اٰيٰتِهٖ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ

‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশ্মিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো এবং কখনো পরস্পর আলাদা হয়ে যেয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্বরণ করো, যখন তোমরা ছিলে একে অপরের দুশমন। অতঃপর, আল্লাহ তোমাদের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিলেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা একে অপরের ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের শেষ সীমানায়, আল্লাহ সেখান থেকে তোমাদের উদ্ধার করেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্ট করে বলে দেন, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পারো।’ {সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত ১০৩}


37

মৃত্যুপুরীতে একশো বছর

হাজার হাজার বছর আগের ঘটনা।

আল্লাহর এক প্রিয় বান্দা সফরে বের হলেন। সাথে কিছু খাবার ও পান করার জন্য মশকভর্তি পানি নিলেন। মশক হলো পানি বহনের চামড়ার ব্যাগ। সঙ্গে ছিল তার প্রিয় গাধাটি। গাধায় চড়ে তিনি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঘুরতে ঘুরতে একটি এলাকায় এসে থমকে দাঁড়ালেন।

এলাকাটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাড়িঘর, রাস্তা-ঘাট, দোকান-পাট সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। কোনো মানুষজন নেই। এখানে-ওখানে মৃত মানুষের হাড়গোড়, কঙ্কাল ছড়িয়ে -ছিটিয়ে পড়ে আছে। লোকটি অবাক হয়ে গেলেন। বললেন-’এই মৃত জনপদটিকে আল্লাহ তায়ালা কিভাবে আবার জীবিত করবেন?’

আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই প্রিয় বান্দার কথা শুনলেন। তিনি লোকটিকে সাথে সাথে দেখাতে চাইলেন, আল্লাহ তায়ালা কীভাবে কোনো মৃতকে পুনরায় জীবিত করতে পারেন। তিনি তো সব মানুষকে একদিন জীবিত করেই হাশরের ময়দানে তুলবেন। তাই তিনি দুনিয়াতেই এর একটি নজির দেখাতে চাইলেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে সবকিছুই সম্ভব।

আল্লাহ তায়ালা সাথে সাথেই লোকটিকে মৃত্যু দান করলেন। সাথের গাধাটিও মারা গেল। এভাবে অনেক দিন কেটে গেল। দিন গিয়ে মাস শেষ হলো। বছর শেষ হলো। বছরের পর বছর চলে গেল।

লোকটি তখনও মৃত পড়ে রইলেন। গাধাটিও তেমনি পড়ে রইল।

এভাবে একশো বছর চলে গেল। আলমে বারজাখে অর্থাৎ কবরের জগতে একশো বছর কেটে গেল। তোমরা যাকে মৃত্যুপুরী বলে থাকো।

এরপর লোকটিকে আল্লাহ তায়ালা আবার জীবিত করলেন। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত না? হ্যা, আল্লাহ তায়ালা সবকিছুই করতে পারেন। তিনি কতভাবে মানুষের জন্য তাঁর কুদরত দেখান! লোকটি জীবন পেয়ে উঠে বসল।

আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন-’ তুমি কতকাল এখানে আছো?’ লোকটি বলল-’এই তো একদিন বা তার চেয়ে কিছু কম সময়। আমি একটু বিশ্রাম নিয়েছিলাম মাত্র, ঘুম ভাঙল কেবল।’ আল্লাহ বললেন-’না না, তুমি তো একশো বছর এখানে অবস্থান করেছ।’ লোকটি হতবাক হয়ে গেল!

কী মহিমা! আল্লাহ তায়ালা লোকটির খাবার-দাবার একদম ঠিকঠিক আগের মতোই রেখে দিয়েছিলেন।

আল্লাহ বললেন-’ তোমার খাবার-দাবার, পানীয়, জিনিসপত্রগুলোর দিকে দেখ তো একটু, এগুলো সব ঠিক আগের মতোই আছে।’

এসব দেখে লোকটির বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল যে, সে কি সত্যিই একশো বছর এখানে ছিল? তখন আল্লাহ বললেন-’দেখ তো তোমার গাধাটির দিকে।’ এবার লোকটি তার গাধাকে আর খুঁজে পেল না, তবে শুকনো কয়েকটি হাড় পড়ে থাকতে দেখল।

আল্লাহ তায়ালা বললেন- ‘ এবার দেখ তাহলে, কিভাবে আমি এই গাধাটির হাড়গুলো একটার সাথে অন্যটি জুড়ে দিই এবং তার ওপর গোশত ও চামড়া দিয়ে ঢেকে দিই।’
লোকটি অবাক হয়ে দেখতে লাগল, পড়ে থাকা হাড়গুলো ধীরে ধীরে এক হয়ে মিলে যাচ্ছে। তারপর গাধার গোশত লেগে যাচ্ছে, চামড়া লেগে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে একটি সুন্দর গাধায় রুপ নিল। তার গাধা যেমনটি ছিল, ঠিক অবিকল সেই গাধাই উঠে এলো। গাধাটি এবার ডেকে উঠল।

আল্লাহ বললেন-’আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য নিদর্শন বানাব। সাবাই তোমার এ ঘটনা থেকে শিক্ষা পাবে।’

লোকটি তাজ্জব বনে গিয়ে বলে উঠল-’ সুবহানাল্লাহ! আমি তো জানিই, আল্লাহ সবকিছু করতে পারেন, সব ধরনের ক্ষমতা রাখেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশক্তিমান।’

এ ঘটনাটি তোমরা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াত পড়লে জানতে পারবে।

أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَىٰ قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّىٰ يُحْيِي هَـٰذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا ۖ فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ ۖ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ۖ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ۖ قَالَ بَل لَّبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانظُرْ إِلَىٰ طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهْ ۖ وَانظُرْ إِلَىٰ حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِّلنَّاسِ ۖ وَانظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا ۚ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থঃ তুমি কি সে লোককে দেখনি যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যার বাড়ীঘরগুলো ভেঙ্গে ছাদের উপর পড়ে ছিল? বলল, কেমন করে আল্লাহ মরনের পর একে জীবিত করবেন? অতঃপর আল্লাহ তাকে মৃত অবস্থায় রাখলেন একশ বছর। তারপর তাকে উঠালেন। বললেন, কত কাল এভাবে ছিলে? বলল আমি ছিলাম, একদিন কিংবা একদিনের কিছু কম সময়। বললেন, তা নয়; বরং তুমি তো একশ বছর ছিলে। এবার চেয়ে দেখ নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে-সেগুলো পচে যায় নি এবং দেখ নিজের গাধাটির দিকে। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখ যে, আমি এগুলোকে কেমন করে জুড়ে দেই এবং সেগুলোর উপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দেই। অতঃপর যখন তার উপর এ অবস্থা প্রকাশিত হল, তখন বলে উঠল-আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। (সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াত)


38

কারুনের ধন-সম্পদ

কারুন ছিল মস্ত বড়ো এক ধনী লোক। তার সময়ে সবচেয়ে বড়ো ধনী ছিল সে। কারুনের ধন-সম্পদ যেসব ঘরে ও সিন্দুকে রাখা হতো, সেসব ঘর আর সিন্দুকের চাবি বহন করতে সত্তরজনেরও বেশি শক্তিশালী লোকের প্রয়োজন হতো। তাহলে টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ জমা করে রাখার জন্য কারুনের কত হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সিন্দুক থাকতে পারে-তা কি কল্পনা করা যায়?

