Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - ashraful.diss

Pages: [1] 2 3 ... 6
1
আদম (আঃ) কে হাওয়া (রাঃ) এর সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল

মহান আল্লাহ তা’আলা আদম আঃ সাঃ থেকে হাওয়া রাঃ কে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন যে তিঁনি হাওয়া রাঃ কে সৃষ্টি করেছেন যেন আদম আঃ তার সাথে থেকে সস্থি পায়।

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّجَعَلَ مِنۡہَا زَوۡجَہَا لِیَسۡکُنَ اِلَیۡہَا ۚ فَلَمَّا تَغَشّٰہَا حَمَلَتۡ حَمۡلًا خَفِیۡفًا فَمَرَّتۡ بِہٖ ۚ فَلَمَّاۤ اَثۡقَلَتۡ دَّعَوَا اللّٰہَ رَبَّہُمَا لَئِنۡ اٰتَیۡتَنَا صَالِحًا لَّنَکُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰکِرِیۡنَ

তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদিগকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে; আর তার থেকেই তৈরী করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। অতঃপর পুরুষ যখন নারীকে আবৃত করল, তখন সে গর্ভবতী হল। অতি হালকা গর্ভ। সে তাই নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। তারপর যখন বোঝা হয়ে গেল, তখন উভয়েই আল্লাহকে ডাকল যিনি তাদের পালনকর্তা যে, তুমি যদি আমাদিগকে সুস্থ  ও ভাল দান কর  তবে আমরা তোমার শুকরিয়া আদায় করব। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৮৯}

আল্লাহ তাঁর শাহী দরবার বা জান্নাত থেকে ইবলিসকে বহিস্কার করে হযরত আদম (আঃ)-কে জান্নাতে বসবাসের স্থান দিলেন। কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিশাল জান্নাতে আদম (আঃ)-এর একা ভাল লাগে না। তাই একদিন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন তাঁর বাম পাড়জড়ের এক খানা বাকা হাড্ডি নিয়ে সমগ্র মানব জাতির আদি মাতা হযরত হাওয়া (আঃ)-কে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করে তার পাশে বসায়ে রাখলেন।

মাদারেজুন নবুয়ত নামক কিতাবের মধ্যে আছে, নিদ্রা ভঙ্গের পর হযরত আদম (আঃ) মা হাওয়া (আঃ)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর দিকে হাত বাড়াতে উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় ফেরেশতারা বলল, হে আদম! যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে বিবাহ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর দিকে হস্তক্ষেপ করা তোমার জন্য জায়েয হবে না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বিবাহ কিভাবে হবে? ফেরেশতারা জবাব দিল হে আদম! বিবাহ করলে হাওয়া (আঃ) তোমার স্ত্রী হবে আর তোমাদের ঔরসে সন্তানাদী হতে থাকবে। এভাবে আখেরী জামানায় তোমার এমন একজন সন্তানকে আল্লাহ পাক পাঠাবেন যাকে সৃষ্টি না করলে তোমাকেও সৃষ্টি করা হত না। সেই ভাগ্যবান সন্তানের উপর তিনবার দুরুদ শরীফ পাঠ না করলে হাওয়া (আঃ)-এর সাথে তোমার বিবাহ হবে না। আল্লাহ পাক আমাদের নবীকে (সাঃ) কত বড় সম্মানিত নবী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন যে তাঁর উপর দুরুদ না পড়লে আদম (আঃ)-এর বিবাহ হল না। অবশেষে আদম-হাওয়া (আঃ) জান্নাতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মহাসুখে বসবাস করতে ছিলেন।

ইবনে কাসীর রহমতুল্লাহ বলেছেন, আদম (আঃ) স্বর্গেই থাকতেন, একাকীত্ব বোধ করতেন এবং তার এমন কোনো সঙ্গীও ছিল না যার কাছ থেকে তিনি খানিকটা প্রশান্তি পেতে পারেন। একদিন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে মাথার কাছে কাউকে বসে থাকতে দেখলেন তিনি। এক সুন্দরী রমণী; স্নিগ্ধ আর কোমল দৃষ্টি মেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

আদম (আঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?”  উত্তরে সে বললো, “আমি একজন নারী।”  তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে?” জবাবে, “যাতে আমার মধ্যে তুমি প্রশান্তি খুঁজে পাও।”

ফেরেশতারা আদম (আঃ) এর কাছে তার নাম জানতে চাইলে জবাবে তিনি বললেন, হাওয়া (ইংরেজিতে Eve) – যার মানে জীবিত কিছু। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কেন তাকে হাওয়া নামে ডাকছেন?” জবাবে আদম (আঃ) বললেন, “কারণ সে আমার থেকে সৃষ্টি হয়েছে আর আমি একজন জীবিত সত্তা।”

وَقُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَزَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ وَکُلَا مِنۡہَا رَغَدًا حَیۡثُ شِئۡتُمَا ۪ وَلَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ

এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাক, কিন্তু এ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। অন্যথায় তোমরা যালিমদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়বে। {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৫}

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,“তোমরা নারীদেরকে উত্তম নাসীহাত প্রদান করবে। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশী বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে নাসীহাত করতে থাক।” {সহীহ বুখারী বই ৬০, হাদিস ৬/ ৩৩৩১}


2
নবীদের অঙ্গীকার

সর্বশক্তিমান আল্লাহ প্রত্যেকটি নবীদের কাছ থেকেও ধর্ম বাস্তবায়ন ও প্রচার করার অঙ্গীকার নিয়েছিলেন বিশেষ করে মুহাম্মদ (সা:), নূহ, ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আঃ)-এর কাছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন।

وَاِذۡ اَخَذۡنَا مِنَ النَّبِیّٖنَ مِیۡثَاقَہُمۡ وَمِنۡکَ وَمِنۡ نُّوۡحٍ وَّاِبۡرٰہِیۡمَ وَمُوۡسٰی وَعِیۡسَی ابۡنِ مَرۡیَمَ ۪  وَاَخَذۡنَا مِنۡہُمۡ مِّیۡثَاقًا غَلِیۡظًا ۙ

যখন আমি পয়গম্বরগণের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার। {সূরা আল-আহযাব: আয়াত ৭}

আদম (আঃ) এবং ঈসা (আঃ) এর মধ্যে মিল

সর্বশক্তিমান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে ঈসা (আঃ সাঃ) আর আদম (আঃ সাঃ) দেখতে একই রকম ছিলেন।

اِنَّ مَثَلَ عِیۡسٰی عِنۡدَ اللّٰہِ کَمَثَلِ اٰدَمَ ؕ خَلَقَہٗ مِنۡ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَہٗ کُنۡ فَیَکُوۡنُ

নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন। {সূরা আল-ইমরান: আয়াত ৫৯}


3
আল্লাহর সাথে মানবজাতির অঙ্গীকার

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তালা একবার আদম (আঃ) এর পেছন বুলিয়ে সেখান থেকে তার বংশধরদের রূহ/আত্মা বের করে জিজ্ঞেস করেছিলঃ “আমি কি তোমাদের রব নই?” তাদের মধ্যে আমরা সহ, এই পৃথিবীতে এই পর্যন্ত যত মানুষ এসেছে এবং আসবে সবার রূহ উপস্থিত ছিল।

তখন, আমরা আল্লাহকেই আমাদের রব/প্রভু বলে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলামঃ “অবশ্যই, আমরা অঙ্গিকার করে বলছি যে আপনি আমাদের পালনকর্তা।”

