Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - 710001113

Pages: 1 [2] 3 4 ... 23
16
অতীত মহামারিগুলো থেকে নেওয়া ৫টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
Sabiha Rahman

বর্তমান সময়কে বলা হচ্ছে নিউ নরমাল। কোভিড-১৯ মহামারির পূর্বের সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। মানবজীবন এবং সমাজ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে যুক্ত হচ্ছে নতুন কিছু অভ্যাস। পূর্বের বিভিন্ন সময়ের মহামারি নানাভাবে বদলে দিয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা। মানুষ মহামারির সাথে লড়াই করতে গিয়ে শিখেছে নতুন সব বিষয়, যা কখনো সক্রিয়ভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজে এসেছে, তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহস জুগিয়েছে, কখনো বা জাগিয়েছে বাঁচার নতুন অনুপ্রেরণা।

কোয়ারেন্টিন
'কোয়ারেন্টিন' শব্দটি ইতালীয় 'কোয়ারেন্টা' শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ '৪০'। ১৩৭৭ সালের ২৭ জুলাই ব্যাধির ইতিহাসে প্রথম বন্দরনগরী রাগুসারের (বর্তমান ডাব্রোভনিক) আইনে কোয়ারেন্টিন যুক্ত করা হয়। তখন এই শহরটিতে বুবোনিক প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ মহামারির তাণ্ডব চলছে। নগরীর জনগণের জীবন রক্ষার্থে তৈরি করা এই নতুন আইনে বলা হয়েছিল, "জীবাণু ছড়িয়ে পড়া অঞ্চল থেকে যারা আসবে তারা (রাগুসা) বা এর অন্য কোনো জেলায় প্রবেশ করতে পারবে না, যদি না তারা জীবাণুমুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে ম্রকান দ্বীপে বা কাভাত শহরে একমাস অবস্থান করে।"
১৩৭৭ এর দশকে উদ্ভূত সেই কোয়ারেন্টিন পরবর্তীতে বহু রোগের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকান শহরগুলোতে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত সৈনিকরা ফিরে আসছিল, তখন এখানে চলছিল স্প্যানিশ ফ্লু। সান ফ্রান্সিসকোতে, নৌপথে আগমনকারীদের শহরে প্রবেশের আগেই পৃথক করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সান ফ্রান্সিসকো এবং সেন্ট লুইসে সামাজিক জমায়েত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। একইসাথে এই অঞ্চলের থিয়েটার ও স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শুধু স্প্যানিশ ফ্লুতে নয়, চতুর্দশ শতকের পরের সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইয়েলো ফিভার, বুবোনিক প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু, কোভিড-১৯ সহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির গতি রোধে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

ওয়াইন উইন্ডো
চতুর্দশ শতাব্দী থেকে আঠারো শতক অবধি বিশ্ব এক ভয়াবহ মহামারির কবলে পড়ে; যার নাম বুবোনিক প্লেগ, ব্ল্যাক ডেথও বলা হয় একে। ভয়াবহ এই মহামারির কবলে পড়ে ইউরোপের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই মহামারির পরবর্তী সময় বিশ্ব চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবাতে খুব দ্রুত এগিয়ে গেছে, তবে সেকালে মহামারির বিস্তৃতি রোধে যে সকল ব্যাবস্থা বা সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছিল তার চর্চা বর্তমান সময়েও লক্ষ্য করা যায়।

শুধু বর্তমান সময়ের কোভিড-১৯ নয়, ষোড়শ শতকে যখন প্লেগ মহামারির প্রকোপ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইতালিও এ থেকে মুক্ত ছিল না। বরং এখানে মহামারির সংক্রমণ ছিল ভয়াবহ। এই সময় ইতালির লোকেরা 'ওয়াইন উইন্ডো' বা 'বুচেটে দেল ভিনো' ধারণাটি নিয়ে আসে। সামাজিক দূরত্ব অনুসরণ করে মদ ক্রয়-বিক্রয় কাজে মদের দোকানের প্রাচীরে এই ছোট জানালা তৈরি করা হয়েছিল।

সমগ্র ফ্লোরেন্স এবং টাস্কানি শহর জুড়ে এখনও সেকালের প্রায় শতাধিক ওয়াইন উইন্ডো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যদিও এগুলোর বেশিরভাগ বন্যাসহ নানা কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে এই ওয়াইন উইন্ডোর ধারণা মানুষের সামনে পুনরায় ফিরে এসেছে। দোকান-মালিক এবং ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এগুলোকে আবার ওয়াইন এবং ককটেল বিক্রির কাজে ব্যবহার করছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ওয়াইন উইন্ডো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাত্তেও ফাগলিয়া বলেন, "আমরা সমস্ত ওয়াইন উইন্ডো দ্বারা একটি মাইলফলক স্থাপন করতে চাই, যখন লোকেরা এটি কী এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে পারবে, তখন তারা এর আরো বেশি কদর করবে।"
মাস্ক পরিধান
প্লেগ চলাকালে রোগীদের চিকিৎসা করার সময়ে চিকিৎসকরা দীর্ঘ, পাখির মতো চিটযুক্ত একপ্রকার মুখোশ পরিধান করতেন। এটি তাদের মুখ এবং নাককে আংশিকভাবে ঢেকে রাখত। রোগী এবং নিজেদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চিকিৎসকরা এই উপায় অবলম্বন করতেন। কিন্তু এর পেছনে তারা যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা দাঁড়া করিয়েছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। মিয়াসমা তত্ত্বে বিশ্বাসী সেই সময়কার চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন, বাতাসের গন্ধের সাথে রোগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যা ছিল তাদের মাস্ক পরিধানের কারণ। তাদের চিটযুক্ত এই মুখোশে সুগন্ধযুক্ত একপ্রকার ঔষধি মিশ্রিত থাকত।
কিন্তু ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি চলাকালে মুখোশগুলো জনসাধারণের মাঝে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সান ফ্রান্সিসকোতে মুখোশ পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। এমনকি যারা মুখোশ পরিধান করবে না তাদের জরিমানা, কারাবাস থাকে শুরু করে তাদের নামগুলো সংবাদপত্রগুলোতে 'মাস্ক স্ল্যাকার' হিসাবে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদের লজ্জা দেবার জন্য নয়; তারা ঘরে কীভাবে মুখোশ বানাবেন সেই সম্পর্কে নির্দেশাবলীও ছাপিয়েছিল।

ব্যক্তিগত সুরক্ষা-সামগ্রী
প্লেগ মহামারি চলাকালীন চিকিৎসকরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য এক বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন- এই পোশাকগুলো তাদের বায়ুবাহিত রোগ থেকে রক্ষা করবে। সপ্তদশ শতকে ফ্রান্স এবং ইতালিতে এর প্রচলন হয়।
প্লেগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করার সময় চিকিৎসকরা প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের ওভারকোট এবং পাখির ঠোঁটের ন্যায় চাঁদযুক্ত মুখোশ, একজোড়া গ্লাভস, বুট, এবং প্রশস্ত ডানাযুক্ত টুপি পরিধান করতেন। কালের পরিক্রমায় সেই বিশেষ পোশাক পরিবর্তিত হয়ে আজ আমাদের সামনে এসেছে এক নতুন রূপে, যাকে আমরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা-সামগ্রী বা পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট নামে চিনি।

সতেজ বায়ু এবং ভিন্নধর্মী শিক্ষা কার্যক্রম
বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বর্তমান মহামারিকালে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও সাময়িক, আবার কোথাও দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মহামারিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ার ঘটনা এবারই নতুন নয়।
১৬৬৫ সালে প্লেগের প্রকোপ চলাকালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তখন সবাই বিশ্বাস করত, তাজা বাতাস, বিশুদ্ধ বায়ু চলাচল এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য স্বাস্থ্যের উন্নতিতে অবদান রাখে। তাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় যাতে তারা সতেজ বায়ু থেকে বঞ্চিত না হয়।
মুক্ত এবং সতেজ বায়ুর ধারণার প্রেক্ষিতে জার্মানিতে প্রথম ওপেন-এয়ার স্কুলের সূচনা হয়। ১৯১৮ সাল নাগাদ ১৩০টিরও বেশি আমেরিকান শহর সেগুলো মেনে চলা আরম্ভ করে। স্প্যানিশ ফ্লু প্রাদুর্ভাবের সেকেন্ড ওয়েভে শিকাগো এবং নিউ ইয়র্কের সরকারি বিদ্যালয়গুলো তাদের পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় নিউ ইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য কমিশনার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, "শিশুরা বিদালয়ের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে তাদের বাড়ি চলে যায়, কিন্তু ওপেন-এয়ার স্কুলগুলোতে সর্বদা শিক্ষার্থীদের পরিদর্শন এবং রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।"

সতেজ বায়ু রোগ নিরাময়ে সক্ষম- এমন ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছিল ওপেন-এয়ার স্কুল। আর ওপেন-এয়ার স্কুলের হাত ধরে মহামারিকালে জন্ম নেয় ভিন্নধর্মী শিক্ষা কার্যক্রম।

17
Monem Ahmed
একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। একবার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বেশ খেপে গেলেন একটি কাকের ওপর। কাকটি তার প্রাসাদের ওয়াচটাওয়ারে বাসা বানিয়েছিল। ভদ্রলোক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, “যে করেই হোক এ বজ্জাত কাকটিকে শেষ করেই ছাড়ব।” সমস্যা হলো তিনি যতবারই ওয়াচটাওয়ারে যান, কাকটি উড়ে পাশের একটি গাছের ডালে গিয়ে বসে থাকে। তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে চলে আসার আগ পর্যন্ত সে আর বাসায় ফেরে না।

বারবার ব্যর্থ হয়ে তিনি একটি বুদ্ধি বের করলেন। তিনি ওয়াচটাওয়ারে তার দুজন লোক পাঠালেন। কাকটি স্বভাবত উড়ে গেল। এরপর একজন লোক ওয়াচটাওয়ার ছেড়ে ফিরে আসলো। অন্যজন লুকিয়ে রইল সেখানে। দেখা গেল কাকটি তবুও বাসায় ফিরছে না। অর্থাৎ সে জানে দুজনের একজন তখনো আছে ওয়াচটাওয়ারে। দুজন ব্যক্তি আর একজন ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা রয়েছে তার।
কাক এবং ওয়াচটাওয়ার; Image Source: pinterest.com/TravelingVardo/

পরেরবার তিনজন লোক পাঠানো হলো। দুজন ফিরে আসলো, লুকিয়ে রইল একজন। কাকটি এবারও বুঝতে পারলো বিষয়টি। তবে বেশিদূর আর এগোতে পারবে না সে। পাঁচ/ছয় জন লোক পাঠালেই ধরা পড়ে যাবে। কারণ চার-এর বেশি পরিমাণের ক্ষেত্রে মধ্যে গুলিয়ে ফেলে কাকেরা। পাঁচজন আর ছয়জন লোকের মধ্যে পার্থক্য করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। 

অধিকাংশ পশু-পাখির অবস্থা এ কাকের মতোই। তাদের তো আর মানুষের মতো সংখ্যা-পদ্ধতি নেই যে জটিল সব অঙ্ক কষবে। তবে একধরনের নাম্বার-সেন্স বা সংখ্যা-বোধ আছে বলা যায়। অনেক প্রাণী এক, দুই,তিন, চার পর্যন্ত বুঝতে পারে। এরপর যা-ই আসুক তা ‘বেশি’ হয়ে যায় তাদের জন্যে।

যেমন- সিংহের কথা বলা যায়। তারা দলবদ্ধ প্রাণী। নিজেদের পরিবার-পরিজন নিয়ে একসাথে থাকতে পছন্দ করে। অন্য কোনো গোত্র কিংবা দলকে তারা তখনই আক্রমণ করে, যখন নিজেরা সংখ্যায় বেশি থাকে। অর্থাৎ ছোট-বড় পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের।
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.
অন্য গোত্রকে আক্রমনের পূর্বে হিসেব কষে নেয় সিংহরা; Image Source: Anup Shah/NPL

লাউড-স্পিকার থেকে সিংহের গর্জন বাজিয়ে তাদের এই আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন গবেষকরা। দেখা গেল, স্পিকারে গর্জন শুনে তারা বুঝতে পারে, কতটি সিংহের কণ্ঠ ভেসে আসছে। তারপর তারা তাকায় নিজেদের দলের দিকে। সংখ্যায় নিজেরা বেশি থাকলেই কেবল এগিয়ে আসে। তবে গবেষকদের মতে, গর্জনের সংখ্যা পাঁচ-ছয়ের ঘরে গেলে এটি আর ঠিকঠাক করতে পারে না তারা। সিংহের সীমিত সংখ্যা বোধ গুবলেট পাকিয়ে ফেলবে এর পর।

এদিক দিয়ে পোষা কুকুরের অবস্থা আরো খারাপ। তারা ০ ও ১ সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে কেবল। হয়তো ধরুন কোনো পাত্রে খাবার আছে নাকি নেই এটুকুই বুঝতে পারে তারা। এর বেশি পরিমাণে গেলে তাদের পক্ষে আর আলাদা করা সম্ভব হয় না। অনেকের মতে, কুকুরকে পোষ মানানোয় তারা সংখ্যা-বোধ হারিয়ে ফেলেছে। কারণ তাদের নিকটতম প্রজাতি নেকড়ের মধ্যে যথেষ্ট উন্নত সংখ্যা-বোধ দেখা যায়।

এ দাবি যৌক্তিক, কারণ গণনার বিষয়টি প্রাণীজগতে প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসেছে। যেমন ধরুন ব্যাঙ; স্ত্রী ব্যাঙ তাদের যোগ্য সঙ্গী বাছাই করার জন্যে পুরুষ ব্যাঙের ডাকের স্পন্দন সংখ্যা গুনে থাকে। অবশ্য ডাকের সময়কাল, স্বরও বিবেচনায় রাখে। তবে স্পন্দন গণনা তাদের মিলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিংবা মৌমাছির কথা ধরুন, পথ চেনার জন্যে তাদের রাস্তায় বিভিন্ন চিহ্নের হিসেব রাখতে হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রাণী প্রয়োজনের তাগিদেই গণনার চর্চা জারি রেখেছে। কিন্তু কুকুর পোষা প্রাণী বনে যাওয়ার পর হয়তো সেরকম প্রয়োজন পড়েনি তার। তাই এ দক্ষতায় তারা পিছিয়ে পড়েছে অন্যান্যদের থেকে।
গণনা বেশ প্রয়োজনীয় বিষয় তাদের জন্য; Image Source: Chris Mattison/NPL

পাখিদের সংখ্যা বোধের বলতে গেলে অ্যালেক্স নামের একটি টিয়া পাখির গল্প দিয়ে শুরু করা উচিৎ। মনস্তত্ত্ববিদ আইরিন পেপারবার্গ তার প্রিয় এ পাখিটিকে দশকের পর দশক ধরে অনেক বিষয় শিখিয়েছিলেন। তন্মধ্যে ছিল গাণিতিক দক্ষতাও। সে সর্বোচ্চ ছয় পর্যন্ত গণনা করতে পারতো।

তাকে পরীক্ষার জন্যে আইরিন একটি ট্রেতে বিভিন্ন রঙ ও আকৃতির বস্তু রাখতেন। ধরুন, গোলাপী রঙের চারটি বল, পাঁচটি সবুজ ফলক এবং তিনটি গোলাপী ফলক রাখা হলো। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কয়টি গোলাপী বল আছে ট্রেতে? সে ঠিকঠাক জবাব দিতে পারতো। এজন্য তাকে স্রেফ গণনা করলেই চলতো না, ভিন্ন রঙ ও আকৃতির মধ্যেও তফাৎ করতে হতো।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, কয়েক দশকের প্রশিক্ষণ ছিল অ্যালেক্সের ঝুলিতে। কিছু পাখিকে দেখা যায় জন্মগতভাবেই তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতা পেয়ে থাকে। যেমন- মুরগীর বাচ্চা স্রেফ তিনদিন বয়স থেকেই গুনতে শিখে যায়। তারা সমান ও ছোট-বড় পরিমাণ চিহ্নিত করতে পারে। এটুকু তো মানা যায়, কিন্তু ইতালিয়ান গবেষক রোজা রুগানি যে দাবি করেছেন তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, মুরগীর ছানাদের মানুষের মতো সংখ্যারেখার ধারণা রয়েছে।
আইরিন ও অ্যালেক্স; Image Source: youtube/ World Science Festival

সংখ্যারেখার কথা মনে আছে তো? যেটি সংখ্যাকে বাম থেকে ডানে সাজায়। রুগানি ষাটটি মুরগীর বাচ্চার ওপর পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রথমে পাঁচটি ডট সম্পন্ন একটি কার্ডের সাথে পরিচয় করানো হয় তাদের। এরপর তাদের যখন দুটি ডট সম্পন্ন কার্ড দেখানো হয়, তখন তারা বাঁ দিকে হাঁটতে শুরু করে। আটটি ডট সম্পন্ন কার্ড তাদের নিয়ে যায় ডানে। এখান থেকেই রুগানি ধারণা করেন তারা সংখ্যারেখায় দেখে সংখ্যাকে।

কিন্তু অনেকেই রুগানির এ দাবির সাথে একমত হতে পারেননি। সমালোচকদের মতে, মুরগী-ছানাদের ডানে বা বাঁয়ে যাওয়ার প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক থাকে। সেটিকে সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত করেও এ ধরনের উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। গবেষকদের এ মতবিরোধের ফলে এখনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না, মুরগী-ছানারা সংখ্যারেখা কল্পনা করতে পারে কী না। তবে এটি সত্যি হলে বুঝতে হবে, আমরা মানুষেরাও সংখ্যারেখার ধারণা জন্মগতভাবেই পেয়েছি।

অনেক প্রমাণ বলে গণনা করার দক্ষতা প্রাইমেটরা জন্মগতভাবেই পায়। তন্মধ্যে একটি হলো আমাদের নিকটাত্মীয় কিছু প্রাণীর চমৎকার গননার দক্ষতা। আই (Ai) নামের একটি জাপানি শিম্পাঞ্জির কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রথম প্রাণী হিসেবে সে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি (0, 1, 2, …, 9) শিখতে সক্ষম হয়। কম্পিউটারের পর্দায় পাঁচটি ডট দেখে সে ‘5’ সংখ্যাটি চাপতে জানে। এটি বিশাল কৃতিত্বের বিষয়। গণনা ছাড়াও ছোটখাট গাণিতিক সমস্যারও সমাধান করতে পারে শিম্পাঞ্জীরা। অবশ্য সেজন্যে আপনাকে কিছু চকলেট উপহার দিতে হবে।
গবেষকের সাথে শিম্পাঞ্জি Ai; Image Source: Jensen Walker/Aurora Select

১৯৮৭ সালে গবেষকরা এমন একটি পরীক্ষা চালান। শিম্পাঞ্জির সামনে দুই জোড়া পাত্র রাখেন তারা। প্রত্যেকটিতে কিছু সংখ্যক চকলেট ছিল। পুরষ্কার জেতার জন্যে শিম্পাঞ্জিদের প্রথমে প্রত্যেক জোড়া পাত্রে কতটি চকলেট আছে তা যোগ করতে হতো। এরপর তুলনা করতে হতো কোন জোড়ায় বেশি চকলেট রয়েছে। এরপর বাছাই করতে হতো সেট। দেখা গেল ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তারা সঠিক পাত্র জোড়া বাছাই করতে সক্ষম হয়েছে।

এসব তথ্য থেকে মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়, পশু-পাখিদের সংখ্যাজ্ঞান সম্পর্কে। কিন্তু এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলা গল্পটিই বলা হয়নি এখনো, যে ঘটনার পর থেকে গবেষকরা প্রাণীদের সংখ্যাজ্ঞান নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন।

এ গল্পের নায়ক ‘ক্লেভার হ্যান্স’ নামের একটি ঘোড়া। ১৮৯১ সালের কথা। জার্মান স্কুল শিক্ষক উইলহেম ভন ওস্টেন ঠিক করলেন, তার ঘোড়াকে গণিত শেখাবেন। যোগ-বিয়োগ দিয়ে শুরু করলেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যেই অপ্রত্যাশিত উন্নতি লক্ষ্য করলেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যেই ঘোড়াটি গুন, ভাগ, এমনকি ভগ্নাংশ পর্যন্ত শিখে গেল।ঘোড়াটির সামনে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের মতো করে প্রশ্ন দেওয়া থাকতো। খুর দিয়ে সে বাছাই করতো সঠিক উত্তরটি। ক্লেভার হ্যান্স নামে পরিচিত হয়ে উঠলো ঘোড়াটি।
ক্লেভার হ্যান্স যথেষ্ট বুদ্ধিমান হলেও অঙ্ক কষার ক্ষমতা ছিল না তার; Image Source: BBC

হ্যান্সের সুখ্যাতি ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে সময় নিলো না। দলে দলে মানুষ ভিড়তে লাগলো গণিতবিদ ঘোড়াটিকে দেখার জন্য। প্রশ্নও উঠলো- ঘোড়াটি কি আসলেই অঙ্ক কষতে সক্ষম? নাকি কোনো চালাকি রয়েছে এতে? বিষয়টি তদন্ত করার জন্যে তেরোজন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জার্মান শিক্ষা বোর্ড।

তদন্ত কমিটি মনস্তাত্ত্বিক অস্কার ফাংস্টকে নিয়ে আসে ঘোড়াটির সক্ষমতা বিচারের জন্যে। বারবার পরীক্ষার পর একটি সন্দেহজনক বিষয় নজরে পড়ে তার। ঘোড়াটিকে যিনি প্রশ্ন করছেন, তার সঠিক উত্তর জানা থাকলেই কেবল ক্লেভার হ্যান্স সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হয়। ফাংস্ট দেখান যে, ঘোড়াটি আসলে প্রশ্নকর্তার থেকে পাওয়া কিছু সূক্ষ্ম সংকেতকে কাজে লাগাচ্ছে। যখনই সে সঠিক উত্তরের দিকে যায়, কাছে দাঁড়ানো প্রশ্নকর্তার শারীরিক ভাষায় অবচেতনভাবেই কিছু সংকেত ফুটে ওঠে। সেগুলো ব্যবহার করেই সে সঠিক উত্তর বাছাই করে। এ বিষয়টি হ্যান্সের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেও তার গাণিতিক সক্ষমতার প্রমাণ কিন্তু মেলে না এতে।

অবশ্য এসব বলে ওস্টেনকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তার গণিতবিদ ঘোড়াটিকে নিয়ে তিনি জার্মানি ঘুরে বেড়াতে থাকেন। উৎসাহী জনতাকে দেখাতে থাকেন তার কৃতিত্ব। কিন্তু এ ঘটনাটি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছিল গবেষকদের। পশু-পাখিদের সংখ্যা-বোধ নিয়ে আগ্রহী গবেষকরা নতুন করে শুরু করেছিলেন তাদের অনুসন্ধান।

জীবজগত সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন এই বইগুলো

১) বিস্ময়কর প্রাণী
২) ক্ষুদে বুদ্ধিমান প্রাণী

18
Sadia Islam Bristi
প্লাস্টিক কবে আবিষ্কার করা হয়েছিল? এই যে এত হাসি-ঠাট্টা যাকে নিয়ে, সেই চীনেই কি প্লাস্টিকের শুরু? প্লাস্টিকের গল্পটা এত নতুন নয়। খ্রিস্টের প্রায় দেড় শতক আগে মেক্সিকোতে ব্যবহার করা হয় পলিমারের বল। এরপর আরও কতশত বছর পর আসে প্লাস্টিকের মতোই আরেকটি উপাদান 'পারকেসিন'। মজবুত রাবার আর নানারকম উপাদান তখন ডুবোজাহাজেও ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে, এতকিছুতেও কিছু একটা কমতি যেন ছিল সবসময়। যেজন্য নিয়মিত নতুন কিছু আনার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। তবে সেসব আবিষ্কার নিয়ে নয়, আজ আমরা কথা বলব আজ যে প্লাস্টিককে চিনি, তার শুরুটা নিয়ে। অনেকটা না চাইতেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল এই প্লাস্টিক।
বিজ্ঞানী লিও হেনরিক বায়েকল্যান্ড; Image Source: YouTube

১৯০৭ সালের ১১ জুলাই। ৪৩ বছর বয়সী বিজ্ঞানী লিও হেনরিক বায়েকল্যান্ড তখন সবে নতুন এক পদার্থ আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানী দারুণ খুশি। একটি জার্নালে নিজের সদ্য উদ্ভাবিত এই পদার্থ নিয়ে গর্ব করেন লিও। তিনি লেখেন,

    "যদি আমি ভুল না করে থাকি, আমার এই উদ্ভাবন ভবিষ্যতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হবে"।

কিন্তু বিজ্ঞানী তো একজন সামান্য মানুষ ছিলেন। তিনি কীভাবে ভবিষ্যতকে জানবেন? সেদিনের সেই উদ্ভাবন প্লাস্টিক হিসেবে বর্তমানে আমার সবার জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া লিও'র বাবা পেশায় ছিলেন একজন মুচি। বাবা নিজে পড়াশোনা করেননি। লিও কেন যে এত পড়াশোনা করতে চান, সেটাও বুঝে উঠতে পারেননি। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ছেলেকে তিনি ব্যবসার কাজে লাগিয়ে দেন। তবে লিওর মা একটু অন্যভাবেই ভাবছিলেন ছেলেকে নিয়ে।
মিস্টার প্লাস্টিকখ্যাত লিও হেনরিক বায়েকল্যান্ড; Image Source: Amazon

মায়ের উৎসাহেই কাজের পাশাপাশি নৈশ বিদ্যালয়ে পড়ে স্কলারশিপ পান লিও। মাত্র ২০ বছর বয়সে রসায়নে ডক্টরেটও করেন। জীবন বেশ ভালোই চলছিল তার। বিয়ে করে নিউ ইয়র্কে এসে নিজের আবিষ্কৃত ফটোগ্রাফিক প্রিন্টিং পেপার বিক্রি করে বেশ ভালো আয় করেন লিও। কাজ করার আর প্রয়োজন ছিল না এই বিজ্ঞানীর। তবে রসায়নের প্রতি ভালোবাসা থেকেই হাডসন নদীর পাশে নিজের ঘর, আর সাথে একটা গবেষণাগার নির্মাণ করেন তিনি। সেবার সেখানেই ফরমালডিহাইড এবং ফেনল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন।
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.

