Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - monirulenam

Pages: 1 [2] 3 4 ... 6
16
মনটা কদিন ধরেই ভালো নেই। অবশ্য যে অদ্ভুত দেশে বসবাস করি সেদেশে মনমেজাজ একটানা ভালো থাকবে সেটাও অস্বাভাবিক। মন খারাপ হলে আপনারা কে কী করেন সেটা জানি না, তবে আমি কি করি-সেটা বলতে পারি।

প্রথমেই মোবাইলটা অফ করি, মাঝে মাঝে রমনা পার্কের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসে থাকি, কিছু বাদাম ছড়িয়ে দিলে দুয়েকটা কাঠবিড়ালী চলে আসে, এরা কী আশ্চর্য সুন্দর করে বাদামগুলো দুহাতে ধরে নিয়ে খায়! এদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসে।

মন খারাপের ব্যক্তিগত নানা ঘটনা বাদ থাকুক, চিকিৎসক হিসেবে যে কারণে মন খারাপ -সে ঘটনাটা বলি...

সেই দিনটার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সকাল সকাল এক যুবক সাথে করে এক বয়স্ক মহিলা ও এক তরুণীকে নিয়ে আমার চেম্বারে প্রবেশ করলেন। বয়স্ক মহিলাটি হাই-প্রেশারের রোগী, বিষয়টা নিয়ে যুবক ও তরুণী বেশ উদ্বিগ্ন। প্রেশার চেক করলাম, একটু বাড়তির দিকে। বয়স্ক মহিলাটি প্রেশারের ওষুধ খাচ্ছেন, ডোজটা বাড়িয়ে দিয়ে কি করতে হবে আর কি করা যাবে না সে ব্যাপারে কিছু কথা বলে রোগীটি দেখা শেষ করলাম।

যুবকটি আমার প্রতিটা কথা বেশ দায়িত্ব নিয়ে বুঝে নিলেন, আমার সামনেই বেশ তরল গলায় বয়স্ক মহিলাকে কয়েকবার ‘মা’, ‘মা’ডেকে তাকেও বুঝিয়ে দিলেন। তাদের কথোপকথনে বুঝতে পারলাম বয়স্ক মহিলাটি তার শাশুড়ি, তরুণীটি তার স্ত্রী।

যুবকের রেসপনসিবিলিটিতে আমিও তখন বেশ মুগ্ধ, এমনকি মহিলার সামনেই বলে ফেললাম, 'আপনার ভাগ্য তো বেশ ভালো! এমন জামাই কি সবার ভাগ্যে জোটে?'

মহিলা ও তরুণী হাসিমাখা মুখে সেটা স্বীকারও করে নিলেন।

যুবকটি ভিজিট দিয়ে বের হয়ে যাবার সময় আমাকে জানালেন ঘন্টাখানেক পর যুবকটির মা'ও আসবেন, আমি যেন একটু দেখে দেই...

যুবকটির মায়ের কথা রোগী দেখতে দেখতে ভুলে গেলাম। চেম্বার শেষ করে উঠতে যাবো, এমন সময় এক বৃদ্ধ মহিলা রুমের দরজা ও দেয়াল ধরে ধরে আমার রুমে ঢোকার চেষ্টা করলেন। আমার মনে আছে ঐ বৃদ্ধা বেশ দুর্বল ছিলেন, উনাকে চেয়ারে বসানোর জন্য আমাকে উঠে যেতে হয়েছিলো।

এই বৃদ্ধা আসলে ঐ যুবকটির মা। ডায়াবেটিস, হাই প্রেশার, শ্বাসকষ্ট আগে থেকেই ছিলো, ইদানিং পায়ে পানি চলে আসছে, সে কারণেই ডাক্তারের কাছে আসা। অনিয়মিতভাবে চিকিৎসা নিতেন। প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখে কিডনী সংক্রান্ত দু'তিনটা পরীক্ষা দিতে হলো। ভিজিট দেবার সময় উনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন, অবাক হয়ে বলেছিলেনঃ " আমার বাজান কি টাকা দিয়া যায় নাই!"

আমাকে বলতে হয়েছিলোঃ " আপনার ছেলের মনে হয় ভুল হয়েছে। সমস্যা নেই, পরেরবার আসলে আপনার ছেলে থেকে নিয়ে নিব..."

তবে ছেলে যে ভুল করেনি সেটা পরে বুঝতে পেরেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম ছেলের ভিজিট না দেয়াটা ছিল ইচ্ছাকৃত...

মাসদুয়েক পর যুবক আবারও এসেছিলেন তার শাশুড়িকে নিয়ে, আগের মতই শাশুড়ির চিকিৎসা নিয়ে তিনি ছিলেন বেশ উদ্বিগ্ন। চলে যাবার সময় একান্তে ডেকে তার মায়ের ভিজিটের কথা বললাম। উনি উষ্মার স্বরে যে উত্তর দিয়েছিলেন সেটা আপনাদের শোনাইঃ "মায়ের চিকিৎসার টাকা মা দিবে, আমারে বলেন কেন?"

অপেক্ষাকৃতভাবে সুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে স্ত্রী সমেত যুবকটি হাজির হতে পারলেও ছানি পড়া অধিকতর দুর্বল নিজের জন্মদাত্রীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসার সময় যুবকটির হয় নি। শাশুড়ির ক্ষেত্রে ভিজিট দিতে যুবকটি কার্পণ্য করেনি, কৃপণতা তিনি দেখিয়েছেন তার জন্মদাত্রীর প্রতি...

বৃদ্ধা মহিলা পরবর্তীতে আরো দু'বার সম্পূর্ণ একা একাই আমার কাছে এসেছিলেন, একা না এসে উপায়ও নেই, স্বামী মারা গিয়েছে অনেকদিন আগে। ততদিনে পায়ের ফোলা আরো বেড়েছে, তেমন কোন ওষুধও নেন নি, পরীক্ষাগুলোও করান নি। কেন ওষুধ ঠিকমত নেন না জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, ‘বাজান তো ওষুধ কিন্যা দেয় না। ওর কি দোষ কন! বউ-বাচ্চা নিয়া কত খরচের সংসার!’

বৃদ্ধা এর পরে যে দু'বার এসেছিলেন সে দু'বারই সর্বমোট ২০০-৩০০ টাকা হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছিলেন, আমার ভিজিটটাও দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, "বাজান" কে হয়ত ভিজিট সংক্রান্ত ব্যাপারে ডাক্তারের সামনে আর অপমানিত হতে দিতে চাননি। আমার সঙ্গেবৃদ্ধার আর দেখা হয় নাই...

এসব ঘটনার পর সাত-আট মাস পার হয়েছে। গত শুক্রবার ঐ যুবক আবারো তার শাশুড়ি আর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন। শাশুড়ি সংক্রান্ত ব্যাপারে উনার তৈলাক্ত ভাব আরো বেড়েছে। প্রেসক্রিপশন লেখা শেষে কৌতুহল বশত একবার জিজ্ঞেস করলাম: 'আপনার মা কেমন আছেন?' উনি আনন্দিত চেহারা নিয়ে বললেন (I repeat, উনি আনন্দিত চেহারা নিয়েই কথাটা বলেছিলেন): "মা তো মারা গেছে আরো মাস চারেক আগে! মারা গিয়া অবশ্য ভালোই হইছে, তার জন্যে সবার অনেক কষ্ট হইতেছিলো"

আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলাম। আহারে! যে মা তাকে "বাজান" ছাড়া কখনও সম্বোধন করেন নাই, সেই "বাজানে"র কথাটা কি ঐ মা পরপার থেকে শুনতে পেয়েছেন? ঐ মা কি শুনতে পেয়েছেন যে মৃত্যুর আগমুহূর্তে তার জন্য নাকি সবার কষ্ট হচ্ছিলো? "বাজান"-কে কষ্ট থেকে মুক্ত করতেই কি তিনি তাড়াতাড়ি ওপারে চলে গেলেন? আমার চিন্তার রাজ্য কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো।

প্রেসক্রিপশন নিয়ে বৃদ্ধার ছেলে হাসিমুখে তার শাশুড়িকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। মনে অনেক কথা ছিলো, মুখে কিছু বলতে পারলাম না। ক্লান্ত পথিকের মত ঝিম মেরে তাদের গমন পথের দিকে চেয়ে রইলাম, পথিক শুধু দেখে যায়, কিছু বলা তার শোভা পায় না...

চিকিৎসক হিসেবে সবচেয়ে কঠিন কাজ কি জানেন? মানুষের সঙ্গে সঙ্গেমানুষরূপী কিছু অমানুষের চিকিৎসাও আমাদের করতে হয়। সে বড় কঠিন কাজ!

চিকিৎসকদের আপনারা পশু বলেন, অমানুষ বলেন--তাতে এখন খুব একটা কষ্ট পাই না, আপনারা মানুষ থাকলেই আমরা অনেক খুশি। দিনের পর দিন শত-সহস্র সত্যিকার মানুষদের চিকিৎসা দিতে আমরা চিকিৎসকরা কিন্তু ক্লান্ত হই না, "মানুষরূপী অমানুষ"দের চিকিৎসা দিতে আমাদের যে বড্ড কষ্ট হয়...

লেখক:ডা. জামান অ্যালেক্স, বিসিএস মেডিকেল অফিসার

কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস

17
এবার সরকারি চাকুরিজীবীরা অবসেরে গেলেও পাবেন ১০ থেকে ১৫ বছরের আর্থিক নিরাপত্তা। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

সূত্র জানায়, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বন্ডগুলোর মেয়াদ হতে পারে ১০ থেকে ১৫ বছর। ১০ বছর মেয়াদি বন্ড ছাড়া হলে অবসরপ্রাপ্তদের ৬৯ এবং ১৫ বছর মেয়াদি বন্ড ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

পাশাপাশি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সবার জন্য এক বিনিয়োগসীমা নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া পৃথকভাবে নয়, অবসরপ্রাপ্তদের সার্বিক আয়ের ওপর কর আরোপের কথাও বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গেল সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে এগুলোসহ মোট পাঁচটি সুপারিশ পাঠিয়ে বিবেচনার জন্য বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুপারিশগুলো পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বাজেট নির্বাচনী হওয়ায় এ পদক্ষেপগুলোর প্রতিফলন থাকতে পারে।

জানা গেছে, আগামী বাজেট হবে বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ বাজেট। তাই নির্বাচনী বাজেটে জনহিতকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বেশি। সরকারি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের এ বাজেটে বিশেষভাবে ফোকাস করা হচ্ছে। দেওয়া হতে পারে নানা সুবিধা। এরই ধারাবাহিকতায় গেল সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এসেছে একগুচ্ছ সুপারিশ। ড. মসিউরের করা এসব সুপারিশে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের নানা সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময় পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব সময় শর্ত রাখা হয়েছে যে, অবসরকালে যে পরিমাণ নগদ অর্থ পাওয়া যাবে তাই হবে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা। সরকারি কর্মচারীরা বিভিন্ন সময় অবসরে গেছেন, নগদ অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে একাধিক বিনিয়োগের সর্বোচ্চ কার্যকর সীমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জীবনের মান অভিন্ন ধরে নিলে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা সবার জন্য এক হওয়া প্রয়োজন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগতভাবে অর্জিত অন্য সম্পদ এ বিবেচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ কাম্য নয়। চৌকস কর্মকর্তা-কর্মচারী সঞ্চয়পত্রের তুলনায় অধিক লাভজনক বিনিয়োগ করার বুদ্ধি ও যোগ্যতা রাখেন।

অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো সুপারিশে পেনশন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আয়কর আরোপযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভবিষ্যৎ তহবিলে জমা অর্থ এবং পেনশনের কম্যুটেশনের (অথবা ক্যাপিটালাইজেশন) অর্থ অবসরকালীন এককালীন নগদ অর্থে যুক্ত হয়। সাধারণ বা বাধ্যতামূলক ভবিষ্যৎ তহবিলে জমা অর্থের ওপর সরকার যে সুদ দেয় তা তহবিলে জমা হতে থাকে এবং অবসরকালে কর্র্মকর্তা-কর্মচারী সব সুদ পান।

ভবিষ্যৎ তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে, পরিশোধিত অর্থ তহবিলে জমা হয়। চাকরিকালে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে জমা অর্থ নিজস্ব অর্থায়নে সৃষ্ট নিরাপত্তা আয় বিবেচনা করলে এ সঞ্চয় স্থানান্তরযোগ্য করা সঙ্গত। সরকার যে হারে সুদ বা মুনাফা দিত, পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদ বা মুনাফা তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। চাকরিকালে বেতন-ভাতা আয়কর আরোপযোগ্য। তাই পেনশন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আয়কর আরোপযোগ্য থাকবে। বিনিয়োগকারীর অন্য আয় বা মুনাফার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট আয় অনুসারে প্রযোজ্য কর হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে চিঠিতে।

অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বন্ড ছাড়ার সুপারিশ করে এতে বলা হয়, পেনশনার সঞ্চয়পত্র বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংস্থান উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা অত্যন্ত সংকীর্ণ (এবং সম্ভবত যুক্তিবিবর্জিত)। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অবসরকালীন আয়ের উসৎ এবং জীবন ধারণের মান সংরক্ষণের সহায়ক। দীর্ঘমেয়াদি ইন্সট্রুমেন্টে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার ১০ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি বন্ড বিক্রি করতে পারে। বন্ডের বিনিয়োগ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত আয় পাবেন। সুদ বা মুনাফার হার নির্দিষ্ট হতে পারে। বিকল্পে সুদ বা মুনাফার ন্যূনতম নির্দিষ্ট হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি যোগ করে সার্বিক মুনাফার হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। অধিকাংশ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্দিষ্ট হার পছন্দ করবেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিডি২৪লাইভ/এএইচ/এমআর


18
ভূমিকম্প বিষয়ে পবিত্র কোরানে সূরায়ে ‘যিলযাল’ নামে একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে। মানুষ শুধু কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় এবং ভূতত্ত্ববিজ্ঞানও এই কার্যকারণ সম্পর্কেই আলোচনা করে থাকে। কিন্তু কুরআনুল কারীম একই সাথে কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ বর্ণনার পাশাপাশি উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় বিষয় কি এবং এই ঘটনা থেকে অন্য আরো বড় কোন ঘটনা ঘটার সংশয়হীনতার প্রতি ইংগিত করে।
ভূমিকম্প বিষয়ে কুরআনুল কারীমে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হল ‘যিলযাল’, যার অর্থ হল একটি বস্তুর নড়াচড়ায় অন্য আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা। দ্বিতীয় শব্দটি হল ‘দাক্কা’, এর অর্থ হল প্রচন্ড কোন শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোন কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া। পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাত্বকে চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে। কিয়ামতের দিন আরেকটি ভূমিকম্পে পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে ধুলিকনায় পরিণত হবে এবং তা হবে ফেরেশেতা হযরত ইসরাফিলের ( আ.) সিঙ্গায় ফুৎকারের কারণে, যাকে বলা হয় ‘দাক্কা’। যা হবে এক প্রচন্ড আওয়াজ।
পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কঠিন শিলাত্বকের স্থানান্তরের কারণে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প আমাদেরকে এ কথার প্রতি ইংগিত করে যে, একদিন ওই ‘দাক্কা’ সংঘটিত হবে, যার নাম কেয়ামত। তখন এই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। মানুষ যেন কিয়ামতকে ভুলে না যায়, দুনিয়াকেই তার আসল ঠিকানা মনে না করে, তাই মাঝে মাঝে মহান আল্লাহ ভূমিকম্পসহ আরো অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে থাকেন।
ভুমিকম্প একটি কেয়ামতের আলামত
আবূল ইয়ামান (রহ.) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি [সা.] বলেছেন, কিয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্ম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভুমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। (হারজ অর্থ খুনখারাবী) তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে। [সহিহ বুখারি, অধ্যায় : ১৫/ বৃষ্টির জন্য দুআ, হাদিস নাম্বার : ৯৭৯]
পবিত্র কোরানের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে, জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। আল্লাহপাক মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন। তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কোরান নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতি সমূহকে আল্লাহপাক গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন। সে সবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভুমিকম্প। ভুমিকম্প এমনই একটা দুর্যোগ যা নিবারন করার মতো কোন প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নাই। এর পূর্বাভাষ পাওয়ার মতো কোন প্রযুক্তিও মানুষ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেনাই। হাদিস শরীফেও একাধিকবার বলা হয়েছে যে, মানুষের দুষ্কর্মের জন্যই ভুমিকম্পের মতো মহা দুর্যোগ ডেকে আনে। কুরআন এবং হাদিসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভুমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনী বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে।
বান্দার ওপর আজাব কেন আসে?
হজরত আলী [রা.] হতে বর্ণত রসুল [সা.] ইরশাদ করছেন, যখন আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মসীবত আপাতিতি হতে আরম্ভ করবে।কাজগুলো হল
১. গণীমতের মাল ব্যাক্তিগত সম্পদে পরিণিত হবে।
২. আমানতের সম্পদ পরিনত হবে গনীমতের মালে।
৩. জাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায়।
৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে।
৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে।
৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে স্বদব্যাবহার করা হবে।
৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম।
৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টোগোল হবে
৯. অসাম্মানী ব্যাক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে।
১০. ব্যাক্তিকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাচার জন্য।
১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে।
১২. পুরুষ রেশমী পোষাক পরবে।
১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে।
১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে।
১৫.পুর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাব, তাবে, তাবেঈন) প্রতি অভিসমাপ্ত করবে পরবর্তীরা।
এই কাজগুলি যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নীবর্ষী প্রবল ঝড়, ভুমিকম্প ও কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে। এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি। আর যখন আমাদের উপর মুসীবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারনেই এত আযাব।