আমাদের সাক্ষ্য দেয়ার পর আল্লাহ তা’আলা বলেছিলেন, “আশা করি পুনরুত্থানের দিনেও তোমরা এই একই সাক্ষ্য দিতে পারবে।” কিন্তু এই ঘটনাটি আমরা ভূলে গিয়েছি।

তারপর আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা বলেছিল যে, যদি আমরা সক্ষম না হই, তাহলে আমরা যেন নিজের অজ্ঞতা বা নিজেদের বাপ-দাদার প্রথা অনুসরণ করাকে অজুহাত হিসেবে  না পেশ করি – কারণ, আল্লাহ আমাদের কুরআনের সাহায্যে পথনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন।

وَاِذۡ اَخَذَ رَبُّکَ مِنۡۢ بَنِیۡۤ اٰدَمَ مِنۡ ظُہُوۡرِہِمۡ ذُرِّیَّتَہُمۡ وَاَشۡہَدَہُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ ۚ  اَلَسۡتُ بِرَبِّکُمۡ ؕ  قَالُوۡا بَلٰی ۚۛ  شَہِدۡنَا ۚۛ  اَنۡ تَقُوۡلُوۡا یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اِنَّا کُنَّا عَنۡ ہٰذَا غٰفِلِیۡنَ ۙ  اَوۡ تَقُوۡلُوۡۤا اِنَّمَاۤ اَشۡرَکَ اٰبَآؤُنَا مِنۡ قَبۡلُ وَکُنَّا ذُرِّیَّۃً مِّنۡۢ بَعۡدِہِمۡ ۚ اَفَتُہۡلِکُنَا بِمَا فَعَلَ الۡمُبۡطِلُوۡنَ وَکَذٰلِکَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ وَلَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ

আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা বলতে শুরু কর যে, অংশীদারিত্বের প্রথা তো আমাদের বাপ-দাদারা উদ্ভাবন করেছিল আমাদের পূর্বেই। আর আমরা হলাম তাদের পশ্চাৎবর্তী সন্তান-সন্ততি। তাহলে কি সে কর্মের জন্য আমাদেরকে ধ্বংস করবেন, যা পথভ্রষ্টরা করেছে? বস্তুতঃ এভাবে আমি বিষয়সমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৭২-১৭৪}

যদিও এই পুরো ঘটনাটি আমরা ভুলে গিয়েছি – কিন্তু আমাদের ভিতর ফিতরা নামে একটি জিনিস আছে যে, জানে যে আল্লাহ আমাদের একমাত্র রব।

فَاَقِمۡ وَجۡہَکَ لِلدِّیۡنِ حَنِیۡفًا ؕ  فِطۡرَتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیۡہَا ؕ  لَا تَبۡدِیۡلَ لِخَلۡقِ اللّٰہِ ؕ  ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ٭ۙ  وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٭ۙ

তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। {সূরা আর-রূম: আয়াত ৩০}

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ আদমকে উত্থাপন করে এবং সে সমগ্র মানব জাতীকে দেখতে পায়: তিনি তাদের মধ্যে ধনী-গরীব, সুগঠিত-দুর্বল, ভালো অবস্থা ও খারাপ অবস্থার মানুষ দেখতে পেলো। তারপর আদম (আঃ) বললেন: “হে আল্লাহ! আমি চাই আপনার সকল বান্দারা সমান হোক।” জবাবে আল্লাহ বললেন, “আমি প্রশংসা পছন্দ করি।”  আদম (আঃ) মানবজাতির মধ্যে নবীগণকে আলোকিত প্রদীপের মত দেখতে পেলেন।


4
তাই আল্লাহ তা’আলা এসব প্রতারণা এড়াতে আমাদেরকে বারংবার সতর্ক করেছেন

আমাদের চির-শত্রু, শয়তানের দ্বারা যেন আমরা প্রতারিত না হই সেইজন্য আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনে বহুবার সতর্ক করে দিয়েছেন যেনো আমরা শয়তানের উপস্থিতি উপলব্ধি করে তাকে আমাদের সত্যিকারের শত্রু হিসেবে নেই:

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّکُمُ الشَّیۡطٰنُ کَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡکُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡہُمَا لِبَاسَہُمَا لِیُرِیَہُمَا سَوۡاٰتِہِمَا ؕ اِنَّہٗ یَرٰىکُمۡ ہُوَ وَقَبِیۡلُہٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَہُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

হে বনী-আদম শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে; যেমন সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে এমতাবস্থায় যে, তাদের পোশাক তাদের থেকে খুলিয়ে দিয়েছি-যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখ না। আমি শয়তানদেরকে তাদের বন্ধু করে দিয়েছি , যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না।{সূরা আল-আরাফ: আয়াত ২৭}

 اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لَکُمۡ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوۡہُ عَدُوًّا ؕ  اِنَّمَا یَدۡعُوۡا حِزۡبَہٗ لِیَکُوۡنُوۡا مِنۡ اَصۡحٰبِ السَّعِیۡرِ ؕ

শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহবান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়।


5
যা ঘটেছিল তার জন্য ইবলিস আল্লাহকে দায়ী করেছিল

ইবলিসের যুক্তি ছিল যে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছে। সে তার নিজের অবাধ্যতার দোষ স্বীকার না করে উল্টো আল্লাহ তা’আলা কেই দায়ী করে বললো যে, সে পৃথিবীর বিভিন্ন সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করে মানব জাতীকে পথভ্রষ্ট করবে। সে প্রতিজ্ঞা করলো যে, মানবজাতিকে সে বিপথগামী করে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

قَالَ رَبِّ بِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاُزَیِّنَنَّ لَہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ وَلَاُغۡوِیَنَّہُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ۙ

সে বললঃ হে আমার পলনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথ ভ্রষ্ঠ করে দেব। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৯}

শয়তান মানুষদের এমন কুবুদ্ধি দেয়, যার জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা তাদের কাছে আকর্ষণীয় লাগে। এবং সে যখন-তখন, সামনে-পিছনে, ডানে-বামে থেকে, যে কোনো ভাবেই আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে; শয়তান আমাদের অধিকাংশ মানুষকে প্রভাবিত করে আল্লাহর প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বার্থ করে দেয়।

قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَہُمۡ صِرَاطَکَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ - ثُمَّ لَاٰتِیَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمِنۡ خَلۡفِہِمۡ وَعَنۡ اَیۡمَانِہِمۡ وَعَنۡ شَمَآئِلِہِمۡ ؕ وَلَا تَجِدُ اَکۡثَرَہُمۡ شٰکِرِیۡنَ   

সে বললঃ আপনি আমাকে যেমন উদভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্যে আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৬-১৭}