না চাইতেই তার এই পরীক্ষা নতুন এক আবিষ্কারের সূচনা করে দেয়। টাইম ম্যাগাজিনে পরবর্তী সময়ে বড় বড় করে ছাপা হয় তার এ আবিষ্কারের কথা। সেদিনই প্লাস্টিকের আবিষ্কার করেছিলেন লিও। নিজের নতুন এই আবিষ্কারের নাম দিয়েছিলেন 'বেকলাইট'। প্লাস্টিকের গুরুত্ব নিয়ে খুব একটা ভুল বলেননি লিও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তার এই আবিষ্কার। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের দৌরাত্ম্য এতটাই বেশি যে, সুজান ফ্রেইনকেল যখন এ নিয়ে নিজের বই 'প্লাস্টিক: আ টক্সিক লাভ স্টোরি' লেখেন, তাতে তিনি একটি গোটা দিনে তার ব্যবহৃত সব প্লাস্টিকের উপাদানের নাম লেখেন। আর তাতে দেখা যায় যে, একটি দিনে তার ব্যবহার করা ১৯৬টি জিনিসই প্লাস্টিকের তৈরি। অন্যদিকে প্লাস্টিক নয়, এমন জিনিসের সংখ্যা মাত্র ১০২!
সুজান ফ্রেইনকেলের বই ; Image Source: Amazon

প্লাস্টিকের পূর্ববর্তী রকম সেলুলয়েড তখনো রাজত্ব করছিল। সেটি সরিয়ে দিয়ে সে জায়গা দখল করে প্লাস্টিক। তবে বায়েকল্যান্ডের বুঝতে বেশি দেরি হয়নি যে, প্লাস্টিক সেলুলয়েডের চাইতেও অনেক বেশি ভিন্নতা ধারণ করতে সক্ষম। তিনি প্রচারণা শুরু করেন ভিন্ন ধারায়। এই একই উপাদানের হাজারটা ব্যবহার আছে, এমনটা বলে খুব একটা ভুল বলেননি লিও। টেলিফোন, বন্দুক, কফি মেকার- সবকিছুতেই একটু একটু করে প্রবেশ করে প্লাস্টিক। আর বেকলাইটের এ সাফল্যের পরই মানুষের মধ্যে চিন্তা কাজ করে, প্রকৃতিতে নেই এমন উপাদান তৈরি করার।

ইতোমধ্যে, ১৯২০-১৯৩০ এর মধ্যে প্লাস্টিক গবেষণাগার থেকে শুরু করে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় প্লাস্টিক ছিল পলিস্টিরিন, পলিথিলিন ও নাইলন আকারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানুষ প্লাস্টিকের ওপর অনেক বেশি ঝুঁকে পড়ে। আর সেখান থেকেই যুদ্ধের পরে জন্ম নেয় টাপারওয়্যারের মতো নিত্যনতুন সব পণ্য।

১৯৬৭ সালে 'দ্য গ্রাজুয়েট' নামক একটি চলচ্চিত্র বেশ পরিচিতি লাভ করে। সেখানে এক বয়স্ক নাগরিক একজন তরুণকে উপদেশ দিতে গিয়ে প্লাস্টিকের কথা বলেন। সেখানে প্লাস্টিক তখনো আগের প্রজন্মের কাছে নতুনত্ব আর নতুন সম্ভাবনার প্রতীক ছিল। আর এখন, এখনও সেটা ঠিক আগের মতোই আছে। আমাদের মানসিক দিক দিয়ে না হলেও, পরিমাণগত দিক দিয়ে প্রতি বছর প্লাস্টিকের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। যা বিশ বছর পর গিয়ে পরিমাণে দ্বিগুণ হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্লাস্টিক- ভালো, না খারাপ?

আপনার মনে হতেই পারে যে, প্লাস্টিক পরিমাণে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে এবং এর হাত থেকে এখনই মুক্তি না পেলে সেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর ফলাফল বয়ে আনবে। হ্যাঁ, কথাগুলো একেবারে মিথ্যে নয়। প্লাস্টিক মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো কোনো বস্তু নয়। এটি পানিতেও মিশে যায় না। ফলে প্রাণীদের উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে আনা থেকে শুরু করে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত বয়ে নিয়ে আসে প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক দিকের কারণে একজন মানুষের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাও তৈরি হয়। আবার, প্লাস্টিকের আছে ভালো দিকও। এই যে বড় বড় গাড়ি চলছে পথে, প্লাস্টিকের ব্যবহার হয় বলেই এরা এত হালকা হতে পারে এবং জ্বালানি খরচ কমে আসে।
এই প্লাস্টিকের বোতল পানিতেও মিশে যায় না; Image Source: magazine.columbia.edu

ভঙ্গুর গ্লাসের বদলে প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করাটা নিরাপদ। এছাড়া, খাবার অনেকটা সময় ভালো থাকে প্লাস্টিকের কারণেই। কিন্তু এই ভালোগুলো তখনই নেওয়া সম্ভব, যখন বাড়তি প্লাস্টিক রিসাইকেল করা হয়। এ লক্ষ্যে কাজ করছে অনেকগুলো দেশ। প্লাস্টিকের গায়ে তিনকোনা একটি চিহ্ন নিশ্চয় দেখেছেন? সেখানে এক থেকে সাত পর্যন্ত সংখ্যা দেওয়া থাকে। এটি হলো রেজিন আইডেন্টিফিকেশন কোড। এ অনুযায়ী প্রতিটি দেশ তাদের প্লাস্টিককে কমিয়ে আনার বা রিসাইকেল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমস্যা হলো, সবগুলো দেশে এ পরিমাণ এক নয়।

অনেক দেশ অবশ্য এক্ষেত্রে সফল হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তাইওয়ানের তাইপে-কে দেখা যায়। যেখানে, প্লাস্টিককে রিসাইকেল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নাগরিকদের জন্য। রিসাইকেলের পদ্ধতিটি সহজ। আর এমনটা না করলে জরিমানা দিচ্ছেন নাগরিকেরা। প্রোটোসাইক্লার নামক এই যন্ত্রটি বেশ অভিনব। আপনি একদিন দিয়ে প্লাস্টিক প্রবেশ করালে যন্ত্রটি সেটাকে থ্রিডি প্রিন্টারের ফিলামেন্টে পরিণত করে দেবে।
প্লাস্টিক রিসাইকেলের নতুন পদ্ধতি প্রোটোসাইক্লার; Image Source: popsci.com

অনেক বাধাবিপত্তি এসেছে এবং আসছে এই গবেষণায়। প্লাস্টিক নিয়ে নতুন কী করা যায়, তা ভাবছেন সবাই। প্লাস্টিক বর্তমানে খুব অবহেলার একটি ব্যাপার হয়ে পড়েছে। তবে একটা সময় এটি মোটেও এমন ছিলো না। আশা করা যায় যে, প্লাস্টিককে ফেলে দেওয়ার জিনিস না ভেবে নতুন করে ব্যবহার করার উপায় হিসেবে ভাবতে শুরু করবেন একটা সময় সবাই। আর লিও বায়েকল্যান্ড? এমনটা সম্ভব হলে তিনিও হয়তো খুশিই হবেন!

19
Zahid Hasan Mithu
১৯১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন অন্তিমদশায়। সেসময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড লয়েড জর্জ। মিত্রশক্তির সাফল্যে তিনি তখন বেশ উল্লসিত। দেশে অবস্থানরত সৈন্য এবং যুদ্ধোপকরণ তৈরির নারী কর্মীদের সাময়িক ছুটি দিয়ে তাদের সাথে নিয়ে ম্যানচেস্টার সফরে যান লয়েড জর্জ। পিকাডিল্লি স্টেশন থেকে আলবার্ট স্কয়ারের পুরো যাত্রাপথে তারা উল্লাস করতে করতে যান।

কিন্তু সন্ধ্যায় হঠাৎ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জ্বর ও গলাব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর লয়েড জর্জকে টানা ১০ দিন ম্যানচেস্টারের টাউন হলে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়েছিল। এত বেশি অসুস্থ ছিলেন যে তাকে হাসপাতালের নেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। টাউন হলে তাকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল।

লয়েড জর্জের বয়স তখন ৫৫ বছর। ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে অধিকাংশ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের ধারণা ছিল তার অসুস্থতার পেছনে জার্মানির হাত রয়েছে। তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসকরা সেই দাবি নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে জানা যায় তিনি স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ; Image Source: BBC

স্প্যানিশ ফ্লুর নাম তখনও নির্ধারণ করা হয়নি। এই নামকরণ হয়েছিল অনেক পরে। তবে সে যাত্রায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভাগ্যবান ছিলেন। এবং কোনোক্রমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটেনের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ তার মতো ভাগ্যবান ছিলেন না। তারা স্প্যানিশ ফ্লু নামক সেই ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করেন, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া মোট ব্রিটিশ সেনা ও সাধারণ নাগরিকের চেয়ে অনেক বেশি।

বৈশ্বিকভাবে এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ছিল কল্পনাতীত। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, সেই সময় পুরো বিশ্বে স্প্যানিশ ফ্লুর কারণে মারা গিয়েছিল প্রায় ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন মানুষ, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মৃতের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। ধারণা করা হয়, প্রকৃত সংখ্যা উভয় বিশ্বযুদ্ধের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.
কোথা থেকে স্প্যানিশ ফ্লুর উৎপত্তি

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, স্প্যানিশ ফ্লু সম্ভবত কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হচ্ছে। স্পেন থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক সংবাদমাধ্যমই এমন খবর প্রকাশ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, এই তথ্য ভুল। স্প্যানিশ ফ্লুর জন্য দায়ী ছিল এক নতুন ধরনের ভাইরাস। পরবর্তীতে গবেষণার মাধ্যমে সনাক্ত করে যার নাম দেওয়া হয় 'এইচ ওয়ান এন ওয়ান ভাইরাস (H1N1), তবে প্রাথমিকভাবে এর নাম ছিল স্প্যানিশ ফ্লু।
স্প্যানিশ ফ্লু সৃষ্টিকারী এইচ ওয়ান এন ওয়ান ভাইরাসের বিবর্ধিত ছবি; Image Source: SPL/Fotostock

১৯১৭ সালের ৬ এপ্রিল, মিত্রপক্ষে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু যুদ্ধে যোগ দেয়ার কয়েক মাসের মাথায় তারা বিশাল এক সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলে, যার মধ্যে থেকে প্রায় দুই মিলিয়ন সেনা ইউরোপে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়।

বিশাল সৈন্যবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তখন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল না। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদেই তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন ক্যাম্প তৈরি করে। এর মধ্যে একটি ছিল কানসাসের ফোর্ট রাইলি। সেখানে সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নতুন করে ক্যাম্প ফান্সটন তৈরি করা হয়।

ক্যাম্প ফান্সটনে মোট ৫০ হাজার সেনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে ১৯১৮ সালের মার্চের শুরুতে প্রথমে এক সৈন্য জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় আরো শতাধিক সেনা একই কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। মূলত এটি ছিল স্প্যানিশ ফ্লুর উৎপত্তি, যার মূল কারণ ছিল পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব।
কানসাসের ক্যাম্প ফান্সটনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত রোগীরা; Image Source: AP/National Museum of Health

একই জায়গায় বহু সংখ্যক সেনা থাকার কারণে সেখানে খুব সহজেই রোগের বিস্তার ঘটেছিল। পরবর্তীতে এপ্রিলে যখন মার্কিন সেনারা নিজ দেশ ছেড়ে ইউরোপের যুদ্ধের ময়দানে আসে, তখন তারা সাথে করে সেই ভাইরাসও নিয়ে আসে। এরপর তাদের থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। স্প্যানিশ ফ্লুর হাত থেকে পৃথিবীর কোনো অংশই ছাড় পায়নি। এশিয়া, আফ্রিকাসহ প্রশান্ত মহাসাগরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল।
স্প্যানিশ ফ্লু নাম হওয়ার কারণ

স্প্যানিশ ফ্লুর ৩০ বছর আগে ইউরোপে রাশিয়ান ফ্লুর সংক্রমণ হয়েছিল, যার উৎপত্তিস্থল ছিল উজবেকিস্তানের বুখারা। উজবেকিস্তান সেই সময় রাশিয়ার অংশ ছিল। যে কারণে সেই ভাইরাসের নাম হয়েছিল রাশিয়ান ফ্লু। কিন্তু স্প্যানিশ ফ্লুর নামকরণ হয়েছিল অন্যায়ভাবে। কারণ এই ভাইরাসের উৎপত্তি স্পেনে হয়নি। আবার তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধেও জড়ায়নি। কিন্তু তাদের এই নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণেই ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের সাথে তাদের নাম জুড়ে গেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশগুলোর সরকার তাদের সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনও ছিল। সরকারের অনুমতি ছাড়া সেসব দেশের সংবাদমাধ্যম সংবেদনশীল কোনো খবর প্রকাশ করতে পারতো না। কিন্তু স্পেন যেহেতু নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিল তাই তাদের সংবাদমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

যার ফলে রাজা ত্রয়োদশ আলফানসো এবং তার মন্ত্রীসভার বেশ কয়েকজন সদস্য যখন বিশেষ সেই ভাইরাসে সংক্রমিত হন, তখন স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম সেই খবর বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের কারণে তখন ইউরোপে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাসের কথা শোনা যায়। যদিও এর আগেই ইউরোপে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছিল।
Image Source: National Photo Company/ Library of Congress

কিন্তু ব্রিটেন, ফ্রান্স কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার চায়নি তাদের জনগণ নিজ দেশে এমন রোগের কথা জানতে পারুক। ফলে নিজেদের যুদ্ধের যৌক্তিকতাকে ধরে রাখার জন্য তারা এই খবর গোপন করেছিল। এরপর স্পেনের সংবাদপত্র যখন তাদের রাজার অসুস্থ হওয়ার খবর প্রকাশ করে, তখন ব্রিটেনের ও ফ্রান্সের নেতারা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে স্পেনের নাম প্রচার করে। যার ফলে তখন ভাইরাসটির হয়ে যায় 'স্প্যানিশ ফ্লু'।

কিন্তু স্প্যানিশরা জানতেন তারা এই ভাইরাসের জন্য দায়ী নন। এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য তারা ফরাসি সেনাদের সন্দেহ করেছিল। কিন্তু তাদের হাতে শক্ত কোনো প্রমাণ ছিল না। তখন তারা এই মিথ্যা অপবাদ ঘুচানোর জন্য অভিনব এক উপায় বের করে। রাজধানী মাদ্রিদের জারজুয়েলা থিয়েটারে ডন জুয়ানের একটি মিথ মঞ্চায়নের সময় 'দ্য সোলজার অব নেপলস' নামে একটি গান খুবই জনপ্রিয় হয়। যে গানটি সেই ভাইরাসের মতোই দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে স্প্যানিশরা ভাইরাসটিকে 'সোলজার অব নেপলস' নাম দেয়।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে শতবর্ষ আগের সেই মহামারী ভাইরাসের আসল পরিচয় এখনো 'স্প্যানিশ ফ্লু'। স্পেনে ভাইরাসটির উৎপত্তি না হলেও সেখানকার লাখ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। এমনকি স্পেনে মৃত্যুর হার ব্রিটেনের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। আর ডেনমার্কের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল।

স্প্যানিশ ফ্লুতে সবচেয়ে বেশি জীবনহানি ঘটেছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে। এখানকার দেশগুলোতে মৃত্যুর হার ইউরোপের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি ছিল। অথচ ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এই হার ছিল সর্বনিম্ন।
এভাবেই আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়া হয়েছে; Image Source: Library of Congress/ Interim Archives

স্প্যানিশ ফ্লুর আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মারা যান ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুর হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম। যদিও গর্ভবতী নারীদের সংক্রমিত হবার আশঙ্কাই অধিক ছিল। তবে পরিণত বয়সের নারী ও পুরুষ উভয়ই সংক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং মারা গেছেন। একই ধরনের ঘটনা সারাবিশ্বেই লক্ষ্য করা গেছে।

মৃতের হার শহরের তুলনায় গ্রামে তুলনামূলক কম ছিল। তবে কিছু শহর একেবারে জনশূন্য হলেও পাশের কোনো শহরে ক্ষতির হার কম হওয়ার নজিরও ছিল।
ভয়ঙ্কর গতিতে জীবনহানি

স্প্যানিশ ফ্লু যে দ্রুততার সাথে মানুষকে সংক্রমণ করেছিল তা এর আগে এবং পরে কখনোই দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে এমনও হয়েছে যে, কেউ সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় অসুস্থবোধ করেছেন। এরপর নাস্তা সেরে অফিস যাওয়ার পথেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

এই রোগের লক্ষণগুলোও ছিল ভয়ঙ্কর। প্রথমে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট হতো। দেহে অক্সিজেনের অভাবে কিছুটা নীলবর্ণ ধারণ করতো। এরপর শ্বাসযন্ত্রে রক্ত জমে বমি ও নাক দিয়ে রক্তপড়া শুরু হতো। অনেকেই নিজেদের রক্তে গড়াগড়ি খেয়ে মারা যেতেন।

এই ভাইরাস অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- ১৯১৮ সালে পারস্য তথা ইরান ছিল বিশ্বের অন্যতম এক ব্যর্থ রাষ্ট্র। রাশিয়া ও ব্রিটেনের প্রতিযোগিতার কারণে সেখানকার সরকার দুর্বল ও প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। ফলে সেখানে সঠিক কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল না।

১৯১৮ সালের আগস্টে যখন ইরানের উত্তর-পূর্বের মাশাদ শহরে স্প্যানিশ ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে, তখন এক রাতের মাথায় মহামারী আকার ধারণ করে। এবং দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। কিন্তু এরপরও চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা না দেয়ায় তা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। যখন অবস্থার উন্নতি হয় তখন দেখা যায় শহরের শতকরা ৮ থেকে ২২ ভাগ মানুষ মারা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অকল্যান্ডের এক অস্থায়ী হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে; Image Source: Underwood Archives/Getty Images

১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে স্প্যানিশ ফ্লু সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে মোট ১৩ সপ্তাহে পৃথিবী জুড়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রাণহানি ঘটায় এই ভাইরাস। শুধু অক্টোবর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যায়, যেখানে পুরো প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মারা গিয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজারের কিছু বেশি।

এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সেই সাথে কবর খননকারী ও সৎকার ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যান। ফলে অনেক মানুষকে একসাথে গণকবর দিতে বাধ্য হন তারা।

১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে স্প্যানিশ ফ্লু শেষবারের মতো আঘাত হানে। প্রথমভাগে এই ভাইরাসের গতি কম ছিল। তবে দ্বিতীয় ভাগে তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। এরপর শেষ ধাপে এসে ভাইরাসটির ক্ষিপ্রতা অনেকাংশে কমে যায়। কিন্তু এরপরও ১৯২০ সালের মার্চে বিদায় নেওয়ার আগে ব্রিটেনে ২ লাখ ৫০ হাজার, যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ ৭৫ হাজার, জাপানে ৪ লাখ এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ সামোয়ার এক-পঞ্চমাংশ লোক মৃত্যুবরণ করেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে

১৯১৮ সালে ইউরোপ ও আমেরিকায় স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী আকার ধারণ করে। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ভারত। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রচুর সংখ্যক সেনা ব্রিটেনের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, যাদের মাধ্যমে পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী আকার ধারণ করে।

ব্রিটিশ ভারতে মানুষের স্যানিটেশন ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ পর্যায়ে। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতাও বেশি ছিল না। স্প্যানিশ ফ্লু সবচেয়ে বেশি প্রাণহানী ঘটায় উপমহাদেশে। সংখ্যায় যা ছিল প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিলিয়ন। অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল শুধুমাত্র এক ভাইরাসের আক্রমণে। একক দেশ হিসেবে যা ছিল সর্বোচ্চ। তবে সঠিক সংখ্যা কখনোই জানা যায়নি। সঠিক হিসাব করলে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সেনা; Image Source: The Print Collector

তবে বিশ্বব্যাপী স্প্যানিশ ফ্লুর ভয়াবহতা ছড়ানোর জন্য দায়ী হলো যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশগুলো। ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ববর্তী সময়ে রোগ ছড়ানো ছিল খুবই সাধারণ এক বিষয়। এর মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকা সত্য জানার পরেও গোপন রেখেছিল, যা এই ভাইরাসকে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করেছিল।

যুদ্ধের ময়দানে বুলেটের আঘাতে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি নিরপরাধ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে সৃষ্ট এক ভাইরাসের কারণে। এ কারণেই আমাদের যুদ্ধের পথ পরিহার করা উচিত। যুদ্ধ শুধু একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে না। সেই সাথে কেড়ে নেয় কোটি মানুষের প্রাণ।

20
Musavvir Mahmud Seazon
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অক্সিজেনের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে খাবার। সেই প্রাচীনকাল থেকেই একমুঠো খাবারের আশায় সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ করে অসংখ্য মানুষ। তবে অর্থনীতি আর সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে খাবারের ধরনেরও পরিবর্তন এসেছে। আগে দরকারের বাইরে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত খাবার কথা চিন্তাই করত না, অথচ আজকাল প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই রেস্টুরেন্টে খাবার খায়। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি রেস্টুরেন্টের বদৌলতে নানা দেশের নানা স্বাদের খাবারও আজকাল খাবার সুযোগ মিলছে। কিন্তু এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে খাবার নষ্ট আর অপচয় হওয়া। অথচ বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে খাবারের চাহিদা, প্রচুর খাবার নষ্ট হবার পরেও অভুক্ত থেকে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রচুর খাবার; Image:  Shutterstock
খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের সংজ্ঞা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (FAO) হিসেব অনুযায়ী, পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত খাবারের এক-তৃতীয়াংশ খাবার নষ্ট কিংবা অপচয় হচ্ছে! খাদ্য অপচয় কিংবা খাদ্য নষ্ট হওয়ার সংজ্ঞা বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বিভিন্নভাবে দিলেও পাঠকদের পড়ার সুবিধার্থে দুটি সহজ সংজ্ঞা এই লেখায় ব্যবহার করা হয়েছে। খাবার নষ্ট বলতে বোঝানো হয় উৎপাদন থেকে গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবহনের সমস্যা কিংবা সঠিকভাবে মজুদ না করার কারণে খাবার ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে খাবারের অপচয় হচ্ছে যখন গ্রাহক বা ভোক্তার কারণে খাবার নষ্ট হয়। সম্পূর্ণ ভালো একটি খাবার শুধুমাত্র পছন্দমত রঙ বা আকারের না হওয়ায় অনেকে ফেলে দেন। আবার একসাথে অনেক খাবার কিনে খেতে না পারার ফলে অপচয় করেন অনেক গ্রাহক। আর রেস্টুরেন্টে কিংবা রান্না করা খাবার নষ্ট করা তো আজকাল খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে। 
খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয় যেভাবে

