Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - mrchawdhury

Pages: 1 [2] 3
16
সাদাকাতুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা রমযানুল মুবারকের শেষে ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করতে হয়। এটি যাকাতেরই একটি প্রকার, যার দিকে সূরাতুল আ’লায় (৪-১৫) ইশারা করা হয়েছে-

قد افلح من تزكى وذكر اسم ربه فصلى

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস ও সুন্নাহয় তা আদায়ের তাকীদ করেছেন এবং এর নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণেই নবী যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ইসলামের পাঁচ রোকন ও দ্বীনের অন্যান্য মৌলিক আমল ও ইবাদতের মতো ছদাকাতুল ফিতরও নিয়মিত আদায় করে আসছে। আমাদের এ অঞ্চলে তা পরিচিত ‘ফিতরা’ নামে। 

একটি যয়ীফ হাদীসে এই ইবাদতের দুটি হিকমত ও তাৎপর্য স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।   

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদাকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন। অর্থহীন, অশালীন কথা ও কাজে রোযার যে ক্ষতি তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার যোগানোর জন্য। (সুনানে আবু দাউদ ১/২২৭)

তাই সকলের কর্তব্য, খুশিমনে এই ইবাদতটি আদায় করা, যাতে আল্লাহর গরীব বান্দাদের খেদমত হয় এবং নিজের রোযার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হয়। সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত আদায়ের সৌভাগ্য অর্জিত হয়। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সুন্নাহর আলোকে এই ইবাদতের বিস্তারিত আহকাম ও বিধান ফিকহের কিতাবে সংকলিত হয়েছে। সাদাকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব হয়, কাদের পক্ষ থেকে আদায় করতে হয়-এইসব বিবরণ হাদীস ও ফিকহের কিতাবে বিস্তারিতভাবে আছে। 

এই সাদাকার পরিমাণ সম্পর্কে হাদীস ও সুন্নাহয় দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে : তা হচ্ছে, صاع   (‘সা’) ও  نصف صاع    (নিসফে সা’)।

যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ এবং গম দ্বারা আদায় করলে ‘নিসফে সা’ প্রযোজ্য হবে।

 

শরীয়তের দলীলে একথাও প্রমাণিত যে, উপরোক্ত খাদ্যবস্ত্তর পরিবর্তে সেগুলোর মূল্য আদায় করারও অবকাশ আছে। সেক্ষেত্রে উল্লেখিত খাদ্যবস্ত্তগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটিকে মাপকাঠি ধরে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। অর্থাৎ ঐ খাদ্যবস্ত্তর জন্য শরীয়তে যে পরিমাণটি নির্ধারিত-‘সা’ বা ‘নিসফে সা’ সে পরিমাণের বাজারমূল্য আদায় করলেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা উচিত যে, মূল্যের দিক থেকে ঐ খাদ্যবস্ত্তগুলোর মধ্যে তফাৎ আছে, কোনোটির দাম বেশি, কোনোটির কম। তো সবচেয়ে কমদামের বস্ত্তকে মাপকাঠি ধরে কেউ যদি সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলেও আদায় হায়ে যাবে। তবে উত্তম হল, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্ত্তকে মাপকাঠি ধরে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা।

যেহেতু সহীহ হাদীসে গমকেও একটি মাপকাঠি সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং এর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আধা সা’ তাই আধা সা গম বা তার মূল্য আদায় করলে নিঃসন্দেহে সাদাকাতুল  ফিতর আদায় হয়ে যাবে।

বর্তমান বাজার দর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম, তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর আধা সা গমকে মাপকাঠি ধরে ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়। টাকায় অংকটি নির্ধারিত হয় আধা সা গমের ঐ সময়ের বাজার-দর হিসাবে।

গত বছর অর্থাৎ ১৪৩১ হিজরী রমযানে হঠাৎ করেই একটি নতুন ঘোষণা এল। ফাউন্ডেশনের এতদিনের নিয়ম ও তাদের প্রকাশিত ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবে উল্লেখিত মাসআলার বিপরীত দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রচার করা হল যে, এবারের ফিতরা একশ টাকা। খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেল যে, ফিতরা কমিটি চালকে মাপকাঠি ধরেছে এবং খেজুর ইত্যাদির জন্য নির্ধারিত পরিমাণ-‘সা’ কে এর উপর প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এক ‘সা’ চাল ফিতরা হিসেবে আদায় করতে হবে। আর মধ্যম মানের এক ‘সা’ চালের বাজার-দর যেহেতু একশ টাকা তাই ফিতরা একশ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছর এবং এ বছরও যেহেতু আধা সা গমের বাজার-মূল্য থেকে চালের বাজার-মূল্য বেশি তাই কেউ ঐ হিসাবে ফিতরা আদায় করে থাকলে অবশ্যই তার ফিতরা আদায় হয়েছে; বরং যাদের সামর্থ্য আছে তারা যদি খেজুর, পনির ও কিসমিসের হিসাবে ফিতরা আদায় করেন তাহলে তো খুবই ভালো। কিন্তু এর কোনোটিকে সর্বনিম্ন ফিতরা বা একমাত্র ফিতরা সাব্যস্ত করার অবকাশ কোথায়?

ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ তো সেটিই, যা সুন্নাহয় উল্লেখিত খাদ্যবস্ত্তগুলোর মধ্যে পরিমাণ ও বাজার-দরের বিচারে সর্বনিম্ন। টাকার অংকে সর্বনিম্ন ফিতরা ঘোষণা করতে হলে এই মানদন্ডের ভিত্তিতেই করতে হবে। অন্যথায় সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো একটি পরিমাণকে অকার্যকর সাব্যস্ত করা হবে, যার অধিকার কারো নেই।

ফলে ঐ সময়, ফাউন্ডেশনের ঐ ঘোষণার উপর আপত্তি উঠেছিল। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার পক্ষ থেতে এবং ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে আরো অনেকে তখন আপত্তি করেছিলেন। সুখের কথা, ইসলামিক ফাউন্ডেশ উলামা-মাশায়েখের উপস্থিতিতে এ  বিষয়ে পুনরায় চিন্তা-ভাবনা করেছিল এবং আগের মতোই আধা সা গমের মূল্য হিসাবে ফিতরা ঘোষণা করেছিল। সাথে সাথে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, ঘোষিত পরিমাণটি ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ। যার সামর্থ্য আছে, তিনি এক সা পরিমাণের খাদ্যবস্ত্তগুলোর কোনো একটিকে মানদন্ড ধরেও ফিতরা আদায় করতে পারবেন এবং এটিই তার জন্য উত্তম।

এই পুনঃঘোষণার ফলে আলহামদুলিল্লাহ ঐ বিভ্রান্তির নিরসন হয়ে যায়। কিন্তু তখন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ এবং কারো কারো মৌখিক কিছু প্রশ্ন থেকে অনুমান করেছি যে, এ প্রসঙ্গে তাদের কিছু অমূলক ধারণা রয়েছে, সম্ভবত পুনরায় চিন্তা-ভাবনা করলে তা আর থাকবে না।

 

তাদের ধারণাগুলো নিম্নরূপ :

1.         হাদীস শরীফে ফিতরার নির্ধারিত পরিমাণ একটিই। তা হল এক সা। আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায় হওয়ার বিধান কোনো সহীহ হাদীসে নেই।

2.         হাদীস শরীফে; বরং যে কোনো খাদ্যবস্ত্ত থেকে এক সা দেওয়ার কথা আছে, যার মাঝে গমও অন্তর্ভুক্ত।

3.        আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা সর্বপ্রথম বলেন হযরত মুআবিয়া রা.। অথবা সর্বোচ্চ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এ কথা বলেছেন। আর এটি তাঁরা নিজেদের ইজতিহাদ থেকেই করেছেন। এজন্য একে ফিতরা আদায়ের মাপকাঠি ধরা যায় না। তবে কখনো যদি আধা সা গমের মূল্য এক সা খেজুর ইত্যাদির সমান হয়ে যায় তখন হয়তো এর দ্বারা ফিতরা আদায় হতে পারে!

4.         হাদীস শরীফে যে চারটি খাদ্যবস্ত্তর কথা বলা হয়েছে তা এজন্য বলা হয়েছে যে, ঐ সময় এগুলোই ছিল মদীনা শরীফে সাধারণ খাদ্যবস্ত্ত। এজন্য অন্য দেশের মানুষ, যাদের সাধারণ খাবার অন্য কিছু, তারা তাদের খাদ্যবস্ত্ত অনুযায়ী ফিতরা আদায় করতে পারবে; বরং এটিই করণীয়।

মোটামুটিভাবে সদকাতুল ফিতরকে এক সা ধরার ক্ষেত্রে এই চারটি ধারণা বা যুক্তি তারা পোষণ করেন। কিন্তু ঐ সব বন্ধুদের জেনে রাখা উচিত যে, আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায়ের বিধান একাধিক সহীহ হাদীসে রয়েছে। এটি খোলাফায়ে রাশেদীন রা.-এর সুন্নাহ দ্বারাও প্রমাণিত। যদি কোনো সাহাবী ইজতিহাদ দ্বারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন তবে তার সিদ্ধান্ত হাদীস ও সুন্নাহয় বর্ণিত বিধানের সাথে মিলে গিয়েছে এবং অন্যান্য সাহাবীও তার সাথে একমত হয়েছেন। এটি কোনো সাহাবীর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, যাকে ইজতিহাদ; বলে খাটো করার চেষ্টা করা যায়। অথচ সাহাবীর ব্যক্তিগত ইজতিহাদও (যদি সেটি স্পষ্ট মারফূ হাদীসের পরিপন্থী না হয়) শরীয়তের দলীল। 

 

ঐ সকল বন্ধুদের আরো জানা দরকার যে, কুরআন-হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত কোনো শরঈ পরিমাপের কোনো একটি তাৎপর্য নিজে থেকে নির্ধারণ করে সেই তাৎপর্যটিকেই মানদন্ড বানিয়ে নেওয়া এবং কুরআন-হাদীসে বর্ণিত পরিমাপকে অকার্যকর করে দেওয়া প্রকৃতপক্ষে কুরআন-সুন্নাহর তাহরীফ ও বিকৃতি সাধন এবং গোটা উম্মতের ইজমা ও অবিচ্ছিন্ন কর্মধারার বিরুদ্ধাচরণ।

বর্তমান নিবন্ধে বিষয়গুলোর উপর কিছুটা বিশদ ও বিশ্লেষমূলক আলোচনা করার ইচ্ছা আছে।

আধা সা সম্পর্কে হাদীস, সুন্নাহ ও আছার

1.         হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষক প্রেরণ করলেন সে যেন মক্কার পথে পথে এ ঘোষণা করে যে-জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর সদকায়ে ফিতর অপরিহার্য। দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা অন্য খাদ্যবস্ত্ত।

 

أن النبي صلى الله عليه وسلم بعث مناديا ينادي في فجاج مكة : ألا إن صدقة الفطر واجب على كل مسلم، ذكر أو أنثى، حر أو عبد، صغير أو كبير، مدان من قمح، أو صاع مما سواه من الطعام.

 

(জামে তিরমিযী ১/৮৫)। ইমাম তিরমিযী রাহ. বলেন, হাদীসটি হাসান।

২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রমযানের শেষ দিকে বসরার মিম্বারের উপর খুতবা দানকালে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন এক সা খেজুর বা যব কিংবা আধা সা গম; গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর।

 

فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الصدقة صاعا من تمر أو شعير، أو نصف صاع من قمح على كل حر أو مملوك، ذكر أو أنثى، صغير أو كبير.

 

(সুনানে আবু দাউদ ১/২২৯। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ইবনে আবদুল হাদী আল হাম্বলী রাহ. বলেন, হাদীসটির সকল রাবী প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। আল্লামা যাহাবী রাহ. বলেছেন, হাদীসটির সনদ শক্তিশালী।)

৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাবা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের একদিন বা দুদিন আগে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিয়েছেন। সে খুতবায় তিনি বলেছেন, তোমরা প্রতি দু’জনের পক্ষ থেকে এক সা গম অথবা ছোট-বড় প্রত্যেকের মাথাপিছু এক সা খেজুর বা এক সা যব প্রদান করো।

أدوا صاعا من بر أو قمح بين اثنين، أو صاعا من تمر، أو صاعا من شعير على كل أحد صغير أو كبير.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৮। আল্লামা যাইলাঈ রাহ. বলেন, এই হাদীসটির সদন সহীহ ও শক্তিশালী।)

৪. হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, যে মুদ (পাত্র) দ্বারা তোমরা খাদ্যবস্ত্ত গ্রহণ করে থাক এমন দুই মুদ (আধা সা) গম আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যমানায় সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম।

كنا نؤدي زكاة الفطر على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم مدين من قمح، بالمد الذي تقتاتون به.

(মুসনাদে আহমদ ৬/৩৪৬। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটি সহীহ এবং এ সনদটি হাসান। শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ. বলেছেন, এই হাদীসের সনদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ, সহীহ।)

ইমাম তহাবী রাহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন-

 

فهذه أسماء تخبر أنهم كانوا يؤدون في عهد النبي صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر مدين من قمح، ومحال أن يكونوا يفعلون هذا إلا بأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم، لأن هذا لا يؤخذ حينئذٍ إلا من جهة توقيفه إياهم على ما يجب عليهم من ذلك.

 

 

হযরত আসমা রা. জানিয়েছেন যে, নবী-যুগে সাহাবায়ে কেরাম সদকাতুল ফিতর দিতেন আধা সা গম। এ তো সম্পূর্ণ অসম্ভব যে, রাসূলুললাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ ছাড়া তাঁরা এই কাজ করতেন। কারণ দ্বীনের বিষয়ে তাঁদের কর্তব্য কী তা জানার একমাত্র সূত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও নির্দেশনা।

৫. হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন দুই মুদ (আধা সা) গম।

فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر مدين من حنطة.

 (মারাসীলে আবু দাউদ পৃ. ১৬। আল্লামা ইবনে আবদুল হাদী আলহাম্বলী রাহ. বলেন, এ হাদীসের সনদ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট, সহীহ। তবে তা মুরসাল। আর সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.-এর মুরসাল রেওয়ায়েতও দলিলযোগ্য হয়।)

৬. ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী রাহ. বলেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান ও উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ রা. প্রমুখকে বলতে শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতর আদায়ের আদেশ করেছেন এক সা খেজুর বা দুই মুদ (আধা সা) গম।

 أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم  بزكاة الفطر بصاع من تمر، أو بمدين من حنطة.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, হাদীসটি সহীহ। নুখাবুল আফকার ৫/২২৫)

৭. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ, কাসেম ও সালেম রাহ. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন সদকাতুল ফিতরে এক সা যব বা দুই মুদ (আধা সা) গম আদায় করার।

أمر رسول الله صلى الله عليه وسلم في صدقة الفطر بصاع من شعير أو مدين من قمح.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, হাদীসটি সহীহ। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এটি সহীহ ও মুরসাল।)

৮. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এবং আবু বকর সিদ্দীক ও উমর ফারূক রা.-এর শাসনামলে সদকাতুল ফিতর দেওয়া হত আধা সা গম।

كان الصدقة تعطى على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم وأبي بكر وعمر نصف صاع من حنطة.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০। আল্লামা ইবনে আবদুল বার রাহ. বলেছেন, এটি সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. থেকে ছিকা রাবীগণ বর্ণনা করেছেন। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সকল রাবী ছিকা ও নির্ভরযোগ্য। আল্লামা আইনী রা. বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ।)

৯. হযরত আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. বর্ণনা করেন, আবদুল খালেক ইবনে সালামা আশশাইবানী রাহ. বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.কে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে তা ছিল মাথাপিছু এক সা খেজুর বা আধা সা গম।

حدثنا إسماعيل بن  إبراهيم عن عبد الخالق بن سلمة الشيباني قال : سألت سعيد بن المسيب عن الصدقة. فقال : كانت على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم صاع تمر، أو نصف صاع حنطة عن كل رأس.

(কিতাবুল আমওয়াল পৃ. ৫৬৪)

ইমাম আবু বকর ইবনে আবী শাইবা রাহ.ও বর্ণনা করেছেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.কে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন প্রত্যেকের মাথাপিছু আধা সা গম বা এক সা খেজুর বা যব।

هشيم عن سفيان بن حسين، عن الزهري عن سعيد بن هشيم عن سفيان بن حسين، عن الزهري عن سعيد بن المسيب يرفعه أنه سأل عن صدقة الفطر. فقال : عن الصغير والكبير، والحر والمملوك نصف صاع من بر، أو صاع من تمر أو شعير.

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১। শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা মুসান্নাফের টীকায় বলেন, এটি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.-এর মুরসাল হাদীস, যা মুহাদ্দিসগণের নিকট বিশুদ্ধতম মুরসালের অন্তর্ভুক্ত।

 

খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ

১০. আবু কিলাবা রাহ. বলেন, স্বয়ং ঐ ব্যক্তি আমাকে বলেছেন, যিনি হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর নিকট এক  সা গম দ্বারা দুই ব্যক্তির সদকাতুল ফিতর আদায় করেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০০; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৬)

অন্য বর্ণনায় আছে, মামার রাহ. বলেন, আমার কাছে তথ্য পৌঁছেছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. দুই মুদ (আধা সা দ্বারা) ফিতরা আদায় করেছেন।

بلغني أن أبا بكر أخرج زكاة الفطر مدين.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৬)

১১. নাফে রাহ বলেন, তিনি হযরত উমর রা.কে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি একজন ক্রীতদাস। আমার সম্পদের কি কোনো যাকাত আছে? উমর রা. বলেছেন, তোমার যাকাত তো তোমার মনিবের উপর। সে তোমার পক্ষ থেকে প্রতি ঈদুল ফিতরে এক সা যব বা খেজুর কিংবা আধা সা গম প্রদান করবে।

إنما زكاتك على سيدك أن يؤدي عنك عند كل فطر صاعا من شعير أو تمر أو نصف صاع من بر.

 (শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০; শরহু মুশকিলুল আছার ৯/৩৮)

হযরত ছালাবা ইবনে আবু সুআইব রা. বলেন, আমরা উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর খেলাফত আমলে সদকাতুল ফিতর দিতাম আধা সা গম।

كنا نخرج زكاة الفطر على عهد عمر بن الخطاب نصف صاع.

(শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫০; শরহু মুশকিলুল আছার ৯/৩৯)

১২. আবুল আশআছ রাহ. বলেন, খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান রা. আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। ঐ খুতবায় তিনি বলেছেন, তোমরা যাকাতুল ফিতর আদায় কর দুই মুদ (আধা সা) গম।

 أدوا زكاة الفطر مدين من حنطة.

 (শরহু মুশকিলিল আছার ৯/৩৯। আল্লামা আইনী রাহ. বলেছেন, হাদীসটির সনদ সহীহ ও শক্তিশালী। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এ হাদীসের সনদ ইমাম মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ।)

১৩. হযরত আলী রা. বলেন, সদকাতুল ফিতর (এর পরিমাণ) হল, এক সা খেজুর বা এক সা যব কিংবা আদা সা গম। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৫; সুনানে দারা কুতনী ২/১৫২; কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মদীনাহ ১/৩৩৬)

অন্য সাহাবীদের অভিমত

১৪. আলকামা ও আসওয়াদ রাহ. থেকে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, (সদকাতুল ফিতর হচ্ছে) দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা খেজুর বা যব।

مدان من قمح أو صاع من تمر أو شعير.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০২; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৪; সুনানে দারা কুতনী ২/১৫২)

১৫. হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, প্রত্যেক গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, ধনী-গরীবের উপর সদকাতুল ফিতর অপরিহার্য। মাথাপিছু এক সা খেজুর বা আধা সা গম।

زكاة الفطر على كل حر أو عبد، ذكر أو أنثى،  صغير أو كبير، غني و فقير صاع من تمر أو نصف صاع من قمح. قال معمر : وبلغني أن الزهري كان يرفعه إلى النبي صلى الله عليه وسلم.

 (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১১। আল্লামা হাইসামী রাহ. এবং আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, হাদীসটি সহীহ এবং মাওকূফ।)

১৬. আমর ইবনে দীনার রাহ. বলেন, তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.কে মিম্বারের খুতবায় বলতে শুনেছেন, সদকাতুল ফিতর হল দুই মুদ (আধা সা) গম কিংবা এক সা খেজুর বা যব। গোলাম-স্বাধীন এই বিধানে সমান।

زكاة الفطر مدان من قمح، أو صاع من تمر زكاة الفطر مدان من قمح، أو صاع من تمر أو شعير، الحر والعبد سواء.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৩; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০২। আল্লামা আলাউদ্দীন ইবনুত তুরকুমানী রাহ. বলেন, এটি একটি মর্যাদাপুর্ণ সহীহ সনদ س। هذا سند صحيح جليل جليل)

১৭. ইমাম আবদুর রাযযাক রাহ. আমর ইবনে দীনার থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন,  সদকাতুল ফিতর হল দুই মুদ (আধা সা) গম অথবা এক সা খেজুর বা যব। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৩।)

১৮. হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, মারওয়ান ইবনুল হাকাম হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর নিকট দূত পাঠান যে, আপনার গোলামের সদকায়ে ফিতর আমার কাছে পাঠান। আবু সাঈদ খুদরী রা. দূতকে বললেন, মারওয়ানের তো (বিধান) জানা নেই। প্রতি ঈদুল ফিতরে আমাদের প্রদেয় হচ্ছে, মাথাপিছু এক সা খেজুর বা আধা সা গম।

إن مروان بعث إلى أبي سعيد : أن ابعث إلي بزكاة رقيقك، فقال أبو سعيد للرسول : إن مروان لا يعلم، إنما علينا أن نعطي لكل رأس عند كل فطر صاعا من تمر أو نصف صاع من بر.

 (শরহু মাআনিল আছার ১/৩৪৯; শরহু মুশকিলুল আছার ৯/২৬। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, এ সনদটি সহীহ। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এই হাদীসের সকল রাবী ছিকা ও বিশ্বস্ত।)

১৯. আবু যুবাইর রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা.কে বলতে শুনেছেন, ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন সকলের পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা অপরিহার্য, দুই মুদ (আধা সা) গম অথবা এক সা খেজুর বা যব।

 

صدقة الفطر على كل مسلم صغير وكبير، عبد أو حر، مدان من قمح، أو صاع من تمر أو شعير.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৫; মুসন্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০২; সুনানে দারা কুতনী ২/১৫১)

বিশিষ্ট তাবেয়ীদের অভিমত

২০. সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন, রোযাদারের অবশ্য কর্তব্য সদকাতুল ফিতর আদায় করা; দুই মুদ (আধা সা) গম অথবা এক সা খেজুর।

زكاة الفطر على من صام مدان من حنطة أو صاع من تمر.

(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৮; শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫১। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, এ সনদটি সহীহ।)

২১. ইসমাঈল ইবনে সালেম রাহ. ইমাম শাবী রাহ.-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, (সদকাতুল ফিতর হল) আধা সা গম অথবা এক সা খেজুর বা যব।

نصف صاع من بر، أو صاع من تمر أو شعير.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১)

২২. মুজাহিদ রাহ. বলেন, প্রত্যেকের প্রদেয় হচ্ছে গমের ক্ষেত্রে আধা সা। আর গম ছাড়া অন্যান্য খাদ্য যেমন খেজুর, কিসমিস, পনির, যব ইত্যাদিতে পুরা এক সা।

 عن كل إنسان نصف صاع من قمح، وما خالف القمح من تمر أو زبيب أو أقط أو شعير أو غيره فصاع تام.

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৫। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, রেওয়ায়েতটি সহীহ। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, এ রেওয়ায়েতের সকল রাবী ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য এবং বুখারী-মুসলিমের রাবী।)

২৩. হাসান বসরী রাহ. থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১। আল্লামা ইবনুত তুরকুমানী রাহ. বলেন, এটি সহীহ সনদ, এতে কোনো আপত্তি নেই।)

২৪. হযরত তাউস রাহ. বলেন, আধা সা গম অথবা এক সা খেজুর।

نصف صاع من قمح نصف صاع من قمح أو صاع من تمر.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৪)

২৫. আতা রাহ.বলেন, দুই মুদ গম অথবা এক সা খেজুর বা যব।

مدان من قمح أو صاع من تمر أو شعير.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০২; সুনানে দারা কুতনী ২/১৪২)

২৬. ইমাম শুবা রাহ. হাকাম ও হাম্মাদ রাহ. কে সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। উত্তরে তাঁরা বলেছেন, نصف صاع حنطة আধা সা গম। শুবা রাহ. বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনুল কাসেম এবং সাআদ ইবনে ইবরাহীমকেও এ প্রশ্ন করেছি, ,  فقالا مثل ذلك  তারাও একই কথা বলেছেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩; শরহু মাআনিল আছার ১/৩৫১। আল্লামা আইনী রাহ. বলেন, এটি একটি সহীহ সনদ।)

২৭. ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন, ছোট-বড়, গোলাম-স্বাধীন প্রত্যেকের পক্ষ থেকে প্রদেয় হচ্ছে আধা সা গম।

 عن الصغير والكبير، والحر والعبد، عن كل إنسان نصف صاع من قمح.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০১। শায়খ শুআইব আরনাউত এর সকল রাবীকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।)

 ২৮. আবু হাবীব রাহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ রাহ.কে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছেন,نصف صاع من حنطة أو دقيق ن. আধা সা গম বা আটা। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩)

 

২৯. আউফ রাহ.বলেন, আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. উমর ইবনে আরতাত রাহ.-এর নিকট পত্র লেখেন, যা বসরার মিম্বারে পঠিত হয়েছে, যাতে তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল-তুমি তোমার অধীনস্থ মুসলমানদেরকে এক সা খেজুর বা আধা সা গম সদকাতুল ফিতর আদায়ের আদেশ কর।

 

أما أما بعد، فمر من قبلك من المسلمين أن يخرجوا صدقة الفطر صاعا من تمر، أو نصف صاع من بر.

 (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৩। শায়খ শুআইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সকল রাবী নির্ভরযোগ্য ও সহীহ-এর রাবী।’

অপর একটি বর্ণনায় আছে, কুবরা রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিকট সদকায়ে ফিতর সম্পর্কিত হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর পত্র পৌঁছেছে, যাতে একথা ছিল যে, প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আধা সা বা তার মূল্য আধা দিরহাম ফিতরা (আদায় করতে হবে)।

 جاءنا كتاب عمر بن عبد العزيز في صدقة الفطر : نصف صاع عن كل إنسان أو قيمته : نصف درهم.

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৮)

৩০. আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি সকলকে ঈদগাহে যাওয়ার আগেই এক সা খেজুর বা আধা সা গম ফিতরা দেওয়ার আদেশ করতেন।

 كان يأمر أن يلقي الرجل قبل أن يخرج صاعا من تمر، أو نصف صاع من قمح.