6
ইবলিস বেঁচে থাকার এবং মানবজাতিকে বিপথগামী করার অনুমতি চেয়েছিল

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন যখন ইবলিস শয়তানের উপর নারাজ হয়ে তাকে জান্নাত থেকে বহিস্কার করে দিলেন তখন তার উচিত ছিল নিজের অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা কিন্তু শয়তান তা করল না। তাফসীরে জুমাল, তাফসীরে ছাবী ও যখীরায়ে মা’লুমাত নামক কিতাবের মধ্যে এসেছে, সে দাবি করল, হে আল্লাহ! আমি আশি হাজার বৎসর পর্যন্ত তোমার জান্নাত দেখা-শোনা করেছি। ত্রিশ হাজার বৎসর পর্যন্ত আরশে আজীম বহনকারী ফেরেশতাদের সরদারী করেছি। বিশ হাজার বৎসর পর্যন্ত ফেরেশতাদেরকে শিক্ষা দিয়েছি। চৌদ্দ হাজার বৎসর পর্যন্ত আরশে আজীম তাওয়াফ করেছি। এছাড়া আরো যত ইবাদত-বন্দেগী, নামায-রোযা, তাসবীহ-তাহলীল আদায় করেছি তার বিনিময়ে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দাও যাতে আমি আদম জাতির রক্তের সাথে চলে তাদেরকে ধোকা দিতে পারি। আল্লাহ বললেন, তুই যদি আখেরাত না চাস তাহলে তোর ইবাদত-বন্দেগীর বিনিময়ে তোকে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দান করলাম। এ সুযোগ পেয়ে ইবলিস শয়তান বলল, হে মাবুদ! তোমার ইজ্জতের কসম করে বলছি, আমি মানব জাতিকে এমনভাবে ধোকা দিব যে, কিছু সংখ্যক মুখলিছ বান্দা ব্যতীত অন্যান্য সকল বান্দা-বান্দীকে একদিন তোমার অবাধ্য করে ফেলব ফলে তারা তোমার কথা আর শুনবে না। তখন আল্লাহ পাক বললেন------

قَالَ فَالۡحَقُّ ۫  وَالۡحَقَّ اَقُوۡلُ ۚ - لَاَمۡلَـَٔنَّ جَہَنَّمَ مِنۡکَ وَمِمَّنۡ تَبِعَکَ مِنۡہُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ

আল্লাহ বললেনঃ তাই ঠিক, আর আমি সত্য বলছি, তোর দ্বারা আর তাদের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে তাদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব। {সুরা ছোয়াদঃ আয়াত ৮৪ - ৮৫}

ইবলিস তখন কিয়ামত পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুরোধ করে। তাকে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। তিনি তার অস্বীকারকে ন্যায্যতার বন্ধনে বাঁধার চেষ্টায় বলেছিল যে, কাদামাটি থেকে সৃষ্ট এই নতুন সৃষ্টি (যাকে ইবলিসের চাইতেও সম্মানিত করা হয়েছে) তার পক্ষে এই মানুষকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত এবং বিপথগামী করা সম্ভব।

ইবলিসের এই চ্যালেঞ্জটিকে সর্বদা আমাদের মাথায় রাখতে হবে:

قَالَ اَرَءَیۡتَکَ ہٰذَا الَّذِیۡ کَرَّمۡتَ عَلَیَّ ۫ لَئِنۡ اَخَّرۡتَنِ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ لَاَحۡتَنِکَنَّ ذُرِّیَّتَہٗۤ اِلَّا قَلِیۡلً

সে বললঃ দেখুন তো, এনা সে ব্যক্তি, যাকে আপনি আমার চাইতেও উচ্চ মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন। যদি আপনি আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত সময় দেন, তবে আমি সামান্য সংখ্যক ছাড়া তার বংশধরদেরকে সমূলে নষ্ট করে দেব। {সূরা আল-বনী ইসরাইল: আয়াত ৬২}

قَالَ رَبِّ فَاَنۡظِرۡنِیۡۤ اِلٰی یَوۡمِ یُبۡعَثُوۡنَ - قَالَ فَاِنَّکَ مِنَ الۡمُنۡظَرِیۡنَ

সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেনঃ তোমাকে অবকাশ দেয়া হল। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৬-৩৭; সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৪-১৫; সূরা সাদ: ৭৯-৮০}


7
ইবলিস নিজেকে আদম (আঃ) এর সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করেছিল


আল্লাহ তা’আলা যখন ইবলিসকে আদেশ অস্বীকার করার যথাযথ কারণ উল্লেখ করতে বললেন তখন ইবলিস নিজেকে আদম (আঃ) এর সঙ্গে তুলনা করে তার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে বলেছিল “আমি আদমের চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে।” ইবলিসের বিশ্বাস ছিল যে, সৃষ্টি জগতে সে আদম (আঃ) এর চাইতেও উন্নত এবং অধিক সম্মানের অধিকারী একটি সৃষ্টি। সেইজন্য, আল্লাহ আদেশ করা সত্ত্বেও ইবলীস সেজদায় যেতে অস্বীকার করেছিল। আসলে, তার মনের মধ্যে খারাপ প্রকৃতির হিংসা জন্মেছিল। ইবলিসের আদম (আঃ) এর প্রতি ঈর্ষা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে উঠে এসেছে:

قَالَ مَا مَنَعَکَ اَلَّا تَسۡجُدَ اِذۡ اَمَرۡتُکَ ؕ قَالَ اَنَا خَیۡرٌ مِّنۡہُ ۚ خَلَقۡتَنِیۡ مِنۡ نَّارٍ وَّخَلَقۡتَہٗ مِنۡ طِیۡنٍ

আল্লাহ বললেনঃ আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।{সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১২}

قَالَ اَنَا خَیۡرٌ مِّنۡہُ ۚ خَلَقۡتَنِیۡ مِنۡ نَّارٍ وَّخَلَقۡتَہٗ مِنۡ طِیۡنٍ

সে বললঃ আমি তার চেয়ে উত্তম আপনি আমাকে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। { সূরা সাদ: আয়াত ৭৬}

قَالَ یٰۤـاِبۡلِیۡسُ مَا لَکَ اَلَّا تَکُوۡنَ مَعَ السّٰجِدِیۡنَ - قَالَ لَمۡ اَکُنۡ لِّاَسۡجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقۡتَہٗ مِنۡ صَلۡصَالٍ مِّنۡ حَمَاٍ مَّسۡنُوۡنٍ

আল্লাহ বললেনঃ হে ইবলিস, তোমার কি হলো যে তুমি সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হলে না? বললঃ আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সেজদা করব, যাকে আপনি পচা কর্দম থেকে তৈরী ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩২-৩৩}

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ  قَالَ ءَاَسۡجُدُ لِمَنۡ خَلَقۡتَ طِیۡنًا ۚ

স্মরণ কর, যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সেজদায় পড়ে গেল। কিন্তু সে বললঃ আমি কি এমন ব্যক্তিকে সেজদা করব, যাকে আপনি মাটির দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? {সূরা আল-বনী ইসরাইল: আয়াত ৬১}

আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে তার স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন

অস্বীকারের কারণে, ইবলিসকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিল:


قَالَ فَاہۡبِطۡ مِنۡہَا فَمَا یَکُوۡنُ لَکَ اَنۡ تَتَکَبَّرَ فِیۡہَا فَاخۡرُجۡ اِنَّکَ مِنَ الصّٰغِرِیۡنَ

বললেন তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১৩}

قَالَ فَاخۡرُجۡ مِنۡہَا فَاِنَّکَ رَجِیۡمٌ

আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা, এখান থেকে। কারণ, তুই অভিশপ্ত। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩৪; সূরা সাদ: আয়াত ৭৭}

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার এই গর্হিতমূলক কথা শ্রবণ করে বললেন, হে শয়তান! আজ থেকে তোর স্থান জান্নাতে নেই তুই বহিস্কার হয়ে যা তুই আজ থেকে বিতাড়িত শয়তান। আর কেয়ামত পর্যন্ত তোর উপর আমার লানত বর্ষিত হতে থাকবে।

