Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - ashraful.diss

Pages: 1 ... 4 5 [6] 7
76
বেতন (টাকা) মাসের শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট রাখার পরামর্শপত্র

এক আরাবি-যুবক ছিল। সে তার জীবনের প্রতি মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। তার বেতন ছিল মাত্র চার হাজার রিয়াল। বিবাহিত হওয়ায় তার সাংসারিক খরচ বেতনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। মাস শেষ হওয়ার আগেই তার বেতনের টাকা শেষ হয়ে যেত, তাই প্রয়োজনের তাগিদে তাকে ঋণ নিতে হত। এভাবে সে আস্তে আস্তে ঋণের কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। আর তার বেতনে এমন বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছিল যে, তার জীবন এই অভাবেই কাটবে। অবশ্য তার স্ত্রী তার এ-অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখত। কিন্তু ঋণের বোঝা এত ভারী হয়েছিল, যেন নিশ্বাস নেওয়াও দুষ্কর।একদিন সে তার বন্ধুদের এক মজলিসে গেল। সেদিন এমন একজন বন্ধু সেখানে উপস্থিত ছিল, যে অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। যুবকের বক্তব্য এমন ছিল যে, আমার ওই বন্ধুর সকল পরামর্শকে আমি খুব গুরুত্ব দিতাম।

কথায় কথায় যুবক তার সকল অবস্থা বন্ধুকে বলল। বিশেষত আর্থিক সমস্যাটা তার সামনে তুলে ধরল। তার বন্ধু মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনল এবং বলল, আমার পরামর্শ হল- তুমি তোমার বেতন থেকে কিছু টাকা ছদকার জন্য নির্ধারণ কর। যুবক আশ্চর্য হয়ে বলল, জনাব! সাংসারিক প্রয়োজন পুরনেই ঋণ নিতে হয়; আর আপনি আমাকে ছদকার জন্য টাকা নির্ধারণ করতে বলেছেন? যাইহোক, যুবক বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি স্ত্রীকে জানাল। তার স্ত্রী বলল, পরিক্ষা করতে সমস্যা কী? হতে পারে আল্লাহ্ তা’আলা তোমার জন্য রিযিকের দরজা খুলে দিবেন। যুবক বেতনের চার হাজার রিয়াল থেকে ত্রিশ রিয়াল ছদকার জন্য নির্ধারণের ইচ্ছা করল এবং মাসশেষে তা আদায় করতে শুরু করল। সুবহানাল্লাহ! কসম করে বললে মোটেও ভুল হবে না, তার (আর্থিক) অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেল। সে তো সবসময় টাকা-পয়সার চিন্তা টেনশনেই পড়ে থাকত; আর এখন তার জীবন যেন ফুলের মতো হয়ে গেছে। এত ঋণ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে স্বাধীন মনে হত। মনের মধ্যে এমন এক অনাবিল শান্তি হচ্ছিল, যা বলে বুঝানো সম্ভব নয়।

কয়েক মাস পর থেকে সে নিজের জীবনকে সাজাতে শুরু করল। নিজের আয়কৃত টাকা কয়েক ভাগে ভাগ করল, আর তাতে এমন বরকত হল, যা পূর্বে কখনও হয়নি। সে হিসাব করে একটা আন্দাজ করল, কত দিনে ঋণের বোঝাটা মাথা থেকে নামাতে পারবে ইনশাআল্লাহ। কিছুদিন পর আল্লাহ তা’লা তার সামনে আরও একটি পথ খুলে দিলেন। সে তার এক বন্ধুর সাথে প্রপাটি-ডিলিং এর কাজে অংশ নিতে শুরু করে। সে বন্ধুকে গ্রাহক/ক্রেতা এনে দিত, তাতে ন্যায্য প্রফিট পেত। আলহামদুলিল্লাহ! সে যখনই কোনো গ্রাহকের কাছে যেত, গ্রাহক অবশ্যই তাকে অন্য গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তা দেখিয়ে দিত। এখানেও সে ঐ আমলের পুনরাবৃত্তি করত। অর্থাৎ প্রফিটের টাকা হাতে আসলে (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) অবশ্যই তা থেকে ছদকা নির্ধারণ করত। আল্লাহর কসম! ‘ছদকা কী’ তা কেউ জানে না; ঐ ব্যক্তি ব্যতিত যে তা পরিক্ষা করেছে। ছদকা কর এবং ছবরের সাথে চল- আল্লাহর ফযলে খায়ের বরকত নাযিল হবে, যা নিজ চোখে দেখতে পাবে।

নোট:- যদি আপনি কোনো মুসলমানকে তার উপার্জনের একটি অংশ ছদকার জন্য নির্ধারণ করতে বলেন এবং এর উপর আমল করে, আপনিও ঐ পরিমাণ ছওয়াব পাবেন যে পরিমাণ ছদকাকারী পেয়েছে। আর ছদকাকারীর ছওয়াবে কোনো কমতি আসবে না। আপনি দুনিয়া থেকে চলে যাবেন আর আপনার অবর্তমানে কেউ আপনার কারণে ছদকা করতে থাকবে। আপনি ছওয়াব পেতে থাকবেন। যদি আপনি তালিবে ইলমও হন (অর্থাৎ ছাত্রও হন) এবং আপনার আয় একেবারে সীমিত ও নির্ধারিতও হয়। তবুও কম-বেশি, যতদূর সম্ভব (সামান্য কিছু হলেও) ছদকার জন্য নির্ধারণ করুন। যদি ছদকাকারী জানতে ও বুঝতে পারে যে, তার ছদকা ফকিরের হাতে যাওয়ার আগে আল্লাহর হাতে যায়। তাহলে অবশ্যই ছদকা গ্রহণকারীর তুলনায় ছদকাদানকারী অনেক গুণ বেশি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে।

ছদকা দানের উপকারিতা:-

ছদকা দানকারী এবং যে তার কারণ হবে সেও এ সকল ফায়েদার অন্তর্ভুক্ত।

১. ছদকা জান্নাতের দরজাসমূহের একটি।
২. সৎ আমলের মধ্যে উত্তম আমল।
৩. ছদকা কেয়ামতের দিন ছাঁয়া হবে এবং ছদকা-আদায়কারীকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবে।
৪. ছদকা আল্লাহ তা‘লার ক্রোধকে ঠান্ডা করে এবং কবরের উত্তপ্ততায় শীতলতার উপকরণ হবে।
৫. মৃতব্যক্তির জন্য উত্তম বদলা এবং সবচে’ উপকারী বস্তু হল সদকা। আর ছদকার ছওয়াবকে আল্লাহ তা‘আলা ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে থাকেন।
৬. ছদকা পবিত্রতার আসবাব, আত্মশুদ্ধির মাধ্যম ও সৎকাজের প্রবর্ধক।
৭. ছদকা কেয়ামতের দিন ছদকাকারীর চেহারার আনন্দ ও প্রফুল্লতার কারণ হবে।
৮. ছদকা কেয়ামতের ভয়াবহ অবস্থায় নিরাপত্তা হবে। অতীতের জন্য আফসোস করা থেকে বিরত রাখে।
৯. ছদকা গুনাহের ক্ষমা এবং খারাপ কাজের কাফফারা।
১০. ছদকা উত্তম মৃত্যুর সুসংবাদ এবং ফেরেস্তাদের দোয়ার কারণ।
১১. ছদকা দানকারী সর্বোত্তম বান্দাগণের অন্তর্ভুক্ত এবং ছদকার ছওয়াব প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি পায় যে কোনো না কোনোভাবে অংশীদার হয়।
১২. ছদকা দানকারীর সঙ্গে সীমাহীন কল্যাণ ও বিরাট প্রতিদানের ওয়াদা রয়েছে।
১৩. খরচ করা মানুষকে মুত্তাকীদের কাতারে শামিল করে। ছদকাকারীকে সৃষ্টিকূল মুহাব্বত করে।
১৪. ছদকা দয়া-মায়া ও দানশীলতার আলামত।
১৫. ছদকা দোয়া কবুল এবং জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম।
১৬. ছদকা বালা মসিবত দূর করে দুনিয়াতে সত্তরটা খারাপির দরজা বন্ধ করে। 
১৭. ছদকা হায়াত ও মাল বৃদ্ধির মাধ্যম। সফলতা এবং রিজিকের প্রশস্ততার মাধ্যম।
১৮. ছদকা চিকিৎসা, ঔষধ ও সুস্থতা।
১৯. ছদকা আগুনে পোড়া, পানিতে ডোবা ও অপহরণসহ (সকল) অপমৃত্যুর প্রতিবন্ধক।
২০. ছদকার প্রতিদান পাওয়া যায় চাই তা পশু-পাখিকেই দেওয়া হোক না কেন।

শেষকথা:- এই মুহূর্তে আপনার জন্য সর্বোত্তম ছদকা হল, কথাগুলো ছদকার নিয়তে প্রচার করা।


77
প্রিয়জনদের কবরের কাছে যাবেন, প্রতিদিন বা সপ্তাহে একবার, আর না পারলে অন্তত মাসে একবার হলেও যাওয়া উচিত।

যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি দুনিয়াতে পরিচিত তার কোনো মৃত ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে গমন করে এবং তাকে সালাম দিলে তখন তার সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য আল্লাহ তার রূহকে ফেরত দেন। (আল-ইসতিযকার, ১/১৮৫; আর-রূহ ইবনুল কাইয়্যিম রহ. পৃষ্ঠা ৫)

হাঁটতে চলতে কখনো তাদের কথা মনে পরলে দুয়া করবেন, নামাজের পর মোনাজাতে তাদের নামটা আল্লাহর কাছে বলতে ভুলবেন না। প্রতিদিন না পারলেও যখনই সম্ভব হবে এক্সট্রা দশটা টাকা হলেও কোন অসহায়কে দিবেন, নিয়ত করে নিবেন যেনো আল্লাহ তা'য়ালা সকল মুসলমানদের কবরের আযাব মাফ করে দেন, জান্নাতের সাথে কবরকে সম্পৃক্ত করে দেন। মাইয়্যেতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিয়া হলো গোলাম আযাদ, সাদকা, তার জন্য ইস্তিগফার, দো‘আ ও তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়। (রূহ, পৃষ্ঠা ৩৪৫)

মনে রাখবেন, তারা আপনার দিকে অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছেন; যদি কিছু দেন! যদি কিছু দেন!! আপনিও একদিন চলে যাবেন। যদি আপনি আপনার প্রিয়জনদের ভুলে থাকেন, তাহলে আপনার পর আপনার প্রিয়জনরাও আপনাকে ভুলে থাকবে। জান্নাতে কোনো কোনো ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। তখন সে বলবে, 'কীভাবে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি পেলো?' তখন তাকে বলা হবে, 'তোমার সন্তান তোমার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, তাই।' (ইবনু মাজাহ: ২/১২০৭, মাজমাউয যাওয়াইদ: ১০/২১০, সিলসিলা সহিহাহ: ৪/১৭২)

অন্ধকার কবরে আপনি অপেক্ষায় থাকবেন শতবছর, কিন্তু আপনার ডাকবাক্সে কখনো কোন চিঠি আসবেনা! কখনো ফিরিশতা মারফত এই ফরমান পৌঁছবেনা যে,"তোমার প্রিয়জনদের দুয়ার উসিলায় আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।"

78
যেভাবে বুঝবেন আপনি অহংকারী"‼️

জীবন ধ্বংসকারী একটি মারাত্মক স্বভাব হলো অহংকার। এই স্বভাবের লোকেরা তাদের উন্নতি ও সফলতা বেশিদিন ধরে রাখতে পারে না। আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষদের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে তারা। তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, সংগঠন, রাষ্ট্র এমনকি নিজ পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাসুল (সা.) তিনটি ধ্বংসকারী বস্তু থেকে মানুষকে সাবধান করেছেন। সেগুলো হলো, প্রবৃত্তি পূজারি হওয়া, লোভের দাস হওয়া এবং অহংকারী হওয়া। তিনি বলেন, এটিই হলো সবচেয়ে মারাত্মক। (মিশকাত, হাদিস : ৫১২২)
এখানে অহংকারের কিছু নিদর্শন বর্ণনা করা হলো—


❏ শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করা

সবার কাছে নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা, অন্যকে তুচ্ছ ভাবা ধ্বংসের কারণ। ইবলিস সর্বপ্রথম নিজেকে বড় মনে করেছিল। যার কারণে মহান আল্লাহ তাকে অভিশাপ দিয়েছেন। আদম (আ.)-কে সিজদা দেওয়ার নির্দেশের বিরোধিতায় সে আল্লাহকে যুক্তি দেখিয়েছিল, ‘আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং আদমকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২)। অতএব, ‘আমি কি তাকে সিজদা করব, যাকে আপনি মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন?’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৬১)
এই অহংকারের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাকে বলেন, ‘বের হয়ে যাও এখান থেকে। কেননা তুমি অভিশপ্ত।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৭৬)


❏ সত্য প্রত্যাখ্যান করা

মানুষ কখনো কখনো নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে চিত্রিত করার জন্য সত্যকে চাপা দেয়। অন্যের অবদানগুলো নিজের বলে চালিয়ে দেয়। অন্যকে দাবিয়ে রাখতে বিভিন্ন জায়গায় তাকে তুচ্ছ করে চিত্রিত করে। এটাও মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, লোকেরা চায় যে তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা জোড়া সুন্দর হোক। জবাবে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হলো সত্যকে দম্ভের সঙ্গে পরিত্যাগ করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৯১)


❏ নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবা

দুনিয়ার প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর দয়ায় চলে। কাউকেই আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ করেননি। তাই যারা নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ ভেবে অন্যকে অবজ্ঞা করে তাদের ব্যাপারে রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ অবশ্যই সীমা লঙ্ঘন করে। কারণ সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ৬-৭)


❏ হাঁটাচলায় বড়ত্ব প্রকাশ করা

একবার উবাই ইবনু কাব (রা.)-এর পেছন পেছন একদল লোককে চলতে দেখে খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁকে চাবুক দিয়ে আঘাত করলেন। এতে চমকে উঠে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী হে আমিরুল মুমিনিন! জবাবে খলিফা বলেন, ‘এটা অনুসরণকারীর জন্য লাঞ্ছনাকর এবং অনুসৃত ব্যক্তিকে ফিতনায় (অহংকারে) নিক্ষেপকারী।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৩১২৪৪)


❏ কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা

অর্থ-সম্পদ, পদবী ও সৌন্দর্যের কারণে অন্যের প্রতি অন্তরে কোনো তুচ্ছভাব উদ্রেক হওয়াটা অহংকারের লক্ষণ। একদিন সাহাবি আবু জর গিফারি (রা.) হাবশি বেলাল (রা.)-কে তাঁর কালো মায়ের দিকে ইঙ্গিত করে তাচ্ছিল্য করলে রাসুল (সা.) তাঁকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘হে আবু জর! তুমি তাকে তার মায়ের নামে তাচ্ছিল্য করলে? তোমার মধ্যে জাহেলিয়াত রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩০) একইভাবে অধীনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করাও মারাত্মক গুনাহ।


❏ প্রভাব খাটিয়ে অন্যের হক নষ্ট করা

এটি অহংকারের একটি বড় নিদর্শন। এর শাস্তি অত্যন্ত লাঞ্ছনাকর। অন্যায়ভাবে কারো সম্মানহানি করলে কিয়ামতের দিন অহংকারী ব্যক্তিকে পিঁপড়াসদৃশ করে লাঞ্ছনাকর অবস্থায় হাঁটানো হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৯২)


❏ অহেতুক জেদ করা

অনেকেই আছে নিজের ভুল কখনো স্বীকার করে না। নিজের ভুলগুলো অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। আবদুর রহমান বিন মাহদি (রহ.) বলেন, আমরা এক জানাজায় ছিলাম। সেখানে ওবায়দুল্লাহ বিন হাসান উপস্থিত ছিলেন, যিনি তখন রাজধানী বাগদাদের বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন। আমি তাঁকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি ভুল জবাব দেন। তখন আমি বললাম, ‘আল্লাহ আপনাকে সংশোধন হওয়ার তাওফিক দিন! এ মাসআলার সঠিক জবাব হলো এই, এই। তখন তিনি কিছুক্ষণ দৃষ্টি অবনত রাখেন। অতঃপর মাথা উঁচু করে দুইবার বলেন, ‘এখন আমি প্রত্যাবর্তন করলাম এবং আমি লজ্জিত।’ অতঃপর বলেন, ‘ভুল স্বীকার করে হকের লেজ হওয়া আমার কাছে অধিক প্রিয় বাতিলের মাথা হওয়ার চেয়ে।’ (তারিখু বাগদাদ : ১০/৩০৮)

আমাদের উচিত আল্লাহর জন্য এগুলো ত্যাগ করা। আল্লাহ আমাদের অহংকার থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।

79
মুহাররম ও আশূরা : করণীয় ও বর্জনীয়

আল্লাহ তা‘আলা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই বারো মাসে বছর নির্ধারণ করে দিয়েছেন (তওবা ৯/৩৬)। এই মাস সমূহের মধ্যে প্রথম মাস হ’ল মুহাররম মাস। মুহাররম মাসের সাথে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত আছে। এই মাসে রয়েছে কিছু নফল  ইবাদত। আবার এই মাসকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু কুসংস্কার ও সুন্নাহ বিরোধী আমল প্রচলিত আছে। আলোচ্য প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

মুহাররম মাসের ফযীলত : ইসলামী শরী‘আতের আলোকে মুহাররম মাসের অনেক ফযীলত রয়েছে।

১. এটা হারাম মাস : চারটি হারাম তথা সম্মানিত মাসের মধ্যে অন্যতম হ’ল মুহাররম। মহান আল্লাহ বলেন,

 إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ،

নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাসসমূহের গণনা হ’ল বারোটি। যার মধ্যে চারটি মাস হ’ল ‘হারাম’ (মহাসম্মানিত)। এটিই হ’ল প্রতিষ্ঠিত বিধান’ (তওবা ৯/৩৬)।

আবূ বাকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

الزَّمانُ قَدِ اسْتَدارَ كَهَيْئَتِهِ يَومَ خَلَقَ اللهُ السَّمَواتِ والأرْضَ، السَّنَةُ اثْنا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْها أرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاثَةٌ مُتَوالِياتٌ: ذُو القَعْدَةِ وذُو الحِجَّةِ والمُحَرَّمُ، ورَجَبُ مُضَرَ، الذي بيْنَ جُمادى وشَعْبانَ-

আল্লাহ যেদিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন হ’তে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যুল-কা‘দাহ, যুল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হ’ল রজব-ই-মুযার, যা জুমাদা ও শা‘বান মাসের মাঝে অবস্থিত’।

২. এই মাসের ছিয়াম রামাযানের পরে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ : আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

 أفضَلُ الصِّيامِ بعدَ شَهرِ رمَضانَ شهرُ اللهِ المُحرَّمُ، وإنَّ أفضَلَ الصَّلاةِ بعد المفروضةِ صلاةٌ مِن اللَّيْلِ

রামাযান মাসের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের ছিয়াম হচ্ছে সর্বোত্তম এবং ফরয ছালাতের পর রাতের ছালাতই সর্বোত্তম’।

৩. এই মাস আল্লাহর মাস : বছরের সব মাস আল্লাহর হ’লেও মুহাররমকে আল্লাহ নিজের মাস বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

আশূরা কী?