 (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/৩১৭)

বিশিষ্ট তাবে তাবেয়ীগণের অভিমত

৩১. ইমাম আওযাঈ রাহ. বলেন,

يؤدي كل إنسان مدين من قمح بمد أهل بلده. প্রত্যেকে প্রদান করবে নিজ দেশের মুদ (পাত্র) দ্বারা দুই মুদ। (আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ৪/১৩৯)

৩২. ইমাম লাইস রাহ. বলেন, গমের ক্ষেত্রে হিশামের মুদে (পাত্র) দুই মুদ আর খেজুর, যব ও পনিরের ক্ষেত্রে চার মুদ (বা এক সা)।

 بمد هشام، وأربعة أمداد من التمر والشعير والأقط. مدين من قمح

(আততামহীদ ৪/১৩৯)

 

বিশুদ্ধতা ও প্রসিদ্ধির ক্ষেত্রে আধা সা বিষয়ক হাদীসসমূহের অবস্থান

এ পর্যন্ত উল্লেখিত আধা সা সম্পর্কিত হাদীস ও আছারের উপর চিন্তা করলে যে বিষয়গুলো পরিষ্কার বোঝা যায় তাই এই-

১. আধা সা সম্পর্কে একাধিক মারফূ হাদীস রয়েছে, যেগুলোর সনদ সহীহ বা হাসান।

এ প্রবন্ধে যে হাদীসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর সাথে হাদীস বিশারদগণের মন্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

২. আধা সা সম্পর্কে সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ.-এর মুরসাল হাদীসটি দলীল হিসেবে যথেষ্ট ছিল। অথচ সেই মুরসাল হাদীসের সাথে শুধু এই প্রবন্ধেই উল্লেখ করা হয়েছে নয়টি মারফূ হাদীস, যার চারটি মুত্তাসিল এবং পাঁচটি মুরসাল; আরো উল্লেখ করা হয়েছে এগারটি আছারে সাহাবা এবং তেরজন তাবেয়ীর ফতোয়া। এই সকল হাদীস ও আছারের কারণে মূল বিষয়টিকে মাশহুর-মুস্তাফীয তো বটেই, মুতাওয়াতির বলা হলেও অতিশয়োক্তি হবে না। মুহাদ্দিস আহমদ আল গুমারী রাহ., যিনি বিগত শতাব্দীর হাতে গোনা কয়েকজন হাফেযে হাদীসের অন্যতম ছিলেন, তিনি এমন মন্তব্যই করেছেন।

 

উল্লেখ্য, এ প্রবন্ধে উল্লেখিত বেশ কিছু হাদীস ও আছার একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে। সনদের ভিন্নতার কারণে প্রত্যেকটি আলাদা হাদীস বলে গণ্য হবে।

৩. উপরোক্ত হাদীস ও আছারে বর্ণিত বিধানটির (অর্থাৎ খেজুর, যব ইত্যাদির এক সা আর গমের আধা সা) একটি বিশেষত্ব এই যে, তা ঘোষণা করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষক পাঠিয়েছিলেন, যা একাধিক রেওয়ায়েতে আছে। এ থেকে বোঝা যায়, বিধানটি ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি তা ব্যাপকভাবে অবগত করতে চেয়েছেন। এ থেকে আরো বোঝা যায়, এক সা ও আধা সা শরীয়তের দৃষ্টিতে দুটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ। এজন্য উপরোক্ত হাদীসগুলোতে بعث بعث مناديا (ঘোষক পাঠিয়েছেন) أمر أمر مناديا مناديا (ঘোষককে আদেশ করেছেন) ইত্যাদি শব্দগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

৪. এ বিধানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই যে, তা বর্ণনা করার জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর একাধিক খলীফায়ে রাশেদ এবং কয়েকজন সাহাবী ঈদুল ফিতরের আগে আলাদাভাবে ভাষণ দিয়েছেন। পূর্বোক্ত হাদীস ও আছারে বর্ণিত خطب (ভাষণ দিয়েছেন)  শব্দটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রকৃত উত্তরসূরী আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এ বিষয়ের বিধান সম্বলিত লিখিত ফরমান জারি করেছিলেন। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, তাঁর একটি ফরমানে শুধু আধা সা গম বা তার মূল্যের কথাই বলা হয়েছিল।

৫. খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল ও ফতোয়াও এই ছিল যে, গম দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করলে আধা সা দিবে। আর হাদীসে বর্ণিত বিধানের অনুকূলে যখন খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল ও সুন্নাহ পাওয়া যায় তখন তার অর্থ হয়, বিধানটি অটল ও মোহকাম, তা

মানসূখ বা রহিত নয়; এবং তাতে ভিন্ন ব্যাখ্যারও অবকাশ নেই। তা নবী-নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত-عليكمعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدينا (তোমাদের জন্য অপরিহার্য, আমার সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাদেশীনের সুন্নাহকে অনুসরণ করা)।

৬. খোলাফায়ে রাশেদীন ছাড়া অন্যান্য ফকীহ সাহাবীও এই ফতোয়া দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এবং হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাহ.-এর ব্যক্তিগত আমল ভিন্ন হলেও তাঁরা কেউ এ কথা বলেননি, আধা সা গম আদায় করলে ফিতরা আদায় হবে না। তাঁরা আগ্রহী ছিলেন হাদীসে বর্ণিত খাদ্যবস্ত্ত দ্বারাই ফিতরা আদায় করতে। আর ঘটনাক্রমে আধা সা সংক্রান্ত মারফূ হাদীস জানা না থাকায় তাঁরা সেটি দ্বারা ফিতরা আদায় করতে চাইতেন না। কিন্তু কখনোই তাঁরা এই ফতোয়া দেননি যে, আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায় হবে না; বরং ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবু সায়ীদ খুদরী মারওয়ান ইবনুল হাকামকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-

إن مروان لا يعلم، إنما علينا أن نعطي لكل رأس عند كل فطر صاعا من تمر أو نصف صاع من بر.

মারওয়ানের তো জানা নেই। প্রতি ঈদুল ফিতরে আমাদের প্রদেয় হচ্ছে মাথাপিছু এক সা খেজুর অথবা আধা সা গম। (শরহু মাআনিল আছার ১/৩৪৯)

তেমনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকেও বর্ণিত আছে যে, আবু মিজলায রাহ. তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন-

إن إن الله قد أوسع، والبر أفضل من التمر؟

আল্লাহ তাআলা স্বচ্ছলতা দিয়েছেন আর গম খেজুরের চেয়ে শ্রেয়। (অতএব আপনি গম দিয়ে ফিতরা আদায় করছেন না কেন?) উত্তরে ইবনে উমর রা. বলেছেন-

 

 

 إن أصحابي سلكوا طريقا، وأنا أحب أن أسلكه 

আমার সঙ্গীরা যে পথে চলেছেন আমিও সে পথে চলতেই পছন্দ করি। অর্থাৎ তাঁদের মতো খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করাই আমার কাছে পছন্দনীয়। তো প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিজের পছন্দের কথা বলেছেন। প্রশ্নকারীর কথাকে খন্ডন করেননি কিংবা এ কথাও বলেননি যে, তা দ্বারা ফিতরা আদায় হবে না।

সারকথা এই যে, আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায় হয়- এ বিষয়ে সকল সাহাবীর ইজমা ছিল। তো যে হাদীসের অনুকূলে ফকীহ সাহাবীগণ আমল করেছেন ও ফতোয়া দিয়েছেন, এরপর শীর্ষস্থানীয় মনীষী তাবেয়ীগণ আমল করেছেন ও ফতোয়া দিয়েছেন, যাদের মধ্যে মদীনা শরীফের সাত ফকীহ ও মুসলিম জাহানের বড় বড় ফকীহ তাবেয়ীও অন্তর্ভুক্ত, সে হাদীস যে متلقى بالقبول তথা সর্বজনগৃহীত সে বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ থাকতে পারে? আর এতো জানা কথা যে, ‘খবরে ওয়াহিদ’ শ্রেণীর কোনো হাদীসও যখন متلقى متلقى بالقبول (সর্বজনগৃহীত) হয়ে যায় তখন জুমহুর ফকীহ, মুহাদ্দিস ও উসূলবিদদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এই যে, তা মুতাওয়াতিরের মতো قطعي قطعي ও সন্দেহাতীত বলে গণ্য হয়। তাহলে যে হাদীস সনদের বিচারেও মাশহুর ও মুস্তাফীয তা যদি খাইরুল কুরূনের ফকীহদের নিকট تقلى بالقبول ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে তার বিশুদ্ধতার বিষয়ে কি কারো প্রশ্ন তোলারও  অবকাশ থাকে?

 

এজন্য কেউ যদি আধা সা বিষয়ক হাদীসসমূহের উপর আপত্তি করে তবে সেটা হবে তার বিচ্যুতি, যদি না তার আপত্তি বিশেষ কোনো সনদের ক্ষেত্রে হয়। বলাবাহুল্য, কোনো বিষয়ে যদি বহু সংখ্যক হাদীস বিদ্যমান থাকলে আর সেগুলোর কোনো একটি হাদীস যয়ীফ হলে ঐ বিষয়টি প্রামাণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সংশয় প্রকাশ করা যায় না। তেমনি কোনো হাদীসের যদি অনেকগুলো সহীহ সনদ থাকে আর তা কোনো যয়ীফ রাবীও রেওয়ায়েত করে তাহলে তার রেওয়ায়েতের কারণে মূল হাদীসটিকে যয়ীফ বলা যায় না।

আধা সা গম দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায়ের মাসআলায়ও তাই ঘটেছে। এ বিষয়ে অনেক হাদীস, আছার এবং সেগুলোর বহু সনদের মধ্যে দু’ একটি হাদীস এবং সনদ যয়ীফও রয়েছে। কারো দৃষ্টিতে কেবল এগুলোই ধরা পড়েছে ফলে তিনি বলতে শুরু করেছেন যে, আধা সা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়!! অন্যথায় যাদের দৃষ্টি বিস্তৃত এবং যাদের এ বিষয় সম্পর্কিত সকল হাদীস এবং রেওয়ায়েত সম্পর্কে নিরীক্ষণের সুযোগ হয়েছে তাদের মধ্য থেকে কোনো হাদীস বিশারদ আধা সা-এর বিশুদ্ধতার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি।

 

বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণের মন্তব্য

এখানে আমরা নমুনাস্বরূপ কয়েকজন মুহাদ্দিস এবং ফকীহর বক্তব্য উদ্ধৃত করছি, যারা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, আধা সা সম্পর্কিত হাদীসসমূহ সহীহ সূত্রে প্রমাণিত এবং গ্রহণযোগ্য। শেষের দিকে কয়েকজন সমকালীন আলেমের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। কেননা, আমাদের দেশে যারা উক্ত বিষয়টিকে নতুন করে আলোচ্য বিষয় বানিয়েছেন তাদেরকে এদের ভক্ত লক্ষ্য করা যায়। আশা করি, এদের বক্তব্য দ্বারা তাদেরও আধা সা বিষয়ক হাদীসসমূহের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ইতমিনান এবং প্রশান্তি হাসিল হবে।

১. ইমাম ত্বহাবী রাহ. আধা সা গম সম্পর্কে অনেকগুলো হাদীস ও আছার রেওয়ায়েত করার পর বলেন, এ পরিচ্ছেদে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে, তারপর তাঁর সাহাবীগণ থেকে এবং তাঁদের পর তাবেয়ীদের থেকে যেসব রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছি, তা প্রমাণ করে যে, সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল গম থেকে আধা সা আর গম ছাড়া অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী থেকে এক সা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সাহাবী ও কোনো তাবেয়ী থেকে এর বিপরীত কিছু বর্ণিত আছে বলে আমাদের জানা নেই। সুতরাং এর বিরোধিতা করার অবকাশ কারো নেই। কারণ তা ছিল ইজমায়ী ও সর্বসম্মত বিষয়, হযরত আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারূক, উসমান ও আলী রা.-এর যমানা থেকে উপরোক্ত তাবেয়ীদের যামানা পর্যন্ত।

هذا كل هذا كل ما روينا في هذا الباب عن رسول الله صلى الله عليه وسلم وعن أصحابه من بعده وعن تابعيهم من بعدهم كلها على أن صدقة الفطر من الحنطة نصف صاع ومما سوى الحنطة صاع، وما علمنا أن أحدا من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ولا من التابعين روي عنه خلاف ذلك، فلا ينبغي لأحد أن يخالف ذلك، إذ كان قد صار إجماعا في زمن أبي بكر وعمر وعثمان و علي إلى زمن من ذكرنا من التابعين.

 

২. ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. (মৃত্যু : ২২৪ হি.) বলেন, গম, যব, খেজুর ও কিসমিস এগুলোর যে কোনোটি দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করা যায়। খেজুর, কিসমিস বা যব দ্বারা আদায় করলে এক সা প্রদান করবে। আর গম দ্বারা আদায় করলে আমার মতে উত্তম হল, এক সা থেকে কম না দেওয়া। তবে আধা সা দিলেও ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। কারণ এক জামাত আলিম এই ফতোয়া দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের আরবী পাঠ নিম্নরূপ-

وأما زكاة الفطر فإن صاحبها فيها بالخيار، إن شاء جعلها برا، وإن شاء جعلها تمرا، أو شعيرا أو زبيبا، فإن اختار التمر، أو الشعير، أو الزبيب فإن هذا المكوك يجزئ عن نفسين ونصف، لأنه صاعان ونصف، وإن اختار البر، فإن أحب الأمرين إلي له أن لا ينتقص من مكيلة الصاع شيئا، لأن أكثر الآثار عليه، وهو أفضل عندي من التمروالشعير،

وإن جعله نصف صاع بر كان مجزيا عنه، لأنه قد أفتى به عدة من أهل العلم، وصاع تمر أو صاع شعير أحب إلي من نصف صاع بر، وإن كان مجزيا، لأنه هو أشد موافقة للاتباع.

৩. ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহ. (মৃত্যু : ৩৭০ হি.) বলেন, আধা সা গম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এবং হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, জাবির, আয়েশা, ইবনুয যুবাইর, আবু হুরায়রা, আসমা বিনতে আবু বকর, কাইস ইবনে সাআদ রা. প্রমুখ সাহাবী ও অধিকাংশ তাবেয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে। কোনো সাহাবী থেকে এ কথা বর্ণিত হয়নি যে, আধা সা গম প্রদান করলে ফিতরা আদায় হবে না।

روي روي نصف صاع من بر عن النبي صلى الله عليه وسلم وأبي بكر وعمر وعثمان وعلي وابن مسعود وجابر وعائشة وابن الزبير وأبي هريرة وأسماء بنت أبي بكر وقيس بن سعد رضي الله عنهم أجمعين، وعامة التابعين، ولم يرو عن أحد من الصاحابة بأنه لا بجزئ نصف صاع من بر.

 (শরহু মুখতাসারিত তহাবী ২/২৩৪৫)

৪. ইমাম ইবনুল মুনযির রাহ. সম্ভবত আধা সা গম দিয়ে ফিতরা আদায় সংক্রান্ত মারফূ হাদীসমূহ তার নিকট পৌঁছেনি বা পৌঁছলেও সেগুলোর সনদের বিশুদ্ধতার দিকটি তাঁর নিকট স্পষ্ট হয়নি, ফলে তিনি সেগুলো প্রমাণিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর অভিমত ও সিদ্ধান্তের কারণে আধা সা-এর মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিজে তা গ্রহণ করেছেন।

ফাতহুল বারীতে তাঁর বক্তব্য এভাবে উল্লেখিত হয়েছে-

 لا نعلم في القمح خبرا ثابتا عن النبي صلى الله عليه وسلم يعتمد عليه، ولم يكن البر بالمدينة ذلك الوقت إلا الشيء اليسير منه، فلما كثر في زمن الصحابة رأوا أن نصف صاع منه يقوم مقام صاع من شعير، وهم الأئمة، فغير جائز أن يعدل عن قولهم إلا إلى قول مثلهم، ثم أسند عن عثمان وعلي وأبي هريرة وجابر وابن عباس وابن الزبير وأمه أسماء بنت أبي بكر بأسانيد صحيحة أنهم رأوا أن في زكاة الفطر نصف صاع من قمح. انتهى، وهذا مصير منه إلى اختيار ما ذهب إليه الحنفية.

 

অর্থাৎ গমের ক্ষেত্রে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্ভরযোগ্য কোনো হাদীস আমাদের জানা নেই এবং তাঁর সময়ে মদীনায় গমের ফলন খুব সামান্য ছিল। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামের যামানায় যখন গমের ফলন বৃদ্ধি পায় তখন তাঁরা আধা সা গমকে এক সা যবের স্থলাভিষিক্ত বলে মত দিলেন। আর তাঁরা হলেন উম্মতের অনুসরণীয় ব্যক্তি। সুতরাং তাঁদের বক্তব্য উপেক্ষা করে তাঁদের সমতুল্য ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য কারো মত গ্রহণ করা জায়েয নয়। এরপর ইবনুল মুনযির রাহ. বিশুদ্ধ সূত্রে হযরত উসমান, আলী, আবু হুরায়রা, জাবির, ইবনে আববাস, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর এবং তাঁর মাতা আসমা বিনতে আবু বকর রা. থেকে রেওয়ায়েত করেছেন যে, তাঁরা সকলেই সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ আধা সা গম মনে করেন। ইবনুল মুনযির রাহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করার পর ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, এটা প্রমাণ করে, এ বিষয়ে তিনি হানাফীদের মত গ্রহণ করেছেন। (ফতাহুল বারী ৩/৪৩৭)

৫. আল্লামা ইবনে আবদুল হাদী আল হাম্বলী রাহ. (মৃত্যু : ৭৪৪ হি.) বলেন, ওয়াজিব ফিতরার ক্ষেত্রে আধা সা গমের সিদ্ধান্তটি একটি শক্তিশালী সিদ্ধান্ত এবং তা অনেক দলিল দ্বারা প্রমাণিত।

 

القول بإيجاب القول بإيجاب نصف صاع من بر قول قوي، وأدلته كثيرة.

(তানকীহু তাহকীকি আহাদীসিত তালীক ২/২৪৫)

৬. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.ও মনে করেন, আধা সা গম দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় হবে। তাঁর বিশিষ্ট শাগরিদ আল্লামা ইবনে মুফলিহ রাহ. কিতাবুল ফুরূতে স্বীয় উস্তাদের অভিমত এভাবে উল্লেখ করেছেন-

 

واختار شيخنا بأنه يجزئ نصف صاع من بر، وقال : وهو قياس المذهب في الكفارة، وإنه يقتضيه ما نقله الأثرم.

অর্থাৎ আমাদের শায়খ (ইবনে তাইমিয়া রাহ.) এ মত গ্রহণ করেছেন যে, আধা সা গম দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় হবে। তিনি বলেন, কাফফারার ক্ষেত্রে হাম্বলীদের যে মাযহাব তা একথাই বলে এবং ইমাম আছরাম রাহ. এর বর্ণনাও তা নির্দেশ করে। (আলফুরূ ১/৭০৯; যাদুল মাআদ ২/২০; আরো দেখুন : তামামুল মিন্নাহ ৩৮৬)

৭. আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. ‘‘যাদুল মাআদ’’ কিতাবে (২/১৮-২০) বলেন, আধা সা গমের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একাধিক মুরসাল ও মুসনাদ হাদীস বর্ণিত আছে, যেগুলো সমষ্টিগতভাবে শক্তিশালী।

 

وفيه عن النبي صلى الله عليه وسلم آثار مرسلة ومسندة يقوي بعضها بعضا.

 

এরপর কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, আমাদের শায়খ (ইবনে তাইমিয়া রাহ.) এ মতটিকে শক্তিশালী আখ্যা দিতেন এবং বলতেন,  কাফফারার ক্ষেত্রে ইমাম আহমদ রাহ.-এর বক্তব্য যা বলে তা এই যে, গম থেকে সদকায়ে ফিতরের ওয়াজিব পরিমাণ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর অর্ধেক।

وكان شيخنا رحمه الله تعالى : يقوي هذا المذهب ويقول : هو قياس قول أحمد في الكفارات، أن الواجب فيها من البر نصف الواجب من غيره.

 তিনি শুধু আধা সা গমের হাদীসগুলো উল্লেখ করেছেন এবং শাইখের অভিমত উল্লেখ করে ঐ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

৮. আল্লামা ছালেহ ইবনে মাহদী আলমাকবিলী রাহ. (মৃত্যু : ১১০৮ হি.) বলেন, এমন অনেক রেওয়ায়েত আছে, যা সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে যে, গমের ক্ষেত্রে ওয়াজিব ফিতরা হচ্ছে দুই মুদ বা আধা সা।

 وردت روايات يعمل بمجموعها أن الواجب من الحنطة مدان.

(আল মানার ফিল মুখতার ১/৩৩১)

৯. আল্লামা আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সিদ্দীক আলগুমারী রাহ. বলেন, কেউ যদি বলে যে, আধা সা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, যেমনটি ইবনুল মুনযির ও বাইহাকী রা.বলেছেন তাহলে এর উত্তরে আমরা বলব যে, বরং তা প্রমাণিত। কারণ তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীদের থেকে এত অধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, এরপর আর কোনো সংশয় থাকে না; বরং একে যদি মুতাওয়াতির বলা হয় তবুও অত্যুক্তি হবে না।

فإن قيل : إن نصف صاع لم يثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم كما قال ابن المنذر والبيهقي؟ قلنا : بل هو ثابت لو روده عن النبي صلى  الله عليه وسلم والخلفاء الراشدين وغيرهم من الصحابة والتابعين، من طرق كثيرة لا يبقى معها شك في ثبوته، بل لا يبعد القول بتواتره. فقد ورد من حديث عبد الله بن عمرو بن العاص، وعبد الله بن عباس، وعائشة، وعبد الله بن ثعلبة، وأسماء بنت أبي بكر، وعبد الله بن عمر بن الخطاب، وجابر بن عبد الله، وزيد بن ثابت، وعصمة بن مالك، وعلي بن أبي طالب، وأبي هريرة، وأبي سعيد الخدري موصولا.

وعن سعيد بن المسيب وأبي سلمة بن عبد الرحمن، وعبيد الله بن عبد الله بن عتبة بن مسعود، والقاسم بن محمد، وسالم بن عبد الله مرسلا.

وعن أبي بكر، وعمر وعثمان وعلي وجابر وابن مسعود وابن الزبير وابن عباس ومعاوية وأبي سعيد الخدري موقوفا.

وعن مجاهد وعطاء والشعبي وعمر بن عبد العزيز والحسن البصري وطاؤس وعبد الله بن شداد وإبراهيم النخعي والحكم وحماد مقطوعا.

 (তাহকীকুল আমাল ফী ইখরাজি যাকাতিল ফিতরি  বিল মাল ৬৩)

১০. শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ. বলেন, আধা সা সম্পর্কে কয়েকটি মারফূ হাদীস রয়েছে এবং এ বিষয়ে অনেক মুরসাল ও মুসনাদ আছর রয়েছে, যেগুলো সমষ্টিগতভাবে শক্তিশালী। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. ‘‘যাদুল মাআদ’’ কিতাবে এমনটি বলেছেন এবং তিনি ঐসব আছার উল্লেখ করেছেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, গমের ওয়াজিব ফিতরা হল আধা সা। আর এটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া  রাহ.-এর অভিমত এবং ইবনুল কাইয়িম রাহ. এ দিকেই ঝুঁকেছেন। ইনশাআল্লাহ এটিই সঠিক মত।

 

زاد فيه أحاديث مرفوعة إلى النبي صلى الله عليه وسلم وفي الباب آثار مرسلة ومسنده يقوي بعضها بعضا، كما قال ابن القيم في الزاد وقد ساقها فيه، فليراجعها من شاء، وخرجتها أنا في التعليقات الجياد. فثبت من ذلك أن الواجب في صدقة الفطر من القمح نصف صاع، وهو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية كما في الاختيبارات. ص : ٦٠ وإليه مال ابن القيم كما سبق، وهو الحق إن شاء الله تعالى.

 

 (তামামুল মিন্নাহ ৩৮৬)

১১. শায়খ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ.-এর বিশিষ্ট শাগরিদ হুসাইন ইবনে আউদাহ আলআওয়াইশাহ বলেন, গমের ক্ষেত্রে সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ হল আধা সা। এটি ইমাম আবু হানীফা ও রাহ.-এর অভিমত এবং শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহ. ও আমাদের শাইখ (নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ.ও) এই মত পোষণ করতেন।

 

তাঁর বক্তব্যের আরবী পাঠ এই -

وأما وأما من البر : فنصف صاع، وهو قول أبي حنيفة، وقياس أحمد في بقية الكفارات، وبه يقول شيخ الإسلام وشيخنا رحم الله الجميع.

عن عروة بن الزبير : أن أسماء بنت أبي بكر كانت تخرج على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم عن أهلها الحر منهم والمملوك ـ مدين من حنطة، أو صاعا من تمر بالمد، أو بالصاع  الذي يقتاتون به، أخرجه الطحاوي واللفظ له، وابن أبي شيبة وأحمد وسنده صحيح على شرط الشيخين، كما في تمام المنة.

قال شيخنا فيه (٣٨٧) عقب أثر عروة ابن الزبير : فثبت من ذلك أن الواجب في صدقة الفطر من القمح نصف صاع، وهو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية كما في الاختيارات وإليه مال ابن القيم ... وهو الحق إن شاء الله تعالى.

 (আলমাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আলমুয়াসারাহ ৩/১৬৩)

১২. ড. মুহাম্মাদ আবদুল গাফফার আশশরীফ বলেন, হানাফী ইমামগণ আধা সা গম ফিতরা সম্পর্কে অনেক হাদীস ও আছার দ্বারা দলিল পেশ করেছেন। দলীলের প্রাচুর্য্য ও বিশুদ্ধতার কারণে আমার নিকট হানাফী ইমামদের বক্তব্যই অগ্রগণ্য। আর হানাফী ইমাম ছাড়াও খোলাফায়ে রাশেদীন, ইবনে মাসউদ, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, আবু হুরায়রা, আসমা বিনতে আবু বকর রা. প্রমুখ সাহাবী এবং উমর বিন আবদুল আযীয রাহ.সহ বড় বড় তাবেয়ীগণ এ সিন্ধান্তই দিয়েছেন। এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদ এবং ইবনুল মুনযির রাহ.সহ আরো অনেকেরই এই সিদ্ধান্ত ছিল।

واستدل الحنفية بأحاديث وآثار كثيرة لوجوب نصف صاع من بر، ... والراجح عندي مذهب الحنفية، لكثرة أدلتهم وصحتها ... وقد قال بهذا القول عدا الحنفية الخلفاء الراشدون، وابن مسعود، وجابر بن عبد الله، وأبو هريرة، وأسماء بنت أبي بكر، وعمر بن عبد العزيز، وكبار التابعين وأحمد في رواية وابن المنذروغيرهم.

 (বুহুছ ফিকহিয়্যাহ মুআছিরা ১/২৭৬)

১৩. শায়খ মাহমুদ সাঈদ মামদূহ বলেন, আধা সা বিষয়ে একাধিক শক্তিশালী মুসনাদ হাদীস এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহীহ অনেকগুলো মুরসাল হাদীস রয়েছে। ইমাম তাহাবী রাহ. তাঁর দুই কিতাব ‘‘শরহু মাআনিল আছার’’ ও ‘‘শরহু মুশকিলিল আছাওে’’ তা রেওয়ায়েত করেছেন। ইবনে আবদুল হাদী রাহ. ‘‘আততানকীহ’’ গ্রন্থে বলেছেন, আধা সা গম ওয়াজিব হওয়ার বক্তব্যটি শক্তিশালী এবং অনেক দলিল দ্বারা প্রমাণিত।

وفي الباب مسندات قوية، ومراسيل غاية في الصحة أخرجها الإمام الطحاوي في كتابيه شرح معاني الآثار وشرح مشكل الآثار. وقد قال ابن عبد الهادي في التنقيح : ٢/١٤٧ القول بإيجاب نصف صاع من بر قول قوي، وأدلته كثيرة.

 (আততারীফ বিআউহামি মান কাসসামাস সুনানা ইলা সহীহিন ওয়া যয়ীফিন ৫/৩৮৯)

 

আধা সা-এর পরিমাপটি কি নবী-যুগের পর নির্ধারিত হয়েছে?

পূর্বোক্ত মাশহুর ও মুতালাক্কা বিলকবুল তথা প্রসিদ্ধ ও খাইরুল কুরূনের ইমামগণের মাঝে স্বীকৃত হাদীস ও আছারসমূহের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে কেউ কেউ এই বলে সংশয় প্রকাশ করেছেন যে, সহীহ হাদীস থেকে জানা যায়, আধা সা-এর পরিমাপ হযরত মুআবিয়া রা.-এর যুগে অথবা হযরত উমর রা.-এর যুগে নির্ধারিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় লক্ষ করুন।

1.         যে রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, হযরত ওমর রা. আধা সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য সাব্যস্ত করেছেন এবং মানুষ সে অনুযায়ী আমল করতে শুরু করে তা একটি ‘মালূল রেওয়ায়েত’ তথা ভুল বর্ণনা। ইমাম মুসলিম রাহ. কিতাবুত তাময়ীযে সেটিকে বর্ণনাকারীর ওয়াহম ও ভ্রান্তি বলে চিহ্নিত করেছেন।

ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. ইবনুল জাওযী রাহ. শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. এবং হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ.ও উক্ত রেওয়ায়েতকে যয়ীফ বা মালূল বলেছেন।

(দেখুন : আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ১৪/৩১৭-৩১৮; আততাহকীক লিআহাদীসিত তালীক, ইবনুল জাওযী ২/২৪৩; আততানকীহ ১/৪৮০; ফাতহুল বারী ৩/৪৩৫)

2.         এ কথা ঠিক যে, কোনো কোনো সহীহ হাদীসে আছে, হযরত মুআবিয়া রা. তাঁর খেলাফত-আমলে হজ্ব বা উমরার এক সফরে মদীনা আগমন করেন। তখন তিনি বলেছিলেন-

 أرى أن إني أرى أن مدين من سمراء الشام تعدل صاعا من تمر.

