Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Messages - 710001113

Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 23
31
ZAHID RIFAT
মানবজীবনের একটি অংশই হচ্ছে সংখ্যা। কিন্তু সেই সংখ্যার উৎপত্তি নিয়ে আছে বেশ রহস্য। অনেকের মতে, প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকে গণনা শুরু হয়েছে। তবে আজ আমরা সংখ্যার উৎপত্তি নিয়ে বলবো না। বরং অন্য কিছু মজাদার বিষয় নিয়েই আলাপ হবে, যা হয়তো এতদিন আমাদের সামনেই ছিলো, কিন্তু আমরা সেসব নিয়ে সেভাবে চিন্তাই করিনি!

Advertisement


 

অনেকের মতে সংখ্যার উৎপত্তি সুমেরীয় আমলে; Image Source: Thought co
ইলেভেন এবং টুয়েলভ
ইংরেজী ভাষায় সংখ্যা গণনার সময় টেনের পর আমরা ইলেভেন ও টুয়েলভ উচ্চারণ করে থাকি। অথচ তার পরবর্তীতে স্বাভাবিক নিয়মে আমরা থার্টিন কিংবা ফোর্টিন এভাবে ক্রমাগত সামনে এগোতে থাকি। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন আমরা ওয়ানটিন বা টুটিন বলি না?

মূলত ইংরেজী সংখ্যার গণনা হলেও শুধুমাত্র ইলেভেন ও টুয়েলভ নামকরণের পেছনে জড়িত আছে জার্মান ভাষা। জার্মান ভাষায় ‘এইনলিফ’ শব্দটির মানে হচ্ছে একটি বাকি। তেমনই ‘টুয়ালিফ’ মানে হচ্ছে দুটি বাকি। এই দুটি শব্দ পরবর্তীতে বিবর্তনের মাধ্যমে ইলেভেন ও টুয়েলভ হয়ে গেছে। তবে এর পরের সংখ্যাগুলোর ক্ষেত্রে 'লিফ' অংশটি উঠে গিয়ে ‘টিন’ ব্যবহার শুরু হয়। যেখানে টিন শব্দটির মানে হচ্ছে দশের বেশি। আর তাই থার্টিনের পর থেকে ইলেভেন ও টুয়েলভের মতো না উচ্চারিত হয়ে সংখ্যাগুলো তাদের প্রাচীনত্ব হারায়।


১১ ও ১২ বাকীদের মতো উচ্চারিত না হয়ে একটু আলাদা; Image Source: Mental Floss
৯১১ কেন ইমার্জেন্সি কল ?
একেবারে শুরুর দিকের ফোন সিস্টেমগুলো কোনো নাম্বার ব্যবহার করতো না। অপারেটররা ম্যানুয়ালি কলগুলোর সাথে সংযোগ প্রদান করতো। তাই সেই সময় নির্দিষ্ট কোনো ইমার্জেন্সি কলও ছিলো না।

পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে যখন ফোন নাম্বারের প্রচলন হলো, তখন এ ব্যাপারে বেশ ঝামেলার সৃষ্টি হলো। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র কমিশন ইমার্জেন্সি কলের ক্ষেত্রে একটি সমাধান দাবি করে। AT&T ছিলো তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় টেলিকম অপারেটর। তারা বেছে নিলো ৯১১ নাম্বারটি। এই সংখ্যাটি বেছে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিলো তৎকালীন আমলের ঘূর্ণায়মান ফোন। ইমারজেন্সি কল মানেই যত দ্রুত ডায়াল তত সুবিধা। সেক্ষেত্রে রোটারি ফোনগুলোতে ৯১১ ডায়াল করতে লাগতো সবচেয়ে কম সময়। তাই এই সংখ্যাটিই বেছে নেয় টেলিকম অপারেটররা। ৯১১ ইমার্জেন্সি কল এখনো যুক্তরাষ্ট্রে বহাল তবিয়তে টিকে আছে।


৯১১ ইমারজেন্সি নাম্বার হিসেবে এখনো টিকে আছে; Image Source: Getty Image
চার সংখ্যার পিন নাম্বার
১৯৬৭ সালে স্কটিশ আবিষ্কারক জন শেপার্ড ব্যারন একদিন ভাবলেন, একটি চকলেট বার পাওয়ার মতো ক্যাশ টাকা পাওয়াটা সহজলভ্য হওয়া উচিৎ। ব্যাংকের ঝক্কি ঝামেলা কমানোর উপায় খুঁজতে গিয়েই তার মাথায় প্রথম ক্যাশ মেশিন বা এটিএম বুথের চিন্তা মাথায় আসে। তার এই চিন্তাধারাকে কাজে লাগিয়ে লন্ডনের বার্কলেস ব্যাংক সর্বপ্রথম এটিএম ব্যাংক প্রথা চালু করে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় শনাক্তকরণ।

Advertisement


 
এই সমস্যা দূরীকরণে এগিয়ে আসেন শেপার্ড ব্যারন। তিনি একটি বিশেষ পেপার চেক প্রথা চালু করেন, যা ছিলো অনেকটা আজকের ডেবিট কার্ডের মতো। প্রতিটি পেপার চেকে আলাদা ব্যক্তিগত শনাক্তকরণ নাম্বার থাকতো, যা পরবর্তীতে পিন নাম্বার হিসেবে পরিচিত লাভ করে। শুধুমাত্র একাউন্টের মালিকই কেবল জানতে পারবে সেই পিন নাম্বার। প্রথমে শেপার্ড চেয়েছিলেন ছয় সংখ্যার পিন নাম্বার তৈরি করতে। কিন্তু এতে বাধ সাধেন তার স্ত্রী। তার মতে, ছয় সংখ্যার নাম্বার মনে রাখা অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। তার চেয়ে চার সংখ্যার নাম্বার মনে রাখা সহজ হবে, পাশাপাশি একটি মানও বজায় রাখবে। তাই স্ত্রীর কথা শুনে শেপার্ড চার সংখ্যার পিন নাম্বার সিস্টেম চালু করেন। সেই সিস্টেমটি বিদ্যমান রয়েছে এখনো।


Image Source: Weird.com
ম্যারাথন দৌড়ে কেন ২৬.২ মাইল?
ম্যারাথন দৌড়ের প্রচলন সেই আদি গ্রিক সভ্যতার সময়ে। এর পেছনে রয়েছে একটি সুন্দর ঘটনা। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে পার্সিয়ান ও অ্যাথেনিয়ানদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে যখন পার্সিয়ানরা পরাজয় বরণ করে, তখন সেই সংবাদ উদ্বিগ্ন অ্যাথেনিয়ানদের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দৌড় শুরু করেন ফিডিপাইডস। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় ২৫ মাইল দৌড়িয়ে ম্যারাথন শহরে এসে এই খবর দেন ফিডিপাইডস। তার এই দৌড়ের স্মৃতি রক্ষার্থে এর পর থেকে প্রতি বছর ম্যারাথন দৌড়ের আয়োজন করে হয়। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে সেটি, ২৫ মাইল না হয়ে কেন ২৬.২ মাইল হলো?

আধুনিক অলিম্পিকের জনক পিয়েরে দ্য কুবার্তো ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন দৌড়টি শুরু করেন গ্রিসের সেই বিখ্যাত ম্যারাথন ব্রিজ থেকেই। সেবার দৌড়টির দূরত্ব ছিলো প্রায় ২৫ মাইল। পরবর্তী দুই অলিম্পিকে ম্যারাথনের নির্দিষ্ট কোনো দূরত্ব ছিলো না। ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে এসে দৌড়ের সীমা নির্ধারণ করা হয় উইন্ডসর ক্যাসল থেকে হোয়াইট সিটি স্টেডিয়াম পর্যন্ত, যা ছিলো প্রায় ২৬ মাইল। কিন্তু রাজকীয় পরিবারের ভিউইং বক্সের সামনে দৌড় শেষ করার জন্য স্টেডিয়ামের ভেতরে আরো অতিরিক্ত ৩৮৫ গজ দূরত্ব বাড়ানো হয়। আর তাতেই ম্যারাথন দৌড় হয় ২৬.২ মাইলের। সেবারই অলিম্পিক কমিটি ম্যারাথনের এই দূরত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানায়।

সেই থেকে ২৬.২ মাইল ম্যারাথন দৌড় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।


ম্যারাথন দৌড়; Image Source: Reader's Digest
ফেব্রুয়ারি মাস কেন ২৮ দিনের?
বর্তমানে আমাদের ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার মূলত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার। তবে একেবারে প্রথমদিককার ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে রোমান ক্যালেন্ডার অন্যতম। সেই সময় মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই দশ মাস মিলে তৈরি করা হয়েছিলো রোমান ক্যালেন্ডার, যাতে দিন ছিলো ৩০৪টি। শীতকালীন সময়টা ফসলের জন্য উপযোগী ছিলো না বিধায় প্রথম দুই মাস রোমানরা ক্যালেন্ডার থেকে বাদ দেয়।

Advertisement


 
ঐতিহাসিকদের মতে, রোমের রাজা দ্বিতীয় নুমা পম্পিলাস ক্যালেন্ডারটিকে চন্দ্রচক্রের সাথে সমন্বয় করার জন্য পরিবর্তন করার মনস্থির করলেন। ডিসেম্বরের পরে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি নামে আরো দুটি মাস সংযুক্ত করলেন তিনি। সকল ৩১ দিনের মাস থেকে একদিন কেটে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির জন্য তিনি ৫৬ দিন বরাদ্দ করলেন। তাতে করে ৩৫৪ দিনের চন্দ্র বছর ক্যালেন্ডারের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

কিন্তু এতে বাধ সাধে রোমানদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন। সেই সময় জোড় সংখ্যাকে খারাপ ভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই জানুয়ারিকে একদিন বাড়িয়ে ২৯ দিন করে ক্যালেন্ডারে মোট দিনের সংখ্যাও বিজোড় করে দেন নুমা। কিন্তু একই কাজ ফেব্রুয়ারির সাথে করলে মোট দিন সংখ্যা ৩৫৬ হয়ে আবার জোড় হয়ে যেতো।

তাই নুমা ২৮ দিনের ফেব্রুয়ারি মাস বহাল রেখে দেন। পরবর্তীতে এই মাসকেই দুর্ভাগা মনে করে রোমানরা তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন শেষকৃত্যানুষ্ঠান পালনের জন্য বেছে নিতো ফেব্রুয়ারিকে। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি শব্দটি সাবাইন গোত্র থেকে আগত। এর অর্থ বিশুদ্ধকরণ।


প্রাচীন ক্যালেন্ডার; Image Source: Pinterest
ফিচার ইমেজ: Independent

32
Mozammel Hossain Toha
বিশাল এ পৃথিবীতে দর্শনীয় স্থানের কোনো শেষ নেই। তার উপর প্রতি বছরই পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্থাপনা, জাদুঘর, পার্ক ইত্যাদি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি এরকমই ১০০টি স্থানের একটি তালিকা তৈরি করেছে টাইম ম্যাগাজিন। তাদের প্রতিবেদকদের পাঠানো প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে ৪৮টি দেশের ১০০টি স্থানের এ তালিকাটিকে তারা বলছে World's Greatest Places 2018। চলুন জেনে নিই এই তালিকার সেরা ১৫টি স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

Advertisement
তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি, চীন

চীনের তিয়ানজিনে অবস্থিত এই পাবলিক লাইব্রেরিটি দেখলে মনে হবে যেন একেবারে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগত থেকে উঠিয়ে এনে বসানো হয়েছে একে। পাঁচতলা উঁচু এই লাইব্রেরিটিতে স্তরে স্তরে সাজানো আছে প্রায় ১৩.৫ লাখ বই। প্রায় ৩৩ হাজার ৭০০ বর্গমিটার ভূমির উপর স্থাপিত লাইব্রেরিটিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার দর্শনার্থী ভীড় করে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে চালু হওয়া লাইব্রেরিটিতে এখন পর্যন্ত দেশ-বিদেশের ১৮ লক্ষ মানুষ ভ্রমণ করেছে।
Image Source: Time
সাইক্লিং থ্রু ওয়াটার, বেলজিয়াম

এটি বেলজিয়ামের ডি উইজার্স নেচার রিজার্ভে অবস্থিত একটি পুকুরের মধ্য দিয়ে তৈরি সাইকেল চালানোর উপযোগী রাস্তা। ২১২ মিটার দীর্ঘ কংক্রিটের এ সেতুটি পানির মধ্যে এমনভাবে নিমজ্জিত অবস্থায় নির্মাণ করা হয়েছে যে, সাইকেল আরোহীদের কাছে মনে হবে তারা বুঝি পানির মধ্য দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে। ২০১৬ সালে চালু হওয়া এ পথটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ সাইকেল আরোহীকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
Image Source: Luc Daelemans
মর্গান'স ইন্সপাইরেশন আইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

শারীরিক প্রতিবন্ধী কন্যা মর্গানের বিনোদনের জন্য তার বাবা গর্ডন হার্টম্যান ২০১০ সালে তৈরি করেন মর্গান'স ওয়ান্ডারল্যান্ড নামে একটি থিমপার্ক। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তার পাশেই নির্মাণ করেন একটি ওয়াটার পার্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত এই পার্কটি সব ধরনের মানুষের জন্য উন্মুক্ত হলেও এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে সব ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
Image Source: Morgan's Wonderland
গোল্ডেন ব্রিজ, ভিয়েতনাম

ভিয়েতনামের 'বা না' পাহাড়ের উপর অবস্থিত বিশালাকার দুটি হাত দেখলে মনে হতে পারে সেগুলো কোনো প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো এ বছরের মে মাসে নির্মিত গোল্ডেন ব্রিজের দুটি সাপোর্ট বা খুঁটি। ১৫০ মিটার দীর্ঘ ব্রিজটি একটি ক্যাবল কার স্টেশনকে নিকটস্থ একটি বাগানের সাথে সংযুক্ত করেছে। স্টেইনলেস স্টিলের রেলিং এবং কাঠের পাটাতনের ব্রিজটির সাথে ওয়্যার মেশ এবং ফাইবার গ্লাসের তৈরি বিশালাকৃতির হাত দুটো মূলত নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য।
Image Source: The Spaces
টিপেট রাইজ আর্ট সেন্টার, যুক্তরাষ্ট্র

প্রকৃতি, শিল্প এবং সঙ্গীতের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায় ১১ হাজার ৫০০ একরের বিশাল ভূমির উপর নির্মিত হয়েছে টিপেট রাইজ আর্ট সেন্টার। ২০১৬ সালে চালু হওয়া আর্ট সেন্টারটিতে চিত্র প্রদর্শনীর হল এবং কনসার্ট হল ছাড়াও বাইরের উন্মুক্ত স্থান জুড়ে আছে বিশাল আকৃতির কিছু ভাস্কর্য।

Advertisement
Image Source: TripAdvisor
প্যানডোরা: দ্য ওয়ার্ল্ড অব অ্যাভাটার, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড রিসোর্টের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজনি অ্যানিমেল ল্যাণ্ড থিমপার্ক। আর এই ডিজনি অ্যানিমেল ল্যান্ডেরই সর্ব সাম্প্রতিক সংযোজন প্যানডোরা। জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাটার চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত ১২ একর আয়তনের এই থিমপার্কে আছে ভাসমান পর্বত, ভিনগ্রহের কৃত্রিম প্রাণী, আলোকোজ্জ্বল গাছপালা ইত্যাদি। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির মাধ্যমে এলিয়েন গ্রহের উপর দিয়ে উড়ে বেড়ানোর সুযোগ এর অন্যতম আকর্ষণ।
Image Source: WDWMagic
এব ফিলহারমনিক হল, জার্মানি

জার্মানীর হামবুর্গে এব নদীর মাঝে গ্রাসব্রুক দ্বীপের উপর অবস্থিত এই কনসার্ট হলটির প্রচলিত নাম এলফি। ইটের তৈরি পুরনো একটি ওয়্যারহাউজের উপরে অবস্থিত কনসার্ট হলটি কাঁচের তৈরি। দেখতে অনেকটা পাল তোলা নৌকার মতো হলটি শুধুমাত্র এর নান্দনিকতাই না, একইসাথে অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের জন্যও বিখ্যাত।
Image Source: Scandic Hotels
মিউজিয়াম মাকান, ইন্দোনেশিয়া

এর পুরো নাম দ্য মিউজিয়াম অব মডার্ন অ্যান্ড কন্টেম্পোরারি আর্ট নসান্ত্রা। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার নসান্ত্রায় প্রায় ৪ হাজার বর্গমিটার ভূমির উপর নির্মিত এই জাদুঘরটি চোখ ধাঁধানো সব চিত্র ও শিল্পকর্মের অপূর্ব সংগ্রহশালা। সব বয়সী দর্শকদের জন্য উপযোগী এ জাদুঘরটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে।
Image Source: dezeen.com
সিউলো ২০১৭ স্কাইগার্ডেন, দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হাইওয়ে ওভারপাসের উপর নির্মিত হয়েছে সিউলো স্কাইগার্ডেন নামের এই এলিভেটেড পার্কটি। প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পায়ে চলার উপযোগী পথটিতে বিভিন্ন ক্যাফে, ফুটবাথ ছাড়াও আছে প্রায় ২৪ হাজার গাছপালার এক সরলরৈখিক বাগান। ২০১৭ সালের মে মাসে চালু হওয়া স্কাইগার্ডেনটির রাত্রিকালীন দৃশ্য পথচারীদেরকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
Image Source: Time
সেন্ট্রাল আইডাহো ডার্ক স্কাই রিজার্ভ, যুক্তরাষ্ট্র

সারা বিশ্বে মাত্র ১২টি স্থান আছে, যেগুলোকে ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক স্কাই অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ ডার্ক স্কাই রিজার্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্থানগুলোর বায়ুমণ্ডল এতই পরিষ্কার যে, এগুলো থেকে খালি চোখে রাতের আকাশে সবচেয়ে বেশি তারা দেখা সম্ভব। গত বছর এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল আইডাহোর ২ হাজার ২৫০ বর্গকিলোমিটারের একটি এলাকা। এটিই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এবং একমাত্র ডার্ক স্কাই রিজার্ভ।

Advertisement
Image Source: idahodarksky.org
থ্রেড, সেনেগাল

সিনথিয়ান হচ্ছে সেনেগালের দুর্গমতম এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু সেখানে নির্মিত থ্রেড নামের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কল্যাণে শহরটি এখন হয়ে উঠেছে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতিমনা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। স্থানীয় বাঁশ এবং মাটি দ্বারা তৈরি ভবনটি শুধু সংস্কৃতির মিলনমেলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না, এটি একইসাথে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদেরকে এখানে বসবাস করার এবং কাজ করার সুবিধাও দেয়।
Image Source: ArchDaily
জারিয়াদাই পার্ক, রাশিয়া

জারিয়াদাই পার্ক হচ্ছে গত অর্ধ শতকের মধ্যে মস্কোতে নির্মিত প্রথম পাবলিক পার্ক। প্রায় ৭৮ হাজার বর্গমিটার ভূমির উপর নির্মিত পার্কটিতে আছে বিশাল একটি কনসার্ট হল, বরফের গুহা, মস্কো নদীর উপর অবস্থিত বুমেরাং আকৃতির একটি ভাসমান ব্রিজসহ আরো নানা আকর্ষণ। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্কটি ভ্রমণ করেছে।
Image Source: Wikimedia Commons
আন্ডারওয়াটার মিউজিয়াম অব আর্ট, যুক্তরাষ্ট্র

ফ্লোরিডার আন্ডারওয়াটার মিউজিয়াম অব আর্ট হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পানির নিচের জাদুঘর। এ বছর চালু হওয়া মিউজিয়ামটি মূলত সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত বিশালাকৃতির সাতটি শিল্পকর্ম। এদের মধ্যে আছে স্টিলের তৈরি একটি আনারসের কাঠামো, একটি মাথার খুলি, একটি অক্টোপাসসহ আরো চারটি ভিন্ন ভিন্ন ভাস্কর্য। প্রতি বছরই এতে নতুন নতুন শিল্পকর্ম যুক্ত হওয়ার কথা আছে। পানির উপর থেকেও ভাস্কর্যগুলো দেখা যায়, কিন্তু এর আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে দর্শনার্থীদেরকে ডুবুরীর পোশাক পরতে হবে এবং সাঁতার কাটতে জানতে হবে।
Image Souce: Smithsonian Magazine
মারিপোসা গ্রোভ, যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার গ্রোভ হচ্ছে বিরল প্রজাতির সেকুইয়া বৃক্ষের বনাঞ্চল। এই গাছগুলো প্রায় ১০০ মিটার উঁচু হয়ে থাকে এবং ৩ হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। গাছগুলোকে দূষণ থেকে রক্ষার জন্য ২০১৫ সালে ৪০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার মধ্যে আছে রাস্তা এবং পার্কিং এরিয়াকে অনেক দূরে নিয়া যাওয়া, পায়ে চলা পথের পাশে গাছপালা লাগানো, কাঠের তৈরি সেতু ও কৃত্রিম জলপ্রবাহ তৈরি করা ইত্যাদি। এ বছর জুনে বনাঞ্চলটি পুনরায় চালু করা হয়েছে।
Image Source: nps.gov
তাই কুয়ান, হংকং

হংকংয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংস্কার প্রকল্প এটি। ১৫০ বছরের পুরানো ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনামলের সেন্ট্রাল পুলিশ স্টেশন, সেন্ট্রাল ম্যাজিস্ট্রেসি এবং ভিক্টোরিয়া প্রিজনের ১৬টি ভবনকে সংস্কার করে রূপান্তরিত করা হয়েছে তাই কুয়ান শিল্প ও ঐতিহ্য কেন্দ্রে। এতে সময় লেগেছে ৮ বছর এবং খরচ হয়েছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বছরের মে মাস থেকে চালু হওয়া তুই কুয়ান হংকংয়ের অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে।

Advertisement
Image Source: asiatatler.com

ফিচার ইমেজ- Time

33
ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ, অংক করতে বসলেই তার হাত-পা ঘেমে একাকার। নিজের উপর খুব সহজেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে, সে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। শুধু এই লরেন সোয়াজই নয়, দুনিয়া জোড়া শত সহস্র মানুষের একই সমস্যা। অংকের সমাধান করতে বসলেই হাত-পা ঘামা শুরু হয়, মস্তিষ্ক কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে, চরম পরাজয়ের মতো অস্বস্তি বোধ হয়। তবে আপনারও যদি একইরকম হয়ে থাকে, তবে আপনি মোটেও একা নন, গবেষকদের মতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় বিশ শতাংশ এই ধরনের গণিত নিয়ে ভীতিতে ভুগে থাকে। কোনো কোনো মনস্তত্ত্ববিদের মতে, এই গণিত ভীতি একধরনের চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। তবে এই সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি যে গণিতে ভালো করতে পারে না, তা মোটেই সত্য নয়। গণিতকে ভয় পাওয়া সেই ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ পরবর্তীতে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেলে ভূষিত হয়েছিলেন।
গণিতবিদ লরেন সোয়াজ; Image source: alchetron.com

গণিতভীতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন মেরি ফিডেস গফ নামের এক গবেষক। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম তার লেখায় ‘Mathemaphobia’ নামে শব্দটির প্রচলন করেন। গণিতের প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি আর তার প্রতিকারে কী করা যেতে পারে, তা ছিলো এই গবেষকের গবেষণার বিষয়বস্তু। পরবর্তীতে স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শত-সহস্র ছাত্র ছাত্রীর উপরে গণিতের ভয় নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।
'Mathemaphobia' শব্দটির প্রচলন হয় পঞ্চাশের দশকে; Image source: www.tandfonline.com

বর্তমান সময়ের মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের এই গণিত কিংবা সংখ্যার প্রতি বিদ্যমান ভীতি লুকিয়ে আছে তাদের মস্তিষ্কে। যারা গণিতকে ভয় পায়, তাদের অনেকের মনেই এই ধারণা বদ্ধমূল যে তারা গণিতে খারাপ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা কিছুটা উল্টো। তারা গণিত নিয়ে ভয়ে থাকে বলেই তাদের গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা কম। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, মানুষ যখন গণিত সমাধানের ব্যাপারটি নিয়ে শংকিত হয়ে যায়, তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানিতে টান পরে। আর সেই জ্বালানি হলো ক্ষণস্থায়ী এবং দ্রুতগতির স্মৃতিশক্তি ব্যবস্থা, যা ‘ওয়ার্কিং মেমরি’ নামেও পরিচিত। এই স্মৃতিশক্তি ক্ষণস্থায়ী হলেও কোনো কাজের তথ্যগুলো ঠিকঠাক গুছিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই। কঠিন বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ কিংবা সমস্যা সমাধানে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তির ভূমিকা আরো বেশি। গণিত সমাধানের ক্ষেত্রে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির সিংহভাগই ব্যবহার করতে হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, গাণিতিক সমস্যা নিয়ে শুরুতেই যদি কেউ ভীত হয়ে যায়, তাহলে এই ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির অনেকটাই নেতিবাচকতা এবং এর প্রতিক্রিয়া দেওয়ার কাজেই ব্যস্ত হয়ে যায়। গাণিতিক সমস্যাকে মোকাবেলা করার জন্য খুব অল্পই অবশিষ্ট থাকে। ফলে দেখা যায় গণিতভীতিতে ভুক্তভোগীদের অনেকেই মানসিক চাপে সাধারণ যোগ-বিয়োগেও তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষায় এই ধরনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে অনেকের মাঝেই।
প্রাপ্তবয়স্করাও ভোগেন এই ভীতিতে; Image source: www.bbc.com

তবে শিশু কিংবা তরুণদের মধ্যে গণিত নিয়ে ভীতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা প্রাপ্তবয়স্কের অনেকেও এই সমস্যায় জর্জরিত। দোকানে কিংবা বাজারের ফর্দ দেখেও অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যান। তবে ব্যাপারটি শুধুই আমাদের মনেই ভীতির সঞ্চার করে না, অনেক মানুষ গণিত সমাধান করতে রীতিমতো যন্ত্রণা অনুভব করেন।
গণিত কারো কাছে যন্ত্রণাও; Image source: ed.ted.com

গবেষকদের দীর্ঘদিন ধরে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, গণিতের প্রতি ভীতি থাকা ব্যক্তিদের গাণিতিক সমস্যা দিয়ে কোনো পরীক্ষা কিংবা প্রতিযোগিতায় বসিয়ে দিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ‘কর্টিসল’ নামক হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোন আমাদেরকে অধিকমাত্রায় উত্তেজিত করে দেয়। পাশাপাশি এই ধরনের প্রতিযোগিতা কিংবা পরীক্ষা আমাদের মস্তিষ্কের এমন কিছু স্থানকে (পেইন ম্যাট্রিক্স) উত্তেজিত করে, যেগুলো আমরা সাধারণত ব্যথা পেলেই কার্যকর হয়।

তবে এমনটা হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণটা বের করতেও কাঠখড় কম পুড়িয়ে যাচ্ছেন না গবেষকরা। তবে তাদের ধারণা, শিশুদেরকে খুব কম বয়সে যেভাবে গণিতের হাতেখড়ি দেওয়া হয়ে থাকে, সে ব্যাপারটিও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। বেশিরভাগ শিশুর সামনেই তার পরিবার কিংবা শিক্ষক উভয়েই গণিতকে বিভীষিকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এমনকি অনেক কম বয়স থেকেই বেঁধে দেওয়া সময়ে গণিতের সমাধান করতে দেওয়াও ভীতির সঞ্চার করে শিশুদের মধ্যে। বিশেষ করে মেয়েরা গণিত সমাধানে কম দক্ষ, এমন মানসিকতাও বিদ্যমান অনেকের মধ্যেই। তবে ব্যাপারটি মোটেই সত্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, গাণিতিক সমস্যা সমাধান দক্ষতা আমাদের লিঙ্গের সাথে যতটা না জড়িত, তার চেয়ে অনেক বেশি জড়িত আমাদের সংস্কৃতির সাথে। ছোটবেলা থেকেই মেয়ে শিশুদের মধ্যে গণিত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে দিলে পরবর্তী জীবনে তা উৎরে যাওয়া খানিকটা কঠিন। এমনকি গণিতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেল পাওয়া প্রথম নারী গণিতবিদ মরিয়ম মির্জাখানিও স্কুলে পড়ার সময়ে গণিতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ তার শিক্ষকেরা মনে করতো মরিয়মের গণিত সমাধান করার মতো প্রতিভা নেই।
গণিতবিদ মরিয়ম মির্জাখানি; Image source: din.az

তবে গবেষকদের ধারণা, গণিতের প্রতি বিদ্যমান এই ভীতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। মূলত যেকোনো প্রতিযোগিতায় গণিতকে কেন্দ্র করে ভীতি এবং উত্তেজনাকে কাটিয়ে উঠতে একটি কার্যকর উপায় হলো এই ভীতিকে অন্যদিকে ধাবিত করে দেওয়া। এটি করা যেতে পারে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে। এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে উত্তেজিত মুহূর্তেও নিজেকে শিথিল করা যায়। কর্টিসল হরমোনের প্রভাবে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে অনেক সময় আমাদের হাত-পা কাঁপতে থাকে কিংবা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার যে ব্যাপারটি দেখা যায়, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গণিতভীতিকে যেহেতু বর্তমান সময়ে একটি মানসিক সমস্যা হিসেবেও গণ্য করা হয়, সেটিকে দূর করার আরেকটি উপায় হলো গণিতের নিজের ভয়ভীতিকে লিখে ফেলা এবং সেগুলো মূল্যায়ন করা। ‘Expressive writing’ নামক প্রক্রিয়ায় নিজের সমস্যাগুলোর বিবরণ নিজেই খাতায় লিখে ফেলা হয় এবং এর ফলে ক্ষণস্থায়ী কার্যকরী স্মৃতির উপর চাপ অনেকটাই কমে আসে।
Expressive writing নিয়ে লেখা একটি বইয়ের প্রচ্ছদ; Image source: www.barnesandnoble.com

পরবর্তীতে মানসিকভাবে চাপমুক্ত অবস্থায় সেই বিষয়গুলোকে পুনরায় মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কী করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। গণিত সমাধানে কাটিয়ে উঠতেও এই প্রক্রিয়া বেশ কাজে দেয়। এক জরিপে দেখা গেছে, এক দল কলেজ শিক্ষার্থীকে গণিত সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের ভয়ভীতির ব্যাপারে লিখে সেগুলো নিজেকে মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছিলো। কয়েকমাস অন্তর অন্তর তাদের গণিতের ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের গড় নম্বর রেকর্ড করা হয়। এবং যাদের এই কাজ করতে বলা হয়নি, তাদের কয়েকজনেরও এই পরীক্ষা নেওয়া হয়। উভয়ের গড় নম্বর তুলনা করে দেখা গেছে নিজের ভয়ভীতিকে লিখে সেগুলোকে মূল্যায়ন করা দলটি তূলনামূলক এগিয়ে আছে এবং গণিতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবও অনেকাংশে দূরে সরে গেছে।
গনিতভীতি দূর করতে প্রয়োজন গণিতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব; Image source: ed.ted.com

পাশাপাশি গণিতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ভীতি কাটিয়ে উঠতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক যথেষ্ট মাত্রায় সহনক্ষম এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী। খুব ছোট বয়স থেকেই বাচ্চাদেরকে গণিত সমাধানে সময় বেঁধে দিয়ে তাদেরকে গণিতের প্রতি ভীত করে না তোলারও পরামর্শ দেন অনেক মনস্তত্ত্ববিদ। পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে গণিতের প্রতি বিদ্যমান ভয় উল্লেখযোগ্য হারে দূর করা যায়। অনেকটা নতুন ভাষা শেখার মতো করেই প্রকৃতির এই ভাষা শেখার চেষ্টা করলে গণিত মোটেই কঠিন কিছু নয়।

ফিচার ইমেজ- www.bbc.com
Shah Md. Minhajul Abedin

34


বিশ্বকাপ আসরের অনেক ম্যাচের ফলাফল হয়তো দুই দলের শক্তি ও ইতিহাসের বিচারে আগে থেকেই ধারণা করা যায়। স্বাভাবিক ফলাফলের ম্যাচে তাই অসাধারণ কিছু না ঘটলে তা বিশ্বকাপের আর বাকি দশটা ম্যাচের মতো ঢাকা পড়ে যায় স্মৃতির আড়ালে। কিছু ম্যাচে দেখা যায় প্রত্যাশিত কিংবা অপ্রত্যাশিত চমক দেখিয়ে এগিয়ে যায় কোনো দল, প্রতিপক্ষের হয়তো সেখানে আর আশা থাকে না ম্যাচে ফেরার।

এমন পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়ে না অনেকেই। হাল না ছাড়া অদম্য মানসিকতার দরুণ তৈরি হয় পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফেরার বিস্ময়কর আখ্যান। সেই সাথে জন্ম নেয় প্রত্যাবর্তনের কিছু রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও রুদ্ধশ্বাস কিংবদন্তি, যা মানুষের মনে গেঁথে যায় রূপকথার মতো। বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের তেমনি অন্যতম কিছু প্রত্যাবর্তনের নিদর্শন নিয়ে আজকের আয়োজন।
১৯৫৪, পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি

১৯৫০-৫৪ সাল; এই চার বছরে একটি ম্যাচও হারেনি দলটি, ৩০টি ম্যাচের মাঝে জিতেছে ২৬টি ম্যাচই এবং বাকি ৪টি ড্র। বলছিলাম মাইটি ম্যাগিয়ার্স নামে খ্যাত হাঙ্গেরির কিংবদন্তি দলটির কথা। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে দলটি ছিল এককথায় অপ্রতিরোধ্য, এই বিশ্বকাপে নিজেদের মাত্র চার ম্যাচ দলটি গোল করেছে ২৫টি। গোলের পরিসংখ্যানে দলটির শক্তিমত্তা বিচার করতে আপত্তি থাকলে জেনে রাখুন, কোয়ার্টার ফাইনালে তারা বিগত বিশ্বকাপের রানার্স আপ ও শক্তিশালী ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে এবং সেমিফাইনালে চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও পরাজিত করেছিল একই ব্যবধানে।

মাইটি ম্যাগিয়ার্সের বিপক্ষে সুইজারল্যান্ড '৫৪ বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়ে জেতার সামর্থ্য কোনো দলের ছিল কি? ফাইনালে এই দলটির প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি, যাদেরকে ম্যাগিয়ার্সরা ৮-৩ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে এসেছে সেই গ্রুপপর্বেই।

ফাইনালে হাঙ্গেরির প্রতিপক্ষ এমন একটি দল, যাদের অস্তিত্ব চার বছর পূর্বেও ছিল না এবং সবাই মোটামুটি একরকম নিশ্চিত ছিল যে গ্রুপপর্বের মতোই ফাইনালেও পাত্তা পাবে না পশ্চিম জার্মানি। ফুটবল বিশ্বকাপ আসরের চেয়ে নিষ্ঠুর কিছু থাকতে পারে এমনটা হয়তো অনেক ফুটবল ভক্ত বিশ্বাস করবেন না, এই বিশ্বাসের উপলক্ষ অনেকগুলো হতে পারে এবং সেখানে হাঙ্গেরির নির্মম পরিণতি অন্যতম।
জার্মানির বিপক্ষে হাঙ্গেরিয়ান কিংবদন্তি পুসকাস; Image Source: worldsoccer.com

আসরে হাঙ্গেরি তাদের শেষ তিনটি ম্যাচ খেলেছিল তাদের সেরা তারকা পুসকাসকে ছাড়াই, ফাইনালের একাদশে দলে যোগ হয় পুসকাসের নামও। ম্যাচের ৬ মিনিটে পুসকাস ও মাত্র ২ মিনিট পরেই জিবর গোল করলে ২-০ গোলে যখন হাঙ্গেরি এগিয়ে, তখন তেমন একটা অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। অনেকেই তখন ভাবছিল, হয়ত আরেকটি ৮-৩ ফলাফলের ম্যাচের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে।

সব কিছু ভুল প্রমাণিত হতে বেশি সময় অবশ্য লাগেনি, কারণ ম্যাচের ১০ মিনিটে মার্লক গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনার মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যেই হেলমুটের গোলে সমতায় ফেরে জার্মানি। বৃষ্টির কারণে ভেজা মাঠে নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে অনেকটা ব্যর্থ হলেও পশ্চিম জার্মানির রক্ষণে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হাঙ্গেরির আক্রমণভাগ। জার্মান গোলরক্ষক টনির সেভের পর সেভ, নান্দোর হিরাকুটির শট গোলপোস্টে ও কচিসের শটে বল গোলবারে আঘাত করে ফিরে আসলে ভাগ্যও যেন আঘাত হানে হাঙ্গেরির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার অল্প কয়েক মিনিট আগে।

ম্যাচের মাত্র ছয় মিনিট বাকি, একটি ক্রস থেকে আসা বল হাঙ্গেরির বক্সে এসে পড়লে কাছাকাছি থাকা হেলমুট তা গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়াতে সামান্যতম ভুল করেননি। অপ্রত্যাশিত এই জয়ে ফুটবল ইতিহাসে রচিত হয় 'মিরাকল অব বার্ন',  শেষ হয়ে যায় মাইটি ম্যাগিয়ার্সের সোনালি সময় এবং ফুটবল বিশ্বে আবির্ভাব হয় অন্যতম এক পরাশক্তির।
১৯৬৬, পর্তুগাল ৫-৩ উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার বিশ্বকাপে প্রথম বিশ্বকাপ স্মরণীয় হওয়ার কারণ মাত্র দুটি ম্যাচ, যদিও তাদের শুরুটা আহামরি কিছু ছিল না। প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা দল হিসেবে তারা যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ৩-০ গোলে পরাজিত হয়, কেউ অবাক হয়নি। দলটি সকলের মনোযোগ ধীরে ধীরে নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয় দ্বিতীয় ম্যাচে চিলির সাথে ড্র করার পর। গ্রুপপর্বের তৃতীয় ম্যাচে তখনকার দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে পরাজিত করে ইতালিকে পেছনে ফেলে সবাইকে অবাক করে কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তীর্ণ হয় উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার এই রূপকথার মতো যাত্রার পরবর্তী প্রতিপক্ষ ছিল পর্তুগাল, ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের প্রতিপক্ষের মতো তারাও এই প্রথম অংশগ্রহণ করছে।

দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে পূর্বে ফেভারিট তকমাটা ছিল পর্তুগালের, কারণ গ্রুপপর্বের তিনটি ম্যাচেই তারা জয়লাভ করেছে এবং শেষ ম্যাচটিতে তাদের সাথে পরাজিত হয়ে আসর থেকে বিদায় নিয়েছে পেলের ব্রাজিল। ব্রাজিলের বিপক্ষে পর্তুগালের খেলা ছিল সুন্দর ফুটবলের সাথে শারীরিক ফুটবলের বেশ ভালো সংমিশ্রণ। তাছাড়া পর্তুগাল দলে ছিল কালো চিতা খ্যাত ইউসেবিও, যিনি ছিলেন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা।
শত চেষ্টা করেও ইউসেবিওকে থামাতে পারেনি কোরিয়ানরা; Image Source: bbc.co.uk

কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ইতালিকে হারিয়ে বাড়তি মনোবলের উত্তর কোরিয়ার শুরুটা যতটা ভালো হওয়ার কথা ছিল, তাদের শুরুটা হয়েছিল তার চেয়েও অনেক বেশি দুর্দান্ত। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই পাক সিউং জিন গোল করলে পর্তুগালকে বিহ্বল করে দেয় দলটি। বিস্ময়ের রেশ কাঁটাতে প্রতিপক্ষকে সম্ভবত এক মুহূর্ত সময় দিতেও রাজি ছিল না কোরিয়ানরা। তাই ম্যাচের ২২ মিনিটে ডং কুক ব্যবধান দ্বিগুণ করলেও থেমে থাকেনি তারা। ৩ মিনিটের ব্যবধানেই কোরিয়ার হয়ে তৃতীয় গোলটি করেন ইয়াং কুক। ম্যাচের মাত্র ২৫ মিনিটে পর্তুগালের বিপক্ষে ৩-০ গোলে লিড নিয়ে উত্তর কোরিয়া থমকে দিয়েছিল গোটা স্টেডিয়াম।

উত্তর কোরিয়ার গোল উৎসব শেষে মঞ্চে আবির্ভূত হন ইউসেবিও, বাকিটা সময় ছিল শুধু ইউসেবিওময় এবং তার কিংবদন্তিতুল্য পারফর্মেন্সের দরুন ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় পর্তুগাল। ২৭ মিনিটে পর্তুগালের হয়ে প্রথম গোলটি করার পর প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই মিনিট আগে পেনাল্টি থেকে দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন এই কিংবদন্তি। দ্বিতীয়ার্ধে কোরিয়ানরা রক্ষণ সামাল দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে গেলেও ইউসেবিও হয়তো পণ করেছিলেন উত্তর কোরিয়ার রূপকথার শেষ থেকেই তিনি শুরু করবেন পর্তুগালের রূপকথার নতুন অধ্যায়ের। শেষপর্যন্ত তিনি করেছিলেনও।
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে অপ্রতিরোধ্য কালো চিতা; Image Source: Youtube.com

অসাধারণ নৈপুণ্যে দ্বিতীয়ার্ধের নয় মিনিটের মাথায় হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন কালো চিতা এবং দলকে ৩-০ থেকে টেনে নিয়ে আসেন ৩-৩ গোলে চোখ ধাঁধানো ফলাফলে। সমতায় ফেরানোর তিন মিনিট পর প্রায় মাঝমাঠ থেকে অপ্রতিরোধ্য ইউসেবিও প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকে পড়লে ফাউলের শিকার হন এবং আদায় করে নেন পেনাল্টি। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে জয়ের পথে এক ধাপ এগিয়ে নেন তিনি এবং তৈরি হয় অবিস্মরণীয় এক ইতিহাসের। এরপর আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি উত্তর কোরিয়া, ম্যাচ শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পূর্বে পর্তুগালের হয়ে পঞ্চম গোলটি করে ৫-৩ গোলে জয় নিশ্চিত করেন হোসে আগুস্তু। ফুটবল বিশ্বকাপের অসাধারণ প্রত্যাবর্তনগুলোর মধ্যে এই ম্যাচটি আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে, কেননা ৩-০ গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পর কোনো দল জিততে পারেনি আজও, যা ইউসেবিওর পর্তুগাল করে দেখিয়েছে অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় আগে।
১৯৭০, পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ইংল্যান্ড

মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড অংশগ্রহণ করেছিল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে, কিন্তু তাদের দুঃস্বপ্নের শেষটা শুরু হয় কোয়ার্টার ফাইনালেই, যখন তারা পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়। ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড দলের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না এই আসরের দলটিও, অনেকে এই দলটিকে চ্যাম্পিয়ন দলটির চেয়েও ভালো মনে করে। ফুটবল বিশ্বকাপ কখনোই চমক দিতে কার্পণ্য করেনি এবং ব্যাপারটা আরও জমে ওঠে যখন প্রতিপক্ষ জার্মানি।

ইংল্যান্ড দল ম্যাচের ৪৯ মিনিটের মধ্যেই অ্যালান ও পিটারের গোলের সুবাদে ২-০ গোলের দুর্দান্ত সূচনা করে। ম্যাচের এই অবস্থা থেকেও যে ববি মুর ও ববি চার্লটনদের ইংল্যান্ড ম্যাচটি হারতে পারে তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। বিশ্বকাপ আসরে ইতিহাস তৈরি করেন কিংবদন্তিরা কিংবা ইতিহাস সৃষ্টি করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন অনেকে। তেমনি জার্মানির হয়ে শুরুতে এগিয়ে আসেন কিংবদন্তি বেকেনবাওয়ার, দ্বিতীয়ার্ধের ৬৮ মিনিটে এই কিংবদন্তির শট ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার বনেত্তিকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ালে শুরু হয় জার্মানির হার না মানা আগ্রাসনের নতুন অধ্যায়।
ম্যাচ হারের বড় দায়টা নিতে হয়েছিল বনেত্তিকে; Image Source: pinterest.com

ইংল্যান্ড কোচ চার্লটনকে ম্যাচের ৬৯ মিনিটে তুলে নিয়ে মিডফিল্ডার কলিন বেলকে মাঠে নামান। মনে করা হয়, ম্যাচটিতে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল কোচদের খেলোয়াড় বদলি করার কৌশল এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই কৌশলগত দিক থেকে এগিয়ে ছিলেন জার্মান কোচ হেলমুট। অন্যদিকে চার্লটনকে তুলে নেওয়ার পর থেকেই ম্যাচে ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের প্রভাব কমতে শুরু করেছিল।

৮২ মিনিটে জার্মানির অধিনায়ক জিলার হেডে সমতাসূচক গোলটি করলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ইংল্যান্ড কোচ রামজে মনে করেন, বেকেনবাওয়ারের শট ও জিলারের হেড আটকানো উচিত ছিল গোলরক্ষক বনেত্তির। যা-ই হোক, অতিরিক্ত সময়ের ১০৮ মিনিটে গার্ড ম্যুলার জয়সূচক গোলটি করলে ইংল্যান্ডের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় এবং বাকি সময়ের তারা আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। এই ম্যাচ শেষে পিটার বনেত্তিকে নিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা করা হয় এবং শেষপর্যন্ত তার মা অনুরোধ করেন এতটা নির্মম না হওয়ার জন্য। অবধারিতভাবে ইংল্যান্ডের হয়ে বনেত্তির এটিই ছিল শেষ ম্যাচ।
১৯৭০, ইতালি ৪-৩ পশ্চিম জার্মানি

'গেম অব দ্য সেঞ্চুরি' খ্যাত ম্যাচটিতে মেক্সিকো '৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য বিখ্যাত ইতালি এবং আক্রমণাত্মক পশ্চিম জার্মানি, যারা ম্যাচের শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত হাল ছাড়ে না। ম্যাচটি নিয়ে আলোচনা করার মতো তেমন কিছু থাকতো না যদি ম্যাচের মাত্র ৮ মিনিটে রবার্তো বনিসেইনার গোলে লিড নিয়ে ইতালি ম্যাচ শেষ করতে পারতো।  ম্যাচের প্রায় শেষ মুহূর্তে, ঠিক ৯০ মিনিটে জার্মানির লেফট ব্যাক কার্ল হেইঞ্জ স্লেইলিনার গোলে সমতায় ফেরে জার্মানি এবং ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে শেষপর্যন্ত জয় পায় ইতালি; Image Source: quotidiano.net

