Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - ashraful.diss

Pages: [1] 2 3 ... 7
1
যদি ঈমানদার হও, তাহলে সকল অঙ্গীকার পূরণ করো — আল-মায়িদাহ ১

নিচের এই আয়াতটি আমাদের বড় করে প্রিন্ট করে কম্পিউটারের সামনে, অফিসের দেওয়ালে দেওয়ালে, ট্রাফিক সিগন্যালের উপরে ঝুলিয়ে রাখা দরকার—


আমরা অনেক মুসলিমরাই, কোনো এক বিশেষ কারণে আমাদের অঙ্গীকারগুলোর ব্যাপারে খুবই উদাসিন। অফিসে গেলে যাই দশ মিনিট দেরি করে: ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দেখিয়ে, কিন্তু বের হওয়ার সময় ঠিকই বের হই আধা ঘণ্টা আগে। অথচ চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় কন্ট্রাক্টে সাইন করেছি: সপ্তাহে কমপক্ষে ৫৬ ঘণ্টা কাজ করব, ৮-৪টা অফিসের সময় মেনে চলব। যুহরের নামাযের সময় আধা ঘণ্টার বিরতির জায়গায় এক ঘণ্টা বিরতি নেই, এই মনে করে: আল্লাহর تعالى জন্য আধা ঘণ্টা বেশি বিরতি নিচ্ছি, এটা তো সওয়াবের কাজ! মাস শেষে বিদ্যুতের, পানির বিল দেওয়ার আগে মিস্ত্রি ডেকে মিটারের রিডিং কমিয়ে দেই। ট্যাক্স দেওয়ার সময় চেষ্টা করি: বিভিন্নভাবে মূল বেতনের পরিমাণকে কমিয়ে, নানা ধরনের বেনিফিট হিসেবে দেখানোর, যাতে করে কম ট্যাক্স দিতে হয়। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সময় সুযোগ খুঁজি তাদের কাজে বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে কতভাবে বেতন কাটা যায়। ঘণ্টা হিসেবে কন্ট্রাক্টে কাজ করার সময় চেষ্টা করি যত বেশি সম্ভব ঘণ্টা দেখিয়ে বেশি করে ক্লায়েন্টকে বিল পাঠানোর। কারও সাথে দেখা করার সময় ঠিক করি সকাল দশটায়, কিন্তু দেখা করতে যাই এগারটায়। উঠতে বসতে আমরা অঙ্গীকার ভাঙছি।

কোনো এক অদ্ভুত কারণে মুসলিমদের ‘দুই নম্বর স্বভাবের জাতি’ হিসেবে পৃথিবীতে ব্যাপক বদনাম হয়ে গেছে। মুসলিমদের সাথে ব্যবসা করতে অমুসলিমরা তো দূরের কথা, মুসলিমরা পর্যন্ত ভয় পায়। বরং উল্টো অনেক মুসলিমরাই চেষ্টা করে হিন্দু বা খ্রিস্টান কাউকে ব্যবসায় পার্টনার বানানোর, না হলে অন্তত একাউন্টেন্টের দায়িত্বটা দেওয়ার। অথচ আল্লাহ تعالى কু’রআনে কমপক্ষে তিনটি আয়াতে খুব কঠিনভাবে আমাদেরকে সব ধরনের চুক্তি, কন্ট্রাক্ট, অঙ্গীকার, আইন মেনে চলার জন্য বারবার আদেশ করেছেন।

হে বিশ্বাসীরা, তোমরা সকল অঙ্গীকার পূর্ণ কর। …  [৫:১]

… তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই তোমাদেরকে অঙ্গীকারের ব্যপারে জিজ্ঞেস করা হবে। [১৭:৩৪]

… নিশ্চিত করার পরে কোনো অঙ্গীকার ভাংবেনা, কারণ তোমরা আল্লাহকে সাক্ষি করেছ। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন। … [১৬:৯১]

মুসলিমরা যদি সত্যি ইসলাম মেনে চলত, তাহলে এত কষ্ট করে আর ইসলামের প্রচার করতে হতো না। মুসলিমদেরকে দেখে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করত; যেভাবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার মানুষেরা ভারত এবং আরব মুসলিম বণিকদের সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ় নৈতিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম মুসলিম-প্রধান দেশে।

أَوْفُوا۟ بِٱلْعُقُود একটি খুবই সাধারণ আদেশ, কিন্তু এর অর্থ ব্যাপক। আওফু হচ্ছে পূরণ করা, পরিশোধ করা, কথা রাখা, প্রাপ্য দেওয়া ইত্যাদি। উ’কুদ হচ্ছে অঙ্গীকার, চুক্তি।আওফু বিল-উ’কুদ এর অর্থ যদি এক কথায় বলা যায়, তাহলে এর মানে দাঁড়ায়—আমার কাছ থেকে নিয়ম বা অঙ্গীকার অনুসারে যা আশা করা হয়, সেটা ঠিকমতো করা। এটা ট্রাফিক লাইটে থামা, অফিসে সময় মতো ঢোকা এবং বের হওয়া থেকে শুরু করে সকল আইনগত ব্যাপার, যেমন ঠিকমতো ট্যাক্স দেওয়া, সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, ঘুষ না নেওয়ার মতো বড় বড় ব্যাপারেও প্রযোজ্য।

যে আইন দেশের মানুষের সবার ভালোর দিকে লক্ষ রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং যে আইন কোনো মুসলিমকে পাপ করতে বাধ্য করে না—সেই আইন মানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য—এই ব্যাপারে স্কলারদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। এধরনের আইন ভাঙ্গা শারিয়াহ-এর দৃষ্টিতে হারাম—আবারও বলছি: হারাম। এতে কোনো ছাড় নেই, আইন মানতেই হবে। সেই আইন ভেঙ্গে কেউ পুলিশের কাছে ধরা না পড়লেও, কিয়ামতের দিন ঠিকই আল্লাহর تعالى কাছে ধরা পড়ে যাবে।

একটু সময় নিয়ে চিন্তা করে দেখুন: আমরা যখন ট্রাফিক সিগন্যালে না থেমে শোঁ করে গাড়ি নিয়ে পার হয়ে যাই, তখন আমরা কু’রআনের এই আয়াতটি ভাঙি, যার জন্য ট্রাফিক পুলিশের কাছে ধরা না পড়লেও, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর تعالى সামনে দাঁড়িয়ে তার জবাব দিতে হবে। আমরা যখন তেল কেনার পর তেলের দাম বাড়িয়ে লিখে দিতে বলি, যেন কোম্পানি থেকে তেলের খরচ বাবদ বেশি টাকা তুলে নিতে পারি, তখন আমরা কু’রআনের একটি কঠিন আদেশের বিরুদ্ধে যাই। ইসলাম আমাদেরকে কত সুন্দর নৈতিকতা শিখিয়েছে, কিন্তু আমরা এই সুন্দর শিক্ষা প্রতিনিয়ত অমান্য করে শুধু নিজেরাই গুনাহ করছি না, একই সাথে মুসলিম বেশভূষা ধরে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক বদনাম করছি।

আমাদের মতো নামে-মুসলিম, কাজে-মুনাফিকদেরকে দেখে অমুসলিমরা ধরে নেয়: “ইসলামের মতো বাজে ধর্ম আর নেই। তারা আরো বলে ,ঃ ইসলাম কী জিনিস, সেটা তো আমি এদের দেখেই বুঝতে পারছি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের আর না জানলেও চলবে। যা অত্যন্ত গর্হিত অন্যায় এবং গোনাহ এর কাজ

2

এতিমদের প্রতি দায়িত্ব

হজরত মোহাম্মদ (সা.) পিতৃহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। ছয় বছর বয়সে তার মা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তিনি তার দাদা ও চাচার অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিমরূপে পাননি? অতঃপর দিয়েছেন আশ্রয়।’ (সুরা দোহা, আয়াত : ৬)

এতিমের প্রতি ভালোবাসা

একবার ঈদের দিন সকালবেলা একটি শিশুকে ছিন্নবস্ত্র পরিহিত ও শরীর কাদায় মাখানো অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে রাসুল (সা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নবীজি (সা.) তাকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে যান এবং উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘শিশুটিকে ভালোভাবে গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দাও।’ আয়েশা (রা.) গোসল করানোর পর তিনি নিজ হাতে তাকে নতুন জামা পরিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে নিয়ে যান। আদর করে শিশুটিকে বললেন, ‘আজ থেকে আমি তোমার বাবা আর আয়েশা তোমার মা।’

প্রতিপালনের মর্যাদা

এতিম প্রতিপালন ইসলামে এক অভাবনীয় মর্যাদা ও ফজিলত রয়েছে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব’ বলে তিনি তার তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং এ দুটির মধ্যে একটু ফাঁক করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪)

এতিমদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অন্তর কোমল হয়, আত্মার প্রশান্তি লাভ হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে তার কঠিন হৃদয়ের ব্যাপারে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও (ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় কাছে টেনে নাও) এবং অভাবীকে আহার দাও।’ (মুসনাদ আহমদ)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি প্রেম-মমতায় কোনো এতিমের মাথায় হাত রাখবে, আল্লাহতায়ালা তাকে তার হাতের নিচের চুল পরিমাণ পুণ্য তাকে দান করবেন।’ (মুসনাদ আহমদ)

এতিমের সঙ্গে আচরণ

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম, যে বাড়িতে এতিম আছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি, যে বাড়িতে এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়…।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬৭৯)

এতিমদের ভালোবাসা, আহার দান করা নেককারদের গুণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আল্লাহর ভালোবাসায় আহার দান করে।’ (সুরা ইনসান, হাদিস : ০৮)

আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, যাবতীয় পুণ্যকাজ সম্পাদন করেও যদি কেউ এতিমদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা পোষণ না করে। কিংবা তাদের কষ্ট দেয় বা সাধ্য থাকা সত্ত্বেও দুঃখ মোচনে সচেষ্ট না হয় তবে সে মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ সৎকর্মশীল হিসেবে গণ্য হতে পারবে না। এতিমের সঙ্গে অন্যায়, কঠোর আচরণ নিষিদ্ধ এবং এটি জঘন্যতম পাপও বটে। ইসলাম যেভাবে এতিম প্রতিপালন, তার সঙ্গে উত্তম আচরণ, তার সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, তাকে সঠিকভাবে শিক্ষাদান ও উপযুক্ত বয়সে তার কাছে সম্পদ প্রত্যর্পণ, সব প্রকার ক্ষতি ব্যতিরেকে সার্বিক কল্যাণকামিতার নির্দেশ দিয়েছে। অনুরূপভাবে এতিমের সঙ্গে কঠোর ও রূঢ় আচরণ থেকেও কঠিনভাবে বারণ করে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।’ (সুরা দোহা, আয়াত : ৯)

ইসলামে এতিমের অধিকার

আমরা কে না জানি- সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতৃহীন তথা এতিম অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। আরও দুঃখের কথা হচ্ছে, তাঁর ছয় বছর বয়সকালে তাঁর পরমপ্রিয় মাতাও দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তিনি তাঁর দাদা ও চাচার অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও দেখাশোনায় বেড়ে উঠেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, তিনি কি আপনাকে এতিমরূপে পাননি? অতঃপর দিয়েছেন আশয়।›› (সুরা আদদোহা : ৬)