আমার মতে শামের দুই মুদ (আধা সা) গম এক সা খেজুরের সমতুল্য। (সহীহ মুসলিম ১/৩১৮)

এ বর্ণনা থেকে কিছু লোক মনে করেছে, আধা সা গম আদায়ের বিধানটির প্রচলন হযরত মুআবিয়া রা.-এর উক্ত প্রস্তাবনার পর থেকে শুরু হয়েছে। এর আগে এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু তারা ভেবে দেখেননি যে, এ রেওয়ায়েতটি যেমন সহীহ, আধা সায়ের মারফূ হাদীসগুলো তো আরো বেশি সহীহ। তো এর কারণে ওগুলোকে অস্বীকার করা কিভাবে সঠিক হতে পারে? তাহলে তো কেউ এমনও বলে বসতে পারে যে, সহীহ মারফূ হাদীসে যেহেতু আধা সার কথা আছে তাই ঐ রেওয়ায়েতটি সহীহ নয়, যাতে বলা হয়েছে, আধা সা-এর (পরিমাণ) হযরত মুআবিয়া রা.-এর আগে ছিল না।

কেউ কেউ বলে থাকে, আধা সায়ের হাদীস বুখারী-মুসলিমে নেই। পক্ষান্তরে এই পরিমাপ হযরত মুআবিয়া রা. শুরু করেছেন তা বুখারী-মুসলিমে আছে। তাই অগ্রগণ্য বর্ণনা হল, মুআবিয়া রা.ই আধা সা-এর উদ্ভাবক!!

এই দাবি নিতান্তই বালখিল্যতা। কারণ যে সকল হাদীসের বিষয়বস্ত্ত সাহাবা-তাবেয়ীনযুগের মনীষী-মহলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়ে যায় তাকে শুধু এই অজুহাতে গৌণ বা নগণ্য সাব্যস্ত করা যে, হাদীসটি বুখারী-মুসলিমে সংকলিত হয়নি, এর চেয়ে হাস্যকর বিষয় আর কী হতে পারে? তবে কি ফকীহ সাহাবী ও তাবেঈদের স্বীকৃতি এমনই তুচ্ছ বিষয় যে, পরবর্তীযুগে বুখারী-মুসলিমে সংকলিত হওয়া ছাড়া তার কোনো মূল্য নেই; বরং তা যয়ীফ বা গৌণ (অপরটির তুলনায় অগ্রহণযোগ্য) হয়ে যাবে? জেনে রাখা দরকার, এ জাতীয় চিন্তা-ভাবনা হাদীস অস্বীকারকারীদের জন্য রসদ যুগিয়ে থাকে!

আর এই দু’ একটি রেওয়ায়েতের কারণে আপনি কতগুলো রেওয়ায়েতকে অস্বীকার করবেন? আধা সায়ের মারফূ হাদীস এবং এ সংক্রান্ত সাহাবা-তাবেয়ীদের আছারের সংখ্যা তো এসব রেওয়ায়েত থেকে অনেক গুণ বেশি। এই সকল রেওয়ায়েতকে শুধু এ কারণে প্রত্যাখ্যান করে দিবেন যে, কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে, উক্ত পরিমাপটি হযরত মুআবিয়া রা.-এর যামানায় নির্ধারিত হয়!?

হযরত মুআবিয়া রা.-এর আগে যদি এই পরিমাপের কোনো অস্তিত্ব না থেকে থাকে তাহলে খোলাফায়ে রাশেদীন ও বড় বড় সাহাবী তা কোথায় পেলেন, যারা হযরত মুআবিয়া রা.-এর খেলাফত আমলের বহু আগেই ইন্তিকাল করেছিলেন? তাঁরা কীসের ভিত্তিতে এক সা যব ও খেজুরের সাথে আধা সা গমের ফায়সালা ও ফতোয়া দিতেন?

আসল কথা এই যে, বুখারী-মুসলিমের ঐ রেওয়ায়েতের সাথে আধা সায়ের হাদীস ও আছারের এমন কোনো সংঘাত নেই যে, একটির কারণে অন্যটিকে অস্বীকার করতে হবে। ওই রেওয়ায়েতে শুধু এটুকু বলা হয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া রা. এই প্রস্তাব দিয়েছেন যে, আধা সা গম এক সা খেজুরের সমতুল্য। অন্যরাও তাঁর সাথে একমত হয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবের সরল অর্থ হচ্ছে, আধা সা সংক্রান্ত মারফূ হাদীসগুলো তাঁর জানা ছিল না। আর এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিটি হাদীস প্রত্যেক সাহাবীর জানা থাকবে তা না অপরিহার্য, না বাস্তবে সম্ভব। এ কারণেই উসূলে হাদীসের কিতাবে এটি একটি স্বীকৃত বিষয়।

হযরত মুআবিয়া রা.-এর প্রস্তাবের সাথে কেউ এজন্যই দ্বিমত পোষণ করেননি যে, বিশিষ্টদের জানা ছিল, তাঁর প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহর দ্বারা তা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, আধা সা সংক্রান্ত অধিকাংশ হাদীস ও আছার হচ্ছে মৌখিক বর্ণনা। অর্থাৎ বিধানটি মুখে বর্ণনা করা হত, কিন্তু ঐ সময় মক্কা মদীনায় গমের প্রচলন কম থাকায় তা আমলের সুযোগ হত কম। সাধারণত খেজুর ও যব দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হত, যার নির্ধারিত পরিমাণ এক সা।

হযরত মুআবিয়া রা.-এর যামানায় গমের প্রচলন বৃদ্ধি পেলে তিনি মিম্বারের দাঁড়িয়ে গম দ্বারা ফিতরা আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন, তখন সাধারণ মানুষও তা জেনেছে এবং ব্যাপকভাবে আমলও করেছে। এর অর্থ এটা নয় যে, ইতিপূর্বে আধা সায়ের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অস্তিত্বই যদি না থাকবে তাহলে এতগুলো সহীহ হাদীস এবং সাহাবা-তাবেয়ীনের এত আছার ও ফতোয়া এল কোত্থেকে?! (ফাতহুল কাদীর ২/২২৮; ফায়যুল বারী ৩/৫৯; ইলাউস সুনান ৯/১০৭; মাআরিফুস সুনান ৫/৩০৫-৩১০)

 

 

আধা সা কি আলাদা পরিমাপ নয়?

কেউ কেউ বলেন যে, সাহাবায়ে কেরাম আধা সা গম এক সা খেজুরের সমমূল্যের মনে করার কারণে তা দ্বারা ফিতরা আদায়ের ফতোয়া দিয়েছিলেন। আসলে তা ফিতরা আদায়ের আলাদা কোনো পরিমাপ নয়। বর্তমানে যেহেতু গমের দাম খেজুর ইত্যাদির চেয়ে কম তাই এখন আধা সা গম দ্বারা ফিতরা আদায় হবে না।

এই বক্তব্যও ঐ ভুল ধারণা থেকেই উৎসারিত যে, আধা সা গমের পরিমাপ মারফূ হাদীসে নেই। অথচ ইতিপূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, সায়ের মতো আধা সাও একটি আলাদা পরিমাপ হিসেবে মারফূ হাদীসে বিদ্যমান আছে। খোলাফায়ে রাশেদীন ও খায়রুল কুরূনের ফকীহগণের ফতোয়াও তা-ই।

 

দ্বিতীয় কথা এই যে, সাহাবায়ে কেরামের যুগেই যখন গমের দাম কমে গেল তখনও তাঁরা আধা সা গমই আদায় করেছেন। ঐ সময় হযরত আয়েশা রা. এবং হযরত আলী রা. পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেহেতু দাম কমে গেছে তাই এখন গমও এক সা-ই আদায় কর। উম্মুল মু’মিনীনের বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-

 

أحب إلي أن إذا وسع الله على الناس أن يتموا صاعا من قمح عن كل إنسان.

আমার নিকট পছন্দনীয় হল, আল্লাহ তাআলা যখন মানুষকে প্রাচুর্য দিয়েছেন তখন তারা মাথাপিছু এক সা গম সদকায়ে ফিতর আদায় করুক। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৫০৫; কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মদীনাহ ১/৩৩৬)

 

হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, হযরত আলী রা. এসে যখন মূল্য সস্তা দেখলেন তখন বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে প্রাচুর্য দান করেছেন। সুতরাং তোমরা যদি সব জিনিসই এক সা করে আদায় করতে (তবে তা উত্তম হত।)

فلما قدم علي ورأى رخص السعر قال : قد أوسع الله عليكم فلو جعلتموه صاعا من كل شيء.

 (সুনানে আবু দাউদ ১/২২৯)

বোঝা গেল যে, তাঁরা পুরা এক সা দেওয়া জরুরি বলতেন না, উৎসাহিত করতেন। আর এতে দোষের কিছু নেই। মানুষ নফল হিসেবে যত বেশি আদায় করতে চায় করতে পারে।

আর এখন তো এক সা গমের মূল্যও এক সা খেজুরের চেয়ে কম তাহলে কি এখন এই ফতোয়া দেওয়া হবে যে, এক সা গম দ্বারাও ফিতরা আদায় হবে না?

তৃতীয়ত ফিতরার ক্ষেত্রে মূল্যকে মানদন্ড ধরা হয়েছে-এ চিন্তা গোড়াতেই প্রশ্নবিদ্ধ।

মূল্যই যদি মূল মাপকাঠি হত তাহলে সায়ের বদলে ছামান বা মুদ্রাই পরিমাপ হিসেবে নির্ধারিত হত। কিন্তু শরীয়ত তা করেনি। ছামান বা মুদ্রার স্থলে كيل বা মাপের ভান্ডকে মানদন্ড ধরা হয়েছে। আর كيل (পাত্র) এর পরিমাণ নির্দিষ্ট। তাতে কমবেশি হয় না। মূল্যই যদি প্রকৃত বিবেচ্য হত তাহলে নবী-যুগে এক সা খেজুরের স্থলে এক সা খেজুরের দাম দীনার-দিরহামে নির্ধারণ করে তাকে মাপকাঠি সাব্যস্ত করা হত। সেক্ষেত্রে কখনো কখনো দুই তিন সাও আদায় করতে হত।

চতুর্থত ফকীহদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, নবী-যুগে এক সা খেজুর, যব, কিসমিস বা পনিরের মূল্য ও আধা সা গমের মূল্য সমান ছিল না। যথেষ্ট তফাত ছিল। সুতরাং সদকায়ে ফিতরের উক্ত পরিমাপের ক্ষেত্রে মূল্যকেই প্রকৃত বিবেচ্য সাব্যস্ত করা খুবই আপত্তিকর। (দেখুন : শরহু মুশকিলিল আছার, ইমাম তহাবী ৯/৩৫; আততাজরীদ, ইমাম কুদূরী ৩/১৪১৫)

পঞ্চমত কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট কোনো বিধানে তত্ত্ব ও তাৎপর্যের ভিত্তিতে রদবদল করার কোনো অবকাশ নেই। এ কারণে মূল্যের ওঠানামার ভিত্তিতে শরীয়তের একটি মাপকাঠিকে অকার্যকর করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

মাসলাহাত ও উপযোগের ভিত্তিতে মানসুস আলাইহি তথা কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট বিধানে রদবদল সম্পূর্ণ অবৈধ

শরীয়তের আহকাম ও বিধিবিধানের হিকমত ও মাসলাহাত তথা বিভিন্ন উপকার-উপযোগ সম্পর্কে যে শাস্ত্রে আলোচনা করা হয় তাকে ‘ইলমু আসরারিশ শরীয়া’ বলে। এটি অতি সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল শাস্ত্র। এ প্রসঙ্গে একটি স্বীকৃত কথা এই যে, শরীয়তের অধিকাংশ বিধানের উপযোগ কুরআন-সুন্নাহয় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি; বরং এ বিষয়ের মনীষী লেখকরা নিজ নিজ প্রজ্ঞা অনুযায়ী ঐসব মাসলাহাত আলোচনা করেছেন। সুতরাং তাদের আলোচনা সম্পূর্ণ ভুলত্রুটিমুক্ত বা শরীয়তের সকল মাসলাহাত তারা আলোচনা করে ফেলেছেন-এমনটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত বিষয় এই যে, আল্লাহ প্রদত্ত আহকামের পিছনে হাজারো মাসলাহাত ও উপযোগিতা থাকতে পারে, যা পুরোপুরি মানুষের বুঝে আসাও জরুরি নয়।

এরপর কোনো বিধানের হিকমত ও মাসলাহাত যদি সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে জানাও যায় তারপরও মূলনীতি এই যে, এসব হিকমত ও মাসলাহাত আহকাম ও বিধানের মানদন্ড নয়। বিধানের মানদন্ড হচ্ছে দলিল। সুতরাং শরীয়তের দলিল থেকেই শরীয়তের বিধান আহরিত হবে, মাসলাহাত বা উপযোগ থেকে নয়।

আর এ সকল মাসলাহাতের কারণে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত বিধানকে পরিবর্তন করা বা কুরআন-হাদীসে উল্লেখিত শরয়ী পরিমাপের মধ্যে রদবদল করা তো সম্পূর্ণ অবৈধ।

ইলমু আসরারিশ শরীয়াহ বিষয়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কিতাব হল শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহ. (মৃত্যু : ১১৭৬ হি.) কৃত ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’। গ্রন্থকার তার গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় একথাগুলো পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন। তাঁর আরবী আলোচনার অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছি।

نعم كما أوجبت السنة هذه، وانعقد عليها الإجماع، فقد أوجبت أيضا : أن نزول القضاء بالإيجاب والتحريم سبب عظيم في نفسه، مع قطع النظر عن تلك المصالح. لإثابة المطيع وعقاب العاصي، وأنه ليس الأمر على ما ظُنَّ من أن حسن الأعمال وقبحها، بمعنى استحتقاق العامل الثواب والعذاب، عقليان من كل وجه ... كيف ولو كان كذلك لجاز إفطار المقيم الذي يتعانى كتعاني المسافر، لمكان الحرح المبني عليه الرخص. ولميجز إفطار المسافر المترفّ. وكذلك سائر الحدود التى حدها الشرع.

 

সামনে গিয়ে আরো বলেন, আর হাদীস শরীফ একথাও প্রমাণ করেছে যে, শরীয়তের আহকাম পালনের জন্য যখন তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয় তখন মাসলাহাত জানার অপেক্ষায় থাকা বৈধ নয়।

কারণ বহু মানুষ নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি দ্বারা শরীয়তের বহু মাসলাহাত বুঝতে অক্ষম আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আমাদের বিদ্যা ও বুদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ আশ্রয়। এ কারণে এ শাস্ত্রের বিষয়ে অযোগ্য লোকের প্রতি কখনো ‘উদারতা’ প্রদর্শন করা হয়নি। এখানেও ঐ সকল শর্ত প্রযোজ্য, যা আল্লাহর কালামের তাফসীরের ক্ষেত্রে রয়েছে। এবং আছার ও সুনানের সহায়তা ছাড়া নিছক যুক্তির আলোকে এ শাস্ত্রে অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম।

 

কিতাবের প্রথমাংশের শেষে باب الفرق بين المصالح والشرائع শিরোনামে একটি আলাদ পরিচ্ছেদে তিনি এ বিষয়টি আরো বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। সেখানে পরিষ্কার লিখেছেন যে, সকল ফকীহ এ বিষয়ে একমত যে, মাসলাহাত ও উপযোগের ভিত্তিতে কিয়াস করা সহীহ নয়।

তালিবুল ইলমগণ শাহ সাহেব রাহ.-এর এই ইলমী আলোচনাগুলো হযরত মাওলানা মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম-এর ‘রাহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআহ’ থেকে (১/১০৮-১১১, ২/৪৫৩-৪৬৭) পাঠ করতে পারেন।

যাইহোক, ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, এই নীতিটি একটি সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি। শাহ ছাহেব রাহ.ও বলেছেন, এই নীতি হাদীস ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরাম একমত।

সারকথা সদকাতুল ফিতরের পরিমাণের ক্ষেত্রে একটি মুজতাহাদ ফীহ হিকমতের আশ্রয় নিয়ে কিয়াস ও ইজতিহাদের অবকাশ নেই। আর এর  পরিমাণ সংক্রান্ত হাদীসের স্পষ্ট কোনো বক্তব্যকে অকার্যকর করে দেওয়া যে  সম্পূর্ণ অবৈধ তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

উপকার-উপযোগকে আহকাম ও বিধানের বুনিয়াদ বানানো সম্ভবও নয়

শরীয়তের দলিল-প্রমাণ হচ্ছে আহকাম ও বিধানের বুনিয়াদ। আর উপকার-উপযোগ জানার সুফল হচ্ছে, এর দ্বারা চিন্তাশীল মানুষের ঈমান মজবুত হয় এবং অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি হয়। তবে, আগেই বলা হয়েছে যে, শরয়ী বিধানের কার্যকারণকে আহকামের ভিত্তি বানানোর কোনো অবকাশ নেই। আর বাস্তবে তা সম্ভবও নয়। কারণ সেক্ষেত্রে শরীয়ত বা শরীয়তের হুকুম থাকবে না, স্বেচ্ছাচারিতা ও মনগড়া মতামতে পর্যবসিত হবে।

উদাহরণস্বরূপ যে পরিমাণ সদকায়ে ফিতর আদায় করা আবশ্যকীয় করে দেওয়া হয়েছে তার হিকমত ও বাহ্যিক উদ্দেশ্য সম্পর্কেই চিন্তা করা যায়। কিছু দুর্বল বর্ণনার উপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে যে, এই বিধানের হিকমত ও উদ্দেশ্য হল, ঈদের দিন গরীব-মিসকীনদের খাবারের ব্যবস্থা করা।  উক্ত বর্ণনার শব্দ  طعمة للمساكين  দ্রষ্টব্য।

২. ঐ দিন তাদেরকে দুয়ারে দুয়ারে হাত পাতা থেকে রক্ষা করা। অন্তত তাদের ঐ দিনের প্রয়োজন পূরণ করা। একটি রেওয়ায়েতের শব্দ-

 

 

أغنوهم عن المسألة في هذا اليوم

 

এখন যদি কেউ এই হিকমত ও উদ্দেশ্যকে বুনিয়াদ বানিয়ে বলতে থাকে, আমাদের আসল খাবার যেহেতু চাল তাই খেজুর বা গমের স্থলে চাল দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে। আর তা হতে হবে এক সা। তাহলে প্রশ্ন হবে যে, খেজুর ও রুটি তো তরকারি ছাড়াও খাওয়া যায়, কিন্তু ভাত তো তরকারি ছাড়া খাওয়া যায় না। কাজেই এক সা চালের সাথে পরিমাণ মতো তরকারিরও ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা মাছের তরকারি হলে উত্তম হয়।

এছাড়া অনেক গরীব লোকের পরিবার বড়। পরিবারের সকল সদস্যের দু’ বেলা বা তিন বেলা খাবারের জন্য এক সা চাল যথেষ্ট নয়; বরং দুই, তিন সা প্রয়োজন। অতএব সামর্থ্যবানদের উপর ওয়াজিব, যে সকল গরীব পরিবারের নিকট ঈদের দিনের খাবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য পৌঁছেনি তাদের জন্য অতিরিক্ত চালের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের পক্ষে যদি এক সা রও বেশি চাল দিতে হয়  তা তাদেরকে দিতে হবে। কথা এখানেই শেষ নয়। ঐ দিন গরীবদেরকে অমুখাপেক্ষী করাই যদি ফিতরার বিধানের মূল নিয়ন্ত্রক হয় তবে তো বর্তমান সমাজের রেওয়াজ অনুযায়ী গরীব-পরিবারের নতুন কাপড়, নতুন জুতা ও বিবিধ প্রকারের মিষ্টান্তের ব্যবস্থাও ফিতরার মাধ্যমে করত হবে। এভাবে আরো নতুন নতুন প্রস্তাব আসতে পারে। তো আসল কথা এই যে, হিকমত ও উপকারিতাকে বিধানের নিয়ন্ত্রক বানানো অসম্ভব।

গত রমযানে (১৪৩১ হি.) দৈনিক নয়া দিগন্তে সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে জনৈক প্রফেসরের একটি প্রবন্ধ নজরে পড়েছিল। তাতে তিনি লিখেছেন-‘সদকাহর ক্ষেত্রে ইসলামের মূল স্পিরিট হল গরীবদের স্বার্থ সংরক্ষণ। এর পাশাপাশি আদায়কারীর সামর্থ্যকেও বিবেচনায় রাখা বাঞ্ছনীয়। অতএব এই দুই মূলনীতির আলোকে আমরা বলতে পারি, আদায়কারীর সামর্থ্যকে বিবেচনায় রেখে এবং গরীবদের স্বার্থ সংরক্ষণের খাতিরে সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নরূপ পলিসি গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।

ক. ধনীদের জন্য এসব বস্ত্তর মধ্যে যার মূল্য সর্বোচ্চ তার এক সা পরিমাণ। যেমন কিসমিস।

খ. উচ্চ মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে যে বস্ত্তর মূল্য মাঝামাঝি তার এক সা পরিমাণ। যেমন-খেজুর।

গ. নিম্ন মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে যে বস্ত্তর মূল্য সর্বনিম্ন তার এক সা পরিমাণ। যেমন-গম বা যব হবে সদকাতুল ফিতরের পরিমাণের ভিত্তি। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, শুক্রবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ ঈ., ২৩ রমযান, ১৪৩১ হি.)

এ প্রস্তাব নিছক প্রস্তাবমাত্র। একে শরীয়তের বিধান বানিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যথায় নতুন নতুন ‘শরীয়ত’ অস্তিত্ব লাভ করবে। কারণ ‘যুক্তি’র তো অভাব নেই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ যুক্তিতে নতুন নতুন প্রস্তাব পেশ করতে থাকবে। তো কুরআন-হাদীসের বিধানের বদলে এমন এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সূচনা ঘটবে, যার রাশ টেনে ধরার কোনো উপায় থাকবে না।

 

চাল দ্বারা যদি ফিতরা দেওয়া হয়

চাল দ্বারা ফিতরা আদায়ের কথা হাদীস শরীফে নেই। এজন্য চালকে মানদন্ড ধরে ফিতরা আদায় জরুরি বলার অবকাশই নেই। তবে কেউ যদি ফিতরায় চাল দিতে চায় তাহলে তাকে অন্তত এ পরিমাণ চাল দিতে হবে, যার মূল্য আধা সা গম কিংবা এক সা খেজুর, কিসমিস, পনির বা যবের সমপরিমাণ হয়, এরচেয়ে বেশি চাল দিলে তা নফল দান বলে গণ্য হবে।

এই কথা ঠিক নয় যে, আমাদের সাধারণ খাবার যেহেতু চাল আর ফিতরের পরিমাণ হল এক সা খাদ্যবস্ত্ত তাই চাল ও এক সা-ই দিতে হবে। কারণ কোনো সহীহ হাদীসে বলা হয়নি সকল অঞ্চলের লোকদের তাদের নিজ নিজ সাধারণ খাবার দ্বারা ফিতরা আদায় করতে হবে। তেমনি একথাও কোনো সহীহ হাদীসে নেই যে, প্রত্যেক খাদ্যবস্ত্ততে সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ এক সা। বরং একাধিক সহীহ হাদীসে আছে, গম দ্বারা ফিতরা আদায় করলে তার পরিমাণ হল আধা সা। এজন্য যে কোনো অঞ্চলের, যেকোনো ব্যক্তি আধা সা গম বা তার মূল্য প্রদান করলে তার ফিতরা আদায় হবে।

কেউ যদি শরীয়তের দলিল-প্রমাণ ছাড়া শুধু যুক্তির ভিত্তিতে চালের ক্ষেত্রেও এক সা দেওয়াকে জরুরি বলে সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, হাদীসের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে বাতিল করে আধা সা গম ফিতরা আদায় থেকে বাধা দেওয়ার অধিকার সে কোথায় পেল? আর তার ঐ দলিলহীন যুক্তির-ই বা কী মূল্য?

এরপর যদি কোনো সময় এক সা চালের মূল্য আধা সা গমের বরাবর বা এর চেয়ে কম হয় তখন তাদের ফতোয়া কী হবে?

