Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - Badshah Mamun

Pages: 1 ... 108 109 [110] 111
1636
শুধু মেয়ে-মশা কামড়ায় কেন?
আব্দুল কাইয়ুম


 
সব মশা-ই কামড়ায়, তবে মানুষকে কামড়ায় শুধু মেয়ে-মশা এবং সেটা ডিম পাড়ার আগে। তখন তাদের প্রচুর পুষ্টি ও শক্তির দরকার হয়। এটা তারা সংগ্রহ করে মানুষ বা কোনো পশুর গায়ের রক্ত থেকে। পুরুষ-মশা চাইলেও মানুষকে কামড়াতে পারবে না, কারণ তাদের হুল ও মুখ ততটা শক্ত নয়। ওরা শুধু ফুল ও লতাপাতায় হুল ফুটিয়ে রস ও মধু আহরণ করে। তাতেই ওদের উড়ে চলার শক্তি জোগাড় হয়। কিন্তু রক্ত ছাড়া মেয়ে- মশার চলে না। যে মশা হয়তো সাধারণত মাত্র পাঁচ থেকে দশটা ডিম পাড়ে, রক্ত খেয়ে সে ডিম পাড়ে অন্তত ২০০টি। যদিও মশার কামড়ে আমরা খুব কম রক্তই হারাই, মশার জন্য কিন্তু সেটুকু রক্তই দারুণ ব্যাপার। প্রায় সময়ই মশা তাদের দেহের ওজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত পান করে।

Source: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-26/news/211582

1637
Liberation of Bangladesh / বিজয়ের ছড়া
« on: December 21, 2011, 11:47:08 AM »
বিজয়ের ছড়া
আলম তালুকদার

শুনতে কেমন লাগে
একাত্তরের আগে
ছিলাম পরাধীন!
একাত্তরের আগে
শুনতে কেমন লাগে
ছিল মরা দিন!

অন্ধকারে ছিল ভরা
শোষণ ছিল বেজায় কড়া
সত্য কথা বলতে গেলে
নিত্য আবাস গোপন জেলে
ছিল অবাক দিন।

অবশেষে যুদ্ধ আসে
রক্ত ঝরে সবুজ ঘাসে
সবাই মিলে অস্ত্র ধরে
স্বদেশভূমি স্বাধীন করে
রাতকে বানায় দিন।

শুনতে দারুণ লাগে
মনে পুলক জাগে
নই তো পরাধীন।

Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-09/news/207272

1638
Be Alert / রোগের নাম চিকুনগুনিয়া
« on: December 21, 2011, 11:14:23 AM »
এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ইদানীং অনেক রোগী প্রায়ই অভিযোগ করছেন যে তাঁদের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল, কিন্তু জ্বর সেরে গেলেও শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়, অথচ দেখা যাচ্ছে জ্বর চলে গেলেও রোগী আরও দীর্ঘদিন অসুস্থ ও দুর্বল বোধ করছেন। শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে গিঁটে গিঁটে ব্যথা কিছুতেই যাচ্ছে না। আসলে ডেঙ্গু হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও এ রোগটি সম্ভবত ডেঙ্গু জ্বর নয়, বরং অন্য একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যাকে বলে চিকুনগুনিয়া।
চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত অসুখ। এ রোগটি আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোগ হলেও আমাদের দেশের কিছু কিছু এলাকায় এ রোগ পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের অতিপরিচিত ডেঙ্গুর সঙ্গে এর অনেকটাই মিল রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরের মতোই চিকুনগুনিয়া ভাইরাস এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
চিকুনগুনিয়ার মূল উপসর্গ হলো জ্বর এবং অস্থিসন্ধির ব্যথা। জ্বর অনেকটা ডেঙ্গুর মতোই দেহের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়, প্রায়ই ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়, তবে কাঁপুনি বা ঘাম দেয় না। জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, গায়ে লাল লাল দানার মতো রেশ, অবসাদ, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা হয়—এমনকি ফুলেও যেতে পারে। জ্বর সাধারণত দুই থেকে পাঁচ দিন থাকে এবং এর পর নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে তীব্র অবসাদ, পেশিতে ব্যথা, অস্থিসন্ধির ব্যথা ইত্যাদি জ্বর চলে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনকি মাসের পর মাসও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা প্রদাহ থাকতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে স্বাভাবিক কাজ করতে অক্ষম করে তোলে। রোগী ব্যথায় এতই কাতর হয় যে হাঁটতে কষ্ট হয়, সামনে বেঁকে হাঁটে। স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও তাই একে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ বলা হয়। দেখা গেছে, রোগীর বয়স যত বেশি, তার রোগের তীব্রতাও তত বেশি হয় এবং উপসর্গগুলো, বিশেষ করে শরীরে ব্যথাও তত বেশি দিন থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সাধারণত এত দীর্ঘ সময় শরীরে ব্যথা বা অন্য লক্ষণগুলো থাকে না। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মূল সমস্যা হলো শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ, যা অনেক সময় খুব ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়া জ্বরে ডেঙ্গুর মতো রক্তক্ষরণ হয় না এবং রক্তের প্লাটিলেট সাধারণত খুব বেশি কমে না। এ রোগে আক্রান্ত হলে কেউ মারা যায় না, শুধু দীর্ঘদিনের জন্য অনেকেই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরে চারবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, কিন্তু চিকুনগুনিয়া একবার হলে সাধারণত আর হয় না।
চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি দেখা হয়। এতে দুই থেকে ১২ দিন লাগতে পারে। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে শুধু শুধু এ পরীক্ষা করার কোনো দরকার নেই। কেননা এতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না। চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই। এর চিকিৎসা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করা। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট এবং এর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। তীব্র ব্যথার জন্য এনএসএআইডি-জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে অ্যাসপিরিন না দেওয়াই ভালো। ক্লোরোকুইন এ রোগের উপশম করে বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। আবার যেন মশা না কামড়ায় এ জন্য রোগীকে মশারির ভেতরে রাখাই ভালো। কারণ, আক্রান্ত রোগীকে মশায় কামড় দিয়ে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড় দিলে ওই ব্যক্তিও এ রোগে আক্রান্ত হবেন।
চিকুনগুনিয়ার জন্য কোনো ভ্যাকসিন বা টিকাও নেই। তাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ। এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা এবং মশাকে নির্মূল করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাসাবাড়ির আশপাশে যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, তা সরিয়ে ফেলতে হবে অথবা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ডাবের খোসা, কোমল পানীয়ের ক্যান, ফুলের টব—এসব স্থানে যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মজা পুকুর বা ডোবা পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের বেলায় স্বচ্ছ, পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে, কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় মশা নোংরা-অপরিষ্কার পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। তাই পানি জমে থাকে এমন সব জায়গাই পরিষ্কার রাখতে হবে। এ ছাড়া মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে মশা কাছে না আসতে পারে। বাইরে যাওয়ার সময় শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে মশা কামড়াতে না পারে। ঘরে ঘরে মশার ওষুধ দেওয়া, দরজা-জানালায় নেট লাগানো, রাতে মশারি ব্যবহার ইত্যাদিও চলবে। জেনে রাখা ভালো, এডিস মশা দিনের বেলা এবং ঘরের বাইরেই বেশি কামড়ায়। কিছু কিছু মিডিয়া বা পত্রপত্রিকায় আজকাল আবার প্রচার করা হচ্ছে যে এ ধরনের রোগীকে ডাক্তাররা ‘ভুল করে’ ডেঙ্গুর চিকিৎসা দিচ্ছেন। আসলে এখানে ভুল করার কিছু নেই। ডেঙ্গুর চিকিৎসা এবং চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা প্রায় একই রকম এবং এতে রোগীর কোনো সমস্যা হবে না বরং ভাইরাস সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয় করে চিকিৎসা করতে গেলে যেসব ব্যয়বহুল পরীক্ষা করতে হবে, তা অনেক দরিদ্র রোগীই করতে পারবে না—এর প্রয়োজনও নেই। এতে চিকিৎসার ক্ষেত্রেও কোনো অতিরিক্ত সুফল পাওয়া যাবে না। রোগটি নতুন হলেও এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এতে কেউ মারা যায় না। হয়তো বা কিছুদিন একটু ভোগান্তি বাড়ায়। একটু সচেতন হলেই এ রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।

Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-21/news/210235

1639

ক্ষুদ্রাকৃতির পেনড্রাইভ বাজারে
ক্ষুদ্রাকৃতির পেনড্রাইভ অ্যাপাসার এএইচ১৩৪ বাজারে এসেছে। এক ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের, খুব পাতলা এই পেনড্রাইভটির তথ্য ধারণক্ষমতা ৮ গিগাবাইট।