আল্লাহ পাকের এই অসন্তুষ্টজনক কথা শুনে তার উচিত ছিল ক্ষমা প্রার্থনা করা। তাতো দূরের কথা তাফসীরে জালালাইন শরীফের হাশিয়ার মধ্যে আছে, পরবর্তীতে আদম (আঃ)-এর কবর দেখাই দিয়ে আল্লাহ বলেছিলেন, তোর জন্য তো জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে, এখনো তুই আদমের কবরে একটা সিজদা করলে আমি তোকে মাফ করে দিব। কিন্তু এত বড় সুযোগ পেয়েও ইবলিস আল্লাহর কথা মানল না বরং জবাব দিল যেই আদম (আঃ)-কে জীবিত অবস্থায় সিজদা করলাম না তাঁর কবরে এখন সিজদা করা অসম্ভব। এমনকি কিয়ামতের পর আদম (আঃ) জান্নাতে চলে যাবেন আর ইবলিস শয়তান জাহান্নামে গিয়ে কঠিন আজাব ভোগ করতে থাকবে। এভাবে এক লক্ষ বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম (আঃ)-কে জান্নাত থেকে বাহির করে আনবেন আর ইবলিস শয়তানকেও জাহান্নাম থেকে বাহিরে এনে বলবেন, এখনো যদি আদম (আঃ)-কে সিজদা করিস আমি তোকে ক্ষমা করে দেব।

কিন্তু শয়তানের কপালে এমন ভাবে আগুন লেগেছে যে, এত বড় আজাবে গ্রেফতার থেকেও মুক্তি পাওয়ার জন্য আদমকে (আঃ) সিজদা করবে না। তখন আল্লাহ পাক ঘোষণা করে দিবেন ইবলিস! তুই পুনরায় জাহান্নামে চলে যা। সে জাহান্নামে জ্বলতে রাজি কিন্তু আদমকে সিজদা করতে রাজি হবে না। এর নামই হল ইবলিসের শয়তানী। {জালালাইন শরীফ-৮ পৃষ্ঠা}


8
সর্বশক্তিমান আল্লাহ ফেরেশতাগণ ও ইবলিসকে – আদম (আঃ) এর সামনে সেজদা দিতে আদেশ দিলেন

সেই সময়টাতে ইবলিস(জ্বিন)-কে তার ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করে আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এরপর সময় আসলো যখন আল্লাহ্‌ ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন (তাদের মধ্যে ইবলিসও উপস্থিত ছিল) আমি যখন রূহ ফুঁকব তখন তোমরা আদম (আঃ) কে সম্মানজনক সেজদা করবে।

وَلَقَدۡ خَلَقۡنٰکُمۡ ثُمَّ صَوَّرۡنٰکُمۡ ثُمَّ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ ٭ۖ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ لَمۡ یَکُنۡ مِّنَ السّٰجِدِیۡنَ

আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব, তৈরী করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি-“আদমকে সেজদা কর” তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। {সূরা আল-আরাফ: আয়াত ১১}

ইবলিস সেজদা করতে অস্বীকার করে এবং শয়তান-এ রূপান্তরিত হয়

ইবলিস অহংকারের কারণে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং একজন কাফের (শয়তান) হয়ে যায়:

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ

এবং যখন আমি হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করলো। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল। {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৪}

فَسَجَدَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ کُلُّہُمۡ اَجۡمَعُوۡنَ - اِ لَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اِسۡتَکۡبَرَ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ     

অতঃপর সমস্ত ফেরেশতাই একযোগে সেজদায় নত হল,কিন্তু ইবলীস; সে অহংকার করল এবং অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। { সূরা সাদ: আয়াত ৭৩-৭৪}

فَسَجَدَ الۡمَلٰٓئِکَۃُ کُلُّہُمۡ اَجۡمَعُوۡنَ -اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰۤی اَنۡ یَّکُوۡنَ مَعَ السّٰجِدِیۡنَ

তখন ফেরেশতারা সবাই মিলে সেজদা করলো। কিন্তু ইবলীস-সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হলো না। {সূরা আল-হিজর: আয়াত ৩০-৩১}


9
আল্লাহ আদম (আঃ) কে সকল কিছুর নাম শেখালেন

আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবকিছুর নাম শিখিয়ে দিলেন। সব মানুষ এবং সব বস্তুর নাম তার জানা আছে। তারপর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে কিছু জিনিসের নাম জিজ্ঞেস করলেন, তারা উত্তরে বলল আল্লাহ আপনি সর্ব জ্ঞানী, আমরা তো শুধু ততটুকই জানি যা আপনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। তারপর, আল্লাহ আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেইসব জিনিসের নাম জিজ্ঞেস করলেন, সে ফেরেশতাদের সামনে সেগুলোর নাম বলে দিলেন। ফলে এলমের ফযীলতের কারণে সম্মানার্থে আদমকে সিজদা করতে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিলে সমস্ত ফেরেশতারা সিজদায় পড়ে গেল। তাফসীরে জালালাইন শরীফের হাশিয়ায় লেখা আছে, ফেরেশতারা আদম (আঃ)-এর দিকে পাঁচশত বৎসর পর্যন্ত সিজদায় পড়ে রইল। কিন্তু ঐ মজলিসে ছিল ইবলিস। সে সিজদা করল না। এইভাবে, আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে দেখিয়ে দিলেন যে তিনি আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন জ্ঞান দিয়েছিলেন যা তিনি ফেরেশতাদেরকেও দেন নি। তারপর আল্লাহ তা’আলা বললেন, যে তিনি জানেন কে কি প্রকাশ করে, আর কি কি গোপন করে – কোনো কিছুই তার জ্ঞানের আওতাধীন নয়। এইখানে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল যে, তখন সেখানে ফেরেশতা এবং আদম আলাইহিস সালাম উপস্থিত ছিলেন আর তাদের মধ্যে গোপন করার কিছুই ছিল না। একমাত্র ইবলিসই সেইখানে উপস্থিত ছিল, যে তার মনের মধ্যে প্রচন্ড পরিমানে হিংসা ও অহংকার গোপন করে রেখেছিল, যা ঠিক পরের আয়াতগুলিতে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

وَعَلَّمَ اٰدَمَ الۡاَسۡمَآءَ کُلَّہَا ثُمَّ عَرَضَہُمۡ عَلَی الۡمَلٰٓئِکَۃِ ۙ فَقَالَ اَنۡۢبِـُٔوۡنِیۡ بِاَسۡمَآءِ ہٰۤؤُلَآءِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
       
আর আল্লাহ তা’আলা শিখালেন আদমকে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।{সুরা আল-বাকারাঃ আয়াত ৩১}

قَالُوۡا سُبۡحٰنَکَ لَا عِلۡمَ لَنَاۤ اِلَّا مَا عَلَّمۡتَنَا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَلِیۡمُ الۡحَکِیۡمُ
               
তারা বলল, তুমি পবিত্র! আমরা কোন কিছুই জানি না, তবে তুমি যা আমাদিগকে শিখিয়েছ (সেগুলো ব্যতীত) নিশ্চয় তুমিই প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন, হেকমতওয়ালা।  {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩২}

قَالَ یٰۤاٰدَمُ اَنۡۢبِئۡہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۚ فَلَمَّاۤ اَنۡۢبَاَہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۙ قَالَ اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ غَیۡبَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ۙ وَاَعۡلَمُ مَا تُبۡدُوۡنَ وَمَا کُنۡتُمۡ تَکۡتُمُوۡنَ

তিনি বললেন, হে আদম (আঃ), ফেরেশতাদেরকে বলে দাও এসবের নাম। তারপর যখন তিনি বলে দিলেন সে সবের নাম, তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমান ও যমীনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর, আর যা তোমরা গোপন কর! {সূরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৩}