কারুন ছিল ইসরাইল বংশীয়দের একজন। সে ছিল আল্লাহর প্রিয়নবি মুসা আলাইহিস সালামের চাচাতো ভাই। ধন-সম্পদের মোহে সে হয়ে উঠেছিল চরম অহংকারী ও অবাধ্য। আর ছিল একদম হাড়কিপটে। এক কানি পয়সাও কাউকে সে দান করতে চাইত না। কেউ কিছু চাইতে এলে ধাক্কা দিয়ে প্রাসাদ থেকে বের করে দিত।

কারুনের এ অবস্থা তার বংশের সবাইকে ভাবিয়ে তুলল। কিভাবে তাকে ভালো পথে আনা যায়, কিভাবে ভালো মানুষ করা যায়? ভাবতে লাগল সবাই।

একদিন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও বনি ইসরাইলের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাকে নসিহত করতে গেলেন। তারা বললেন-’হে কারুন! তুমি এমন গর্ব-অহংকার করো না। কারণ, আল্লাহ অহংকারকারীদের একদম পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যে ধন-সম্পদ দান করেছেন, তা দিয়ে তুমি আখিরাতের জন্য স্থায়ী ঘর বানানোর চেষ্টা করো। তোমার প্রতি আল্লাহ যেমন অনুগ্রহ করেছেন, তেমনি তুমিও মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো। দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না।’

কিন্তু কারুন তার অহংকারকে চরমভাবে প্রকাশ করল। সে বলল-’এ সম্পদ তো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে অর্জন করেছি। এখানে আল্লাহর অনুগ্রহের কী আছে???!

আল্লাহ তায়ালা যে কারুনকে জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়েছেন, তাকে সৌভাগ্য দান করেছেন, বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে তার সম্পদকে রক্ষা করেছেন-এ সবকিছুই সে বেমালুম ভুলে গেল।

কারুন অহংকারে অন্ধ হয়ে আল্লাহর ক্ষমতার কথা একদম ভুলে গিয়েছিল। শুধু গর্ব, অহংকার ও পাপাচারের কারণে আল্লাহ তায়ালা এর আগেও কারুনের চেয়ে অনেক সম্পদশালী, শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর জাতিকে নিমিষেই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

এদিকে কারুনের অহংকার দিনে দিনে বেড়ে যেতে লাগল। সে সবাইকে অবজ্ঞা করতে লাগল। একদিন সে খুব জাঁকজমকের সাথে তার বিশাল লাটবহর নিয়ে জাতির সামনে এক চোখ ধাঁধানো শোভাযাত্রা বের করল। সে যে খুব ধনী এবং কাউকে যে সে পরওয়া করে না, তা দেখানোর জন্যই এমন করল।

খুব অবাক চোখে লোকেরা দেখতে লাগল। যারা দুনিয়ার জীবনে ধন-সম্পদের জন্য লালায়িত ছিল, তারা বলাবলি করতে লাগল-’ইস! কত সৌভাগ্যবান কারুন! কত বড়ো ধনী সে! আহ! আমরাও যদি কারুনের মতো ধনী হতে পারতাম!’

কিন্তু যারা ভালো লোক ছিল, তারা এসব লোকদের বলতে লাগল-’হায়! তোমাদের  মনের এমন অবস্থা দেখে খুব আফসোস হয়! যে ঈমান আনে এবং ভালো কাজ করে, তার জন্য তো আল্লাহর কাছে মহা পুরুস্কার রয়েছে; এগুলো তো সবই ঠুনকো জিনিস।’

কারুনের বহর সমস্ত রাজপথ ঘুরতে লাগল। তার হাবভাব যেন রাজ-রাজাদেরও হার মানায়। অহংকারে গদগদ হয়ে চলতে চলতে সমস্ত বহর নিয়ে সে তার ভবনে প্রবেশ করল। খুব পরিতৃপ্তির সাথে ঘুমাতে গেল।

কী আশ্চর্য! ভোর হতে না হতেই কারুনের পুরো আস্তানা, বিশাল বিশাল প্রাসাদ আর সমস্ত সম্পদ মাটির নিচে তলিয়ে যেতে লাগল। এমনকী কারুনও তলিয়ে যেতে লাগল! ভয়ে-আতঙ্কে কারুন চিৎকার করে বলতে লাগল-’ বাঁচাও বাঁচাও।’

তার চিৎকারে কেউ-ই একটুও এগিয়ে এলো না। ভয়ে সবাই পালাতে লাগল। দেখতে দেখতে সে মাটির নিচে তলিয়ে গেল। তার সমস্ত ধন-সম্পদও তলিয়ে গেল। চিরতরেই মাটিতে বিলীন হয়ে গেল। আল্লাহ তায়ালার মোকাবিলায় সে কিছুই করতে পারল না, কোনো সাহায্যকারীও পেল না।

আগের দিন কারুনের শান-শওকত দেখে যারা লোভ করেছিল, এবার তাদের ভুল ভাংল। তারা বলতে লাগল-’ আফসোস! আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তার রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে যান তার রিজিক কমিয়ে দেন। যদি আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি দয়া না করতেন, তাহলে আমাদেরও মাটিতে পুঁতে ফেলতেন।’

আসলে প্রকৃত সফলতা তো পরকালের সফলতা। তারাই সেখানে সফল হয়, যারা আল্লাহর পথে চলে, দুনিয়ায় বড়াই করে না, অহংকার দেখিয়ে চলে না এবং মারামারি-হানাহানি করে না। এরাই মুত্তাকি। এদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার।

সূরা আল কাসাসের ৭৬ থেকে ৮৩ নম্বর আয়াত পড়লে তোমরা সরাসরি কুরআনের মধ্যেই এ ঘটনা খুঁজে পাবে।

 إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِن قَوْمِ مُوسَىٰ فَبَغَىٰ عَلَيْهِمْ ۖ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَىٰ عِلْمٍ عِندِي ۚ أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِن قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا ۚ وَلَا يُسْأَلُ عَن ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ ۖ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ ۖ لَوْلَا أَن مَّنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا ۖ وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

 
৭৬) একথা সত্য , কারূণ ছিল মূসার সম্প্রদায়ের লোক, তারপর সে নিজের সম্প্রদায়ে বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলো৷ আর আমি তাকে এতটা ধনরত্ন দিয়ে রেখেছিলাম যে, তাদের চাবিগুলো বলবান লোকদের একটি দল বড় কষ্টে বহন করতে পারতো৷ একবার যখন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে বললো, “অহংকার করো না, আল্লাহ অহংকারকারীদেরকে পছন্দ করেন না ৷

৭৭) আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে আখেরাতের ঘর তৈরি করার কথা চিন্তা করো এবং দুনিয়া থেকেও নিজের অংশ ভুলে যেয়ো না৷ অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেস্টা করো না৷ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না ৷”

৭৮) এতে সে বললো, “এসব কিছু তো আমি যে জ্ঞান লাভ করেছি তার ভিত্তিতে আমাকে দেয়া হয়েছে৷” –সে কি এ কথা জানতো না যে, আল্লাহ এর পূর্বে এমন বহু লোককে ধ্বংস করে দিয়েছেন যারা এর চেয়ে বেশী বাহুবল ও জনবলের অধিকারী ছিল? অপরাধীদেরকে তো তাদের গোনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় না ৷

৭৯) একদিন সে সম্প্রদায়ের সামনে বের হলো পূর্ণ জাঁকজমক সহকারে৷ যারা দুনিয়ার জীবনের ঐশ্বর্যের জন্য লালায়িত ছিল তারা তাকে দেখে বললো, “আহা! কারূনকে যা দেয়া হয়েছে তা যদি আমরাও পেতাম! সে তো বড়ই সৌভাগ্যবান ৷”

