ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই হবে ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার বড় মাধ্যম
(https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2015%2F05%2F10%2F90916f70563244f5ef85cb0567aee95e-116.jpg?rect=0%2C0%2C1200%2C800&w=300&auto=format%2Ccompress&fmt=avif)
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মতো তারুণ্যনির্ভর দেশে কারিগরি শিক্ষাকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতির ভাষায় এটিই জনমিতিক লভ্যাংশ বা Demographic Dividend। কিন্তু এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। একটি প্রজন্ম একবারই তরুণ থাকে। তাই এই সময়ে যদি আমরা আমাদের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারি, তাহলে যে সম্ভাবনা আজ আশীর্বাদ, সেটিই আগামী দিনে আমাদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একদিকে বহু শিক্ষিত তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না, অন্যদিকে শিল্প খাত বলছে—তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু চাকরির নয়; সমস্যাটি দক্ষতার অমিলের।
আমরা এখনো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি, যেখানে সনদ অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ওপর তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও শিল্পের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।
এই বাস্তবতা থেকেই কারিগরি শিক্ষাকে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন হয়েছে। আমি কারিগরি শিক্ষাকে কখনোই সাধারণ শিক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখি না; বরং এটি আধুনিক অর্থনীতির একটি অপরিহার্য ভিত্তি। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলেই শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্ত ভিত তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই পথই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
আমার বিশ্বাস, গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতির মাধ্যমে শিক্ষা, শিল্প এবং কর্মসংস্থানকে একসুতায় গাঁথতে পারলেই আমরা এই জনমিতিক সুযোগকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারব। শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি ডিগ্রি নয়, দক্ষতা।
প্রশ্ন: আমরা জানি, বর্তমান শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা (TVET) নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় আপনি যুক্ত ছিলেন। আপনি কীভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন এবং শুরুতে সামনে কী লক্ষ্য ছিল?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: একজন শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে বর্তমান সরকারের শিক্ষা পলিসি টিমে সম্পৃক্ত হতে পারা আমার জন্য গর্বের। দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমবাজার এবং শিল্পনীতির ওপর কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি—বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা সম্পদের অভাব নয়; দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি।
নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করার সময় আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল—কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু সনদ নিয়ে বের না হয়ে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছেন। নীতি প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি নিয়মিত অগ্রগতি সম্পর্কেও অবগত থেকেছেন এবং একাধিক পর্যায়ে আমার কাছ থেকে উপস্থাপনা গ্রহণ করেছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছে TVET বিষয়ক বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁকে একাধিকবার সরাসরি উপস্থাপনা করার সুযোগ পাওয়ার। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ড. মাহদী আমিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সমন্বয়, গবেষণা এবং নীতি-প্রস্তুতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ পুরো কাজকে আরও কার্যকর করেছে।
আমরা শুরু থেকেই কারিগরি শিক্ষাকে একটি বিচ্ছিন্ন খাত হিসেবে নয়; জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখেছি। কারণ, শিক্ষা, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতা—এই চারটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধাপে ধাপে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনে মাঝপথে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন, আবার পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষায়ও ফিরে আসতে পারবেন। একই সঙ্গে শিল্প খাতও তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনবল পাবে।
আমার কাছে এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
আরও পড়ুন
৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল: ২ হাজারের বেশি ক্যাডার পদ কেন ফাঁকা জানাল পিএসসি
২৯ জুন ২০২৬
৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল: ২ হাজারের বেশি ক্যাডার পদ কেন ফাঁকা জানাল পিএসসি
প্রশ্ন: আপনার মতে, এই নতুন নীতির সবচেয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন কোনটি?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: আমার মতে, এই নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোনো একটি নতুন কোর্স বা নতুন প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