অনুবাদ: এম আশরাফুল আলম

19
জিনদের পঞ্চমবারের পয়গাম্বর ও বাদশাহ হামুসের পুত্র ছিল ইবলীসের জনক। তার নাম ছিল খবীস। খবীসের আকৃতি ছিল ভয়ঙ্কর এক সিংহের ন্যায়। তার স্বভাব প্রকৃতিও সিংহের ন্যায়ই ছিল। একদিকে তার দেহে ছিল পঞ্চ শক্তি অন্য দিকে তার চেহারায় ছিল সুস্পষ্ট ধূর্ততার ছাপ। এ খবীসইছিল পাপীষ্ঠ জিনদের মাথার তাজ। ইবলিসের মাতা ছিল জিনজাতির পঞ্চম নেতা হামুসের কণ্যা। তার নাম ছিল নিলবিস। নিলবিস জিন দেখতে ঠিক একটি নেকড়ে বাঘের মত। তার প্রকৃতিও ছিল অবিকল নেকড়ের ন্যায়। এক বর্ণনায় আছে, জাহান্নামের আগুনের খবিস ও নিলবিসের মিলনে ইবলীসের জন্ম হয়।

সুতরাং পিতামাতা ও জাহান্নাম এই ত্রিস্বত্তার স্বভাব ও প্রকৃতির সম্পূর্ণ প্রভাবই ইবলীসের চরিত্রে নিহিত ছিল। ইবলীসের পিতার সারবুক নামেসর্ববিদ্যায় পারদর্শী একজন বন্ধ ছিল। খবিসের পুত্র ইবলীসেরশিক্ষা-দীক্ষার ভার তার পিতা উক্ত বন্ধু সারবুকের হাতে অর্পণকরল। ইবলীস ছিল অতিশয় মেধাবী ও স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন। সুতরাং কোন পাঠই তাকে একাধিকবার বলে দেয়ার প্রয়োজন হত না। সে একবার যা শুনত তাই সে চিরদিনের জন্য মনে রাখত। ফলে সারবুকের মনে ইবলীস সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা জন্মেছিল।


তাকে পড়াতে শুরু করে সে তার বন্ধু খবিসকে লক্ষ্য করে প্রায়ই বলত, বন্ধু! তোমার পুত্রের ভেতরে যে লক্ষণসমূহ দেখছি তাতে মনে হচ্ছে যে, সে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এক মহা বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হবে। আমার শিক্ষকতা জীবনের ছাব্বিশ হাজার বছরের মধ্যে তোমার পূত্র ইবলীসের মত এত তীক্ষ্ম স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ও বুদ্ধিমান ছাত্র আমার হস্তে আর দ্বিতীয়টি পড়েনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় তোমার পূত্রটি অত্যধিক বেয়াদব, অহংকারী এবং ভীষণ একগুয়ে। এটা তার ভবিশ্যতেরজন্য সুখকর নয়। তবে সে যাই হউক না কেন, ইবলীসের ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

উল্লেখ্য যে, ফেরেশতারা জিনকুলকে ধ্বংস করার সময় বালক ইবলীসকে স্নেহবশতঃ হত্যা না করলে উল্টা তাকে লালন-পালন করার জন্য আল্লাহর নিকট হতে অনুমতি নিয়ে আসমানে নিয়ে যায়। ফেরেশতারা তাকে প্রথম আসমানে নিয়ে নিজেদের প্রকৃতি ও স্বভাব অনুরূপ আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম-কানুন শিক্ষাদান করল। ইবলীস স্বীয় প্রতিভাবলে অতি অল্প আয়েসে ও স্বল্পসময়ে শিক্ষালাভ করে দীর্ঘ এক হাজার বছর প্রথম আসমানে আল্লাহর এবাদাত করল। তথাকার ফেরেশতারা তার ইবাদাতে একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখেঅবাক হয়ে বলতে লাগল যে, আমরা ফেরেশতা জাতি কেবল আল্লাহর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি হয়েছি। একমাত্র ইবাদতই আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও ধ্যান ধারণা সবকিছু। ইবাদতই আমাদের একমাত্র কাজ। তবুকি আশ্চর্য!

ইবলীস আমাদের কাছে ইবাদতের কায়দা কানুন শিখে সে যে ইবাদত করছে, তাতে তার ইবাদতের তুলনারয় আমরা নিজেদেরকে তো মোটেই ইবাদতকারী বলতে পারি না। আমাদের ফেরেশতাকূলের মধ্যে তো কাকেও এমন ধারায় ও এমন নিবিড় ভাবে কখনোই ইবাদত করতে দেখি নি। মনে হচ্ছে এখন এর কাছেই আমাদের অনেক কিছু শিখবার ও বুঝবার আছে। ফেরেশতারা তার ইবাদত বন্দেগি দেখে এত মুগ্ধ হল যে, তারা ইবলীসের ‘খাশে’ নামকরণ করল।

ইবলী সপ্রথম আসমানে একহাজার বছরইবাদতের পর দ্বিতীয় আসমানের ফেরেশতারা অতি আদর করে তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে গেল। ইবলীস দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছেও পূর্বাপেক্ষা আরও বেশী পরিমাণে ইবাদত মশগুল হল। এ আসমানের ফেরেশতারা তার ইবাদাত দেখে তাকে ধন্য ধন্য করতে লাগল এবং শতমুখে তার প্রশংসা করতে লাগল, এবং তারা ইবলীসের নামকরণ করল ‘আবেদ’। দ্বিতীয় আসমানে এক হাজার বছর অবস্থানের পর তৃতীয় আসমানের ফেরেশতারা ইবলীসকে তৃতীয় আসমানে নিয়ে গেল। তৃতীয় আসমানে এসে সে আরও বেশী পরিমাণে পরম একাগ্রতা ও মনোযোগের সাথে আল্লাহর ইবাদত শুরু করে দিল। সে এখানেও এক হাজার বছর ইবাদত করল। এখানের ফেরেশতারা তার ইবাদতে মুগ্ধ হয়ে তার নাম রাখল ‘অলী’।

তারপর চতুর্থ আসমানের ফেরেশতারা আল্লাহর অনুমতি লাভ করে ইবলীসকে চতুর্থ আসমানে নিয়েগেল। ইবলীস এখানেও অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ এক হাজার বছর আল্লাহর ইবাদতে মাশগুল রইল।তথাকার ফেরেশতারা তার ইবাদতে খুশী হয়ে নাম রাখল “ছালেহ”। এইভাবে অবশিষ্ট সকল আসমানে উন্নীত হয়ে প্রত্যেক আসমানে এক হাজার বছর করে ইবাদত করল। তখন পুরো ফেরেশতা জগতই তার প্রশংসায়মুখরিত হয়ে গেল। সকল ফেরেশতার সন্তুষ্টির ভেতর যে সপ্তম আসমানে উপনীত হয়ে পরম সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করল।

ইবলীস ফেরেশতাদের নিকট থেকেই আদব-কায়দা এবং ইবাদতের রীতিনীতিপ্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ইবলীস অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় যা শিক্ষালাভ করত তার কোন কিছুই আর ভুলত না। সুতরাং অতি অল্প সময়ে ফেরেশতাদের নিকট হতে সে সর্ববিষয়ে এত বেশী অভিজ্ঞতা অর্জন করল যে, এখন তার ওস্তাদ ফেরেশতাদের তুলনায় তার জ্ঞানই বেশী হয়ে গেল। তদ্রুপ ফেরেশতাদের ইবাদতের পরিমান অপেক্ষা তার ইবাদতের পরিমাণ অনেক বেশী বৃদ্ধি পেল। সাত আসমান ও যমীনের এমন একটি স্থান বাকি থাকল না যেখানে ইবলীসের সিজদাহ পড়েনি। ফেরেশতারা ইবলীসের ইবাদত বন্দেগী দেখে উপলব্ধি করতে লাগল যে, ইবলীসকে তারা শিক্ষা দান করেছে, এখন সেই ইবলীসের কাছেই তাদের অনেক কিছু শিখার আছে। তাই তারা সকলে আল্লাহর দরবারে আবেদন করল, হে মাবুদ! তুমি তোমার প্রিয় ইবলীসকে যদি আরশে মুআল্লার কাছেউঠিয়ে আন তবে আমরা তার কাছ থেকে অনেক মূল্যবান উপদেশ শুনে অনেক কিছু শিখতে পারতাম। কেননা, সে আমাদের অপেক্ষা অনেক বেশী জ্ঞানঅর্জন করেছে।

মহান আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের এ আবেদন মঞ্জুর করে ইবলীসকে আরশে মুআল্লার নিকট নিয়ে আসলেন। আরশেমুআল্লার কাছেই রয়েছে ইয়াকুত নির্মিত একটি সুউচ্চ মিম্বর, ইবলীস উক্ত মিম্বরে আল্লাহর ইবাদতে রত হল। স্বীয় ইবাদতের অবসর সময়ে সে ফেরেশতাদেরকে ওয়াজনসিহতও করতে লাগল। ফেরেশতারা তার ওয়াজ ও অমূল্য উপদেশাবলী শুনে মুগ্ধ হয়ে সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। শেষ পর্যন্তসে মালাইকাহ ফেরেশতার শিক্ষক নামে পরিচিত হয়ে গেল।

ইবলীসের দুনিয়ায় আগমন:
আল্লাহর আদেশে ফেরেশতারা শেষবার জিনদেরকে হত্যা করার পরেও পাহাড়-পর্বত ও বনে-জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে কিছু সংখ্যক জিন প্রাণরক্ষা করে। ক্রমে তাদের বংশ বৃদ্ধি পেয়ে আবার জিনদের দিয়ে জগত পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে হিদায়েত করার জন্য পয়গাম্বর বা আল্লাহর দূত ছিল না। ফলে জিন জাতি ভীষন পাপাচারী হয়ে উঠেছিল। আল্লাহ তা’আলা ইবলীসকে আদেশ করলেন, হে ইবলীস! তোমার ইবাদত-বন্দেগী ও আমার প্রতি তোমার আনুগত্যে আমি তোমার প্রতি অন্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। এবার তোমার প্রতি আমার নির্দেশ হল তুমি দুনিয়াতে গিয়ে তোমার স্বজাতীয় জিনদেরকে সৎপথে প্রদর্শন কর।

মহান আল্লাহর এ নির্দেশ শুনে ইবলীস বলল, হে মাবুদ! আপনার নির্দেশ আমি অবশ্যই পালন করব। তবে আমার একটি আরজ হল আপনি আমাকেএমন ক্ষমাতা দান করুন, যেন সারাদিন দুনিয়াতে জিনদেরকে হিদায়েত করে সন্ধ্যায় আবার আমি এখানে ফিরে এসে সরারাত আপনার ইবাদত ও ফেরেশতাদেরকে নসিহত করতে পারি। আল্লাহ পাক ইবলীসের এই আবেদন কবূল করলেন। তখন ইবলীস অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে দুনিয়ায় নেমে আসল এবং জিনদেরকে হিদায়েতের কাজে আত্মনিয়োগ করল। কিন্তু একাধারে বহুদিন পর্যন্ত সে আপ্রাণ চেষ্টা ও পরিশ্রম করা সত্বেও সামান্য কিছু সংখ্যক জিন ব্যতীতপ্রায় সকলেই ইবলীসের বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগল। তখন ইবলীস আবার আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করল হে মাবুদ! আমাকে এমন ক্ষমতা দিয়ে দিন যাতে এই অবাধ্যচারী জিনদেরকে আমি সমূলে ধ্বংস করতে পারি।

আল্লাহ তা’আলা ইবলীসের আবেদন শুনে জিনদেরকে ধ্বংস করার জন্য আসমান থেকে অগণিত ফেরেশতা দুনিয়ায় প্রেরণ করলেন, ফেরেশতাদের সঙ্গে ইবলীসের অনুগত বহু জিনও যোগদান করল। ফেরেশতা ও ইবলীসের বাধ্যগত জিনদের আক্রমণে কিছু সংখ্যক পথভ্রষ্ট জিন সৎপথ অবলম্বন করে প্রাণ রক্ষা করল। বাকি সমস্ত পাপী জিন প্রাণ হারল। ইবলীস দুনিয়ার কার্য থেকে অবসর নিয়ে পুনরায় একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হল। আল্লাহর দরবারে তার কৃত সিজদাহর সংখ্যা যে কত ছিল, তা কারও পক্ষে হিসাব করা সম্ভব নয়। আসমান-যমীনে ও আরশে মুআল্লার নিকটে এমন কোনস্থান অবশিষ্ট ছিল না, যেখানে ইবলীস অসংখ্য সিজদাহ দেয়নি।

ইবলীসের লাওহে মাহফুজ দর্শন:
ইবলীস আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাল হে প্রভু! তোমারই অসীম অনুগ্রহে আমি অতি সামান্য স্তর থেকে সসম্মানে অতিউচ্চস্তরে পৌঁছেছি। তোমারই অসীম অনুগ্রহে আমি তোমার নৈকট্যলাভ করতে সমর্থ হয়েছি। এখন আমার মনের একান্ত বাসনা হল তোমার পবিত্র লাওহে মাহফুজ দর্শ করে আমার জীবন ধন্য ও সার্থক করি। তুমি অনুগ্রহ করে আমার এই আকাঙ্খা পূর্ণ করা। পরম দয়ালু আল্লাহ তা’আলা ইবলীসের প্রার্থনা কবূল করে মিকাঈল ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেনঃ ইবলীসকে পবিত্র লাওহে মাহফুজের একান্ত নিকটে নিয়ে দেখিয়ে আনার জন্যে।

আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত মিকাঈল (আঃ) ইবলীসকে লাওহে মাহফুজের নিকটে নিয়ে গেল। ইবলীসসেখানে পৌঁছে এক দৃষ্টিতে লাওহেমাহফুজের দিকে তাকিয়ে অদৃষ্টলিপি পাঠ করতে লাগল। হঠাৎএক স্থানে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে লিখিত রয়েছে- আল্লাহর একবান্দা ছয়লক্ষ বছর পর্যন্ত তার মাবুদের ইবাদত করবে। কিন্তুঅবশেষে আল্লাহর একটি আদেশ অমান্য করে সে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হবে। ঐ বান্দা আসমান ও যমীনে মালউন বা অভিশপ্ত নামে পরিচিত হবে। ইবলীস এ লিপি পাঠের পর আপনা হতে কেঁদে ফেলল এবং সিজদায় পতিত হল এবং এ সিজদায় সে দীর্ঘ ছয় হাজার বছর অতিবাহিত করল। ছয় হাজার বছর পর মাথা তুলে, দেখতে পেল তার সিজদাহর জায়গায় লিখিত রয়েছে “লা’আনাতুল্লা-হি ‘আলা-ইবলীস’ অর্থাৎ ইবলীসের উপরেআল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হউক।