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে খাবার নষ্ট বা অপচয় বাসা-বাড়িতেই বেশি হয়। কিন্তু বাস্তবে খাবার ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকে নষ্ট হওয়া শুরু হয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বেশ লম্বা একটি প্রক্রিয়া কাজ করে। আর সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় এই পর্যায়েই। তবে যেসব দেশ প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে তাদের এই ক্ষেত্রে নষ্ট হবার পরিমাণ অন্যান্য দেশগুলোর থেকে কম স্বাভাবিকভাবেই।

খরা, বন্যা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় পোকামাকড় কিংবা অণুজীবের আক্রমণে ফসলের বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। অনুন্নত দেশে সঠিকভাবে ফসলের যত্ন নিতে না পারার কারণে উৎপাদন কম হতে পারে। পশুপাখির খামারেও বিভিন্ন সময় রোগ দেখা দেয়। ফলে খাদ্য নষ্ট হওয়া একেবারে খাদ্য উৎপাদনের প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হয়। ফসল সঠিকভাবে উৎপাদন হলেও ভোক্তা পর্যন্ত যাবার জন্য স্বল্পস্থায়ী কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মজুদ করতে হয়। সঠিক উপায়ে মজুদ না করার কারণেই প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। এরপরে রয়েছে পরিবহনের সময় খাবার নষ্ট হওয়া। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে খাবার নষ্ট হয়, পরিবহনের জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুত না করায় গরমে বা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় কাঁচা ফল বা সবজি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মাছ-মাংস পরিবহন করা গাড়ির রেফ্রিজারেটর নষ্ট হয়ে মাছ-মাংস নষ্ট হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয় প্রচুর খাবার; Image: sapei.com

উৎপাদন পর্যায়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পরিবহন দুর্ঘটনার কারণে নষ্ট হলেও ভোক্তাদের হাতেও খাবার কম অপচয় হয় না। উন্নত দেশে অনেকেই খাবারের রঙ বা আকার একটু অন্যরকম হলেই আর কিনে না! ফলে একটু বেখাপ্পা দেখতে সবজি বা ফলগুলো শেষপর্যন্ত ময়লার ঝুড়িতেই যায়। আবার অনেকে বাসায় অতিরিক্ত খাবার কিনে রেখে দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো না খেয়ে ফেলে দেয়। দাওয়াত কিংবা রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত খাবার নিয়ে না খাওয়া তো আজকাল খুবই সাধারণ কিন্তু ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার প্যাকেটজাত খাবার কিনে মেয়াদ কতদিন আছে খেয়াল না করায় মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ফেলে দিতে হয়। আমাদের বাসা বাড়িতেই আমরা না খাওয়া যে খাবার ময়লার ঝুড়িতে ফেলি সেটি আমাদের দৃষ্টিতে অনেক কম মনে হলেও সামগ্রিকভাবে এভাবে প্রচুর পরিমাণে খাবার অপচয় করছি আমরা সবাই, প্রায় প্রতিদিনই!
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.

খাদ্য উৎপাদন আর ভোক্তার মাঝামাঝি পর্যায়েও অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। হঠাৎ করে কোনো ফসলের দাম বেড়ে গেলে সেটি অনেক সময় বিক্রি কমে যায়। ফল বা সবজি যেহেতু পচনশীল, তাই এরকম পরিস্থিতিতে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। আবার ফসলের দাম কমে গেলেও অনেক সময় কৃষকরা প্রতিবাদস্বরূপ ফসল নষ্ট করে। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় ফসলের দাম কমে গেলে কৃষকরা রাস্তায় ফসল ফেলে প্রতিবাদ করেন। আবার অনেক বড় বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কোম্পানি তাদের কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে খুবই খুঁতখুঁতে হয়। এতে দেখা যায় তারা একজন কৃষকের উৎপাদিত সব ফসল না নিয়ে কিছু অংশ নেয়। বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রায়ই বলতে শোনা যায় "বিশেষভাবে বাছাইকৃত … দিয়ে তৈরি’'। এই বিশেষভাবে বাছাইয়ের পর বেঁচে যাওয়া ফসল বা ফলগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়। আর এভাবেই উৎপাদন পর্যায়ে বা ভোক্তার দ্বারা খাবার নষ্ট বা অপচয় না হয়েও খাবার নষ্ট হচ্ছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকারখানায় নষ্ট হয় প্রচুর খাবার; Image: nutraingredients.com
খাবার অপচয়ের কিছু পরিসংখ্যান

খাবার অপচয় সবচেয়ে বেশি হয় উৎপাদন পর্যায়ে, সেটি পৃথিবীর সব অঞ্চলেই। তবে গ্রাহক পর্যায়ে অপচয় ধনী ও উন্নত দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি। FAO এর তথ্য অনুসারে, শিল্পোন্নত দেশগুলো অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ খাবার নষ্ট ও অপচয় করে। আর সব অঞ্চলেই নষ্ট খাবারের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফল আর শাকসবজি। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, ধনী দেশগুলোতে প্রতিবছর যে পরিমাণ খাবার অপচয় হয় সাব-সাহারা অঞ্চলের মোট খাদ্য উৎপাদন প্রায় একই পরিমাণ! ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ধনী দেশগুলো যে পরিমাণ জনপ্রতি যে খাবার নষ্ট ও অপচয় হয় তা আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার জনপ্রতি খাবার নষ্টের প্রায় ১০ গুণ বেশি! সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে অর্থের সাথে সাথে খাবার নষ্ট ও অপচয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকে। 
ধনী দেশগুলো খাদ্য অপচয়ে সবচেয়ে এগিয়ে; Image: FAO
খাদ্য অপচয় রোধে আমাদের করণীয়

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগ-জীবানুতে নষ্ট হওয়া কিংবা পরিবহনের সময় নষ্ট হওয়া খাবারের ব্যাপারে আমরা ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি কিছু করতে না পারলেও আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের খাবারের অপচয় কিন্তু আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

    শুরুটা বাজার করা দিয়েই করা যাক। অনেকেই বাজারে গেলেই একগাদা বাজার করে বাসায় ফেরেন, অথচ এত খাবার কেনার কিন্তু কোনো দরকারই ছিল না। এতে দেখা যায় সপ্তাহ শেষে কিছু খাবার ফ্রিজেই নষ্ট হয়েছে বা নষ্ট হবার পথে। সুতরাং বাজার করার সময় অতিরিক্ত বাজার করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
    অনেক সময় বাজার পরিমিত পরিমাণে করলেও সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোন খাবার কোথায়, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় এ ব্যাপারে জ্ঞান থাকাটাও জরুরি। যেমন- আলু, পেঁয়াজ খোলা জায়গায় রাখলে কিংবা শাক-সবজি ফ্রিজে বায়ুরোধক ব্যাগে রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
    এরপর রয়েছে রান্না করা খাবার নষ্ট করা। আমরা কে কতটুকু খাবার খেতে পারি এ ব্যাপারে সবারই ধারণা আছে। কিন্তু তারপরেও ‘চোখের ক্ষুধা’ মেটানোর জন্য আমরা অতিরিক্ত খাবার প্লেটে নেই যার অনেকটাই শেষে নষ্ট হয়। এটি সবচেয়ে বেশি হয় বিয়ে বাড়ি কিংবা দাওয়াতে। অনেকে তো দাওয়াতে অন্যদের সাথে পাল্লা দিয়ে খেতে বসেন। এতে খাবার যেমন অপচয় হয়, নিজের স্বাস্থ্যেরও কিন্তু ক্ষতি হয়। অতিরিক্ত এবং অকারণে খাবার কারণে আজকাল খুব অল্প বয়সেই অনেকের হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগ হচ্ছে। তাই খাবার সময় আমরা যতটুকু খেতে পারব ততটুকুই নেয়া উচিত। প্রথমেই অনেকগুলো না নিয়ে অল্প অল্প করে নিয়েও অনেক বেশি খাওয়া যায়- খেতে বসে এ কথাটি মাথায় রাখলেই খাবারের অপচয় অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
    প্যাকেটজাত খাবার কেনার ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া উচিত। পাউরুটির মতো স্বল্পমেয়াদী খাবার কেনার সময় অবশ্যই মেয়াদ কতদিন বাকি আছে দেখে কেনা উচিত। সেই সাথে এই মেয়াদের ভেতরে খাবারটি পুরোটি শেষ করা সম্ভব হবে কি না সেটিও মাথায় রাখা উচিত। যদি এমন হয় যে মেয়াদ শেষ হলেও রান্না করে বা অন্য কোনো উপায়ে সংরক্ষণ করা যায় তাহলে সেই ব্যবস্থাও নেয়া উচিত।
    বিয়ে বা দাওয়াতের বেঁচে যাওয়া খাবার এতিমখানা বা পথশিশুদের দিয়ে দেয়া যায়। বর্তমানে বেশ কিছু সংগঠন আছে যারা এ রকম বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে।
    নষ্ট হয়ে যাওয়া সার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আজকাল অনেকেই বাসায় ফুল কিংবা সবজি চাষ করেন। কোনো খাবার ফেলে না দিয়ে সেটি দিয়ে কম্পোজিট সার বানিয়ে সহজেই গাছে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে খাবার নষ্ট হলেও অন্য কাজে ঠিকই লাগলো আবার গাছের যত্ন নেয়ার জন্য আলাদা খরচও করতে হলো না।
    খাবারের অপচয় রোধ এখন সময়ের দাবি; Image: nicolscales.com

খাবারের অপচয় বন্ধ করা জরুরি কেন

শুধুমাত্র গরীবেরা খাবার পাচ্ছে না তাই খাবার অপচয় বন্ধ করা বা কমানো দরকার এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। খাবার অপচয় শুধু খাবারের অপচয় না, একই সাথে অর্থ, শ্রম, শক্তির অপচয়। ফসল ফলানো থেকে খাবার কেনা পর্যন্ত প্রচুর মানুষ জড়িত। এতে তারা তাদের অর্থ দেন, শ্রম দেন। কিন্তু তাদের দেয়া অর্থ আর শ্রমের খাবার যদি নষ্ট হয় তাহলে সেই অর্থ আর শ্রমও নষ্টই হয় শেষ পর্যন্ত। ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ পরিবহন, ট্রাক্টর কিংবা ফসল পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়ি জ্বালানি পুড়িয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে খাবার প্রক্রিয়াজাত কারখানা থেকে নিঃসরিত হচ্ছে বিভিন্ন গ্রীনহাউস গ্যাস। রান্না করা খাবার তৈরিতেও কিন্তু জ্বালানী ও পানির প্রয়োজন হয়। খাবার যদি নষ্টই হয় শেষ পর্যন্ত তাহলে একই সাথে প্রচুর জ্বালানী নষ্ট হচ্ছে আর সাথে বায়ুমন্ডলে যোগ হচ্ছে গ্রীনহাউস গ্যাস। আবার অন্যদিকে খাবার সাথে পানিরও অপচয় হচ্ছে। ফলে একদিকে খাবার যেমন নষ্ট হলো, পরিবেশেরও ক্ষতি হলো। খাবার নষ্ট না হলে অন্তত একদিক থেকে তো লাভ ছিল! সবদিক বিবেচনা করলে খাবার নষ্ট বা অপচয় হলে শুধু খাবারই নষ্ট হয় এমন না, বরং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতিও যুক্ত হয়।
খাবারের অপচয় পরিবেশ দূষণের ভূমিকা রাখছে; Copyright: James P. Blair

পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ খাবার না পেয়ে মারা যাচ্ছে, অথচ এরপরেও প্রতিদিন খাবার নষ্ট হচ্ছে। আবার সমন্বয়হীনতা, সদিচ্ছা, দুর্নীতির কারণে উৎপাদিত খাবারও সবার কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।উৎপাদন পর্যায়ের কথা বাদ দিলেও ভোক্তা পর্যায়ে যে পরিমাণ অপচয় হয় তা দিয়েও অনেক পরিবারের সারা বছরের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু আমরা ব্যক্তিপর্যায়ে অন্তত নিজেদের সংশোধিত করতেই পারি। এতে হয়তো দারিদ্রপীড়িত অঞ্চলের মানুষেরা সরাসরি খাবার পাবে না, কিন্তু নিজের লাভটাও কম হবে না। নিজের খাবার নষ্ট করা মানে নিজের কষ্টার্জিত টাকারই অপচয়। তাই খাবার অপচয় রোধে সবারই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

21
Uchsash Tousif
বিস্মৃত এগারো জন বাঙালি বিজ্ঞানীকে নিয়ে অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয় 'মেঘে ঢাকা তারা: বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া বাঙালি বিজ্ঞানী'। ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত এই বইটি লিখেছেন অতনু চক্রবর্ত্তী।

বইটিতে যে এগারোজন বাঙালি বিজ্ঞানীর কথা উঠে এসেছে, তাদের প্রায় কারো নামই এখন আর সেভাবে শোনা যায় না। প্রতিবছর গুগল হয়তো এদের কারো কারো প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ডুডল করে, কিন্তু সেই মানুষটির কাজ, বা তাকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না বললেই চলে।
'মেঘে ঢাকা তারা' বইয়ের প্রচ্ছদ; Image Source: Atonu Chakrabortty

দুঃখজনক হলেও সত্যি, তাদের না চিনলেও তাদের কাজের সঙ্গে আমরা পরিচিত। এর অনেকগুলো আমাদের চোখের সামনেই আছে, আবার কিছু কাজ থেকে আমরা প্রতিদিনের জীবনে প্রচুর সুবিধাও ভোগ করছি। শুধু কাজগুলোর সঙ্গে মানুষগুলোর নাম নেই দেখে আমরা তাদেরকে চিনতে পারি না। যে মানুষগুলো এদেশে বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, আবিষ্কার করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত বেশ কিছু জিনিস, তাদের এভাবে আড়ালে পড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ, তারা বাঙালি।

নির্মম এই সত্যটি আমাদের জন্য বড় লজ্জার। আশার কথা হলো, একেবারে ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাওয়ার আগেই লেখক অতনু চক্রবর্ত্তী এই বিজ্ঞানীদের জীবন ও কাজ তুলে আনার চেষ্টা করেছেন দুই মলাটে। নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করে দিতে চেয়েছেন তাদের সাথে। বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

    মেঘে ঢাকা তারা একটি ভিন্ন ধরনের বই। আমরা যখন কোনো শিল্পী, সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানীকে নিয়ে বই লিখি, সবসময়ই তখন বিখ্যাত কাউকে বেছে নেই। আমরা ধরেই নিয়েছি কারো জীবনী লিখতে হলে এমন কাউকে বেছে নিতে হবে যাকে সবাই এক নামে চেনে। অতনু চক্রবর্ত্তী কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কাজ করেছেন। তার বইটি লিখেছেন এগারোজন বাঙালি বিজ্ঞানী নিয়ে, যাদের সবাই বিস্মৃতপ্রায়। নূতন প্রজন্ম যদি এদের কাউকে চিনতে না পারে আমি একটুও অবাক হব না, কিন্তু তাঁদের কয়েকজন সম্পর্কে একটুখানি বলা হলেই তাঁরা বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে যাবে।
    Newsletter

    Subscribe to our newsletter and stay updated.

কারা এরা, যাদের সম্পর্কে জানলে অভিভূত হয়ে যেতে হবে? চলুন, দেখে নেওয়া যাক।
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের লেখা বই 'আমার দেখা পোকা-মাকড়'; Image Source: munirhasan.com
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

ভারতীয় উপমহাদেশে কীট আচরণ বিদ্যার পথিকৃৎ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। পিপড়ার লিঙ্গ নির্ধারণের পরীক্ষা এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজিতে পেপার লিখেছেন ২২টি। এই ২০২০ সালে এসেও ২০টি পেপার লিখেছেন, এমন বাঙালি বিজ্ঞানী খুঁজে পাওয়াটা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না!
মধুসূদন গুপ্ত

ভারতীয় উপমহাদেশের গোঁড়ামি ভেঙে দেওয়ার কাজটি খুব ভালোভাবে করেছিলেন তিনি। প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানী সুশ্রুতের পরে প্রথম ভারতীয় হিসেবে শবব্যবচ্ছেদ করেন তিনি। এর মাধ্যমে ভারতে সার্জারী করার প্রচলনও ঘটান মধুসূদন। প্রাচীনপন্থী হিন্দুরা প্রয়োজন হলেও অস্ত্রোপাচার করতে রাজি হতেন না। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের চিকিৎসা দিতেন মধুসূদন।

সতীদাহ প্রথা ভেঙে বিদ্যাসাগর যেমন ভারতীয় অনেক নারীর জীবন বাঁচিয়েছেন, তেমনি মধুসূদনও বাঁচিয়ে দিয়েছেন অনেক প্রাণ। তিনি না হলে কবে এসে ভারতে অস্ত্রোপচার বা সার্জারির প্রচলন হতো, আর কে-ইবা সেটা করতে রাজি হতেন, কে জানে!
রাধানাথ শিকদার; Image Source: Alok Bhatt
রাধানাথ শিকদার

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গের নাম কী, বলুন তো? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, মাউন্ট এভারেস্ট। আপনি কি জানেন, এটি কে আবিষ্কার করেছিলেন? কে প্রথম এটি মেপে, হিসেব কষে দেখিয়েছিলেন, এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গ? একজন বাঙালি। রাধানাথ শিকদার।

তাঁর ঊর্ধ্বতন ইংরেজ কর্মকর্তা কর্নেল ওয়া নিজের পুরনো প্রভু জেনারেল এভারেস্টকে খুশি করার জন্য হিমালয় পর্বতের শৃঙ্গ 'পিক ফিফটিন'-এর নাম দিয়ে দেন মাউন্ট এভারেস্ট। আসলে, এভারেস্ট কর্নেল ওয়াকে এই পদ পাইয়ে দিয়েছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতাই জানালেন ওয়া। মাঝখান থেকে হারিয়ে গেলেন রাধানাথ শিকদার।

নেচারে মাউন্ট এভারেস্ট নিয়ে ১৯০৪ সালে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল। সেই প্রবন্ধে জেরাল্ড বারার্ড লিখেছেন,

    ১৮৫২ নাগাদ কলকাতার দফতরে কর্মরত প্রধান গণক দেরাদুনে অবস্থানরত সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াকে জানালেন, 'আ পিক ডেজিগনেটেড 'XV' (ফিফটিন) হ্যাড বিন ফাউন্ড টু বি হায়ার দ্যান এনি আদার হিদারটু মেজারড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড'।

হ্যাঁ, রাধানাথ শিকদারের কথা এখানে প্রধান গণক হিসেবে এসেছিল। কিন্তু তাঁর নাম আর আসেনি।

ভূতাত্ত্বিক বিভিন্ন জরিপের কাজও করেছেন রাধানাথ। হায়দ্রাবাদের বিদর থেকে মুসৌরির ব্যানোগ পর্যন্ত ৮৭০ মেইল দূরত্বের গ্রেট আর্কটিও তিনি জরিপ করেছিলেন। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এটাও তিনি করেছেন এভারেস্ট সাহেবের অধীনে। তাঁর এই দক্ষতা ছিবড়ে নেওয়ার জন্য এভারেস্ট এবং ওয়া রাধানাথ যেন আর কোথাও যেতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করেছিলেন। বারবার তাঁর বদলির আবেদন পর্যন্ত নাকচ করে দিয়েছেন। এমনকি এভারেস্ট তো তাঁর বাবাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, ছেলেকে দেখতে চাইলে এখানে চলে আসুন। ছুটিতে গেলে ওর কাজে বাধা পড়বে।

এই কৃতি বাঙালিকে পৃথিবী মনে রাখেনি। আমরাও কি রেখেছি?
রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

বাঙালি এই জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট ছিল না। অথচ সেই আমলে, ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে ৩৮ হাজার ভ্যারিয়েবল স্টার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। ভ্যারিয়েবল স্টারের বাংলা করেছিলেন 'বহুরূপ তারা'। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অনেক পারিভাষিক শব্দের এত সহজ বাংলা তো আমাদের এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরাও করতে পারেন না!

তাঁর কাজের জন্য তিনি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার থেকে সম্মান পেয়েছেন। ওরা তাঁকে সদস্যও করে নিয়েছিল। সম্মান পেয়েছেন ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকেও। এমনকি ব্রিটেন অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনেরও সদস্য ছিলেন তিনি।

জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে এদেশে যারা বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের জন্য রাধাগোবিন্দ চন্দ্র অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন আজীবন।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র

তালিকার এই মানুষটি সম্ভবত অনেকের পরিচিত। তবে নামে চিনলেও তাঁর কাজের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানি না আমরা।

খুলনার মানুষ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র। শুধু গবেষকই না, সফল উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকতেই দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর লেখা ১০১টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে! ৮০০ টাকা মূলধনে গড়ে তুলেছিলেন বেঙ্গল ক্যামিকেলস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস। সেই উদ্যোগের বর্তমান মূল্য আট কোটি টাকার কাছাকাছি!

প্রফুল্লচন্দ্রের জীবন, গবেষণা ও সামাজিক কাজকর্ম দারুণভাবে উঠে এসেছে এই বইতে।
অসীমা চট্টোপাধ্যায়; Image Source: anandabazar.com
অসীমা চট্টোপাধ্যায়

নারী হওয়ায় সমাজের সাথে কী ভীষণ লড়াই করতে হয়, সেটা আজকের নারীরা ভালোভাবেই জানেন। আর, অসীমা ছিলেন বিশ শতকের মানুষ। কিন্তু সব বাধা ঠেলে নিজেকে টেনে নিয়ে গেছেন তিনি।

সে সময় রসায়ন বিভাগে স্নাতক শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র তিনজন। তার একজন ছিলেন তিনি। ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়ত, এই নিয়ে কম ঝামেলা সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। এর মধ্য দিয়েই অনার্স শেষ করেছেন, পেয়েছেন স্বর্ণপদক।

মাস্টার্স শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করেছেন আমৃত্যু। বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং এদের মধ্যকার রাসায়নিক নিয়ে চমৎকার সব কাজ আছে তাঁর। স্টেরয়ডাল এলকালয়েড নিয়েও কাজ করেছেন। পাশাপাশি, 'ভারতীয় বনৌষদি' নামে ছয় খণ্ডের ঢাউস গ্রন্থ সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
অসীমা চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে ডুডল; Image Source: anandabazar.com

বিজ্ঞানী সত্যেন বোস তাঁকে নিয়ে বলেছিলেন,

    বিজ্ঞান কলেজে যখন সব ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন যে একটা ঘরে দেখবে আলো জ্বলছে, সেটা অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের ঘর।

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছিলেন উপেন্দ্রনাথ। তাঁর একার চেষ্টায় এই মহামারীকে পৃথিবীর বুক থেকে নির্মূল করা গিয়েছিল। তিনি যখন এন্টিমাইক্রোবিয়াল ড্রাগ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করেছেন, তখনও পেনিসিলিনও আবিষ্কার হয়নি!
মৃণাল কুমার দাশগুপ্ত

দেশে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বিদেশে পড়তে গিয়েছিলেন মৃণাল। এর আগে শিশির কুমার মিত্রের অধীনে কিছুদিন গবেষণা করেছিলেন। পরে তাঁর সুপারিশে 'জডরেল ব্যাংক এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন' নামে বিখ্যাত গবেষণাগারে অধ্যাপক লোভেলের অধীনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এখানে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন রোজার জেনিসন।

তাঁদের গবেষণার মধ্য দিয়েই প্রথম কৃষ্ণগহ্বরের পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়!
হাবিবুর রহমান

গণিতজ্ঞ ও পেশায় শিক্ষক হাবিবুর রহমান একাত্তরে হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন।

২৫শে মার্চের ভীষণ নির্মমতার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনের বেশিরভাগটাই খালি হয়ে যায়। কিন্তু হাবিবুর রহমান নিজের বাসায় কালো পতাকা উত্তোলন করেন এবং সেখানেই অবস্থান করেন।

সেই কালে বাংলায় গণিত নিয়ে চমৎকার সব কাজ করেছিলেন তিনি। পঞ্চম-ষষ্ট শ্রেণী থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীর জন্যেও গণিত নিয়ে বই লিখে গেছেন। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার পেছনেই তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি হল আছে। কিন্তু সেখানকার কেউই তাঁকে গণিতজ্ঞ হিসেবে চেনেন না, চেনেন বুদ্ধিজীবী হিসেবে। এটা লেখক নিজেই সেখানে গিয়ে যাচাই করে দেখেছেন। একজন বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধির ব্যবহার, মানে তাঁর কাজের ব্যাপারে না জানলে যে তাঁকে জানা হয় না, সেটা তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

শুধু সেই হলের শিক্ষার্থীরাই নয়, আমরা কয়জনই বা তাঁকে চিনি?
শম্ভুনাথ দে

কলেরা নিয়ে গ্রাম বাংলায় তখন ভীষণ ভয়। মহামারিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে গ্রামের পরে গ্রাম। কেউই আসলে সমস্যাটা শনাক্ত করতে পারছিল না, চিকিৎসা কীভাবে করবে? লোকে ততদিনে কলেরার নামও দিয়ে দিয়েছে। ওলাবিবি। একবার আসলেই হয়েছে, সব শেষ!