ইসলাম সাম্য ও ন্যায় পরায়তার ধর্ম। শুধু মানবকূল কেন প্রাণীজগতের প্রতি দয়া ও কোমল আচরণ করাও ইসলামের অন্যতম আদর্শ ও শিক্ষা।

পবিত্র কোরআন-হাদিসে এতিমের অধিকার, এতিমের প্রতি দয়া-অনুগ্রহের মর্যাদা ও পুরস্কারের কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আর তোমার কাছে তারা জিজ্ঞেস করে, এতিম সংক্রান্ত বিধান। বলে দাও, তাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে গুছিয়ে দেওয়া উত্তম। আর যদি তাদের ব্যয়ভার নিজের সাথে মিশিয়ে নাও, তাহলে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই। বস্তুত: অমঙ্গলকামী ও মঙ্গলকামীদেরকে আল্লাহ জানেন। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের ওপর জটিলতা আরোপ করতে পারতেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, মহাপ্রাজ্ঞ।’’ (সুরা আল-বাকারাহ : ২২০)

এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ ও প্রত্যার্পণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, এতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। মন্দ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটি বড়ই মন্দ কাজ।›› (সুরা আননিসা : ২)

এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, আর এতিমদেরকে যাচাই করবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের যোগ্য হয়; অতঃপর তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দেখতে পেলে তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। তারা বড় হয়ে যাবে বলে অপচয় করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যে অভাবমুক্ত সে যেন নিবৃত্ত থাকে এবং যে বিত্তহীন সে যেন সংযত পরিমাণে ভোগ করে। অতঃপর তোমরা যখন তাদেরকে তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দিবে তখন সাক্ষী রেখো। আর হিসেব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট।›› (সুরা আননিসা : ৬)

উপর্যুক্ত প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এতিমদের সাথে উত্তম ও সুন্দর আচরণ এবং তাদের কাজকর্ম, অধিকার ও পাওনা সহজভাবে সম্পন্ন করে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে এতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণের বিধান ও পদ্ধতি, তাদের সম্পদ ব্যবহারের অনুমতি ও সীমাবদ্ধতা এবং তাদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তরে প্রক্রিয়া ও সময়কাল অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করেছেন।

এতিমের সম্পদ ভক্ষণের ভয়াবহতা বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, যারা এতীমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করে এবং সত্ত্বরই তারা অগ্নিতে প্রবেশ করবে।›› (সুরা আননিসা : ১০)

ইসলাম যেভাবে এতিমের সাথে উত্তম আচরণ, এতিমের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক শিক্ষাদান ও উপযুক্ত বয়সে তার কাছে সম্পদ প্রত্যার্পণ, সকল প্রকার ক্ষতি ব্যতিরেকে সার্বিক কল্যাণসাধনের নির্দেশ দেয়। অনুরূপভাবে এতিমের সাথে কঠোর ও রূঢ় আচরণ থেকেও কঠিনভাবে বারণ করে।

3

তওবা কবুল হওয়ার যত আলামত

আমাদের গুনাহের শেষ নেই। পদে পদে আমরা নাফরমানি করি। আল্লাহতায়ালাকে ভুলে যাই।

যেহেতু আমরা কালিমা পড়েছি, আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করি, তাই মাঝে মাঝে নিজের কৃত পাপকাজের জন্য অনুতপ্ত হই এবং আল্লাহতায়ালার কাছে তওবা করি।  প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, আর কখনও নাফরমানি করব না।

আমাদের তওবা কবুল হলো কি হলো না, এটা আমরা কীভাবে বুঝব?

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে তওবা কবুল হওয়ার কয়েকটি আলামত বর্ণনা করা হলো।

১. তওবার পরের জীবন তওবার আগের জীবনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে।
২. গুনাহ করতে গেলেই আল্লাহতায়ালার ভয় জাগ্রত হবে।

৩. মন গুনাহের কাজের প্রতি নিরাসক্ত হতে থাকবে।  গুনাহ করতে ভালো লাগবে না।
৪. নেককাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আমলে তৃপ্তি ও স্বাদ অনুভব হবে।

৫. নেককার লোকদের সঙ্গে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের সোহবতে থাকতে ইচ্ছে করবে।

তওবা করার পর এই আলামতগুলো যদি আমাদের মধ্যে দেখতে পাই, তাহলে বুঝে নিব আল্লাহতায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এক যুবক ২০ বছর আল্লাহতায়ালার অনেক ইবাদত বন্দেগি করল। এরপরে হঠাৎ এক মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে গুনাহের কাজে লিপ্ত হল। ৩০ বছর পর্যন্ত গুনাহ করতে থাকল এবং আল্লাহতায়ালাকে ভুলে গেল।

অতঃপর, সে যখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হল, তখন নিজের কৃতকর্মের ওপরে অনুতপ্ত হয়ে নির্জনে বসে আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করতে লাগল, হে আল্লাহ, আপনার দেয়া ২০ বছর আমি ইবাদত বন্দেগিতে কাটিয়েছি। তারপরে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ৩০ বছর নাফরমানি ও অবাধ্যতা  করেছি।

এখন আবার আমি আপনার ইবাদত বন্দেগি করতে চাই। আপনি কি আমার কৃত গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দিবেন?

বারবার সে একই কথা বলে দোয়া করতে থাকল। কাঁদতে থাকলো ঘণ্টারর পর ঘণ্টা। হঠাৎ গায়েব থেকে আওয়াজ এলো, হে আমার বান্দা, তুমি ইবাদতের মাধ্যমে আমাকে যখন মোহাব্বাত করতে, তখন আমিও তোমাকে মোহাব্বাত করতাম।

এরপরে তুমি যখন আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, তখন আমিও তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি অপেক্ষায় ছিলাম,তুমি ফিরে আসবে।  হতাশ হইনি। আজ তুমি ফিরে আসতে চাচ্ছ?

তওবা করে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ? তাহলে শোনো আমার কথা, আমি তোমার তওবা কবুল করেছি এবং তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

এক হাদিসে কুদসির সারমর্ম এমন, কী হয়ে গেল আদম সন্তানের, সে গুনাহ করে, এরপরে সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আমি তাকে ক্ষমা করে দিই।

এরপরে আবার সে গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিই; আমার ভয়ের কারণে পরিপূর্ণভাবে না সে গুনাহে লিপ্ত থাকতে পারে, না আমার রহমত ও মাগফিরাত থেকে নিরাশ হতে পারে!

এই জন্য গুনাহ হয়ে গেলেও সে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

হে আমার ফেরেশতারা, তোমরা সাক্ষী থাকো, আমার এমন সমস্ত বান্দাদেরকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।

এক যুবক নবীজি (সা.) এর কাছে এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল, হায় হায় আমি গুনাহগার, আমার গুনাহের শেষ নেই! আমার কোনো মুক্তি নেই। 

নবীজি (সা.) বললেন, আমার কাছে এসো। আমি যা যেভাবে শিখিয়ে দিচ্ছি, সেভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া কর।

এরপরে নবীজি (সা.) বললেন, হে আল্লাহ, আমার গুনাহ তো অনেক, কিন্তু আমার এই গুনাহের চেয়ে আপনার রহমত আরও অনেক অনেক বেশি।

হে আল্লাহ, আমি যা নেক কাজ করেছি, তার প্রতি বিন্দুমাত্র আমার আশা এবং ভরসা নেই, যতটুকু না আপনার রহমত ও মাগফিরাতের প্রতি আছে!

নবীজি (সা.) যুবককে বললেন, এভাবে আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।  দোয়া করে এমনভাবে উঠে যাও, যেন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।

হযরত মুসা (আ.) আল্লাহতায়ালার কাছে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ, দোয়ার মাধ্যমে ‘হে আল্লাহ, হে আমার প্রতি পালক’ বলে আপনাকে কেউ যখন ডাকে, তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন?

আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, আমি তখন বলি, লাব্বাইক, (হে আমার বান্দা, আমি হাজির)।

মুসা (আ.) আবার জিজ্ঞেস করলেন আপনার কোনো ইবাদতগুজার বান্দা যখন আপনাকে ডাকে তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন? আল্লাহতায়ালা বললেন, লাব্বাইক।

মুসা (আ.)  বললেন, কোনো রোজাদার আপনাকে যখন ডাকে, তখন কী বলেন? আল্লাহ তায়ালা বললেন, তখনও আমি বলি লাব্বাইক।

মুসা (আ.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা কোনো গুনাহগার বান্দা যখন আপনাকে ডাকে, তখন আপনি কী বলে তার ডাকে সাড়া দেন?

আল্লাহতায়ালা উত্তরে বললেন, তখন আমি বলি, লাব্বাইক, লাব্বাইক, লাব্বাইক।

মুসা (আ.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, নেককার লোক, রোজাদার লোক যখন আপনাকে ডাকে, তখন আপনি একবার লাব্বাইক বলেন, আর কোনো গুনাহগার ডাকলে তিনবার লাব্বাইক বলেন, এর কারণ কী?

আল্লাহতায়ালা বলেন, কোনো নেককার বান্দা যখন আমার কাছে দোয়া করে, তখন তাদের নেক কাজের প্রতি সামান্য হলেও আশা থাকে, আমি এর উসিলায় তাকে ক্ষমা করে দিব।

কিন্তু, কোনো গুনাহগার যখন আমার কাছে দুআ করে, তখন আমার রহমত ছাড়া তার তো আর কোনো কিছুর প্রতি আশা এবং ভরসা থাকে না!
 

