Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - ashraful.diss

Pages: [1] 2 3 ... 10
1

এই যুবক আমাদের পিতাকে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।"

দোষী যুবককে টেনে-হিঁচড়ে খলীফার দরবারে নিয়ে এসেছেন দুই ব্যক্তি। তারা তাদের পিতার হত্যার বিচার চান।

খলীফা হযরত উমর (রা) সেই যুবককে জিজ্ঞেস করলেন যে তার বিপক্ষে করা অভিযোগ সত্য  কিনা। অভিযোগ স্বীকার করল যুবক। দোষী যুবক সেই ঘটনার বর্ণনা দিলঃ

"অনেক পরিশ্রমের কাজ করে আমি বিশ্রামের জন্য একটি খেজুর গাছের ছায়ায় বসলাম। ক্লান্ত শরীরে অল্প সময়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একমাত্র বাহন উটটি পাশে নেই। খুঁজতে খুঁজতে কিছু দূর গিয়ে পেলাম, তবে তা ছিল মৃত। অভিযোগকারী এই দুই ব্যক্তির বাবাকে আমার মৃত উটের পাশে পেলাম। সে আমার উটকে তার বাগানে প্রবেশের অপরাধে পাথর মেরে হত্যা করেছে। এই কারণে আমি হঠাৎ করে রাগান্বিত হয়ে পড়ি এবং তার সাথে তর্কাতর্কি করতে করতে এক পর্যায়ে মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে ফেলি। ফলে সে সেইখানেই মারা যায়। যা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে গেছে। এর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"

বাদী’রা জানালেন- "আমরা এর মৃত্যুদণ্ড চাই।" সব শুনে হযরত উমর (রা) অপরাধী যুবককে বললেন, "উট হত্যার বদলে তুমি একটা উট দাবি করতে পারতে, কিন্তু তুমি বৃদ্ধকে হত্যা করেছ। হত্যার বদলে হত্যা। এখন তোমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। তোমার কোন শেষ ইচ্ছা থাকলে বলতে পারো।" নওজোয়ান বললো, "আমার কাছে কিছু ঋণ ও অন্যের রাখা কিছু আমানত আছে। আমাকে যদি কিছু দিন সময় দিতেন, আমি বাড়ি গিয়ে আমানত ও ঋণগুলি পরিশোধ করে আসতাম।"

খলিফা হযরত উমর (রা) বললেন, "তোমাকে এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারি না। যদি তোমার পক্ষ থেকে কাউকে জিম্মাদার রেখে যেতে পারো তবে তোমায় সাময়িক সময়ের জন্য যেতে দিতে পারি।“  নওজোয়ান বললো, "এখানে আমার কেউ নেই যে আমার জিম্মাদার হবে।" যুবকটি তখন নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এই সময় হঠাৎ মজলিসে উপস্থিত একজন সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, "আমি হবো ঐ ব্যক্তির জামিনদার। তাকে যেতে দিন।" আবু যর গিফারীর (রা) এই উত্তরে সভায় উপস্থিত সবাই হতবাক। একে তো অপরিচিত ব্যক্তি, তার উপর হত্যার দন্ডপ্রাপ্ত আসামী! তার জামিনদার কেন হচ্ছেন আবু জর!

খলিফা বললেন, "আগামি শুক্রবার জুম্মা পর্যন্ত নওজোয়ানকে মুক্তি দেয়া হলো। জুম্মার আগে নওজোয়ান মদীনায় ফেরত না আসলে নওজোয়ানের বদলে আবু যরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।" মুক্তি পেয়ে নওজোয়ান ছুটলো মাইলের পর মাইল দূরে তার বাড়ির দিকে। আবু যর গিফারী (রা) চলে গেলেন নিজ বাড়িতে।

দেখতে দেখতে জুম্মাবার এসে গেল। নওজোয়ানের আসার কোনো খবর নেই। হযরত উমর (রা) রাষ্ট্রীয় পত্রবাহক পাঠিয়ে দিলেন আবু যর গিফারির (রা) কাছে। পত্রে লিখা, আজ শুক্রবার বাদ জুমা সেই যুবক যদি না আসে, আইন মোতাবেক আবু যর গিফারির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। আবু যর যেন সময় মত জুম্মার প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে নববীতে হাজির হন। খবর শুনে সারা মদীনায় থমথমে অবস্থা। একজন নিষ্পাপ সাহাবী আবু যর গিফারী আজ বিনা দোষে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবেন।

জুমার পর মদীনার সবাই মসজিদে নববীর সামনে হাজির। সবার চোখে পানি। কারণ দন্ডপ্রাপ্ত যুবক এখনো ফিরে আসেনি। জল্লাদ প্রস্তুত।

জীবনে কত জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু আজ কিছুতেই চোখের পানি আটকাতে পারছে না জল্লাদ। আবু যরের মত একজন সাহাবী সম্পূর্ণ বিনা দোষে আজ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবেন, এটা মদীনার কেউ মেনে নিতে পারছেন না। এমনকি মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রদানকারী খলিফা উমর (রা) নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। হৃদয় তাঁর ভারাক্রান্ত। তবু আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারো পরিবর্তনের হাত নেই। আবু যর (রা) তখনও নিশ্চিন্ত মনে হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। জল্লাদ ধীর পায়ে আবু যর (রা) এর দিকে এগুচ্ছেন আর কাঁদছেন। আজ যেন জল্লাদের পা চলে না। পায়ে যেন কেউ পাথর বেঁধে রেখেছে।

এমন সময় এক সাহাবী উচ্চ স্বরে জল্লাদকে বলে উঠলেন, "হে জল্লাদ একটু থামো। মরুভুমির ধুলার ঝড় উঠিয়ে ঐ দেখ কে যেন আসছে। হতে পারে ঐটা নওজোয়ানের ঘোড়ার পদধুলি। একটু দেখে নাও।" ঘোড়াটি কাছে আসলে দেখা যায় সত্যিই এ সেই নওজোয়ান।

নওজোয়ান দ্রুত খলিফার সামনে এসে বললো, "আমীরুল মুমিনীন, মাফ করবেন। রাস্তায় যদি আমার ঘোড়া পায়ে ব্যথা না পেত, তবে যথা সময়েই আসতে পারতাম। বাড়িতে গিয়ে আমি একটুও দেরি করিনি। বাড়ি পৌঁছে গচ্ছিত আমানত ও ঋণ পরিশোধ করি। তারপর বাবা, মা এবং নববধুর কাছে সব খুলে বলে চিরবিদায় নিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এখন আমার জামিনদার ভাইকে ছেড়ে দিন আর আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে পবিত্র করুন। কেননা কেয়ামতের দিন আমি খুনি হিসেবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই না।"

আশেপাশের সবাই একেবারেই নীরব। চারিদিকে একদম থমথমে অবস্থা। সবাই হতবাক, কী হতে চলেছে! যুবকের পুনরায় ফিরে আসাটা অবাক করে দিলো সবাইকে।

খলিফা হযরত উমর (রা) যুবককে বললেন, "তুমি জানো তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তারপরেও কেন ফিরে এলে?" উত্তরে সেই যুবক বলল- "আমি ফিরে এসেছি, কেউ যাতে বলতে না পারে, এক মুসলমানের বিপদে আরেক মুসলামান সাহায্য করতে এগিয়ে এসে নিজেই বিপদে পড়ে গেছিলো।"

এবার হযরত উমর (রা) হযরত আবু যর গিফারী (রা) কে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কেন না চেনা সত্যেও এর জামিনদার হলেন?" উত্তরে হযরত আবু যর গিফারী (রা) বললেন, "পরবর্তিতে কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান বিপদে পড়েছিলো, অথচ কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।"

এমন কথা শুনে, হঠাৎ বৃদ্ধের দুই সন্তানের মাঝে একজন বলে উঠল, "হে খলীফা, আপনি তাকে মুক্ত করে দিন। আমরা তার উপর করা অভিযোগ তুলে নিলাম।"

হযরত উমর (রা) বললেন, “কেন তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছ?” তাদের এক ভাই বলে উঠলো, "কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে নিজেই স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার পরেও অন্য মুসলমান তাকে ক্ষমা করেনি।"

[হায়াতুস সাহাবা-৮৪৪]

2
Common Forum/Request/Suggestions / এতিমদের সরদার
« on: February 01, 2023, 04:50:21 PM »

এতিমদের  সরদার

আবদুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহ, আবদুল ওয়াহাবের মেয়ে আমিনাকে বিয়ে করলেন। এই বিয়ের কয়েক মাস পর তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে  সফর করলেন। অত:পর তিনি রাস্তায় অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করলেন।

এই সময় তার স্ত্রী আমিনা গর্ভবতী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হলেন। কারণ তার গর্ভের এই সন্তানটি কিছু দিন পরে এতিম অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করবে।

আমিনা যখন সন্তানটি প্রসব করলেন তখন তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব অত্যন্ত খুশী হলেন এবং তার নাম রাখলেন মুহাম্মদ। মক্কার প্রথা অনুযায়ী ধাত্রীরা ধনীদের সন্তানদেরকে দুধ পান করানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলো। যখনই কোনো মহিলা জানতে পারে যে, মুহাম্মদ একজন এতিম, তখন তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর অন্য এমন সন্তান খোঁজে যার বাবা রয়েছে এবং ধনী, যাতে তাকে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ প্রদান করতে পারে। পরিশেষে হালিমা সাদিয়া আসলেন এবং এই এতিমকে গ্রহণ করলেন। পরিশেষে তিনি তার পরিবার-পরিজনের জন্য বরকতের কারণ হয়ে গেলেন।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ পাঁচ বছর তার কাছে অবস্থান করলেন। তারপর তিনি তার মায়ের কাছে ফিরে আসলেন। মায়ের কোলে মাত্র অল্প দিন তিনি তার আদর-স্নেহ ও মমতার মাঝে বসবাস করতে পারলেন। তার বয়স যখন ছয় বছর, তখন তাঁর মা চির বিদায় নিলেন। এভাবেই  তিনি শৈশব থেকেই মায়ের স্নেহ  ও বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হলেন, কিন্তু আল্লাহর দয়া ও করুণা তাঁকে কখনই ছেড়ে যায়নি। তাঁর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা আল্লাহ সহজ করে দিলেন। দাদা আব্দুল  মুত্তালিব দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন এবং তাঁর সাথে সুন্দর ব্যবহার করলেন। কিন্তু তিনিও এর দুই বছর পর মৃত্যু বরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল আট বছর। অত:পর লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন চাচা আবু তালিব। তাঁর উপার্জন করার ক্ষমতা হওয়া পর্যন্ত তিনিই তার দেখাশুনা ও দায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তারপর তিনি মহান করুণাময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবুওয়ত প্রাপ্ত হলেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآَوَى وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى وَوَجَدَكَ عَائِلًا فَأَغْنَى

অর্থ : তিনি কি তোমাকে এতিম রূপে পাননি। অত:পর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি তোমাকে  পেয়েছেন পথহারা, অত:পর  পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনি তোমাকে পেয়েছেন নি:স্ব, অত:পর অভাবমুক্ত করেছেন। (সুরা দোহা: ৬-৮)
 
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় আল্লাহর বাণী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এতিম প্রতিপালন ও তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ

অর্থ: সুতারাং তুমি এতিমদের প্রতি কঠোর হবে না। (সূরা দোহা: ৯)

এতিমের গুপ্তধন

আল্লাহর আদেশে মূসা আলাইহিস সালাম খিজির আ:-এর সাথে ঘুরাফিরার জন্য সময় নির্ধারণ করলেন। যেখানে মূসা আ: এই সামান্য সময়ে খিজির আ: থেকে অনেক শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। খিজির আ:- কে আল্লাহ এমন ইলম দান করেছিলেন যা অন্য কাউকে দেননি। আল্লাহ তালাআ তার সম্পর্কে বলেন:

آَتَيْنَاهُ رَحْمَةً مِنْ عِنْدِنَا وَعَلَّمْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا عِلْمًا

অর্থ: আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম এবং আমার পক্ষ থেকে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান।  (সূরা কাহফ: ৬৫)

তাদের দু’জনের চলার পথে বেশ ক্ষুধা পেলো। দূর থেকে একটা শহর দৃষ্টিগোচর হলে তারা সেই শহরের দিকে অগ্রসর হলেন । সেখানে গিয়ে শহরবাসীর কাছে খানার আবদেন করলেন। কিন্তু ঐ শহরের বাসীন্দারা ছিল কৃপণ । তাই তারা তাদেরকে খাদ্য দিতে অস্বীকার করলো। শেষ পর্যন্ত তারা শহরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলেন।

হঠাৎ করে খিজির আ: একটা পুরাতন প্রাচীর দেখতে পেলেন যা ভেংগে পড়ার উপক্রম ছিল। তিনি প্রাচীরের কাছে গেলেন এবং তা মেরামত করে দিলেন।  এদিকে খিজির আ:-এর কাজ  দেখে মূসা আ: আশ্চর্য্য ও বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কি করে এমন সম্প্রদায়ের দেয়াল মেরামত করে দেয়া হলো যে সম্প্রদায় এক লোকমা খাদ্য প্রদান করলো না।

প্রকৃত পক্ষে খিজির আ:-এর এই কাজের পিছনে হিকমত ছিল। তিনি  মূসাকে আ: সেই গোপন তথ্য বর্ণনা  করে বলেন যে, প্রাচীরের নিচে মূল্যবান গোপ্তধন লুকায়িত আছে যার মালিক হচ্ছে শহরের দুই জন ছোট এতিম। যদি তিনি প্রাচীরটি ঐ অবস্থায় রেখে যেতেন তাহলে অনতিবিলম্বে দেয়ালটি ভেংগে পড়ে গুপ্তধনটি প্রকাশ হয়ে যেত এবং জালিম কৃপণ সম্প্রদায় এগুলি নিয়ে নিত। তিনি প্রাচীরটি মেরামত করেছেন যাতে গুপ্তধন এতিমদ্বয় বড় হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। বড় হওয়ার পর কেউ আর তাদের থেকে তাদের সম্পদ কেড়ে নেয়ার সাহস পাবে না।  আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

وَأَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَنْزٌ لَهُمَا وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا فَأَرَادَ رَبُّكَ أَنْ يَبْلُغَا أَشُدَّهُمَا وَيَسْتَخْرِجَا كَنْزَهُمَا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا

অর্থ: আর প্রাচীরের বিষয়টি হল, তা ছিল শহরের দু’জন এতিম বালকের এবং তার নিচে ছিল তাদের গুপ্তধন। আর তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তাই আপনার রব চাইলেন যে, তারা দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তাদের গুপ্তধন বের করে নেবে। এসবই আপনার রবের রহমত স্বরূপ। আমি নিজ থেকে তা করিনি। এ হলো সে বিষয়ের ব্যাখ্যা, যে সম্পর্কে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি। (সূরা কাহাফ: ৮২)

এতিমের প্রতি আমিরুল মুমিনীন ওমর রা.-এর দয়া

আমিরুল মুমিনীন ওমর বিন খাত্তাব রা. এক রাতে মুসলিমদের অবস্থা অবলোকন করার জন্য বের হলেন। তিনি রাস্তায় চলা অবস্থায় প্রজ্জ্বলিত আগুন দেখতে পেলেন। আস্তে আস্তে সেই আগুনের নিকটবর্তী হলেন। দেখতে পেলেন, একজন নারী একটি পাতিলের নিচে আগুন জ্বালাচ্ছে, আর তার পাশে ছোট ছোট কিছু ছেলে কান্নাকাটি করছে। আমিরুল মুমিনীন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন ছেলেগুলি কান্নাকাটি করছে? নারী তাঁকে বললেন, তারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আগুনের উপর পাতিলটিতে কি রয়েছে? মহিলাটি বললো: পাতিল পানি ভর্তি করে নিচে আগুণ দিয়েছি যাতে ছেলেরা ধারণা করে যে, খাদ্য রান্না করা হচ্ছে এবং  কান্না থেকে বিরত থেকে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে যায়। এ কথা শুনে ওমর বিন খাত্তাব রা. দু:খ পেলেন এবং কেঁদে ফেললেন।  অত:পর অতিদ্রুত বাইতুল মালে আসলেন এবং সেখান থেকে কিছু আটা, খেজুর, ঘি, কাপড় ও কিছু দিরহাম সাথে নিয়ে খাদেমকে বললেন: এগুলো আমার ঘাড়ে উঠিয়ে দাও। খাদেম তাঁর পরিবর্তে নিজেই বহণ করতে ইচ্ছা করলে তিনি তাকে বললেন: না আমি নিজেই তা বহণ করব, কারণ আমি কিয়ামতের দিন তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হব।