আরবী ‘আশারা (عشر) শব্দ থেকে এসেছে ‘আশূরা (عاشوراء)। ‘আশারা অর্থ দশ আর ‘আশূরা অর্থ দশম, মাসের দশম দিন। হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররমের দশ তারিখকে আশূরা বা আশূরায়ে মুহাররম বলা হয়।

আশূরার করণীয় :

আশূরাকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বিভিন্ন আমলের প্রচলন দেখা যায়। যার সবগুলো ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামের আলোকে আশূরায় করণীয় হ’ল-

১. হারাম মাস হিসাবে এ মাসকে সম্মান করা : মুহাররম মাস বছরের চারটি হারাম মাসের অন্যতম। অন্যান্য হারাম মাসের ন্যায় এ মাসে বিভিন্ন নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকে এ মাসকে সম্মান করতে হবে। আবূ জামরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হ’তে কিয়দংশ প্রদান করব। আমি তাঁর সাথে দু’মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আব্দুল কায়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন, তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন প্রতিনিধি দলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের’। তিনি বললেন, স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল,

يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّا لاَ نَسْتَطِيعُ أَنْ نَأْتِيَكَ إِلاَّ فِي شَهْرِ الْحَرَامِ، وَبَيْنَنَا وَبَيْنَكَ هَذَا الْحَىُّ مِنْ كُفَّارِ مُضَرَ، فَمُرْنَا بِأَمْرٍ فَصْلٍ، نُخْبِرْ بِهِ مَنْ وَرَاءَنَا، وَنَدْخُلْ بِهِ الْجَنَّةَ-

‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! হারাম মাস ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফেরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে দাখিল হ’তে পারি’।

২. ছিয়াম পালন করা : এ মাসের অন্যতম কাজ হ’ল এ মাসের দশ তারিখে ছিয়াম পালন করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কাতে অবস্থান কালে এ ছিয়াম পালন করতেন। মক্কার কুরায়শরাও এই দিনকে সম্মান করত ও ছিয়াম পালন করত। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَصُومُهُ قُرَيْشٌ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُهُ فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِينَةَ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تَرَكَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَمَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ-

‘জাহেলী যুগে কুরায়শরা আশূরার ছিয়াম পালন করত এবং আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)ও এ ছিয়াম পালন করতেন। যখন তিনি মদীনায় আগমন করেন তখনও এ ছিয়াম পালন করেন এবং তা পালনের নির্দেশ দেন। যখন রামাযানের ছিয়াম ফরয করা হ’ল তখন আশূরার ছিয়াম ছেড়ে দেয়া হ’ল। যার ইচ্ছা সে পালন করবে, আর যার ইচ্ছা পালন করবে না’।

মদীনায় হিজরতের পর তিনি এ ছিয়াম পালন করতেন ও ছাহাবায়ে কেরামকে ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ مَا هَذَا قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهُ مُوسَى قَالَ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ-

নবী করীম (ছাঃ) মদীনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইহুদীরা আশূরার দিনে ছিয়াম পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে ছিয়াম পালন কর কেন?) তারা বলল, এটি অতি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হ’তে নাজাত দান করেছেন। ফলে এ দিনে মূসা (আঃ) ছিয়াম পালন করতেন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এ দিনে ছিয়াম পালন করেন এবং (লোকদেরকে) ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন’।
রামাযানের ছিয়াম ফরয হওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুহাররম মাসের দশ তারিখে ছিয়াম পালনে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ছাহাবীগণও আশূরার ছিয়াম পালনের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন।

 রুবাইয়ি‘ বিনতু মু‘আব্বিয (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَرْسَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم غَدَاةَ عَاشُورَاءَ إِلَى قُرَى الأَنْصَارِ مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَليَصُمْ قَالَتْ فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا وَنَجْعَلُ لَهُمْ اللُّعْبَةَ مِنْ الْعِهْنِ فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الإِفْطَارِ-

আশূরার সকালে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আনছারদের সকল পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি ছিয়াম পালন করেনি সে যেন দিনের বাকী অংশ না খেয়ে থাকে। আর যার ছিয়াম অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন ছিয়াম পূর্ণ করে। তিনি (রুবাইয়ি‘) (রাঃ) বলেন, পরবর্তীতে আমরা ঐ দিন ছিয়াম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের ছিয়াম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত’।
 
অন্য বর্ণনায় এসেছে,

فَإِذا سَأَلُونا الطَّعامَ، أَعْطَيْناهُمُ اللُّعْبَةَ تُلْهِيهِمْ حتّى يُتِمُّوا صَوْمَهُمْ-

যখন তারা আমাদের কাছে খাবার চাইত, আমরা তাদের খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম যতক্ষণ না তারা তাদের ছিয়াম পূর্ণ করত’। ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে ‘আশূরার দিনের ছিয়ামের উপরে অন্য কোন দিনের ছিয়ামকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি এবং এ মাস অর্থাৎ রামাযান মাস (এর উপর অন্য মাসের গুরুত্ব প্রদান করতেও দেখিনি)।

আল-হাকাম ইবনুল আ‘রাজ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আববাস (রাঃ)-এর নিকট এলাম। এ সময় তিনি মাসজিদুল হারামে তার চাদরে হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি তাকে আশূরার ছিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যখন তুমি মুহাররমের নতুন চাঁদ দেখবে, তখন থেকে গণনা করতে থাকবে। এভাবে যখন নবম দিন আসবে তখন ছিয়াম অবস্থায় ভোর করবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মুহাম্মাদ (ছাঃ) কি এভাবে ছিয়াম রাখতেন? তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ছাঃ) এভাবেই ছিয়াম রাখতেন’।

আশূরার ছিয়ামের হুকুম :

আশূরার ছিয়াম পালন করা সুন্নাত। হুমাইদ ইবনু আব্দুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, যে বছর মু‘আবিয়া (রাঃ) হজ্জ করেন, সে বছর আশূরার দিনে (মসজিদে নববীর) মিম্বরে তিনি (রাবী) তাঁকে বলতে শুনেছেন যে,

يَا أَهْلَ الْمَدِينَةِ أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ هَذَا يَوْمُ عَاشُورَاءَ وَلَمْ يَكْتُبْ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ وَأَنَا صَائِمٌ فَمَنْ شَاءَ فَلْيَصُمْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيُفْطِرْ-

‘হে মদীনাবাসীগণ! তোমাদের আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আজকে আশূরার দিন, আল্লাহ তা‘আলা এর ছিয়াম তোমাদের উপর ফরয করেননি বটে, তবে আমি ছিয়াম পালন করছি। যার ইচ্ছা সে ছিয়াম পালন করুক, যার ইচ্ছা সে পালন না করুক’।

আশূরার ছিয়ামের ফযীলত :

১. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এ দিনের ছিয়ামকে বেশী প্রাধান্য দিতেন। ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلاَّ هَذَا الْيَوْمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَهَذَا الشَّهْرَ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَانَ-

আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে আশূরার দিনের ছিয়ামের উপরে অন্য কোন দিনের ছিয়ামকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি এবং এ মাস অর্থাৎ রামাযান মাস (এর উপর অন্য মাসের গুরুত্ব প্রদান করতেও দেখিনি)’।

ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم لَمْ يَكُنْ يَتَوَخَّى فَضْلَ يَوْمٍ عَلَى يَوْمٍ بَعْدَ رَمَضَانَ إِلا يَوْمَ عَاشُورَاءَ،

‘নবী করীম (ছাঃ) রামাযানের ছিয়ামের পর আশূরার দিন ছাড়া কোন দিনকে অন্য দিন অপেক্ষা মাহাত্ম্যপূর্ণ মনে করতেন না’।

২. এক বছরের গুনাহের কাফফারা : আশূরার ছিয়াম পূর্ববর্তী এক বছরের ছগীরা গুনাহের কাফফারা স্বরূপ। আবু ক্বাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

صَوْمُ يَوْمِ عَاشُوْرَاءَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ

আর আশূরার ছিয়াম, আমি আশা করি (এর বিনিময়) বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হবে’। অন্য শব্দে এসেছে,

 يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ

বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করবেন’।

৩. আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

 مَنْ وَسَّعَ عَلى عِيَالِه فِي النَّفَقَةِ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ سَائِرَ سَنَتِه. قَالَ سُفْيَانُ: إِنَّا قَدْ جَرَبْنَاهُ فَوَجَدْنَاهُ كَذلِكَ

যে ব্যক্তি আশূরার দিন নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য উদার হস্তে খরচ করবে আল্লাহ তা‘আলা সারা বছর উদারহস্তে তাকে দান করবেন। সুফিয়ান ছাওরী বলেন, আমরা এর পরীক্ষা করেছি এবং কথার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি’।
 
আশূরার ছিয়াম কতদিন?

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কায় ও মদীনায় প্রথম দিকে মুহাররম মাসে এক দিন ছিয়াম পালন করতেন। পরবর্তীতে ইহুদীদের বিরোধিতা করার জন্য ৯ তারিখসহ দুই দিন ছিয়াম পালনের আশা প্রকাশ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) যখন নিজে আশূরার দিন ছিয়াম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,

فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ صُمْنَا يَوْمَ التَّاسِعِ ‏فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم

‘আগামী বছর আসলে আমরা নবম দিনেও ছিয়াম পালন করব। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মৃত্যুবরণ করেন’। ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

صُومُوا التَّاسِعَ وَالْعَاشِرَ وَخَالِفُوا الْيَهُودَ

তোমরা ৯ ও ১০ তারীখে ছিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের বৈপরীত্য কর’। সুতরাং মুহাররমের দু’টি ছিয়াম পালন করা উত্তম। এক্ষেত্রে দশ তারিখের আগের দিন বা পরের দিন ছিয়াম রাখা যেতে পারে।

ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

صُوموا يومَ عاشوراءَ وخالِفوا فيه اليهودَ صوموا قبلَهُ يومًا وبعده يومًا

‘তোমরা আশূরার ছিয়াম পালন কর এবং ইহুদীদের বিরোধিতা কর। তোমরা আশূরার আগের দিন অথবা পরের দিন ছিয়াম পালন কর’।

80
কুরবানীর মাসায়েল

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উল্লেখ হল।

কার উপর কুরবানী ওয়াজিব

মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ

মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

কুরবানীর সময়

মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

নাবালেগের কুরবানী

মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

মুসাফিরের জন্য কুরবানী

মাসআলা : ৫.  যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী

মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম

মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

কুরবানী করতে না পারলে

মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

রাতে কুরবানী করা

মাসআলা : ১০.  ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে

মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১

কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ১২.  উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

নর ও মাদা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

কুরবানীর পশুর বয়সসীমা


মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।

উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬
এক পশুতে শরীকের সংখ্যা

মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮

সাত শরীকের কুরবানী

মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে

মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯

কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ

মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২

মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।

মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানী দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরীক করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে শরীক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিবে।-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০

কুরবানীর উত্তম পশু

মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।-মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

খোড়া পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭

রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮

যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে

মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে

মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪, আলমগীরী ৫/২৯৭

কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮

অন্ধ পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে

মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে যদি আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া যায় তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪৭

গর্ভবতী পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান ৩/৩৫০

পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে

মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানী সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা

মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। -আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ৫

বন্ধ্যা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা

মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী ৫/৩০০, ইলাউস সুনান ১৭/২৭১-২৭৪

জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে

মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪

কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া

মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং কুরবানীর পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০

কুরবানীর পশুর দুধ পান করা

মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে মূল্য সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭,
রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে

মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫১

কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে

মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চা জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। যদি সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে বাচ্চাকেও জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-কাযীখান ৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩

মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী

মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫২

কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা

মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮, ইলাউস সুনান
১৭/২৭০

কুরবানীর গোশত বণ্টন

মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১

মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০

গোশত, চর্বি বিক্রি করা

মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া

মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

জবাইয়ের অস্ত্র

মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা

মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু

নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

অন্য পশুর সামনে জবাই করা

মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।

কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া

মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০

অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে

মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে

মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরীব  হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯

পাগল পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা জায়েয। তবে যদি এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না। -আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২

নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া

মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম ২২/১৫৯, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪

ঋণ করে কুরবানী করা

মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।

হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী


মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন মুকীম থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার কুরবানী করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৬৬

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা

মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, মিশকাত ৩/৩০৯

কোন দিন কুরবানী করা উত্তম

মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী

মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪, ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩

জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী

মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে করা

মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।

কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই করবে

মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। -আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা

মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত

মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ। নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা করে দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১, কাযীখান ৩/৩৫৪

কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে

মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার পূর্বে মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে গুনাহগার হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯

কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া

মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা, হজ্বের কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী ৪/১৪৪, আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯

কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা

মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী ১/১২০, শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬, আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৩

কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি

মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন কুরবানীর হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

রাতে কুরবানী করা

মাসআলা : ৬৮.  ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুণ জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০

কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো

মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন জাস্সাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন

জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া

মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫

মোরগ কুরবানী করা 

মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০

81
শিশুদের-নৈতিক শিক্ষা ও অনুশীলনে করণীয়

আজকের শিশুরাই যেহেতু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, কাজেই তাদের সুস্থ-সবল প্রাণবন্ত দেহ ও ফুলের মতো পবিত্র জীবন গঠনে নৈতিক শিক্ষা ও অনুশীলন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান লাভ করা অতীব জরুরি।

আমরা জানি, শিক্ষা মূলত দুই প্রকার- ১. সাধারণ শিক্ষা ও ২. ধর্মীয় শিক্ষা। যে শিক্ষা অর্জনে মানুষের জাগতিক উন্নতি ও কল্যাণ সাধিত হয়- তাকে সাধারণ শিক্ষা বলে।

আর ধর্মীয় মানুষের মাঝে উন্নত নৈতিকতা ও মানবতাবোধ জাগ্রত করে। সেই সঙ্গে জাগতিক এবং পারলৌকিক জীবনে শান্তি আনয়ন করে।

সুতরাং মানুষের মতো মানুষ হতে হলে, উভয় জ্ঞানের প্রয়োজন। যাবতীয় পরিস্থিতি আর প্রশ্নের জবাব দিতে পারে জ্ঞানীরাই। জীবন সায়াহ্নে পুরস্কৃত হয় জ্ঞানীরা। প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করবে জ্ঞানীরা। তাইতো হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জ্ঞানীর ঘুম মুর্খের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। ’