4

তারাবি নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

শুরু হয়েছে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজান। এই মাসের প্রধান দুটি আমল হলো সিয়াম ও কিয়াম।

সিয়াম বা রোজা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, দাম্পত্য মিলন ও রোজা ভঙ্গ হওয়ার সকল বিষয় থেকে দূরে থাকা। আর কিয়াম হলো রাতে তারাবির নামাজ।

তারাবিহ’ শব্দটি আরবি তারভিহাতুন থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম করা, প্রশান্তি লাভ করা।

তারাবি নামাজে যেহেতু প্রতি চার রাকাত পর পর একটু বিশ্রাম নিয়ে তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করা হয়, তাই এই নামাজকে সালাতুত তারাবিহ বা তারাবি নামাজ বলা হয়।


তারাবির নামাজ এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর এবং বিতিরের পূর্বে আদায় করা হয়। তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। যেটা গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিবের কাছাকাছি।

তারাবির ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে নেকীর আশায় কিয়ামুল লাইল তথা তারাবি আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসুল (সা:) তারাবিকে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তারাবি যেন ফরজ না হয়ে যায়, যেটা আদায়ে উম্মতের কষ্ট হতে পারে, সেটা রাসুল (সা:) এর একটি হাদিস থেকেই বোঝা যায়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) একবার রমজান মাসে রাত্রিবেলায় মসজিদে নববীতে নামাজ (তারাবি) আদায় করলেন। উপস্থিত লোকজনও তার সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। একইভাবে তারা দ্বিতীয় দিনেও নামাজ আদায় করলেন এবং লোকসংখ্যা অনেক বেশি হলো। অতঃপর তৃতীয় এবং চতুর্থ দিনেও মানুষ একত্রিত হলো। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) হুজরা থেকে বেরিয়ে তাদের কাছে এলেন না। অতঃপর সকাল হলে তিনি এলেন এবং বললেন, তোমাদের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু শুধু এ ভয়ে আমি তোমাদের নিকট আসা থেকে বিরত থেকেছি যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, না জানি তোমাদের ওপর উহা (তারাবি) ফরজ করে দেওয়া হয়। (বুখারী)

তারাবি বিশ রাকাত সুন্নাত। এটা রাসুল (সা:), সাহাবী, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং মুজতাহিদ ইমামগণের আমল দ্বারা প্রমাণিত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) রমজান মাসে বিশ রাকাত এবং বিতির পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)

সমস্ত সাহাবীদের আমলও বিশ রাকাত ছিল। রাসুল (সা:) এর নাতি হযরত আলী ইবনে হাসান (রা:) থেকে বর্ণিত, হযরত ওমর (রা:) এর নির্দেশে লোকদেরকে নিয়ে উবাই বিন কাব (রা:) বিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন। (আবু দাউদ)

এভাবে খলিফা ওমর, ওসমান, আলী (রা:) সহ সকল সাহাবীদের ঐক্যমতে বিশ তারাবি পড়া হয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ:) বলেন, মক্কা ও মদীনা শরীফে সাহাবায়ে কেরামের যুগ হতে আজ পর্যন্ত সব সময় বিশ রাকাত তারাবি খতমে কোরআনসহ জামাতের সঙ্গে পড়া হয়। তারাবি নামাজে পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত বা শ্রবণ করা ও সুন্নত। রাসূল (সা:)বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে সে একটি নেকী অর্জন করবে এবং একটি নেকীকে দশগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে। (তিরমিজি)

কুরআনে কারীম তেলাওয়াতের মতো শুনলেও একই রকম সওয়াব। এজন্য তারাবি নামাজে পরিপূর্ণ আদবের সাথে মনোযোগ দিয়ে কোরআন শুনতে হবে।

বিশ রাকাত না পড়ে ইমামকে রেখে মসজিদ ত্যাগ করা উচিত নয়। রাসুল (সা:) বলেন, যে ব্যক্তি ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল তথা তারাবি আদায় করবে, তার জন্য পুরো রাত সিয়াম পালনের সওয়াব লাভ হবে। (তিরমিজি)

মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলত পূর্ণ আমল তারাবির নামাজে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। আসুন আমরা যথাযথ গুরুত্বের সাথে তারাবির নামাজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন। আমীন!


5

মাহে রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য (৩য় পর্ব)

রমজান মাসের বরকতঃ

রমজান মাসের অন্যতম বরকত হল, এ মাসে ভাল কাজের প্রতিদান বহু গুণে বেড়ে যায়। রোযা একমাত্র আল্লাহর জন্য, আর রোযার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজে দিবেন। শুধু আল্লাহর ভয়েই বান্দা পানাহার, যাবতীয় যৌন কামনা বাসনা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকে। অন্যথায়, পৃথিবীর এমন কোন শক্তি কি, যা তাকে গোপনে এক ঢোক পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারে? রোযাদার পিপাসায় কাতর অবস্থায় ওযু করার জন্য মুখে পানি নেন, কুলি করে মুখভর্তি পানি আবার ফেলে দেন, কিন্তু এক ঢোক পানি কন্ঠনালীর নিচে নামতে দেন না।

কার ভয়ে? কার প্রেমে? কার ভালোবাসায়? কোন সত্তার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে কুরবানির এই নজরানা? কার মুহাব্বতে ত্যাগের এই উপস্থাপনা? কার সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্ষুধা পিপাসার এই কষ্ট সহ্য করা? বস্তুতঃ একমাত্র আল্লাহ তাআলার ভয়ে, আল্লাহ তাআলার মুহাব্বতে, আল্লাহ তাআলার ভালোবাসায় বিগলিত হৃদয়ই রোযার কষ্ট সহ্য করে করে তাঁর প্রিয়পাত্র হওয়ার যোগ্য। কেউ দেখছে না, কিন্তু আল্লাহ তাআ'লা তো দেখছেন। কেউ জানছে না, কিন্তু আল্লাহ তাআ'লা তো জানছেন। আহা! জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি এই অনুভূতি লাভ করতে পারতাম! এজন্যই তো রোযার প্রতিদান দিবেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। বান্দার চাহিদা মাফিক নয়, বরং মহান রব্বে কারিম নিজের শান অনুযায়ী।

হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনী আদমের প্রতিটি আমলের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি হতে থাকে, ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ, এমনকি আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও বেশি দেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তবে রোযার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, রোযা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি স্বয়ং এর প্রতিদান দিব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকে। রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ : এক. ইফতারের মুহূর্তে দুই. রবের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তে। আর রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম। -সহীহ মুসলিম হাদীস : ১১৫১

রমজানের আরও কিছু আমলঃ

রাত্রে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা রমজানের অন্যতম উত্তম একটি আমল। কারণ, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

{ من قام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه } [رواه البخاري ومسلم].

যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমজানের রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। -বুখারী মুসলিম

এ মাসে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন:

{ كان النبي - صلى الله عليه وسلم - أجود الناس بالخير، وكان أجود ما يكون في رمضان حين يلقاه جبريل } [رواه البخاري ومسلم]،

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। রমজানে যখন তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করতেন আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। -বুখারী মুসলিম

দান সদকা করা অতি উত্তম কাজগুলোর একটি। বিশেষ করে রমজান মাসে বেশি করে করা। রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা, পূর্বসূরীরা রমজান মাসে নামাজে এবং নামাজ ব্যতীত অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।

ই'তিকাফ রমজানের অন্যতম সুন্নত আমলঃ

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদে থেকে ইবাদত বন্দেগী করার নাম ই'তিকাফ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

{ كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يعتكف العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله } [رواه البخاري ومسلم].

রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করেছেন। -বুখারী মুসলিম

রমজান মাসে উমরা করার অনেক ফজিলত রয়েছে। বুখারী ও মুসলিম ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে এ বিষয়ে তাদের কিতাবে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

সিয়াম পালনকারীর জন্য সাহরী খাওয়া উত্তমঃ

ইমাম আহমাদ রহ. আবু সাইদ খুদরী রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন-

{ السحور أكله بركة، فلا تدعوه ولو يجرع أحدكم جرعة من ماء، فإن الله عز وجل وملائكته يصلون على المتسحرين }.

সাহরী বরকতের খাবার। তা খাওয়া থেকে বিরত হবে না। কেহ যদি এক ঢোক পানিও পান করে তবুও সে সাহরী খেল। কেননা, আল্লাহ তাআলা এবং ফেরেশতাগণ সাহরীতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন।

ইফতার তাড়াতাড়ি করা এবং তখন দুআ করা উত্তমঃ

ইমাম তিরমিজি রহ. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন-

{ثلاثة لا ترد دعوتهم: الإمام العادل، والصائم حتى يفطر، ودعوة المظلوم.. }.

তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এক. ন্যায়পরায়ন ইমাম, দুই. রোযাদার যেই পর্যন্ত ইফতার না করে এবং তিন. অত্যাচারিত।

কুরআন নাজিলের মাসঃ

রমজান হল কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ : البقرة : 184

রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। -সূরা বাকারা : ১৮৪

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কুরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কুরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ. -এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিলসহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। -সহি আল-জামে

এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দু'বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।

জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়ঃ

রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وأغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين. وفي لفظ : (وسلسلت الشياطين) رواه مسلم

যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-শয়তানের শিকল পড়ানো হয়। -মুসলিম

তাই শয়তান রমজানের পূর্বে যে সকল স্থানে অবাধে বিচরণ করত রমজান মাস আসার ফলে সে সকল স্থানে যেতে পারে না। শয়তানের তৎপরতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় ব্যাপকভাবে মানুষ তওবা, ধর্মপরায়ণতা, ও সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয় ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে। তারপরও কিছু মানুষ অসৎ ও অন্যায় কাজ-কর্মে তৎপর থাকে। কারণ, শয়তানের কু-প্রভাবে তারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।

রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদরঃ

আল্লাহ তাআলা বলেন :—

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿3﴾ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ﴿4﴾ سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ ﴿5﴾ (القدر: 3-5)

লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনি উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। -সূরা আল-কদর : ৩-৫

রমজান মাস দোয়া কবুলের মাসঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

لكل مسلم دعوة مستجابة، يدعو بـها في رمضان. رواه أحمد

রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। -মুসনাদ আহমদ

অন্য হাদিসে এসেছে –

إن لله تبارك وتعالى عتقاء في كل يوم وليلة، (يعني في رمضان) وإن لكل مسلم في كل يوم وليلة دعوة مستجابة. صحيح الترغيب والترهيب.

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। -সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব

তাই প্রত্যেক মুসলমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের কল্যাণের জন্য যেমন দোয়া-প্রার্থনা করবে, তেমনি সকল মুসলিমের কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করবে।

রমজান পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাসঃ

যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসূল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :

.. رغم أنف رجل، دخل عليه رمضان، ثم انسلخ قبل أن يغفر له. .رواه الترمذي

ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। -তিরমিজি

বস্তুতঃ সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।

রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাসঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

إذا كان أول ليلة من رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار، فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب، وينادي مناد كل ليلة : يا باغي الخير أقبل! ويا باغي الشر أقصر! ولله عتقاء من النار، وذلك في كل ليلة. رواه الترمذي

রমজান মাসের প্রথম রজনির যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। -তিরমিজি

রমজান মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়ঃ

যেমন হাদিসে এসেছে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একটি হজের সওয়াব পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং, রমজান মাসে ওমরাহ করা আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ আদায়ের মর্যাদা রাখে। এমনিভাবে সকল ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল সৎকাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বেশি দেয়া হয়।

রমজান ধৈর্য ও সবরের মাসঃ

এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদি ও অন্যান্য সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনিভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ. الزمر:

ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেয়া হবে। -সূরা যুমার : ১০

শেষের প্রার্থনাঃ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদের সকলের সিয়াম সাধনাকে কবুল করুন। আমাদের ভাল কাজগুলোকে আমাদের জন্য নাজাতের উসিলা হিসেবে গ্রহন করুন। হে আল্লাহ! সিয়াম পালনকারীদের সিয়াম কবুল করুন, দানকারীদের দান কবুল করুন, রাত্রি জাগরণকারী ইবাদতকারীদের ইবাদত কবুল করুন, প্রার্থনা কারীদের প্রার্থনা কবুল করুন, আমাদের পূর্বের এবং পরের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, এ মাস যেন আমাদের সকলের জন্য ক্ষমার মাস হয়। আমীন! আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।


6

মাহে রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য (২য় পর্ব)

সিয়াম জান্নাতের পথ:

ইমাম নাসাঈ রহ. আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে প্রতিদান দেবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি অসাল্লাম বলেন:

{ عليك بالصيام فإنه لا مثل له }.

তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর কোন তুলনা নেই।

জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। সেখান দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সাহল ইবনে সাআদ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ إن في الجنة باباً يقال له: الريّان، يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال: أين الصائمون، فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا أغلق، فلم يدخل منه أحد } [أخرجه البخاري ومسلم].

জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামত দিবসে সেখান দিয়ে সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সে দরজা দিয়ে অন্য কেহ প্রবেশ করবে না। বলা হবে: সিয়াম পলনকারী কোথায়? তারা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া আর কেহ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর কেহ সে স্থান দিয়ে প্রবেশ করবে না। -বুখারী মুসলিম, ১৮৯৬

সিয়াম পালনকারীর জন্য সিয়াম সুপারিশ করবে:

ইমাম আহমদ রহ. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন:

{ الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام: أي رب منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفّعني فيه، ويقول القرآن: منعته النوم بالليل فشفّعني فيه، قال: فيشفعان }.

সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী হবে, সিয়াম বলবে, হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা বলবেন: তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল।

সিয়াম গুনাহের ক্ষমা এবং কাফফারা হিসাবে গৃহিত হয়:


কেননা ভাল কাজ অন্যায়কে মুছে দেয়। আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহ তাআ'লা আনহু রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ من صام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه } [رواه البخاري ومسلم].

যে রমজানে ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। -বুখারী মুসলিম

সিয়াম ইহকাল এবং পরকালের সৌভাগ্যের কারণঃ

আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহ তাআ'লা আনহু রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{للصائم فرحتان: فرحة حين يفطر، وفرحة حين يلقى ربه، ولخلوف فم الصائم أطيب عند الله من ريح المسك } [رواه البخاري ومسلم].

সিয়াম পালনকারীর দুটি খুশি, প্রথম খুশি যখন সে ইফতার করে, আর এক খুশি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে। সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অধিক প্রিয়। -বুখারী মুসলিম

রমজানে সুযোগ কাজে লাগানো:

এ বছর রমজান মাস কি আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসার মৌসুম হবে, এবং নিজের হিসাব নিকাশের সুযোগ করে দেবে, আর আল্লাহর সামনে নিজের গোনাহের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ করে দেবে?

সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য সত্যিকারভাবে ইসলামী জীবন যাপন করার সুযোগ এনে দেবে কি এ মহান মাস?

দ্বীনের পথে দাওয়াতদানকারীগণ এ মাসকে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। এ কথা চিন্তা করে যে, তারা সর্বোত্তম দাওয়াতের দায়িত্বপালনকারী এবং তারা অতি উত্তম উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন। তারা নিজের সত্তার চিন্তা এবং তার জন্য ঘোরাফেরা করা থেকে মুক্ত হয়ে শুধু আল্লাহ তাআ'লার নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী মনে করে কাজ করবেন।

এ মাসটিকে প্রত্যেক মুসলমান তার মুসলমান ভাইকে সাহায্য করার মাস হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন। হোক না সে অত্যাচারী অথবা অত্যাচারিত। অত্যাচারীকে তার অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, উৎসাহিত করে সর্বোপরি প্রতিরোধ গড়ে তুলে সাহায্য করবে। আর অত্যাচারিতকে সাহায্য করবে সাহায্য, সহযোগিতা এবং দয়ার হাত তার প্রতি সম্প্রসারিত করে দেয়ার মাধ্যমে। ফলে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নির্দেশিত এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের স্বার্থক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজের সর্বত্র তৈরি হবে সৌহার্দ্যপূর্ণ জুলূম অত্যাচারবিহীন ভ্রাতৃত্বের কাঙ্খিত পরিবেশ।

ধনী দরিদ্র সকলের জন্যই রমজান উপকারলাভের মাধ্যমঃ


এ মাস ধনী এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপনকারীদের জন্যও সাওয়াব অর্জনের মহাবরকতময় সুযোগ। তাদের অনুভূতিকে সজাগ করে তুলতে রমজানের বাস্তব প্রায়োগিক শিক্ষার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তারা দরিদ্রদের প্রয়োজন ও ব্যাথা মরমে অনুভব করতে পারেন। পারেন নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও। আল্লাহ তাআ'লা যে পথে ব্যয় করতে সম্পদ দান করেছেন সে পথে তারা সম্পদ ব্যয় করার প্রকৃত প্রেরণালাভ করতে পারেন। উম্মাহর ক্ষুধার্তদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেন তারা। তারা যদি তাদের ক্ষুধার্তদেরকে না খাওয়ায়, বস্ত্রহীনদেরকে বস্ত্র না দেয় আর দুর্বলদেরকে সাহায্য না করে- তাহলে মনে করতে হবে, তাদের ঈমান বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। হাদিসের মর্মানুযায়ী, ঈমানের প্রকৃত পরিপূর্ণতা তো নিজের জন্য যা কল্যানকর বা পছন্দনীয় মনে করা হয়, অপরের জন্যও তাকে কল্যানকর বা পছন্দনীয় ভাবার শিক্ষার মধ্যে। সেই মহান শিক্ষা রমজানের বাস্তব প্রয়োগের ভেতরেই নিহিত রয়েছে।

রমজান আমাদের নিজেদের জন্য এমন একটি পদ্ধতি অবলম্বনের সুযোগ এনে দেয় যার মাধ্যমে ইসলামী ভাবধারায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারি। রোজার প্রকৃত শিক্ষা শুধু সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপোস থাকা নয়; বরং, রোজাদারের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গও রোজার বাস্তবিকতায় ধন্য হবে। রোজাদারের হাত, পা, চোখ, কান, জিহবাসহ প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গেরও রোজা রয়েছে। যখনই এ সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ নড়া-চড়া করবে, ব্যবহার করবে- রোযাদার ব্যক্তিকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তিনি একজন রোযাদার। মহান সৃস্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় নিষিক্ত থাকবে রোযাদারের প্রতিটি আমল। মহান মালিকের ইচ্ছানুযায়ী তিনি ব্যবহার করবেন তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

{ وما يزال عبدي يتقرّب إليّ بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها } [رواه البخاري].

আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, আমি তাকে ভালবাসি। যখন আমি তাকে ভালবাসি সে আমার কান হয়ে যায়, যা দিয়ে সে শোনে। আমার চক্ষু হয়ে যায়, যা দিয়ে সে দেখে। হাত হয়ে যায়, যা দিয়ে সে ধরে। পা হয়ে যায়, যা দিয় সে চলে। -বুখারী

এই হাদিস যদিও নফল আমলের ফজিলত বিষয়ক, কিন্তু এসব নফল আমল শেখার উত্তম শিক্ষালয়ও রমজান। ইবাদাতের বসন্ত খ্যাত সেই মাহে রমজানের পাঠশালায় এ সমস্ত কিছুই অর্জন করা সম্ভব, যে রমজান আমাদেরকে দৃঢ়তা অবলম্বন ও সত্য গ্রহণের শিক্ষা দেয়। যার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তির সমস্ত দেয়াল ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। খারাবির সমস্ত ইচ্ছের জলাঞ্জলির মাধ্যমে কল্যানের ফল্গুধারা বইতে থাকে মনে ও মননে।

রোযাদার ঝগড়া করবে নাঃ


সে দৃঢ়তা এবং সুক্ষ্ম নিয়ম কি? যার মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীর মুমিনদেরকে দেখা যায় যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত হচ্ছেন, আবার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে পানাহার করছেন। অত:পর নিজের নফসকে কুপ্রবৃত্তির মধ্যে পতিত হওয়া অথবা পথভ্রষ্টতার বাতাসে ভেসে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছেন। রোযাদার ব্যক্তি তো তিনিই, যিনি কুপ্রবৃত্তি এবং কামনার উদ্রেককারী প্রত্যেক বিষয়কে 'না' বলে দিবেন। আর তার এই 'না' বলা হতে হবে আল্লাহ তাআ'লার সন্তুষ্টি অনুযায়ী, তাঁর সন্তোষলাভের উদ্দেশ্যে। রোযাদার অশ্লীল কাজ করবেন না। ঝগড়া করবেন না। এমনকি, উচু স্বরে কথাও বলবেন না। কোন মূর্খ যদি তার অনুভূতিকে আহত করে ও তার ভেতরের খারাপ জিনিসকে জাগিয়ে তোলে, প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে তবুও তিনি বলবেন, 'আমি সিয়াম পালনকারী'।

আর মানুষতো নিজের অভ্যাসের গোলাম। যতই সে চেষ্টা করে ফিরে আসতে পারে না নফসের গোলামী থেকে। কেননা, অভ্যাসের বিরাট প্রভাব রয়েছে অন্তর ও নফসের উপর। আমাদের অনেকের পানাহার, ঘুমানো, জাগ্রত হওয়া ইত্যাদির ব্যাপারে অনেক রকম অভ্যাস রয়েছে তার থেকে সে বিরত হতে পারে না। সিয়াম এই সমস্ত অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বিরাট উপকারী। মুসলমান ইচ্ছা করলে এর মাধ্যমে অনেক অভ্যাস থেকে নাজাত পেতে পারে কোন কষ্ট এবং ক্ষতি ছাড়াই। অত:পর যে সমস্ত অভ্যাস তার ক্ষতি করে সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। যেমন, রাত্রি জেগে অনুষ্ঠান উপভোগ করা, গোনাহ হয় এমন অনুষ্ঠানে যাওয়া, কারো সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা, বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা ইত্যাদির অভ্যাস করা। অর্থাৎ এ জাতীয় যত ধরণের নেশা জাতীয় অভ্যাস আছে তা পরিত্যাগ করা। মূলত এ সমস্ত কিছু হয় দুর্বল মানসিকতার কারণে, অথবা এগুলোর নিকট আত্মসমর্পনের কারণে। সুস্থ, ভদ্র ও বিবেকবানরা কখনও এমন কাজ করতে পারে না। যদি সিয়াম পালন করতে চাও তবে হিংসা, গোনাহ এবং অন্যায় থেকে বিরত থেকে সিয়াম পালন কর। সিয়াম অবস্থায় জিহবাকে অহেতুক কথা থেকে, দৃষ্টিকে হারাম থেকে বিরত রাখ। অনেক সিয়াম পালনকারী আছেন তার সিয়াম উপবাস এবং পিপাসিত থাকা ছাড়া আর কোন উপকারে আসে না। সে ঐ ব্যাক্তি যে আহার বাদ দিল, কিন্তু গীবতের মাধ্যমে নিজের ভাইয়ের গোস্ত খাওয়া থেকে বিরত হতে পারল না। পান করা থেকে বিরত থাকল কিন্তু মিথ্যা, ধোকা, মানুষের উপর অত্যাচার থেকে বিরত হল না।

সিয়াম পালনকারীর জন্য নসিহতঃ


প্রিয় রোযাদার ভাই বোন, রমজান আমাদের কি শেখায়? রমজানের প্রকৃত শিক্ষা এবং আদর্শ কি? আসুন, শপথ নিই। আগত রমজানে আমরা আমাদের মনকে প্রশস্ত করি, জিহবাকে খাটো করি, অন্যায় এবং ঝগড়া থেকে দুরে থাকি। যদি বিচ্যুতির পথ সামনে এসে যায়, তবে নিজেকে সামলে নিই। ভাইদের থেকে যদি কষ্ট পাই তাহলে ধৈর্য ধারণ করি। কেউ যদি আমার সাথে ঝগড়া শুরু করে, তবে আমি তার মত করবো না। বরং আমি বলবো, 'আমি সিয়াম অবস্থায় আছি।'


চলবে......