৮০) কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলতে লাগলো, “তোমাদের ভাবগতিক দেখে আফসোস হয়৷ আল্লাহর সওয়াব তার জন্য ভালো যে ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আর এ সম্পদ সবরকারীরা ছাড়া আর কেউ লাভ করে না ৷”

৮১) শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ও তার গৃহকে ভূগর্ভে পুতে ফেললাম৷ তখন আল্লাহর মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার মতো সাহায্যকারীদের কোন দল ছিল না এবং সে নিজেও নিজেকে সাহায্য করতে পারলো না ৷

৮২) যারা আগের দিন তার মতো মর্যাদালাভের আকাংখা পোষণ করছিল তারা বলতে লাগলো, “আফসোস, আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তার রিযিক প্রসারিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা তাকে সীমিত রিযিক দেন৷ যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করতেন, তাহলে আমাদেরও ভূগর্ভে পুতে ফেলতেন৷ আফসোস, আমাদের মনে ছিল না, কাফেররা সফলকাম হয় না”

৮৩) সে আখেরাতের গৃহ তো আমি তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেবো যারা পৃথিবীতে নিজেদের বড়াই চায় না এবং চায় না বিপর্যয় সৃষ্টি করতে৷ আর শুভ পরিণাম রয়েছে মুত্তাকীদের জন্যই ৷ (সূরা আল কাসাসের ৭৬ থেকে ৮৩ নম্বর আয়াত)


39

গুহাবাসী যুবকেরা

অনেক অনেক বছর আগের কথা। তখন রোম দেশের তয়তুস শহরে দাকিয়ানুস নামে এক অত্যাচারী শাসক ছিল। সময়টা ছিল ঈসা (আঃ)-এর আগমনের কিছুকাল পরের। দাকিয়ানুস ছিল একজন মূর্তিপূজক। এক আল্লাহর প্রতি ইমানদার কাউকে পেলেই সে চরম নির্যাতন করত; এমনকি হত্যাও করত!

কয়েকজন সাহসী যুবক দাকিয়ানুসের এমন অত্যাচারের তীব্র বিরোধিতা করে জনগণের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকে।

যুবকদের কথা দাকিয়ানুসের কানে যায়। এতে সে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে যুবকদের নিকট খবর পাঠায়-’হয় তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ছাড়বে, নাহয় আমি তোমাদের হত্যা করব।’

যুবকরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনায় অটল থাকে এবং লোকালয় থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে।

যুবকরা চুপি চুপি লোকালয় থেকে পালিয়ে গিয়ে পাহাড়ের একটি বিশাল গুহায় আশ্রয় নেয়। তাদের পিছু পিছু একটি কুকুরও আসে। কুকুরটিও তাদের সাথে গুহায় আশ্রয় নেয়।

এদিকে যুবকদের পালিয়ে যাওয়ার কথা জেনে দাকিয়ানুস তাদের ধরার জন্য একদল সৈন্য পাঠায়। সৈন্যরা অনেক চেষ্টা করেও তাদেরকে আর খুঁজে পায়নি।

গুহায় আশ্রয় নেওয়া যুবকরা ছিলেন সাতজন। সাথে ওই কুকুরটিও ছিল। আল্লাহ তায়ালা কুকুরসহ তাদের সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেন।

গুহার মুখে ঘুমিয়ে ছিল কুকুরটি, দেখে মনে হতো- সে যুবকদের পাহাড়া দিচ্ছে। ভয়ে কেউ গুহায় ঢোকার সাহস পেত না। লোকেরা মতে করত, সফররত কোনো কাফেলা এখানে অবস্থান করছে হয়তো। গুহায় মুখ এমন জায়গায় ছিল যে তাতে কখনো রোদের উত্তাপ লাগত না। এজন্য গুহাটি সব সময় আরামদায়ক ছিল।

যুবকরা ঘুমিয়ে গেল। দিন গিয়ে মাস গড়াল। এক মাস-দুই মাস করে বছর শেষ হলো, তবুও তারা ঘুমিয়ে রইল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কেটে গেল বছরের পর বছর। যুগের পর যুগও চলে গেল। একশত বছর শেষ হলো। দুইশত বছর শেষ হলো। তবু তারা ঘুমিয়ে রইল। কী আশ্চর্য! তখনও তারা জীবিত। ঘুমের মধ্যেই এপাশ ওপাশ করছে, কিন্তু ঘুম ভাঙছে না। শেষ পর্যন্ত তিনশত বছর গত হলো। এবার! এবার তারা জেগে উঠল। কুকুরটিও জেগে গেল। কিন্তু কী আশ্চর্য! তারা ঠিক আগের মতোই ছিল।

যুবকরা একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতে লাগল-’ আমরা কতক্ষণ ধরে এখানে ঘুমিয়ে ছিলাম? তখন তারা নিজেরাই বলাবলি করতে লাগল-’আল্লাহই ভালো জানেন, আসলে আমরা কতদিন ঘুমিয়ে ছিলাম। তবে মনে হয় একদিন বা তার চেয়েও কম সময় এখানে ঘুমিয়ে ছিলাম।’

তাদের খুব খিদে পেল। তাদের কাছে কিছু টাকা ছিল। সেই টাকা থেকে খাবার কেনার জন্য একজনকে বাজারে পাঠাল।

যুবকরা ভেবেছিল-এখনও দাকিয়ানুসের সময়কাল চলছে। এজন্য তারা খুব ভয়ে ভয়ে ছিল। ভাবল, রাজা জানতে পারলে যেকোনো সময় তাদের পাথর মেরে হত্যা করে ফেলবে অথবা তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাই যুবকটিকে তারা খুব সাবধানে, কেউ যেন টের না পায়- এমনভাবে বাজারে গিয়ে কিছু খাবার কিনে আনতে বলল।

বাজারে গিয়ে যুবকটির সবকিছু অচিন মনে হলো। তারপরও সে খাবার কিনল। যেই সে দোকানদারকে মুদ্রা দিলো, দোকানদার অবাক হয়ে বলল-’এ মুদ্রা তুমি কোথায় পেলে? এ তো বহু আগের মুদ্রা, শত শত বছরের পুরোনো মুদ্রা! নিশ্চয় তুমি গুপ্তধন পেয়েছ!’

যুবক বলল-’অসম্ভব! এ আমার নিজের মুদ্রা। দু-তিন দিন আগেই তো আমি এ মুদ্রা দিয়ে কেনাকাটা করেছি। তুমি কী আজগুবি কথা বলছ?’ দেখতে দেখতে সেখানে ভিড় জমে গেল।

সবাই যখন বলল- এটি বহু পুরোনো দিনের মুদ্রা, যুবকটি যখন জানল দাকিয়ানুস নেই, সে কয়েকশত বছর আগেই গত হয়েছে। তখন সে তাদের কাহিনি শুনিয়ে বলল-’আমার সঙ্গী্রা খাবার নিতে পাঠিয়েছেন, তাঁরা এখন গুহায় আছেন। তোমাদের বিশ্বাস না হলে আমার সাথে সেই গুহায় চলো, সেখানে তাদের দেখতে পাবে।’

লোকেরা এ খবর তখনকার বাদশাহকে জানায়। বাদশাহর নাম ছিল বায়জুসিস। তিনি ছিলেন একজন সৎ, ইমানদার ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। তিনি ঘটনা শুনে খুবই অবাক হন। সাথে সাথে তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনী ও দলবলসহ গুহার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

এদিকে গুহায় থাকা যুবকরা ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে মনে করল, দাকিয়ানুস হয়তো তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আমাদেরকে ধরতে আসছে। যুবকরা তখন তাড়াতাড়ি নামাজে দাঁড়িয়ে যান।

