Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - Mrs.Anjuara Khanom

Pages: 1 ... 3 4 [5] 6 7 ... 24
61
ঘাড়ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়নি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে শীতকালে এটি একটি কমন সমস্যা। ঘাড়ব্যথায় পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি ভোগেন।

মেরুদণ্ডের ঘাড়ের অংশকে মেডিকেল ভাষায় সারভাইক্যাল স্পাইন বলে। ঘাড়ে দুই ধরনের ব্যথা হয়।

১. লোকাল বা স্থানীয় ব্যথা

২. রেফার্ড পেইন বা দূরে ছড়িয়ে যাওয়া ব্যথা।
 
ঘাড়ব্যথার প্রধান কারণ–

ঘাড়ব্যথার একটি কারণ হলো পশচার। এই শব্দটি বলতে বোঝায় ভঙ্গি। যে ভঙ্গিতে আমরা বসি, যে ভঙ্গিতে আমরা ঘাড়কে পরিচালনা করি। ঘাড়ে রয়েছে সাতটি হাড়। এর ভেতর দিয়ে স্পাইনাল কর্ড গেছে, একে মেরুরজ্জু বলে এবং তার থেকে অন্যান্য স্নায়ু গেছে।

আর এই হাড়গুলো একটি আরেকটির সঙ্গে কাপড়ের মতো, কিন্তু শক্ত ও লিগামেন্ট দিয়ে আটকানো রয়েছে।

বেশ কয়েকটি লিগামেন্ট গুচ্ছ রয়েছে। যে কোনো একটিতে অসুবিধা হলে ঘাড়ব্যথা হতে পারে। পেশিতেও হতে পারে। ভাসকুলার পেইন হতে পারে।

এ ছাড়া থাইরয়েড, প্যারাথাইরয়েড ও টনসিল। এগুলোতেও ব্যথা হলে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।

ঘাড়ব্যথার আরও যেসব কারণ রযেছে

মাংসপেশি, হাড়, জোড়া, লিগামেন্ট, ডিস্ক (দুই কশেরুকার মাঝখানে থাকে) ও স্নায়ুর রোগ বা ইনজুরি। অস্বাভাবিক পজিশনে নিদ্রা বা অনিদ্রা, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগ, হাড় ও তরুণাস্থির প্রদাহ ও ক্ষয়, হাড়ের ক্ষয় ও ভঙ্গুরতা রোগ, হাড় নরম ও বাঁকা হওয়া, রিউমাটয়েড-আর্থ্রাইটিস ও সেরো নেগেটিভ আর্থ্রাইটিস, সারভাইক্যাল অস্টিও-আর্থ্রাইটিস ও ফাইব্রোমায়ালজিয়া।
 
উপসর্গ

ঘাড়ব্যথা হলে এই ব্যথা কাঁধ, বাহু, হাত ও আঙুলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া কাঁধ, বাহু, হাত ও আঙুলে অবশ ভাব ও দুর্বল হতে পারে। এ ছাড়া ঘাড়ের মুভমেন্ট ও দাঁড়ানো অবস্থায় কাজ করলে ব্যথা বেড়ে যায়।

যা করণীয়

১. সামনের দিকে ঝুঁকে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা এবং মাথার ওপর অতিরিক্ত ওজন নেবেন না। শক্ত বিছানায় ঘুমান ও শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।

২. ব্যথা তীব্র হলে ঘাড় নিচু বা উঁচু করা, মোচড়ানো (টুইসটিং) পজিশন বন্ধ করা। এ ছাড়া কাত হয়ে শুয়ে দীর্ঘক্ষণ পড়বেন না বা টেলিভিশন দেখবেন না।

৩. কম্পিউটারে কাজ করার সময় মনিটর চোখের লেভেলে রাখবেন।

৪. ঘাড়ব্যথার সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


লেখক:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
 

62
শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের মূল অভিযোগ– তারা পড়ালেখায় অমনোযোগী। কোনো কোনো মা-বাবার আক্ষেপ– সন্তান পড়া মনে রাখতে পারে না।

সব শিশুর স্মৃতিশক্তি সমান না। যাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল, তাদের সেটি প্রখর করারও কিছু কৌশল আছে। আসুন জেনে নিই শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর করণীয় সম্পর্কে-

১. শিশুকে প্রশ্ন করতে শেখান। যেন আপনার শিশুর মধ্যে কোনো কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হয়। যত প্রশ্ন করবে, ততই বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করবে সে। ফলে শিশুর স্মৃতিশক্তি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

২. শিশু যা শিখছে, সেগুলো দিয়ে তাকে ছড়া, গান তৈরি করতে শেখান। মানুষের মস্তিষ্ক মিউজিক ও প্যাটার্ন মনে রাখতে পারে দ্রুত। তাই মিউজিক বা ছড়া শিশুকে কিছু শেখালে সে তাড়াতাড়ি সব কিছু মনে করতে পারবে।

৩. শিশুর স্মৃতিশক্তি বাড়াতে লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে নিয়ে যান। তাকে এক জায়গায় বসিয়ে পড়াবেন না, বরং ঘুরতে ঘুরতে শেখান। লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়ে বই দেখাতে পারেন। মিউজিয়াম বা আর্ট গ্যালারিতেও নিয়ে যান।

৪. বিভিন্ন বিষয়ে শিশুর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তারা কি ভাবছে জানতে চান। এভাবে তাদের চিন্তাধারার যেমন উন্নতি হবে, তেমন স্মৃতিশক্তিও বাড়বে।

৫. শিশুকে কিছু শেখানোর সময় ছবির ব্যবহার করুন। তা হলে শিশুর মনে রাখতে সুবিধা হবে।

৬. বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব ও ভাইবোনের কাছ থেকে শিশু অনেক কিছু শেখে, সে যা শিখছে সেগুলো সম্পর্কে জানতে চান। আপনাকে বোঝানোর মাধ্যমে শিশুর স্মৃতিশক্তি বাড়বে।

৭. শরীরচর্চা শরীর ও মন দুই-ই ভালো রাখে। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। রোজ শরীরচর্চা করুন।

 

তথ্যসূত্র: বোল্ডস্কাই।

63
কথাবার্তা দিয়ে একজন মানুষের ভালো-মন্দ যাচাই করা যায়। এরই মধ্যে ফুটে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব।
এই কথা মানুষকে যেমন জান্নাতে পৌঁছাতে সাহায্য করে, অনুরূপ জাহান্নামের পথেও নিয়ে যায়। একজন মুমিনের কথাবার্তা কেমন হবে, কেমন হবে তার সম্বোধন—তার উত্তম দৃষ্টান্ত রয়েছে রাসুল (সা.)-এর জীবনে। নিম্নে মহানবী (সা.)-এর কথাবার্তা ও বাকভঙ্গির নানা দিক তুলে ধরা হলো—

সত্যবাদিতা : কথার সত্যতা হলো কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকা। সত্যের একটা প্রভাব আছে, যা মানুষকে আকর্ষণ করে। কোরআনে সত্য কথার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

রাসুল (সা.) নবুয়তের  আগে ও পরে সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সত্যবাদী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল শৈশব থেকে। রাসুল (সা.) সাহাবিদের সত্য বলতে উৎসাহিত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই সত্য ভালো কাজের পথ দেখায় আর ভালো কাজ জান্নাতের পথ দেখায়। আর মানুষ সত্য কথা বলতে অভ্যস্ত হলে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। নিশ্চয়ই অসত্য পাপের পথ দেখায় আর পাপ জাহান্নামের পথ দেখায়। কোনো ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়। (বুখারি, হাদিস : ৬০৯৩)

স্পষ্টতা : স্পষ্টতা কথার অন্যতম গুণ। শ্রোতার মনে স্পষ্ট কথার প্রভাব বেশি পড়ে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর কথা এত সুস্পষ্ট ছিল যে প্রত্যেক শ্রোতা তাঁর কথা বুঝত। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৯)

ধীরস্থিরতা : ধীরস্থিরতা কথার অন্যতম গুণ। দ্রুত গতিতে কথা বলা, যা মানুষের বুঝতে কষ্ট হয় দোষণীয়। রাসুল (সা.) কথাবার্তায় ধীরস্থির ছিলেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) এমনভাবে কথা বলতেন যদি কোনো গণনাকারীর গণনা করতে ইচ্ছা করে তবে সে গুনতে পারবে। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৯৯)

মিষ্টভাষী : রাসুল (সা.) কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে কোমলতা অবলম্বন করতেন। কর্কশ ও রূঢ় ভাষায় কারো সঙ্গে কথা বলতেন না এবং কাউকে সম্বোধনও করতেন না। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি যদি কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে মানুষ আপনার থেকে দূরে চলে যেত। ’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

