ইসলামে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম ও এর অলৌকিক শক্তি অসীম। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, তাকদিরের পরিবর্তন ঘটে এবং কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি মেলে। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার আত্মিক সম্পর্ক, যা মানুষের জীবনে অলৌকিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
দোয়ার অলৌকিকতার প্রধান কিছু দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
ভাগ্যের পরিবর্তন: খাঁটি মনে ও বিশ্বাসের সাথে করা দোয়া মানুষের ভাগ্য ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
অসম্ভব অর্জন: মানুষের কাছে যা আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব বা অলীক মনে হয়, তা-ই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে অলৌকিক রূপ নেয়।
মানসিক শান্তি ও সুরক্ষা: নিয়মিত দোয়া এবং ইস্তেগফারের মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতিতেও মনে প্রশান্তি আসে এবং বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
দোয়া কবুলের বিশেষ কিছু সময় ও আমল:
@ তাহাজ্জুদের সময়: রাতের শেষ প্রহরে করা দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়।
@ দরূদ শরীফ: ইবাদতের মাঝে অতিরিক্ত আমল হিসেবে দরূদ শরীফ পাঠ করলে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
@ দোয়া ইউনুস: বিপদ থেকে মুক্তির জন্য "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কন্তু মিনাজ জোয়ালিমীন" অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি কামনা করে, বিপদ ও সঙ্কটের সময় আল্লাহ তার দুআ কবুল করুন, সে যেন সুখের সময় অধিক পরিমাণে দুআ করে। —জামে তিরমিযি, হাদীস ৩৩৮২
দোয়া হলো মুমিনের আত্মার নিঃশ্বাস, বিশ্বাসের প্রমাণ এবং নিরাশার অন্ধকারে আশার আলোকবর্তিকা। আল্লাহ তার বান্দাকে যে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে দোয়া এমন এক অনন্য দান,যার মাধ্যমে বান্দা সরাসরি তার রবের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
মানুষের শক্তি সীমাবদ্ধ, কিন্তু দোয়ার শক্তি অসীম, কারণ দোয়া সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। তাই দোয়া মুমিনের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, বিজয়ের প্রধান অস্ত্র ও শক্তির কেন্দ্রবিন্দু।
তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (সুরা গাফির: ৬০)
এ আয়াত দ্বারা প্রমানিত,আল্লাহ শুধু দোয়া করতে আদেশই করেননি, বরং তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে বান্দা যখন আন্তরিক মনে তার দিকে হাত বাড়াবে, তখন তিনি নিজ অনুগ্রহে সেই দোয়াকে গ্রহণ কবুল করবেন। অর্থাৎ দোয়া মুমিনের জন্য এমন এক হাতিয়ার, যার ও পাশে আল্লাহর দয়া, করুণা প্রস্তুত।
আবু হুরাইরার মায়ের হেদায়াত
আবু হুরাইরা (রা.)-এর মা মুশরিক ছিলেন। তিনি তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন এবং নবীজির বিরুদ্ধে কটু কথা বলতেন। একদিন আবু হুরাইরা কাঁদতে কাঁদতে নবীজির কাছে গেলেন।
বললেন, 'আমি মাকে দাওয়াত দিই, তিনি আপনার বিরুদ্ধে খারাপ বলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি হেদায়াত পান।' নবীজি বললেন, 'আল্লাহুম্মাহদি উম্মা আবি হুরাইরাহ' (হে আল্লাহ, আবু হুরাইরার মাকে হেদায়াত দান করো)।
আবু হুরাইরা আনন্দে বাড়ি ফিরলেন। দরজায় পৌঁছে শুনলেন, দরজা বন্ধ। মা বললেন, 'অপেক্ষা করো।' তিনি পানির শব্দ শুনলেন। তারপর মা গোসল করে দরজা খুলে বললেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'