বাদশাহ বায়জুসিস তাদের নামাজ পড়তে দেখে অপেক্ষা করতে থাকেন। গুহাবাসীরা নামাজ পড়া শেষ করলে বাদশাহ তাদের সালাম দেন।

গুহাবাসীরা খুব অবাক হয়ে যান। দেখে- এ তো দাকিয়ানুস নয়; অন্য কোনো বাদশাহ! বাদশাহ বায়জুসিস তাঁর পরিচয় দেন।

এবার যুবকরা তাদের কাহিনি শোনান। বাদশাহ তখন তাদের জানান, অত্যাচারী দাকিয়ানুস কয়েকশত বছর আগেই মারা যায়। এখন এ দেশের অধিকাংশ লোকই ঈমানদার। যুবকরা ভীষণ খুশি হন। কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর দরবারে সিজদায়ে লুটিয়ে পড়েন।

কিছুক্ষণের মধ্যে গুহাবাসী এ আশ্চর্য যুবকদের প্রবল ঘুম আসতে থাকে। তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন। এ ঘুমের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা তাদের মৃত্যু ঘটান।

এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির সামনে এক অনুপম নিদর্শন দেখালেন। বস্তুত আল্লাহ তায়ালা সবকিছুই করতে পারেন; তিনি সর্বশক্তিমান।

তোমরা এ ঘটনা সূরা আল কাহাফের ৯ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে পাবে। এ ঘটনার জন্যই এ সূরার নাম রাখা হয় আল কাহাফ বা গুহা।

أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا

আপনি কি ধারণা করেন যে, গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল ?

إِذْ أَوَى الْفِتْيَةُ إِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوا رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

যখন যুবকরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয়গ্রহণ করে তখন দোআ করেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন।

فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا

তখন আমি কয়েক বছরের জন্যে গুহায় তাদের কানের উপর নিদ্রার পর্দা ফেলে দেই।

ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ أَيُّ الْحِزْبَيْنِ أَحْصَى لِمَا لَبِثُوا أَمَدًا

অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে।

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى

আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

وَرَبَطْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَن نَّدْعُوَ مِن دُونِهِ إِلَهًا لَقَدْ قُلْنَا إِذًا شَطَطًا

আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বললঃ আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে।

هَؤُلَاء قَوْمُنَا اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّوْلَا يَأْتُونَ عَلَيْهِم بِسُلْطَانٍ بَيِّنٍ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا

এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চাইতে অধিক গোনাহগার আর কে?

وَإِذِ اعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنشُرْ لَكُمْ رَبُّكُم مِّن رَّحمته ويُهَيِّئْ لَكُم مِّنْ أَمْرِكُم مِّرْفَقًا

তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের এবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয়গ্রহণ কর। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ কর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন।

وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَاوَرُ عَن كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِي فَجْوَةٍ مِّنْهُ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ مَن يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي وَمَن يُضْلِلْ فَلَن تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُّرْشِدًا

তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বামদিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, আপনি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবেন না।

وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ وَكَلْبُهُم بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا

তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংক গ্রস্ত হয়ে পড়তে।

وَكَذَلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءلُوا بَيْنَهُمْ قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالُوا رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ فَابْعَثُوا أَحَدَكُم بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنظُرْ أَيُّهَا أَزْكَى طَعَامًا فَلْيَأْتِكُم بِرِزْقٍ مِّنْهُ وَلْيَتَلَطَّفْ وَلَا يُشْعِرَنَّ بِكُمْ أَحَدًا

আমি এমনি ভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললঃ তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বললঃ একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি। কেউ কেউ বললঃ তোমাদের পালনকর্তাই ভাল জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়।

إِنَّهُمْ إِن يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَن تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا

তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।

وَكَذَلِكَ أَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوا أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَأَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيهَا إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِم بُنْيَانًا رَّبُّهُمْ أَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِم مَّسْجِدًا

এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কেয়ামতে কোন সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বললঃ তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বললঃ আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে মসজিদ নির্মান করব।

سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ قُل رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِم مَّا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاء ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِم مِّنْهُمْ أَحَدًا

অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবেঃ তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে; তারা পাঁচ জন। তাদের ছষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবেঃ তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুনঃ আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভাল জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া আপনি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবেন না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও করবেন না।

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا

আপনি কোন কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামী কাল করব।

إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ وَاذْكُر رَّبَّكَ إِذَا نَسِيتَ وَقُلْ عَسَى أَن يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَذَا رَشَدًا

‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যান, তখন আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করুন এবং বলুনঃ আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথ নির্দেশ করবেন।

وَلَبِثُوا فِي كَهْفِهِمْ ثَلَاثَ مِائَةٍ سِنِينَ وَازْدَادُوا تِسْعًا

তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে।

قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَبْصِرْ بِهِ وَأَسْمِعْ مَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا

বলুনঃ তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত চমৎকার দেখেন ও শোনেন। তিনি ব্যতীত তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না। (সূরা আল কাহাফের ৯ থেকে ২৬ নম্বর আয়াত)

40
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও পাখিগুলো

অনেক দিন আগের কথা।

তখন পৃথিবীতে বাস করতেন আল্লাহর এক প্রিয় মানুষ- ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। তিনি আল্লাহর সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন। তিনি আল্লাহর একজন মহান নবি ও রাসূল ছিলেন।

একবার ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহকে বললেন-’ হে আল্লাহ! আপনি মৃতকে কিভাবে পুনরায় জীবিত করেন তা কি আমায় একটু দেখাবেন?’ আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-’আমি মৃত যেকোনো কিছুকে পুনরায় জীবিত করতে পারি-এটা কি তুমি বিশ্বাস করো না?’

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বললেন-’ হে আল্লাহ! আমি তো তা বিশ্বাস করিই। আমার মনকে বোঝানোর জন্য একটু দেখতে চেয়েছি শুধু। আপনি তো সবকিছুই পারেন, পরওয়ারদিগার।’

আল্লাহ তাঁর এই দুআ কবুল করলেন। দুনিয়ায় দেখাতে চাইলেন আল্লাহর এক অনুপম কুদরত। আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে চারটি পাখি ধরে নিয়ে আসতে বললেন এবং সেগুলোকে ভালো করে পোষ মানাতে বললেন।

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বন থেকে চারটি পাখি ধরে আনলেন। পাখিগুলো খুব সুন্দর ছিল। ধীরে ধীরে পাখিগুলো পোষ মেনে গেল। পাখিগুলোকে ডাক দিলে সাথে সাথেই চলে আসত। এগুলোকে তিনি আলাদা আলাদাভাবে চিনতেন।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর বন্ধুকে এবার বললেন-’ পাখিগুলোকে জবাই করে টুকরো টুকরো করে ফেলো। আর টুকরো অংশগুলো বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে এসো।’ কিছুটা শিহরিত হয়ে গেলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম, কিন্তু আল্লাহর অপার মহিমা দেখার জন্য তিনি তা-ই করলেন।

তিনি পাখিগুলো একেবারে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেন। অতঃপর টুকরোগুলোকে একত্রে মেশালেন। এবার তিনি পাখির মেশানো টুকরোগুলো কয়েকটা পাহাড়ে রেখে এলেন। আল্লাহ বললেন-’ এবার পাখিগুলোকে ডাকো। এরা ঠিকই তোমার কাছে ছুটে আসবে।’

ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পাখিগুলোকে একে একে ডাক দিলেন। কী অবাক ব্যাপার! বিভিন্ন পাহাড়ে বিভিন্ন জায়গায় এক-এক পাখির এক-একটি অংশ ছিল। কোথাও হাড়ের একটি অংশ, কোথাও ডানার, কোথাও গোশতের, কোথাও কলিজার কোনো অংশ হয়তো পড়ে ছিল। কোথাও রক্ত পড়ে ছিল। সবগুলো অংশ ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে এক হয়ে নিমিষেই মিলে গেল। মুহূর্তেই জীবন্ত পাখি হয়ে উড়ে চলে এলো!