ইবলীস আরজ করল, হে আমার রব! ইবলীসকে? তাকে দেখিয়ে দিন। আমি তাকে যথোচিত শিক্ষা দান করি। জবাবে আল্লাহ তা’আলা ইবলীসকে বললেন, অচিরেই তুমি তাকে দেখতে পাবে। এ কথা শুনে ইবলীস সেখানে দাঁড়িয়ে একহাজার বছর পর্যন্ত পাঠ করল,”লা আনাতুল্লা-হি ‘আলা ইবলীস’ ইবলীসের উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হউক। এখানে উল্লেখ্য করাপ্রয়োজন যে, তখনও ইবলীস এ নামে পরিচিত হয়নি। আর তার এ কথা তখনও জানা ছিল না যে, এক সময় তারই নাম ইবলীস হবে। তখন আল্লাহ তা’আলা ইবলীসকে বললেন, ওহে! বলত আমার যে বান্দাহ আমার অশেষ অনুগ্রহ লাভ করেও আমার হুকুম অমান্য করবে তার কেমন শাস্তি হওয়া উচিত? জবাবে ইবলীস বলল, হে আমার রব! এরূপ অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর আপনার কঠিন শাস্তি ও অভিশাপ বর্ষিত হওয়া উচিত। আল্লাহ তা’আলা বললেন, তোমার এ মন্তব্যটা এক টুকরা তখতিতে লিখেতোমার নিকটেই রেখে দাও, পরে তা কাজে আসতে পারে। এক টুকরা তখতিতে লিখে রেখে দিল ইবলীস তখনই।

ইবলীসের মনে কুমতলব ও অহঙ্কারেরসূত্রপাত:
উল্লেখিত ঘটনার কিছুদিন পরে হঠাৎ একদিন ইবলীস মনে মনে ভাবল এখন তো ফেরেশতা জগতে ও জিনের রাজ্যে এমন কোন ফেরেশতা বা জিন নেই যে আমার কোন নির্দেশ অমান্য করে। কেননা, আসমান যমীন বা জিন ও ফেরেশতাকুলের মাঝে আমার প্রভাব এখন অতুলনীয়। আমার প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমাতার সাথে মোকাবেলা করার মত এখন আর কেউ নেই। এমতাবস্থায় যদি কোন কারণবশতঃ আল্লাহ তা’আলা নিজের দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করেন কিংবা স্বেচ্ছায় ঘোষণা করেন যে, আমি এ সৃষ্টি জগত পরিচালনার দায়িত্ব হতে অবসর গ্রহণ করছি। অতএব এখন তোমাদের মধ্য হতে যোগ্যতম ব্যক্তি আমার সৃষ্টজগতের পরিচালনার ভার গ্রহণ কর। তা হলে নিশ্চয়ই একমাত্র আমিই এ পদের সুযোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে এ দায়িত্ব গ্রহণকরে সুষ্ঠুরূপে পালন করতে পারি। মূলতঃ এখন আর আমি কোন দিক দিয়েই আল্লাহ তা’আলা অপেক্ষা হীনবল ও কম ক্ষমতাবান নই। যাবতীয় ফেরেশতা ও জিনদের ওপর এখন আমার যে রূপ প্রভাব, তাতে আল্লাহ তা’আলার সাথে আমার কোন ব্যাপার নিয়ে বিরোধে অবশ্যই তারা আমার পক্ষাবলম্বন করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

লাওহে মাহফুজ দর্শনে ফেরেশতারা:
এর কিছুদিন পরেই একদা ফেরেশতারালাওহে মাহফুজে লিখিত দেখতে পান যে, অচিরেই আমার জনৈক বান্দাহর ওপরে চিরদিনের জন্য আমার লা’নত বর্ষিত হবে। এ লেখা পড়ে ফেরেশতারা ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। তারা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। তারা সঙ্কিত হয়ে পড়ল। হায়! না জানি তাদের মধ্যেই কোন হতভাগ্য বান্দাহর উপরে এ দুর্ভাগ্য নেমেআসবে। ফেরেশতারা এ দুশ্চিন্তায় কেঁদে কেঁদে হয়রান পেরেশান হয়ে সকলে মিলে তাদের ওস্তাদ ইবলীসেরনিকট উপস্থিত হল। ইবলীস এর কারণ জানতে চাইলে ফেরেশতারা বলল ওস্তাদ! ঐ যে পড়ে দেখুন; লওহে মাহফুপের এ লেখা পড়ে আমাদের সকলেরই মনে দারুন আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুণ যাতে আমরা আল্লাহর লা’নত থেকে রক্ষা পেতে পারি।

ইবলীস ফেরেশতাদের মিনতিতে তাচ্ছিল্যের সাথে মুচকী হেসে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করল, হে মাবুদ! তুমি ফেরেশতাদের কারো ওপর লা’নত দিও না। আল্লাহ তা’আলা ইবলীসের ঐ প্রার্থনা কবূল করলেন। ফেরেশতারা আল্লাহর সেই নির্ধারিত গযব থেকে রক্ষা পেল। কিন্তু ইবলীস সমগ্র ফেরেশতাদের জন্য দোয়া করল বটে কিন্তু অহংকার বশতঃ নিজের জন্য দোয়া করতে ভুলে গেল। এর কিছু দিন পরও একদিন ইবলীস আরশে মুআল্লার একখানা তখতির উপরে উজ্জ্বল নূরের হরফে ‘আউ’যুবিল্লা’হি মিশাশ শাইতোয়া-নির রাজীম-‘বিতাড়িত শয়তান হলে আল্লাহ তা’আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি’ লিখিত দেখতে পেল। এ লেখা পাঠ করে ইবলীস অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে আল্লাহর নিকট জিজ্ঞেসা করল, হে মাবুদ! কে সেই দুষ্ট পাপিষ্ঠ শয়তান যাহার নিকট হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা করার কথা লিখিত রয়েছে? আল্লাহ তা’আলা জবাব দিলেন, তুমি শীঘ্রই তাকে চিনতে পারবে।


সময়ের কণ্ঠস্বর

20
   


    ড. জাকির নায়েক অনেক বৎসর যাবৎ পবিত্র ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, আর ইসলাম সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণাগুলো পরিষ্কার করেন। পবিত্র কোরআন, সহীহ হাদিস ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং সেই সাথে যুক্তি, উক্তি ও বিজ্ঞানের সাহায্যে। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাকে ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হলে, তিনি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ হতে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। আজ থাকছে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে তার দেয়া বক্তৃতা।
ডঃ জাকির নায়েক বলেন, লাইলাতুল কদর ঠিক কবে হবে, সেটা যদি বলতে হয়, সেই ক্ষমতার রাত, সে ব্যাপারে সহীহ বুখারি শরীফে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা এই রাত নিয়ে অনেক গবেষণা করার পর ৪০টিরও বেশি আলাদা আলাদা মতামত ব্যক্ত করেছেন। এটি নিয়ে কেউ বলেন, রমজানের প্রথম রাত, কেউ বলে সপ্তম রাত, কেউ বলে ১৯তম রাত এরকম অনেক মতামত আছে।
তিনি বলেন- কিন্তু সহীহ হাদিস বলছে, এটা হবে রমজান মাসের শেষের ১০ রাতের যে কোনো বিজোড় রাতে। এই হাদিসের উল্লেখ সহীহ বুখারির তিন নং খণ্ডে রয়েছে, মহানবী (সঃ) বলেছেন, “তোমরা লাইলাতুল কদরের রাত রমজান মাসের শেষ দশ রাতের বিজোড় রাতে খুজবে”। এটা হল সবচেয়ে খাঁটি।
ডঃ জাকির বলেন, এছাড়াও আরও একটি হাদিসে আছে, সহীহ বুখারির এক নং খণ্ডের বুক অফ ঈমানের ৪৯ নং আয়াতে রয়েছে, নবীজি মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, তিনি একবার বাহিরে বের হয়েছিলেন বলার জন্য যে, লাইলাতুল কদর আসলে কোন রাতে হবে? তখন তিনি দুইজন মুসলিম পুরুষকে একে-অপরের সাথে মারামারি করতে দেখলেন, ঝগড়া করতে দেখলেন। নবীজি বললেন, অমুক লোক ও অমুক লোক একে-অন্যের সাথে ঝগড়া করছিলেন। সে সময় আল্লাহ পাক নবীজির জ্ঞান নিয়ে নিলেন। তখন তিনি সবকিছু ভুলে গেলেন। তিনি বললেন, এটি হয়ত মুসলমানদের জন্য ভাল। তাই, লাইলাতুল কদরকে খোঁজ, রমজানের শেষ দশ দিনের মধ্যে ৫ম, ৭ম বা ৯ম দিনের মধ্যে।
জাকির নায়েক আরেকটি হাদিসের বিষয়ে বলেন, লাইলাতুল কদরের রাত খুব সম্ভবত ২৬ রমজানের রাতে। কারণ, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, ২৬ রমজানের রাতে নামাজ পড়তে।

তিনি বলেন, সহীহ হাদিসে লাইলাতুল কদরের কিছু নিদর্শনের কথা বলে হয়েছে, তবে যতগুলো নিদর্শন রয়েছে, তা লাইলাতুল কদর পার হয়ে যাবার পর দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে, এটাও আল্লাহ পাকের ইচ্ছা যে আমরা যেন না জানতে পারি। কারণ, আমরা যদি আগে জানতে পারি তাহলে আমরা শুধু সে রাতেই নামাজ পড়ব, অন্যান্য রাতে আমরা আল্লাহ সুবহানা তায়ালার ইবাদত খুব বেশি করতাম না।
ডঃ জাকির বলেন, আরেকটি সহীহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, লাইলাতুল কদরের পরের দিন সূর্যের কোন কিরণ থাকবে না। দেখা যাবে একটা থালার মত। যতক্ষণ না মাথার উপরে উঠছে। লাইলাতুল কদরের রাতে চাঁদকে দেখাবে একটা থালার মত।
এছাড়া আরও একটি হাদিস বিষয়ে জাকির নায়েক বলেন, লাইলাতুল কদরের যে আলো হবে, তা খুব একটা গরম হবে না এবং ঠান্ডাও খুব একটা হবে না। এটা হবে একটা সুন্দর রাত, সুখ-শান্তির রাত। লাইলাতুল কদরের পরের দিন সূর্যটা হবে হালকা লালচে। লাইলাতুল কদরের নিদর্শণ সম্পর্কে এই টুকুই হাদিসে বলা হয়েছে, কিন্তু এই নিদর্শনগুলো দেখা যাবে, লাইলাতুল কদর পার হবার পর। তাই, আমরা আজও লাইলাতুল কদরের রাতকে খুঁজি। –সূত্র: ইন্টারনেট।

সম্পাদনা: ফাতেমা তুজ জোহুরা।

21
 

          এক ব্যক্তি জঙ্গলে হাটছিলেন। হঠাৎ দেখলেন এক সিংহ তার পিছু নিয়েছে। তিনি প্রাণভয়ে দৌড়াতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে একটি পানিহীন কুয়াদেখতে পেলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে দিলেন ঝাঁপ।পড়তে পড়তে তিনি একটি ঝুলন্ত দড়ি দেখে তা খপ করে ধরে ফেললেন এবং ঐ অবস্থায় ঝুলে রইলেন। উপরে চেয়ে দেখলেন কুয়ার মুখে সিংহটি তাকে খাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।নিচে চেয়ে দেখলেন বিশাল এক সাপ তার নিচে নামার অপেক্ষায় চেয়ে আছে। বিপদের উপর আরো বিপদ হিসেবে দেখতে পেলেন একটি সাদা আর একটি কালো ইঁদুর তারদড়িটি কামড়ে ছিড়ে ফেলতে চাইছে। এমন হিমশিম অবস্থায় কি করবেন যখন তিনি বুঝতে পারছিলেন না, তখন হঠাৎ তারসামনে কুয়ার সাথে লাগোয়া গাছে একটা মৌচাক দেখতে পেলেন। তিনি কি মনে করে সেই মৌচাকের মধুতে আঙ্গুল ডুবিয়ে তা চেটে দেখলেন। সেই মধুর মিষ্টতা এতই বেশি
ছিল যে তিনি কিছু মুহূর্তের জন্য উপরের গর্জনরত সিংহ, নিচের হাঁ করে থাকা সাপ, আর দড়ি কাঁটা ইঁদুরদের কথা ভূলে গেলেন।ফলে তার বিপদ অবিশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ালো।
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এই গল্পেরব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন :
এই সিংহটি হচ্ছে আমাদের মৃত্যু,যে সর্বক্ষণ আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেই সাপটি হচ্ছে কবর।যা আমাদের
অপেক্ষায় আছে। দড়িটি হচ্ছে আমাদের জীবন, যাকে আশ্রয় করেই বেঁচে থাকা। সাদা ইঁদুর হল দিন, আর কালো ইঁদুর হল রাত, যারা প্রতিনিয়ত ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের আয়ু কমিয়ে দিয়ে আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর সেই মৌচাক হল দুনিয়া। যার সামান্য মিষ্টতা পরখ করে দেখতে গেলেও আমাদের এই চতুর্মুখি ভয়ানক বিপদের কথা ভূলে যাওয়াটা বাধ্য।

 
আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার তৌফিক দান করুক সবাই বলুন “আমিন”

22
এ মৌসুমে দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আর বজ্রপাতের কারণে এ সময় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ লেখায় দেওয়া হলো কয়েকটি উপায়, যা বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সহায়ক হবে। এক নিবন্ধে বিষয়টি জানিয়েছে উইকিহাউ।

১. দালান বা পাকা ভবনের নিচে আশ্রয় নিন
ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো একটি পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে।

 উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুৎ লাইন থেকে দূরে থাকুন
কোথাও বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এসব স্থানে আশ্রয় নেবেন না। খোলা স্থানে বিচ্ছিন্ন একটি যাত্রী ছাউনি, তালগাছ বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে।

৩. জানালা থেকে দূরে থাকুন
বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন।
৪. ধাতব বস্তু স্পর্শ করবেন না
বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলো স্পর্শ করেও বহু মানুষ আহত হয়।
৫. বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র থেকে সাবধান
বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাষ পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখুন।

৬. গাড়ির ভেতর থাকলে…
বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে থাকলে সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন। গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। গাড়ির কাচেও হাত দেবেন না।
৭. খোলা ও উঁচু জায়গা থেকে সাবধান
এমন কোনো স্থানে যাবেন না, যে স্থানে আপনিই উঁচু। বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা বড় মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে যান। বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু কোনো স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যান।

৮. পানি থেকে সরুন
বজ্রপাতের সময় আপনি যদি ছোট কোনো পুকুরে সাঁতার কাটেন বা জলাবদ্ধ স্থানে থাকেন তাহলে সেখান থেকে সরে পড়ুন। পানি খুব ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী।
৯. পরস্পর দূরে থাকুন
কয়েকজন মিলে খোলা কোনো স্থানে থাকাকালীন যদি বজ্রপাত শুরু হয় তাহলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যান। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।
১০. নিচু হয়ে বসুন
যদি বজ্রপাত হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসুন। চোখ বন্ধ রাখুন। কিন্তু মাটিয়ে শুয়ে পড়বেন না। মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।