ম্যাচটিকে কেন 'গেম অব দ্য সেঞ্চুরি' বলা হয়ে থাকে সব উত্তর এই অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটে নিহিত রয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে গোল হয়েছে মোট ৫টি এবং এক গোলের ব্যবধানে হলেও এগিয়ে থাকার সুবিধার রদ-বদল হয়েছে তিনবার। কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি মেক্সিকোর বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকলেও শেষপর্যন্ত ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে সেমিতে পা রাখে দেশটি এবং পশ্চিম জার্মানিও ফুটবল বিশ্বকাপের আরেকটি ক্লাসিক ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ নজির স্থাপন করে। অতিরিক্ত সময়ের ৯৪ মিনিটে জার্ড ম্যুলার গোল করলে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি এবং মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানেই তারচিসিওর গোলে সমতায় ফিরে ইতালি।

১০৪ মিনিটে জিজি রিভার গোলে এগিয়ে যাওয়া ইতালিকে আবারও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যখন ১১০ মিনিটে জার্ড ম্যুলার তার দ্বিতীয় গোলটি করেন। ম্যাচটি যদি ৩-৩ গোলের সমতায় শেষ হতো তাহলে ফুটবল বিশ্বকে দেখতে হতো কয়েন টসের মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণের এক হাস্যকর প্রথা, কিন্তু সেজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য ইতালির মাঝমাঠের খেলোয়াড় জিয়ান্নি রিভেরার। ম্যুলারের গোলের মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই ইতালির চতুর্থ ও জয়সূচক গোলটি করেন তিনি এবং শেষপর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস এক ম্যাচে ৪-৩ গোলের জয় পায় ইতালি। তাদের অসাধারণ এই জয়ের আনন্দের সলিল সমাধি ঘটে ফাইনালে, যখন তারা ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪-১ গোলে পরাজিত হয়ে শিরোপা বঞ্চিত হয়েছিল।

ম্যাচটি শেষে জার্মানির স্ট্রাইকার উবে জিলার বলেছিলেন, "ইংল্যান্ড ও ইতালির সাথে আমাদের অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচগুলোর পর যদি ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলতে হতো, তাহলে আমরা ৫ গোলে পরাজিত হতাম।"
২০১৮, বেলজিয়াম ৩-২ জাপান

ফুটবল বিশ্বকাপে ১৯৭০ সালের পর বিগত ৪৮ বছরে এই প্রথম কোনো দল নক আউট পর্বে ২-০ গোলে পিছিয়ে পরার পরও ম্যাচটি জিতেছে এবং অসাধারণ এই কৃতিত্ব চলতি রাশিয়া '১৮ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল বেলজিয়ামের।

গ্রুপপর্বে শক্তিশালী বেলজিয়াম তেমন একটা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়নি। রাউন্ড ষোলোতে বেলজিয়ামের প্রতিপক্ষ যখন জাপান, তখনও কেউ হয়তো ভাবেনি ফুটবল বিশ্ব দেখতে যাচ্ছে অসাধারণ একটি ম্যাচ। ম্যাচের প্রথমার্ধে গোল করতে পারেনি কোনো দলই এবং খেলার চমক শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। বিরতির তিন মিনিট পর হারাগুচির দারুণ শটে কর্ত্যুয়া পরাস্ত হলে লিড নেয় জাপান। প্রথম গোলের মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত গতির শটে এবার গোল করেন জাপানের ইনুই। ম্যাচে তখনও বেলজিয়ামের বলার মতো প্রভাব বা আধিপত্য ছিল না। ২-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও রক্ষণাত্মক ফুটবল না খেলে বরাবরের মতো আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে গিয়েছে জাপান, শেষপর্যন্ত এর মাশুল গুনতে হয়েছে তাদের। ম্যাচে ফিরতে মরিয়া বেলজিয়াম আক্রমণ জোরালো করলে অবশেষে তারা গোলের দেখা পায় ম্যাচের ৬৯ মিনিটে।
চাদলির শেষ সেকেন্ডের গোলে ধরাশায়ী হয় জাপান; Image Source: sportingnews.com

ভার্তোগেনের হেডে করা গোলটি বেলজিয়ামের ডুবতে থাকা তরীতে কিছুটা ভরসা যোগায়। বদলি হিসেবে নামা ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার ফেলাইনি হেড থেকে সমতাসূচক গোলটি করেন প্রথম গোলের পাঁচ মিনিট পরেই। ম্যাচটির ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল মার্তিনেজের দুই বদলি খেলোয়াড়ই। ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হলে যোগ হয় অতিরিক্ত চার মিনিট। যোগ হওয়া চার মিনিটও প্রায় শেষের দিকে, বেলজিয়ামের অর্ধে কর্নার পাওয়া জাপান নিজেদের রক্ষণ পূর্ণ সুরক্ষিত না রেখেই অংশ নিয়েছিল কর্নার কিকে। শেষ মিনিটেরও প্রায় শেষ সেকেন্ডে জাপানের কর্নার থেকে প্রতি-আক্রমণের সুযোগ পায় বেলজিয়াম, দুর্দান্ত এই আক্রমণ থেকে জয়সূচক গোলটি করেন বেলজিয়ামের আরেক বদলি খেলোয়াড় চাদলি। এই গোলেই শেষ হয়ে যায় জাপানের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বপ্ন এবং বেলজিয়াম রচনা করে নতুন এক প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস।

ফিচার ইমেজ- foxsports.com.au

35
By Prakash Nath

অটোগ্রাফ সংগ্রহ করা অনেকের কাছে এক মজার শখ। হয়তো কোনো এক উপলক্ষে কোনো এক বিখ্যাত ব্যক্তির সই নেয়া থেকে যে শখের শুরু, তা কখন যে তীব্র নেশায় পরিণত হয়, ব্যক্তি নিজেও জানেন না! অনেকের জীবনে বইমেলায় স্বাক্ষর সংগ্রহের নানা মজার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখনো এমন অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, যারা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব দেখলেই কাগজ-কলমের খোঁজ করেন। অটোগ্রাফ শিকারের নেশা এমনই। নিমেষে তারা ফিরে যান তারা ছোটবেলার দিনগুলোয়।

কীভাবে অটোগ্রাফ নেওয়ার চল শুরু হলো এই পৃথিবীতে, আর অটোগ্রাফ দেখে কীভাবে চেনা যায় সেই ব্যক্তিকে, তারই আদ্যোপান্ত  জানাবো আজ আপনাদের।
অটোগ্রাফ কী?

‘অটোগ্রাফ’ কথাটির অর্থ ‘নিজের লেখা’। গ্রিক ভাষায় ‘অটোগ্রাফোস’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। সেই অর্থে যেকোনো মানুষের নিজের হাতে কিছু লেখা মানেই তার অটোগ্রাফ। কিন্তু আমরা সাধারণত শব্দটিকে ব্যবহার করি ‘বিখ্যাত ব্যক্তিদের সই’ বোঝাবার জন্য।
কবে থেকে শুরু অটোগ্রাফ নেয়ার প্রচলন?

বলা হয়ে থাকে, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জার্মানিতে অটোগ্রাফ নেয়ার প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে বিখ্যাত ব্যক্তিদের বা বিশেষ করে নিজের বন্ধুবান্ধবদের সই সংগ্রহ করার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। সেই থেকেই অটোগ্রাফ নেয়ার উৎসাহটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানিতে সেই সময় এই সই সংগ্রহের ব্যাপারটা এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, অচিরেই বেরিয়ে যায় একধরনের ছোট, লম্বাটে অ্যালবাম, যা পকেটে রাখা সহজ। এই খাতাগুলোর নাম ছিল ‘অ্যালবা অ্যামিকোরাম’। ব্রিটিশ জাদুঘরে এই অ্যালবামের একটি বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। সেখানে রয়েছে কবি জন মিল্টনের মতো বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের সই।
ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত অ্যালবা অ্যামিকোরাম খাতার নমুনা; Image Source: sarahemilybond.com
বিখ্যাত ব্যক্তিদের বৈচিত্র্যময় অটোগ্রাফ

বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে অটোগ্রাফ দেয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা বৈচিত্র্যময়তা। কেউ শুধু সই দিয়েই ক্ষান্ত হন, আবার কেউ সইয়ের সাথে লিখে দেন নানা উদ্দীপনামূলক বাণী। এই ভারতীয় উপমহাদেশে সইয়ের সাথে কিছু একটা লিখে দেয়ার রীতি ব্যাপকভাবে চালু করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সই দেয়ার সাথে তৎক্ষণাৎ কিছু লেখার এক অসামান্য ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথের ছিল।
ভক্তকে দেয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সই সহ কবিতা; Image Source: SAHITYA JAGAT - WordPress.com

অনেকে আবার লেখার বদলে প্রীতি বা শুভেচ্ছা জানান কিংবা শুধুই নাম সই করে দেন। তবে কেউ কেউ সইয়ের সাথে কিছু একটা লিখে দেন, যার ফলে অটোগ্রাফ অন্য একটা মাত্রা পেয়ে যায়। অনেক সময় অটোগ্রাফের সাথে এমন কিছু লেখা পাওয়া যায়, যা শুধুই উপরি পাওনা হিসেবে থাকে না, তার মধ্যে রীতিমতো ভাবনার খোরাকও পাওয়া যায়। সময়ের সাথে সাথে সে উক্তিটি ইতিহাসে পেয়ে যায় অমরত্ব। বিশ্ব বিখ্যাতদের এসব বিরল সই সারা পৃথিবীর এক বিরল সম্পদ। আর এসব অটোগ্রাফ ব্যক্তিগত সংগ্রহের চেয়ে কোনো জাদুঘরে দেখতে পাওয়া সম্ভাবনায় সবচেয়ে বেশি।
কেন মানুষ অন্যের সই সংগ্রহ করে?

মানুষ অন্যের সই সংগ্রহ করতে কেন চায়, মনস্তাত্ত্বিকরা বিভিন্ন আঙ্গিকে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, বিখ্যাত ব্যক্তিদের কিছুক্ষণের সান্নিধ্য লাভের উৎসাহ, তাদের হাতের লেখা নিজের সংগ্রহে রাখার গৌরব। এসব কারণই স্বাক্ষর সংগ্রহকে একটি দারুণ জনপ্রিয় শখে পরিণত করেছে।
১৮৮৮ সালের এক অটোগ্রাফ খাতা; Image Source: wikimedia commons

অবসর সময়ে খাতার পাতা উল্টে সেই যুগের বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিজের হাতের লেখা দেখতে পাওয়ার শিহরণ এবং এগুলো সংগ্রহ করতে পারার দরুন একটা তৃপ্তি নিশ্চয়ই মানুষকে খুবই আনন্দ দেয়। অন্যান্য অনেক শখেরই মতো, এটিও কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যের প্রভাবে গড়ে ওঠে। বন্ধুর আছে, তাই আমিও একটা অটোগ্রাফের খাতা করবো, এভাবেই হয়তো একটি বিশাল সংকলনের শুরু হয়।
পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত সব অটোগ্রাফ শিকারী

অটোগ্রাফ সংগ্রহের জন্য পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত মানুষের অভাব নেই। কি বিশাল আর বৈচিত্র্যময় তাদের সংগ্রহ, তা না দেখলে কল্পনাই করা যায় না। স্বাক্ষর শিকারী হিসেবে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন ইংল্যান্ডের অ্যালফ্রেড মরিসন। তার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, মরিসনের বাড়িতে শুধু অটোগ্রাফই থাকতো, তার নিজের জন্য ছিল সামান্য একটু জায়গা। তার এত অটোগ্রাফ অ্যালবাম ছিল যে, সেগুলোর আলাদা ক্যাটালগ ছিল। সেই বিশাল ক্যাটালগ থেকে বেশ কয়েকটি অ্যালবাম বেছে নিয়ে নির্বাচিত অটোগ্রাফের কিছু প্রতিলিপি সংস্করণ মরিসন নিজেই প্রকাশ করেন।
অটোগ্রাফের প্রতিলিপি

অটোগ্রাফের ‘ফ্যাকসিমিলি’ বা ‘প্রতিলিপি’ অর্থাৎ, সইটিকে হুবহু কাগজে ছেপে বের করা। এ ধরনের সংকলন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচুর বেরিয়েছে। ইংল্যান্ডের দুই ভদ্রলোক জে. নেদারক্লিফট এবং এফ. জি নেদারক্লিফট এই কাজে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন। এই দুজন ব্যক্তি সম্পর্কে পিতা-পুত্র। ১৮৩৫-৬৫ সাল, এই দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তারা কখনো একক, আবার কখনো যুগ্মভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পাঁচটি বিশাল অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এগুলোতে সেই সময় ও অতীতের তাবৎ বিখ্যাত মানুষের, এমনকি প্রাচীনকালের বহু রাজা-রানীরও সই পর্যন্ত বাদ ছিল না।
অটোগ্রাফের নিলাম

অটোগ্রাফের নিলামও বিদেশের বহু জায়গায় হইচই ফেলে দেয়। এই নিলামে বিক্রি হওয়া অটোগ্রাফ প্রধানত চার রকমের হতে পারে।

C.S. (Cut Signature), D.S. (Document Signed), L.S. (Letter Signed) ও A.L.S (Autograph Letter Signed)।

C.S. (Cut Signature): এই ধরনের অটোগ্রাফ সাধারণত কোনো চিঠি বা খাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া সই।
Cut Signature-এর উদাহরণ; Image Source: The Auction at Graceland

D.S. (Document Signed): মোটামুটি অক্ষত কোনো দলিলে বিখ্যাত ব্যক্তির অটোগ্রাফ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
কোনো দলিলে বিখ্যাত ব্যক্তির অটোগ্রাফ Document Signed নামে পরিচিত ; Image Source: MacLitigator

L.S. (Letter Signed): এ ধরনের অটোগ্রাফ কোনো টাইপ করা চিঠির তলায় সই।
 টাইপ করা চিঠির নচ সই; Image Source: Heritage Auctions 

A.L.S (Autograph Letter Signed): নিজের হাতের লেখা ও সই করা চিঠি।
Letter Signed বলতে হাতে লেখা কোনো চিঠির নীচে কোন বিখ্যাত জনের অটোগ্রাফ; Image Source: Heritage Auctions 

এই হাতে লেখা চিঠির দামই সাধারণত সবচেয়ে বেশি ওঠে। এছাড়াও নিলামে অটোগ্রাফের মূল্য নির্ভর করে আরো বেশ কিছু বিষয়ের ওপর। যেমন, কার অটোগ্রাফ, জনসাধারণের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কেমন, নিলামে ওঠা অটোগ্রাফের পেছনের বড় কোনো খবর বা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল কি না, এসবের ওপর।

১৯৭০ সালে একটি এরকম নিলামে রিচার্ড নিক্সনের হাতে লেখা একটি গোটা চিঠি বিক্রি হয়েছিল ৬,২৫০ ডলারে আর কেনেডির একটি বক্তৃতার আগে হিজিবিজি করে লিখে নেওয়া ছোট্ট নোটের দাম উঠেছিল ৮,০০০ ডলার। এখানে দুই প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার নিরিখে তাদের অটোগ্রাফের দাম নির্ধারিত হয়েছিল।
অটোগ্রাফের মধ্যে লুকিয়ে আছে অটোগ্রাফ দেয়া ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন আলাদা, প্রতিটি সইও তেমন আলাদা। তাই গোয়েন্দাদের কাছে সইও আঙুলের ছাপের মতোই মূল্যবান চিহ্ন। কোনো ব্যক্তির অটোগ্রাফ থেকে সেই ব্যক্তির চরিত্র সম্পর্কে বেশ কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সই ছোট, অল্প হেলানো, দেখতেও সুন্দর। পুরোটাকে আরো সুন্দর করে তুলেছে ‘t’ এর মাথা কাটার উড়ন্ত টান। ‘E’- টাও কম শিল্পিত নয়। পরিচ্ছন্ন এই অটোগ্রাফে একই সঙ্গে চিন্তার শৃঙ্খলা ও শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এই অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানী আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক হবার পাশাপাশি ছিলেন চমৎকার এক বেহালাবাদকও।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সই ; Image Source: Live Science

মহাত্মা গান্ধীর সই এত ছোট যে, বিশ্বের রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত বিরল। সাধারণত নেতাদের সই খুব বড়ই হয়। কিন্তু গান্ধীজির সইয়ের মধ্যে দিয়ে তার চিন্তাধারা প্রকাশ বেশ পরিলক্ষিত হয়। তিনি বিশাল প্রতাপশালী নেতা কখনোই হতে চাননি, অহিংসা আন্দোলনের পথিকৃৎ গান্ধীজির মাটির কাছাকাছি অনাড়ম্বর, নম্র জীবনযাপনের সাথে সইটি বেশ মানিয়ে যায়।
মহাত্মা গান্ধীর সই; Image Source: PatnaBeats

পপ গানের সম্রাট এলভিস প্রিসলির সইয়ে সূক্ষ্ম বা শিল্পিত ব্যাপার যেন একটু কম। কিন্ত ‍একটা সূক্ষ্মতা আরোপের প্রবণতা বেশ দেখা যায়। অক্ষরগুলো খুব নমনীয়, আর পুরো সইটা বেশ বড়। জনপ্রিয়তাকামী ব্যক্তিদের সই সচরাচর বেশ বড়ই হয়। শেষ ‘y’– এর টানে সইটাকে আরো বিশিষ্ট করে তোলার চেষ্টাও সহজে চোখে পড়ে। এলভিসের গানের চরিত্রের সাথে একটা মিল এই সইয়ে আছে।
এলভিস প্রিসলির অ্যালবামের কভাবে পেইজে তার সইয়ের প্রতিলিপি; Image Source: discogs.com

টমাস আলভা এডিসনের সইয়ে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের যথাযথ সহাবস্থান বেশ লক্ষণীয়। সইটা তাড়াহুড়ো না করে অত্যন্ত যত্নে করা। পুরো স্বাক্ষরে দারুণ মনোযোগের ছাপ, অক্ষরগুলোও মাপা। পুরো সইটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর দেওয়া বিশাল টানটি তার জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছাটিকেই ফুটিয়ে তোলে। তার শিল্পীসুলভ মানসিকতার পরিচয় দেয় সইয়ের সামগ্রিক সৌন্দর্যে।
শৃঙ্খলা ও সুষমামন্ডিত টমাস আলভা এডিসনের অসাধারণ সইয়ে; Image Source: Nate D Sanders

বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে এই অটোগ্রাফ রীতিমতো লাভজনক। লেখকরা তাদের বইয়ে, গায়করা অনুষ্ঠানের টিকিটে প্রায়ই অটোগ্রাফ দেন শুধু ভক্তদের খুশি করার জন্য নয়, এর ফলে বিক্রিও বাড়ে। তাই বর্তমানে অটোগ্রাফ এখন আর কারো কোনো নেশা বা শখের উপকরণ হয়ে থাকেনি। এর সাথে জুড়ে গেছে অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। তারপরও পছন্দের কোনো ব্যক্তি বা তারকার অটোগ্রাফ পেতে কে না চাই বলুন!

36
By Mumtahina Mahbub
Like what you read ? Give it a star !

কল্পচিত্র- এক

বিয়ের ব্যাপারে চরম অনাগ্রহী ফারজানা। অফিসে সহকর্মীদের বিবাহিত জীবনের গল্পে তাকে কালেভদ্রে পাওয়া যায়, আর সবসময়ই বিরক্তিসূচক প্রতিক্রিয়া দেন ফারজানা। তবে লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, ফারজানার বিরক্তির সবটা জুড়েই থাকে বর মশাইটি! অর্থাৎ দম্পতির পুরুষ সদস্যের প্রতিই তার যত বিতৃষ্ণা, বিরূপ মনোভাব। সবকিছুতে পুরুষ জাতটাকে শাপ-শাপান্ত না করলে তার শান্তি হয় না।
Advertisement

কল্পচিত্র- দুই

ওদিকে মায়াকে নিয়ে তার পরিবারের মানুষজন ভীষণ বিপাকে পড়ে আছে। মায়ার কথাবার্তা, আচরণে সর্বদা ছেলেদের প্রতি কটাক্ষ স্পষ্ট থাকে! একই কাজে কোনো মেয়ে ভুল করলে মায়ার কাছ থেকে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো ছেলে যদি ঐ কাজে সামান্য ভুল করে বসে, মায়া তাকে কথা শোনাতে ছাড়বেই না! এই আচরণের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না মায়ার ঘরের মানুষেরা। কিন্তু তারা বুঝতে চাচ্ছে, মেয়ের সমস্যাটা ঠিক কোথায়। কেন এমন আচরণ তার ছেলেদের প্রতি?

