Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - Noor E Alam

Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 7
32

দেশে তো জনপ্রিয় হচ্ছেই, ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) এখন বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হচ্ছে বগুড়া থেকে। বর্তমানে এই তেল প্রধানত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। তবে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন—এসব দেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে।

স্বাধীনতার পর এবং আশির দশকেও দেশে প্রধান ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল ও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়তে থাকে। দেশে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাও। আর ভোজ্যতেল হিসেবে ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয় পাম তেল ও সয়াবিন তেল। কেউ কেউ অবশ্য সূর্যমুখী বা জলপাই তেলও (অলিভ অয়েল) রান্নায় ব্যবহার করেন।

একসময় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে অন্য ভোজ্যতেলের তুলনায় ধানের কুঁড়ার তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক মাত্রা কম। ধানের তুষ ছাড়ানোর পর চালের গায়ে বাদামি যে অংশ থাকে, সেখান থেকে এই তেল নিষ্কাশন করা হয়।

গত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধানের কুঁড়ার তেলের ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড ব্র্যান্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের আরেকটি কারখানা।

তবে উৎপাদনের মাঠে ভালোভাবে আছে এখন বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মজুমদার গ্রুপের তেলের ব্র্যান্ড ‘স্বর্ণা’। মজুমদার গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন তেল উৎপাদন হয় ৯০ থেকে ১০০ টন। এ ছাড়া রংপুরের গ্রিন অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজও কিছু তেল উৎপাদন করে।

মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করছি মূলত ভারতে। তবে বিশ্বব্যাপীই এই তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বছর বছর চাহিদা বাড়ছে।’

কুঁড়ার তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ২৫০–৩০০ টন এই তেল উৎপাদিত হয়। বছরে হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন। সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়।

তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিনের কুঁড়ার চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টন। দেশের চালকল থেকে বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি কুঁড়া উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মধ্যে কুঁড়ার তেলের অবদান সোয়া দুই থেকে আড়াই শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন।

তবে অন্যদের কাছ থেকে পরিশোধন করিয়ে নিয়েও এই তেল বাজারজাত করছে কয়েকটি বড় কোম্পানি। যেমন এসিআই। এসিআইয়ের রাইস ব্র্যান তেলের নাম ‘নিউট্রিলাইফ’। বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’। ‘নেচুরা’ নামের একটি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে।

এসিআই কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের বিজনেস ডিরেক্টর অনুপ কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এই পণ্যটির বিক্রির পরিমাণ যেহেতু বাড়ছে, অনুমান করা যায় যে সারা দেশে রাইস ব্র্যান তেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে, তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজার এখনো অত বড় হতে পারছে না।’

জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে অনুপ কুমার বলেন, ডাক্তাররাই বলছেন এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অরাইজানল রয়েছে এবং এই তেল মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। অরাইজানল ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ধারণা বোতলে তেলের রংটা একটু হালকা হলে ভালো হয়। কিন্তু তা করতে গেলে তেল থেকে উপকারিতা কম পাওয়া যেতে পারে।

কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত এক লিটার কুঁড়ার তেলের দাম পাম ও সয়াবিন তেলের দামের চেয়ে একটু বেশি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম যেখানে ১০০ টাকার মতো, কুঁড়ার তেলের দাম সেখানে ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা।

কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই তেল যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায়, তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব। এদিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (বিসিএসআইআর) এক গবেষণাও বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি তা কুঁড়ার তেলে রয়েছে।

মজুমদার গ্রুপের চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘বড় সমস্যা কুঁড়ার সরবরাহ। যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই পরিমাণ কুঁড়া সব সময় পাওয়া যায় না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এ কারণেই। তবে সম্ভাবনা বিশাল। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে দরকার নগদ সহায়তা। ভারতে আমরা রপ্তানি করি ঠিকই, কিন্তু ভারতই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী।’




Source:- Daily Prothom Alo, 12 January 2019

33

আলহাজ সুফী মো. মিজানুর রহমান। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি এবং পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান। গত ৩০ মার্চ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আমন্ত্রণে তরুণ উদ্যোক্তাদের শুনিয়েছেন তাঁর শিল্পপতি হয়ে ওঠার সংগ্রামের গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার দেশের শিল্প খাতের মোট ১২ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে আয়োজন করেছে ‘উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক ডিআইইউ ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া বক্তৃতামালা’। ১২ পর্বের লোকবক্তৃতামালার প্রথম পর্বের সেই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সুফী মিজান বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর কয়েকজন বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ১ হাজার ৪৮৩ টাকা নিয়ে আমি ব্যাবসা শুরু করেছিলাম। এখন পিএইচপি গ্রুপের বার্ষিক আয় ২০ বিলিয়ন টাকা।’


অনুষ্ঠানে এক তরুণ উদ্যোক্তা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন-‘শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে প্রাইভেট কার তৈরি করতে যাচ্ছে পিএইচপি…।’ উত্তরে সুফী মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি গাড়ি তৈরি করতে ৮ হাজার ৩৯২টি যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। এই যন্ত্রাংশগুলো আলাদা আলাদা কাখানায় উৎপাদিত হয়। তোমরা উদ্যেগ নাও এইসব যন্ত্রাংশের কারখানা তৈরি করার। আমি চাই, ৮ হাজার ৩৯২ জন উদ্যেক্তা তৈরি হোক।’

সুফি মিজান আরও বলেন, ‘জীবনে সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে সততা এবং অদম্য স্বপ্ন থাকতে হবে।’ জীবনে চলার পথে নানা ধরনের ভুল ভ্রান্তি থাকবে এবং ভুল থেকেই শিক্ষা নিতে হবে বলে জানান সফল এই ব্যবসায়ী।

অনুষ্ঠান শেষে কথা হয় কয়েকজন উদ্যেক্তার সঙ্গে। আবু রফিক নামের একজন বলেন, ‘আমি ছোট একটা ব্যাবসা করি। আজকের বক্তৃতা অনুষ্ঠানে এসে অনেক কিছু জানলাম। আমার মনোবল অনেক বেড়ে গেছে।’

প্রায় অনুরূপ অনুভূতি ব্যাক্ত করেন মোহাম্মদপুর থেকে আসা মীর মহীব চৌধুরী-‘পিএইচপি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। তার চেয়ারম্যানের মুখে সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প শুনে অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি।’

‘উদ্যেক্তা উন্নয়ন’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, উপাচার্য প্রফেসর ড. ইউসুফ মাহাবুবুল ইসলাম ও ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের পরিচালক মো. আবু তাহের।

আমন্ত্রিত এই ১২ জন সফল উদ্যোক্তার বক্তৃতাগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি বই প্রকাশিত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ব্যবসা, অথনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই ১২ জন উদ্যোক্তার ওপর ডিআইইউ থেকে ১২টি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিআইইউ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই লোকবক্তৃতামালা নতুন প্রজন্মের সৎ, শিক্ষিত ও মেধাবী উদ্যোক্তাদের সাহস, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য ও অনুপ্রাণিত করবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিতে এগোতে পারছে না বলে যে ধারণা চালু রয়েছে, এ লোকবক্তৃতামালা সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

34

তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা’-রবীন্দ্রনাথের গানের এ উক্তি আর কারো জীবনের সঙ্গে মিলুক বা না মিলুক, রোকেয়া আফজাল রহমানের জীবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল ঠিকই।রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনকে সাঙ্গ করে যে বছর চলে যান, ঠিক সে বছরই জন্মগ্রহণ করেন রোকেয়া আফজাল রহমান, ১৯৪১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায়। তাঁর বাবা ব্যারিস্টার খোন্দকার আলী আফজাল ছিলেন বঙ্গীয় আইন পরিষদ বা বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লির সচিব। আর মা সাদিয়া আফজাল কোনো আনুষ্ঠানিক পেশায় না থাকলেও ছিলেন গভীর শিক্ষানুরাগী।

মিসেস রোকেয়া আফজাল রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু কলকাতার লরেটো কনভেন্ট স্কুলে। পরে করাচির সেন্ট জেভিয়ার্স কনভেন্ট কলেজ থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরপরই ১৯৬২ সালে তিনি করাচিতে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে যোগদান করেন। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬৪ সালেই তিনি ব্যাংকের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শাখার ব্যবস্থাপক নিযুক্ত হন। লক্ষণীয় যে, ১৯৬২ সালে ব্যাংকিংয়ের মতো পেশায় মেয়েদের যোগদানই যেখানে ব্যাতিক্রমী ঘটনা, সেখানে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হিসেবে।

ব্যাংকিং জীবনের অভিজ্ঞতাকে পটভূমিতে রেখে ১৯৮০ সালে নিজস্ব উদ্যোগ ও মালিকানায় বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের ঋণে মুন্সিগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আর আর কোল্ড স্টোরেজ’। ১৯৯৭ সালে এ তালিকায় যুক্ত হয় অন্যের কাছ থেকে কিনে নেয়া আরো একটি কোল্ড স্টোরেজ। কোল্ড স্টোরেজ চালাবার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা একদিকে যেমন পরম আনন্দ ও পরিতৃপ্তির, অন্যদিকে তেমনি কিছু কিছু দুষ্টু সামাজিক ক্ষত দ্বারা তাড়িত পীড়নেরও। আনন্দ ও পরিতৃপ্তি এ কারণে যে এ কোল্ড স্টোরেজ দ্বারা প্রায় ১৫ হাজার চাষী সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন এবং ব্যবসায়ের উন্নত নীতি নৈতিকতা মেনে এগুলো পরিচালিত হবার কারণে সংশ্লিষ্ট চাষীরা এর দালিলিক মালিকানার অংশীদার না হয়েও একে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বলেই মনে করেন। আর তিনিও একে শুধু আলু সংরক্ষণ ও বেচাকেনার প্রতিষ্ঠান না ভেবে একে চাষীদের ভবিষ্যৎ চাষ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাড়তি মুনাফা অর্জনের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আর সে কারণেই এ দু’ প্রতিষ্ঠানের ঢাকাস্থ অফিসে বসে কাজ করার চেয়ে নিয়মিত মুন্সিগঞ্জের কারখানায় গিয়ে কর্মী ও চাষীদের সাথে মিলে কাজ করতে অধিকতর আগ্রহ ও স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আর কষ্ট ও পীড়নের বিষয় এই যে, এ কারখানা চালাতে গিয়ে তাকে অত্যন্ত শক্ত হাতে ও সাহসিকতার সাথে চরম ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় চাদাবাজ ও মাস্তানদেরকে মোকাবেলা করতে হয়েছে।

স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাইডাসের একেবারে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি এর কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছেন এবং সে যুক্ততার ধারাবাহিকতাতেই সংশ্লিষ্টদের সাথে মিলে পরবর্তীতে তিনি গড়ে তোলেন মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেড। আর তিনিই বস্তুতঃ সেখানে মহিলা উদ্যোক্তাদের বিনা বন্ধকীতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণদান, তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য ‘মিনি মার্ট’ নামক স্বতন্ত্র দোকান, উইমেন টু উইমেন সাপোর্ট পোগ্রাম ইত্যাদি চালু করেন।

১৯৭৪ সালে মহিলা উদ্যোক্তা সমিতি বা উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তোলেন। ২০০৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ মহিলা উদ্যোক্তা ফেডারেশন বা বিএফডব্লিউই; সারাদেশে যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।

ব্যাংকিং ছেড়ে নিজেকে ব্যাসায় যুক্ত করলেও শুধু মুনাফা অর্জন কখনোই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল না। বরং স্বপ্নের পরিধিতে সবচেয়ে বেশি জাজ্বল্যমান হয়ে আছে এ দেশের নারীদের মধ্যে একটি নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা, প্রকারান্তরে যা তাদেরকে সচ্ছল, সাবলম্বী ও বর্ধিত সামাজিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।আর এরূপ স্বপ্ন দেখেন বলেই তাঁর জিজ্ঞাসার জবাবে একজন দুস্থ নারী যখন জানান যে ঋণ নিয়ে কাজে লাগাবেন এমন কোনো কাজই তার জানা নেই-রোকেয়া আফজাল তখন মমতাপূর্ণ ধমকের সুরে তাকে বলেন যে, এটা হতেই পারে না। নিরুপায় নারী তখন জানান যে, তিনি শুধু রাধতে জানেন। পরে সাব্যাস্ত হলো যে, তাকে রান্নার জন্যই ঋণ দেয়া হবে এবং তাই হলো। তাকে ঋণ দেয়া হলো পিঠা তৈরির জন্য এবং সে পিঠা বেচে এখন তিনি স্বাবলম্বীই নন-একজন প্রতিশ্রুতিশীল নারী উদ্যোক্তাও বটে।