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মুসলমানকে অর্জিত জ্ঞান ও আমল এবং অর্জিত জ্ঞানের অনুশীলন বিষয়ক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে। সবাইকেই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। 

ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, যেহেতু দুনিয়ার কৃতকর্মের ভিত্তিতে আখেরাতের ফলাফল নিশ্চিত করা হবে, কাজেই প্রতিটি শিশুর-সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ উভয় শিক্ষার্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করলে নিজে যেমন উপকৃত হওয়া যায়- তেমনি পরিবার, বংশ, জাতি ও দেশের এমনকি বিশ্বের মানুষ লাভবান হন। 

শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে জ্ঞান দিতে হবে এর অন্যতম হলো-

সালাম বিনিময়, সম্বোধন, কুশলাদি বিনিময় করে কথা বলা। 

দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দোয়া মুখস্থকরণ ও অনুশীলন। বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও আদবের অনুশীলন। 

তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞানার্জন। অপবিত্রতা থেকে নিরাপদে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পবিত্রতা অর্জন করা। কথা বলা, বসা, চলাফেরার আদব রক্ষা করা। পিতা-মাতা, শিক্ষক-গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা। কোমল ব্যবহার ও হাসিমুখে কথা বলার অভ্যাস। সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও কাজের লোকের সঙ্গে ভালো আচরণ করা। 

নিয়মিত ক্লাসের পাঠ সম্পন্ন করা। নিয়মিত নামাজ আদায়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষকরে মসজিদে যেয়ে জামাতে নামাজের বিষয়ে উৎসাহী করা। নামাজে পাঠকৃত আয়াতসমূহ মুখস্থ করা। নিয়মিত খেলাধুলা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। 

সম্ভব হলে প্রতিদিন কোরআনে কারিম অর্থসহ পাঠ করা, টিভিতে ভালো অনুষ্ঠান দেখা ও পত্র-পত্রিকা পাঠ করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক জ্ঞানার্জন করা। 

শিশুদের যেসব মন্দ অভ্যাস সম্পর্কে জানাতে হবে সেগুলো হলো- মিথ্যা বলা, অহংকার করা, রাগ করা, অহেতুক বায়না ধরা, ঘৃণা করা, হিংসা করা, সন্দেহ করা, গীবত করা, চোগলখুরি করা, অশ্লীল কথা ও গালি-গালাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, প্রতারণা করা, উপহাস করা, অন্যকে মন্দ নামে ডাকা, ছোটদের সঙ্গে খেলার ছলে মিথ্যা বলা ও ভয় দেখানো, অশ্লীল ছবি দেখা, অশ্লীল বই বা ম্যাগাজিন পড়া, খারাপ বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকা। 

যাবতীয় নেশাদ্রব্য পরিহার করা। খোলা ছাদে খেলাধুলা করা বা ঘুড়ি উড়ানো। তাড়াহুড়া করা। ক্লাসে বিলম্বে উপস্থিত হওয়া ও নামাজে উদাসীনতা দেখানো। 

এছাড়াও শিশুদের যা জানা প্রয়োজন, সেগুলো হলো- তওবা- গোনাহ ধ্বংস করে। শিরক-ঈমান ধ্বংস করে। দীন- গোমরাহি ধ্বংস করে। রাগ-বুদ্ধি ধ্বংস করে। অহংকার- জ্ঞান ধ্বংস করে। মিথ্যা-আস্থা ধ্বংস করে। চিন্তা- জীবন ধ্বংস করে। পরনিন্দা- আমল ধ্বংস করে। ন্যায় বিচার- জুলুম ধ্বংস করে। সদকা- বালা মসিবত ধ্বংস করে। নেশা- শরীর ধ্বংস করে। অশ্লীলতা- চরিত্র ধ্বংস করে।

শিশুদের মনে শিক্ষা জীবনের শুরু এ বিষয়গুলো শিখিয়ে দিতে পারলে তার জীবন সুন্দরের পথে পরিচালিত হবে। তার মেধা-মনন গড়ে উঠবে শালীনভাবে। 


 

82
কুরবানীর ফজিলত,করণীয় ও বর্জনীয়ঃ

আমরা যে কুরবানী করি তা হযরত ইবরাহীম (আ.) থেকে প্রাপ্ত প্রিয় জিনিস আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার নমূনা। এজন্য আল-হাদীসে কুরবানীকে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সুন্নাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণিত আছে,

وعَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ؟ قَالَ سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ قَالُوا فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ! قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ قَالُوا فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ! قَالَ بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنْ الصُّوفِ حَسَنَةٌ”  رواه أحمد والترمذي وابن ماجه

“হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এর সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কুরবানী কী? উত্তরে নবীজি ইরশাদ করলেন, কুরবানী তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.) এর সুন্নাত, তারা বললেন এতে আমাদের কী ফজিলত? নবীজি বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তারা বললেন, ছুফ এর জন্যও কি? নবীজি জবাব দিলেন, ছুফ (অধিক পশম বিশিষ্ট পশু) এর জন্য নেকী রয়েছে।” (সূনান ইবনে মাজাহ)

কুরবানীর ফযীলত:

(ক) কুরবানী দাতা নবী ইব্রাহীম (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.)- এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।

(খ) পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানী দাতা আল্লাহ রাববুল ‘আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :-

لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧ الحج: ٣٧

আল্লাহর নিকট পৌছায় না উহার গোশত এবং রক্ত, বরং পৌছায় তোমাদের তাক্বওয়া। এ ভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়নদেরকে। [সূরা হজ্জ্ব:৩৭]।

কুরবানীর দিনে সবচেয়ে প্রিয় কাজ পশু কুরবানী করা। কুরবানীর পশুর রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

 عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ قَالَ : مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلاً أَحَبَّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ ، مِنْ هِرَاقَةِ دَمٍ ، وَإِنَّهُ لَتَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، بِقُرُونِهَا ، وَأَظْلاَفِهَا ، وَأَشْعَارِهَا ، وَإِنَّ الدَّمَ ، لَيَقَعُ مِنَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ ، بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الأَرْضِ ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا.

“হযরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোন আমল আল্লাহর কাছে নেই। ঐ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, ক্ষুর, পশমসমূহ নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। কুরবানীর রক্ত জমিনে পতিত হবার পূর্বেই তা আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কুরবানির দ্বারা নিজেদের নফসকে পবিত্র কর।” (সূনান ইবনে মাজাহ)

আল-কুরআনের এ আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে জানা যায়, পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানীদাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন করেন। এবং পশু কুরবানী করার বারাকা হিসেবে যে পশু যবেহ করা হয় তার গায়ের পশম সমপরিমান বা তার পাঁচগুন সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়। আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ ، حَسَنَةٌ قَالُوا : فَالصُّوفُ ؟ يَا رَسُولَ اللهِ ، قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ ، حَسَنَةٌ

“সাহাবীরা বললেন এতে আমাদের কী ফজিলত? নবীজি বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব। তারা বললেন, ছুফ এর জন্যও কি? নবীজি জবাব দিলেন, ছুফ (অধিক পশম বিশিষ্ট পশু) এর জন্য নেকী রয়েছে।” (সূনান ইবনে মাজাহ)

(গ) পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দান। আর এটা অন্য এক ধরনের আনন্দ যা কুরবাণীর গোশতের পরিমাণ টাকা যদি আপনি তাদের সদকা দিতেন তাতে অর্জিত হত না। কুরবানী না করে তার পরিমাণ টাকা সদকা করে দিলে কুরবানী আদায় হবে না। কুরবানীর ফজীলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলোর উপর আল্লাহ আমাদের  আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি:

কুরবানী করা আল্লাহর এক ইবাদত। আর কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, কোন নেক আমল, সালেহ বা ভাল হয় না, কিংবা গৃহীত ও নৈকট্যদানকারী হয় না; যতক্ষণ না তাতে প্রাথমিকভাবে ( যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত) দু‘টি শর্ত পূরণ হয়েছে:

প্রথমত: ‘ইখলাস’, অর্থাৎ তা যেন খাটি আল্লাহরই উদ্দেশ্যে হয়। তা না হলে তা আল্লাহর নিকটে কবূল হবে না। যেমন কাবীলের নিকট থেকে কুরবানী কবুল করা হয়নি এবং তার কারণ স্বরূপ হাবীল বলেছিলেন,

إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧المائ‍دة: ٢٧

অর্থাৎ ‘আল্লাহ তো মুত্তাক্বী (পরহেযগার ও সংযমী)দের কুরবানীই কবূল করে থাকেন। [ সূরা মায়িদা (৫):২৭]।

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,

لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧ الحج: ٣٧

অর্থাৎ, ‘আল্লাহর কাছে ওগুলোর (কুরবানীর পশুর) না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। [সূরা হাজ্জ (২২):৩৭]

দ্বিতীয়ত : তা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। [সূরা কাহফ:১১০]।

সুতরাং যারা কেবল বেশী করে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী দেয় অথবা লোক সমাজে নাম কুড়াবার উদ্দেশ্যে মোটা-তাজা অতিরিক্ত মূল্যের পশু ক্রয় করে এবং তা প্রদর্শন ও প্রচার করে থাকে তাদের কুরবানী যে ইবাদত নয়- তা বলাই বাহুল্য। গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে বলেই লোকে একই মূল্যের একটি পূর্ণ পশু কুরবানী না করে একটি ভাগ দিয়ে থাকে। ফলে, একটি ছাগল দিলে দু‘দিনেই শেষ হয়ে যাবে। লোকেরা ছেলে-মেয়েরা খাবে, আর আমার ছেলে-মেয়েরা তাকিয়ে ও দেখবে? উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট।

তবে, বাহ্যিকভাবে কুরবানী শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে:

(১) এমন পশু দ্বারা কুরবানী দিতে হবে যা শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। অর্থাৎ কুরবানীর পশু যেন সেই শ্রেণী বা বয়সের হয় যে শ্রেনী ও বয়স শরীয়ত নির্ধারিত করেছে। সেগুলো হলো উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এগুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আন‘আম।’ যেমন এরশাদ হয়েছে-

وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ الحج: ٣٤

আমি প্রত্যেক সম্প্রদাযের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ [সূরা হজ্জ্ব(২২):৩৪]

হাদিসে এসেছে-

عن جابر رضى الله عنه قال:قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لا تذبحوا إلا مسنة إلا أن تعسر عليكم فتذبحوا جذعة من الضأن

‘তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কুরবানী করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কুরবানী করতে পার।’ [মুসলিম, হাদীস নং ১৯৬৩]।

আর আল্লাহর রাসূল (সা.) উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া অন্য লোক জন্তু কুরবানী করেননি ও কুরবানী করতে বলেননি। তাই কুরবানী শুধু এগুলো দিয়েই করতে হবে। ইমাম মালিক (রহ.) এর মতে কুরবানীর জন্য সর্বোত্তম জন্তু হলো শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ রাসূলে কারীম (সা.) এ ধরনের দুম্বা কুরবানী করেছেন বলে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে। অধিকাংশ উলামাদের মতে, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কুরবানীর পশু হলো উট, অতঃপর গরু, তারপর মেষ (ভেড়া), তারপর ছাগল। আবার নর মেষ মাদী মেষ অপেক্ষা উত্তম। যেহেতু এ প্রসঙ্গে দলীল বর্ণিত হয়েছে। (আযওয়াউল বায়ান, ৫/৬৩৪)।

একটি উট ও গরু-মহিষে সাত ব্যক্তি কুরবানীর জন্য শরীক হতে পারে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩১৮) অন্য এক বর্ণনামতে, উট কুরবানীতেও দশ ব্যক্তি শরীক হতে পারে। ইমাম শাওকানী বলেন, হজ্জের কুরবানীতে দশ এবং সাধারণ কুরবানীতে সাত ব্যক্তি শরীক হওয়াটাই সঠিক। (নায়লুল আওত্বার, ৮/১২৬)

 যেমন হাদিসে এসেছে-

عن جابر رضى الله عنه أنه قال: «نحرنا بالحديبية مع النبي صلى الله عليه وسلم البدنة عن سبعة والبقرة عن سبعة »

‘আমরা হুদায়বিয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে ছিলাম। তখন আমরা উট ও গরু দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছি।’ (ইবনে মাজা-৩১৩২, হাদিসটি সহীহ)।

কিন্তু মেষ বা ছাগলে ভাগাভাগি বৈধ নয়। তবে সওয়াবে একাধিক ব্যক্তিকে শরীক করা যাবে। সুতরাং একটি পরিবারের তরফ থেকে মাত্র একটি মেষ বা ছাগল যথেষ্ট হবে। তাতে সেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা যতই হোক না কেন। এ বিধানটি সফরের অবস্থায় প্রযোজ্য। গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হলো কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া।

(২) শরীয়তের দৃষ্টিতে কুরবানীর পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দু‘বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের। অবশ্য অসুবিধার ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়সী মেষ কুরবানী করা যায় । প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘দাতালো ছাড়া যবেহ করো না। তবে তা দুর্বল হলে ছয় মাসের মেষ যবেহ কর।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৬৩)

কিন্তু উলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, ছ‘মাস বয়সী মেষের কুরবানী সিদ্ধ হবে; তা ছাড়া অন্য পশু পাওয়া যাক অথবা না যাক। অধিকাংশ উলামাগণ ঐ হাদীসের আদেশকে ‘ইস্তিহবাব’ (উত্তম) বলে গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন যে, ঐ হাদীসের মর্মার্থ এটা নয় যে, অন্য কুরবানীর পশু পাওয়া গেলে তবেই ছ‘মাস বয়সের মেষশাবকের কুরবানী বৈধ।যেহেতু এমন অন্যান্য দলীলও রয়েছে যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঐ বয়সী মেষেরও কুরবানী বৈধ; প্রকাশ থাকে যে, যদিও কুরবানীদাতা অন্য দাতালো পশু পেয়ে থাকে। যেমন রাসূল (সা.) বলেন, ছ‘মাস বয়সী মেষশাবক উত্তম কুরবানী। (মুসনাদে আহমাদ, ২/৪৪৫; তিরমিযী)

উক্ববা বিন আমের (রা.) বলেন, (একদা) নবী (সা.) কুরবানীর পশু বিতরণ করলেন। উক্ববার ভাগে পড়ল এক ছ‘মাসের মেষ। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগে ছ‘মাসের মেষ হলো?’ প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘এটা দিয়েই তুমি কুরবানী কর।’ (সহীহ বুখারী , হাদীস নং ২১৭৮; সহীহ মুসলিম, ১৯৬৫)।

(৩) কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে-

عن البراء بن عازب رضى الله عليه وسلم قال: « قام فينا رسول الله صلى الله وسلم فقال:أربع لا تجوز في الأضاحي العوراء البين عورها والمريضة البين مرضها والعرجاء البين ضلعها والكسيرة التي لا تنقى »

সাহাবী বারা ইবনে আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেন : চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না। অন্ধ. যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত; যার কোন অংগ ভেংগে গেছে। নাসাঈ‘র বর্ণনায় ‘আহত’ শব্দের স্থলে ‘পাগল’ উল্লেখ আছে। (তিরমিজি-১৫৪৬; নাসাঈ’-৪৩৭১; আবূদাউদ; হাদিসটি সহীহ)।

অতএব এ চারের কোন এক ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কুরবানী সিদ্ধ হয় না। ইবনে কুদামাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে কোন মতভেদ আছে কিনা তা আমরা জানি না।’ (মুগনী, ১৩/৩৬৯)

ত্রুটিগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো:

১. স্পষ্ট কানা (এক চক্ষু অন্ধ): যে পশুর একটি চক্ষু নষ্ট হয়ে গেছে অথবা বেরিয়ে আছে । দৃষ্টিহীন হলে তো অধিক ত্রুটি হবে। তবে যে পশুটির চক্ষু সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু নষ্ট হয়নি, সেটির কুরবানী সিদ্ধ হবে। কারণ, তা স্পষ্ট কানা নয়।

২. স্পষ্ট রোগের রোগা : যে পশুর ওপর রোগের চি‎হ্ন প্রকাশিত। যেটি চলতে অথবা খেতে পারে না; যার দরুন দুর্বলতা ও মাংসবিকৃতি হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে, চর্মরোগও একটি ত্রুটি, যার কারণে চর্বি ও মাংস খারাপ হয়ে থাকে। তেমটি স্পষ্ট ক্ষত একটি ত্রুটি,যদি তার ফলে পশুর ওপর কোন প্রভাব পড়ে থাকে। তবে, গর্ভধারণ কোন ত্রুটি নয়। তবে গর্ভপাত বা প্রসবের টিকটবর্তী পশু একপ্রকার রোগ গ্রস্থতা এবং তা একটি ত্রুটি। যেহেতু গাভীন পশুর গোশত অনেকের নিকট অরুচিকর, সেহেতু জেনেশুনে তা ক্রয় করা উচিত নয়। অবশ্য কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট বা ক্রয় করার পর গর্ভের কথা জানা গেলে তা কুরবানীরূপে যথেষ্ট হবে। বাচ্চা মৃত হলে যবেহ না করেই খাওয়া যাবে। কেননা, মায়ের যবে হতে সেও হালাল হয়ে যায়। (আহমাদ, আবু দাউদ , তিরিমযী, ইবনু মাজাহ, ইবনে হিববান, হাকেম, দাবা কুত্বনী, ত্বাবারীনী, সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৩৪৩১)।