আমিরুল মুমিনীন বস্তাটি নিজেই ঘাড়ে করে বহণ করত: মহিলাটির বাড়ীতে পৌঁছলেন এবং নিজেই খাদ্য প্রস্তুত করলেন তারপর ছেলেগুলিকে পরিতৃপ্তি সহকারে খাইয়ে দিলেন।

এতিমের দুআ

কথিত আছে এক ব্যক্তি মদ্য পান ও গুনাহর কাজ করত। এক প্রচণ্ড শীতের রাতে রাস্তা দিয়ে চলতে ছিল। অত:পর দেখতে পেলো, একটি ছোট ছেলে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে ও প্রচণ্ড শীতের কারণে কাঁপছে।  ছেলিটির সাথে সে কথাবর্তা বললো,  পরিচয় নিয়ে জানতে পারল যে, সে একজন এতিম। তার দুরাবস্থা দেখে লোকটি  প্রভাবিত হলো। সে ছেলেটিতে খানা খাইয়ে দিলো এবং নিজের পোষাক খুলে তাকে দিলো যাতে সে শীতের কষ্ট থেকে রক্ষা পায়। তারপর নিজ বাড়ীতে ফিরে আসলো এবং ঘুমিয়ে পড়লো। স্বপ্নে দেখলো যেন কেয়ামত উপস্থিত হয়েছে। মানুষ হিসাব নিকাশের জন্য দাড়িয়েছে, আর তার নিজের ব্যাপারে সে দেখছে যে, আজাবের ফেরেশতাগণ এসে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের সামনে সে লাঞ্জিত ও অপমাণিত হচ্ছে। আর যে মুহূর্তে তাকে আগুনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই মুহূর্তে সেই এতিমের সাথে দেখা হলো। এতিমটি তার দুরাবস্থা দেখে আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলো। আল্লাহ এতিমের প্রার্থনা কবুল করলেন এবং ফেরেশতাদেরকে এতিমের প্রতি ভাল ব্যবহারের কারণে তাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন, লোকটির হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সে ভীত হয়ে পড়লো। অত:পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। গুনাহ থেকে তাওবা করলো ও পাপকাজ ছেড়ে দিলো এবং আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দায় পরিণত হয়ে গেল। এবং সংকল্প করলো যে,  সব সময় এতিমের প্রতি ভাল ব্যবহার করবে।

বর্ণিত আছে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক রহ. এতিমদেরকে খেজুর দিয়ে বলতেন। তোমরা আমাকে খেজুরের আটি দাও, আমি তোমাদেরকে দিরহাম দিব। অত:পর এতিমরা তার কাছ থেকে খেজুর নিয়ে যেত এবং ঠাণ্ডা পানি পান করত ও আটিগুলি ফেরত দিয়ে  প্রতিটি আটির পরিবর্তে একটি করে দিরহাম গ্রহণ করত। তারপর তারা তাদের উদর পূর্ণ ও পকেট ভর্তি করে খুশি হয়ে রেব হতো।

এদিকে আব্দুল্লাহ বিন মুবারক বিনয়ের সাথে আওয়াজ করে ক্রন্দন করতেন। এমনকি অশ্রু দিয়ে চেহারা ও দাড়ি ভিজে যেত। তার এক ছাত্র তাকে জিজ্ঞেস করল। আপনি এতিমের উদর পরিতৃপ্ত করেছেন এবং তাদের পকেট দিরহাম দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। এর পরও কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাচ্ছে?

তিনি উত্তরে বললেন: হে ভাই! আমাদের সম্মুখে শক্ত ঘাটি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْعَقَبَةُ فَكُّ رَقَبَةٍ أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ

তবে সে বন্ধুর গিরিপথটি অতিক্রম করতে সচেষ্ট হয়নি। আর কিসে তোমাকে জানাবে, বন্ধুর গিরিপথটি কি? তা হচ্ছে দাস মুক্তকরণ। অথবা খাদ্য দান করা দুর্ভিক্ষের দিনে। এতিম আত্বীয় স্বজনকে। অথবা ধূলি মলিন মিসকীনকে। (সূরা আল-বালাদ: ১১-১৬)

প্রিয় মুসলিম! এতিম প্রতিপালন নি:সন্দেহ এমন কাজ যার দ্বারা দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতের যাবতীয় কল্যাণ সাধন করা যায়। সন্তুষ্টি পাওয়া যায় মহা মহিম আল্লাহ তাআলার। তাই আমাদের সকলের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে এ বিষয়ে সচেষ্ট হয়ে উভয় জগতের সফলতা অর্জন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সকল কাজ সম্পাদন করার তাওফিক দিন। আমিন।

3

এতিমদেরকে কীভাবে প্রতিপালন ও শিক্ষা দিব?


কাতাদাহ রহ. বলেন:

كن لليتيم كالأب الرحيم

এতিমের তরে তুমি দয়াবান পিতার ন্যায় হয়ে যাও। (ইবনে কাসীর: ৪/৬৭৬)

আমরা যারা এতিমের অভিভাবক হতে চাই এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে জান্নাতে অবস্থান করতে ইচ্ছুক। অনুরূপভাবে যারা প্রসস্ত রিজিকের কামনা করি, তাদের উচিৎ পিতৃহারা অসহায় এতিমদেরকে নিজেদের সন্তানের মত লালন-পালন, শিক্ষা দিক্ষা ও জীবন গঠনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা। অত:পর বয়:বৃদ্ধির সাথে সাথে বিচার বুদ্ধি বিকাশ ঘটানোর স্বার্থে ছোট ছোট কাজ ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এবং এর মাধ্যমে তাদেরকে যেন ভবিষ্যৎ জীবনে  কোনো সমস্যার সম্মুখীন  হতে না হয় তার পাকা বন্দবস্ত করা।

ছোট থেকেই এতিমদের অন্তরে আপন সন্তানের ন্যায় ঈমান ও সহিহ আক্বিদার বীজ বপন করা । শিরক ও বিদআত থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে আল্লাহর মহাব্বত ও ভালবাসা সৃষ্টি করা। লোকমান আ: স্বীয় সন্তানকে লালন পালন ও শিক্ষা দান কল্পে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় হয়েছিল। তাইতো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

লোকমান স্বীয় সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন: হে বৎস! আল্লাহর সাতে শরিক করো না, নিশ্চয়ই শিরক করা বড় জুলুম।  (সূরা লোকমান : ১৩)

আল্লাহর ইবাদতে শিরক পরিহার করা, যেমন মৃত অথবা অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে কোনো প্রার্থনা না করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

الدعاء  هو العبادة

অর্থ: দোয়াই এবাদত।

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهما قَالَ: كُنْتُ خَلْفَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فَقَالَ يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظْ اللهَ يَحْفَظْكَ احْفَظْ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلْ اللهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ رُفِعَتْ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ.  سنن الترمذي - قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ

অর্থ: ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে বসা ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন: হে  বৎস! আমি তোমাকে কিছু কথা শিক্ষা দিব। তুমি আল্লাহর হুকুমকে সংরক্ষণ কর আল্লাহ তোমাকে সংরক্ষণ করবেন, আল্লাহর সীমাকে হিফাজত কর আল্লাহকে তোমার সামনে পাবে। যখন চাইবে একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে কেবল আল্লাহর কাছেই করবে।  জেনে রেখ, সমস্ত জাতি যদি তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয় তাহলে এতটুকু উপকারই করতে পারবে যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা তোমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তাহলেও ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে যা আল্লাহ লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং কালি শুকিয়ে গেছে। ( বর্ণনায় তিরমিযী)

আলোচ্য হাদিস থেকে আমরা  শিশু-কিশোরদের প্রতি মহাব্বতের শিক্ষা পেয়ে থাকি।

আরো শিক্ষা পাচ্ছি ছোট থেকেই তাদেরকে আল্লাহর হুকুমের অনুসরণ ও নাফরমানী থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়ার, যাতে করে তারা  দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যের অধিকারী হয়।

একমাত্র আল্লাহর কাছে চাওয়া ও সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের হৃদয়ে আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাস স্থাপন করা। তাদেরকে এমনভাবে লালন-পালন করা যাতে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে আশা-প্রত্যাশা ও সাহসীকতার সাথে গড়ে উঠতে পারে।

وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ، وَأَنَّ الْفَرَجَ مَعَ الْكَرْبِ، وَأَنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا، المعجم الكبير للطبراني -

অর্থ: তুমি জেনে নাও যে, ধৈর্যের সাথে সাহয্য (এর প্রতিশ্রুতি) রয়েছে এবং দু:খের সাথে রয়েছে সুখ। আর কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। ( তবরাণী, মুজাম কাবির)

আল্লাহ মুমিনকে মুসিবত ও কঠিন সময়ে রক্ষা করবেন যদি সে সুসময় আল্লাহর হক ও মানুষের হক আদায় করে থাকে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

تَعَرَّفْ إِلَى اللهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ،  المعجم الكبير للطبراني

সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখবে, তিনি দু:খের সময় তোমাকে মনে রাখবেন। ( তবরাণী, মুজাম কাবির)

واعلم أن ما أخطأك لم يكن ليصيبك ، وما أصابك لم يكن ليخطئك ، شعب الإيمان للبيهقي

জেনে রাখ, যা তোমাকে এড়িয়ে গেছে তা তোমার নিকট পৌছার ছিল না, আর যা পৌঁছেছে তা এড়িয়ে যাবার ছিল না। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, এতিম প্রতিপালনকারীর দায়িত্ব হবে:

১. এতিমকে তাওহিদের কালিমা শিক্ষা দেয়া, বুদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে এর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দেয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।

২. এতিমকে ছোট থেকেই এ শিক্ষা দেয়া যে, তারা যেন আল্লাহর কাছেই চায় এবং এককভাবে তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।

৩.তাদেরকে হারাম কাজোর ব্যাপারে সতর্ক করা, যেমন আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা, মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু প্রার্থনা না করা, তাদের কাছে কোনো সাহায্য না চাওয়া ইত্যাদি। তাদেরকে ভাল করে বুঝিয়ে দেয়া যে, ওরা হচ্ছে সৃষ্টজীব, কোনো উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করার ক্ষমতা রাখেনা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ

তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে না যা তোমার কোনো উপকার করতে পারে না। আর না তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারে।  যদি তুমি তা কর তাহলে নিশ্চয়ই তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।  (সূরা ইউনুস : ১০৬)

৪. এতিমের মা যদি বেঁচে থাকে তাহলে তার সাথে ভাল ব্যবহারের উৎসাহ প্রদান করা ।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ

আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানয়ে দেব যা তোমরা করতে। (সূরা লুকমান: ১৪-১৫)

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

لا طاعة لأحد في معصية الله، إنما الطاعة في المعروف.

আল্লাহর নাফরমানী করে কারো আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎ কাজে।

এতিমকে এ শিক্ষাও প্রদান করতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা আসমানে রয়েছেন, তিনি আমাদের সব কিছু অবলোকন করছেন ও সব কিছুই শুনছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

 الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

পরম দয়াময় আরশে সমাসীন রয়েছেন। (সূরা তাহা: ৫)

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

কোন কিছুই তার অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন সব দেখেন। (সূরা শুরা: ১১)

عن معاوية بن الحكم السلمي رضي الله عنه قال: ...
وَكَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّيبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ لَكِنِّي صَكَكْتُهَا صَكَّةً فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَفَلَا أُعْتِقُهَا قَالَ ائْتِنِي بِهَا فَأَتَيْتُهُ بِهَا فَقَالَ لَهَا أَيْنَ اللهُ قَالَتْ فِي السَّمَاءِ قَالَ مَنْ أَنَا قَالَتْ أَنْتَ رَسُولُ اللهِ قَالَ أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ. صحيح مسلم -

মুয়াবিয়া বিন হাকাম আসসুলামী রা. বলেন, আমার একজন দাসী ছিল সে উহুদ ও আল জাওয়ানীয়া প্রান্তে আমার ছাগল চরাতো। একদিন আমি লক্ষ্য করলাম হঠাৎ একটি বাঘি তার ছাগপাল থেকে একটি ছাগল নিয়ে গেল। আমি যেহেতু  আদম সন্তান, তাই তারা যেমন দু:খ করে, আমিও তেমনি দু:খিত হলাম। কিন্তু আমি তাকে একটা চড় মেরেছি। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলাম, তিনি বিষয়টি আমার নিকট অনেক বড় করে তুলে ধরলেন। আমি বললাম: তাহলে কি তাকে আজাদ করে দিব? তিনি বললেন: তাকে তুমি আমার কাছে নিয়ে আস। আমি তাই করলাম, তাকে তার কাছে নিয়ে আসলাম। তারপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ কোথায়? সে বলল: আসমানে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: তাকে তুমি আজাদ করে দাও, কেননা সে মুমিন। ( সহিহ মুসলিম)

এতিমকে ছোটকাল থেকেই নামাজ শিক্ষা দেয়া,  নামাজের আরকান ও ওয়াজিবসহ তা কায়েম করাতে সচেষ্ট হওয়া। ধীর-স্থিরভাবে তা পালন করার নির্দেশ দেয়া, যাতে সে বড় হয়ে তা যথাযথভাবে পালন করতে অভ্যস্ত হয়। সাথে সাথে অজু গোসল, ও অন্যান্য বিষয় শিক্ষা  দেয়া, যেমন আল্লাহভীরুতা, সত্যবাদীতা, আমানতদারী, ধৈর্য ও সুন্দর চরিত্রের প্রশিক্ষণ দিয়ে মিথ্যা, হিংসা, খিয়ানত, গিবত, চোগলখোরী ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত মোতাবেক সালামের আদব, খাওয়ার আদব, প্রস্রাব পায়খানার আদব ও অন্যান্য আদব শিক্ষা দেয়া।

এতিমরা সমাজ ও জাতিরই একটি অংশ। তাই শুধু এতিমের অভিভাবকের নয়, বরং সমাজের সকলেরই দায়িত্ব হল  সঠিকভাবে তাদের প্রতিপালন ও শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থা করা। কারণ সকলকে আল্লাহর সম্মুখে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। যদি তারা সুন্দর ও সুচারু রূপে তাদেরকে প্রতিপালন করে তাহলে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব ও সৌভাগ্যবান হবে।  আর যদি অবহেলা করে তাহলে দুর্ভাগা হবে এবং তাদের উপরই বর্তাবে এর কুফল, তাদেরকেই দিতে হবে এর মাসূল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে বলেন:

 كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته . متفق عليه

তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। (বুখারি ও মুসলিম)

যারা এতিমের শিক্ষা ও প্রতিপালন করার দায়িত্ব পালন করবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় তাদেরর জন্য সুসংবাদ রয়েছে। নবীজী তার এক সাহাবিকে সম্বোধন করে বলেন,

فوالله لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خير لك من حمر النعم . رواه البخاري ومسلم

আল্লাহর কসম, তোমার দ্বারা আল্লাহ যদি একজন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন তা তোমার জন্য উৎকৃষ্ট সম্পদ থেকেও উত্তম। ( বুখারি ও মুসলিম।)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيَامًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا

তোমাদের সম্পদ যা আল্লাহ তোমাদের জন্য উপজীবিকা করেছেন তা নির্বোধদের হাতে অর্পণ কর না।  এবং তোমরা তা হতে তাদেরকে আহার দাও, তাদেরকে পরিধান করাও এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বল।  (সূরা নিসা : ৫) 


মুফাসসিরে কোরআন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেছেন, পবিত্র কোরআনের এ আয়াতে নির্দেশ করা হচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্তুতি কিংবা অনভিজ্ঞ স্ত্রীলোকদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না, রবং আল্লাহ তাআলা যেহেতু তোমাকে অভিভাবক এবং দেখা শোনার দায়িত্ব দিয়েছেন, তাই তুমি সম্পদ তোমার নিজের হাতে রেখে তাদের খাওয়া পরার দায়-দায়িত্ব পালন করতে থাক।

যদি তারা অর্থ সম্পদের দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে নেয়ার আপত্তি করে, তাহলে তাদেরকে ভালভাবে বুঝিয়ে দাও যে, এসব তোমাদের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে তাদের মন:কষ্টের কারণ না হয়, আবার সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা না দেয় ।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের ব্যাখ্যা মতে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক বালিকা এবং অনভিজ্ঞ যে কোনো স্ত্রীলোকের হাতে ধন সম্পদ তুলে না দেয়ার নির্দেশ প্রদান করায় প্রমাণ হয় যে, তাদের হাতে সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। এতে এতিম শিশু বা নিজের সন্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সাহাবি আবু মূসা আশআরী রা.-ও  আয়াতের এরূপ তাফসিরই বর্ণনা করেছেন। ইমামে তাফসির হাফেজ তাবারিও এ মত গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া প্রসঙ্গ আলোচনার মধ্যেও আয়াতের নির্দেশ এতিমদের জন্যই প্রযোজ্য বলে অনুভূত হয়।

এতিম প্রতিপালনকারী বা এতিমের অভিভাবকের সম্পদের সাথে যদি এতিমের সম্পদের মিশ্রণ ঘটে, আর যদি এতিমের সম্পদের কোনো ক্ষতির আশংকা না হয় তাহলে এ মিশ্রণ জায়েয ।

মহান আল্লাহ বলেন:

وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ وَاللهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ

যদি তাদের ব্যয়ভার নিজের সাথে মিশিয়ে নাও তাহলে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই। বস্তুত: অমঙ্গলকামী ও মঙ্গলকামীদেরকে আল্লাহ জানেন। (সূরা বাকারা : ২২০)

কেউ যদি নিজের খাওয়া দাওয়া ও ব্যবসা বাসস্থান থেকে এতিমের খাওয়া দাওয়া ও বাসস্থান সম্পূর্ণ  আলাদা করে, এতে কোনো দোষ নেই মহান আল্লাহ তা মুবাহ করেছেন।
 
উপরোল্লেখিত আয়াত থেকে কোনো কোনো তাফসিরকারক বলেছেন, অভিভাবক এতিমের সম্পদ থেকে ঐ পরিমাণ উপকৃত হতে পারবে যে পরিমাণ তার এই কাজের মজুরি বা পারিশ্রমিক হতে পারে।  তবে ব্যক্তি যদি ধনী হয় কিংবা এমন হয় যার প্রয়োজনীয় খরচ-পত্রের ব্যবস্থা অন্যত্র সংস্থান করতে পারে তাহলে তার উচিত এতিমের মাল থেকে তার পরিশ্রমিক গ্রহণ না করা। 

وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ

যারা স্বচ্ছল  তারা অবশ্যই এতিমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। (সূরা নিসা: ৬)

আর এতিমের তত্ত্বাবধানকারী যদি দরিদ্র হয় তাহলে এতিমের মাল থেকে তার প্রয়োজন পরিমাণ খরচ করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ فَإِذَا دَفَعْتُمْ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ فَأَشْهِدُوا عَلَيْهِمْ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا

যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ ভোগ করবে। যখন তাদের হাতে তাদের সম্পত্তি প্রত্যার্পণ করবে তখন তাদের উপর তোমরা সাক্ষী রাখবে। আর হিসাবগ্রহণকারী হিসেবে আল্লাহ যথেষ্ট। (সূরা নিসা: ৬)

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنِّي فَقِيرٌ لَيْسَ لِي شَيْءٌ وَلِي يَتِيمٌ قَالَ فَقَالَ كُلْ مِنْ مَالِ يَتِيمِكَ غَيْرَ مُسْرِفٍ وَلَا مُبَادِرٍ وَلَا مُتَأَثِّلٍ  .سنن أبي داود -

আমর ইবনে শুয়াইব হতে বর্ণিত । তিনি তার পিতা এবং তিনি তার দাদার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল: আমি দরিদ্র ব্যক্তি, আমার কিছুই নেই। আমার একজন এতিম রয়েছে। তিনি বললেন: তোমার এতিমের সম্পদ থেকে খাও, তবে নষ্ট ও অপব্যয় করবে না এবং মূলধন থেকেও খাবে না। (আবু দাউদ)

কারো কারো মতে উক্ত ব্যক্তির যদি কোনো সময় স্বচ্ছলতা আসে তাহলে সে এতিমের মাল হতে গ্রহণকৃত সম্পদ ফেরত দিবে। আর যদি  সম্ভব না হয় তাহলে এতিমের মাধ্যমে তা হালাল করে নিবে।

ওমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

إني أنزلت نفسي من مال الله بمنزلة مال اليتيم ، إن استغنيت استعففت  ، وإن افتقرت أكلت بالمعروف » )معرفة السنن والآثار للبيهقي

আল্লাহর সম্পদের ব্যাপারে আমি আমাকে এতিমের সম্পদের জায়গায় এনেছি, আমার যখন স্বচ্ছলতা দেখা দেয় তখন আমি এতিমের মাল থেকে বিরত থাকি এবং  যখন অভাব দেখা দেয় তখন আমি ন্যায়সঙ্গতভাবে ঋণ হিসাবে খাই , অত:পর তা পরিশোধ করি। ( মা’রেফাতুস সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাকি, ১১/১১৫)

মুজাহিদ রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: যদি অভাবগ্রস্ত হয় এবং সঙ্গত পরিমাণ খায় তাহলে তা পরিশোধ করতে হবে না।

এতিম মেয়েদের বৈবাহিক জীবনে যাবতীয় অধিকার সংরক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ذَلِكَ أَدْنَى أَلَّا تَعُولُوا

আর যদি তোমরা আশংকা কর যে, এতিমদের ব্যাপারে তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে তোমারা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে তোমর সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের হাত যার মালিক হয়েছে। এটা অধিকতর নিকটবর্তী যে, তোমরা যুলম করবে না।  (সূরা নিসা: ৩)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
 
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ فِي يَتَامَى النِّسَاءِ اللَّاتِي لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُتِبَ لَهُنَّ وَتَرْغَبُونَ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الْوِلْدَانِ وَأَنْ تَقُومُوا لِلْيَتَامَى بِالْقِسْطِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللهَ كَانَ بِهِ عَلِيمًا

তারা তোমার কাছে নারীদের ব্যাপারে সমাধান চায়। বল, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে তোমাদেরকে সমাধান দিচ্ছেন এবং সমাধান দিচ্ছেন ঐ আয়াতসমূহ যা কিতাবে তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হয় এতিম নারীদের ব্যাপারে। যাদেরকে তোমরা প্রদান কর না যা তাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ তোমরা তাদের বিবাহ করতে আগ্রহী হও। আর দুর্বল শিশুদের ব্যাপারে ও ইতিমদের প্রতি তোমাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে। আর তোমরা যে কোনো ভালো কাজ কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে পরিজ্ঞাত। (সূরা নিসা : ১২৭)

চলবে...............

4

এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীর শাস্তি

এতিমের সম্পদে অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের জন্য ভীষণ শাস্তির হুমকি রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا

অর্থ: নিশ্চয় যারা এতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে, আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। (সূরা নিসা : ১০)

জাহেলি যুগে মানুষেরা এতিমদের ধন-সম্পদ থেকে উপকার হাসিলের মধ্যে সীমালঙ্ঘন করত। এমন কি সম্পদের লোভে কখনো বিয়ে করত অথবা সম্পদ যাতে  হাত ছাড়া না হয়ে যায় সে জন্য নিজের ছেলেকে দিয়ে বিয়ে করাত এবং বিভিন্ন পন্থায় তাদের সম্পদ ভক্ষণের চেষ্টা করত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন।

আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে ইবনে জারির রহ. বলেন:

إذا الرجل يأكل مال اليتيم ظلما يبعث يوم القيامة ولهب النار يخرج من فيه ومن مسامعه و من أذنيه وأنفه وعينيه يعرفه من رآه بأكل مال اليتيم.

এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী কিয়ামতের দিন এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার পেটের ভিতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা মুখ, দুই কান, নাক ও দুইচক্ষু দিয়ে বের হতে থাকবে। যে তাকে দেখবে সে চিনতে পারবে যে, এ হচ্ছে এতিমের মাল ভক্ষণকারী। (ইবনে কাসীর)

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

يبعث يوم القيامة قوم من قبورهم تأجج أفواههم نارا فقيل يا رسول الله من هم ؟ قال ألم تر أن الله يقول : إن الذين يأكلون أموال اليتامى ظلما... أخرج ابن أبى شيبة في مسنده

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন এক সম্প্রদায় নিজ নিজ কবর হতে এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তাদের মুখ থেকে আগুনের উদগীরণ প্রকাশিত হতে থাকবে। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন: তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষণ করে না। (ইবনে কাসীর)

عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ليلة أسري بي رأيت قوما لهم مشافر كمشافر الإبل وقد وكل لهم من يأخذ بمشافر هم ثم يجعل في أفواههم صخرا من النار يخرج من أسفله فقلت: يا جبريل من هؤلاء؟ فقال: هؤلاء الذين يأكلون أموال اليتامى ظلما.

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, যে রাতে আমাকে ভ্রমণ করানো হলো (অর্থাৎ ইসরার রাতে), সেথায় এমন এক সম্প্রদায়কে দেখলাম তাদের রয়েছে উটের ঠোটের ন্যায় ঠোট, যারা তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা ঐ লোকদের মুখের চোয়াল খুলে হা করাচ্ছে তারপর তাদের মুখ দিয়ে আগুনের পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর সাথে সাথে পাথরগুলি তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিবরাঈলকে বললাম, এরা করা ? তিনি বললেন: এরা হচ্ছে এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী । (ইবনে কাসীর)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ

আর তোমরা এতিম বয়:প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না।  (সূরা আনআম: ১৫২)

وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

আর তোমরা এতিম বয়:প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সদুপায় ছাড়া তার সম্পদের নিকটবর্তী হয়োনা এবং প্রতিশ্রুতি পালন কর। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। (সূরা ইসরা: ৩২)

উপরোক্ত আয়তদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বর্ণিত  হয়েছে, এতিম যদি পারিতোষিক অথবা উপঢৌকন হিসাবে কিছু সম্পদ প্রাপ্ত হয় তাহলে এতিমের অভিভাবকের দায়িত্ব হচ্ছে, সেসব মালেরও হিফাযত করা। এতিমের মৃত পিতা, দেশের সরকার কিংবা অন্য যে কেউ উক্ত অভিভাবক মনোনীত করুক না কেন, তার উপরই এতিমের মাল-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে। এ ব্যাপারে  সাবধানতা অবলম্বন সম্পর্কে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এতিমের মালের কাছেও যাবে না। অর্থাৎ এতে যেন শরিয়তবিরোধী অথবা এতিমদের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না হয়। এতিমদের মালের হেফাজত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত হবে তাদের এ ব্যাপারে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তারা শুধু এতিমের স্বার্থ দেখে ব্যয় করবে। এ কর্মধারা ততদিন অব্যাহত থাকবে যতদিন না এতিম যৌবনে পদার্পন করে নিজের মালের হিফাযত নিজেই করতে সক্ষম হবে। এর সর্বনিম্ন বয়স পনের বছর এবং সর্বোচ্চ আঠারো। কারণ এ বয়সের পূর্বে তার জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেচনা সম্পত্তি সংরক্ষণের মত না হওয়াই স্বাভাবিক।

অবৈধ পন্থায় যে কোনো ব্যক্তির মাল খরচ করা জায়েয নয়। এখানে বিশেষ করে এতিমের কথা  উল্লেখ করার কারণ এই যে, সে নিজে কোনো হিসাব নেয়ার যোগ্য নয় অন্যেরাও এ সম্পর্কে জানতে পারে না। যেখানে মানুষের পক্ষ থেকে হক দাবী করার কেউ থাকে না সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে দাবী কঠোরতর হয়ে যায়। এতে ত্রুটি হলে সাধারণ মানুষের হকের তুলনায় গুনাহ অধিক হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَآَتُوا الْيَتَامَى أَمْوَالَهُمْ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَى أَمْوَالِكُمْ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا

অর্থ: আর তোমরা এতিমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে দাও এবং তোমরা অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তুদ্বারা পরিবর্তন করো না এবং তাদের ধন-সম্পদকে তোমাদের ধন-সম্পদের সাথে খেয়ো না। নিশ্চয় তা বড় পাপ। (সূরা নিসা: ২)

এ আয়াতে  এতিমদের সর্ব প্রকার হকের প্রতি সর্বদা তীক্ষ্ণ সকর্ত দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ করা হয়েছে। এতিমের ধন-সম্পদ তার নিকট পৌছে দাও, এর অর্থ হচ্ছে, সে বালেগ হলেই কেবল তার গচ্ছিত মালামাল তার নিকট পৌছে দেয়া যেতে পারে। তবে বয়:প্রাপ্ত হওয়ার পর দেখতে হবে, তার মধ্যে নিজের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং শুদ্ধ খাতে ব্যয় করার যোগ্যতা হয়েছে কিনা। যদি যোগ্যতা না হয়ে থাকে তাহলে পচিশ বছর পর্যন্ত ধন-সম্পদ হিফাযত করার দায়িত্ব অভিভাবকদের। যখনই ধন-সম্পদ সংরক্ষণ এবং কারবারের যোগ্যতা তার মধ্যে দেখা যাবে, তখনই তার সম্পদ তার হাতে সমর্পন করতে হবে। যদি পচিশ বছর বয়স পর্যন্তও তার মধ্যে এ যোগ্যতা সৃষ্টি না হয়, তাহলে ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে তার মাল তাকে সমর্পণ করতে হবে, যদি সে উন্মাদ না হয়। কোনো কোনো ইমামের মতে তখনও তার মাল তাকে দেয়া যাবে না, বরং শরিয়তের কাজী (বিচারক) তার মাল সংরক্ষণের জন্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির হাতে সমর্পণ করবেন।

এতিমের অভিভাবককে আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা শিশুর লেখা পড়া ও জীবন গঠনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অত:পর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিষয় বুদ্ধির বিকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে ছোট ছোট কাজ কারবার এবং লেনদেনের দায়িত্ব অর্পন করে তাদের পরীক্ষা করতে থাকবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْيَتَامَى قُلْ إِصْلَاحٌ لَهُمْ خَيْرٌ وَإِنْ تُخَالِطُوهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ وَاللهُ يَعْلَمُ الْمُفْسِدَ مِنَ الْمُصْلِحِ وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَأَعْنَتَكُمْ إِنَّ اللهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

অর্থ : আর তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে এতিমদের সম্পর্কে। তুমি বল, সংশোধন করা তাদের জন্য উত্তম। আর যদি তাদেরকে নিজেদের সাথে মিশিয়ে নাও, তবে তারা তোমাদেরই ভাই। আর আল্লাহ জানেন কো ফাসাদকারী, কে সংশোধনকারী এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, অবশ্যই তোমাদের জন্য (বিষয়টি) কঠিন করে দিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা বাকারা: ২২০)