শম্ভুনাথ এই রোগ নিয়েই গবেষণা করেছেন। কারণ উদঘাটন করে দেখিয়েছেন, সমস্যাটা কী। মোটামুটি তাঁর একার চেষ্টাতেই ভারতীয় উপমহাদেশ ওলাবিবির হাত থেকে মুক্তির সুযোগ পেয়েছিল।
আব্দুস সাত্তার খান

আব্দুস সাত্তার খান নিজ দেশে কখনোই সেভাবে স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত সব দেশে তাঁকে বেশ সম্মান দেওয়া হয়। স্বাভাবিক। যে মানুষ চল্লিশটির বেশি সংকর ধাতু তৈরি করেছেন, মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ ও এফ-১৬ এর ইঞ্জিনের সমস্যা মেটানোর জন্য উদ্ভাবন করেছেন নিকেলভিত্তিক সংকর ধাতু; তাঁকে শ্রদ্ধা না করে উপায় কী?

এই হলেন বইয়ের এগারোজন বিজ্ঞানী। বইতে তাঁদের প্রত্যেকের জীবন বিস্তৃত কলেবরে উঠে এসেছে।
পর্যালোচনা

'মেঘে ঢাকা তারা' আসলেই আড়ালে পড়ে যাওয়া নক্ষত্রদের নিয়ে কথা বলেছে। দুই মলাটে তুলে এনেছে তাঁদের জীবন ও কর্ম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালি বিজ্ঞানীদের পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টার জন্য লেখক অতনু চক্রবর্ত্তী অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন।

লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে এই বই নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। এই বিজ্ঞানীদের নিয়ে অন্তর্জালে কোথাও সেভাবে বিস্তারিত তথ্য নেই। সেজন্য যেখানেই তথ্যের খোঁজ পেয়েছেন, ছুটে গেছেন। নিজে যাচাই করে দেখেছেন সেসব তথ্য। কিন্তু নিজের রেফারেন্সে তো আর সরাসরি তথ্য দেওয়া যায় না। তাই কষ্ট করে বিভিন্ন ডকুমেন্ট ঘেঁটে বের করেছেন রেফারেন্স। সত্যি বলতে, এই বইটি নিজেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হবে।

বইটিতে বানান ভুল নেই বললেই চলে। ঐতিহ্য প্রকাশনী এ ব্যাপারে দারুণ যত্নশীল ছিল। তবে বইটির মেকআপ বা সাজানোর কাজটি আরো যত্ন করে করা যেত। অধ্যায়ের মাঝের কিছু পৃষ্ঠা ছবির বিন্যাসের জন্য এমনভাবে খালি রয়ে গেছে যে, চোখে লাগে।
টোকিয়োতে ডঃ রাধা বিনোদ পালের স্মারক ছবির সামনে লেখক অতনু চক্রবর্ত্তী;  Image Source: Atonu Chakrabortty
লেখক পরিচয়

অতনু চক্রবর্ত্তীর জন্ম নড়াইলে। বর্তমানে কোরিয়ার পুসান বিশ্ববিদ্যালয়ে অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ছেন। সেই সঙ্গে একই বিভাগে সহকারী গবেষক হিসেবে প্যান্ট মাইক্রোবায়োলজি গবেষণাগারে কাজ করে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞান ভালোবাসেন ও এ নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে চান সবার মাঝে। তাই বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে যে কয়দিন সুযোগ পেয়েছিলেন, কাজ করেছেন বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কমিটিতে।

এছাড়াও, বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করেন। সম্প্রতি জীববিজ্ঞান নিয়ে তাঁর লেখা 'জীববিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা' বইটি প্রকাশিত হয়েছে। অমর একুশে বইমেলা ২০২০-এ 'মেঘে ঢাকা তারা'-এর দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশ পাবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তাঁর হাত ধরে আধুনিক প্রজন্ম বাঙালি বিজ্ঞানীদের সাথে পরিচিত হবে, তাঁদেরকে হৃদয়ে লালন করবে, আগ্রহী হয়ে উঠবে গবেষণায়-এটুকু আশা বোধ হয় করা যায়।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আরও জানতে সংগ্রহ করে নিতে পারেন এই বইগুলো:

১) জীববিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা
২) মেঘে ঢাকা তারা: বিস্মৃতির মেঘে ঢেকে যাওয়া বাঙালি বিজ্ঞানী

22
Iqbal Hossain Porosh
গত ২৯ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের একটি জনবহুল শহর উহানে মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। প্রথমদিকে ব্যাপারটি তেমন গুরুত্ব না পেলেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করোনা মহামারি আকার ধারণ করে। বর্তমানে উহান ছাড়িয়ে চীনের সবগুলো প্রদেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করেছে সেখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ।

কর্মব্যস্ত উহানে হঠাৎ করেই নেমে এসেছে নীরবতা। নাগরিক ছন্দপতন ঘটায় এক ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে সেখানে। মানুষের পাদচারণায় পরিপূর্ণ সব জায়গাও জনশূন্য, চলছে না কোনো গাড়ি, দোকানপাট বন্ধ করে সবাই ঘরে বসে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু একটার প্রহর গুনছে।

করোনা ছোঁয়াচে ভাইরাস হওয়ায় সহজেই একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীব্যাপী জরুরী অবস্থা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাসের দৌরাত্ম্য কোটি মানুষের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে তারপর থামবে। করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক তৈরি না হওয়ায় আপাতত সতর্ক থাকা ছাড়া উপায় নেই।

২৯ বছর বয়সী গুও জিং সামাজিক আন্দোলনের একজন কর্মী। তিনিও অন্য সবার মতো বাড়তি সতর্কতার জন্য বাড়িতে অবস্থান করছেন। এমন নাজুক পরিস্থিতির চিত্র লিপিবদ্ধ করেছেন নিজের ডায়েরিতে। সে কথাগুলোই বিবিসির মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিতে চান তিনি। তার কথাগুলো হুবহু তুলে ধরছি এখানে।

বৃহস্পতিবার, ২৩শে জানুয়ারি: আপাত গৃহবন্দি!

আমি সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং তখনই প্রথম লক-ডাউন সম্পর্কে জানতে পারি। বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করব; কারণ লক-ডাউন এর মানে বুঝতাম না আমি। এই পরিস্থিতি কতদিন ধরে চলবে এবং আমাকে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিৎ; তার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নজর রাখছিলাম, যাতে সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে পারি। সেখানে অনেকেই মন্তব্য করছে, “ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেকে জায়গার অভাবে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। তাই তারা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।’’ আমার বন্ধুরা আমাকে পর্যাপ্ত মাস্ক মজুদ করার পরামর্শ দিল। এদিকে দোকানগুলোতে চাল এবং নুডলসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এই শহর আবার জেগে উঠবে কবে? Image Source: wallpapercraft.com

একজন লোক ইচ্ছেমত লবণ কিনে নিচ্ছিল! তা দেখে অন্যরা অবাক হয়ে এত লবণ কেনার কারণ জানতে চাইল। জবাবে লোকটি বলল, "যদি লকডাউন পুরো এক বছর ধরে চলে!’’

আমি একটি ফার্মেসিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে মাস্ক আর জীবাণুনাশকের মজুদ শেষ হয়ে গিয়েছে। ক্রমেই শহরে গাড়ি এবং পথচারীদের আনাগোনা কমে আসছিল। হঠাৎ করেই সেখানে রাজ্যের নীরবতা নেমে এলো। এই শহর আবার জেগে উঠবে কবে?

শুক্রবার, ২৪শে জানুয়ারি: সাদামাটা নববর্ষের প্রস্তুতি 

আমার কাছে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী যেন থমকে আছে, এমন নীরবতা ভয়ের জন্ম দিচ্ছে মনের ভেতর। যেহেতু আমি একা থাকি তাই করিডোর ধরে যখন কেউ হেঁটে যায়, তখন মনে হয় পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে!

কীভাবে টিকে থাকব- সেটা ভাবার যথেষ্ট সময় রয়েছে, কিন্তু যথেষ্ট রসদ কিংবা আলাপচারিতা করার মতো মানুষ নেই।

আমাকে যেভাবেই হোক সুস্থ থাকতে হবে, সেজন্য দরকার নিয়মিত অনুশীলন। আর অনুশীলনের পর প্রয়োজন হবে খাবারের। তাই সবগুলো দিক বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে আমাকে।
আমাকে যেভাবেই হোক সুস্থ থাকতে হবে; Image Source: vox.com

সরকার চলমান অচলাবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানাচ্ছে না আমাদের। লোকজন বলাবলি করছে, এটি মে মাস পর্যন্ত স্থায়ী হবে।

আশপাশের ফার্মেসি এবং খাবারের দোকানগুলো বন্ধ রয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, হোম ডেলিভারি সার্ভিসগুলো এখনও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আজ আমি বাজারে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে রসুনের অঙ্কুর আর ডিম কিনে এনেছি। বাজারে নুডলসের কোনো নতুন চালান আসেনি, তবে চালের যোগান রয়েছে এখনও। বাড়িতে ফিরেই ভালো করে গোসল সেরে নিয়েছি। আর কিছু ধরার পরই হাত পরিষ্কার করে নিচ্ছি। এই সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

বাইরে বেরোতে পারার কারণেই মনে হচ্ছে পৃথিবীর সঙ্গে এখনো আমার যোগাযোগ বজায় রয়েছে। বৃদ্ধ আর প্রতিবন্ধীরা কীভাবে যে এমন পরস্থিতি সামাল দিচ্ছে কে জানে!

আজকের রাতটিই চীনা বর্ষপঞ্জির শেষ রাত। তাই বিশেষ খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন আয়েশ করার মতো অবস্থায় নেই। তাই প্রয়োজনের বেশি রান্না করিনি।

রাতে খাওয়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছিলাম। তাদের অনেকেই উহানের পার্শ্ববর্তী শহরে ছিল। বাড়িতে ফিরে আসতে ভয় পাচ্ছিল তারা, আবার কয়েকজন এত কিছুর পরও একসঙ্গে আড্ডা দিতে উদগ্রীব ছিল। আমরা প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে অনলাইনে মজা করেছি। তখন নিজেকে অনেক সুখী মনে হয়েছে।

কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার পর বিগত কয়েকদিনের ঘটনা মনে করে আর ঘুমাতে পারলাম না। অনেক অসহায় লাগছিল ভেতর থেকে; কান্না করে নিজেকে কিছুটা হালকা করতে চাইলাম। কষ্ট আর হতাশায় আমি মৃত্যুর কথাও ভেবেছিলাম কয়েকবার। কিন্তু নিজের কাছে আমার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আমার জীবনটা যথেষ্ট অর্থবহ, তাই আমি সময়ের আগেই মরতে চাই না।

শনিবার, ২৫শে জানুয়ারি: একাকী নববর্ষ পালন

আজ চীনা নববর্ষ। দিবস উদযাপনের ব্যাপারে আমার কখনোই তেমন আগ্রহ ছিল না। এবারের নববর্ষ তো আরও বেশি অর্থহীন।

সকালবেলা হাঁচির সঙ্গে কিছুটা রক্ত বেরিয়েছিল। আমি প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, তবে ভাইরাসের উপসর্গগুলো প্রকাশ না পাওয়ায় সাহস পেলাম মনে। বাইরে বের হবো না ভেবেছিলাম, কিন্তু অবশেষে বেরিয়ে পড়লাম। আমার মুখে দুটো মাস্ক পরা ছিল, কারণ পণ্যগুলো নকলও হতে পারে। যার জন্য এই বাড়তি সতর্কতা। যদিও সবাই এটাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। বাইরে গিয়ে তেমন মানুষজনের দেখা পেলাম না।

ফুলের দোকানগুলোর প্রবেশমুখে এমন কিছু ফুল সোভা পাচ্ছিল, যেগুলো কেবল শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে সাজানো হয়। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না তারা কেন এরকম সাজিয়েছে!
তরিতরকারি বিক্রির তাকগুলো একদম খালি ছিল; Image Source: creativebonito.com

সুপার শপে তরিতরকারি বিক্রির তাকগুলো একদম খালি ছিল, সেই সঙ্গে এবারও নুডলসের দেখা পেলাম না। ক্রেতাহীন অলস সময় পার করছিল দোকানীরা।

আমি চাইছিলাম প্রতিবার বাইরে বেরোনোর সময় বেশি করে জিনিসপত্র কিনে বাসায় ফিরতে। তাই আরও আড়াই কেজি চাল কিনলাম, যদিও বাসায় যথেষ্ট মজুদ ছিল। সেই সঙ্গে মিষ্টি আলু, মটরশুঁটি, সসেজ, লবণের প্রলেপ দেওয়া ডিম কিনে নিলাম। যদিও নোনতা ডিম খেতে আমার খুব একটা ভালো লাগ না। তাই ভাবলাম অচলাবস্থা কেটে গেলেই এগুলো বন্ধুদের দান করে দেব!

বাসায় ফিরে দেখলাম আমার ১ মাস চলার মতো খাবার মজুদ হয়ে গিয়েছে! এভাবে খাবারের স্তুপ জড়ো করার ব্যাপারটা পাগলামি মনে হচ্ছিল আমার কাছে। কিন্তু নিজেকেই বা কীভাবে দোষ দেই?

নদীর ধারে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম; দেখলাম অনেকগুলো জুটি সেখানে হাঁটছে। সঙ্গে তাদের পোষা কুকুরকে আনতেও ভোলেনি। আমি এই রাস্তায় তেমন একটা আসতাম না। তাই ভাবলাম আমার মতো তারাও চার দেয়ালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে চাইছিল না।

রবিবার, ২৬শে জানুয়ারি: নিজের অস্তিত্বের জানান দাও

আমি চলমান অচলাবস্থার প্রথমদিন থেকেই অনলাইন সেন্সরশিপের কারণে তেমন কিছুই লিখতে পারিনি। চীনে অনলাইনে অনেক আগে থেকেই কড়াকড়ি রয়েছে, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন মনে হচ্ছে আমার কিছুই বলার অধিকার নেই!

আপনার জীবন যখন ওলটপালট হয়ে যায়, তার প্রভাব দৈনন্দিন সব কাজের উপর পড়ে। আমি মোবাইলে অ্যাপ ব্যবহার করি ব্যায়াম করার জন্য। কিন্তু এখন কোনো কাজেই ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারি না।

আমি আজ আবার বাইরে গিয়েছি। যাত্রাপথে কতজন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে সেটার হিসাব রেখেছি। বাড়ি থেকে ৫০০ মিটার দূরে নুডলসের দোকান, যাত্রাপথে কেবল ৮ জনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে!
আমাকে আরও বেশি পরিমাণে মানুষের সঙ্গে দেখা দিতে হবে; Image Source: henri matisse\wikiart

উহানে এসেছি আজ ২ মাস হলো, তাই শহরটা ভালো করে না ঘুরেই বাড়ি ফিরতে চাইনি। স্বাভাবিকভাবেই এখানকার মানুষজন এবং বেশিরভাগ স্থান আমার অচেনা।

আজ সর্বমোট ১০০ জনকে রাস্তায় বের হতে দেখেছি। আমাকে আরও বেশি পরিমাণে মানুষের সঙ্গে দেখা দিতে হবে, যাতে তারা আমার ব্যাপারে জানতে পারে। বন্ধুরা, আমি আশা করি ভবিষ্যতে আমরা আবার দেখা করতে পারব, যাতে নিজেদের গল্পগুলো একসঙ্গে বসে বলা যায়।

রাত ৮ টার দিকে হঠাৎ মানুষের সম্মিলিত চিৎকার শুনতে পেলাম ‘’গো উহান!’  নিজেদের জানালাগুলো খুলে দিয়ে তারা কথাটা বারবার বলছিল। এটা শহরের নাগরিকদের মাঝে আশা জাগানোর সংকেত। আমরা কেউ একা নই- এই অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।   

মঙ্গলবার, ২৮শে জানুয়ারি: অবশেষে আলোর দেখা পেলাম

আতঙ্কগ্রস্ত হলে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। সবার জন্য বাইরে বেরোলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা ভালো একটা উদ্যোগ, কিন্তু কখনো কখনো এমন নিয়ম ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ করে দেয়।

বেশ কয়েকজনকে মাস্ক না পরার কারণে গণপরিবহন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জানি না কেন তারা মাস্ক পরেনি! হয়তো তারা সামর্থ্যবান নয়, কিংবা তারা ভাইরাসটি নিয়ে কোনো ঘোষণা শুনতে পায়নি।
অনেকদিন পর নিজের মনমতো সূর্যের আলোর দেখা পেয়েছি; Image Source: nytimes.com

অনলাইন ভিডিওতে দেখেছি, যাযাবর গোছের লোকদের তাদের ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ঘরগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে কিছু পরিবার ভবঘুরে কয়েকজন মানুষকে থাকার জায়গা করে দিয়েছেন।

সরকার চাইলেই প্রতিটি ঘরে মাস্কের যোগান দিতে পারত। এমনকি নাগরিকদের ঘরে অবস্থানের জন্য পুরস্কৃতও করা যায়।

আজ অনেকদিন পর নিজের মনমতো সূর্যের আলোর দেখা পেয়েছি। আমার কমপ্লেক্সের লোকজনদের দেখা পেলাম অবশেষে। কয়েকজন কমিউনিটি কর্মী এসেছেন কমপ্লেক্সের অনাবাসিক নাগরিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে।

শহর জুড়ে অচলাবস্থা চলার কারণে মানুষের বিশ্বাস আর মনোবল ভেঙে পড়েছিল প্রায়। উহান আজ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত; নিজের ভারই বহন করতে পারছে না যেন। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়  নিজেকে সতর্ক থাকা ছাড়া বেশি কিছু করার নেই আমার।

প্রতিনিয়ত নিজেকে শহরের আরও গভীরে নিয়ে যেতে হবে। নইলে জীবনের কোনো অর্থ থাকবে না। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে আরও বেশি করে অংশগ্রহণ করা দরকার। প্রত্যেককেই সমাজের দায়িত্ব নিতে হবে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার জন্য। আর এই নিঃসঙ্গ শহরে আমাকে আমার ভূমিকা খুঁজে নিতে হবে শীঘ্রই।

23
Iqbal Hossain Porosh

বিশ্বজুড়ে নিয়মিত প্রাচীন সভ্যতার নানা নিদর্শন আমাদের সামনে তুলে আনছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। মাটি খুঁড়ে যেমন শতাব্দী প্রাচীন শহরের সন্ধান মিলছে, তেমনি সমুদ্রের অতলেও খোঁজ মিলছে সভ্যতার নিদর্শন। এমন আবিস্কার পৃথিবীর সভ্যতাগুলোর ইতিহাস নিয়ে আবার ভাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়। কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে পানির অতলে! যে রহস্যের টানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেখানেও ডুব দিতে দুবার ভাবেন না। এগুলোর ফলাফলও মিলছে খুব দ্রুত। যার কারণে নতুন এক জগত সম্পর্কে জানার দুয়ার খুলে গেছে আমাদের সামনে। আজ এমন কিছু অবিশ্বাস্য আবিস্কার নিয়েই জানব, যেগুলো এতদিন সাগরের তলদেশে লুকায়িত ছিল পরম যত্নে!   
 ১. প্রাচীনতম নৌযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ 

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সিসিলির উপকূলে একটি অনুসন্ধান কার্যক্রম চালান। সেখানে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে এমন কিছু নমুনার খোঁজ পান, যেগুলো প্রাচীনকালে সংঘটিত কোনো একটি নৌযুদ্ধকে ইঙ্গিত করে। সৈনিকদের শিরস্ত্রাণ, বর্মসহ প্রাপ্ত অন্যান্য অস্ত্রের নমুনা থেকে আন্দাজ করা যায়, যুদ্ধটি অন্তত ২ হাজার বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ২৪১ সাল থেকে রোমান আর কার্থেজিনিয়ানদের মাঝে ২০ বছর ধরে চলমান এক নৌযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। ভূমধ্যসাগরের দখল নিয়ে সংঘটিত এই যুদ্ধ প্রথম পুনিক যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধের শেষদিকে এগাদি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকায় কার্থেজিনিয়ানদের জাহাজডুবির পর সেগুলো পানির অতলে হারিয়ে যায়।
কার্থেজিনিয়ানদের নৌবাহিনী রোমানদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল; Image Source: divemagazine.co.uk

কার্থেজিনিয়ানদের নৌবাহিনী সেই সময় রোমানদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। তবে রোমানদের কূটকৌশলের কাছে তারা অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের এই সময় ৫০টি পর্যন্ত কার্থেজিনিয়ান জাহাজ ডুবে গিয়েছিল, সেই সঙ্গে জাহাজে অবস্থান করা ১০,০০০ যোদ্ধারও সলীল সমাধি হয়েছিল, যে পরাজয় রোমানদের ইউরোপে প্রবেশের পথ সুগম করে দেয়।

সহস্রাব্দের এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এতদিন সমুদ্রের ১০০ মিটার নিচে প্রায় অবিকৃত অবস্থায় ছিল, যা ইতিহাসকে জানার নতুন দিগন্ত উম্মোচন করেছে।
Newsletter

Subscribe to our newsletter and stay updated.
২. মায়ানদের গুহায় মাথার খুলি

ঘটনাটি মেক্সিকোর একটি উপকূলীয় গ্রামের, সেখানে সমুদ্রের অগভীর অংশে একদল প্রত্নতাত্ত্বিক কয়েকটি অদ্ভুত গুহার সন্ধান পান। গুহার ভেতর প্রবেশ করতেই গবেষকদল চমকে যান! সারি সারি মানুষের মাথার খুলি আর কঙ্কাল দেখে তারা সত্য অনুসন্ধানে নামেন। ততদিনে গ্রামবাসীর কাছে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে, ফলে তারা আতঙ্কিত হয়।‍
 মায়ানরা উপাসনার অংশ হিসেবে বলিদান করত এখানে; Image Source: businessinsider.com

অদ্ভুত এই ডুবো গুহাটি আবিষ্কৃত হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে। মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপের কাছাকাছি সন্ধান পাওয়া এই গুহার নাম দেওয়া হয় ‘স্যাক উয়েয়াম’। মূলত এটি একটি প্রাকৃতিক গুহা, যেখানে চুনাপাথর দিয়ে তৈরি বেদিগুলো সময়ের পরিক্রমায় ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। ধারণা করা হয়, এখানে মায়ানরা নিজেদের উপাসনার অংশ হিসেবে বলিদান করত। স্থানীয় কিংবদন্তী মতে, রহস্যময় গুহাটিকে প্রাচীনকাল থেকে ভয়ঙ্করদর্শন এক সাপ পাহারা দিচ্ছে, যার শরীরভর্তি পালক আর গর্দানের উপরের অংশটি দেখতে ঠিক ঘোড়ার মাথার মতো! গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরাও তাই সুযোগ পেয়ে তরুণদের নিয়ে মেতেছেন তাদের গল্প শোনাতে! যে গল্পের বিষয়বস্তু একটি সাপকে ঘিরে; দেখতে ভয়ঙ্কর আর আকারে বিশাল যে সাপ বহু বছর আগে এই দ্বীপে বাস করত। সে সমুদ্রে ডুব দিত আবার ভেসে উঠত, কখনো বা দ্বীপের উপর এসে বিশ্রাম নিত!