সুতরাং, ফেরেশতাগণ বুঝতে পারলো যে, আদম (আঃ) এমন এক সৃষ্টি যে অনেককিছুই জানে যা তারা নিজেরাও জানে না।


10
মহান আল্লাহ আদম (আঃ) এর রূহ ফুঁকলেন

আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা আমাদেরকে কুরআনে জানিয়েছেন যে, তিনি আদম (আঃ) এর উপর তার রূহ ফুঁকেছেন। এইখানে আমাদেরকে একটি ব্যাপার অবশ্যই বুঝতে হবে যে, “আমার রূহ” এই শব্দটি দিয়ে আল্লাহ আক্ষরিক অর্থে এই কথা বুঝাননি যে তিঁনি তাঁর নিজের রূহ আদম (আঃ) এর উপর ফুঁকেছেন। তিঁনি এমন শব্দ ব্যবহার করে আসলে বুঝাতে চেয়েছেন যে তাঁর এই সৃষ্টিটি একটি সম্মান জনক সৃষ্টি। সুতরাং, এইখানে এমন কথা বুঝানো হয়নি যে আদম (আঃ) এর ভিতর আল্লাহর ঐশ্বরিক কোনো কিছু বিদ্যমান ছিল যা কিনা আমাদের সবার মধ্যেও আছে, কারণ সকল জীবিত মানুষের মধ্যেই তার রূহ থাকে।

فَاِذَا سَوَّیۡتُہٗ وَنَفَخۡتُ فِیۡہِ مِنۡ رُّوۡحِیۡ فَقَعُوۡا لَہٗ سٰجِدِیۡنَ

যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সম্মুখে সেজদায় নত হয়ে যেয়ো। {সূরা সাদ: আয়াত ৭২; সূরা আল-হিজর: আয়াত ২৯}

আল্লাহ তা’আলা তাদের মতামত জিজ্ঞাসার্থে কিংবা তাদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করার জন্যে এমনটা করেননি; কেননা তিনি এসকল কিছুর উর্ধ্বে। তিনি কেবল তাদেরকে আদেশ করেছিলেন যেন তারা তা মান্য করে। উল্লেখ্য যে, ঐ সেজদা শ্রদ্ধা স্বরূপ করতে বলা হয়েছিল (ইবাদতের উপলক্ষ্যে নয়)। ইবাদতের সেজদা একমাত্র আল্লাহর জন্যই করা হয়ে থাকে।

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, রুহটি শরীরের উপর মাথা থেকে নিচে পা পর্যন্ত যেতে প্রায় দুইশত বৎসর ঘোরার পর অবশেষে আদম (আঃ)-এর চোখের উপর পড়ল তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি এলে তিনি জান্নাত দেখতে পেলেন। অতপর যখন রূহ আদম (আঃ)-এর নাকে প্রবেশ করল তখন শ্বাস-প্রশ্বাস চালু হল। এতে নাকের মধ্যে কিছু সুড়সুড়ি পয়দা হয়ে তাঁর হাঁচি এল। তিনি হাঁচি দিলেন। আল্লাহ শিক্ষা দিলেন হে আদম! তুমি বল-আলহামদুলিল্লাহ। আদম (আঃ) তখন বললেন আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা ও ধন্যবাদ আল্লাহর জন্য) উত্তরে আল্লাহ্‌ বললেন, ইয়ারহামুকাল্লাহ (তোমার পালনকর্তার দয়া তোমার উপর বর্ষিত হোক) {জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৩৬৮}।

এটাই ছিল আল্লাহ ও মানব জাতির প্রথম কথোপকথন। তারপর, রূহ তার পেট পর্যন্ত পৌঁছলে তার  ক্ষুধা পেল আর সে জান্নাতের ফল দেখে সেগুলো খাবার জন্য আগ বাড়াতে চেয়েও পারলেন না কারন তার পা পর্যন্ত তখনও রূহ পৌঁছায়নি। অনেক উলামাদের মতে আল্লাহ এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনে বলেছেনঃ

خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ؕ سَاُورِیۡکُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ

সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ ত্বরাপ্রবণ, আমি সত্তরই তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব। অতএব আমাকে শীঘ্র করতে বলো না। {সূরা আম্বিয়া আয়াত ৩৭}


11
আদম (আঃ) এর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেবার আগে যা ঘটেছিল

ইবনে কাসির রহমতুল্লাহ বলেছেন, সুতরাং আদম (আঃ) কে মানুষের আকারে রূপ দিলেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। কিন্তু তিনি তাঁকে অনেক সময় মাটির আকারেই রেখে দিলেন। ফেরেশতারা প্রতিনিয়ত তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলাচল করতো। তার আকৃতি দেখতে ভয়ংকর ছিল। ইবলিস প্রায় সময়ই আদমের আকৃতিটাকে অতিক্রম করতো, আর ওটাতে টোকা মারতো; ফলে মাটির পাত্রে আঘাত করলে যেমন ফাঁপা আওয়াজ হয় তেমন শব্দ হতো।

خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ صَلۡصَالٍ کَالۡفَخَّارِ

আল্লাহ্‌ আমাদের জানিয়েছেন: তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে। (সূরা আর-রহমান: আয়াত ১৪)

আবু হুরাইরা হইতে বর্ণিত আছে যে, মহা নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: অতঃপর আল্লাহ্‌ তাঁকে তেমন অবস্থাতেই রেখে দিলেন যতদিন ধরে সেটা কুমোরের চটচটে মাটিতে পরিণত হয়। ইবলিস প্রায়শই তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতো ‘তোমাকে একটি মহান উদ্দেশ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।’


12
জাহান্নামের আজাবের ভয়ে জমিনের ক্রন্দন

তাফসীরে জালালাইন শরীফের হাশিয়ার মধ্যে লেখা রয়েছে, রাব্বুল আলামীন একদিন জমিনকে ডেকে বললেন, হে জমিন! আমি তোর বুক থেকে মাটি নিয়ে আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করব আর ঐ আদমের সন্তানের মধ্যে যারা আমার আনুগত্য করে চলবে তাদেরকে আমি জান্নাত দান করব। পক্ষান্তরে যারা আমার নাফরমানী করবে তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাব। একথা শুনে জমিন আফসোস করে ক্রন্দন করতে লাগল যে, হে দয়াময় মাবুদ! আমার বুক থেকে মাটি নিয়ে আপনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করবেন আর তারা জাহান্নাম-এর আগুনে জ্বলে পুড়ে ভষ্ম-ভষ্ম হবে তা আমি কি করে সহ্য করব? ঐ দিন হতে জমিন জাহান্নামের ভয়ে কান্না শুরু করল আর জমিনের চোখের পানি গিয়ে খাল-বিল, নদী-সমুদ্রের পানির সাথে মিলতে থাকল। অন্যথায় পৃথিবীর বুকে এতদিন পানি থাকত না। নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যেত। (তাফসীরে জালালাইন ৮ পৃষ্ঠা)

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ ঘোষণা দিলেন যে, তিনি কাদামাটি থেকে মানুষ গড়বেন। সেই মাটিকে তিনি আকৃতি দিবেন এবং তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দিবেন।

মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা ফেরেশতাদিগনকে মাটি নিয়ে আসার আদেশ দিলেন ইবনে মাস’উদ এবং অন্যান্য সাহাবীগণ হইতে বর্ণিত আছে যে, পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতা জিবরাঈল (আঃ) কে পৃথিবী মাটি এনে দেয়ার জন্য প্রেরণ করলেন। তখন পৃথিবী বললো, “তোমার হাত থেকে আমার পরিমাণ হ্রাস হওয়া কিংবা বিকৃতি হওয়া থেকে আমি মহান আল্লাহ্‌ তা’আলার আশ্রয় প্রার্থণা করছি।” তাই জিবরাঈল (আঃ) সঙ্গে কিছু না নিয়েই ফিরে গিয়ে বললেন:“হে আমার পালনকর্তা, পৃথিবী আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করেছে।”এবার আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতা মিকাঈল (আঃ) কে একই উদ্দেশ্যে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠালেন। এবং একইভাবে পৃথিবী আবারও আল্লাহ্‌র নিকট আশ্রয় প্রার্থণা করলো।
 
অতঃপর আল্লাহ্‌ মৃত্যুর ফেরেশতা বা মৃত্যুদূতকে পাঠালে পুনরায় পৃথিবী একইভাবে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থণা করলো। কিন্তু তখন সেই ফেরেশতা বললো: “আমিও তাঁর আদেশ মান্য না করে ফিরে যাবার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করছি।” তাই তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের উপরিভাগ থেকে মাটি নিয়ে, সেগুলো মিশিয়ে তা সঙ্গে নিয়ে আরোহণ করলেন আর আল্লাহ্‌ তা’আলা মাটিগুলোকে ভিজিয়ে আঠালো করলেন। তারপর আল্লাহ্‌ তা’আলা ফেরেশতাগণকে বললো যে তিনি শুষ্ক ঠনঠনে মাটির কাদা থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে , আল্লাহ পাক বলেন,

اِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ خَالِقٌۢ بَشَرًا مِّنۡ طِیۡنٍ
 
”আমি মাটির মানুষ সৃষ্টি করব।”{সূরা সাদ: আয়াত ৭১}

وَاِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ خَالِقٌۢ بَشَرًا مِّنۡ صَلۡصَالٍ مِّنۡ حَمَاٍ مَّسۡنُوۡنٍ

”আমি পচা কর্দম থেকে তৈরী বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্ট একটি মানব জাতির পত্তন করব।”{সূরা আল-হিজর: আয়াত ২৮}

প্রতিটি মানুষ কেন ভিন্ন (একই পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও)

আবু মুসা আল-আশয়ারি হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ্‌ আদম (আঃ) কে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার এক মুঠো ধুলোমাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। সেইজন্যই মানবজাতির মধ্যে বিভিন্ন রং; ভালো এবং মন্দ, নরম ও কঠিন, এবং এর মধ্যবর্তীতে যা আসে তার সবকিছুই আছে।”(তাফসীরে ইবনে কাসির)


13
আদম (আঃ) - এর জীবনী – মানবজাতির সূচনা

পরাক্রমশালী আল্লাহ়্ তার নতুন সৃষ্টি – মানব সম্পর্কে ফেরেশতাদের অবহিত করেন

মহান আল্লাহ্‌ তা’আলা জানালেন যে, তিনি পৃথিবীতে এমন এক প্রতিনিধি প্রেরণ করতে চলেছেন, যার সন্তান-সন্ততি হয়ে বংশবিস্তার করবে। তখন ফেরেশতাগণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌কে কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি সেখানে এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে চান যারা পৃথিবীতে ফিৎনা ফ্যাসাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা সর্বদা আপনার প্রশংসা এবং উপাসনায় মগ্ন থাকি।” আল্লাহ্‌ জবাবে বললেন, “নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তা তোমরা জান না।”

وَاِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡہَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡہَا وَیَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَنُقَدِّسُ لَکَ ؕ قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ

অর্থঃ আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। {সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত ৩০}

পৃথিবীর বুকে মানব জাতিকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে আল্লাহ পাক ফেরেশতাদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা কি বল? এতে মানব হৃদয়ে একটা প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাহলে কি আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন পরামর্শ সাপেক্ষে বিশ্বজগৎ পরিচালনা করে থাকেন?

জবাবঃ তা নয়। বিশ্বজগতে বিদ্যমান কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে সৃষ্টি ও পরিচালনা করতে মহান মুনিবের কোন পরামর্শের প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। অতীতে কি হয়েছে, বর্তমানে কি হইতেছে ও ভবিষ্যতে কি হবে তা সবই তিনি জানেন। তদুপরি জিজ্ঞাসা করে তাদের কে সাক্ষী বানিয়ে রাখলেন। আল্লাহ পাক জানেন যে, আমি পৃথিবীর বুকে মানব জাতিকে প্রেরণ করব এবং তাদের মধ্যে আখেরী জামানার রাসূল হিসেবে আমার হাবীব (সাঃ) কে পাঠাব। কিয়ামতের দিন যখন আমার হাবীব (সাঃ) তাঁর উম্মতদেরকে নিয়ে জান্নাতে চলে যাবেন তখন হে ফেরেশতারা! তোমরাই আমার হাবীব (সাঃ) ও তাঁর উম্মতদের খাদেম হয়ে খেদমত করবে কিন্তু তোমাদের তা জানা নেই। এজন্য আল্লাহ বললেন, আমি যা জানি তোমরা তার কিছুই জান না।

এই নশ্বরধরায় মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করার পূর্বে আল্লাহ পাক জ্বিন জাতিকে  সৃষ্টি করেছিলেন। কিছু দিন পর্যন্ত আল্লাহর দাসত্ব আদায় করে অবশেষে তারা মারা-মারি,কাটা-কাটি দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুট-তরাজ, অন্যায়-অত্যাচার, যেনা-ব্যাভিচার তথা সর্বপ্রকার খোদাদ্রোহী কর্মকান্ডের সাগরে নিমজ্জিত হয়েছিল। তাফসীরে উসমানীর মধ্যে এসেছে, এভাবে জ্বিন জাতি পৃথিবীর বুকে হাজার হাজার বৎসর ধরে বসবাস করতে ছিল।

অবশেষে তাদের প্রতি নারাজ হয়ে রাব্বুল আলামীন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন, জমিনের বুকে যত অবাধ্য জ্বিন রয়েছে তাদেরকে ধ্বংস করে দাও। ফেরেশতারা এই নির্দেশ পেয়ে জমিনের বুকে যত অবাধ্য জ্বিন পেয়েছিল তাদেরকে কতল করে দিল। কিছু কিছু জ্বিন পাহাড়ে-পর্বতে গিয়ে পালাল। কিন্তু জ্বিন সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল এক বিখ্যাত আলেম ও নিতান্ত পরহেজগার জ্বিন। তার নাম ছিল ইবলিস। এই ইবলিস জ্বিন জাতির এই গর্হিত কার্যক্রম খুবই ঘৃণা করত। তার প্রতি ফেরেশতাদের মহব্বত লেগে গেল। অবশেষে আল্লাহর শাহী দরবারে ফেরেশতারা ফরিয়াদ করল, হে দয়াময় খোদা নির্দেশ দিলে আমরা ইবলিস নামক জ্বিনকে কতল করব না। রাব্বুল আলামীন বললেন, ঠিক আছে ইবলিসকে তোমাদের মাঝে রেখে দাও। এভাবে ইবলিস মুক্তি পেয়ে ফেরেশতাদের সাথে জান্নাতে বসবাস করতে লাগল।