দীর্ঘদিন ধরে আমরা কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার বাইরে একটি আলাদা পথ হিসেবে দেখেছি। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করতেন, কারিগরি শিক্ষা বেছে নিলে ভবিষ্যতের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। নতুন নীতি সেই ধারণা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে।
এখানে শিক্ষা আর দুই ভাগে বিভক্ত নয়—একদিকে সাধারণ শিক্ষা, অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা। বরং একজন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন এবং পরে আবার উচ্চশিক্ষায় ফিরে আসার সুযোগও পাবেন। অর্থাৎ শেখার পথ আর একমুখী নয়; এটি হবে নমনীয় ও আজীবন চলমান।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, শিল্প খাতকে এই ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখা হয়েছে। এত দিন পাঠ্যক্রম অনেকটাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে তৈরি হতো। এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগদাতা এবং শিক্ষাবিদ—সবাই মিলে নির্ধারণ করবেন ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন।
আমার মতে, এই নীতির অন্যতম বড় অর্জন হলো TVET-কে ইতিবাচকভাবে পুনঃব্র্যান্ডিং করা। দীর্ঘদিন আমাদের সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার বাইরে একটি বিকল্প শিক্ষা হিসেবে দেখা হতো। নতুন নীতি সেই ধারণা পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের মূলধারার পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক ও কারিগরি বিষয়গুলোকে ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করছে। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা, যা ভবিষ্যতে সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় বিভাজন কমাতে সহায়তা করবে।
প্রশ্ন: অনেক তরুণ কারিগরি শিক্ষা শেষ করেও চাকরি পান না। এর কারণ এবং প্রতিকার কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: এটি আমাদের শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র এবং বিষয়টি নিয়ে আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে ভাবতে হবে।
আমি সমস্যাটিকে শুধু কর্মসংস্থানের সমস্যা হিসেবে দেখি না; এটি মূলত দক্ষতার অমিলের সমস্যা। অনেক তরুণ নিষ্ঠার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা সম্পন্ন করেন, কিন্তু শিল্প খাত যে ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করে, অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশিক্ষণ তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। ফলে একদিকে চাকরিপ্রার্থী বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়োগদাতারা বলছেন—যোগ্য কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।
আমরা এমন ঘটনাও দেখেছি, যেখানে একটি অফিস সহায়ক পদের জন্য প্রকৌশলী, এমবিএ কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা আবেদন করেছেন। এটি শুধু শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানেরও প্রতিফলন।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেব।
প্রথমত, শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে নিয়মিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যক্রম তৈরি থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই শিল্প খাতকে যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং অন-দ্য-জব ট্রেনিংকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশে কাজ শেখার সুযোগ পান।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, কোথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে এবং কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর পরামর্শের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আমি বিশ্বাস করি, সমস্যাটি তরুণদের নয়; সমস্যাটি ব্যবস্থার। সেই ব্যবস্থাকে যদি আমরা গবেষণাভিত্তিক, শিল্প-সংযুক্ত এবং বাস্তবমুখী করতে পারি, তাহলে কারিগরি শিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
(https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-06-29%2Fza1wjunl%2F9.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর (ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট) অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক।ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে কী করা উচিত?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: আমার কাছে এটি পুরো নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই সফল বলা যায়, যখন একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, আর শিল্পপ্রতিষ্ঠানও তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল পায়।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও শিল্প খাতকে দুটি আলাদা জগৎ হিসেবে দেখেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে পাঠ্যক্রম তৈরি করেছে, আর শিল্প খাত নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী লোক নিয়োগ দিয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আমার বিশ্বাস, এই সম্পর্কটিকে বদলাতে হবে। শিল্প খাতকে শুধু নিয়োগদাতা হিসেবে নয়, শিক্ষাব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কোন খাতে আগামী পাঁচ বা দশ বছরে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে, সেই তথ্য নিয়মিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাতে হবে। একইভাবে পাঠ্যক্রমও নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করতে হবে।