১১. বজ্রপাতের আগ মুহূর্তের লক্ষণ জানুন
আপনার উপরে বা আশপাশে বজ্রপাত হওয়ার আগের মুহূর্তে কয়েকটি লক্ষণে তা বোঝা যেতে পারে। যেমন বিদ্যুতের প্রভাবে আপনার চুল খাড়া হয়ে যাবে, ত্বক শিরশির করবে বা বিদ্যুৎ অনুভূত হবে। এ সময় আশপাশের ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। অনেকেই এ পরিস্থিতিতে ‘ক্রি ক্রি’ শব্দ পাওয়ার কথা জানান। আপনি যদি এমন পরিস্থিতি অনুভব করতে পারেন তাহলে দ্রুত বজ্রপাত হওয়ার প্রস্তুতি নিন।
১২. রবারের বুট পরুন
বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।

১৩. বাড়ি সুরক্ষিত করুন
আপনার বাড়িকে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। এজন্য আর্থিং সংযুক্ত রড বাড়িতে স্থাপন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিতে হবে। ভুলভাবে স্থাপিত রড বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
১৪. বজ্রপাতে আহত হলে
বজ্রপাতের সময় আশপাশের মানুষের খবর রাখুন। কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসককে ডাকতে হবে বা হাসপাতালে নিতে হবে। একই সঙ্গে এ সময় বজ্রাহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ নিয়ে রাখুন।

সুত্র: অনলাইন।

23
পৃথিবীর সকল কিছু সৃষ্টির মূল উপাদান পানি। এই মৌলিক উপাদান পৃথিবীর সকল জীবদেহের মধ্যে বিদ্যমান। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ‘আর প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হ’তে’ (আম্বিয়া ২১/৩০)। জীব বিজ্ঞানের মতে, সাগরের অভ্যন্তরের পানিতে যে প্রোটোপ্লাজম বা জীবনের আদিম মূলীভূত উপাদান রয়েছে তা থেকেই সকল জীবের সৃষ্টি।

মানুষের ভ্রূণ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের ধারণা পোষণ করা প্রাচীনকাল থেকেই। এরিস্টটল মনে করতেন মাসিকের রক্তের সঙ্গে পুরুষের বীর্যের মিলন হলে ভ্রূণ তৈরি হয়।
অনেকে আবার মনে করতেন মানুষের ভ্রূণ কেবল পুরুষের বীর্য থেকে তৈরি হয়। এ দুটি ধারণা যে ভুল তা প্রমাণ করেন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী স্পিলিজার ১৭৭৫ সালে। ব্রাভি ১৮৮৮-১৯০৯ সালের মধ্যে প্রমাণ করেন ক্রোমোজম বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঠিক করে। মরগান ১৯১২ সালে মানুষের ভ্রূণ তৈরিতে জীবের ভূমিকা প্রমাণ করেন।
এটা বলা যায়, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আঠারশ শতকের আগে ভ্রূণ তৈরি সম্পর্কে কোনো ধারণা করতে পারেনি কিন্তু পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর বাণীর মাধ্যমে আজ থেকে প্রায় ১৫শ বছর আগেই ভ্রূণ তৈরির প্রক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।
‘নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্রিত শুক্রবিন্দু থেকে। আমি তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছি। এরপর আমি তাকে বানিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। সূরা ইনসান (দাহর) – আবার সকল জীবদেহ কোষ দ্বারা গঠিত।
baby_growing_2
আর এই কোষ গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে পানি। ভিন্নমতে, পানি অর্থ শুক্র (কুরতুবী)। তাছাড়া আকাশ ও পৃথিবী বন্ধ ছিল অর্থাৎ পূর্বে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হ’ত না এবং যমীনে তরুলতা জন্মাত না।
আল্লাহর ইচ্ছায় বৃষ্টি বর্ষিত হ’ল এবং মাটি তা থেকে উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করল (ইবনে আববাস)।[1] পৃথিবীর জীব কোষের মূল উপাদান যেমন পানি, তেমনি এই পানিই মাটির উৎপাদন ক্ষমতা লাভের প্রধান উপাদান। মহান আল্লাহ এই ধরণীতে মাটি থেকে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করেন এবং তারপর তা থেকে ক্রমশঃ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এই মানব জাতি।

মহান আল্লাহর ভাষায়,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوْبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا ‘হে মানবমন্ডলী! আমরা তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদেরকে বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরে পরিচিতি লাভ করতে পার’ (হুজুরাত ৪৯/১৩)।


আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে ‘মানব ক্লোন’। এই ক্লোন পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিতে গেলে পুরুষের জীব কোষের প্রয়োজন। অর্থাৎ একজন পুরুষের জীব কোষ বা শুক্রাণু ব্যতীত একজন নারী সন্তান জন্ম দানে অক্ষম। কেননা নারীর ডিম্বাণু ক্রমোজম (XX) ও পুরুষের শুক্রাণু ক্রমোজম (XY) পুত্র-কন্যা সন্তান গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

evolution1

এখানে হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন হ’তে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহ এ প্রশ্নের সমাধান পবিত্র কুরআনে যথাযথভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, إِنَّ مَثَلَ عِيْسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُوْنُ ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকটে ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মত। তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন অতঃপর তাকে বলেছিলেন, হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেল’ (আলে ইমরান ৩/৫৯)। আদি মানব-মানবী ও তাদের সন্তান সৃষ্টির পূর্ব ও পরের গূঢ় রহস্য কথা নিয়ে নিমেণ আলোকপাত করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

মানব সৃষ্টির আদি কথা :

আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন বস্ত্তবাদী গবেষক, দার্শনিক নানা বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। যেমন- আদি মানব সম্প্রদায় বানর ছিল। কালের আবর্তনে পর্যায়ক্রমে বানর থেকে মানবে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হ’ল বর্তমান যুগে কি বিশ্বের কোথাও একটি বানর মানবে রূপান্তরিত হয়ে জীবন যাপন করছে? কিংবা কোন বানরের গর্ভ থেকে মানব সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে ও বেঁচে আছে?

এর জবাব হ’ল নেতিবাচক। এটা সকলের জানা। আদি মানব কি বস্ত্ত থেকে সৃষ্টি তা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, ‘কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা (সাজদাহ ৩২/৭), আমি মানবকে পঁচা কাদা থেকে তৈরী বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি (হিজর ১৫/২৬), এঁটেল মাটি (ছাফ্ফাত ৩৭/১১), পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি’ (আর-রহমান ৫৫/১৪)। আল্লাহ তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন (ছোয়াদ ৩৮/৭৫) এবং তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন (ছোয়াদ ৩৮/৭২) আদম একাই শুধুমাত্র মাটি থেকে সৃষ্টি। বাকী সবাই পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্ট’ (সাজদাহ ৩২/৭-৯)।

হযরত আদম (আঃ) মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি। কিন্তু মা হাওয়া (আঃ) কি দিয়ে সৃষ্টি সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর তিনি তার (আদম) থেকে তার যুগল (হাওয়াকে) সৃষ্টি করেছেন’ (যুমার ৩৯/৬)। তিনি আরও বলেন, ‘তিনি তার (আদম) থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত নারী-পুরুষ’ (নিসা ৪/১)। অন্যত্র বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীকে, তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন’ (রূম ৩০/২১)।

মহান আল্লাহ হযরত আদম (আঃ)-এর পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে মা হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَىْءٍ فِى الضِّلَعِ أَعْلاَهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيْمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوْا بِالنِّسَاءِ- ‘নারী জাতিকে পাঁজরের বাঁকা হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের মধ্যে একেবারে উপরের হাড়টি অধিক বাঁকা। যদি তা সোজা করতে যাও, ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি তা ছেড়ে দাও, তবে সব সময় বাকাই থাকবে। সূতরাং তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ও উপদেশমূলক কথাবার্তা বলবে’।

পৃথিবীতে প্রথম মানব আদম (আঃ) মাটি থেকে এবং প্রথম মানবী হাওয়া (আঃ) আদমের পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি। এতদ্ব্যতীত সকল মানব-মানবী এক ফোঁটা অপবিত্র তরল পদার্থ (বীর্য) থেকে অদ্যাবধি সৃষ্টি হয়ে চলেছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ বলেন,فَإِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلاً- ‘অতঃপর আমরা তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।

brain-globe_3028263b

এরপর বীর্য থেকে, জমাট বাঁধা রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণ আকৃতি ও অপূর্ণ আকৃতি বিশিষ্ট গোশতপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। আর আমরা নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর শিশু অবস্থায় বের করি’ (হজ্জ ২২/৫)। এভাবে আজও মানব বংশবিস্তার অব্যাহত আছে বিবাহ-বন্ধন ও স্বামী-স্ত্রীর মিলন ব্যবস্থার মাধ্যমে। যাতে করে মহান আল্লাহর মহৎ উদ্দেশ্য সফল হয়।

গর্ভে সন্তান গঠনের গূঢ় রহস্য :

গর্ভে সন্তান গঠনের চক্র সাধারণতঃ দীর্ঘ ২৮০ দিন যাবৎ চলতে থাকে। যা ৪০ দিন অন্তর সুনির্দিষ্ট ৭ টি চক্রে বিভক্ত। নারী-পুরুষের যৌন মিলনের সময় নারীর ডিম্বনালীর ফানেলের মত অংশে ডিম্বাণু নেমে আসে এবং ঐ সময় পুরুষের নিক্ষিপ্ত বীর্যের শুক্রাণু জরায়ু বেয়ে উপরে উঠে আসে ও তা ডিম্বনালীতে প্রবেশ করে।

প্রথমে একটি শক্তিশালী শুক্রাণু ডিম্বাণুটির দেহে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে অন্য কোন শুক্রাণু প্রবেশ করতে পারে না। এভাবে নারীর ডিম্বাণুটি নিষিক্ত (Fertilization) হয় এবং নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জরায়ুতে নেমে প্রোথিত (Embedded) হয়। তাছাড়া নারীর ডিম্বাণুর বহিরাবরণে প্রচুর সিয়ালাইল-লুইস-এক্সসিকোয়েন্স্ নামের চিনির অণুর আঠালো শিকল শুক্রাণুকে যুক্ত করে পরস্পর মিলিত হয়। আর এই শুক্রাণু দেখতে ঠিক মাথা মোটা ঝুলে থাকা জোঁকের মত।

জোঁক যেমন মানুষের রক্ত চুষে খায়, শুক্রাণু ঠিক তেমনি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করে মায়ের রক্তে থাকা প্রোটিন চুষে বেড়ে উঠে। নিষিক্ত ডিম্বাণুটি সন্তান জন্মের রূপ নিলে সাধারণতঃ নিম্নে ২১০ দিন ও উর্ধ্বে ২৮০ দিন জরায়ুতে অবস্থান করে এবং ঐ সময়ের মধ্যে ডিম্বাশয়ে নতুন করে আর কোন ডিম্বাণু প্রস্ত্তত হয় না।

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِيْنٍ ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِيْ قَرَارٍ مَكِيْنٍ، ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِيْنَ-

‘আমরা মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমরা তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে (জরায়ুতে) স্থাপন করেছি। এরপর শুক্র বিন্দুকে জমাট রক্ত রূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে গোশতপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর গোশতপিন্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করেছি’ (মুমিন ২৩/১২-১৪)।

তিনি আরো বলেন, إِلَى قَدَرٍ مَعْلُوْمٍ، فَقَدَرْنَا فَنِعْمَ الْقَادِرُوْنَ ‘এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত, অতঃপর আমরা একে গঠন করেছি পরিমিতভাবে, আমরা কত সুনিপুন স্রষ্টা’ (মুরসালাত ৭৭/২২-২৩)। ‘অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন এবং তাতে রূহ সঞ্চার করেন’ (সাজদাহ ৩২/৯)।

এখানে মানব সৃষ্টির ৭টি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে। স্তরগুলো হ’ল মাটির সারাংশ, বীর্য, জমাট রক্ত, গোশতপিন্ড, অস্থি পিঞ্জর, অস্থিতে গোশত দ্বারা আবৃতকরণ ও সৃষ্টির পূর্ণত্ব অর্থাৎ রূহ সঞ্চারণ।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মাতৃগর্ভে মানব শিশু জন্মের স্তর সম্পর্কে এভাবে বলেছেন, إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِىْ بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِيْنَ يَوْمًا، ثُمَّ يَكُوْنُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُوْنُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللهُ مَلَكًا، فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ، وَيُقَالُ لَهُ اكْتُبْ عَمَلَهُ وَرِزْقَهُ وَأَجَلَهُ وَشَقِىٌّ أَوْ سَعِيْدٌ ثُمَّ يُنْفَخُ فِيْهِ الرُّوْحُ ‘তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান আপন মাতৃগর্ভে বীর্যের আকারে ৪০ দিন, জমাট বাধা রক্তে পরিণত হয়ে ৪০ দিন, গোশত আকারে ৪০ দিন।

এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে পাঠান এবং চারটি বিষয়ে আদেশ দেন যে, তার (শিশুর) আমল, রিযিক্ব, আয়ুষ্কাল ও ভালো না মন্দ সব লিপিবদ্ধ কর। অতঃপর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়া হয়’।

অন্যত্র এসেছে, إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَّلَ بِالرَّحِمِ مَلَكًا يَقُولُ يَا رَبِّ نُطْفَةٌ، يَا رَبِّ عَلَقَةٌ، يَا رَبِّ مُضْغَةٌ. فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقْضِىَ خَلْقَهُ قَالَ أَذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى شَقِىٌّ أَمْ سَعِيْدٌ فَمَا الرِّزْقُ وَالأَجَلُ فَيُكْتَبُ فِىْ بَطْنِ أُمِّهِ ‘আল্লাহ মাতৃগর্ভে একজন ফেরেশতা মোতায়েন করেন। ফেরেশতা বলেন, হে রব! এখনো তো ভ্রূণ মাত্র। হে রব! এখন জমাট বাঁধা রক্তপিন্ডে পরিণত হয়েছে। হে রব! এবার গোশতের টুকরায় পরিণত হয়েছে।

আল্লাহ যদি তাকে সৃষ্টি করতে চান, তখন ফেরেশতাটি বলেন, হে আমার রব! (সন্তানটি) ছেলে না মেয়ে হবে, পাপী না নেক্কার, রিযিক্ব কি পরিমাণ ও আয়ুষ্কাল কত হবে? অতএব এভাবে তার তাক্বদীর মাতৃগর্ভে লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়’। নারী ও পুরুষের বীর্যের সংমিশ্রণ ঘুরতে থাকে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এর চতুর্দিকে একটি আবরণের সৃষ্টি হয়। যাতে করে ভ্রূণটি ধ্বংস হ’তে না পারে।

এরপর আস্তে আস্তে এক বিন্দু রক্তকণায় পরিণত হয় এবং সেই রক্তকণা গোশতপিন্ডে ও অস্থিমজ্জায় পরিণত হয়, এভাবেই সৃষ্টি হয় মানব শিশু। মাতৃগর্ভে শিশুকে সংরক্ষণের জন্য মাতৃজঠরের তিনটি পর্দা বা স্তরের কথা কুরআনে বলা হয়েছে। যথা- পেট বা গর্ভ, রেহেম বা জরায়ু এবং ভ্রূণের আবরণ বা ভ্রূণের ঝিল্লি গর্ভফুল (Placenta)। এই তিন স্তর সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে’ (যুমার ৩৯/৬)।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে পবিত্র কুরআনে যে, ‘ত্রিবিধ অন্ধকারের’ কথা বলা হয়েছে। এই তিনটি অন্ধকার হ’ল- ১. রেহেম, ২. মাশীমা (المشيمة) বা গর্ভফুল এবং ৩. মায়ের পেট। রেহেমে রক্তপিন্ড ব্যতীত সন্তানের আকার-আকৃতি কিছুই তৈরী হয় না। আর গর্ভফুল (Placenta) ভ্রূণ বৃদ্ধি, সংরক্ষণ, প্রতিরোধ ইত্যাদি কাজে অন্যতম ভূমিকা রাখে। গর্ভফুল মায়ের শরীর থেকে রক্তের মাধ্যমে নানা পুষ্টি ভ্রূণের দেহে বহন করে, খুব ধীর গতিতে রেচন পদার্থ মায়ের দেহের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।