বাহুল্য বর্জন : রাসুল (সা.) কখনো প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। সওয়াবহীন কাজে কখনো সময় ব্যয় করতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তির ইসলাম পালনের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অনর্থক কথা ও কাজ ত্যাগ করা। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)

শালীনতা : রাসুল (সা.)-এর কথাবার্তা শালীনতার চাদরে আবৃত ছিল। তিনি কখনো অশালীন কথা বলেননি। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) অশালীন, অভিশাপকারী ও গালিদাতা ছিলেন না। তিনি কাউকে তিরস্কার করার সময় শুধু এটুকু বলতেন—কী হলো তার? তার কপাল ধূলিমলিন হোক। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৪)

বিশুদ্ধভাষী : রাসুল (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষার অধিকারী। তাঁর উচ্চারণ, শব্দ প্রয়োগ ও বাচনভঙ্গি সবই ছিল বিশুদ্ধতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। হিন্দ ইবনে আবু হালা (রা.)-কে রাসুল (সা.)-এর বাচনভঙ্গি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, রাসুল (সা.) তিনি বেশির ভাগ সময় নীরব থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন।
তিনি ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যালাপ করতেন। তাঁর কথা ছিল একটি থেকে অপরটি পৃথক। তাঁর কথাবার্তা অতি বিস্তারিত কিংবা অতি সংক্ষিপ্তও ছিল না। অর্থাৎ তাঁর কথার মর্মার্থ অনুধাবনে কোনো প্রকার অসুবিধা হতো না। তাঁর কথায় কঠোরতার ছাপ ছিল না, থাকত না তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব। ’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৭)


64


মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশেষ প্রেরিত পুরুষ। আল্লাহ তাঁকে সর্বোত্তম শিক্ষক ও আদর্শ মানব হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে তাদের জন্য রাসুলের মধ্যে আছে উত্তম আদর্শ। ’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আয়াতটি মহানবী (সা.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ তথা তাঁর কথা, কাজ ও অবস্থার অনুসরণ বিষয়ক একটি মূলনীতি। মানবজাতির জন্য মহানবী (সা.)-এর আগমন আল্লাহর বিশেষ দান, অনেক বড় অনুগ্রহ এবং স্পষ্টত উপহার। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ মুমিনের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যখন তাদের মধ্যে তাদের থেকে নবী প্রেরণ করেছেন। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)

কবি হাসসান বিন সাবিত (রা.)-এর কবিতায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামগ্রিক পবিত্রতা ও সমকালীন বিশ্বাসের ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমার চোখ আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে কখনো দেখেনি/আপনার চেয়ে উত্তম কাউকে তার মা জন্ম দেয়নি/আপনি সব দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন/কেমন যেন আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ’ (আহসানুল কাসাস : ২/২৮৪)

মহানবী (সা.)-এর পবিত্রতার ঘোষণা

পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-এর সব ধরনের পবিত্রতার সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। যেমন—

১. চিন্তা ও মননের পবিত্রতা : মহানবী (সা.)-এর চিন্তা, ভাবনা ও মেধাশক্তি ছিল পঙ্কিলতামুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ২)

২. কথা ও বচনের পবিত্রতা : মহানবী (সা.) কথাবার্তায় সংযত ও পবিত্র ছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তিনি মনগড়া কথাও বলেন না। এটা তো ওহি যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)

৩. শ্রবণশক্তির পবিত্রতা : পবিত্র কোরআনের আয়াত থেকে মহানবী (সা.)-এর শ্রবণশক্তির পবিত্রতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তিনি মনগড়া কথাও বলেন না। এটা তো ওহি যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪)

৪. পবিত্র দ্বিনের ধারক : মহানবী (সা.) পবিত্র দ্বিন ইসলামের ধারক ও বাহক ছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যিনি তাঁর রাসুলকে পথনির্দেশ ও সত্য দ্বিনসহ প্রেরণ করেছেন। যাতে তা সব দ্বিনের ওপর বিজয়ী হয়। যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৩)

৫. ওহি পৌঁছা ও তা গ্রহণে পবিত্রতা : মহানবী (সা.) সঠিকভাবে ওহি গ্রহণ ও তা প্রচার করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী প্রজ্ঞাবান—সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৫-৬)

৬. হৃদয়ের পবিত্রতা : নবী করিম (সা.)-এর হৃদয়ের পবিত্রতা ঘোষণা করে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি যা দেখেছেন, তাঁর অন্তর তা অস্বীকার করেনি। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ১১)

৭. দৃষ্টিশক্তির পবিত্রতা : দৃষ্টিশক্তি নবী (সা.)-কে কখনো বিভ্রান্ত করেনি। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। ’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ১৭)

৮. অন্তরের পবিত্রতা : আল্লাহ মহানবী (সা.)-এর অন্তরকে সব ধরনের সংকীর্ণতামুক্ত করেন এবং তাতে প্রশস্ততা দান করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি কি আপনার হৃদয়কে প্রশস্ত করিনি?’ (সুরা : আশ-শরাহ, আয়াত : ১)

৯. মর্যাদা ও খ্যাতির পবিত্রতা : আল্লাহ মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও খ্যাতি দান করেছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং আমি আপনার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি। ’ (সুরা : আশ-শরাহ, আয়াত : ৪)

১০. ভারমুক্ত জীবন : আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিষ্কলুষ ও ভারমুক্ত রেখেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি অপসারণ করেছি আপনার ভার, যা ছিল আপনার জন্য অতি কষ্টদায়ক। ’ (সুরা : আশ-শরাহ, আয়াত : ২)

১১. মানবতার বন্ধু : মহানবী (সা.) ছিলেন মানবতার বন্ধু। মানুষ ও মানবতা বিপন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি কষ্ট পেতেন। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে এসেছে একজন রাসুল। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৮)

১২. পবিত্র পথের দিশা দানকারী : রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে সরল ও সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি তো কেবল সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। ’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৫২)

১৩. পবিত্র কিতাবের ধারক : নবীজি (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ কোরআন একটি আলোকদীপ্ত ঐশী গ্রন্থ, যা মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন হিদায়াত করে সে পথের দিকে, যা সুদৃঢ় এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদের সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য আছে মহা পুরস্কার। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)

১৪. সেরা উম্মতের নবী : আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদিকে ‘উত্তম জাতি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কোরো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

১৫. আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত সহচর : মহানবী (সা.)-এর সাহাবি বা সহচররা ছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছেন। তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও পুরস্কার। ’ (সুরা : হুজরাত, আয়াত : ৩)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০০)

১৬. সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতার অধিকারী : মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতার অধিকারী এবং আদর্শ মানুষের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ’ (সুরা : কলাম, আয়াত : ৪)

সর্বাঙ্গীণভাবে পূতপবিত্র নবী (সা.)-এর অনুসরণই মানবজাতিকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘একজন রাসুল, যিনি তোমাদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতগুলো পাঠ করে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার জন্য। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ১১)

আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.), তাঁর পরিবার ও সাহাবি এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের অনুসারীদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আমিন।

65
Hadith / শিরক সবচেয়ে বড় পাপ
« on: December 10, 2020, 12:33:54 PM »


কবিরা গুনাহ কী? অনেকেই মনে করেন, কবিরা গুনাহ মাত্র সাতটি, যার বর্ণনা একটি হাদিসে এসেছে। মূলত কথাটি ঠিক নয়।
কেননা হাদিসে বলা হয়েছে, উল্লিখিত সাতটি গুনাহ কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা উল্লেখ করা হয়নি যে শুধু এ সাতটি গুনাহই কবিরা গুনাহ, আর কোনো কবিরা গুনাহ নেই। এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কবিরা গুনাহ সাত থেকে ৭০ পর্যন্ত। (তাবারি)

ইমাম শামসুদ্দিন জাহাবি (রহ.) বলেন, উক্ত হাদিসে কবিরা গুনাহের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, কবিরা গুনাহ হলো, যেসব গুনাহের কারণে দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক শাস্তির বিধান আছে এবং আখিরাতে শাস্তির ধমক দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যেসব গুনাহের কারণে কোরআন ও হাদিসে ঈমান চলে যাওয়ার হুমকি বা অভিশাপ ইত্যাদি এসেছে, তাকেও কবিরা গুনাহ বলে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার ফলে কোনো কবিরা গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না। আবার একই সগিরা গুনাহ বারবার করার কারণে তা সগিরা (ছোট ) গুনাহ থাকে না। ওলামায়ে কেরাম কবিরা গুনাহের সংখ্যা ৭০টির অধিক উল্লেখ করেছেন। সেগুলো পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হবে—