৩. দুরারোগ্য ভগ্নপদ।

৪. দুর্বলতা ও বার্ধক্যের কারণে যার চর্বি ও মজ্জা নষ্ট অথবা শুষ্ক হয়ে গেছে।

উপরে উল্লেখিত হাদীসে মোট চারটি ত্রুটিযুক্ত পশুর কুরবানী সিদ্ধ নয় বলে বর্ণিত হয়েছে এবং বাকী অন্যান্য ত্রুটির কথা বর্ণনা করা হয়নি। কিন্তু অধিকাংশ উলামাগণের মতে, যদি ঐ ত্রুটিসমূহের অনুরূপ বা ততোধিক মন্দ ত্রুটি কোন পশুতে পাওয়া যায় তাহলে তাতেও কুরবানী সিদ্ধ হবে না; যেমন- দুই চক্ষু অন্ধ বা পা কাটা প্রভৃতি। (শরহুন নববী, ১৩/২৮)

খাত্ত্বাবী (রাহ.) বলেন, হাদীসে এ কথার দলীল রয়েছে যে, কুরবানীর পশুতে স্পষ্ট খঞ্জ।’ অতএব ঐ ত্রুটির সামান্য অংশ অস্পষ্ট হবে এবং তা মার্জনীয় ও অধর্তব্য হবে। (মাআলিমুস সুনান, ৪/১০৬)।

পক্ষান্তরে, এমন কতগুলো ত্রুটি আছে যা থাকলে কুরবানী আদায় হয় কিন্তু তা মাকরূহ বলে বিবেচিত হয়। তাই এ জাতীয় ত্রুটি থেকেও কুরবানীর পশুকে মুক্ত করা উত্তম।

যে ত্রুটিযুক্ত পশুর কুরবানী মাকরূহ হবে তা হলো:

• কান কাটা বা শিং ভাংগা :

এ ত্রুটিযুক্ত পশুর কুরবানী মাকরূহ। তবে আদায় হয়ে যাবে। কারণ, এতে মাংসের কোন ক্ষতি বা কম হয় না এবং সাধারণত এমন ত্রুটি পশুর মধ্যে বেশী পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কিন্তু যে পশুর জন্ম থেকেই শিং বা কান নেই তার দ্বারা কুরবানী মাকরূহ নয়। যেহেতু ভাঙ্গা বা কাটাতে পশুর রক্তাক্ত ও ক্লিষ্ট হয়; যা এক প্রকার রোগের মতো। কিন্তু জন্ম থেকে না থাকাটা এ ধরনের কোন রোগ নয়। অবশ্য পূর্ণাঙ্গ পশুই উত্তম।

• লেজ কাটা:

যে পশুর পূর্ণ অথবা কিছু অংশ লেজ কাটা গেছে তার কুরবানী মাকরূহ। ভেড়ার পুচ্ছে মাংসপিণ্ড কাটা থাকলে তার কুরবানী সিদ্ধ নয়। যেহেতু তা এক স্পষ্ট দাগ এবং সামান্য অংশ। অবশ্য এমন জাতের ভেড়া যার পশ্চাতে মাংসপিণ্ড হয় না তার দ্বারা কুরবানী শুদ্ধ।

• কান চিরা, দৈর্ঘ্যে চিরা, পশ্চাৎ থেকে চিরা, সম্মুখ থেকে প্রস্থে চিরা, কান ফাটা ইতাদি।

• লিঙ্গ কাটা। অবশ্য অণ্ডকোষ কাটা মাকরূহ নয়। যেহেতু খাসীর দেহ হৃষ্টপুষ্ট ও মাংস উৎকৃষ্ট হয়।

• দাঁত ভাঙ্গা ও চামড়ার কোন অংশ অগভীর কাটা বা চিরা ইত্যাদি।

(৪) যে পশুটি কুরবানী করা হবে তার উপর কুরবানী দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত্ব থাকতে হবে। অর্থাৎ কুরবানীদাতা যেন বৈধভাবে ঐ পশুর মালিক হয়। সুতরাং চুরিকৃত, আত্মসাৎ কৃত, বন্ধকী পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া, অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রীত পশু দ্বারা কুরবানী আদায় হবে না। একই ভাবে অবৈধ মূল্য যেমন সুদ, ঘুষ, প্রবঞ্চনা, ধোঁকা প্রভৃতির অর্থ) দ্বারা ক্রীত পশুর কুরবানী জায়েয নয়। যেহেতু কুরবানী এক ইবাদত যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয়। আর কুরবানীর পশুর মালিক হওয়ার ঐ সকল পদ্ধতি হলো পাপপূর্ণ। আর পাপ করার মাধ্যমে কোন প্রকার নৈকট্য লাভ সম্ভব নয়। বরং তাতে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ব্যতীত কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১৫)।

কুরবানীর পশু নির্ধারণে মুসলিম সবিশেষ যত্নবান হওয়া উচিত, যাতে পশু সর্বগুণে সম্পূর্ণ হয়। যেহেতু এটা আল্লাহর নিদর্শন ও তা‘যীমযোগ্য দ্বীনি প্রতিক সমূহের অন্যতম যা আত্মসংযম ও তাক্বওয়ার পরিচায়ক।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ الحج
٣٢
অর্থাৎ, ‘এটিই আল্লাহর বিধান এবং কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীর সম্মান করলে এতে তার হৃদয়ের তাক্বওয়া সঞ্জাত। [সূরা হাজ্জ:৩২]।

এতো সাধারণ দ্বীনী প্রতীকসমূহের কথা। নির্দিষ্টভাবে কুরবানীর পশু যে এক দ্বীনী প্রতীক এবং তার যত্ন করা যে আল্লাহর সম্মান ও তা‘যীম করার শামীল, সে কথা অন্য এক আয়াত আমাদেরকে নির্দেশ করে। মহান আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ (কুরবানীর)

وَٱلۡبُدۡنَ جَعَلۡنَٰهَا لَكُم مِّن شَعَٰٓئِرِ ٱللَّهِ لَكُمۡ الحج ٣٦

উটকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম করেছি। [সূরা হাজ্জ:৩৬]

এখানে কুরবানী পশুর তা‘যীম হবে তা উত্তম নির্বাচনের মাধ্যমে। ইবনে আববাস (রা.) প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘কুরবানী পশুর সম্মান করার অর্থ হলো, পুষ্ট, মাংস, সুন্দর ও বড় পশু নির্বাচন করা।’ (তাফসীরু ইবনু কাসীর, ৩৬/২২৯)

রাসূল (সা.) এর যুগে মুসলিমগণ দামী পশু কুরবানীর জন্য ক্রয় করতেন, মোটা-তাজা এবং উত্তম পশু বাছাই করতেন; যার দ্বারা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর তা‘যীম ঘোষণা করতেন। যা একমাত্র তাদের তাক্বওয়া, আল্লাহর প্রতি ভীতি ও ভালবাসা থেকে উদগত হতো। (ফতহুল বারী, ১০/০৯)

অবশ্য মুসলিমকে এ ক্ষেত্রে খেয়াল করা উচিত যে, মোটা-তাজা পশু কুরবানী করার উদ্দেশ্য কেবল উত্তম মাংস খাওয়া এবং আপোষে প্রতিযোগিতা করা না হয়। বরং উদ্দেশ্য আল্লাহর নিদর্শন ও ধর্মীয় এক প্রতীকের তা‘যীম এবং তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। কালো রঙ অপেক্ষা ধূসর রঙের পশু কুরবানী উত্তম। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কালো রঙের দু‘টি কুরবানী অপেক্ষা ধূসর রঙের একটি কুরবানী আল্লাহর নিকট অধিকতর পছন্দনীয়।’ (আহমাদ, হাকিম, সিলসিলাহ সহীহাহ, হাদীস নং ১৮৬১)

সুতরাং কুরবানীর পশু ক্রয়ের সময় ত্রুটিমুক্ত দেখা ও তার বয়সের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। যেহেতু পশু যত নিখুত হবে তত আল্লাহর নিকট প্রিয় হবে, সওয়াবেও খুব বড় হবে এবং কুরবানীদাতার আন্তরিক তাক্বওয়ার পরিচায়ক হবে।

কারণ আল্লাহ বলেন:

لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقۡوَىٰ مِنكُمۡۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمۡ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٣٧الحج: ٣٧

অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ওগুলোর (কুরবানীর পশুর) না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন, কাজেই সৎকর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। [সূরা হাজ্জ:৩৭]।


83
কুরবানীর ইতিহাস, উদ্দেশ্য ও কতিপয় বিধান

মহান আল্লাহ মানব জাতিকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি কিছু ইবাদত ফরজ করেছেন, আর কিছুকে ওয়াজিব সাব্যস্ত করেছেন। মুসলিমগণের উচিত একনিষ্ঠভাবে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সেগুলো সম্পন্ন করা। কুরবানী সে ধরনের একটি ইবাদত যার বিধান আদম (আ.) এর যুগ থেকেই চলে আসছে। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সঠিক ইতিহাস ও বিধানাবলী সম্পর্কে আমরা খুব কমই অবগত আছি। আলোচ্য নিবন্ধটি এ বিষয়ে আমাদের অনেক সহায়ক হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

কুরবানীর ইতিহাস :

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী: কুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা বলেন,

وَٱتۡلُ عَلَيۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَيۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانٗا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ يُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡأٓخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ المائ‍دة: ٢٧

অর্থাৎ, আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবূল করে থাকেন।[সূরা মায়িদা (৫):২৭]।

মূল ঘটনা হলো:

যখন আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন হাওয়া (আ.) এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীস (আ.) ব্যতিরেকে। কারণ, তিনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া আদম (আ.) এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.) এর শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় আদম (আ.) একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন।

ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল পরমা সুন্দরী। তার নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। সে ছিল কুশ্রী ও কদাকার। তার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরয়ী ‘নিয়মানুযায়ী হাবীলের সহোদরা কুশ্রী বোন কাবীলের ভাগে পড়ল। ফলে আদম (আ.) তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে তার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে বকাঝকা করলেন। তবুও সে ঐ বকাঝকায় কান দিল না। অবশেষে আদম (আ.) তার এ দু‘সন্তান হাবীল ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।’ সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত।

যাহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভাল ভাল মালগুলো বের করে নিয়ে বাজে মালগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হাবীল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবীলের কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। [ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, হাবীলের পেশকৃত দুম্বাটি জান্নাতে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে। অবশেষে ইসমাঈল যাবিহুল্লাহ (আ.) কে ঐ দুম্বাটি পাঠিয়ে বাঁচিয়ে দেয়া হয়।] আর কাবীলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হাবীলেরটি গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না। কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না।

অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। হাবীল বলেছিল, ‘ তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়? তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হাবীল কে হত্যা করে ফেলল। (তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

কুরআনে বর্ণিত হাবীল ও কাবীল কর্তৃক সম্পাদিত কুরবানীর এ ঘটনা থেকেই মূলত কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরবানী দাতা ‘হাবীল’, যিনি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্যে একটি সুন্দর দুম্বা কুরবানী হিসেবে পেশ করেন। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়। পক্ষান্তরে কাবীল, সে অমনোযোগী অবস্থায় কিছু খাদ্যশস্য কুরবানী হিসেবে পেশ করে। ফলে তার কুরবানী কবূল হয়নি। সুতরাং প্রমাণিত হলো কুরবানী মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবূল হয় না। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপরে এটা জারি ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُۥٓ أَسۡلِمُواْۗ وَبَشِّرِ ٱلۡمُخۡبِتِينَ ٣٤ الحج: ٣٤

অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিযিক নির্ধারণ করেছেন। [সূরা হাজ্জ (২২):৩৪]।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা নাসাফী ও যামাখশারী বলেন, ‘আদম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা তার নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছেন। (তাফসীরে নাসাফী ৩/৭৯; কাশশাফ, ২/৩৩)।

আদম (আ.) এর যুগে তারই পুত্র কাবীল ও হাবীলের কুরবানীর পর থেকে ইবরাহীম (আ.) পর্যন্ত কুরবানী চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে কুরবানীর ইতিহাস ততটা প্রাচীন যতটা প্রাচীন দ্বীন-ধর্ম অথবা মানবজাতির ইতিহাস। মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানী করার বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। তবে ঐসব কুরবানীর কোন বর্ণনা কোন গ্রন্থে পাওয়া যায় না। মূলত সেসব কুরবানীর নিয়ম-কানুন আমাদেরকে জানানো হয়নি।

বর্তমান কুরবানীর ইতিহাস :

পবিএ কুরআনে এসেছে- رَبِّ هَبۡ لِي مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ١٠٠ فَبَشَّرۡنَٰهُ بِغُلَٰمٍ حَلِيمٖ ١٠١ فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ ٱلسَّعۡيَ قَالَ يَٰبُنَيَّ إِنِّيٓ أَرَىٰ فِي ٱلۡمَنَامِ أَنِّيٓ أَذۡبَحُكَ فَٱنظُرۡ مَاذَا تَرَىٰۚ قَالَ يَٰٓأَبَتِ ٱفۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُۖ سَتَجِدُنِيٓ إِن شَآءَ ٱللَّهُ مِنَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٠٢ فَلَمَّآ أَسۡلَمَا وَتَلَّهُۥ لِلۡجَبِينِ ١٠٣ وَنَٰدَيۡنَٰهُ أَن يَٰٓإِبۡرَٰهِيمُ ١٠٤ قَدۡ صَدَّقۡتَ ٱلرُّءۡيَآۚ إِنَّا كَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٠٥ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ ٱلۡبَلَٰٓؤُاْ ٱلۡمُبِينُ ١٠٦ وَفَدَيۡنَٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِيمٖ ١٠٧ وَتَرَكۡنَا عَلَيۡهِ فِي ٱلۡأٓخِرِينَ ١٠٨ سَلَٰمٌ عَلَىٰٓ إِبۡرَٰهِيمَ ١٠٩ كَذَٰلِكَ نَجۡزِي ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١١٠ إِنَّهُۥ مِنۡ عِبَادِنَا ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١١١ [الصافات: ١٠٠، ١١١]

[ইব্রাহীম (আ.) যখন আমার কাছে দু‘আ করল] হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান কর। অতঃপর আমি তাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহীম বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবহ করছি, এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দু‘জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল আর ইবরাহীম তাকে কাত ক‘রে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইবরাহীম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি তাঁকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার মু‘মিন বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা আস- সাফফাত:১০০-১১১]।

ইবনে কাসীর (রাহ.) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জানান যে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহীম (আ.) যখন তার পিতৃভুমি থেকে হিজরত করলেন, তখন তিনি তার প্রভুর কাছে চেয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করেন। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এটা ছিল ইসমাঈলের (আ.) ব্যাপারে, কেননা তিনি ছিলেন ইব্রাহীমের (আ.) ঔরসে জন্ম নেয়া প্রথম সন্তান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দ্বীনের (ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলিম) অনুসারীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে ইব্রাহীমের ঘরে ইসমাঈলই প্রথম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (ইবনে কাসীরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৫৭-১৫৮)

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ ٱلسَّعۡيَ  অর্থাৎ ‘এবং যখন সে তার সাথে হাটার মত বড় হলো’- এর অর্থ হচ্ছে, যখন সে বড় হয়েছিল এবং তার বাবার মতই নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারত। মুজাহিদ (রাহ.) বলেন, ‘এবং যখন সে তার সাথে হাঁটার মত বড় হলো’ এর অর্থ হচ্ছে, যখন সে বড় হয়ে উঠেছিল এবং বাহনে চড়তে পারত, হাঁটতে পারত এবং তার বাবার মত কাজ করতে পারত। ফার্রা বলেন, যবহের সময় ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৩ বছর। ইবনু আববাস (রা.) বলেন, ঐ সময় তিনি কেবল সাবলকত্বে উপনীত হয়েছিলেন। (তাফসীর কুরতুবী, ১৫/৯৯)

এ রকম একটা অবস্থা যখন আসল, তখন ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন যে, তাঁকে তার ছেলেকে কুরবানী করার আদেশ দেয়া হচ্ছে। নবীদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী। তাদের চক্ষু মুদিত থাকলেও অন্তরচক্ষু খোলা থাকে। সুতরাং আল্লাহ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে, তার প্রিয়পুত্রকে কুরবানী করার আদেশ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, যে পুত্রকে তিনি তার বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েছিলেন। এবং তারপর শিশু অবস্থায় তাকে এবং তার মাকে মরুভুমিতে রেখে আসার আদেশ পেয়েছিলেন, এমন একটা উপত্যকায় যেখানে কোন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ ছিল না, কোন মানুষজন ছিল না, কোন বৃক্ষরাজি ছিল না এবং কোন পাখ-পাখালী বা পশুও ছিল না।

ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তাদের সেখানে রেখে আসলেন। আর আল্লাহ তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিযিক পাঠালেন। এত কিছুর পরেও, তার ঘরে প্রথম জন্ম নেয়া ও তার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী করার জন্য যখন আদেশ করা হলো, তিনি তখন তাঁর প্রভুর ডাকে সাড়া দিলেন এবং তার প্রভুর আদেশ মেনে, তিনি যা চেয়েছিলেন, তা করতে উদ্যত হলেন। তাই তিনি তার পুত্রকে ব্যাপারটা সম্বন্ধে বললেন- যেন সে শান্ত থাকে এবং জোর করে তাকে কুরবানী করতে না হয়।

‘হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি (আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য কুরবানী করছি)। তাহলে, তুমি কি মনে কর!’ ধৈর্যশীল ছেলেটি সাথে সাথেই জবাব দিল, ‘সে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। সে সবচেয়ে উত্তম জবাব দিল, এটাই ছিল তার পিতার প্রতি এবং মানব কুলের প্রভুর প্রতি বাধ্যতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আল্লাহ বলেন, فَلَمَّآ أَسۡلَمَا وَتَلَّهُۥ لِلۡجَبِينِ

‘তারপর তারা উভয়ে নিজেদেরকে (আল্লাহর ইচ্ছার কাছে) সমর্পণ করল, এবং সে তাকে তার পার্শ্বে উপর কাত অবস্থায় শুইয়ে দিল’ এখানে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা উভয়ে নিজেদেরকে সমর্পণ করল’- অর্থ হচ্ছে তারা দু‘জনে যখন নিজেদেরকে আল্লাহর আদেশের কাছে সমর্পণ করল। ‘এবং সে তাকে শুইয়ে দিল’- এর অর্থ হচ্ছে তিনি, তাকে ছেলেকে) মাটির দিকে মুখ করে রাখলেন। এখানে বলা হলো যে, তিনি তাকে পেছন থেকে যবেহ করতে চাইলেন, যেন তিনি যবেহ করার সময় তার মুখটা দেখতে না পান। এটা ছিল ইবনে আববাস (রা.), মুজাহিদ (রাহ.) এর মত।

তারা উভয়ে নিজেদের সমর্পণ করল’ এর অর্থ হচ্ছে ইব্রাহীম (আ.) বললেন, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ আর ছেলেটি বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ – কেননা সে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছিল। আস সুদ্দী এবং অন্যান্যরা বলেন যে, ইব্রাহীম (আ.) ছেলেটির গলদেশে ছুরি চালান, কিন্তু তা তাকে কাটেনি। এটা বলা হয়ে থাকে যে, ছুরি ও তার গলার মাঝখানে একটা তামার পাত রাখা হয়েছিল ( এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।) তারপর তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল যখন আল্লাহ বললেন,

قَدۡ صَدَّقۡتَ ٱلرُّءۡيَآۚ ١٠٥ الصافات: ١٠٥  হে ইব্রাহীম! তুমি তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছ!’- এর অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে, তোমাকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তোমার প্রভু তোমাকে যে আদেশ করেছেন, তা পালন করার ব্যাপারে তোমার ইচ্ছা ও আনুগত্য প্রমাণিত হয়েছে। তোমার পুত্রের পরিবর্তে বিকল্প কুরবানীর ব্যবস্থা করা হবে- যেমন ভাবে তুমি তোমার নিজের শরীরকে আগুনের শিখায় সমর্পণ করেছিলে এবং তোমার অতিথিদের সম্মান জানাতে তোমার সম্পদ খরচ করেছিলে, তা স্মরণ রেখে। তাই আল্লাহ বলেন,

إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ ٱلۡبَلَٰٓؤُاْ ٱلۡمُبِينُ ١٠٦ الصافات: ١٠٦ ‘নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা’- অর্থাৎ এটা যে একটা পরীক্ষা ছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট। নিঃসন্দেহে এখানে মূল উদ্দেশ্য যবেহ ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল পিতা-পুত্রের আনুগত্য ও তাক্বওয়ার পরীক্ষা নেওয়া। সে পরীক্ষায় উভয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন পিতার পূর্ণ প্রস্তুতি এবং পুত্রের স্বতঃস্ফুর্ত সম্মতি ও আনুগত্যের মাধ্যমে।

وَفَدَيۡنَٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِيمٖ ١٠٧ ﴾ [الصافات: ١٠٧ আমরা তাকে একটা বড় কুরবানী দিয়ে মুক্ত করলাম’- এর অর্থ হচ্ছে আমরা তার ছেলের মুক্তিপণের ব্যবস্থা করলাম, তার পরিবর্তে যবেহ করার জন্য বিকল্প হিসেবে । বেশিরভাগ আলিমের মতে, এটা ছিল শিং বিশিষ্ট খুব সুন্দর সাদা একটা ভেড়া। ইবনে আববাস (রা.) থেকে আস-সাওরী আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে খাইসাম, সাঈদ ইবনে জুবায়ের বর্ণনা করেন যে, ‘এটা ছিল এমন একটা ভেড়া যা চল্লিশ বছর ধরে জান্নাতে বেড়িয়েছে।

’ইবনে আববাস (রা.) থেকে এ রকম বর্ণনাও এসেছে যে, ঐ ভেড়ার শুকনো মাথাটা এখনই কা‘বা শরীফের দাদের [পানি নির্গমনের] পাইপ থেকে ঝুলে রয়েছে। কেবল এটা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যাকে কুরবানী করার কথা ছিল, তিনি ছিলেন ইসমাঈল (আ.)- কেননা তিনি মক্কায় বসবাস করতেন এবং আমরা এমন কখনো শুনিনি যে ইসহাক (আ.) তার ছেলেবেলায় কখনো মক্কায় এসেছিলেন, আর আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানে। (ইবনে কাসীরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৫৭-১৫৮)।

যাকে কুরবানী করার কথা ছিল তিনি ইসহাক্ব (আ.) নন; বরং তিনি ছিলেন ইসমাঈল (আ.), তার কারণগুলো উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ করেন যা নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করে যে, ইসমাঈল (আ.) এরই কুরবানী হওয়ার কথা ছিল। সেই বিষয়গুলো এ রকম:

• ইসমাঈল (আ.) ছিলেন তার প্রথম সন্তান, যার ব্যপারে ইব্রাহীম (আ.) – কে সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। মুসলিম ও আহলে কিতাবগণের ইজমা (ঐক্যমত্য) অনুসারে তিনি
হলেন ইসহাক্ব (আ.)- এর চেয়ে বড়। আহলে কিতাবগণের কিতাবসমূহে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা ইব্রাহীমকে (আ.) তার একমাত্র পুত্র কুরবানী দিতে আদেশ দিয়েছিলেন। এবং কোন কোন নথিতে আছে যে, তাকে তার প্রথম জন্ম নেয়া ছেলেকে কুরবানী দিতে বলা হয়েছিল।

• সাধারণত প্রথম ছেলে অন্যদের চেয়ে বেশী প্রিয় হয়ে থাকে, আর তাই তাকে কুরবানী করা আদেশ পরীক্ষার জন্য অধিকতর উপযোগী।

• এটা উল্লিখিত রয়েছে যে, এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং তাকেই কুরবানী করার আদেশ পরীক্ষার জন্য অধিকতর উপযোগী।

• এটা উল্লিখিত রয়েছে যে, এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং তাকেই কুরবানী করার কথা ছিল। এর পরে একই সূরায় ফেরেশতারা ইব্রাহীমের (আ.) কাছে ইসহাক্বের সুসংবাদ নিয়ে আসলেন, তারা বললেন, قَالُواْ لَا تَوۡجَلۡ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَٰمٍ عَلِيمٖ ٥٣ ال٥٣  আমরা আপনাকে একটি পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি যার অনেক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকবে।’ [সূরা হিজর: ৫৩]।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন وَٱمۡرَأَتُهُۥ قَآئِمَةٞ فَضَحِكَتۡ فَبَشَّرۡنَٰهَا بِإِسۡحَٰقَ وَمِن وَرَآءِ إِسۡحَٰقَ يَعۡقُوبَ  আমরা তাকে (সারাকে) ইসহাক্বের সুসংবাদ দিলাম এবং তার পরে ইয়া‘কূবের সুসংবাদ দিলাম।’ [সূরা হুদ (১১):৭১]

এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, ইয়া‘কূব বলে একজন শিশুর জন্ম হবে তাদের (সারা এবং ইসহাক্বের) জীবদ্দশায় এবং তার থেকে অনেক বংশ বিস্তার লাভ করবে এবং এটা সঠিক শোনায় না যে, ইব্রাহীমকে সেই ইসহাক্বকেই কুরবানী করতে বলা হবে যখন তিনি ছোট ছিলেন তখন, কেননা আল্লাহ অঙ্গীকার করেছেন যে তার অনেক বংশধর থাকবে।

• ইবরাহীম (আ.) এর বয়স যখন ৮৬ বৎসর তখন ইসমাঈল বিবি হাজেরার গর্ভে এবং যখন ৯৯ তখন বিবি সারার গর্ভে ইসহাক্ব জন্মগ্রহণ করেন। ইবরাহীম (আ.) সর্বমোট ২০০ বছর বেঁচে ছিলেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/১৬, মুয়াত্তা, তাফসীরে কুরতুবী, ২/৯৮-৯৯)।

• এখানে সূরা সাফফাতে ইসমাঈলকে ধৈর্যশীল বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যা এই পটভুমিতে যথার্থ। (তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/১৫) আর আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।

রাসূল (সা.) এর নবূয়্যতের সমসাময়িক সময়ের ইয়াহুদীরা জানত যে, আরব ভুমিতে একজন নবী আসছেন এবং তারা তার জন্য রীতিমত অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু তিনি যেহেতু ইসহাক্ব (আ.) থেকে বিস্তৃত বণী ইসরায়েলের বংশধারায় জন্মগ্রহণ না করে, ইসমাঈল (আ.) এর বংশধারায় জন্মগ্রহণ করলেন- তখন তারা তা সহ্য করতে পারল না।

84
জামাতে নামাজ আদায়ের প্রতিদান

ইসলামের প্রতিটি বিধানেই দুনিয়া-আখেরাতের অসংখ্য কল্যাণ নিহিত আছে। ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত প্রতিটি হৃদয় সেসব কল্যাণ উপলব্ধি ও অবলোকন করে। মুমিনের জীবনে ঈমানের পর আবশ্যকীয় একটি বিধান হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। নামাজ আদায়ের পদ্ধতিগত বিধান হচ্ছে জামাতে আদায় করা। এই বিধানটিরও তাগিদের সঙ্গে বহুবিধ প্রতিদানের কথা হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে। জামাতে নামাজ আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। ইরশাদ হয়েছে, তোমরা রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর।’ (সুরা বাকারা : ৪৩)।

অর্থাৎ জামাতে নামাজ আদায়কারীদের সঙ্গে নামাজ আদায় কর। নবীজি (সা.) সারা জীবন জামাতে নামাজ আদায় করে দেখিয়েছেন, নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সারা জীবন জামাতের সঙ্গেই নামাজ আদায় করেছেন। এমনকি ইন্তেকালপূর্ব অসুস্থতার সময়ও জামাত ছাড়েননি। সাহাবায়ে কেরামের পুরো জীবনও সেভাবে অতিবাহিত হয়েছে। (বুখারি : ৬৪৪)।

পুরুষের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই জামাতে আদায় করা সুন্নাতে মুআক্কাদা, যা ওয়াজিবের সঙ্গে তুলনীয়। অর্থাৎ এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি। (মুসলিম : ১০৯৩)।

শরিয়ত অনুমোদিত কোনো ওজর বা অপারগতা ছাড়া জামাতে শরিক না হওয়া বৈধ নয়। যে ব্যক্তি জামাত ত্যাগে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে গুনাহগার হবে। (আবু দাউদ : ৪৬৪)

নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ের অভূতপূর্ব প্রতিদানের সুসংবাদ রয়েছে হাদিস ভান্ডারে। জামাতে নামাজ আদায়ে প্রতি রাকাতে ২৭ রাকাতের সওয়াব লাভ হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে নামাজের ফজিলত একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি।’ (মুসলিম : ১৪৭৭)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে প্রতি কদমে নেকি লাভ হয় এবং গুনাহ মাফ হয়। সঙ্গে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে পবিত্রতা লাভ করে মসজিদে এসে নামাজ আদায় করে তার প্রতি কদমে একটি নেকি দেওয়া হয়। একটি করে গুনাহ মাফ করা হয়। একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। (মুসলিম : ১০৯৩)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে সারা দিন আল্লাহর হেফাজতে থাকা যায়। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে, সে আল্লাহর হেফাজতে থাকে। আল্লাহর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে যে কষ্ট দেবে, আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ২/২৯)।

জাহান্নাম ও মুনাফেকি থেকে মুক্তির সনদ লাভ করে জামাতে নামাজ আদায়কারী। হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত প্রথম তাকবিরের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে দুটি পুরস্কার দান করবেন। এক. জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। দুই. মুনাফিকের তালিকা থেকে তার নাম কেটে দেবেন। (তিরমিজি : ২৪১)

বিনা ওজরে জামাত পরিত্যাগকারীর নিন্দায় নবীজি কঠোর কথা বলেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার প্রাণ যার হাতে, তার শপথ করে বলছি, আমার ইচ্ছা হয় আমি কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দেই আর নামাজের আজান দেওয়ার জন্য হুকুম দেই। তারপর আমি এক ব্যক্তিকে হুকুম করি, যেন সে মুসল্লিদের নামাজের ইমামতি করে। আর আমি ওই সব লোকদের দিকে যাই, যারা নামাজের জামাতে হাজির হয়নি এবং তাদের বাড়িঘরগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেই।’ (বুখারি : ৬১৮)

তবে কিছু কিছু অপারগতার কারণে জামাতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি আছে। যথা মুষলধারে বৃষ্টি হলে। রাস্তায় বেশি কাদা হলে। অতি আঁধার হলে। রাতে যদি অতিমাত্রায় মেঘ হয়। অসুস্থ হলে। দৃষ্টিহীন ব্যক্তির জন্য। এমন বৃদ্ধ, যিনি মসজিদে আসতে সক্ষম নন। কোনো রোগীর সেবাই আত্মনিয়োজিত থাকলে। ঘন ঘন প্রস্রাব-পায়খানার বেগ হলে। এক পা বা উভয় পা কর্তিত হলে। এমন রোগ হওয়া, যার কারণে চলতে অক্ষম, যেমন অর্ধাঙ্গ রোগ ইত্যাদি। প্রচণ্ড ঠান্ডা, ঘর থেকে বের হলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে জামাতে শরিক না হওয়ার অবকাশ আছে। খাবার সামনে, সেও ক্ষুধার্ত, মনের আকর্ষণ খাবারের দিকে এমন অবস্থায় জামাতে না গেলেও চলবে। সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। জামাতে নামাজ আদায় করতে গেলে কোনো সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে জামাত ত্যাগ করতে পারবে। জামাতে যাওয়ার কারণে ট্রেন, ফ্লাইট বা গাড়ি চলে যাওয়ার আশঙ্কা হলে জামাতে শরিক না হওয়ার অনুমতি আছে। (বুখারি : ১১২৬, ৬২৬, ৬২৭; বদরুল মুনির : ৪/৪১৯; জমউল জাওয়ামে : ১/৩০৫৮; মুসনাদে আহমাদ : ৫৩০২; আবু দাউদ : ৪৬৪)

নারীদের জন্য সর্বোতভাবে মসজিদের চেয়ে ঘরে নামাজ আদায় করাই উত্তম। আব্দুল্লাহ বিন সুয়াইদ আল আনসারী (রা.) তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু হুমাইদ আস সায়িদীর স্ত্রী রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তো আপনার সঙ্গে নামাজ পড়তে পছন্দ করি। তখন নবীজি (সা.) বললেন, আমি জেনেছি যে, তুমি আমার সঙ্গে নামাজ পড়তে পছন্দ কর। অথচ তোমার জন্য তোমার বসবাসের গৃহে নামাজ পড়ার চেয়ে তোমার একান্ত রুমে নামাজ পড়া উত্তম। আর তোমার বাড়িতে নামাজ পড়ার চেয়ে তোমার বসবাসের গৃহে নামাজ পড়া উত্তম । আর তোমার এলাকার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে তোমার বাড়িতে নামাজ পড়া উত্তম। আর আমার মসজিদে (মসজিদে নববীতে) নামাজ পড়ার চেয়ে তোমার এলাকার মসজিদে নামাজ পড়া উত্তম। তারপর তিনি আদেশ দিলেন তার গৃহের কোণে একটি রুম বানাতে। আর সেটিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেললেন। তারপর সেখানেই তিনি নামাজ পড়েন মৃত্যু পর্যন্ত। (ইবনে খুজাইমা : ১৬৮৯; ইলাউস সুনান : ৩/২৬)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সহিত আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন!