প্রসঙ্গতঃ তাই বলা প্রয়োজন যে, সামর্থ বা সম্ভাবনার অভাব নয়-সামর্থ ও সম্ভাবনার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের অভাবই বাংলাদেশে উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয় বড় বাধা; যে বাধা সামাজিক সংস্কার ও মূল্যবোধের কারণে আরো বেশি করে প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের নারীদের সৃজনশীল চিন্তা ভাবনার ব্যাপারে রোকেয়া আফজাল রহমান শুধু আশাবাদীই নন-রীতিমতো মুগ্ধও। আর সে মুগ্ধতার বোধ থেকেই জানালেন কুড়িগ্রামের এক সৃজনশীল নারী উদ্যোক্তার কথা যিনি তার ঘরের জানালায় বাইরের দিকে মুখ করে একটি টেলিভিশন সেট বসিয়ে দিয়ে সূর্যাস্তের পর থেকে রাত ১২টা অব্দি পালা করে ভারতীয় চ্যানেলের জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলো দর্শককে বিনা পয়সায় দেখাচ্ছেন। আর প্রত্যন্ত গ্রামের খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষরা সারাদিনের খাটা খাটুনির পর বিনোদন লাভের এমন সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন? না, তারা তা করছেনও না। বরং সারি বেঁধে সেখানে জড়ো হচ্ছেন। আর সেই সুযোগে ওই নারী উদ্যোক্তা জড়ো হওয়া দর্শকদের কাছে প্রতিদিন চা-পুরি ইত্যাদি বিক্রি করে যা আয় করছেন তা রীতিমতো ঈর্ষণীয়।

রোকেয়া আফজাল রহমানের কর্মময় জীবন এমনই আরো নানা স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতায় ভরা যেখানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরাও বাদ পড়েননি। তিনি প্রতিশ্রুত যে, তাঁর সুবিধামতো সময়ে তিনি এখানকার নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিছু কিছু নারী উদ্যোক্তার বাড়ি ও কারখানায় যাবেন।

রোকেয়া আফজাল রহমান খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন যে, অ্যাঞ্জেলা গোমেজ ও স্যার ফজলে হাসান আবেদের মতো ব্যাক্তির সঙ্গে তিনি দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন ও করছেন। মিয়ানমারের নেত্রী অংসাং সুচির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কমিশনে একসঙ্গে কাজ করেছেন, যদিচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির বর্তমান ভূমিকায় তিনি খুবই অসন্তুষ্ট।

নিজের কর্ম ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ রোকেয়া আফজাল রহমান দেশে-বিদেশে বহু পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন যার মধ্যে লিডিং উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড, মন্টে কার্লো ১৯৯৯, আমেরিকান চেম্বারের বিসনেস পার্সন অব দি ইয়ার ২০০৩ ইত্যাদি অন্যতম। তিনি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা পরিচালক, ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

বাংলাদেশ সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে একই সঙ্গে তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবেন বা কতটা আশাবাদী-এ প্রশ্নের জবাবে তাঁর উত্তর-‘তিন সন্তানের সবাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বিদেশে থেকে গিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভের সব ধরনের সুযোগ ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা সবাই দেশে ফিরে যার যার ক্ষেত্রে অবদান রাখার চেষ্টা করছেন। আমি ব্যাপারে আমি তাদের উৎসাহিত করেছি। দেশের সম্পর্কে আশাবাদী না হলে আমি কি এটা করতাম?’

লেখক: প্রকল্প পরিচালক, ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (আইআইসি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

35

তরুণ উদ্যোক্তাদের গ্রামভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স এর চেয়ারম্যার এবং সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান। আজ শনিবার (৪ ফ্রেব্রুয়ারি) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার আয়োজিত ‘উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক ডিআইইউ ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া বক্তৃতামালা’ অনুষ্ঠানের ৭ম পর্বে তিনি এ আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানটি সকাল ১০টায় শুরু হয় রাজধানী ঢাকার সোবহানবাগে অবস্থিত ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ক্যাম্পাসের মিলনায়তনে।

রোকেয়া আফজাল রহমান বলেন, ‘উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে হলে দুটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রথমত, কঠোর পরিশ্রম এবং দ্বিতীয়ত মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার।  স্বপ্নকে সামনে রেখে নিরলস পরিশ্রম করে যাও আর তোমার গ্রাহকদের সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করো। সব গ্রাহককে সমানভাবে গুরুত্ব দাও এবং সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলো। জীবনে সফল হবে।’ এসময় তিনি নারী শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান।


নারীদের কেন উদ্যোক্তা হওয়া প্রয়োজন তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, নারীরা আয় করলে সেই আয়ের টাকা শতভাগ পরিবারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পুরুষ আয় করলে শতভাগ পরিবারেরর পেছনে ব্যায় করতে পারেন না। এটা পুরুষদের দোষ নয়। তাদের নিজস্ব কিছু ব্যায় রয়েছে যা নারীদের নেই।

এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশ্নত্তোর পর্বে অংশ নেন রোকেয়া আফজাল রহমান।

অনুষ্ঠানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়েরে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান বলেন, সফল উদ্যোক্তাদের গল্প শুনে আজকের তরুণরা যাতে উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা পায় সেই উদ্যেশ্যেই এই লেকচার সিরিজের আয়োজন। এসময় তিনি সেরা প্রশ্নকারী হিসেবে ছয় শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ১ হাজার টাকা করে তাৎক্ষণিক পুরস্কার ঘোষণা করেন। এই পুরস্কার ব্যবস্থা প্রতিটি লেকচার অনুষ্ঠানে চালু থাকবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. ইউসুফ মাহাবুবুল ইসলাম, স্টুডেন্ট অ্যফেয়ার্সের পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান ও ইনোভেশন ও ইনকিউবেশন সেন্টারের পরিচালক মো. আবু তাহের খান।

ডিআইইউ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,  আমন্ত্রিত ১২ জন সফল উদ্যোক্তার বক্তৃতাগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি বই প্রকাশিত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ব্যবসা, অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই ১২ জন উদ্যোক্তার ওপর ডিআইইউ থেকে ১২টি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইতোমধ্যে এই লেকচার সিরিজ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেরে সাফল্যের গল্প শুনিয়ে গেছেন পিএইচপি ফ্যালিমির চেয়ারম্যান আলহাজ সুফি মিজানুর, অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, বিআরবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মজিবর রহমান, এসিআই গ্রুপের চেয়ারম্যান এম. আনিস উদ দৌলা, হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান একে আজাদ এবং অ্যাডকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী।

36
নিয়াজ রহিম, রহিমআফরোজ গ্রুপের পরিচালক। সততা, মূল্যবোধ, নিষ্ঠা, শ্রম, অধ্যবসায়, লেগে থাকা যে ব্যবসার অন্যতম মূলধন, তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এ সি আবদুর রহিম। শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে এক অভাবনীয় সাফল্য এনেছিলেন তিনি ব্যবসায়। ৫৬ বছর আগে বাবার হাতে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রুপের হাল ধরেছে দ্বিতীয় প্রজন্ম। ব্যবসায় এসেছে নানামুখীতা। এসেছে বৈচিত্র্য। ব্যাটারি, আইপিএস, আইটি, চেইন শপ, কৃষিপণ্য, রেন্টাল বিদ্যুৎ, সোলার এনার্জি নানামুখী ব্যবসা যেমন বেড়েছে, তেমনি এসেছে চ্যালেঞ্জও। ভারতে ব্যাটারি রপ্তানি করতে গিয়ে মুখোমুখি হতে হয়েছে মামলার। সেই মামলা আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অবশেষে এসেছে জয়। রহিমআফরোজ গ্রুপের এই চড়াই-উৎরাইয়ের নানামুখী গল্প বলেছেন নিয়াজ রহিম।



আপনার বাবাকে দিয়েই শুরু করতে চাই। প্রায় ৫৬ বছর আগে আপনাদের ব্যবসা শুরু। আপনার বাবার কথা যদি বলেন।

নিয়াজ রহিম : আমার বাবার নাম এ সি আবদুর রহমি। উনি বেঁচে নেই। আমার বাবা সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি ৬ অথবা ৭ বছর বয়সেই উনি উনার মা-বাবাকে হারান। এতিম হয়ে যান। এরপর উনার মামার সংসারে মানুষ হন। কলকাতায় মামার একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল। বাবার লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। সেখানে লেখাপড়া ছাড়া যে কাজগুলো করা যায় এমন একটা চাকরি তাকে দেয়া হয়। তার অবস্থার যখন কিছুটা উন্নতি হয় তখন বাবা চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে পার্টনারশিপে কলকাতায় একটা দর্জির দোকান দেন। সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করলেন। পরে চলে আসলেন চিটাগংয়ে।

: চিটাগংয়ে আসলেন কত সালে?

নিয়াজ রহিম : ১৯৪৮ সালে। দেশভাগের পরে। চিটাগংয়ে এসে উনি পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে ঠিকাদারির ব্যবসা করলেন। চিটাগং থেকে আমরা ঢাকায় আসি ’৫৮-তে। প্রথম যখন লুকাস ব্যাটারির ফ্যাক্টরি  করার চেষ্টা চলছিল, তখন আমরা ফ্যাক্টরি করার জন্য উনাদেরকে সহায়তা করি। ওই সময় এত আধুনিক ব্যাটারি ফ্যাক্টরি ছিল না। ওই সময় পাকিস্তানেও বোধ হয় ব্যাটারির ফ্যাক্টরি ছিল না। এখান থেকে তৈরি হয়ে ওখানে যেত। ব্রিটিশরা যখন ব্যাটারি তৈরি করত আমরা ওটা ডিস্ট্রিবিউট করতাম।

: আপনার বাবার জন্ম কোথায়?

নিয়াজ রহিম : কলকাতায়।

: আপনাদের আদি নিবাস কোথায়?

নিয়াজ রহিম : ভারতে। আমার জন্ম চিটাগংয়ে।

: আপনারা কয় ভাই বোন?

নিয়াজ রহিম : আমরা তিন ভাই, দুই বোন। আমি হলাম ভাইদের মধ্যে ছোট।

: তারপর আপনাদের ব্যবসার শুরুটা হলো কিভাবে?

নিয়াজ রহিম : তারপর থেকে উনারা ব্যাটারি উৎপাদন করতেন আমরা বিক্রি করতাম, এই। এভাবেই ছিল।

: তখন তো এটা ছোট আকারে ছিল।

নিয়াজ রহিম : খুবই ছোট আকারে। ’৫৮ থেকে ’৮০ পর্যন্ত আমরা শুধু ব্যাটারি ডিস্ট্রিবিউশনই করতাম। তখন ডিলার সংখ্যা অত্যন্ত কম। খুলনাতে একটা। চিটাগাংয়ে একটা। ঢাকায় একটা হয়ত ছিল। উৎপাদনও খুব ছিল না। এভাবেই শুরু।

: আপনাদের ডিলারশিপটা তো ঢাকাতেই।

নিয়াজ রহিম : বাবার ব্যাকগ্রাউন্ড তেমন স্ট্রং ছিল না। এর পরও বাবা যে এই পর্যন্ত আসলেন এটা একটা লক্ষণীয় ব্যাপার। কারণ, প্রথমত লোকটা এতিম। লেখাপড়া তেমন নেই। এক দেশ থেকে আরেক দেশে এক অজানা জায়গায় তিনি আসলেন। তারপর নিজের অবস্থান তৈরি করলেন। এবং তিনি উঠলেন। তাহলে তার ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো গুণ ছিল। তিনি সব সময় উপরের দিকে, সম্ভাবনার দিকে তাকাতেন। সমস্যাকে এতটা গুরুত্ব দেননি। আমরা আজ কি করি, সমস্যাকে প্রাধান্য দেই। আমরা যদি বাবার জীবনটাকে দেখি উনি কিন্তু সমস্যাকে সব সময় দূরে সরিয়ে রেখেছেন। সম্ভাবনার দিকেই এগিয়ে গেছেন।

: আপনি কোথায় লেখাপড়া করেছেন?

নিয়াজ রহিম : আমি পড়েছি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে, ওখান থেকে শাহিন স্কুলে, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি, তারপর কানাডায় যাই। ওখান থেকে লেখাপড়া শেষ করে আমি দেশে ফিরে আসি।

: কোন বিষয়ে পড়েছেন?

নিয়াজ রহিম : আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি ল-তে। বাইরে পড়েছি বিজনেসে।

: বড় দুই ভাই?

নিয়াজ রহিম : বড় দুই ভাইও এমএ পলিটিক্যাল সায়েন্স, ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আমার মেজো জন, সেও নটর ডেম কলেজে পড়ে লন্ডনে গিয়ে লেখাপড়া করে আবার আসে। বাবা নিজে ছিলেন নিম্ন স্থানে, ওখান থেকে আমাদের বললেন যে, উঠতে হবে। লেখাপড়া করতে হবে। ভালো পরিবেশে থাকতে হবে। ভালো পরিবেশে না থাকলে মানসিকতা উদার হয় না। তারপর বাবার ধর্মের ওপরে বিশ্বাস, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আমি মনে করি এই জিনিসগুলো উনাকে গঠন করেছে। বাবার পরে আমরা কিন্তু এখনো এই মূল্যবোধ নিয়ে আছি। এখনো এসব চর্চা করি। কাজে সততা থাকতে হবে। আমরা যে কাজই করি সেটা মোটামুটি হওয়ার সুযোগ নেই। ভালো হতে হবে। সর্বোচ্চ ভালো হতে হবে। আমরা বাবার কাছ থেকে যা শিখেছি আজও এগুলো নিয়েই আছি।

: উনি তো মারা গেলেন ১৯৮২-তে। তখন কি আপনি লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসায়ে ঢুকেছেন।

নিয়াজ রহিম : আমি মাত্র শেষ করে আসছি।

: ব্যবসার ক্ষেত্রে আপনি কী উনার সান্নিধ্য পেয়েছেন?