7


মাহে রমজানের ফজিলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য (১ ম পর্ব)

সমস্ত প্রশংসা, শোকর, ছানা, হামদ সেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যিনি রমজানকে শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে নির্ধারন করেছেন এবং সে সময় মু'মিন মুসলিমের প্রত্যেক ভাল কাজের প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। আহ! আমাদের সময়গুলো কতই না দ্রুত কেটে যাচ্ছে। চলন্ত মেঘমালার ন্যায় দিনগুলো গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে দূরন্ত গতিতে! বছর কতই না দ্রুত কেটে যাচ্ছে! আর আমরা জীবন চলার পথে বেখবর-অলস সময় কাটাচ্ছি! হায়, আমাদের চেতনা কবে ফিরে আসবে! আমরা কখন জাগব! আমাদের মধ্যে কম সংখ্যক লোক এমন আছেন যারা বাস্তবতা ও পরিণতি নিয়ে চিন্তা করছেন অথবা তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করছেন। রমজানুল মোবারক আমাদের দ্বারে উপনীত। স্বাগতম প্রিয় মাহে রমজান!

আলহামদুলিল্লাহ। মানব জীবনের সংক্ষিপ্ত এবং নির্ধারিত বয়স ও অল্প সময়ের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তার জন্য অধিক পরিমান সওয়াব লাভের জন্য ভাল কাজের কিছু মৌসুম রেখেছেন। তার জন্য স্থান এবং কালের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন কখনও কখনও। যে কাল ও স্থানের মাধ্যমে সে তার ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। সেসব বিশেষ মৌসুমের মধ্য থেকে অন্যতম একটি মৌসুম হল পবিত্র রমজান মাস।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ [البقرة:183].

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।' -সূরা বাকারা, ১৮৩ আয়াত

রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ (يونس: 58)

বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং, এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। -সূরা ইউনুস : ৫৮

পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না। করা হলে, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :—

أتاكم رمضان شهر مبارك

তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন :—

فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. رواه النسائي

আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। -নাসায়ী

আমাদের কর্তব্য :

আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা।

রমজান মাসে মুমিন বান্দার উপরে শয়তানি প্রবৃত্তির আক্রমণ কম হয়, রাত দিনে মন নরম থাকে। একজন দেখা যায় তার গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইছে, আর একজন আনুগত্যের তাওফীক প্রার্থনা করছে। তৃতীয়জনকে দেখা যায় আল্লাহর শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছে, চতুর্থজন ভাল কাজের ফলাফল সুন্দরভাবে পাওয়ার আশা করছে, পঞ্চম জনকে দেখা যায় তার প্রয়োজনের জন্য প্রার্থনা করছে। তিনিই মহান যিনি তাদেরকে তাওফীক দেন। অনেক লোক এমন আছে যারা এ সমস্ত কাজ থেকে দুরে অবস্থান করছে।

রমজান মাসের ফজিলত:

রমজান মাস শক্তি অর্জন ও দানের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম মক্কা বিজয় করেন। তখন তিনি এবং সমস্ত মুসলমান সিয়াম অবস্থায় ছিলেন। এ রমজানেই ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়ছিল। এ সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের পতাকা সমুন্বত হয়েছিল। পক্ষান্তরে বিপথগামী ভ্রান্ত পৌত্তলিকদের পতাকা হয়েছিল অবনমিত। এ মাসে মুসলমানদের অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা এবং কুরবানি সংঘঠিত হয়েছে।

রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা অধিক পরিমাণে শক্তি, সজিবতা এবং ইবাদতের জন্য ধৈর্য ধারণ করার উদ্যম অনুভব করতেন, তাইতো রমজান মাসকে সৎকাজ, ধৈর্য্য ও দানের মাস বলা হয়। রমজান দুর্বলতা, অলসতা, ঘুমানোর মাস নয়। ভীরুতা, কাপুরষতা এবং নির্জীবতারও সময় নয়। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রমজান সত্যের আলোয় জেগে ওঠার শিক্ষা দেয়। কোন কোন সিয়াম পালনকারীকে হাত পা ছেড়ে দিয়ে, দিনের বেলায় ঘুমাতে, কাজ কম করতে দেখা যায়। এমন আচরণ সিয়ামের তাৎপর্য বিরোধী। সিয়ামের উদ্দেশ্যের সাথে এগুলো আদৌ যায় না।

পূর্বেকার মুসলমানগণ রমজান যাপন করতেন তাদের অন্তর এবং অনুভূতি দিয়ে। রমজান এলে তারা কষ্ট করতেন। ধৈর্য্যের সাথে দিন যাপন করতেন। আল্লাহর ভয় এবং পর্যবেক্ষণের কথা তাদের স্মরণ থাকত। সিয়াম নষ্ট হয় অথবা ত্রুটিযুক্ত হয় এমন সব কিছু থেকে তারা দুরে থাকতেন। খারাপ কথা বলতেন না, ভাল না বলতে পারলে নিরবতা পালন করতেন।

তারা রমজানের রাত্রি যপন করতেন সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনুসরণ করেই।

সিয়ামের উপকার অথবা ফজিলত অনেক। তা গণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে খেলাধুলা ও রং তামাশায় মত্তব্যক্তিরা কিংবা অলস শ্রেণির লোকজন, যারা সারাদিন ঘুমিয়ে কাটায় এবং রাত্রে বাজারে ঘুরে বেড়ায় তারা রমজানের এসব ফজিলত থেকে বঞ্চিত থাকবে।

সিয়াম আগুন থেকে রক্ষাকারী ঢাল:

ইমাম আহমাদ রহ. তার কিতাবে জাবের রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

{ إنما الصيام جنة، يستجنّ بها العبد من النار }.

সিয়াম প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বাঁচার জন্য ঢাল। এর মাধ্যমে বান্দা আগুন থেকে মুক্তি পায়।

ইবনে মাসউদ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج، فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج، ومن لم يستطع فعليه بالصوم، فإنه له وجاء } [أخرجه البخاري ومسلم].

হে যুবকেরা! যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা, তা দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে এবং যৌনাঙ্গের হিফাজত করে। যে বিবাহের সামর্থ রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা এটি তার জন্য সুরক্ষা। -বুখারী মুসলিম

সিয়াম জান্নাতের পথ:

ইমাম নাসাঈ রহ. আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে প্রতিদান দেবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি অসাল্লাম বলেন:

{ عليك بالصيام فإنه لا مثل له }.

তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর কোন তুলনা নেই।

জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। সেখান দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সাহল ইবনে সাআদ রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ إن في الجنة باباً يقال له: الريّان، يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال: أين الصائمون، فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا أغلق، فلم يدخل منه أحد } [أخرجه البخاري ومسلم].

জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামত দিবসে সেখান দিয়ে সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সে দরজা দিয়ে অন্য কেহ প্রবেশ করবে না। বলা হবে: সিয়াম পলনকারী কোথায়? তারা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া আর কেহ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর কেহ সে স্থান দিয়ে প্রবেশ করবে না। -বুখারী মুসলিম, ১৮৯৬

সিয়াম পালনকারীর জন্য সিয়াম সুপারিশ করবে:

ইমাম আহমদ রহ. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন:

{ الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام: أي رب منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفّعني فيه، ويقول القرآن: منعته النوم بالليل فشفّعني فيه، قال: فيشفعان }.

সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী হবে, সিয়াম বলবে, হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা বলবেন: তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল।

সিয়াম গুনাহের ক্ষমা এবং কাফফারা হিসাবে গৃহিত হয়:

কেননা ভাল কাজ অন্যায়কে মুছে দেয়। আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহ তাআ'লা আনহু রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

{ من صام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه } [رواه البخاري ومسلم].

যে রমজানে ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। -বুখারী মুসলিম


চলবে......

8

কোরআন-হাদিসে আলেমদের সম্মান ও মর্যাদা


নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকার : আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের সম্মানিত করেছেন ওহির জ্ঞান ও জীবন-বিধান দিয়ে। সেই ওহির জ্ঞান ও বিধি-বিধান মানবজাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি প্রেরণ করেছেন যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল। তাঁরা ছিলেন জগৎবাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় করুণা ও রহমতস্বরূপ। আল্লাহর রহমতের সেই নবুয়তি ধারা আদম (আ.) থেকে শুরু হয়ে সমাপ্ত হয়েছে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনি শেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী এই দুনিয়াতে আগমন করবেন না।

আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্যদাতা : যুগে যুগে যাঁরা এই নবীদের জ্ঞান ধারণ করে আসছেন তাঁরাই যুগের হক্কানি উলামায়ে কেরাম। যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজ আমাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছেছে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্রের সুবিন্যস্ত বিশাল বিশাল গ্রন্থাবলি। আল্লাহ তাআলা তাঁদের বানিয়েছেন নিজ একত্ববাদের অন্যতম সাক্ষী। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা : আলে ইমরান : ১৮)

আলেমদের আনুগত্য : তাঁরা আম্বিয়ায়ে কেরাম থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাঁদের কাছেই মানুষ লাভ করে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান। চিনতে নিজের প্রভুকে, শিখতে পারে আল্লাহর বিধি-বিধান। বুঝতে পারে শরিয়তকে। মানতে পারে হালাল-হারামকে। তাঁদের মাধ্যমেই মানুষ খুঁজে পায় নিজের আসল পরিচয়। যাঁদের সংস্পর্শে এসে অন্ধকার জগতের মানুষগুলো সন্ধান পায় আলোকিত জীবনের। মৃত হৃদয়গুলো হয় পুনর্জীবিত। তাঁরা পৃথিবীর জন্য রহমত। তাঁরা উম্মতের জন্য বরকত। পরম হিতৈষী ও মঙ্গলকামী। আল-কোরআনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গেই তাঁদের আনুগত্যেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, অনুসরণ করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বসম্পন্ন (ন্যায়পরায়ণ শাসক ও আলেম) তাদের।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা : আলেমদের কাছে ইসলাম সবার আগে। তাঁরা দ্বিনের অতন্দ্র প্রহরী। দ্বিন রক্ষার ঢাল ও সুদৃঢ় প্রাচীর। ইসলামের বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়ষন্ত্রের মোকাবেলায় তাঁরা সর্বদা সচেষ্ট। তাঁরা নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করে সব ধরনের বাতিল মতবাদকে রুখে দেওয়ার জন্য সর্বদা অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়ে যান। তাঁরা হক কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। হক প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জান-মাল ব্যয় করাটা গৌরব মনে করেন। বাতিলের মুখোশ উন্মোচন করতে কালক্ষেপণ করেন না। তাঁদের হাতেই জিন্দা হয় সুন্নত। দূরীভূত হয় বিদআত। যেকোনো শরয়ি সমস্যা নিরসনে তাঁদের দ্বারস্থ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব আলেম-জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।’ (সুরা : নাহল : ৪৩)