14
বান্দার হক আদায় করা ফরজ

কবি বলেছেন, ‘ এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ পৃথিবীতে যার যত বেশি আছে, সে আরো তত বেশি চায়। অন্যকে কষ্ট দিয়ে, বঞ্চিত করে, জুলুম করে, বেশি পাওয়ার বা বেশি ভোগের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং পেশিশক্তি বলে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করে। যার ফলে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় বা বান্দার হক নষ্ট হয়। বান্দার হক বা হককুল ইবাদ একটি বিস্তৃত বিষয়। বান্দাহ অর্থ আল্লাহর গোলাম, আর হক অর্থ অধিকার বা মানবাধিকার। বান্দার হক মানে মানুষের অধিকার বা মানবাধিকার। অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ হরণ করা, নষ্ট করা, আর্থিক, দৈহিক ও মর্যাদার ক্ষতিসাধন করা, কারো ন্যায্য অধিকার হরণ করা এবং ইনসাফবিরোধী কাজ করাই হচ্ছে বান্দার হক নষ্ট করা। বান্দার হক নষ্ট করলে বান্দাহ ক্ষমা না করলে আল্লাহ পাকও তা ক্ষমা করেন না। মহান আল্লাহ কুরআন মজিদে ফরমান, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না।’ (সূরা বাকারা-১৮৮)।

মানুষের প্রতি অবিচার করতে নিষেধ করে আল্লাহপাক কুরআনে ইরশাদ করেন ‘তোমরা যখন বিচার করো, তখন ন্যায়-সঙ্গতভাবে বিচার করো।’ (সূরা নিসা-৫৮)।

আদল বা ন্যায় নিষ্ঠা আল্লাহর গুণ, এ গুণে সমৃদ্ধ হওয়া ঈমানদারের কর্তব্য। সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ যে মানুষের সর্বোত্তম কল্যাণ করে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সব মানুষের হক ও সম্মান রক্ষায় প্রিয় নবী সাঃ অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। বিশ্বনবী সাঃ বলেন, ‘যদি কোনো বক্তি অন্যের এক বিঘত পরিমাণও জমি জবরদখল করে, তাহলে কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’ (মুসলিম)। আল কুরআনে কারো কুৎসা রটনা করা, গিবত করা, কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করা, তিরস্কার করাকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

‘উপযুক্ত কারণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গোপনে দোষ অনুসন্ধান করা হারাম, কারো সম্পর্কে অকারণে কুধারণা পোষণ করা হারাম ঘোষিত হয়েছে।’ (সূরা হুজরাত-১২)।

ইসলামের বিধান অনুসারে শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের হক, স্বামীর কাছে স্ত্রীর মোহরানার হক, উপার্জনক্ষম সন্তানের নিকট বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণপোষণের হক, আত্মীয়-স্বজনের হক, প্রতিবেশীর হক, দাস-দাসি ও শ্রমিকের উপযুক্ত মজুরির হক, দরিদ্রের হক, মুসাফিরের হক, অসহায় এতিমের হক সবই হককুল ইবাদ। এ সব বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ এত বেশি বলেছেন যার কোনো তুলনা নেই। নবীজী সাঃ আল্লাহর নামে তিন-তিনবার কসম খেয়ে বলেছেন ‘যে ব্যক্তি প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেটপুরে খায় সে মুমিন নয়।’ আল কুরআনে একে অপরের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগদখল হারাম ঘোষিত হয়েছে। সঠিক মাপ নিশ্চিত করে সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। রাসূল পাক সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি কারো উত্তরাধিকার হরণ করে, আল্লাহ তায়ালা তার জান্নাতের উত্তরাধিকার হরণ করবেন (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তিনি আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো ধন-সম্পদ ও পরিবারপরিজনের ব্যাপারে ধোঁকা দেয় সে জাহান্নামি।’ নিশ্চিয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায় নিরপেক্ষতা ও সহমর্মিতার নির্দেশ দিচ্ছেন। (নাহল-৯০)।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ‘আদল’ ও ‘ইহসান’ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তোমরা ন্যায়ের ঝাণ্ডা উঁচু করে দাঁড়াও যদিও তা তোমাদের নিজেদের ওপর আপতিত হয়। কিয়ামতের দিন প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নিশ্চয়ই মানুষের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অনুভবশক্তি (বিবেক) সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) প্রশ্ন করা হবে। আল্লাহপাক আরো বলেন, ‘শুধু তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে থাকে। জুলুমবাজরা (বান্দার হক নষ্টকারীরা) তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে। (সূরা-২২)।

তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত বান্দার আচরণগত হক এবং বৈষয়িক বা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত হক যথাসম্ভব আদায়ের জন্য দায়িত্ব সচেতন হওয়া। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের খুবই ভালোবাসেন (মায়েদা-৪২)।

মালিক শ্রমিকের সাথে, কর্মকর্তা কর্মচারীর সাথে, শাসক শাসিতের সাথে সদ্ব্যবহার না করা, কেউ কারো সাথে অসৎ ব্যবহার করা, অনর্থক কারো সাথে কটুবাক্য প্রয়োগ করা, গালমন্দ করা, কাউকে মারধর করা ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক নষ্ট করার পর্যায়ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে ওইসব ব্যক্তির অধিকার রয়েছে তাদের কাছ থেকে সুন্দর ও ভালো আচরণ পাওয়ার। আল্লাহ বলেন, যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে (আহযাব-৫৮)।

স্ত্রীর জন্য স্বামীর ওপর বিয়ের দেনমোহর আদায় করা ফরজ। এ হক থেকে স্ত্রীকে বঞ্চিত করা, দুর্বলদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নির্দিষ্ট পাওনা থেকে বঞ্চিত করা, কারো টাকা-পয়সা, সম্পদ বা অন্যান্য মালামাল অবৈধভাবে ভোগ করা বা যার যা প্রাপ্য তাকে তা থেকে বঞ্চিত করা, এসবই বৈষয়িক বা আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত হক। বান্দার এ সব হক নষ্টের জন্য অবশ্যই একদিন আল্লাহপাকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। রাজা-প্রজা, মালিক-শ্রমিক বিত্তশালী-বিত্তহীন কাউকেই সেদিন বান্দার হক নষ্টের জন্য ছাড় দেয়া হবে না।

এ জীবনে চলার পথে, কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, কাজকর্মে লেনদেনে অন্যের হক রয়েছে। তাই অন্যের হক বা অধিকারের বিষয়টি চিন্তা করে আমাদের বিবেক সচেতন হয়ে চলতে হবে, যাতে কারো হক নষ্ট না হয়। হে আল্লাহ! আমাদের বান্দার হক আদায়ে তৌফিক দান করুন এবং সততা, বিনয় অল্প তুষ্টি, শুকুরগুজারি দিয়ে আত্মাকে সুসজ্জিত করে দিন।


15
শিশু সুরক্ষায় ইসলামের শিক্ষা

ইসলাম হচ্ছে ন্যায় ও শান্তির ধর্ম। ইসলাম সব মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। ইসলামে রয়েছে ক্ষমা, ধৈর্য, সহনশীলতা, সহযোগিতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা ও মহান আদর্শ। আজ সারা বিশ্বে বিচিত্র সামাজিক সমস্যা যেমন: শিশু ও নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, শিশু ও নারী পাচার, অ্যাসিড নিক্ষেপ, অনৈতিক ও শ্রমসাধ্য কাজে শিশুদের ব্যবহার করে অধিক মুনাফা এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন বেড়ে চলেছে। মিথ্যাচার, অহংকার, পরনিন্দা, লোভ, হিংসা, যৌন অনাচার ইত্যাদি মহামারি রূপ ধারণ করেছে।