১ নম্বর কবিরা গুনাহ আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা।
শিরক দুই প্রকার। এক. শিরকে আকবার, আল্লাহর সঙ্গে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা। অথবা যেকোনো ধরনের উপাসনা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর জন্য নিবেদন করা। যেমন—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশে প্রাণী জবেহ করা ইত্যাদি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করবেন না। তবে শিরক ছাড়া অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)

দুই. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক। রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আমল করা ইত্যাদি। এটিও শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব মুসল্লির, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন। যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে। ’ (সুরা : মাউন, আয়া : ৪-৬)

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি অংশীদারি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে আর ওই কাজে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি ওই ব্যক্তিকে তার শিরকে ছেড়ে দিই। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৫৩০০)


66


আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য রাসুল (সা.) আমাদের বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। নিচে এমনই গুরুত্বপূর্ণ একটি দোয়া দেওয়া হলো।

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাওয়ালি নি’মাতিকা ওয়া তাহবিলি আফিয়াতিকা ওয়া ফুজাআতি নিকমাতিকা ওয়া জামি’য়ি সাখাতিকা।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আপনার নিয়ামতের বিলুপ্তি, আপনার অনুকম্পার পরিবর্তন, আকস্মিক শাস্তি এবং আপনার সমস্ত ক্রোধ থেকে।

ইবনে উমার (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর শেখানো বিভিন্ন দোয়ার মধ্যে এটি অন্যতম। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪৫)



 
 

67
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখা খুবই জরুরি। আর মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য কিছু বিশেষ যত্ন ও সাবধানতা জরুরি। অথচ নিজের অজান্তেই প্রতিদিন অসংখ্য ভুল কাজে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যহানি করে চলেছি আমরা নিজেরাই।

সাতটি বদঅভ্যাস মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।
১. সকালের নাস্তা ভুলে যাওয়া/মিস করা
২. রাতে দেরিতে ঘুমানো
৩. অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া
৪. সকালে অধিক পরিমাণে ঘুমানো
৫. খাওয়ার সময় টিভি বা কম্পিউটার দেখা
৬.  ক্যাপ/স্কার্ফ বা মোজা পরে ঘুমানো
৭. ইচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব আটকে রাখা/বন্ধ করে রাখা


বিডি প্রতিদিন/

68
পৃথিবীর ইতিহাসে রবিউল আওয়াল একটি ঐতিহাসিক মাস। বিশিষ্ট গবেষক ও ঐতিহাসিক আল্লামা সুলাইমান মানসুরপুরী এবং আল্লামা মাহমুদ বাশার-এর গবেষণা অনুযায়ী ৫৭১ খৃষ্টাব্দের ২০/২২ এপ্রিল মোতাবেক আরবী রবিউল আওয়াল মাসেই রাসুল সা. দুনিয়ার বুকে আগমন করেন আর এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিকগণ-ই একমত। তবে কোন তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছে সে ব্যাপারে ৩,৮,৯,১২ সহ বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে রবিউল আওয়ালের ১২ তারিখকেই অধিকাংশ ঐতিহাসিক আলেম অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

রাসুল সা. হলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এ ধরাধামের জন্য প্রজ্জল এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ। তাঁর প্রকাশ রূপ হল দুইটি। একটি হল তার সৌন্দর্যের প্রকাশ। এটা হয়েছিলো মাতৃগর্ভ থেকে ধরণীর বুকে প্রিয় নবী সা. এর শুভাগমনের মাধ্যমে। এটা ইসলামের শরীয়াতে মিলাদুন্নবী বা নবীর জন্ম হিসেবে প্রসিদ্ধ। অপরটি হচ্ছে-রাসুল সা. এর কামাল তথা গুনাবলীর পূর্ণ বিকাশ। এটা হয়েছিলো জন্মের পর থেকে সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে। ইসলামী দৃষ্টি কোনে এটি সীরাতুন্নাবী হিসেবে প্রসিদ্ধ।

রাসুল সা. এর মিলাদ তথা জন্ম বৃত্তান্ত ও তৎসংশিষ্ট বিষয়ে উম্মতের অনুসরণীয় কিছুই নেই। অনুসরণীয় হল রাসুল সা. এর সীরাত। কারণ রাসুল সা. এর জন্ম কখন হয়েছিলো, কিভাবে হয়েছিলো, জন্মকালীন সময়ে কি কি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিলো, তার অবয়ব আকৃতি কেমন ছিলো এগুলো যদি কোন ব্যক্তি অনুসরণ করতে চায় তাহলে সেটা আদৌ সম্ভব নয়। তবে রাসুল সা.এর জন্ম সংক্রান্ত ও তার অবয়ব সম্পর্কে আলোচনা করা অত্যন্ত বরকত ও ফযীলতের বিষয়। এতে বহু কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে এরশাদ করেন, “অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। যে আল্লাহ কে এবং আখেরাত দিবসের আশা রাখে”। (সুরা আহযাব-২১)

অপর আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন “অর্থাৎ রাসুল সা. তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা আকড়ে ধরো এবং যে বিষয় নিষেধ করেছেন তা থেকে বেঁচে থাকো”। (সুরা হাশর-৭) এ মর্মে কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “অর্থাৎ হে রাসুল আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত স্বরুপই প্রেরণ করেছি”। (সুরা আম্বিয়া-১০৭) তাই সমস্ত মাখলুকের জন্যই তিনি ছিলেন করুনার আধার।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে রাসুল সা. বলেন, নবুওয়াতের পূর্বে যখন আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতাম দুপাশের গাছ ও পাথর আমাকে “আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ” বলে সালাম নিবেদন করত। সুতরাং রাসুল সা. এর জীবনেই রয়েছে আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। রাসুল সা. এর আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়ন করলেই সফলতার মুখ দেখা যাবে। রাসুল সা. এর সাহাবায়ে কেরাম তাঁর আদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করেই এ বিশ্বকে চূড়ান্ত সফলতার মুখ দেখিয়ে গিয়েছেন।

হযরত উমর ফারুক রা. যিনি অর্ধজাহানের অধিপতি ছিলেন। শাইখুল ইসলাম আল্লামা ত্বাকি উসমানী বলেন, হযরত উমর রা. যে বিশাল ভূখন্ড শাসন করতেন সেখানে বর্তমান বিশ্ব মানচিত্রের ৫০টি রাষ্ট্র রয়েছে। একদা আমিরুল মুমীনিন হযরত উমর রা. তার শাসন কালে সহচরদের নিয়ে কোন এক গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, হঠাৎ তিনি কোন এক পাহাড়ের পাদদেশে থেমে নিজেকে সম্বোধন করে বলছিলেন, হে উমর! তোমার কি মনে আছে তুমি কি ছিলে ? তুমি তো সামান্য উটের রাখাল ছিলে। এখানে উট চড়াতে। উটের পেশাবে তোমার দুই পা ভিজে যেতো।

উট চড়ানোর যোগ্যতাটুকু তোমার ছিলোনা। আজ তুমি অর্ধজাহানের খলিফা হয়েছো। এসব কিছু রাসুল সা. এর সোহবতের বরকতে হয়েছে। তার আদর্শ গ্রহনের কারণেই গোটা বিশ্ব তোমাদের পদচুম্বন করছে। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকেই রাসুল সা. এর সুন্নত অনুসরণের ব্যাপারে ছিলেন খুবই লালায়িত। ভয়-নিন্দা কোন কিছুকেই তাঁরা পরওয়া করতেন না।

হুদাইবিয়ার সন্ধির জন্য রাসুল সা. হযরত উসমান রা. কে মক্কার মুশরিকদের কাছে প্রেরণ করলেন। পূর্বে থেকেই মক্কায় তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। প্রথমে তিনি তার চাচাতো ভাইয়ের গৃহে গিয়ে অবস্থান করলেন। তার চাচাতো ভাই যখন তার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন তখন দেখতে পেলেন-তার কাপড় বা পায়জামা পায়ের গোড়ালী ও হাটুর মাঝ বরাবর রয়েছে। তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত উসমান রা. কে বললেন, তোমার যে বেশভূষা তাতে তো মক্কার নেতৃস্থানীয় লোকেরা তোমার কথার কোন গুরুত্ব প্রদান করবেনা।

কারণ তুমি তোমার কাপড়কে “নিসফে সাক” বরাবর উঁচু করে পরেছ। অথচ তুমি জানো, আরবের লোকেরা যে তার কাপড়কে অহমিকাবশত যত নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করে তাকে তারা ততো বেশি পছন্দ করে। প্রতিউত্তরে হযরত উসমান রা. বলেন, আমার কাপড়কে নিচু করে পড়বো না। কারণ এটা আমার রাসুলের সুন্নত।