গর্ভফুলের সাহায্যে ভ্রূণ অক্সিজেন (O2) গ্রহণ ও কার্বনডাই অক্সাইড (CO2) ত্যাগ করে মায়ের ফুসফুসের মাধ্যমে, জীবাণু (Infection) থেকে ভ্রূণকে রক্ষা করে। এছাড়া ভ্রূণটি ঠিকমত জরায়ুতে আটকে রাখা, পুষ্টি সঞ্চয়, সম্পর্ক রক্ষা, হর্মোন সৃষ্টি ইত্যাদি কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এভাবে ভ্রূণটি জরায়ুতে বেড়ে উঠতে থাকে ও ১২০ দিন অতিবাহিত হ’লে শিশুর রূহ ফুঁকে দেয়া হয়। আর শিশু নড়েচড়ে উঠে ও আঙ্গুল চুষতে থাকে এবং পূর্ণ-পরিণত হওয়ার পরে সেখান থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয় (আবাসা ৮০/১৮-২০)। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঠেলে দেয়া হয়’। অর্থাৎ ২১০ দিন পর একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হবার উপযুক্ত হয়।

আর সন্তানটির যখন ভূমিষ্ঠ হবার উপযুক্ত সময় হয়ে যায়, তখন Overy-Placenta থেকে এক প্রকার গ্রন্থিরস নিঃসৃত হয়, যা প্রসব পথ পিচ্ছিল ও জরায়ুর মুখ ঢিলা করে দেয়। আর মানব সন্তান ঐ সময় বিভিন্নভাবে নড়াচড়া করতে থাকে এবং প্রসব পথ পিচ্ছিল থাকায় বাচ্চা অনায়াসে বেরিয়ে আসে। সবচেয়ে মজার কথা হ’ল মানবশিশুর যে অঙ্গ সর্বপ্রথম গঠিত হয় তা হ’ল কর্ণ। আর সন্তান গর্ভে ধারণের ২১০ দিন পর চক্ষু গঠিত হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুতে পরিণত হয়।

পুত্র-কন্যা সন্তান সৃষ্টির রহস্য :

নারীর গর্ভ সঞ্চার হওয়ার পর ২৮০ দিনের মধ্যে ১২০ দিন অতিবাহিত হ’লে পুত্র না কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন,لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُوْرَ، أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيْمًا إِنَّهُ عَلِيْمٌ قَدِيْر-ٌ ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদের পুত্র-কন্যা উভয় দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।

নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল’ (শূরা ৪২/৪৯-৫০)। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘পুরুষের বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করলে পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। আবার স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করলে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়’।

আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতে, জরায়ুতে যদি কন্যা ভ্রূণ সৃষ্টি হয়, তাহ’লে করটেক্স কম্পোন্যান্টগুলি (Cortics Componant) বৃদ্ধি প্রাপ্ত হ’তে থাকে এবং মেডুলার কম্পোন্যান্টগুলি (Medullar Componant) কমতে থাকে। পক্ষান্তরে জরায়ুতে যদি পুত্র ভ্রূণ সৃষ্টি হয়, তাহ’লে করটেক্স কম্পোন্যান্টগুলি (Cortics Componant) কমতে থাকে এবং মেডুলার কম্পোন্যান্টগুলি (Medullar Componant) বৃদ্ধি প্রাপ্ত হ’তে থাকে।তাছাড়া মানুষের প্রতিটি দেহকোষে মোট ২৩ জোড়া ক্রমোজম থাকে।

তন্মধ্যে ২২ জোড়া অটোজম এবং এক জোড়া সেক্স (Sex) ক্রমোজম। নারীর ডিম্বাণুতে XX ক্রমোজোম এবং পুরুষের শুক্রাণুতে XY ক্রমোজম থাকে। সুতরাং নারীর ডিম্বাণুর X ক্রমোজমকে যদি পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রমোজম নিষিক্ত করে, তবে জাইগোটের ক্রমোজম হবে XX এবং কন্যা সন্তানের জন্ম হবে। পক্ষান্তরে নারীর ডিম্বাণুর X ক্রমোজমকে যদি পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রমোজম নিষিক্ত করে, তবে জাইগোটের ক্রমোজম হবে XY এবং পুত্র সন্তান জন্ম হবে।[16]

মোদ্দাকথা, যখন ডিম্বাণুর ও শুক্রাণুর জাইগোটের ক্রমোজম একই গোত্রীয় (XX) হয়, তখন কন্যা সন্তান এবং যখন ডিম্বাণুর ও শুক্রাণুর জাইগোটের ক্রমোজম একই গোত্রীয় (XY) না হয়, তখন পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। অতএব সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ নির্ভর করে পুরুষের দেহে উৎপন্ন শুক্রাণুর উপর। আর যমজ সন্তান জন্ম দানের জন্য সবচেয়ে বেশী ভূমিকা স্ত্রীর।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, নারীর ডিম্বাশয় থেকে যখন একটি ডিম্বাণু জরায়ুতে নেমে আসে, তখন একটি শক্তিশালী শুক্রাণু তাতে প্রবেশ করে একটি সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু যদি দু’টি ডিম্বাণু জরায়ুতে নেমে আসে, তখন দু’টি শক্তিশালী শুক্রাণু তাতে আলাদা আলাদা প্রবেশ করে। ফলে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। আবার সন্তানের আকৃতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ) বলেছেন, ‘পুরুষ যখন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন যদি পুরুষের বীর্য প্রথমে স্খলিত হয়, তাহ’লে সন্তান পিতার আকৃতি পায়। পক্ষান্তরে যদি স্ত্রীর বীর্য প্রথমে স্খলিত হয়, তাহ’লে সন্তান মায়ের আকৃতি লাভ করে’। এভাবেই সন্তান সৃষ্টির গূঢ় রহস্য বেরিয়ে এসেছে।

শেষ কথা :

মহান আল্লাহ তা‘আলা সুনিপুন করে সুন্দর আকৃতিতে মনোরম কাঠামোতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন গবেষণা করে আল্লাহর সৃষ্টির গূঢ় রহস্য উদঘাটন করে চলেছে। এই সব চাঞ্চল্যকর তথ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা গবেষণা ও শিক্ষা গ্রহণ কর’ (হাশর ৫৯/২)। যুগে যুগে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে মানুষ সৃষ্টির চেয়ে মহাকাশ সৃষ্টিকে অতীব বিস্ময়কর মনে করেছেন। দিন দিন নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারে বিস্মিত হয়েছেন।

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ সৃষ্টি অপেক্ষা নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সৃষ্টি কঠিনতর। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করে না’ (মুমিন ৪০/৫৭)। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করার অনুমতি আছে। আমাদের সকলের উচিত আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করতঃ তাঁর (আললাহর) মহত্ত্ব ঘোষণা করা। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে নতুন নতুন তথ্য উদ্ধার করছেন।

অথচ অনেক আগেই এই তথ্য মানব কল্যাণে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। বলা যেতে পারে, কুরআনই এক সুশৃংখল কল্যাণকর অকৃত্রিম বিস্ময়কর এলাহী বিজ্ঞান এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সর্বকালের যুগশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তা উপলব্ধি করার তাওফীক দান করুন-আমীন!!

24
আসলেই কি অভিশাপ বলে কিছু আছে? বিজ্ঞান অভিশাপের বিষয়টি সমর্থন করে না। কিন্তু বিজ্ঞানের বাইরেও রয়েছে কিছু বিষয়। এমন অনেক অসংজ্ঞায়িত বিষয় রয়েছে পৃথিবীতে যা বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পারে না। এমনই অসংজ্ঞায়িত একটি বিষয় হচ্ছে অভিশাপ এবং অভিশপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি।
অনেক সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে কিছু জিনিসকে ঘিরে যার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন ইতিহাস খুঁজে দেখা যায় জিনিসটি কোনো না কোনো কারণে অভিশপ্ততা লাভ করেছে। এবং এরই ফসল এতোসব অসংজ্ঞায়িত ঘটনার। আজ পর্যন্ত এমন অনেক কিছুরই নজির পাওয়া গিয়েছে পুরো পৃথিবী জুড়ে। আজকে দেখে নিন এমনই ভয়ংকর অভিশপ্ত কিছু জিনিস এবং জেনে নিন এইসকল জিনিসের সাথে জড়িত সকল অসংজ্ঞায়িত ঘটনাগুলো।
১) লিটল বাস্টার্ড

জেমস ডিন মাত্র দুটি সিনেমাতে কাজ করেই ১৯৫৫ সালে অনেক নাম কুড়ান। তিনি আর এই খ্যাতি এবং প্রতিপত্তির কারণেই অর্ডার দিয়ে একটি ১৯৫৫ পোর্সে স্পাইডার গাড়ির ফরমায়েশ করেন যার নাম দেন ‘লিটল বাস্টার্ড’। মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যেই ডিন মারাত্মক গাড়ি এক্সিডেন্ট করে মৃত্যু বরণ করেন। গাড়ির গতিবেগ ছিল ৮৫ মাইল প্রতিঘন্টা। এই ঘটনা দিয়ে অভিশপ্ততা শুধুমাত্র শুরু-

– একজন গাড়ি মেকানিক গাড়িটি এক্সিডেন্টের পর ঠিক করতে গিয়ে নিজের দু’পা হারান
– এই গাড়ির পার্টস খুলে লাগানো হয় দুটি স্পোর্টস গাড়িতে যার দুটিই এক্সিডেন্ট করে এবং একজন চালক মৃত্যুবরণ করেন।
– চোর এই গাড়ির পার্টস চুরি করতে গিয়ে গুরুতর জখম হন
– গাড়িটি অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছিল সেই ট্রাকটি এক্সিডেন্ট করে এবং ড্রাইভার মৃত্যুবরণ করেন। এরপর গাড়িটি চুরি হয়ে যায়।
২) চেয়ার অফ ডেথ

থমাস বাসবে নামক এক ব্যক্তির এই চেয়ারটি খুব বেশি প্রিয় ছিল। তিনি এই চেয়ারটিতে কাউকে বসতে দিতেন না। তার এই অবসেশন এমন মাত্রায় পৌঁছে যায় যে তিনি চেয়ারটিকে অভিশপ্ত করেন এই বলে যে, ‘মৃত্যু ছাড়া এই চেয়ার কেউ ব্যবহার করতে পারবে না’। তার মৃত্যুর পর ঘটে সব অদ্ভুত ঘটনা। ইতিহাস বলে সেই থেকে ৬৩ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন শুধুমাত্র এই চেয়ারে বসার কারণে। এরপর এটি মিউজিয়ামের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যেনো কেউ বসতে না পারে।

৩) হোপ ডায়মন্ড


বেশ বড় আকারের নীল রঙের এই বিখ্যাত পাথরটি বিশ্বের দামী পাথরগুলোর মধ্যে একটি। এই পাথরটি মূলত ভারতীয় দেবতার মূর্তি থেকে চুরি করা হয়েছিল যার কারণে এটি অভিশপ্ত হয়। এরপর বহু ধনী মানুষের কাছে এই পাথরটি গিয়েছে এবং এটিই তাদের সর্বনাশের মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়। কারণ পাথরটি পাওয়ার পর থেকে বহু ধনী মানুষ গরীব হয়েছেন, ব্যংক দেউলিয়া ঘোষণা করেন, আত্মহত্যা করেন এবং খুন হন।

৪) দ্য আংগুইসড ম্যান

এই ‘দ্য আংগুইড ম্যান’ নামক ছবিটি পেইন্টার তার নিজের রক্ত দিয়ে এঁকেছিলেন এবং এই ছবিটি আঁকা শেষ করার পর তিনি আত্মহত্যা করেন। যখন শেন রবিনশোন পৈত্রিক সুত্রে এই ছবিটি পান তারপর থেকেই তার পরিবার নানা ধরণের আধাভৌতিক কার্যকলাপের সম্মুখীন হন। তারা একটি মানব দেহের ছাড়া ঘুরে বেড়াতে দেখতে পুরো ঘরময়। এরপর ছবিটি বেজমেন্টে বন্ধ করে রাখা হয়।

৫) অ্যানাবেল দ্য ডল

কিছুদিন আগেও এই সম্পর্কিত একটি সিনেমা মুক্তি পায়। কিন্তু বলে রাখা ভালো সত্যিকারের অ্যানাবেল ডল কিন্তু আসলেই রয়েছে। এই ঘটনাটি আসলেই বিশ্বাস হতে চায় না। ১৯৭০ সালে এই অ্যানাবেল নামক পুতুলটি কেনে একটি ছোট্ট মেয়ে এবং কিছু দিনের মধ্যেই টের পাওয়া যায় পুতুলটি আপনাআপনিই ঘরে চলাফেরা করে এবং ঘরের এখানে সেখানে নোট লিখে রাখে ‘হেল্প’ লিখে। পরবর্তীতে এটিও জানা যায় এই ব্যাপারে তদন্ত করতে আসা মানুষের উপর পুতুলটি হামলাও করেছিল। প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটরদের মতে এই পুতুলটি ছিল নরকের পোর্টাল ছিল যা শয়তান দ্বারা চালিত হতো। পুতুলটি এখন একটি অতিপ্রাকৃত যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

25
বিজ্ঞানের সূচনালগ্নের অনেক পরে জমজমের পানি সম্পর্কে নতুন রহস্য প্রকাশ করেছে এবং এটা কিভাবে গৌরবময় কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রভাবিত হয়। আপনি আশ্চর্য হবেন! আমরা সাম্প্রতিককালে মাদুলীর বা তাবিজের ব্যবহারের মূল্য বুঝতে সমর্থ হয়েছি।

এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, পানযোগ্য পানির উপরে যা পাঠ করা হয় তা দ্বারা কিভাবে প্রভাবিত হয়। জাপানের বিজ্ঞানী মাশারো ইমোটোর একটি অনন্য অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

তিনি বলেছিলেন যে, তিনি একটি বইতে পড়েছেন যে, আকাশ থেকে পড়া তুষার কনা হচ্ছে অনন্য। তিনি বলেছেন যে, তার বৈজ্ঞানিক অনুভূতি তাকে বলেছিল যে, এটা সত্য হতে পারে না। তুষার কনার জ্যামেতিক আকার এর রাসায়নিক গঠন দ্বারা নির্ধারিত হয়।

ওই বিজ্ঞানী বলেছিলেন যে, পানির গঠন সুপরিচিত। দুইটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু দ্বারা এটা গঠিত হয়। তাই আকাশ থেকে পড়া তুষার কনাগুলো একে অন্যের থেকে আলাদা কিভাবে হতে পারে? তিনি বলেছেন, আমি দৃঢ় মানসিকতাবদ্ধ ছিলাম যে, এই তত্ত্বকে কিভাবে ভুল প্রমাণিত করব।

তিনি একটি গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন যাতে একটি রেগুলেটরসহ একটি ডিপ ফ্রিজার ছিল। যেহেতু কোনো তরল পদার্থ যদি হঠাৎ করে জমাটবদ্ধ করা হয় তাহলে একটি জ্যামেতিক আকার গ্রহণ করতে পারে না।

জমাট বাধা অবশ্যই ধীরে হতে হবে যাতে করে পরমাণুগুলো বিধাতা দ্বারা নির্ধারিত আকারে স্ফটিকায়ন হবার সুযোগ লাভ করে। একটি রেগুলেটরসহ একটি ডিপ ফ্রিজার ছিল। মাইনাস (-৭ ) ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় একটি ঠাণ্ডা কক্ষ এবং ক্যামেরা দ্বারা সুসজ্জিত কতগুলো অনুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল যাতে করে তুষার কনা গলে যাওয়ার আগে এগুলোর আলোকচিত্র গ্রহণ করা যায়।