এএইচ১৩৪
 দেখতে চাবির মতো পেনড্রাইভটি গাড়ির সিডি প্লেয়ারের ইউএসবি পোর্টে ব্যবহার করা যায়।
সহজে বহনযোগ্য এবং ব্যবহারউপযোগী কম্পিউটার সোর্সের আনা পেনড্রাইভটির দাম ৮৫০ টাকা।

1640
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭১ সালের অসহযোগ ও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তৎকালীন অন্য ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সামান্য নয়, এ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরকে সেদিন রক্তে রঞ্জিত করেছিল পাকিস্তানি হায়েনারা, স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে। ওই সময় এ দেশের লাখো কোটি জনতার পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

৩০ লাখ শহীদের মধ্যে রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জানা-অজানা অনেক ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডায়েরিতে এদের মাঝে ১৮ জন শহীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তারা হলেন_ মো. জামাল হোসেন মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, নাজিম আখতার কাশেম কৃষি প্রকৌশল অনুষদ, হাবিবুর রহমান কৃষি অনুষদ, আবদুল মতিন খন্দকার মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, আবুল কাশেম ডিভিএম, খুরশিদ আলম কৃষি অনুষদ, এম নাজমুল আহসান কৃষি অর্থনীতি ও সমাজকল্যাণ অনুষদ, শামসুল হক তালুকদার কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ, কাজী মজুর হোসেন ভেটেরিনারি অনুষদ, ইব্রাহিম মোস্তফা কামাল ভেটেরিনারি অনুষদ, মনিরুল ইসলাম আকন্দ মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ এবং কর্মচারীদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন, হাসান আলী, ওয়াহিদুজ্জামান, নুরুল হক, মধুসুদন, আক্কাস আলী, মো. তোহসিনুল ইসলাম প্রমুখ। উপরোক্ত শহীদদের মধ্যে তিনজন শহীদের স্মৃতিকে ধরে রাখার লক্ষ্যে তাদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলের নামকরণ করা হয়েছে। এগুলো হলো_ শহীদ জামাল হোসেন হল, শহীদ শামসুল হক হল, শহীদ নাজমুল আহসান হল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক শামসুল ইসলাম, বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল হক, অধ্যাপক আতিয়ার রহমান মোল্লা, অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক ড. শেখ জিনাত আলী, অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ তালুকদার, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি মো. নজিবর রহমানসহ শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রাপ্ততথ্য থেকে জানা যায়, ভারতের একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বর্তমান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল হক প্রশিক্ষক হিসেবে সফল দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ বৈঠক বাতিল ঘোষণা করলে সারা দেশে প্রতিবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র দেশের ন্যায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও লাগলো বিক্ষোভের ঢেউ। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঈশা খাঁ হলসংলগ্ন শহীদ মিনারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী, এলাকাবাসী সমবেত হয়ে সংগ্রামের শপথ নিলেন ।


৬ মার্চ ১৯৭১, ময়মনসিংহ টাউন হলে জমায়েত হলেন ময়মনসিংহের বীর জনতার পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীরা। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন জননেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়া। গঠিত হলো স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নূর মোহাম্মদ তালুকদার। ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে পালিত হলো প্রতিরোধ দিবস। প্রতিটি ভবনে উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলার পতাকা। তৎকালীন ভিসি কাজী ফজলুর রহীম ঘোষণা করলেন, আজ থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয় 'স্বাধীন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়' নামে পরিচিত হবে। ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে বিপুলসংখ্যক যোগ দিলেন সংগ্রাম পরিষদে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এর কিছুদিন পর উপস্থিত হলেন তৎকালীন মেজর শফিউল্লাহ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খোলা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। ২৩ এপ্রিল ১৯৭১, পাকবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরকে ঘোষণা করা হলো তাদের ক্যান্টনমেন্ট। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অতিথিশালায় স্থাপন করে আঞ্চলিক কমান্ড হেড কোয়ার্টার। সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হক হলকে করা হয় সেনানিবাস। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরসংলগ্ন একটি বাড়িকে করা হয় নির্যাতন কক্ষ। নির্যাতন কক্ষের পাশেই লাশ পুঁতে রাখা হতো। জানা যায়, ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার স্কুল-কলেজ থেকে রাজাকার বাহিনী কর্তৃক ধরে আনা অসংখ্য নারী-পুরুষকে হত্যার পর এ জায়গায় মাটিচাপা দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জায়গাটিকে চিহ্নিত করে বধ্যভূমি ঘোষণা করেছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের শত শত মানুষের নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে নীরবে আজও সাক্ষী দিচ্ছে বধ্যভূমিটি। তৎকালীন আলোকচিত্রী নাইব উদ্দিন আহমেদ তার ক্যামেরায় বন্দী করেছিলেন নির্যাতনের অনেক বিভীষিকাময় চিত্র, যা আজও জাতীয় বিভিন্ন প্রদর্শনীতে দেখা যায় ।

ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ফার্মগুলোতে চালানো হয় লুটপাট। তৎকালীন উপাচার্য ড. কাজী ফজলুর রহীম, ডিন শামসুল ইসলাম, ড. শফিকুর রহমান, ড. মোস্তফা হামিদ হোসেনকে লাঞ্ছি করে পাকিস্তনি হানাদার বাহিনী। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত গফরগাঁও, ভালুকা, ত্রিশাল ও অন্যান্য থানার রাজাকার বাহিনী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করত। ১০ ডিসেম্বর রাতে পালিয়ে গেল হানাদার বাহিনী। যাওয়ার আগে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা মেরে বিধ্বস্ত করল, ভস্মীভূত করল কয়েকটি ছাত্রাবাসের লাখ লাখ টাকার বই ও আসবাবপত্র। ১২ ডিসেম্বরের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করতে থাকে বিজয়ের বেশে দলে দলে মুক্তিপাগল ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক- কর্মচারীরা। রক্তেভেজা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তোলন করা হলো স্বাধীন বাংলার পতাকা। এখনো সোহরাওয়ার্দী হল, ফজলুল হক হল ও জামাল হোসেন হল প্রাঙ্গণে 'শহীদের স্মৃতিস্তম্ভ' অতীতের সেই বিভীষিকাময় সময়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

লেখক :দীন মোহাম্মদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা।

Source : http://www.bd-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=Cook&pub_no=588&cat_id=3&menu_id=51&news_type_id=1&index=5

1641
Liberation of Bangladesh / একাত্তরের চিঠি
« on: December 17, 2011, 11:56:30 AM »
একাত্তরের চিঠি
স্মৃতির মাস ডিসেম্বর। এ মাসে বাঙালি ঝাপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেকেই আত্মীয় পরিজনের কাছে চিঠি লেখেন। বিজয়ের চার দর্শক উপলক্ষে হৃদয়স্পর্শী চারটি চিঠি পত্রস্থ হলো।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি
নয়াদিলি্ল
ডিসেম্বর ৬, ১৯৭১
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

৪ঠা ডিসেম্বর তারিখে মাননীয় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা পেয়ে আমি ও ভারত সরকারের আমার সহকর্মীবৃন্দ গভীরভাবে অভিভূত হয়েছি। বার্তাটি পেয়ে ভারত সরকার আপনার নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য আপনার অনুরোধ পুনর্বিবেচনা করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিদ্যমান বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আজ সকালে এ বিষয়ে পার্লামেন্টে আমি একটি বিবৃতি প্রদান করেছি।
অনুলিপি প্রেরণ করা হলো।
বাংলাদেশের জনগণকে প্রচুর দুর্ভাগ পোহাতে হয়েছে। আপনাদের যুবসমপ্রদায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এক আত্মোৎসর্গীকৃত সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। ভারতের জনসাধারণও অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই সহমর্মিতা প্রচেষ্টা ও ত্যাগ দুই দেশের মৈত্রীকে আরও সুদৃঢ় করবে। পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণকে যত বড় ত্যাগ স্বীকারই করতে বলা হোক না কেন আমি নিশ্চিত যে জয় আমাদের হবেই।
এই সুযোগে আপনাকে, আপনার সহকর্মীগণকে এবং বাংলাদেশের বীর জনগণকে আমার প্রীতিসম্ভাষণ ও শুভকামনা জ্ঞাপন করছি।
আমি এই সুযোগে আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি আমার সর্বোত্তম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

আপনার একান্ত

[ইন্দিরা গান্ধী]
BANGLADESH LIBERATION COUNCIL
বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ



কামরুল ভাই,
আমাদের যে সমস্ত Painter রা ওখান থেকে এসেছেন, তাদের সবার নাম-ঠিকানা কি আপনার কাছে আছে? সবার নাম এবং ঠিকানাগুলো অবিলম্বে দরকার।
Painter দের সবার জন্যে কিছু টাকা-পয়সার আয়োজন হচ্ছে। তাদের সবার সঙ্গে অবিলম্বে আমার একটু যোগাযোগ হওয়া দরকার। আমি একমাত্র আপনার আর মুস্তাফা মনোয়ার ছাড়া আর কারও ঠিকানা জানি না। সবার নাম এবং ঠিকানা হয়তো আপনার কাছ থাকতে পারে, তাই লিখলাম।
আমি দু-এক দিনের মধ্যে আপনার সঙ্গে দেখা করব। কমার্শিয়াল পেইন্টাররাও যদি কেউ এসে থাকে, তাদের নাম ঠিকানা দরকার।

[জহির রায়হান]

[চলচ্চিত্রকার ও কথাশিল্পী শহীদ জহির রায়হান ১৯৭২ সালেল ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে তার বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে যেয়ে তিনি নিখোঁজ হন। এই চিঠিটি তিনি পটুয়া কামরুল হাসানকে লিখেছিলেন। কামরুল হাসানমুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের হিংসমুখ এঁকে যুদ্ধের বয়াবহতা প্রমাণ করেছিলেন।]


প্রিয় মোয়াজ্জেম সাহেব,

তসলিম। আশা করি খোদার রহমতে কুশলে আছেন। কোনোমতে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে [মুরগি যেমন তার ছানাগুলো ডানার তলে রাখে] বেঁচে আছি। পত্রবাহক আপনার পূর্বে দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী আপনার কাছেই যাচ্ছে। স্বাপদসংকুল ভরা এ দুনিয়ার পথ। নিজের হেফাজতে যদি রাখতে পারেন। তবে খুবই ভালো নতুবা নিরাপদ স্থানে [চিতলমারীর অভ্যন্তরে কোনো গ্রামে] পেঁৗছানোর দায়িত্ব আপনার। বিশেষ লেখার কিছু দরকার মনে করি না। মানুষকে মানুষে হত্যা করে আর মানুষের সেবা মানুষেই করে। হায়রে মানুষ! আমার অনুরোধ আপনি রাখবেন জানি- তা সত্ত্বেও অনুরোধ থাকল।

ইতি আপনাদের

আবদুস হাসিব চৌধুরী
[চিঠিটি মুক্তিযোদ্ধা আবদুস হাসিব চৌধুরীর লেখা। ১৯৭১ সালে তার ঠিকানা ছিল আমিনা প্রেস, কোর্ট মসজিদ রোড, বাগেরহাট। এ চিঠির প্রাপক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। বাগেরহাট পি.সি. কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক।]



বুলবুল,

আমি ফলদা আছি। সামাদ এলে তাকে ওখানেই রেখে দিবেন। এখানে আমি কোথায় কোন জিনিস রাখা হয়েছে তার খোঁজ খবর নিচ্ছি। কয়েক দিনের মধ্যে ভুয়াপুর আক্রমণ হবার সম্ভাবনা নেই। কাজেই জনগণকে সাহস দিয়ে রাখবেন। আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছি। যা যা করা দরকার তা করিও। ডাক্তার দিয়ে পায়ে বেনডিচ [ব্যান্ডেজ] করিও। লতিফকে এখানে পাঠিয়ে দিও।

ইতি
এনাযেত করিম
[চিঠির লেখক মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত করিম। কাদেরিয়া বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় হেডকোর্য়াটার, ভুয়াপুরের প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। এর প্রাপক বুলবুল খান মাহবুব ছিলেন কাদেরিয়া বাহিনীর উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম সদস্য। চিঠির ঠিকানা ছিল: আব্দুস ছাত্তার খান [বাবু] গ্রাম ও ডাকঘর অর্জুনা, উপজেলা: ভুয়াপুর, জেলা: টাঙ্গাইল।]

Source : http://www.bd-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=Airline&pub_no=588&cat_id=3&menu_id=51&news_type_id=1&index=2

1642
মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত গাড়ি

১৯৭১ সালে চরম ব্যস্ত সময় কাটাত যে গাড়িগুলো, এখন জাদুঘরের লোহার শিকলের ভেতরে নিশ্চুপ। মুক্তিযুদ্ধের সময় গাড়িগুলো যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে কিছু গাড়ি জাদুঘরে আছে। আর কিছু সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। এ ধরনের কয়েকটি গাড়ির কথা জানাচ্ছেন_ নাজমুল হক ইমন
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী যুদ্ধের সময় একটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। তিনি তার এই গাড়িটি নিয়ে যুদ্ধচলাকালীন বিভিন্ন যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করতেন। সেই সঙ্গে গাড়িটিতে যুদ্ধে ব্যবহৃত অনেক কিছুই বহন করতেন তিনি। যশোর ব-১৪৬ নম্বরের এই গাড়িটি 'কাইজার উইলিজ জিপ ওয়াগনার'। নীল রংয়ের এই বিশাল জিপ গাড়িটিতে ৫-৬ জন ওঠা যেত। বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে গাড়িটি এখন সংরক্ষিত। জেনারেল এমএজি ওসমানীর গাড়ির পাশে কালোর রংয়ের একটি মার্সিডিজ রয়েছে। দেখতে চমৎকার এই গাড়িটি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির তৈরি। আর এই গাড়িটি ব্যবহার করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি। যুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় গাড়িটি। পরবর্তীতে এ গাড়িটি ব্যবহার করেছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। গাড়িটির নাম স্টাফ কার মার্সিডিজ বেঞ্জ ৪ সিলিন্ডার ২০০০সিসি। আর নম্বর ছিল ০০০০০৫।

লাল জিপ গাড়িটি হবিগঞ্জের তৎকালীন এসডিও বা মহকুমা প্রশাসক আকবর আলি খান ব্যবহার করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই স্থানীয় নেতাদের হাতে ট্রেজারির চাবি তুলে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পেয়ে যান বেশকিছু অস্ত্র। সেই সঙ্গে এই জিপ গাড়িটি মুক্তিযোদ্ধারাও ব্যবহার করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন জায়গায় আনা-নেওয়াসহ তাদের খাদ্য, অস্ত্র পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই চাইছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত এ গাড়িটি যাতে স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়। গাড়িটি বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দোতলার ছাদে রক্ষিত আছে। প্রায় জরাজীর্ণ। তবে আশার কথা, প্রয়োজনীয় সংস্কার করার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পৌরসভা সম্মতি প্রকাশ করেছে।

আরেকটি গাড়ির কথা না বললেই নয়, যেই গাড়িতে যুদ্ধের সময় বহন করা হতো মর্টার ও মেশিন গান। গাড়িটি যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করে।

রিকয়েললেস রাইফেল (আরআর) ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর গোলা একটি ট্যাংকের লৌহপাতের ভেতর ১৬.২০ ইঞ্চি পর্যন্ত প্রবেশ করতে সক্ষম। জিপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। যুদ্ধের পর এই আরআর জিপটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছে। ১০৬ মি.মি. রিকয়েললেস রাইফেলসহ (আরআর) জিপ জি এস ইউলিস ৪ন্৪ মডেল এম ৩৮ এ-১। আর আর ক্যালিবার ১০৬ মি.মি. এবং সর্বোচ্চ দূরত্ব ২০০০ মিটার।

ট্রাক কারগো ৬ন্৬ ভ্যান মডেল এম ১০৯ গাড়িটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। যুদ্ধক্ষেত্রে যানবাহন, অস্ত্র, বেতার সামগ্রী ইত্যাদি মেরামত করা যন্ত্রপাতি গাড়িটির ভেতরে সংযুক্ত থাকত। যুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এটি ব্যবহৃত হয়। গাড়িটির নম্বর ০৭২০১২।

ট্র্যাংক পিটি ৭৬ রাশিয়ার তৈরি। এই ট্যাংকটি পানিতেও ভেসে থাকে। যুদ্ধ চলাকালীন ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া এলাকা থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর কাছ থেকে গাড়িটি উদ্ধার করে।

জিপ অ্যাম্বুলেন্স ৪ন্৪ মডেল সি জে-৪। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জিপটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত সৈনিকদের আনার জন্য ব্যবহার করতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এ গাড়িটি পাকিস্তান বাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ব্যবহারও করেছে।