নিয়াজ রহিম : আমি পুরোপুরি পাইনি। কিন্তু আমার বোন ও দুই বড় ভাই পেয়েছে। যেহেতু আমরা ওই পরিবেশে বড় হয়েছি। আমি বলব উনার মূল্যবোধ অবশ্যই আমার মধ্যে আছে।

: প্রথমে ডিস্ট্রিবিউশন থেকে তারপরে আপনাদের অগ্রযাত্রাটা কিভাবে হলো?

নিয়াজ রহিম : ডিস্ট্রিবিউশন, ১৯৮২ পর্যন্ত ঐভাবে ছিল। ’৮২-তে আমি আসলাম। এসে জয়েন করলাম। বাবা একক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতেন। উনার কথাই সব। উনার হারানোর কিছু ছিল না। কারণ উনি তৈরি করেছেন। হারালে হারালাম। কিন্তু আমরা যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেই তবে ক্ষতি কিন্তু এককভাবে হবে না। সামগ্রিকভাবে হবে। অতএব আমাদের খুব সতর্কভাবে আগাতে হবে। প্রত্যেকটা জিনিস আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে করি। কোনো সিদ্ধান্ত এককভিত্তিতে নেই না। আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে আগাই। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই এই কালচারটা আমরা প্রাকটিস করি। বোর্ড রুমে আমাদের তর্কবিতর্ক যা হওয়ার হবে কিন্তু বাইরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবাই মানে। আমরা বলি না যে, আমি তো এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেইনি কিংবা ও এ রকম বলেছিল। সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে আমরা সবাই তা মেনে নেই। এই যে আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগুলো নিতাম, আমি মনে করি আজকের সফলতার কারণ হলো এগুলো।



আপনি এসে গ্রুপের আলাদা কোন সেক্টরে জয়েন করলেন—নাকি গ্রুপের দায়িত্ব নিলেন?

নিয়াজ রহিম : আমি এসেছি তখন ’৮২-তে। কোনো একজন নতুন ব্যক্তি সেটা ফ্যামিলি মেম্বারই হোক আর বাইরেরই হোক ব্যবসার মধ্যে সহজে ঢোকা যায় না। প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে কিন্তু হঠাৎ ঢোকা যায় না। ’৮২ সালে বাংলাদেশে তখন গার্মেন্টস মাত্র উঠছে। এক ইতালিয়ানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সে সময়। সে গার্মেন্টসের মার্কেট খুলছে। তখন শ্রীলঙ্কাতে সমস্যা ও অন্যান্য দেশে সমস্যা ছিল। সেই সুযোগে বাংলাদেশে মাত্র গার্মেন্টস ঢুকেছে। আমি আমার তিনজন বন্ধু মিলে তখন ‘ভিভা বাংলাদেশ লিঃ’বলে একটা বায়িং হাউস খুলি। ওই সময় আমরা ব্যাংকে যখন এলসি নিয়ে যেতাম ব্যাংকও জানত না ব্যাক টু ব্যাক এলসি কী, মাদার এলসি কী- এই শব্দগুলো ব্যাংকও শুনেনি। আমরা ইতালিয়ানদের মাধ্যমে তা শিখি। ’৮৩-তে আমার ভাইয়েরা আমাকে নোটিস দিলো—হয় তুমি আলাদা হও, নয় আমাদের সঙ্গে থাক। আমাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত আলাদা ব্যবসা আমরা করব না। পরিবারের সদস্যদের এখানে একটা ব্যবসা থাকবে আবার একেক জনের প্রাইভেট আরেকটা ব্যবসা থাকবে, এ রকম আমরা করব না। আমরা যা করব একসঙ্গে। এটাই আমাদের ফিলোসফি। তখন নতুন ব্যবসাতে না গিয়ে ফ্যামিলি ব্যবসাকেই স্ট্রং করি। ’৮৫-এ সিদ্ধান্ত নিলাম যে বায়িং হাউস থেকে আস্তে আস্তে বের হব। তখন কিন্তু কোটা সিস্টেম শুরু হয়। আমরা এক একটা এলসি হ্যান্ডল করতাম মোর দেন হানড্রেড থাউজেন্ড ডলারস, ফিফটি থাউজেন্ড ডলারস, টু হানড্রেড থাউজেন্ড ডলারস। গার্মেন্টসে ইন্সপেকশন যে করবে তার ওপরে কিন্তু অনেক কিছু নির্ভর করবে। একটা এলসি বাতিল হওয়া মানে তার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এ জন্য যাকে আমরা ইন্সপেকশনের দায়িত্ব দেব তার সততা কত কঠিন হতে হবে সেটা বুঝতে হবে। ওকে হয় কেউ গুলি করে মারবে, না হয় কেউ কিনে ফেলবে। এখানে দুই এক হাজার টাকার বিষয় নয় কোটি কোটি টাকার বিষয়। ভাবলাম আমরা যদি নিজেরা সম্পৃক্ত না হই তাহলে এটা খুব রিস্কি ব্যবসা হয়ে যাবে। আমাদের সুনামের ওপর একটা দাগ পড়ে যাবে। কারণ তারা আসছে আমাদের ওপর বিশ্বাস করে। আমরা যদি বিশ্বাসের মূল্য দিতে না পারি তাহলে এটা তো ঠিক হয় না। অতএব আমরা বললাম, না এখানে আমাদের গুড উইলটা মোর ইম্পরট্যান্ট। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে না আমরা আর বায়িং হাউসে থাকব না। আমরা বেরিয়ে আসব।

তিন বন্ধুর মধ্যে এক বন্ধু যখন সিদ্ধান্ত নিল যে, বের হয়ে আসবে তখন অন্যরাও আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসল। থাকলে সবাই না হলে কেউ না। এভাবে আমরা ১৯৮৫ সালে বায়িং হাউস থেকে বেরিয়ে আসি। যারা আমাদের সঙ্গে বায়িং হাউসে কাজ করতেন তাদের ফ্যাক্টরির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমরা চলে আসি। আমি রহিমআফরোজ-এ ঢুকলাম ১৯৮৪-তে।

: রহিমআফরোজ নামটা কিভাবে?

নিয়াজ রহিম : আফরোজ রহিম হলো আমার বড় ভাইয়ের নাম। রহিম এ্যান্ড সন্স আপনি দেখবেন যেমন সন্স যোগ করে অনেক জায়গায়। রহিম যেহেতু ফ্যামিলি নেম আফরোজ এর সঙ্গে যুক্ত করে। যখন ওই কোম্পানি করেন ওই সময় বোধহয় বাবার একটাই ছেলে ছিল। এটা রহিম আফরোজ নামে নিবন্ধন হয়েছে ১৯৮৪-এ কিন্তু উনি তো ব্যবসা করেন অনেক আগে থেকেই। নিজের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে উনি সব সময় অন্যদের সহযোগিতা নিতেন। রহিমআফরোজ হলো উনার দেয়া নাম। কিন্তু যখন রেজিস্ট্রেশন করে তখন আফরোজের সঙ্গে আরেকটা ও (০) বসিয়ে দিয়েছে।  এটা হলো প্রোডাক্ট অফ এ মিসটেক। কিন্তু এখন আমরা বলি এটা কোম্পানির নাম।

: আপনার যাত্রা শুরু হলো কিভাবে?

নিয়াজ রহিম : আমি কানাডা থেকে এসে ’৮৪-তে ঢুকি। আমি দায়িত্ব নেই ব্যাটারি সেলস-এ। আগে ছিল মামা একা। এখন আমরা তিন ভাই, আমার এক মামা আমাদের পরে দায়িত্ব নেন।

: আপনাদের গ্রুপে আপনার সঙ্গে দুটো আলাদা নাম আছে উনারা কারা?

নিয়াজ রহিম : উনারা পরে ঢুকেছে। আমার মামা, আমি ’৮৪-এর কথা বলছি।

: আপনি শুরু করলেন ব্যাটারি ডিস্ট্রিবিউশন থেকে। প্রডাকশনে গেলেন ’৯৫ সাল থেকে?

নিয়াজ রহিম : হ্যাঁ। প্রোডাক্টশন তো ব্রিটিশরা করেই গেছে ১৯৫৯ বা ৬০-তে। আমরা এটাকে টেকওভার  করেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে যখন এখানে নানা সমস্যা, তখন ব্রিটিশরা বলল যে এদেশে ব্যাটারির ব্যবসা ওদের জন্য লাভজনক না। ’৭৮ বা ’৭৯-এর দিকে তারা বলল না আমরা আর এখানে ব্যবসা করব না। এ দেশকে আমরা পটেনশিয়াল মনে করি না। তখন তারা ফ্যাক্টরি বিক্রি করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন আমরা ‘লুকাস’ কিনে নিই। ১৯৮০ সালে উনাদের থেকে দায়িত্ব বুঝে নিই। ’৮৩-তে আমি জয়েন করি।  এখন আমাদের দায়িত্ব হলো ব্যাটারির ক্যাপাসিটিকে বাড়ানো। এটাকে লাভজনক অবস্থায় আনা। আস্তে আস্তে সমস্যাগুলোকে মেটানো।  আমি ব্যাটারি সেলসের দায়িত্ব নিলাম। সারা বাংলাদেশে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া আরম্ভ করি। এবং দুই বছরে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করার মতো অবস্থানে আসি। আপনারা দেখবেন ডিলার নেটওয়ার্ক করার পর থেকেই কিন্তু রহিমআফরোজের গ্রোথ আস্তে আস্তে ভালো হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী ব্যাটারির ফ্যাক্টরির ক্যাপাসিটি বাড়ানো হলো। সেলস্-ডিস্ট্রিবিউশন ক্যাপাসিটি বাড়ানো হলো। এর ফলে আমাদের চেহারা আস্তে আস্তে পাল্টানো শুরু হয়ে গেল। অনেক সমস্যা ছিল। পরিবহনের সমস্যা ছিল, বিশ্বাসের একটা সমস্যা ছিল। ওই সময় কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সেগুলোকে আস্তে আস্তে প্রতিষ্ঠিত করে এই জায়গায় আনা সত্যিই একটা কঠিন ব্যাপার।  ওই সময়ে এমন অবস্থা ছিল না যে ডিলাররা নগদ টাকা দিয়ে ব্যাটারি নেবে। বাকিতে ব্যবসা করতে হবে। বাকিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ব্যাটারি দেব, টাকা দেবে কি দেবে না এটা একটা অনিশ্চয়তা। সেখানেও আমরা বাকি দিয়ে শুরু করি। বিশ্বাস করলে বিশ্বাস পাওয়া যায়। অন দেট প্রিন্সিপাল উই স্টার্ট।

ডিলারশিপ দেয়ার আগেই কিন্তু স্টাডি করে নেই আমি কাকে দিচ্ছি। তার ব্যবসায়িক, সামাজিক সুনাম কেমন? তারপরও আল্টিমেটলি তাওয়াক্কালুত আল্লাহ। বিশ্বাস করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে দেয়া।

এই অভিজ্ঞতার পরে আমি বলব আমরা জাতি হিসেবে নিজেদের সব সময় ছোট করে দেখি। এটা কিন্তু একটা ডেঞ্জারাস জিনিস। আমরা যেহেতু ব্রিটিশদের অধীনে ছিলাম আমাদের এটাই শিখানো হয়েছে যে, কাউকে বিশ্বাস কর না। যাতে আমরা উঠতে না পারি। এটাও পরিকল্পনা করে করা হয়েছে। যাতে আমরা আগাতে না পারি। আমরা তখন সারাদেশে ১৫০ জনের মতো ডিলার এস্টাবলিশ করি। আমি গর্ব করে বলব তাদের একজনও আমাদের সঙ্গে বিট্রে করেনি।

: এ কাজটা কি আপনি করতেন? সিলেকশনের সময় ক্রাইটেরিয়া কী দেখতেন?