বিজ্ঞানীরা এই কক্ষে গরম কাপড় পরে কাজ করা শুরু করে। তিনি বলেছিলেন, আমি গবেষণাগারে দুইটি নলের থেকে নমুনা নিয়েছিলাম, আমি এদেরকে জমাট করি এবং প্রতিটি নমুনা আমাকে একটি আলাদা তুষার কনা দিয়েছিল।

নমুনাগুলো দুইটি আলাদা কূপের থেকে, দুইটি আলাদা নদীর থেকে এবং দুইটি আলাদা হ্রদের থেকে গ্রহণ করেছিলাম। আমি পাগল হয়ে গেছিলাম এবং ভেবেছিলাম এটি একটি যাদুমন্ত্র।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নরত একজন সৌদি ছাত্রের সাথে তার হঠাৎ করে দেখা হয় এবং তাকে জিজ্ঞাসা করে কি ভুল হয়েছে। মাশারো তাকে তার সমস্যা সম্পর্কে বলে। ছাত্রটি তাকে বলে যে, আমাদের আশীর্বাদপুষ্ট পানি আছে যাকে জমজমের পানি বলে।

আমি আপনাকে এই পানির একটি নমুনা দেব যাতে করে আপনি এর ওপর পরীক্ষা চালাতে পারেন। জমজমের পানি যাদুমন্ত্র বা জীন দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তাই এটা ব্যবহার করা হলে এটা সমগ্র তত্ত্ব প্রমাণ বা মিথ্যা সাব্যস্ত করবে।

ইমোটো জমজমের পানির একটি নমুনা নিলেন এবং বললেন, আমি এটাকে স্ফটিকায়ন করতে পারি নি, এমনকি পর্যন্ত পানিটি ১০০০ ভাগ পাতলা করার পরেও। অন্য কথায় তিনি ১ ঘন সেন্টিমিটিারকে ১ লিটারে রূপান্তর করেন।

তিনি বলেন যে, তিনি যখন পানিটি ১০০০ ভাগ পাতলা করেন এবং জমাটবদ্ধ করেন তিনি তখন একটি অনবদ্য আকারের স্ফটিক লাভ করেন। দুইটি স্ফটিক গঠিক হয় একটি অপরটির উপরে কিন্তু এগুলো একটি অনন্য আকার গ্রহণ করে।

যখন তিনি তার মুসলিম সহকর্মীকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন দুটো স্ফটিক হলো? তিনি তাকে বলেন যে, যেহেতু জমজম দুইটি শব্দ দ্বারা গঠিত, “জম এবং জম”। মাশারো ইমোটো বলেন, আমার মুসলিম সহকর্মী পানির ওপর কোরআনের আয়াত পাঠ করার প্রস্তাব দেয়।

সে একটি টেপ রেকর্ডার নিয়ে আসে এবং কতগুলো কোরআনের আয়াত বাজায় এবং আমরা সবচাইতে নিখুঁত আকৃতির স্ফটিক লাভ করি। তারপর সে আল্লাহ (সর্বশক্তিমান) এর ৯৯টি নাম বাজায়। প্রতিটি নাম একটি অনবদ্ধ আকারের স্ফটিক তৈরি করে।

যখন ডাক্তার ইমোটো এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করেন যা ১৫ বছর স্থায়ী হয়েছিল, তিনি একটি ৫ খণ্ডের বই নির্মাণ করেন, যার নাম হচ্ছে ‌‘পানির থেকে বার্তা’। তিনি লেখেন, আমি প্রমাণ করেছি যে পানি, ওই বিশেষ তরলটি চিন্তা করার, মাপার, বোধ করার, উত্তেজিত হওয়ার এবং নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে।

ডাক্তার মাশারো ইমোটো নিম্নোক্তভাবে লিখেছেন, জমজম পানির গুণ/বিশুদ্ধতা এই পৃথিবীর অন্য কোথাও পানিতে এর যে গুণ আছে তা পাওয়া যাবে না। তিনি নানো নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করেন এবং জমজম পানির ওপর প্রচুর গবেষণা করেন এবং দেখতে পান যে, যদি জমজম পানির ফোটা নিয়মিত পানির ১০০০ ফোটাতেও মিশ্রিত হয় তবুও নিয়মিত পানি জমজম পানির মত সমান গুণ লাভ করবে।

তিনি আরো দেখতে পান যে, জমজম পানির এক ফোটাতে একটি খনিজ পদার্থের এর নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে যা এই পৃথিবীর অন্য কোনো পানিতে পাওয়া যাবে না। তিনি কিছু পরীক্ষাতে দেখতে পান যে, জমজম পানির গুণ বা উপকরণ পরিবর্তন করা যায় না, কেন, বিজ্ঞান এর কারণ জানে না।

এমনকী তিনি জমজম পানির পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করেন কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি, এটা বিশুদ্ধ ছিল। এই বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন যে, মুসলমানরা খাওয়া বা পান করার আগে বিস্‌মিল্লাহ বলে। তিনি বলেন যে, নিয়মিত পানিতে বিস্‌মিল্লাহ বলা হলে এর ফলে নিয়মিত পানির গুণে কতগুলো অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে।

এর ফলে এটা সবোর্ত্তম পানি হয়। তিনি আরো দেখতে পান যে, যদি নিয়মিত পানির ওপর কোরআন পাঠ করা হয় তা হলে এটা বিভিন্ন ব্যাধি চিকিৎসার জন্য ক্ষমতা লাভ করে। সুবহানাল্লাহ! নিশ্চয় আল্লাহর এটা একটি কুদরত। জমজম পানি পর্যায় ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ১০.৬ ফুট নিচে এটা আল্লাহর কুদরত যে, জমজম ক্রমাগত প্রতি সেকেন্ডে ৮০০০ লিটার হারে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পাম্প করা হয়, তখন পানির পর্যায় ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৪৪ ফুট নিচে নেমে যায়।

কিন্তু যখন পাম্প করা বন্ধ করা হয় তখন পর্যায় দ্রুত ১১ মিনিট পরে আবার ১৩ ফুট উচ্চতায় ফিরে আসে। প্রতি সেকেন্ড ৮০০০ লিটার অর্থ হল ৮০০০ x ৬০ = ৪,৮০,০০০ লিটার প্রতি মিনিটে, প্রতি মিনিটে ৪,৮০,০০০ লিটারের অর্থ হল ৪,৮০,০০০ x ৬০ = ২৮.৮ মিলিয়ন লিটার প্রতি ঘণ্টায় এবং প্রতি ঘণ্টায় ২৮.৮ মিলিয়ন লিটার মানে হচ্ছে ২৮৮০০০০০ x ২৪ = ৬৯১.২ মিলিয়ন লিটার প্রতিদিনে।

তাই তারা ২৪ ঘন্টায় ৬৯০ মিলিয়ন লিটার জমজম পানি পাম্প করে কিন্তু এটা কেবলমাত্র ১১ মিনিটে আবার পূর্ণ হয়। এখানে দুইটা কুদরত আছে, প্রথমটি হলো জমজম দ্রুত পুনর্ভর্তি হয় এবং দ্বিতীয় হলো আল্লাহ অসামান্য শক্তিশালী একুফার ধারণ করেন, যা কূপের বাইরে কোনো অতিরিক্ত জমজম পানি নিক্ষেপ করে না। অন্যথায় পৃথিবী ডুবে যেত।


আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন যে, আমরা তাড়াতাড়ি তাদেরকে বিশ্ব ভ্রমান্ডে আমাদের চিহ্ন দেখাব এবং তাদের নিজস্ব আত্মায় আমাদের চিহ্ন দেখাব, যতক্ষণ না পর্যন্ত এটা তাদের কাছে পরিষ্কার হয় যে, এটা হচ্ছে সত্য।

26
এলিয়েন (ভিনগ্রহের প্রাণী) সম্পর্কে বিজ্ঞান থেকে আল-কুরআনের ধারনা অনেক বেশি সুস্পষ্ট। বিজ্ঞান যেখানে দ্বিধাদ্বন্দে কিন্তু আল-কুরআন সেখানে দিচ্ছে ১০০% নিশ্চয়তা। যেই দিন-ই আমরা এলিয়েনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারব, সেই দিন হয়তো দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে এসে আশ্রয় গ্রহণ করবে!
খ্রীষ্টপূর্ব পাঁচ শতকে থেলাস সর্বপ্রথম ভিনগ্রহের প্রাণীর ধারনা পোষন করেন। তার ধারনা মতে “দৃশ্যমান গ্রহ ব্যবস্থা ছাড়াও অন্য কোন জীবন বহুল জগত রয়েছে”। পুটার্চ তার ধারণায় চাঁদে স্বর্গের অসুরদের আবাস ভূমিকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
অনুরূপভাবে মধ্যযুগের জ্যোতির্বিদগণও পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহে জীবনের কল্পনায় শুধু করতেন না, তারা কল্পিত জগতগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেরও নিরন্তর প্রয়াস ও ধ্যান ধারণার চিহ্ন রেখে গেছেন ইতিহাসের পাতায়।
বিখ্যাত গণিতবিদ সি এফ গাউস সাইবেরীয় জঙ্গলের বৃক্ষরাজিতে একটি অতিকায় ত্রিকোণ তৈরীর প্রস্তাব করেছিলেন যা অন্যান্য গ্রহের অধিবাসিগণকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হবে। জে জে ভন লিট্রো সাহারা মরুভূমিতে জ্যামিতির পদ্ধতি অনুসারে সুবৃহৎ আকৃতির নালা তৈরী করে তাতে কেরোসিন ঢেলে রাতের বেলায় আগুন ধরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব রাখেন।
সি গ্রস দিনের সূর্যালোকে অতিকায় আয়না স্থাপন করে আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে ভিন গ্রহের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পরামর্শ পর্যন্ত দান করেছিলেন। এই তো গেল প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দার্শনিকদের প্রচেষ্টা। আর আধুনিক যুগে ভিনগ্রহের প্রাণীর সন্ধানে পৃথিবীতে এবং পৃথিবী থেকে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন অভিযান।
পৃথিবীর অভিযানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সেটি (SETI:Search for Extraterrestrial Intelligence), যা ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক। 'সেটি' বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে ভিনগ্রহের প্রাণীর সন্ধান করে পৃথিবী থেকেই। বর্তমানে ১০টিরও বেশি দেশে 'সেটি' এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভিনগ্রহের প্রাণীদের সম্পর্কে আংকিক কিংবা যৌক্তিক কিংবা বিশ্বাসগত এই বিপুল সমর্থনের কারণেই গবেষকরা খুঁজে চলেছেন প্রাণের অস্তিত্ব। এই সন্ধান-কার্যক্রমে গবেষকরা একদিকে অতীতের ঐতিহাসিক উৎসে খোঁজ করছেন ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব আর বিজ্ঞানীরা খোঁজ করছেন পৃথিবীর বাইরের গ্রহ কিংবা উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব।
শুধু বিজ্ঞানিক ও দার্শনিক নয় গণমাধ্যমও রেখে যাচ্ছেন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা- ভিনগ্রহের প্রাণীদের সম্পর্কে গণমাধ্যমে বহু চটকদার এবং কখনও কখনও ভাবগম্ভির কাজও হয়েছে। যেমন লেখা হয়েছে বই, প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকার প্রতিবেদন, তেমনি তৈরি হয়েছে গান, চলচ্চিত্র এবং এ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। যা নতুন করে বলার কোন অবকাশ রাখেনা, কারণ এগুলো সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি।
এবার আমরা আল-কুরআনের দিকে দৃষ্টি দেয়-
“মহান আল্লাহই জগতসমূহের প্রতিপালক। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা” (৪০:৬৪-৬৫)।
“জগতসমূহের প্রতিপালক আবার কি? তিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীসমূহ এবং উহাদিগের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর প্রতিপালক যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও”
(২৬:২৩-২৪)।
“তাঁর এক নিদর্শন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন” (৪২:২৯)।
“আল্লাহ হইতেছেন তিনি, যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন অসংখ্য আকাশ আর অনুরূপ সংখ্যক পৃথিবী। উহাদের উপরও আল্লাহর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়; (এ তথ্যটি) এই জন্য যে তোমরা যেন অবগত হও, আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও সর্বাজ্ঞ” (৬৫:১২)।
আল-কুরআনের আরো অনেক আয়াতে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যে- শুধু আমাদের এই পৃথিবীই নয়, অন্য কোন অজানা প্রান্তেও রয়েছে আল্লাহর সৃষ্টি জীব। কিন্তু এর বিপরীতে মহাবিশ্বের কোথাও প্রাণ নেই এরকম কোন বার্তা আল-কুরআনে দেয়নি।
আর ৪২ নং সূরার ২৯ নং আয়াত এবং ৬৫ নং সূরার ১২ নং আয়াত ২টি আমাদের কে ১০০% নিশ্চিয়তা প্রদান করে ভিন গ্রহের প্রাণী সম্পর্কে এবং ৬৫ নং সূরার ১২ নং আয়াতটি আমাদেরকে যে ধারনা দান করে তাহল- “ভিন গ্রহের প্রাণীরা আমাদের মতই বুদ্ধিমান এবং গঠন গত দিক থেকে আমাদের মতই (হতে পারে আমাদের থকেও বেশি) উন্নত ।
কারণ তাদের উপর যেহেতু আল্লাহর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়, তারা অবশ্যই বুদ্ধিমান হতে হবে। তাদের থাকবে জ্ঞান, থাকবে পড়ার ও লিখার ক্ষমতা। যদি পড়ার ও লিখার ক্ষমতা থাকে, তহলে তাদের মস্তিষ্ক হতে হবে বড় এবং থাকতে হবে নূন্যতম আমাদের হাতের মত গঠন, যা কলম ধরতে সহায়ক। কিন্তু এলিয়েনের গঠনগত বিজ্ঞানের ধারনা গুলো আনেক বৈচিত্র পূর্ণ, যা শুধু কল্পনা মাত্র।

27
হিজরী ৫৫৭ সালের একরাতের ঘটনা। সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) তাহাজ্জুদ ও দীর্ঘ মুনাজাতের পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারিদিক নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। এমতাবস্থায় হঠাৎ তিনি স্বপ্নে দেখলেন স্বয়ং রাসুল (স) তার কামরায় উপস্থিত। তিনি কোন ভূমিকা ছাড়াই দু’জন নীল চক্ষু বিশিষ্ট লোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, (নূরুদ্দীন) মাহমূদ! (এরা আমাকে বিরক্ত করছে), এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।

এই ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গোটা কক্ষময় পায়চারি করতে লাগলেন। সাথে সাথে তার মাথায় বিভিন্ন প্রকার চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। হৃদয় রাজ্যে ভীড় জমাল হাজারও রকমের প্রশ্ন। তিনি ভাবলেন-

আল্লাহর রাসূল তো এখন কবরে জীবনে!

তার সাথে অভিশপ্ত ইহুদীরা এমন কী ষড়যন্ত্র করতে পারে?

কী হতে পারে তাদের চক্রান্তের স্বরুপ?

তারা কি রাসূল (স)-এর কোন ক্ষতি করতে চায়?

চায় কি পর জীবনেও তার সাথে ষড়যন্ত্র লিপ্ত হতে?


আমাকে দু’জন ইহুদীর চেহারা দেখানো হল কেন?

শয়তান তো আল্লাহর নবীর অবয়বে আসতে পারে না। তাহলে কি আমি সত্য স্বপ্ন দেখেছি?