এমর্মে অপর একটি ঘটনা ইতিহাস গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। তৎকালীন এক পরাশক্তি কিসরার দরবারে আলোচনার জন্য নিয়ে হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রা. ও হযরত রিবয়ী বিন আমের রা. কে প্রেরণ করা হল। তারা যখন কিসরার মেহমানখানায় প্রবেশ করবেন তখন তাদের কে বলা হল ভিতরে প্রবেশ করতে তোমাদের এ পোষাক পরিবর্তন করে আমাদের পোষাক পড়ে যেতে হবে। তারা এ দাবীকে প্রত্যাখ্যান করে বললেন এটা আমাদের ধর্মীয় পোষাক রাসুলের সুন্নত। সুতরাং আমরা কিছুতেই এটা পরিবর্তন করবো না।

পরে রাজদরবারের লোকেরা বাধ্য হয়ে তাদেরকে ঐ পোষাকেই প্রবেশ করার অনুমতি দিলো। অতপর যখন দস্তরখানে মেহমানদারীর পালা আসল তখন তারা সুন্নাত তরীকায় দস্তরখানে বসলেন। খাবারের মাঝে হযরত হুযাইফা রা. এক আশ্চর্যজনক ঘটনার অবতরণা করলেন। খাবারের লুকমা গ্রহনের মাঝে অনাকাংখিত কিছু খাবার নিচে পড়ে গেলো। পরক্ষনে হযরত হুযাইফা রা. রাসুল সা. এর সুন্নত মুতাবিক পতিত খাবারগুলো থেকে ময়লা পরিষ্কার করে তুলে নিতে উদ্বত হলেন। “কেননা রাসুল সা. বলেন তোমাদের কারো হাত থেকে যখন খাবারের কোন লুকমা পড়ে যায় তাহলে সে যেন তার থেকে ময়লা দূর করে তা উঠিয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য যেন রেখে না দেয়।

আর তোমাদের কেউ যেন খাবারের পরে হাত রুমালে না মুছে বরং সে যেন তার আঙ্গুলগুলো চেটে খায়। কারণ সে যানে না তার খাবারের কোন অংশের মধ্যে বরকত রয়েছে। হতে পারে পতিত লুকমার মাঝেই বরকত রয়েছে।” মুসনাদে আহমাদ-১৪২৫৬ হযরত হুযাইফা রা. যখন তার থেকে পরে যাওয়া লুকমাটি উঠিয়ে নিতে উদ্বত হলেন তখনই তার এক সঙ্গি হাত চেপে ধরলেন এবং বললেন তুমি এ কি করছো? তুমি ইরানের বাদশাহ বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি কিসরার দরবারে রয়েছো। তুমি যদি এ কাজ করো তাহলে এদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।

তখন হযরত হুযাইফা রা. সকলকে অবাক করে দিয়ে উত্তর দিলেন আমি এ নির্বোধ অবুঝদের কারণে রাসুল সা. এর সুন্নতকে ছেড়ে দিবো? পরবর্তিতে ইরানের সৈনিকরা তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল তোমরা তো আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে, দেখি তোমরা কোন তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করবে? হযরত রিবয়ী বিন আমর রা. তরবারি বের করলেন তার তরবারী দেখে ইরানের সৈনিকদের পছন্দ হচ্ছিলো না। তৎক্ষণাত হযরত রিবয়ী বিন আমর রা. বললেন তোমরা তো তরবারি দেখেছো তরবারি বহনকারীর বাহু দেখনি। তখন তারা তাদের সবচেয়ে মজবুত ঢালের ব্যাপারে ধারণা ছিলো কোন আঘাতেই এটার কোন ক্ষতি হবে না। হযরত রিবয়ী বিন আমর রা. তার তরবারি দিয়ে প্রচন্ড এক আঘাতে ঢালটি দ্বিখন্ডিত করলেন। এ সংবাদ শুনে স¤্রাট কিসরা তাদেরকে রাজদরবারে তলব করলেন ভিতরে প্রবেশ করে তারা দেখতে পেলেন সম্্রাট একা রাজসিংহাসনে বসে আছেন।

আর অন্য সকলে তার সম্মানার্থে মাথা ঝুঁকিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। সাহাবিরা লক্ষ্য করলেন, এ কাজটি রাসুল সা. এর সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। “কেননা রাসুল সা. বলেন যে ব্যক্তি চায় এবং খুশি হয় মানুষেরা তার সম্মানার্থে ঠায় দাড়িয়ে থাকুক তাহলে সে যেন তার অবস্থান স্থল জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” তিরমীযী-২৬৯৮ তাই তারা বললেন সম্্রাট হয়ত আমাদের জন্যও বসার ব্যবস্থা করুন অথবা আপনি নিজে দাড়িয়ে যান। আমরা আপনার সাথে দাড়িয়ে কথা বলি। তখন সম্্রাট ক্রোধান্বিত হয়ে তার সৈন্যদেরকে বলল ওদের সাথে কোন আলোচনা নেই। ওদের মাথায় এক টুকরি মাটি দিয়ে দাও। সাহাবিরা মাটির টুকরি মাথায় নিয়ে বললেন হে স¤্রাট তুমি যেনে রেখো ইরানের মাটি তুমি আজ আমাদের দিয়ে দিয়েছো।

ইরানের সম্রাট কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলো। সে তৎক্ষণাৎ মাটির টুকরি ফেরত নেয়ার জন্য লোক পাঠালো। কিন্তু তারা সফল হলো না। আপনারা অনেকেই হয়ত হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. কে চিনেন। তিনি উচু পর্যায়ের এক বুজুর্গ ছিলেন। শেষ বয়সে তাকে যারা দেখেছেন তাদের মনে থাকার কথা সব সময় তিনি মাথা নিচু করে শাহাদাত আঙ্গুলি উচু করে তাসবীহ হাতে হুইল চেয়ারে জিকির করতে থাকতেন। তৎকালিন সময় ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলছিলো। অনেকেই এ যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন। হযরত হাফেজ্জী হুজুরও সে জন্য ইরাক ও ইরানে সফর করেছিলেন।

তিনি লন্ডন, ইরান, সৌদি আরব ও ইরাকে সফর করেছিলেন। এজন্য সর্বপ্রথম যখন তারা লন্ডনে একটি সেমিনারের জন্য সফর করলেন, তখন হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর নেতৃত্বে একটি দল সফর করলেন। সফরে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর সঙ্গে যারা ছিলেন। সকলেই স্বাভাবিক সুন্নতি পোষাক পড়ে লন্ডনে সফর করলেন। তবে সাথে অপর একজন দাড়ি-টুপি ওয়ালা ছিলো সে চিন্তা করলো যেহেতু লন্ডনে এসেছি তাদের পোষাক পড়ে সেমিনারে যোগদান করলে হয়ত এতে আলাদা সম্মান পাওয়া যাবে। কিন্ত ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরিত ঘটে গেলো। লন্ডন এয়ারপোর্টে নামার পরে সুন্নতি পোশাকে যারা ছিলেন চেকপোষ্টে অবস্থানরত দায়িত্বশীলগণ তদেরকে সহজেই ছেড়ে দিলো। কিন্তু ঐ লোকটি বড় বিড়ম্বনার শিকার হল।

এয়ারপোর্টে বিভিন্ন চেকের কারণে তাকে প্রায় ৪-৫ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হল। পরে লোকটি যখন সফরকারীদের কাছে উপস্থিত হল তখন বলল আমি আপনাদের মত সুন্নতি লেবাস না পরে বিরাট ভুল করেছি। এজন্যই এত হয়রানির শিকার হয়েছি। “রাসুল সা. এরশাদ করেছেন তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষন পর্যন্ত আমি তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সমস্ত মানুষের চেয়ে তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় না হবো।” বুখারী-১৪ সুতরাং আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের লাঞ্চনার মূল কারণ হচ্ছে রাসুল সা. এর আদর্শ পরিত্যাগ করা।

আজ আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ইহুদি, খৃষ্টান, মূর্তিপূজারীদের অনুসরণ করছি। তাদের দালালী করছি। এত কিছু করেও কোন ফলাফল হচ্ছে না। আমরা মার খেয়েই যাচ্ছি, লাঞ্চিত হয়েই চলছি। এর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে রাসুল সা. এর আদর্শকে আমাদের মাঝে পরিপূর্ণরুপে বাস্তবায়ন করা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে পরিপূর্ণ ভাবে রাসুলের আদর্শ ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: জামিয়া আরাবিয়া শামসুল উলুমের প্রিন্সিপাল ও শাইখুল হাদিস, ফরিদপুর চকবাজার জামে মসজিদের খতিব।