 

 

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতি

পরিশেষে আমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীলদের কাছে নিবেদন করতে চাই যে, এ প্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং এর নামের সাথে ‘ইসলামিক’ শব্দটি যুক্ত আছে। এদেশের মুসলমানদের অনেক আশা-ভরসা এ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িয়ে আছে। সঙ্গত কারণেই এ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের উপর দায়িত্ব আরোপিত হয় যে, এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে কোনো সিদ্ধান্ত প্রচার করার আগে তারা অন্তত দুটি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এং নিশ্চিত হবেন : এক. সিদ্ধান্তটি কুরআন ও সুন্নাহর কোনো বিধান বা কোনো ইজমাঈ বিধানের পরিপন্থী নয়। দুই. সিদ্ধান্তটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য বিনা কারণে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী নয়।

 

এ ভূ-খন্ডে যখন থেকে ইসলামের আগমন, তখন থেকেই এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধিবাসী হানাফী মাযহাব অনুসারে আমল করে আসছে। স্বয়ং ফাউন্ডেশন ফিকহে হানাফী মোতাবেক ফতোয়া ও মাসায়েল এবং সেগুলোর দলিল-প্রমাণের উপর বহু গ্রন্থ ও বইপত্র প্রকাশ করেছে। তাই ফাউন্ডেশনের জন্য

ফিকহে হানাফীর কোনো দলীলভিত্তিক মাসআলার পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আদৌ সমীচীন নয়। ভবিষ্যতেও এদেশের মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশলীদের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেওয়া আবশ্যক।

শরীয়তের সীমার ভেতরে থেকে শরীয়তের হিকমত ও মাসলাহাতের ভিত্তিতে ফাউন্ডেশন কোনো পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যমানা থেকে চলে আসা উম্মতের অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা দ্বারা প্রমাণিত কোনো মাসআলায় কোনোরূপ পরিবর্তন সাধনের অধিকার তার নেই। এদেশের মুসলমান কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী এবং ইজতিহাদী মাসআলাসমূহে ফিকহে হানাফী মোতাবেক আমলকারী। কারো নিজস্ব ইজতিহাদ বা ব্যক্তিগত মতামত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না আর তা হওয়া জরুরিও নয়। এ কারণে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা এড়ানোর স্বার্থেই ফাউন্ডেশনের কর্তব্য, সর্বসম্মত নীতি থেকে বিচ্যুত না হওয়া এবং সকল সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা।

আল্লাহ তাআলা সর্বদা এ প্রতিষ্ঠানটিকে ইসলাম ও মুসলমানদের উপকারে নিয়োজিত রাখুন। আমীন ইয়া আরহামার রাহিমীন।

মাওলানা মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ

১৬ রজব, ১৪৩২ হি.।

 


17
প্রশ্ন : শবে বরাত সম্পর্কে কিছু বিষয় জানতে চাই। আজকাল কারো কারো মুখে শোনা যায় যে, শবে বরাত বলতে কিছু নেই, এ রাতের ফযীলত বিষয়ে যত রেওয়ায়েত আছে সব মওযূ বা যয়ীফ। তাই শবে বরাতকে ফযীলতপূর্ণ রাত মনে করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা জায়েয নয়। তাদের কথা কি ঠিক? যদি ঠিক না হয় তাহলে হাদীস ও সুন্নাহর আলোকে শবে বরাতের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে জানতে চাই। উত্তর : শবে বরাত অর্থাৎ পনেরো শা’বানের রজনীর ফযীলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস রয়েছে। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, (তরজমা) আল্লাহ তাআলা অর্ধ শা’বানের রাতে (শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।-সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৫৬৬৫ শবে বরাতের গুরুত্ব ও ফযীলত প্রমাণিত হওয়ার জন্য এই একটি হাদীসই যথেষ্ট। তবুও হাদীসের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে এ বিষয়ক আরো হাদীসউল্লেখ করা সম্ভব। নিম্নে আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা হল। হযরত আ’লা ইবনুল হারিছ রাহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সেজদা করলেন যে, আমার আশঙ্কা হল, তাঁর হয়তো ইনতেকাল হয়ে গেছে। আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বলেছেন, ও হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন, এটা হল অর্ধ শা’বানের রাত। (শা’বানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ শা’বানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি প্রদান করেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস'াতেই।-শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৩/৩৮২,৩৮৩ উপরোক্ত হাদীস থেকে এ রাতের ফযীলত যেমন জানা যায় তদ্রূপ এ রাতের আমল কেমন হওয়া উচিত তাও বোঝা যায়। অর্থাৎ দীর্ঘ নামায পড়া, সেজদা দীর্ঘ হওয়া, দুআ ও ইসে-গফার করা ইত্যাদি। মোটকথা, সহীহ হাদীস থাকা অবস'ায় শবে বরাতের ফযীলত ও গুরুত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা এবং এ সংক্রান- সকল রেওয়ায়েতকে মওযূ বা যয়ীফ বলা যে কত বড় অন্যায়, তা তো বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন : অনেকে শবে বরাতের পরদিন রোযা রাখেন। এ বিষয়ে শরীয়তের হুকুম কী জানতে চাই। উত্তর : শা’বানের এক তারিখ থেকে সাতাইশ তারিখ পর্যন- রোযা রাখার বিশেষ ফযীলতের কথা হাদীস শরীফে আছে। তাছাড়া আইয়ামে বীয তথা প্রতি মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোযা রাখার ব্যাপারে হাদীস শরীফে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেই সাথে যয়ীফ সনদে বর্ণিত একটি হাদীসে বিশেষভাবে পনেরো তারিখের রোযা রাখার নির্দেশনাও পাওয়া যায়। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (তরজমা) পনেরো শা’বানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং পরদিন রোযা রাখ।-সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ১৩৮৪ আগেই বলা হয়েছে যে, যেহেতু বিভিন্ন সহীহ হাদীসে শা’বান মাসের রোযার সাধারণ ফযীলত এবং আইয়ামে বীযের রোযার ফযীলত উল্লেখিত হয়েছে পাশাপাশি যয়ীফ সনদে উপরোক্ত হাদীসটিও বিদ্যমান রয়েছে তাই কেউ যদি এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখে পনেরো শা’বানের রোযা রাখেন তাহলে তিনি ছওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ। প্রশ্ন : শবে বরাত ও শবে কদর উপলক্ষে বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায আছে কি না-এ প্রশ্ন অনেকে করে থাকেন। এক ধরনের চটি বই পুসি-কায় বিভিন্ন নিয়মের কথা লেখাও থাকে। বিশেষ বিশেষ সূরা দিয়ে নামায পড়া বা নির্ধারিত রাকাত নামায বিশেষ সূরা দ্বারা আদায় করা ইত্যাদি। প্রশ্ন এই যে, হাদীস শরীফে এ দুই রাতে বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায আছে কি? থাকলে তা জানতে চাই। তদ্রূপ কেউ কেউ এ রাতগুলোতে জামাতের সঙ্গে নফল নামায পড়তে চায়। এ ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী? উত্তর : এ দু’রাতের জন্য বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায নেই। সব সময় যেভাবে নামায পড়া হয় সেভাবেই পড়বে অর্থাৎ দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব হয় আদায় করবে এবং যে সূরা দিয়ে সম্ভব হয় পড়বে। তদ্রূপ অন্যান্য আমলেরও বিশেষ কোনো পন'া নেই। কুরআন তেলাওয়াত, যিকির-আযকার, দুআ-ইসে-গফার ইত্যাদি নেক আমল যে পরিমাণ সম্ভব হয় আদায় করবে। তবে নফল নামায দীর্ঘ করা এবং সিজদায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা উচিত, যা ইতিপূর্বে উল্লেখিত হাদীস শরীফ থেকে জানা গেছে। বিভিন্ন বই-পুস-কে নামাযের যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানূন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকাত হতে হবে, প্রতি রাকাতে এই এই সূরা এতবার পড়তে হবে-এগুলো ঠিক নয়। হাদীস শরীফে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই, এগুলো মানুষের মনগড়া পন'া। বলাবাহুল্য যে, যে কোনো বই-পুসি-কায় কোনো কিছু লিখিত থাকলেই তা বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিজ্ঞ আলিমদের নিকট থেকে জেনে আমল করা উচিত। শবে বরাত ও শবে কদরের নফল আমলসমূহ, বিশুদ্ধ মতানুসারে একাকী করণীয়। ফরয নামায তো অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই আর সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না।-ইকতিযাউস সিরাতিল মুস-াকীম ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ পৃ. ২১৯ তবে কোনো আহ্বান ও ঘোষণা ছাড়া এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায় তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না। প্রশ্ন : শবে বরাত ও শবে কদর উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা হয়, পটকা ফুটানো হয় ও আতশবাজি করা হয়। সেই সাথে হালুয়া-রুটি, খিচুড়ি ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করা হয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর হুকুম কী জানতে চাই। উত্তর : এগুলো কিছু ভুল রেওয়াজ, যা পরিহার করা আবশ্যক। আলোকসজ্জা বা আতশবাজিতে অপচয়ের পাশাপাশি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণও রয়েছে। তাই তা সর্বোতভাবে পরিত্যাজ্য। আর হালুয়া-রুটি বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বানানো,আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করা তদ্রূপ খিচুড়ি রান্না করা এবং গরীব-মিসকীনদের মাঝে বন্টন করা সাধারণ অবস'ায় জায়েয ও ভালো কাজ হলেও এটাকে এ রাতের বিশেষ আমল মনে করা এবং এসবের পিছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা-ইসে-গফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়া শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। মূল কথা এই যে, এই রাতগুলো উৎসবের রাত নয়, ইবাদত-বন্দেগী ও তওবা- ইসে-গফারের রাত। তাই রসম-রেওয়াজের অনুগামী হয়ে এ রাতে উপরোক্ত কাজকর্মে লিপ্ত হওয়া নিজেকে ক্ষতিগ্রস- করা ছাড়া আর কিছুই নয়।-ইকতিযাউস সিরাতিল মুস-াকীম ২/৬৩২; আলমাদখাল লি ইবনিল হাজ্ব ১/২৯৯ ও ১/৩০৬, ৩০৭; তানকীহুল হামীদিয়াহ ২/৩৫৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/২৮৯ প্রশ্ন : সামনে রমযান মাস। এ মাসের পরিপূর্ণ বরকত, রহমত ও ফযীলত কীভাবে হাসিল করা যাবে সে ব্যাপারে জানতে চাই। উত্তর : মাহে রমযান বছরের বাকি এগারো মাস অপেক্ষা অধিক মর্যাদাশীল ও বরকতপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে ইরশাদ করেন, (তরজমা) ‘রমযান মাসই হল সে মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত।-সূরা বাকারা : ১৮৫ হাদীস শরীফে এসেছে, যখন রমযানের আগমন হয় তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। -সহীহ বুখারী হাদীস : ১৮৯৯ অন্য হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যহ ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।- মুসনাদে আহমদ হাদীস ২১৬৯৮ তাই এ মাস হচ্ছে হেদায়েত লাভের মাস, আল্লাহ তাআলার রহমত লাভের মাস এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত হাসিলের মাস। সুতরাং বেশি বেশি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা এবং তাওবা-ইসে-গফারের মাধ্যমে মুক্তির সনদ লাভে সচেষ্ট হওয়া কর্তব্য। এ মাসের রোযাকে আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন। তাই প্রত্যেক সুস' ও বালিগ মুসলিম নর-নারীর জন্য রোযা রাখা অপরিহার্য। বলাবাহুল্য যে, ফরয ইবাদতের মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহ তাআলার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জন করে। রমযানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে তারাবী। রমযানের বরকতময় রজনীতে যত্নের সঙ্গে বিশ রাকাত তারাবীর নামায আদায়ে যত্নবান হওয়া উচিত। রমযান মাস হচ্ছে কুরআন নাযিলের মাস। এ মাসে লওহে মাহফূয থেকে প্রথম আসমানে কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে তাই কুরআন মজীদ শ্রবণের জন্য এবং এই পুণ্যময় রজনীতে আল্লাহর সান্নিধ্যে দণ্ডায়মান হওয়ার জন্য তারাবী নামাযের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া কর্তব্য। অন্য সময়ও ব্যক্তিগতভাবে অধিক পরিমাণে কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করা উচিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামায। এ মাসে যেহেতু সাহরী খাওয়ার সুবাদে সুবহে সাদিকের পূর্বেই সবাইকে উঠতে হয় তাই এ সুযোগে তাহাজ্জুদের ইহতিমাম করা সহজ। হাদীস শরীফে তাহাজ্জুদের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। তদ্রূপ সাধ্যমতো দান-সদকা করা উচিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে অনেক বেশি দান-সদকা করতেন। এসব নেক আমলের পাশাপাশি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাও অপরিহার্য। রমযান মাস হচ্ছে তাকওয়া ও পরহেযগারী অর্জনের মাস। আল্লাহ তাআলা রোযাকে ফরযই করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য। হাদীস শরীফ থেকে জানা যায় যে, গুনাহ থেকে সর্বোতভাবে বেঁচে থাকা ছাড়া রোযা পূর্ণাঙ্গ হয় না। তাই রোযাকে নিখুঁতভাবে আদায়ের উদ্দেশ্যে মুমিন যখন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে তখন আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে তাকে তাকওয়া ও পরহেযগারীর শক্তি দান করেন। এজন্য সকল গুনাহ থেকে, বিশেষ করে গীবত, শেকায়েত, কুদৃষ্টি, কুচিন-া, হারাম পানাহার ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের একান- কর্তব্য। প্রশ্ন : তারাবীর সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন যে, এই নামায আট রাকাত, বিশ রাকাত তারাবীর কোনো প্রমাণ নেই। জানতে চাই, তাদের দাবির সত্যতা কতটুকু? উত্তর : এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যমানা থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন এবং পরবর্তী কোনো যুগেই তারাবীর নামায বিশ রাকাতের কম ছিল না। এ বিষয়ে আলকাউসারের তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম-এর একটি বিস-ারিত ও প্রামাণিক প্রবন্ধ আলকাউসার অক্টোবর-নভেম্বর ২০০৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। পরে তা ‘মাকতাবাতুল আশরাফ’ থেকে পুসি-কা আকারেও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে এ বিষয়ে দলীল-প্রমাণসহ বিস-ারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং বিশ রাকাত তারাবীর অস্বীকারকারীদের বিভ্রানি- ও প্রপাগাণ্ডার জবাব দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী পাঠক সেটি পড়ে নিতে পারেন। উল্লেখ্য, তারাবীর নামাযে বেশ কিছু ত্রুটি অনেক মসজিদেই দেখা যায়। এগুলো থেকেও বেঁচে থাকা একান- জরুরি। যেমন-নামায তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য রুকু-সেজদা, কওমা-জলসা ইত্যাদিতে তাড়াহুড়া করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ই’তিদালে আরকান-এর ওয়াজিব পর্যন- তরক হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে যে, সকল নামাযে, তা ফরয হোক বা নফল, রুকু-সেজদা, কওমা-জলসা ইত্যাদি শান-ভাবে আদায় করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে সচেতন হওয়া কর্তব্য। তদ্রূপ এত তাড়াতাড়ি কুরআন তেলাওয়াত করা হয়ে থাকে যে, দ্রুততার কারণে শব্দাবলিও ঠিকমতো বোঝা যায় না। এত দ্রুত না পড়ে তারতীলের সঙ্গে কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করতে হবে। প্রশ্ন : আমাদের কিছু ভাই বলে থাকেন যে, আমরা যে পদ্ধতিতে ঈদের নামায পড়ে থাকি তা সুন্নাহসম্মত নয়। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হল বারো তাকবীরের সঙ্গে নামায আদায় করা। তাদের কথা কতটুকু ঠিক? আর আমরা যে পদ্ধতিতে নামায আদায় করি তার দলীল কী? উত্তর : ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপে ওহীর উপর নির্ভরশীল। তাই এ ধরনের বিষয়ে বুনিয়াদ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে ঈদের নামাযের নিয়ম-পদ্ধতি শিখিয়েছেন এবং তাঁরা পরবর্তী লোকদেরকে সেই নিয়মই শিখিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতি শিখিয়েছেন তার সবগুলোই সঠিক ও জায়েয। ঈদের তাকবীর বলার ক্ষেত্রেও একাধিক নিয়ম পাওয়া যায়, যার সবগুলোই সঠিক। এক্ষেত্রে বারো তাকবীরের নিয়ম যেমন হাদীসে পাওয়া যায় তেমনি চার তাকবীরের নিয়মও হাদীস শরীফে রয়েছে। তাই বারো তাকবীরের পন'াও জায়েয পন'া। কোনো দেশে বা কোনো ঈদগাহে যদি এই পদ্ধতিতে নামায হয় তাহলে আপত্তি করার কিছু নেই। ঝগড়া-বিবাদের তো প্রশ্নই ওঠে না। তদ্রূপ যে পদ্ধতি অনুযায়ী আমরা নামায পড়ে থাকি সেই পদ্ধতিও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং একাধিক জলীলুল কদর সাহাবী এই পদ্ধতির উপর আমল করেছেন। অতএব এ বিষয়ে কোনো বিভ্রানি- ছড়ানো সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। নিম্নে এ পদ্ধতির দু’টি দলীল উল্লেখ করা হল। প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আবু আবদুর রহমান কাসিম বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, ‘‘নবীজী ঈদের দিন আমাদের নামায পড়ালেন এবং চারটি করে তাকবীর দিলেন। নামায শেষে আমাদের দিকে তাকিয়ে ইরশাদ করলেন, ‘ভুলো না যেন, তারপর হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বন্ধ করে বাকি চার আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, জানাযার তাকবীরের মতো (ঈদের নামাযেও চারটি করে তাকবীর হয়ে থাকে)’।’’-তহাবী ২/৩৭১ (কিতাবুু যিয়াদাত ১ম বাব) এই হাদীসটি সহীহ এবং এর সকল রাবী ‘ছিকাহ’ নির্ভরযোগ্য। ইমাম তহাবী রাহ.-এর ভাষ্য অনুযায়ী এদের বর্ণনাসমূহ সহীহ হওয়া বিশেষজ্ঞদের নিকট সর্বজনবিদিত। ইমাম তহাবী রাহ. একথাও বলেছেন যে, এই হাদীসের সনদ ওই সব হাদীসের সনদ থেকে অধিক সহীহ যেখানে বারো তাকবীরের কথা বলা হয়েছে। ২. (প্রসিদ্ধ তাবেয়ী ইমাম) মাকহুল বলেছেন, আমাকে আবু হুরায়রা রা.-এর সহচর আবু আয়েশা জানিয়েছেন যে, (কূফার আমীর) সাঈদ ইবনুল আছ হযরত আবু মুসা আশআরী রা. ও হযরত হুযায়ফা রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরে কয় তাকবীর দিতেন? আবু মুসা আশআরী রা. উত্তরে বললেন, জানাযার তাকবীরের সমসংখ্যক (চার) তাকবীর দিতেন। হুযায়ফা রা. (আবু মুসা রা.-এর সমর্থনে) বললেন, তিনি ঠিক বলেছেন। আবু মুসা রা. আরো বললেন, আমি যখন বসরার আমীর হিসাবে সেখানে ছিলাম তখন চার তাকবীর দিয়েছি। আবু আয়েশা বলেন, সাঈদ ইবনুল আছ-এর এই প্রশ্নের সময় আমি সেখানে উপসি'ত ছিলাম। তিনি আরো বলেন, আবু মুসা রা-এর বাক্য ‘জানাযার মতো চার তাকবীর’ এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে।-সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ১১৫০; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা ২/৭৮, কিতাবু সালাতিল ঈদাইন, বাব নং ১২; মুসনাদে আহমদ ৪/৪১৬ সনদের বিবেচনায় এই হাদীসটি হাসান এবং হাসান হাদীস গ্রহণযোগ্য হাদীসেরই একটি প্রকার। বিস-ারিত আলোচনার জন্য আলকাউসার অক্টোবর ও নভেম্বর ২০০৫ সংখ্যা অথবা মাকতাবাতুল আশরাফ থেকে প্রকাশিত পুসি-কা ‘সহীহ হাদীসের আলোকে তারাবীর রাকাআত সংখ্যা ও সহীহ হাদীসের আলোকে ঈদের নামায’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

18
الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد

আমরা এখন রজব মাস কাটাচ্ছি। এ মাস ‘আরবাআতুন হুরুম’ বা সম্মানিত চার মাসের শেষ মাস। এরপর আসছে শাবান। শাবান মাস যেন রমযান মাসের ‘সুবহে সাদিক’। এরপর রমযানুল মুবারক। রমযান শেষ হলেই শুরু হবে শাওয়াল, যা হজ্বের মাসসমূহের প্রথম মাস। আর এ মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর। পরবর্তী মাস যুলকা‘দা, যা আশহুরে হুরুমের প্রথম মাস। এরপর যুলহাজ্ব। হজ্ব ও কুরবানীর মাস, আশহুরে হুরুমের দ্বিতীয় মাস এবং ফযীলতপূর্ণ দশ দিন ও দশ রাতের মাস। যুলহাজ্ব মাস শেষ হলে একটি চান্দ্রবর্ষের সমাপ্তি ঘটে, কিন্তু খায়ের ও বরকতের সমাপ্তি ঘটে না। কারণ এর পরবর্তী মাস হল, মুহাররমুল হারাম। যে মাসকে হাদীস শরীফে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে। এটি চান্দ্র বছরের প্রথম মাস, আশহুরে হুরুম বা সম্মানিত চার মাসের তৃতীয় মাস এবং আশুরা’র মাস।

মোটকথা, আমাদের সামনে এখন ফযীলতপূর্ণ মাস ও দিবস-রজনীর এক নূরানী ধারা এবং খায়ের ও বরকতের এক আশ্চর্য বসন্তকাল। কিন্তু এগুলোর কদর বোঝার মত কি কেউ আছি? আমাদের বদ কিসমত যে, আমরা ফযীলতপূর্ণ সময়গুলো গাফলত ও অলসতায় পার করে দিই। নির্বিকারচিত্তে সময় নষ্ট করতে থাকি। অথচ শুধু ফযীলতপূর্ণ সময় নয়, অন্যান্য সময়ও আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিআমত। আমি যদি কদর করতে পারি তাহলে প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি মাস, প্রতিটি বছর আমার জন্য খায়ের ও বরকত বয়ে আনবে।

ہر شب  شب  قدر  است  اگر  قدر  میداني

‘সব রাতই কদরের রাত, যদি কদর করতে পারো’। কিন্তু আমাদের অবস্থা হল, সাধারণ সময় তো দূরের কথা, বিশেষ সময় এমনকি বিশেষতর সময়েরও আমরা কদর করি না।

সময়ের কদর হবে কীভাবে?

সময়ের কদর করার বিভিন্ন দিক আছে। যেমন-

১. আল্লাহর নাফরমানির কাজে সময় ব্যয় না করা

আল্লাহর নাফরমানির কাজে সময় ব্যয় করা সময়ের সবচেয়ে বড় অবমূল্যায়ন। তাই কোনো সময় যেন আল্লাহর নাফরমানির কাজে ব্যয় না হয়- এ বিষয়ে সতর্ক থাকা ফরয। সময়ে গুনাহের কোনো হিসসা থাকতে পারে না। গুনাহ কোনোভাবেই সময়ের ব্যয়খাত হতে পারে না। আমরা যদি নাফরমানি থেকে সময়কে বাঁচাতে পারি তাহলে তা হবে সময়ের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন ও সর্বোচ্চ শোকরগোযারি।

২. নির্দিষ্ট সময়ে পালনীয় ইবাদতসমূহ গুরুত্ব ও যত্নসহকারে আদায় করা

যে সময়গুলোতে শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোনো ইবাদাত আছে সে সময়গুলোর সর্বোচ্চ মূল্যায়ন হল, নির্ধারিত ইবাদতগুলো গুরুত্ব সহকারে সুচারুরূপে পালন করা। সেগুলো যেন ছুটে না যায় তার প্রতি খেয়াল রাখা। ফরয ও ওয়াজিব তো কাযা হওয়ার প্রশ্নই আসে না সুন্নাতে মুয়াক্কাদার ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে, অলসতা-অবহেলার কারণে যেন সেগুলো ছুটে না যায়।  সুন্নাতে মুআক্কাদা’র অর্থ হল, তাকিদপূর্ণ সুন্নাত। সালাফের যুগে এটি ‘সুন্নাতে রাতেবাহ’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিল। এর অর্থ, এমন সুন্নাত যা নিয়মিত আদায় করা হয়, ছেড়ে দেওয়া হয় না।

আর যে সময়গুলোতে কোনো নফল ইবাদাত (নফল নামায, তিলাওয়াত, দুআ ও যিকির) পালনের প্রতি হাদীসে উৎসাহিত করা হয়েছে সেগুলোর কিছু কিছু নফল আমল নিজের দৈনিক আমলে শামিল করে নিব এবং এই নববী মুলনীতি خير العمل ما ديم عليه  (সর্বোত্তম আমল হল যা নিয়মিত করে যাওয়া হয়)-অনুসারে সেগুলো আমি নিজ ইচ্ছায় নিয়মিত পালন করে যাওয়ার চেষ্টা করব। সাময়িক কোনো প্রয়োজনে (দ্বীনী বা দুনিয়াবী) কিংবা অলসতার কারণে কখনও যদি এ ধরনের আমল ছুটে যায় তাহলে অন্য সময় কাযা করে নেওয়া ভালো। হাদীস শরীফে আছে-

مَنْ نَامَ عَنْ حِزْبِهِ، أَوْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ، فَقَرَأَهُ فِيمَا بَيْنَ صَلَاةِ الْفَجْرِ، وَصَلَاةِ الظُّهْرِ، كُتِبَ لَهُ كَأَنَّمَا قَرَأَهُ مِنَ اللَّيْلِ

 যে তার নির্ধারিত আমল বা তার কিছু অংশ আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়ে, এরপর ফজর-যোহরের মাঝে তা পড়ে নেয় তার সম্পর্কে লেখা হবে যেন সে রাতেই তা পড়েছে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৪৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৮১

৩. কর্তব্য কর্মে নির্ধারিত সময় ব্যয় করা

আমার দায়িত্বে যে কাজ ও যিম্মাদারি আছে এবং সেগুলো পালনের জন্য যে সময় নির্ধারিত আছে, যেমন আমি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করি বা বিনিময় নিয়ে খেদমত আঞ্জাম দেই এবং আমার দায়িত্ব পালনের সময় নির্ধারিত, এই নির্ধারিত সময়ে আমার ফরয হল, সে সময়ের নির্ধারিত জিম্মাদারী যথাযথ আদায় করা। এখানে নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করাই এই সময়ের মূল্যায়ন। অন্য কোনো কাজে এই সময় ব্যয় করা যেমন সময়ের অবমূল্যায়ন তেমনি তা আমানতেরও খেয়ানত।

৪. অতিরিক্ত সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক উপকারী কাজে ব্যয় করা

নির্দিষ্ট সময়ে পালনীয় ইবাদাত, নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও যিম্মাদারী, বিভিন্ন সময় আসা তাৎক্ষণিক পালনীয় কাজ ইত্যাদি সম্পন্ন করার পর হাতে যে সময় থাকে সাধারণত এই সময়গুলো বেশি অবহেলার শিকার হয়। তাই এ খেয়াল রাখা অতি জরুরি যে, এ সময়গুলো যেন অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক উপকারী কাজে ব্যয় হয়। প্রয়োজনে বড়দের সাথে, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। সৌভাগ্যবশত আমার জীবন যদি কোনো মুত্তাকী আলেমে দ্বীন বা মুত্তাবিয়ে সুন্নাত (সুন্নাহর অনুসারী) শায়খের নেগরানি ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় তাহলে তাঁর সাথেই এ ব্যাপারে পরামর্শ করে নেওয়া অধিক শ্রেয়।

৫. নেক কাজ ও সওয়াবের কাজ কী কী তা বিশদভাবে জানা

নেক কাজ ও সওয়াবের কাজের মাশাআল্লাহ আনেক শাখা। সেগুলো বিশদভাবে জানলে দেখা যাবে সব ধরনের মানুষের জন্য তার স্ব স্ব যোগ্যতা ও অবস্থা অনুসারে নেক কাজ করার ও সওয়াব অর্জন করার অনেক রাস্তা খোলা আছে।

দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, আমাদের সমাজে এমন একটি শ্রেণী আছে যাদের পরিচয় হল ‘অবসরপ্রাপ্ত’। এই অবসরকে যদি আল্লাহ তাআলার নিআমত মনে করা হত, অবসর সময়ের সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার হত এবং একে অপব্যবহার থেকে রক্ষা করা হত, তাহলে তা উম্মত ও মিল্লাতের জন্য অনেক কল্যাণ বয়ে আনত।

কিন্তু সাধারণত দেখা যায়, এর অপব্যবহারই বেশি হয়। আমার দৃষ্টিতে এর মারাত্মক অপব্যবহার এই যে, নিজের গণ্ডি ও সামর্থ্যরে বাইরের কাজে এই সময় ব্যয় করা। যেমন কোনো আলেম চিকিৎসা-শাস্ত্রের কয়েকটি বই পড়েই চিকিৎসালয় খুলে বসল অথবা কোনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সাহিত্যিক কিছু কিতাবের অনুবাদ পড়ে দ্বীনী বিষয়ে গবেষণা শুরু করল।

নেক কাজ, সওয়াবের কাজ, দ্বীনের খেদমতের বিভিন্ন পথ ও পন্থা সম্পর্কে বিশদ জানাশোনা না থাকার কারণে এবং পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার না করে এমনি এমনি ‘খাদেমে দ্বীন’ বনে যাওয়ার অভিলাষে গুটিকয়েক কাজ ও গুটিকয়েক পন্থাকেই সবাই নেক কাজ বা দ্বীনী কাজ মনে করে। তাই অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ অবহেলার শিকার। খিদমতে দ্বীনের বিস্তৃত অঙ্গনে শুধু শূন্যতা আর শূন্যতা। তবে দ্বীনের যা কিছু খেদমত হচ্ছে তার জন্য আল্লাহর দরবারে লাখো শোকর। আল্লাহর যেসকল বান্দা এতে কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরও শোকর আদায় করছি। আল্লাহ তাআলা সবাইকে আপন শান মোতাবেক জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন।

মোটকথা অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহারের জন্য (তা ছাড়া এমনিতেও বিষয়টি জরুরি) আমাদের নেক কাজের ক্ষেত্র, সওয়াব অর্জনের বিভিন্ন আমল এবং খেদমতে দ্বীনের নানা পথ ও পন্থা সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানার্জন করা জরুরি।

এখানে সহজে বোধগম্য একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি। কুরআনে কারীম তিলাওয়াত করা একটি ইবাদত। কুরআনে কারীমের মর্ম বোঝার চেষ্টা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। তিলাওয়াত করতে হলে তাজবীদসহ কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত শেখা জরুরি। আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছেন যিনি কুরআনের মর্ম বোঝার জন্য সময় বের করতে প্রস্তুত, কিন্তু কুরআনে কারীমের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখার জন্য সময় বের করতে প্রস্তুত নন।

আরেকটি উদাহরণ, এমন অনেক লোক আছেন, যাদের ধারণায় আলেমরা দৃষ্টি না দেওয়ার কারণে ইলমী কাজে অনেক শূন্যতা রয়েছে। তাই সেসব শূন্যতা পূরণের জন্য তারা উঠে পড়ে লাগেন এবং কাজ করার জন্য ময়দানে নেমে আসেন। অথচ তারা আরবী ভাষা শিখতে রাজী নন। যদিও শুধু ভাষা শিক্ষাও ‘আলেম’ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। নতুবা আরবীভাষী সবাই ‘আলেম’ হয়ে যেত।

তৃতীয় উদাহরণ, কিছু সূ² মাসআলায় অপরিণামদর্শী লোকেরা ঝগড়াঝাটি ও তর্ক-বিতর্কের পথ খুলে রেখেছে। কিছু লোক আছে যারা এ ধরনের মাসআলায় দখল দিতে গিয়ে প্রচুর সময় ব্যয় করেন তাদেরকে যদি বলা হয়, ভাই! গুরুত্বের বিচারে স্বাভাবিক নিয়মে প্রথমে আপনি ‘জরুরিয়্যাতে দ্বীনের’ ইলম হাসিল করুন, ফরযে আইন পরিমাণ ইলম হাসিল করার পর আরো ইলম হাসিল করতে চাইলে আপনি মাআরেফুল কুরআন ও মাআরেফুল হাদীস মুতালাআ করুন, الطريق إلى العربية  দরসে পড়–ন,   الطريق إلى العربية  শেষ হলে الطريق إلى القرآن الكريم পড়–ন, তাহলে দেখা যায় তারা এই নির্দেশনা মানতে প্রস্তুত হন না।