নিয়াজ রহিম : তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা আছে কিনা। সামাজিক অবস্থানটা কী রকম? আর্থিক অবস্থা কী? তার যদি একটা দোকান থাকে ভালো।  আমরা যেখান থেকে স্টার্ট করেছি ইট ইজ এ জিরো বেইজড। ওই সময়ে এই ব্যবসাগুলো যারা করতেন রাস্তা থেকে তারা পুরনো ব্যাটারি কিনত। আমরা তাদের নতুন ব্যাটারি সিস্টেমে নিয়ে আসি। ওদের আমরা নিয়মকানুন শিখাই। ওদের ব্যবসা শেখানোর কোনো সুযোগ ছিল না কারণ ওরা বাপ-দাদার আমল থেকেই এই ব্যবসা করে আসছে। আমরা সেই এনভায়রনমেন্টে কিন্তু ঢুকেছি। আমরা বলেছি নতুন ব্যাটারি আমরা দিচ্ছি। সমস্যা হবে না। পুরনো ব্যাটারি দাম প্রায় অর্ধেক। আর আমরা তাকে বলছি, না তুমি বেশি দাম দিয়ে ব্যাটারি বিক্রি করবা। সমস্যা হবে না? বলেছি সমস্যা হলে দেখব আমরা। পুরাতন ব্যাটারির অভ্যস্ততা ছেড়ে ক্রেতারা নতুন ব্যাটারি কিনবে কিনা এই আশঙ্কা ছিল। কারণ ও যে পরিবেশে বড় হয়েছে সেখানে ভালো এবং নতুন ব্যাটারির কিন্তু কোনো চাহিদা ছিল না। আমরা সেখানে একটা চাহিদা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ আমি বলব যে, আমরা সফল হয়েছি। একটা মরুভূমি আমরা আবাদ করেছি। একটা নতুন পথে যাত্রা করেছি।

: আপনি মরুভূমিতে গেলেন কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনার একটা জায়গা অবশ্যই দেখেছিলেন, সেটা কি?

নিয়াজ রহিম : স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশ কিন্তু থেমে ছিল না। সব সময় দেশে একটা ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। রাস্তা বাড়ছে। থেমে কিন্তু থাকেনি। গাড়ি বাড়া মানে ব্যাটারির চাহিদাও বেড়ে যাওয়া। জিয়াউর রহমান সাহেবের সময়ে একটা প্রকল্প ছিল গণযোগাযোগ। ঐ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি গ্রামে গ্রামে টেলিভিশন বিতরণ করতেন। তথ্য যাতে মানুষের কাছে পৌঁছায়। ওরা টেলিভিশন পেত কিন্তু ব্যাটারি জন্য আসত ঢাকায়। তখন আমরা বললাম তোমার ঢাকায় আসতে হবে না। ব্যাটারি নিয়ে আমরাই পৌঁছে যাব তোমার কাছে। এ রকম প্রত্যেটা সুযোগের পেছনে ব্যবসায়িক অবস্থান সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। তখন তো ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন ছিল, কারণ বিদ্যুৎ ছিল না। ব্যাটারির জন্য আগে উনারা আসতেন এখানে আর আমরা যেতে শুরু করলাম তাদের বাড়ির কাছে। এটাই ছিল আকর্ষণ। আর স্থানীয় সরকারি অফিসগুলো যখন দেখল ঢাকা থেকে ওদের ব্যাটারি পাঠাতে হয় না, তারাও ওখান থেকে পেয়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে এ মেসেজগুলো এমনিই চালু হয়ে গেল।

: কিন্তু সেই সময় নতুন ব্যাটারির দাম তো বেশি। মানুষের অভ্যাসেরও তো একটা ব্যাপার রয়েছে। করলেন কিভাবে?

নিয়াজ রহিম : গাড়িতে ব্যাটারির প্রয়োজন হয় গাড়ি স্টার্ট দেয়ার সময়। একটা দুর্বল ব্যাটারি দিয়ে যখন গাড়ি স্টার্ট করা হয় তখন ইঞ্জিনের ওপর দুইগুণ তিনগুণ চাপ পড়ে। দুই হাজার টাকার ব্যাটারির জন্য আপনি কয়েক লাখ টাকার গাড়ির কিন্তু বারোটা বাজাচ্ছেন। আমরা ডিলারদের বলতাম তোমরা ওদের বোঝাও যে দুই হাজার টাকার জায়গায় যদি নতুন ব্যাটারির জন্য আড়াই হাজার বা তিন হাজার টাকা দেয়, উনার লাখ টাকার গাড়ি কিন্তু বেঁচে যাচ্ছে। তখন ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া মাত্র গাড়ি স্টার্ট নেবে। ইঞ্জিনের ওপর চাপ পড়বে না। গ্রাহকের সচেতনতা আমরা বাড়ালাম। তখনই কিন্তু আমাদের বিক্রি বাড়ল। ডিলাররা আগ্রহ পেল। যখন আগ্রহ পেল তখন তারা গ্রাহকদের সঙ্গে আরো বেশি কথা বলতে লাগল।

:  তবে আফটার সেলস এটা কিন্তু একটা বড় জায়গা।

নিয়াজ রহিম : ব্যবসা করাটা কিন্তু অনেক সহজ। আপনাকে আমি নয়-ছয় বুঝিয়ে দিয়েই ব্যাটারি বেচতে পারব। কিন্তু আমরা সব সময় চেষ্টা করি আমাদের কাস্টমার যেন পারমানেন্ট থাকে। আপনি ব্যাটারিটা নিলেন। এটার এসিড ফুরিয়ে যেতে পারে। শুকিয়ে যেতে পারে। এখানে রক্ষণাবেক্ষণেরও একটা সুযোগ আছে।  প্রয়োজন আছে। এই প্রয়োজনটা কে মেটাবে? হয় আপনাকে সহযোগিতা করতে হবে না হয় মেটাতে হবে। আমরা যাদেরকে আমরা ডিলার দিয়েছি এদের ট্রেনিং দিতাম যে, ব্যাটারিকে এভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। দামটাকে  মিনিমাইজ করার জন্য ব্যাটারির পানি ঢাকা থেকে সরবরাহ করতাম। কাস্টমারদের সার্ভিস দেয়ার জন্য আমাদের ফ্যাক্টরিতে ব্যাটারির  জন্য যে পানিগুলো হতো এগুলো আমরা ফ্রি  সাপ্লাই দিতাম।

আমরা আজও ব্যাটারির গ্যারান্টি এক বছর বা দুই বছর দেই; কিন্তু লাইফটাইম সার্ভিস দিচ্ছি ফ্রি। ব্যাটারি যদি পাঁচ বছর যায়, পাঁচ বছরই ফ্রি সার্ভিস দেই। ওটার জন্য কিন্তু কোনো পয়সা দিতে হয় না। এই সার্ভিসগুলো আমরা কাস্টমারকে দিই। এখনো দিচ্ছি। এভাবেই আমরা ডিলার নেটওয়ার্কটাকে প্রতিষ্ঠিত করি।



টার পরেই কি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাটারিতে গেলেন?

নিয়াজ রহিম : এগুলো করে আমরা তখন একটা লেভেলে আসছি। বাংলাদেশে এখন আমরা চাহিদা তো মিটাচ্ছি। তখন এমন হয়ে গেছে যে, ক্যাপাসিটি বেশি; কিন্তু সেলস কম। তখন অন্য মার্কেট আমরা খুঁজলাম। দেখলাম আর কোন জায়গায় বিক্রি করা যায়। ’৮৫-এ এটমিক এনার্জি কমিশন থেকে খবর পেলাম যে তারা সোলার  সিস্টেম ডেভেলপ করবে। ’৮৫-এর পর থেকে আমরা সোলার এনার্জির পেছনে লাগি। সোলার এনার্জির পেছনে কেন লাগি? আমরা দেখলাম যে, আল্লাহর সূর্যের  মাধ্যমে আমি ব্যাটারি চার্জ করতে পারব। আর ব্যাটারির মাধ্যমে আমি ঘরে কিন্তু আলো দিতে পারব। আমি যদি আলো দিতে পারি তাহলে  আমাদের উন্নয়ন বা সামাজিক ডেভেলপমেন্ট কেউ ঠেকাতে পারবে না। কেননা শিক্ষিত লোককে যদি অন্ধকার রুমে রাখেন সে কিন্তু বেকার। কিন্তু একটা অশিক্ষিত লোককে আলোর রুমে রাখেন সে কিন্তু একটা পেপার হলেও উল্টোবে। কিংবা কিছু একটা বানানোর চেষ্টা করবে বা হাতের কাজ কিছু একটা করবে। মানে আলো পেলেই ব্রেন কাজ করবে। এবং  ওখান থেকে একটা ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট আসার সম্ভাবনা রয়েই গেছে। আমরা মনে করলাম, এটা তো একটা বিরাট একটা সোর্স যেটা ব্যবসায়িক কাজে লাগবে। এটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন আনোয়ার হোসেন সাহেব। উনি আমাদের অনেক উৎসাহ দিলেন। বললেন আপনারা করেন যা সহযোগিতা লাগে আমরা করব।

উনার মাধ্যমে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ করে পাবলিক অপিনিয়ন আস্তে আস্তে তৈরি করার চেষ্টা করলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষকরা এলেন। আস্তে আস্তে জিনিসটা ছড়াল। তখন ডিউটি ছিল হানড্রেড পারসেন্ট। এটা কেউ জানত না যে, সোলার এনার্জির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এটা আবার কী? আস্তে আস্তে ১৯৯১ বা ’৯২ সালের দিকে সরকার এটাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করল। হানড্রেড পারসেন্ট ডিউটি নামল ৪৫% ডিউটিতে।

:এই যে আপনারা এটমিক এনার্জি থেকে সোলার এনার্জির প্রতি আগ্রহী হলেন এবং সহযোগিতা পেলেন তখন কি আপনারা কোন প্রজেক্ট শুরু করেছিলেন?

নিয়াজ রহিম :   তখন এটা তো কোনো জায়গায় ছিল না। এটমিক এনার্জিরই একটা ইন্সটলেশন ছিল না। সাভারে তাদের একটা ডেমন্সট্রেশন ছিল। এটমিক এনার্জি কমিশন ও রহিমআফরোজ একসঙ্গে সেই ইন্সটলেশন করি। সেটা হলো আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা। সেখান থেকেই আমাদের যাত্রাটা শুরু করি।

: তখন বাইরে থেকে কোন জিনিস আনতে হতো?

নিয়াজ রহিম : ফটোভোল্ট আনতে হতো বাইরে থেকে, ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল এগুলো বাইরে থেকে আনতে হতো। ইন্সটলেশন ক্ল্যাম্প, ব্রাকেট, এমনকি ক্যাবল বাইরে থেকে আনতে হতো। তখন বাংলাদেশে ক্যাবল হলেও আমরা এটাতে নির্ভর করতাম না। ১৯৯১ বা ’৯২-তে এটা ৪৫% ডিউটিতে নামল তারপর ’৯৩ বা ৯৪ এ জিরো ডিউটি হয়। তখন সবকিছুই বাইরে থেকে আনতে হতো। ব্যাটারিও অনেকখানি বাইরে থেকে আসত।

সোলার এনার্জি কিন্তু গাড়ির ব্যাটারি দিয়ে হয় না। গাড়ির ব্যাটারি তৈরি করা হয় ইঞ্জিনটা স্টার্ট করার জন্য। পাওয়ার দেয়ার জন্য না। এটার জন্য আস্তে আস্তে আমাদের নতুন ধরনের আলাদা ব্যাটারির আইডিয়া পাওয়া শুরু হলো।

আমরা যখন দেখলাম আমাদের ক্যাপাসিটি বেশি কিন্তু সেল কম। আমাদের মার্কেট বের করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে এক্সপোর্ট ওই সময় কেউ চিন্তাও করত না। তখন আমরা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবিতে গিয়ে দেখলাম বড় ব্যাটারিগুলো তারা বাইরে থেকে আমদানি করে আনে। টেলিকমিউনিকেশনেও তাই। তখন চিন্তা হলো এই বড় ব্যাটারির তো একটা বাজার আছে। অথচ এই সেক্টরে আমরা নাই। বেসিক ‘র’ মেটিরিয়ালস এক, টেকনোলজি ডিফারেন্ট। আমরা আস্তে আস্তে গবেষণা শুরু করলাম। লক্ষ্য এ সেক্টরে তো আমাদেরকে ঢুকতে হবে। সম্ভবত ’৯০-এ আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাটারিতে যাত্রা শুরু করলাম।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাটারি দিয়ে আমরা আজকে টেলিকমিউনিকেশন, পাওয়ার, রেলওয়ে, সোলার এই সব কিন্তু এই স্পেশালাইজড ব্যাটারির মাধ্যমে যাচ্ছে। এমনকি এই ব্যাটারির মাধ্যমে আমরা আইপিএসকেও প্রথমদিকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছি।

: এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাটারির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আপনাদের কোনো প্রতিযোগী আছে?

নিয়াজ রহিম : বেশ কয়েকজনই আছে।

: পরে সোলার এনার্জি ডেভেলপমেন্টের কি হলো?

নিয়াজ রহিম : এখন তো গভর্নমেন্ট নিজেই প্রোগ্রাম নিয়ে নিল।

: আপনাদের ডেভেলপমেন্টটা কি?

নিয়াজ রহিম : আমরা ইলেক্ট্রনিক্স দেশে তৈরি করা শুরু করলাম। যারা এখানে ক্যাবল বানাতেন, বিদেশি ক্যাবলের স্পেসিফিকেশনগুলো দেখে আমরা স্থানীয়ভাবে ওদের গিয়ে বললাম তোমরা আমাদের তৈরি করে দাও। উনারা এটাকে তৈরি করলেন। এখন প্যানেল ছাড়া বাংলাদেশে সবকিছুই কিন্তু স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে। ব্যাটারি, ক্যাবল, ক্ল্যাম্প, ইলেক্ট্রনিক কন্ট্রোল ইত্যাদি দেশেই তৈরি হচ্ছে। আমরা মনে করি প্যানেলও আমরা দেশেই তৈরি করব।


: সোলার এনার্জি আপনারা মাঠপর্যায়ে কোথায় ব্যবহার শুরু করলেন?