হাদিসের আলোকে আলেমদের মর্যাদা : উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওই ব্যক্তি আমার আদর্শের ওপর নাই, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের আলেমদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২১৪৩, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৩৮৪)

আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৃদ্ধ মুসলমান, কোরআনের আদব রক্ষাকারী ও কোরআন অনুযায়ী আমলকারী হাফেজ এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর সম্মান করা মহান আল্লাহর সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৫৩)

আলেমরা আল্লাহর ওলি বা বন্ধু। তাঁদের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করা আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার শামিল। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করবে আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)

আলেমদের অপমান ও সমালোচনার পরিণতি : ইমাম হাফেজ আবুল কাসেম ইবনে আসাকির (রহ.) বলেন, হে ভাই জেনে রাখো, উলামায়ে কেরামের দোষ চর্চা করা বিষাক্ত জিনিস। আল্লাহ তাআলার অভ্যাস হলো উলামায়ে কেরামের কুৎসা রটনাকারীকে তিনি লজ্জিত করেন (এটা কারো অজানা নয়)। যে ব্যক্তি উলামায়ে কেরামের সমালোচনা করবে আল্লাহ তার মৃত্যুর আগে তার অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেবেন। (আত-তিবয়ান ফি আদাবে হামালাতিল কোরআন : ২৭-২৯)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) (৮৫২ হি.) বর্ণনা করেছেন, ইয়েমেনের বিখ্যাত মুহাদ্দিস কাজি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ জাবিদি আশ-শাফেঈ (৭১০-৭৯২ হিজরি) যিনি ২৪ খণ্ড বিশিষ্ট ফিকহে শাফেঈর ‘আত-তাফকিহ ফি শরহিত তানবিহ’ নামক বিশাল ব্যাখ্যাগ্রন্থের রচয়িতা। মৃত্যুর সময় তাঁর চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। এমন কি তাঁর জিহ্বা কালো হয়ে থুতনি পর্যন্ত বেরিয়ে যায়। উপস্থিত সবাই ধারণা করে তিনি জীবদ্দশায় ইমাম মুহিউদ্দীন নববী (রহ.)-এর অধিক সমালোচনা ও অপমান করার কারণে আজ তাঁর এ দুরাবস্থা বরণ করতে হলো। (আদ্দুরারুল কামেনা : ৪/১০৬)

উলামা কেরামের প্রতি অবজ্ঞা করা এবং তাঁদের সঙ্গে উপহাস ও তাঁদের শানে বেআদবি করার প্রথম ফল হলো অন্তর মরে যাওয়া এবং এর সর্বশেষ পরিণাম অনেক ভয়াবহ। কেননা অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা প্রমাণিত যে যারা কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের বিধি-বিধানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে তাদের বেশির ভাগের সূচনা হয়েছে কোরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক উলামায়ে কেরামের সমালোচনা করা এবং অবজ্ঞা দিয়ে। কেননা কোরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহকদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও অবজ্ঞা করতে করতে তাদের অন্তর থেকে মূল কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের প্রতি প্রকৃত মূল্যবোধ দূর হয়ে যায়। এভাবেই তারা ধীরে ধীরে সিরাতে মুস্তাকিম ও আবার কেউ একেবারে ইসলাম থেকেই সটকে পড়ে।

আলেমদেরকে গালি দেওয়ার শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি : যেকোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া, বিদ্বেষী মনোভাব, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা নাজায়েজ ও ফাসেকি কাজ। সুতরাং উম্মতের শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায় উলামায়ে কেরামকে গালি দেওয়া, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা আরো জঘন্যতম কাজ তা বলাই বাহুল্য। আলেমের সঙ্গে দুশমনি ও গালি দেওয়ার কারণ দুটি হতে পারে। যথা—১. ব্যক্তিগত কোনো কারণে। ২. আলেম হওয়ার কারণে। কোনো আলেমকে আলেম হওয়ার কারণে গালি দেওয়া, তাঁর সঙ্গে শত্রুতা বা বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা একটি কুফরি কাজ। এটি খুবই ভয়াবহ মানসিকতা। এমন মানসিকতা লালনকারী ব্যক্তি তাওবা না করলে ঈমানের সঙ্গে তার মৃত্যু হবে কি না ঘোর সন্দেহ আছে।

আল্লামা জাইনুদ্দিন ইবনে নুজাইম মিসরি (রহ.) (৯৭০ হি.) বলেন, যদি কেউ কোনো আলেম বা ফকিহকে ব্যক্তিগত কোনো কারণ ছাড়া (আলেম হওয়ার কারণে) গালি দেয়, তাহলে সে কাফির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ (আল-বাহরুর রায়েক : ৫/১৩২)

উলামায়ে কেরাম হলেন আম্বিয়া কেরামের ওয়ারিশ ও তাঁদের প্রতিনিধি। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মনোনীত করেছেন দ্বীনের জন্য। তাই আলেমদের সঙ্গে বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা, তাঁদের গালি দেওয়া পরোক্ষভাবে ইসলামের নিদর্শন অসম্মান করার অন্তর্ভুক্ত।

যারা আলেমদের সম্মান নষ্ট করে ও কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের হেদায়েত দিয়ে দ্বীনের রাস্তায় কবুল করুন। আল্লাহুম্মা আমিন!

9

শিশুদের ঈমান পরিচর্যায় কিছু পরামর্শ

অনুভূতি শূণ্য মুসলিম জাতি : উপলব্ধি জাগ্রত হলে মানুষের ভেতর পরিবর্তন আসবে। মুসলিম জাতির মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে অভাব অনুভূতি, উপলব্ধি ও চেতনার। আমরা হতাশার সঙ্গে দেখছি, দৃষ্টি রাখলে খুব সহজে তা চোখে পড়বে। অথচ মুসলিমদের ভেতর তা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। ফলে তা থেকে উত্তরণেরও পথ খোঁজে না। এর ব্যতিক্রমও যে নেই তা নয়।

শিক্ষায় অগ্রগতি জরুরি : শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আমরা সবাই জানি। শিক্ষা ও সুশিক্ষা ছাড়া বর্তমান সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং বড় লক্ষ্যও অর্জন করা যাবে না। শিক্ষায় যে জাতি পিছিয়ে সে জাতি জাগতিক জীবনেও পিছিয়ে।

জাগতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় :  যেহেতু জাগতিক জীবনের প্রয়োজন পূরণে আমাদের জাগতিক শিক্ষারও প্রয়োজন হয়, তাই শিক্ষা কারিকুলামে আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় করতে হবে। যেন তারা পার্থিব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে এবং তাদের ঈমান ও ধর্মীয় জীবন রক্ষা পায়। নিম্নে শিশুদের ঈমান পরিচর্যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে।

এক. অভিভাবকের ঈমান শিক্ষা : শিশুরা যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায় বা তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকে, তখন তাদের ঈমান ও বিশ্বাসের শিক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। কেননা শৈশবের শিক্ষা ও বিশ্বাস শিশুর মনে গভীর রেখাপাত করে। সহজে তা দূর হয় না। তাই এ সময় তাকে ঈমান, ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, উত্তম চরিত্র শেখানো প্রয়োজন। শৈশবে শিশুকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে পরবর্তী সময়ে শিশুকে দ্বিনের ওপর রাখা কঠিন হবে।

দুই. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামী মৌলিক শিক্ষার ব্যবস্থা : প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে শিশুরা যখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে যায়, তখন তাদের প্রথমে ফরজ বিধানগুলো এবং ইসলামের অপরিহার্য বিভিন্ন দিক তাদের শেখাতে হবে। এরপর তাদের মুসলিম হিসেবে জীবন যাপনের জন্য যেসব সামাজিক ও আর্থিক (মুআমালাত ও মুআশারাত) বিধি-বিধানের প্রয়োজন হয়, তা শেখাতে হবে। আর তাদের তা শেখাতে পারেন গভীর জ্ঞান ও বোধসম্পন্ন শিক্ষকেরা। ইসলামী শিক্ষার আয়োজন রয়েছে এবং তার প্রয়োজনও রয়েছে। তাই শিশুদের জন্য ইসলামী শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর তা হতে পারে স্বতন্ত্র ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

যেহেতু স্কুলে যাওয়া শিশুদের ফেরানো যাবে না এবং তাদের ফেরানো উচিতও হবে না, তাই তাদের জন্য দ্বিনি বিবেচনায় অনুকূল শিক্ষা দিতে হবে। আর অবশ্যই তাদের মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে হবে এবং জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুসরণ করতে হবে, যেন সরকারি স্কুল-কলেজ থেকে শিক্ষার মান কম না হয়।

তিন. দ্বিনি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা : কর্ম জীবনে গিয়ে শিশুরা যেন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে না পড়ে, এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে বাধ্য না হয়—যারা দ্বিন পালনের সুযোগ দেবে না তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে। তাদের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। সেটা যেকোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান হতে পারে। যেমন তারা ব্যবসা করতে পারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে পারে।

চার. পরিবারে ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা : অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। দ্বিন পালন, ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। যেন শিশুর মন ও মস্তিষ্কে, চিন্তা ও চেতনায় ইসলামী জীবনধারার সঙ্গে মিশে যায়। ইসলাম পালনে তারা অভ্যস্ত হয়।

পাঁচ. মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য পাঠ : জাতি হিসেবে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে শিশুদের জানানো। ইসলামী সভ্যতার সোনালি অধ্যায়গুলো তাদের সামনে তুলে ধরা। যেন তারা ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত এবং বর্তমান বিপর্যয়কর অবস্থার জন্য হীনম্মন্যতায় না ভোগে।

আল্লাহ কবুল করুন! আমরা যেন আমাদের শিশুদের ইমানী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি। আল্লাহুম্মা আমীন!


10

রাগান্বিত অবস্থায় শিশু পেটানো একদম অনুচিত

রাগান্বিত অবস্থায় কখনও শিশুকে প্রহার করবে না। পিতা ও উস্তাদ উভয়ের জন্যই এই কথা।

রাগ প্রশমিত হওয়ার পর চিন্তা-ভাবনা করে শাস্তি দেবে। ছাত্রদের জন্য উত্তম শাস্তি হল ছুটি মওকুফ করে দেওয়া। শিশুর উপর এর খুব প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে।

শিক্ষক ছাত্র প্রহারে এজন্য বেপরওয়া হয়ে যান যে, তাকে প্রশ্ন করার কেউ থাকে না। শিশুর তো প্রশ্ন করার যোগ্যতাই নেই আর অভিভাবক শিক্ষককে পূর্ণ স্বাধীন করে দিয়েছেন এই বলে যে, ‘হাড্ডি আমাদের, আর চামড়া মিয়াজীর’!