আল্লাহর মহিমা দেখে তিনি খুবই অবাক হয়ে গেলেন। জানো, কিয়ামতের পর এ পাখিগুলোর মতোই হবে মানুষের অবস্থা। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বা মাটিতে মিশে যাওয়া মানুষেরা এভাবে জীবন ফিরে পাবে।

দৌড়াতে দৌড়াতে হাশরের ময়দানে হাজির হবে এ পাখিগুলোর মতোই। অনেকে মনে করে, মানুষ মরে গেলেই সব শেষ! তাই তারা দুনিয়ায় ইচ্ছেমতো খারাপ কাজ করে বেড়ায়। কিন্তু না, এ কথাটা মোটেও ঠিক নয়।

মৃত্যুর পর আল্লাহ তায়ালা এভাবেই আবার সবাইকে জীবিত করবেন; তাদের বিচার করবেন। ভালো কাজের জন্য চিরশান্তির জান্নাত দেবেন। খারাপ কাজের জন্য দেবেন ভয়ংকর জাহান্নাম।

তোমরা কি জানো- এ ঘটনা আল্লাহ তায়ালা কোথায় বলেছেন? পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২৬০ নম্বর আয়াত পড়লেই আমরা এ ঘটনা জানতে পারব । আল্লাহ তায়ালা সেখানে এ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ ۖ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِن ۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَـٰكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِي ۖ قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَىٰ كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا ۚ وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থঃ এবং (সেই সময়ের বিবরণ শোন) যখন ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি মৃতকে কিভাবে জীবিত করবেন আমাকে তা দেখান। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করছ না? বলল, বিশ্বাস কেন করব না? কিন্তু (এ আগ্রহ প্রকাশ করেছি এজন্য যে,) যাতে আমার অন্তর পরিপূর্ণ প্রশান্তি লাভ করে। আল্লাহ বললেন, আচ্ছা, চারটি পাখি ধর এবং সেগুলোকে তোমার পোষ মানিয়ে নাও। তারপর (সেগুলোকে যবাহ করে) তার একেক অংশ একেক পাহাড়ে রেখে দাও। তারপর তাদেরকে ডাক দাও। সবগুলো তোমার কাছে ছুটে চলে আসবে। আর জেনে রেখ, আল্লাহ তাআলা মহাক্ষমতাবান, প্রজ্ঞাময়। (সূরা আল-বাকারা ২৬০ নম্বর আয়াত)

41

কোরবানীর মাহাত্ম্য

تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَ مِنْكُمْ

তাকাব্বালাললাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।


আজকের এই দিনে কেউ হাসে কেউ কাঁদে। কেউ আনন্দিত। কেউবা বিমর্ষ। আপনারা এই দিনের মহত্ব সম্পর্কে জানেন তো? আজকের এই দিনে এমন একটি বিশেষ মূহুর্ত রয়েছে যে মুহূর্তে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বান্দার সমস্ত ভাল এবং মন্দ, আমলগুলো কবুল করেন। যার পরিনাম ভাল কাজের হলে তার পুরস্কার  আল্লাহ্পাক তা দশগুন থেকে সাতশতগুন বৃদ্ধি করে দেবেন। যা আপনি কল্পনাও করেন নি। আর মন্দ হলে সেটার পরিনাম  আপনার জন্য অপরিনামদর্শী মন্দ বয়ে আনবে যা আপনি দুনিয়াতেই অবলোকন করবেন, এবং আলম ই বারযাখ থেকে জাহান্নাম পর্যন্ত যার কোন শেষ নেই। যা অনন্ত। (বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীস)
 
মনের পশুত্ব কোরবানী দেওয়ার নামই প্রকৃতপক্ষে কোরবানী। কোরবানী শব্দের অর্থ হলো ত্যাগ করা। কোরবানী বা ত্যাগ তিন প্রকার। ১. জানের কোরবানী ২. মালের কোরবানী। ৩. মনের কোরবানী। তিন নাম্বারটাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:

لَنۡ يَّنَالَ اللّٰهَ لُحُـوۡمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰـكِنۡ يَّنَالُهُ التَّقۡوٰى مِنۡكُمۡ​ؕ كَذٰلِكَ سَخَّرَهَا لَـكُمۡ لِتُكَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰى مَا هَدٰٮكُمۡ​ؕ وَبَشِّرِ الۡمُحۡسِنِيۡنَ‏-


‘নিশ্চই আমার নিকট কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত কিছুই কবুল হয় না, তবে আমার নিকট পৌঁছে তোমাদের নিয়ত, এখলাস ও একমাত্র তাকওয়া। (সূরা হজ-৩৭)।

আপনার ছোট বড় সকল কোরবানী আল্লাহ্ কবুল করুন। আমীন।

পবিত্র ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা।

ঈদ মোবারক!

42
যদি ঈমানদার হও, তাহলে সকল অঙ্গীকার পূরণ করো — আল-মায়িদাহ ১

নিচের এই আয়াতটি আমাদের বড় করে প্রিন্ট করে কম্পিউটারের সামনে, অফিসের দেওয়ালে দেওয়ালে, ট্রাফিক সিগন্যালের উপরে ঝুলিয়ে রাখা দরকার—


আমরা অনেক মুসলিমরাই, কোনো এক বিশেষ কারণে আমাদের অঙ্গীকারগুলোর ব্যাপারে খুবই উদাসিন। অফিসে গেলে যাই দশ মিনিট দেরি করে: ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দেখিয়ে, কিন্তু বের হওয়ার সময় ঠিকই বের হই আধা ঘণ্টা আগে। অথচ চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় কন্ট্রাক্টে সাইন করেছি: সপ্তাহে কমপক্ষে ৫৬ ঘণ্টা কাজ করব, ৮-৪টা অফিসের সময় মেনে চলব। যুহরের নামাযের সময় আধা ঘণ্টার বিরতির জায়গায় এক ঘণ্টা বিরতি নেই, এই মনে করে: আল্লাহর تعالى জন্য আধা ঘণ্টা বেশি বিরতি নিচ্ছি, এটা তো সওয়াবের কাজ! মাস শেষে বিদ্যুতের, পানির বিল দেওয়ার আগে মিস্ত্রি ডেকে মিটারের রিডিং কমিয়ে দেই। ট্যাক্স দেওয়ার সময় চেষ্টা করি: বিভিন্নভাবে মূল বেতনের পরিমাণকে কমিয়ে, নানা ধরনের বেনিফিট হিসেবে দেখানোর, যাতে করে কম ট্যাক্স দিতে হয়। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সময় সুযোগ খুঁজি তাদের কাজে বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে কতভাবে বেতন কাটা যায়। ঘণ্টা হিসেবে কন্ট্রাক্টে কাজ করার সময় চেষ্টা করি যত বেশি সম্ভব ঘণ্টা দেখিয়ে বেশি করে ক্লায়েন্টকে বিল পাঠানোর। কারও সাথে দেখা করার সময় ঠিক করি সকাল দশটায়, কিন্তু দেখা করতে যাই এগারটায়। উঠতে বসতে আমরা অঙ্গীকার ভাঙছি।