প্রত্নতাত্ত্বিকরা কিংবদন্তীকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রামবাসীদের ভয়কে আমলে নিলেন। এখানে হয়তো সত্যিই সাংঘাতিক কিছু ঘটে গিয়েছিল অতীতে। তবে প্রবীণরা যেভাবে সবার কাছে তুলে ধরেছে সেভাবে নয়। সত্যিকার গল্পগুলো হয়তো আরও মারাত্মক, যা শতাব্দী জুড়ে সবার আড়ালেই রয়ে গেছে।

গবেষকদল গুহাটিতে এক ডজনেরও বেশি মানুষের খুলি এবং কঙ্কাল শনাক্ত করেছেন। তবে সেগুলোতে বলি দেওয়ার মতো কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সবগুলো কঙ্কালকে সমাধিস্থ করার পূর্বে পিষে সমতল করে ফেলা হয়েছিল! এটা কি কোনো ধর্মীয় রীতি, যার জন্য এমন আকৃতি দেওয়া হয়েছিল? এর উত্তর এখনও অজানা।
৩. জাপানের ডুবন্ত শহর 

১৯৯৫ সালে একজন ডুবুরী জাপানের ওকিনাওয়া উপকূল থেকে সাঁতরে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছিল। সেখানে সে বিপদের সম্মুখীন হয় এবং খেই হারিয়ে পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর সে উপরে ভেসে উঠতে সক্ষম হয়। তবে ভেসে ওঠার আগে পানির নিচে সে অদ্ভুত কিছু আকৃতি দেখতে পায়!

তারপর থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিকপাড়ায় বেশ একটা হইচই পড়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জাপানের ইউনাগুনির দক্ষিণ উপকূলে পাওয়া এই পাথুরে স্থাপনাটি নিয়ে গবেষকরা দুভাগ হয়ে পড়েছিলেন। একদলের মতে, এটি মনুষ্যসৃষ্ট, যেখানে অন্যরা একে প্রাকৃতিক বলে দাবি করছেন। বিশাল এই স্থাপনার পুরো গঠনজুড়ে অনেকগুলো বড় পাথরের ব্লক রয়েছে। সেগুলোকে পর পর খুব নিখুঁতভাবে বসানো রয়েছে।
পাথুরে গঠনটি প্রায় ১০,০০০ বছরের পুরোনো; Image Source: diveplanet.com

গবেষকদের মাঝে এর উৎপত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও একটি ব্যাপারে সবাই একমত। আর সেটা হলো পাথুরে গঠনটি প্রায় ১০,০০০ বছরের পুরোনো!

পাথরের উপরিভাগে পাকা রাস্তা, চৌরাস্তা, বাজারসহ একটি সমৃদ্ধ নগরের অসংখ্য চিহ্ন রয়েছে। এই থেকে আন্দাজ করা যায় স্থানটিতে একসময় মানুষের বসবাস ছিল। কালের পরিক্রমায় যা সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে গেছে। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ রবার্ট সোচ গবেষণা করে দেখিয়েছেন, ডুবে যাওয়া স্থানটিতে টেকটোনিক প্লেটের বেশ সক্রিয়তা রয়েছে। এদের স্থানচ্যুতির কারণেই হয়তো শহরটি তলিয়ে গেছে।
৪. প্রায় অক্ষত লায়ন সিটি

প্রাচীন এক নিমজ্জিত শহর লায়ন সিটি, চীনারা যাকে 'শি চ্যাং' নামে অভিহিত করে। এই শহরটি ‘উ শি’ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত কিয়ানডাও হ্রদের নিচে প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে রয়েছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবিষ্কৃত হওয়ার পর গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, শহরটি কমপক্ষে ৫০ বছর পূর্বে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে এটি আদতে একটি ভার্চুয়াল টাইম ক্যাপসুলে রূপান্তরিত হয়েছে।

হানদের রাজত্বের সময় (২৫-২০০ খ্রিস্তাব্দ) শি চ্যাং শহরটি গড়ে উঠেছিল। একসময় পূর্ব ঝেজিয়াংয়ের প্রদেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতির কেন্দ্র ছিল শি চ্যাং। ১৯৫৯ সালে চীন সরকার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে। এভাবেই কিয়ানডাও হ্রদ তৈরি করা হয়, যার ফলে শি চ্যাং ৪০ মিটার পানির নিচে ডুবে যায়।
ডুবন্ত শহরটি এখনও সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে; Image Source: nypost.com

অবশেষে, শহরটি ডুবে যাওয়ার ৫৩ বছর পর সেই অঞ্চলের পর্যটন কর্মকর্তা কিউ ফ্যাংয়ের নজরে আসে ব্যাপারটি। তিনি সরেজমিনে ডুবন্ত শহরটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে নামেন। এই শহরে অমূল্য কিছু লুকিয়ে রয়েছে কি না সেটা জানাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তিনি ও তার দল যখন সেখানে পৌঁছান, অবাক হওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না। তাদের সাদরে গ্রহণ করার জন্যই যেন ডুবন্ত শহরটি এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে! শহরের মন্দির, স্মারক তোরণ, খাঁজকাটা রাস্তা এবং ঘরগুলো প্রায় অক্ষত। যেন সেগুলো আদিমতম ব্যস্ত শহরের প্রমাণ মেলে ধরছে।

গবেষকদল এই আবিষ্কারকে আরেক ‘হারানো আটলান্টিস’ বলে উপমা দিয়েছেন। শীঘ্রই এটি চীনের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হবে বলে তাদের বিশ্বাস। তবে ডুবন্ত শহরটিকে একেবারে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখাও তাদের দায়িত্ব বলে মনে করেন পৃথিবীর তাবৎ প্রত্নতত্ত্ববিদ।
 ৫. হেরাক্লিওন-ক্লিওপেট্রার শহর   

হেরাক্লিওন শহরটির কোনো এক মন্দিরে রানী ক্লিওপেট্রার অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল। যে শহর ১,২০০ বছর পূর্বে ভূমধ্যসাগরের মিসরীয় উপকূলে ডুবে গিয়েছিল। ডুবে যাওয়ার আগেও শহরটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

২০০১ সালে একদল প্রত্নতাত্ত্বিক একটি ফরাসি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজতে গিয়ে শহরটির খোঁজ পান। তারা মাটি এবং কাদার স্তর সরিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্যের মুখোমুখি হন। একটি পরিপূর্ণ সাজানো-গোছানো শহর! যার সবকিছু এত বছর পরও প্রায় অবিকৃত রয়েছে।
এ যেন এক পরিপূর্ণ সাজানো-গোছানো শহর; Image Source: independent.co.uk

ফেরাউনদের দৈত্যাকার সব মূর্তি, নানা দেব-দেবীর মূর্তি, স্ফিংক্স, ৬৪টি জাহাজ এবং তাদের নোঙ্গর, প্রাচীন মিসরীয় শিলালিপি, সোনা-ব্রোঞ্জের মুদ্রাসহ অগণিত সম্পদের ভাণ্ডার।

গ্রীক ঐতিহাসিক হেরাডোটাস আমাদের প্রাচীন এক মন্দির সম্পর্কে বলেছিলেন। মন্দিরটি হেরাকলের মিশরে আগমন উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছিল তারই নামানুসারে। মিশরে হেরাডোটাসের আগমনের ৪০০ বছর পর, ভূগোলবিদ স্ট্র্যাবো হেরাক্লিওন শহরকে নিয়ে একটি নতুন পর্যবেক্ষণ হাজির করেন। তিনি দেখান যে, হেরাক্লিওন শহরটি নীল নদের ক্যানোপিক শাখামুখে ক্যানোপাসের পূর্ব দিকে অবস্থিত। শহরটি আবিষ্কারের পূর্বে জাঁকজমকপূর্ণ হেরাক্লিওন কেবল কিংবদন্তীরই একটি অংশ হয়ে ছিল সহস্র বছর ধরে।

24
Jannatul Naym Pieal

    জন্মিলে মরিতে হবে,
    অমর কে কোথা কবে...

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই চরণগুলো কেবল জীবজগতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। একই কথা বলা যেতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলগুলোর ক্ষেত্রেও। বিশেষত, ফেসবুক প্রোফাইলগুলোর ক্ষেত্রে এই কথা খুবই খাটে, যেগুলোর পেছনে আমরা আমাদের প্রতিদিনের বড় একটা সময় ব্যয় করছি।

নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলকে আমরা ভরিয়ে তুলছি যেকোনো বিষয়ে আমাদের বিভিন্ন মতামত দিয়ে, রাঙিয়ে তুলছি আমাদের বর্ণিল সব ছবি দিয়ে। ফেসবুক প্রোফাইল হয়ে উঠেছে আমাদের বাস্তব জীবনেরই একটি ভার্চুয়াল প্রতিফলন। যেসব মানুষ আমাদেরকে একদমই চেনে না, তারাও কিছুক্ষণ আমাদের ফেসবুক প্রোফাইলগুলো ঘেঁটে আমাদের ব্যাপারে অনেক অজানা তথ্যই জেনে নিতে পারছে। ফলে ফেসবুক প্রোফাইলগুলো বর্তমানে হয়ে উঠেছে অন্যের কাছে আমাদের পরিচিত তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যমে।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, আমাদের মৃত্যুর পর এই ফেসবুক প্রোফাইলগুলোর কী হবে?
প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবনের ভার্চুয়াল প্রতিফলন তার ফেসবুক প্রোফাইল; Image Source: Getty Images

যার যার ফেসবুক প্রোফাইল তার একেবারে নিজস্ব সম্পত্তি। এমনকি অনেকে আছে যে তার পরম বিশ্বস্ত সঙ্গীকেও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের পাসওয়ার্ড জানতে দেয় না। বলাই বাহুল্য, এমন মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এই মানুষগুলো যখন মারা যাবে, একইসাথে বন্ধ হয়ে যাবে তাদের ফেসবুক প্রোফাইলের যাবতীয় কার্যকলাপও। ওই প্রোফাইল থেকে নতুন কোনো পোস্ট আসবে না, যোগ হবে না কোনো ছবি। কোনো পেজে লাইক পড়বে না, কোনো ইভেন্টে গোয়িং বা ইন্টারেস্টেড দেয়া হবে না, এবং অন্যের পোস্টে রিয়েকশন বা কমেন্টও করা হবে না। এদিকে মেসেঞ্জারেও তাদের কনট্যাক্ট থেকে অন্য কারো কাছে মেসেজ কিংবা অডিও বা ভিডিও কল যাবে না।

কিন্তু তাই বলে প্রোফাইলগুলো কিন্তু উধাও হয়েও যাবে না। ফেসবুকে খোঁজ করলে সেই প্রোফাইলগুলোর সন্ধান ঠিকই মিলবে। অর্থাৎ একজন মানুষ মারা গেলে যেমন সে আর নিঃশ্বাস নিতে পারে না, কিছু দেখতে বা শুনতে পায় না, কিংবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করতে পারে না, কিন্তু তার মৃতদেহটি ঠিকই রয়ে যায়, ঠিক তেমনই হবে মৃত ব্যক্তির ফেসবুক প্রোফাইলের ক্ষেত্রেও। সেগুলোতে নতুন করে কোনো আপডেট হবে না বটে, কিন্তু প্রোফাইলগুলোর অস্তিত্ব বিলীনও হবে না। একসময়কার সচল প্রোফাইলগুলো অচল-অচেতন হয়েও ঠিকই টিকে থাকবে ফেসবুকের নীল-সাদা জগতে।
ফেসবুক প্রোফাইলগুলো পরিণত হবে আমাদের আমাদের ডিজিটাল ঐতিহ্যে; Image Source: Getty Images

এই বিষয়টি নিয়ে আরো সবিস্তারে জানতে চেয়েছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। তাদের গবেষণার মূল জিজ্ঞাস্য বিষয় ছিল, মৃতরাই কি দখল করে নিচ্ছে ফেসবুক? এবং গবেষণা শেষে তারা যে উত্তরটি পেয়েছেন, তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতোই একটি বিষয়। উত্তরটি হলো: আসলেই ফেসবুকে বেড়ে চলেছে জীবিতের চেয়ে মৃতের সংখ্যা, এবং একটা সময় আসবে, যখন ফেসবুক পরিণত হবে একটি ডিজিটাল গোরস্তানে।

অনেকেই বলতে পারেন, এ তথ্যে আর চমকাবার মতো কী আছে, যেকোনো বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের পক্ষেই এমন ভবিষ্যতের ব্যাপারে আগে থেকেই ধারণা করে নেয়া সম্ভব। হ্যাঁ, সে কথা ঠিক বটে। কিন্তু মূল বিস্ময়ের জায়গাটি অন্য। ফেসবুকে একদিন জীবিতের চেয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়বে এ কথা আমরা সকলেই আন্দাজ করেছিলাম বটে, তবে ঘটনাটি যে এত শীঘ্রই ঘটে যাবে, সে সম্পর্কে অবশ্যই কারো কোনো ধারণা ছিল না।

অক্সফোর্ডের গবেষকরা বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন, ২১০০ সালের মধ্যেই ফেসবুকের অন্তত ১.৪ বিলিয়ন সদস্য মারা যাবে। এমন প্রেক্ষাপটে, ২০৭০ সালের মধ্যেই ফেসবুকে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে জীবিত ব্যবহারকারীর সংখ্যাকে। এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির ব্যবহারকারী যদি বর্তমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে এই শতক শেষ হওয়ার আগেই মৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা এমনকি ৪.৯ বিলিয়নও হতে পারে।
ফেসবুকে বর্তমানে মৃত ব্যক্তিকে স্মরণের জন্য আছে রিমেম্বারিং ফিচারটি; Image Source: Getty Images

এই গবেষণার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য দুটি দৃশ্যপট চিন্তা করা হয়েছে, এবং গবেষক দলটির বিশ্বাস, প্রকৃত ভবিষ্যৎ বাস্তবতা এই দুইয়ের মাঝামাঝি কিছু হতে পারে।

    প্রথম সম্ভাব্য দৃশ্যপটের ক্ষেত্রে ধরে নেয়া হয়েছে যে, ২০১৮ সালের শেষ পর্যন্ত ফেসবুকে যে পরিমাণ ব্যবহারকারী ছিল, পরবর্তীতে তার অধিক আর কোনো নতুন ব্যবহারকারী যোগ হবে না। সেক্ষেত্রে এই শতাব্দীর শেষ হওয়া পর্যন্ত ফেসবুকের মৃত প্রোফাইলের ৪৪ শতাংশই আসবে এশিয়া থেকে। এবং এসব মৃত প্রোফাইলের প্রায় অর্ধেকই আবার আসবে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। ২১০০ সাল নাগাদ এই দুই দেশ থেকেই ফেসবুকে সৃষ্টি হবে ২৭৯ মিলিয়নের মতো মৃত প্রোফাইল।
    দ্বিতীয় সম্ভাব্য দৃশ্যপটে ধরে নেয়া হচ্ছে যে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ফেসবুকের ব্যবহারকারী বৃদ্ধির হার যেমন ১৩ শতাংশ, প্রতিটি বাজার পরিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এ হারই বিদ্যমান থাকবে। সেক্ষেত্রে মৃত প্রোফাইলের সংখ্যায় আফ্রিকাও পেছন থেকে এসে এশিয়াকে ধরে ফেলবে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন ঘটবে নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে। ২১০০ সাল নাগাদ মোট মৃত প্রোফাইলের ৬ শতাংশেরই ঠিকানা হবে আফ্রিকার এই দেশটি। অপরদিকে, ফেসবুকে পশ্চিমা বিশ্বের মৃত প্রোফাইলের প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যাটি এশিয়া ও আফ্রিকার তুলনায় হবে খুবই নগন্য। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে সর্বোচ্চ মৃত প্রোফাইলের আবাসস্থলের তালিকায় সেরা দশে।

গবেষক দলটি এই সম্ভাব্য দুই ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে প্রধানত ব্যবহার করেছে জাতিসংঘ প্রণীত তথ্য, যারা প্রতিটি দেশের বয়সভেদে মোট জনসংখ্যা ও সম্ভাব্য মৃতের পরিমাণ প্রকাশ করে থাকে। এছাড়া গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে ফেসবুকের অডিয়েন্স ইনসাইটস ফিচারও, যা থেকে জানা যায় প্রতিটি দেশ ও বয়সভেদে নতুন ব্যবহারকারী বৃদ্ধি সম্পর্কে।
ফেসবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এশিয়ায়; Image Source: Website Hosting Rating

এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই যে গবেষণাটি করা হলো এবং এর মাধ্যমে ২১০০ সাল নাগাদ ফেসবুকের সম্ভাব্য মৃত প্রোফাইলের সংখ্যা সম্পর্কে একটি আন্দাজ পাওয়া গেল, এর মূল তাৎপর্য কী? অর্থাৎ, এই গবেষণার তথ্য আদতে কী কাজে লাগবে? সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গবেষণাপত্রটির প্রধান রচয়িতা, কার্ল ওহম্যান।

    এই পরিসংখ্যানগুলো জন্ম দেয় নতুন এবং কঠিন কিছু প্রশ্নের। তা হলো, মৃত প্রোফাইলগুলোতে থাকা ডেটা ব্যবহারের অধিকার কার হাতে থাকবে, এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মৃতের পরিবার ও বন্ধুদের স্বার্থের কথা আমলে নেয়া হবে কি না। এছাড়া আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদরা অতীতকে জানার ও বোঝার ক্ষেত্রে এসব ডেটা কতটুকু কাজে লাগাতে পারবেন।

    সামাজিক ধাপ থেকে আমরা কেবলই এই প্রশ্নগুলো করতে শুরু করেছি, এবং এখনো আমাদের অনেকদূর পথ অতিক্রম করা বাকি। আমাদের ডিজিটাল দেহাবশেষের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে সংযুক্ত রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তিকেই প্রভাবিত করবে। কেননা একদিন আমরা সকলেই মারা যাব, কিন্তু ফেসবুকে আমাদের ডেটাগুলো থেকে যাবে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে ফেসবুকের মৃত প্রোফাইলের সংখ্যাটি আরো বড় কিছুরও ইঙ্গিত দেয়। কেননা, আর কিছু না হোক, এগুলো অন্তত আমাদের বৈশ্বিক ডিজিটাল ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তো পরিণত হবেই।
    ফেসবুক পরিণত হবে ডিজিটাল গোরস্তানে; Image Source: Digital Remains

গবেষণাপত্রটির সহযোগী রচয়িতা ডেভিড ওয়াটসনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যোগ করেন:

    মানব ইতিহাসে এমনটি আগে আর কখনোই ঘটেনি যে মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতির এত বিশাল একটি আর্কাইভ কেবল একটি জায়গাতেই মজুদ অবস্থায় রয়েছে। তাই, এই আর্কাইভগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, এক অর্থে, আমাদের ইতিহাসকেই নিয়ন্ত্রণ করা। তাই এখন আমাদের জন্য এই বিষয়টি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের এসব ঐতিহাসিক ডেটা ব্যবহারের বা সংরক্ষণের অধিকার যেন কেবল একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে। এছাড়া আমাদেরকে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের ডিজিটাল ঐতিহ্যগুলো ব্যবহারের সুযোগ পায়।

25
Jannatul Naym Pieal

প্রায় সব সংস্কৃতিতেই মাতৃত্বকে বিবেচনা করা হয় একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে। ভাবা হয়, মাতৃত্বই নাকি একজন নারীর জীবনে পরিপূর্ণতা বয়ে আনে। তাই তো মাতৃত্বের আগমন বার্তা শোনার পর থেকেই একজন হবু মা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যায়। আর শেষমেষ যখন সেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তখন তার আনন্দের সীমা থাকে না।

তবে অতি স্বাভাবিক এই চিত্রের বিপরীত চিত্রও কিন্তু রয়েছে। সাত রাজার ধন হাতে পেয়েছে বলেই যে একজন নারী সারাক্ষণ সুখের সপ্তম স্বর্গে বাস করবে, তার জীবনে দুঃখ বলে আর কোনো শব্দের অস্তিত্বই থাকবে না, এমন ভাবাটা নিতান্তই ভুল। কখনো কখনো মাতৃত্বের আনন্দ বিষাদেও পরিণত হতে পারে।

শুনতে হয়তো অবাক লাগছে, তবে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মায়ের ক্ষেত্রেই অন্তত এক-দুইবার এমন পরিস্থিতি হয়েছে। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে একজন নারীকে আট-নয় মাস বা তারও বেশি সময় ধরে যে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়, তার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো থাকবেই। তাই সন্তান প্রসবের দু'-তিনদিন পর থেকেই অনেক মায়ের ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন, কান্না কান্না ভাব, উদ্বেগ, রাতে ভালো ঘুম না হওয়া প্রভৃতি সমস্যা হতে শুরু করে।

সাধারণত দু' সপ্তাহ পর্যন্ত একজন নতুন মাকে এসব সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে সবার ক্ষেত্রেই তো আর সমস্যার ধরন এক হয় না। কোনো কোনো নতুন মায়ের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরো দীর্ঘমেয়াদী হয়, এবং সমস্যার মাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়। এভাবে একজন নতুন মায়ের বিষণ্ণতা যখন চরম মাত্রায় পৌঁছায়, তখন সেটিকে পোস্টপার্টাম বা পোস্টন্যাটাল ডিপ্রেশন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মাতৃত্বের আনন্দ পরিণত হতে পারে বিষাদে; Image Source: Parents
বিষণ্ণতায় ঘাবড়াবার কিছু নেই

সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে একজন নারীকে প্রচুর শারীরিক ও মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়। ফলে সন্তান জন্মদানের অব্যবহিত পরে তার মন স্বাভাবিকের চেয়েও কোমল ও স্পর্শকাতর থাকে। আর ঠিক সেই সময়টাতেই তার উপর বিষণ্ণতা ভর করে। এতে অনেক নতুন মা-ই ঘাবড়ে যায়। নিজের উপর অহেতুক সন্দেহ করতে থাকে সে,

    "আমার সমস্যাটা কী! সন্তান হয়েছে বলে আমার তেমন আনন্দ হচ্ছে না কেন! আমি কি তবে ভালো মা হতে পারব না!"