কল্পচিত্র- তিন

নীরা সদ্য বিবাহিত। পারিবারিকভাবে সম্বন্ধ করেই বিয়ে হয়েছে তার। নীরার বর নীরাকে বুঝে উঠতে পারছে না। কেন কথায় কথায় নীরা তাকে কটাক্ষ করছে, তার কাজকে নিজের কাজের তুলনায় তুচ্ছজ্ঞান করছে, কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না! বেচারা বর হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে নতুন বৌয়ের হাবভাব বুঝতে।

পুরুষজাতির প্রতি নারীর এই বিরূপ মনোভাব, ঘৃণা, তীব্র নেতিবাচকতা, এগুলো কি খুব স্বাভাবিক বিষয়?
পুরুষবিদ্বেষ বা মিস্যান্ড্রি

উপরের কল্পচিত্রগুলোর পেছনে কারণটা অহেতুক ভালো না লাগা নয়। আরেকটু বেশি কিছু। আর সেটা হতে পারে পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ , যা চরম অপছন্দ অথবা ঘৃণার সম পর্যায়ের।

পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ, কেন? Source: YouTube

পুরুষজাতির উপর বিদ্বেষ, ব্যাপারটা ঠিক কী? সেটা জানার আগে মনে করিয়ে দেয়া যাক, বিপরীতে আরেকটা ব্যাপার রয়েছে ‘নারীবিদ্বেষ’ বলে, আর এটা বেশ জানাশোনা একটা ব্যাপার। নারীবিদ্বেষী বা নারীর প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে আলোচনার খাতা যতটা পরিপূর্ণ, উল্টোটা সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে বলতে হয়।

সাইকোলজি টুডের এক প্রতিবেদনে এই ঘৃণার কিছু কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যার মধ্য থেকে কয়েকটি কারণ এখানে তুলে ধরা হলো। ভিনদেশ বা ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে হলেও এই কারণগুলো বেশ জোরদার, যা পুরুষবিদ্বেষের বিষয়টাকে বুঝতে সাহায্য করবে।
ক্রিয়ার ফল প্রতিক্রিয়া

বাস্তবিকভাবে এটা বলা হচ্ছে যে নারীবিদ্বেষ তার বিপরীতে পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ জন্ম দেয়। বিষয়টা অনেকটা নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো। আপনি আপনার কাজের সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া অবশ্যই পাবেন। আর তাই আপনার আচরণে যদি নারীবিদ্বেষ থাকে, তবে সেটা আর কারো মনে আপনার প্রতি বিদ্বেষ জন্মাতে যথেষ্ট। হতে পারে আপনার খুব কাছের একজন নারীও ধীরে ধীরে আপনার প্রতি অতিরিক্ত বিরূপ মনোভাব পুষতে আরম্ভ করেছে এবং সেটা তার মনে অন্যান্য পুরুষের জন্যও ঘৃণার সূত্রপাত ঘটাচ্ছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বড় একটা কারণ, যেকোনো বাজে অনুভূতির পেছনেই এটা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া সবচেয়ে বড় যে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া এটি হতে পারে, ক্রমশ নারীকে গৃহবাসী করে ফেলা, নারীকে মনোরঞ্জনের বস্তু হিসেবে দেখা ও উপস্থাপন করা, নারীর মানবসত্তাকে দীর্ঘদিন পাথরচাপা করে রাখা ইত্যাদি তার মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে, সেগুলো হয়তো একটা সময় তীব্র পুরুষবিদ্বেষে রূপ নেয়।

নারীবিদ্বেষ ও পুরুষবিদ্বেষ, ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া! Source: peppychunk.com
ইতিহাসের পাঠগ্রহণ

আমরা ইতিহাস পড়ি, জানি, একই তথ্য গ্রহণ করি কিন্তু সেটার অন্তর্নিহিত পাঠ? মানুষভেদে সে পাঠ পাল্টায় বটে। কারো কাছে ওসামা বিন লাদেন বীর, কারো কাছে সন্ত্রাসী। হিটলারের বেলায়ও একই কথা খাটে, তাকে অপছন্দ করা বহু মানুষের বিপরীতে পছন্দ করা মানুষও আছে পৃথিবীতে। বিশ্বের যুদ্ধবিগ্রহের যত ইতিহাস, তার বেশিরভাগেই খলচরিত্র পুরুষের। আর এটা খুব বড় একটা কারণ হতে পারে অনেক নারীর মনে পুরুষের প্রতি ঘৃণা জন্মানোর। অথচ, খলনায়কদের ভিড়ে বীরদের সংখ্যাও এখানে অনেক! কিন্তু অনেকেই খারাপটাকে যতটা গভীরভাবে অনুভব করে, মনে রাখে বা নিজের ভেতর ধরে রাখে, ভালোটাকে সেভাবে মনে রাখে না। পুরুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব হবার পেছনে এই আচরণকেও কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে এখানে।
সমসাময়িক অরাজকতা

সমসাময়িক দুর্ঘটনা নির্দিষ্ট সময় নির্দেশ করে দেখানো হয়েছে যে ঘটমান সিংহভাগ হত্যাকাণ্ড, অরাজকতা পুরুষদের দ্বারা সংঘটিত হয়। এফবিআই এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায়ও পুরুষজাতির সরব উপস্থিতি। পুরুষবিদ্বেষের সূত্রপাত ঘটাতে এসব বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু, অনেকটা ক্ষার ও ক্ষারকের চিরচেনা সেই বাক্যের মতো এটাও সত্য যে, সব হত্যাকারী পুরুষ হতে পারে কিন্তু তাতে সব পুরুষ  হত্যাকারী হয়ে যাচ্ছে না!

অরাজকতায় পুরুষের সম্পৃক্ততা বেশি; Source: NPR
ব্যক্তিজীবনের তিক্ততা

যেটা নারীবিদ্বেষী হবার পেছনেও বড় একটা কারণ, ব্যক্তিজীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা, সেটাই পুরুষবিদ্বেষী হবার জন্য বড় কারণ বটে। একজন নারী যদি ব্যক্তিজীবনে পুরুষের দ্বারা বাজেভাবে আক্রান্ত হয়ে থাকে, শারীরিক এবং মানসিকভাবেও, সে পরবর্তীতে পুরুষবিদ্বেষী হতেই পারে। ভালোবাসার মানুষটা, নিকটাত্মীয়, সহকর্মী কিংবা যেকোনো অচেনা পুরুষ, একজন নারী যে কারো দ্বারাই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হতে পারে। এবং তারপর তার কাছে সমগ্র পুরুষ জাতিই মন্দ হয়ে যায়! এখানে বিষয়টা এরকম, দোষ একজনই করছে, কিন্তু তার ফলস্বরূপ ঐ জাতির সবাই নারীর কাছে দোষী হয়ে থাকলো।

ব্যক্তিগত তিক্ততা বাজে অনুভূতির জন্ম দেয়; Source: Dear Georgiana

সাইকোলজি টুডের একটি প্রতিবেদনে একজন নারীবিদ্বেষীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছিলো, তার আলোকে বিপরীতভাবে পুরুষবিদ্বেষীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়েছে আরেকটি প্রতিবেদনে।

পুরুষ অপছন্দ করা একজন নারী প্রাথমিকভাবে কোনো পুরুষের প্রতি মোহনীয় আচরণ করতে পারে। সে চাইতে পারে পুরুষটি তার প্রতি আকৃষ্ট হোক এবং তার অধীনস্থ হয়ে পড়ুক। এবং তারপর ধীরে ধীরে ঐ নারী নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে থাকবে, সে প্রায় সবকিছুতেই তার সঙ্গীকে শাসন করার মনোভাব দেখাবে। সঙ্গীকে অসম্মান করার মতো ভাষাও ব্যবহার করবে যখন ইচ্ছা।

পুরুষকে দেয়া কথা রাখার ব্যাপারে এমন একজন নারী উদাসীন থাকবে। এবং তাতেও সে পুরুষকেই দায়বদ্ধ রাখার চেষ্টা করবে। বিষয়টা হাস্যকর বটে! এমন নারী নিজের পুরুষ সঙ্গীকে দেখা করার জন্য অযথা অপেক্ষা করাবে এবং আগে থেকে ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা বাতিলও করবে, হতে পারে একদম শেষ মুহূর্তে। এইসব আচরণের পেছনে কারণ সেটাই, পুরুষকে অপদস্থ করা। একজন পুরুষবিদ্বেষী নারীর ভেতরে এই জিনিসগুলো থাকা বেশ স্বাভাবিক।

পুরুষকে অপদস্থ করাই যখন উদ্দেশ্য; Source: Human Resources Online
Advertisement

অপ্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিতেও একজন পুরুষবিদ্বেষী নারী নিজেকে কোনো পুরুষের কাছে অরক্ষিত, বিপদগ্রস্ত মনে করবে। এবং সেটা সে প্রকাশ করতেও পারে। কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষকর্মীকে সমতার নজরে দেখাটা তার কাছে স্বাভাবিক হবে না। পুরুষকে মাত্রাতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেয়াটা বরং অতি সাধারণ তার কাছে। প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এরকম একজন নারী নিজের অধীনস্ত পুরুষকর্মীদের অধিক শাসনে রাখতে পছন্দ করবে, তাদের জরুরি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় রাখতে চাইবে না।

পুরুষসঙ্গী যদি তাকে একভাবে দখে, সে তার বিপরীতটা চাইবে। অধিক মনোযোগ দেখালে সে চাইবে সেটা কম হোক, আর পুরুষ কম মনোযোগী হলে সেটাকেই ঢাল বানাবে পুরুষের বিপক্ষে। অর্থাৎ সবকিছুতে পুরুষের বিরুদ্ধাচরণ করাই তার উদ্দেশ্য হবে। পুরুষের বিরোধিতা করাটা ধীরে ধীরে এমন নারীর অভ্যাসে পরিণত হবে এবং এই কাজটি সে উপভোগ করবে।

পুরুষকে অকারণে ‘মেয়েলি’ বলে তাচ্ছিল্য করা, পুরুষের আবেগ দেখানোর স্বভাবকে বিচ্ছিরি বলে অভিহিত করা, একজন পুরুষ ঘরোয়া স্বভাবের হলে তাকে হাসিঠাট্টা করা এসবই পুরুষবিদ্বেষের লক্ষণ। নারীবিদ্বেষীর মতোই পুরুষবিদ্বেষীর সংখ্যাও নিতান্তই কম নয়। খুঁজে দেখলে আশেপাশেই দেখা মিলতে পারে এ স্বভাবের কোনো নারীর, পুরুষরা যার লক্ষ্যে থাকে নিগ্রহ করার বিষয় হিসেবে। এবং বলাই বাহুল্য, বিদ্বেষের এই জিনিসখানা সর্বক্ষেত্রেই খারাপ, হোক তা নারীর প্রতি আর হোক, আর তা পুরুষের প্রতি।

ফিচার ইমেজ: Pinterest

37
By Saiful Alam Saif
Like what you read ? Give it a star !

হোক সকালে বা সন্ধ্যায়, আপনার কাজের জায়গা, হোক সেটি অফিস, ব্যাংক, কোম্পানি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আপনার মাথায় কেবল একটিই চিন্তা, কিভাবে আগে পৌঁছাবেন, কিভাবে কাজটি শেষ করবেন উসাইন বোল্টের ন্যায় দ্রুত গতিতে অথবা কিভাবে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে পড়বেন। কিন্তু কখনো কি চিন্তা করে দেখেছেন দু’একটা ছোটখাটো বিষয়ে আরেকটু কষ্ট করে দৃষ্টি দিলেই হয়ত আরো সহজ, আরো পরিপাটি হতে পারত আপনার দৈনন্দিন জীবন। এমনকি আপনার কাজের স্পৃহাও বেড়ে যেতে পারত আরো অনেকগুণ।

বিশ্বাস করুন, আপনার একটি কর্মদিবসের শুরু এবং শেষের মুহূর্ত দুটিই নির্ধারণ করতে পারে আপনার কাজের জায়গাতে আপনার পরবর্তী দিন, এমনকি পরবর্তী সপ্তাহ কেমন যাবে। একজন উদ্যোক্তা, চাকুরীজীবী কিংবা ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি ঠিক তা-ই। একটি পরিপক্ক রুটিন করে নিজের কাজে মনযোগ দেয়া, রুটিন অনুযায়ী চলা, যদিও একটু দুরূহ কাজ বটে, তবে সেক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনাটাই আসল। অবশ্যই এর মাঝে গতানুগতিকতার ছাপ রাখতে হবে, নতুবা তাল মিলাতে পারবেন না। যেমন ধরুন, খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা, সন্ধ্যার পরেও বাড়তি কাজ করা, নিজেকে একটু সময় দেয়া ইত্যাদি। এই কাজগুলো আপনার প্রতিদিনকার রুটিনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে এবং আপনি একসময় দেখবেন এর বাইরে আপনি কতটুকু সময় কাজ করলেন সেটা আপনার ক্যারিয়ারে তেমন প্রভাব রাখছে না। উপরন্তু আপনার কাজের দক্ষতা এবং কাজের পরিধি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
Advertisement

আপনি চাইলে আপনার দিন, সপ্তাহ অথবা মাস আরো কার্যকরী কিংবা আরো ফলপ্রসূ করতে নিচে উল্লেখ করা বিষয়গুলো চর্চা করতে পারেন।
আপনার কর্মদিবসের প্রথম ১০টি মিনিট যেভাবে কাটানো উচিত
পরিকল্পনা হোক সফলতার

Source: Premium Shutterstock

সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য প্রতিটি দিন শুরু করুন একটি সুন্দর পরিকল্পনার মাধ্যমে। কর্মস্থলে পৌঁছে আপনার আসন গ্রহণ করুন। সেটাকে মনে করুন আপনার নিজের ঘাঁটি হিসেবে, যেভাবে প্রধান রাঁধুনি অন্য কারিকরদের জন্য প্রস্তুতি নেয়। আপনার হাতের কাজগুলো করে নেয়ার আগে কিছুক্ষণ সময় নিন কাজগুলো দেখে নেওয়ার জন্য। কাজ হাতে পাবার পরপরই তাড়াহুড়া করে শুরু করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে কাজগুলোর তালিকা লিখে রাখতে পারেন আপনার মুঠোফোনে, হোয়াইট বোর্ডে অথবা সাদা কাগজে। এতে করে সারাদিন আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আপনার সামনে থাকবে এবং আপনি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজগুলো করতে পারবেন।
নিজেই নিয়ে নিন বড় সিদ্ধান্তগুলো

সিদ্ধান্ত নিন ভেবে-চিন্তে, Source: Premium Shutterstock

দিনের শুরুতেই বড় সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নিন, যদি আপনি আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকেন। আপনার সময় কাজে লাগান; সিদ্ধান্ত নিন উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়ে অথবা প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগের বিষয়ে। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মানসিক চাপে ভুগবেন না। দিনের শুরুতেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিন, বাকি দিনটি ব্যবহার করুন উন্নতির লক্ষ্যে ।
‘ব্যাং’ দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে ফেলুন

Source: Premium Shutterstock

আগেই বলে রাখি, এটা কিন্তু সেই ব্যাঙ না। এটি ব্যবসার জগতে খুবই পরিচিত একটি ধারণা। এই ব্যাং ধারণা জনপ্রিয় হয় ব্র্যায়ান ট্রেসি’র Eat That Frog! বইটির মাধ্যমে। এর মূলকথা হচ্ছে, সকালে যখন কাজে যাবেন, আপনার সবচেয়ে কঠিন কর্ম-পরিকল্পনায় হাত দেবেন সবার আগে। ট্রেসি এখানে আপনার কঠিন কাজটিকে উল্লেখ করেছেন ‘ব্যাং’ হিসাবে। একটি কর্ম-পরিকল্পনা পিছিয়ে পরের দিন বা তার পরের দিন নেয়া সহজ। যদি আপনি মনে করেন সময়ের অভাবে এই ধরনের কোনো কাজ আটকে রয়েছে বহুদিন ধরে, সিদ্ধান্ত নিন আগামীকাল কর্মস্থলে ঢুকেই এটি সম্পন্ন করে ফেলার।
ই-মেইল, এসএমএস, ফেসবুক/যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়া চেক করার প্রয়োজন নেই

Source: Premium Shutterstock.

Never Check E-Mail in the Morning: And Other Unexpected Strategies for Making Your Work Life Work বইয়ের লেখক জুলি মরগেনস্টার্ন পরামর্শ দেন, আপনার নিজের বাসায় বা কর্মস্থলে প্রথমেই ই-মেইল চেক করতে বসে যাবেন না । বরং প্রথম কাজ হিসাবে এমন একটি নির্দিষ্ট কাজে আপনার মনোযোগ সীমাবদ্ধ রাখুন যেটি কিনা আপনি নিখুঁতভাবে করে ফেলতে পারেন। প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন বিশেষভাবে ই-মেইল চেক করবেন না। এই প্রসঙ্গে সামাজিক মনস্তত্ববিদ রন ফ্রাইডম্যান Psychology Today-তে লিখেছেনঃ

“এই ধরনের কর্মকাণ্ড রীতিমতো আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং মানসিকভাবে আমাদের প্রতিক্রিয়াশীল স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে অন্য কোনো মানুষের গুরুত্বই হয়ে দাঁড়ায় চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। এটা অনেকটা রান্নাঘরে ঢুকে পানি জাতীয় কিছু ছলকে পড়েছে কিনা খোঁজা, পরিষ্কার করার জন্য অথবা পাত্র খোঁজা ধোয়া-মাজা করার জন্য।”

ব্যক্তিগতভাবে সকালে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত শেখার দিকে। সরাসরি কাজে ঝাঁপ দেওয়ার চেয়ে বরং TED Talk জাতীয় ভিডিও দেখা খুবই কাজের। অথবা কোনো দক্ষতা ঝালাই দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়া যেতে পারে, যাতে দিনের বাকি সময় কাজে সফলতা আসে।

মনে রাখবেন, উপরে আলোচিত প্রতিটি বিষয় একসাথে কখনোই করতে পারবেন না। বরং একটি একটি করে সমাধান করুন এবং সেই পথ ধরে সামনে এগোতে থাকুন।
আপনার কর্ম দিবসের শেষ ১০ মিনিট যেভাবে কাটানো উচিত
ছোট কর্মপরিকল্পনা সেরে ফেলুন আজই

Source: Premium Shutterstock.

দিনের শুরুতেই যদি আপনি আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং কঠিন সমস্যাগুলো সমাধান করে ফেলেন, তাহলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে দিনের শেষে আপনি পরিশ্রান্ত একজন মানুষ। এখন কী করবেন? আপনি এই সময়ে আপনি আপনার বাড়তি মেইলগুলো চেক করে নিতে পারেন, কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে পারেন। আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (অথবা কর্মস্থলে) ছোটখাটো যে কাজগুলো বাকি ছিল সেগুলোও সেরে নিতে পারেন। তবে ঐসব কাজ নয় যেগুলোতে আপনার শারীরিক পরিশ্রম হবে। বলা যায়, এতে আপনার সময়েরই সদ্ব্যবহার হবে। শুধু তা-ই নয়, এতে আপনার চিন্তা হবে আরো সুসংহত, আপনি হয়ে উঠবেন আরো আত্মবিশ্বাসী। ফলাফলে হয়তো আপনার পরের দিনটিও হতে পারে আরো অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
Advertisement
বিগত দিনটির হিসাব করুন

Source: Premium Shutterstock

কর্মদিবসের শেষে ১০ মিনিট নিজেকে সময় দিন। নিজেই হিসাব করুন এই দিনটিতে কোন কোন কাজ আপনি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন এবং কোন কাজগুলো বাকি রয়েছে এবং আগামীকাল কোন কোন কাজগুলো করা প্রয়োজন। আপনি যখন জানবেন পরের দিনটির জন্য আপনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তখনই আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে বাকি সন্ধ্যাটুকু উপভোগ করতে পারবেন আপনার মতো করে।
কর্মস্থল ত্যাগ করবেন, কিন্তু …

আপনার কর্মী অথবা সহকর্মীদের সাথে সারাদিনের কাজের বিষয়ে আলাপকালে শুধু শুধু গড়িমসি না করাই শ্রেয়। Tame Your Terrible Office Tyrant: How to Manage Childish Boss Behavior and Thrive in Your Job বইটিতে লেখক লিন টেলরের মন্তব্যটি এখানে খুবই মানানসই- “কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া কর্মস্থলে থাকা নিশ্চিতভাবেই আপনার প্রাণশক্তি এবং উদ্যম কমিয়ে ফেলতে পারে, যা আপনার অবশ্যই প্রয়োজন হবে, হ্যাঁ, আগামীকালকে।” টেলরের মতে, কর্মস্থল ত্যাগ করার পরে আপনার উচিত আপনার ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়া। কাজকে কাজের জায়গায় রাখাটা আপনার কর্মজীবন এবং ব্যক্তিজীবনকে সঙ্গতিপূর্ণ রাখার প্রথম শর্ত।

জীবনের সকল ক্ষেত্রে, এমনকি কাজের ক্ষেত্রে তো বটেই, যে কাজটি করা বাঞ্ছনীয় অথবা যে কাজটি আপনাকে নতুন কোনো কাজের জন্য ভাবিয়ে তুলবে না, সে কাজটিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে সম্পন্ন করতে হবে। নতুবা আপনি পিছিয়ে থাকবেন আপনারই সময়ে অন্যদের থেকে সহস্র-কোটি আলোকবর্ষ দূরে।

38
By Farzana Tasnim Pinky
Like what you read ? Give it a star !

একবিংশ শতাব্দীতে এসে নানা ধরনের আবিষ্কারের কথা শুনে আমরা বেশ অবাক হয়ে যাই। অথচ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন সব পাণ্ডুলিপি যখন হঠাৎ করেই আমাদের সামনে হাজির হয়, তখন সেই আমলের মানুষের চিন্তাভাবনা আমাদের টনক নড়িয়ে দিতে বাধ্য করে। বলছিলাম সিবিউ পাণ্ডুলিপির কথা। আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগেকার এই পাণ্ডুলিপিটিতে তরল জ্বালানি, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও একাধিক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট রকেট তৈরির বর্ণনা দিয়েছেন কনরাড হাস নামক এক ব্যক্তি। চোখ কপালে তোলা সেই পাণ্ডুলিপিটি নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।
শুরুতেই আসা যাক কনরাড হাসের প্রসঙ্গে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে খুব উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ছিলো প্রটেস্ট্যান্ট রিফরমেশন। পোপ কর্তৃক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের এক শ্রেণীকে অস্বীকৃতি জানানোর পর পুরো বিষয়টিকে ঢেলে সাজানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে গোটা ইউরোপ ক্যাথোলিক এবং প্রটেস্ট্যান্ট, মোটা দাগে এই দুই গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়। দুই দলে ভাগ হয়ে চলতে থাকে তাদের মধ্যকার অরাজকতা। আর এদিকে প্রাচ্যে তখন অটোমান সাম্রাজ্য বেশ বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। ১৫২৯ সালে বিধানকর্তা সুলাইমানের হাত ধরে তারা এমনকি ভিয়েনার গেট অব্দি পৌঁছে যায়। এমনই এক দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় শতাব্দীতে জন্ম হয় কনরাড হাসের।
Advertisement


হাসের সেই চমকপ্রদ পাণ্ডুলিপি; Source: ancient-code.com
হাস ছিলেন অস্ট্রিয়ান অথবা ট্রানসিলভানিয়ার স্যাক্সন সামরিক প্রকৌশলী। হাঙ্গেরিতে কর্তব্যরত এই ইঞ্জিনিয়ার রকেটের প্রধান নকশাকারী হিসেবে পরিচিত। তার নকশা করা রকেটের মধ্যে তিন স্তর বিশিষ্ট একটি রকেট এবং মনুষ্যবাহী রকেটের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। ১৫০৯ সালে জন্ম নেয়া হাস অস্ত্র প্রকৌশলী এবং প্রশিক্ষক হিসেবে রকেট প্রযুক্তি নিয়ে জার্মান ভাষায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। শুধু রকেটই নয়, এখানে ক্ষেপণাস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র সহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের বিবরণও দিয়েছেন তিনি।
১৯৬১ সালে আবিষ্কৃত হয় হাসের পাণ্ডুলিপিটি। সিবিউয়ের পাবলিক রেকর্ড থেকে এটি উদ্ধার করা হয় বলে একে ‘সিবিউ পাণ্ডুলিপি’ বলেই ডাকা হয়। ডেলটা বা ত্রিভুজাকৃতির ডানা, ঘণ্টাকৃতির নল, বিভিন্ন তরলের সংমিশ্রণে তরল জ্বালানি তৈরি থেকে শুরু করে কয়েক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট রকেটের গতিতত্ত্বও আবিষ্কার করেছিলেন হাস। তার সেই প্রবন্ধের মূল পাণ্ডুলিপিটিতে উল্লেখিত রকেটের সামরিক ব্যবহার সংক্রান্ত অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন-
“আমার উপদেশ থাকবে যুদ্ধকে না বলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও বেশি মনোনিবেশের প্রতি। শান্তভাবে রাইফেলগুলো গুদামে রেখে আসা উচিত, যাতে আর একটি গুলিও না চলতে পারে, গানপাউডারগুলোও খরচ না হয়। এতে একদিকে যেমন রাজার টাকা বেঁচে যাবে, অন্যদিকে অস্ত্রাগারের রক্ষীর চাকরিটাও টিকে যাবে বহুদিন। কনরাড হাস তোমাদেরকে অস্ত্রের অপব্যবহার না করার উপদেশ দিচ্ছে”।