মিডিয়াম উদ্ধার যান ৬ন্৬ মডেল এম ৫৪৩। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি শক্তিশালী এ গাড়িটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৫.০৮ মেট্রিক টন ওজনের যে কোনো গাড়ি উদ্ধার করতে সক্ষম। এ গাড়িটি যুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এটি ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও আরও অনেক গাড়ি রয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়।
Source : http://www.bd-pratidin.com/?view=details&type=gold&data=Hotel&pub_no=588&cat_id=3&menu_id=51&news_type_id=1&index=8


1643
বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় নারী
ভারতের শিক্ষার্থী জ্যোতি আমগে বিশ্বের সবচেয়ে খর্বাকৃতির নারীর খেতাব পেয়েছেন। তাঁর উচ্চতা ৬২ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার (দুই ফুট সাত ইঞ্চি)। গতকাল শুক্রবার গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এ কথা নিশ্চিত করেছে।
নাগপুরে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ১৮তম জন্মদিন উদ্যাপনের পর আমগেকে বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় নারীর খেতাব দেওয়া হয়। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের বিচারক রব মলয় বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের উপস্থিতিতে চিকিৎসক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমগের উচ্চতা তিনবার মেপেছেন। তবে সামান্য তারতম্য হওয়ায় আমরা গড় উচ্চতাকেই গ্রহণ করেছি।’

সবচেয়ে খর্বাকৃতির নারী নির্বাচিত হওয়ার পর আমগেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ দেওয়া হয়। এ সময় তাঁর বাবা কিষান ও মা রঞ্জনা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী লাল শাড়ি পরা আমগে বলেন, ‘সনদ পেয়ে আমি খুব আনন্দিত।’ রব মলয় বলেন, ‘এটি প্রতীকী রেকর্ড।’
আমগের উচ্চতা চার মাসের কন্যাসন্তানদের গড় উচ্চতার সমান। তিনি বলিউডের অভিনেত্রী হতে চান বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন।
এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে খর্বকায় নারীর খেতাব ছিল ব্রিজেত জর্ডানের। তাঁর বাড়ি যুক্তরাজ্যের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। জর্ডানের উচ্চতা ৬৯ দশমিক ৪৯ সেন্টিমিটার। এএফপি।
Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-17/news/209391

1644
জুলাই, ১৯৭১: বাল্টিমোর অবরোধ,
পাকিস্তানি জাহাজ হটাও,
আলীম আজিজ .
১৯৭১ সাল, পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচারে গণহত্যা চলছে। সেই গণহত্যায় ব্যবহূত হচ্ছে মার্কিন সমরাস্ত্র। এ সময়েই খবর এল বাল্টিমোর বন্দরে পাকিস্তানি জাহাজ পদ্মা আসছে যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য মার্কিন অস্ত্রের চালান নিতে। মার্কিন সরকারের এই অন্যায় ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবাদে বাল্টিমোরের একদল নারী-পুরুষ সিদ্ধান্ত নিলেন পদ্মায় কোনো অস্ত্র উঠবে না। শুরু হলো পদ্মা অবরোধ আন্দোলন।

কিছু করতে চাই
জুন মাসজুড়ে পত্রিকার পাতায় ছাপা হচ্ছিল ভয়াবহ সব ছবি: হাজার হাজার বাঙালি প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে ভারতে, সহায়-সম্বলহীন দুর্বল অভুক্ত মানুষের দীর্ঘ কাফেলা। তাদের একেকজনের চোখেমুখে আতঙ্ক, দিশেহারা দৃষ্টি। খবর আসছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে।
১৯৭১ সালের গ্রীষ্মের ওই সময় পশ্চিম ফিলাডেলফিয়ার কিছু শান্তিকামী মানুষ একত্র হয়েছে ফিলাডেলফিয়া লাইফ সেন্টারে অহিংস আন্দোলনের ওপর প্রশিক্ষণ ও আলোচনার জন্য; আয়োজক কোয়েকার ফাউন্ডেশন, এটা ঈশ্বরবিশ্বাসী শান্তিকামী কিছু মানুষের সংগঠন।
ওই সভারই একজন সদস্য রিচার্ড টেলর, যিনি বিভিন্ন কারণে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর একটি প্রতিদিনের মিডিয়ার খবর আর তাঁর বন্ধু বিল ময়ার। টেলরের মতো ময়ারও পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। বিল ময়ার গিয়েছিলেন মিলাওয়াকির এক শান্তি আলোচনায়, সেখানে দেখা পুরোনো বন্ধু ডিক মারের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকেই ময়ার জানতে পারেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্য দিচ্ছে। তিনি সাক্ষী হিসেবে হাজির করেছেন পাকিস্তানি এক শান্তিকর্মী একবাল আহমেদকে। একবাল বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনেছেন: যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভূমিকা শুধু সমর্থনেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা সমরাস্ত্রসহ অন্য সব রকম সাহায্যই পাঠাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের খুনি সরকারকে।
বিল কৌতূহল থেকেই ডিক মারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র পাকিস্তানে যাচ্ছে কীভাবে?’
‘জাহাজে?’ জবাব এসেছিল।
বিল ময়ার আগপিছ না ভেবেই বলেছিলেন, ‘ওই জাহাজ কোনোভাবে আটকে দেওয়া যায় না?’
ডিক উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ যায় তো...জাহাজগুলো তো ইস্ট কোস্টের বন্দরেই আসছে। তোমার কিছু একটা করা উচিত।’ এই ভাবনাই ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল বিল ময়ারকে।
সে কারণেই কোয়েকারের ২২ জুনের সভায় হাজির করা হয় ওইদিন টাইম-এ টেড জুলকের লেখা একটি প্রতিবেদন, তাতে বলা হয়েছে: যদিও আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, মার্চে পাকিস্তানের দমন অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে আসছে অস্ত্রের চালান নিতে...
মার্কিন সরকারের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে পাকিস্তানি সামরিক সরকার, এটা অনুধাবন করার পর থেকেই সদস্যদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ট্যাক্সের টাকা ব্যবহার হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ হত্যায়। ‘আমাদের যুদ্ধবিমান, ট্যাংক আর বন্দুক-গোলবারুদ ব্যবহার করে মারা হচ্ছে শত শত নিরীহ মানুষকে। আমাদের বুলেট ব্যবহার করা হচ্ছে নির্বাচনে বিজয়ী একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।’
‘আমাদের এখন কী করা উচিত?’ কেউ একজন প্রশ্ন করেছিলেন। ‘হারবারে মাইন পেতে রাখব।’
বিল ময়ার চিন্তাভাবনা না করেই বলেছিলেন, ‘মাইন নয়, জাহাজ অবরোধ করতে হবে। তবে সেটা আমাদের অহিংস নীতিও বজায় রেখে।’
এভাবেই সমুদ্রতীরের এক শহরে হাজার মাইল দূরের নিদারুণ কষ্টে থাকা পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য নিজের দেশের সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরিকল্পনা করে ফিলাডেলফিয়ার একদল শান্তিকামী মানুষ।