85
সন্তান কিভাবে ভালো মানুষ হবে, সেক্ষেত্রে পিতা-মাতার দায়িত্ব

যতদিন পর্যন্ত সন্তানের জ্ঞান বুদ্ধি পরিপক্ক না হয়, ততদিন পর্যন্ত তাদেরকে শাসন করা এবং কঠোরতার মধ্যে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যখন সন্তান জ্ঞান বুদ্ধিতে পরিপক্ক হয় এবং ভালো মন্দ বুঝতে পারে, যুক্তি ও জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে কাজকর্ম করতে পারে তখন যদি কোন বাবা মা কঠোরতা করতে যায় তবে সেই সন্তান নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করবে এবং পিতা-মাতার সাথেও তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। যা বর্তমান সময়ে অহরহ আমাদের সামনে ঘটেই চলছে। এই জন্যে সন্তান ছোট থাকতেই তাকে যতদূর সম্ভব কঠোরতা আর শাসন করা প্রয়োজন।

খুবই দুঃখ লাগে যখন এমন অনেক পিতা-মাতাকে দেখি যারা দুনিয়ার কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু সন্তানের ব্যাপারে অত্যন্ত বেখেয়াল। এটা ভাবতে থাকে যে, সন্তান যখন বড় হবে তখন হয়তো সব শিখে যাবে। কিন্তু না। সন্তানকে শেখানোর দায়িত্ব পিতা-মাতার। আর সেটা ছোট বেলা থেকেই। কারণ পিতা-মাতাই তার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। আবার অনেকে আছে তারা অন্যের কাছে অনেক উত্তম চরিত্র পেশ করে এবং মানুষকে ভালো পরামর্শ দেয়। কিন্তু নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে তারা এই সকল জিনিস ভুলে যায়। কিভাবে নিজের সন্তানদেরকে ভালো উপদেশ দিতে হবে, কিভাবে তাদেরকে সঠিক পথে আনতে হবে, তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে আর কিভাবে সন্তানের আবদার পূরণ করতে হয় সেটা পর্যন্ত ভুলে যায়। যা কিনা অত্যন্ত মর্মন্তুদ ব্যাপার। ইসলাম ধর্মে সন্তান আর স্ত্রীর ব্যাপাওে অত্যন্ত কঠোর পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- পরিবার-পরিজনের হক আদায়ের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। অথচ এসব চিন্তা-ভাবনা আমাদের মাথা থেকেই উধাও হয়ে যায়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার পিতা-মাতারা নিজেরা বা নিজেদের জন্যে যা ভালো মনে করেন সেটাই নিজেদের সন্তানদের উপর প্রয়োগ করতে চান। তারা নিজের সন্তানের পরিস্থিতি একটুও বুঝবার চেষ্টা করেন না। তারা এটা জানার চেষ্টা করেন না যে, পৃথিবী এখন কতটা এগিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে পুরো পৃথিবী যেই দিক থেকে এগিয়ে গিয়েছে এবং সকল মিডিয়াতেও এর প্রচারণা হচ্ছে, তা হচ্ছে ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’। আল্লাহ্ তা’আলাও মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিয়েছেন। পিতা-মাতা যদি পরিবারের ক্ষেত্রে দ্বীন দুনিয়ার খবর না রেখে নিজের ইচ্ছাকে সন্তানের উপর চাপিয়ে দিতে চান তাহলে এর পরিণাম হয় খুবই খারাপ। এতে সেই সন্তানের জীবনটাই নষ্ট হয় শুধুমাত্র এই পিতা-মাতার কারণে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজের পরিবারের কাছে ভালো। (তিরমিজি, হাঃ ৩৮৯৫)

আল্লাহর রাসুল (সা.) এর এই কথাটি সবসময় মনে রেখে চলবেন- সবার আগে নিজের পরিবারের বিশেষ করে সন্তানের মানসিক পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করবেন এবং সেই অনুযায়ী আহবান জানাবেন। আপনার উচিৎ ভালো কাজের আহবান পৌঁছে দেওয়া, জোর জবরদস্তি করা নয়। যদি আপনার কথা সঠিক হয় তবে আপনার সন্তানকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন। কিন্তু জোর করার অধিকার আপনার নেই। কারণ জোর করা যায় পশুর সাথে, মানুষের সাথে নয়।

প্রিয় ভায়েরা এবং বোনেরা, এবার আসি একটু গোড়ার কথায়। সন্তান গর্ভে যাওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন। আব্দুল কাদির জিলানীর ঘটনা পড়ুন। কেন আব্দুল কাদির জিলানীর পিতা-মাতার মধ্যে শিক্ষা রয়েছে তা জানুন। অনেক শিক্ষা রয়েছে। ইসলাম-ই শান্তি। বাকি সব অশান্তি। সন্তান যখন গর্ভে পিতা এবং মাতা দুজনেই সকল অন্যায় কাজ করা ছেড়ে দিন। বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকতে থাকুন। মনে রাখবেন ওই সন্তান-ই আপনার সাদকায়ে যারিয়া। আবার ওই সন্তান-ই আপনার জাহান্নামে যাওয়ার হাতিয়ার। সন্তান জন্মের সাথে সাথে কিছু হক রয়েছে। সেগুলো যথাযথ ভাবে পালন করুন। বড় হতে হতে আল্লাহর বিধান সমূহ পালনের ব্যাপারে তাকে জানান। এই ক্ষেত্রে ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর কথোপকথন বার বার মনে রাখুন। সন্তানকে একবার ভালো কথা বলেই মনে করবেন না যে, আপনি সব কাজ সেরে ফেলেছেন। আসলে আপনার কাজ তো শুরু মাত্র। আপনি পিতা, আপনি মাতা। আল্লাহর সাহায্য বার বার প্রত্যাশা করুন। মেয়ে সন্তান হলে ছোট থেকেই পর্দা করার ব্যবস্থা করুন। সন্তান আপনার, আর আপনি যদি বলেন, ওরে এত বলি তা শোনে না। এই কথার মাধ্যমে আপনার মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব এর দায় আপনি কখনোই এড়াতে পারবেন না। কারণ ছোট বেলাতেই যদি সে আপনার কথা না শোনে নিশ্চিতভাবে বড় হলে আর শুনবেই না বরং বিগড়ে যাবে। বার বার বলছি, আপনার সন্তানকে আদব-কায়দা শেখাতে কখনোই আজ থাক, কাল ঠিক হয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশা কখনোই করবেন না।

আপনার পরিবারকে আপনি নিজের কাছে টেনে নিন। সে তো আপনার সন্তান। আপনার কথা তারা যদি না শুনতে চায় তবে কার কথা শুনবে.?? তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা অর্থাৎ পিতা-মাতারা ভালো হওয়ার চেয়ে সন্তানদেরকে ভালো বানানোর বেশি চেষ্টা করি। যা কি না আদৌ সম্ভব নয়। কারণ আপনার সন্তান আপনাকে ২৪ ঘন্টা চোখে চোখে রাখে। আপনি কি করেন, কিভাবে অন্যের সাথে কথা বলেন, আপনি কিভাবে রাগকে হজম করেন, কিভাবে আপনি মানুষকে আপন করে নেন, মানুষের সাথে কিভাবে ব্যবহার করেন- সব, সবকিছু। তাহলে আপনি কতটুকু সিরিয়াস হবেন আপনার আচরণের ক্ষেত্রে, এবার সেটা নিশ্চই আপনাকে আর বোঝানো লাগবে না।

একটি কথা শুনুন, সন্তান কথা না শুনতে পারে। তাকে বার বার বিভিন্ন পদ্ধতিতে বোঝানোর চেষ্টা করুন। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই, অবশ্যই, তাকে দূরে সরিয়ে দিবেন না। এটা সত্যি খুবই দুঃখজনক যে কিছু পুরুষ-মহিলা সমাজের মানুষের সাথে খুব ভালো আচরণ দেখায় আর খুব সুন্দর চরিত্র ফুটিয়ে রাখে কিন্তু নিজের পরিবারের সাথে জঘন্য-নোংরা আচরণ করেন। তাদের মুখের কথায় কথায় গালি বের হয় আর কিছু থেকে কিছু হলেই তারা স্ত্রী সন্তানের গায়ে হাত তুলতেও পিছু হটেন না। তারা মনে করেন আল্লাহ তাদেরকে দারোগা করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। আর তারা মনে করে এইভাবে শাসন করে সে ভালো কাজ করছে। কিন্তু, না প্রিয় ভাই এবং বোনেরা। আপনার কাজ ভালো কথাগুলো আপনার পরিবারের মধ্যে বলা আর আপনার নিজেকেও সেই মতাদর্শ অনুযায়ী গড়ে তোলা। জুলুম করা আপনার কাজ নয়।

মনে রাখবেন আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) কে পর্যন্ত একথা বলেছেন যে, ‘হে রাসূল! আপনি তাদেরকে উপদেশ দিন, আপনি কেবল উপদেশদাতা, আপনাকে দারোগা বানিয়ে পাঠানো হয়নি যে আপনি তাদের বাধ্য করবেন।’ (সূরা আল-গাশিয়াহ, আয়াত: ২১-২২)

খুব খেয়াল করে শুনে রাখুন প্রিয় ভাই এবং বোনেরা, যদি আপনার পরিবার আপনার নম্রতা আর ভালো আচরণের সাক্ষী না দেয় তাহলে আপনার নামায, যাকাত, হজ্জ, রোজা, দান-সাদকাহ সবই বাতিল হয়ে যাবে। এই ব্যাপারে রাসুল (সা.) এর কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো এক মহিলার ব্যপারে, যে কিনা খুব ইবাদাত করতো কিন্তু প্রতিবেশীর সাথে মন্দ আচরণ করতো। তার ফলাফল রাসুল (সা.) বলেছেন- সে জাহান্নামে যাবে।

তাই বলছি প্রিয় ভায়েরা আর বোনেরা, আপনার সন্তানকে যদি সবচেয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তবে প্রথমেই সবচাইতে বড় পরীক্ষা হচ্ছে আপনার চরিত্র সুন্দর রাখা। আর আপনার চরিত্রের সুন্দর আচরণ সবার আগে আপনার পরিবারের সাথে ফুটে উঠবে। আপনার পরিবারের স্ত্রী-সন্তান যদি আপনার চরিত্রের সাক্ষী হয়ে উঠতে পারে তবেই আপনার সন্তান আপনার শাসন ছাড়াই ভালো সন্তানে পরিণত হবে। নতুবা এই সন্তানের জন্যেই পরকালে আপনার কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সুতরাং শেষ কথা হচ্ছে, আল্লাহকে ভয় করুন। সন্তানের জন্যে রাতে জেগে উঠুন, দোআ করুন। পরিবারের জন্যে বেশি বেশি দোআ করুন। আর হক কথা আর হক কাজ নিজেও মেনে চলুন, সন্তানকেও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলুন। নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য কিন্তু সবসময় সত্য। আল্লাহ বান্দাকে যেই হক দিয়েছেন সেটা আপনি ছিনিয়ে নেওয়ার কোন অধিকার রাখেন না। সেটা আপনার লাভ হোক আর লোকসান হোক, আপনাকে মেনে নিতেই হবে। আল্লাহ আমাদের বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন। আর হক কথা আর হক কাজ নিজেও মেনে চলুন, সন্তানকেও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলুন। নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য কিন্তু সবসময় সত্য।

প্রিয় ভাই এবং বোনেরা, পরিশেষে আপনাকে একটা পরামর্শ দেই, আল্লাহর সাথে এমনভাবে কথা বলুন যেন তিনি আপনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আপনি যখন আশ্চর্যজনক কিছু দেখেন, যদিও আল্লাহ তা জানেন তবুও তা চুপচাপ আল্লাহর কাছে উল্লেখ করুন। আপনি যখন কাজ থেকে বাড়ি ফিরছেন, বিশ্রাম নিতে নিতে তাকে আপনার সারা দিনের কথা বলুন। আপনি যখন বিছানায় শুয়ে থাকবেন তখন পরের দিনের জন্য আপনার পরিকল্পনা সম্পর্কে আল্লাহকে বলুন। আপনি যে স্বপ্ন দেখেছেন তা সম্পর্কে আল্লাহকে বলুন। যখন আপনি ক্লান্ত তখন আপনার ক্লান্তির কথা আল্লাহকে বলুন। শুধু আল্লাহর সাথে কথা বলুন। ফলে আপনি তার নিকটবর্তী হবেন এবং দোআ করা সহজ হবে। তবে একটি কথা সর্বদাই মনে রাখবেন- সুখ-দুঃখ উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহকে স্মরণ করুন। দেখবেন আল্লাহ আপনাকে আরো কাছে টেনে নিবেন।


86
আল কোরআনে সিজদার আয়াত সমূহ

পবিত্র কোরআনুল কারিমের মাঝে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো তেলাওয়াত করলে তেলাওয়াতকারীর ওপর একটি সিজদা ওয়াজিব হয়। সে আয়াতগুলোকে সিজদার আয়াত বলে। সিজদার আয়াত পবিত্র কোরআন শরিফে মোট চৌদ্দটি। সবকটি সূরার আয়াত, নম্বর ও অর্থ দেয়া হলো।

(১)‎ إِنَّ الَّذِينَ عِنْدَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيُسَبِّحُونَهُ وَلَهُ يَسْجُدُون

অর্থ : নিশ্চয় যারা তোমার প্রভুর নিকট আছে তারা তার ইবাদতের ব্যাপারে অহঙ্কার করে না এবং তার তাসবিহ পাঠ করে, এবং তার জন্যই সিজদা করে। (সূরা আরাফ, আয়াত নং ২০৬)।

(২) ‎وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلَالُهُمْ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ

 অর্থ : আর আসমানসমূহ ও জমিনের সবকিছুই আল্লাহর জন্য অনুগত্য ও বাধ্য হয়ে সকাল সন্ধ্যায় সিজদা করে এবং তাদের ছায়াগুলোও। (সূরা রাদ, আয়াত নং ১৫)।

(৩) ‎وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ دَابَّةٍ وَالْمَلَائِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

অর্থ : আর আসমান ও জমিনের যত প্রাণী এবং ফেরেশতা আছে সবাই আল্লাহকেই সিজদা করে, তারা অহঙ্কার করে না। তারা তাদের উপরস্থ রবকে ভয় করে এবং তাদেরকে যা নিদের্শ দেয়া হয়, তারা তা পালন করে। (সূরা নাহল, আয়াত নং ৫০)।

(৪) ‎قُلْ آمِنُوا بِهِ أَوْ لَا تُؤْمِنُوا إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا

অর্থ : (কাফেরদেরকে) বলে দাও, বলুন; তোমরা এতে ঈমান আন বা না-ই আন, যাদেরকে এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, তাদের সামনে যখন (কোরআন) পড়া হয় তখন তারা থুতনি ফেলে সিজদায় পড়ে যায়। আর তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক পবিত্র মহান পবিত্র! আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে থুতনির ওপর (সিজদায়) লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের অন্তরের বিনয় আরও বৃদ্ধি করে। (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং ১০৭-১০৯)।

(৫) ‎أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

অর্থ : এরাই হচ্ছে আদম (আ.) এর সন্তানের মধ্যে থেকে সেসব নবী, আল্লাহ যাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন এবং যাদের আমি নুহের সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম। আর ইব্রাহিম ও ইসমাইলের বংশোদ্ভূত এবং যাদেরকে আমি পথ প্রদর্শন করেছিলাম ও মনোনীত করেছিলাম। যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়তো। (সূরা মারইয়াম, আয়াত নং ৫৮)।

(৬) ‎أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَنْ يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاء

অর্থ : তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহর জন্য সিজদা করে যা কিছু রয়েছে আসমানসমূহে এবং যা কিছু রয়েছে জমিনে, সূর্য ও চাঁদ, নক্ষত্ররাজি, পাহাড়, বৃক্ষ, জীবজন্তু ও মানুষের মধ্যে অনেকে; যাদের প্রতি শাস্তি অবধারিত হয়ে আছে। আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন তার সম্মানদদাতা কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন। (সূরা হজ, আয়াত নং ১৮)।

(৭) ‎وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اسْجُدُوا لِلرَّحْمَنِ قَالُوا وَمَا الرَّحْمَنُ أَنَسْجُدُ لِمَا تَأْمُرُنَا وَزَادَهُمْ نُفُورًا

অর্থ : আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা রহমান (আল্লাহ)-কে সিজদা কর, তখন তারা বলে, রহমান কী? তুমি আমাদেরকে আদেশ করলেই কি আমরা সিজদা করবো? আর এটা তাদের পলায়নপরতাই বৃদ্ধি করে। (সূরা ফুরকান, আয়াত নং ৬০)।

(৮) ‎أَلَّا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

অর্থ : (সে তাদেরকে নিবৃত্ত রেখেছে), যাতে তারা সিজদা না করে আল্লাহকে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর গুপ্ত বিষয়াবলি প্রকাশ করেন এবং তোমরা যা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর সবই জানেন। (সূরা নামল, আয়াত নং ২৫-২৬)।