রোমানিয়ার ডাকটিকিটে কনরাড হাস; Source: ancient-code.com
হাসের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি। ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত হাসকে নতুন করে সামনে উপস্থিত করে এই পাণ্ডুলিপিটি। বলা হচ্ছে, এটি মূল পাণ্ডুলিপির তৃতীয় খণ্ড, যা লেখা হয়েছিল প্রায় ১৫০০ সালের দিকে। সামরিক এ ইঞ্জিনিয়ার এখানে ‘ফ্লাইং জ্যাভেলিন’ বা ‘উড়ুক্কু বর্শা’ নামক এক নতুন প্রযুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন, আশ্চর্যজনকভাবে যা বহুস্তর বিশিষ্ট রকেটের বর্ণনার সাথে বহুলাংশে মিলে যায়। কাজেই ইতিহাস খুঁড়ে হাসের নাম নতুন করে উত্থিত হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এতদিন ধরে পোল্যান্ডের আর্টিলারি বিশেষজ্ঞ কাজিমিয়ার্জ সিমেনোউইকজকে রকেট উদ্ভাবকের স্বীকৃতি দেয়া হতো। ১৬৫০ সালে তিনি তিন স্তর বিশিষ্ট রকেটের নকশা প্রণয়ন করেছিলেন। পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর কাজিমিয়ার্জকে হটিয়ে রকেট উদ্ভাবকের জায়গায় নাম লেখান কনরাড হাস।
সিবিউ পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করেন ডরু তোদেরিকিউ। রোমান এই লেখক, ঐতিহাসিক, গবেষক সিবিউয়ের স্টেট আর্কাইভের পুরনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছিলেন। এরই মধ্যে তার চোখে পড়ে হাসের পাণ্ডুলিপিটি। সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ এগিয়ে থাকা এই পাণ্ডুলিপিটি ডরুকে একটি স্বতন্ত্র গবেষণার খোরাক যোগায়। জার্মান ভাষায় লেখা পাণ্ডুলিপিটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৫০। সিবিউয়ের স্টেট আর্কাইভ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে ডরু নিজেই এর নাম দেন ‘সিবিউ পাণ্ডুলিপি’। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সে সময় খুব বেশি উন্নতি না ঘটলেও হাসের চিন্তা-ভাবনা ছিল অভূতপূর্ব ও চমকপ্রদ।

১৫৫১ সালে উৎক্ষেপিত রকেটের ছবি; Source: toptenz.net
১৯২৬ সালের ১৬ মার্চ রবার্ট গোদার্ড ম্যাসাচুসেটসে বিশ্বের প্রথম তরল জ্বালানি বিশিষ্ট রকেট উৎক্ষেপণ করেন। এর আগপর্যন্ত সাধারণ মানুষ ভাবতেও পারেনি যে এমন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব। অথচ তারও প্রায় ৫০০ বছর আগে এমন একটি অভিনব জিনিসের নকশা তৈরি করে ফেলেছিলেন হাস। পাণ্ডুলিপির তৃতীয় খণ্ডে ১৫৫৫ সালে সিবিউ শহরে হাজার হাজার মানুষের সামনে একাধিক টায়ার বিশিষ্ট একটি রকেট উৎক্ষেপণের সফল বর্ণনাও রয়েছে। ঘটনাটি কতটুকু সত্যি বা কতটুকু মিথ্যে, তা যাচাই করার উপায় নেই। তবে হাসের নিজ হাতে আঁকা রকেটের বিভিন্ন ছবি রকেট উৎক্ষেপণ না হলেও আবিষ্কারের প্রমাণ বহন করছে।
শত শত বছর আগে একজন মানুষ রকেট বিজ্ঞানের এত জটিল প্রক্রিয়া কীভাবে আবিষ্কার করলেন, তা এক রহস্যই বটে। শুধু রকেট নয়, মহাকাশযান, তরল জ্বালানি এবং ত্রিভুজাকৃতির ডানা- এতগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কার হাসের সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
সিবিউ পাণ্ডুলিপি বর্তমানে রোমানিয়ায় সংরক্ষিত আছে। অনেকেই অবশ্য এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, এত বছর আগে যেহেতু এমন জটিল পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল না, সেহেতু ডরু নিশ্চয়ই নিজ হাতে এগুলো লিখে সবাইকে ধোঁকা দেয়ার পাঁয়তারা করছে। তাদের এই সন্দেহের ভিত্তিতে পরবর্তীতে গবেষকরা হাসের বর্ণনা করা পুরো প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখেন। ধোঁয়া এবং জ্বালানির হিসাবে সেখানে বেশ কিছু গরমিল তাদের চোখে পড়ে, যার ফলে ঐ বর্ণনানুযায়ী সফলভাবে রকেট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব কিনা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবুও এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য হলেও একবার অন্তত সিবিউ পাণ্ডুলিপিটি পড়ে দেখা প্রয়োজন।

১৯২৬ সালে নিজের উদ্ভাবিত রকেটের পাশে রবার্ট গডার্ড; Source: ancient-origins.net
অসংখ্য নকশা আর আর্টিলারি, ক্ষেপণাস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্রের বর্ণনা সম্বলিত সিবিউ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়ার আগপর্যন্ত রকেট উদ্ভাবনের জগতে কাজিমিয়ার্জ ছাড়াও আরেকজন বেশ নাম করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে ব্যাভেরিয়ান আতশবাজি নির্মাতা জোহান স্কিমিডলাপ দ্বি-স্তরবিশিষ্ট রকেট নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। ১৫৯০ সালের দিকে তিনি প্রথম এ ব্যাপারে নিরীক্ষা চালান।কাজিমিয়ার্জ নিজেও তিন স্তর বিশিষ্ট রকেটের নকশা প্রণয়ন করেন ১৬৫০ সালে। কাজেই তাদের সমসাময়িক উদ্ভাবক হাস যদি আগেই রকেটের নকশা প্রণয়ন করেন, তবে তা খুব একটা অবিশ্বাস্য হবে না।
Advertisement

হাসের নকশাকৃত রকেট পরবর্তীতে উৎক্ষেপিত হয় কেপ কেনেডিতে। মার্কারি, জেমিনি এবং অ্যাপোলো নামক নাসার কয়েকটি প্রোগ্রামেও পরীক্ষামূলকভাবে তা ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়। রোমানিয়ার সিবিউ জাদুঘরে সংরক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপিটির তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন লেডি সালা শাবাজ। ২০০২ সালের ২৮ মার্চ তিনি মারা যান। তিনি বলেছিলেন-
“দুর্ভাগ্যবশত বহু বছর আগে লেখা অধিকাংশ পাণ্ডুলিপিতে কুসংস্কার আর গোঁড়ামির ছাপ বেশি পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত ডায়েরিগুলোতেও মানুষ কেন যেন মনের মাধুরী মিশিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনা বিকৃত করত, এমন প্রমাণ আমি নিজে দেখেছি। এত শত ঠিক-বেঠিকের ভিড়ে অনেক সময় দরকারি বা কাজের তথ্য সংবলিত গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো জনসাধারণের অগোচরে চলে যায়। অথচ এমন দুয়েকটি লেখাই যথেষ্ট সে সময়কার মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে বর্তমান প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দিতে। এমন আরও কিছু তথ্য আবিষ্কৃত হলে তৎকালীন মানুষের প্রতি আমাদের ধারণাই পাল্টে যাবে। ডরুকে ধন্যবাদ হাসের এমন তথ্যবহুল পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করার জন্য”।
সিবিউ শহরটি এমন নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য বেশ আগে থেকেই খ্যাতি লাভ করেছে। হাসের এই পাণ্ডুলিপি সিবিউয়ের অর্জনের মুকুটে নতুন পালক সংযোজিত করেছে।
ফিচার ইমেজ- thedockyards.com

39
By Monem Ahmed
Like what you read ? Give it a star !

আমরা  অনেকে প্রায়ই আফসোসের সুরে বলে থাকি “কেউ আমায় বুঝলো না”। খুব করে চাই, কেউ যদি বুঝতে পারতো আসলে কী চলছে আমাদের মনের মধ্যে! আচ্ছা একবার ভাবুন তো আমরা যদি বুঝতে পারতাম কী চলছে অন্যদের মনের মধ্যে, তাহলে কত ভুল বোঝাবুঝির অবসান হতো? কত সম্পর্ক ভাঙার বদলে আরো দৃঢ় হতো?

আচ্ছা আরেকজনের কথা বাদ দেই আমরা, নিজেদের অনুভূতিগুলোই ঠিকমতো বুঝতে পারি কি? ধরুন আপনার মন খারাপ। কিন্তু আমাদের অনুভূতি কি এতই সরল যে স্রেফ মন খারাপ বা ভালো এ দুটো শব্দ  দিয়েই প্রকাশ হয়ে যায়? উত্তর হলো- না। আপনি কি ধরতে পারছেন আপনার আসলে কোন ধরণের মন খারাপ? আপনি কি হতাশ, নাকি বিষণ্ণ? নাকি কোনো অনুতাপে ভুগছেন? আমরা আমাদের অনুভূতির এ সূক্ষ্ম রূপগুলো ধরতে পারি কি?

ছবিসূত্রঃ assets.entrepreneur.com

অনুভূতির এ সূক্ষ্ম রূপগুলো নিয়েই ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স এর কাজ। নিজের এবং অন্যের আবেগ বুঝতে পারা, অনুভূতির সূক্ষ্মতর রূপগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারা এবং কোনো পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়া বা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাই হলো ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স।

জীবনের বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা নিয়ন্ত্রিত হই আবেগ দ্বারা। আবার এ আবেগের কারণেই সূত্রপাত ঘটে দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ সমস্যার। আবেগকে ঠিকমতো বুঝে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এড়ানো যায় এসব সমস্যা, অর্জন করা যায় অনেক লক্ষ্য। এ কারণেই ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স এর গুরুত্ব এত বেশী। এমনকি সফলতার ক্ষেত্রে ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্সকে (‘ই আই’ বা ‘ই কিউ’) ‘আই কিউ’ এর চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়।

ছবিসূত্রঃ mind-setdevelopments.co.uk

ড্যানিয়েল গোলম্যান তার ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স এর মডেলে পাঁচটি দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছেন:

১। আত্মসচেতনতা: নিজের অনুভূতি, দুর্বলতা, সবলতা, মূল্যবোধ ও লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এ সকল কিছু মাথায় রাখাই আত্মসচেতনতা। এছাড়াও অন্যদের উপর নিজের সহজাত ও প্রতিক্রিয়াশীল অনুভূতিগুলোর (যেমন হতে পারে অতিরিক্ত বিশ্বাস প্রবণতা বা রেগে যাওয়া ইত্যাদি ) প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।

২। আত্মনিয়ন্ত্রণ: নিজের ক্ষতিকর আবেগ বা মনোবৃত্তিগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা বা পরিবর্তিত অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানো এর অন্তর্ভুক্ত।

৩। সামাজিক দক্ষতা: সম্পর্কের মাধ্যমে সহযোগী বা অধীনস্থ কর্মীদের কোনো একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা।

৪। সহমর্মিতা: কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় অন্যদের অনুভূতির বিষয়ে সজাগ থাকা।

৫। প্রেরণা: কোনো কিছু অর্জনের জন্য নিজেকে তাড়িত করা।

ছবিসূত্রঃ sessioncam.com
ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্টদের কিছু বৈশিষ্ট্য

অন্য যেকোনো দক্ষতার মতো ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্স এর দক্ষতাও অনুশীলনের মাধ্যমে শাণিত করা যায়। তবে এমনটাও হতে পারে যে এটি কি তা না বুঝেই সহজাত ভাবে আপনি উচ্চ ‘ই আই’ সম্পন্ন। নিচে উল্লিখিত ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্ট ব্যক্তিদের অভ্যাসগুলো খেয়াল করুন। আপনার অভ্যাসের সাথে কি মিল খুঁজে পাচ্ছেন?

১। তারা অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন

উচ্চ ‘ই কিউ’ সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেকে জিজ্ঞেস করেন ‘আমি এমন অনুভব করছি কেন?’, ‘আমি এমনটা করলাম কেন?’ এ সকল প্রশ্নের মাধ্যমেই মূলত ‘ই আই’ এর শুরু। প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মাধ্যমে একজন তার প্রতিক্রিয়াশীল অনুভূতিগুলোর বিষয়ে সচেতন হন এবং একে ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন।

২। তারা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে আগ্রহী হন

তারা জানেন যে তিনি নিজেকে বা নিজের কাজকে যে দৃষ্টিতে দেখেন অন্যরা সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে না। তাই তারা ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেমনই হোক না কেন অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে জানতে আগ্রহী হন।

ছবিসূত্রঃ dharmaconsulting.com

৩। তারা সঠিক সময়ে বিরতি দিতে জানেন

হুট করে কোনো কথা বলতে গিয়ে বা কোনো কিছু করতে গিয়ে থেমে একটু ভেবে নেয়া, বিষয়টি সহজ মনে হলেও আসলে ততটা সহজ নয়। তবে এ একটুখানি ভেবে নেয়া আপনাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে অনেক সমস্যা থেকে, টিকিয়ে রাখতে পারে অনেক সম্পর্ককে, এমনকি আপনি হয়ে উঠতে পারেন আগের চেয়ে ভাল কর্মীও। ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্ট ব্যক্তিরা সঠিক সময়ে এ বিরতিটি দিতে পারেন।

৪। তারা অন্যের অবস্থান থেকে ভাবার চেষ্টা করেন

কোনো বিষয়ে কাউকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করার পূর্বে উচ্চ ‘ই আই’ সম্পন্ন মানুষেরা ঐ ব্যক্তির অবস্থান থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। সে কেন এমনটা করল? তার এমন প্রতিক্রিয়ার পেছনে কী কাজ করছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মাধ্যমে তারা সবার মধ্যে একধরণের মিলবন্ধন খুঁজে পান।

৫। ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্ট ব্যক্তিরা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন

নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক মতামত কে-ইবা শুনতে চায়! তবে ‘ই আই’ সম্পন্ন ব্যক্তিরা বুঝতে পারেন সমালোচনা ঠিক ভদ্র ভাবে না আসলেও তার মধ্যেও কিছু সত্যতা লুকিয়ে থাকে। তাই তারা সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়াও সমালোচনা থেকে অন্যরা কিভাবে চিন্তা করে তাও বুঝতে পারেন তারা।

৬। অন্যদের মনোভাবও গুরুত্ব পায় তাদের কাছে

কোনো একজন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার পর তারা নিজের অজান্তেই ঐ ব্যক্তিকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। এর ফলে তাদের কথাগুলি অন্যদের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে তারা তা বুঝতে পারেন। তাই তারা কী বলছেন এর পাশাপাশি কিভাবে বলছেন তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তাদের কাছে।

৭। তারা নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চান

নিজের ভুলগুলি স্বীকার করে আবার তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কাজটি সহজ না। কিন্তু ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্ট ব্যক্তিরা নিজেদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের ভুলগুলো ধরতে পারেন এবং ‘আমি দুঃখিত’ বা ‘আমি ক্ষমা প্রার্থী’ এ শব্দগুলোর ক্ষমতা সম্পর্কেও তারা জ্ঞাত তাই ক্ষমা প্রার্থনা করতে দ্বিধা করেন না।

৮। তারা ক্ষমা করে দেন

তারা বুঝতে পারেন যে কেউই আসলে নিখুঁত নয়। তাই ক্ষমা করতে না চাওয়া আসলে একটি ক্ষতকে নিরাময় হওয়ার সুযোগ না দেয়ার মতো। যখন দোষী ব্যক্তি তার জীবনে এগিয়ে চলছে, তখন অযথা অসন্তোষ ফুঁসে না রেখে ক্ষমা করার মাধ্যমে তারা নিজেদেরও এগিয়ে চলার সুযোগ করে দেন।

ছবিসূত্রঃquotesnpictures.com

৯। তারা তাদের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন

প্রচলিত কথায় আছে, “একটা পাখিকে হুট করে আপনার মাথায় এসে বসার থেকে হয়তো আপনি থামাতে পারবেন না, কিন্তু আপনার মাথায় বসে বাসা বানানোর থেকে তো থামাতে পারেন!”

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্ট ব্যক্তিরা এটি করার চেষ্টা করেন। কোনো বাজে পরিস্থিতিতে সহজাত কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানোর থেকে হয়তো তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু এর পরবর্তী বিষয়গুলো তারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তারা ঠিক করেন যে তাদের চিন্তাগুলো কোনদিকে ফোকাস করবেন। তারা সবধরনের নেতিবাচক অনুভূতি ঝেড়ে ফেলে নিজেকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।

ছবিসূত্রঃpbs.twimg.com

১০। তারা কাউকে বিচার করেন না

কারো সম্পর্কে ভালভাবে না জেনে, পরিস্থিতি, প্রসঙ্গ ইত্যাদি বিশ্লেষণ না করে কাউকে বিচার করে ফেলা বা কোনো আখ্যা দিয়ে ফেলা খুবই বাজে অভ্যাস। কিন্তু ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্টরা এ কাজটি কখনোই করেন না। তারা মানুষকে জানেন, বিশ্লেষণ করেন কিন্তু কারো উপর কোনো লেভেল এঁটে দেন না কখনোই। তারা জানেন যে, একজন মানুষের একটা খারাপ দিন এমনকি একটা খারাপ বছরও যেতে পারে।

অন্য সব দক্ষতার মতো ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্সকেও নৈতিক, অনৈতিক দুই ভাবেই ব্যাবহার করা যায়। এর মাধ্যমে আমরা যেমন মুক্তি পেতে পারি অনেক নেতিবাচক অনুভূতি থেকে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে করতে পারি অনেক অর্জন, তেমনি অনেকে এ দক্ষতার মাধ্যমে অন্যকে অনেক নেতিবাচক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যও প্রভাবিত করতে পারে। তাই অর্জন করতে হবে এর ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধের দক্ষতাও।

    তথ্যসূত্র

    ১) inc.com/justin-bariso/15-signs-youre-emotionally-intelligent-without-even-realizing-it.html

    ২) en.wikipedia.org/wiki/Emotional_intelligence

    ৩) www.psychologytoday.com/basics/emotional-intelligence

40
By Abdullah Ibn Mahmud
Like what you read ? Give it a star !

সারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন মুসলিমের কাছে রমজান মাস একটি পবিত্র সময়, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রেখে তারা এ সময়টি পার করে থাকে। কিন্তু কবে প্রথম এই মাসব্যাপী রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়? ইসলামের পূর্বেই বা রোজা কেমন ছিল? এসব নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

রামাদান [رمضان] (ভাষাগত অপভ্রংশ: রমজান) শব্দটা এসেছে আরবি মূল রামিদা বা আর-রামাদ থেকে, যার মানে প্রচণ্ড উত্তাপ কিংবা শুষ্কতা। আরবি ক্যালেন্ডারের নবম মাস হলো রমজান। হযরত মুহাম্মাদ (সা) প্রথম ওহী পেয়ে নবী হয়েছিলেন ৬১০ সালের রমজান মাসেই। এ মাসের যে রাত্রিতে প্রথম আয়াতগুলো নাজিল হয় (সুরা আলাক এর প্রথম পাঁচ আয়াত) সে রাতকে বলা হয় শবে কদর বা লাইলাতুল কদর (আরবিতে লাইল=রাত)। বলা হয়েছে যে, রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাত্রির কোনো এক রাত্রি এই শবে কদর, প্রসিদ্ধমতে সেটা ২৭ তারিখ ধরে নেয়া হয়। যদিও আরেক মতে সেটি ২৩তম রাত্রি। তবে নিশ্চিতভাবে এই রাতটি পাবার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ ইতিকাফ করে থাকেন, অর্থাৎ নির্জনে টানা ১০ দিন প্রার্থনা। আর এই রমজান শেষ হওয়া মানেই ঈদুল ফিতর যা মুসলিমদের প্রধান দুটি উৎসবের একটি।

মক্কা শরিফ, সৌদি আরব

পুরোপুরি প্রমাণিত না হলেও, মতবাদ আছে যে, নবী হযরত ইব্রাহিম (আ) এর সহিফা নাজিল হয়েছিল তৎকালীন রমজানের ১ম দিবসে, তাওরাত এসেছিল ৬ রমজান, যাবুর ১২ রমজান আর ইঞ্জিল ১৩ রমজান। যদিও আরবের বাহিরে রমজান মাস হিসেব করা হতো না, কিন্তু এই হিসেবটা ভিন্নজাতিক পঞ্জিকার সাথে মিলিয়ে স্থির করা হয়েছে বলে বলা হয়।

তবে পুরো এক মাস পবিত্র রমজান মাসের রোজা রাখার আদেশ অবতীর্ণ হয় যখন নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং সাহাবীরা মক্কা থেকে মদিনাতে হিজরত করেন তার পরে। সেটা ছিল হিজরতেরও ১৮ মাস পরের ঘটনা। তখন আরবি শাবান মাস চলছিল।

    “রমযান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে।” [পবিত্র কুরআন, বাকারা 2:185]

মসজিদে নববী, মদিনা, সৌদি আরব

তবে এমন না যে, এর আগে কেউ রোজা রাখত না। অবশ্যই রাখত। কুরআনেই বলা রয়েছে যে, আগের জাতিগুলোর জন্যও রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, সেটা রমজান না হলেও।

    “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [পবিত্র কুরআন, বাকারা 2:183]

এমনকি মক্কার মানুষেরাও ইসলামের পূর্বে রোজা রাখত, তবে সেটা কেবল মুহাররাম মাসের ১০ম দিন, আশুরার রোজা। কারবালার ঘটনা তখনও ঘটেনি, আশুরার প্রধান উপজীব্য ছিল হযরত মুসা (আ) এর নেতৃত্বে মিসর থেকে বনী ইসরাইলের মুক্তি এবং লোহিত সাগর দু’ভাগ হয়ে যাবার ঘটনা। আত্মসংযম আর আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির নিমিত্তে অন্যরাও রোজা রাখত বটে।

মসজিদে নববী, মদিনা, সৌদি আরব

৭৪৭ সালের একজন আরব লেখক আবু যানাদ জানান যে, উত্তর ইরাকের আল জাজিরা অঞ্চলে অন্তত একটি মান্দাইন সমাজ ইসলাম গ্রহণের আগেও রমজানে রোজা রাখত। প্রথম থেকেই রমজানের রোজা রাখা শুরু হত নতুন চাঁদ দেখবার মাধ্যমে, তাই অঞ্চল ভেদে রোজার শুরুও ভিন্ন হতো। এখন মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি দেশের মুসলিমরা প্রকৃতির স্বাভাবিক সময়ানুসারে সেখানে রোজা রাখতে পারে না, যেহেতু সেখানে দিনরাত্রির পার্থক্য করা দুরূহ। তাই নিকটতম স্বাভাবিক দেশের সময়সূচী কিংবা মক্কার সময় মেনে তারা রোজা রাখে এবং ভাঙে।