এসব ভাবতে ভাবতে সুলতান অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি অজু-গোসল সেরে তাড়াতাড়ি দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। তারপর মহান আল্লাহর দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় অনেকক্ষণ মুনাজাত করলেন। সুলতানের এমন কেউ ছিল না যার সাথে তিনি পরামর্শ করবেন। আবার এ স্বপ্নও এমন নয় যে, যার তার কাছে ব্যক্ত করবেন। অবশেষে আবারও তিনি শয়ন করলেন। দীর্ঘ সময় পর যখনই তার একটু ঘুমের ভাব এলো, সঙ্গে সঙ্গে এবারও তিনি প্রথম বারের ন্যায় নবী করীম (সা)কে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি তাকে পূর্বের ন্যায় বলছেন, (নূরুদ্দীন) মাহমূদ! এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।

এবার নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) “আল্লাহ্, আল্লাহ্” বলতে বলতে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। তারপর কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই ঠিক করতে পা পেরে দ্রুত অজু-গোসল শেষ করে মুসল্লায় দাড়িয়ে অত্যধিক ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় দু’রাকাত নামায আদায় করলেন এবং দীর্ঘ সময় অশ্রু সিক্ত নয়নে দোয়া করলেন।

রাতের অনেক অংশ এখনও বাকী। সমগ্র পৃথিবী যেন কি এক বিপদের সম্মুখীন হয়ে নিঝুম হয়ে আছে। কী এক মহা বিপর্যয় যেন পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হতে যাচ্ছে । কঠিন বিপদের ঘনঘটা যেন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মুখ তুলে আকাশ পানে তাকালেন। মনে হলো স্বপ্ন দেখা ঐ দু’জন লোক যেন তাকে ধরার জন্য দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। তিনি সেই চেহারা দুটোকে মনের মনিকোষ্ঠা থেকে সরাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই তা সম্ভব হল না। শেষ পর্যন্তু নিরুপায় হয়ে নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) চোখ বন্ধ করে আবারও তন্দ্রা-বিভোর হয়ে শুয়ে পড়লেন।

শোয়ার পর তৃতীয়বারও তিনি একই ধরনের স্বপ্ন দেখলেন। রাসূল (সা)-এর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) ক্রন্দনরত অবস্থায় বিছানা পরিত্যাগ করলেন। এবার তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, নিশ্চয়ই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক কোন না মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছে।

তিনি তড়িৎ গতিতে অজু-গোসল করে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামায শেষে প্রধানমন্ত্রী জালালুদ্দীন মৌশুলীর নিকট গিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বপ্নের বিবরণ শুনালেন এবং এ মুহূর্তে কী করা যায়, এ ব্যাপারে সুচিন্তিত পরামর্শ চাইলেন।

জালালুদ্দীন মৌশুলী স্বপ্নের বৃত্তান্ত অবগত হয়ে বললে, “হুজুর! আপনি এখনও বসে আছেন? নিশ্চয়ই প্রিয় নবীর রওজা মোবারক কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তাই এ বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য বারবার তিনি আপনাকে স্মরণ করছেন। অতএব, আমার পরামর্শ হল, সময় নষ্ট না করে অতিসত্তর মদীনার পথে অগ্রসর হোন।” নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) আর কালবিলম্ব করলেন না। তিনি ষোল হাজার দ্রুতগামী অশ্রারোহী সৈন্য এবং বিপুল ধন সম্পদ নিয়ে বাগদাদ থেকে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। রাত দিন সফর করে ১৭তম দিনে মদিনা শরীফে পৌঁছলেন এবং সৈন্য বাহিনীসহ গোছল ও অজু সেরে দু’ রাকাত নফল নামাজান্তে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করলেন। তারপর সৈন্য বাহিনী দ্বারা মদিনা ঘেরাও করে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারী করে দিলেন যে, বাইরের লোক মদিনায় আসতে পারবে, কিন্তু সাবধান! মদিনা থেকে কোন লোক বাইরে যেতে পারবে না।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) জুম্মার খোৎবা দান করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, “আমি মদিনাবাসীকে দাওয়াত দিয়ে এক বেলা খানা খাওয়াতে চাই। আমার অভিলাষ, সকলেই যেন এই দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করে।” সুলতান মদিনাবাসীকে আপ্যায়নের জন্য বিশাল আয়োজন করলেন এবং প্রত্যেকের নিকট অনুরোধ করলেন, মদিনার কোন লোক যেন এই দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়। নির্ধারিত সময়ে খাওয়া-দাওয়া শুরু হল। প্রত্যেকেই তৃপ্তিসহকারে খানা খেল। যারা দুরদুরান্ত থেকে আসতে পারেনি তাদেরকেও শেষ পর্যন্ত ঘোড়া ও গাধার পিঠে চড়িয়ে আনা হল। এভাবে প্রায় পনের দিন পর্যন্ত অগনিত লোক শাহী দাওয়াতে শরিক হওয়ার পর সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন আরও কেউ অবশিষ্ট আছে কি? থাকলে তাদেরকেও ডেকে আন।

এই নির্দেশের পর সুলতান বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হলেন যে, আর কোন লোক দাওয়াতে আসতে বাকী নেই। একথা শুনে তিনি সীমাহীন অস্থির হয়ে পড়লেন। চিন্তার অথৈই সাগরে হারিয়ে গেলেন তিনি। ভাবলেন, যদি আর কোন লোক দাওয়াতে শরীক হতে বাকী না থাকে তাহলে সেই অভিশপ্ত লোক দু’জন গেল কোথায়? আমি তো দাওয়াতে শরীক হওয়া প্রতিটি লোককেই অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু কারও চেহারাইতো স্বপ্নে দেখা লোক দুটোর চেহারার সাথে মিলল না, তাহলে কি আমার মিশন ব্যর্থ হবে? আমি কি ঐ কুচক্রী লোক দুটোকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দিতে সক্ষম হব না? এসব চিন্তায় বেশ কিছুক্ষণ তিনি ডুবে রইলেন। তারপর আবারও তিনি নতুন করে ঘোষণা করলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মদিনার সকল লোকদের দাওয়াত খাওয়া এখনও শেষ হয়নি। অতএব সবাইকে আবারও অনুরোধ করা যাচ্ছে, যারা এখনও আসেনি তাদেরকে যেন অনুসন্ধান করে দাওয়াতে শরীক করা হয়।

একথা শ্রবণে মদিনাবাসী সকলেই এক বাক্যে বলে উঠল, “হুজুর! মদিনার আশে পাশে এমন কোন লোক বাকী নেই, যারা আপনার দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করেনি।” তখন নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) বলিষ্ঠ কন্ঠে বললেন, “আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। আপনারা ভাল ভাবে অনুসন্ধান করুন।” সুলতানের এই দৃঢ়তা দেখে লক্ষাধিক জনতার মধ্য থেকে এক ব্যক্তি হঠাৎ করে বলে উঠল, “হুজুর! আমার জানামতে দু’জন লোক সম্ভবত এখনও বাকী আছে। তারা আল্লাহ্‌ওয়ালা বুযুর্গ মানুষ। জীবনে কখনও কারও কাছ থেকে হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করেন না, এমনকি কারও দাওয়াতেও শরীক হন না। তারা নিজেরাই লোকদেরকে অনেক দান-খয়রাত করে থাকেন। নীরবতাই অধিক পছন্দ করেন। লোক সমাজে উপস্থিত হওয়া মোটেও ভালবাসেন না।”

লোকটির বক্তব্য শুনে সুলতানের চেহারায় একটি বিদ্যুত চমক খেলে গেল। তিনি কাল বিলম্ব না করে কয়েকজন লোক সহকারে ঐ লোক দুটোর আবাসস্থলে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন, এতো সেই দু’জন, যাদেরকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল। তাদেরকে দেখে সুলতানের দু’চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কে তোমরা? কোথা থেকে এসেছ? তোমরা সুলতানের দাওয়াতে শরীক হলে না কেন?”

লোক দুটো নিজের পরিচয় গোপন করে বলল, “আমরা মুসাফির। হজ্বের উদ্দেশ্য এসেছিলাম। হজ্ব কার্য সমাধা করে জিয়ারতের নিয়তে রওজা শরীকে এসেছি। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে আত্মহারা হয়ে ফিরে যেতে মনে চাইল না। তাই বাকী জীবন রওজার পাশে কাটিয়ে দেওয়ার নিয়তেই এখানে রয়ে গেছি। আমরা কারও দাওয়াত গ্রহণ করি না। এক আল্লাহর উপরই আমাদের পূর্ণ আস্থা। আমরা তারই উপর নির্ভরশীল। এবাদত, রিয়াজত ও পরকালের চিন্তায় বিভোর থাকাই আমাদের কাজ। কুরআন পাক তিলাওয়াত, নফল নামায ও অজিফা পাঠেই আমাদের সময় শেষ হয়ে যায়। সুতরাং দাওয়াত খাওয়ার সময়টা কোথায়?”

উপস্থিত জনগণ তাদের পক্ষ হয়ে বলল যে, “হুজুর! এরা দীর্ঘদিন যাবত এখানে অবস্থান করছে। এদের মত ভাল লোক আর হয় না। সব সময় দরিদ্র, এতিম ও অসহায় লোকদের প্রচুর পরিমাণে সাহায্য করে। তাদের দানের উপর অত্র লোকদের প্রচুর পরিমাণে জীবিকা নির্ভর করে।” নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) লোকদের কথা শুনে লোক দুটোর প্রতি পুনরায় গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেন। এতে আবারও তিনি নিশ্চিত হলেন, এরা তারাই যাদেরকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন।

এবার সুলতান জলদ গম্ভীর স্বরে তাদেরকে বললেন, “সত্য কথা বল। তোমরা কে? কেন, কী উদ্দেশ্যে এখানে থাকছ?”

এবারও তারা পূর্বের কথা পুনরাবৃত্তি করে বলল, “আমরা পশ্চিম দেশ থেকে পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য এখানে এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য লাভই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই আমরা এখানে অবস্থান করছি।” সুলতান এবার কারও কথায় কান না দিয়ে তাদেরকে সেখানে আটক রাখার নির্দেশ দিলেন, অত:পর স্বয়ং তাদের থাকার জায়গায় গিয়ে খুব ভাল করে অনুসন্ধাণ চালালেন। সেখানে অনেক মাল সম্পদ পাওয়া গেল। পাওয়া গেল বহু দুর্লভ কিতাবপত্র। কিন্তু এমন কোন জিনিষ পাওয়া গেল না, যা দ্বারা স্বপ্নের বিষয়ে কোন প্রকার সহায়তা হয়।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি(র:) অত্যধিক পেরেশান, অস্থির। এখনও রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় তিনি সীমাহীন চিন্তিত। এদিকে মদীনায় বহু লোক তাদের জন্য সুপারিশ করছে। তারা আবারও বলছে, “হুজুর! এরা নেককার বুযুর্গ লোক। দিনভর রোজা রাখেন। রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই রওজা শরীফের নিকটে এসে আদায় করেন। প্রতিদিন নিয়মিত জান্নাতুল বাকী যিয়ারত করতে যান। প্রতি শনিবার মসজিদুল কোবাতে গমন করেন। কেউ কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।”

সুলতান তাদের অবস্থা শুনে সীমাহীন আশ্চর্যবোধ করলেন। তথাপি তিনি হাল ছাড়ছেন না। কক্ষের অংশে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের প্রতিটি বস্তুকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু সন্দেহ করার মত কিছুই তিনি পাচ্ছেন না।

নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) এক পর্যায়ে সঙ্গীদের বললেন- “আচ্ছা, তাদের নামাযের মুসাল্লাটা একটু উঠাও দেখি।” সঙ্গীরা নির্দেশ পালন করল। নামাযের মুসল্লাটি বিছানো ছিল একটি চাটাইয়ের উপর। সুলতান আবার নির্দেশ দিলেন, “চাটাইটিও সরিয়ে ফেল।”

চাটাই সরানোর পর দেখা গেল একখানা বিশাল পাথর। সুলতানের নির্দেশে তাও সরানো হল। এবার পাওয়া গেল এমন একটি সুরঙ্গপথ যা বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। এমনকি তা পৌছে গেছে, রওজা শরীফের অতি সন্নিকটে। এ দৃশ্য অবলোকন করা মাত্র নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) বিজলী আহতের ন্যায় চমকে উঠলেন। অস্থিরতার কালো মেঘ ছেয়ে যায় তার সমস্ত হৃদয় আকাশে। ক্রোধে লাল হয়ে যায় গোটা মুখমন্ডল। অবশেষে লোক দুটোকে লক্ষ্য করে ক্ষিপ্ত-ক্রদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জন করে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে বললেন-

“তোমরা পরিস্কার ভাষায় সত্যি কথাটা খুলে বল, নইলে এক্ষুনি তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সম্মুক্ষিন হতে হবে। বল, তোমরা কে? তোমাদরে আসল পরিচয় কী? কারা, কী উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে?”

সুলতানের কথায় তারা ঘাবড়ে গেল। কঠিন বিপদ সামনে দেখে আসল পরিচয় প্রকাশ করে বলল,-

“আমরা ইহুদী। দীর্ঘদিন যাবত আমাদেরকে মুসল শহরের ইহুদীরা সুদক্ষ কর্মী দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রচুর অর্থ সহকারে এখানে পাঠিয়েছে। আমাদেরকে এজন্য পাঠানো হয়েছে যে, আমরা যেন কোন উপায়ে মুহাম্মদ (স)-এর শবদেহ বের করে ইউরোপীয় ইহুদীদের হাতে হস্তান্তর করি। এই দুরূহ কাজে সফল হলে তারা আমাদেরকে আরও ধনসম্পদ দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সুলতান বললেন, “তোমরা তোমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলে? কিভাবে তোমরা কাজ করতে?”

তারা বলল, “আমাদের নিয়মিত কাজ ছিল, রাত গভীর হলে অল্প পরিমাণ সুড়ঙ্গ খনন করা এবং সাথে ঐ মাটিগুলো চামড়ার মজকে ভর্তি করে অতি সন্তর্পণে মদীনার বাইরে নিয়ে ফেলে আসা। আজ দীর্ঘ তিন বৎসর যাবত এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে আমরা অনবরত ব্যস্ত আছি। যে সময় আমরা রওজা মোবারকের নিকট পৌছে গেলাম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বনবীর লাশ বের করে নিয়ে যাব, ঠিক সে সময় ধরে আমাদের মনে হল, আকাশ যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। জমীন যেন প্রচন্ড ভূমিকম্পে থরথর করে কাঁপছে। যেন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মহাপ্রলয় সংঘটিত হচ্ছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় রূপ ধারণ করল, মনে হল সুড়ঙ্গের ভিতরেই যেন আমরা সমাধিস্থ হয়ে পড়ব। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে আমরা কাজ বন্ধ করে রেখেছি।”

তাদের বক্তব্যে সুলতানের নিকট সব কিছুই পরিস্কার হয়ে গেল। তাই তিনি লোক দুটোকে নযীর বিহীন শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন । যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন দু:সাহস দেখাতে না পারে। তিনি মসজিদ হতে অর্ধ মাইল দূরে একটি বিশাল ময়দানে বিশ তাহ উঁচু একটি কাঠের মঞ্চ তৈরী করলেন। সাথে সাথে সংবাদ পাঠিয়ে মদীনা ও মদীনার আশেপাশের লোকদেরকে উক্ত ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন।

নির্ধারিত সময়ে লক্ষ লক্ষ লোক উক্ত মাঠে সমবেত হল। সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) অপরাধী লোক দুটোকে লৌহ শিকলে আবদ্ধ করে মঞ্চের উপর বসালেন । তারপর বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে তাদের হীন চক্রান্ত ও ঘৃণ্য তৎপরতার কথা উল্লেখ করলেন।

সুলতান নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) -এর বক্তব্য শ্রবণ করে লোকজন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তারা এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করল। সুলতান বললেন- হ্যাঁ, এদের শাস্তি দৃষ্টান্তমূলকই হবে।

তিনি লোকদেরকে বিপুল পরিমাণ লাকড়ী সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। তারপর লক্ষ জনতার সামনে সেই ইহুদী দুটোকে মঞ্চের নিম্নভাগে আগুন লাগিয়ে পুড়ে ভস্ম করে ফেলেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে, সেই আগুন নাকি দীর্ঘ এগার দিন পর্যন্ত জ্বলছিল।