নিয়াজ রহিম : আমরা ডিলারদেরকে যে প্রশিক্ষণটা দিয়েছিলাম যেমন ফরেস্টে (বন বিভাগ) অনেকগুলো নিয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে। আমরা সব সময় মনে করেছি ঢাকার ডিলারকে প্রশিক্ষণ দেয়ার চেয়ে যদি খুলনার ডিলারকে প্রশিক্ষণ দেই, তবে কোনো সময় যদি সোলার এনার্জির কোথাও কোনো সমস্যা হয় তাহলে কয়েক মিনিট বা ১-২ ঘণ্টার মধ্যে তার সমাধান হয়ে যাবে। ঢাকায় থেকে লোক পাঠিয়ে মেরামতের চেষ্টা করলে ২-৩ দিন লাগবে।

গ্রামে আমরা প্রমোট করার চেষ্টা করলাম। গ্রামে আমরা মেলা করেছি, বিদ্যুৎমেলা। আমরা সিলেটের বিশ্বনাথে, ফরিদপুরে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎমেলা করেছি। ওখানে গিয়ে দেখলাম আমরা যদি মনে করি গ্রামের লোকের কাছে টাকা নেই তারা কিনতে চায় না, তা কিন্তু নয়। আমরা তা পাইনি। তখন সোলার প্যানেল ছিল ৩৫ না ৩৬ হাজার টাকা। এখন নেমে আসছে ২৬ হাজার টাকায়।

লোকেরা কিনতে এগিয়ে আসছে কিন্তু একটা অবিশ্বাস কাজ করে। সেখানে আমরা মনে করেছি গ্রামের লোককে আমরা এত টাকায় সোলার প্যানেল দেব তারপরে টাকা আদায় করব কেমনে। আর ওরা ভাবছে এরা শহর থেকে আসছে, এদের কাছ থেকে এত টাকার জিনিস কিনব, পুরা টাকা দিয়া দেব পরে এর পেছনে দৌড়াতে পারব না। তখন এখানে একটা গ্যাপ।

ওরা আমাদের টাকা দিতে চাইছে ৬০ ভাগ, ৭০ ভাগ কিন্তু হানড্রেড পারসেন্ট  দেবে না। টাকা নাই বলে না, আস্থাহীনতার কারণে। তখন আমরা ড. মুহম্মদ ইউনূস সাহেবের সঙ্গে বসলাম, ব্র্যাকের আছে গেলাম। বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে গেলাম। সোলার এনার্জির গ্রাহক এবং আমাদের মাঝখানে কোনো ব্রিজ হতে পারে কিনা?

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আজ আলহামদুলিল্লাহ গ্রামীণ একটা বিরাট শক্তি হয়ে গেছে। ব্র্যাক নিজেরা করছে। অনেকগুলো এনজিওর মাধ্যমে আস্তে আস্তে এটাকে চেষ্টা করেছি। ব্র্যাক, গ্রামীণসহ ৪-৫টা ছাড়া ব্যাপকভাবে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। আমরা সবকিছু করে দিতাম। আমরা ইন্সটলেশনও করে দিতাম। উনারা আমাদের ফিন্যান্স গ্যারান্টি দিত।

আস্তে আস্তে মাইক্রো ফিন্যান্সের মাধ্যমে এটা যখন ছড়ানো শুরু করল তখন এইসব মধ্যস্থতাকারী এনজিওদের লোকদের আমরা প্রশিক্ষণ দিলাম। যাতে আমাদের আর যেতে না হয়। উনারাই যাতে করে নেয়। তারা নিজেরা একটা এস্টাবলিশমেন্ট তেরি করলেন, গ্রামীণ শক্তি ছড়িয়ে গেল। উনারা নিজেরাই এখন টেন্ডার করেন। আমাদেরটাও কেনেন, বাইরেরটাও কেনেন। এভাবে ইন্ডিপেনডেন্ট একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেল।

37

১৯৩৭ সাল—দ্বিতীয় বিশ্ববিযুদ্ধের অব্যবহিতপূর্ব পটভূমিক বছর। গৃহযুদ্ধ কবলিত স্পেন তখন হিটলারপন্থী স্বৈরতান্ত্রিক একনায়ক ফ্রাঙ্কের শাসনাধীনে। ফ্রাঙ্কোর উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক স্পেনের বাস্ক প্রদেশের গোয়ের্নিকায় নিক্ষপ্ত বোমায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় দু হাজার মানুষ মারা গেলে, আহত হলো অরো বহু হাজার। এ হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রতিচ্ছবি ও প্রতিবাদ হিসেবে পাবলো পিকাসো আঁকলেন বিশ্ইতিহাসের অন্যতম মহা চিত্রকর্ম গোয়ের্নিকা। সৈন্যরা পিকাসোকে ধরে নিয়ে গিয়ে এক নায়ক ফ্রাঙ্কোর সামনে  হাজির করলো। চরমতম কষ্টের বোধ থেকে অঙ্কিত মানবতার জয়গানে ভরা ওই পরমতম সুন্দর চিত্রকর্ম গোয়ের্নিকার দিকে অঙ্গুলি নির্দেম করে ফ্রাঙ্কো পিকাসোকে জিজ্ঞেস করলেন, ইউ ডিড ইট—এটি তুমি করেছ? পিকাসো বললেন, নো, ইউ ডিড ইট—না, তোমরা এটি করেছ। আসলেই তো, ফ্রাঙ্কোরা যা করেছিল, পিকাসো সেটিকেই যত্নসহকারে রঙতুলিতে এঁকেছিলেনমাত্র।

ফ্রাঙ্কোর সঙ্গে রহিমআফরোজ (বাংলাদেশ)লিমিটেডের গ্রুপ ডিরেক্টরের পার্থক্য হচ্ছে, ফ্রাঙ্কো ধ্বংস করেছিলেন, আর নিয়াজ রহিম তার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এ দেশের ব্যবসা ও শিল্পখাত তথা অর্থনীতিকে তিল তিল করে গড়ে উঠতে সহায়তা করেছেন।

নিয়াজ রহিমের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। বাবা প্রয়াত আব্দুর রহিম, মা মিসেস আয়েশা রহিম, যিনি আল্লাহর অসীম কৃপায় তিন ভাই আফরোজ রহিম, ফিরোজ রহিম ও নিয়াজ রহিমের মাথার ওপর ছায়া হয়ে এই ৮৭ বছর বয়সেও বেঁচে আছেন।

সেন্ট প্লাসিড স্কুল, বিএএফ শাহীন স্কুল ও নটরডেম কলেজের ছাত্র নিয়াজ রহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮০ সালে আইন শাস্ত্রে স্নাতক সম্মান ও ১৯৮২ সালে কানাডার কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

কানাডা অবস্থানকালেই ১৯৮২ সালে তাঁর বাবা মারা যান এবং সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে এসে সে বছরই তিনি অন্য ভাইদের সাথে মিলে বাবার হাতে ১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া ব্যবসায়ের হাল ধরেন। প্রথমেই তিনি দায়িত্ব নেন রিনিউঅ্যাবল সোলার এনার্জি বা নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন সংক্রান্ত কার্যক্রমের। কাজটি ব্যবসায়িক বটে, যেখানে মুনাফা অবশ্যই অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু মুনাফার শর্তকে ছাড়িয়ে গিয়ে চোখে মুখে তাঁর স্বপ্ন বিদ্যুৎবিহীন আলোবিহীন গ্রাম বাংলার অযুত অন্ধকার গ্রামকে তিনি সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করে তুলবেন। পৃথিবীর আগামী দিনের জ্বালানী চাহিদা মিটাবার জন্য নবায়নযোগ্য সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বর্তমান বিশ্ব যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় লিপ্ত, আজ থেকে প্রায় চার দশক আগেই তিনি সে যাত্রা শুরু করেন, যা তার দূরদর্শীতা ও নেতৃত্বসূলভ গুণাবরীর পরিচয়কেই তুলে ধরে।

বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই এ দেশে বৃটিশ কোম্পানি লুকাসের ব্যাটারির ছিল একচ্ছত্র ব্যবসা। বাবা আব্দুর রহিম ছিলেন এ দেশে লুকাস ব্যাটারির একমাত্র ডিলার। ১৯৮০ সালে লুকাস এ দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে রহিমআফরোজ তা অধিগ্রহণ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুধু ব্র্যান্ড ইমেজ কিনে নেবার জন্য পৃথিবীজুড়ে যেখানে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ের ব্যবসায়িক সংস্কৃতি চালু রয়েছে সেখানে সে প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে লুকাসের মতো বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান ব্র্যান্ড ইমেজকে পরিত্যাগ করে তারা এ ব্যাটারির নামকরণ করলেন ‘রহিমআফরোজ’। কতটা আত্মবিশ্বাস, প্রত্যয় ও দেশাত্মবোধ থাকলে এটি সম্ভব তা যে কেউ অনুধাবন করতে পারেন। উল্লেখ্য, ব্যাটারি রফতানির ক্ষেত্রে রহিমআফরোজ রাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু অগ্রণী নয়—বিশ্ব বাজারেও অন্যতম শরীক।

একই কথা ডানলপ টায়ারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একই প্রক্রিয়ায়, একই আত্মবিশ্বাসে ব্রিটিশ ব্যাটারি লুকাসের মতো ব্রিটিশ টায়ার ডানলপও এখন ‘রহিমআফরোজ’।

ইংরেজ, পর্তুগীজ বা ফরাসীদের আগমনের সুবাদে এ দেশ থেকে ইউরোপে কমবেশি যাতাযাতের চল সেই ষোড়শ শতক থেকেই রয়েছে। আর সে যাতায়াতের সুবাদেই শীতপ্রধান ইউরোপে এক ঘরের ছায়ায় সব পণ্য বিক্রির ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, মল বা সুপার মার্কেট বহুদিন পর্যন্ত তাজ্জব হয়ে দেখেছি এবং দেশে ফিরে গল্প করেছি। কিন্তু নিজেদের দেশেও তেমনটি দেখার কথা প্রায় কেউই ভাবিনি। রহিমআফরোজ এ দেশে প্রথম চালু করল আধুনিক সুপার স্টোর ‘আগোরা’। গ্রিক শব্দ আগোরার মানে হচ্ছে মার্কেট প্লেস বা বিপণী বিতান বা বিপণী।

ব্যবসা পরিচালনায় অতি উন্নত নৈতিকতা রক্ষা করে চলা এবং ক্রেতা ও ভোক্তার আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে রহিমআফরোজ এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। রহিমআফরোজের সকল পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে রাজধানী কিংবা প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বত্রই একই মান ও মূল্য প্রযোয্য যা বাংলাদেশের খুব বেশি প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায় না।

পাঁচটি বৃহৎ খাতের আওতায় বহুসংখ্যক পণ্য ও সেবার সমন্বয়ে গড়া রহিমআফরোজ গ্রুপের কর্মীসংখ্যা এখন প্রায় ১৫ হাজার এবং এই প্রতিষ্ঠান সমূহের বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

ব্যবসায়ের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রহিমআফরোজ পিছিয়ে নেই। দরিদ্র ছেলেমেয়ের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, এতিম ও দুস্থদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং নানা সামাজিক কল্যাণে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছেন। আর এসব কাজকে একটি স্থায়ী ভিত্তি ও কাঠামো দানের জন্য গড়ে তুলেছেন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘রুরাল সার্ভিস ফাউন্ডেশন’, ‘সেন্টার ফর যাকাত ফান্ড’ ইত্যাদি।

নিয়াজ রহিম বর্তমানে কানাডা-বাংলাদেশ চেম্বারের সহ-সভাপতি, এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক, অস্ট্রেলেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার পরিষদের সদস্য। ইতিপূর্বে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব অগ্রণী ব্যাংক ও বিডিবিএল-এর সরকার নিয়োজিত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন কেরেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সুপার মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি।

প্রচলিত পারিবারিক সংজ্ঞা অনুযায়ী স্ত্রী মিসেস সাইয়িদা ফারজানা রহিম এবং তিন পুত্র ফারাজ আব্দুর রহিম, নাওয়াজ আব্দুর রহিম ও ফায়েজ আব্দুর রহিমকে নিয়ে তাঁর পরিবার গঠিত হলেও বাস্তবে ভাই, মামা, খালু ও ছোট ভাইদের ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে বৃহত্তর পারিবারিক বন্ধনের মধ্যেই তাঁর বসবাস এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে কে, কীভাবে উত্তরাধিকারী হবেন এবং কে কোন দায়ত্ব পালন করবেন, সে উত্তরাধিকার পরিকল্পনাও বার্ষিক পারিবারিক সম্মেলনে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা আছে। এবং এটিও ঠিক করা আছে যে সন্তান বলেই পুত্ররা সরাসরি বাবার আসনে বসতে পারবেন না—তাদেরকে পিতা ভিন্ন অন্য নির্বাহীদের অধীনে কাজ করে কাজ শিখে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে।

(ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ইন্ড্রাস্ট্রি একাডেমিয়া লেকচার সিরিজ অনুষ্ঠানে পঠিত বক্তব্য)
লেখক: পরিচালক, ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট সেন্টার (সিডিসি), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

38

অনেকগুলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক এক ভদ্রলোক আমাকে ফোন করে প্রায় ভর্ৎসনার সুরে বললেন, ‘আপনারা কী সব নিয়ে লেখালেখি করেন? দেশের এক নম্বর সমস্যা নিয়ে তো কিছু লেখেনটেখেন না।’

আমি হেসে বললাম, ‘এক নম্বর সমস্যা কোনটা?’