অতিরিক্ত ইবাদত হিসেবে রয়েছে তারাবিহ, যদিও সেটি বাধ্যতামূলক নয়, বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) প্রথমদিকে জামাতের সাথে সে নামাজ আদায় করলেও পরে জামাতে করেন নি, পাছে সেটি মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। তবে খলিফা উমার (রা) পুনরায় জামাতে আদায় করা শুরু করেন তার শাসনামলে। তবে শিয়াগণ তারাবিকে নবউদ্ভাবন বলে পরিত্যাগ করে থাকে। আট থেকে ২০ রাকাত পর্যন্ত তারাবিহ নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে, তবে মক্কার হারাম শরিফে ২০ রাকাতই আদায় করা হয়। উল্লেখ্য, ফজরের ওয়াক্ত হবার পূর্বে খেয়ে রোজা রাখাকে সাহরি আর সূর্যাস্তের পর খেয়ে রোজা ভাঙাকে ইফতার বলা হয়।

সৌদি আরবে তারাবির নামাজ পড়ানো হচ্ছে

অনেক খ্রিস্টানও রোজা রেখে থাকে, তবে কিছুটা ভিন্ন অর্থে। বাইবেলে বর্ণিত যীশু খ্রিস্ট নিজেও টানা ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। (Matthew 4; Luke 4)। আদি খ্রিস্টানরাও রোজা রেখেছিলেন বলে বাইবেলে প্রমাণ পাওয়া যায়। (Acts 13:1-5; 14:23; 27:9); এখনো অনেক ধর্মপ্রাণ রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ইস্টার সানডেরআগের ছয় সপ্তাহ এই প্রথা পালন করেন, একে Lent বলা হয়।

উল্লেখ্য, আরবিতে সিয়াম বললেও উপমহাদেশে ফার্সি “রোজা” শব্দটাই বেশি প্রচলিত হয়ে গেছে। আরবি “সাওম” শব্দ কিংবা সিরিয়াক “সাওমা” অথবা আদি হিব্রু “সম” শব্দের মূল অর্থ “বিরত থাকা”। শুধু খ্রিস্টান বা মুসলিম নয়, ইহুদী ধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, কনফুসীয়, সনাতন, তাও কিংবা জৈনবাদ- সকল ক্ষেত্রেই আছে উপবাসের প্রচলন। রমজানের রোজা ছাড়াও মুসলিমদের জন্য শাওয়াল মাসের যেকোনো ৬ দিন, প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩-১৫ তারিখ, আরাফা দিবস, আশুরা দিবস ইত্যাদি দিবসে রোজা রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে ঈদের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ।

একমাত্র যে ধর্মের ব্যাপারে রেকর্ড পাওয়া যায় যেখানে রোজা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল সেটি হলো আদি পারস্যের ধর্ম বা জরথুস্ত্রুবাদ।

তবে মুসলিমদের মতো কঠোরভাবে রোজা রাখে কেবল ধার্মিক ইহুদীরাই। বছরে ছয় দিন তাদের বাধ্যতামূলক রোজা রাখতে হয়। সাব্বাথ (সাপ্তাহিক ছুটির শনিবার) দিবসে রোজা রাখা তাদের জন্য হারাম। ইয়ম কিপুর (হিব্রুতে ইয়ম=দিন, কিপুর=প্রায়শ্চিত্ত) এর দিন অবশ্যই অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। এদিন ইহুদী বিশ্বাস মতে, এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এবং তারা টানা ২৫ ঘণ্টা রোজা রাখে।

জেরুজালেমের দেয়ালের কাছে জড়ো হওয়া রোজা রাখা ইহুদীরা

নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) যখন মদিনা এলেন, তখন তিনি দেখলেন ইহুদীরা আশুরার রোজা রাখছে। যদিও তারা ইসরায়েলে থাকতে ইহুদী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত, সেখানকার ইহুদী মাস তিশ্রির দশম দিবসে তারা রোজা রাখত (ইয়ম কিপুর)। আরবে তারা সেটার সাথে মিলিয়ে মুহাররামের দশম দিন আশুরার দিন রোজা রাখত। হযরত মুহাম্মাদ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তারা কেন রোজা রাখে? তারা উত্তর করল, এদিন আল্লাহ্‌ বনি ইসরাইলকে রক্ষা করেছিলেন এবং হযরত মুসা (আ) এজন্য রোজা রেখেছিলেন। তখন হযরত মুহাম্মাদ (স) মুসলিমদেরও এ রোজা রাখতে নির্দেশ দেন যেহেতু হযরত মুসা (আ) ইসলাম ধর্মেও নবী। তবে তিনি সাথে অন্তত একদিন অতিরিক্ত রাখতে বললেন, আগের দিন কিংবা পরের দিন। পেছনের কাহিনী মক্কাবাসীরা না জানলেও, তারা ঠিকই আগে থেকে এ দিন রোজা রাখত, এমনকি ইসলামের আগে হযরত মুহাম্মাদ (স) নিজেও রেখেছিলেন। রমজানের রোজা বাধ্যতামূলক হবার আগে এ রোজাটা সবাইকে রাখতে হত। রমজানের রোজা আসবার পর এ রোজা নফল হয়ে যায়।

মদিনায় ইফতার বিলি

অনেকের আগ্রহের বিষয় থাকতে পারে, নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও সাহাবীরা কী খেয়ে সাহরি বা ইফতার করতেন? নবীজী (সা) মাগরিবের আগে কয়েকটি ভেজা খেজুর খেতেন, তা না থাকলে শুকনো খুরমা/খেজুর, আর পানি। এটাই ছিল ইফতার। একবার তিনি সফরে থাকা অবস্থায় ছাতু ও পানি মিশিয়ে ইফতার করেছিলেন। সেহরির ক্ষেত্রেও প্রাধান্য দিতেন খেজুরকে। তবে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে খেজুরগুলো ছোট ছোট, আরবীয় খেজুর যথেষ্ট বড়, অন্তত আমাদের দেশের তুলনায়।

আরবীয় খেজুর

সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ রমজান মাসটি পালন করে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে, এবং পরম আগ্রহে সাদরে বরণ করে নেয় রমজান শেষে ঈদকে। সবাইকে রামাদান মোবারাক!

রমজান মোবারাক

    তথ্যসূত্র

    পবিত্র কুরআন
    মুসলিম শরীফ, ১০৯৯,
    বায়হাকি, মেশকাত : ১৭৪,
    নাসায়ি: ২১৬২,
    আবু দাউদ, ২৩৪৫
    বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ
    নিউ টেস্টামেন্ট, বাইবেল
    telegraph.co.uk/lifestyle/11524808/The-history-of-fasting.html

41
By Shakib Mustavee
Like what you read ? Give it a star !

মিশর নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিরামিডের ছবি। নীলনদের তীরে  সুপ্রাচীনকালে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতার অনেকগুলো অনন্য নিদর্শনের মধ্যে নিঃসন্দেহে পিরামিড সবচেয়ে বিস্ময়কর ও রহস্যময়। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই পিরামিডকে ঘিরে। এমনকি আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও খুঁজে পাওয়া যায়নি পিরামিডের অনেক রহস্যের কূল কিনারা। তাই প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যের অন্যতম মিশরের পিরামিডের উপর সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের এই প্রতিবেদনটি।
মরু প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাক পিরামিড আজও মানবজাতির কাছে এক বিস্ময়ের নাম source: www.planetware.com

মরু প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা পিরামিড আজও মানবজাতির কাছে এক বিস্ময়ের নাম
source: www.planetware.com
যে কারণে নির্মাণ করা হত পিরামিড

প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্ম বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পরকালে বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করতেন মৃত্যু হল নশ্বর দেহ থেকে পরকালে আত্মার স্থানান্তর। সেখানেও একটি জগত রয়েছে। সেখানেও প্রয়োজন হবে ধন, দৌলত ও অন্যান্য জাগতিক বিষয়াদির। তাই রাজা ও রাণীদের মৃত্যুর পর মৃতদেহের সাথে সাথে দিয়ে দেওয়া হত সোনা, রূপা ও মূল্যবান রত্নাদি। তাঁদের দেহকে সংরক্ষণ করা হত মমি বানিয়ে এবং হত্যা করা হত তাঁদের দাস দাসীদের যাতে পরকালে সেবার অভাব না হয়। কিন্তু সমস্যা হল এই মমি ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী একটি নিরাপদ স্থানে না রাখলে চুরি হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। তাই পিরামড তৈরিরও আগে নির্মাণ করা হত ট্রপিজয়েড আকৃতির মাস্তাবা নামক সমাধি।
বেইত খালেফে অবস্থিত একটি মাস্তবা source: www.nemo.nu

বেইত খালেফে অবস্থিত একটি মাস্তবা source: www.nemo.nu

কিন্তু প্রাচীনকালে রডের ব্যবহার ছিল না। সেকারণে এই মাস্তাবাগুলো বেশি উঁচু বানানো ছিল অসম্ভব। তাই কালক্রমে এই মাস্তাবাগুলোর পরিবর্তে স্টেপ পিরামিডের ডিজাইন গৃহীত হতে লাগল। এর পেছনের মূল কারণ পিরামিডের জ্যামিতিক গঠন। আমরা জানি কোন বিল্ডিং এর পুরো ওজন তার ভিত্তির উপর পড়ে। তাই উচ্চতা যত বেশি হবে ভিত্তি হতে হবে তত শক্ত। পিরামিডের ক্ষেত্রফল উচ্চতার সাথে সাথে হ্রাস পেতে থাকে। পিরামিডের ভিত্তির ক্ষেত্রফল উপরের স্তরগুলোর চেয়ে বেশি হওয়ায় এর উপর চাপও পড়ে কম এবং স্থাপনাটি শক্তিশালী হয়। তাই অনেক উঁচু সমাধি নির্মাণের একমাত্র রাস্তা ছিল পিরামিড শেপের ডিজাইন গ্রহণ করা।
306504620_sakkara7

প্রথম দিকের পিরামডগুলো ছিল অমসৃণ স্টেপ পিরামড যেগুলো মিশরের প্রথম তিনটি মহান রাজবংশের আমলে নির্মাণ হত। তবে চতুর্থ রাজবংশের সময় থেকে নির্মাণ করা শুরু হল প্রকৃত পিরামিড আকৃতির সমাধি। এছাড়া পিরামিডের উচ্চতা ক্রম হ্রাসমান হওয়ায় এর আরও একটি দার্শনিক তাৎপর্য ছিল। মনে করা হত পিরামিডগুলো যেন ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে পরজগতের পানে। পিরামিডের আর্কিটেক্টরা ছিলেন প্রাচীন মিশরীয় পুরোহিত যারা ইমহোটেপ নামে পরিচিত ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তাঁদের কাজ শুধু আধ্যাত্মিক জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও ছিল পুরোহিত কেন্দ্রিক।
গিজার গ্রেট পিরামিড

মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত মৃত নগরী আল গিজা। এখানে দেখা পাওয়া যায় তিনটি বড় বড় পিরামিডের। এগুলো হল যথাক্রমে ফারাও খুফু, তাঁর ছেলে ফারাও খেফ্রে এবং খেফ্রের ছেলে মেনকাউরে এর পিরামিড। এঁরা সবাই ছিলেন মিশরের চতুর্থ রাজবংশের রাজা। তবে এই তিনটি তো বটেই মিশরের সবগুলো পিরামিডের মধ্যে ফারাও খুফুর পিরামিডটি হল সবচেয়ে উঁচু এবং আকারে সবচেয়ে বড়। একারণে ফারাও খুফুর পিরামিডটি গিজার গ্রেট পিরামিড নামেও বহুল পরিচিত। এমনকি খ্রিস্টপূর্ব ষড়বিংশ শতক থেকে, চতুদর্শ শতক পর্যন্ত প্রায় সুদীর্ঘ চার হাজার বছর এটিই ছিল মানব সৃষ্ট সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। তাই খুব সহজে অনুমেয় প্রযুক্তি ও প্রাচুর্যে প্রাচীনযুগে মিশরীয় সভ্যতা অন্য সভ্যতাগুলোর চেয়ে কত বেশি অগ্রসর ছিল।
গিজার গ্রেট পিরামিড source: travelingcanucks.com

গিজার গ্রেট পিরামিড source: travelingcanucks.com

গিজার গ্রেট পিরামিডটি তৈরির সময়কাল ২৫৬০ থেকে ২৫৪০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ। প্রকৃত উচ্চতা ৪৮১ ফুট হলেও বর্তমান উচ্চতা ৪৫৫ ফুট। পিরামিডটির ভূমি বর্গাকৃতির এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয় দিকেই ৭৫৬ ফুট। পাথরের বড় বড় চাঁই দিয়ে বানানো এই স্থাপনাটি আসলে কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল সেটা আজও গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়ের ব্যাপার। আরও অবাক করা বিষয়টি হল এর নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ২৩ লক্ষ বড় বড় পাথরের চাঁইয়ের। একেকটি পাথরের চাঁইয়ের ভর ছিল গড়ে কমপক্ষে ২ টন থেকে ১৫ টন। এমনকি কিছু কিছু চাঁইয়ের ভর ৫০ টনেরও বেশি ছিল। চাঁইগুলোর বেশির ভাগই ছিল লাইম স্টোনের। গুণে মানে অনন্য এই লাইমস্টোনগুলো আনা হত তুরা অঞ্চল থেকে। নীল নদের পূর্ব তীর থেকে জলপথে নিয়ে আসা হত এগুলো।

কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল কালের পরিক্রমায় চুরি হয়ে গেছে অনেকগুলো লাইম স্টোনের চাঁই যার বেশির ভাগই পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে কায়রো শহরের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মানে। গিজার পিরামিডের ভেতরতে রয়েছে তিনটি কক্ষ। একটি বেইসমেন্টে। বাকি দুটি উপরে। উপরের কক্ষ দুটি ছিল যথাক্রমে রাণী ও রাজার সমাধি কক্ষ। এই কক্ষগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল গ্রানাইটের পাথর দিয়ে। প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়া আসা হয়েছিল সেগুলো। পিরামিডের ভেতরে ঢোকার সরাসরি কোন পথ কোন পথ ছিলনা।
গিজার পিরমিডে পর্যটকদের ঢোকার পথ source: www.emaze.com

গিজার পিরমিডে পর্যটকদের ঢোকার পথ source: www.emaze.com

তবে অনেকগুলো চোরাই পথ বানানো হয়েছে যুগে যুগে। এই পথগুলো দিকে ঢুকে গত পাঁচ সহস্রাব্দের বিভিন্ন সময় চুরি করে প্রায় শূন্য করে ফেলা হয়েছিল এক সময়ের ঐশ্বর্যমন্ডিত গিজার গ্রেট পিরামিড। তবে দর্শনার্থীদের জন্য এখন ভেতরে ঢোকার রাস্তা আছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা মিশরের পিরামিডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিত্রায়িত পিরামিডটিও হল গিজার গ্রেট পিরামিড। তাই গিজার গ্রেট পিরামিডকে পিরামিডের সমার্থক বললেও ভুল হবেনা।
নির্মাণ কাল ও শ্রমিকসংখ্যা

গিজার গ্রেট পিরামিডটি নির্মাণ করতে ঠিক কতজন শ্রমিক লেগেছিল সেটা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে জনসংখ্যা ও খাদ্য সরবরাহ পর্যালোচনা এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রকে একত্রে করে মোটামুটি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান গেছে। ধারণা করা হয় প্রায় ৪০০০-৬০০০ পাথর খোদাইয়ে দক্ষ রাজমস্ত্রী একটানা প্রায়  বিশ বছর সময় ধরে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছিল। তবে নীলনদের দান প্রাচীন মিশর বছরে তিনমাস ডুবে থাকত পানির নিচে। অনুমান করা হয় এই সময়গুলোতে লক্ষাধিক কৃষকও তাদের সাথে যোগ দিত।
পিরামিড নির্মাণরত শ্রমিক source: geekstopten.com

পিরামিড নির্মাণরত শ্রমিক source: geekstopten.com

এছাড়া দাস, যুদ্ধবন্দী ও অন্যান্য শ্রমিকরা তো ছিলই। শ্রমিক ও মিস্ত্রিদের খাবার বাবদ প্রতিদিন ২০০০০০ লক্ষ পিস রুটি ও ১০০০০০ পেয়াজের প্রয়োজন হত। পিরামিডের আসে পাশে ছিল শ্রমিকদের থাকার জায়গা। এই উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি গ্রাম।

আজকের দিনে একটি পিরামিড তৈরি করতে তাহলে কত খরচ পড়ত?ভাবতেই অবাক লাগে গবেষকরা সেটিও হিসাব কষে দেখিয়েছেন। আজকের বাজার মূল্যে গিজার গ্রেট পিরামিডটি তৈরি করতে প্রায় ৫ বিলিওন ডলার ব্যয় করতে হত। কিন্তু মিশরের এই গ্রেট পিরামিডের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এতই বেশি যে নিছক কাগজের নোটে এর মূল্য হিসাব করা মূল্য নেহায়েত বোকামো।

তথ্যসূত্র

১) http://traveltips.usatoday.com/able-enter-pyramids-egypt-106535.html

২) http://www.ancientnile.co.uk/pyramids.php

৩) http://www.livescience.com/18589-cost-build-great-pyramid-today.html

৪) http://www.nationalgeographic.com/pyramids/khufu.html

42
By Shah MD. Minhajul Abedin
Like what you read ? Say it !
Like

গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারতের বুক চিরে বয়ে চলা এক নদীর নাম গঙ্গা। ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের সীমানা ভাগ হওয়ার অনেক আগেই, গঙ্গা নদীর একটি শাখা পূর্ব বাংলার শস্য-শ্যামল প্রকৃতির বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে শেষ ঠিকানা করে নিয়েছিলো। নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) বইয়ে বুড়িগঙ্গার ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, “পদ্মার প্রাচীনতম প্রবাহপথের নিশানা সম্বন্ধে নিঃসংশয়ে কিছু বলা যায় না। ফান ডেন ব্রোকের (১৬৬০) নকশায় দেখা যাইতেছে পদ্মার প্রশস্ততর প্রবাহের গতি ফরিদপুর-বাখরাগঞ্জের ভিতর দিয়া দক্ষিণ শাহবাজপুরের দিকে। কিন্তু ঐ নকশাতে আরেকটি প্রাচীন পথেরও ইঙ্গিত আছে। এই পথটি রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়ার পাশ দিয়ে চলনবিলের ভিতর দিয়া ধলেশ্বরীর খাত দিয়ে ঢাকার পাশ ঘেঁষে মেঘনা খাঁড়িতে গিয়ে সমুদ্রে মিশিত। ঢাকার পাশের নদীটিকে যে বুড়িগঙ্গা বলা হয়, তাহা এই কারণেই। ঐ বুড়িগঙ্গাই প্রাচীন পদ্মা-গঙ্গার খাত।”

Frederick William Alexander কর্তৃক ১৮৬১ সালে আঁকা বুড়িগঙ্গার ছবি; Source: collections.vam.ac.uk

গঙ্গার এই বুড়িমা গঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। গঙ্গোত্রী হিমবাহের সাথে লেনদেন চুকে গেলেও নামের সাথে গঙ্গা শব্দটি শ’খানেক বছর ধরে জুড়ে রেখেছে এই নদী। মাঝে এই নদী দেখেছে কত পরিবর্তন। মোঘল সুবাদারেরা অনেকেই এই নদীর প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলেন। বুড়িগঙ্গার তীরেই গড়ে উঠতে থাকে জমজমাট ঢাকা নগরী। নদীর তীরে ঘেঁষে গড়ে উঠা এই জনপদকে আরেকটু রাঙ্গিয়ে দিতে রাতে নদীর তীরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছিলেন মোঘল সুবাদার মুকাররম খাঁ। বর্ষাকালে এই নদীতীরের জনপদকে জলমগ্ন ভেনিস নগরীর সাথে গুলিয়ে ফেলতেন অনেক ইউরোপিয়ান বণিক। এমনকি গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকেও বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ পানি ঢাকার সেই আদি জনপদকে বিনামূল্যেই ভেনিস দেখার ব্যবস্থা করে দিতো। ঢাকার নদীতীরের স্থানের নামের সাথেও জড়িয়ে আছে নদীর ইতিহাস। নদীর অদূরে এখন যেখানে ‘নারিন্দা’, ঢাকার ইতিহাসে আদিকালে সেই এলাকার নাম ছিলো ‘নারায়ণদিয়া’ বা ‘নারায়ণদি’। প্রচলিত ঢাকাইয়া বাংলায় দ্বীপের অপভ্রংশ দাঁড়ায় ‘দিয়া’ বা ‘দি’। বর্ষাকালে এই এলাকা জলমগ্ন দ্বীপের মতো দেখাতো বলে লোকে হয়তো কোনো এককালে এই এলাকার নামই দিয়ে দিলো ‘নারায়ণের দ্বীপ’ বা ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত দীপ’।

বুড়িগঙ্গার স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে সময়ও পেরিয়ে যেতে থাকে। সেই সময়ের ক্ষুধার্ত গর্ভে নদীর তীরে গড়ে উঠা বহু অট্টালিকাকে নিজের পেটে টেনে নেয়। মিল ব্যারাকের পুলিশ ট্রেনিং স্কুল চলে গেছে রাজারবাগে। এরও অনেক আগে ক্ষুরধার স্রোতে মিল ব্যারাকের কাছের আলমগঞ্জের ‘পাঠান কোট’ বা ‘পাঠান দুর্গে’র মতো অনেক সুরম্য কারুকাজওয়ালা অট্টালিকার আর দুর্গ হারিয়ে গেছে। ১৯৮৪ সালে মিল ব্যারাকের পূর্বাংশে স্থাপন করা হয়েছে ট্রাফিক ট্রেনিং স্কুল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ঢাকা; Source: British Library

মোঘল আমল থেকেই নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরের উন্নয়ন করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই আমলের খরস্রোতা বুড়িগঙ্গার তীরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করা ছিলো বেশ মুশকিল। তাই ঢাকার কমিশনার চার্লস থমাস বাকল্যান্ড বুড়িগঙ্গার তীরে বাধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। ১৮৬৪ সালের সেই সময়টাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নদীর তীরে যে বাড়িঘরগুলো আছে তাদের সামনের দিক অনেকখানি বাধাই করে দেওয়া হবে। এতে নদীর পাড় দেখতে অনেকটা স্ট্যান্ডের মতো দেখাবে। কেমন দেখাবে তার চেয়ে বড় কথা ছিলো এই বাধ কাজ করবে কিনা। বাঁধের শুরু হওয়ার পর দেখা গেলো নদীর পাড় পুরোপুরি বাধিয়ে দিলে শহরের লেভেল নদী থেকে বেশ উঁচুতে থাকবে। প্রথম বছর বাঁধ হাটিহাটি পা করে নর্থব্রুক হল ঘাট থেকে ওয়াইজঘাট পর্যন্ত এগিয়ে যায়। ঢাকার বেশ কিছু লিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায়- সরকারিভাবে পুরো বাঁধ নির্মাণের খরচ কুলিয়ে উঠতে না পারায় ঢাকার ধনী ব্যক্তিরা বাঁধ নির্মাণে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসেন।