69
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন মহান সমাজ সংস্কারক। প্রাক- ইসলামী যুগে আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। গোত্র কলহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি, হানাহানি, সামাজিক বিশৃঙ্খলার নৈরাজ্য পূর্ণ অবস্থার মধ্যে নিপতিত ছিল গোটা সমাজ। সামাজিক সাম্য- শৃঙ্খলা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, নারীর মর্যাদা ইত্যাদির কোনো বালাই ছিল না। জঘন্য দাসত্ব প্রথা, সুদদ, ঘুষ, জুয়া মদ, লুন্ঠন, ব্যভিচার, পাপাচার, অন্যায়- অত্যাচারের চরম তাণ্ডবতায় সমাজ কাঠামো ধসে পড়েছিল, এমন এক দুর্যোগময় যুগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব।

তিনি আরবের বুকে বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করে বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয় খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে নবুওতের আলোকে উদ্ভাসিত করেন। ঐতিহাসিক রেমন্ড লার্জ বলেন, The founder of islam is in fact the promoter to the first social and international revolution of which history gives mention. (প্রকৃতপক্ষে সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক বিপ্লবের সূচনাকারী হিসেবে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক এর নাম ইতিহাসে প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে)।

সমাজ সংস্কারে হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কৃতিত্ব:-
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজের যাবতীয় অনাচার দূর করে যে এক জান্নাতী সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন। নিম্নে তার সংস্কারের সামান্য নমুনা পেশ করা হল:-

তাওহিদের আদর্শে সমাজের পত্তন:
ধর্মীয় ক্ষেত্রে নানা অনাচার, পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে সমগ্র সমাজ- সংগঠনকে এক আল্লাহে বিশ্বাসী তাওহিদের আদর্শে সমাজকে নবরূপে রূপায়িত করেন। সকল ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের উৎস একমাত্র আল্লাহকেই মেনে নিয়ে সমাজের সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ব্যবস্থা করেন।

মানবতার ভিত্তিতে সমাজ গঠন:
সমগ্র আরবদেশ জঘন্য পাপ ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাম্য অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্বমানবতার ভিত্তিতে যে এক উন্নত ও আদর্শ সমাজব্যবস্থার প্রবর্তন করেন পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই। তাঁর প্রবর্তিত সমাজে গোত্রের বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের বন্ধনই ছিল মজবুত ঐক্যের প্রতীক। তিনি অন্ধ অভিজাত্যের গৌরব ও বংশ মর্যাদায় গর্বের মূল নির্মমভাবে কুঠারাঘাত হানেন এবং সাম্য ও ন্যায় এর ভিত্তিতে আদর্শ সমাজ কাঠামো প্রস্তুত করেন। এ একটিমাত্র আঘাতেই আরবের একমাত্র বন্ধন গোত্রপ্রীতি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এবং ঈমান এই বন্ধনের স্থান দখল করল।

তিনি ঘোষণা করলেন, “সকল মানুষ সমান সমান”। মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর সবদিকে অনুগত ও মানব এর সর্বাধিক কল্যাণকামী। তার সমাজ ব্যবস্থায় উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, কালো সাদার বৈষম্য রইল না। মানুষে মানুষে সকল প্রকার অসাম্য ও ভেদাভেদ দূরীভূত করে মানবতার অতুজ্জ্বল আদর্শে সমাজ বন্ধন সুদৃঢ় সুদৃঢ় করেন। আরবের ইতিহাসে রক্তের পরিবর্তে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত।

দাসপ্রথার উচ্ছেদ:
আরবে বহু যুগ ধরে গোলামীপ্রথা প্রচলিত ছিল। মনিববগণ গোলামদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করত। মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিল না। তারা পশুর মতো জীবন যাপন করত। তাদেরকে বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। হযরত মুহাম্মদ সাঃ মনিবদের নির্দেশ দিলেন ক্রীতদাসদের প্রতি সদাচরণ করো। তোমরা যা খাও, পরিধান করো, তা তাদের খেতে এবং পরিধান করতে দাও। তিনি তাদের মুক্তির পথ নির্দেশ করে ঘোষণা দিলেন, গোলামকে আজাদীদানের কাজ আল্লাহর কাছে একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তিনি অনেক দাস কে মুক্তি করে দেন এবং অনেক সাহাবী তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তার উদারতার জন্য দাস বেলালকে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন এবং ক্রীতদাস জায়েদকে সেনাপতিত্বে বরণ করে দাসদের পূর্ণমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।

নারীর মর্যাদা দান:
তৎকালীন আরবে নারীদের ভোগ্য সামগ্রী মনে করত। তারা ছিল পুরুষদের দাসীমাত্র। কন্যা সন্তানদের জীবন্ত দাফনপ্রথা সিদ্ধ ছিল। পরিবারের কর্তা ইচ্ছে করলে নারীকে ক্রয়-বিক্রয় এবং হস্তান্তর করতে পারতো। পিতা এবং স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোন অংশ ছিল না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সমাজে অভূতপূর্ণ মর্যাদা দিলেন। তিনি নারী-পুরুষ সকলকে সমমর্যাদা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “জননীর পদতলে সন্তানের বেহেশত”। তিনি আরো বলেন, “সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করে “। তিনি সর্বপ্রথম নারীগণকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেন। এসবের জন্য নারী জাতি সমাজের অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ এ পরিণত হল।

সংঘাতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা:
তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকত। সামান্য অজুহাতে ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজত আর দীর্ঘকাল যাবত তা দাবানলের মতো জ্বলতে থাকত। রক্তপাত ও লুন্ঠন ছিল তাদের নিত্যদিনের পেশা। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সমস্ত অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রাক-নবুওয়াত “হিলফুল ফুজুল” এবং পরে “মদিনা সনদ” এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি আনয়ন করেন।

মদ্যপান রহিতকরণ:
মদ্যপ্রিয়তা আরবদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল।
নর্তকিদের সাথে মদোমত্ত হয়ে তারা যেকোন অশ্লীল কাজ করত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনে চরম ক্ষতি সাধনকারী। তাই তিনি কঠোরভাবে মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সমাজের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হন।

জুয়া নিষিদ্ধ:
তৎকালীন আরবে জুয়া খেলার ব্যাপক প্রচলন ছিল এবং এটাকে সম্মানজনক অভ্যাস মনে করত।
জুয়া খেলায় হেরে মানুষ অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো। ফলে ব্যাহত হতো সামাজিক জীবন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সমাজকে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।

কুসীদপ্রথা উচ্ছেদ:
কুসীদ প্রথা বলতে এক প্রকার সুদের কারবার প্রথা। আরব সমাজে জঘন্য কুসীদপ্রথা বিদ্যমান ছিল। তারা এত উচ্চহারে সুদের কারবার করত যে সুদ পরিশোধ করতে না পারলে সুদগ্রহীতার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তির সাথে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে নেওয়া হতো। আরবে প্রচলিত ব্যবস্থা সুস্থ সমাজ বিকাশে প্রচন্ড বাধাস্বরুপ ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ হারাম ঘোষণা করেন এবং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে “করজে হাসানা” দানে উৎসাহিত করেন।

কুসংস্কার হতে মুক্তি:
আরবের জাহেলি সমাজে নানা কুসংস্কার ছিল। ভাগ্য নির্ধারক তীর, দেবদেবীর সঙ্গে অলীক পরামর্শ, মৃতের অজ্ঞাতযাত্রার ধারণা প্রভৃতি চালু ছিলো। শুধু তা- ই না, আরো নানা প্রকার ভূত-প্রেত, দৈত্য, পরী প্রভৃতিকে বিশ্বাস করত। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে তাদের মন-মগজ থেকে সমস্ত কুসংস্কার দূর করেন।

নিষ্ঠুরতার অবসান:
প্রাচীনারব নিষ্ঠুরতায় ভরপুর ছিল। ভোগবাদী আরবরা দাস-দাসী, এমনকি শত্রু গোত্রের লোকদের সাথে অমানবিক নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিত। বিত্তবানরা খেলার ছলে দ্রুতগামী ঘোড়ার লেজের সাথে নারীকে বেঁধে দিত। যার ফলে হতভাগা নারীর প্রাণ-প্রদীপ নিভে যেত। মহানবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজ হতে এরুপ বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা দূর করে সমাজের অমূল পরিবর্তন অনয়ন করেন।

যাকাতের বিধান জারি:
অর্থনৈতিক দৈন্যদশা বিদূরিত করে সমাজের সার্বিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সৌধ নির্মাণ এর নিমিত্তে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতের বিধান প্রবর্তন করেন। যাতে করে সমাজ হতে দারিদ্র্য বিমোচনের পথ সুগম হয়। তিনি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য সমাজ হতে চিরতরে উৎখাত করেন।

আর্থ-সামাজিক অসাধুতা দূর:
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর্থ-সামাজিক অসাধুতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, হটকারিতা, মজুতদারী, কালোবাজারি, ইত্যাকার যাবতীয় অনাচার হারাম ঘোষণা করে সমাজ থেকে উচ্ছেদ করে একটি সুন্দর, পবিত্র সমাজ কাঠামো বিনির্মাণ করেন।

জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা:
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করেন। অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা এবং কারো সম্পদ গ্রাস করা যাবে না। সকলের জীবন-সম্পদ পবিত্র আমানত এ বিশ্বাসের উপর সমাজ কাঠামোকে গড়ে তোলেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা:
বিভিন্ন প্রকার অবিচার, অনাচার দূরীকরণের জন্য বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাহু সাল্লাম আইনের শাসন কায়েম করেন। আইনকে ব্যক্তিবিশেষ অথবা কোন গোত্রের হাতে না দিয়ে কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করেন। যেন আইন কারো ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার না হয়।

উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি অল্প সময়ে স্বীয় প্রচেষ্টা অদম্য শক্তিবলে সকল অনাচার এর মূলোচ্ছেদ করে অসভ্য, দ্বিধাবিভক্ত সদা কলহপ্রিয় সে সময়ের সর্বাপেক্ষা অধঃপতিত আরবকে সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যবন্ধনে সঙ্ঘবদ্ধ জাতিতে পরিণত করে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।এভাবেই তিনি পুরো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। যার জন্য বলতে হয় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ একজন আদর্শ, মহামানব ও আখেরী নবী। কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসরণ করবে অবশ্যই তারা হেদায়েত পাবে। ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভ করবে।

70
মুমিন জীবনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত ফরজ। এর কোনো তুলনা হয় না। ফরজ আদায়ের পর যারা নফল আদায় করে তাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত। নফলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অধিকতর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করে। হাদিসে কুদসিতে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে। একপর্যায়ে সে আমার মাহবুব ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়।’ (বুখারি: ২/৯৬৩)

নফল ইবাদতের মধ্যে নফল নামাজ আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নামাজের বাইরেও কিছু নফল নামাজ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো- আওয়াবিন নামাজ।

আওয়াবিন শব্দটি ফার্সি। এটি ‘আওয়াব’ শব্দ থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো খোদাভীরু। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় মাগরিবের ফরজ ও সুন্নত নামাজ আদায় করার পর যে নফল নামাজ পড়া হয় তাকে আওয়াবিন নামাজ বলে।

আওয়াবিনের ওয়াক্ত: আওয়াবিন একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ। হাদিস শরিফে ‘সালাতুল আওয়াবিন’ নামেই নামাজটির উল্লেখ রয়েছে। মাগরিবের নামাজের পর আওয়াবিনের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং এশার আগ পর্যন্ত তার সময় বাকি থাকে। মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি মুরসাল হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নামাজি ব্যক্তি যে নামাজ পড়ে একে সালাতুল আওয়াবিন (আওয়াবিনের নামাজ) বলে।’ (জামে সাগির : ২/৪২৭)। আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে (নিভৃতে) যে নামাজ পড়া হয় একে সালাতুল আওয়াবিন (আওয়াবিন নামাজ) বলে।’ (কিয়ামুল লাইল : ৮৮)। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আওয়াবিনের ওয়াক্ত ঐ সময় থেকে শুরু হয়, যখন নামাজি মাগরিবের নামাজ পড়ে শেষ করে এবং এর ওয়াক্ত এশার ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত থাকে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ৫৯৭৩)

ফজিলত: হাদিস ভা-ারে আওয়াবিন নামাজের অনেক ফজিলত, মাহাত্ম্য ও বরকতের কথা বর্ণিত হয়েছে। সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয় এ নামাজের মাধ্যমে। আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মাগরিবের নামাজের পর যে ব্যক্তি ছয় রাকাত নফল নামাজ পড়বে তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ : ৩৩৮০)।

সালেম (রহ.) স্বীয় পিতা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়বে তার পঞ্চাশ বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ (নাইলুল আওতার : ৩/৫৫)। অন্য আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘এ নামাজে গুরুত্বারোপকারী বান্দা আওয়াবিন তথা আল্লাহমুখী, আনুগত্যকারী ও নেককার বান্দাদের গণ্য হবে।’

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়বে তাকে আওয়াবিন তথা নেককার, আনুগত্যকারী বান্দাদের মধ্যে লেখা হবে এবং কোরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল।’ (বনি ইসরাইল : ২৫) [আল বাহরুর রায়েক : ২/৫০]।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজের পর এ নামাজ পড়বে তার মর্যাদা জান্নাতের উঁচু স্থানে হবে।’ (ইতহাফুস সাদাহ : ৩/৩৭১)।

১২ বছরের ইবাদতের সমান সওয়াবের সুসংবাদ রয়েছে আওয়াবিন নামাজে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে ছয় রাকাত নফল আদায় করে, মাঝখানে কোনো দুনিয়াবি কথা না বলে, তাহলে সেটা ১২ বছরের ইবাদতের সমান গণ্য হবে।’ (তিরমিজি : ১/৫৫৯)

নিয়মিত আওয়াবিন পড়লে বেহেশতে ঘর তৈরি করা হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়বে আল্লাহতায়ালা তার জন্য বেহেশতে একটি ঘর প্রতিষ্ঠিত করবেন (অর্থাৎ সে বেহেশতে যাবে)’ (তিরমিজি : ১/৯৮, হাদিস : ৪৩৭)। হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, এশার মধ্যবর্তী সময়ের নামাজও রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ বলে গণ্য হবে।’ (আসসুনানুল কুবরা, বাইহাকি)।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ফেরেশতারা ঐসকল লোকদের ঢেকে নেয়, যারা মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নামাজ পড়ে। আর এ নামাজের নাম সালাতুল আওয়াবিন (আওয়াবিনের নামাজ)।’ (শরহুস সুন্নাহ, বাগাবি : ৮৯২)

আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী হাদিসসমূহের পাশাপাশি এ নামাজের ব্যাপারে নবীজির নিজের (সা.) আমলও হাদিসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। আম্মার ইবনে ইয়াজিদের ছেলে মোহাম্মদ ইবনে আম্মার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আমার পিতা আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে (রা.) দেখেছি, তিনি মাগরিবের পর দুই রাকাত পড়তেন এবং বলতেন, আমি আমার প্রিয় মোহাম্মাদ (সা.)-কে দেখেছি, তিনি মাগরিবের পর ছয় রাকাত নামাজ পড়তেন।’ (আল মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানি: ২৭৪৫)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও বলেছেন, নবীজি (সা.) এ নামাজ পড়েছেন।’ (কিয়ামুল লাইল : ৮৮)। হুজায়ফা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির (সা.) কাছে এসে তার সঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। তিনি মাগরিবের পরে এশার নামাজ পর্যন্ত নফল নামাজে রত থাকলেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২/১৫)। আনাস (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নফল নামাজ পড়তেন।’ (নাইলুল আওতার : ৩/৫৪) আনাস (রা.) থেকেই অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) অনেক সময় মাগরিবের নামাজ পড়ে নফল নামাজ পড়তেন, এমনকি কখনো এশার নামাজের আজান হয়ে যেত।’ (কাসফুল গুম্মাহ : ১১২)।

আওয়াবিন নামাজ কয় রাকাত: এই নামাজ কমপক্ষে ছয় রাকাত এবং সর্বাপেক্ষা বিশ রাকাত নফল নামাজ। ছয় রাকাত পড়ারও সুযোগ না হলে মাগরিবের দুই রাকাত সুন্নত মিলিয়ে ছয় রাকাত পড়া যায়। নবীজি (সা.) কখনো ৬ রাকাত (তিরমিজি) কখনো ৪ রাকাত (নাইলুল আওতার) কখনো ১২ রাকাত (ইতহাফুস সাদাহ : ৩/৩৭১) আবার কখনো বা ২০ রাকাত (তিরমিজি : ৪৩৫) নফল নামাজ পড়তেন। তবে ৬ রাকাতই অধিকাংশ সময় পড়তেন।

সাহাবায়ে কেরামও এ নামাজের খুব গুরুত্ব দিতেন। আনাস (রা.) বলেন, সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় জামাত মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে এ নামাজ আদায় করতেন।’ (নাইলুল আওতার : ৩/৫৪)। তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ি ও পূর্বসূরী সবাই এর ওপর আমল করেছেন।

আওয়াবিন পড়ার পদ্ধতি: নিঃসন্দেহে এ নামাজ অনেক ফজিলত ও মর্যাদার অধিকারী। এ নামাজের প্রতি গুরুত্বদান উভয় জাহানে বরকত ও কল্যাণের কারণ। নামাজটি পড়ার পদ্ধতি হলো-দুই দুই রাকাত করে তিন সালামে নামাজটি পড়া। বিদগ্ধ ফকিহদের অভিমতও এটাই যে, এ নামাজ দু রাকাত করে তিন সালামে পড়া মোস্তাহাব। (আল বাহরুর রায়েক : ২/৫০)। দু রাকাত করে পড়া এজন্যও উত্তম যে, নবীজি (সা.) রাতের নামাজ দুই রাকাত করে পড়তেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ফরজের পাশাপাশি নফল ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ।