যেসব নতুন মা এসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। মাতৃত্বকালীন বিষণ্ণতা মোটেই কোনো চারিত্রিক ত্রুটি বা দুর্বলতা নয়। ন'মাস ধরে এত কষ্ট, এত শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করার পর, কিছুদিন যদি আপনি মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করেন, তাতে দোষের কিছুই নেই। বরং যদি বুঝতে পারেন যে আপনার মধ্যে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, তাহলে দেরি না করে সেটির চিকিৎসা নিয়ে নিলেই দ্রুততম সময়ে আপনি আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারবেন, সন্তানের সাথে চমৎকার বন্ধনও গড়ে তুলতে পারবেন।
সাধারণ বিষণ্ণতায় ঘাবড়াবার কিছু নেই; Image Source: Amen Clinics
সাধারণ বিষণ্ণতার লক্ষণ

সন্তান জন্ম দেয়ার দু'-তিনদিন পর থেকে সর্বোচ্চ দু' সপ্তাহ পর্যন্ত যেকোনো নতুন মা-ই বিষণ্ণ বোধ করতে পারে। এটি নিতান্তই সাধারণ বিষণ্ণতা, যাকে 'বেবি ব্লুজ' বলা হয়ে থাকে। ব্যক্তিভেদে এসব বিষণ্ণতার স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে স্বাভাবিকভাবে একজন নতুন মা নিম্নোক্ত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়ে থাকেন,

    ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন
    উদ্বেগ
    দুঃখবোধ
    খিটখিটে মেজাজ
    সহজেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া
    কান্নাকাটি করা
    কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে না পারা
    খাবারে স্বাদ না পাওয়া
    ঘুমাতে সমস্যা হওয়া।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ

শুরুতে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনকে অনেকেই সাধারণ বিষণ্ণতা বা বেবি ব্লুজ বলে ভুল করতে পারেন। কিন্তু পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের উপসর্গগুলোর তীব্রতা আরো অনেক বেশি, এবং এগুলো আরো বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। পরবর্তীতে অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, নবজাতক শিশুকে সামলানো কিংবা ঘরের টুকিটাকি যেকোনো কাজের ক্ষেত্রেই তাকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো সন্তান জন্মদানের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেখা দেয়। তবে অনেকের ক্ষেত্রে আরো আগে, যেমন গর্ভাবস্থাতেই, আবার অনেকের ক্ষেত্রে অনেক পরে, যেমন সন্তান জন্মদানের বছরখানের পরেও, এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সন্তান জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই লক্ষণ দেখা যায়; Image Source: Baby Center

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা দেয়-

    মন সবসময়ই বিষণ্ণ থাকা
    মেজাজ অনেক তাড়াতাড়ি পরিবর্তিত হতে থাকা
    বাচ্চার সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে সমস্যা হওয়া
    স্বাদহীনতার কারণে একেবারেই খেতে না পারা
    স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেশি খেয়ে ফেলা
    একেবারেই ঘুমাতে না পারা (ইনসমনিয়া)
    অনেক বেশি বেশি ঘুমানো
    যেকোনো বিষয়ে অনেক বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়া
    কোনো বিষয়ে একদমই আগ্রহ অনুভব না করা
    আগে যেসব কাজ উপভোগ্য ছিল, সেগুলোও ভালো না লাগা
    মেজাজ খিটখিটে থাকা এবং অল্পতেই রেগে যাওয়া
    "আমি ভালো মা নই" জাতীয় অনুভূতি হওয়া
    হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া
    নিজেকে নিয়ে লজ্জিত, বিব্রত বোধ করা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা
    কোনো বিষয়ে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে না পারা
    কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে না পারা
    যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোলাচলে ভোগা
    সবসময় অস্থির অনুভব করা
    প্রচণ্ড উদ্বেগ অনুভব করা, প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হওয়া
    নিজের কিংবা সন্তানের ক্ষতি করার চিন্তা করা
    বারবার মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার কথা ভাবা।

পোস্টপার্টাম সাইকোসিস

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন অনেকের ক্ষেত্রে আরো বিরল একটি মুড ডিজঅর্ডার, পোস্টপার্টাম সাইকোসিসেও রূপান্তরিত হতে পারে। খুবই চরম মাত্রার একটি মানসিক সমস্যা এটি। এক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়-

    সবসময় বিভ্রান্ত থাকা, কাউকে সহজে চিনতে না পারা
    সন্তানের ব্যাপারে অবসেশনে ভুগতে থাকা
    সম্মোহিত কিংবা ভ্রমের মধ্যে থাকা
    ঘুমের চরম ব্যাঘাত হওয়া
    মাত্রাতিরিক্ত শারীরিক শক্তি অনুভভ করা এবং উত্তেজিত থাকা
    প্যারানয়া বা মস্তিষ্কবিকৃতির শিকার হওয়া
    বারবার নিজের বা সন্তানের ক্ষতি করতে উদ্যত হওয়া।

পোস্টপার্টাম সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার মৃত্যুচিন্তা করতে থাকে, নিজের আচার-আচরণেও সেগুলো প্রকাশ পায়, এবং যথাসময়ে চিকিৎসা না করা হলে তার জীবন সত্যি সত্যিই হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে?

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা পোস্টপার্টাম সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে লক্ষণ বা উপসর্গগুলো কমবেশি দেখা যাবে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলো সবসময় বোঝা না-ও যেতে পারে। তাই অনেকেই বিভ্রান্তিতে ভুগতে পারেন যে কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে, একজন নতুন মায়ের সাথে নিম্নোক্ত পাঁচটি ব্যাপার ঘটলে অনতিবিলম্বে তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে-

    যদি বিষণ্ণতা দু' সপ্তাহের মাঝে দূর না হয়
    যদি অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে
    যদি সন্তানের যত্ন নেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে
    যদি প্রতিদিনের কাজকর্ম সম্পন্ন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে
    যদি নিজের ও সন্তানের ক্ষতির চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

সমস্যা হতে পারে বাবাদেরও; Image Source: Medical Academic
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে নতুন বাবারাও

এতক্ষণ তো কেবল নতুন মাদের নিয়েই কথা বললাম। কিন্তু পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের অভিজ্ঞতা হতে পারে নতুন বাবাদেরও। তারাও দুঃখবোধ করতে পারে, হঠাৎ হঠাৎ বিষণ্ণবোধ করতে পারে, উদ্বিগ্ন হতে পারে, অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে, কিংবা তাদের সাধারণ খাওয়া ও ঘুমের নিয়মে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

যেসব নতুন বাবার বয়স কম, ইতিপূর্বে বিষণ্ণতার ইতিহাস রয়েছে, সম্পর্কে ঝামেলা হয়েছে, অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, তাদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বাবাদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনকে বলা হয়ে থাকে প্যাটার্নাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। এটি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এবং সন্তানের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আপনি যদি একজন নতুন বাবা হন, এবং স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় কিংবা সন্তান জন্মের প্রথম বছরের মধ্যে বিষণ্ণতা বা উদ্বিগ্নতার শিকার হন, তাহলে আপনার উচিত হবে, দেরি না করে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। তাছাড়া নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, নতুন বাবাদের ক্ষেত্রেও সেই একই বিষয়গুলো প্রযোজ্য।
কেন হয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন?

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের পেছনে কোনো একক কারণকে দায়ী করা সম্ভব নয়। তবে কিছু শারীরিক ও মানসিক ইস্যু এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।

শারীরিক পরিবর্তন: সন্তানের জন্মের পর শরীরে বিশেষ কিছু হরমোনের (যেমন এস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন) ঘাটতি দেখা দেয়, যা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন ঘটাতে পারে। এছাড়া থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে উৎপাদিত আরো কিছু হরমোনের পরিমাণও কমে যেতে পারে, যার ফলে দুর্বল, অলস ও বিষণ্ণ অনুভূত হতে পারে।

মানসিক কারণ: যদি কারো ঘুমের সমস্যা হয় এবং সবসময় উত্তেজিত থাকে, তাহলে অনেক ছোটখাটো সমস্যা মোকাবেলা করতেও তার সমস্যা হতে পারে। অনেক নতুন মা-ই নিজের নবজাতক সন্তানের যত্ন নেয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকে। আবার সন্তান জন্মানোর পর সকল মনোযোগ ওই সন্তানকেই দিতে হয় বলে, অনেকেই আত্মপরিচয়হীনতায় ভুগতে পারে, নিজেকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে, কিংবা নিজের জীবনের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে। এগুলোর মধ্যে যেকোনো কারণেও পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে।
রিস্ক ফ্যাক্টর

অন্য যেকোনো মানসিক সমস্যার মতো, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনেরও কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে, অর্থাৎ কিছু বিশেষ কারণে এটি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে-

    যদি অতীতে বিষণ্ণতার ইতিহাস থাকে
    যদি বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকে
    পূর্বের কোনো গর্ভাবস্থায়ও যদি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন হয়ে থাকে
    পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের মধ্যেও যদি বিষণ্ণতা বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যা থেকে থাকে
    যদি পূর্ববর্তী বছরে মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটে, যেমন গর্ভকালীন জটিলতা, শারীরিক অসুস্থতা, চাকরি হারানো, সঙ্গীর সাথে মনোমালিন্য
    যদি সন্তান পুরোপুরি সুস্থভাবে না জন্মায়, অর্থাৎ তার মধ্যে কোনো শারীরিক জটিলতা থাকে
    যদি যমজ সন্তান হয়
    যদি বুকের দুধ খাওয়াতে সমস্যা হয়
    যদি অর্থনৈতিক সমস্যা চলতে থাকে
    গর্ভধারণটি যদি অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপরিকল্পিত হয়।

মায়ের মানসিক অবস্থা শিশুকেও প্রভাবিত করতে পারে; Image Source: Colic Calm
প্রতিরোধের উপায়

মানসিক সমস্যাগুলো কখনো বলে-কয়ে আসে না। তারপরও যদি কোনো নতুন মা বা সন্তান-সম্ভবা নারী বিষণ্নতার শিকার হয়, তবে তার উচিত হবে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নেয়া। পূর্ববর্তী বিষণ্ণতার ইতিহাস থেকে থাকলে, গর্ভধারণের আগেই এ বিষয়ে চিকিৎসকের সাথে কথা বলে নিলেও ভালো হয়। সেক্ষেত্রে চিকিৎসক হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ ডিপ্রেশন স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করবেন, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেবেন, কিংবা প্রয়োজনবোধে কোনো সাপোর্ট গ্রুপ বা কাউন্সেলরের কাছে যেতে বলবেন।

যাদের বিষণ্ণতার ইতিহাস আছে, সন্তান জন্মদানের পরপরই তাদের উচিত হবে, আবারো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ভালোভাবে নিজের মানসিক চেক-আপ করিয়ে আসা। যদি তখনই কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ ধরা পড়ে, তাহলে আগেভাগেই চিকিৎসা শুরু করে দেয়া যাবে, এবং নতুন মা ও সন্তান কারো উপর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টির আগেই সমস্যাটিকে দূর করে ফেলা সম্ভব হবে।

26
Sabrina Sumaiya

আবেগ-অনুভূতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসি-আনন্দ, ভালোলাগা-ভালোবাসার মতো আবেগ যেমন আমাদের জীবনকে বর্ণিল রঙের ছটায় রাঙিয়ে দেয়, তেমনি দুঃখ-কষ্ট, রাগ, দুশ্চিন্তা, ভয়-ভীতির মতো আবেগ জীবনকে তিক্ততায় ভরিয়ে দেয়। এই ভালো বা খারাপ আবেগগুলোর ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থানের ফলে আমাদের জীবনের ভারসাম্য বজায় থাকে, আমরা জীবনের অর্থ উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু কখনো কখনো একটি বা একাধিক আবেগের আধিক্যের কারণে জীবন সাম্যবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, আনন্দের প্রাচুর্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। তবে দুঃখ-কষ্ট বা রাগের আধিক্য জীবনকে একনিমিষে নরক বানিয়ে দিতে পারে।
প্রতীকী ছবি; Image Source: talkspace

ফলে আচরণ, বিশ্বাস ও চিন্তা-ভাবনায় আসে নেতিবাচক পরিবর্তন, যার লাগাম টেনে ধরতে না পারলে জীবন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্টি হওয়া নেতিবাচক আবেগ ও আচরণ আমাদের সবাইকে একরকম নাকানিচুবানি খাইয়ে ছেড়ে দেয়। এভাবে আমরা প্রতিটি সংগ্রামী জীবনযোদ্ধা একটা না একটা সময় জীবনে হোঁচট খাই। কখনো আবার উঠে দাঁড়াই, কখনো পারি না। তখন মনে হয়, "না, আমি আর পারছি না, আমাকে দিয়ে আর সম্ভব না।"

আপনি যদি এমন দিশেহারা অবস্থায় পড়ে থাকেন, তাহলে মোটেও ঘাবড়ে যাবেন না। কারণ আপনি একা নন। সাইকোথেরাপি নিয়ে সাইকোথেরাপিস্টরা আছেন আপনার পাশে।
সাইকোথেরাপির প্রাথমিক ধারণা

আমরা যখন কোনো দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের মতো মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় পড়ি, তখন কী করি? বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের লোকজনের সাথে সমস্যাগুলো শেয়ার করি। এতে কখনো সমাধান হয়, কখনো হয় না। অন্তত হালকা লাগে, দুশ্চিন্তা কমে। কখনো কখনো আমরা এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যা পরিবার বা বন্ধুবান্ধবকেও বলা যায় না। বললেও দুশ্চিন্তা বা কষ্টবোধ কমে না। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে, আপনার সাইকোথেরাপি নেয়ার সময় হয়েছে। সাইকোথেরাপির গুরুত্ব বুঝতে হলে জানতে হবে সাইকোথেরাপি কী।
প্রতীকী ছবি; British psychotherapy foundation

সাইকোথেরাপি হচ্ছে একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাইকোথেরাপিস্ট আপনার সাথে আপনার সমস্যা নিয়ে কথা বলে সেটি চিহ্নিত করবেন এবং বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও জ্ঞানের আলোকে তা সমাধান করবেন।
একজন সাইকোথেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলছেন; Image Source: medical news today

বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের থেকে একজন সাইকোথেরাপিস্টের সাহায্য নেয়া অনেক বেশি কার্যকরী। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা আছে, প্রশিক্ষণ আছে, আপনার সাথে আবেগীয় দূরত্ব আছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তিনি আপনার প্রতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আপনার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং আপনার সমস্যা যত উদ্ভটই হোক আপনাকে কটাক্ষ করবেন না। তিনি আপনার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না, বরং আপনার নিজেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। এছাড়া আরেকটি বিশেষ সুবিধা আপনি পাবেন। তা হচ্ছে খুবই গোপনীয় পরিবেশে মনের সবটুকু কথা নির্ভয়ে খুলে বলতে পারবেন। কারণ সাইকোথেরাপিস্টরা গোপনীয়তাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

সুতরাং, সাইকোথেরাপি মূলত ব্যক্তি ও সাইকোথেরাপিস্টের অংশগ্রহণে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, যা ব্যক্তিকে আরো সুস্থ ও সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারে।
কখন সাইকোথেরাপি নেয়া জরুরি?

যখন কারো দিনের পর দিন অনেক বেশি মন খারাপ থাকে, যখন কেউ দীর্ঘসময় ধরে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভোগে, যখন অতিরিক্ত রাগ জীবনকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিতে চায় কিংবা কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়, তখন সাইকোথেরাপি নিতে হয়। এছাড়া আরো যেসব কারণে সাইকোথেরাপি নেয়া যায়:

    দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে প্রচন্ড অসহায় অনুভব করলে
    মানসিক সমস্যা সমাধানের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও সমাধান না হলে
    প্রতিদিনের কাজকর্মে মনোযোগ দিতে না পারলে
    অতিরিক্ত মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে
    সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি হলে (দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স)

আপনার যেকোন মানসিক সমস্যার সমাধান হতে পারে সাইকোথেরাপি; Image Source: mushable.com
সাইকোথেরাপির যত প্রকার

সাইকোথেরাপির নানা রকমফের আছে। প্রত্যেক প্রকার সাইকোথেরাপিই একেকটি আলাদা পথ দেখায়, যে পথে সাইকোথেরাপিস্ট ক্লায়েন্টের সমস্যার সমাধান করবেন। তবে সাইকোথেরাপিস্টরা সাধারণত একাধিক ধরনের সাইকোথেরাপির সমন্বয়ে সমাধান করে থাকেন। আপনাকে কোন ধরনের সাইকোথেরাপি দেয়া হবে তা নির্ভর করবে আপনার সমস্যার ধরন ও গভীরতা এবং আপনার সাইকোথেরাপিস্টের মনোবিজ্ঞানের উপর দখল কতটুকু তার ওপর। বিভিন্ন ধরনের সাইকোথেরাপি নিয়ে চলুন সংক্ষেপে জানা যাক।
কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি

এই সাইকোথেরাপি মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে এবং তার চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসে। ক্ষতিকর ও বাজে আচরণ ও চিন্তাকে বদলে দেয় যৌক্তিক ও ইতিবাচক আচরণ দিয়ে। মানুষকে সঠিকভাবে চিন্তা করতে শেখায়। ডিপ্রেসন, ওসিডি, এংজাইটি, ট্রমা ও ইটিং ডিসঅর্ডারের মতো রোগবালাইয়ের আদর্শ দাওয়াই হিসেবে কাজ করে এই থেরাপি।
ইন্টারপারসোনাল থেরাপি

এটি একটি স্বল্পমেয়াদী সাইকোথেরাপি। এই থেরাপি গভীর শোক, সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সমাজের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বড়সড় ঝামেলার মতো সমস্যা সংক্রান্ত ব্যাপারে তার ও অন্যদের ভূমিকা ঠিক কেমন হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। এটি মানুষকে সুস্থভাবে নিজের আবেগ প্রকাশ ও যোগাযোগের দক্ষতার উন্নতি ঘটাতে শেখায়।
ডায়ালেক্টিক্যাল থেরাপি

এটি একধরনের কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি, যা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা লোকজন, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার ও পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের রোগীদের সমস্যা সমাধানের পথ দেখায়। এটি ব্যক্তির দায়িত্ববোধে পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং সুস্থ আচরণ করতে শেখায়।
সাপোর্টিভ থেরাপি

এই থেরাপিতে রোগীকে আত্মোন্নয়নের জন্য উৎসাহ দেয়া হয়। এটি শেখায় কীভাবে আত্মসম্মানবোধ বাড়ানো যায়, দুশ্চিন্তা কমানো যায়, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো যায় এবং সামাজিক দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো যায়।
সাইকোডায়নামিক থেরাপি

শৈশবের দুঃসহ কোনো স্মৃতির কারণে আমাদের অবচেতন মনে বিরক্তিকর চিন্তাভাবনা ঘোরাফেরা করে, যা আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। এই থেরাপির লক্ষ্য হচ্ছে এই চিন্তাগুলো দূর করে মানসিক ও আচরণগত সুস্থতা নিশ্চিত করা।
সাইকোঅ্যানালাইসিস

এটি সাইকোডায়নামিক থেরাপির আরো বিস্তারিত রুপ। এক্ষেত্রে এক সপ্তাহে তিনটি বা তার বেশি সেশন নেয়া হয়।
কারা সাইকোথেরাপি দিয়ে থাকেন?

সাইকোথেরাপি সেবা দিয়ে থাকেন সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক নার্সের মতো পেশাজীবীরা।
কাউন্সেলিং বনাম সাইকোথেরাপি

কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি মোটামুটি একইরকম ব্যাপার, কখনো কখনো শব্দ দুটি সমার্থক। যারা কাউন্সেলিং করেন, তারাই সাইকোথেরাপি দেন। তবে কিছু পার্থক্য তো রয়েছেই। কাউন্সেলিং স্বল্পমেয়াদী একটি সেবা।

কাউন্সেলিং মূলত ক্লায়েন্টের বর্তমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- দাম্পত্য জীবনে অশান্তি। এক্ষেত্রে কাউন্সেলর মাত্র কয়েকটি সেশনে ক্লায়েন্টের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সমাধান বাতলে দেন। আর সাইকোথেরাপি দীর্ঘসময় নিয়ে চলা একটি চিকিৎসাপদ্ধতি। এতে সমস্যার একদম গভীরে গিয়ে সমস্যার শিকড়কে উপড়ে ফেলা হয়। এতে ব্যক্তির অতীত ও অতীতের সমস্যাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয় যেন এর প্রভাবে বর্তমান জীবন সুন্দর হয়।
আপনিও পেতে পারেন মানসিক ঝঞ্ঝাটমুক্ত সুস্থ জীবন; Image Source: shutterstock
কীভাবে সাইকোথেরাপি শুরু করবেন

প্রথমে আপনাকে একজন সাইকোথেরাপিস্ট খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য আপনার পরিচিত লোকজনকে জিজ্ঞেস জরুন, আপনার পারিবারিক ডাক্তারকে বলুন, আশেপাশের মেডিকেল কলেজগুলোতে খোঁজ নিন, কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগ থাকলে সেখানে খোঁজ নিন।

তারপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করুন ও সাইকোথেরাপি শুরু করুন। সাইকোথেরাপি মোটামুটি এরকম হবে- আপনি ও আপনার থেরাপিস্ট প্রথমে আপনার সমস্যাকে খুঁজে বের করবেন। এতে আপনার থেরাপিস্ট বিভিন্ন স্কেলের ভিত্তিতে আপনার ডিপ্রেসন বা এংজাইটির তীব্রতা পরিমাপ করবেন। এরপর সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবেন। তিনি আপনার সাথে কথা বলতে বলতে আপনার গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করবেন এবং তা শোধরানোর কৌশল শেখাবেন। থেরাপিস্ট আপনাকে কিছু হোমওয়ার্ক ও অ্যাসাইনমেন্ট দেবেন এবং আপনি তা ঠিকঠাকমতো করছেন কি না তার খবর নেবেন। তারপর আপনার থেরাপিস্ট ও আপনি সময়ের সাথে আপনার কতটুকু উন্নতি হচ্ছে তা নিরীক্ষণ করবেন। আশা করা যায়, এভাবে একসময় আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

বর্তমানে মানসিক যেকোনো জটিলতা বা মানসিক রোগের নির্ভরযোগ্য ও কার্যকরী সমাধান হচ্ছে সাইকোথেরাপি। আপনি যদি কোনো মানসিক সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে থাকেন তাহলে দেরি করবেন না। আজই অভিজ্ঞ কোনো সাইকোথেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন।

27
Jannatul Naym Pieal
আপনি কি স্ট্রেস বা মানসিক চাপে ভুগছেন? প্রচন্ড অস্থির লাগছে? একাকিত্ব অনুভব করছেন? পানিতে তলিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে? চারপাশের সবকিছু অর্থহীন লাগছে? জীবনটা একেবারেই মূল্যহীন মনে হচ্ছে? সামাজিক বিজ্ঞানীরা এসব সমস্যার এক অসাধারণ নিরাময় আবিষ্কার করেছেন। সেটির সত্যতা যাচাই করতে আপনাকে মিনিট পাঁচেকের বেশি ব্যয় করতে হবে না। স্রেফ আপনার মায়ের সাথে কথা বলুন। কিংবা মা যদি ধারেকাছে না থাকেন, তবে তাকে ফোনে একটি কল দিন। এতে করে আপনার স্ট্রেস কমা ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
যাবতীয় মানসিক সমস্যায় ফোন করতে পারেন মাকে; Image Source: mmctsu.com
মায়ের ভালোবাসার ক্ষমতা

সম্পর্ক-বিজ্ঞানে মায়ের ভালোবাসার মতো ক্ষমতাশালী বস্তু খুব কমই আছে। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই জানতেন যে একজন সন্তান যদি তার মাকে জড়িয়ে ধরে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই তার মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতিসম্পন্ন হরমোন অক্সিটোসিনের স্রোত বয়ে যায়, যা মা ও সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কের বন্ধনকে আরো জোরালো করে, মানসিক চাপ কমায়, এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের খুঁটিকে আরো মজবুত করে। এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন নিশ্চয়ই অনেকেই হয়েছেন যে, আপনি হয়তো মানসিকভাবে সেরা অবস্থায় ছিলেন না, কিন্তু মায়ের সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর পরই আপনার মেজাজ চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, মায়ের ভালোবাসার শক্তি কেবল এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মায়ের পক্ষে হাজার মাইল দূরে থেকেও সন্তানের মন ভালো করে দেয়া সম্ভব, যেটি রীতিমতো একটি গবেষণা থেকেই প্রমাণিত। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের চাইল্ড ইমোশন ল্যাব থেকে করা গবেষণাটির ফল বলছে, মায়ের আলিঙ্গন সন্তানের মানসিক স্ট্রেস কমাতে যে প্রভাব ফেলে, ফোনের মাধ্যমে শোনা যাওয়া মায়ের কণ্ঠস্বরেও ঠিক সেরকমই প্রভাব বিদ্যমান।
গবেষণাটি হয়েছে  ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনে; Image Source:  University of Wisconsin-Madison
যেভাবে পরিচালিত হয়েছে গবেষণাটি

৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ৬১ জন মেয়েকে এই গবেষণার জন্য বেছে নেয়া হয়। তাদের মানসিক স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে অজানা অচেনা দর্শকদের সামনে তাদেরকে বিভিন্ন কৌশলী গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে দেয়া হয়। তাদের মনে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্ট্রেস ঢুকিয়ে দেয়ার পর, তাদেরকে তিনটি পৃথক দলে বিভক্ত করা হয়। এরপর:

    প্রথম দলকে তাদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়, যাতে করে মায়ের সাথে তাদের শারীরিক সংযোগ ঘটে;
    দ্বিতীয় দলকে ফোন দেয়া হয়, যাতে তারা তাদের মায়ের সাথে ১৫ মিনিট করে কথা বলতে পারে;
    তৃতীয় দলকে একটি আবেগ-নিরপেক্ষ ভিডিও দেখতে দেয়া হয়।

এরপর গবেষকরা প্রতিটি মেয়ের শরীর থেকে তরল নমুনা সংগ্রহ করেন, যাতে করে তাদের শরীরের অক্সিটোসিন ও স্ট্রেস হরমোন কোর্টিসলের মাত্রা পরিমাপ করা যায়।
ফলাফল

গবেষকরা কিছু বিস্ময়কর ফলাফল পান। তারা দেখেন, যারা মায়ের সাথে শারীরিক বা ফোনের মাধ্যমে সংযোগের সুযোগ পায়নি, তাদের মানসিক স্ট্রেসের সবচেয়ে কম নিঃসরণ ঘটেছে। কিন্তু যারা মায়ের শারীরিক সংস্পর্শ পেয়েছে, আর যারা ফোনে মায়ের সাথে কথা বলেছে, তাদের সকলেরই প্রায় সমান মাত্রায় মানসিক স্ট্রেসের নিঃসরণ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে গবেষণাপত্রের প্রধান রচয়িতা লেসলি সেলৎজার বলেন,

    যেসব বাচ্চারা মায়ের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে, হোক তা ফোনে কথা বলে কিংবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে, তাদের সকলেরই প্রায় সমান মাত্রার হরমোনাল প্রতিক্রিয়া ছিল। এতদিন আমরা জানতাম সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অক্সিটোসিন বৃদ্ধির জন্য শারীরিক স্পর্শের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের প্রাপ্ত ফলাফলের মাধ্যমে এটি এখন পরিষ্কার যে মায়ের কণ্ঠস্বর আলিঙ্গনের সমতুল্য প্রভাব বিস্তারে সক্ষম।

মায়ের সংস্পর্শে এলে শিশু সবচেয়ে আনন্দে থাকে; Image Source:
প্রতিক্রিয়া

ড. লেন স্ত্রাথার্ন, বর্তমানে বেইলর কলেজ অব মেডিসিন এবং টেক্সাস চিলড্রেন্স হসপিটালে পিডিয়াট্রিকসের একজন অধ্যাপক, এ গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলকে 'খুবই শক্তিশালী' হিসেবে অভিহিত করেন।

স্ত্রাথার্ন, যিনি নিজে উপরোক্ত গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না, বলেন যে, এটিই প্রথম কোনো গবেষণা যেখানে দেখানো হয়েছে যে মায়ের স্পর্শই শুধু নয়, এমনকি কণ্ঠস্বরও সন্তানের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। এর আগে তিনি নিজেও একটি গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে, শিশুদের অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যায়, যখন তারা তাদের মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় এবং আয়নায় তাদেরকে দেখতে পায়। তবে পরিসংখ্যানগতভাবে সেই বৃদ্ধি খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না।
অক্সিটোসিনের মাত্রা বৃদ্ধি

মানব মস্তিষ্কে বুকের দুধ খাওয়ানো, আলিঙ্গন ও অর্গাজমের সময় অক্সিটোসিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে কায়িক পরিশ্রমকে গতিশীল করতেও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। বস্তুতঃ, পিটোসিন নামে একটি ড্রাগ রয়েছে, যেটি অক্সিটোসিনের কৃত্রিম সংস্করণ; কায়িক পরিশ্রম বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই ড্রাগটি ব্যবহৃত হয়।
মস্তিষ্ককে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে অক্সিটোসিন খুবই দরকারি; Image Source: SlidePlayer

এছাড়াও অক্সিটোসিন মানুষের যা যা উপকার করে:

    সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি করে;
    শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা লাঘব করে;
    মানসিক স্ট্রেস ও উদ্বিগ্নতা কমায়;
    ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা দূর করে।

জীবজন্তুর উপর চালানো গবেষণা থেকে দেখা গেছে, অক্সিটোসিন একজন নারীর মস্তিষ্ককে মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। ড. স্ত্রাথার্ন ও অন্যরা মস্তিষ্ক স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মস্তিষ্কের যে অংশগুলো অক্সিটোসিন উৎপাদন করে, একজন মা তার সন্তানকে দেখামাত্রই সেই অংশগুলো জ্বলে ওঠে। এটি রক্তপ্রবাহে উচ্চমাত্রার অক্সিটোসিনের উপস্থিতির সাথেও সম্পর্কিত।
যদি মাকে ফোন দেয়া সম্ভব না হয়?

ফিরে যাওয়া যাক আমাদের প্রাথমিক আলাপে; অর্থাৎ মানসিক স্ট্রেস কমাতে মাকে ফোন করার উপকারিতা বিষয়ে। এই বিষয়টি অনেকের জন্যই স্পর্শকাতর হতে পারে, বিশেষত যাদের মা নেই, কিংবা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, যাদের পক্ষে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলা সম্ভব নয়। মানসিক স্ট্রেস কমাতে তাদের কী করণীয়? বাবার সাথে কথা বলা কি কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে? সম্ভবত না।

জার্নাল অব পারসোনাল অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি বলছে, আপনি নিজে যে লিঙ্গেরই হোন না কেন, একজন পুরুষের চেয়ে যেকোনো নারীর সাথে (তার সাথে আপনার সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন) কথা বললে আপনার একাকিত্ব দূর হওয়া ও মানসিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। টানা দুই সপ্তাহ যাবত ৯৬ জন কলেজ শিক্ষার্থীকে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
কোনো নারীর সাথে কথা বললে একাকিত্ব দূর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি; Image Source: Healthista

এক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের জন্য ৯৬ জন কলেজ শিক্ষার্থী তাদের সকল সামাজিক মিথস্ক্রিয়া রেকর্ড করেছেন, এবং প্রতিটি মিথস্ক্রিয়ার পর সেটিকে রেট করেছেন। এক্ষেত্রে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষ সকলেই একজন নারীর সাথে আলাপচারিতার পর অপেক্ষাকৃত কম একাকিত্ব অনুভব করেছেন। এর একটি কারণ সম্ভবত এই যে, নারীরা প্রাকৃতিকভাবেই বেশি দক্ষ কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে, আবেগিক জায়গাগুলোতে যথোপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে।

সাইকোলজি টুডে'র কিরা আসাট্রায়ান বলেন, "নারীদের মস্তিষ্ক সামাজিক দক্ষতা ও স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী। এর ফলে তারা অন্য একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সহজেই মনে রাখতে পারে।"

এ কারণেই মনে করা হয়, আপনি যদি কারো সাথে কথা বলে নিজের মানসিক চাপ ও একাকিত্ব দূর করতে চান এবং আপনার কথার বিপরীতে উপযুক্ত সাড়াও পেতে চান, তাহলে একজন নারীর সাথে কথা বলাই আপনার জন্য সবচেয়ে ফলদায়ক হবে।

28
Jannatul Naym Pieal

মনে করুন, আপনি আপনার খুব পছন্দের একজন মানুষের সাথে বসে আছেন। অনেকদিন পর তার সাথে দেখা হলো, তাই আপনার মনে অনেক কথা জমে আছে। তাকে সেসব কথা বলার জন্য আপনি উসখুস করছেন। কিন্তু হায়! আপনার কথা শোনার বদলে, সে নিজের মোবাইল বের করে চাপতে শুরু করেছে।

খুব সম্ভবত ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করছে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ চেক করছে সে। খুব জরুরি কোনো কাজ নয়। এমনও নয় যে কাজটা এখনই করতে হবে, না করলে পৃথিবীতে মহাপ্রলয় সৃষ্টি হবে।

কিন্তু তার কাছে মনে হয়েছে, আপনার সাথে কথা বলার চাইতে মোবাইলে ওসব করা তার জন্য এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কী আর করা! "চলি রে, আবার দেখা হবে," বলে আপনি ওই স্থান থেকে চলে আসলেন। কিন্তু মনে মনে খুব কষ্টও পেলেন। অনেক অপমানিত হলেন। সারাদিন আপনার মনের মধ্যে একটা কথাই ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজতে লাগল, "আমার চেয়ে মোবাইলটা ওর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল!"
মনোযোগ যখন মনে নয়, মোবাইল ফোনে; Image Source: Fox News
ফাবিং কী?

এতক্ষণ যে দৃশ্যপটটির কথা বললাম, এর সাথে নিশ্চয়ই আপনারা সকলেই পরিচিত। নিশ্চয়ই প্রায় সময়ই আপনারা এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। কিংবা কে জানে, এমনও হতে পারে যে আপনাদের কারণেই হয়তো কাউকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অর্থাৎ আপনি যে ভূমিকাতেই থাকুন না কেন, এমন অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছেই।

এই যে ব্যাপারটি, অর্থাৎ কারো উপস্থিতিতে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া, এটির কিন্তু একটি নির্দিষ্ট নামও রয়েছে। একে বলা হয় 'ফাবিং' (Phubbing). ইংরেজি শব্দ Phone (ফোন) ও Snubbing (অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ) মিলে তৈরি হয়েছে ফাবিং শব্দটি। সুতরাং, ফোনের প্রতি মনোযোগ দিতে গিয়ে যখন আমরা সামনে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষটিকে অবজ্ঞা করি, তখন সেটিকে বলা হয় ফাবিং।
ইংরেজি শব্দ Phone (ফোন) ও Snubbing (অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ) মিলে তৈরি হয়েছে ফাবিং শব্দটি; Image Source: Digital Trends
ফাবিং যখন মারাত্মক একটি অভ্যাস

আপাতদৃষ্টিতে ফাবিংকে খুবই নিষ্পাপ একটি আচরণিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে হতে পারে। অনেকেই ভেবে বসতে পারেন, "সারাক্ষণ কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় নাকি? একটু যদি মোবাইলটা হাতে নিই, মেসেঞ্জারটা বা ইনস্টাগ্রামটা খুলে দেখি কোনো আপডেট আছে কি না, তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে!"

কিন্তু না পাঠক। যতটা সাদামাটা, অতি সাধারণ একটি অভ্যাস বলে ভাবছেন ফাবিংকে, আদতে তা নয়। বরং খুবই মারাত্মক একটি অভ্যাস একটি, যা কোনো একসময়ে আপনার সম্পর্ক ভাঙা বা জীবন বিষিয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণে পরিণত হতে পারে।

ঘনিষ্ঠতা নষ্ট করে

শুনতে রূঢ় শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো: আপনি যখন আপনার সামনে থাকা মানুষটির বদলে নিজের মোবাইলের দিকে মুখ গুঁজে বসে থাকেন, তখন আপনি নিজের অজান্তেই তাকে একটি অব্যক্ত সংকেত দিয়ে দেন, "এই যে মশাই, আপনি কিন্তু আমার কাছে অত বেশি জরুরি কেউ না। তাই তো আপনাকে রেখে আমি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছি।"

আর এমন ভাবার ফলে, হয় ওই মানুষটি আপনার সামনে থেকে উঠে চলে যাবে, কিংবা ভদ্রতার খাতিরে রয়ে গেলেও, মনে মনে ঠিকই আপনাকে গালমন্দ করবে, কিংবা আপনার সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে নেবে। আর যখন আপনার সম্পর্কে কারো মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওই মানুষটির কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। ফলে আপনাদের মধ্যে একসময় যতই ঘনিষ্ঠতা থাকুক না কেন, এখন একটি দূরত্ব সৃষ্টি হতে শুরু করবে।
বন্ধুত্বে বাগড়া দেয় ফাবিং; Image Source: Merriam-Webster

বন্ধুত্ব শেষ করে দেয়

আপনি যখন আপনার সামনের বন্ধুটিকে বাদ দিয়ে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুটিকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, তার মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে? তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, সামনাসামনি থাকা বন্ধুটির চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুটিই আপনার কাছে বেশি মূল্যবান।

আর বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সবসময়ই একটা মান-অভিমান, মানসিক টানাপোড়েনের জায়গা থাকে। কেউই মানতে পারে না যে সে যাকে বন্ধু করে, সেই বন্ধুটি তাকে বন্ধু ভাবে না, কিংবা ভাবলেও অন্য আরেকজন বন্ধুর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এরকমটা যখন আপনার সামনে থাকা বন্ধুটিও ভাববে, তখন থেকেই আপনাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে থাকবে।

রোমান্টিক সম্পর্ককে আক্রান্ত করে

ফাবিংয়ের ফলে রোমান্টিক সম্পর্কেও ভাঙন ধরে। আর তা কেন ধরবে না, বলুন তো!

একটি সম্পর্কে খুব ছোট ছোট মুহূর্তও অনেক বেশি মূল্যবান। হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী কিছু বলছেন না, চুপ করে বসে আছেন। কিন্তু ওই নীরবতার সময়টুকুও আপনাদের একান্ত নিজস্ব। ওই সময়ে যদি তৃতীয় পুরুষ (কিংবা নারী) হিসেবে মোবাইলের অনাহূত আবির্ভাব ঘটে, তবে তার ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ।
অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার নারীরা খেয়াল করে বেশি; Image Source: Cosmopolitan

বিশেষত নারীরা এই বিষয়গুলোতে বেশি প্রভাবিত হয়। একজন নারী হয়তো রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে তার স্বামীকে সারাদিন কী কী হয়েছে তা বলছে। সে তখন চাইবে তার স্বামী পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার কথাই শুনুক। কিন্তু তার স্বামী যদি ভাবে, "এক কান দিয়ে তো শুনছিই সব কথা, সেই সাথে একটু মোবাইলও চাপি না!" তাহলেই কিন্তু লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যেতে পারে। কিংবা তেমন কিছু না হলেও, ওই নারীর মনে একটা খারাপ লাগা কিন্তু থাকবেই, যা ঠিক ওই মুহূর্তে প্রকাশিত না হলেও, অন্য কোনো সময় ঠিকই বের হয়ে আসবে। ফলে তাদের সম্পর্কে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

তাছাড়া অবজ্ঞা কিংবা পূর্ণ মনোযোগ না পাওয়া থেকে এসব খারাপ লাগা কিন্তু কেবল নারীদের মনেই জন্মায় না, পুরুষদের মনেও জন্মায়। হয়তো একজন পুরুষ স্বাভাবিকভাবে খুব বেশি স্পর্শকাতর নয়। কিন্তু বারবার যখন তার সাথে এমনটা হতে থাকবে, তখন সে-ও একদিন ঠিকই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলবে। আর সেই প্রতিক্রিয়ার সূত্র ধরে তাদের সম্পর্ক প্রায় খাদের কিনারায় চলে আসলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

যৌন সম্পর্ককে প্রভাবিত করে

হ্যাঁ, ফাবিং এমনকি যৌন সম্পর্কের উপরও খুব বাজে প্রভাব ফেলতে পারে। দেখা গেল, এক দম্পতির মধ্যে কোনো একজন হয়তো তার সঙ্গীর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হতে আগ্রহী, তাই সে তার সঙ্গীকে আলতো করে চুমু খাচ্ছে বা তার গায়ে হাত বোলাচ্ছে। অথচ সঙ্গীটি তার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। তাই আশপাশে কী হচ্ছে, কিছু সে টেরই পাচ্ছে না। এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যক্তির মনে গভীর আঁচড় কেটে যেতে পারে। পরবর্তীতে তার সঙ্গী নিজে থেকে উদ্যোগী হলেও, তার মনে যদি ইতিপূর্বের খারাপ লাগার অনুভূতি থেকে যায়, তখন হয়তো সে চাইলেও সঙ্গীর ডাকে সাড়া দিতে পারবে না বা শীতল আচরণ করবে। এভাবেই তাদের যৌন সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুরু হয় মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদ; Image Source: self.com
মুক্তির উপায় কী?

যারা ভুক্তভোগী, তাদের কাছে ফাবিং যেন একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। কিন্তু একটু সদিচ্ছা থাকলেই এই দুঃস্বপ্নের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

    এক্ষেত্রে প্রথম উপায় হতে পারে মোবাইল ব্যবহার সীমিত করা। যুক্তরাষ্ট্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দৈনিক গড়ে ৮০ বার মোবাইল চেক করে। এর মধ্যে অধিকাংশ সময়েই তারা কাজটি করে বিনা প্রয়োজনে, স্রেফ ঝোঁকের মাথায়। কিন্তু চাইলেই বারবার মোবাইল চেক করার এই প্রবণতাকে কমিয়ে আনা সম্ভব। একজন ব্যক্তি আগে থেকেই ঠিক করে নিতে পারে, সারাদিনে সে ৫০ বারের বেশি মোবাইল চেক করবে না। শুরুতেই হয়তো সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। তবে ধীরে ধীরে মোবাইলের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ হ্রাস পাবে, এবং একপর্যায়ে সে অবশ্যই মোবাইলের প্রতি আসক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবে।
    ফাবিং যেহেতু একজন ব্যক্তি করে, কিন্তু এর প্রভাব পড়ে তার সঙ্গীর উপর, তাই তার সঙ্গীও এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। কেউ যদি তার সঙ্গীর মাত্রাতিরিক্ত ফাবিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে যায়, তাহলে সে নিজেই তার সঙ্গীকে বলতে পারে, "দেখো, বারবার তোমার মোবাইল চেক করা উচিৎ না।" অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই এক কথাতেই কাজ হবে। তা-ও যদি সেই সঙ্গী একই ভুল করে, তাহলে তাকে ফের মনে করিয়ে দিতে হবে। এভাবে টানা কয়েকদিন মনে করিয়ে দিতে থাকলে সমস্যাটি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
    কিন্তু টানা কয়েকদিনেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। দুজনকে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা যখন একে অন্যের সান্নিধ্যে থাকবে তখন খুব প্রয়োজন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই মোবাইল হাতে নেয়া যাবে না। এরকম কড়াকড়ির মাধ্যমেও মোবাইলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে আনা যেতে পারে।
    যদি উপরের তিন প্রচেষ্টাতেও কোনো সুফল পাওয়া না যায়, তাহলে বুঝতে হবে ফাবিং করতে থাকা ব্যক্তিটি কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। আর এই মানসিক সমস্যাকে কোনোক্রমেই হালকাভাবে নেয়া যাবে না। সমস্যাটির গভীরতা উপলব্ধি করতে হবে, এবং তাকে কোনো মনোচিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে তার কাউন্সেলিং করাতে হবে।

ফাবিং বন্ধ করা একান্ত জরুরি; Image Source: Star Tribune
শেষ কথা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে আমাদের জীবনে কী বিশাল আশীর্বাদস্বরূপ, তা ঠিক বলে বোঝানো সম্ভব না। কিন্তু নিজেদের দোষেই অনেক সময় আমরা এই আশীর্বাদটিকেই অভিশাপে রূপান্তরিত করে ফেলি। ফাবিংয়ের কারণেও ঠিক এমনটাই হচ্ছে। মোবাইল আমাদের এত দরকারি একটা জিনিস, অথচ ফাবিংয়ের কারণে সেই মোবাইলকেই আমরা উপদ্রবে পরিণত করছি। কিন্তু সকল সমস্যার সমাধানেই প্রাথমিক পর্যায় হলো সচেতনতা। একবার যদি কেউ ফাবিংয়ের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে দেরিতে হলেও সে এই বদভ্যাসটি থেকে মুক্তিলাভ করতে পারবে। যেহেতু এতদিন ফাবিং সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা ছিল না, তাই আশা করা যেতেই পারে এই লেখাটি তাদেরকে সেই প্রয়োজনীয় ধারণাটি দিতে পেরেছে, ফলে ভবিষ্যতে তারা নিজেরাই এই সমস্যাটি মোকাবেলা করতে পারবে।

29
Place / জ্যামের শহরের গল্প
« on: December 01, 2018, 08:35:37 PM »
লেখাটি যখন পড়ছেন, তখন হয়তো আপনি নিজেও জ্যামেই বসে আছেন। হয়তো ভাবছেন বাংলাদেশের চেয়ে বেশি যানজট আবার বিশ্বের কোথাও আছে নাকি! হয়তো ধরেই নিয়েছেন সবার উপরে বাংলাদেশ তথা ঢাকা শহরের নামটাই দেখতে পাবেন। তারপরের নামগুলো কাদের, সেটা দেখতেই আপনার হয়তো আগ্রহ জন্মাবে।

কিন্তু ঘটনা উল্টো কথা বলছে। আপনাকে প্রচণ্ড হতাশ করে এটাও জানাতে হচ্ছে যে, বাংলাদেশের কোনো শহরের নাম বিশ্বব্যাপী তীব্র যানজটের প্রথম দশের তালিকাতে একেবারেই নেই। প্রথম ১৫ শহরের মধ্যেও নেই। তাহলে একবার ভাবুন, সবচেয়ে বেশি যানজটের শহরের কেমন অবস্থা? পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি যানজট হয় এমন অনেক শহরে স্থানীয় জনগণের প্রায় পুরো কার্যঘণ্টা চলে যায় রাস্তার জ্যামে। কেবল সময় নয়, এসব যানজটের কারণে প্রত্যেকটি শহর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আর্থিকভাবে। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, কমছে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ।

তবে জ্যাম হওয়ার পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, যত্রতত্র পার্কিং, দুর্নীতিগ্রস্থ ট্রাফিক সিস্টেম আর নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো দায়ী।

আপাতত নিশ্চিত হোন, বাংলাদেশের কোনো শহরের নাম নেই। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের  সবচেয়ে বেশি যানজটের অন্তত ১০টি শহরের কথা।

বেইজিং (চীন)

বেইজিংয়ের জ্যাম, Image Source: Mashable
পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ট্রাফিক জ্যামের শহরের  তালিকায় নাম রয়েছে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের। এই শহরকে বলা হয় ট্রাফিক জ্যামের ‘পোস্টার বয়’। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল চীনের এই রাজধানীতে জ্যামের হার ৪৬%। যদিও বেইজিংয়ের বায়ুদূষণও দুশ্চিন্তার কপালে ভাজ পড়ার অন্যতম কারণ। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে যানজটের সমস্যা। তবে বায়ুদূষণের পেছনেও বিশেষ অবদান রয়েছে এখানকার ট্রাফিক জ্যামের। অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানীর ধোঁয়া এখানকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।

তাইনান (তাইওয়ান)

মোপেডের জ্যাম; Image Source: TopInfoWala.in
প্রায় ১৮ লাখ জনসংখ্যার দ্বীপ তাইনান। এটি তাইওয়ানের সবচেয়ে দূষিত দ্বীপ না হলেও কেবল জ্যামের কারণে প্রতিনিয়ত দূষণের পথে এগোচ্ছে এই শহর। বেইজিংয়ের মতো এখানেও জ্যামের হার ৪৬%।

তবে ট্রাফিক জ্যামের করাল গ্রাস থেকে বেঁচে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে তাইনানের প্রশাসন। দুই চাকার বিশেষ মোটরসাইকেল, নাম ‘মোপেড’; এর কারণে আরও জ্যাম বাড়ছে। তাই এর বিকল্প খুঁজে ফিরছে সরকার। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, তাইনান শহরের মধ্যে দেশটির সরকার একটি রিং রোড স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

রিও ডি জেনেইরো (ব্রাজিল)

রাতের রিও; Image Source: Discovering São Paulo
ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরো বিশ্বের প্রধানতম যানজটের শহর। পুরো ব্রাজিলের মধ্যে এই শহর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল জায়গা। প্রতি বছর এখানে জ্যামের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে পুরো শহরজুড়ে নতুন রাস্তা তৈরি, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার কারণে জ্যামের পরিমাণ আরও বাড়ছে। ২০১৬ অলিম্পিক আয়োজনের সময় এই বিপদ অনেক বেড়ে যায়। পরবর্তীতে সেগুলো সমাধানও হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, শহরের আয়তন অনেক বেশি হওয়ায় জ্যাম কমানোর অনেক সুযোগ রয়েছে।