বাঁধের পূর্ব অংশটুকু তৈরি হয়েছিলো রূপলাল আর রঘুনাথ সাহার যৌথ উদ্যোগে, পশ্চিমের অংশের কাজে সহায়তা করেছিলেন নবাব আবদুল গণি, বাদবাকি মাঝের অংশটুকু নির্মিত হয়েছিলো সরকারি খরচে। এভাবেই তৈরি হতে থাকে ‘বাকল্যান্ড বাঁধ’। পরে বিভিন্ন সময় প্রয়োজনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাঁধের পরিধি বাড়তে থাকে।

ছবিতে ১৮৮০ সালে বাকল্যান্ড বাঁধের অংশবিশেষ; Source: en.banglapedia.org

তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাঁধের যে অংশগুলো নির্মিত হয়েছিলো, সেগুলো কেউই কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেনি। তবে বাঁধের মালিকানা হস্তান্তর না করলে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এসে পড়ে কর্তৃপক্ষের কাঁধেই। সময়ে সময়ে বুড়িগঙ্গা তার গতিপথ বদলেছে। বাকল্যান্ড বাঁধের ফ্রেমে বাঁধা যায়নি এই নদীকে। ১৮৬৪ সালে যে বুড়িগঙ্গা বয়ে যেত লালবাগ কেল্লা, রায়েরবাজার আর পিলখানা ঘাটের ধার ঘেঁষে, সময়ের সাথে সেই বুড়িগঙ্গা সরে যেতে থাকে দক্ষিণে। উত্তরে জমতে থাকা পলি জন্ম দিতে থাকে শহরের আরেকটি অংশকে।

১৮৮৫ সালে বুড়িগঙ্গার তীর অনেকটা এরকমই ছিলো; Source: The British Library

মোঘল, ব্রিটিশ আর পাকিস্তান আমল পেরিয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার সন্তান ঢাকার বয়স ছাড়িয়ে গেছে ৪০০ বছর। বাকল্যান্ড বাঁধের তীরে গড়ে উঠা এই শহরের উন্নয়নের জঞ্জাল এই নদীকে একটু একটু করে ধ্বংস করে দিয়েছে। চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। কিন্তু এই চামড়া শিল্পের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে অশোধিত বর্জ্য এসে পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।

বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য; Source: Allison Joyce/Getty Images

সাম্প্রতিক এক হিসেবানুযায়ী পাঁচ শতাধিক ট্যানারীর ৪.৭৫ মিলিয়ন লিটার বিষাক্ত বর্জ্য এসে বুড়িগঙ্গাতে এসে পড়ছে। ট্যানারি থেকে বাদ যাওয়া চামড়ার অংশ থেকে শুরু করে বিষাক্ত সব ভারী ধাতুর শেষ ঠিকানা এই বুড়িগঙ্গা। অনেক কম মূল্যে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ববাজারে নিজেদের স্থান ধরতে গিয়ে আমরা বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে তুলেছি ট্যানারি, যার অপরিশোধিত বর্জ্যের প্রতিটি ফোঁটা এই নদীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের গ্রিন ক্রস আর ব্ল্যাকস্মিথ ইন্সটিটিউট এর দেওয়া তথ্য অনুসারে হাজারীবাগ এবং আশপাশের এলাকায় পৃথিবীর দূষিত স্থানগুলোর মাঝে পঞ্চম।

হাজারীবাগ এলাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত স্থানগুলোর একটি; Source: Allison Joyce/Getty Images

এই নদীকে কেন্দ্র করে ঢাকা হয়ে ওঠে অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক নগরী। পণ্য আদান-প্রদান থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহন, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সবই বাড়তে থাকে। জলযান আর গৃহস্থালি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২১,৬০০ ঘন মিটার কঠিন বর্জ্যের ঠাই হয় বুড়িগঙ্গায়।

শুধু কি তা-ই? ট্যানারি, জলযান আর গৃহস্থালি বর্জ্য! নদীর তীর জুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট বড় পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ, রঙ আর বিষাক্ত দ্রব্যাদি এই নদীকে কোনো জলজ প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী করে দিয়েছে।

বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে রঙ; Source: thethirdpole.net

বুড়িগঙ্গার পাশ দিয়ে যেখানে হেঁটে যাওয়াই মুশকিল হয়ে গেছে, সেখানে কি আদৌ কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব? সদরঘাট সহ বিভিন্ন এলাকার পানির নমুনা সংগ্রহ করে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে, বেড়ে গেছে বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ। শুধু দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ নয়, পানির বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের যত ধরনের সূচক আছে সব ধরনের সূচকেই বুড়িগঙ্গার পানি জলজ প্রাণী বসবাসের অনুপযোগী। এই পরিমাণ বিষাক্ত পদার্থ আর ভারী ধাতুর অভয়ারণ্যের মধ্যে কোনো জলজ প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থেকে আসলেই কঠিন। মাছ তো দূরে থাক, সাধারণ অন্য কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও চোখে পড়ে না এই নদীতে।তবে শহর থেকে যত দূরে যাওয়া যায় এই নদীতে দূষণের মাত্রা ততই কম। বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে নদীতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

বুড়িগঙ্গার দূষিত পানির বর্তমান অবস্থা; Source: assets.irinnews.org

যে নদীর হাত ধরে গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর, সেই নদী যদি মরে যায় তাহলে ঢাকা কি বেঁচে থাকবে? নদীর তীর জুড়ে গড়ে উঠা সকল শিল্প কারখানাকে অবিলম্বে তাদের বর্জ্যকে পরিশোধন করে নদীতে ফেলতে বাধ্য করতে না পারলে এই নদীকে বাঁচিয়ে তোলা খুবই কঠিন। পলিথিনের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া এই বুড়িগঙ্গাকে বাঁচিয়ে তুলতে দরকার সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জমা হওয়া বর্জ্য অপসারণ করতে হলে হাতে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নদীর তীর জুড়ে বসবাস করা কিংবা নদীর উপর অবলম্বন করে বেঁচে থাকা মানুষকে দূষণের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। অন্যথায় প্রতিদিন একটু একটু করে এই নদীর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবে ঢাকার মানুষ।

Feature Image: collections.vam.ac.uk

43
By Monem Ahmed
বিজ্ঞানীদের এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষার কথা ভাবলে আমাদের মাথায় কেমন চিত্র ভেসে ওঠে? মনে হয় গোমড়ামুখো কিছু বিজ্ঞানী রাত-দিন এক করে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে জটিল সব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন আর গাদা গাদা অংক কষছেন। কিন্তু বিজ্ঞানের সব পরীক্ষা এমন রসকষহীন ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া নয়। কিছু পরীক্ষা অনেকটা অদ্ভুতুড়ে ধরণের হয়, কিছু পরীক্ষা আবার মানুষকে বিনোদনও দেয়। আজকের লেখায় আমরা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের প্রথমদিকের এমন কিছু কাণ্ড-কারখানা সম্পর্কে জানবো।
আনন্দদায়ক বা ততটা জটিল ছিল না বলে এসব পরীক্ষা কিন্তু হেলাফেলা করার মতো কোনো বিষয় নয়। বিদ্যুৎ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে এদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক এমন তিনটি অদ্ভুত বিষয় সম্পর্কে।
দ্য ফ্লাইং বয় এক্সপেরিমেন্ট

দ্য ফ্লাইং বয়; Source: diatrope.com
একে পরীক্ষা না বলে হয়তো প্রদর্শনী বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ বিজ্ঞানী স্টিফেন গ্রে এটিকে ঠিক পরীক্ষা হিসেবে পরিচালনা করতেন না। তিনি তার বিদ্যুৎ বিষয়ক জ্ঞান ব্যবহার করে জনতাকে বিনোদন দেয়ার জন্য এটি পরিচালনা করতেন। দর্শকরা বিদ্যুতের জাদু দেখে আনন্দ পেলেও এ পরীক্ষায় অংশ নেয়া ছেলেটির জন্যও যে এটি আনন্দদায়ক হতো এমনটি বলা চলে না। পরীক্ষাটি সম্পর্কে জানার আগে চলুন বিদ্যুৎ বিষয়ে তখনকার জ্ঞান কোন স্তরে ছিল তা একটু জেনে নেই।
সময়টা ছিল আঠারো শতকের শুরুর দিকে, বিদ্যুৎ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের উল্লেখযোগ্য অর্জন বলতে ছিল কেবল অটো ভন গুয়েরিকের সালফার বল। কাপড়ের সাথে ঘষে এতে বেশ ভালো পরিমাণ বৈদ্যুতিক আধান জমা করা যেত। তবে বিদ্যুৎ পরিবহন সম্পর্কে জ্ঞান তখন ছিলো প্রায় শূন্যের কোঠায়। ১৭২৯ সালের দিকে স্টিফেন গ্রে প্রথম লক্ষ্য করেন বিভিন্ন পদার্থ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যুৎ পরিবাহী। যেমন ধাতব বস্তু বেশ ভালো বিদ্যুৎ পরিবহণ করে, অন্যদিকে কাঠ বা কাপড় বিদ্যুৎ পরিবহনে তেমন একটা সায় দেয় না।
তিনি আরো লক্ষ্য করলেন, ভূমি নিজেও বিদ্যুৎ পরিবাহীর ন্যায় আচরণ করে। কপার তার ব্যবহার করে তিনি প্রায় ৩০০ ফুট দূরের এক গুয়েরিক বল থেকে আরেক গুয়েরিক বলে বিদ্যুৎ পরিবহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তার এ জ্ঞানকে জনতার সামনে প্রদর্শনের জন্য একটি পরীক্ষার ছক সাজালেন। এটি করার জন্য তিনি একটি বালককে সিল্কের দড়ির সাহায্যে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ পরিবাহী ভূমি থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। যেকোনো ধরনের পরিবাহী থেকে সে সম্পূর্ণ পৃথক থাকতো।

স্টিফেন গ্রে; Source: youtube.com
এরপর তিনি ছেলেটির পায়ে একটি চার্জিত গুয়েরিক বল স্পর্শ করতেন। এতে ছেলেটির শরীর চার্জিত হতো। এবার শুরু হতো তার বিদ্যুতের জাদু দেখানোর পালা। কখনো তিনি ছেলেটির নিচে মেঝেতে ফুলের পাপড়ি রেখে দিতেন। ছেলেটির শরীর চার্জিত হওয়ায় ফুলের পাপড়িগুলো তার দিকে আকর্ষিত হতো এবং ছেলেটিকে কেন্দ্র করে শূন্যে ভাসতে থাকতো। কখনো বা তিনি একটি বই মেলে ধরতেন ছেলেটির হাতের সামনে। ছেলেটি বইয়ের পাতা স্পর্শ না করেই পাতা ওল্টাতে পারতো। জনতা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেত এসব দৃশ্য দেখে।
কখনো এ ক্ষমতা ছেলেটি দর্শকসারির কাউকেও দিত। আগ্রহী কাউকে ডেকে এনে তাকে একটি অপরিবাহী ড্রামের ওপর দাঁড় করানো হতো। তারপর ছেলেটি তাকে স্পর্শ করতো। অপরিবাহী বস্তুর ওপর দাঁড়ানো বলে তিনি কিছু অনুভব করতেন না, কিন্তু চার্জিত হতেন। একটু পর দেখা যেত সে দর্শকও বালকটির মতো বৈদ্যুতিক ক্ষমতা লাভ করেছেন। তবে স্থির-বৈদ্যুতিক আকর্ষণের খেলা এখানেই শেষ নয়। তার সর্বশেষ পরীক্ষাটা অন্যগুলোর মতো নিরীহ ছিল না।
তিনি জানতেন চার্জের পরিমাণ অধিক হলে ডিসচার্জের সময় স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়। তিনি ছেলেটিকে আরো চার্জিত করতেন। হলের বাতি ঢিম করে দেয়া হতো। এরপর ডেকে আনা দর্শককে অপরিবাহী বস্তু থেকে নামিয়ে এনে বলতেন ছেলেটিকে স্পর্শ করতে। যখন লোকটির আঙ্গুল ছেলেটির আঙ্গুলের দিকে এগোত, সবাই একটি জোরালো শব্দ শুনতে পেতো আর দেখতো উজ্বল বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ খেলে যাচ্ছে দু’জনের আঙ্গুলের মাঝে। এ শক ছেলেটির জন্য সুখকর হতো বলে মনে হচ্ছে?
তবে স্টিফেন গ্রে’র এ পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ বিদ্যুতকে আরো ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। এটি সেসময়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিষয় হয়ে উঠছিল। গোটা ইউরোপেজুড়ে এ নিয়ে আলোচনা, লেখালেখি হতে শুরু করে। ১৭৩১ সালে তার এ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ রয়্যাল সোসাইটি তাকে সর্বপ্রথম কপলি পদক প্রদান করে। বিজ্ঞানের যেকোনো শাখায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য এ পদকটি এখনো দেয়া হয়ে থাকে।
লেইডেন জার ও এক পাদ্রীর গল্প

লেইডেন জার; Source: wikipedia
১৭৪৫ সালের দিকে ডাচ অধ্যাপক পিটার ভন ম্যাশেনব্রোক বৈদ্যুতিক আদান জমা রাখার বিষয়টিকে সাধারণ গুয়েরিক গোলক থেকে আরো একটু এগিয়ে নিয়ে আসেন। বিশেষভাবে নির্মিত কাঁচের বোতলের মাধ্যমে ‘লেইডেন জার’ তৈরি করেন তিনি। এর গঠন ছিল একদমই সাধারণ। একটি কাঁচের বোতলের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে ধাতব পদার্থ দিয়ে ঘিরে রাখা হতো। ক্যাপাসিটরের গঠন সম্পর্কে ধারণা থাকলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, এটিই ছিল ক্যাপাসিটরের সর্বপ্রথম সংস্করণ। কাঁচের দেয়ালের দু’পাশের পরিবাহী ধাতব পাতগুলো কাজ করতো তড়িৎদ্বার হিসেবে, আর মাঝখানে কাঁচ ডাই-ইলেকট্রিক পদার্থ।
এ তড়িৎদ্বারগুলোকে গুয়েরিক গোলকের মাধ্যমে চার্জ দেয়া যেতো। এরপর যখন একটি পরিবাহী তার দ্বারা ভেতরে ও বাইরের দেয়ালকে যুক্ত করে দেয়া হতো তখন এটি স্ফুলিঙ্গ ও শক সহ ডিসচার্জ হতো। লেইডেন জার অসাধারণ এক উদ্ভাবন ছিল সে সময়, কারণ এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক চার্জ কেবল জমা করে রাখাই যেত না, পাশাপাশি একে বহন করে অন্য কোথাও নিয়েও যাওয়া যেত ডিসচার্জের জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কৌতূহলী মানুষজন এ নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন তখন। তবে এক খ্রিস্টান পাদ্রী যা করেছেন তার জুড়ি মেলা ভার।
১৭৪৬ সালে ফরাসী পাদ্রী জ্যান-অ্যান্টোনি নোলেট তার আশ্রমে এক পরীক্ষার আয়োজন করেন। তিনি প্রায় এক মাইল জায়গা জুড়ে দু’শ পাদ্রীকে বৃত্তাকারে দাঁড় করিয়ে দেন। এরপর তাদের প্রত্যেকের হাতে পঁচিশ ফুট লম্বা পিতলের পাত ধরিয়ে দেয়া হলো, পাশাপাশি দুজন একই পাত ধরে দাঁড়ালেন। এভাবে সবাই সংযুক্ত হলেন একে অপরের সাথে। নলেট এবার বিশেষভাবে নির্মিত, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং পুরোপুরি চার্জড একটি লেইডেন জার নিয়ে হাজির হলেন। তিনি প্রথম ও শেষ পিতলের পাতকে যুক্ত করে দিলেন লেইডেন জারের দুই তড়িৎদ্বারের সাথে।

নোলেট এর এক্সপেরিমেন্ট; Source: sciencesource.com
মুহূর্তের মধ্যে লেইডেন জার থেকে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ল বেচারা পাদ্রীদের শরীরে। তারা সবাই যেন সাময়িকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেলেন, বজ্রাহত ব্যক্তির মতো তাদের মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে জমাট বেঁধে গেল। নোলেট তার এ পরীক্ষার মাধ্যমে আসলে বুঝতে চেয়েছিলেন, মানুষের শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ কতটা দ্রুত প্রবাহিত হয়। এ পরীক্ষা শেষে স্বাভাবিকভাবেই তার সিদ্ধান্তে ছিল ‘অতি দ্রুততার সাথে’।
নোলেটের মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে দ্রুত বার্তা আদান-প্রদানের জন্য বিদ্যুৎকে ব্যবহার করা যায়। এ জন্য তিনি এ নিয়ে আরো পরীক্ষা করতে আবার পাদ্রীদের সাহায্য চাইলেন। কিন্তু ন্যাড়া আর কয়বার বেলতলায় যায়? পাদ্রীরা প্রথমবারের ‘সুখকর’ অভিজ্ঞতা ভোলেননি, তাই তারা সহায়তা করতে অস্বীকার করলেন। আর কোথাও কোনো সুযোগ না পেয়ে শেষে তিনি ধর্না দিয়েছিলেন ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের কাছে। রাজা তার কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করে তার পরবর্তী পরীক্ষার জন্য ১৮০ জন রাজকীয় পাহারাদার দিলেন। বেচারা পাহারাদারদের কপাল!
ইলেকট্রিক কিস

ইলেকট্রিক কিস; Source: wikipedia
সেসময় বিদ্যুৎ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের এসব গবেষণা মানুষকে আকৃষ্ট করে, নোলেট, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, কুলম্বদের মতো বিজ্ঞানীদের কাজ দেখে সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে বিদ্যুৎ নিয়ে। এ আগ্রহের ফলে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে, ছোটখাট বৈদ্যুতিক শক নেওয়া তখন ফ্যাশন হয়ে ওঠে। বার বা পাবে রাখা লেইডেন জার থেকে মানুষ এ শক নিত। এ শক নেয়ার বিষয়টিই পরিচিত হয়ে ওঠে ‘ইলেকট্রিক কিস’ নামে।
ওপরের এসব পরীক্ষা বা প্রদর্শনীগুলো উদ্ভট হলেও এসব বিদ্যুৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে। কৌতূহলি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে বিদ্যুৎ নিয়ে জানতে, কাজ করতে। এসময়টি ছিল এ বিষয়ে জ্ঞানের ভিত গড়ার সময়। সে ভিতের ওপরই আরো বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ভিশনারিদের কাজের ফলে সম্ভব হয়েছে আজকের ইলেকট্রনের যুগ, আমাদের আধুনিক সভ্যতা।
তথ্যসূত্র: Conquering the Electron by Derek Cheung , Eric Brach , page (12-16)
ফিচার ইমেজ: devianart.com

44
By Tiasha Idrak
নূর হোসেনকে মনে পড়ে? নিজের শরীরকে ক্যানভাস বানিয়ে যিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে? “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”, তার বুকে-পিঠে সাদা রঙ দিয়ে সেই লেখা, যার জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছিল? অথচ এরই জন্য তিনি এদেশের ইতিহাসের পাতায় হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের এক অনন্য প্রতীক।
’৫২ থেকে ’৭১, বাংলার ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বহু নিদর্শন আছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও জনমানুষের অধিকারের দাবিতে, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নিদর্শন আছে অনেক। ’৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ’১৩ এর গণজাগরণ মঞ্চ, এমনকি সাম্প্রতিককালের কোটা সংস্কার আন্দোলন – দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছে সাধারণ মানুষ। বিশ্বজুড়ে বহু দেশেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রাণের দাবিতে সাধারণ মানুষ নেমে এসেছে রাজপথে। অনেক সময়ই তাদের প্রতিবাদের ভাষা ছিল যেমন অভিনব, তেমনই শক্তিশালী। বিশ্বজুড়ে এমনই কতগুলো প্রতিবাদের নিদর্শন এখানে দেয়া হলো।
১. রাস্তা জুড়ে শ্রমিকদের হেলমেট বিছিয়ে রাখা – ইতালি
২০১২ সালের অক্টোবর মাস। অর্থনৈতিক মন্দায় জর্জরিত ইতালিতে অনেকটা হুট করেই বহু কারখানা বন্ধ করে দেয় মারিও মন্টি সরকার। একে অর্থনৈতিক সঙ্কট তার উপর হঠাৎ বেকারত্বের দরুন দিশেহারা হয়ে পড়ে তৎকালীন সাধারণ শ্রমিকরা। পেটের তাগিদে, কারখানা খোলার দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়েন হাজার হাজার শ্রমিক। এসময় সার্ডিনিয়ার শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের একটি অভিনব উদাহরণ উপস্থাপন করেন।

কারখানা খোলা রাখার দাবিতে ইতালির শ্রমিকদের রাস্তায় হেলমেট রেখে প্রতিবাদ, Source- trueactivist.com
প্ল্যাকার্ড বা স্লোগান নয়, বরং শ্রমিকদের পরনের হেলমেটখানা রাস্তায় রাখেন একে একে সকলে। একেকটি হেলমেট যেন একেকজন শ্রমিক, তাদের বেদনা।
ইতালির রাস্তায় শোভা পায় সারি সারি, হাজার হাজার হেলমেট। শ্রমিকের হেলমেটের রঙে হলুদ হয়ে যায় ইতালির ধূসর রাস্তাগুলো।
২. পুলিশের উপর ইইউ খামারিদের দুগ্ধ কামান – বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের পুলিশের উপর দুগ্ধকামান; Source- trueactivist.com
২০১২ সালের নভেম্বর মাসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশ ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস থেকে হাজার হাজার দুগ্ধ খামারি ট্র্যাক্টরে চেপে উপস্থিত হন ব্রাসেলস শহরে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সামনে এসে জড়ো হন তারা, উদ্দেশ্য স্থানীয় খামারিদের স্বার্থবিরোধী ইইউ এর নীতিকে প্রতিহত করা। ইইউ এর প্রস্তাবিত নীতির কারণে ডেইরি বাজার থেকে স্থানীয় খামারিদের বের করে দেয়ার আশঙ্কায় তারা এর প্রতিবাদ জানান। কিন্তু আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশী আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা গেলে খামারিরা নিজেরাই পুলিশের উপর তাদের ‘দুগ্ধ কামান’ চালান।
৩. মানুষের বদলে জুতো দিয়ে র‍্যালি – ফ্রান্স
২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর । বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং এর বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে একটি র‌্যালিতে অংশগ্রহণের জন্য প্যারিসে জমায়েত হবার কথা ছিল দেশ-বিদেশের ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের। কিন্তু এর কিছুদিন আগে অর্থাৎ নভেম্বরের ১৩ তারিখে প্যারিস হামলায় ১৩০ জনের মৃত্যু হবার পর দেশটিতে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়। এর কারণে যেকোনো ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করে দেয় ফ্রান্স সরকার। জলবায়ু পরিবর্তন বিরোধী র‌্যালি বাতিল হয়ে যাবার কারণে আশাহত হন অনেকেই। কিন্তু র‌্যালিটির আয়োজক একটি এনজিও আভাজ (Avaaz.org) থেমে যেতে চায়নি, তাই তারা প্রতীকী আন্দোলনের একটি অভিনব উপায় বের করেন, অংশগ্রহণকারীদের জুতো জোড়া পাঠিয়ে দেয়ার আহবান জানান। তাদের ডাকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। বাক্সে বাক্সে উপস্থিত হয় হাজার হাজার জুতো। র‌্যালির দিন দেখা যায় প্যারিসের Place de la République এ হাজার হাজার জুতো সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এ যেন যে র‌্যালিটি সেদিন হবার কথা ছিল তারই প্রকাশ।