একটি হাদিসে বর্ণিত আছে,

إن رسول صلى الله عليه وسلم قال لأبي ذر: يا أبا ذر! إني أراك ضعيفًا وإني أحب لك ما أحب لنفسي، فلا تأمرن على اثنين ولا تولين مال يتيم. رواه مسلم

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু জর রা. কে বললেন: হে আবু জর! আমি তোমাকে দুর্বল দেখতে পাচ্ছি। আমি তোমার জন্য তাই পসন্দ করি যা করি নিজের জন্য। তুমি কখনো দুই জনের উপর আমির হবে না এবং এতিমের সম্পদের দায়িত্বশীল হবে না।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اللَّهُمَّ إِنِّي أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ الْيَتِيمِ وَالْمَرْأَةِ. سنن ابن ماجه -

অর্থ : আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে আল্লাহ নিশ্চয় আমি দুই অসহায়-দুর্বলের হক বিষয়ে (ভয়ে) সংকীর্ণতায় আছি, একজন হচ্ছে এতিম অপর জন নারী। (সুনান ইবন মাজাহ)

আরো বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أربعة حق على الله أن لا يدخلهم الجنة ولا يذيقهم نعيمها : مدمن الخمر ، وآكل الربا ، وآكل مال اليتيم بغير حق ، والعاق  لوالديه » « هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه

অর্থ : চার ব্যক্তি এমন আল্লাহ তাদের ব্যাপারে নিজের উপর ওয়াজিব করে নিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না এবং জান্নাতের কোনো নিয়ামতের স্বাদ আস্বাদন করাবেন না। নিয়মিত মদ্য পানকারী, সুদখোর, অন্যায়ভাবে এতিমের মাল ভক্ষণকারী এবং পিতামাতার অবাধ্য। (মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন লিল হাকেম)
 
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا هُنَّ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ. صحيح البخاري -

আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ধ্বংসকারী সাত প্রকার কবিরা গুনাহকে তোমরা (বিশেষভাবে) পরিহার কর। সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কি? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরিক করা, যাদু করা,  মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা,  সুদখাওয়া,  এতিমের মাল ভক্ষণ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা ও সতী সাধ্বী মুমিন রমণীর সতীত্বের উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়া। (সহিহ বোখারি)

বর্ণিত আয়াত ও হাদিসগুলোতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এগুলোতে একদিকে এতিমের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কারীদের প্রতি ব্যক্ত হয়েছে কঠিন হুশিয়ারি, অপর দিকে এতিমের প্রতি রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অশেষ রহমত ও করুণা। কেননা তারা হচ্ছে শেষ পর্যায়ের দুর্বল ও অসহায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

হে ঈমানদার বান্দাগণ, তোমরা তোমাদের নিজদিগকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে বাঁচাও...। (সূরা তাহরীম: ৬)

চলবে...............


5

সিজদাবনত হয়ে তওবার মাধ্যমে শুরু হোক নতুন বছর

পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব হিসেবে মানুষ ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপন করে। একথা ঠিক যে, নতুন বছরটি মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত একটি বছরের পর্যালোচনা ও নতুন এক বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা সচেতন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। তবে ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে মুসলমানদের তেমন সম্পর্ক নেই। তাই ইংরেজি নববর্ষ পালন করা মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর নয়।

খৃস্টানদের অনুকরণে ইংরেজি বছরের শেষের দিন ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ (১২টা ১ মিনিট) পালন করাকে ইসলাম সমর্থন করে না'। এ রাতে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অশ্লীলতা-নগ্নতা ও বেলেল্লাপনার বন্যায় মেতে উঠে অনেকে। মদ পান, বিভিন্ন অনৈতিক, কর্মকান্ড ও নোংরা অনুষ্ঠান করে ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করা হয়। যা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

ইসলামে নৈতিকতাহীন ক্রিয়া কর্মের অশ্লীল উপভোগ নেই। বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও নোংরামীকে ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। ইংরেজি নববর্ষ তথা ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ ইসলামে অবৈধ। এটা খৃষ্টানদের সংস্কৃতি।

আমাদের দেশে থার্টি ফার্স্ট নাইটে অসামাজিক কার্যকলাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। নেশাদ্রব্য, আপত্তিকর নাচ-গানসহ বিভিন্ন বেহায়ামিপূর্ণ কীর্তিকলাপ দ্বারা থার্টি ফার্স্ট উদযাপন গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে চলে আসছে।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দশক আগে এ দিবসটি এভাবে উদযাপন করা হতো না। কিন্তু ভিনদেশের সংস্কৃতিতে আজ এ দিবসগুলোতে শরীয়ত বিরোধী ও গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে ঈমানদাররা তাদের ঈমান-আমলকে বিনষ্ট করছেন।

মূলত এটা খৃস্টানদের সংস্কৃতি হলেও প্রতি বছর অনেক মুসলিমও পালন করে থাকেন। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ি, শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে ফেলি। অশ্লীলতা ও নোংরামীতে লিপ্ত হয়ে পড়ি। এটা মুসলমানদের কোন সভ্যতা, সংস্কৃতি হতে পারে না।

বরং এটা একটি অপসংস্কৃতি। থার্টি ফার্স্ট নাইট বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণ এবং অশ্লীলতার মহাপ্লাবন। এটি সম্পূর্ণ বিজাতীয় সংস্কৃতি। একজন ঈমানদার মুসলমান ও রুচিশীল-সচেতন মানুষ কিভাবে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও বেহায়াপনাকে সমর্থন করে তা বোধগম্য নয়।

বিজাতীয় সংস্কৃতি উদযাপন থেকে বিরত থাকতে কোরআন ও হাদিসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া (ইসলামি রীতিনীতি) অন্য কোনো ধর্মের অনুসরণ করবে কখনো তার সেই আমল গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা আল ইমরান : ৮৫)।

নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে অন্য জাতির সঙ্গে আচার-আচরণে, কৃষ্টি-কালচারে সামঞ্জস্য গ্রহণ করবে সে তাদের দলভুক্ত বিবেচিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ : ২৭৩২)।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক সু-স্পষ্ট এরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি’। (সুরা মায়িদাহ : ৪৮)।

রাসুল (সাঃ ) এরশাদ করেন, ‘যদি তুমি খারাপ কাজ করো, আর তোমার খারাপ লাগে, ভালো কাজ করে ভালো লাগে তাহলে তুমি মুমিন। কিন্তু যদি খারাপ কাজ করে ভালো এবং ভালো কাজ করে খারাপ লাগে তাহলে তুমি মুমিন হতে পার না’। (মুসলিম : ১৯২৭)।

হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনারবীয় দেশে বসবাস করে, সে যদি সে দেশের মেহেরজান (নববর্ষ) উদযাপন করে এবং বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে এমনকি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন তাকে তাদের (কাফিরদের) সঙ্গে হাশর করা হবে’ (বায়হাকি মাজমুয়াতুত তাওহীদ : ২৭০)।

একজন ঈমানদার নর-নারীর প্রতিটি দিন-রাত উৎসব ও আনন্দের। বছরে গুটি কয়েক দিন নয় বরং প্রতিটি দিন আনন্দের। প্রতিটি দিন ক্ষণ আমাদের জন্য মুল্যবান।
বিশেষ করে থার্টি ফার্স্ট নাইট আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাত। আমাদের দায়িত্ব হল এই রাতে অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা করে আগামী বছরের কল্যাণ কামনা করত: সিজদাবনতে হয়ে থাকা। তওবাহ, ইস্তেগফার, দোয়া- দুরুদ, নফল নামাজসহ ইত্যাদি ভালো কাজের মধ্যে রাতটি অতিবাহিত করা।

জ্ঞানকে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন!


6

এতিম প্রতিপালনের ফজিলতঃ

আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিব, আমাদের নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং ছয় বছর বয়সে মা আমিনাকেও হারান। তারপর তার লালন পালনের দায়িত্ব নিলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। কিন্তু তিনিও মাত্র দুই বছর পর এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। সে হিসাবে তিনি ছিলেন সর্বদিক দিয়েই এতিম।

তাই আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

اَلَمۡ یَجِدۡکَ یَتِیۡمًا فَاٰوٰی وَ وَجَدَکَ ضَآلًّا فَهَدٰی وَ وَجَدَکَ عَآئِلًا فَاَغۡنٰی فَاَمَّا الۡیَتِیۡمَ فَلَا تَقۡهَرۡ ؕ

অর্থঃ তিনি কি আপনাকে এতিম রূপে পাননি? অত:পর আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অত:পর পথ প্রদর্শন করেছেন। আপনাকে পেয়েছেন নি:স্ব, অত:পর অভাবমুক্ত করেছেন। সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। [সূরা দুহা : ৬-৯]

একদিকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবি ছিলেন এতিম, অপর দিকে এতিমরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায়। তাই তাদের প্রতি আল্লাহর করুণা ও রহমত রয়েছে, বিধায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিম প্রতিপালনে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত রয়েছে। নিম্নে তার কিছু বর্ণনা করা হচ্ছেঃ

এক. এতিম প্রতিপালনে জান্নাতের উচ্চাসন লাভ হয়

وعن سهل بن سعد رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا وأشار بالسبابة والوسطى وفر‍ج بينهما. رواه البخاري.

অর্থ: সাহল বিন সা’দ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি  ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্য অংগুলি দিয়ে ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মধ্যে ফাক করলেন। (বর্ণনায় বুখারি)

এ হাদিসে এটাই প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তি জান্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথী হতে চায় সে যেন এই হাদিসের উপর আমল করে এবং এতিম প্রতিপালনের প্রতি ব্রতী হয়। সার্বিক দিক থেকে তার প্রতি গুরুত্ব দেয়। কারণ আখেরাতে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো স্থান হতে পারেনা।

অপর এক হাদিসে রয়েছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ :قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَافِلُ الْيَتِيمِ لَهُ أَوْ لِغَيْرِهِ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ وَأَشَارَ مَالِكٌ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى. رواه مسلم

অর্থ: আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আমি ও এতিম প্রতিপালনকারীর অবস্থান জান্নাতে এই দুই অংগুলির ন্যায় পাশাপাশী হবে। চাই সেই এতিম তার নিজের হোক অথবা অন্যের। (বর্ণনাকারী) মালেক বিন আনাস রা. তর্জনী ও মধ্যমা আংগুলি দ্বারা ইশারা করলেন। ( সহিহ মুসলিম)

عَن سَهْلٍ رضي الله عنه أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ كَهَاتَيْنِ فِي الْجَنَّةِ وَقَرَنَ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ الْوُسْطَى وَالَّتِي تَلِي الْإِبْهَامَ. سنن أبي داود

অর্থ: সাহল রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী  জান্নাতে এই দুই আংগুলির ন্যায় পাশাপাশি অবস্থান করব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মধ্যমা ও বৃদ্ধা আংগুলিকে কাছাকাছি করে দেখিয়ে দিলেন। (সুনান আবি দাউদ)

দুই. এতিম প্রতিপালনে রিজিক প্রশস্ত হয় এবং রহমত ও বরকত নাজিল হয়

أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا الدَّرْدَاءِ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ابْغُونِي الضُّعَفَاءَ فَإِنَّمَا تُرْزَقُونَ وَتُنْصَرُونَ بِضُعَفَائِكُمْ. سنن أبي داود

অর্থ: আবু দারদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, দুর্বল অসহায়দের আবেদনে আমাকে সাহায্য কর। তোমাদের দুর্বল-অসহায়দের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিজিক প্রাপ্ত হও। (আবু দাউদ)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَيْرُ بَيْتٍ فِي الْمُسْلِمِينَ بَيْتٌ فِيهِ يَتِيمٌ يُحْسَنُ إِلَيْهِ وَشَرُّ بَيْتٍ فِي الْمُسْلِمِينَ بَيْتٌ فِيهِ يَتِيمٌ يُسَاءُ إِلَيْهِ. سنن ابن ماجه

অর্থ: আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, মুসলিমদের ঐ বাড়ীই সর্বোত্তম যে বাড়ীতে এতিম রয়েছে এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঐ বাড়ী যে বাড়ীতে এতিম আছে, অথচ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়। অত:পর তিনি তার আঙ্গুলির মাধ্যমে বললেন: আমি এবং এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব। (ইবনে মাজাহ)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধমাতা হালিমা বর্ণনা করেন যে, এতিম হওয়ার কারণে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লালন পালন করার জন্য কেউ সম্মত হয়নি। আমার উট ছিল দুর্বল তাই আমি সবার শেষে গিয়ে পৌঁছি। এরপর আর কোনো উপায় না পেয়ে এতিম মুহাম্মদকে গ্রহণ করি। কিন্তু মহান করুণাময়ের অশেষ করুণায় আমার উট এমন সবল হলো যে, আমি আমার গোত্রের সবার আগে পৌঁছে গেলাম। শুধু তাই নয়, আমার স্তনের দুধ, বকরি ও অন্যান্য সকল বস্তুতে এই এতিম বালকের কারণে কল্পনাতীত বরকত ও রহমত নাজিল হতে থাকল।

তিন. এতিম প্রতিপালনে হৃদয় নম্র হয়

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَجُلًا شَكَا إِلَى رَسُولِ اللهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَسْوَةَ قَلْبِهِ فَقَالَ لَهُ إِنْ أَرَدْتَ تَلْيِينَ قَلْبِكَ فَأَطْعِمْ الْمِسْكِينَ وَامْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيمِ. مسند أحمد

অর্থ: আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার অন্তর কঠিন মর্মে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, যদি তুমি তোমার হৃদয় নরম করতে চাও তাহলে দরিদ্রকে খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথা মুছে দাও। (মুসনাদে আহমাদ:)

চার. এতিম প্রতিপালন ও তাদের প্রতি সদয় হওয়ায় অত্যাধিক সওয়াব হাসিল হয়

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ مَسَحَ رَأْسَ يَتِيمٍ أَوْ يَتِيمَةٍ لَمْ يَمْسَحْهُ إِلَّا لِلهِ كَانَ لَهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ مَرَّتْ عَلَيْهَا يَدُهُ حَسَنَاتٌ وَمَنْ أَحْسَنَ إِلَى يَتِيمَةٍ أَوْ يَتِيمٍ عِنْدَهُ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ فِي الْجَنَّةِ كَهَاتَيْنِ وَقَرَنَ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ. مسند أحمد

অর্থ: আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ছেলে অথবা মেয়ে এতিমের মাথায় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হাত বুলিয়ে দেয়, মাথার যত চুল দিয়ে তার হাতটি অতিক্রম করবে তার তত সওয়াব অর্জিত হবে। আর এতিমের প্রতি সে যদি ভাল ব্যবহার করে তাহলে এই দুই আঙ্গুলের ন্যায় সে এবং আমি জান্নাতে অবস্থান করব। রাসূলুল্লাহ তাঁর দুই আঙ্গুলকে মিলিয়ে দেখালেন। (মুসনাদে আহমদ)

পাঁচ. এতিম প্রতিপালন ও তাদের সান্ত্বনা দেয়ায় জান্নাত লাভ হয়

عن عمرو بن مالك رضي الله عنه قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : مَنْ ضَمَّ يَتِيمًا بَيْنَ أَبَوَيْنِ مُسْلِمَيْنِ إِلَى طَعَامِهِ وَشَرَابِهِ حَتَّى يَسْتَغْنِيَ عَنْهُ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ الْبَتَّةَ .مسند أحمد -

আমর বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মাতা পিতা মারা যাওয়া কোনো মুসলিম এতিমকে আল্লাহ তাআলা স্বাবলম্বী করা অবধি নিজ পানাহারে শামিল করে। ঐ ব্যক্তির জন্য অবশ্যই জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়। ( মুসনাদ আহমাদ:)