ফ্রেন্ডস অব বেঙ্গল
সুলতানা ক্রিপেনডরফ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। জার্মান বংশোদ্ভূত স্বামী ক্লাউস কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট। তাঁদের প্রথম সন্তান কাইহান—কিন্তু তিন মাস ধরে এই পরিবারের সুখ-শান্তি সব হারাম হয়ে গেছে। বাঙালি মেয়ে সুলতানার পুরো পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবাই থাকে পূর্ববঙ্গে। আর প্রতিদিন মিডিয়া খবর দিচ্ছে, পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে সেখানে, বাবা-মায়ের চিন্তায়, দেশের চিন্তায় সুস্থির হতে পারছেন না সুলতানা। পড়াশোনা বাদ পড়েছে, ছোট্ট শিশুপুত্র কাইহানের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে না, তাঁর অস্থির সময় কাটছে টেলিফোনের সামনে। একের পর এক ফোন করছেন, যদি কোনো সাহায্য মেলে। ফোন করেছেন বিভিন্ন পিস গ্রুপকে, রাজনীতিতে সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠনকে, উইমেন্স স্ট্রাইক ফর পিস, দ্য উইমেন ইন্টারন্যাশনাল লিগ অব পিস অ্যান্ড ফ্রিডম—কাউকে বাদ রাখেননি। সবাই সমবেদনা জানিয়েছে। কিন্তু তারা ব্যস্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যাঁদের অনেকেই দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন, তাঁদের কাছেও সাহায্য চেয়েছেন, চিঠি লিখেছেন, কিন্তু তাঁরাও কেউ জড়াতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত এপ্রিলের শেষাশেষি, অনেক চেষ্টায় বাঙালি ও মার্কিনদের ছোট একটা দলকে একত্র করে গঠন করা হলো ‘ফ্রেন্ডস অব ইস্ট বেঙ্গল’।
এই দলের কারোরই এর আগে এ ধরনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই দলটি শেষ পর্যন্ত ভালোমতো কাজ করবে কিনা এই নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু সুলতানা ও অন্যান্য বাঙালি এবং মার্কিনদের আন্তরিক চেষ্টায় ধীরে ধীরে সংগঠনটি শক্তি অর্জন করে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে নানা রকম কর্মকাণ্ড চালাতে শুরু করে, ফিলাডেলফিয়ার বাইরেও যোগাযোগ হতে থাকে বাংলাদেশের প্রতি সমব্যথিদের সঙ্গে।
২২ জুন টাইমের রিপোর্ট থেকেই যখন জানা গেল: ‘এস এস পদ্মা’ নামে একটি পাকিস্তানি জাহাজ বাল্টিমোর বন্দরে অস্ত্র বোঝাই করবে।
ফলে ফ্রেন্ডস অব ইস্ট বেঙ্গল এবং ফিলাডেলফিয়ার কোয়েকার সংগঠন একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নিল:‘পদ্মা’য় অস্ত্রের চালান ঠেকানোর চেষ্টা চালাবে তারা।
ড. উইলিয়াম গ্রিনাউ জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে কলেরা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি পেন্টাগনের একটি গোপন সূত্র থেকে জানতে পারেন, শুধু পদ্মা নয় একাধিক পাকিস্তানি জাহাজ অস্ত্রের চালান গ্রহণ করতে যুক্তরাষ্ট্র অভিমুখে রয়েছে। এর একটি কিংবা দুটি আসছে ইস্ট কোস্টের বন্দরগুলোতে। এ খবর পাওয়ামাত্র গ্রিনাউ দেখা করেন টাইম-এর সাংবাদিক ট্যাড জুলের সঙ্গে। তারই ফল ২২ জুন টাইম-এর রিপোর্ট। জুল লেখেন: নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে। গ্রিনাইয়ের সূত্র ব্যবহার করেই...টাইম-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ট্যাড পদ্মা নামের পাকিস্তানের জাহাজের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন। বলা হয়, পদ্মায় যুদ্ধবিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ ও সামরিক যানের যন্ত্রাংশ এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করা হবে।

কোয়েকারের কজন কীর্তিমান
কোয়েকার সদস্যদের শুরুর দিকে আন্দোলনে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও ফ্রেন্ডস অব ইস্ট বেঙ্গল যোগ দেওয়ার পর, সুলতানার মুখে পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের কাহিনি শুনে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে যায়। প্রথম দিকের ৩০-৪০ জন দলের সদস্য সংখ্যা এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০০ জনের ওপরে। এদের একজন রিচার্ড টেলরের পুরোনো বন্ধু জ্যাক প্যাটারসন—বাল্টিমোরের আমেরিকান ফ্রেন্ডস সোসাইটির বাল্টিমোর শাখার সভাপতি—পত্রিকা-ম্যাগাজিন পড়ে এরই মধ্যে পাকিস্তানযুদ্ধের অনেক খবরই তিনি জেনেছেন। এসেছেন অ্যালেক্স কক্স—লাল চুলের এক টেক্সান, ফিলাডেলফিয়া স্কুল কাউন্সেলর, সদ্য ন্যাশনাল এডুকেশন কনভেনশন শেষ করে ফিরেছেন। ‘আমাদের ট্যাক্সের টাকায় মিলিটারি সাহায্য যাচ্ছে পাকিস্তানে। এটা আমার মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ অনুভূতি তৈরি করে...জাহাজ আটকানোর পরিকল্পনাটা আমার কাছে নাটকীয় মনে হলেও এই ঘটনা থেকে মার্কিন জনগণ প্রতিবাদের কথা জানতে পারবে।’ বাল্টিমোর সানকে বলেছিলেন।
ফিলাডেলফিয়া শহরতলির এক গোলাঘরের কর্মচারী ওয়েন লাউজার। ২৩ বছর বয়সী এই শান্তিকর্মী এর আগেও ১৯৬৯ সালে ক্লিভল্যান্ড থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত যুদ্ধবিরোধী এক পদযাত্রায় অংশ নিয়ে প্রতিবাদলিপি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাছে। ওয়েনই প্রথম প্রস্তাব করেন জাহাজ প্রতিরোধে ক্যানো (ছোট আকারের নৌকা) ব্যবহার করার। ওয়েন নিজেও একজন দক্ষ ক্যানো-চালক।
স্যালি উইলোবি বড় হয়েছেন কোয়েকার শান্তিকর্মীবেষ্টিত পরিবারে। তাঁর বাবা জর্জ উইলোবি ও মা লিলিয়ান গান্ধীবাদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। ২৪ বছর বয়সী স্যালি মাত্র কিউবায় নৌকা চালিয়ে যুদ্ধবিরোধী এক শান্তি অভিযাত্রা শেষ করে ফিরেছেন। পাকিস্তানি জাহাজ হটানোর পরিকল্পনায় তিনিও রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন।
কোয়েকারের আরেক সদস্য ফিলাডেলফিয়া স্কুলের স্টাফ পারসন মাল স্কট আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তার পুরো পরিবার নিয়ে।

পদ্মা নিয়ে ধূম্রজাল
বাল্টিমোর সান-এ ছোট্ট একটা সংবাদ ছাপা হয় বিজনেস পাতায়: বুধবার, পদ্মা ভিড়বে বাল্টিমোরে, ইস্ট ওয়েস্ট শিপিং এজেন্সি।
১১ জুলাই বাল্টিমোর হারবারে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। প্রতিবাদকারীরা মিছিল নিয়ে হাজির হন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে, বন্দরে। আন্দোলনের এই সময়ে একেকজন সদস্য দিনে ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেছেন। কর্মীরা শুধু আন্দোলনের কর্মকৌশল নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁরা লিফলেট, প্ল্যাকার্ড-সাইন তৈরি; প্রেস রিলিজ, টিভি স্টেশনে খবর পাঠানোর মতো কাজও করেছেন।
পাকিস্তানি জাহাজ পদ্মার ভেড়ার কথা ছিল বন্দরের ৮ নম্বর পিয়ারের কভিংটনে। কিন্তু ১৩ জুলাইয়েও পদ্মার দেখা নেই। ‘এক শ একটা গুজব ছড়াচ্ছে চারদিকে’, বিল ময়ার লেখেন তাঁর জার্নালে, ‘লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ভাবছে, পদ্মা কোথায়?’
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ, পদ্মার এজেন্ট ইস্ট-ওয়েস্ট শিপিং এজেন্সি—কেউ পদ্মা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নয়। মুখে সবাই কলুপ এঁটে বসে আছে যেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, পদ্মা আদৌ বাল্টিমোরে আসবে কি না, তারই নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে পদ্মার আগের যাত্রায় জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে বাল্টিমোরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এমন কয়েকজন বাঙালি নাবিকও যোগ দিয়েছেন আন্দোলনে। তাঁরা জড়ো হয়েছেন বন্দরের হকিন্স পয়েন্টে। পদ্মা বন্দরে ঢুকলে তাঁরাই সবার আগে দেখতে পাবেন। দেখামাত্র খবর ছড়িয়ে দেওয়া হবে অন্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে।
সর্বশেষ বন্দরের বে পাইলট জানান, পদ্মা বন্দরে ভিড়বে ১৪ জুলাই, বুধবার।