‘শোনেন, মশিউল সাহেব, আমার প্রতিষ্ঠানে কিছু লোক দরকার। এক লাখ, দেড় লাখ টাকা বেতন দেব, দুই মাস ধরে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছি, কিন্তু লোক পাচ্ছি না।’

‘বলেন কী? দেশে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আপনি এত টাকা বেতন দিতে চেয়েও লোক পাচ্ছেন না?’

‘না, সত্যিই পাচ্ছি না। ইন্টারভিউ দিতে আসে, অনার্স–মাস্টার্স পাস করা তরুণেরা ইন্টারভিউ দিতে আসে, কিন্তু কিচ্ছু জানে না। ঢাকা ভার্সিটি থেকে ইংলিশে মাস্টার্স করে আসছে, দুইটা সেনটেন্স শুদ্ধ করে ইংলিশ লিখতে পারে না। কথা বললে মনে হবে আইকিউ লেভেল এত কম! দুনিয়ার কোনো খোঁজখবরই রাখে না।’

অভিযোগ নতুন নয়। ফলে আমার বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। শিল্পপতি ভদ্রলোক অবিরাম বলে চললেন। প্রায় সবই অভিযোগ। দেশের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে দক্ষ লোক পান না বলে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে উচ্চ বেতনে লোক নিয়ে আসেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পসহ শিল্প ও সেবা খাতের উচ্চ স্তরের পদগুলোতে প্রচুর বিদেশি লোক কাজ করে, তারা হাজার হাজার ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

ভদ্রলোক খেদের সঙ্গে আরও বললেন, আমাদের দেশে সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার হিড়িক লেগেছে, কিন্তু সেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে যারা বেরোচ্ছে, তারা যে শুধু সার্টিফিকেট নিয়ে বেরোচ্ছে, সেদিকে কারও দৃষ্টি নেই: না শিক্ষকদের, না অভিভাবকদের, না শিক্ষার্থীদের নিজেদের। উচ্চশিক্ষিত তরুণ–তরুণীরা ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসার পরেই দাবি জানায়, তাদের চাকরি দিতে হবে। কিন্তু চাকরি করার জন্য যে বিদ্যা, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা দরকার, সেটা তারা পুরো ছাত্রজীবন ধরে ভুলে থাকে। তারা নিজেদেরকে ঠকায়, মা–বাবাকে ঠকায়, জাতিকে ঠকায়; কারণ মা–বাবা ও রাষ্ট্র তাদের পড়াশোনার পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে।

বছর দুয়েক আগে আমি প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় ‘উচ্চশিক্ষিত বেকারদের অপরাধ কী?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেটি পড়ার পরেও ওই শিল্পপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি সে কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনারা তো শুধু পপুলার কথাবার্তা লেখেন। অপ্রীতিকর বাস্তব সমস্যাগুলো এড়িয়ে যেতে চান। তখনো আমি আপনাকে বলেছিলাম, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের অপরাধ হলো, তারা ভালোভাবে লেখাপড়া করে শ্রমবাজারের জন্য দরকারি যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করে না, অথচ তারা দাবি করে, তাদেরকে চাকরি দিতে হবে।’

একপর্যায়ে আমি তাঁকে বললাম, ‘আপনার কথা তো শুনলাম। কিন্তু আমাদের দেশে মেধাবী তরুণ–তরুণী একেবারেই নেই, এটা কি হতে পারে?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘মেধাবীরা সম্ভবত বিদেশে চলে যায়, নইলে আমরা পাই না কেন?’

‘একদমই পান না?’

‘পাই, খুবই কম। কিন্তু তাদেরও সমস্যা আছে।’

‘কী সমস্যা?’

‘সততার অভাব। বেশি চালাক, শর্টকাটে রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হতে চায়। আমার প্রতিষ্ঠানে যতজন ব্রাইট ছেলেকে চাকরি দিয়েছি, তাদের কারও মধ্যে সততার লেশমাত্র দেখিনি। বারবার বিশ্বাস করেছি, বারবার প্রতারিত হয়েছি। প্রত্যেকর শুধু দুই নম্বরি ধান্দা; দুই নম্বর রাস্তা ছাড়া আর কোনো রাস্তা তাদের জানা নেই।’

ভদ্রলোকের কথায় বিরক্তি। সম্ভবত হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাঁর হতাশা দূর করার জন্য কিছু সান্ত্বনামূলক বা আশাব্যঞ্জক কথা বলা যেত, কিন্তু সে পথে গেলাম না। তিনি আমাকে বললেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে লেখেন; আওয়ামী লীগ–বিএনপি নিয়ে লিখে কোনো কাজ হবে না। পলিটিশিয়ানরা
যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে, আপনারা লেখালেখি করে তাদের বদলাতে পারবেন না। তার চেয়ে যুবসমাজের জন্য লেখেন, কিছু কাজ হলেও হতে পারে। আলটিমেটলি যুবসমাজই তো আমাদের ভবিষ্যৎ, না কী বলেন?’

সায় না দিয়ে উপায় কী। কিন্তু যুবসমাজ নিয়ে কী লেখা যায়? তাদের উপদেশ–পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা কি আমাদের আছে? তাদের যে অবস্থার কথা ওই শিল্পপতি ভদ্রলোক বললেন, তার জন্য কি শুধু তারাই দায়ী? না পুরো শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা দায়ী?

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও লেখক ড. আকবর আলি খান এক সাক্ষাৎকারের সময় প্রসঙ্গক্রমে আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করা প্রয়োজন। কারণ, তিনি মনে করেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা সনদসর্বস্ব হয়ে পড়েছে, শিক্ষার গুণগত মান ভীষণভাবে নেমে গেছে এবং আরও নেমে যাচ্ছে।

ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার ছিলেন আনোয়ার চৌধুরী। আমি একবার তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তখন তিনি প্রসঙ্গক্রমে আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রতি মনোযোগী নয়। শিক্ষার্থীরাও ডিগ্রি অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। বাট ইউ নো, পিএইচডি হোল্ডারস আর নট নেসেস্যারিলি গুড ডেলিভারার্স?’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীরা যে বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দক্ষ হবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আনোয়ার চৌধুরী আমাকে আরও বলেছিলেন, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। এত বেশিসংখ্যক ছেলেমেয়ের অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বিভিন্ন কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানো।

গত দু–তিন দশকে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স–মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে যে বিপুলসংখ্যক তরুণ–তরুণী বেরিয়ে এসেছে ও আসছে, তাদের কর্মসংস্থান কোথায় কীভাবে হবে, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো চিন্তাভাবনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। তাই দেখা যাচ্ছে, বেকারদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত তরুণ–তরুণীরাই আছে সবার ওপরে। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ (সিডার) নামের একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা করে থাকে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত তাদের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ যার ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা’ যত বেশি, তার চাকরি পাওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা তত কম। যারা দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু যারা অনার্স–মাস্টার্স পাস করেছে, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সুখের বিষয়, কম শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্রুতগতিতে বেড়ে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যানের এই সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রীতিকরভাবেই অব্যাহত আছে; কিন্তু কর্মসংস্থান, বিশেষত উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়ছে না বলে প্রবৃদ্ধির সুসংবাদ এ দেশের লাখ লাখ তরুণ–তরুণীর হতাশা দূর করতে পারছে না।

এর বিপরীতে এ কথাও মিথ্যা নয় যে আমাদের শ্রমবাজারে দক্ষ লোকের বেশ ঘাটতি আছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা–উদ্যোগের মালিকেরা বিদেশ থেকে লোক আনতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ী–শিল্পপতি–উদ্যোক্তা সমাজের ৭৫ শতাংশই বলেছে, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে লোক নিয়োগ করতে চায়, কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ লোক পায় না। শিল্পপতি মনজুর এলাহী একবার প্রথম আলোর এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির অভাব প্রকট। ড. আকবর আলি খানের মতো তিনিও মনে করেন, এ দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ভালো নয় এবং ক্রমেই তা আরও খারাপ হচ্ছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ও দক্ষ শ্রমশক্তির বাজার এক অস্বাভাবিক উভয়সংকটের মধ্যে আছে। এই সংকট দূর করতে হলে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়াতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। সনদের জোরে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না, যাবে না—এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও যদি শিক্ষার্থীদের টনক না নড়ে, তাহলে এই দুর্দশা কোনো দিন ঘুচবে না। দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থায়ও ভালো মানের শিক্ষা অর্জন করা একেবারে অসম্ভব নয়, যদি শিক্ষার্থীদের নিজেদের আন্তরিক চেষ্টা থাকে। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সনদের অপেক্ষায় না থেকে জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগী হলে একপর্যায়ে তারাই শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতিগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারসাধনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

মশিউল আলম প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

mashiul.alam@gmail.com


Source:- Daily Prothom Alo, 6 January 2019.
Link: https://www.prothomalo.com/opinion/article/1573423/%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%A6%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7-%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC

39

২০ আগস্ট ডিআইইউ ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া লেকচার প্রোগ্রামের তৃতীয় পর্বের আয়োজন করা হয়। এদিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপিস্থিত ছিলেন বিআরবি ক্যাবলের চেয়ারম্যান মোঃ মজিবর রহমান।  সেখানে তিনি লিখিত বক্তব্যে তার শুরু এবং সফলতার গল্প শোনান। তার পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইনোভেশন এ্যান্ড ইনকিউবেটর সেন্টারের পরিচালকব মো: আবু তাহের।  লিখিত বক্তব্য পাঠের পর মোঃ মজিবুর রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন পেশার মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন। এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সফলতার সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। তাই সফল হতে পরিশ্রম করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নীতি-নৈতিকতা, সততা ও মানসিক সুশৃঙ্খলতা শুধুমাত্র উপাসনা কক্ষের বিষয় নয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে, জীবন –জীবিকা এবং আয়-উপার্জনের ক্ষেত্রেও এসবকে মেনে চলতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে  পুস্তক থেকে অর্জিত জ্ঞানের পাশাপাশি  বাস্তবে প্রয়োগপযোগী দক্ষতাও অর্জন করতে হবে, যাতে নিয়োগকারী  উদ্যোক্তারা বলতে না পারেন যে তারা উপযুক্ত লোক পাচ্ছেন না। এ বাস্তবতাকে বিচেনায়  নিয়ে ড্যাফোডিল


ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটি কারিক্যুলামে  প্রয়োগিক শিক্ষাকে যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার সাথে যুক্ত করে তাদের হাতে- কলমে কাজ শিখিয়ে প্রকৃতপক্ষেই  কর্মক্ষম হয়ে উঠার সুযোগ  করে দিচ্ছে। তিনি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এ পথ অনুসরনের আহবান জানান।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে মজিবুর রহমান বলেন, নতুনভাবে কোনো কিছু শুরু করতে হলে সবার আগে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করতে হবে। অনেক বাধা আসবে সেগুলো মোকাবেলা করার মতো সাহসী হতে হবে। ব্যার্থতাকে ভয় পেলে হবে না। ব্যার্থতাকে পেছনে ফেলেই এগিয়ে যেতে হবে।

উক্ত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ সবুর খান, বিআরবি ক্যাবলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ রহমান, পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সুফী মিজানুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হামিদুল হক খান ও ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের পরিচালক মোঃ আবু তাহের। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (স্টুডেন্ট এফেয়ার্স) সৈয়দ মিজানুর রহমান।

সবশেষে  বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ সবুর খান বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ এর চেয়ারম্যান মোঃ মজিবর রহমানের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
মজিবর রহমানের বক্তব্যের ভিডিও দেখুন:


[/size]

40
চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি পছন্দ করেন। সততা, ব্যবহার আর শ্রমের বিনিময়ে এ চ্যালেঞ্জকে তিনি জয়ও করেছেন। সফলতাকে এনেছেন হাতের মুঠোয়। আর তাই আজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও এক আলোকিত নাম বিআরবি ক্যাবল। এর কর্ণধার মো. মজিবর রহমান। কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে বেড়ে ওঠা। ফলে ছোট থেকে হিসাবের হাত একেবারে পাক্কা। চল্লিশ বছর ধরে এ পাক্কা হিসাবি মজিবর রহমান ব্যবসাকেও নিয়ে গেছেন পাক্কা খুঁটিতে। অন্যতম বিশ্বে বাংলাদেশের শীর্ষে- এ স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তর তর করে।