আমি আরও মনে করি, প্রতিটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক বা একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর অংশীদারত্ব থাকা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, বাস্তব কর্মপরিবেশেও শেখার সুযোগ পাবেন। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার সময়ই শিল্পে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তাহলে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা—দুটিই অনেক বেশি হবে।
আরেকটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। শিল্প খাত শুধু দক্ষ কর্মী চায় না; তারা এমন মানুষ চায়, যারা সমস্যা সমাধান করতে পারে, নতুন প্রযুক্তি দ্রুত শিখতে পারে এবং দলগতভাবে কাজ করতে পারে। তাই কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, কর্মনৈতিকতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আমি মনে করি, শিক্ষা ও শিল্প খাত যখন একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে, তখন দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার ব্যবধান অনেকটাই কমে আসবে।
প্রশ্ন: এই উদ্যোগ সফল করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: আমার মতে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে তিনটি পক্ষের যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর—সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাত। এদের মধ্যে কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
সরকারের ভূমিকা হবে নীতি নির্ধারণ, মান নিশ্চিত করা, অর্থায়ন এবং একটি কার্যকর সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলা। শুধু নতুন নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না; সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও বড়। কারণ, দক্ষতা তৈরির কাজটি সেখান থেকেই শুরু হয়। আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
অন্যদিকে শিল্প খাতকেও দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না—এ কথা বললে হবে না। পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোতেও শিল্প খাতকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।
তবে আমার মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; মানসিকতার পরিবর্তন। এখনো অনেকেই মনে করেন, কারিগরি শিক্ষা মানেই কম মেধাবীদের জন্য শিক্ষা। এই ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। যেদিন আমরা কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় সারির শিক্ষা না ভেবে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে দেখব, সেদিনই প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হবে।
আরও পড়ুন
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চাকরি, পদ ৪৪, বয়স ৩৫ হলেও আবেদন
২৯ জুন ২০২৬
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চাকরি, পদ ৪৪, বয়স ৩৫ হলেও আবেদন
প্রশ্ন: নতুন কারিগরি শিক্ষা নীতির প্রয়োজন কেন অনুভূত হলো এবং এর মূল লক্ষ্য কী?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: নতুন এই নীতির প্রয়োজনীয়তা এসেছে অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের বাস্তবতা থেকে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করছেন, কিন্তু শিল্প খাত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল পাচ্ছে না। একই সঙ্গে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে। অর্থাৎ শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, উৎপাদনব্যবস্থার রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিও এই নীতির প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।
নীতির মূল লক্ষ্য তিনটি—
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা,
শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ তৈরি করা,
এবং বাংলাদেশের তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা।
আমার কাছে এটি শুধু একটি শিক্ষানীতি নয়; ভবিষ্যতের অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
প্রশ্ন: দেশের তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক: আমি বাংলাদেশের তরুণদের খুব আশাবাদী চোখে দেখি। কারণ, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তারাই। তবে আজকের পৃথিবীতে শুধু একটি ডিগ্রি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে একজন মানুষ কী জানেন, কী করতে পারেন এবং কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন।
আমি তরুণদের তিনটি বিষয় সব সময় মনে রাখতে বলি।
প্রথমত, একটি বাস্তব দক্ষতা অর্জন করুন। সেটা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, ডিজাইন, নির্মাণ, কৃষি কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্র হতে পারে। দক্ষতা এমন একটি সম্পদ, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিকে ভয় পাবেন না। AI কিংবা নতুন প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখুন।
তৃতীয়ত, বিদেশি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দিন। বিভিন্ন অঞ্চলের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আরবি, পূর্ব এশিয়ার জন্য জাপানি বা কোরিয়ান, ইউরোপের জন্য ইংরেজির পাশাপাশি জার্মানসহ অন্যান্য ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো দরকার।
সবশেষে একটি কথা বলতে চাই—নিজেকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলবেন না। নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করুন, যাতে একদিন আপনি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।
Source: https://www.prothomalo.com/chakri/chakri-interview/cu35ahdmt8