শেষ কথা
১৪ জুলাই সকালে ৮ নম্বর পিয়ার অভিমুখী যাত্রা শুরু হলো আন্দোলনকারীদের। শুরুতে দলটা ছোট থাকলেও দেখতে দেখতে জমায়েত দুশর কাছাকাছি চলে গেল। খবর পেয়ে হাজির হয়েছে টিভি ক্রু, বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক আর পুলিশ। জাহাজের কোনো কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে মিছিলকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ পিছপা হবে না। বার্তা খুব স্পষ্ট, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল, পদ্মার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তাদেরও নৈতিক সায় আছে। নেতৃত্বে রিচার্ড টেলর, ছোট ছোট নৌকা ক্যানো আর কায়াক নিয়ে নেমে পড়ল তাঁরা: ওয়েন লাউজার আর মাল স্কট ৮ নম্বর পিয়ারের কাছাকাছি গিয়ে দেখে, সেখানে আগেই আরও তিনটি কায়াক নিয়ে পৌঁছে গেছে স্যালি উইলোবি, স্টেফানি হলিম্যান আর অ্যালেক্স কক্স। কিন্তু পদ্মার কোনো দেখা নেই তখনো। ফলে ক্যানো আর কায়াকের ৮ নম্বর পিয়ার অভিমুখী এই অবরোধযাত্রা পরিণত হলো নিছক এক মহড়ায়। উপকূল থেকে ওয়াকিটকিতে বিল মারে জানাল, পাকা খবর জানা গেছে, পদ্মা বন্দরে ভিড়বে রাতে। কাজেই সবাই স্টোনি হাউসে ফিরে এল। নৌকাগুলো যেকোনো মুহূর্তে পানিতে নামার উপযোগী করে তৈরি রাখা হলো।
সন্ধ্যা ছটায় যখন সাপার গরম করা হচ্ছিল, তখনই ফোন বেজে উঠল, পদ্মা হারবারে ঢুকেছে।
এর পরের ঘটনা: ক্যানো আর কায়াকে চেপে বিশাল আকৃতির পদ্মার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে গ্রেপ্তার হলো—রিচার্ড টেলর, মাল স্কট, স্যালি উইলোবি, স্টেফানি হলিম্যান, ওয়েন লাউজারসহ মোট সাতজন। যদিও এক রাতের বেশি জেলে কাটাতে হলো না তাঁদের। এরপর দ্রুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। বন্দরের মাল ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত লংসোরম্যান অ্যাসোসিয়েশন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর পদ্মায় কোনো কারগো ওঠা-নামায় তাদের শ্রমিক অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিল।
ফিলাডেলফিয়ার এই অহিংস আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকার অন্যত্রও। পদ্মার মতো সামরিক সরঞ্জাম না ভরেই আরও পাকিস্তানি জাহাজকে ফিরে যেতে হয় নিউইর্য়ক থেকে সুটলাজ, ফিলাডেলফিয়া সিটি হারবার থেকে আল-আহমাদি জাহাজকে। আন্দোলন পৌঁছে যায় হোয়াইট হাউসের দোরগোড়া পর্যন্ত। সেখানে শান্তিকামী মানুুষ ভারতে বাঙালিদের শরণার্থী শিবিরের আদলে গড়ে তোলে প্রতিবাদ ক্যাম্প।
সূত্র: রিচার্ড টেলরের ব্লকেড গ্রন্থ, ৫ ডিসেম্বর প্রথম আলো কার্যালয়ে নেওয়া স্যালি উইলোবির সাক্ষাৎকার

Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-09/news/207249

1645
মফস্বলে দেশসেরা বিদ্যালয়!
মজিবর রহমান খান,
ঠাকুরগাঁও

আমাদের দেশে শহর বা শহরতলির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই দেশসেরা হবে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরাই হবে সেরা মেধাবী—এটা যেন ধরেই নেওয়া হয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেই ব্যতিক্রমী একটি বিদ্যালয় হলো ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২০০৮ সালে দেশসেরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে বিদ্যালয়টি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর স্থানীয়দের চেষ্টার ফসল এই অর্জন।
বিদ্যালয়ে এক দিন: সম্প্রতি এক সকালে বিদ্যালয়ের চত্বরে ঢুকতেই নজর কাড়ে বিদ্যালয় মাঠের ঝকঝকে পরিবেশ। পতাকা দণ্ডে পতপত করে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। পাশেই স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। বিদ্যালয় ভবনের বারান্দায় সাজানো হরেক রকম ফুলগাছের টব।
বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষগুলোর নাম রাখা হয়েছে বিভিন্ন মনীষীর নামে। কক্ষের দেয়ালে তাঁদের ছবিও আঁকা। ছবির পাশে মনীষীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। মনীষীদের মধ্যে আছেন জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, ভাষাশহীদ বরকত, রফিক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি সুফিয়া কামাল, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, পল্লিকবি জসীমউদ্দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। শিশুদের ছোট থেকেই দেশের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য আঁকা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিষয়ক নানা ছবি। রয়েছে মনীষীদের বাণী।
বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ কম্পিউটার ল্যাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেখানে রয়েছে তিনটি কম্পিউটার। তৃতীয় শ্রেণী থেকেই এখানে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে ই-বুকের মাধ্যমে গণিত বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছিলেন সহকারী শিক্ষিকা ফারজানা আক্তার। ‘আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে নিয়মিত মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হয়। এতে অমনোযোগী শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।’ জানালেন তিনি।
বিদ্যালয়ের কার্যালয় কক্ষটি সাজানো বিভিন্ন স্মারক ও পুরস্কার দিয়ে। তিনটি আলমারিতে শিশুমানস বই ও শিক্ষা উপকরণ। দেয়ালে সেঁটে দেওয়া তথ্যবোর্ড। সেখানে দেওয়া তথ্যমতে, বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী ৮৩৭ জন। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ২০১০ সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ের ২৩৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। ২০১০ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ১৪২ জন শিশু অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছে।
বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণীতে মোট ১১টি শাখা। প্রতিটি শাখায় ন্যূনতম ৫০ জন শিক্ষার্থী। সবগুলো শাখায় আছে একজন করে ক্যাপ্টেন। শিক্ষার্থীদের খাওয়ার জন্য বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি ক্যানটিন। প্রতিটি শ্রেণীকক্ষেই আছে পানি খাওয়ার ব্যবস্থা।

প্রতিষ্ঠাকালের কথা: ১৯৩০ সালের দিকে রানীশংকৈলের পালপাড়া গ্রামের চন্দ্র হরিপাল নিজ বাড়িতে একটি পাঠশালা খোলেন। নাম দেন ‘চন্দ্র হরির পাঠশালা’। তাঁর মৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে যায় পাঠশালাটি। ১৯৩৫ সালে ওই গ্রামের সহোদর চিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত ও সুরেন্দ্রনাথ রক্ষিতের দান করা এক একর পাঁচ শতক জমিতে বিদ্যালয় করা হয়। তবে নাম দেওয়া হয় রানীশংকৈল প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৯২ সালে উপজেলার মডেল বিদ্যালয় করা হয়।
বদলের শুরু: বিদ্যালয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিকা রেবা রানী রায় জানালেন, ১৯৯২ সালে বর্তমান প্রধান শিক্ষক বিজয় কুমার যোগ দেন। তখন বিদ্যালয়ের পরিবেশ দেখে তাঁর মন খারাপ হয়ে যেত। পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ নেই, মাঠের নোংরা আবর্জনার দুর্গন্ধ। একদিন স্কুলের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ডেকে প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘বিদ্যালয়টি কার?’ উত্তরে শিক্ষার্থীরা সমস্বরে বলল, ‘আমাদের’। তিনি জানতে চাইলেন, তাহলে বিদ্যালয়ের মাঠ এত নোংরা কেন? এরপর প্রধান শিক্ষক নিজেই বললেন, ‘আজ আমরা মাঠের মাত্র চার হাত জায়গা পরিষ্কার করব।’ এই বলে তিনি মাঠ পরিষ্কার শুরু করলেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই। সেই শুরু বিদ্যালয়ের বদলে যাওয়া।
এরপর প্রধান শিক্ষক এলাকার সুধীজনদের নিয়ে বিদ্যালয়ের পড়ালেখার পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা চাইলেন। সেদিনই সুধী সমাজের সহায়তায় বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়। পরে সবার সহযোগিতায় নির্মাণ করা হয় দুটি শ্রেণীকক্ষ। প্রধান শিক্ষকের পরিকল্পনায় শিক্ষকেরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়ি পরিদর্শন করে কথা বলেন অভিভাবকদের সঙ্গে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ‘মা’ সমাবেশ শুরু হলো। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শ বাস্তবায়িত হলো বিদ্যালয়ে। উপজেলার সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে সর্বজনীন একটি কমিটি করা হলো। সবার সহযোগিতায় শিক্ষার চমৎকার পরিবেশ নিশ্চিত হলো, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বেড়ে গেল, ফলও ভালো হতে থাকল।
অন্য বিদ্যালয় থেকে আলাদা: বিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে কল্যাণ সমিতি ও শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি।
২০০৮ সালে প্রতিটি অভিভাবকের কাছ থেকে মাথাপিছু অতিরিক্ত দুই টাকা করে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কল্যাণ সমিতির তহবিল। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জমিতে ভাড়া দেওয়া চারটি দোকান থেকে ভাড়া ও প্রতি মাসে কিছু অনুদান এই তহবিলে জমা হয়। সেই তহবিল থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ওই তহবিল থেকে চলতি মাসে ১৩৩ জন শিক্ষার্থীকে নতুন পোশাক ও একজনকে চিকিৎসা-সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্রদের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে বই-খাতা ও কলম।
বিদ্যালয়ে কম্পিউটার, শরীরচর্চা ও নাচ-গানের জন্য তিন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে নৈশপ্রহরী, অফিস সহকারী ও দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য রাতে আড়াই ঘণ্টা পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আছে জেনারেটর। রাতে অতিরিক্ত চারজন শিক্ষক এই শিক্ষার্থীদের পড়ান। এসব খরচ মেটানো হয় কল্যাণ তহবিল থেকেই।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের মুঠোফোন নম্বর বিদ্যালয়ে রাখা হয়েছে। উপস্থিতি বাড়াতে পরীক্ষায় উপস্থিতির ওপর সংরক্ষিত রাখা হয়েছে ৫০ নম্বর।
বিদ্যালয়ের অর্জন: রানীশংকৈল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উকিল চন্দ্র রায় জানান, ২০০৮ সালে রানীশংকৈল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দেশের সেরা বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়টি ২০১০ সালে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ক্যাটাগরিতে রংপুর বিভাগে শ্রেষ্ঠ স্থান লাভ করে।
শিক্ষার্থীদের কথা: চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী সুমাইয়া জান্নাতি বলে, ‘বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকদের ব্যবহার সব সময় আমাদের আকৃষ্ট করে। পড়া না বুঝলে স্যার-আপারা কখনোই বিরক্ত বোধ করেন না, বারবার বুঝিয়ে দেন।’ পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রাফি তোরাব বলে, ‘আমি ঠাকুরগাঁও শহর ছেড়ে এখানে পড়তে এসেছি। বিদ্যালয়টি ভালো বলে বাবা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে।’
প্রধান শিক্ষক যা বলেন: প্রধান শিক্ষক বিজয় কুমার এই সাফল্য সম্পর্কে বলেন, ‘নিজের কাজটুকু সব সময় যত্ন দিয়ে করতে হয়। একজন মানুষের পেশা ও নেশার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ভালো কিছু করতে পারে না। আমি পেশাকে নেশা হিসেবে নিয়েছি। আর এত সাড়া দিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার সুধীজন। সবার সহায়তায় এ সাফল্য।’
তাঁদের কথা: বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও রানীশংকৈল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সইদুল হক বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত। যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই বিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা ধরে রাখতে চাই।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম তৌফিকুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়টি সারা দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’

Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-17/news/209411

1646
স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো
নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে, তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু-পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না।
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু-পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে,
ফুলের বাগানে ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হূদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ...।

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু-পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।
সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান, ...এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখণ্ড আকাশ যে রকম, সে রকম দিগন্তপ্লাবিত
ধু-ধু মাঠ ছিল দুর্বাদলে ঢাকা, সবুজের সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু-ধু মাঠের সবুজে।

কপালে, কবজিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক;
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মতো শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে।

একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: ‘কখন আসবে কবি?’
‘কখন আসবে কবি?’
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হূদয়ে লাগিল দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা।
কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর
অমর কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
চাষাভুষার কাব্য (১৯৮১) থেকে

Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-15/news/141513

1647

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একাত্তরের প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি দিবসই রক্তের অক্ষরে লেখা। তার পরও কোনো কোনো তারিখ ত্যাগে, আত্মদানে ও গৌরবের মহিমায় হয়ে ওঠে সমুজ্জ্বল। একটি তারিখ পরিণত হয় সংগ্রামের প্রতীকে, শ্রদ্ধা ও বিজয়ের অবিনাশী স্মারকে।
একাত্তরের এ রকমই ১০টি তারিখ নিয়ে প্রথম আলোর স্বাধীনতা দিবস সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে—
৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ;
২৬ মার্চ, স্বাধীনতা ঘোষণা;
১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর সরকার গঠন;
১১ জুলাই, সেক্টর কমান্ডারদের বৈঠক;
১ আগস্ট, দ্যকনসার্ট ফর বাংলাদেশ;
৩ ডিসেম্বর, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ;
৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি;
৪-১৫ ডিসেম্বর, জাতিসংঘে বাংলাদেশ-বিতর্ক;
১৪ ডিসেম্বর, বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং
১৬ ডিসেম্বর, চূড়ান্ত বিজয়।
একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন রূপ নিয়েছিল, কোনো কোনো তারিখে তাও প্রতীকায়িত হয়েছে। শোক ও বীরত্বগাথায় ঋদ্ধ এ দিনগুলো আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে কেবল ইতিহাসের সাক্ষ্য নয়, ভবিষ্যতের পথচলায় নিত্যপ্রেরণা হিসেবেও।
আমরা উদ্যাপন করছি স্বাধীনতার ৪০ বছর। সুন্দর, আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এখন আমাদের সামনে পরিবর্তনের সংগ্রাম। আমাদের বদলে দেওয়ার, বদলে যাওয়ার সংগ্রামে পথচলার প্রেরণা জোগাবে একাত্তরের এই দিনগুলো।
মতিউর রহমান
Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-15/news/141507

1648
Heritage/Culture / Districts of Bangladesh
« on: December 15, 2011, 04:43:01 PM »
Dear all,

We all are Bangladeshi. We have 64 districts in our country.
We should know the detail of every district.
In this purpose this address can help us : http://en.wikipedia.org/wiki/Districts_of_Bangladesh

1649
Heritage/Culture / Country Profile of Bangladesh
« on: December 15, 2011, 02:12:27 PM »
Dear all,

Bangladesh is our motherland. So we have to a clear concept about our country.

So to get clear concept we can get help from this link : http://www.bdgateway.org/country_profile.php#bdmap

1650
মৃত্যুর আগে কেউই জানে না জীবনের মূল্য ও পরিণতি। কিন্তু শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা জেনেছিলেন। চিঠিটা পড়ুন:

‘‘প্রিয় আব্বাজান! টেকেরঘাট হইতে
তাং-৩০/৭/৭১
আমার সালাম নিবেন। আশা করি খোদার কৃপায় ভালই আছেন। বাড়ির সকলের কাছে আমার শ্রেণীমত সালাম ও স্নেহ রইলো। বর্তমানে যুদ্ধে আছি। আলীরাজা, মাহতাব, রওশন, রুনু, ফুলমিয়া, ইব্রাহিম সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করিয়াছি। আমাদের জন্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য দোয়া করবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি, কারণ দেশ স্বাধীন না হইলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধকে জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম।
আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদের ক্ষমা করিব না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে। চাচা-মামাদের ও বড় ভাইদের নিকট আমার ছালাম। বড় ভাইকে চাকুরীতে যোগ দিতে নিষেধ করিবেন। জীবনের চেয়ে চাকুরী বড় নয়। দাদুকে দোয়া করিতে বলিবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হইতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত আছি। দোয়া করিবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্র হারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন। আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নাই। আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সকল সাধ মিটে যাবে।
দেশবাসী! স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর। মীরজাফরী করিও না, কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদেরকে মাফ করিবে না এবং এই বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।
সালাম! দেশবাসী সালাম!
ইতি, মোঃ সিরাজুল ইসলাম, ৩০-৭-৭১ ইং’’