71
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজর নামাজের গুরুত্ব অনেক। হাদিসে এর এত বেশি গুরুত্ব এসেছে যে, যদি একজন মুমিন তন্মধ্য থেকে মাত্র একটিও মনে রাখে তাহলেও এক্ষেত্রে তার গাফলতি অনায়াসে দূর হয়ে যাবে। তার হিম্মত বেড়ে যাবে। ঘুম ও অলসতা কাটিয়ে ওঠতে সক্ষম হবে। নব প্রেরণায় উজ্জীবিত হবে। যেমন-

এক- ফজরের নামাজে দাঁড়ানো, সারা রাত দাঁড়িয়ে নামায পড়ার সমান। উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতে এশার নামাজ আদায় করলো, সে যেন অর্ধেক রাত জেগে নামাজ পড়লো। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়লো, সে যেন পুরো রাত জেগে নামাজ পড়লো। -সহিহ মুসলিম: ১০৯৬

দুই- ওই দিনের পুরোটা আল্লাহর জিম্মায় থাকার দুর্লভ সৌভাগ্য। ফজরের নামাজ পড়লেই শুধু এ-ঈর্ষণীয় সৌভাগ্য লাভ করা যাবে। যুনদব ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সুফইয়ান আলবাজালি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেল। অতএব আল্লাহ যেন তার জিম্মার বিষয়ে তোমাদেরকে কোনোরূপ অভিযুক্ত না করেন। -জামেউত তিরমিযি: ২১৮৪

তিন- ফজরের নামাজ কেয়ামতের দিন নুর হয়ে দেখা দেবে। বুরাইদা আল আসলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা আঁধারে (ফজর নামাযে) মসজিদের দিকে হেঁটে যায়, তাদের কেয়ামতের দিন পরিপূর্ণ নুর প্রাপ্তির সুসংবাদ দাও। -সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৪

চার- জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদ। আবু যুহাইর ‘উমারাহ ইবনে রুআইবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে (ফজরের ও আসরের নামাজ) আদায় করবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। -সহিহ মুসলিম: ৬৩৪

পাঁচ- মুনাফেকি থেকে মুক্তি পাবে। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকদের ওপর ফজর ও এশার নামাজ অপেক্ষা অধিক ভারী নামাজ আর নেই। যদি তারা এর ফজিলত ও গুরুত্ব জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বা পাছার ভরে অবশ্যই (মসজিদে) উপস্থিত হত।
-সহিহ বুখারি: ৬৫৭



72
বিখ্যাত আরবি সাহিত্যিক শায়েখ সুলাইমান আল জিলানির বর্রণা করা একটি ঘটনা আমার হৃদয়ে আটকে আছে। তিনি বলেন, একবার তিনি গাড়িতে করে তার আরো দুইজন আলেম সাথী নিয়ে সফরে রওনা করেন।এক জায়গায় রাস্তার উপর কতগুরো উট দেখেতে পেলাম। রাস্তার অপর পাশে একটি গাড়িতে বৃদ্ধ একজন লোক বসে আছে।আমি গাড়ি সামনে নিতে পারছিলাম না উটগুলোর কারণে। উটের রাখালরা উটগুলোকে হাঁকাচ্ছে কিন্তু সেগুলো রাস্তা ছাড়ছিলো না।

আমি ভাবলাম হরণ বাজালে হয়ত উটগুলো রাস্তা ছেড়ে দিবে। আমি তাই আমার গাড়ির হরণ বাজালাম। এমনি গাড়িতে বসা বৃদ্ধ উটের মালিক আমাকে গালিগালজ করতে শুরু করলো। আমার বাবা নিয়ে অভিশাপ দিতে থাকলো। বলল অভিশাপ পড়ুক এমন বাবার উপর যে তোমার মত ছেলেকে জন্ম দিয়েছে, আমার উটের উপর হরণ বাজানোর তুই কে! তোকে যে জন্ম দিয়েছে তার উপরও অভিশাপ। যা তা বলে আমাকে গালি দিতে থাকলো।

বৃদ্ধর উপর আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হলো। সাধারণ একটি হরণের জন্য এভাবে গালিগালাজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমি তো ভালোর জন্যই হরণ বাজিয়েছিলাম, হয়ত আমার হরণ শুনে উট চলতে শুরু করবে। আর এর বদলায় এমন গালি শুনতে হলো?

আমি খুব রাগান্বিত হয়ে গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে গায়ের জোড়ে দরজাটি বন্ধ করি। জামার হাতা গুটাতে গুটাতে বৃদ্ধের দিকে যেতে থাকি। গাড়িতে থাকা আমার দুই সাথীর মধ্যে একজন বললেন আপনি কী করতে যাচ্ছেন। আমি বললাম আজ নতুন কিছু দেখবেন। আমি এটা বলে হনহন করে বৃদ্ধের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।

গিয়ে খুব জোড়ে শব্দ করে তার গাড়ির দরজা খুললাম। বৃদ্ধ আমার ভাবসাব দেখে ভয় পেয়ে গেলো। আমি দরজা খুলেই তার কপালে চুমু দিলাম। আমি বললাম আমাকে আপনি ক্ষমা করে দেন, আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি, আমি আপনার উটকে কষ্ট দিয়েছি। তার অর্থ আমি আপনাকেই কষ্ট দিয়েছি। আসলেই আমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।

বৃদ্ধ আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল। বেটা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও আমি তোমার বাবা মা কে গালি দিয়েছি, অভিশাপ দিয়েছি। আর তুমি আমার কপালে চুমু খেয়েছ আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছ। তুমি বরং আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তখন বললাম, আপনি আমার বাবা-মা এমনকি আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন, গালিগালাজ করেছন।

আল্লাহর কসম, আমি কিয়ামত পর্যন্ত আপনাকে ক্ষমা করব না। তবে আপনি ক্ষমা পেতে পারেন এক শর্তে। শর্ত যদি মানেন তাহলে আমি আপনাকে ক্ষমা করবো। বৃদ্ধ লোকটি বলল কী তোমার শর্ত বল। আমি শর্ত মানতে রাজি আছি। আমি বললাম আমাদের উটের দুধ পান করাতে হবে। বৃদ্ধ খুশি হয়ে বলল অবশ্যই।

বৃদ্ধ তার খাদেমদের আদেশ দিলেন, তাড়াতাড়ি গদি বসাও। গালিচা বিছাও। আরেকজন গিযে দুধ দোহন করে নিয়ে আসো। আমার সঙ্গীরাসহ পেটভরে দুধ পান করি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি শের পারেন? তিনি আমাদের শের শুনাতে শুরু করে। অনেক কবিতা শুনায় আমাদের। আমাদের এ মাহফিল আধাঘণ্টা পর্যন্ত চলে। আমরা যখন ওঠার অনুমতি চাই, বৃদ্ধ আমাদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরে বলল আমি তোমাদেরকে ছাড়বো না।

আল্লাহর কসম তোমাদেরকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। তোমাদেরকে এভাবে যেতে দিবো না। আমি বৃদ্ধকে বললাম আমাদের এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে আবার একদিন আপনার মেহমান হবো। এখন আমাদের অনুমতি দেন। বৃদ্ধ তার উটের পেছনে পর্দা করা তিনটি মেয়েকে দেখিয়ে বলল আমার তিনটি মেয়ে আছে, তোমরা তিন জনও আলেম ও বুদ্ধিমান। তোমরা তাদেরকে বিয়ে করে আমাকে সম্মানিত কর।

সম্মানিত পাঠক! আপনাদের কী মনে হয়? গালির বদলায় একটি নয় তিন তিনটি প্রস্তাব। এটা এজন্যই যে, আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন, ভাল ও মন্দ সমান নয়। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শুত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। (সুরা হা-মীম ৪১:৩৪)

আমি যদি বৃদ্ধের গালির বিপরিতে ভালো আচরণ না করতাম, তাহলে চিত্রটা অন্যরকমও হতে পারতো। গালির বিপরিতে ভালো আচরণের কারণে এ ঘটনাটা কত সুন্দর হয়ে গেলো। আমরা যদি কুরআনের এ ছোট্ট আয়তটার উপর আমল করি, তাহলে আমাদের পৃথিবীটা আরো সুন্দর ও জান্নাতের মত আনন্দময় হয়ে যেতো।
সূত্র: আরমোগান বাংলা সাইট