বেশিদিন আগের কথা নয়, ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন বিআরবি (বজলার রহমান অ্যান্ড ব্রাদার্স) ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আস্তে আস্তে দেশের বাজারে অবস্থান করে নেয় প্রতিষ্ঠানের পণ্য। তারপর দেশের বাইরে নজর দেন তিনি। এখন বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদাকে শীর্ষে তুলে ধরছেন বিআরবি গ্রুপ তাদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে। আর দেশের বেকারত্ব মোচন, অর্থনীতির গতি সঞ্চার ও দেশের রপ্তানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন সমান তালে। মজিবর রহমান প্রতিষ্ঠানটির চেয়াম্যান। তার মতে, দেশে কোনো কিছু করা না গেলে, বাইরে গিয়েও কিছু করা যায় না। ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন,জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের অর্জন আরও সূদুরপ্রসারী করতে চাই।

প্রতিষ্ঠানের শুরু সম্পর্কে মজিবর রহমান বলেন, নিজেদের মূলধন ও ব্যাংকের অর্থায়নে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮০ সালে। ১৯৯৪ সালে গোটা দেশে বিদ্যুতায়নের প্রসার ঘটলে ক্যাবল উৎপাদন বাড়নো হয়। ১৯৯৬ ও ২০০০ সালে উন্নত বিশ্বের উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন করে কারখানার সমপ্রসারণ করা হয়। বর্তমানে উন্নত ও গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ক্যাবল বাজারের স্থান করে নিয়েছে বিআরবি গ্রুপ। এখন এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এ গ্রুপে বর্তমানে ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৬ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছে এখানে। এর মধ্যে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ, কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ, বিআরবি পলিমার, বিআরবি সিকিউরিটিজ, টিপিটি ক্যাবলস, লাভলী হাউজিং, কিয়াম সিরাতুন্নেসা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, বিআরবি এনার্জি, বিআরবি এয়ার, বিআরবি ট্রাভেলস, গ্যাস্ট্র লিভার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট লিমিটেড।

জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি দেশে শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা জনপদ কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ জেলায় রূপান্তরেরও অন্যতম কারিগর এই বিআরবি গ্রুপ। স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই কুষ্টিয়া অঞ্চলে নতুন করে শিল্পায়নের সূচনা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুষ্টিয়ার খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান মোহিনী মিল বন্ধ হয়ে যায়। নাজুক হয়ে পড়ে কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিলের অবস্থাও। জেলার বৃহৎ কর্মস্থানের এ ক্ষেত্র দুটি ভঙ্গুর হয়ে পড়লে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এ জেলা।
মন অবস্থায় নানা রকমের ঝুঁকি সত্ত্বেও নতুন করে শিল্পকারখানা দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন মজিবর রহমান। এ প্রচেষ্টা বাস্তবরূপ লাভ করে ১৯৭৮ সালের ২৩শে অক্টোবর কুষ্টিয়া শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ বিসিক শিল্প নগরীতে বৈদ্যুতিক ওয়্যারস ক্যাবল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দেশে ও বিশ্ব বাজারের বৈদ্যুতিক ক্যাবলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৫ সালে কোম্পানির প্রসার ঘটিয়ে বিআরবি ক্যাবলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইউনিট-২ স্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটি।

মজিবর রহমান বলেন, বিআরবি উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় শুধু বৈদ্যুতিক ক্যাবলই তৈরি করছে না তাদের উৎপাদনের সঙ্গে আরও সংযোজিত হয়েছে টেলিকম টিউব লাইন ব্যালস্টসহ ৯৯ হাইভোল্টেজ ক্যাবল, যা এদেশের মধ্যে শুধু বিআরবিই তৈরি করছে। অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বিআরবি ক্যাবল তার সাফল্যের আরও এক ধাপ এগিয়ে আইএসও ৯০০২ : ২০০০ সনদপ্রাপ্ত হয়ে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছে। শিল্প উৎপাদনে-রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তিনি সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন বেশ কয়েক বার।

যেভাবে সম্প্র্রসারণ হয় গ্রুপটির: উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গ্রাহক চাহিদা মেটানোসহ কর্মসংস্থানের জন্য ২০০৯ সালে নতুন প্লান্ট স্থাপন করে উৎপাদন করছেন বৈদ্যুতিক ফ্যান। যার নাম লাভলী ফ্যান, যা বাজারে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। টেকসই ও মজবুত হওয়ায় লাভলী ফ্যান অল্প সময়ে মানুষ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এ ফ্যান বাংলাদেশের এক নম্বর ব্র্যান্ড হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে বলে জানান চেয়াম্যান।২০১১ সালে বিআরবি গ্রুপে যুক্ত হয় আর একটি নতুন অধ্যায়। বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড মেরিন ক্যাবল উৎপাদন করে ব্যবসায় নজির স্থাপন করায় কোম্পানি ব্যাপক সুনাম অর্জন করে।

আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ও আকর্ষণীয় মেটালিক পণ্যসামগ্রী রান্নাঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য মজিবর রহমান ১৯৯০ সালে কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কুষ্টিয়া বিসিক শিল্প নগরীতে আরও একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পিএচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান।
কুষ্টিয়ায় ১৯৯২ সালে বিআরবি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ নামে আরও একটি প্রকৌশল, ঢালাই, প্লাইউড ও মেলামাইন বোর্ড কারখানা প্রতিষ্ঠিত করেন গ্রুপটি।

কৃষিপ্রধান দেশর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিআরবির স্বপ্নদ্রষ্টা আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৯৭ সালে বিসিক শিল্প নগরী কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন বিআরবি পলিমার লিমিটেড।

২০১১ সালে বিসিক শিল্প নগরীর মূল হাইওয়েতে এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশন স্থাপন করেন।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চয়তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিসিক শিল্প নগরীর বিআরবি চত্বরে ২০০৯ সালে স্থাপন করেন বিআরবি এনার্জি লিমিটেড। এই বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে বিআরবি গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনে গতিশীলতা ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কে ২০০০ সালে ১০তলা বহুতল ভবন বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স ‘লাভলী টাওয়ার’ স্থাপন করেন।

আকাশপথের মাধ্যমে সারা দেশে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে বিআরবি গ্রুপে যুক্ত হয় বিআরবি এয়ার লিমিটেড। বর্তমানে বেল ৪০৭ জিএক্স নামের একটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরবি এয়ারের যাত্রা শুরু হয়।
গ্রুপের কর্ণধার মো. মজিবুর রহমান কুষ্টিয়ায় কিয়াম সিরাতুননেছা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করে দরিদ্র ছাত্রদের বিনামূল্যে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র হজব্রত পালনের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন। নিজ খরচে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন।

মজিবর রহমান বলেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে ও স্বনির্ভর কুষ্টিয়া প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বিআরবি গ্রুপ। দেশের সমৃদ্ধি ও বেকারত্ব মোচনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আর এটা সম্ভব হয়েছে কুষ্টিয়াবাসীসহ দেশের সবার সার্বিক সহযোগিতায়। বিআরবির পণ্যের মান উন্নত হওয়ার কারণে বিশ্ব দরবারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্যাবল তৈরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিনে। গোবি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে সারা বিশ্বের তালিকাভুক্ত ৩ হাজার ক্যাবল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআরবি ৩৩তম। মানের কারণে বিআরবি ৩ বার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি অর্জন করেছে।

41

১১ জুন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন’ শীর্ষক লেকচার সিরিজে জীবনের সফলতার গল্প শুনিয়েছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে ঝুঁকি নিতে হবে এবং ব্যাংক থেকে অর্থসংস্থান করতে হবে। কারণ ব্যাংক হলো একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

ব্যবসায় সফল হতে হলে কি করতে হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সফলতা একদিনে আসে না। তাই সফলতার জন্য কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই সফলতা ধরা দেবে। এছাড়া ব্যবসায়ে ভালো এবং মন্দ সময় যাবে, সেটাকে মেনে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ব্যবসায়ে সফলতার জন্য সবার আগে প্রয়োজন পণ্যের মার্কেটিং করা। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদের প্রতিমাসে নির্দিষ্ট তারিখে বেতন দেওয়া। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখাটাও দরকারি।

তিনি বলেন, সফলতার অন্যতম প্রধান ধাপ হলো সুনাম অর্জন করা। সুনাম এমন একটি জিনিস যা কখনো অর্থের মূল্যে পরিমাপ করা যায় না।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহি ছাড়াও উক্ত অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন পিএইচপি গ্রুপের চেয়ারম্যান সূফী মিজানুর রহমান, ড্যাফোডিল ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. ইউসুফ এম ইসলাম প্রমুখ। ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের (আইআইসি) আয়োজনে এটি ছিল দ্বিতীয় অনুষ্ঠান। এর আগে পিএইচপি গ্রুপের প্রধান সুফী মিজানুর রহমান শুনিয়েছেন তাঁর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প। আয়োজকরা জানান, ১২জন সফল উদ্যেক্তা পর্যায়ক্রমে তাঁদের উদ্যেক্তা হওয়ার গল্প শোনাবেন। অবশেষে এই ১২ জনের লেকচার নিয়ে প্রকাশ করা হবে একটি বই।

42

জন্ম ১৯৪২ সালে, কলকাতায়।  বাবা স্যার সৈয়দ নাসিম এলাহী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধান বিচারপতি। বড় ভাই বিচারপতি এস এ মাসুদ ছিলেন পশ্চিম বাংলার প্রধান বিচারপতি। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে মঞ্জুর এলাহী চতুর্থ।

পড়াশোনার শুরু সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। এরপর ক্লাস নাইনে ভর্তি হন বিহারের বোর্ডিং স্কুলে। সেখান থেকে পরে বিশপ ওয়েস্টকট স্কুল। এই স্কুল থেকেই ও লেভেল সম্পন্ন করেন মঞ্জুর এলাহী। তারপর ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে ডিস্টিংশনসহ সপ্তম স্থান অধিকার করে গ্রাজুয়েশন করেন। এরপর ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী নিলুফার চৌধুরী সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বাবার সঙ্গে ব্যবসা দেখভাল করেন। মেয়ে মায়ের সঙ্গে সানবিমস স্কুলে কাজ করছেন।

ব্যবসায়ীক জীবনে আদর্শ মানেন জে আর জি টাটাকে। কারণ হিসেবে বলেন, ‘প্রথমত তার সততা, প্রোফেশনালিজম। সম্পূর্ণ পেশাদারদের দিয়ে কোম্পানি চালায়। দ্বিতীয়ত প্রত্যেকটা কোম্পানিকে প্রাতিষ্ঠানিক একটা রূপ দিয়েছে। তৃতীয়ত তার সিএসআর, সোশ্যাল কর্পোরেট রেসপনসিবিলিটি বা সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমার মনে হয় এত ভালো সিএসআর খুব কম কোম্পানির আছে। টাটা ক্যান্সার ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে টাটা ম্যানেজমেন্ট সেন্টার আছে। সম্পূর্ণরূপে তারা অরাজনৈতিক।’

অবসর সময়টুকু পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করেন। মাছ, ডাল ও সাদা ভাত প্রিয়। রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান প্রিয়।

43
অ্যাপেক্স মানে ‘চূড়া’।অ্যাপেক্স মানে শীর্ষ স্থান। একটু একটু করে ব্যবসার চূড়ায় উঠেছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গোষ্ঠী, অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান৻ মঞ্জুর এলাহী বিভিন্ন মেয়াদে ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স এসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন৻ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে দু’বার তিনি শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১১ জুন ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের (আইআইসি) আয়োজনে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিলনায়তনে তরুণ শিক্ষার্থীদের সামনে এই সফল ব্যবসায়ী শুনিয়েছেন তাঁর উদ্যেক্তা হয়ে ওঠার সংগ্রামমুখর দিনের গল্প।

ধরাবাঁধা জীবন, গতানুগতিক স্বপ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছেন। এখন কী করবেন মঞ্জুর এলাহী? চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বন্ধুরা সবাই সিএসপি (পাকিস্তান সার্ভিস কমিশন) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনিও সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। ওই সময়ের এক দিনের ঘটনা। মঞ্জুর এলাহী জিন্নাহ এ্যাভিনিউ (বর্তমান নাম বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ) দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথে দেখা হলো পরিচিত এক বড় ভাই হুমায়ুন খান পন্নীর সঙ্গে। তিনি জানতে চাইলেন, আজকাল কি করছিস? মঞ্জুর এলাহী বললেন, ‘এমএ পরীক্ষা দিয়েছি। এখন  সিএসপি পরীক্ষা দেব। প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি বললেন, ‘সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে কী হবে। ক’পয়সা পাবি? তুই চাকরি করবি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে।’ তারপর সেই ভদ্রলোকের সহযোগিতায় বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতে চাকরি হয়ে গেল মঞ্জুর এলাহীর।