ছয়. এতিম প্রতিপালনে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়

عَنْ عَائِشَةَ رضي الله عنها أَنَّهَا قَالَتْ:جَاءَتْنِي مِسْكِينَةٌ تَحْمِلُ ابْنَتَيْنِ لَهَا فَأَطْعَمْتُهَا ثَلَاثَ تَمَرَاتٍ فَأَعْطَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا تَمْرَةً وَرَفَعَتْ إِلَى فِيهَا تَمْرَةً لِتَأْكُلَهَا فَاسْتَطْعَمَتْهَا ابْنَتَاهَا فَشَقَّتْ التَّمْرَةَ الَّتِي كَانَتْ تُرِيدُ أَنْ تَأْكُلَهَا بَيْنَهُمَا فَأَعْجَبَنِي شَأْنُهَا فَذَكَرْتُ الَّذِي صَنَعَتْ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنَّ اللهَ قَدْ أَوْجَبَ لَهَا بِهَا الْجَنَّةَ أَوْ أَعْتَقَهَا بِهَا مِنْ النَّارِ. رواه مسلم

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক অসহায় মহিলা তার দুই মেয়েকে নিয়ে আমার কাছে আসল। আমি তাকে তিনটি খেজুর খেতে দিলাম। সে দুই মেয়েকে একটি করে খেজুর দিলো। আর নিজে খাওয়ার জন্য একটি খেজুর তার মুখে উঠাল। অত:পর দুই মেয়ে ঐ খেজুরটি খেতে চাইল।  সে খেজুরটি তাদের মধ্যে ভাগ করে দিল যেটি সে নিজে খেতে চেয়েছিল। তার এ অবস্থাটি আমাকে বিস্মিত করল। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে সে যা করেছে তা তুলে ধরলাম। তিনি বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এ কারণে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন অথবা তাকে একারণেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। (মুসলিম)

সাত. এতিম প্রতিপালন করা জান্নাতী লোকদের স্বভাব

আল্লাহ তাআলার তাদের প্রশংসা করে বলেন:

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا

আহার্য্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে আহার্য্য দান করে এবং (তারা বলে) আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে খাদ্য প্রদান করি। অতএব তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান ও  ধন্যবাদ চাইনা। (সূরা ইনসান: ৮)

এখানে জান্নাতিদের প্রাপ্ত নিয়ামতের কারণ উল্লেখ করে বলা হল যে, তারা দুনিয়াতে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের সাহায্য করত। তারা শুধু নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাহায্য দরিদ্র ও এতিমদেরকে দান করতো এমটি নয়। বরং নিজেদের প্রয়োজন সত্ত্বেও দান করে।

كَلَّا بَل لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ

না কখনই না। বস্তুত: তোমরা এতিমকে সম্মান করনা। (সূরা আল-ফজর: ১৭)

এ আয়াতে কাফিরদের একটি মন্দ স্বভাব বর্ণনা করে বলা হয়েছে, তোমরা এতিমদেরকে সম্মান কর না, তাদেরকে সম্মান না করার উদ্দেশ্য এই যে, তোমরা এতিমের প্রাপ্য আদায় কর না এবং তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন কর না।

এ আয়াতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে যে, এতিমদের প্রাপ্য আদায় এবং তাদের ব্যয়ভার বহন করলেই  তোমাদের মানবিক ও আল্লাহ প্রদত্ত ধন সম্পদের কৃতজ্ঞতা সম্পর্কিত দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না, বরং তাদেরকে সম্মানও করতে হবে। অপর দিকে নিজেদের সন্তানদের মোকাবেলায় তাদেরকে হেয় মনে করা যাবে না।

আট. আপনজনের মধ্য থেকে এতিম প্রতিপালনে দ্বিগুণ সওয়াব লাভ হয়

عن سلمان بن عامر رضي الله عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إن الصَّدَقَة عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ، صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ. سنن النسائي

সালমান ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেন, মিসকিনকে দান করায় একটি সাওয়াব এবং আত্মীয়কে দান করায় দুইটি সওয়াব হাসিল হয়, একটি দানের সাওয়াব এবং অপরটি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার সাওয়াব। (বর্ণনায় সুনান আন-নাসায়ী)

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদের স্ত্রী জয়নব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, সেই সদকায় কি আমাকে প্রতিদান দেয়া হবে যা আমি আমার স্বামী ও আমার নিজস্ব এতিমের জন্য করে থাকি? তিনি বললেন, এতে তোমার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে, সদকার সাওয়াব ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার সাওয়াব। (নাসায়ী)

চলবে..................



7

এতিম লালন-পালন

এতিম সমাজেরই একজন। সে ছোট অবস্থায় তার বাবাকে হারিয়েছে, হারিয়েছে তার রক্ষণাবেক্ষণকারী ও পথ  প্রদর্শনকারীকে। এজন্য তার বিশেষ প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তির যে তার খরচ যোগাবে, দেখাশুনা করবে, তার সাথে ভাল ব্যবহার করবে, তাকে নসিহত করবে, উপদেশ দিবে এবং সৎপথ প্রদর্শন  করবে।

যাতে সে মানুষের মত মানুষ হতে পারে, পরিবারের জন্য কল্যাণকর কর্মী এবং সমাজের জন্য দরদী ও উপকারী হতে পারে। আর যদি এতিমের প্রতি অবহেলা করা হয়। দায়িত্ব না নিয়ে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দেয়া হয়। তার যদি কোনো পথ প্রদর্শক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী না থাকে, তাহলে সে বিপথগামী হয়ে যেতে পারে।

পরিশেষে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে এ সমাজই দায়ী হবে। কেননা  তার হক আদায়ের ব্যাপারে সমাজ অবহেলা করেছে এবং দায়িত্ব পালনে কমতি করেছে।

তাই এতিম প্রতিপালন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও জাতির  ভবিষ্যৎ সুখ ও শান্তিময় হওয়া এ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। তাই দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তির বার্তা আনয়নকারী ইসলাম এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব  আরোপ করেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় হাবিবকে শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও এই জাতির সৌভাগ্যের দিশারী হিসাবে প্রেরণ করেছেন।

এতিম কে?

এতিম শব্দটি আরবি, যার অর্থ নি:সঙ্গ। একটি ঝিনুকের মধ্যে যদি একটি মাত্র মুক্তা জন্ম নেয় তখন একে দুররে এতিম বা নি:সঙ্গ মুক্তা বলা হয়। ইবনু মন্জুর লিসানুল আরব অভিধানে বর্ণনা করেছেন।

اليتيم: الذي يموت أبوه حتى يبلغ الحلم، فإذا بلغ زال عنه اسم اليتيم، واليتيمة ما لم تتزوج، فإذا تزوجت زال عنها اسم اليتيمة.

অর্থ: এতিম এমন সন্তানকে বলা হয় যার পিতা মারা গিয়েছে, বালেগ হওয়া পর্যন্ত সে এতিম হিসাবে গণ্য হবে। বালেগ হবার পর এতিম নামটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর মেয়ে সন্তান বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত এতিম বলে গণ্য হবে। বিয়ের পর তাকে আর এতিম বলা হবে না।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বালেগ হওয়ার পর আর কেউ এতিম থাকে না। [মেশকাত : পৃষ্ঠা নং ২৮৪]

লিসানুল আরবে আরো বর্ণিত আছে যে, মানুষের মাঝে এতিম হয় পিতার পক্ষ থেকে আর চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে এতিম হয় মায়ের পক্ষ থেকে। যে সন্তানের বাল্যকালে তার মাতা মারা যায়, কিন্তু পিতা বেঁচে থাকে তাকে এতিম বলা হবে না।

চলবে.....................


8

মানুষ মারা যাওয়ার পর আত্মার কি হয়

একদিন নবী করিম (সাঃ) এর একজন সাহাবী মারা গেলেন রাসূল পাক (সাঃ) উনার জানাজা পড়ালেন। তারপর একদল সাহাবী মৃতদেহ কবর দেয়ার জন্য কবরস্থানে নিয়ে আসলেন। সবার সাথে আমাদের নবী করিমও (সাঃ) হেঁটে হেঁটে আসলেন দুই জন সাহাবী কবর খুঁড়তে শুরু করলেন সবাই মৃত দেহকে ঘিরে বসে আছেন কবর খনন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন সবাই চুপচাপ, নীরব ও শান্ত একটি পরিস্থিতি।
 
নবীজি (সাঃ) গভীর মনোযোগ দিয়ে কবর খোঁড়া দেখছিলেন একটু পর সবার দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
 
তোমরা কি জানো, মানুষ মারা যাওয়ার পর, তাঁর আত্মার কি হয় ?

সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে নবীজি কে বললেন,

ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমাদেরকে বলুন।
 
নবীজি একটু চুপ করে থাকলেন। সবাই উনার কাছে এসে ঘিরে বসলেন। মৃত্যুর পর আত্মার কি হয়, এই তথ্য তাঁদের জানা ছিল না। আজ সেটা নবীজির মুখে শুনবেন। কত বড় সৌভাগ্য। শুনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে নবীজির কাছে এসে বসলেন।
 
তিনি একবার কবরের দিকে তাকিয়ে মাথাটা তুলে আকাশের দিকে তাকালেন,

তারপর তিনি গল্পের মত করে বলতে শুরু করলেন,
 
শুনো, যখন মানুষ একেবারেই মৃত্যু শয্যায়, তখন সে মৃত্যুর ফেরেস্তাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু যে বিশ্বাসী ও ভালো মানুষ তাকে মৃত্যুর ফেরেস্তা হাসি মুখে সালাম দেন। তাকে অভয় দেন এবং মাথার পাশে এসে ধীরে ও যত্ন করে বসেন। তারপর মৃত প্রায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলেন,
 
হে পবিত্র আত্মা ! তুমি তোমার পালনকর্তার ক্ষমা ও ভালোবাসা গ্রহণ করো এবং এই দেহ থেকে বের হয়ে আসো।
 
মুমিনের আত্মা যখন বের হয়ে আসে তখন সে কোন ধরণের ব্যথা ও বেদনা অনুভব করে না।

নবী (সাঃ) আরো একটু ভালো করে উদাহরণ দিয়ে বললেন,
 
মনে করো একটা পানির জগ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর উপর থেকে এক ফোঁটা পানি যেমন নিঃশব্দে উপর থেকে নিচে নেমে আসে ঠিক তেমনি নীরবে ও কষ্ট ছাড়াই আত্মাটি তার দেহ থেকে বের হয়ে আসে।
 
সেই সময় দুই জন অন্য ফেরেস্তা বেহেস্ত থেকে খুব সুগন্ধি মাখানো একটা নরম সুতার সাদা চাদর নিয়ে আসেন এবং তারা আত্মাটিকে সেই চাদরে আবৃত করে আকাশের দিকে নিয়ে যান।

তারা যখন আকাশে পৌঁছেন তখন অন্য ফেরেস্তারা সেই আত্মাটিকে দেখার জন্য এগিয়ে আসেন।
 
কাছে এসে সবাই বলেন,

সুবহানাল্লাহ ! কত সুন্দর আত্মা, কি সুন্দর তার ঘ্রান !

তারপর সবাই জানতে চান,

এই আত্মাটি কার ?

উত্তরে আত্মা বহন কারী ফেরেস্তারা বলেন,

উনি হলেন, "ফুলান ইবনে ফুলান"

(নবী আরবিতে বলেছেন, বাংলায় হলো, "অমুকের সন্তান অমুক" )

বাকি ফেরেস্তাগন তখন আত্মাটিকে সালাম দেয়, তারপর আবার জিজ্ঞেস করেন,

উনি কি করেছেন ? উনার আত্মায় এতো সুঘ্রাণ কেন ?

আত্মা বহন কারী ফেরেস্তাগন তখন বলেন,
 
আমরা শুনেছি মানুষজন নিচে বলা-বলি করছে, উনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, আল্লাহর ভালো বান্দা, অনেক দয়ালু, মানুষের অনেক উপকার করেছেন।
 
এতটুকু বলার পর নবী (সাঃ) একটু থামলেন।

তারপর সবার দিকে ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে, উনার কণ্ঠটা একটু বাড়িয়ে বললেন,

এই কারণেই বলছি, সাবধান ! তোমরা কিন্তু মানুষের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না।
 
তুমি মারা যাওয়ার পর মানুষ তোমার সম্পর্কে যা যা বলবে, এই আত্মা বহনকারী ফেরেস্তারাও আকাশে গিয়ে ঠিক একই কথা অন্যদেরকে বলবে।
 
এই কথা বলে তিনি আবার একটু চুপ করলেন, কবরটার দিকে দৃষ্টি দিলেন। আবার বলতে শুরু করলেন।
 
এই সময় মানুষ যখন পৃথিবীতে মৃত দেহকে কবর দেয়ার জন্য গোসল দিয়ে প্রস্তুত করবে তখন আল্লাহ তা'আলা আত্মা বহন কারী ফেরেশতাদেরকে বলবেন, "যাও , এখন তোমরা আবার এই আত্মাকে তার শরীরে দিয়ে আসো, মানুষকে আমি মাটি থেকে বানিয়েছি, মাটির দেহেই তার আত্মাকে আবার রেখে আসো। সময় হলে তাকে আমি আবার পুনরায় জীবন দিবো।"

তারপর মৃতদেহকে কবরে রেখে যাওয়ার পর দুই জন ফেরেস্তা আসবেন। তাদের নাম মুনকার ও নাকির।
 
তারা মৃতের সৃষ্টিকর্তা, তার ধর্ম ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন।

মুনকার নাকির চলে যাওয়ার পর,

আত্মাটি আবার অন্ধকার কবরে একাকী হয়ে যাবে।

সে এক ধরণের অজানা আশংকায় অপেক্ষা করবে। কোথায় আছে ? কি করবে ? এক অনিশ্চয়তা এসে তাকে ঘিরে ধরবে।
 
এমন সময় সে দেখবে, খুব সুন্দর একজন তার কবরে তার সাথে দেখা করতে এসেছেন।

তাঁকে দেখার পর আত্মাটি ভীষণ মুগ্ধ হবে। এতো মায়াবী ও সুন্দর তার চেহারা, সে জীবনে কোন দিন দেখেনি।
 
আত্মাটি তাকে দেখে জিজ্ঞেস করবে,

তুমি কে ?

সেই লোকটি বলবে,

আমি তোমার জন্য অনেক বড় সু-সংবাদ নিয়ে এসেছি, তুমি দুনিয়ার পরীক্ষায় উর্তীর্ণ হয়েছো, তোমার জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন, তুমি কি সেটা একটু দেখতে চাও?

আত্মাটি ভীষণ খুশি হয়ে বলবে,

অবশ্যই আমি দেখতে চাই, আমাকে একটু জান্নাত দেখাও।

লোকটি বলবে,

তোমার ডান দিকে তাকাও।
 
আত্মাটি ডানে তাকিয়ে দেখবে কবরের দেয়ালটি সেখানে আর নেই। সেই দেয়ালের দরজা দিয়ে অনেক দূরে সুন্দর বেহেস্ত দেখা যাচ্ছে।
 
বেহেস্তের এই রূপ দেখে আত্মাটি অনেক মুগ্ধ হবে ও প্রশান্তি লাভ করবে।

এবং সেখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে,

আমি সেখানে কখন যাবো ? কিভাবে যাবো ?

লোকটি মৃদু হেসে বলবেন,

যখন সময় হবে, তখনই তুমি সেখানে যাবে ও থাকবে। আপাততঃ শেষ দিবস পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ভয় পেও না! আমি তোমার সাথেই আছি। তোমাকে আমি সেই দিন পর্যন্ত সঙ্গ দিবো।
 
আত্মাটি তখন তাকে আবারো জিজ্ঞেস করবে,

কিন্তু তুমি কে ?