এর আট দিন পর কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র সিরাজ সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের যুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে জয়ী হন; কিন্তু সেটাই ছিল তাঁর শেষ যুদ্ধ। জয়ের উচ্ছ্বাসে স্লোগান দিতে গিয়ে অসাবধানে পজিশন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, ঠিক তখনই পলায়মান শত্রুর ‘কাভারিং ফায়ারের’ একটি বুলেট এসে লাগল তাঁর চোখে। চিকিৎসার জন্য মিত্র বাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতে নেওয়ার পথেই শেষ নিঃশ্বাস নির্গত হয়। সন্ধ্যায় খাসিয়া পাহাড়ের কোলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’-এর কাছাকাছি টেকেরঘাটে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরাধীন দেশের মাটি তিনি পাননি, কিন্তু স্বাধীনতার পরও কেন এক শহীদ বীরপ্রতীককে পড়ে থাকতে হবে সীমান্তের ওপারের নো ম্যান্স ল্যান্ডে?
প্রাণের চেয়ে বড় দান আর হয় না। তবে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, প্রাণের চেয়ে বড় দান আছে, তা হলো দেশভক্তি। সিরাজ দেশের জন্য প্রাণ ও ভক্তি দুটোই দিয়েছিলেন। তাই তো বলতে পারেন, ‘আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি, কারণ দেশ স্বাধীন না হইলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধকে জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম।’ সে সময় তাঁরা আত্মদানের মতো বিমূর্ত ভাষা বলতেন না, বলতেন ‘জান কোরবান’ করার কথা।
ছোট্ট একটি চিঠি, কিন্তু কেবল নিষ্ঠার শুদ্ধতাতেই নয়, নীতির শক্তিতেও অসামান্য। একাত্তরের চিঠির বেশির ভাগ চিঠিই মাকে সম্বোধন করা (প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯)। সেই মা কেবল ব্যক্তিগত মা নন, যোদ্ধা ছেলে নিজে যেমন দেশের সন্তান হয়ে ওঠে, তেমনি জননীকেও ভাবে দেশমাতৃকার আদলে। ১৯ নভেম্বর, ১৯৭১ ‘যুদ্ধখানা হইতে তোমার পোলা’ নুরুল হক মাকে লেখেন, ‘আমার মা, আশা করি ভালোই আছ। কিন্তু আমি ভালো নাই। তোমায় ছাড়া কীভাবে ভালো থাকি! তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। তার মধ্যে ছয়জন মারা গেছে, তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, “খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে,’’ তাই আমি পিছুপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব...।’ জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে দেশমাতা আর জন্মদায়িনী যখন একাকার, তখন মায়ের ছেলেরাও অনায়াসে দেশের ছেলে হয়ে যায়।
কিন্তু সিরাজ মাকে সম্বোধন করে লিখতে পারেননি, কারণ মা ‘পাগল’। যোদ্ধা পুত্র তাই বাবাকে সম্বোধন করে লেখেন। তাতেও তাঁর উদ্বেল হূদয় তৃপ্ত হয় না; চিঠিটার শেষে তিনি দেশবাসীকেই ডাকেন:
‘দেশবাসী! স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর। মীরজাফরী করিও না, কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদেরকে মাফ করিবে না এবং এই বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।’
পরিবারের দায়িত্ব হিসেবে বাবাকে যা বলেন, তা অসাধারণ।
‘আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদের ক্ষমা করিব না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে।’
ভাইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে এক বাক্যের উদ্বেগের পরই বোনদের বিষয়ে বলেন, ‘আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সকল সাধ মিটে যাবে।’
একাত্তরের চেতনার দলিল ইতিহাসে যত না, তার থেকে বেশি মিলবে মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিঠিতে। চিঠিটা তিনি শেষ করেন জাতির প্রতি ডাক দিয়ে:
‘দেশবাসী! স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর। মীরজাফরী করিও না, কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদেরকে মাফ করিবে না এবং এই বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।’
পরিবার ও দেশের জন্য তাঁর এই নির্দেশনার মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের সত্যিকার মুক্তির শর্ত নিহিত ছিল। কিন্তু একাত্তরের পরের ইতিহাস সেই সব নির্দেশনা অমান্য করারই ইতিহাস।
যে ‘যুদ্ধকে জীবনের পাথেয় করে’ নিয়েছিলেন সিরাজরা, সেই যুদ্ধ পেরিয়ে তাঁরা আসতে পারেননি বর্তমানে। কিন্তু তাঁদের কৃতকর্ম, তাঁদের স্মৃতি ও চিঠির অস্তিত্ব এক নিত্য বর্তমানে। যখনই পড়ি এই চিঠিগুলো, মনে ভাসে বাংকারে শায়িত, অথবা অন্ধকারে নদী পেরোনো অথবা প্রশিক্ষণ শিবিরের তাঁবুতে রাত জাগা কোনো যুবকের ছবি। জীবিতের ক্ষয় আছে, শহীদেরা অক্ষয়, তাঁদের বয়স কখনো বাড়ে না। একাত্তরের চল্লিশ বছর পরও তাঁরা যুবকই রয়ে যান আমাদের মনে।
দেশটা বধ্যভূমিময়। আজকের তরুণ, যে মাটিতেই পা রাখো, জানবে আশপাশে কোথাও নিশ্চয়ই আছে কোনো না কোনো শহীদের গায়েবি কবর। তাই মাটির দিকে তাকিয়ো, জানিয়ো তোমার বা তোমার চেয়ে কম বয়সী কারও রক্ত-অস্থি-মাংস-চক্ষু সেই মাটিতে মিশে আছে। এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এই ভাবনা আমাকে থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মনে হলো, ওখানে যে শুয়ে আছে, সে তো আমার চেয়েও কম বয়সী! একাত্তরের জাতকেরা এখন স্বাধীনতার সমান কিংবা কিছু বেশি বয়সী। তাদের মনেও নিশ্চয়ই এই অনুভূতি জাগে, কবরে শায়িত তাদের বাবা তাদের চেয়ে কত ছোট! কেবল বয়স পেরোনোর যোগ্যতাতেই আমরা এগিয়ে, কিন্তু তাদের সমান অবদান রাখার সুযোগ আমাদের কি হবে! আমাদের সময়ের তরুণেরা কি পারবে মুক্তিযুদ্ধের ফেলে আসা রণাঙ্গনে, মাটিচাপা বধ্যভূমিগুলোতে, লাখ লাখ ধর্ষিতার পিঠের নিচের অন্ধকার বাংলাদেশে, গোপন বন্দিশালায়, এক কোটি শরণার্থীর দেশত্যাগের মর্মান্তিক যাত্রাপথে, আহত-পর্যুদস্ত মুক্তিযোদ্ধা আর ভুক্তভোগীদের স্মৃতির মণিকোঠায় কোনো দিন পৌঁছাতে? যেখানে যন্ত্রণার শিখা অনির্বাণ জ্বলে। যে জীবন একাত্তরের, তার সঙ্গে কি আমাদের হবে দেখা?
যদি দেখা হয়, যদি জানা হয়, তাহলে তারা প্রশ্ন করবে, মেহনতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হকের ‘রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব...’ এই বিশ্বাস কেন ব্যর্থ হয়েছে? শহীদ সিরাজের আকাঙ্ক্ষা মতো কেন বাংলাদেশের মেয়েরা পুরুষের সমান শিক্ষা ও অধিকার পায়নি? হত্যা, ধর্ষণ, শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিতেও কেন হত্যা-ধর্ষণ, শোষণ-লুণ্ঠন কমিয়ে আনা যায়নি? কেন মীরজাফররা এখনো বাংলার মাটিতে প্রতাপের সঙ্গে বিরাজ করছে? কেন শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশ রূপকথার পিটারপ্যানের মতো শিশুই রয়ে গেল; আর পরিণত হলো না। হিসাব মেলে না। একাত্তরের অসম্পূর্ণ হিসাব মেলানোর দায় আজকের তরুণদের সামনে।
প্রয়াত সেক্টর কমান্ডার বীরোত্তম কর্নেল (অব.) নুরুজ্জামানকে একদিন টিভিতে দেখি। দেশের ভেতরে যুদ্ধ থেকে ফিরে শরণার্থী-শিবিরে এক অন্ধ বৃদ্ধকে পেয়েছিলেন। বৃদ্ধটির সন্তান যুদ্ধে গেছে। অনেক দিন নিখবর। কমান্ডারকে কাছে পেয়ে তাঁর সে কী উচ্ছ্বাস। তিনি কর্নেলের হাত ছুঁলেন, চোখ ছুঁলেন। তারপর সেই স্পর্শ নিজের দৃষ্টিহীন চোখে মাখিয়ে নিয়ে বললেন, ‘বাবা, তোমার এই হাত যুদ্ধ করেছে, তোমার চোখ দেশের মাটি-গাছ-পাখি দেখেছে। বাবা, আমি চোখে দেখি না। তুমি তো দেশ থেকে এসেছ, তুমি বলো আমার দেশ কি এখনো তেমন সবুজ, আমার মাটি কি এখনো তেমন সজল? এখনো কি সেখানে পাখিরা ডাকে?’ অন্ধ বৃদ্ধ সন্তানের জন্য কাঁদেননি, কেঁদেছিলেন বিধ্বস্ত দেশের শোকে? ঘটনার ৩৬ বছর পর সেই কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ কর্নেলের গাল ভেসে যাচ্ছিল অশ্রুতে। তিনি ফোঁপাচ্ছিলেন। একাত্তরের চিঠিগুলো পড়ে তেমন দমকানো কান্না আসে। অশ্রুও কখনো কখনো ক্ষারের মতো কাজ করে। আমাদের জাতীয় আত্মার ময়লা ধুতে এমন ক্ষার এখন অনেক প্রয়োজন।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com
Source : http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-12-14/news/208556

Pages: 1 ... 108 109 [110] 111