এখানে তো ইলমে দ্বীনের কথা আলোচনা করা হল। খেদমতে দ্বীন এবং নেক আমলের অন্যান্য ক্ষেত্রের অবস্থাও এ রকম। অল্প কিছু কাজ নিয়েই সবাই ব্যস্ত অথচ অন্য অনেক ময়দানে শূন্যতা বিরাজ করছে। সেগুলোতে কাজ করার উদ্দেশ্যে যোগ্যতা অর্জনের জন্য সময় ব্যয় করতে কেউ প্রস্তুত নয়।

৬. অনর্থক ও বে-ফায়দা কাজ থেকে বেঁচে থাকা

চিন্তা করলে দেখা যাবে, আমাদের বড় একটা সময় অনর্থক ও বে-ফায়দা কাজে ব্যয় হয়। অথচ মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ, বে-ফায়দা কাজ থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَۙ الَّذِیْنَ هُمْ فِیْ صَلَاتِهِمْ خٰشِعُوْن وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْن

‘নিশ্চয় সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাযে বিনীত এবং যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে।’... -সূরা মুমিনূন : ১-৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه

ব্যক্তির সুন্দর মুসলিম হওয়ার এক নিদর্শন, অর্থহীন কাজ ত্যাগ করা। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩১৭

অনর্থক ও বে-ফায়দা কাজের মধ্যে ঐসকল কাজও অন্তর্ভুক্ত যেগুলো করলে কোনো সওয়াবও হয় না এবং দ্বীনী বা দুনিয়াবী কোনো ফায়দাও হয় না। কোনো কাজ যদি বাহ্যত ‘মুবাহ’ হয় কিন্তু সে কাজ করলে দ্বীনী বা দুনিয়াবী কোনো ক্ষতির আশংকা থাকে তাহলে সে কাজও لغو বা অনর্থক কাজ বলে বিবেচিত হবে।

আর নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্যরে ঊর্ধ্বের কাজে নাক গলানো শুধু অনর্থক কাজ নয়; বরং গুনাহ।

সময় ও অবস্থাভেদে মন্দ কাজেরও তারতম্য হয়। সাধারণ সময়ে অনর্থক কাজ করা আর ফযীলতপূর্ণ সময়ে অনর্থক কাজে লিপ্ত হওয়া এককথা নয়। ফযীলতপূর্ণ সময়ে অনর্থক ও অহেতুক কাজে লিপ্ত থাকা খুবই নিন্দনীয়।

তদ্রƒপ সকলের অনর্থক কাজের হুকুম এক নয়। কোনো তালিবে ইলমের অনর্থক কাজে পাঁচ মিনিট নষ্ট করা কারো কারো ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করার চেয়েও দোষের।

আর ‘অনর্থক’ একটি আপেক্ষিক বিষয়ও। সময়ের চাহিদার প্রতি ভ্রƒক্ষেপ না করে কিংবা অধিক উপকারী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখে নিজের মনমতো কোনো নেক কাজে লেগে যাওয়াও একদিক থেকে বে-ফায়দা কাজেই লেগে যাওয়া। বিশেষ করে তা যদি তালিবে ইলমদের পক্ষ থেকে হয়।

এখানে প্রসঙ্গত এ বিষয়টিও উল্লেখ করে দেওয়া মুনাসিব মনে হচ্ছে যে, শরীরের হক আদায় করা এবং শরীর-মনে উদ্যম ফিরিয়ে আনার জন্য তালিবে ইলমের শান মোতাবেক জায়েয ও ‘মুহায্যাব’ খেলাধুলা বা শরীর চর্চা অনর্থক কাজের মধ্যে পড়ে না; বরং এটা কাম্যও এবং সুন্নাতসম্মতও। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা আজর ও পুরস্কারও দিবেন।

৭. টুকরো সময় কাজে লাগানো

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফযীলতপূর্ণ সময়ের টুকরো অংশগুলোকে যিকির, দুআ এবং তিলাওয়াতে ব্যয় করা উচিত। এক আয়াত বা এক লাইন তিলাওয়াতও তিলাওয়াত।

টুকরো সময়ের গুরুত্ব ও কাজে লাগানোর উপায় সম্পর্কে হযরত মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দামাত বারাকাতুহুম-এর একটি বয়ান আল কাউসারে শিক্ষার্থীদের পাতায় ছাপা হয়েছে। ‘তালেবানে ইলম : পথ ও পাথেয়’তেও বয়ানটি আছে।

৮. নেযামুল আওকাত মেনে চলা

 সময় নষ্ট হওয়ার বা সময় ফলপ্রসূ না হওয়ার যত কারণ আছে তার মধ্যে একটি বড় কারণ,

اوقات کے حسن تنظیم اور حسن تقسیم کا فقدان

সময়ের সুষম বন্টন ও সুষ্ঠু বিন্যাস না থাকা। কাগজে নেযামুল আওকাত লেখার প্রচলন হয়ত পরবর্তীতে শুরু হয়েছে, কিন্তু সারাদিনের সময় একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বণ্টন করে সে অনুযায়ী চলা- এ তো শরীয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং সালাফে সালেহীনের শিআর। বিশেষ করে সব যুগের আকাবির উলামা ও মাশায়েখের কাছে এ বিষয়টির বেশ গুরুত্ব ছিল। চিন্তা করলে হাদীস শরীফে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে এর অনেক দলীল পাওয়া যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই সুন্নাতটি যথাযথ গুরুত্বের সাথে পালন করার তাওফীক দিন।

সামনে রমযান মাস আসছে। রমযান মাসকে ইসতিকবাল করার এক উপায় এই যে, রমযান আসার আগেই তার জন্য নেযামুল আওকাত তৈরি করা এবং অন্যান্য যিম্মাদারির প্রতি লক্ষ্য রেখে যথাসম্ভব রমযানের হক আদায়ের এবং রমযানের আমলের জন্য বেশির থেকে বেশি সময় নির্ধারণের চেষ্টা করা।

৯. আমলে নূর ও রূহ তৈরি করার চেষ্টা করা

সম্ভবত সময়কে ফলপ্রসূ বানানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল, উক্ত সময়ে কৃত আমল ও কাজে রূহানিয়্যাত ও নূরানিয়্যাত সৃষ্টির চেষ্টা করা। যখন একটি কাজে সময় ব্যয় হচ্ছেই তখন তা যথাযথভাবে হওয়া উচিত। কাজটি অবহেলাভরে করা, মনোযোগ না দেওয়া, নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা না করা- একটি ভুল কর্মপন্থা। এর মাধ্যমে আমরা সময়েরও অবমূল্যায়ন করি এবং কাজটিরও হক নষ্ট করি। কোনো কাজে রূহানিয়্যাত ও নূরানিয়্যাত আনার উপায় হল, গুরুত্বের বিচারে কাজটি যে মনোযোগ, অভিনিবেশ ও নিষ্ঠার দাবি রাখে তা পুরণের চেষ্টা করা। মাসনূন তরিকায় কাজ করা, সুচারুরূপে করা, ‘ইহসান’-এর প্রতি লক্ষ্য রেখে আমল করা, প্রশস্ত ও গভীর নিয়ত করা, ইহতিসাব ও সওয়াবের কথা খেয়াল রাখা, সিদক ও সততা এবং ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করা- প্রভৃতি গুণাবলিই কাজে রূহানিয়্যাত ও নূরানিয়্যাত আনে। তাছাড়া এ তো সবারই জানা যে, এই গুণগুলো আলাদাভাবেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রত্যেকটিই মুমিনের মাকসাদ ও মানযিল।

১০. সময়ের বরকত নষ্ট করে দেয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা

সৃষ্টির সূচনা থেকে সময়ের একই নিয়ম ও ধারা চলে আসছে। আল্লাহ আআলা বলেন-

تَبٰرَكَ الَّذِیْ جَعَلَ فِی السَّمَآءِ بُرُوْجًا وَّ جَعَلَ فِیْهَا سِرٰجًا وَّ قَمَرًا مُّنِیْرًا  وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا.

‘মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি আকাশে বুরূজ বানিয়েছেন এবং তাতে এক উজ্জ্বল প্রদীপ ও আলোকিত চাঁদ সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই সেই সত্তা যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন- (কিন্তু এসব বিষয় উপকারে আসে কেবল) সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়।’ -সূরা ফুরকান : ২৫ : ৬১

সৃষ্টির সূচনা থেকে সময়ের একই ধারা ও নিয়ম জারি থাকার পরও আমাদের আর সালাফের মাঝে এত পার্থক্য কেন? কেন আমরা সবসময় সময়স্বল্পতার অভিযোগ করি? অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্নদের বক্তব্য হল, তাঁদের সময়ে বরকত হত, আমাদের সময়ে বরকত হয় না। হলেও কম হয়। তাই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের সময়ও যেন বরকতশূন্য না হয়ে যায়। যে সকল বিষয় সময়ের বরকত নষ্ট করে দেয় তন্মধ্যে এই চারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-

ক. আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করা। বিশেষ করে অশ্লীল কথা বলা বা অশ্লীল কোনো কাজ করা। এটি সময়কে একেবারেই নূর ও বরকতশূন্য করে দেয়। এ থেকে বেঁচে থাকা খুব জরুরি। খালেস দিলে তওবা করে হিম্মত করে এ থেকে বাঁচার চেষ্টা করা কর্তব্য। গীবত, শেকায়েত, মন্দ কথা, মন্দ ধারণা, সমসাময়িক বিষয়ে ‘¯্রফে মন্তব্যের জন্য মন্তব্য’- ইত্যাদি কাজও সেই গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যা সময়ের বরকত নষ্ট করে দেয়।

খ. দিল-দেমাগ ও মন-মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত করে এমন সকল আচার-আচরণ ও চিন্তা-ফিকির। এটি সময়ের বরকত ও নূরানিয়্যাতের জন্য বিষতুল্য।

গ. অনর্থক ও বে-ফায়দা কাজকর্মে সময় নষ্ট করা।

ঘ. আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের তাওফীক দিয়েছেন তা ছেড়ে এমন কাজ করতে যাওয়া, যা করার সামর্থ্য বা যোগ্যতা আমার নেই।

এগুলো এবং এগুলো ছাড়া আরো যেসকল কাজের কারণে সময়ের নূর ও বরকত নষ্ট হয়ে যায়- সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

বিশেষকরে কিছু কাজ এমন আছে যার কারণে মানুষের গোটা জীবনটা বরকতশূন্য হয়ে যায়। এগুলো থেকে সাবধান থাকা উচিত। যেমন পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া, আসাতিযায়ে কেরামের সাথে বেআদবি করা, সহপাঠীদের সাথে অহংকার করা, খাবার-খাদ্য, ঘর-বাড়ি, প্রয়োজনীয় বাহন প্রভৃতিতে হারাম অর্থ শামিল থাকা।

১১. কৃত নেক আমল হেফাযতের প্রতি খেয়াল রাখা

সময়ের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে কথাটি সর্বশেষ আরয করতে চাই তা হল, সময় ব্যয় করে যে নেক কাজ করা হল তার হেফাযতের প্রতি খেয়াল রাখা কর্তব্য। এমন কথা ও কাজ-কর্ম থেকে বেঁচে থাকতে হবে যার কারণে নেক আমল বাতিল হয়ে যায় বা নেক আমলের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের উপর অটল রাখুন। সর্বদা ইসলামের ছায়াতলে রাখুন। সব ধরনের ইরতিদাদ ও ধর্মহীনতা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ َمِنَ الْحَوْرِ بَعْدَ الْكَوْرِ.

হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে ভালোর পর মন্দে পতিত হওয়া থেকে পানাহ চাই। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৩৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৮৮৮

তো দ্বীনে হককে ত্যাগ করে ‘মুরতাদ’ হয়ে যাওয়া কিংবা আল্লাহর সাথে শিরক করা- এ দুই কারণে মানুষের আমল বরবাদ হয়ে যায় তা সবাই জানে এবং এটি একটি প্রসিদ্ধ বিষয়। কিন্তু এ ছাড়াও আরো কিছু কাজ আছে যেগুলোর কারণে আমল বরবাদ হয়ে যায় কিংবা আমলের সওয়াব ও ফায়দা শেষ হয়ে যায়। যেমন-

ক. রিয়া বা লোক দেখানোর নিয়ত।

খ. অনুগ্রহ করে খোঁটা দেওয়া।

গ. সদকা দিয়ে খোঁটা দেওয়া।

ঘ. হিংসা-বিদ্বেষ।

ঙ. পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়া।

কিছু রেওয়ায়েত থেকে অনুমিত হয়, কবীরা গুনাহ বেশি করতে থাকলেও অন্যান্য আমল বরবাদ হয়ে যায়।

কিছু বিষয় এমন আছে যেগুলোর কারণে আল্লাহর দরবারে দুআ ও ইবাদত কবুল হয় না। সেগুলো থেকে বেঁচে না থাকলে ব্যয়কৃত সময়, মেহনত-মোজাহাদা সবই বিফলে যাবে। যেমন-

ক. খাবার-দাবার, ঘর-বাড়ি, ব্যবহারের বাহন হারাম অর্থের বা হারাম উপার্জনের হওয়া।

খ. আকীদা বা আমলে বিদআতে লিপ্ত হওয়া।

কিছু গুনাহ এমন আছে হাশরের ময়দানে যেগুলো বড় বড় আবেদ ও যাহেদকেও ‘ফকির’ বানিয়ে দেবে। যখন নেকআমলের প্রচণ্ড প্রয়োজন পড়বে তখন এ গুনাহগুলোর কারণে নেক আমল কোনো কাজে আসবে না। এটা হয়ে থাকে আল্লাহর মাখলূক ও আল্লাহর বান্দাদের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদির ক্ষেত্রে। যেমন কারো গীবত করা, কারো উপর অপবাদ আরোপ করা, কাউকে গালি-গালাজ করা, কাউকে না-হক কষ্ট দেওয়া, কারো হক মেরে দেওয়া, এতিমের সম্পদ গ্রাস করা, হকদারকে মীরাছের সম্পদ না দেওয়া, রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা, নিরীহ পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া। মোটকথা আল্লাহর মাখলূক বা আল্লাহর বান্দাদের হক নষ্ট করার কারণে যে গুনাহ হয় তার কারণে মানুষ ঐ সময় তার কৃত নেক আমল থেকে বঞ্চিত থাকবে যখন কৃত আমলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়বে। তার সকল নেক আমল চলে যাবে সেই লোকদের আমলনামায় যাদের হক সে নষ্ট করেছিল। এর দ্বারাও যদি হক আদায় না হয় তাহলে তাদের গুনাহ তার আমলনামায় দিয়ে দেওয়া হবে। সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করুন।

দুনিয়া থেকে যাওয়ার আগেই সবার প্রাপ্য হক আদায় করে দিয়ে যাওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

শেষকথা

বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে প্রবন্ধ নির্দিষ্ট বিষয়ে থাকেনি। বিষয় ছিল ফযীলতপূর্ণ সময়ের কদর করব কীভাবে? কিন্তু আলোচনা হল সময়ের কদর কীভাবে হবে সে সম্পর্কে। বস্তুত ফযীলতপূর্ণ সময় তো সময়েরই অংশ। যে উপায়ে সময়ের মূল্যায়ন হবে, সেভাবেই ফযীলতপূর্ণ সময়েরও মূল্যায়ন হবে। ফযীলতপূর্ণ সময়ে এই মূলনীতিগুলো অধিক গুরুত্বের সাথে পালন করা আবশ্যক।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়ে গেছে। তা হল, সময়ের মূল্যায়ন করতে হলে সময়ের চাহিদা বোঝাও জরুরি। ফযীলতপূর্ণ সময়ের ক্ষেত্রে এই মূলনীতির গুরুত্ব আরো বেশি। ফযীলতপূর্ণ সময়ে কী করণীয় এবং সময়গুলোর বিশেষ আমল কী তা সঠিকভাবে জেনে তার উপর আমল করা এবং এর মাধ্যমে এই সময়গুলোকে বেশি ফলপ্রসূ করাই এ সময়গুলোর যথাযথ মূল্যায়ন। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিন।
মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
১৬/০৭/১৪৩৬ হিজরী

19
রশংসার ক্ষেত্রে

বর্তমানকালে সবকিছুই আর্ট বা শিল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা মানব-সত্তায় যে বহুমুখী প্রতিভা নিহিত রেখেছেন, নিত্য নতুন পন্থায় তা বিকাশ লাভ করছে। প্রতিভা-বিকাশের সে ডামাডোলে মানুষের কাছে লঘু-গুরুর প্রভেদও যেন ঘুচে গেছে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কেও সে তার চর্চা ও পরিচর্যার স্পর্শে মনোযোগ-আকর্ষী শিল্পের স্তরে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। মানব-সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ও এখন আর শিল্পের আওতা-বহির্ভূত নয়। তা না-ই থাকুক। মানুষের হাতের ছোঁয়ায় নগণ্য সবকিছু প্রথম শ্রেণীতে গণ্য হয়ে উঠলে তাকে তো মানুষের কৃতিত্বই বলতে হবে। সুতরাং মানুষের জীবন সম্পর্কিত প্রতিটি জিনিস যদি শিল্প হয়ে ওঠে তা উঠুক না! আমরা তাকে সাধুবাদই জানাব। কেননা আমাদের শরীআত যে জীবনের নির্দেশনা দেয়, তাও তো শিল্পিত জীবনই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার ছিল শিল্পোৎকর্ষের সর্বোত্তম নিদর্শন। তাঁর শিক্ষায় আমরা অপরিহার্য সব কিছুর নিখুঁত ধারণ ও বাহুল্য সবকিছু বর্জনেরই সবক পাই। সেই সবক যে গ্রহণ করবে তাঁর হাসি-কান্না, চলন-বলন প্রভৃতি জীবনকৃত্য সুষমাম--ত হতে বাধ্য। তার প্রতিটি বিষয় হবে সুচারু ও শোভনীয়। কাজেই সাধনা-সেবা ও চর্চা-পরিচর্যা দ্বারা কোনও কিছুকে শিল্পমানে উন্নীত করার ভেতর এমনিতে কোনও দোষ নেই। তা দোষের হয় তখনই, যখন তাতে বৈধাবৈধের কোন বিচার থাকে না, সত্যাসত্যের ভেদাভেদ থাকে না এবং পারিপার্শ্বিক লাভ-ক্ষতির প্রতি কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকে না। এই বেলাগাম লিপ্ততার কারণে অনেক সময় নন্দিত জিনিস নিন্দিত হয়ে যায় এবং বৈধ বিষয় অবৈধতায় পর্যবসিত হয়। যেই ‘প্রশংসা’ সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছি, এমনিতে তো তা একটি বৈধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাম্য জিনিস। তাই পূর্ণ মনোযোগের সাথে এতে লিপ্ত হওয়াতে কোনও দোষ নেই। বরং যথার্থ প্রশংসাকে ভাব-ভঙ্গী ও ভাষার মাধুর্যে মনোজ্ঞ করে তুললে তা কেবল প্রশংসিতের মনোরঞ্জনই করে না, প্রশংসার লক্ষ্যার্জনেও সহায়ক হয়। কিন্তু তা সহায়ক হয় ততক্ষণই, যতক্ষণ প্রশংসাকে শিল্পিতকরণের বাড়াবাড়ি দ্বারা বাস্তবতাবর্জিত অতিকথনে পরিণত করা না হয়। সন্দেহ নেই আজকাল তাই হচ্ছে এবং ভয়াবহরূপে হচ্ছে। সাধারণ-বিশিষ্ট অধিকাংশের দ্বারাই এই অনুচিত কর্মটি ঘটছে। বিশেষত দৃষ্টি যাদের শৈল্পিক বর্ণচ্ছটায় প্রশংসাকে কতটা ঝলমলে করে তোলা যায় এবং প্রশংসিত বা শ্রোতা সাধারণকে প্রশংসার যাদুকাঠি দ্বারা কতটা মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলা যায়, সে দিকেই নিবদ্ধ, তাদের হাতে পড়ে প্রশংসা নামক সুকুমার কর্মটি আজ চরমভাবে বিপন্ন। ক্ষেত্রবিশেষে সেই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করা খুব সহজ কাজ নয়।

  লিখন, কথন, পারস্পরিক আলাপচারিতা, সভা-সমাবেশের বক্তৃতা-বিবৃতি, ও সবরকম গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণায় ব্যক্তি বা বস্তুর গুণকীর্তন একটি নিত্যদিনের কর্মানুষ্ঠান। হরদম নানাপ্রকারে, বিচিত্র ভাব-ভঙ্গীতে এতে লিপ্ত হরেক রকম মানুষ। এর বিবিধ কার্যপ্রণালীর ফিরিস্তি দান করা এ স্থলে উদ্দেশ্য নয় এবং তা সম্ভবও নয়। কেবল মোটা দাগের কয়েকটি রসমী ও পেশাগত পদ্ধতির উল্লেখ করা যাচ্ছে, যাতে ব্যক্তি বা বস্তুর প্রশংসা শুধু উচ্ছ্বসিতভাবেই নয়; কোনওরকম সত্যাসত্যের তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছভাবে করা হচ্ছে।

  সংবর্ধনা ও মানপত্র

  গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধনা দেওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। বর্তমানে এর ব্যাপকতা অনেক বেশি। এখন সংবর্ধিত হওয়ার জন্য গুণী হওয়ার দরকার পড়ে না। অর্থ ক্ষমতাও সংবর্ধনাকে আকর্ষণ করে। গুণ অপেক্ষা একটু বেশি পরিমাণেই করে। কারণ এর সাথে প্রভাব-প্রতিপত্তি জড়িত। সংবর্ধনা যেন প্রভাবশালীর হক। তাই এ হক আদায়ে প্রভাববলয়ের সকলে থাকে বেজায় ব্যস্ত, তা অন্যসব হক অর্থাৎ শরী‘আত-নির্ধারিত হক আদায়ে যতই নির্লিপ্ত থাকুক না কেন।

  যা-হোক সংবর্ধনা সাভায় উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে মানপত্র দেওয়া হয় এবং বক্তাগণ তার গুণকীর্তনে একের পর এক বক্তৃতা দিতে থাকে। তাতে যা লেখা বা বলা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকে না। মানপত্রের রচয়িতা ও বক্তা প্রত্যেকেরই নজর থাকে নিজ দক্ষতা জাহির করার দিকে। সেইসঙ্গে উদ্দেশ্য থাকে খোশামোদ করাও। তাই যা বলা হচ্ছে তা আদৌ সত্য কি না বা তার সাথে সেই ব্যক্তির দূরেরও কোন সম্পর্ক আছে কি না তা ভেবে দেখার কোনও প্রয়োজনই বোধ করা হয় না। ফলে লিখিত ও উচ্চারিত সবটাই হয় কুরআন মাজীদের ভাষায় زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا ‘প্রতারণামূলক চমকপ্রদ বাক্য’ (আনআম : ১১২)। ব্যক্তিটির মধ্যে যদি কিছুটাও আত্মসচেতনতা থাকে এবং থাকে আল্লাহর ভয়, তবে সেসব বাক্যের অসারতা ঠিকই বুঝতে পারে। যদ্দরুন সে কুণ্ঠিত ও বিব্রত হয়। ভেবে শিউরে ওঠে যে, আমি কী আর বলা হচ্ছে কী!

এমনকি অনেক সময় তজ্জন্য নিজেকে অপমানিতও বোধ করে। কেননা ব্যক্তির সাথে প্রশংসাবাক্যের তফাত দৃষ্টিকটু রকমের হলে তা আর প্রশংসা থাকে না, ব্যঙ্গে পরিণত হয়ে যায়। ভরা-মজলিসে ব্যঙ্গ-উপহাসের শিকার হলে আত্মম্মানবোধসম্পন্ন যে-কোনও লোকই নিজেকে অপমানিত বোধ করবে। কী লোমহর্ষক পরিহাস! সম্মাননার শিরোনামে এতসব আয়োজন, অথচ বাস্তবে হচ্ছে চরম অবমাননা। কিন্তু আয়োজকের সে অনুভূতি কোথায়? ব্যঙ্গাত্মক বাক্যবাণে একজনকে জর্জরিত করা হচ্ছে, অথচ তারা এই ভেবে আহ্লাদ বোধ করছে যে, কি অভূতপূর্ব সম্মাননা তাকে দান করলাম! এটা একরকম আত্মপ্রবঞ্চনাও বটে। চরম গর্হিত কাজ করে ভাবা হচ্ছে বেজায় ভালো কাজ। তবে এ জাতীয় অতিরঞ্জনে যারা খুশি না হয়ে লজ্জিত ও কুণ্ঠিত হয় কিংবা অপমানিত বোধ করে তাদের সংখ্যা বড় কম। দ্বীনদারী ও আল্লাহভীতির অভাবে মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতি হারিয়ে যায়। অর্থ ও সম্মানস্পৃহা মানুষকে স্থূলমতি করে তোলে। জড়বাদ-অধ্যুষিত আধুনিক বিশ্ব তো সেই স্পৃহায় কাতর। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই এখন স্তবপ্রত্যাশী। তাতে যত অত্যুক্তিই হোক না কেন, তাকে তারা অসংগত মনে করে না। বরং খুশিই হয় এবং মনে মনে স্তবককে বাহবা দেয়। এতে প্রশংসাকারী ও প্রশংসিত ব্যক্তির যে ক্ষতি হয় সে সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা হয়েছে।

  অধিকাংশ ক্ষেত্রে এজাতীয় সংবর্ধনার পেছনে উদ্দেশ্য খুব সৎ থাকে না। লÿ্য টাকা-পয়সা বা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা। এভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কারও থেকে অন্যায় সুবিধা ভোগের কোনও বৈধতা ইসলামে নেই। এক হাদীসে ইরশাদ-

 إن الله يبغض البليغ من الرجال الذي يتخلل بلسانه تخلل الباقرة بلسانها ‘আল্লাহ তাআলা সেই বাগ্মী পুরুষকে ঘৃণা করেন, যে তার জিহবা (অর্থাৎ বাকচাতুর্য) দ্বারা খায় (অর্থাৎ রোজগার করে), যেমন গরু তার জিহবা দ্বারা খেয়ে থাকে’ (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদীস ৫০০৫; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৮৫৩)। এ হাদীস মুখের যে কোনও অপব্যবহার দ্বারা পার্থিব সুবিধা ভোগকে অবৈধ ঘোষণা করছে। অনস্বীকার্য, প্রশংসার বাড়াবাড়িও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সংবর্ধনা ও মানপত্র দানের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কোনও রকম অসদুদ্দেশ্যকে এতে প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। উদ্দেশ্য সৎ থাকার পরও অসত্য কথন ও অতিরঞ্জনকে পরিহার করতে হবে। সেই সঙ্গে সঠিক প্রশংসা বাক্যও যদি কারও পক্ষে ক্ষতিকর মনে হয় তাও পরিত্যাজ্য।