73
আওয়ার ইসলাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কেউ দোয়া করলে তিনি খুব খুশি হন । যারা আল্লাহর কাছে চায় আল্লাহ তাদের তিনি ভালোবাসেন। আর যারা আল্লাহর কাছে চায় না তিনি তাদের অপছন্দ করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের প্রভু বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ -সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০

আল্লাহ বলেছেন আমাদের ডাকে সাড়া দিবেন। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায়, আমরা দিনরাত তার কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেও কবুল হচ্ছে না। এর কারণ কী? ইসলাম বিশেষজ্ঞদের মতে কিছু কিছু কারণে আমাদের দোয়া আরশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় না। যদি এসব ক্ষেত্রে আমরা একটু সচেতন হয় তাহলে আমরা আমাদের ডাকে সাড়া দিবেন বলে আশা করা যায়।

এক- আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া : হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎ কাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তাআলা শিগগির তোমাদের ওপর তাঁর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তাঁর কাছে দোয়া করলেও তিনি তোমাদের সেই দোয়া গ্রহণ করবেন না। -সুনানে তিরমিজি: ২১৬৯

দুই- আত্মীয়তা ছিন্ন করা : আত্মীয়তা ছিন্ন করা একটি বড় ধরনের পাপ। এই পাপের শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কোনো মুসলিম দোয়া করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের দোয়া না করলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে এ তিনটির কোনো একটি দান করেন। এক- হয়তো তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সুপারিশ দুনিয়ায় দান করেন, দুই- অথবা তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন এবং তিন- অথবা তার কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদ তার থেকে দূরে করে দেন। সাহাবিরা বলেন, তাহলে তো আমরা অনেক বেশি লাভ করব। তিনি বলেন, আল্লাহ এর চেয়েও বেশি দেন। -আত-তারগীব: ১৬৩৩

তিন- দোয়া করে নিরাশ হওয়া : দোয়ার পর আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখো যে আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করবেন। নেতিবাচক কোনো চিন্তা না করা। অন্যথায় এ দোয়া বিফল হয়ে যেতে পারে। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়ে থাকে। যদি সে তাড়াহুড়া না করে আর বলে যে, আমি দোয়া করলাম, কিন্তু আমার দোয়া তো কবুল হলো না। সহিহ বুখারি: ৬৩৪০

চার- হারাম থেকে বেঁচে থাকা : দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে হারাম খাদ্য, বস্ত্র, পানীয় ইত্যাদি পরিহার করা। হারাম উপার্জনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে যতই দোয়া করা হোক, তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত ও সারা শরীর ধুলামলিন। সে আসমানের দিকে হাত প্রশস্ত করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে? – সুনানে তিরমিজি: ৮৯৬৯

পাঁচ-অন্যমনস্ক হয়ে দোয়া করা : দোয়ার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দোয়া করা। আল্লাহ অবচেতন মনের দোয়া গ্রহণ করেন না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কোরো। জেনে রেখো, আল্লাহ অমনোযোগী ও অসাড় মনের দোয়া কবুল করেন না। -সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৯)

74
সুলাইমান মোল্লা: হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমআ এবং রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে যে সব গোনাহ হয়ে থাকে তা পরবর্তী নামাজ, জুমআ এবং রমজান (পালনে) সে সব মধ্যবর্তী গোনাহসমূহের কাফফারা হয়ে থাকে। যদি কবিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে।’ (মুসলিম, তিরিমজি)

উল্লেখিত হাদিসেরর আলোকে বুঝা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি ফজরের নামাজ পড়ার পর পরদিন ফজরের নামাজ আদায় করে তবে এ সময়ে মধ্যে করা সব (কবিরা গোনাহ ব্যতিত) গোনাহ আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিবেন।

অনুরূপভাবে এক জুমা থেকে অপর জুমা এবং এক রমজানের রোজা আদায়ের পর থেকে পরবর্তী রমজানের রোজা আদায় করে তবে ওই ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত পূর্ণ এক বছরের সব (কবিরা গোনাহ ব্যতিত) গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে।

জুমার দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে ফজিলতপূর্ণ অনেক আমল। এগুলো মধ্যে তিনটি আমল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো হলো-

এক. জুমার দিনে ‘সুরা কাহফ’ তেলাওয়াত করা। কুরআনুল কারিমের ১৫তম পারার ১৮নং সুরা এটি। যদি কেউ সম্পূর্ণ সুরাটি তেলাওয়াত করতে না পারে তবে সে যেন এ সুরার প্রথম এবং শেষ ১০ আয়াত তেলাওয়াত করে।

এই আমলের ফজিলত- যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে তার জন্য এক জুমা থেকে অপর (পরবর্তী) জুমা পর্যন্ত নূর হবে। যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, সে আটদিন পর্যন্ত সর্বপ্রকার ফেতনা থেকে মুক্ত থাকবে। যদি দাজ্জাল বের হয় তবে সে দাজ্জালের ফেতনা থেকেও মুক্ত থাকবে। এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত তার সব (কবিরা গোনাহ ব্যতিত) গোনাহ মাফ হয়ে যাবে।

দুই. জুমআর দিনে বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ। যদি কোনো ব্যক্তি একবার দরূদ পড়ে তবে তার প্রতি ১০টি রহমত নাজিল হয়।

তিন. জুমআর দিন দোয়া কবুলের কিছু সময় বা মুহূর্ত রয়েছে; সে সময়গুলোতে বেশি বেশি দোয়া ও ইসতেগফার করা।

জুমআর দিন ও জুমআর নামাজ আদায় মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ দিন। এ দিনের প্রতিটি আমলই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমআর নামাজ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (ইচ্ছা করে) অলসতাবশত তিনটি জুমআ ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তাআলা তার হৃদয়ে মোহর মেরে দেন।’ (মুসলিম, তিরমিজি, নাসাঈ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা মালেক)

75
আওয়ার ইসলাম: জুমআর দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে ফজিলতপূর্ণ অনেক আমল। এগুলোর মধ্যে একটি আমল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তা হচ্ছে জুমআর দিনে ‘সুরা কাহফ’ তেলাওয়াত। পবিত্র কুরআনুল কারিমের ১৫তম পারার ১৮নং সুরা এটি। যদি কেউ সম্পূর্ণ সুরাটি তেলাওয়াত করতে না পারে তাহলে এ সুরার প্রথম এবং শেষ ১০ আয়াত তেলাওয়াত করলেও অনেকটা ফজিলত পাবে। এ সুরা তেলাওয়াতের ফজিলত বর্ণনা করে হাদিসে এসেছে-

‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা আল কাহাফ পড়বে, তার ইমানের নুর এ জুমাহ থেকে আগামী জুমাহ পর্যন্ত চমকাতে থাকবে। (মিশকাত ২১৭৫)’

‘যে ব্যক্তি সূরা আল কাহাফ এর প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে তাকে দাজ্জালের অনিষ্ট হতে নিরাপদ রাখা হবে। (মুসলিম) (মিশকাত)’

‘যে ব্যক্তি সূরা কাহাফ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন তার জন্য এমন একটি নুর হবে, যা তার অবস্থানের জায়গা থেকে মক্কা পর্যন্ত আলোকিত করে দিবে। আর যে ব্যক্তি এ সুরার শেষ দশটি আয়াত পাঠ করবে, তার জীবদ্দশায় দাজ্জাল বের হলেও সে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সিলসিলায়ে সহীহা -২৬৫১)।

‘যে ব্যক্তি জুমার রাতে সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য স্বীয় অবস্থানের জায়গা হতে পবিত্র মক্কা পর্যন্ত একটি নুর হবে।’ (সহীহ তারগীব ওয়াত্ তারহীব – ৭৩৬)।

‘জুমার দিনে সূরা কাহফ পাঠ করিলে কিয়ামত দিবসে তার পায়ের নীচ থেকে আকাশের মেঘমালা পর্যন্ত নূর আলোকিত হবে এবং দুই জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ মাফ হবে।’ (আত তারগীব ওয়াল তারহীব- ১/২৯৮)

‘জনৈক ব্যক্তি সূরাহ আল কাহফ পড়ছিল। তখন লোকটি তাকিয়ে দেখতে পেল একখণ্ড মেঘ তাকে পরিবেষ্টন করে নিয়েছে। বারা ইবনু আযিব বর্ণনা করেছেন যে, লোকটি বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম এর কাছে বললেন। তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে অমুক তুমি সুরাটি পড়তে থাক। কারণ এটি ছিল আল্লাহর রহমত বা প্রশান্তি যা কোরআন তেলাওয়াতের কারণে বা কোরআন তেলাওয়াতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল।’ (মুসলিম- ১৭৪২)।

Pages: 1 ... 3 4 [5] 6 7 ... 24