মনে রাখবে! যার অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করার কেউ থাকে না তার সম্পর্কে প্রশ্নকারী স্বয়ং আল্লাহ।

শিশুদেরকে প্রহার করা খুবই ভয়াবহ। অন্যান্য গুনাহ তো তওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে, কিন্তু শিশুদের উপর জুলুম করা হলে এর ক্ষমা পাওয়া খুবই জটিল। কেননা, এটা হচ্ছে বান্দার হক। আর বান্দার হক শুধু তওবার দ্বারা মাফ হয় না, যে পর্যন্ত না যার হক নষ্ট করা হয়েছে সে মাফ করে। এদিকে যার উপর জুলুম করা হয়েছে সে হচ্ছে নাবালেগ। নাবালেগের ক্ষমা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এমনকি শিশু যদি মুখে বলেও যে, আমি মাফ করলাম তবুও তা গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য এই অপরাধের মাফ পাওয়া খুব জটিল। আর তাই শিশুদেরকে প্রহার করা এবং তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার করার ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত। স্কুল মাদরাসার শিক্ষক সাহেবরা এ অন্যায় করে ফেলেন। আল্লাহ তাআলা তাদের রক্ষা করুন। আমীন!

এটা ঠিক যে, শিশুদেরকে পড়ানো খুবই কঠিন কাজ। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ নয় এবং কখনও কখনও প্রহারের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েই যায়। তো এমন পরিস্থিতিতে অন্য কোনো চিকিৎসা ফলপ্রসূ না হলে এ ক্ষেত্রেও রাগান্বিত অবস্থায় মারবে না। এ সময় চুপ থাকেন। যখন ক্রোধ দূর হয়ে যাবে তখন ভেবে চিন্তে শাস্তি দিবে। এতে শাস্তির মাত্রা ঠিক থাকবে। যে পরিমাণ প্রয়োজন সে পরিমাণ শাস্তিই দেওয়া হবে। সীমালঙ্ঘন হবে না।

কিন্তু যদি রাগান্বিত অবস্থায় মারতে আরম্ভ করেন তাহলে এক থাপ্পড়ের জায়গায় দশ থাপ্পড় দিয়ে ফেলবেন। এর কারণে একে তো গুনাহ হল। কেননা, প্রয়োজনের অধিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত এতে শিশুর ক্ষতি হবে। কেননা সকল বিষয়ই মাত্রা অতিক্রম করলে ক্ষতিকর হয়ে যায়। তৃতীয়ত এর জন্য পরে অনুতাপ করতে হবে।

এজন্য ক্রোধের অবস্থায় শাস্তি দিবেন না। ক্রোধ ঠান্ডা হওয়ার পর শাস্তি দিবে।

আল্লাহ আমাদের দরদী শিক্ষক হওয়ার তাওফীক দান করুন আমীন!


11

শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে শিক্ষকের করণীয়

ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আনয়ন, পাঠদান আকর্ষণীয় করণ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়ির কাজ আদায় এবং ভালো মানুষ হওয়ার জন্য তাদের কি কি গুণাবলী থাকা উচিত এ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা কর হয়েছে

১. শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করেই কুশল বিনিময় করতে হবে। তারপর ক্লাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রয়োজনে ক্লাস ক্যাপ্টেনের সাহায্য নিতে পারেন।

২. শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগ আনার জন্য শিক্ষক বিশেষ কোনো মজার ঘটনা/সহজ পড়া (পাঠ্য থেকে) বলে বা লিখে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন। ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থী অমনোযোগী থাকলে শিক্ষক সতর্ক করে দেবেন। বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অভয় দেবেন যাতে তারা সহজে প্রশ্ন করতে শেখে।

৩. বিগত ক্লাসের পাঠ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামান্য আলোচনা করতে পারেন। ক্লাস ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে বাড়ির কাজের কপি সংগ্রহ করবেন (যদি কাজ দেওয়া থাকে)। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পড়া আদায় করবেন। পড়া আদায় লিখিতভাবে অথবা মৌখিকভাবে হতে পারে। তবে লিখিত হলেই ভালো। প্রয়োজন হলে ডায়েরি মার্ক করবেন। বাড়ির কাজ থাকলে ক্লাস ক্যাপ্টেনের সহায়তায় বাড়ির কাজ সংগ্রহ করতে হবে। প্রথমেই দুর্বল শিক্ষার্থীদের পড়া ধরা উচিত। দুর্বলদের মধ্যে যারা ঠিকমতো পড়া দিতে পারবে না তাদের আগের দিনের পড়া ক্লাসেই শিখতে দিতে হবে। এরপর অন্যদের পড়া ধরতে হবে।

৪. দিনের পাঠের শিরোনাম উপস্থাপন এবং বিশ্লেষণ করতে হবে।

৫. দিনের পাঠের বিষয়বস্তু বিস্তারিত আলোচনা করা।

৬. দিনের পাঠের কোন অংশটি শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেনি তা খুঁজে বের করা।

৭. না বোঝা বিষয়টুকু আরও পরিচ্ছন্ন ও পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।

৮. পরবর্তী দিনের জন্য শিক্ষার্থীদের যে বাড়ির কাজ দেওয়া হবে সেই পাঠ বা পড়ার ওপর শিক্ষক আলোচনা করবেন।

৯. প্রতিটি অনুশীলনী/ অধ্যায়/ বিষয়ভিত্তিক অংশ পড়ানো শেষে ওই অনুশীলনী/ অধ্যায়/ বিষয় থেকে কি কি সম্ভাব্য প্রশ্ন থাকতে পারে (অনুশীলনীগুলো বাদে) তা শিক্ষার্থীদের প্রদান করা। প্রদত্ত প্রশ্নগুলো তৈরি করার জন্য সাধারণ আলোচনা করা।

১০. পরবর্তী দিনের জন্য বাড়ির কাজ ও পড়া শেখার উৎসাহ দান করে শ্রেণীকক্ষ থেকে বিদায় নেওয়া।

১১. কোনো বিষয় পাঠদানের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সমস্যার সম্মখীন হলে তা নিজের উপস্থিত বুদ্ধির মাধ্যমে সমাধান করা। সাথে সাথে সমাধান দিতে না পারলে তা পরবর্তী দিনে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তা বলে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয় বোঝানোর সময় একাধিক উদাহরণ দিতে হবে। যাতে তারা পরিষ্কারভাবে ওই বিষয়ের ওপর ধারণা পেতে পারে।

১২. পাঠদানের সময় কোথাও কোনো অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়লে তা অল্প কথায় সমাধান দেওয়া।

১৩. আলোচনার মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের পাঠদানরত বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করতে হবে। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলে জানা যাবে তারা ওই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছে কিনা বা বুঝতে পারছে কিনা।

১৪. শিক্ষকরা ক্লাসের মধ্যেই বোর্ড ব্যবহার করবেন। আরবী, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরা বেশি করে বোর্ড ব্যবহার করবেন। বিজ্ঞান বিষয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিত্র এঁকে বোঝাবেন। প্রয়োজনে প্রাকটিক্যাল ক্লাস করাবেন।

১৫. দুর্বল শিক্ষার্থীদের হেয় করা যাবে না। তারাও যে ভালো করার ক্ষমতা রাখে এ ব্যাপারে তাদের উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

১৬. ডি আই এসএস এর শিশুদের জন্য কম সময়ের মধ্যেও কিভাবে ক্লাসকে অধিকতর ফলপ্রসূ করা যায় সেজন্য শিক্ষকগণের আগে থেকেই পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

১৭. শিক্ষার্থীদেরকে পঠিত বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যাতে তারা নির্ভয়ে না বোঝা বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে।

১৮. যেসব শিক্ষার্থীর বানান বেশি ভুল হয় তাদের কঠিন শব্দগুলো সহজ করে বানান শিখতে দেওয়া যেতে পারে।

১৯. প্রাকটিক্যাল এবং চিত্রাঙ্কনে শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে কাজ দেবেন। আবার কোনো বিষয়ে দলগত প্রতিযোগিতা করতে দেওয়া যেতে পারে এবং দলগত প্রতিযোগিতা করাবেন।

২০. শিক্ষার্থীদের মাঝে মধ্যে বোর্ডে লিখতে দিতে হবে।

২১. যেসব শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা খারাপ তাদের লেখা উন্নত করার জন্য রোল করা খাতায় নিয়মিত লেখা চেক করতে হবে এবং অক্ষর, শব্দ বা বাক্যগুলো কিভাবে লিখলে সুন্দর হতে পারে এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেবেন।

২২. এ ছাড়া ক্লাসে অতিরিক্ত সময় পেলে শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হওয়ার জন্য উপদেশ দিতে হবে।

ভালো মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন:

১.ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে।

২.নিজের আচরণ ও কর্মে যাতে অন্য কেউ মনোকষ্ট না পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৩.কারও আর্থিক বা অন্য কোনো প্রকার ক্ষতি করা যাবে না।

৪.সম্ভব হলে অন্যের উপকার করতে হবে।

৫.মিথ্যা বলবে না, সৎ পথে চলবে।

৬.অন্যায়কে ঘৃণা করবে।

৭.অহঙ্কারি হবে না।

৮.গরিব বা ছোট পেশার মানুষকে অবজ্ঞা করবে না, সম্ভব হলে সহযোগিতা করবে।

আল্লাহ আমাদের আদর্শবান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!

12
আদম(আঃ) তার আয়ু থেকে দাউদ(আঃ) কে সময় উপহার দিয়েছিলেন

আদম (আঃ) তার জীবনের দীর্ঘতম মেয়াদ থেকে ৬০ বছর দাউদ (আঃ) কে উপহার দিয়েছিলেন এবং নিজের মৃত্যুর সময় তিনি এই কথাটি ভুলেও গিয়েছিলেন। আদম (আঃ) এর সামনে যখন আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা মানবজাতির রূহ উপস্থাপন করেছিলেন তখন আদম (আঃ) তাদের মধ্যে অতিউজ্জ্বল দাউদ (আঃ) এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেন যে তার জীবনধারণের জন্য চল্লিশ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। আদম (আঃ) তার নিজের আয়ু থেকে ৬০ বছর দাউদ (আঃ) কে দিয়ে দিতে বলেছিলেন। পরবর্তীতে আদম (আঃ) এর পৃথিবীতে থাকাকালীন সময়ে যখন তার মৃত্যুর সময় এসে গিয়েছিলো আর মালাকুল মাউত তার যান কবজ করার অনুমতি চেয়েছিলেন তখন সে বলেছিলেন যে তার জন্য নির্ধারিত ১০০০ বছর শেষ হতে আরো ষাট বছর বাকি আছে, কারণ তিনি ঐ ঘটনাটি ভূলে গিয়েছিলেন।