  চরিত্রসনদ

  সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চরিত্রসনদকে মূল্য দেওয়া হয়। তাছাড়াও সামাজিক বিভিন্ন কাজে এর প্রয়োজন পড়ে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ এ সনদ দিয়ে থাকেন এবং তাদের দেওয়া সনদ অনুযায়ী সনদবাহী ব্যক্তিকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সুতরাং এটা একটা দায়িত্বপূর্ণ কাজ। একাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা কতটুকু দেওয়া হয়? পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ আসে, লিখে দেওয়া ‘সে আমার পরিচিত। সে দেশের একজন সুনাগরিক ও চরিত্রবান লোক।’ ক্ষেত্রবিশেষে আরও অনেক কিছু লেখা হয় ও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। অপরিচিত লোককেও যদি পরিচিত বলে চালানো হয় তাতে সনদদাতার সত্যনিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ থাকে কি? তারপর যদি কারও সম্পর্কে বেশি কিছু না বলে কেবল এতটুকুই বলা হয় যে, ‘সে একজন সুনাগরিক ও চরিত্রবান লোক’ প্রশংসা হিসেবে তা কি কম কিছু?  দেশের জন্য কারও সুনাগরিক হওয়াটা তো চারটিখানি কথা নয়। এর জন্য যে দায়বদ্ধতা ও কল্যাণচিমত্মার দরকার তা ঠিক কতখানি আমাদের মধ্যে আছে? দেশ ও দেশাত্মবোধের জিগির তো সবার মুখে মুখে, কিন্তু দেশের জন্য সত্যিকারের মমতা কতজন পোষণ করে। অন্ততপক্ষে আমার কোনও কাজ যাতে দেশের জন্য ক্ষতিকর না হয়, এতটুকু সচেতনতাই বা কজনের আছে? কাজেই সুনাগরিক হওয়া খুব সোজা কথা নয়। তারপর কারও চরিত্রবান হওয়াটা অনেক বড় ব্যাপার। চরিত্র নবী-রাসূলগণের শিক্ষার একটি প্রধান ধারা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, بعثت لاتمم مكارم الأخلاق ‘আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাবিধানের জন্য। মানবচরিত্রের বহু দিক আছে। তার সবগুলোতে যে শূচিশুদ্ধ, সে-ই চরিত্রবান। কে সত্যবাদী, আমানতদার, বদান্য, বিশ্বস্ত, সরল ও অকপট, উদারপ্রাণ, ক্ষমাপ্রবল, সহনশীল ও নিঃস্বার্থ তার কতটুকু আমরা জানি? সুতরাং নিশ্চিত না হয়ে নিশ্চিতমনে কাউকে চরিত্রবান বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া যায় কি করে? তা দিতে গেলে তো নিজেরই চারিত্রিক শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায় এ সনদের পেছনে কোনও রকম লেন-দেনের ব্যাপার নেই তো? কিংবা কাজ করেনি তো কিছুটা স্বজনপ্রিয়তা? আর কিছুও যদি না থাকে তবে দায়িত্বজ্ঞানের অভাব বলে অভিযোগ আসবেই। যেভাবেই হোক না কেন, নিশ্চিতভাবে না জেনে কাউকে চরিত্রসনদ দিলে তাতে সংশ্লিষ্টজনদের সাথে এক রকম খেয়ানত হয়ে যায়। কখনও বা জাতির সাথেও। কাজেই চরিত্রসনদ দিতেও সাবধানতা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মধ্যম পন্থা হল অজ্ঞাত কাউকে চরিত্রসনদ না দেওয়া। আর যাদের সম্পর্কে জানা আছে তাদেরকে সতর্কতার সাথে দেওয়া। মুখস্থ শব্দ না আউড়িয়ে যার সম্পর্কে যতটুকু জানা থাকে ঠিক ততটুকুই লেখা।

  বই-পুস্তক সম্পর্কে অভিমত

  বিভিন্ন বই-পুস্তক খুললে শুরুতেই দেখা যায়, বইটি সম্পর্কে বিশিষ্ট ও বিখ্যাত কারও অভিমত ছেপে দেওয়া হয়েছে। কখনও তারই হস্তান্তরে কখনও মুদ্রিতাকারে। কোনও বইতে দু-একজনের অভিমত, কোনওটায় বহুজনের। এমন বইও চোখে পড়েছে, যার গোটা একটা ফর্মাই চলে গেছে অভিমতের দখলে। মূল বইতে পৌঁছাতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ওল্টাতে হয়। সে এক ক্লান্তিকর অভিযাত্রা।

  যাহোক বইয়ের শুরুতে অভিমত ছাপানোটাও এমন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। এমনিতে এটা দোষের কিছু নয়। লেখক তার রচনার বিশ্বস্ততাকে বিশ্বাস করানোর জন্য বা তার প্রতি পাঠক সাধারণের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য বরেণ্য কোনও ব্যক্তির অভিমত জুড়ে দিতেই পারে। কিংবা এর উদ্দেশ্য কেবল বরকত লাভও হতে পারে। থাকল তার রচনার শুরুতে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির দুটি কথা। হয়ত সেই বরকতে রচনাটি মানুষের সমাদর লাভ করবে বা অন্য কোন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করবে। সুতরাং অভিমত ছাপানোতে আপত্তিকর কিছু নেই। যে কারণে বিষয়টির অবতারণা, তা হচ্ছে অভিমতের ভাষা।

প্রায় সব অভিমতেই থাকে রচনার প্রশংসা এবং কেবলই প্রশংসা। কখনও কদাচিৎ সাদামাঠা ভাষায়, অধিকাংশই উচ্ছ্বসিতভাবে।

  লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অভিমতযুক্ত রচনাবলীর মধ্যে এমন এমন বইও থাকে রচনার দিক থেকে যা শিল্পমানে উত্তীর্ণ নয়। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রচনা ও সংকলন একটি উচ্চ পর্যায়ের শিল্প। একটি মানসম্পন্ন রচনার জন্য তথ্য সমৃদ্ধি, বিষয়বস্তুর পূর্ণাঙ্গতা, উপস্থাপনার বলিষ্ঠতা, আলোচনার ধারাবাহিকতা, সুষ্ঠু বিন্যাস, ভাষার মাধুর্য ও গতিময়তা অনেক কিছুই দরকার। (স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এসব অনুষঙ্গের সাথে কিঞ্চিৎ পরিচিত থাকলেও আজও পর্যন্ত এতে আমার দখল আসেনি। যে কারণে একটি শিল্পমানসম্পন্ন রচনা তৈরি করে ফেলার মত দুরাশা আমি করতে পারি না। তবে যারা তা করতে পারে এবং যথারীতি তাদের অগ্রযাত্রা শুরুও হয়ে গেছে, সংখ্যায় কম হলেও আলহামদু লিল্লাহ এরকম কলমশিল্পীদের অস্তিত্ব আমরা মুগ্ধ চোখে দেখতে পাচ্ছি। সেদিন হয়ত দূরে নয় যখন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এর প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা তা পূরণ করেই দিন- আমীন)

  যাহোক বলছিলাম, মানসম্পন্ন রচনার আনুষঙ্গিক বিষয় অনেকগুলো। কিন্তু অনেক বইতেই তার বেশিরভাগ থাকে না বা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে না। তা সত্ত্বেও তাতে বিশিষ্টজনদের অভিমত ছেপে দেওয়া হয় এবং সাধারণত সে সব অভিমতে বইয়ের প্রশংসাই করা হয়ে থাকে। এটা যেমন পার্থিব বিষয়াদি সংক্রান্ত রচনায় করা হয়, তেমনি দ্বীনী বই-পুস্তকেও।

  কোনও বই সম্পর্কে অভিমত দেওয়াটা সেই বই সম্পর্কে সাক্ষ্যের মর্যাদা রাখে। এটা এক ধরনের তাসদীক (সত্যায়ন) ও তাওছীক (বিশ্বস্ততা নিরূপণ)-ও বটে। এর মাধ্যমে অভিমতদাতা পাঠক সাধারণের সামনে বই সম্পর্কে তার মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বইটি সম্পর্কে নিজ মতামত ব্যক্ত করেন এবং এর বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান করেন। এর ফলে বইটির উপর পাঠকের আস্থা জন্মায় এবং তাতে উপস্থাপিত তথ্যাবলী ও বিষয়বস্তু গ্রহণে উৎসাহী হয়। বোঝাই যাচ্ছে বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এটা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কেননা বইতে যদি কোন ভুল তথ্য থাকে এবং সেই আস্থার ভিত্তিতে পাঠক তা গ্রহণ করে নেয় তবে তাতে তার ও সংশ্লিষ্ট সকলের যে দ্বীনী ও দুনিয়াবী ক্ষতি সাধিত হবে তার দায়ভার কেবল লেখকের উপরই নয়, অভিমতদাতার উরপও বর্তাবে। এ কারণেই আমাদের আকাবিরে দ্বীন (দ্বীনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ) এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাদের অভিমতসমূহ (তাকরীয) পাঠ করলে লক্ষ্য করা যায়। শব্দ প্রয়োগে তারা কতটা সতর্ক ছিলেন। রচনার মান এবং তাদের কর্তৃক তা পাঠ সম্পর্কে তাদের শব্দ হত অত্যন্ত মাপাজোখা। বর্তমানকালের আকাবিরে দ্বীনও এক্ষেত্রে তাদের পদাঙ্কানুসারে চলে থাকেন। কিন্তু সাধারণ চিত্র এরকম নয়। অধিকাংশ অভিমতেই দায়িত্বজ্ঞানের ছাপ থাকে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, অভিমত যেন সর্বাবস্থায় প্রশংসামূলকই হতে হয়, তাতে রচনার মান যাই হোক না কেন। কি মৌলিক রচনায়, কি অনুবাদে সর্বত্রই অভিন্ন দৃশ্য। মূলের সাথে অনুবাদের দুস্তর ব্যবধান, কিন্তু উচ্চ প্রশংসার সাথে বলা হয়, অনুবাদ সম্পূর্ণ মূলানুগ। মৌলিক রচনায় তথ্যভুক্তিতে সতর্কতার অভাব, অথচ বলে দেওয়া হয়, অত্যন্ত সারগর্ভ তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রমাণসমৃদ্ধ রচনা। ভাষা সুখপাঠ্য, এমনকি বিশুদ্ধ না হলেও অভিমতে তা মানোত্তীর্ণ হয়ে যায়। এবংবিধ আরো বহু শিথিলতায় বর্তমানকালের অভিমত তার ওজন হারাতে বসেছে। দরকার ছিল গুণ ও দোষ দুটোই সামনে রাখা এবং গুণের জন্য প্রশংসার পাশাপাশি ত্রম্নটিকেও নিশানদিহী করে দেওয়া। এটা হত সত্যিকারের আমানতদারি। সে ক্ষেত্রে সতর্ক পাঠক অভিমত ও রচনায় সাযুজ্য পেত। গরমিলের জন্য ধাক্কা খেত না। কিন্তু সেই সাবধানতা অবলম্বন না করায় এবং প্রান্তিকতামূলক প্রশংসাপত্র লিখে দেওয়ায় একদিকে সতর্ক পাঠক হোচট খাচ্ছে, অন্যদিকে যাদের সচেতনতার অভাব বা যারা লেখক বা অভিমতদাতার প্রতি অতি আস্থাশীল তারা হচ্ছে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত। এসবই প্রশংসায় বাড়াবাড়ির কুফল। এ কুফল থেকে নিজেকে ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য দরকার প্রশংসায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ও পরিমিতিবোধের পরিচয় দেওয়া তথা আকাবিরে দ্বীনের মতো অভিমত দানে সতর্কতা অবলম্বন করা, যেমন দ্বীনী রচনাবলীতে তেমনি দুনায়াবী বইপুস্তকের ক্ষেত্রেো।

  পণ্য বিজ্ঞপ্তি

  ‘প্রচারেই প্রসার’ একটি সর্বজনবিদিত মূলনীতি। পণ্যের ক্ষেত্রেই এটা বেশি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। পণ্যের ব্যাপক প্রচারের লক্ষ্য উৎপাদক মহল প্রচার-প্রচারণাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর জন্য বিজ্ঞাপন ও মডেলিংয়ের মত নতুন নতুন শিল্প ও পেশার উদ্ভব ঘটেছে। এর মাধ্যমে পণ্যের গুণকীর্তণ করে ভোক্তাসাধারণকে আকৃষ্ট করাই উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য যখন তাদেরকে আকৃষ্ট করে পণ্যটি তাদের গছিয়ে দেওয়া তাই বাস্তবে সেটি যেমনই হোক না কেন বিজ্ঞাপিত করা হয় অতি উপকারী একটি সংগ্রহযোগ্য বস্তুরূপে। এ পেশায় যারা আত্মনিয়োগ করে, অর্থ বিত্তই যেহেতু তাদের মূখ্য তাই একেকটি পণ্যকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য নিজেদের সবটা ক্ষমতা ঢেলে দেয়। প্রতিযোগিতার বাজারে নিজ নিজ মক্কেলের পণ্যটিই যে সবার সেরা তা প্রতিপন্ন করার জন্য তদসংশ্লিষ্ট যত গুণ আছে সবই তাতে একঠাঁই করার কসরত করে। এ প্রচেষ্টায় যে যতটা দক্ষতা দেখাতে পারে সে ততটা প্রতিষ্ঠা পায়। সেই প্রতিষ্ঠা লাভের উদ্দেশ্যে ভাষা-ভাব-ভংগী ও অভিনয়ের মাধ্যমে পণ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, মনে হয় তার চেয়ে খাসা মাল যেন আর কিছু হতে পারে না। প্রশংসার জগতে বোধ করি এর চে শিল্পিত (?) ও এর বেশি অতিরঞ্জিত প্রশংসা আর কিছুরই হয় না। এই প্রশংসায় কেবল ভাষাই ব্যবহার হয় না, প্রশংসাকারীর গোটা সত্তাই এতে বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে যেখানে পৌঁছানো হয়, বাস্তবিকই কি পণ্যটি সেই মানের এবং আসলেই কি সেটি সেই সব গুণের ধারক? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো বিশেষজ্ঞগণ তা স্বীকার করেন না। তাহলে সে প্রশংসা ও প্রচারণা মিথ্যাচারের মধ্যে পড়ে না কি? আজ এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে গোটা জাতিকেই তো প্রতারিত করা হচ্ছে। মিথ্যাচার ও প্রতারণা দুটোই গুরুতর মহাপাপ। প্রতারণা যে কতটা গুরুতর গুনাহ তা বোঝার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাবধানবাণীটিই যথেষ্ট যে, তিনি বলেন, من غشنا فليس منا ‘যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে সে আমাদের একজন নয়।’ অথচ এই প্রতারণাই আধুনিককালের এক ফ্যাশন ও শিল্পের রূপ ধারণ করেছে আর এর ফাঁদে ফেলে গণমানুষকে যতসব ভেজাল পণ্যের ভোক্তা বানানো হচ্ছে। আজ গণস্বাস্থ্য যে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, কে না জানে এই ভেজাল ভোগই তার জন্য বড় দায়ী। এর থেকে মুক্তির জন্য যে পরিব্যাপ্ত সচেতনতা দরকার তার অংশ হিসেবে প্রশংসা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভংগীকে অবশ্যই সামনে নিয়ে আসতে হবে। ভেজাল পণ্যের প্রশংসা অথবা নির্ভেজাল পণ্যেরও অতি প্রশংসা, কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ অন্যান্য ক্ষতি ও ত্রুটিকে পাশ কাটিয়ে কেবলই গুণকীর্তনের একদেশদর্শিতা যে বহুবিধ পাপের সমষ্টি সেই বোধ যদি মানুষের চেতনায় জাগ্রত হয়ে যায়। তবেই ব্যবহারিক, চারিত্রিক সকল অংগনে হাজারও ক্ষতি থেকে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে।

20
Namaj/Salat / Reciting Surah al-Fatiha behind the Imam?
« on: November 22, 2014, 11:08:35 AM »
Recently it has been experienced that some people stubbornly claim that whosoever does not recite Surah al-Fatiha behind the Imam then his prayer is not acceptable (i.e. It is null and void). Whether it is necessary to recite behind the Imam or not is a minor issue, but when arrogant people make rigid statements like: Prayer of people who do not recite is “NULL AND VOID” then it becomes necessary to write a detailed refutation of such extremists. With the Grace of Allah “NOT” reciting behind Imam is something which is proven directly from Qur'an itself

 

 

In Light of Qur'an

 

 

Qur'an states: When the Qur’an is being recited then “LISTEN ATTENTIVELY AND REMAIN SILENT” so that mercy will be showered upon you".(7:204)

 

 

Tafsir Ibn Kathir R.A: Imam Ibn Kathir (rah) narrates from Abu Musa al-Ash’ari (ra), Abu Huraira (ra) and Ibn Masud (ra) that this ayah was revealed regarding “REMAINING SILENT WHEN IMAM RECITES”… Then Imam Ibn Kathir says:

وقال أبو حنيفة وأحمد بن حنبل: لا يجب على المأموم قراءة أصلاً في السرية ولا الجهرية بما ورد في الحديث «من كان له إمام فقراءته قراءة له» وهذا الحديث رواه الإمام أحمد في مسنده عن جابر مرفوعاً، وهو في موطأ مالك عن وهب بن كيسان عن جابر موقوفاً، وهذا أصح

Translation: Imam Abu Hanifa (rah) and Imam Ahmed bin Hanbal (rah) say that Qirat is not binding upon Muqtadi “WHETHER IN SILENT OR LOUD PRAYER” because it has come in hadith that whosoever has an Imam then his recitation is your recitation, this hadith is narrated by Imam Ahmed in his Musnad from Jabir (ra) in the “MARFU FORM” and in Muwatta Imam Malik via the route of Wahb bin Kaysan who nattated from Jabir (ra) in Mawquf form. (Ibn Kathir said) “THIS IS THE MORE CORRECT VIEWPOINT” [Tafsir Ibn Kathir, (1/281) under 7:204]


May Allah immensely bless Imam Ibn Kathir (rah) who in-spite of being a Shafi'i called the stance of Imam Abu Hanifa and Ahnaaf as “MORE CORRECT”

 

 

Imam Nasai'i (rah) made a whole chapter as:

باب تأويل قوله عز وجل: {وإذا قرىء القرآن
فاستمعوا له وأنصتوا لعلكم ترحمون}

Translation: Interpretation of Allah’s saying: {When the Qur’an is being recited then listen attentively and remain silent so that mercy will be showered upon you}

 

Under this chapter he brought the following hadith

1.


أَخْبَرَني الْجَارُودُ بْنُ مُعَاذٍ التِّرْمِذِيُّ حَدَّثَنَا أَبُو خَالِدٍ الأَحْمَرُ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَجْلاَنَ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ عَنْ أَبِـي صَالِحٍ عَنْ أَبِـي هُرَيْرَةَ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلّم: «إنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَإذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا وَإذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا وَإذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَقُولُوا اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ».

Translation: Hadrat Abu Hurraira (ra) narrates that the Prophet (Peace be upon him) said: Imam has been appointed upon you so that you follow him, when he says takbir then you should also say takbir, “BUT WHEN HE RECITES QUR'AN THEN YOU SHOULD REMAIN SILENT”, when he goes for Ruku and says Sami Allah huliman Hamida then you should say Allahuma Rabbana Lakal Hamd [Sunnan Nasai’I (2/479, Hadith # 919)]

 

2.
حدثنـي أبو السائب، قال: ثنا حفص، عن أشعث، عن الزهري، قال: نزلت هذه الآية فـي فتـى من الأنصار كان رسول الله صلى الله عليه وسلّم كلـما قرأ شيئا قرأه، فنزلت: وَإذَا قُرِىءَ القُرآنُ فـاسْتَـمِعُوا لَهُ وأنْصِتُوا

Translation: Imam al-Zuhri (rah) narrates that this ayah was revealed regarding a young person from Ansaar. When the Prophet (Peace be upon him) recited any ayah in prayer, then he used to recite behind him, “THEREFORE THIS AYAH WAS REVEALED” [Tafsir Ibn Jarir (9/110) under 7:204]


 

 

Leading Sahaba and Tabiyeen on 7:204

 

1.
عن بشير بن جابر، قال: صلى ابن مسعود، فسمع ناسا يقرءون مع الإمام، فلـما انصرف، قال: أما آن لكم أن تفقهوا؟ أما آن لكم أن تعقلوا؟ وَإذَا قُرِىءَ القُرآنُ فـاسْتَـمِعُوا لَهُ وأنْصِتُوا كما أمركم الله.

Translation: Hadrat Bashir bin Jabir (ra) narrates that Ibn Masud (ra) lead people in prayer and he heard some people reciting along with Imam, when he offered salutations he said: “HASN’T TIME COME YET THAT YOU UNDERSTAND” hasn’t time come yet that you use your senses? Remember when Quran is recited then you should listen to it attentively and “REMAIN SILENT, BECAUSE ALLAH HAS ORDERED IT (IN 7:204)” [Tafsir at-Tabri, (9/110) under 7:204]

 

2.
عن سعيد بن جبـير: وَإذَا قُرِىءَ القُرآنُ فـاسْتَـمِعُوا لَهُ وأنْصِتُوا قال: فـي الصلاة الـمكتوبة.

Translation: Hadrat Sa’eed bin Jubair (ra) narrates that {When the Qur’an is being recited then listen attentively and remain silent} is revealed about “OBLIGATORY PRAYERS” [Tafsir Ibn Jarir (9/110) under 7:204]

 

3.
وقال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس في الآية قوله {وَإِذَا قُرِىءَ ٱلْقُرْءَانُ فَٱسْتَمِعُوا۴} يعني في الصلاة المفروضة،

Translation: Ibn Abbas (ra) said that {When the Qur’an is being recited then listen attentively and remain silent} refers to ruling regarding “OBLIGATORY PRAYERS” [Tafsir Ibn Kathir under 7:204]

 

 

 

Now here is proof from leading Tabiyeen:


1.
قال: ثنا أبـي، عن سفـيان، عن أبـي هاشم، عن مـجاهد: فـي الصلاة الـمكتوبة

Imam Mujahid (rah) said: (This ayah is revealed) about “Obligatory prayers” [ibid]

 

2.
قال: ثنا الـمـحاربـي وأبو خالد، عن جويبر، عن الضحاك قال: فـي الصلاة الـمكتوبة

Imam adh-Dhahak (rah) said: (This ayah is revealed) about “Obligatory prayers” [ibid]

 

3.
قال: ثنا جرير وابن فضيـل، عن مغيرة، عن إبراهيـم، قال: فـي الصلاة الـمكتوبة.

Ibrahim al Nakh’ai (rah) said: (This ayah is revealed) about “Obligatory prayers” [ibid]


Hence those people who believe that recitation of Imam is enough for Muqtadi (follower) then they have Quran in their favour whereas people who proclaim that recitation is necessary for Muqtadi have no proof from Quran whatsoever. But to their surprise even overwhelming ahadith refute the claim that recitation on Muqtadi is binding, some have been shown above but let us see some more.

 

 

In Light of Hadith

 

 

Hadith #1

Ata' b. Yasar reported that he had asked Zaid b. Thabit about recital along with the Imam, to which he said: ”THERE SHOULD BE NO RECITAL ALONG WITH THE IMAM IN ANYTHING” and alleged that he recited:" By the star when it sets" (Surah Najm) before the Messenger of Allah (may peace be upon him) and he did not prostrate himself. [Book 004, Number 1192: (Sahih Muslim)]

References:


1. Sahi Muslim, Kitab As Salah, Chapter: Sajood At Tilawah, Volume 1, Page: 406, Hadith No #577

2. Sunan Nasai Al Kubra, Kitab Al Masajid, Volume 2, Page: 6, Hadith No #1034

3. Sunan Nasai, Kitab Al iftitah, Volume 2, Page: 160, Hadith No #960

4. Mustakhraj Abu 'Awanah, Volume 1, Page: 522, Hadith No #1951

 


Hadith #2

حدثني ‏ ‏عن ‏ ‏مالك ‏ ‏عن ‏ ‏أبي نعيم وهب بن كيسان ‏ ‏أنه سمع ‏ ‏جابر بن عبد الله ‏

Yahya related to me from Malik from Abu Nuaym Wahb ibn Kaysan that he heard Jabir ibn Abdullah say, "Someone who prays a raka without reciting the umm al-Qur'an in it has not done the prayer except behind an imam." [Book 3, Number 3.9.40: (Muwatta Imam Malik)]

1. Jami' Tirmidhi, Kitab As Salah, Volume 1, Page: 43, Hadith No #313

2. Sharah Ma'ani al Athaar, Volume 1, Page: 218, Hadith No #1300




Note: It has been noted that some people use the above hadith and they hide the last part of it, without the last part of above hadith which states: "EXCEPT BEHIND AN IMAM" the hadith is incomplete.

 

 

Hadith #3

حدثني ‏ ‏يحيى ‏ ‏عن ‏ ‏مالك ‏ ‏عن ‏ ‏ابن شهاب ‏ ‏عن ‏ ‏ابن أكيمة الليثي ‏ ‏عن ‏ ‏أبي هريرة ‏

Yahya related to me from Malik from Ibn Shihab from Ibn Ukayma al-Laythi from Abu Hurayra that the Messenger of Allah, may Allah bless him and grant him peace, finished a prayer in which he had recited aloud and asked, "Did any of you recite with me just now?" One man said, "Yes, I did, Messenger of Allah." The Messenger of Allah, may Allah bless him and grant him peace, said, "I was saying to myself, 'Why am I distracted from the Qur'an?' " When the people heard the Messenger of Allah, may Allah bless him and grant him peace, say that, they refrained from reciting with the Messenger of Allah, may Allah bless him and grant him peace, when he recited aloud. [Book 3, Number 3.11.46: (Muwatta Imam Malik)]

We would clarify something here so that no excuse is left. Some people  believe that Surah al Fatiha is to be recited by Muqtadi whether in “Jahri (loud) or Sari (silent) prayer, so they cannot say that one should refrain from reciting in loud prayer but may recite in silent prayer. Now  let us see the following ahadith which makes it crystal clear.

 

References

1. Muwatta Imam Malik, Kitab As Salah, Volume 2, Page: 118, Hadith No #286

2. Musnad Ahmad Bin Hambal, Volume 13, Page: 223, Hadith No #7820

3. Imam Bukhari in Qirat Khalf Al Imam, Volume 1, Page: 28, Hadith No #67

4. Sunan Ibn e Majah, Kitab Iqam As Salah Was Sunnah Feeha, Volume 1, Page: 276, Hadith No #848

5. Jami' Tirmidhi, Kitab As Salah, Volume 1, Page: 408, Hadith No #312

6. Musnad Al Bazzar, Volume 15, Page: 286, Hadith No #8780

7. Sunan Nasai, Volume 2, Page: 140, Hadith No #919

8. Sunan Nasai Al Kubra, Volume 1, Page: 475, Hadith No #993

9. Sharah Ma'ani Al Athaar, Volume 1, Page: 217, Hadith No #1290

10. Sahi Ibn e Hibban, Volume 5, Page: 151, Hadith No #1843

11. Ma'jam Al Ausath of Tabrani, Volume 5, Page: 308, Hadith No #5397

12. Sunan Dar Al Qutuni, Volume 2, Page: 99, Hadith No #1217

Hadith #4

حدّثنا وَكِيع عن الضحاك بن عُثمان عن عَبدِ الله بن يَزيد عن ابن ثوبان عن زَيد بن ثَابت قال: لا يقرأ خلف الإمام إن جهر ولا إن خافت.

Zayd bin Thabit (ra) said: There is no recitation behind the Imam “WHETHER IN LOUD OR SILENT (PRAYER)”[Musannaf Ibn Abi Shaybah 1/413


1. Musannaf Ibn e Abi shahibah, Kitab As Salah, Volume 1, Page: 330, Hadith No #3787

2. Musannaf Abdul Razzaq, Kitab As Salah, Volume 2, Page: 137, Hadith No #2802

3. Sharah Ma'ani Al Athaar, Volume 1, Page: 219, Hadith No #1314

4. Sunan Al Kubra-Bayhaqi, Volume 2, Page: 233, Hadith No #2912

 

 

Hadith #5[ Ahadith regarding not reciting behind Imam]

حدّثنا الفضل عن زُهير عن الوليد بن قيس قال: سألت سويد بن غفلة: أقرأ خلف الإمام في الظهر والعصر؟ فقال: لا.

Translation: Walid bin Qays asked Suwaid bin Ghafla (ra): Should there be Qirat behind Imam in the Dhuhr and Asr prayers? He said: No! [Musannaf Ibn Abi Shaybah 1/413]

1. Musnnaf Ibn e Abi shaybah, Volume 1, Page: 331, Hadith No #3796

2. Al Athaar of Muhmmad Bin Hasan, Volume 1, Page: 186, Hadith No #87


 

Hadith #6

ثنا بن نمير عن عبيد الله بن عمر عن نافع عن بن عمر أنه كان يقول من صلى وراء الإمام كفاه قراءة الإمام هذا هو الصحيح

Translation: Hadhrat Abdullah Ibn Umar (radhiallahu anhu) used to repeatedly say: "Whoever performs salaah behind the Imaam, the Imaam’s qiraat suffices for him" Imam Baihaqi declared it “SAHIH”.(Sunan Baihaqi, Chapter regarding “NOT RECITING BEHIND THE IMAM” Volume No.2, Page No. 160]

 

1. Sunan Al Kubra-bayhaqi, Volume 2, Page: 229, Hadith No #2901

2. Musnad Ibn e Ja'd, Volume 1, Page: 178, Hadith No #1150

3. Sharah Ma'ani Al Athaar, Volume 1, Page: 220, Hadith No #1317

4. Sunan Dar Al Qutuni, Volume 2, Page: 260, Hadith No #1503

Hadith #7

حدّثنا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدٍ . حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسى ، عَنِ الْحَسَنِ بْنِ صَالِحٍ ، عَنْ جَابِرٍ ، عَنْ أَبِي الزُّبَيْرِ ، عَنْ جَابِرٍ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ: «مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ، فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ قِرَاءَةٌ».