ইন্টারভিউ বোর্ডে মজার অভিজ্ঞতা
পাকিস্তানের করাচি গেলেন ইন্টারভিউ-এর জন্য। ইন্টারভিউ বোর্ডে দেখলেন সবাই ইংরেজ। কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নের পর তারা মঞ্জুর এলাহীর কাছে জানতে চাইলেন, মাইনে কত চান। মঞ্জুর এলাহী ভাবলেন, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করলে তো চারশ টাকা বেতন। সিভিল সার্ভিসের একটা ক্ষমতা আছে। এই চাকরিতে তো কোনো ক্ষমতা নাই। সুতরাং দ্বিগুণ বেতন চাওয়া উচিত। অতএব অনেক ভেবেচিন্তে তিনি ৯০০ টাকা বেতন চাইলেন। শুনে বোর্ডের লোকজন মুচকি হাসতে শুরু করলেন। এটা দেখে একটু দমে গেলেন মঞ্জুর-এই রে! বেশি বলে ফেলেছি মনে হয়! তিনি ঢোক গিলে বললেন, ‘না না, আমার ছয় শ টাকা হলেই চলবে।’ এবার ইন্টারভিউ বোর্ডের সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। মঞ্জুর এলাহীর মন খারাপ হয়ে গেল।চাকরিটা বোধ হয় আর হলো না। নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন-কোনোদিন করাচি আসেননি। করাচি দেখা হলো, এটিই বা কম কি?
তারপর ফাইনান্স ডিরেক্টর বললেন যে, এই প্রতিষ্ঠানের বেতন শুরুই হয় ১৯০০ টাকা থেকে। তারপর তারা থাকার জায়গা দেবেন। আরো অনেক কিছু।শুনে তো আকাশ থেকে পড়লেন মঞ্জুর এলাহী। এভাবে চাকরিটা হয়ে গেল।


চাকরি ছাড়লেন ৩০তম জন্মদিনে
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭২।তিরিশতম জন্মদিনে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় প্রবেশ করলেন মঞ্জুর এলাহী। পুঁজি ছিল ১৫ হাজার টাকা। তা নিয়েই ৩০ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।  প্রেক্ষাপট এরকম : শ্বশুরের বাসায় বেড়াতে গেছেন। সেখানে দেখা হলো শ্বশুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সঞ্জয় সেনের সঙ্গে। তিনি মঞ্জুর এলাহীকে বললেন, ‘কতদিন আর চাকরি করবা? চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করো।’ কথা বলতে বলতে তাদের মাঝে ঠিক তখনই উপস্থিত হন এক ফরাসি ভদ্রলোক রেমন্ড ক্লেয়ার। তিনি চামড়ার ব্যবসায়ী। কার্গো প্লেনে ফ্রান্স থেকে ট্যানারি কেমিক্যালস নিয়ে এসে হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকাতে বিক্রি করেন। তিনি মঞ্জুরকে সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, ‘তুমি এখানে আমাকে রিপ্রেজেন্ট কর।’
মঞ্জুর এলাহী আর না করলেন না। নেমে পড়েলেন ব্যবসায়।


ব্যবসায় তো নামলেন, কিন্তু পথ তো চেনেন না। কারণ পরিবারের কেউই কোনোদিন ব্যবসা করেননি। অতএব অচেনা পথে যাত্রা শুরু করে অনেক চড়াই উৎরাই পেরোতে হলো মঞ্জুর এলাহীকে। কেমন ছিল সেই সংগ্রাম? মঞ্জুর এলাহীর নিজ মুখেই শোনা যাক :
প্রথমে আমাদের পুরো প্রোডাকশন জাপানে যেত। ব্যবসা ভালো ছিল, ব্যবসা চলছিল। ১৯৯৩-৯৪ সালে খেয়াল আছে জাপানি অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়ল। আমার ক্রেতা ব্যাংক খেলাপি হয়ে গেল। অনেকগুলো দোকান ছিল, দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেল। দোকানে বিক্রি হচ্ছে না। বিপদে পড়ে গেলাম। ইতালিতে গেলাম স্বাভাবিকভাবে। ইতালিতে তারা বলে, চামড়া ঠিক আছে? তোমরা জুতা কী বানাবে? ওই ইমেজ প্রবলেম। ভারত থেকে তারা জুতা কেনে। তখন চায়না চায়না, সবাই চীনের কথা বলছে। চায়না ছাড়া কোনো কথা নেই। চেষ্টা করলাম ১৯৯৩, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬। চার-পাঁচ বছরে প্রচুর লোকসান হলো। আমার কারখানার উৎপাদন কমে গেল। পুরো উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারি না। জুতার প্রোডাক্ট ডেভেলপ করতে পারি না। জুতার বাজার গার্মেন্টসের মতো কিন্তু খুব ফ্যাশনেবল। একই জুতা কিন্তু বছরের পর বছর চলবে না। আর এখানে গার্মেন্টস-এর মতো দুটো ভিন্ন ঋতু আছে। বসন্ত-গ্রীষ্ম, শরৎ-শীত। তো খুবই অসুবিধায় ছিলাম। চার-পাঁচ বছর ধরে।যাকে আমরা চামড়া সাপ্লাই করতাম ইতালিতে, সাউথ ইতালিতে তার প্রচুর প্রডাকশন। খুব নাম করা সু ফ্যাক্টরি। তার কাছে আমি গিয়েছিলাম আমার নিজের ব্যবসার জন্য। চামড়া বিক্রি করার জন্য। তখন দেখলাম যে, সে আমাকে আগের মতো বড় পরিমাণে অর্ডার দিচ্ছে না। কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল চাইনিজদের সঙ্গে সে পেরে উঠছে না। চাইনিজ গুডস, চাইনিজ সুজ সারা ইউরোপে কম দামে বাজার দখল করেছে। সিম্পল, ফ্রি মার্কেট ইকোনমি এসব কারণে সে আস্তে আস্তে আমি তার প্রডাকশন কমিয়ে দিচ্ছি। প্রডাকশন কম বলে স্বাভাবিকভাবেই সে  চামড়া কম কিনছে। ফলে সে চায়নাতে শিফট করবে বলে মনস্থির করেছিল। তাছাড়া ইতালিতে শ্রম ব্যয় অনেক বেশি। গড়ে মাসে কর্মীদের বেতন প্রায় সাত হাজার ইউরো যেটা বেশি দিন চালিয়ে যাওয়া শ্রমঘন জুতার কারখানার পক্ষে সম্ভব না।

আমি তাকে বাংলাদেশে আসার প্রস্তাব করি। সে তখন বাংলাদেশ বলতেই বুঝত নিয়মিত বন্যা আর হরতাল। আমার বিশেষ অনুরোধে এবং অনেকদিনের সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশে আসতে রাজি হয়। তারপর সে আমাদের সাথে জয়েন ভেঞ্চারের প্রস্তাব করে। এটাই হলো টার্নিং পয়েন্ট। কোম্পানির নাম হলো ‘এডেলকি’। সেই যে আমাদের যৌথ উদ্যোগ শুরু  হলো তা এখনো চলছে।


অ্যাপেক্স মানে ‘চূড়া’
অ্যাপেক্স ইংরেজি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ চূড়া বা শীর্ষ স্থান। ছোটবেলা থেকেই সবকিছুতে শীর্ষ স্থান দখল করতে পছন্দ করতেন মঞ্জুর এলাহী। ব্যবসার শুরুতেও ভাবলেন, এক্ষেত্রে তাঁকে চূড়ায় উঠতে হবে। তাই প্রথম কিনে নেওয়া ‘ওরিয়েন্ট ট্যানারি’র নাম বদলে নতুন নাম রাখলেন ‘অ্যাপেক্স’। মঞ্জুর এলাহী বলেন, ‘ব্যবসায় ওঠানামা আছেই, কিন্তু আমি স্থির ছিলাম এই চামড়ার ব্যবসাতেই আমি থাকব। এখানেই ফোকাস করব। এখানেই নাম্বার ওয়ান হব। আমি গর্বের সঙ্গে আজকে বলতে পারি যে, ডেফিনেটলি আমরা এখন নাম্বার ওয়ান। রপ্তানির দিক থেকে বলেন, প্রোডাক্ট ডাইভারসিটির দিক থেকে বলেন, প্রোডাকশনের দিক থেকে বলেন, এপেক্স ট্যানারি নাম্বার ওয়ান। নাম্বার টু কিন্তু আমাদের অনেক নিচে।’

44
১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে প্রথম জীবনে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কম্পানিতে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। নিজের ৩০তম জন্মদিনে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে চামড়াশিল্পের ব্যবসা শুরু করি। এরপর অ্যাপেক্স গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করি’, অ্যাপেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটিতে (ডিআইইউ) এক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার দেশের শিল্প খাতের মোট ১২ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে আয়োজন করেছে ‘উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক ডিআইইউ ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া বক্তৃতামালা’। ১২ পর্বের লোকবক্তৃতামালার দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয় গত ১১ জুন। সেই অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মঞ্জুর এলাহী।শিক্ষার্থীদের  উদ্দেশে মঞ্জুর এলাহী বলেন, একমাত্র কঠোর পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা আর বিনম্রতার মতো গুণাবলিই পারে একজন সফল উদ্যোক্তা তৈরি করতে। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখতে এবং উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের গুণগত মান বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টার পাশাপাশি সুনাম ধরে রাখারও আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ইউনির্ভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, উপাচার্য প্রফেসর ড. ইউসুফ মাহাবুবুল ইসলাম ও ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের পরিচালক মো. আবু তাহের।

আমন্ত্রিত এই ১২ জন সফল উদ্যোক্তার বক্তৃতাগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি বই প্রকাশিত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ব্যবসা, অথনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই ১২ জন উদ্যোক্তার ওপর ডিআইইউ থেকে ১২টি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিআইইউ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই লোকবক্তৃতামালা নতুন প্রজন্মের সৎ, শিক্ষিত ও মেধাবী উদ্যোক্তাদের সাহস, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য ও অনুপ্রাণিত করবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গতিতে এগোতে পারছে না বলে যে ধারণা চালু রয়েছে, এ লোকবক্তৃতামালা সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

45

তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি  নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত  দেশ বরেণ্য শিল্পপতি লতিফুর রহমান। তিনি আজ সোমবার (২৭ ফ্রেব্রুয়ারি) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশ ইউনিভার্সির ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার আয়োজিত লোকবক্তৃতা সিরিজের ৮ম পর্বে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতাকালে এ আহ্বান জানান। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, বিশবিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইউসুফ এম ইসলাম ও ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের পরিচালক আবু তাহের খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (স্টুডেন্ট এফেয়ার্স) সৈয়দ মিজানুর রহমান।

লতিফুর রহমান তার বক্তৃতায় দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এ সাফল্যের শিখরে উঠে আসার কাহিনী শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী বন্ধুরা, তোমাদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই চলবে না, নৈতিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত হতে হবে। তা না হলে তোমাদের অর্জিত শিক্ষা এবং সার্টিফিকেট কোনো কাজে আসবে না। এসময় তিনি হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত প্রিয় নাতি ফারাজের নৈতিক শিক্ষাকে স্মরণ করে বলেন, ফারাজ ছিল তোমাদের মতোই তরুণ। সে তার জীবন দিয়ে নৈতিকতার প্রমাণ দিয়ে গেছে।সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ুয়া নাইজেরিয়া বংশোদ্ভূত এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে লতিফুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নিজের সদিচ্ছাই যথেষ্ঠ। আইডিয়া তোমাদের চারপাশেই ছড়ানো রয়েছে। শুধু নিজের আগ্রহ আর পছন্দ বুঝে আইডিয়া নির্বাচন করো এবং কঠোর পরিশ্রম করো, সফল হবেই।

এসময় লতিফুর রহমান আরও বলেন, একা একা সংগ্রাম করে কখনো সফল হওয়া যায় না। সফল হতে হলে পারস্পরিক সহযোগিতা লাগে। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কাজ আদায় করে নিতে হলে প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ কর্মীবান্ধব করতে হয় বলেও মনে করেন এই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা।

অনুষ্টানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের মো. সবুর খান বলেন, বাংলাদেশের শিল্পক্ষেত্রে যারা বিপ্লব করেছেন তাদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোনো গবেষণা নেই। এটা দুঃখজনক।  বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা বিদেশি উদ্যোক্তাদের জীবন সংগ্রাম পাঠ করে, কিন্তু আমাদের দেশের সফল উদ্যোক্তাদের জীবনও কম সংগ্রামমুখর নয়। সেসব গল্প শুনতেই আমাদের ইন্ড্রাস্ট্রি একাডেমিয়া লেকচার সিরিজ।

মো. সবুর খান আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসা জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম লতিফুর রহমান। নৈতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি এক রোল মডেল। তার মুখে তার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শুনতে পারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের ব্যাপার।

অনুষ্ঠানে দেশের শিল্প ও ব্যাবসাখাতের নেতৃবর্গ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, আমন্ত্রিত এই ১২ জন সফল উদ্যোক্তার বক্তৃতাগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি বই প্রকাশিত হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ব্যবসা, অথনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই ১২ জন উদ্যোক্তার ওপর ডিআইইউ থেকে ১২টি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হবে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটি আশা করছে যে, এ লোকবক্তৃতামালা নতুন প্রজন্মের সৎ, শিক্ষিত ও মেধাবী উদ্যোক্তাদেরকে সাহস, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য ও অনুপ্রাণিত করবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সম্ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ  গতিতে এগুতে পারছে না বলে যে ধারণা চালু রয়েছে, এ লোকবক্তৃতামালা, সে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠতে অনেকখানি সাহায্য করবে আশা করা যায়।

Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 7