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত খুললে দেখা গেল যে, তাতে আদম (আঃ) এবং তাঁর সন্তানরা রয়েছে। আদম (আঃ) বললেনঃ হে আমার পালনকর্তা! এরা কারা? আল্লাহ তা‘আলা বললেনঃ এরা তোমার বংশধর। তাদের সকলের দুই চক্ষুর মধ্যখানে তাদের আয়ুষ্কাল লেখা ছিল। তাদের মাঝে একজন অত্যুজ্জ্বল চেহারার ছিল।” তিনি বললেন, হে আল্লাহ! কে এই লোক? তিনি বলেনঃ সে তোমার সন্তান দাঊদ (আঃ)। আমি তার চল্লিশ বছর বয়স নির্ধারণ করেছি। আদম (আঃ) বললেনঃ হে আল্লাহ! তার আয়ুষ্কাল আপনি আরো বাড়িয়ে দিন। তিনি বললেনঃ আমি তার আয়ুষ্কাল এটাই নির্ধারণ করেছি। আদম (আঃ) বললেনঃ হে প্রভু! আমার আয়ুষ্কাল হতে ষাট বছর আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ তা‘আলা বললেনঃ এটা তার প্রতি তোমার বদান্যতা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যত দিন চাইলেন তিনি জান্নাতে থাকলেন, তারপর তাঁকে সেখান হতে (পৃথিবীতে) নামানো হল। আদম (‘আঃ) নিজের বয়সের গণনা করতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আদম (‘আঃ)-এর নিকট মালাকুল মাউত (মুত্যুদূত) এসে হাযির হলে তিনি তাকে বললেনঃ আমার জন্য ধার্যকৃত বয়স তো হাজার বছর, যথাসময়ের আগেই তুমি এসেছ। মৃত্যুদূত বললেন, হ্যাঁ, তবে আপনি আপনার বয়স হতে ষাট বছর আপনার বংশধর দাঊদ (‘আঃ)-কে দান করেছেন। আদম (‘আঃ) তা (ভুলে গিয়ে) অস্বীকার করলেন। এজন্য তার সন্তানরাও অস্বীকার করে থাকে। আর তিনি ভুলে গিয়েছিলেন তার তার সন্তানরাও ভুলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সেদিন হতেই লিখে রাখা ও সাক্ষী রাখার হুকুম দেয়া হয়। {জামে’ আত-তিরমিজি, বই ৪৪, হাদিস ৩৩৬৮}

আদম আঃ শুক্রবারে পৃথিবীতে অবতরণ করেছিল

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমু‘আর দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম(‘আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে দাখিল করা হয়েছে এবং এ দিন তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়।” {সহীহ মুসলিম, বই ৭, হাদীস ২৭/১৮৬১}

পৃথিবীতে আদম (আঃ) এর জীবনযাপন

আদম (আঃ) জানতেন, তিনি জান্নাতের শান্তি ত্যাগ করেছেন। পৃথিবীতে টিকে থাকতে তাকে অনেক  সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পৃথিবীতে চাষাবাদ, নির্মাণ এবং জনবসতি গড়ে তুলতে হয়েছিল তাকে। কাপড় দিয়ে নিজের ইজ্জতের রক্ষা এবং অস্ত্র দিয়ে নিজের জীবন রক্ষার পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের বন্য হিংস্র জীবজন্তু থেকেও রক্ষা করতে হয়েছিল তাকে।

সর্বোপরি, তাকে নিজের নাফ্সের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। যেই শয়তান, যে কিনা তাঁর জান্নাত হতে বিতাড়িত করেছিল, সেই শয়তানই প্রতিনিয়ত তাকে এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানদেরকে চিরন্তন জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। ভালো এবং মন্দের লড়াই অব্যাহতই রইলো, তবে যারা আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের আসলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই। কিন্তু যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে এবং ইবলিসকে অনুসরণ করে তারাও তারই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে।


13
আদম (আঃ) এবং মুসা (আঃ) এর মধ্যকার বাকবিতণ্ডা – হাদীস


একবার আল্লাহ (সুবহানু ওয়াতালা) মূসা (আঃ) কে আদম (আঃ) এর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন যেখানে তিনি আদম(আঃ) সাথে তর্ক করে বলেছিলেন যে, তার সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার কারণেই আমরা(গোটা মানবজাতি) সকলে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। কিন্তু আদম (আঃ) সুন্দরভাবে পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আসলে আদমের সৃষ্টিরও অনেক আগে থেকেই এই ব্যাপারটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। আদম (আঃ) এর এই যুক্তির কাছে মূসা (আঃ) পরাস্ত হয়েছিলেন। এখনও আমাদের অনেকের মনেও এই একই প্রশ্ন থেকে গিয়েছে আর এইখানেই এর উত্তর রয়েছে: আদম (আঃ) আসলে তার পাপের জন্য আল্লাহ তা’আলাকে দোষ দেননি। বরং তিনি তার যুক্তিতে এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি সহ সমগ্র মানবজাতির পৃথিবীতে আসার ব্যাপারটা পূর্বনির্ধারিত ছিল। সুতরাং এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব ও বসবাস আদম (আঃ) এর পাপের কারণে নয় বরং তা সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত ছিল।

আবু হুরায়রা হইতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, আদম (আঃ) ও মূসা (আঃ) তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। তখন মূসা (আঃ) তাঁকে বলছিলেন, আপনি সেই আদম যে আপনার ভুল আপনাকে বেহেশত হতে বের করে দিয়েছিল। আদম (আঃ) তাঁকে বললেন, আপনি কি সেই মূসা যে, আপনাকে আল্লাহ্‌ তাঁর রিসালাত দান এবং বাক্যালাপ দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। অতঃপরও আপনি আমাকে এমন বিষয়ে দোষী করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই আমার জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’বার বলেছেন, এ বিতর্কে আদম (আঃ) মূসা (আঃ)–এর ওপর বিজয়ী হন। {সহীহ বুখারী বই ৬০, হাদিস ৮২/ ৩৪০৯}

এখানে একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণীয় বিষয় হলো:

যখন মূসা (আঃ) এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের পরিণতি হিসাবে আদম (আঃ) কে দোষারোপ করেছিলেন, আদম (আঃ) যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, এই ব্যাপারটি পূর্বনির্ধারিত ছিল।

কিন্তু, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন আদম (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তিনি সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছেন, তখন তিনি তার নিজের দোষ স্বীকার করে অনুশোচনার সাথে তওবা করেছিলেন।

আসলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি নিজেই সেই ভুলটি করেছেন এবং তার দ্বায়ভার নিজের উপরেই নিয়েছিলেন। সুতরাং, পুনঃ নির্ধারণ ও নিজের পাপের জন্য দায়ভার গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ (সুবহানু ওয়াতালা) জানেন যে কে ভুল করতে চলেছে তবে তিনি কখনই সেই ব্যক্তিকে ভুল করতে বাধ্য করেন না।


14
কেন আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) অবতরণ করলেন

কিছু লোক এই কথা বিশ্বাস করে যে, মানবজাতি জান্নাতেই বসবাস করতো, আদম (আঃ) এর অবাধ্যতার কারণেই আজ আমরা পৃথিবীতে। তা নাহলে আমরা হয়তো চিরকাল জান্নাতেই বসবাস করার সুযোগ পেতাম। এগুলি নিছক কল্প কাহিনী ও ভূল ধারণা, কারণ আদম আঃ সাঃ কে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ ফেরেশতাগণকে বলেছিলেন যে, “আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করতে যাচ্ছি।” তিনি একথা বলেননি যে, “আমি জান্নাতে প্রতিনিধি বানাতে চাই।”

আল্লাহ জানতেন যে, আদম (আঃ) এবং হাওয়া (রাঃ) সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাবে এবং পৃথিবীতে অবতরণ করবে। তিনি একথাও জানতেন যে, শয়তান তাদের সরলতার ফায়দা নেবে। এই সম্পূর্ণ ঘটনাটি আদম (আ), হাওয়া (রা) এবং তার বংশধরদের জন্য (যাদের মধ্যে আমরাও অন্তর্ভুক্ত) একরকমের শিক্ষণীয় ব্যাপার যে কিভাবে শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করে জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেছে। আমরা আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করলেই নিজেদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারব আর জান্নাতে পৌঁছুতে পারবো ইনশা আল্লাহ্। 

আদমের স্বাধীন ইচ্ছা

এমন কথা কি বলা উচিত যে, আদম (আঃ) এর অবাধ্যতা; জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়া এবং পৃথিবীতে অবতরণ করা, এই পুরো ব্যাপারটাই পূর্ব-পরিকল্পিত?

আল্লাহ কোনো কিছুকেই জোর করে বাধ্য করে ঘটায়নি। তিনি মানব জাতিকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।  আদম (আঃ) এরও পূর্ণ ইচ্ছাশক্তি ছিল বিধায় সে নিজের অবাধ্যতার দায়ভার নিজেই স্বীকার করেছিলেন।

তাই আদম (আঃ) অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করেছিলেন যা আল্লাহ সুবহানু ওয়াতালা কবুল করেছিলেন। আদম (আঃ) এর এই ঘটনাটি কুরআনে বহুবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যেন আমরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহন করতে পারি যে, শয়তান কীভাবে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে আর আমরা কিভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারি এবং আমাদের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি।

15
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর অবাধ্যতা আমাদের কেবল ক্ষতিই করবে

আদম (আঃ) কে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, শয়তান হচ্ছে তার একমাত্র শত্রু। কিন্তু সে এই কথা ভুলে গিয়েছিল, তাই শয়তান তাকে সহজেই ধোঁকা দিয়ে মহান আল্লাহর অবাধ্যতা করাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে, পরবর্তীতে তওবা করার জন্য তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়; এবং আল্লাহ তা’আলা পুনরায় তাকে পথনির্দেশনা দেন।

আদম (আঃ) ও তার স্ত্রীকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়। তাকে অবহিত করা হয় যে, তার বংশধরের কেউ যদি আল্লাহর নির্দেশনা গ্রহণ ও মান্য করে; তবে সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। কিন্তু যে অবজ্ঞা করবে, তাকে অসুখী জীবন পার করতে হবে এবং কেয়ামতের দিন তাকে অন্ধ করে পুনরুত্থান করা হবে কারণ দুনিয়াতে আল্লাহর আয়াতসমূহ এর ব্যাপারে তারাও অন্ধ বা বেখেয়াল ছিল।

আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি। যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ তোমরা আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সেজদা করল। সে অমান্য করল। অতঃপর আমি বললামঃ হে আদম, এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু, সুতরাং সে যেন বের করে না দেয় তোমাদের জান্নাত থেকে। তাহলে তোমরা কষ্টে পতিত হবে। তোমাকে এই দেয়া হল যে, তুমি এতে ক্ষুধার্ত হবে না এবং বস্ত্রহীণ হবে না। এবং তোমার পিপাসাও হবে না এবং রৌদ্রেও কষ্ট পাবে না। অতঃপর শয়তান তাকে কুমন্ত্রনা দিল, বললঃ হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দিব অনন্তকাল জীবিত থাকার বৃক্ষের কথা এবং অবিনশ্বর রাজত্বের কথা? অতঃপর তারা উভয়েই এর ফল ভক্ষণ করল, তখন তাদের সামনে তাদের লজ্জাস্থান খুলে গেল এবং তারা জান্নাতের বৃক্ষ-পত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে শুরু করল। আদম তার পালনকর্তার অবাধ্যতা করল, ফলে সে পথ ভ্রষ্ঠ হয়ে গেল। এরপর তার পালনকর্তা তাকে মনোনীত করলেন, তার প্রতি মনোযোগী হলেন এবং তাকে সুপথে আনয়ন করলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা উভয়েই এখান থেকে এক সঙ্গে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু।

এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ঠ হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেনঃ এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব। এমনিভাবে আমি তাকে প্রতিফল দেব, যে সীমালঙ্ঘন করে এবং পালনকর্তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন না করে। তার পরকালের শাস্তি কঠোরতর এবং অনেক স্থায়ী। {সূরা ত্বোহা: আয়াত ১১৫-১২৭}


Pages: [1] 2 3 ... 7