Translation: Hadrat Jabir bin Abdullah (ra) narrates that the Prophet (Peace be upon him) said: Whosoever has an Imam then the “RECITIATION OF IMAM IS ENOUGH FOR HIM” [Sunnan Ibn Majah (1/277, Hadith # 880)]


1. Musnnaf Ibn e Abi Shaybah, Volume 1, Page: 330, Hadith No #3779 and Volume 1, Page: 331, Hadith No #3802

2. Musnad Ahmad Bin Hambal, Volume 23, Page: 12, Hadith No #14643

3. Sunan Dar Al Qutuni, Volume 2, Page: 113, Hadith No # 1238, Volume 2, Page: 122, Hadith No #1253, Volume 2, Page: 125, Hadith No #1264

4. Muwatta Imam Malik, Kitab As Salah,Volume 1, Page: 62, Hadith No #124

5. Sunan Ibn e Majah, Kitab Iqam As Salah Wa Sunnah Feeha, Volume 1, Page: 277, Hadith No #850

6. Sharah Ma'ani al Athaar, Volume 1, Page: 215, Hadith No #1287

7. Musnad Imam Abu hanifah, Volume 1, Page: 32

8. Ma'jam Al Ausath of Tabrani, Volume 7, Page: 308, Hadith No #7579

 

Hadith #8

حدّثنا أحمد بن داود قال: ثنا يوسف بن عَديّ قال: ثنا عُبيد اللّه بن عمرو، عن أيوب، عن أَبي قلابة، عن أنس رضي الله عنه قال: صلى رسول الله، ثم أقبل بوجهه فقال: «أتقرؤون والإمام يقرأ» فسكتوا فسألهم ثلاثاً فقالوا إنا لنفعل، قال: «فلا تفعلوا».

Translation: Anas bin Malik (ra) narrates: The Prophet (Peace be upon him) led us in prayer and then turned towards the people and asked: Do you recite while Imam is reciting? The Prophet asked this thrice! They replied Yes! The Prophet said “DO NOT DO IT” [Imam Tahawi in Sharh al Ma’ni al Athaar (Volume 1, Page: 218, Hadith no #1302)]


Qirat khalf Al Imam-Bayhaqi, Volume 1, Page: 175, Hadith No #385



Conclusion: We hope that the above article would be enough for people to understand that the great Hanafi Muslims who believe in not reciting behind Imam and that one’s prayer is valid without it, they are in “PERFECT CONFORMITY” with Qur'an and Sunnah. This article means no offense to any of the other 3 valid schools of Jurisprudence because following a valid school of jurisprudence is a source of security from wrath of Allah, however this does not apply on the La Madhabiyyah sect.

21
দুআর ফলাফল চোখে দেখি বা না  দেখি আমাদেরকে দুআ করে যেতে হবে। কিছু কিছু  ক্ষেত্রে দুআর ফলাফল একেবারেই কম দেখা যায়, বলতে গেলে দেখাই যায় না। এমন একটি ক্ষেত্র হল, যখন মুসলমান মযলুম হতে থাকে, তাদের  উপর বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতন চলতে থাকে, তখন দুআ কান্নাকাটি করা হয়, চোখের পানি ফেলা হয়, কুনুতে নাযিলা পড়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ত ঝরতেই থাকে, আগুন জ্বলতেই থাকে। একসময় আগুন জ্বলা বন্ধ হয় কিন্তু মানুষ যেভাবে দুআ করেছিল, যেভাবে কান্নাকাটি করেছিল, সেভাবে কিছুই হয় না। তাৎক্ষণিকভাবেও হয় না, কাছাকাছি সময়েও হয় না।

তো যে সব ক্ষেত্রে ফলাফল চোখে দেখা যায় না সেসব ক্ষেত্রেও আমাদেরকে দুআ করে যেতে হবে। দুআ করে একথাও বলা যাবে না যে, আমি দুআ করেছি, দুআ কবুল হয় না। একথা বলা বেয়াদবী এবং দুআর মধ্যে বেবরকতির কারণ। বেবরকতির অর্থ হল, দুআ কবুল না হওয়া।

দুআ কবুল হওয়ার জন্যে আল্লাহ অনেক উপায় দান করেছেন। সময় দিয়েছেন। আমল দিয়েছেন। ব্যক্তি দিয়েছেন। অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, অমুক সময় দুআ কবুল হয়। অমুক স্থানে দুআ কবুল হয়। অমুক ব্যক্তির দুআ কবুল হয়।  অমুক অমুক আমলের পর দুআ কবুল হয়। রোযাদারের দুআ কবুল হয়। মুসাফিরের দুআ কবুল হয়। সমত্মানের জন্যে মা-বাবার দুআ কবুল হয়। দুআ কবুল হওয়ার কত ঘোষণা আল্লাহ কতভাবে দিয়েছেন।

দুআ কবুল হওয়ার যেমন অনেক উপায় রয়েছে তেমনি দুআ কবুল না হওয়ারও অনেক কারণ রয়েছে। সেগুলো থেকেও আমাদেরকে বাঁচতে হবে।

আরেকটা বিষয় হল, আমি যেভাবে চেয়েছি আমার দুআ জানা বা অজানা কোনো কারণে সেভাবে কবুল হয়নি, তখন আমাকে দুটি কথা মনে রাখতে  হবে-

এক. আমি দেখিনি তাই বলে একথা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে, আমার দুআ কবুল হয়নি। দুআ কবুল হওয়ার অনেক পদ্ধতি আছে। কোন পদ্ধতিতে দুআ কবুল হয়েছে তা আমি জানি না। আল্লাহই ভাল জানেন। দুই. আমি দুআ কবুল হতে  দেখিওনি, আবার আমার কিছু ত্রম্নটির কারণে দুআ  কবুল হয়েছে  বলেও মনে হয় না, তখনও আমার করণীয়, দুআ করা। একেতো আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে দুআ কবুল হয়নি। দ্বিতীয়ত যদি বাসত্মবিকই দুআ কবুল না হয়ে থাকে তাহলেও আমি দুআ বাদ দিতে পারি না।

কী কী কারণে দুআ কবুল হয় না

কী কী কারণে দুআ কবুল হয় না। কবুল না হওয়ার অর্থ একেবারে কবুল হবে না এটা নয়। কবুল না হওয়ার অর্থ হল, কবুল হওয়ার কোনো ওয়াদা নেই। নিশ্চয়তা নেই। নয়ত আল্লাহ তাআলার কুদরত আছে, আল্লাহ চাইলে যে কোনো সময় যে কারো দুআ কবুল করতে পারেন।

দুআ কবুল না হওয়ার প্রথম কারণ হল, হাদীস শরীফে এসেছে,

إن الله أمر المؤمنين ما أمر المرسلين... يا أيها الذِيْنَ آمَنُوْا كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ و اعْمَلُوْا صَالِحًا ... 

আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সে জিনিসের আদেশ করেছেন যে জিনিসের আদেশ তিনি নবীদেরকে করেছেন। তা হল, হালাল খাও এবং সৎকাজ কর। রাসূলদেরকেও আল্লাহ সম্বোধন করে বলেছেন, তোমরা হালাল রিযিক গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ইবাদত কর।

ثم ذكر الرجل أشعث أغبريطيل السفريمد يديه يقول: يا رب يا رب! وملبسه حرام و مشربه حرام و مأكله حرام !

 আল্লাহর এক বান্দা লম্বা সফরে বের হয়েছে। এত দীর্ঘ সফর যে, মাথার চুল এলোমেলো হয়ে গেছে এবং কাপড়চোপড় ময়লা হয়ে গেছে।  সফরে তো এমনি দুআ কবুল হওয়ার কথা। তার উপর তার এই করুণ হালতে তো আরো বেশী করে কবুল হওয়ার কথা। তো সে এক বিপদে পড়ে দুহাত আসমানের দিকে প্রসারিত করে এভাবে আল্লাহকে ডাকছে, হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! সে এভাবে দুআ করেই যাচ্ছে। অথচ লোকটার অবস্থা হল, তার খাবার হারাম। যা পান করে তা হারাম। আবার যা পরিধান করে তাও হারাম। সুতরাং এর দুআ কবুল হবে কীভাবে? তো গেযা হালাল না হওয়া দুআ  কবুল না হওয়ার একটি কারণ। আবার কোনো গোনাহের বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়া, যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা, এটি এমনিতেও নাজায়েয আবার দুআ কবুল না হওয়ার একটি কারণ।

দুআ কবুল না হওয়ার আরেকটা কারণ হল, ব্যাপকভাবে যখন সমাজে নাহী আনিল মুনকার বন্ধ হয়ে যাবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যখন একেবারেই ছেড়ে দেয়া হবে, ফাহেশা এবং অশস্নীলতা যখন মহামারির রূপ ধারণ করবে তখনও দুআ কবুল হবে না। এ সকল বিষয়ে কুরআন মাজীদে সতর্ক করা হয়েছে।

وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ 

(তরজমা) তোমরা ঐ বিপর্যয়কে ভয় কর, যা বিশেষভাবে তোমাদের মধ্যে যারা যুলুম করে কেবল তাদেরকেই আক্রান্ত করে না। -সূরা আনফাল ৮ : ২৫

অনেক গোনাহ আছে এমন, এর উপর শাসিত্ম যখন আসে তখন শুধুই গোনাহগারদের উপর আসে না, ব্যাপকভাবে সকলের উপর আসে। আর এ সকল ফাহেশা ও অশস্নীলতা যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে, যখন নাহী আনিল মুনকার বন্ধ হয়ে যায়, কোনো কওম কোনো জাতি কোনো দেশ বা সমাজে যদি অশস্নীলতা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, পাপাচার, অন্যায়, অত্যাচার ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষভাবে সমাজের সেই শ্রেণীর মাঝে যে শ্রেণীর মাধ্যমে এ মন্দ কর্ম দূর হওয়ার কথা, তখন এর শাসিত্ম হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। এখন উম্মত আছে এই হালতে। আমরা নাফরমানী করতে করতে আল্লাহকে এত নারায করেছি যে, যেদিক থেকে আমাদের সংশোধনী আসবে সেদিকটিই খারাপ হয়ে আছে।

আমি দুআ করে যাব

আর দুআ আমি যেভাবে চাচ্ছি সেভাবে কবুল হোক বা না হোক আমি দুআ করে যাব। কারণ আমার উপার্জন যদি হালাল হয়, পুরো সমাজে নাহী আনিল মুনকার করার সামর্থ্য আমার নেই, আমার ঘরে আমার সামর্থ্য আছে। এটুকু যদি করি, তাহলে আমি কীভাবে এ কথা বলি যে, দুআ কবুল হবে না।  হাঁ, আক্ষরিক অর্থে দুআ কবুল খুব কমই হয়ে থাকে। বেশীর ভাগ এরকম হয় যে, আপনি যেভাবে চাচ্ছেন তার চেয়ে একটু ব্যতিক্রমভাবে দুআ কবুল হবে। তারপরও বোঝা যায়, আল্লাহ দুআ কবুল করেছেন। দুআ কবুল হওয়ার যে নকশা আপনি তৈরি করেছেন, সেই নকশা হয়ত আল্লাহ বাসত্মবায়ন করবেন না। কিন্তু আপনার জরুরত আল্লাহ পুরা করবেন। তারপরও কখনো কখনো আপনার নকশা মোতাবেক দুআ কবুল হয়ে যেতে পারে। কবুল হওয়ার একটা সূরত আছে, যেটা বোঝার কোনো উপায় নেই।  সেটা হল, হাদীস শরীফে এসেছে, আপনি চেয়েছেন দুনিয়ার জন্যে, আল্লাহ রেখেছেন আখেরাতের জন্যে। কিয়ামতের দিন যখন বান্দা দেখবে যে, আল্লাহ দুআর বদলে কত কিছু রেখেছেন তখন বলবে, আল্লাহ! আমি তো এত কিছু করিনি । এগুলো আমার আমলনামায় কোত্থেকে এল? তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি যে দুনিয়ায় দুআ করেছিলে সেগুলো দুনিয়ায় দেয়া হয়নি। এখন সেগুলো আরো উত্তমরূপে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু দুনিয়ায় সেটা আমাদের বোঝার উপায় নেই।

দুআ কবুল হওয়ার আরেকটি সূরত হল, আমি ছোট কোনো মুসিবতে পড়লাম, আল্লাহর কাছে দুআ করলাম। আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করুন। কিন্তু মুসিবত থেকে আমি উদ্ধার পেলাম না। তখন আমি মনে করি, আমার দুআ কবুল হয়নি । অথচ আমার তকদিরে ছিল আরো বড় মুসিবত। আল্লাহ আমাকে এই ছোট মুসিবতে আক্রান্ত করে সেই বড় মুসিবত থেকে রেহাই দিয়ে দিয়েছেন। সেই বড় মুসিবত থেকে বাঁচার জন্যে  আমি দুআ করিনি। কিমত্মু এই ছো্ট মুসিবতের দুআর বরকতে আল্লাহ আমাকে সেই বড় মুসিবত থেকে বাচিয়ে দিলেন।

অনেক সময় রাস্তায় আমরা যানজটে পড়ি। তখন যানজন থেকে বাঁচার জন্যে আল্লাহর কাছে দুআ করি ।  কিন্তু দেখা গেল যানজট থেকে বাঁচতে পারলাম না ঠিক কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে বড় বিপদ থেকে বাচিয়ে দিয়েছেন। একটু সামনে যেতেই দেখা গেল একটা গাড়ি খাদের মধ্যে উল্টে পড়ে আছে। যানজটে না পড়লে হয়ত আমাদের গাড়িটা সেখানেই থাকত। কবুল হওয়ার অদৃশ্য সূরতগুলো তো আমরা জানি না। তাহলে আমি কীভাবে এ কথা বলি যে, আমার দুআ কবুল হয়নি।

ফখরুদ্দীন রাযী রাহ.-এর ঘটনা তাকী ছাহেব হুযুর লিখেছেন, এক লোক একদা এক বিচ্ছুকে দেখল অস্বাভাবিক দ্রম্নত গতিতে কোথাও যাচেছ। লোকটি কৌতুহলী হয়ে বিচ্ছুটির পিছু নিল। বিচ্ছুটি আসতে আসতে একটি নদীর কিনারে আসল। নদীতে একটা কচ্ছপ ভেসে উঠল। বিচ্ছুটি কচ্ছপের পিঠে লাফ দিয়ে উঠে গেল। লোকটির কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। সেও একটা নৌকা নিয়ে নদী পার হয়ে গেল। ওপারে গিয়ে দেখতে পেল এক লোক শুয়ে আছে। আর তার পাশে একটি বিষধর সাপ ফণা তুলে আছে ছোবল মারার জন্যে। সাপটি যেই ছোবল মারতে যাবে বিচ্ছুটি অমনি সাপকে  দংশন  করল। ছোবল মারার আগেই বিচ্ছুর দংশনে সাপটি মরে গেল। এরকম আরো কত ঘটনা ঘটতে থাকে, আমাদের খবর থাকে না।

দুআর ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় হযরত থানুবী রাহ. নিজ ভাষায় বলেছেন, একজন আল্লাহর কাছে দশটা টাকা চেয়েছে। এটা সে যুগের কথা। এ যুগে তো মানুষ দশ টাকা আল্লাহর কাছে চাইতেও যাবে না। অথচ হাদীস শরীফে এসেছে, ছোট থেকে ছোট জিনিসও আল্লাহর কাছে চাওয়া দরকার। তো সে দশ টাকা আল্লাহর কাছে চাইল। এখানে একটা মূলনীতি বলে দিচ্ছি, দুআ করার অনেক বড় একটি আদব হচ্ছে আল্লাহর কাছে জরুরত চাওয়া। আল্লাহকে বলা আল্লাহ আমার অমুক জরুরত পুরো করে দাও। আমার কর্জ আদায় করে দাও। আমাকে দান সদকা করার তাওফীক দাও। নির্দিষ্টভাবে বলা, আল্লাহ! আমাকে দশ হাজার টাকা দাও, এটা উচিত নয়।

তো আল্লাহর কাছে চাওয়ার সময় আমাদের জরুরত চাইতে হবে। ধরলাম, আল্লাহ আমাকে দশ হাজার টাকা দিলেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এই টাকা চেয়েছি সেই উদ্দেশ্য পূরণ হল না। থানবী রাহ.-এর কথা বলছিলাম। থানবী রাহ. বলছিলেন, সে আল্লাহর কাছে দশটা টাকা চাইল। কিন্তু তার দশ টাকার ব্যবস্থা হল না। যেদিন দুআ করেছিল, সেদিন রাতে তার তাহাজ্জুদের তাওফীক হল। এমনিতে সাধারণত তার তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য হয় না। কিন্তু আজ দুআর বদৌলতে তার তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য হয়ে গেল। সুতরাং নিশ্চিতভাবে এ কথা বলা যায় না যে, আমাদের দুআ কবুল হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুআ করার একটি পদ্ধতি হল, তিনি ব্যাপক দুআ করতেন । অর্থাৎ তিনি এমন শব্দে দুআ করতেন যে শব্দের মধ্যে ব্যাপকতা আছে। রাববানা আতিনা... একটার ভেতর সব এসে গেছে। আবার দুআ করছেন আল্লাহুম্মাগফির লিল মুমিনীনা আল্লাহ সকল মুমিন নারী পুরুষকে আপনি মাফ করে দিন। আমার এক দোসত্ম আমাকে বললেন তার জন্যে দুআ করি কি না। আমি বললাম, হাঁ। তিনি বললেন, কীভাবে করেন? পনের কোটির মধ্যে দিয়ে দেন নাকি! তিনি মনে করেছিলেন, আমি দুআর মধ্যে বলি হে আল্লাহ ! বাংলাদেশের সকল মুসলমানকে আপনি মাফ করে দিন। কিন্তু আমি তো কখনো এভাবে দুআ করি না।  আমি তো সারা পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্যে দুআ করি। তো আমি বললাম, না আমি আপনাকে পনের কোটির মধ্যে দেই না। আমি আপনাকে  একশ কোটির মধ্যে দেই । কিন্তু তাতে সমস্যা কী? সকল মুসলমান বললে আল্লাহর চোখ থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। নাম নিয়ে দুআ করলে আর সেই বাদ পড়ার আশংকাটা থাকে না, আপনি কি মনে মনে তাই ভাবছেন?  না, আল্লাহর কাছে তো একজনের কথা বললে যেমন, সকলের বললেও তেমন। আমি তো বলি, আপনি যদি তালিকা পড়তে থাকেন আল্লাহর সামনে, তাহলে ভুলে তালিকা থেকে দুয়েকজনের নাম বাদ যেতে পারে। কিন্তু আপনি যখন ‘লিল মুমিনীন’ বলেছেন তখন যমিনের উপর আর যমিনের নীচে যেখানে যত মুমিন আছে আল্লাহর কাছে সব এমনভাবে দাখিল হয়ে গেল যেমনভাবে একজন দুজনের নাম পড়া হলে হয়। কিন্তু মনের সান্তনা বলে একটা কথা আছে। এজন্যে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বন্ধুর নাম নিয়ে দুআ করি। কিন্তু ইজতেমায়ী দুআর মধ্যে তো সকলের নাম নিয়ে দুআ করা সম্ভবও নয়। আর ইজতেমায়ী দুআ বেশী লম্বা করা উচিতও নয়। কারণ কারো কোনো জরুরত থাকতে পারে। আর ইজতেমায়ী দুআয় নাম নেয়াটা অনেকের জন্যে বিরক্তিরও কারণ হতে পারে। যখন ইনফেরাদী দুআ করবেন তখন একজন একজন করে সকলের নাম নেয়া যায়।

 দুআর মধ্যে নিয়ম হল, প্রথমে ব্যাপকভাবে দুআ করবেন। তারপর খাসভাবে দুআ করবেন। তার আপনার উপর হক রাখে, যারা আপনার সাথে সংশিস্নষ্ট, যারা আপনার কাছে দুআ চায় তাদের একেক জনের নাম নিয়ে নিয়ে দুআ করুন। এভাবে দুআকে ব্যাপক করুন।

দুআ করার আরেকটি পদ্ধতি হল, জরুরতকে ব্যাপক করা। এভাবে বলা আল্লাহ যত জরুরত আছে তুমি গায়েব   থেকে পূরণ করে দাও। যত নেক তামান্না আছে তুমি গায়েব থেকে পুরো করে দাও। এই ব্যাপক শব্দের মধ্যে আমার সকল জরুরত চলে এল। কিন্তু এরপরও আমি আমার বিশেষ বিশেষ জরুরত ভিন্ন ভিন্নভাবে আবার বলব।

আমরা দুআ করি

اللهُمَّ اشْفِ مَرْضَانَا و مَرْضى الْمُسْلِمِيْنَ جَمِيْعًا

আল্লাহ আপনি আমাদের অসুস্থদেরকে এবং মুসলমানদের সকল অসুস্থদেরকে সুস্থ করে দিন। তো এখানে ব্যাপকভাবে দুআ করা হল। পরে নাম নিয়ে নিয়ে আমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ তাদের জন্যে দুআ করতে পারি।

 দুআর মধ্যে আরেকটা বিষয় হল, কবুলিয়াতের আশা নিয়ে দুআ করা এবং দৃঢ়তার সাথে দুআ করা । যেন আল্লাহর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েই দাও। আমাদেরকে মাগফিরাত করেই দাও। আল্লাহ তুমি মন চাইলে দাও, মন চাইলে মাফ করে দাও-এভাবে না। এভাবে বললে আর দুআ করার দরকারটা কী ছিল? আর আল্লাহর খাযানায় কি কোনো কিছুর অভাব আছে। হাদীসে তো এসেছে আল্লাহ যদি সকলের সকল জরুরত পুরা করে দেন তারপরও আল্লাহর খাযানা বিন্দুমাত্র কমবে না। সুতরাং চাওয়ার সময় আমি কম চাইতে যাব কেন?

আরেকটা বিষয় হল, অন্তর হাযির রেখে আল্লাহর কাছে দুআ করা। অন্তর যদি গাইরে হাযির থাকে তাহলে দুআ কবুল  হয় না। হাত উঠিয়ে রাখলাম। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে অন্যদিকে। তাহলে দুআ কবুল হবে না। মুখে তলব দিলে তলব নেই এটা দুআ কবুল না হওয়ার অনেক বড় একটি কারণ।

আরেকটা বিষয় হল কান্না বা কান্নার ভাব নিয়ে দুআ করা। কান্না মানুষের ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। কখনো অনেক চেষ্টা করেও পারা যায় না। কখনো ছোটখাট কারণেও কান্না চলে আসে । কিন্তু কান্নার ভাব ধরা এটা সব সময় সাধ্যের ভেতর আছে। হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কাঁদো বা কান্নার ভান কর।’ আমাদের জন্যে কত সহজ করে দেয়া হয়েছে।

আর দুআর মধ্যে কোনো ইমামতি নেই। এটা শায়খুল হাদীস আল্লামা আযীযুল হক ছাহেবের শব্দ। প্রফেসর হামীদুর রহমান ছাহেবও এ কথা খুব নকল করেন। আজকাল অনেকে বলেন, দুআ পরিচালনা করবেন অমুক। আহা! দুআ বুঝি পরিচালনার জিনিস। দুআর মধ্যে ইমামতি নেই । কথাটি অত্যন্ত অর্থবহ। নামাযের মধ্যে যেমন ইমাম সাহেব তাকবীর বলেন, তারপর অন্যরা তার অনুসরণ করেন। ইমাম সাহেবের আগে কোনো কিছু করলে যেমন নামায হবে না তেমনি  অনেকে মনে করেন দুআর মধ্যে  ইমাম সাহেবের আগে কিছু করলে হবে না। না, এটি মোটেই জরুরি কোনো বিষয় নয়। তিনি শুরু করবেন তার সুবিধামত আর আমি শুরু করব আমার সুবিধামত। তিনি যে দুআ করছেন আমি চাইলে তার দুআর  উপরও আমিন বলতে পারি। আর চাইলে আমার জরুরতের বিষয়েও আমি নিজে নিজে আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি। আর আমার এখন বিস্তারিত দুআ করার সময় নেই। আমি কিছুক্ষণ দুআ করে চলে গেলাম। কোনো সমস্যা নেই। অথবা আমি শরীক হলাম না। আলোচনা হল। আলোচনার পর দুআ শুরু হল। কিন্তু  আমি দুআয় শরীক না  হয়ে চলে গেলাম। তাহলে এতে আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু মানুষ মনে করে দুআয় থাকা বয়ানে থাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা কেউ দুআয় শরীক না হলে বলে, আরে! এতক্ষণ বয়ানে শরীক হল, এখন দুআয় শরিক না হয়েই চলে গেল। অথচ বাসত্মবিকপক্ষে দুআর চেয়ে বয়ানের গুরুত্ব বেশী। আর দুআ তো সে নিজে নিজেই করতে পারে। 

22
প্রশ্ন : মুহতারাম, কিছুদিন পূর্বে চেয়ারে বসে নামায বিষয়ে একটি রিসালা (পুস্তিকা) হাতে পেলাম, যা মূলত এ বিষয়ে জামেয়া দারুল উলূম করাচী-এর  ফতওয়া বিভাগ থেকে জারিকৃত বিভিন্ন সময়ের ফতওয়ার সংকলন। মাকতাবা দারুল উলূম করাচী থেকে প্রকাশিত। শুনেছি এর বাংলা অনুবাদও হয়েছে। এই রিসালা পড়ার পর আমার জেহেনে কিছু প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। আশা করি এ সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞ করবেন। প্রশ্নগুলো নিম্নরূপ :

১. রিসালাটির বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি জমিনের উপর সিজদা করতে অক্ষম সে যদি চেয়ারে নামায আদায় করে তাহলে তার উপর জরুরী সামনে তখতা, টেবিল বা অন্যকিছু রেখে তার উপর সিজদা করা। কারণ, এটাও নিয়মতান্ত্রিক সিজদা। সুতরাং যে ব্যক্তি এভাবে সিজদা করতে সক্ষম তাকে এভাবে সিজদা করতে হবে। শুধু ইশারার মাধ্যমে সিজদা করা সহীহ হবে না।’’

এখন আমার প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামকে তো মাসআলাটি এভাবে বলতে শুনিনি। এখানে তো সাধারণত দেখা যায় এ ধরনের মাযূর মুসল্লীগণ ইশারায় রুকু-সিজদা আদায় করেন। এখন উল্লিখিত ফওয়ার আলোকে আমাদের কী করা উচিত?

২. যে ব্যক্তি দাড়িয়ে নামায পড়তে সক্ষম কিন্তু রুকু সিজদা করতে সক্ষম নয়, অথবা রুকু করতে সক্ষম কিন্তু সিজদা করতে অক্ষম। আমাদের দরসী কিতাবাদীতে পড়েছি, এই ব্যক্তি দাড়িয়ে বা বসে যেভাবে ইচ্ছা নামায আদায় করতে পারবে। কিন্তু উত্তম হল, এই ব্যক্তি বসে নামায আদায় করবে এবং ইশারায় রুকু সিজদা করবে। আমি এক আলেমের কাছে এই মাসআলার দলীল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা’তে (১ : ৩২৫) এর একটি দলীল উল্লেখ আছে।

দারুল উলূম করাচী-এর রিসালায়ও এই মাসআলা এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার একটি বিষয়ে একটু খটকা লাগছে। তা হল, যে ব্যক্তি দাড়িয়ে নামায আদায় করতে সক্ষম তার দাড়িয়েই নামায আদায় করা উচিত। রুকু সিজদা করতে সক্ষম নয় তো রুকু সিজদা ইশারায় আদায় করবে। কিন্তু ‘কিয়াম’ (দাড়ানো) কেন ছেড়ে দেবে? এই মাসআলায় কি ফিকহে হানাফীতে শুধু একটিই ‘কওল’ (মত) নাকি অন্য ‘কওল’ও আছে? যদি থাকে তাহলে দলীলের আলোকে কোনটি বেশি মজবুত?