মোমিন বা বিশ্বাসী তথা ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ কখনোই এহেন অনৈতিক কাজ যেমন: শিশুদের সঙ্গে সহিংস আচরণ, তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পাচার, হত্যা, গুম এবং শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে না। শিশু ও নারীদের যৌন নির্যাতন ও তাদের সঙ্গে ব্যভিচার করা জঘন্য অপরাধ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘চরিত্রের বিচারে যে লোকটি উত্তম, মোমিনদের মধ্যে সে–ই পূর্ণ ইমানের অধিকারী।’ (তিরমিজি)।

তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই লোকটিই আমার কাছে বেশি প্রিয়, যার নৈতিক চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।’ (বুখারি)।

আল্লাহ–নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কারও জীবন রক্ষা করা শরিয়া নির্দেশিত একটি পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুদের এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যা তার ক্ষতির কারণ হয়। এতে শিশুদের শিক্ষার অধিকার দেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য জ্ঞানার্জন বাধ্যতামূলক এবং শিক্ষার সুব্যবস্থা করার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।

হজরত বেলাল (রা.) ক্রীতদাস ছিলেন, কিন্তু তিনি ইসলামে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আজকের দিনে দাসপ্রথা নেই, তবে দরিদ্র পরিবারের সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত যেসব শিশু গৃহকাজে নিয়োজিত, তাদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে দাসের মতোই আচরণ করতে দেখা যায়। ইসলামে এতিম, শিশু, নারী, বৃদ্ধ, বিপদগ্রস্ত, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ প্রত্যেকের অধিকার সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। জুলুম, নিপীড়ন, অত্যাচার, অনাচার, ভয়ভীতি সঞ্চার, বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ফিতনা-ফ্যাসাদ কোরআনের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ফিতনা হত্যার চেয়েও জঘন্য।’ (বাকারা: ১৯১)।

শিশুদের সঙ্গে সহিংস আচরণ, তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, পাচার, হত্যা, গুম ইত্যাদি করা সম্পূর্ণ ইসলামি শিক্ষার বিপরীত, অনৈতিক ও হারাম। জীবন হলো আল্লাহর দান, তাই কারও জীবনকে যেকোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তাই বাবা-মায়ের প্রতি আল্লাহ তায়ালা নির্দেশনা দিয়েছেন বৈধ দাম্পত্য জীবনযাপনের। কারণ, পিতৃমাতৃহীন সন্তান সামাজিকভাবে মর্যাদাহীন, অভিভাবকহীন, আশ্রয়হীন ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। মানবশিশু অসহায় ও দুর্বল বলে তাদের নিরাপত্তাদান প্রাথমিকভাবে পিতা-মাতার দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অভাবের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কোরো না। তাদের জীবিকা আমি দিই এবং তোমাদেরও আমিই জীবিকা দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা ভয়ানক অপরাধ।’ (ইসরা: ৩১)।

গৃহকর্মীদের অধিকার ও সম্মান

সমাজের দরিদ্র পরিবারের শিশু বা এতিম শিশুরাই প্রধানত গৃহকাজের সঙ্গে যুক্ত। কাজে সামান্য ত্রুটির জন্য তারা কতভাবেই না শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং তাদের উপযুক্ত মজুরিও তারা পায় না। তাদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ দিয়ে দাও আর ভালো সম্পদের সঙ্গে খারাপ সম্পদ বদল কোরো না। তোমাদের সম্পদের সঙ্গে এতিমদের সম্পদ মিলিয়ে তাদের সম্পদ আত্মসাৎ কোরো না। নিশ্চয় এমন করা অত্যন্ত বড় রকমের অপরাধ।’ (নিসা, ২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তারা (কাজের মানুষ) তোমার ভাই! তাই যখন সে তোমার জন্য খাবার প্রস্তুত করে তখন তাকে তোমার সঙ্গে বসাও, যদি সে অস্বীকার করে তবু তাকে খাবার দাও। আর তাদের মুখে মারবে না।’ (কাফি, সিলসিলাতুস, আলবানি)।

নারী ও কন্যাশিশুর বিশেষ গুরুত্ব

আমাদের সমাজে মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হয়। ঘরে, স্কুলে, কলেজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিস-আদালতে কোথাও তাদের নিরাপত্তা নেই। নারীদের ইভ টিজিং, যৌন নির্যাতন, অ্যাসিড নিক্ষেপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্নভাবে তারা মর্যাদাহানির শিকার হচ্ছে। অথচ ইসলামে নারী বা মেয়েদের অনেক উচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে জীবন যাপন করবে।’ (নিসা: ১৯)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি)।

যে ব্যক্তির কন্যাসন্তান আছে আর সে তাকে জীবন্ত কবর দেয় না, তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না, ছেলেসন্তানকে কন্যাসন্তানের ওপর প্রাধান্য দেয় না, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু দাউদ)।

তাই নারী বা মেয়েশিশুদের প্রতি উত্তম ব্যবহার করা প্রতিটি মোমিনের ইমানি দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য।

শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়

শিশুদের প্রতিপালন, শিক্ষা, সংশোধন ও গঠন বিষয়ে নির্দেশনাও ইসলামে রয়েছে। শিশুর প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার। এরপর মক্তব বা পাঠশালা। শিশুর সুশিক্ষার জন্য পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা প্রধান। তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে তা হলো শিশুর মাথায় আঘাত করা যাবে না। মুখমণ্ডল বা চেহারায় চপেটাঘাত করা যাবে না। কান টানা বা কান মলা ও নাক মলা যাবে না। চামড়া মোচড়ানো ও গাল টানা যাবে না।। শিশুদের প্রহারের জন্য কোনো দড়ি, ছড়ি, লাঠি, কাঠি, বেত, স্কেল ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না। ডাস্টার, চক, মার্কার পেন ইত্যাদি ছুড়ে মারা যাবে না। রাগের বশীভূত হয়ে শাস্তি প্রদান করা যাবে না।

শিশুদের সঙ্গে যেসব আচরণ করা যাবে না

শিশুদের জন্ম নিয়ে অশোভন কথা বলা যাবে না। শিশুদের বাবা-মাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা যাবে না। শিশুদের জন্মস্থান বা এলাকা নিয়ে অসম্মানজনক কথা বলা যাবে না। শিশুদের বংশ, জাত, বর্ণ, পদবি নিয়ে উপহাস করা যাবে না। শিশুদের শারীরিক গঠন, আকার-আকৃতি ও গায়ের রং নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা যাবে না। শিশুদের বিশেষ কোনো স্বভাব বা মুদ্রাদোষ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা যাবে না। শিশুর জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো অযাচিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় উল্লেখ করে তাকে লজ্জা দেওয়া যাবে না। শিশুদের মেধা নিয়ে কটু মন্তব্য করা যাবে না। কোনো শিশুকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না। শিশুদের পশু বা প্রাণীর নামে অভিহিত করা যাবে না। শিশুদের জন্য এমন বাক্য বা এমন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণত কোনো প্রাণী বা পশুর জন্য ব্যবহৃত হয়। শিশুর সঙ্গে খেলার ছলে তাকে বিরক্ত বা বিব্রত করা যাবে না।

ইসলামের শিক্ষা তথা আল্লাহ তায়ালার ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেওয়া বিধিবিধান মেনে চললে সমাজে শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধ হবে।

Pages: [1] 2 3 ... 6