তখন লোকটি বলবে,
 
আমি তোমার এতদিনের আমল, পৃথিবীতে তোমার সব ভালো কাজের, তোমার সব পুণ্যের রূপ আমি, আজ তুমি আমাকে একজন সঙ্গীর মত করে দেখছো। আমাকে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যই এখানে পাঠিয়েছেন।
 
এই কথা বলে, লোকটি আত্মাটির উপর যত্ন করে হাত বুলিয়ে দিবেন এবং বলবেন,

হে পবিত্র আত্মা ! এখন তুমি শান্তিতে ঘুমাও। নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও।
 
এই কথা বলার পর, আত্মাটি এক নজরে বেহেস্তের দিকে তাঁকিয়ে থাকবে এবং একসময় এই তাকানো অবস্থায় গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে।
 
নবীজি এতটুকু বলে আবার একটু থামলেন। সাহাবীরা তখন গায়ের কাপড় দিয়ে ভেজা চোখ মুছলেন। (বুখারী ও মুসনাদের দুইটি হাদিস থেকে নেওয়া)
 
আল্লাহ আমাদের পবিত্র আত্মা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন!


9

আত্মত্রুটি স্বীকার করে নেয়ার ফযীলত


নিজের ভুলকে স্বীকার করে নেয়ার স্বভাব নিজের মাঝে সৃষ্টি করা উচিত। এর মাঝেই আমাদের উন্নতি রয়েছে। এতে করে আমরা যে কোন ধরনের ভুল থেকে নিরাপদ থাকতে পারব। অথবা আমাদের মাঝে যদি কোন ধরনের ত্রুটি থাকে এবং কেউ আমাদেরকে সতর্ক করে দেয়, তাহলে তাকে নিজের কল্যাণকামী মনে করা এবং নিজের ভুলকে স্বীকার করে নেয়া।

এর মাঝে নিজের অপমান বা হেয় মনে না করা। সাহাবায়ে কেরামের স্বভাব এমনই ছিল। অর্থাৎ কেউ তাদের ভুল ধরিয়ে দিলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন এবং খুশি হয়ে তাদের জন্য দোয়া করতেন। আল্লামা ইবনুল জাওযী (রাহ.) আবু ইসহাক (রাহ.)এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত উমর ফারুক (রাযি.) বর্ণনা করেন-

إنّ احبّ النّاس إلىّ من اهدىٰ إلىّ عيوبى”

অর্থাৎ- “আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ঐ ব্যক্তি, যে আমার ভুল ধরিয়ে দেয়”।
 
আব্দুল জাব্বার বিন আব্দুল ওয়াহেদ আল-তানুখী বলেন, হযরত উমর (রাযি.) একবার মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, আমি আল্লাহর ক্বসম দিয়ে বলছি, যে ব্যক্তি আমার কোন দোষ সম্পর্কে অবগত সে যেন আমাকে তা অবশ্যই বলে দেয়। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার মাঝে দু’টি দোষ রয়েছে। আপনি দু’টি চাদর ব্যবহার করেন এবং খাবারের সময় দুই তরকারি গ্রহণ করেন। অথচ অন্য লোকেরা এর সামর্থ্য রাখে না।

বর্ণনাকারী বলেন, হযরত উমর (রাযি.) তার এই ভুল স্বীকার করে নিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত আর কখনো তিনি দু’টি চাদর এবং খাবারে দুই তরকারি গ্রহণ করেননি। নম্রতা এবং বন্দেগীর চাহিদাও এটাই। যে মানুষ নিজের ভুলকে স্বীকার করে নিবে, এর দ্বারা আল্লাহর নিকট তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

তাওয়াজু এর বরকত সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে-

“وما تواضع أحد لله الّا رفعه اللهُ”

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা অবশ্যই উঁচু করে দিবেন”।

একবার হযরত উমর (রাযি.) মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বলছিলেন, হে লোক সকল! নম্রতা অবলম্বন কর। কেননা আমি রাসূল (সা.)কে বলতে শুনেছি যে-

“من تواضع لله رفعه الله فهو في نفسه صغير وفي أعين الناس عظيم”

অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা উঁচু করে দেন। তাই সে নিজের চোখে ছোট থাকলেও মানুষের নিকট তার সম্মান বেড়ে যায়”। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করে নেন। আমীন!


10

মনোমালিন্য, বিবাদ ও সংকট নিরসনে ইনসাফ ভিত্তিক ফায়সালার গুরুত্ব

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের লিডার ও কর্মীদের পারস্পরিক মনোমালিন্য, বিবাদ এবং সমস্যা সমাধানে প্রথমে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের কথা মনোযোগ সহকারে শুনবে। সঠিক-ভুল জানার চেষ্টা করবে। তারপর ঐ সমস্যাকে সর্বদা শরীয়তের আলোকে সমাধান করার চেষ্টা করবে। এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্ব কখনোই কাম্য নয়। বরং শরীয়তের মূলনীতির আলোকে সঠিক ফায়সালা দেয়ার পরিপূর্ণ চেষ্টা করবে। সর্বদা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রতি লক্ষ্য রাখবে। কেননা যিনি দায়িত্বশীল তিনি সকলের জন্য সমান। দায়িত্বশীলদের অধীনস্থ সকলের প্রতিই সমান আচরণ ও সকলের কল্যাণকামী হওয়া উচিত। তিনি কোন দলভুক্ত নন। ইনশা-আল্লাহ্! এভাবে কাজ করলে সকলের অন্তরে দায়িত্বশীলের প্রতি মর্যাদা বহাল থাকবে এবং সকলেই মিলে-মিশে কাজ করলে কাজে বরকত হবে।

স্বরণ রাখা চাই, ভুল ফায়সালা দেয়ার দ্বারা প্রান্তিকতা এসে যায়। এর দ্বারা অকল্যাণ সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে লিডার এবং কর্মীদেরও এই খেয়াল রাখা উচিত যে, দায়িত্বশীলও একজন মানুষ। আমাদের মতো তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে। এজন্য ফায়সালা করতে গিয়ে যদি কোন ভুল হয়ে যায় অথবা তিনি যদি কোন ভুল ফায়সালা দিয়ে দেন, তাহলে যার পক্ষে এই ফায়সালা হয়েছে, সে এই ফায়সালাকে নিজের জন্য বৈধ মনে করবে না। ঐ ফায়সালার উপর সে খুশি না হয়ে পরকালের জবাবদিহীতার কথা চিন্তা করে নিজের ভুল স্বীকার করে নিবে। কেননা ঐ সত্ত্বা যিনি عليم এবং خبير তিনি সবকিছু জানেন। কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল তা তাঁর থেকে লুকায়িত নয়। সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে-

‎عن أم سلمةؓ قلت: قال رسول الله ﷺ: إنكم تختصمون إلى ولعل بعضكم ان يكون الحن بحجته من بعض، فأقضى له على نحو ماأسمع منه فمن قطعت له من حقٍّ أخيه شيئاً فلا يأخذه، فإنما اقطع له به فطعة من النار     
‎وفى رواية عنها إنّ رسول الله ﷺ سمع جلبة خصم بباب حجرته فخرج إليهم، فقال: إنما أنا بشر وإنه يأتيني الخصم فلعل بعضكم أن يكون أبلغ من بعض فأحسب انّه صادق فأقضي له، فمن قضيت له بحق مسلم فإنما هى قطعة مّن النار، فلا يحملها أو يذرها (صحيح مسلم)

অর্থাৎ- হযরত উম্মে সালামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা আমার নিকট নিজেদের বিচার নিয়ে আস। এবং হতে পারে যে তোমাদের মাঝে একজন অপরজন থেকে কথায় বাকপটু। আমি তার কথা সত্য মনে করে নিলাম এবং রায় তার পক্ষে দিয়ে দিলাম। কিন্তু বাস্তবে সে ছিল অপরাধী। তখন সে যেন আমার এই রায়কে লুফে না নেয়। কেননা, এই অবস্থায় মনে করতে হবে যে, আমি তার জন্য জাহান্নামের টুকরা কেটে দিচ্ছি।

হযরত উম্মে সালামা (রাযি.) অন্য হাদীসে রেওয়ায়াত করেন, একবার রাসূলের (সা.) কামরার নিকটে কিছু লোক দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছিল। তা শুনে রাসূল (সা.) বের হলেন এবং বললেন, প্রকৃতপক্ষে আমিও একজন মানুষ। এবং হতে পারে যে কিছু লোক আমার নিকট তাদের মধ্যকার ঝগড়া-ঝাটির বিচার নিয়ে আসল। তাদের মধ্যে একজন লোক অপর পক্ষের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সু-চতুরভাবে শক্ত এবং উপযুক্ত প্রমাণাদি পেশ করল। আমি তার কথাকে সত্য মনে করলাম এবং তার পক্ষে ফায়সালা প্রদান করলাম (যদিও আসলে সে মিথ্যাবাদী ছিল)। তবে এটা তার জন্য জাহান্নামের টুকরা বলে বিবেচিত হবে। এখন তার ইচ্ছা, সে চাইলে এই জাহান্নামের টুকরাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারে (আমার দেয়া ফায়সালা ভুল জেনেও তা মেনে নেওয়ার দ্বারা)। আবার রেখেও যেতে পারে (আমর দেয়া ভুল ফায়সালার বিপরীতে নিজের সত্য স্বীকারের দ্বারা)।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন!



11

যবানের হেফাযতের গুরুত্ব

যবান অনেক দামী নিআমত, আল্লাহ তাআলার মহা দান। তাই এর নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ ব্যবহার কাম্য। কথায় আছে, দামী জিনিসের হেফাযত কঠিন। স্বর্ণ-রৌপ্য তো মানুষ যত্রতত্র ফেলে রাখে না। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে হেফাযতের চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা যবান হেফাযতের তাকীদ করেছেন এভাবে-

مَا یَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَیْهِ رَقِیْبٌ عَتِیْدٌ

মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত। -সূরা ক্বফ (৫০) : ১৮

যবানে উচ্চারিত সবকিছুই ফেরেশতারা সংরক্ষণ করে রাখেন। ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সবকিছুই তাঁরা লিপিবদ্ধ করেন। কিয়ামতের দিন এগুলোর হিসাব দিতে হবে। সেইদিন জিহ্বা, হাত-পাসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষী দিবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

یَّوْمَ تَشْهَدُ عَلَیْهِمْ اَلْسِنَتُهُمْ وَ اَیْدِیْهِمْ وَ اَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ

যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে। -সূরা নূর (২৪) : ২৪

আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে বান্দাকে সতর্ক করেছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ قُوْلُوْا قَوْلًا سَدِیْدًا، یُّصْلِحْ لَكُمْ اَعْمَالَكُمْ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  وَ مَنْ یُّطِعِ اللهَ وَ رَسُوْلَهٗ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِیْمًا.

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী শুধরে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করল সে মহা সাফল্য অর্জন করল। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৭০

আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বন তথা সব ধরনের নাফরমানী ছেড়ে দিতে বলেছেন। এর  সাথে সাথেই যবানের সদ্ব্যবহার তথা সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। কেননা, যবান হল নাফরমানীর বড় হাতিয়ার। তাই তাকওয়ার সাথেই যবানে সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। যবান ঠিক হয়ে গেলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সংশোধন হয়ে যাবে। তাই এরপরেই সব আমল সংশোধন ও গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন।

আর অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত, যারা যবানের হেফাযত করতে পারে, তারা অন্যান্য গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচতে পারে। যবানের ব্যাপারে শিথিলতা অনেক বড় বড় বিপদ ডেকে আনে। দেখা যায়, দু-একটি কথার সূত্র ধরে বউ-শ্বাশুড়ি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বড় ধরনের ঝগড়া-বিবাদ হয়ে যায়।

যবান হেফাযতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন-

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১৮)

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবী ওকবা ইবনে আমের রা.-কে তিনটি ওসিয়ত করলেন। এর প্রথমটি ছিল-

امْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ

তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪০৬)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন-

وَالّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ مَا عَلَى الْأَرْضِ شَيْءٌ أَحْوَجُ إِلَى طُولِ سَجْنٍ مِنْ لِسَانٍ

অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ভূপৃষ্ঠে সবকিছুর চেয়ে জিহ্বাই সবচেয়ে বেশি বন্দিত্ব ও  নিয়ন্ত্রণের মুখাপেক্ষী। (আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, বর্ণনা ৮৭৪৪; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, বর্ণনা ১৮১৮৪)


নবীজী বাচালকে অপছন্দ করেন

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচালকে অপছন্দ করেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

وَإِنّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ الثّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ

তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে দূরে থাকবে সে, যে অযথা বেশি কথা বলে এবং যে অহংকার প্রদর্শনের জন্য, দাপট দেখানোর জন্য মুখ ভরে কথা বলে। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২০১৮)

যবানের অপব্যবহারে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া

হাদীস শরীফে এসেছে-

خَرَجْتُ وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى رَجُلَانِ فَاخْتُلِجَتْ مِنِّي فَاطْلُبُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى أَوْ تَاسِعَةٍ تَبْقَى أَوْ خَامِسَةٍ تَبْقَى

আমি তোমাদেরকে কদরের রাত সম্পর্কে সংবাদ দিতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু দুই ব্যক্তির বিতর্কের কারণে আমি তা ভুলে গেছি। তাই তোমরা শেষ দশকে তা অন্বেষণ কর। তেইশ, একুশ, পঁচিশের রাতে।

শবে কদর একটি মহিমান্বিত রজনী। বরকতময় রাত। এ রাতের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এসেছে-

لَیْلَةُ الْقَدْرِ  خَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ

কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

যদি একটু বাগবিতণ্ডার কারণে এত বড় সৌভাগ্য লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাহলে আমরা যেভাবে যবানের অপব্যবহার করি যেমন গীবত, পরনিন্দা অপবাদ, মিথ্যা, কটুকথা, গালি ইত্যাদির কারণে আমরা কত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি!