আবু হুরাইরা আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে নবীজির কাছে গেলেন। বললেন, 'সুসংবাদ, আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৯১)।
[হাদীস শরীফে এসেছে,
'আদদুআউ হুয়াল ইবাদাহ'। দুআই ইবাদত।
আরেক হাদীসে এসেছে-
'আদদুআউ মুখখুল ইবাদাহ'।
অর্থাৎ দুআ ইবাদতের মগজ বা সারবস্ত্ত।
আল্লাহতায়ালা বলেন, 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে, তারা অচিরেই জাহান্নামে লাঞ্ছিত হয়ে প্রবেশ করবে।' (সুরা মুমিন : ৬০)। হজরত নুমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দোয়াই হলো ইবাদত। তারপর তিনি পাঠ করেন, 'তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদতে অহংকার করে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।' (তিরমিজি : ২৯৬৯) হজরত আবদুল্লা ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে বিপদ আপতিত হয়েছে এবং যা এখনো আপতিত হয়নি, সব ক্ষেত্রেই দোয়ায় উপকার হয়। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দারা, তোমাদের দোয়া করা উচিত।' (তিরমিজি : ৩৫৪৮)।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
অর্থাৎ, তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক (আমার নিকট দুআ কর) আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (আমি তোমাদের দুআ কবুল করব।) যারা অহংকারে আমার উপাসনায় (আমার কাছে দুআ করা হতে) বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সূরা গাফের ৬০ আয়াত)।
তিনি আরো বলেন, "আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করে (তখন তুমি বল,) আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমার কাছে প্রার্থনা জানায়, তখন আমি তার প্রার্থনা মঞ্জুর করি।" (সূরা বাক্বারাহ ১৮৬
রসুল (ﷺ) বলেন, "দুআই তো ইবাদত।" (আবু দাউদ ২/৭৮; তিরমিযী ৫/২১১)
"নিশ্চয় তোমাদের প্রভু লজ্জাশীল অনুগ্রহপরায়ণ, বান্দা যখন তার দিকে দুই হাত তোলে, তখন তা শূন্য ও নিরাশভাবে ফিরিয়ে দিতে বান্দা থেকে লজ্জা করেন।" (আবু দাউদ ২/৭৮; তিরমিযী ৫/৫৫৭)
"যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার উপর ক্রোধান্বিত হন।" (তিরমিযী ৫/৪৫৬, ইবনে মাযাহ ২/১২৫৮)
দুআ অন্যান্য ইবাদতের মত এক ইবাদত। যা আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট। সুতরাং গায়রুল্লাহর নিকট দুআ ও প্রার্থনা করলে বা কিছু চাইলে অথবা গায়রুল্লাহকে ডাকলে তা অবশ্যই শির্ক হয়। তাই যাবতীয় দুআ ও প্রার্থনা কেবল আল্লাহরই নিকট করতে হয় এবং যত কিছু চাওয়া কেবল তাঁরই নিকট চাইতে হয়। সর্বপ্রকার, সর্বভাষায় এবং একই সময় অসংখ্য ডাক কেবল তিনিই শুনতে ও বুঝতে পারেন এবং সর্বপ্রকার দান কেবল তিনিই করতে পারেন।
রব্বি লা তাযারনি ফারদাও ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসিন
(আরবি: رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ)
পবিত্র কোরআনের একটি অত্যন্ত বরকতময় দোয়া。
হজরত জাকারিয়া (আ.) নিঃসন্তান অবস্থায় নেক ও যোগ্য সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে এই দোয়াটি করেছিলেন (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯)
'আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফিয়া',
একটি ছোট্ট দোয়া, কিন্তু অফুরানের কল্যাণবাহী। এর অর্থ: 'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আফিয়া (কল্যাণ) প্রার্থনা করি। ' আফিয়া শব্দটি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পাপ থেকে মুক্তি এবং দুনিয়া-আখিরাতের সকল কল্যাণকে ধারণ করে।