অত:পর তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এক হাজার মন সিসা গলিয়ে রওজা শরীফের চতুষ্পার্শে মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ প্রিয় নবীজির কবর পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম না হয়। তারপর তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্‌পাকের শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাকে যে এত বড় খেদমতের জন্য কবুল করা হল সেজন্য সপ্তাহকাল ব্যাপী আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। ইতিহাসের পাতা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, নূরুদ্দীন জাঙ্কি (র:) ইন্তিকাল করলে অসীয়ত মোতাবেক তার লাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারকের অতি নিকটে দাফন করা হয়।


28
 নবীজির মৃত্যুর সময় জিবরাইল আসলেন, এসে নবীজিকে সালাম দিলেন, আর বল্লেন হে আল্লাহ‘র রাসুল। আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছে, আর জানতে চেয়েছে আপনি কেমন আছেন, আল্লাহ সব জানেন তার পড় ও আপনার মুখ থেকে জানতে চেয়েছেন আপনি কেমন আছেন, নবীজি বল্লেন আমি বড়ই কষ্টের ভিতর আছি, অসুস্হ আছি, জিবরাইল বললো, ইয়া রাসুলল্লাহ একজন নতুন ফেরেস্তা এসেছে আজ আমার সাথে, যে ফেরেস্তা কোন মানুষের কাছে আসার জন্য কোন দিন অনুমতি চায় নাই, আর কোনদিন অনুমতি চাইবে ও না, শুধু আপনার অনুমতি চায় আপনার কাছে আসার জন্য, আর সে ফেরেস্তার নাম মালাকুল মউত, মালাকুল মউত রাসুলের অনুমতি নিয়ে রাসুলের জাসান মোবারকের কাছে এসে সালাম দিলেন, বললেন ইয়া রাসুলল্লাহ আদম (আঃ) থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত আমি যত মানুষের জান কবচ করেছি, আর কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের জান কবচ করবো কারো কাছে অনুমতি চাইনি আর চাওয়া ও আমার লাগবে না, কিন্তু আজকে আসার সময় আল্লাহ বলেছেন আমি যেন আপনার অনুমতি চাই, নবীজি বললেন মালাকুল মউত আমি যদি অনুমতি না দেই? মালাকুল মউত বলে ইয়া রাসুলল্লাহ আল্লাহ বলেছেন যদি অনুমতি না পাও ফিরে এসো।


“আল্লাহু আকবার“

29
হযরত সুলায়মান (আঃ) আল্লাহর হুকুমে পক্ষীকুলের আনুগত্য লাভ করেন। একদিন তিনি পক্ষীকুলকে ডেকে একত্রিত করেন ও তাদের ভাল-মন্দ খোঁজ-খবর নেন। তখন দেখতে পেলেন যে, ‘হুদহুদ’ পাখিটা নেই। তিনি অনতিবিলম্বে তাকে ধরে আনার জন্য কড়া নির্দেশ জারি করলেন। উক্ত ঘটনা কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ:

‘সুলায়মান পক্ষীকুলের খোঁজ-খবর নিল। অতঃপর বলল, কি হ’ল হুদহুদকে দেখছি না যে? না-কি সে অনুপস্থিত’ (নমল ২০)। সে বলল, ‘আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা যবহ করব অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ’ (২১)। ‘কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে হাযির হয়ে বলল, (হে বাদশাহ!) আপনি যে বিষয়ে অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার নিকটে ‘সাবা’ থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি’ (নমল ২৭/২০-২২)।

‘আমি এক মহিলাকে (রাণী বিলক্বীস) সাবা বাসীদের উপরে রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে’ (২৩)। ‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলীকে সুশোভিত করেছে। অতঃপর তাদেরকে সত্যপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। ফলে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয় না’ (নমল ২৭/২৩-২৪)।

উল্লেখ্য যে, ‘হুদহুদ’ এক জাতীয় ছোট্ট পাখির নাম। যা পক্ষীকুলের মধ্যে অতীব ক্ষুদ্র ও দুর্বল এবং যার সংখ্যাও দুনিয়াতে খুবই কম। বর্ণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) একদা নও মুসলিম ইহুদী পন্ডিত আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, এতসব পাখী থাকতে বিশেষভাবে ‘হুদহুদ’ পাখির খোঁজ নেওয়ার কারণ কি ছিল? জওয়াবে তিনি বলেন, সুলায়মান (আঃ) তাঁর বিশাল বাহিনীসহ ঐসময় এমন এক অঞ্চলে ছিলেন, যেখানে পানি ছিল না।

আল্লাহ তা‘আলা হুদহুদ পাখিকে এই বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, সে ভূগর্ভের বস্ত্ত সমূহকে এবং ভূগর্ভে প্রবাহিত পানি উপর থেকে দেখতে পায়। হযরত সুলায়মান (আঃ) হুদহুদকে এজন্যেই বিশেষভাবে খোঁজ করছিলেন যে, এতদঞ্চলে কোথায় মরুগর্ভে পানি লুক্কায়িত আছে, সেটা জেনে নিয়ে সেখানে জিন দ্বারা খনন করে যাতে দ্রুত পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা করা যায়’।

একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) ‘হুদহুদ’ পাখি সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। তখন নাফে‘ ইবনুল আযরক্ব তাঁকে বলেন,

‘জেনে নিন হে মহা জ্ঞানী! হুদহুদ পাখি মাটির গভীরে দেখতে পায়। কিন্তু (তাকে ধরার জন্য) মাটির উপরে বিস্তৃত জাল সে দেখতে পায় না। যখন সে তাতে পতিত হয়’। জবাবে ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, إذا جاء القَدَرُ عَمِىَ البَصَرُ ‘যখন তাক্বদীর এসে যায়, চক্ষু অন্ধ হয়ে যায়’।

চমৎকার এ জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইবনুল ‘আরাবী বলেন, لايَقْدِرُ على هذا الجوابِ إلا عالِمُ القرانِ ‘এরূপ জওয়াব দিতে কেউ সক্ষম হয় না, কুরআনের আলেম ব্যতীত’। [ কুরতুবী, তাফসীর সূরা নমল ২০ আয়াত ]

30
নিষিদ্ধ দেশ কোনটি প্রশ্ন করলে এক বাক্যে সবাই বলবে তিব্বত। কিন্তু এই নিষিদ্ধের পেছনের রহস্য অনেকেরই অজানা। শত শত বছর ধরে হিমালয়ের উত্তর অংশে দাঁড়িয়ে আছে তিব্বত নামের এই রহস্যময় রাজ্যটি। তিব্বতে যে কী আছে সে ব্যাপারে সবার মনে রয়েছে জিজ্ঞাসা।

হিমালয়ের উত্তরে অবস্থিত ছোট একটি দেশ তিব্বত। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে ত্রয়োদশ দালাইলামা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গণচীনের একটি সশাসিত অঞ্চল তিব্বত। মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। এই অঞ্চলটি চীনের অংশ হলেও এখানকার অনেক তিব্বতি এই অঞ্চলকে চীনের অংশ মানতে নারাজ। ১৯৫৯ সালে গণচীনের বিরুদ্ধে তিব্বতিরা স্বাধিকার আন্দোলন করলে সেটি ব্যর্থ হয়। তখন দালাইলামার নেতৃত্বে অসংখ্য তিব্বতি ভারত সরকারের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে স্বাধীন তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিব্বতের রহস্য অজানার পেছনে এর প্রকৃতি ও দুর্গম পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। রাজধানী লাসা থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গোবি মরুভূমি। মরুভূমির নিষ্ঠুর ও কষ্টদায়ক পরিবেশ এসব এলাকার মানুষকে কাছে আনতে নিরুৎসাহিত করে। তিব্বতের বেশিরভাগ ভূ-ভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০০ ফুটেরও ওপরে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বসবাস করা পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের চেয়ে একটু বেশি কষ্টকর। এই অঞ্চলগুলো এতই উঁচু যে, একে পৃথিবীর ছাদ বলা হয়ে থাকে। তিব্বতের স্থলভাগ বছরের প্রায় আট মাস তুষারে ঢেকে থাকে। সেই প্রাচীনকাল থেকেই তিব্বতকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে অনেক রহস্য। তিব্বতের রাজধানী লাসা বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল অনেক আগে থেকেই। লাসায় বহির্বিশ্বের কোনো লোকের প্রবেশাধিকার ছিল না। দেশটি পৃথিবীর অন্য সব অঞ্চল থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন ছিল। তিব্বত বা লাসায় বাইরের বিশ্ব থেকে কারও প্রবেশ করার আইন না থাকায় এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে সবার কাছে একটি রহস্যময় জগৎ হিসেবে পরিচিত ছিল। কী আছে লাসায়, সেটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত সমগ্র বিশ্ব। লাসার জনগোষ্ঠী, শহর, বন্দর, অট্টালিকা সব কিছুই ছিল সবার কাছে একটি রহস্যঘেরা বিষয়। লাসা নগরীতে ছিল বিখ্যাত পোতালা নামক একটি প্রাসাদ। এই প্রাসাদটি প্রথমবারের মতো বহির্বিশ্বের মানুষেরা দেখতে পায় ১৯০৪ সালে। আমেরিকার বিখ্যাত ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় এই বিখ্যাত অট্টালিকার ছবি ছাপা হয়। তিব্বতের চতুর্দিকে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পাহাড় ও গুহা। সেই পাহাড়ি গুহাগুলোতে বাস করে বৌদ্ধ পুরোহিত লামারা।

তিব্বতিরা অত্যান্ত ধর্মভীরু । তাদের মধ্যে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাদের প্রধান ধর্মগুরুর নাম দালাইলামা। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তিব্বতে লামা নামে পরিচিত। লামা শব্দের অর্থ সর্বপ্রধান, আর দালাই শব্দের অর্থ জ্ঞান সমুদ্র। অর্থাৎ দালাইলামা শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্ঞান সমুদ্রের সর্বপ্রধান। ধর্মগুরু বা দালাইলামা বাস করে সোনার চূড়া দেওয়া পোতালা প্রাসাদে। ১৩৯১ সালে প্রথম দালাইলামার আবির্ভাব ঘটে। দালাইলামাকে তিব্বতিরা বুদ্ধের অবতার মনে করে থাকে। তিব্বতিদের বিশ্বাস, যখনই কেউ দালাইলামার পদে অভিষিক্ত হয় তখনই ভগবান বুদ্ধের আত্মা তার মধ্যে আবির্ভূত হয়। এক দালাইলামার মৃত্যুর পর নতুন দালাইলামার নির্বাচন হয়। দালাইলামা নির্বাচনের পদ্ধতিটাও বেশ রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর।

তিব্বতিদের দালাইলামা বা নেতা নির্বাচনের পদ্ধতিটি খুবই বিচিত্র। তিব্বতি প্রথা মতে কারও মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার মরদেহের সৎকার করা হয় না। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, মৃত্যুর পরও আত্মা জাগতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত আত্মা জাগতিক পরিমণ্ডল ত্যাগ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মরদেহটি তাদের বাড়িতে রেখে দেয়। কোনো লামার মৃত্যু হলে লাসার পূর্বে লহামপূর্ণ সরোবরের তীরে লামারা ধ্যান করতে বসে। ধ্যানযোগে লামারা দেখতে পায় সেই সরোবরে স্বচ্ছ পানির ওপর ভেসে উঠছে একটি গুহার প্রতিবিম্ব। যে গুহার পাশে আছে একটি ছোট্ট বাড়ি। প্রধান লামা তার সেই অলৌকিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এঁকে দেবে নতুন দালাইলামার ছবি। বড় বড় লামারা সেই ছবির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করে। তারপর কয়েকজন লামা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তিব্বতের বিভিন্ন স্থানে যায় শিশু অবতারের খোঁজে। তারা তিব্বতের ঘরে ঘরে গিয়ে সেই ছবির হুবহু শিশুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আর এভাবেই তারা খুঁজে বের করে তাদের নতুন দালাইলামাকে।

তিব্বতের লামারাসহ সাধারণ মানুষেরাও প্রেতাত্মাকে খুবই ভয় পায়। তারা সর্বদা প্রেতাত্মার ভয়ে আড়ষ্ট থাকে। অধিকাংশ তিব্বতির ধারণা, মানুষের মৃত্যুর পর দেহের ভেতর থেকে প্রেতাত্মারা মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওই প্রেতাত্মার লাশ সৎকার হওয়ার আগ পর্যন্ত সে মানুষের ক্ষতি করার জন্য ঘুরে বেড়ায়। তারা কখনও মানুষের ওপর ভর করে, কখনও পশু-পাখি কিংবা কোনো গাছ অথবা পাথরের ওপরও ভর করে। প্রেতাত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ও প্রেতাত্মাদের খুশি রাখতে তিব্বতিরা পূজা করে থাকে।
তিব্বতে সরকারি ভাষা হিসেবে চীনা ভাষার প্রচলন থাকলেও তিব্বতিদের ভাষার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। তাই চীনের বেশ কিছু প্রদেশ এবং ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানে তিব্বতি ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে।

তিব্বতিদের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আচার হলো মৃতদেহের সৎকার। এদের মৃতদেহ সৎকার পদ্ধতি খুবই অদ্ভুত। কোনো তিব্বতি যদি মারা যায়, তবে ওই মৃতদেহ কাউকে ছুঁতে দেওয়া হয় না। ঘরের এক কোণে মৃতদেহটি বসিয়ে চাদর অথবা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। মৃতদেহের ঠিক পাশেই জ্বালিয়ে রাখা হয় পাঁচটি প্রদীপ। তারপর পুরোহিত পোবো লামাকে ডাকা হয়। পোবো লামা একাই ঘরে ঢোকে এবং ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দেয়। এরপর পোবো মন্ত্র পড়ে শরীর থেকে আত্মাকে বের করার চেষ্টা করে। প্রথমে মৃতদেহের মাথা থেকে তিন-চার গোছা চুল টেনে ওপরে আনে। তারপর পাথরের ছুরি দিয়ে মৃতদেহের কপালের খানিকটা কেটে প্রেতাত্মা বের করার রাস্তা করে দেওয়া হয়। শবদেহকে নিয়ে রাখে একটা বড় পাথরের টুকরোর ওপর। ঘাতক একটি মন্ত্র পড়তে পড়তে মৃতদেহের শরীরে বেশ কয়েকটি দাগ কাটে। দাগ কাটার পর একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে সেই দাগ ধরে ধরে মৃতদেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। তারপর পশুপাখি দিয়ে খাওয়ানো হয়।
তিব্বতের সামাজিক অবস্থার কথা বলতে গেলে বলতে হয় এমন এক সমাজের কথা, যা গড়ে উঠেছিল আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। তখন পীত নদীর উপত্যকায় চীনারা জোয়ার ফলাতে শুরু করে। অন্যদিকে আরেকটি দল রয়ে যায় যাযাবর। তাদের মধ্য থেকেই তিব্বতি ও বর্মী সমাজের সূচনা হয়।


খাবার- দাবারের ও রয়েছে যথেষ্ট ভিন্নতা । শুনলে অবাক হবেন উকুন তিব্বতিদের অতি প্রিয় খাবার। ঐতিহ্যগত তিব্বতি সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ যাযাবর বা রাখাল জীবনযাপন। ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়া পালন তাদের প্রধান জীবিকা। শুধু চীনের তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ এই যাযাবর রাখাল সম্প্রদায়। এরা কখনও চাষাবাদের কাজ করে না। মোট ভূমির ৬৯ শতাংশ এলাকা চারণ বা তৃণভূমি। চীনা ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে তিব্বতিরাও ভীষণ চা প্রিয়। তাদের বিশেষ চায়ে মেশানো হয় মাখন এবং লবণ। তবে তিব্বতিদের প্রধান খাবার হলো চমবা। গম এবং যবকে ভেজে পিষে চমবা তৈরি করা হয়। তারা খাবার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করে কাঠের পেয়ালাকে। আধুনিক বিশ্ব দিন দিন আধুনিক হলেও আজও তিব্বত বিশ্বে রহস্যময় একটি অঞ্চল।

Pages: 1 [2] 3 4 ... 6