(৯) ‎إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِآيَاتِنَا الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِهَا خَرُّوا سُجَّدًا وَسَبَّحُوا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ

অর্থ : আমার আয়াতসমূহ কেবল তারাই বিশ্বাস করে যারা এর দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দেয়া হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবিহ করে। আর তারা অহঙ্কার করে না। (সূরা সিজদা, আয়াত নং ১৫)।

(১০) ‎قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ إِلَى نِعَاجِهِ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ وَظَنَّ دَاوُودُ أَنَّمَا فَتَنَّاهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ

অর্থ : তিনি (দাউদ (আ.)) বললেন, তোমরার দুম্বাকে তার ভেড়ির পালের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি করে সে তোমার প্রতি জুলুম করেছে। আর শরিকদের অনেকেই একে অন্যের ওপর সীমালঙ্ঘন করে থাকে। তবে কেবল তারাই এরূপ করে না যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে। আর এরা সংখ্যায় খুবই  কম। আর দাউদ জানতে পারলো যে, আমি তাকে পরীক্ষা করেছি। তারপর সে তার রবের কাছে ক্ষমা চাইল, সিজদায় লুটিয়ে পড়লো এবং তার অভিমুখী হলো। (সূরা সোয়াদ, আয়াত নং ২৪-২৫)।

(১১) ‎وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ  فَإِنِ اسْتَكْبَرُوا فَالَّذِينَ عِنْدَ رَبِّكَ يُسَبِّحُونَ لَهُ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَهُمْ لَا يَسْأَمُونَ 

অর্থ : আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, চন্দ্র ও সূর্য। তোমরা না সূর্যকে সিজদা করবে না চন্দ্রকে। আর তোমরা আল্লাকে সিজদা কর যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত কর। অতপর যদি এরা অহঙ্কারও করে তবে (তারা জেনে রাখে) যারা তোমার রবের নিকটে রয়েছে তারা দিনরাত তাঁরই তাসবিহ পাঠ করছে এবং তারা ক্লান্তি বোধ করে না। (সূরা হা-মীম সিজদা, আয়াত নং ৩৭-৩৮)।

(১২) ‎فَاسْجُدُوا لِلَّهِ وَاعْبُدُوا

অর্থ : সুতরাং তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা কর এবং ইবাদত করো। (সূরা নাজম, আয়াত নং ৬২)।

(১৩) ‎وَإِذَا قُرِئَ عَلَيْهِمُ الْقُرْآنُ لَا يَسْجُدُونَ

অর্থ : আর যখন তাদের কাছে কোরআন তেলাওয়াত করা হয় তখন তারা সিজদা করে না। (সূরা ইনশিকাক আয়াত নং ২১)।

(১৪) ‎كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِبْ

অর্থ : কখনও নয়, তুমি আর আনুগত্য করবে না। আর তুমি (তাকেই) সিজদা করো এবং নৈকট্য লাভ করো। (সূরা আলাক, আয়াত নং ১৯)।

এই চৌদ্দটি আয়াত যখন তেলাওয়াত করা হবে তখনই সিজদা করতে হবে। এখন কেউ পড়ে দিতে চাইলেও পারবে।

87
হালাল উপার্জন ও তার গুরুত্ব:

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, মানুষের মৌলিক চাহিদা। এগুলোর যোগান দিতে মানুষকে বেছে নিতে হয় সম্পদ উপার্জনের নানাবিধ পন্থা। জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ যেসব পেশা অবলম্বন করে তা হলো: কৃষি, ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরী, শিল্প প্রভৃতি। উপার্জনের মাধ্যম ব্যতীত কোন ব্যক্তির পক্ষেই উপর্যুক্ত মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মানুষকে মহান আল্লাহ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদের যাবতিয় মৌলিক অধিকারও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

উপার্জনের গুরুত্ব:

উপার্জন ব্যতীত জীবিকা নির্বাহ করা যায় না এবং ইসলামে পরিশ্রমের প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তিতে নয়! আল্লাহ তা‘আলা ফরয ইবাদত সমাপনান্তে জীবিকা নির্বাহে উপার্জন করার লক্ষ্যে যমিনে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

‎فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرٗا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ

সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরন করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সূরা জুমুআ: ১০)

এখানে অনুগ্রহ সন্ধান করা মানে জীবিকা অর্জনের মাধ্যম গ্রহণ করা। (দেখুন: তাফসীরে কুরতুবী:খ.১৮,পৃ.৯৬)

উপার্জনের ক্ষেত্রে ইসলাম নিজ হাতে উপার্জন করাকে সর্বোত্তম উপার্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ মর্মে হাদীসে এসেছে:

‎عن رافع بن خديج، قال: قيل: يا رسول الله، أي الكسب أطيب؟ قال: «عمل الرجل بيده وكل بيع مبرور»

হযরত রাফে ইবনে খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি? জবাবে তিনি বলেন: ব্যক্তির নিজস্ব শ্রমলব্দ উপার্জন ও সততার ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়। (মুসনাদে আহমাদ: খ.৪, পৃ. ১৪১ )

উপার্জন করার মনোবৃত্তি ব্যতিরেকে যারা ভিক্ষাবৃত্তিতে প্রবৃত্ত হয়, তাদের এ ধরনের পেশাকে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায় সে কিয়ামতের দিন এমন অরস্থায় আগমন করবে যে, তার মুখমণ্ডলে এক টুকরো গোশতও থাকবে না। [বুখারী,হাদীস নং ১৪৭৪; সহীহ মুসলিম. হাদীস নং. ১০৪০]’’

ইসলাম মানবতার ধর্ম। দুস্থ মানবতার সেবায় দান করার রীতি ইসলামে চালু আছে। তবে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে ইসলাম অনুমোদন দেয় নি। সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এভাবে বলেছেন,

‎«إِنَّكَ أَنْ تَدَعَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ فِي أَيْدِيهِمْ»

তোমাদের সন্তান সন্তুতিদেরকে সক্ষম ও সাবলম্বী রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। [বুখারী,খ- ১, হাদীস নং ৫২]

হালাল উপায়ে উপার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণও অন্যতম একটি মৌলিক ইবাদত। শুধু তাই নয়, ইসলাম এটিকে অত্যাবশ্যক (ফরয) কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস প্রনিধানযোগ্য। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‎«كسب الحلال فريضة بعد الفريضة »

ফরয আদায়ের পর হালাল পন্থায় উপার্জনও ফরয।[বাইহাকি]

হে মানুষ! পৃথিবীতে হালাল ও তাইয়্যেব যা রয়েছে তা থেকে আহার কর। আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না, নি:সন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।[সূরা আল-বাকারা: ১৬৮]

মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ وَتُدۡلُواْ بِهَآ إِلَى ٱلۡحُكَّامِ لِتَأۡكُلُواْ فَرِيقٗا مِّنۡ أَمۡوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلۡإِثۡمِ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ﴾[النساء:]

তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অবৈধ পন্থায় গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দাংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকগণের নিকট পেশ করো না।[সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৮]

হালাল উপার্জনের গুরুত্ব:

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মানুষের নিকট এমন একটি সময় আসবে, যখন ব্যক্তি কোন উৎস থেকে সম্পদ আহরন করছে, তা হালাল না হারাম, সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ করবে না। [বুখারী,হাদীস নং ২০৫৯]

হালাল উপার্জন ব্যতীত দুআ বা ইবাদত কবুল হবে না। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তই গ্রহণ করেন। তিনি মুমিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ তিনি দিয়েছিলেন রাসূলগণের।

আল্লাহ তা’আলা বলেন : ‘‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত্ত-সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসেবে দান করেছি।’’ অতঃপর রাসূল সা. এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধুসরিত ক্লান্ত-শ্রান্ত বদনে আকাশের দিকে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে ডাকছেঃ হে আমার প্রভূ! হে আমার প্রভূ! অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারা সে পুষ্টি অর্জন করে। তার প্রার্থনা কিভাবে কবুল হবে? [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১০১৫]

উপার্জনের উৎস সম্পর্কে কিয়ামাতে জিজ্ঞাসা করা হবে:-

কিয়ামতের দিন আদম সন্তানকে তার উপার্জনের উৎস সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সেজন্য মুমিনের জন্য হালাল উপার্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন,

‎«لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ»

কিয়ামতের দিন আদম সন্তানকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও স্বস্থান হতে নড়তে দেওয়া হবে না। ১. তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, ২. যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৩. ধন সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে, ৪. তা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৫. সে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল করেছে কিনা। [তিরমিযী, খ- ৪, হাদীস নং ২৪১৭]

হালাল উপার্জন করা আল্লাহর পথে বের হওয়ার শামিল:-

হালাল উপার্জন করার জন্য প্রয়োজনে বিদেশেও যেতে হতে পারে। সেজন্য এটিকে কুরআন মাজীদে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার সাথে হালাল উপার্জনকে বর্ণনা করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন,

‎﴿وَءَاخَرُونَ يَضۡرِبُونَ فِي ٱلۡأَرۡضِ يَبۡتَغُونَ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَءَاخَرُونَ يُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِۖ ﴾ [المزمل: ٢٠]

আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে, আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে। [সূরা আল-মুযযাম্মিল: ৭৩:২০]

হালাল উপার্জন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন

পৃথিবীর জীবন নির্বাহে হালাল উপার্জন করার সুযোগ বা যোগ্যতা লাভ করা আল্লাহ তাআ’লার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামাত। সেজন্য হালাল পন্থায় উপার্জনকারী পরকালে জান্নাতে যাবে। আর অবৈধ পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে সম্পদের পাহাড় গড়লেও পরকালীন জীবনে তার জন্য ভয়াবহ আযাব ও শাস্তি অপেক্ষা করছে। হাদীসে এসেছে,

‎«أربع إذا كن فيك فلا عليك ما فاتك من الدنيا حفظ أمانة وصدق حديث وحسن خليقة وعفة في طعمة»

চারটি জিনিস যখন তোমার মধ্যে পাওয়া যাবে তখন দুনিয়ার অন্য সব কিছু না হলেও কিছু যায় আসে না। তা হলো, আমানতের সংরক্ষণ, সত্য কথা বলা, সুন্দর চরিত্র, হালাল উপার্জনে খাদ্যগ্রহণ। [মুসনাদ আহমাদ, খ- ২, পৃ. ১৭৭, হাদীস নং: ৬৬৫২]

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‎«مَنْ أَكَلَ طَيِّبًا، وَعَمِلَ فِي سُنَّةٍ، وَأَمِنَ النَّاسُ بَوَائِقَهُ دَخَلَ الجَنَّةَ»

যে ব্যক্তি হালাল উপার্জিত খাবার খায় ও সুন্নাতের উপর আমল করে এবং মানুষ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [ তিরমীযি, খ- ৪,পৃ. ৬৬৯, হাদীস নং ২৫২০]

অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জনকারীর জন্য জাহান্নাম অবধারিত, ইবনে আব্বাস রা.বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. বলেছেনঃ

‎«كل جسد نبت من سحت فالنار أولى به »

আর যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে উঠে তার জন্য দোযখের আগুনই উত্তম।’’(তাবারানী)

কাব ইবনে উজরাহ রা. রাসূলে কারীম সা. থেকে বর্ণনা করেন:

‎«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بِحَرَامٍ»

যে শরীর হারাম পেয়ে রিষ্ট পুষ্ট হয়েছে, তা জান্নাতে যাবে না। [মুসনাদ আবী ইয়া‘লা, খ.১ পৃ. ৮৪]

আল্লাহ আমাদের হালাল উপার্জনের তাওফিক দিন। ইসলাম বুঝার ও মানার পথ সহজ করে দিন । আমীন!!

88
গরিব ও দুর্বলরা সমাজে মূল্যহীন আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান

দুনিয়ায় মানুষ সাধারণত গরিব, দুর্বল ও অসহায় মানুষকে হীনচোখে দেখে। এর বিপরীতে ধনী, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর মানুষকে মর্যাদার চোখে দেখা হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে ধন-সম্পদ ও সামাজিক প্রভাব মর্যাদার মাপকাঠি নয়। গরিব ও দুর্বল মানুষও আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান হতে পারে, যদি সে মুত্তাকি হয়।,তাকওয়াবান নেককার ব্যক্তির মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি, হতে পারে সে গরিব কিংবা ধনী। এখানে গরিব ও দুর্বল শ্রেণির মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো—

মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে গরিব-মিসকিন ও অসহায়কে অবজ্ঞার চোখে দেখা। এরা অভাব-অনটনে যেমন জর্জরিত, তেমনি সম্পদশালীর কাছে অবহেলিত। এদের পক্ষে কথা বলার কোনো মানুষ নেই। নেই তাদের মানসিক কষ্টগুলো ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতো কোনো স্বজনও। সামাজিকভাবে যেহেতু এরা মর্যাদাহীন, তাই ব্যক্তির কাছেও মূল্যহীন। মানুষের ভালোবাসা থেকে এরা নিদারুণভাবে বঞ্চিত। অথচ বিশ্বমানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) এই শ্রেণির লোকদের ভালোবাসার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

আবু জার (রা.) বলেন, ‘আমার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) আমাকে সাত কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। (১) আমি যেন গরিব-মিসকিনকে ভালোবাসি ও তাদের নৈকট্য লাভ করি। (২)আমি যেন ওই ব্যক্তির দিকে তাকাই, যে আমার চেয়ে নিম্ন স্তরের এবং ওই ব্যক্তির দিকে না তাকাই, যে আমার চেয়ে উচ্চ পর্যায়ের। (৩) আমি যেন আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করি, যদিও তারা একে ছিন্ন করে। (৪) আমি যেন কারো কাছে কিছু  না চাই অর্থাৎ হাত না পাতি, আমার সমস্ত চাওয়া পাওয়া যেন আল্লাহর কাছে হয়। (৫) আমি যেন সর্বদা  ন্যায় ও সত্য কথা বলি, যদিও তা তিক্ত হয়। (৬) আমি যেন আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় না করি এবং (৭) তিনি আমাকে এই নির্দেশই দিয়েছেন যে আমি যেন বেশির ভাগ সময় ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করি। কেননা এই শব্দগুলো আরশের নিচের ভাণ্ডার থেকে আগত।’ (মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত, হাদিস : ৫২৫৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৪৪৯)

গরিব ও দুর্বলদের মর্যাদাস

১. গরিব ও দুর্বলদের কারণে রিজিক প্রদান করা হয় :

আল্লাহভীরু গরিব ও দুর্বল শ্রেণির লোকেরা সামাজিকভাবে হেয় হলেও মহান আল্লাহর কাছে মর্যাদাশীল। এ শ্রেণির কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের রিজিক দিয়ে থাকেন। সাদ (রা.) নিজেকে নিম্ন শ্রেণির লোকদের চেয়ে অধিক মর্যাদাশীল মনে করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘দুর্বল লোকদের দোয়ায় তোমাদের সাহায্য করা হয় ও রিজিক দেওয়া হয়।’ (বুখারি, মিশকাত, হাদিস : ৫২৩২)

২. জান্নাতের অধিবাসীদের বেশির ভাগ সম্পদহীন :

সাধারণত সম্পদশালীদের কমসংখ্যকই আল্লাহভীরু হয়ে থাকে। বরং এদের বেশির ভাগ হয় উদ্ধত, অহংকারী। ধরাকে করে সরাজ্ঞান। আখিরাতে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ, পুলসিরাত ও জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই। দুনিয়া নিয়েই এরা মহা ব্যস্ত। অথচ এই সাধারণ জ্ঞানটুকু তাদের ঠিকই আছে যে দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়। যেকোনো সময় এখানে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে যাবে। এর পরও আখিরাতের প্রস্তুতি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। ফলে চূড়ান্ত বিচারে তারা হবে চরমভাবে ব্যর্থ। জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়বে যুগ যুগ ধরে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের জান্নাতিদের সম্পর্কে অবহিত করব না? (তারা হলো) প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তি এবং এমন ব্যক্তি, যাকে দুর্বল মনে করা হয়। সে যদি আল্লাহর নামে কসম করে, তাহলে তা তিনি পূর্ণ করে দেন। (তিনি আরো বলেন) আমি কি তোমাদের জাহান্নামিদের সম্পর্কে অবহিত করব না? (তারা হলো) প্রত্যেক রূঢ় স্বভাব, কঠিন হৃদয় ও দাম্ভিক ব্যক্তি।’ (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ৫১০৬)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি জান্নাতে উঁকি মেরে দেখলাম যে এর বেশির ভাগ অধিবাসী হলো গরিব-মিসকিন। আর জাহান্নামে দেখলাম যে এর বেশির ভাগ নারী।’ (মুসলিম ও  মিশকাত, হাদিস : ৫২৩৪)

যারা দারিদ্র্যকে নিজের দুর্ভাগ্যের কারণ মনে করেন, আশা করি হাদিসগুলো তাদের লালিত বিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারবে। দুনিয়াতে সম্পদের দীনতাই আপনাকে অগ্রগামী জান্নাতি হতে সহায়তা করবে, ইনশাআল্লাহ।