কোনো এক অদ্ভুত কারণে মুসলিমদের ‘দুই নম্বর স্বভাবের জাতি’ হিসেবে পৃথিবীতে ব্যাপক বদনাম হয়ে গেছে। মুসলিমদের সাথে ব্যবসা করতে অমুসলিমরা তো দূরের কথা, মুসলিমরা পর্যন্ত ভয় পায়। বরং উল্টো অনেক মুসলিমরাই চেষ্টা করে হিন্দু বা খ্রিস্টান কাউকে ব্যবসায় পার্টনার বানানোর, না হলে অন্তত একাউন্টেন্টের দায়িত্বটা দেওয়ার। অথচ আল্লাহ تعالى কু’রআনে কমপক্ষে তিনটি আয়াতে খুব কঠিনভাবে আমাদেরকে সব ধরনের চুক্তি, কন্ট্রাক্ট, অঙ্গীকার, আইন মেনে চলার জন্য বারবার আদেশ করেছেন।

হে বিশ্বাসীরা, তোমরা সকল অঙ্গীকার পূর্ণ কর। …  [৫:১]

… তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই তোমাদেরকে অঙ্গীকারের ব্যপারে জিজ্ঞেস করা হবে। [১৭:৩৪]

… নিশ্চিত করার পরে কোনো অঙ্গীকার ভাংবেনা, কারণ তোমরা আল্লাহকে সাক্ষি করেছ। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন। … [১৬:৯১]

মুসলিমরা যদি সত্যি ইসলাম মেনে চলত, তাহলে এত কষ্ট করে আর ইসলামের প্রচার করতে হতো না। মুসলিমদেরকে দেখে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করত; যেভাবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মানুষেরা ভারত এবং আরব মুসলিম বণিকদের সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ় নৈতিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম মুসলিম-প্রধান দেশে।

أَوْفُوا۟ بِٱلْعُقُود একটি খুবই সাধারণ আদেশ, কিন্তু এর অর্থ ব্যাপক। আওফু হচ্ছে পূরণ করা, পরিশোধ করা, কথা রাখা, প্রাপ্য দেওয়া ইত্যাদি। উ’কুদ হচ্ছে অঙ্গীকার, চুক্তি।আওফু বিল-উ’কুদ এর অর্থ যদি এক কথায় বলা যায়, তাহলে এর মানে দাঁড়ায়—আমার কাছ থেকে নিয়ম বা অঙ্গীকার অনুসারে যা আশা করা হয়, সেটা ঠিকমতো করা। এটা ট্রাফিক লাইটে থামা, অফিসে সময় মতো ঢোকা এবং বের হওয়া থেকে শুরু করে সকল আইনগত ব্যাপার, যেমন ঠিকমতো ট্যাক্স দেওয়া, সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, ঘুষ না নেওয়ার মতো বড় বড় ব্যাপারেও প্রযোজ্য।

যে আইন দেশের মানুষের সবার ভালোর দিকে লক্ষ রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং যে আইন কোনো মুসলিমকে পাপ করতে বাধ্য করে না—সেই আইন মানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য—এই ব্যাপারে স্কলারদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। এধরনের আইন ভাঙ্গা শারিয়াহ-এর দৃষ্টিতে হারাম—আবারও বলছি: হারাম। এতে কোনো ছাড় নেই, আইন মানতেই হবে। সেই আইন ভেঙ্গে কেউ পুলিশের কাছে ধরা না পড়লেও, কিয়ামতের দিন ঠিকই আল্লাহর تعالى কাছে ধরা পড়ে যাবে।

একটু সময় নিয়ে চিন্তা করে দেখুন: আমরা যখন ট্রাফিক সিগন্যালে না থেমে শোঁ করে গাড়ি নিয়ে পার হয়ে যাই, তখন আমরা কু’রআনের এই আয়াতটি ভাঙি, যার জন্য ট্রাফিক পুলিশের কাছে ধরা না পড়লেও, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর تعالى সামনে দাঁড়িয়ে তার জবাব দিতে হবে। আমরা যখন তেল কেনার পর তেলের দাম বাড়িয়ে লিখে দিতে বলি, যেন কোম্পানি থেকে তেলের খরচ বাবদ বেশি টাকা তুলে নিতে পারি, তখন আমরা কু’রআনের একটি কঠিন আদেশের বিরুদ্ধে যাই। ইসলাম আমাদেরকে কত সুন্দর নৈতিকতা শিখিয়েছে, কিন্তু আমরা এই সুন্দর শিক্ষা প্রতিনিয়ত অমান্য করে শুধু নিজেরাই গুনাহ করছি না, একই সাথে মুসলিম বেশভূষা ধরে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক বদনাম করছি।

আমাদের মতো নামে-মুসলিম, কাজে-মুনাফিকদেরকে দেখে অমুসলিমরা ধরে নেয়: “ইসলামের মতো বাজে ধর্ম আর নেই। তারা আরো বলে ,ঃ ইসলাম কী জিনিস, সেটা তো আমি এদের দেখেই বুঝতে পারছি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের আর না জানলেও চলবে। যা অত্যন্ত গর্হিত অন্যায় এবং গোনাহ এর কাজ

43

এতিমদের প্রতি দায়িত্ব

হজরত মোহাম্মদ (সা.) পিতৃহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। ছয় বছর বয়সে তার মা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তিনি তার দাদা ও চাচার অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিমরূপে পাননি? অতঃপর দিয়েছেন আশ্রয়।’ (সুরা দোহা, আয়াত : ৬)

এতিমের প্রতি ভালোবাসা

একবার ঈদের দিন সকালবেলা একটি শিশুকে ছিন্নবস্ত্র পরিহিত ও শরীর কাদায় মাখানো অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে রাসুল (সা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নবীজি (সা.) তাকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে যান এবং উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘শিশুটিকে ভালোভাবে গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দাও।’ আয়েশা (রা.) গোসল করানোর পর তিনি নিজ হাতে তাকে নতুন জামা পরিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে নিয়ে যান। আদর করে শিশুটিকে বললেন, ‘আজ থেকে আমি তোমার বাবা আর আয়েশা তোমার মা।’

প্রতিপালনের মর্যাদা

এতিম প্রতিপালন ইসলামে এক অভাবনীয় মর্যাদা ও ফজিলত রয়েছে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব’ বলে তিনি তার তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং এ দুটির মধ্যে একটু ফাঁক করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪)

এতিমদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অন্তর কোমল হয়, আত্মার প্রশান্তি লাভ হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে তার কঠিন হৃদয়ের ব্যাপারে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও (ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় কাছে টেনে নাও) এবং অভাবীকে আহার দাও।’ (মুসনাদ আহমদ)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি প্রেম-মমতায় কোনো এতিমের মাথায় হাত রাখবে, আল্লাহতায়ালা তাকে তার হাতের নিচের চুল পরিমাণ পুণ্য তাকে দান করবেন।’ (মুসনাদ আহমদ)

এতিমের সঙ্গে আচরণ

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম, যে বাড়িতে এতিম আছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি, যে বাড়িতে এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়…।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬৭৯)

এতিমদের ভালোবাসা, আহার দান করা নেককারদের গুণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আল্লাহর ভালোবাসায় আহার দান করে।’ (সুরা ইনসান, হাদিস : ০৮)

আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, যাবতীয় পুণ্যকাজ সম্পাদন করেও যদি কেউ এতিমদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা পোষণ না করে। কিংবা তাদের কষ্ট দেয় বা সাধ্য থাকা সত্ত্বেও দুঃখ মোচনে সচেষ্ট না হয় তবে সে মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ সৎকর্মশীল হিসেবে গণ্য হতে পারবে না। এতিমের সঙ্গে অন্যায়, কঠোর আচরণ নিষিদ্ধ এবং এটি জঘন্যতম পাপও বটে। ইসলাম যেভাবে এতিম প্রতিপালন, তার সঙ্গে উত্তম আচরণ, তার সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, তাকে সঠিকভাবে শিক্ষাদান ও উপযুক্ত বয়সে তার কাছে সম্পদ প্রত্যর্পণ, সব প্রকার ক্ষতি ব্যতিরেকে সার্বিক কল্যাণকামিতার নির্দেশ দিয়েছে। অনুরূপভাবে এতিমের সঙ্গে কঠোর ও রূঢ় আচরণ থেকেও কঠিনভাবে বারণ করে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।’ (সুরা দোহা, আয়াত : ৯)

ইসলামে এতিমের অধিকার

আমরা কে না জানি- সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতৃহীন তথা এতিম অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। আরও দুঃখের কথা হচ্ছে, তাঁর ছয় বছর বয়সকালে তাঁর পরমপ্রিয় মাতাও দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তিনি তাঁর দাদা ও চাচার অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও দেখাশোনায় বেড়ে উঠেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, তিনি কি আপনাকে এতিমরূপে পাননি? অতঃপর দিয়েছেন আশয়।›› (সুরা আদদোহা : ৬)

ইসলাম সাম্য ও ন্যায় পরায়তার ধর্ম। শুধু মানবকূল কেন প্রাণীজগতের প্রতি দয়া ও কোমল আচরণ করাও ইসলামের অন্যতম আদর্শ ও শিক্ষা।

পবিত্র কোরআন-হাদিসে এতিমের অধিকার, এতিমের প্রতি দয়া-অনুগ্রহের মর্যাদা ও পুরস্কারের কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আর তোমার কাছে তারা জিজ্ঞেস করে, এতিম সংক্রান্ত বিধান। বলে দাও, তাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে গুছিয়ে দেওয়া উত্তম। আর যদি তাদের ব্যয়ভার নিজের সাথে মিশিয়ে নাও, তাহলে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই। বস্তুত: অমঙ্গলকামী ও মঙ্গলকামীদেরকে আল্লাহ জানেন। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের ওপর জটিলতা আরোপ করতে পারতেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, মহাপ্রাজ্ঞ।’’ (সুরা আল-বাকারাহ : ২২০)

এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও প্রত্যার্পণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, এতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। মন্দ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটি বড়ই মন্দ কাজ।›› (সুরা আননিসা : ২)

এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, আর এতিমদেরকে যাচাই করবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের যোগ্য হয়; অতঃপর তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখতে পেলে তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। তারা বড় হয়ে যাবে বলে অপচয় করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যে অভাবমুক্ত সে যেন নিবৃত্ত থাকে এবং যে বিত্তহীন সে যেন সংযত পরিমাণে ভোগ করে। অতঃপর তোমরা যখন তাদেরকে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দিবে তখন সাক্ষী রেখো। আর হিসেব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট।›› (সুরা আননিসা : ৬)

উপর্যুক্ত প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এতিমদের সাথে উত্তম ও সুন্দর আচরণ এবং তাদের কাজকর্ম, অধিকার ও পাওনা সহজভাবে সম্পন্ন করে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে এতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণের বিধান ও পদ্ধতি, তাদের সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি ও সীমাবদ্ধতা এবং তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তরে প্রক্রিয়া ও সময়কাল অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করেছেন।

এতিমের সম্পদ ভক্ষণের ভয়াবহতা বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, যারা এতীমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করে এবং সত্ত্বরই তারা অগ্নিতে প্রবেশ করবে।›› (সুরা আননিসা : ১০)

ইসলাম যেভাবে এতিমের সাথে উত্তম আচরণ, এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক শিক্ষাদান ও উপযুক্ত বয়সে তার কাছে সম্পদ প্রত্যার্পণ, সকল প্রকার ক্ষতি ব্যতিরেকে সার্বিক কল্যাণসাধনের নির্দেশ দেয়। অনুরূপভাবে এতিমের সাথে কঠোর ও রূঢ় আচরণ থেকেও কঠিনভাবে বারণ করে।

44

তওবা কবুল হওয়ার যত আলামত

আমাদের গুনাহের শেষ নেই। পদে পদে আমরা নাফরমানি করি। আল্লাহতায়ালাকে ভুলে যাই।

যেহেতু আমরা কালিমা পড়েছি, আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করি, তাই মাঝে মাঝে নিজের কৃত পাপকাজের জন্য অনুতপ্ত হই এবং আল্লাহতায়ালার কাছে তওবা করি।  প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, আর কখনও নাফরমানি করব না।

আমাদের তওবা কবুল হলো কি হলো না, এটা আমরা কীভাবে বুঝব?

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে তওবা কবুল হওয়ার কয়েকটি আলামত বর্ণনা করা হলো।

১. তওবার পরের জীবন তওবার আগের জীবনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে।
২. গুনাহ করতে গেলেই আল্লাহতায়ালার ভয় জাগ্রত হবে।

৩. মন গুনাহের কাজের প্রতি নিরাসক্ত হতে থাকবে।  গুনাহ করতে ভালো লাগবে না।
৪. নেককাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আমলে তৃপ্তি ও স্বাদ অনুভব হবে।

৫. নেককার লোকদের সঙ্গে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের সোহবতে থাকতে ইচ্ছে করবে।

তওবা করার পর এই আলামতগুলো যদি আমাদের মধ্যে দেখতে পাই, তাহলে বুঝে নিব আল্লাহতায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এক যুবক ২০ বছর আল্লাহতায়ালার অনেক ইবাদত বন্দেগি করল। এরপরে হঠাৎ এক মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে গুনাহের কাজে লিপ্ত হল। ৩০ বছর পর্যন্ত গুনাহ করতে থাকল এবং আল্লাহতায়ালাকে ভুলে গেল।

অতঃপর, সে যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হল, তখন নিজের কৃতকর্মের ওপরে অনুতপ্ত হয়ে নির্জনে বসে আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করতে লাগল, হে আল্লাহ, আপনার দেয়া ২০ বছর আমি ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়েছি। তারপরে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ৩০ বছর নাফরমানি ও অবাধ্যতা  করেছি।

এখন আবার আমি আপনার ইবাদত বন্দেগি করতে চাই। আপনি কি আমার কৃত গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দিবেন?

বারবার সে একই কথা বলে দোয়া করতে থাকল। কাঁদতে থাকলো ঘণ্টারর পর ঘণ্টা। হঠাৎ গায়েব থেকে আওয়াজ এলো, হে আমার বান্দা, তুমি ইবাদতের মাধ্যমে আমাকে যখন মোহাব্বাত করতে, তখন আমিও তোমাকে মোহাব্বাত করতাম।

এরপরে তুমি যখন আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, তখন আমিও তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি অপেক্ষায় ছিলাম,তুমি ফিরে আসবে।  হতাশ হইনি। আজ তুমি ফিরে আসতে চাচ্ছ?