মানুষের বদলে জুতার র‌্যালি ; Source- huffingtonpost.ca
এমনকি পোপ ফ্রান্সিস নিজেই তাঁর এক জোড়া জুতো পাঠিয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন।
সেদিন প্যারিসে ঠিক কতগুলো জুতো রাখা হয়েছিল বলতে পারবেন কি? প্রায় ২২,০০০ জোড়া জুতো!
৪. দ্য আমব্রেলা মুভমেন্ট – হংকং
চীনের শাসনাধীন হংকং এর রাস্তায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে নেমে এসেছিল হাজার হাজার মানুষ, ছাতা হাতে অবস্থান কর্মসূচিতে।

দ্য আমব্রেলা মুভমেন্ট ;Source- mantlethought.org
তাদের দাবি, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন। বিস্তারিত বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হংকং এর শাসক তথা চিফ এক্সিকিউটিভের নির্বাচন। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে বের হবার পর দেশটির উপর কর্তৃত্ব লাভ করে চীন। চীনের মতে, চীফ এক্সেকিউটিভ পদটি নির্বাচনের জন্য হংকং এর চীন ঘেঁষা গোষ্ঠী এবং টাইকুনদের দ্বারা গঠিত নির্বাচন কমিটি যথেষ্ট। আমব্রেলা মুভমেন্টের আন্দোলনকারীরা এর বিরুদ্ধে ছাতা হাতে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয়। সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে ছাতাধারী মানুষে ছেয়ে যায় হংকং এর রাস্তাগুলো, যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় অনেকগুলোতে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এতকিছু থাকতে ছাতা কেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে আন্দোলনকারীরা বলেন, পুলিশের পিপার-স্প্রে থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করা হয়। এভাবে এ ছাতাই তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা আদায়ের আন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এসে পুলিশী বাধার দরুন ৩ মাসব্যাপী এ অবস্থান কর্মসূচি ভেস্তে যায়, তারপরও এটি হংকং এর বৃহৎ জনআন্দোলনের একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫. ‘হেড ইন দ্য স্যান্ড’ প্রতিবাদ – অস্ট্রেলিয়া
২০১৪ সালের নভেম্বরের ১৩ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বন্ডি সমুদ্র সৈকতে জড়ো হয় ৪০০ জন মানুষ। এর কিছুদিন পরই নভেম্বরের ১৫-১৬ তারিখে ব্রিসবেনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের এজেন্ডায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি রাখতে সারা বিশ্বের অধিকাংশ নেতাদের সায় থাকলেও অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটের বিরোধিতার কারণে সেটা এজেন্ডাভুক্ত করা হয়নি।

হেড ইন দ্য স্যান্ড; Source- riledupjournal.com
অ্যাবটের জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর বিপদকে অস্বীকার করাটা অনেকটা উট পাখির বালুতে মাথা গোঁজার সামিল, এমনটাই মনে করেছিল অনেকেই। আর এটাই মাথায় রেখে তারা জড়ো হয়েছিল বন্ডি সৈকতে, আর একসাথে মাথা গুঁজে ফেলে তারা বালুতে। বিপদ দেখে উট পাখি যেমন বালুতে মাথা গুঁজে, তেমনই অ্যাবটও জলবায়ু পরিবর্তনকে দেখেও না দেখার ভান করেন, অস্বীকার করেন। অথচ এটা করে কিন্তু বিপদের কোনো সমাধান হয় না- এমনটাই বোঝাতে বালুতে মাথা গুঁজে প্রতীকী প্রতিবাদ করেন তারা।
৬. মোমবাতি আন্দোলন – দক্ষিণ কোরিয়া
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হল মোমবাতি প্রজ্বলন। একটি মোমবাতির কোনো শক্তি নেই, অথচ শতটি মোমবাতির শক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি। এখন মোমবাতির সংখ্যা হাজার হয়, আরো বেশি। এখন যদি সেই মোমবাতির সংখ্যা হয় লক্ষাধিক, তাহলে?
কতখানি শক্তিশালী সেই প্রতিবাদ? কী করতে সক্ষম হবে সেই গণ আন্দোলন?

দক্ষিণ কোরিয়ার মোমবাতি আন্দোলন; Source- abc.net.au
ঠিক এ প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার এই গণ আন্দোলনে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত রাষ্ট্রপতি পার্ক গিউন হাই এর অব্যাহতির দাবিতে দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তায় নেমে আসে সর্বস্তরের সব বয়সের মানুষ। হাতে তাদের মোমবাতি। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের ২৬ তারিখে শুরু হওয়া এই আন্দোলন চলে প্রায় ৬ মাসব্যাপী। দেইগু থেকে সিউল, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিটি শহরে গণ আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তো শেষমেশ এই আন্দোলনের ফল? রাষ্ট্রপতি পার্কের অভিশংসন ঘটাতে বাধ্য হয় দক্ষিণ কোরিয়ো শাসক গোষ্ঠী।
অথচ এটি একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছিল।
সফল হোক বা ব্যর্থ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সময়ের সাথে সাথে হতে থাকবে বারবার। যা কিছু ন্যায় এবং কল্যাণকর তার জয় কামনা করা, তার জন্য চেষ্টা করার সৎ সাহস কামনা করে এখানেই শেষ করছি।
ফিচার ছবিসূত্র- qz.com

45
By Mehedi Hasan Nirob

হলিউডের চলচ্চিত্র পরিচালকদের একটি তালিকা করা হলে একদম উপরের দিকে থাকা নামগুলোর মধ্যে জেমস ক্যামেরন যে থাকবেন এটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। তবে বেশীরভাগ মানুষ তাকে শুধু পরিচালক হিসেবে চিনলেও তিনি কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশী কিছু। কানাডিয়ান এই চলচ্চিত্র নির্মাতা একাধারে একজন প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়ার। গভীর সমুদ্র নিয়েও তার অনেক কৌতুহল। নিজের বানানো সাবমেরিন দিয়ে সাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ডুব দিয়ে এসেছেন। তিনি তার চলচ্চিত্রে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেন সেগুলোকে একেকটা মাইলফলক হিসেবেও ধরা যায়। অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তি তার অ্যাকশনধর্মী ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীমূলক চলচ্চিত্রগুলোকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

এখানেই কেটেছে জেমস ক্যামেরনের শৈশব

তার জীবনের গল্পটাও কিন্তু চিত্রনাট্যের মতোই অনেকটা।

জেমস ফ্রান্সিস ক্যামেরনের জন্ম ১৯৫৪ সালে কানাডার অন্টারিওতে। তার মা ছিলেন একজন আর্টিস্ট এবং বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তার পরিবার যখন ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে চলে আসে তখন তার বয়স ১৭ বছর। সেখানে তিনি ফুলারটন কলেজে ভর্তি হন পদার্থবিজ্ঞান পড়ার জন্য। কিন্তু সেখানে বেশীদিন টিকতে পারলেন না। এক বছর যেতে না যেতেই ড্রপ আউট হয়ে গেলেন কলেজ থেকে।

স্কুলের ল্যাবে জেমস ক্যামেরন

এরপর ট্রাক ড্রাইভারের কাজ নিলেন তিনি এবং সময় পেলে মাঝে মাঝে লেখালেখিও করতেন একটু আধটু। পরে তিনি বলেছেন এই সময়টাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইউএসসি লাইব্রেরীতে নিয়মিত যেতেন এবং ফিল্ম টেকনোলজির সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের বই কিংবা থিসিস পেপার পড়ে ফেলতেন বা খাতায় নোট করে রাখতেন। এই সময়টাতে তিনি অপটিক্যাল প্রিন্টিং, ফ্রন্ট স্ক্রীন প্রজেকশন কিংবা ডাই ট্রান্সফারের মতো বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেছেন যা তাকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় বিস্তর সাহায্য করেছে।

এরপর ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনা তার জীবনকে পুরোপুরি পাল্টে দিল। ওই বছর মুক্তি পেল বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিরিজ স্টার ওয়ার্স এর চতুর্থ কিস্তি এ নিউ হোপ (A New Hope)। ওই চলচ্চিত্র দেখে তিনি বুঝতে পারলেন শিল্প এবং বিজ্ঞান কতটা কাছাকাছি থাকতে পারে। এরপর ট্রাক ড্রাইভারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্যামেরন ঝুঁকে পড়লেন চলচ্চিত্রের দিকে।

তিনি তার দুই বন্ধুকে নিয়ে জেনোজেনেসিস (Xenogenesis) নামে একটি ১০ মিনিটের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললেন। কিন্তু শ্যুট করার মতো যথেষ্ট টাকা তাদের হাতে নেই। শেষ পর্যন্ত বন্ধু-বান্ধবদেরকে নিয়ে চাঁদা তুলে ৩৩ মিলিমিটার ক্যামেরা, লেন্স, ফিল্ম স্টক এবং স্টুডিও ভাড়া করে ফেললেন। তারা ক্যামেরাটি পুরোটা খুলে এর বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন এটা বোঝার জন্য যে ফিল্ম ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে।

বলা যায় জেমস ক্যামেরন ছিলেন জেনোজেনেসিস এর পরিচালক, লেখক, প্রযোজক এবং প্রোডাকশন ডিজাইনার। এরপর তিনি রক এন্ড রোল হাই স্কুল (Rock and Roll High School) নামে একটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন প্রোডাকশন সহকারী হিসেবে। কিন্তু এই কাজের জন্য কোনো স্বীকৃতি তিনি পাননি। তারপরও থেমে না গিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর কায়দা-কানুন নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রজার কোরম্যান স্টুডিওতে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির মডেল বানানোর কাজ শুরু করেন এই সময়টাতে। এরপর ১৯৮১ এবং ১৯৮২ এই দুই বছরে চারটি চলচ্চিত্রে আর্ট ডিজাইনার, প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।

পিরানহা মুভির সিকুয়্যাল পিরানহা-২ তে কাজ করার জন্য ইটালির রোমে যান ক্যামেরন। সেখানে ফুড পয়জনিং এর কারণে একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় একদিন রাত্রে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন ভবিষ্যৎ থেকে একটি রোবট পাঠানো হয়েছে তাকে খুন করার জন্য। এই স্বপ্ন থেকেই তিনি তার দ্য টারমিনেটর (The Terminator) চলচ্চিত্রের আইডিয়া পান। বলা যায় এখান থেকেই তার উত্থান শুরু হয়।

এখন পর্যন্ত জেমস ক্যামেরনের পরিচালিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা সাতটি। তার পরিচালিত কয়েকটি চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাহলে একটু জেনে নেওয়া যাক।
১. দ্য টারমিনেটর (১৯৮৪)

ক্যামেরন দ্য টারমিনেটর (The Terminator) চলচ্চিত্রটির জন্য চিত্রনাট্য লিখে সেটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন যাতে ছবিটি পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু কোনো প্রোডাকশন কোম্পানী তার মতো একজন অনভিজ্ঞ লোককে এরকম একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করার দায়িত্ব দিতে রাজি হচ্ছিল না। শেষমেশ হেমডেল পিকচার্স (Hemdale Pictures) নামে একটি কোম্পানী তাকে পরিচালকের দায়িত্ব দিতে রাজি হলো। কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি বানানোর জন্য বাজেট ছিল খুবই কম, মাত্র ৬.৫ মিলিয়ন ডলার। অবশ্য ক্যামেরন ততদিনে শিখে গেছেন কীভাবে কম বাজেটে দক্ষতার সাথে কাজ আদায় করে নিতে হয়।

টারমিনেটরের সেটে জেমস ক্যামেরন

এই সিনেমাটিতে টারমিনেটরের ভূমিকায় অভিনয় করেন আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। ২০২৯ সাল থেকে তাকে অতীতে (১৯৮৪) পাঠানো হয়েছিলো সারা কনর নামে একজনকে হত্যা করার জন্য। কারণ সারা কনরের ছেলে একদিন যন্ত্রশক্তিদের বিরুদ্ধে মানব সমাজকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।

সবাই ভেবেছিল এটিও হবে আর আট-দশটা সাধারণ সায়েন্স ফিকশন মুভির মতো, যা হয়ত থিয়েটারে এক সপ্তাহের বেশী টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বক্স অফিস হিট হয় টার্মিনেটর। দুর্দান্ত অ্যাকশন দৃশ্য আর দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া কাহিনী দর্শকরা দারুণভাবে গ্রহন করে। সেই সঙ্গে শোয়ার্জনেগারের অভিনয় ছিলো আক্ষরিক অর্থেই দেখার মতো। সারা বিশ্বে ৭৮ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী আয় করে এই সিনেমাটি।
২. এলিয়েনস (১৯৮৬)

ক্যামেরন ১৯৭৯ সালে রিডলি স্কটের এলিয়েন (Alien) সিনেমাটির একটি সিকুয়্যাল বানানোর কাজ শুরু করেন এবং এর নাম রাখেন এলিয়েনস (Aliens)।

সিনেমার প্রধান চরিত্র হচ্ছে এলেন রিপ্লে। এলেন রিপ্লেকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন সে দাবি করে এলিয়েনরা তাদের স্পেসশিপ ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং শিপের বাকি সবাইকে মেরে ফেলে। কিন্তুই কেউই তার কথা বিশ্বাস করে না। একটি কলোনীকে দায়িত্ব দেয়া হয় পুরো ব্যাপারটা তদন্ত করতে। কিন্তু কোনো এক কারণে তাদের সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এলেন রিপ্লেকে পাঠানো হয় উদ্ধার অভিযানে। কিন্তু সে তখনো জানে না কি ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে তার সামনে। এভাবে এগিয়ে চলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীমূলক এই অ্যাকশন হরর সিনেমার কাহিনী।

শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে এলিয়েন সিনেমার কর্মকর্তাদের সাথে তার বনিবনা হচ্ছিল না। তারা মনে করতো জেমস ক্যামেরন রিডলি স্কটের মতো ভালো পরিচালক নন। এত ঝামেলার পরও সিনেমাটি বক্স অফিসে সফলতা পায়। এছাড়া বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরীতে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয় এলিয়েনস সিনেমাটি।
৩. দ্য অ্যাবিস (১৯৮৯)

জেমস ক্যামেরন এই সিনেমাটির আইডিয়া পান তার হাই স্কুলের একটি বায়োলজি ক্লাস থেকে। একটি আমেরিকান সাবমেরিন ক্যারিবিয়ানে ডুবে গেলে উদ্ধারকারী একটি দল তেল কারখানার কিছু শ্রমিককে সাথে নিয়ে গভীর সমুদ্রে মিশনে যায়। গভীর সমুদ্রে তারা অদ্ভুত কিছু প্রাণীর সন্ধান পায়। এভাবে এগিয়ে যায় এই সিনেমার কাহিনী।

শুরুর দিকে এই সিনেমার বাজেট ছিল ৪১ মিলিয়ন ডলার যা দ্য অ্যাবিস (The Abyss)-কে ওই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমাগুলোর একটিতে পরিণত করে। সিনেমাটির সেট তৈরী করার জন্য একটি অসমাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিল্ডিং এবং দুইটি বিশাল সাইজের ট্যাংক ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়া ওই সময়ে সিনেমাটিতে এমন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল যেটি হয়ত সম্ভব হয়েছে কেবল জেমস ক্যামেরনের কারণেই। ক্যামেরনের অন্য সিনেমাগুলোর তুলনায় এই সিনেমাটি অবশ্য তেমন ব্যবসা করতে পারেনি।
৪. টাইটানিক (১৯৯৭)

টাইটানিক নিয়ে জেমস ক্যামেরনের ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল। একটা সময়ে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন টাইটানিক ট্র্যাজেডির উপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। শুরু করলেন স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ। সিনেমাটি বানানোর আগে ক্যামেরন আটলান্টিকের তলদেশে সত্যিকারের টাইটানিকের ফুটেজ সংগ্রহ করেন যা পরবর্তীতে মূল সিনেমায় যোগ করা হয়।

টাইটানিক জাহাজে উচ্চবিত্ত সমাজের মেয়ে রোজের সাথে নিম্নবিত্ত সমাজের ছেলে জ্যাকের প্রেম এবং ১৯১২ সালে টাইটানিকের পরিণতির পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের কাহিনীকে সাদামাটা বলা যায়। কিন্তু এই সিনেমার ভিজুয়্যাল ইফেক্ট অসাধারণ বললেও হয়তো কম বলা হয়। বিশেষ করে টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। এজন্য তাকে স্কেল মডেলিং ও কম্পিউটার এনিমেশনের সাহায্য নিতে হয়েছে। চলচ্চিত্রটির প্রেমের গল্প আর প্রধান চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও অনেকগুলো পার্শ্ব চরিত্র ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

টাইটানিক সিনেমার সেটে কেট উইন্সলেট এবং লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওকে দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন জেমস ক্যামেরন

এই চলচ্চিত্র তৈরীতে মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তৎকালীন সময়ে এটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবি। ক্যামেরনের প্রবল উচ্চাকাঙ্খার এটি একটি উদাহরণ। প্যারামাউন্ট পিকচার্স ও টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সকে যৌথভাবে এই অর্থের যোগান দিতে হয়েছে। বিশাল বাজেটের কারণে মুক্তির আগেই ক্যামেরন ও তার টাইটানিককে সমালোচনার শিকার হতে হয়। সমালোচকরা ধারণা করেছিলেন ফক্স এবং প্যারামাউন্ট বিশাল লোকসানের সম্মুখীন হবে।

অস্কারের মঞ্চে জেমস ক্যমেরন

কিন্তু টাইটানিক মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। কয়েক মাসের জন্য এটি বক্স অফিসের তালিকায় ছিল এক নম্বরে। পুরো বিশ্বজুড়ে টাইটানিক আয় করলো মোট ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে সিনেমাটিকে তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী উপার্জন করা সিনেমার তালিকায় স্থান দেয়। পরবর্তীতে অবশ্য জেমস ক্যামেরনেরই অ্যাভাটার সিনেমাটি টাইটানিকের আয়ের রেকর্ড ভেঙে দেয়। ১৪টির মধ্যে ১১টি ক্যাটাগরীতেই একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার জিতে নেয় এই সিনেমাটি। জেমস ক্যামেরন পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার। টাইটানিক সিনেমার জ্যাকের মতোই ক্যামেরন অস্কারের মঞ্চে উঠে বলেছিলেন, “I am the king of the world!”।
৫. অ্যাভাটার (২০০৯)

পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ যার নাম প্যানডোরা। এই গ্রহের অধিবাসীদের বলা হয় নাভি, যারা দেখতে অনেকটা মানুষের মতোই। পৃথিবীর একদল লোভী মানুষ আর নিরীহ নাভীদের মধ্য এক অসম আর সাহসী যুদ্ধ নিয়েই গড়ে উঠেছে অ্যাভাটার (Avatar) সিনেমার কাহিনী।

সিনেমাটি বানানোর পরিকল্পনা ক্যামেরন করেছিলেন সেই ১৯৯৭ সালের টাইটানিক সিনেমার পর থেকেই। এরও আগে ১৯৯৫ সালে ৮০ পৃষ্ঠার একটি খসড়া স্ক্রিপ্টও লিখে ফেলেন সিনেমাটির জন্য। কিন্তু সিনেমাটি বানানোর জন্য যে প্রযুক্তি দরকার, তা ওই সময়ে ছিল না। প্যানডোরা গ্রহটির ডিজাইন থেকে শুরু করে সিনেমার প্রায় প্রতিটি অংশই কম্পিউটার এনিমেশনের সাহায্য নিয়ে করা। দ্য পোলার এক্সপ্রেস (The Polar Express) সিনেমাটিতে পরিচালক রবার্ট জেমেকিস পারফরম্যান্স ক্যাপচার টেকনিক ব্যবহার করেছিলেন। জেমস ক্যামেরন ব্যবহার করলেন এই টেকনিকেরই অনেক উন্নত একটি ভার্সন।

অ্যাভাটার সিনেমার পরিচালনার দায়িত্বে জেমস ক্যামেরন

অ্যাভাটার সিনেমার বাজেট ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার যা টাইটানিকের বাজেট থেকেও অনেক বেশী! আর এই সিনেমাটি আয় কত করেছিলেন জানেন? সারা বিশ্ব থেকে সিনেমাটি আয় করে ২.৭৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী!

অ্যাভাটারের এই জনপ্রিয়তা কারণে ২০১০ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশী আয় করা পরিচালকদের মধ্যে এক নম্বরে চলে আসেন জেমস ক্যামেরন। তার মোট সম্পদ তখন ২৫৭ মিলিয়ন ডলার!

জেমস ক্যামেরন সম্পর্কে সমালোচকদের প্রধান যে অভিযোগ সেটা হল তার লেখা স্ক্রিপ্টগুলোর কাহিনীর গভীরতা কম। অভিযোগ অবশ্য মিথ্যা নয়। তবে যে ধরনের সিনেমা তিনি তৈরী করেন, সেখানে কাহিনীর গভীরতা থাকা হয়ত অত আবশ্যকও নয়। এই কারণে সব জায়গায় গভীরতা খুঁজতে যাওয়া লোকেরা হতাশ হতে পারেন তার সিনেমাগুলো দেখে।

কিন্তু পরিচালক হিসেবে ক্যামেরনের সমালোচক খুব বেশী নেই। আর্টিস্টদের কাছ থেকে ষোল আনা কাজ আদায় করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। এই কারণে তার সাথে কাজ করা অনেকের কাছেই দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি শ্যুটিং শুরু হওয়ার আগে সবার মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখতে বলেন যাতে তা কাজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। কোনো একটা দৃশ্য পছন্দ না হলে বারবার শ্যুট করেন। সিনেমাকে বাস্তবসম্মত করার জন্য জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধাবোধ করেন না তিনি। টাইটানিক চলচ্চিত্রের নায়িকা কেট উইন্সলেট তো ঘোষণাই দিয়েছিলেন যে তিনি আর জেমস ক্যামেরনের কোনো সিনেমায় কাজ করবেন না।

নিজের কাজে ডুবে থাকার কারণে পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি বেশী একটা। এ কারণে সংসারও ভেঙে গেছে তার। তাও একবার নয়, পাঁচবার!

তবুও জেমস ক্যামেরন থেমে নেই। অ্যাভাটার ২ হয়তো শিগগিরই মুক্তি পাবে। অ্যাভাটার ৩ এবং ৪ ও যে আসবে এরকম ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন। ৬২ বছর বয়সেও যেভাবে এগিয়ে চলেছেন তিনি, তাতে মনে হচ্ছে এটা অসম্ভব কিছু নয়। হলিউডে আরও অনেকদিন চলবে জেমস ক্যামেরনের রাজত্ব এটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়।

    তথ্যসূত্র

    ১. en.wikipedia.org/wiki/James_Cameron

    ২. imdb.com

    ৩. jamescamerononline.com

Pages: 1 2 [3] 4 5 ... 23