চুপ থাকতে উৎসাহিত করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ صَمَتَ نَجَا

যে চুপ থাকে সে বেঁচে যায়। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫০১

অন্যত্র তিনি বলেন-

إِنّكَ لَمْ تَزَلْ سَالِمًا مَا سَكَتّ، فَإِذَا تَكَلّمتَ كُتِبَ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ

তুমি যখন চুপ থাকবে তখন নিরাপদেই থাকবে। আর যখন কথা বলবে তখন তা তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যাবে। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১৩৭
এক দার্শনিকের অভিব্যক্তি-

ما إن ندمت على سكوتي مرة ولقد ندمت على الكلام مرارا

আমি কখনো আমার নীরবতার উপর অনুতপ্ত হইনি।  তবে বহুবার কথার কারণে লজ্জিত হয়েছি। তাই আমাদের উচিত চুপ থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা।

যবানের হেফাযতে বেহেশতের যামানত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবান হেফাযতের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন-

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الجَنّةَ

যে তার যবান ও লজ্জাস্থান হেফাযতের যামানত দিতে পারবে, আমি তার জান্নাতের যামিন হব। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৪

নবীজীর যবানের হেফাযত

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আদর্শ। কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্ম সব বিষয়ে তিনি কখনও অযথা অনর্থক কথা বলতেন না, এমনকি বলা পছন্দও করতেন না। শুধু উপকারী ও প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। তিনি দীর্ঘসময় নীরব থাকতেন। হাদীসে এসেছে-

كَانَ طَوِيلَ الصّمْتِ قَلِيلَ الضِّحْكِ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘসময় চুপ থাকতেন এবং কম হাসতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৮১০

অসচেতনতায় যবানের অপব্যবহার

সরাসরি মিথ্যা, গালমন্দ, অশ্লীল কথা এগুলো থেকে আমরা অনেকেই বিরত থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় বেখেয়ালে মিথ্যা বলে ফেলি। যেমন কিছু দেওয়ার বাহানা করে ছোট বাচ্চাকে ডাকা হল অথচ আহ্বানকারীর কাছে দেওয়ার মত কিছুই নেই। এটি মিথ্যার শামিল।

উম্মে আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. ছোট বাচ্চাকে কিছু দেওয়ার কথা বলে ডাকছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করলেন। বললেন, তুমি কি তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকছ (নাকি কিছু দেওয়ার বাহানা করে তাকে কাছে ডাকছ?)। তিনি বললেন, হাঁ, আমি তাকে খেজুর দেওয়ার জন্য ডাকছি। তখন নবীজী বললেন-

أَمَا إِنّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِيهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كِذْبَة

জেনে রাখ, তুমি যদি তাকে কিছু না দিতে, তাহলে তোমার গুনাহের খাতায় একটি মিথ্যা লেখা হত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৯১

গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা ও রসিকতার ছলে অনেক সময় আমরা অলীক, অবাস্তব ও উদ্ভট কথা বলে ফেলি। এমনকি কখনো কখনো মিথ্যাও হয়ে যায়। এ সমস্যাটি ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর মানুষের মাঝে মহামারির আকার ধারণ করেছে। কারণ রসিকতায় শ্রোতাদের হাসানোই থাকে মুখ্য বিষয়। তাই মিথ্যা, অলীক, অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক কথা বলার প্রবণতা থাকে। এমনকি এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। অথচ মিথ্যাকে আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যম বানানো মারাত্মক গুনাহ। এর পরিণাম অনেক ভয়াবহ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَيْلٌ لِلّذِي يُحَدِّثُ الْقَوْمَ، ثُمّ يَكْذِبُ لِيُضْحِكَهُمْ وَيْلٌ لَهُ. وَوَيْلٌ لَهُ

ধ্বংস ওর! যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। ধ্বংস ওর! ধ্বংস ওর জন্য!! -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০০২১

কারো কারো মাঝে কথায় কথায় লানত-বদদোয়া দেওয়ার অভ্যাস থাকে। বিশেষভাবে নারীদের মাঝে। অনেক সময় তারা আপনজন এমনকি নিজ সন্তানকেও বদদোয়া দিয়ে চলে। হতে পারে তখন দুআ কবুলের মুহূর্ত ছিল। ফলে খাল কেটে কুমির আনার মত অবস্থা হয়। বদদোয়াটা লেগে যায়। এটা খুবই গর্হিত কাজ। যবানের মারাত্মক অপব্যবহার।

তাই এ ব্যাপারে আমাদের হুঁশিয়ার থাকা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لاَ تَلاَعَنُوا بِلَعْنَةِ اللهِ، وَلاَ بِغَضَبِهِ، وَلاَ بِالنّارِ

তোমরা একে অপরকে লানত করো না; বলো না- তোমার উপর আল্লাহর লানত হোক, তোমার উপর আল্লাহর গযব পড়ুক, তুমি জাহান্নামে যাও। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৭৬

যবানের অপব্যবহারের আরেকটি ক্ষেত্র হল, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, গীবত-অপবাদ ইত্যাদি। আমাদের কারো কারো কথাবার্তার বড় একটা অংশ থাকে তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে। হয়ত কারো দোষ চর্চা করা, না হয় কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা অথবা কারো ব্যাপারে মন্দ বলা বা  অপবাদ আরোপ করা। অথচ কুরআন-হাদীস এগুলো থেকে শক্তভাবে বারণ করেছে। এগুলো প্রত্যেকটাই কবীরা গুনাহ। পাশাপাশি যবানের অপব্যবহারেরও শামিল।

যবানের অপব্যবহারের পরিণাম

যবানের অপব্যবহার মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। দীর্ঘ এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত মুআয রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন-

وَهَلْ نُؤَاخَذُ بِمَا تَكَلّمَتْ بِهِ أَلْسِنَتُنَا؟

কথার কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? (মুখের কথার কারণেও কি জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে?)

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ রা.-এর উরুতে মৃদু আঘাত করে বললেন-

يَا مُعَاذُ ثَكِلَتْكَ أُمّكَ - أَوْ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ مِنْ ذَلِكَ - وَهَلْ يكَب النّاس عَلَى مَنَاخِرِهِمْ فِي جَهَنّمَ إِلّا مَا نَطَقَتْ بِهِ أَلْسِنَتُهُمْ. فَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتْ عَنْ شَرٍّ، قُولُوا خَيْرًا تَغْنَمُوا وَاسْكُتُوا عَنْ شَرٍّ تَسْلَمُوا.

হে মুআয! তুমি এ বিষয়টি বুঝ না! আরে, মানুষকে তো তার যবানের কথাই উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সে যেন ভালো কথা বলে বা অন্তত মন্দ কথা থেকে বিরত থাকে। তোমরা ভালো কথা বল, লাভবান হবে। মন্দকাজ থেকে বিরত থাক, নিরাপদ থাকবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৭৭৪)

যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। কত পুত-পবিত্র তাঁর যবান! যে যবান আল্লাহর তরফ থেকে বান্দার কাছে ওহী পৌঁছায় এবং আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা দান করে। এ যবানের পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-

وَ مَا یَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰی،  اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْیٌ یُّوْحٰی

[সে তার নিজ খেয়াল-খুশি থেকে কিছু বলে না। এ তো ওহী, যা তার কাছে পাঠানো হয়। -সূরা আননায্ম (৫৩) : ৩-৪]

তা সত্তে¡ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়কাতর হয়ে আল্লাহ্র কাছে যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন-

اللّهُمّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي، وَمِنْ شَرِّ بَصَرِي، وَمِنْ شَرِّ لِسَانِي، وَمِنْ شَرِّ قَلْبِي، وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي

হে আল্লাহ! আমি আমার কান, চোখ, যবান, হৃদয় এবং লজ্জাস্থানের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২)

আমাদের উচিত যবানের সঠিক ব্যবহারের প্রতি সচেতন ও যত্নবান হওয়া এবং এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা


12

যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত

বাকশক্তি আল্লাহ তাআলার বড় নিআমত ও মহা দান। বান্দার বহুবিধ কল্যাণ এতে নিহিত। বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তিনি এ নিআমত বান্দাকে দান করেছেন। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে এসব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। যবানের নিআমত থেকে বঞ্চিত হলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। কোনো কিছুই যবানের বিকল্প হতে পারে না।

মানুষের মনের ভাব, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশে যবান অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বলতে গেলে যবান সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মুখপাত্র। বোবার মনের কত দুঃখ-কষ্ট, কত আনন্দ-বেদনা, কিন্তু কাউকে জানাতে পারে না, জীবনের প্রতিটি ধাপে যার বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যে বাকশক্তি হারিয়েছে সে-ই উপলদ্ধি করতে পারে- যবান কত বড় নিআমত!

সাধারণত যার মুখে জড়তা আছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারে না তার জীবনেই তো কত সমস্যা। কত কষ্ট পেতে হয় তাকে। কত জায়গায় লজ্জা পেতে হয়। অথচ আমরা নির্বিচারে যত্রতত্র যবানের অপব্যবহার করে চলেছি। বস্তুত এত বড় নিআমতের উপলদ্ধি আমাদের মাঝে না থাকার কারণ হল, বিনামূল্যে কোনো কষ্ট স্বীকার ছাড়াই এ নিআমত আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন।

হায়! আমরা যদি একটু বুঝতাম, কত দামী এ নিআমত! রব্বে কারীমের কত বড় দান! একটু ভেবেছি কি- কীভাবে কথা বলছি? এত সুন্দর আওয়াজ কীভাবে বের হয়? কোথা থেকে এ ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়? আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কত বড় নিআমত দান করেছেন আর আমরা তাঁর নাফরমানিতে লিপ্ত। এ যবানের কত অপব্যবহার করছি হিসাবও নেই। কত পাপ এ যবান দিয়ে হচ্ছে, আমাদের অনুভূতিও নেই। একটু ভেবেছি কি, কথা বলার জন্য যদি মিনিট হিসাব করে বিল পরিশোধ করতে হত, তাহলে জীবনটা কত দুর্বিষহ হত।

আল্লাহ আমাদের এই নিআমত এমনিতেই দিয়ে দিয়েছেন। কথা বলতে কোনো কষ্টও পোহাতে হয় না। তাই অনেক বেশি শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন। অথচ আমরা নির্বিচারে যবানের প্রতি জুলুম করে যাচ্ছি। নাফরমানির কাজে ব্যবহার করছি। এ যবান দিয়ে খালেকের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এমনকি শিরকী-কুফরী কথাও যারা বলছে এই যবান ব্যবহার করেই বলছে। অনুভূতি-অনুশোচনাও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنّ العَبْدَ لَيَتَكَلّمُ بِالكَلِمَةِ، مَا يَتَبَيّنُ فِيهَا، يَزِلّ بِهَا فِي النّارِ أَبْعَدَ مِمّا بَيْنَ المَشْرِقِ

অর্থাৎ বান্দা চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে ফেলে, যার কারণে সে (পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৭)

বহু ক্ষেত্রে যবানের অপব্যবহার গভীর সম্পর্ককেও তছনছ করে দেয়। নিবিড় বন্ধুত্বের মাঝেও ফাটল ধরায়। দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাকে মুহূর্তে শেষ করে দেয়। হৃদয়কে জর্জরিত করে। অন্তরকে ক্ষত বিক্ষত করে, যা কখনও মানুষ ভুলতে পারে না। কারণ, যবানের আঘাতের ঘা শুকায় না। কবি বলেছেন-

جراحات السنان لها التئام + ولا يلتام ما جرح اللسان

বর্শার ফলার আঘাতের উপশম হয়। তবে যবানের আঘাতের কোনো উপশম নেই।

যবানের সঠিক ব্যবহার যেমন প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনে তেমনি এর অপব্যবহার ধ্বংস ডেকে আনে। এজন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের যবানের ব্যবহার নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতেন।

عَنْ سُفْيَانَ بْنِ عَبْدِ اللهِ الثّقَفِيِّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيّ؟ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِسَانِ نَفْسِهِ، ثُمّ قَالَ: " هَذَا ".

হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আসসাকাফী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আমার কোন বিষয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি আশংকা করেন। তখন তিনি নিজ জিহ্বা ধরলেন এরপর বললেন, এটা। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৪১৯)

যবান খুব দামী নিআমত। সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝে যবানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। পরস্পরিক কথাবার্তা, লেনদেন, আলাপ-আলোচনা, সব কিছুতেই মুখের ভূমিকা অপরিসীম। এটা সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র।

যবানের যথাযথ ব্যবহারের দ্বারা দুনিয়া-আখেরাতে মানুষ যেভাবে উপকৃত হতে পারে তদ্রূপ এর অপব্যবহার দ্বারা ডেকে আনতে পারে ধ্বংস। এই যবান যেমন সত্তর বছরের বৃদ্ধকে ঈমানের স্বীকারোক্তি দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয় তেমনি কুফরের উচ্চারণ দ্বারা তা মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

যার বাকশক্তি মজবুত এবং যে সুন্দর উপস্থাপনে পারঙ্গম যবানের অপব্যবহারে তার ক্ষতির আশংকাও তত বেশি। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দরজায় কিছু মানুষকে বিবাদে লিপ্ত দেখে বললেন-

إِنّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلّ بَعْضَهُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبَ أَنّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنَ النّارِ فَلْيَأْخُذْهَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا.

আমিও মানুষ। আমার কাছে (বিচার নিয়ে) বাদী-বিবাদী আসে। কখনো এমন হয় যে, তোমাদের একজনের চেয়ে অপরজন দলীল উপস্থাপনে বেশি পারঙ্গম। ফলে (দলীল উপস্থাপন থেকে) আমি কাউকে সত্যবাদী মনে করি আর (সেই ভিত্তিতে) কারো পক্ষে ফয়সালা করি। কখনো যদি এমন ঘটে- আমি অপর মুসলিমের হক কারো জন্য ফয়সালা করে দিলাম তাহলে (শুনে রাখ) তা হবে জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরা। (এখন তার ইচ্ছা, চাইলে) সে তা গ্রহণ করুক অথবা তা থেকে নিজেকে রক্ষা করুক। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১৮১)

প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট ভাষা আল্লাহর মহা দান। তেমনি এর সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার অত্যাবশ্যক। নতুবা জাহান্নামের আগুনই হবে ঠিকানা। সাধারণত আমাদের কথা চার ধরনের হয়।

১. পুরো কথাই কল্যাণকর।
২. পুরো কথাই ক্ষতিকর।
৩. যে কথাতে কল্যাণ-অকল্যাণ মিশ্রিত থাকে।
৪. যে কথাতে দুনিয়া-আখেরাতের লাভ-ক্ষতি কিছুই নেই। অর্থাৎ অনর্থক কথা।

কল্যাণকর কথার ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান হল পুরোপুরি জেনেশুনে কথা বলা। অনুমান করে কথাবার্তা বলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ  اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ اُولٰٓىِٕكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـُٔوْلًا

যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না। জেনে রেখো, কান, চোখ হৃদয়- এর প্রতিটি সম্পর্কে  (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৩৬

আমাদের অনেকের মাঝেই একটি প্রবণতা খুব লক্ষ করা যায়। আমরা যা শুনি তাই বিশ্বাস করি এবং প্রচার করতে শুরু করি। যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করি না। কোনো তথ্য বা সংবাদ বর্ণনা করার আগে যাচাই-বাছাই করা কর্তব্য। অন্যথায় মিথ্যা হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ

ব্যক্তি যা শুনে তা বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪)

যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলতে থাকা কিংবা সে অনুযায়ী কর্মনীতি নির্ধারণ করতে থাকা চরম বোকামী। পরিণামে তা আক্ষেপের কারণ হয় এবং ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। মহান আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ جَآءَكُمْ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوْۤا اَنْ تُصِیْبُوْا قَوْمًۢا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلٰی مَا فَعَلْتُمْ نٰدِمِیْنَ

হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ৬

যে কথায় কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়টাই রয়েছে, বিশেষ প্রয়োজনে তা বলা যাবে। যেমন, বললে কারো গীবত হয়, না বললে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কথা।

ক্ষতিকর ও অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। মুমিন তো ক্ষতিকর কথা বলতেই পারে না। এসব বলে মুমিন কেন জাহান্নামে যাবে? মুমিন তো অনর্থক কথা থেকেও বেঁচে থাকে। এজন্যে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-

وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ

যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ৩

বিজ্ঞজনের উক্তি-

في اللسان آفتان عظيمتان، إن خلص من إحداهما لم يخلص من الأخرى، آفة الكلام وآفة السكوت

‘যবানের দুটি বিপদ। কথার বিপদ ও চুপ থাকার বিপদ! একটি থেকে মুক্তি পেলেও অপরটি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।’

কখনো একটি আরেকটির চেয়ে বড় বিপদ হয়ে সামনে আসে। সত্য থেকে যে চুপ থাকে সেও তো অপরাধী। আর যে বাতিল কথা বলে সে আল্লাহর অবাধ্য, শয়তানের মুখপাত্র।

চলবে..............