৩. ধনীদের ৫০০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ :

দুনিয়াবঞ্চিত এই গরিব অসহায়দের জন্য সুখের বিষয় হলো, ধনীদের আগেই এরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে মূল্যহীন থাকলেও আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনে সবার আগে জান্নাতে প্রবেশের মহা সম্মানে ভূষিত হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘দরিদ্র মুহাজিররা তাদের ধনীদের চেয়ে ৫০০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর
তা হলো (আখিরাতের) অর্ধদিনের সমান।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৫৩)

মুমিনদের করণীয়

১. গরিব বলে কাউকে অবজ্ঞা না করা :

গরিব ও অসহায় মুসলমানদের অবজ্ঞা-অবহেলা না করতে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি নিজেকে তাদেরই সংসর্গে রাখো, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের রবকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৮)

২. নিম্ন স্তরের মানুষের দিকে দৃষ্টি দেওয়া :

মুমিনদের উচিত নিজ অবস্থানের চেয়ে উচ্চ স্তরের কোনো ব্যক্তি বা তার সম্পদের দিকে আক্ষেপের দৃষ্টিতে না তাকিয়ে বরং নিম্ন স্তরের মানুষের দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থার জন্য মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ এমন ব্যক্তির দিকে দেখে, যাকে ধন-সম্পদে, স্বাস্থ্য-সামর্থ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে, তখন সে যেন নিজের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তির দিকে তাকায়।’ (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ৫২৪২)

৩. অল্পে তুষ্ট থাকা :

মুমিনমাত্র করণীয় হচ্ছে অল্পে তুষ্ট থাকা। আল্লাহপ্রদত্ত হালাল জীবিকা যত অল্পই হোক না কেন, তাতে সন্তোষ থেকে শুকরিয়া আদায় করলে দুনিয়ার ধন-সম্পদের মোহ তাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। অল্পে তুষ্ট থাকা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সুস্থ দেহে পরিবার-পরিজনসহ নিরাপদে সকালে উপনীত হয় এবং তার কাছে যদি সারা দিনের খোরাকি থাকে, তাহলে তার জন্য যেন গোটা দুনিয়া একত্রিত করা হলো।’ (ইবনে মাজাহ,  হাদিস : ৪১৪১)

পরিশেষে গরিব-মিসকিন সমাজে উপেক্ষিত হলেও মহান আল্লাহর বিধান মেনে যত কষ্টেই সে দিনাতিপাত করুক না কেন, বিচার দিবসে সে-ই হবে মহা সম্মানিত। সবার আগেই প্রবেশ করবে অনন্ত সুখের অনিন্দ্যসুন্দর বাগান জান্নাতে।


89
মুমিনদের জন্যে এটা একটা লোভনীয় হাদিস!

আল্লাহকে খুশি করার জন্যে নিজের চরিত্রকে শুধরানো অনেক জরুরি। এটা চিন্তা করেই কত ভালো লাগে যে, আমি যদি কোনোভাবে আমার চরিত্রটাকে সুন্দর করতে পারি, কিয়ামতের দিন আমার পাল্লা সবচেয়ে ভারী হবে! (আল্লাহ কবুল করুক! আমিন।) কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে সুন্দর চরিত্র!" (তিরমিজী)।

চরিত্রকে কিভাবে সুন্দর করা যায় - এটার হয়তো বাঁধা-ধরা কোনো সিলেবাস নেই. রাসূল (সা:) কে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তাঁর চরিত্রের এমন কিছু দিক আমার সামনে এলো - যেটা নিয়ে সচরাচর আলোচনা শুনিনা।

যেমন, রসূল (সা:)
কখনো উচ্চ স্বরে কথা বলতেন না,
খুব অল্প শব্দে গভীর জ্ঞানপূর্ণ কথা বলতেন।
তিনি সবসময় হাসি খুশি থাকতেন।
কখনো বদমেজাজী হয়ে থাকতেন না!
ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে নামাজ পড়তেন।
তাঁর চরিত্রই হচ্ছে কুরআন।

আল্লাহর জন্যে নিজের ভিতরটাকে সুন্দর করার কিছু চর্চা এমন হতে পারে

১.সবসময় সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা. উপযুক্ত প্রমান ছাড়া কাউকে খারাপ ভেবে না বসা. সাহাবীদের সময় একবার এক সাহাবী যখন দেখলেন আরেকজন সাহাবীর দাড়ি থেকে মদের ফোঁটা বেয়ে বেয়ে পড়ছে, সে তাকে প্রথমেই দোষ না দিয়ে ভাবলেন, হয়তো তার সাথে কারো ঝগড়া হয়েছে, এর ফলে রাগ করে কেউ তার দিকে মদের গ্লাস ছুড়ে মেরেছে। সেখান থেকেই ফোঁটা বেয়ে বেয়ে পড়ছে।


২.নিয়তেই বরকত! প্রতিনিয়ত নিজের নিয়তকে চেক করা. আমি এই কাজটা কেন করছি? কাকে খুশি করার জন্যে করছি? কেউ যদি সত্যি কোনো কাজ আন্তরিক ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে করে - তাহলে সেই কাজে খুব উঁচু মানের কোয়ালিটি থাকবে! একটা সিম্পল নিয়ত করলে যে কোনো কাজ বরকতপূর্ণ হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি ঘুমানোর আগে এই নিয়ত করে ঘুমায় যে, "হে আল্লাহ! আমি এই ঘুমের মাধ্যমে যে কর্মশক্তি আর তেজ পাবো, সেটা দিয়ে যেন ঘুম থেকে উঠে যেন আরো ভালোভাবে তোমার ইবাদাত করতে পারি।" তাহলে পুরা ঘুমটাই তার জন্যে ইবাদাত হবে এবং সে যতটা সময় ঘুমাযে তার জন্যে নেকী পেতে থাকবে! সুবহানাল্লাহ ঘুমানোর জন্যেও পুরস্কার!

৩.অপ্রয়োজনীয় কথা-আলাপে মশগুল না হওয়া। কেউ কথা বলার সময় তাকে কথার মাঝে cut-off না করা (বিঘ্ন না ঘটানো)! শেইখ বলেন, "কেউ কথা বলতে থাকলে কখনো তাকে মাঝখানে কাট করে দিয়ে নিজের কথা বলা শুরু করে দিও না. কারণ, যে কথা বলছে সে যদি জ্ঞানী হয়, তাকে শুনতে থাকো, তোমার জ্ঞান বাড়বে! আর যে কথা বলছে, সে যদি মূর্খ হয় তাকে শুনতে থাকো - তোমার ধৈর্য্য বাড়বে! নিশ্চয়ই তোমার ধৈর্য্য অর্জন করা জ্ঞান অর্জন করার থেকে বেশি জরুরি!

৪. নিজের সমালোচনা শুনলে ক্ষুব্ধ না হওয়া! আসলেই চিন্তা করে দেখা - আমার মাঝে কি আসলেই এই ভুল আছে? ইমাম শাফি'ই (রা:) একবার ভরা সমাবেশে ক্লাস করাচ্ছিলেন। তখন এক লোক হুড়মুড় করে তার ক্লাসে ঢুকে গেলেন। তার দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন, "তুমি কি ইমাম শাফি'ই?". ইমাম বললেন, "জ্বী, আমি শাফি'." তখন লোকটি সবার সামনে চেঁচিয়ে ইমামকে বললেন, "তুমি একটা ফাসিক, কাফির এবং জঘন্য প্রকৃতির লোক!"

ইমাম চুপ করে শুনলেন। শুধু সমালোচনা না, তাকে সবার সামনে খুব খারাপ ভাবে অপমান করা হয়েছে! তিনি অফেন্ডেড তো হলেনই না, বরং এর উত্তরে তৎক্ষনাৎ দুই হাত তুলে সবার সামনে দুআ করলেন, "হে আল্লাহ! এই ব্যক্তি যদি সত্য বলে থাকেন, তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার উপর দয়া করো এবং আমার তাওবা কবুল করে নাও! আর যদি এই ব্যক্তি যা বললেন, সেটা যদি সত্য না হয়, তাহলে তার এ আচরণের জন্যে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও, তার উপর দয়া করো এবং তার তাওবা কবুল করে নাও!"

৫.প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে সবাইকে মাফ করে দিয়ে অন্তর পরিষ্কার করে ঘুমানো

৬.কোনো ব্যাপারে অন্তরে অহংকার ঢুকে যাচ্ছে কি না চেক করা. যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমান অহংকার থাকবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ-ও পাবে না (সহীহ হাদিস)

৭.যদি কারো উপর হিংসা হতে থাকে, সেই ব্যক্তির নাম ধরে তার সাফল্যের জন্যে বেশি বেশি দুয়া করা. এটাকে অনেক স্কলার হিংসার সর্বোত্তম চিকিৎসা বলেছেন। একটা উদাহরণ দেই, ধরেন ক্লাসে আব্দুল্লাহ অনেক ভালো রেজাল্ট করলো, এতে উমরের হিংসা হচ্ছে। উমর কন্ট্রোল করতে পারছে না। তার মনে এটা নিয়ে কষ্ট লেগেই আছে যে, তার বন্ধু তার থেকে এতো ভালো অবস্থানে আছে, অথচ সেও তো অনেক পরিশ্রম করে যাচ্ছে, তার কেন উন্নতি হচ্ছে না? উমর সেই দিন থেকে বেশি বেশি আব্দুল্লাহর জন্যে দুয়া করতে থাকলো, আল্লাহ যেন আব্দুল্লাহকে আরো বেশি সাফল্য দেন, রহমত এবং বরকত দেন!

আলহামদুলিল্লাহ দুয়া করতে করতে কয় মাসের মধ্যেই উমরের অন্তর থেকে হিংসা দূর হয়ে গেলো। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা উমর এবং আব্দুল্লাহ দুইজনকেই সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে অনেক ভালো অবস্থানে যাবার তাওফিক দিলেন।

৮. নিজের ভুল/গুনাহ -র একটা লিস্ট বানানো। নিজের ভুল নিয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকা, যেন অন্যের ভুল নিয়ে গল্প/গীবত করার কোনো সুযোগ না থাকে।

৯. এমন কোনো কথা কারো পিছনে কখনো না বলা, যেটা সে যদি সামনে থাকতো, তাহলে তার সামনে কখনোই বলা যেত না. এটাই গীবতের ক্লাসিক সংজ্ঞা! গীবত মৃত ভাইয়ের মাংস খাবার মতন জঘন্য গুনাহ (কুরআন: সুরাহ হুজুরাত)

১o. রাস্তার মধ্যখানে কখনো ময়লা না ফেলা! আমার এক ভাইকে দেখতাম সে দেশে গেলে একটা ব্যাগ নিয়ে ঘুরতো। বলতো, দেশে তো সব জায়গায় ময়লা ফেলার ঝুড়ি খুঁজে পাওয়া যায় না. সারাদিনের ময়লা সে তার ঐ ব্যাগে রাখতো। ঘরে এসে ময়লার বিনে ফেলে দিতো।

১১. বড় - ছোট সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা. যারা আমাদের থেকে বয়সে বড়, তারা আমাদের থেকে বেশি বছর ধরে বেঁচে আছেন, কাজেই তারা আমার থেকে বেশি নেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। আবার যারা আমাদের থেকে বয়সে ছোট, তারা আমাদের থেকে কম গুনাহ করার সুযোগ পেয়েছে। কাজেই বড় হোক, ছোট হোক - সবাই আমার থেকে ভালো। কারো সাথে তুলনা করে যেন আমার নিজের মধ্যে অহংকার না আসে। আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আমাদের ভিতর-বাহির সব সুন্দর রাখুক।আমাদেরকে উত্তম চরিত্রের হবার তাওফিক দিন। আমিন!

90
শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত-নিয়মকানুন

সিয়াম সাধনের মাস রমজান ইসলামের মৌলিক বিধানগুলোর অন্যতম। জীবন ও জগতের সার্বিক কল্যাণ বিধানে সিয়ামের গুরুত্ব সীমাহীন। মানবজীবনে খোদা ভীতি, সহমর্মিতা, ধৈর্য ইত্যাদি গুণ একটি আদর্শ সমাজের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু মানুষ নিজের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্যের অধিকারকে দলিত করার কারণে সামাজিক জীবনটা প্রায়শই উত্তপ্ত হয়ে উঠে। অশান্তির দাবানলে দগ্ধ হয় মানবতা।

তাই মানবজীবনটা যাতে ভোগের মোহকে মিটিয়ে দিয়ে ত্যাগের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়, মনুষ্যসমাজ যাতে আদর্শিক মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, সে জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলমানের ওপর মাহে রমজানের রোজাকে ফরজ করেছেন। তবে রোজার মহৎ শিক্ষাটা যেন শুধু রমজানের একটি মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বছর ভরে জীবনজুড়ে এর অনুশীলন হতে থাকে সেজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বছরের বার মাসের বিভিন্ন সময়ে নফল রোজা নিজে রেখেছেন এবং উম্মতকে রাখতে উৎসাহিত করেছেন। নফল রোজাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা। সাধারণ মুসলমান এই ছয় রোজাকে সাক্ষী রোজা হিসেবে জানলেও পবিত্র কোরআন, হাদীস বা ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে এই নামটি খুঁজে পাওয়া যায় না।

শাওয়াল মাসের ছয় রোজার ফজিলত:

রমজান মাসের পরের মাস অর্থাৎ হিজরি সনের দশম মাস হলো শাওয়াল মাস। এ মাসের প্রথম দিনে মুসলিম উম্মার সর্ববৃহৎ জাতীয় উৎসব, ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। উৎসব আনন্দে মুসলমানগণ যাতে রমজানের মহৎ শিক্ষাটা ভুলে না যায়, হয় তো সে জন্যই রাসুলে করিম (সা.) এ মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখতে উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের সব ফরজ রোজাগুলো রাখল অতঃপর শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারাবছর ধরেই রোজা রাখল। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬৪)

আলোচ্য হাদিসে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো- শুধু শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখলেই এক বছরের নফল রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে তেমনটি নয়। আবার শুধু মহিমাম্বিত রমজানে পুরো একমাস রোজা রাখলেও এক বছরের নফল রোজার সওয়াব দেওয়া হবে সে কথাও কোথাও বলা হয়নি। বরং পুরো রমজান মাস রোজা রাখার পরে শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখলে তবেই পূর্ণ এক বছর নফল রোজা রাখার সওয়াব লাভ করা যাবে সে কথাই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন। বস্তুত হাদিসে পবিত্র কোরআনেরই একটি আয়াতের বক্তব্য বিবৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে কেউ কোন নেক আমল করবে তাকে তার দশ গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে।(সুরা আল-আনআম: ১৬০)

সুতরাং রমজানের এক মাসের ১০ গুণ হলো দশ মাস আর শাওয়াল মাসের ছয়দিনের দশগুণ হলো ৬০ দিন অর্থাৎ দুইমাস। অর্থাৎ পূর্ণ এক বছরের নফল রোজার সওয়াব
লাভের জন্য রমজানের রোজা রাখার পরে শাওয়াল মাসের ছয় রোজা রাখার শর্ত থাকলেও যদি কেউ কোনো কারণে রমজানের পূর্ণমাস রাখতে না পেরে থাকেন, তাহলে শাওয়াল মাসের ছয় রোজা রাখা যাবে না তেমনটি নয়। সে ক্ষেত্রে পূর্ণ এক বছরের নফল রোজার সওয়াব না পেলেও নফল রোজা পালনের সীমাহীন নেকি তিনি পাবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

কীভাবে রাখবেন ছয় রোজা:

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসের ভেতর ছয় রোজা রাখার কথা বলেছেন। মাসের প্রথম দিকে, মধ্যভাগে না শেষাংশে সে কথা হাদিসে উল্লেখ নেই। আবার ছয়টি রোজা একসঙ্গে লাগাতার রাখতে হবে, না-কি বিরতি দিয়ে দিয়ে রাখতে হবে, সে কথারও কোনো উল্লেখ নেই। তাই বিজ্ঞ ফকীহ ও আলিমগণের অভিমত হল, যেহেতু শাওয়াল মাসের প্রথম দিন মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসব এবং ওই দিনে রোজা রাখা হারাম, সেহেতু ঈদুল ফিতরের দিনটি বাদ দিয়ে মাসের যে কোনো ছয়দিনে রোজা রাখলেই উল্লিখিত সওয়াব লাভ করা যাবে। এই আরবি শাওয়াল মাসের অর্থাৎ প্রথমদিকে, মাঝামাঝি দিনগুলোতে অথবা শেষদিকে, আবার একাধারে ছয়দিন অথবা একদিন রোজা রেখে তারপর একদিন বা দু’দিন বিরতি দিয়ে আবার একদিন যে কোনোভাবে রোজা রাখা যাবে। শাওয়াল মাসের মধ্যে ছয়টি রোজা রাখলেই হাদিসে বর্ণিত সওয়াব পাওয়া যাবে, ইনশাল্লাহ।

Pages: 1 ... 4 5 [6] 7