তবে রিও ডি জেনেইরোর জ্যামের কোনো সময়জ্ঞান নেই। সারাদিন ধরেই চলে জ্যামের গ্রাস।

শেংদু (চীন­)

শেংদুর যানজট; Image Source: Thatsmags.com
চীনের শিচুয়ান প্রদেশের শহর শেংদু। শিচুয়ান প্রদেশ তার প্রাকৃতিক দৃশ্য, সুস্বাদু খাবারের জন্য বিখ্যাত। এই মুহূর্তে বিখ্যাত যানজটের জন্য। প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর শেংদুর জনগণ পুরো দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক, যার ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ট্রাফিক জ্যামের বিড়ম্বনা। এই অবস্থার উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং স্থানীয়দের ভাবনা, দ্রুত কোনো সমাধান বের করতে না পারলে অবস্থা আরও বেশি খারাপের দিকে যাবে।

ইস্তাম্বুল (তুর্কিস্তান)

যত দূর চোখ যায়; Image Source: Business
তুর্কিস্তানের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যের ধারক ইস্তাম্বুল শহরের খ্যাতি জগদ্বিখ্যাত। আবার একইসঙ্গে শহরটি ট্রাফিজ জ্যামের জন্য কুখ্যাত। অনেকের মতে, পুরো ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে নাকি ইস্তাম্বুলের মতো ট্রাফিক জ্যাম আর কোথাও নেই। সরকারিভাবে চেষ্টা  করা হচ্ছে শহরের যানজট কমানোর। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তীব্র যানজটের কারণে প্রতিদিন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শহরের সাধারণ মানুষ। মালামাল পরিবহন, শিপমেন্ট হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

বুখারেস্ট (রোমানিয়া)

যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই জ্যাম, বুখারেস্টের রাজপথ; Image Source: Pinterest
বুখারেস্ট রোমানিয়ার রাজধানী। কিন্তু এই শহর পুরো ইউরোপের মধ্যে অন্যতম যানজটের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করে। এই শহরে চালকদের জন্য পার্কিং ফ্রি। সে কারণে যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করে এখানকার বেশিরভাগ নাগরিক। ফলশ্রুতিতে বেড়ে যায় যানজট। তাছাড়া এখানকার গণপরিবহণের উন্নয়নে অনেক কিছু করার আছে। কখনও কখনও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা যানজট থাকে। মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহণের উদাসীনতার কারণেই এই শহরে যানজট বেড়ে চলেছে। 

চোংকিং (চীন)

চোংকিংয়ের যানজট; Image Source: SkyscraperCity
সবচেয়ে যানজটের শহরের তালিকায় চীনের নাম সবার আগে আসে। যদি বিশ্বব্যাপী যানজটের শহরের তালিকা করা হয়, অন্ততপক্ষে কেবল চীনেরই ২-৩টি শহরের নাম থাকবে। বেইজিং আর শেংদুর মতো চোংকিংও চীনের একটি যানজটপূর্ণ শহর। এর অবস্থান চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে।

চোংকিং পুরো চীনের মধ্যে অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগলিক অবস্থার কারণে এখানে বাণিজ্যিক ‘কারবার’ ভালো হয়, তাই ব্যবসায়িক এলাকা হিসেবেও এখানকার বেশ সুখ্যাতি আছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো চোংকিং একটি মেট্রোপলিটন শহর। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন। কিন্তু তীব্র যানজট স্থানীয়দের বিশাল একটি সময়ের অপচয় ঘটায়। এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, চোংকিংয়ের অনেক মানুষ তাদের ৯৪% সময় জ্যামে নষ্ট করে ফেলেন। এর মূল কারণ চোংকিংয়ের গোলকধাঁধার মতো বিভ্রান্তিকর রাস্তাঘাট। যানজটের কারণে আপনি অন্য রাস্তা দিয়ে যাবেন, সেই উপায়ও নেহাত ভাগ্য ভালো না হলে মেলে না। কারণ এখানকার রাস্তাগুলোর ধরনই এমন যে, আপনি চাইলেই ব্রিজ-কালভার্ট এড়িয়ে যেতে পারবেন না।

জাকার্তা (ইন্দোনেশিয়া)

জাকার্তার বিকেল; Image Source: The Jakarta Post
এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া। তার রাজধানী জাকার্তা। অর্থনৈতিক, ভৌগলিকভাবে এই শহরটি ক্রমশ উন্নতি পথে এগোচ্ছে বটে, কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে যানজট। বলা হয়, গ্রেটার জাকার্তায় বাস করে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ, যাদের অনেকেই উপশহর ও শহরতলিতে বাস করে। সবমিলিয়েই জাকার্তায় প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ভুগতে হয় চরম যানজটে। দিনে অন্ততপক্ষে চার ঘন্টা যানজটে আঁটকে থাকা জাকার্তায় খুব সাধারণ ব্যাপার।

এত কিছু সমস্যার সমাধানে সরকারও উঠেপড়ে লেগেছে। ২০১৯ সালেই জাকার্তায় মেট্রোরেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকক (থাইল্যান্ড)

ব্যাংককের ট্রাফিক জ্যাম; Image Source: 123RF.com
ভ্রমনপিয়াসীদের জন্য ব্যাংকক জনপ্রিয় এক নাম। থাইল্যান্ডের রাজধানী, এই শহর ছবির মতো সুন্দর হলেও, সেই সৌন্দর্য ক্রমশ আবেদন হারাচ্ছে এখানকার যানজটের কারণে। বলা যায়, ব্যাংককের জন্য যানজট এক বিষফোঁড়া। জীবনমানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এখানে প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে যানজট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরোটা সময় যানজটের কবলে পড়তে হয় এখানকার জনসাধারণকে। এখানকার ট্রাফিক শৃঙ্খলার অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়। যে কারণে রাজপথের বিশাল একটি অংশ কেবল পার্কিংয়ের জন্য আঁটকে রাখা হয়।

মেক্সিকো সিটি (মেক্সিকো)

মেক্সিকো সিটি; Image Source: Red Bull Racing
উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল শহর মেক্সিকো সিটি। যে কারণে এখানকার জ্যামের অবস্থাও বেগতিক। এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, অন্ততপক্ষে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৬%-১০১% সময় সাধারণ মানুষকে যানজটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রতি বছর এখানে অন্ততপক্ষে ২১৯ ঘন্টা সময় অপচয় হয় যানজটের কারণে। মেক্সিকো সিটির যানজট কেবল সময়ই নষ্ট করছে না, বাড়াচ্ছে দূষণও।
Islam Shami

30
KUDRATE JAHAN ZINIA
নিজ দেশ থেকে বহু মাইল দূরে অচেনা দ্বীপে আটকে পড়েছিলেন তারা। কারো পড়েছিল খাবারের অভাব, কেউ বিক্রি হয়েছিলেন দাস হিসেবে, কেউ কেউ আবার দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ হতে বসেছিলেন। কিন্তু এই অবস্থা থেকেও বেঁচে ফিরে এসেছেন তারা। কেউ কেউ আবার সেই অচেনা দ্বীপকেই বানিয়ে ফেলেছেন নিজের নতুন আবাসস্থল। আজকের লেখা এমনই কিছু অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনী নিয়ে।

Advertisement


 

উত্তাল সাগরে জাহাজ; Image Source: literacyshed
সত্যিকারের রবিনসন ক্রুসো
In an ill hour, I went on board a ship bound for London.

“এক দুর্ভাগা দিনে লন্ডনের উদ্দেশ্যে এক জাহাজে চড়েছিলাম।” এই কথাগুলো দিয়ে একটি জনপ্রিয় গল্পের বই শুরু হয়েছিল। বইটির নাম ‘রবিনসন ক্রুসো’। ড্যানিয়েল ডেফোর এই উপন্যাসটি অবশ্য বিখ্যাত স্কটিশ নাবিক আলেক্সান্ডার সেলকার্কের সত্যিকারের অ্যাডিভেঞ্চারের কাহিনী নিয়ে রচিত। প্রশান্ত মহাসাগরের এক দুর্গম দ্বীপে ৪ বছর কাটিয়ে বেঁচে ফিরে আসার পর সেলকার্ক এই কাহিনী শুনিয়েছিলেন।

১৭০৪ সালে কেপ হর্নের কাছাকাছি সিংক পোর্ট নামের এক জাহাজে নেভিগেট করছিলেন সেলকার্ক। হঠাৎ ধেয়ে আসলো বিপর্যয়। জাহাজের ক্রুরা আক্রান্ত হলেন প্লেগ রোগে। খাবার পচে নষ্ট হতে লাগলো। জাহাজের কাঠগুলোতে পোকা ধরে গেল। অবশেষে প্রশান্ত মহাসাগরের হুয়ান ফার্নান্দেজ নামক দ্বীপে নোঙর ফেলা হলো কিছুদিনের জন্য। উদ্দেশ্য বিশ্রাম এবং খাদ্য সংগ্রহ।

সেলকার্ক প্রস্তাব দিলেন, জাহাজের আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য জাহাজের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করার। কিন্তু জাহাজের ক্যাপ্টেন বেঁকে বসলেন। দুইজনের মধ্যে তর্কাতর্কি একসময় হাতাহাতিতে রূপ নিলো। কোনো খাবার কিংবা পানি ছাড়াই জোর করে দ্বীপের একাংশ ‘মাস এ তিয়েরা’য় ফেলে আসা হলো সেলকার্ককে। সৈকত থেকে প্রাণপণে চিৎকার করে মাফ চাইতে লাগলেন সেলকার্ক। কিন্তু নির্দয় ক্যাপ্টেনের মন গললো না তাতে। বাকি ক্রুরাও উপেক্ষা করলেন তার আকুতিকে।

হুয়ান ফার্নান্দেজ থেকে পালানো এক কথায় অসম্ভব। কাছাকাছি দ্বীপটি ছিলো প্রায় ছয়শো মাইল দূরে, অথৈ সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে যাবার আশাই দূরাশা। ভাগ্য ভালো, সেলকার্ক সহজেই ঝর্ণা খুঁজে বিশুদ্ধ পানির অভাব মেটালেন। তাছাড়া দ্বীপটিতে নানাধরনের ফলগাছে ভরা ছিল। হাত বাড়ালেই ধরা যেত নানা ধরনের মাছ। শুরুতে চরম নিঃসঙ্গতায় অবশ্য পাগল হবার দশা হয়েছিল সেলকার্কের।

Advertisement


 
এদিকে দ্বীপের বড় বড় ইঁদুরগুলো রাতে গায়ের কাপড় কাটতে গিয়ে বারবার ঘুম ভাঙিয়ে দিতো তার। বুদ্ধি করে বিড়াল পোষা শুরু করলেন। এছাড়াও তার সঙ্গী ছিল ছাগলের পাল। নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার জন্য তাদের সাথে নেচেগেয়ে সময় কাটাতেন সেলকার্ক!


শিল্পীর তুলিতে ক্যাপ্টেন উডসের মুখোমুখি সেলকার্ক; Image Source: Look and Learn
এভাবে একাকী ৫২ মাস কাটানোর পর দ্বীপে এসে ভিড়লো ব্রিটিশ জাহাজ ‘ডিউক’। ক্যাপ্টেন উডস রজারের নেতৃত্বে চলা ঐ জাহাজের উদ্দেশ্য ছিলো জলদস্যুদের খুঁজে বের করা। ডিউকের নাবিকেরা খাবার পানির খোঁজে দ্বীপের কাছাকাছি এসে লাফাতে লাফাতে আগুন ধরানো গাছের ডাল নাড়তে থাকা এক অর্ধপাগলের দেখা পান। সেলকার্ক তখন লজ্জা নিবারণ করছিলেন কেবলমাত্র ছাগলের চামড়া দিয়ে।

বেঁচে ফেরার পর লোকালয়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। আগে যে নির্জনতাকে অসহ্য লাগতো। পরে সেটারই অভাব অনুভব করতেন বারবার। রবিনসন ক্রুসো প্রকাশিত হবার দুইবছর পর ১৭২১ সালে সেলকার্ক মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৬ সালে মাস এ তিয়েরার নামকরণ করা হয় ‘রবিনসন ক্রুসো আইল্যান্ড’।

যে স্প্যানিয়ার্ড লড়েছিলেন স্পেনেরই বিরুদ্ধে
আলেক্সান্ডার সেলকার্কের মতো নির্জন দ্বীপে নয়, বরং জাহাজডুবির পর একটি জনবহুল দ্বীপেই আশ্রয় নিয়েছিলেন ১৬ জন স্প্যানিয়ার্ড। ১৬ জন হলেও কী হবে, তাদের পরিস্থিতি সেলকার্কের চেয়েও খারাপ ছিল। কেননা তাদেরকে মোকাবেলা করতে হয়েছিল দ্বীপের আদিবাসী মায়ানদের সাথে। বাকি পৃথিবী তখনই প্রথম পরিচিত হয় মায়া সভ্যতার সাথে।

১৫১১ সালে ইউকাতান পেনিনসুলা নামের এক স্প্যানিশ জাহাজ মেক্সিকোর দক্ষিণ-পূর্বে গিয়ে ডুবে যায়। জায়গাটি ছিল পানামার কাছাকাছি। বেঁচে যাওয়া ১৬ জন স্প্যানিয়ার্ড ভাসতে ভাসতে চলে যান অচেনা এক দ্বীপে। বর্তমানে দ্বীপটি 'কুইনটানা রু' নামে পরিচিত। তবে দ্বীপে তাদের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। মাত্র দুজন বাদে সবাইকেই উৎসর্গ করে দেয়া হয়েছিল মায়ান দেবতাদের কাছে!

Advertisement


 

গঞ্জালো গুয়েরোর পাল্টে যাওয়া; Image Source: Pinterest
বেঁচে যাওয়া একজন, গঞ্জালো গুয়েরো বিয়ে করেন উচ্চ-বংশীয় এক মায়ান নারীকে। প্রথমে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। পরে নিজের অর্জিত যুদ্ধ সম্পর্কিত বিদ্যা দিয়ে মায়ানদের মন জয় করেন তিনি, বিয়ে করেন নিজের মালিক জাজিল হা এর মেয়েকে।

১৫১৯ সালে স্প্যানিশ অ্যাডভেঞ্চারার হার্নান করতেজ ঐ দ্বীপে গিয়ে গুয়েরোর অবস্থা দেখে থ। তিনজন আমেরিকান ইন্ডিয়ান সন্তানসহ স্ত্রীকে নিয়ে তিনি রীতিমতো সংসার পেতে বসেছেন। নাক-কান ফুটানো, মুখে রঙ মাখা গুয়েরোকে অন্য মায়ানদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। বেঁচে যাওয়া অপর স্প্যানিয়ার্ড, ব্রাদার জেরোনিমো অ্যাগুইলার দোভাষীর কাজ করলেন। কারণ গুয়েরো ইংরেজি বলতেও রাজি হচ্ছিলেন না।

এই ঘটনাকে পুরোপুরিই ব্রেইনওয়াশ হিসেবে ধরে নিলেন করতেজ। স্প্যানিয়ার্ডদের আগ্রাসী মনোভাব টের পেলেন গুয়েরো। তাই মায়ান আর্মিকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন নিজের দেশের লোকদের বিরুদ্ধেই। করতেজ তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দিলেও গুয়েরো নিজের দেশের লোকদেরকে ফাঁকি দিয়ে বেড়ালেন বেশ কয়েক বছর। অবশেষে হন্ডুরাসের একটি যুদ্ধক্ষেত্রে তার লাশ পাওয়া যায়। জন্মগতভাবে মায়ান না হয়েও তাদের স্বার্থে এভাবেই প্রাণ দিলেন তিনি।


গঞ্জালো গুয়েরোর মূর্তি; Image Source: The Huffington Post
ইংরেজী ভাষাভাষী দেশগুলোতে তার নাম প্রায় শোনা যায় না বললেই চলে। তবে মেক্সিকানেরা তাকে দিয়েছে বীরের সম্মাননা। অন্যদিকে স্পেনের ইতিহাসে তাকে এক বেইমান পিশাচ হিসেবে গণ্য করা হতো বেশ কয়েক শতক ধরে, নিজের দেশের বিপক্ষে যাবার কারণে।

ব্রিটিশ বিয়ে করলেন হাওয়াইয়ান রাজকুমারীকে
দুর্ভাগ্য তাড়া করেছিল ব্রিটিশ ম্যারিনার জন ইয়ংকে। ভুলবশত নিজের লোকদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে হাওয়াইয়ের এক দ্বীপে আটকে পড়েন তিনি। তবে দুর্ভাগ্য সৌভাগ্যে রূপ নিতে সময় লাগেনি। ক'দিন বাদেই স্থানীয় রাজকুমারীকে বিয়ে করে রাজার ডান হাত হয়ে বসেন তিনি। ল্যাঙ্কাশায়ারে বেড়ে ওঠা ইয়ং ব্রিটিশ জাহাজে ইলিনরে কাজ করতেন। পশমের ব্যবসা করা জাহাজটিতে করে হাওয়াইতে এসে পৌঁছান ১৭৯০ সালে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানকার মনোলোভা রমণীরা ছিলো দেশ-বিদেশের নাবিকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়।

Advertisement


 
তবে স্বর্গেও সাপ থাকে। অপরাধ-নৈরাজ্যের কারণে কুখ্যাতিও কম ছিল না হাওয়াই এর। অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করা ক্যাপ্টেন কুক ১৭৭৯ সালে খুন হয়েছিলেন এখানেই। দ্বীপে থাকাকালীন সময়ে এক আমেরিকান জাহাজের ওপরে হাওয়াইয়ানদের আক্রমণের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হন ইয়ং।


জন ইয়ং এর জীবনের ওপর ভিত্তি করে লেখা বইয়ের প্রচ্ছদ; Image Source: Amazon.com
এই কথা যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য রাজা কামেহামেহা আটকে ফেলার আদেশ দেন ইয়ংকে। ফলে তার জাহাজ তখন তাকে ঐ দ্বীপে ফেলেই চলে যায়।

পরে ভাগ্য ঘুরে যায় ইয়ং এর। ১৭৯৩ সালে ক্যাপ্টেন ভ্যাঙ্কুভার যখন ইয়ংকে দেশে ফিরে যাবার প্রস্তাব দেন, তখন সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন তিনি। জাহাজে নাবিকগিরি করার চাইতে বহুগুণ উন্নত তার হাওয়াইয়ের জীবনযাত্রা। ইতিমধ্যেই রাজার সভাসদদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে বসেছেন তিনি। তাই তিনি ফিরিয়ে দিলেন ভ্যাঙ্কুভারকে। ইয়ং ১৭৯৫ সালে বিয়ে করেন রাজকুমারী ন্যামোকিউলুয়াকে। তার বংশধরেরা এখনো হাওয়াইতেই বসবাস করে।

আর্নেস্ট শ্যাকলটনের মেরু অভিযান
আধুনিক যুগে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘ক্যাস্ট অ্যাওয়ে’ সম্ভবত আর্নেস্ট শ্যাকলটন। অ্যান্টার্কটিকে যাওয়া তার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। ২২ বছর বয়সে বলেছিলেন, ইচ্ছা করে বরফের রাজ্যে হাঁটতে হাঁটতে মেরুর শেষ সীমায় চলে যেতে। সময় তখন ১৯১৪ সাল। চল্লিশ বছর বয়সী শ্যাকলটন ইতিমধ্যেই একজন পোড় খাওয়া অভিযাত্রিকে পরিণত হয়েছেন। মেরু অভিযাত্রার স্বর্ণযুগ তখন, অভিযাত্রিকদের মধ্যে শীর্ষ কয়েকজনের কথা বলতে গেলে শ্যাকলটনের নামও আসে। এক মাসের ব্যবধানে অ্যামুন্ডসেন এবং স্কট দুজনই দক্ষিণ মেরু জয় করেছেন। তবে শ্যাকলটনের মতে অ্যান্টার্কটিক ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, দক্ষিণ মেরু অঞ্চল সাগরপথে পাড়ি দেয়া।

সেই উদ্দেশ্যেই ১৯১৪ সালের ৮ আগস্ট ‘এনডুরেন্স’ নামের এক ব্রিটিশ জাহাজে চড়ে বসলেন ২৩ জন অভিযাত্রিক। বুয়েন্স আয়ার্স আর দক্ষিণ জর্জিয়া পার হয়ে ওয়েডেল সাগরে এসে পৌঁছালেন ডিসেম্বর নাগাদ। দুঃখের বিষয়, এনডুরেন্স আর এগোতে পারেনি। শীত মৌসুমের আগে কোনো আভাস ছাড়াই হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেলো প্রবল তুষার ঝড়। ফলে বিশাল জাহাজটি বরফে আটকে গেল। তার ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়ে গেছে ওয়েডেলের আইসবার্গের নিচে।

Advertisement


 

শ্যাকলটন এবং তার অভিযাত্রিক দল; Image Credit: Skackleton Thomas
বাধ্য হয়ে জাহাজ ছেড়ে তাদেরকে আশ্রয় নিতে হলো বরফের ওপরে। বরফের পাশ দিয়ে অল্প পানিতে লাইফবোট চালিয়ে অতি ধীর গতিতে অগ্রসর হতে থাকলেন তারা, এক বরফ খন্ড থেকে আরেক বরফ খন্ডের দিকে। অবশেষে বরফে ছাওয়া পাহাড়সদৃশ একটি দ্বীপে পৌঁছালেন ১৯১৬ এর এপ্রিলে। লাইফবোট এবং স্থানীয় এলিফ্যান্ট সিলের চামড়া দিয়ে নিজেদের অস্থায়ী আবাসস্থল বানিয়ে নিলেন তারা। একারণেই দ্বীপটি এখন পরিচিত 'এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড' নামে।

অ্যান্টার্কটিকের দুর্গম এলাকায় তুষার বন্দী হয়ে থাকলেও খুব বেশি কষ্ট হয়নি তাদের। হকি খেলে, ডগ-স্লেজ চালিয়ে, সিলমাছ শিকার করে ভালোই সময় কাটিয়েছেন। এই পুরো সময়টাতেই বরফের চাপে মড়মড় করে ভাঙছিল এনডুরেন্সের কাঠামো! অবশেষে মাস পাঁচেক পরে সাগরে চলার মতো অবস্থা হলো। কারণ দ্বীপে খুব বেশিদিন জীবন ধারণ করা সম্ভব হবে না তাই শ্যাকলটনের সাথে আরো পাঁচজন নৌকা বাওয়া শুরু করলেন, আটশ মাইল দূরে দক্ষিণ জর্জিয়া বন্দরের উদ্দেশ্যে।


আর্নেস্ট স্যাকলটন এবং তার জাহাজ 'এনডুরেন্স'; Image Credit: Skackleton Thomas
সাহায্য নিয়ে ফিরে আসতে লেগে গেলো আরো ১০৫ দিন। দ্বীপের কাছাকাছি আসতে আসতে শ্যাকলটন চিৎকার করে জানতে চাইলেন, “তোমরা ভালো আছো তো?”। সেই আঠারোজন উল্লসিত কণ্ঠে জানালেন যে, তারা ভালোই আছেন। অনাহার, অর্ধাহারকে জয় করেছেন তারা। তাদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ছিলো প্রবল ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া দশটি পায়ের আঙুল, ক্লোরোফর্ম ব্যবহার করে এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে থাকাকালীন নিজেরাই কেটে ফেলেছিলেন সেগুলোকে।

শ্যাকলটনের অভিযান সফল না হলেও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। কারণ তিনি তেইশজন অভিযাত্রিকের সবাইকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন। অ্যান্টার্কটিক অভিযাত্রিকদের মধ্যে স্কট বিখ্যাত ছিলেন তার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্য আর অ্যামুন্ডসেন বিখ্যাত ছিলেন তার গতিশীল কিন্তু কার্যকর পদ্ধতির জন্য। কিন্তু ঝড়-ঝঞ্ঝার সময়ে যখন বাঁচার কোনো আশা থাকে না, তখন সবাই শ্যাকলটনের এই কাহিনী থেকেই অনুপ্রেরণা লাভ করে।

শ্যাকলটনকে পরবর্তীতে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

Pages: 1 [2] 3 4 ... 23