13

ইনসাফ ভিত্তিক কর্মবণ্টন ও শরীয়ত অনুযায়ী আমলের গুরুত্ব

বর্তমান যামানায় প্রায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানই কর্মীদের এবং লিডারদের মাঝে সম্পর্কের ঘাটতি, ঈর্ষাকাতরতা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। এর একটি কারণ যেমন, পৃথিবীতে আল্লাহর ভয় কমে যাচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে এর একটি বড় কারণ, পরামর্শের মাধ্যমে কার্য বণ্টন এবং কর্মপন্থা নির্ধারণ না করা বলে আমি মনে করি।

রাসূল (সা.)এর একটি অভ্যাস ছিল যে, সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে প্রত্যেকের অবস্থা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ বণ্টন করতেন এবং নিজের যিম্মায়ও কিছু কাজ নিতেন।

প্রসিদ্ধ আছে যে, এক সফরে রাসূল (সা.) লাকড়ি কুড়ানোর কাজ নিজের যিম্মায় নিলেন। পরস্পর পরামর্শের মাধ্যমে কাজ বণ্টন করার মাঝে অনেক উপকারিতা রয়েছে। এর দ্বারা কাজ সহজ এবং দ্রুত হয়। সাথিরা সন্তুষ্ট মনে কাজ করে। প্রত্যেকেই একে অপরের সাহায্যকারী হয়। অবিশ্বাস এবং মতবিরোধ থেকে সকলেই হিফাজতে থাকে। কাজের মাঝে বরকত হয়। কুর’আন ও হাদীসে এ বিষয়ের গুরুত্ব এবং তার উত্তম দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে বিদ্যমান।

সংঘাতপূর্ণ মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মহান আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত পথ ও মত অনুসরণ করতে হবে। এক আল্লাহর বিশ্বাস, তিনি জগতের সৃষ্টিকর্তা ও ইবাদতের মালিক এ কথা মেনে চলতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ কি বিচারকদের সর্বোচ্চ বিচারক নয়?’ বিচার দিনের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে মানুষের মাঝে বিচার ফয়সালার দায়িত্ব দিয়ে কিতাব সহকারে হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-‘আমি আপনাকে কিতাব সহকারে প্রেরণ করেছি এ জন্য যে, আপনি মানুষের মাঝে সত্যিকার বিচার করবেন, আল্লাহ যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন ঠিক সেভাবে। আর আপনি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বাদানুবাদ করতে যাবেন না। সূরা নিসা, আয়াত: ১০৫

পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনে সঠিক পন্থা অবলম্বন করে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হয়,তা হাতে কলমে শিখিয়েছেন । তিনি নিজের কারণে কখনো কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি। নিজের কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ নেননি। কেবল জনগণের জন্যই অপরাধীর উপর দন্ড কার্যকর করেছেন। জয়নাব বিনতে হারিস নামক খাইবারের ইহুদী মহিলা নবীজিকে হত্যা করার মানসে ছাগল ভুনা করে বিষ মিশ্রিত করে তাঁর নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছিল। সাথে সাথে এ বিষের ক্রিয়া নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সহচররা টের পেলেন। সাহাবীরা তরবারি উঁচিয়ে মহিলার দিকে ধেয়ে আসলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মহিলাকে রক্ষা করেন। তাকে কোন শাস্তি দিলেন না। পরবর্তীতে যখন বিশিষ্ট সাহাবী বিশর ইবনে বারা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিষক্রিয়ায় ইন্তেকাল করলেন, তখন এ হত্যাকান্ডের শাস্তি সরূপ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহিলাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন। সূরা আলে ইমরান,আয়াত: ১০৩

আমরা যদি প্রিয় নবীর হাতে গড়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র মদীনাতুর রাসূলের দিকে অবলোকন করি তবে বলা যায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত- জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সমাজে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। যথা-

১. ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া: ভ্রাতৃত্ব হচ্ছে ফুল ও পল্লবে শোভিত এক বরকতপূর্ণ বৃক্ষ, নানাভাবে নিরবধি যা ফলদায়ক। ভ্রাতৃত্বের মৌল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা। ইরশাদ হচ্ছেঃ “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো : তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতি সঞ্চার করেন, ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে।” এ প্রসঙ্গে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে যে কল্যাণ নিজের জন্য পছন্দ করে, তার অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে। সহিহ বুখারী; সহিহ মুসলিম

২. প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও দয়া প্রদর্শন করা: বিতর্ক করতে হবে সত্য প্রকাশ ও মানুষের প্রতি দয়া-মমতার জন্য। প্রতিপক্ষকে হীন করার উদ্দেশ্যে কিংবা মুর্খ বলার জন্য নয়। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘‘আর রাহমানের বান্দা তারাই যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে তখন বলে ‘সালাম।’’ তাই নবীজিকে হত্যার জন্য হাজার বার যারা চেষ্টা করেছিল বরাবরই তাদের সবাইকে তিনি ক্ষমা করে দিয়ে প্রতিপক্ষের সাথে আচরণের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

৩. কারো ওপর জুলুম-অবিচার না করা: যার যা প্রাপ্য তাকে তা না দেয়া হলো জুলুম। এটা ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ, শারীরিক আক্রমণ বা সম্মানহানির মাধ্যমেও হতে পারে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অন্যায় বলে বিবেচিত। আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বিনষ্টকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না যার ওপর জুলুম করা হয়েছে, সে ক্ষমা করে দেয়। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে আমার বান্দা! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও একে হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’’ সূরা ফুরকান,আয়াত:৬৩

৪.সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজের নিষেধ করা : এটা সমাজ সংস্কার ও সংশোধনের অনন্য মাধ্যম। এর মাধ্যমে সত্যের জয় হয় এবং মিথ্যা ও বাতিল পরাভূত হয়। যে ব্যাক্তি আন্তরিকতা ও সততার সাথে এ দায়িত্ব পালন করে তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ পারিতোষিক। ইরশাদ হচ্ছে, “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা সৎকাজের প্রতি আহ্বান করবে, নির্দেশ করবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।” সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪

৫. ইনসাফ করা : ইসলামের পরিভাষায় ইনসাফ হচ্ছে কোনো বস্তু তার হকদারদের মধ্যে এমনভাবে বণ্টন করে দেয়া যাতে কারও ভাগে বিন্দুমাত্র কম বেশি না হয়। বসুন্ধরার বুকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার কায়েম নিয়ে আসে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও শান্তির ফল্গুধারা। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জিন্দেগীর সকল পর্যায়ে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে ইসলাম সমধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। এমনকি মুসলমানদের সাথে কাফিরদের লেনদেন ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইনসাফের নীতিতে অবিচল থাকতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রু তা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জন করতে কোনোভাবেই প্ররোচিত না করে। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” সূরা মায়েদা, আয়াত: ৮

৬. দ্বীনী শিক্ষা অর্জন ও প্রচার-প্রসার : দুনিয়ার নিযাম ও ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার জন্য যেমন জাগতিক শিক্ষার প্রয়োজন তেমনি দ্বীনের হিফাজতের জন্য এবং দুনিয়ার সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক করার জন্য দ্বীনী শিক্ষার প্রয়োজন। কুরআন-সুন্নাহর চর্চা ও অনুসরণের অভাব হলে সমাজের সকল অঙ্গনে দুর্নীতি ও অনাচার দেখা দেয়। দেখা দেয় অশান্তি। শিক্ষিত মানুষ পথভ্রষ্ট হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমাজ যতই উন্নতি লাভ করুক ঈমান ও খোদাভীতি না থাকলে তা মানুষের ক্ষতি ও অকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। মানুষের সকল আবিষ্কারকে অর্থপূর্ণ ও কল্যাণমুখী করার জন্যই অপরিহার্য প্রয়োজন ইলমে ওহীর চর্চা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ তা’আলা যাকে প্রভূত কল্যাণ দিতে চান তাকে দ্বীনের প্রজ্ঞা দান করেন।’’ সহীহ বুখারী, ১/৬

৭. আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণ করা : শত্রু-মিত্রের বিচার না করে সব মানুষ যদি সঠিক পথের অনুসারী হতো তবে হক্ব-বাতিল, ঈমান-কুফর, আল্লাহর বন্ধু এবং শয়তানের বন্ধুর মাঝে কোনো পার্থক্য থাকতো না। তাই বন্ধু নির্বাচন ও শত্রু তা পোষণ আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “ঈমানের অধিকতর নিরাপদ বন্ধন হলো আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর জন্য শত্রু তা। সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস : ৪৫৯৯

৮. জবাবদিহিতার মানসিকতা থাকা :মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। বিভিন্ন কাজকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশের উপযুক্ত তত্ত্ব-তথ্য, আয়-ব্যয়, হিসাব-নিকাশ ও লেনদেনকে সুস্পষ্টভাবে জানার জন্য উন্মুুক্ত করাই হলো স্বচ্ছতা। ইহকালীন ও পারলৌকিক উভয় জগতে জবাবদিহিতা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ ‘অন্তত যে ব্যক্তি স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে (জবাবদিহি) ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’’ সূরা নাজিয়াত, আয়াত: ৪০

এই জন্য আমাদেরও পরামর্শের গুরুত্ব বুঝে এর উপর আমল করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহায্য করুন এবং সমস্ত অকল্যাণ থেকে হিফজত করুন। আমিন!


14

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে কর্তব্যবোধ ও ইখলাস থাকা গুরুত্বপূর্ণ


দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব: আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে, তিনি আমাদেরকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের খিদমত করার সুযোগ দিয়েছেন। আমাদের নিজেদের দায়িত্বের প্রতি চিন্তা করা উচিত। গুরুত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করলে কাজের মাঝে বরকত আসে। একটা হচ্ছে চাকুরীর জন্য ডিউটি পালন, অপরটি হচ্ছে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা। এই দু’টির মাঝে পার্থক্য আছে। চাকুরীতে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রুল মেনে কাজ করা হয়। কিন্তু যখন আপনি এটিকে দায়িত্ব হিসেবে নেবেন, তখন সেটা পালনের ক্ষেত্রে আপনার চেষ্ঠা থাকবে সর্বাত্মক।

নির্ধারিত সময়ের কাজ সময়ে না করলে বা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে, পরে আর সেই কাজের কোন উদ্দেশ্য থাকে না। আর ‘দায়িত্ব’ সময় দেখে না। কাজের চিন্তা করতে থাকে। যাদের দায়িত্ব পালন করার অনুভূতি থাকে, তারা সর্বদা চেষ্ঠা চালিয়ে যেতে থাকে। তারা অযুহাত দেয় না। তারা সর্বদা তাদের অন্তরকে কাজের মাঝে লাগিয়ে রাখেন।

প্রতিষ্ঠানের কাজ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে না হওয়ার গুরুত্ব: শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহের (শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দ্বীনি জযবার অবনতি, প্রতিটি কাজে জাগতিক লাভের চিন্তা) অবস্থা দেখে এমন মনে হয় যে, এক যামানা আসবে যে, কোন মানুষকে সালাম দিলেও বলবে টাকা দাও তবে উত্তর দেব। অন্যথায় উত্তর দেব না। (উদ্দেশ্য এই যে, প্রত্যেক বিষয়ে বিনিময়ের প্রতি মানুষের মনোযোগ থাকবে। যা জ্ঞান ও ইলমের শান নয়। এই উদ্দেশ্যও হতে পারে যে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে সালাম এবং পরস্পর মুহাব্বতের চর্চা হারিয়ে যাবে। তাই এই সমস্ত সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সুদূরপ্রসারী চিন্তা থাকা উচিত। বাকীটা মহান সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন)।

প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার গুরুত্ব: প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মীর উচিত, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের উপর প্রাধান্য দেয়া। নিজের সত্ত্বাকে দেখবে না। নিজের সত্ত্বার কী ভরসা আছে? আজ আছে তো কাল নেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান তো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা সর্বদা দায়েমী থাকবে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করবে তো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান উন্নতি হবে এবং প্রতিষ্ঠানের উত্তর উত্তর সাফলু আসবে। সুনাম হবে।

ইখলাসের গুরুত্ব: আমাদের সকলেরই প্রতিষ্ঠানের জন্যও কিছু কাজ করা উচিত। নিজের জন্য ও দুনিয়ার জন্যই সব কাজ না করা চাই। ইখলাস বিহীন কোনো কিছুই আসমানি দরবারে কবুলযোগ্য নয় বরং কখনো এমন আমল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পার্থিব মোহ ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের যাবতীয় লোভ থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ পাকের জন্য সমর্পিত আত্মার সামান্য আমলও ইখলাসের কারণে অনেক বেশি মূল্যবান।

চারিদিকে সৌজন্যের ছড়াছড়ির এমন অস্থির সময়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি সাধারণ উদাসীনতা আমাদের সবার জন্য বড়ই বেমানান। “সারা জীবন তো অভিজ্ঞতা, ধোকা-বাজী ও চাপাবাজী করেই পেট পুষলাম। হায় আফসোস!” আল্লাহ আমাদের এসব কাজকর্ম থেকে হেফাজত করুন।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে করণীয়: বছরের শুরুতেই সকলে একত্রে বসে হিসাব-নিকাশ করে নেবে যে, গত বছর আমাদের কী কী ভুল-ত্রুটি হয়েছে, যেগুলোর প্রতি আমরা লক্ষ্য রাখতে পারিনি। সে ভুলগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে পরস্পরে আলোচনার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা। এবং বছরের শুরুতেই সেগুলোকে পরিশূদ্ধ করার চেষ্টা করা। ইন্শাআল্লাহ্! প্রতিষ্ঠানের নেযাম ঠিক হয়ে যাবে।

15

শিক্ষনণীয় গল্প

এক স্বর্ণকারের মৃত্যুর পর তার পরিবারটা বেশ সংকটে পড়ে গেলো, খাদ্য-বস্ত্রে দেখা দিল চরম অভাব!

স্বর্ণকারের বিধবা স্ত্রী তার বড় ছেলেকে একটা হীরের হার দিয়ে বললো--এটা তোমার কাকার দোকানে নিয়ে যাও সে যেন এটা বেচে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দেয়!

ছেলেটা হারটি নিয়ে কাকার কাছে গেল! কাকা হারটা ভালো করে পরীক্ষা করে বললো- বেটা, তোমার মাকে গিয়ে বলবে যে এখন বাজার খুবই মন্দা, কয়েকদিন পর বিক্রি করলে ভাল দাম পাওয়া যাবে! কাকা কিছু টাকা ছেলেটিকে দিয়ে বললেন--আপাতত এটা নিয়ে যাও আর কাল থেকে তুমি প্রতিদিন দোকানে আসবে আমি কোন ১দিন ভাল খদ্দোর পেলেই যেন তুমি দৌড়ে হার নিয়ে আসতে পার তাই সারাদিন থাকবে!

পরের দিন থেকে ছেলেটা রোজ দোকানে যেতে লাগলো! সময়ের সাথে সাথে সেখানে সোনা-রুপা-হীরে কাজ শিখতে আরম্ভ করলো!

ভাল শিক্ষার ফলে অল্প দিনেই খুব নামি জহুরত বনে গেল! দূর দূরান্ত থেকে লোক তার কাছে সোনাদানা বানাতে ও পরীক্ষা করাতে আসত। খুবই প্রসংশীত হচ্ছিল তার কাজ!
একদিন ছেলেটির কাকা বললো--তোমার মাকে গিয়ে বলবে যে এখন বাজারের অবস্থা বেশ ভালো, তাই সেই হারটা যেন তোমার হাতে দিয়ে দেন! এখন এটা বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে!

ছেলেটি ঘরে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে হারটি নিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো যে এটা একটা নকল হীরের হার! তাই সে হারটা আর কাকার কাছে না নিয়ে বাড়িতেই. রেখে দিলো!
কাকা জিজ্ঞেস করলো-- হারটি এনেছো ?ছেলেটি বললো-- না কাকা পরীক্ষা করে দেখলাম এটা একটা নকল হার!

তখন কাকা বললো- তুমি যেদিন আমার কাছে হারটি প্রথম নিয়ে এসেছিলে সেদিন আমি দেখেই বুঝে নিয়েছিলাম যে এটা নকল, কিন্তু তখন যদি আমি তোমাকে এই কথাটা বলে দিতাম, তাহলে তোমরা হয়তো ভাবতে যে আজ আমাদের মন্দা সময় বলেই কাকা আমাদের আসল জিনিষকে নকল বলছে!

আজ যখন এ ব্যাপারে তোমার পুরো জ্ঞান হয়ে গেছে, তখন তুমি নিজেই বলছো এটা নকল হার!

এই দুনিয়াতে প্রকৃত জ্ঞান ছাড়া তুমি যা কিছু দেখছো যা কিছু ভাবছো সবটাই এই হারের মতই নকল মিথ্যে!

জ্ঞান ছাড়া কোন জিনিসের বিচার সম্ভব নয়! আর এই ভ্রমের শিকার হয়েই অনেক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়! তোমাদের সাথে আমার সেই সম্পর্কটা নষ্ট হোক আমি তা চাইনি!
-সংগ্রহিত পোস্ট!

Pages: [1] 2 3 ... 10