তওবা করে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ? তাহলে শোনো আমার কথা, আমি তোমার তওবা কবুল করেছি এবং তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

এক হাদিসে কুদসির সারমর্ম এমন, কী হয়ে গেল আদম সন্তানের, সে গুনাহ করে, এরপরে সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আমি তাকে ক্ষমা করে দিই।

এরপরে আবার সে গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিই; আমার ভয়ের কারণে পরিপূর্ণভাবে না সে গুনাহে লিপ্ত থাকতে পারে, না আমার রহমত ও মাগফিরাত থেকে নিরাশ হতে পারে!

এই জন্য গুনাহ হয়ে গেলেও সে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

হে আমার ফেরেশতারা, তোমরা সাক্ষী থাকো, আমার এমন সমস্ত বান্দাদেরকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।

এক যুবক নবীজি (সা.) এর কাছে এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল, হায় হায় আমি গুনাহগার, আমার গুনাহের শেষ নেই! আমার কোনো মুক্তি নেই। 

নবীজি (সা.) বললেন, আমার কাছে এসো। আমি যা যেভাবে শিখিয়ে দিচ্ছি, সেভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া কর।

এরপরে নবীজি (সা.) বললেন, হে আল্লাহ, আমার গুনাহ তো অনেক, কিন্তু আমার এই গুনাহের চেয়ে আপনার রহমত আরও অনেক অনেক বেশি।

হে আল্লাহ, আমি যা নেক কাজ করেছি, তার প্রতি বিন্দুমাত্র আমার আশা এবং ভরসা নেই, যতটুকু না আপনার রহমত ও মাগফিরাতের প্রতি আছে!

নবীজি (সা.) যুবককে বললেন, এভাবে আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।  দোয়া করে এমনভাবে উঠে যাও, যেন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

হযরত মুসা (আ.) আল্লাহতায়ালার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ, দোয়ার মাধ্যমে ‘হে আল্লাহ, হে আমার প্রতি পালক’ বলে আপনাকে কেউ যখন ডাকে, তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন?

আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, আমি তখন বলি, লাব্বাইক, (হে আমার বান্দা, আমি হাজির)।

মুসা (আ.) আবার জিজ্ঞেস করলেন আপনার কোনো ইবাদতগুজার বান্দা যখন আপনাকে ডাকে তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন? আল্লাহতায়ালা বললেন, লাব্বাইক।

মুসা (আ.)  বললেন, কোনো রোজাদার আপনাকে যখন ডাকে, তখন কী বলেন? আল্লাহ তায়ালা বললেন, তখনও আমি বলি লাব্বাইক।

মুসা (আ.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা কোনো গুনাহগার বান্দা যখন আপনাকে ডাকে, তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন?

আল্লাহতায়ালা উত্তরে বললেন, তখন আমি বলি, লাব্বাইক, লাব্বাইক, লাব্বাইক।

মুসা (আ.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, নেককার লোক, রোজাদার লোক যখন আপনাকে ডাকে, তখন আপনি একবার লাব্বাইক বলেন, আর কোনো গুনাহগার ডাকলে তিনবার লাব্বাইক বলেন, এর কারণ কী?

আল্লাহতায়ালা বলেন, কোনো নেককার বান্দা যখন আমার কাছে দোয়া করে, তখন তাদের নেক কাজের প্রতি সামান্য হলেও আশা থাকে, আমি এর উসিলায় তাকে ক্ষমা করে দিব।

কিন্তু, কোনো গুনাহগার যখন আমার কাছে দুআ করে, তখন আমার রহমত ছাড়া তার তো আর কোনো কিছুর প্রতি আশা এবং ভরসা থাকে না!
 

45

তারাবি নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

শুরু হয়েছে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজান। এই মাসের প্রধান দুটি আমল হলো সিয়াম ও কিয়াম।

সিয়াম বা রোজা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, দাম্পত্য মিলন ও রোজা ভঙ্গ হওয়ার সকল বিষয় থেকে দূরে থাকা। আর কিয়াম হলো রাতে তারাবির নামাজ।

তারাবিহ’ শব্দটি আরবি তারভিহাতুন থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম করা, প্রশান্তি লাভ করা।

তারাবি নামাজে যেহেতু প্রতি চার রাকাত পর পর একটু বিশ্রাম নিয়ে তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করা হয়, তাই এই নামাজকে সালাতুত তারাবিহ বা তারাবি নামাজ বলা হয়।


তারাবির নামাজ এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর এবং বিতিরের পূর্বে আদায় করা হয়। তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। যেটা গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিবের কাছাকাছি।

তারাবির ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে নেকীর আশায় কিয়ামুল লাইল তথা তারাবি আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসুল (সা:) তারাবিকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তারাবি যেন ফরজ না হয়ে যায়, যেটা আদায়ে উম্মতের কষ্ট হতে পারে, সেটা রাসুল (সা:) এর একটি হাদিস থেকেই বোঝা যায়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) একবার রমজান মাসে রাত্রিবেলায় মসজিদে নববীতে নামাজ (তারাবি) আদায় করলেন। উপস্থিত লোকজনও তার সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। একইভাবে তারা দ্বিতীয় দিনেও নামাজ আদায় করলেন এবং লোকসংখ্যা অনেক বেশি হলো। অতঃপর তৃতীয় এবং চতুর্থ দিনেও মানুষ একত্রিত হলো। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) হুজরা থেকে বেরিয়ে তাদের কাছে এলেন না। অতঃপর সকাল হলে তিনি এলেন এবং বললেন, তোমাদের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু শুধু এ ভয়ে আমি তোমাদের নিকট আসা থেকে বিরত থেকেছি যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, না জানি তোমাদের ওপর উহা (তারাবি) ফরজ করে দেওয়া হয়। (বুখারী)

তারাবি বিশ রাকাত সুন্নাত। এটা রাসুল (সা:), সাহাবী, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং মুজতাহিদ ইমামগণের আমল দ্বারা প্রমাণিত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) রমজান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)

সমস্ত সাহাবীদের আমলও বিশ রাকাত ছিল। রাসুল (সা:) এর নাতি হযরত আলী ইবনে হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, হযরত ওমর (রা:) এর নির্দেশে লোকদেরকে নিয়ে উবাই বিন কাব (রা:) বিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন। (আবু দাউদ)

এভাবে খলিফা ওমর, ওসমান, আলী (রা:) সহ সকল সাহাবীদের ঐক্যমতে বিশ তারাবি পড়া হয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ:) বলেন, মক্কা ও মদীনা শরীফে সাহাবায়ে কেরামের যুগ হতে আজ পর্যন্ত সব সময় বিশ রাকাত তারাবি খতমে কোরআনসহ জামাতের সঙ্গে পড়া হয়। তারাবি নামাজে পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত বা শ্রবণ করা ও সুন্নত। রাসূল (সা:)বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে সে একটি নেকী অর্জন করবে এবং একটি নেকীকে দশগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে। (তিরমিজি)

কুরআনে কারীম তেলাওয়াতের মতো শুনলেও একই রকম সওয়াব। এজন্য তারাবি নামাজে পরিপূর্ণ আদবের সাথে মনোযোগ দিয়ে কোরআন শুনতে হবে।

বিশ রাকাত না পড়ে ইমামকে রেখে মসজিদ ত্যাগ করা উচিত নয়। রাসুল (সা:) বলেন, যে ব্যক্তি ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল তথা তারাবি আদায় করবে, তার জন্য পুরো রাত সিয়াম পালনের সওয়াব লাভ হবে। (তিরমিজি)

মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলত পূর্ণ আমল তারাবির নামাজে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। আসুন আমরা যথাযথ গুরুত্বের সাথে তারাবির নামাজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন। আমীন!


Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 10