৩. আজকাল চেয়ারে বসে নামায পড়ার প্রবণতা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক মানুষ তো শুধু আরামের জন্য চেয়ারে বসে নামায আদায় করেন। আবার কিছু মানুষ যদিও তাদের রুকু সিজদা করতে কষ্ট হয়, কিন্তু জমিনে বসে ইশারায় রুকু সিজদা করতে পারেন। তা সত্ত্বেও তারা নির্দ্বিধায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করেন।

আমার প্রশ্ন হল, শুধু আরামের জন্য চেয়ারে বসে নামায আদায় করা কি ঠিক? যদি কেউ তা করে তার নামায কি সহীহ হবে? আর যে ব্যক্তি জমিনে বসে নামায আদায় করতে পারে তার জন্য কি শুধু এই ওযরে চেয়ারে বসে নামায আদায় করা সহীহ হবে যে, সে রুকু সিজদা করতে সক্ষম নয়?

আশা করি বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানাবেন।

উত্তর : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

এক.

যে ব্যক্তি জমিনে সিজদা করতে অক্ষম তার ব্যপারে হুকুম হল, সে ইশারায় সিজদা আদায় করবে। এমন মাযূর ব্যক্তি যদি অন্য কোন কারণে চেয়ারে বসে নামায আদায় করেন তাহলেও তিনি ইশারায়ই সিজদা করবেন, সামনে তখতা বা টেবিল রেখে তাতে সিজদা করার প্রয়োজন নেই। যদি কেউ এমনটি করে তা সিজদা বলে গণ্য হবে না। অবশ্য এর দ্বারা যেহেতু ইশারার কাজ হয়ে যায় ফলে তার সিজদা আদায় হয়ে যাবে।

চেয়ারে বসে সামনে তখতা বা টেবিল ইত্যাদির উপর কপাল রাখাকে দুই কারণে সিজদা বলা সহীহ নয়। ১. সিজদার জন্য শর্ত হল, উভয় হাঁটু জমিনের উপর রাখা। ২. সিজদার সময় কপালের অংশ কোমরের অংশ থেকে নীচু থাকা দরকার। চেয়ারে বসে সামনের কোন কিছুর উপর কপাল রাখলে উল্লিখিত উভয় শর্ত পাওয়া যায় না। সুতরাং সেটাকে হাকীকী সিজদা (নিয়মতান্ত্রিক সিজদা) বলা ঠিক নয়।

আর আপনি মাকতাবা দারুল উলূম করাচী থেকে প্রকাশিত রিসালার বরাতে যে কথা লিখেছেন, তা যদিও দারুল উলূম করাচীরই কিছু ফতওয়ায় উল্লেখ আছে, কিন্তু সম্প্রতি এই মাসআলার বিষয়ে উসতাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুমের এক সদ্য লিখিত ফতওয়া আমাদের হস্তগত হয়েছে। যাতে দারুল উলূম করাচী-এর দারুল ইফতার অন্যান্য হাযারাতের দস্তখতও রয়েছে। তাতে হযরত দামাত বারাকাতুহুম আগের ফতওয়া থেকে ‘রুজুর’ (প্রত্যাহারের) ঐ লেখায় হযরত ‘‘ফাতওয়া শামী’’র ঐ ‘ইবারাতের’ (বক্তব্য) উপর বিষদ আলোচনা করেছেন যার ভিত্তিতে দারুল উলূমের আগের ফতওয়া দেয়া হয়েছিল। এবং তিনি এটা প্রমাণ করেছেন যে, ঐ ইবারাতের ভিত্তিতে এই মাসআলার দলীল দেয়া সিদ্ধ নয়। তিনি স্পষ্ট লিখেছেন :

  "لہذا كرسى پر بيٹهكر سامنے كسى چيز پر سجدہ كرنے كو "سجدۂ حقيقيہ" (باقاعدہ سجدہ) كہنا درست نہين"

 ‘‘... তাই চেয়ারে বসে সামনে কোন কিছুর উপর সিজদা করাকে ‘হাকীকী সিজদা’ (নিয়মতান্ত্রিক সিজদা) বলা ঠিক নয়।’’

তিনি আরও লিখেছেন,

كرسى پر بيٹهنے كى صورت پر علامہ شامى رحمة اللہ عليہ كى بات صادق نہيں آتى، اوراس كى بنياد پر سامنے كى كسى چيز پر سجدہ كرنے كو واجب نہيں كہا جا سكتا ہے.

 ‘‘চেয়ারের উপর বসে নামায আদায়কারীর ক্ষেত্রে আল্লামা শামীর ঐ বক্তব্য প্রযোজ্য নয় এবং এর ভিত্তিতে সামনে কোন কিছু রেখে তার উপর সিজদা করাকে ওয়াজিব বলা যায় না।’’

এই সদ্য লিখিত ফতওয়ার শেষে হযরত লিখেছেন,

اس تحرير سے پہلے دار الافتاء جامعہ دار العلوم كراچى سے جارى ہونے والے فتاوى ميں كوئى جزء اس تحرير كے خلاف ہےاس سے رجوع كيا جاتا ہے.

 ‘‘এই লেখার পূর্বে দারুল ইফতা, জামেয়া দারুল উলূম করাচী থেকে জারিকৃত ফতওয়ার যে সকল অংশ এই লেখার খেলাফ হয় তার থেকে ‘রুজু’ করা হচ্ছে।’’ অর্থাৎ তা প্রত্যাহার করা হল।

এই ফতওয়ার উপর তারিখ দেয়া আছে ২ রবিউস সানী ১৪৩৪হিজরী।

আর আপনি ঐ রিসালার বরাতে যেই ফতওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তা বর্তমান ফতওয়ার চেয়ে অনেক আগের তারিখের।

বর্তমান ফতওয়ায় যাঁদের সম্মতিসূচক দস্তখত রয়েছে :

1.    আব্দুর রউফ সাখ্খারবী (মুফতী)

2.   মাহমুদ আশরাফ উসমানী (মুফতী)

3.  আব্দুল মান্নান (নায়েবে মুফতী)

4.    আব্দুল্লাহ [বরমী] (সদস্য)

5.   আসগার আলী রাববানী (সদস্য)

এই ফতওয়ায় দারুল ইফতার সীলের মধ্যে ফতওয়া নাম্বার লেখা আছে : ৪১/১৫০৮।

দুই.

যে ব্যক্তি জমিনে সিজদা করতে সক্ষম নয় তার ব্যাপারে হানাফী ফকীহগণের প্রসিদ্ধ মত ওটাই যা আপনি দরসী কিতাবের হাওয়ালায় লিখেছেন যে, ‘‘এমন ব্যক্তির উপর দাড়িয়ে নামায আদায় করা জরুরী নয় বরং সে বসে ইশারায় নামায আদায় করবে।’’

এ বক্তব্যটি যদিও একেবারে দলীলবিহীন নয়, কিন্তু অনেক মুহাক্কিক ফকীহের দৃষ্টিতে এই মাসআলায় দলীলের বিচারে ফিকহে হানাফীর ঐ বক্তব্য বেশি শক্তিশালী যা ইমাম আবু হানিফার রাহ. শাগরিদ ইমাম যুফার ইবনে হুযাইল রাহ.-এর মাযহাব। আর এটাই বাকী তিন ইমামের (ইমাম মালেক রাহ., ইমাম শাফেয়ী রাহ. এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহ.) মাযহাব। আর তা হল, এমন ব্যক্তি ( যে ব্যক্তি জমিনের উপর সিজদা করতে অক্ষম) যদি দাড়িয়ে নামায আদায় করতে সক্ষম হয় তাহলে তাকে দাড়িয়েই নামায আদায় করতে হবে। আর যেহেতু সে সিজদা করতে অক্ষম তাই সে ইশারায় সিজদা করবে (যদি রুকু করতেও অক্ষম হয় তাহলে রুকুও ইশারায় আদায় করবে)। জমিনে সিজদা করতে অক্ষম হওয়ার কারণে দাড়ানোর ফরয ছাড়া যাবে না।

মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুমের যে নতুন ফতওয়ার কথা উপরে আলোচনা হয়েছে তাতে তিনি এই মাসআলার উপর বিশদ আলোচনা করেছেন এবং ‘ফাতহুল কাদীর’ খ. ১ পৃ. ৪৬০, ‘আননাহরুল ফায়েক খ. ১ পৃ. ৩৩৭ এবং ‘ইলাউস সুনান খ. ৭ পৃ. ২০৩ ইত্যাদির বরাতে দালায়েলের আলোকে এই ‘কওল’ (বক্তব্য)-কেই শক্তিশালী বলেছেন যে, কিয়ামের ফরয আদায় থেকে শুধু ঐ ব্যক্তি ছাড় পাবে যে দাড়িয়ে নামায আদায় করতে অক্ষম। সিজদা করতে অক্ষম হওয়ার কারণে কিয়াম-এর ছাড় পাবে না। তিনি সেখানে বিশদভাবে ঐ কথারও খন্ডন করেছেন যে, শুধু সিজদার জন্য কিয়াম ফরয করা হয়েছে। তাই সিজদা করতে অক্ষম হলেই কিয়াম জরুরী থাকে না। তিনি একাধিক দলীল দ্বারা এ কথা প্রমাণ করেছেন যে, কিয়াম নামাযের একটি স্বতন্ত্র ফরয তা শুধু সিজদার জন্য নয়।

এমন কি হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম ঐ ফতওয়ায় এ কথাও লিখেছেন যে, যে ব্যক্তি দাড়িয়ে নামায শুরু করতে পারে কিন্তু সিজদার জন্য জমিনে বসার পর আবার দাড়াতে তার অনেক কষ্ট হয়, এমন ব্যক্তিও কিয়াম (দাড়িয়ে নামায পড়া) একেবারে ছাড়বে না। বরং প্রথম রাকাত দাড়িয়ে আদায় করবে। এরপর দাড়াতে কষ্ট হওয়ার কারণে বাকী নামায বসে আদায় করবে।

এর সাথে সাথে হযরত দামাত বারাকাতুহুম এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, জমিনের উপর সিজদা করতে অক্ষম কোন মুসল্লী যদি ফিকহে হানাফীর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী আমল করে এবং পুরা নামায বসে আদায় করে এবং  ইশারায় রুকু সিজদা করে তাহলে তার নামায ফাসেদ হয়েছে বলব না। কারণ, গায়রে মুজতাহিদের (মুজতাহিদ নয় এমন) জন্য মুজাতাহিদের ‘কওল’ও (বক্তব্য) দলীলে শরয়ী। সুতরাং যে ব্যক্তি সে অনুযায়ী আমল করেছে আমরা বলব না তার নামাজ ফাসেদ হয়েছে।

(لأن المسألة من الاجتهاديات، و القول المشهور و إن كان مرجوحا من حيث الدليل و لكنه ليس من الزلات المحضة، فله بعض الأدلة أيضا، مذكور في "مختصر اختلاف العلماء" ج ١ ص ٣٢٥-عبد المالك)

তিন.

যে ব্যক্তি শুধু আরামের জন্য অথবা মামুলি কষ্টের বাহানায় চেয়ারে নামায আদায় করছেন তিনি মস্ত বড় ভুল কাজ করছেন। এভাবে নামায আদায় করার দ্বারা তার নামাযই হবে না। তার উপর ফরয, দাড়িয়ে নামায আদায় করা এবং যথা নিয়মে রুকু সিজদা আদায় করা।

আর যে ব্যক্তি জমিনের উপর বসে নামায আদায় করতে সক্ষম তার জন্য শুধু এই বাহানায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করা ঠিক নয় যে, সে দাড়িয়ে নামায আদায় করতে বা রুকু সিজদা করতে অক্ষম। বরং এ ধরণের লোকেরা জমিনে বসে নামায আদায় করবে। চেয়ারে বসে নামায আদায় করবেন শুধু ঐ লোকেরা যারা জমিনে বসে নামায আদায় করতে অক্ষম।

হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারকাতুহুম তার সদ্য লেখা এ ফতওয়ায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করার ক্ষতির দিকগুলো আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘জমিনে বসে নামায আদায় করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও চেয়ারে বসার যে প্রচলন দেখা যায় তাতে বিভিন্ন দিক থেকে আপত্তি রয়েছে।

১. মাযুর ব্যক্তিদের জন্য জমিনে বসে নামায আদায় করাই উত্তম ও মাসনূন তরীকা। এর উপরই সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং পরবর্তীদের আমল চলে আসছে। চেয়ারে বসে নামায আদায় করার রেওয়াজ কেবল শুরু হয়েছে। খায়রুল কুরূনে এর নযীর নেই। অথচ সে যুগে মাযুরও ছিল চেয়ারও ছিল।

২. যে ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে মাযুর নয়, অর্থাৎ কিয়াম, রুকু সিজদা করতে সক্ষম, তার জন্য জমিনে বা চেয়ারে বসে ফরয এবং ওয়াজিব নামায আদায় করাই জায়েয নেই। অথচ কখনো কখনো দেখা যায় এ ধরণের সুস্থ ব্যক্তিও সামনে চেয়ার পেয়ে চেয়ারে বসে নামায আদায় করে নেয়। ফলে তার নামাযই হয় না।

৩. চেয়ারের ব্যবহারের কারণে কাতার সোজা করা ও সোজা রাখার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অথচ মিলে মিলে দাড়ানো ও কাতার সোজা করার বিষয়ে হাদীস শরীফে জোর তাকীদ এসেছে।

৪. বিনা প্রয়োজনে মসজিদে চেয়ারের অধিক্যের কারণে তা নাসারাদের গির্জা ও ইহুদীদের উপাসনালয়ের সাদৃশ দেখা যায়। তারা গির্জায় চেয়ার ও বেঞ্চে বসে উপাসনা করে। আর দ্বীনী বিষয়ে ইহুদী নাসারা ও অন্যান্য জাতির সাদৃশ্য থেকেহ নিষেধ করা হয়েছে।

৫. নামায তো এমন ইবাদত যা আদায় করতে হয় বিনয়াবনত হয়ে বিগলিতচিত্তে। আর চেয়ারে বসে নামায আদায় করার চেয়ে জমিনে বসে নামায আদায়ের মাঝে তা পূর্ণমাত্রায় পাওয়া যায়।

৬. কোন কোন যুবক ও সুস্থ ব্যক্তি নামাযের পর মসজিদে রাখা চেয়ারে বসে আরাম করে। কখনো কখনো চেয়ার নিয়ে গোল হয়ে বসে আলাপচারিতায় লিপ্ত হয়। এটা মসজিদের পবিত্রতা, মার্যাদা ও আদবের খেলাফ।

৭. মসজিদে চেয়ারের ব্যবহারের কারণে কোন কোন ছুরতে কুরআনে কারীম এবং মুরববী নামাযীদের আদব ও এহতেরামের ব্যত্যয় ঘটে।’’

(নমুনা স্বরূপ আপত্তির এ সাতটি দিক উল্লেখ করার পর হযরত লেখেন :)

اس لئے اشارہ سے نماز پرهنے كے لئے بهى حتى الامكان كرسيوں كے استعمال سے بچنا چاہئے اور ان كے استعمال كى حوصلہ شكنى كرنى چاہئے، اور ان كا استعمال صرف ان حضرات كى حد تك محدود كرنا چاہئے جو زمين پر بيٹهكر نماز ادا كرنے پر قادر نہ ہوں.

 ‘‘...এ জন্যই ইশারায় নামায আদায় করার জন্যও যথাসম্ভব চেয়ারের ব্যবহার না করা চাই। চেয়ার ব্যবহারের প্রতি নিরুৎসাহিত করা চায় এবং এর ব্যবহার কেবলমাত্র ঐ সকল ব্যক্তির মাঝে সিমাবদ্ধ করা উচিত, যারা জমিনে বসে নামায আদায় করতে সক্ষম নয়।’’

এই স্পষ্ট বক্তব্য সত্ত্বেও হযরত আবার এটাও লিখেছেন যে, রুকু সিজদা করতে অক্ষম ব্যক্তিগণ জমিনের উপর বসে ইশারায় নামায আদায় করতে সক্ষম হওয়ার পরও যদি চেয়ারে বসে নামায আদায় করে থাকেন, তাহলে সেটাও জায়েয, কিন্তু অনুত্তম কাজ। আর দারুল উলূম দেওবন্দের ফতওয়ায় এটাকে শুধু অনুত্তমই বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে, তা বিভিন্ন কারণে ‘কারাহাত’ মুক্ত নয়।

আমার যদ্দুর জানা আছে, আমাদের দেশের বিভিন্ন দারুল ইফতার ফতওয়াও এটাই। মারকাযুদ দাওয়ার দারুল ইফতার ফতওয়াও এটাই যে, রুকু সিজদায় অক্ষম ব্যক্তিগণ জমিনে বসতে সক্ষম হলে তাদের জন্য চেয়ারে বসে নামায আদায় করা মাকরূহ। যা পরিহার করা জরুরী। আর রুকু সিজদায় সক্ষম ব্যক্তি যদি এমনটি করে তাহলে তো তার নামাযই শুদ্ধ হবে না।

মোদ্দাকথা এই যে, যে ব্যক্তি দাড়িয়ে নামায আদায় করতে অক্ষম তার জন্য বিকল্প পদ্ধতি হল, জমিনে বসে তা আদায় করা। আর যে রুকু সিজদা করতে অক্ষম তার জন্য বিকল্প পন্থা হল, ইশারায় তা আদায় করা। আর যে ব্যক্তি যমিনে বসে নামায আদায় করতে অক্ষম তার জন্য বিকল্প হল, চেয়ারে বসে নামায আদায় করা। কেবলমাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় ওযরের কারণে চেয়ারে বসে নামায আদায় করা ঠিক নয়।

আপাতত আপনার প্রশ্নের উত্তরে এই সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলে শেষ করলাম। যদি আল্লাহ তাওফীক দেন তাহলে মাযূর ব্যক্তিদের নামায বিষয়ে বিস্তারিত ও দালীলীক একটি প্রবন্ধ আলকাউসারে প্রকাশ করার ইচ্ছা থাকল।

و ما توفيقي إلا بالله عليه توكلت و إليه أنيب.

বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

দারুল ইফতা

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা

৯ জুমাদাল উলা ১৪৩৪ হিজরী

23
Namaj/Salat / একটি বই, একটি চিঠি
« on: November 19, 2014, 05:01:02 PM »


ইখতিলাফে মাযমূম (অযৌক্তিক ও নিন্দনীয় মতভেদ) তো সর্বাবস্থায় বর্জনীয়; এক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য একটিই, যা সুনির্দিষ্ট এবং যা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। এই সত্য থেকে যে বিমুখ হবে ইখতিলাফের গোনাহ ও দায়দায়িত্ব তার উপর। ইখতিলাফে মাহমূদ বা মাশরূ’ যা বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত- এক্ষেত্রেও বিধান এই যে, একে গলদ তরিকায় ব্যবহার করে বিভেদের দ্বার উন্মুক্ত করা যাবে না। তবে ন্যায়ের সীমা অতিক্রম না করে, সংলাপের নীতিমালা মেনে দলীলনির্ভর ইখতিলাফি মাসায়েলে ‘ইলমী জিদাল ও মুনাকাশা’ তথা আলেমসুলভ বিতর্ক ও পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। এবং এই ধারাবাহিকতা অতিপ্রাচীন। আক্ষেপের বিষয়, কিছু মানুষ এখন এধরণের মাসায়েলে ‘ইলমী মুনাকাশার’ পরিবর্তে রেষারেষি ও অপবাদ আরোপের পথ বেছে নিয়েছে। যে কারণে তাদেরকে নিজেদের আলোচনার ভিত্তি রাখতে হয়েছে অবাস্তব সব দাবি-দাওয়ার উপর। রেওয়ায়েতসমূহের গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রেও তাদের নিতে হয়েছে উসূল ও নীতিমালার পরিবর্তে না-ইনসাফি ও পক্ষপাতিত্বের পথ। এমন কাজ যে-ই করুক বা করে থাকুক সে ন্যায়ের পথ থেকে অবশ্যই বিচ্যুত এবং ইলমের আমানত বিনষ্টের অপরাধে অপরাধী।

‘জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর ছালাত’ নামের বইটি ‘ইলমী মুনাকাশা’র চেয়ে অপবাদ ও না-ইনসাফিরই উপর বেশি নির্ভরশীল। বইটির নাম থেকেই যা অনুমেয়। এর আবরী নামটিও বড় অদ্ভুত। Ôصلاة الرسول صلى الله عليه وسلم بقبضة الأحاديث الضعيفة والموضوعة। নাম তো আক্রোশে ঠাসা, কিন্তু বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে শূন্য! আল্লাহর মেহেরবানী যে, এ বইয়ের একটি কপি জনৈক আলেমের হস্তগত হয়। যিনি হযরত মাওলানা আব্দুল গাফফার সাহেবের ভক্ত এবং এক সময় তার মুসল্লিও ছিলেন- তিনি তা মাওলানার কাছে পৌঁছান এবং এ বই সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশের অনুরোধ জানান। এই অনুরোধকে গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়ে মাওলানা এ বিষয়ে এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন। যা একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধের রূপ লাভ করে। বিষয়বস্ত্ত পুরোপুরি ইলমী ও সূক্ষ্ম হওয়া সত্ত্বেও ভাষার সাবলীলতা ও পাঠ-মাধুর্য তাতে ব্যাহত হয়নি। ইলমী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার যতখানি হক আদায় করা সম্ভব তাতেও প্রবন্ধটি সফল, আলহামদুলিল্লাহ। পাঠকদের কাছে নিবেদন, চিঠিটি তারা চিন্তা সহকারে পড়বেন এবং বারবার পড়বেন। দলীলের বিশ্লেষণসহ ইখতিলাফি মাসায়েল অধ্যয়ন করে যারা অভ্যস্ত- ইনশাআল্লাহ তারা এতে সেই চাহিদা নিবারণের প্রচুর উপাদান পাবেন। প্রবন্ধকারের কাছে আবেদন, ইনসাফ ও ইলমী গভীরতা এবং ভাষার সাবলীলতা ও প্রাঞ্জলতার এই ধারা বজায় রেখে তিনি সম্পূর্ণ বইটির উপর তার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন লিপিবদ্ধ করবেন। আল্লাহ তা‘আলা সুস্থতা ও নিরাপত্তার সাথে তাকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করেন। আমীন।

(মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক)

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ

মুহতারাম,

আপনার প্রেরিত মুযাফ্ফর বিন মুহসিন প্রণীত ‘‘জাল হাদীসের কবলে রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছালাত’’ নামক বইটি পেয়েছি। এরূপ একটি বই প্রেরণের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আল্লাহ তাআলা আপনাকে জাযায়ে খায়ের এনায়েত করুন, আমীন। আপনার পক্ষে বর্তমানে কোনো কিতাবাদি দেখা সম্ভব নয় বিধায় আপনি আমাকে আদেশ করেছেন, বইটিতে যা বলা হয়েছে তার সত্যাসত্য ও যথার্থতা যাচাই করে আপনাকে জানাতে।

বইটির নাম থেকে শুরু করে উপসংহার পর্যন্ত লেখকের বক্তব্য, উদ্ধৃতি ও হাদীসের ব্যাখ্যাসহ সবকিছুই ব্যাপক ও গভীর আলোচনা ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। কিন্তু এর জন্য যে পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন সেই সময় বের করা আমার পক্ষে কষ্টকর। কারণ, আপনি জানেন, মাদারটেকের একটি মাদরাসায় বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠিত জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়ায় বুখারী শরীফ ২য় খন্ড, মিশকাত শরীফ ১ম খন্ডসহ বেশ কিছু কিতাবের দরস আমাকে দিতে হয়। সেই সঙ্গে শহীদবাগস্থ আব্দুস সোবহান মাদরাসার পরিচালনা-ভার  ও আমাদের প্রতিষ্ঠিত জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া ঢাকা -এর ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব এবং মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব তো আছেই। অতএব সময়ের স্বল্পতাহেতু পুরো বইটি নিয়ে আলোচনা এই মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছে না। তবে বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় যেহেতু সালাত, সেহেতু গ্রন্থখানির চতুর্থ অধ্যায়ে ‘‘ছালাতের সময়’’ শিরোনামের অধীনে আলোচিত বিষয়াবলীর মধ্য হতে শুধু ‘ফজরের ছালাতের ওয়াক্ত’ সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য  নিয়ে সামান্য পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিলাম। পর্যালোচনা শেষে পুরো গ্রন্থখানি সম্পর্কে আমার মৌলিক কিছু বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

ফজরের ছালাতের ওয়াক্ত

লেখক লিখেছেন, ছুবহে ছাদিকের পর হতে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত থাকে। সমস্যাজনিত কারণে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়। এ পর্যন্ত লিখে তিনি ৪৫৫ নং টীকা যুক্ত করেছেন। টীকায় তিনি তাঁর উপরিউক্ত কথার বরাত দিয়েছেন বুখারী শরীফের ৫৫৬ ও ৫৭৯ নং হাদীসের।

পর্যালোচনা: বরাত অনুযায়ী  নম্বর দুইটিতে ঐরূপ কোনো হাদীস আমি পাইনি। নম্বর দুইটিতে যে হাদীসটি আছে তা এই-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : إِذَا أَدْرَكَ أَحَدُكُمْ سَجْدَةً مِنْ صَلاَةِ الْعَصْرِ قَبْلَ أَنْ تَغْرُبَ الشَّمْسُ فَلْيُتِمَّ صَلاَتَهُ ، وَإِذَا أَدْرَكَ سَجْدَةً مِنْ صَلاَةِ الصُّبْحِ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَلْيُتِمَّ صَلاَتَهُ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের এক রাকআত পায় তখন সে যেন তার সালাত পূর্ণ করে এবং যখন সূর্যোদয়ের পূর্বে সালাতে ফজরের এক রাকআত পায় সে যেন তার সালাত পূর্ণ করে ।’

লেখক হয়তো বলবেন, ‘আমি এই হাদীসের বরাত দিয়েছি আমার শেষোক্ত বাক্য  ‘‘সমস্যাজনিত কারণে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়’’-এর সমর্থনে’। কিন্তু লেখকের বিরূদ্ধে তখন প্রশ্ন দাঁড়াবে যে, এই হাদীসে  তা বলা হয়নি।  এই হাদীসে যা বলা হয়েছে তার মর্মার্থ হল, ফজরের এক রাকআত পড়ার পর যদি সূর্য উদিত হয়ে যায় তবে সূর্যোদয়ের কারণে সে যেন সালাত পরিত্যাগ না করে, বরং সে যেন তার সালাত পূর্ণ করে নেয়। অর্থাৎ সূর্যোদয়ের  পূর্বে এক রাকআত আদায় করতে পারলে তার দ্বিতীয় রাকআতটি সূর্যোদয়ের মুহূর্তে আদায়কৃত হলেও তার সালাত হয়ে যাবে । সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত নয় বরং সূর্যোদয়ের মুহূর্তে আদায় করার কথা বলা হচ্ছে।

উল্লেখ্য: সূর্যোদয়ের মুহূর্তে সালাত আদায় অন্যান্য হাদীসের বক্তব্য মতে হারাম। সেইসব হাদীসের সঙ্গে এই হাদীসের বক্তব্য সাংঘর্ষিক হওয়ায় এই হাদীসের প্রায়োগিক ক্ষেত্র কী  তা নির্ণয়ে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের মাঝে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। সেটি স্বতন্ত্র এক আলোচ্য বিষয়। 

সমস্যাজনিত কারণে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়। লেখকের এই কথাটি এই হাদীসে তো নয়ই কোনো হাদীসেই নেই। দেখুন, লেখক প্রথমে বলেছেন যে, ছুবহে ছাদিকের পর হতে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত থাকে। এটি শুধু লেখকের বক্তব্য নয়, ওয়াক্ত সংক্রান্ত সব হাদীসের বক্তব্যও তাই। সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত যখন ফজরের ওয়াক্ত থাকে তখন সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত ফজর আদায় করা সর্বাবস্থায় বৈধ হবে। কোন সমস্যা বা ওজর থাকুক বা না থাকুক।   সমস্যাজনিত কারণে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আদায় করা যায়’ - লেখকের এই কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, সমস্যা না থাকলে সূর্যোদয়ের পূর্ব  পর্যন্ত আদায় করা যাবে না । অথচ একটু পূর্বে তিনি বলে আসলেন যে, ফজরের ওয়াক্ত সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত থাকে। লেখকের বক্তব্য এখানে স্ববিরোধী হয়ে যাচ্ছে। আসলে  ‘সমস্যাজনিত কারণে’ শর্তটি লেখক নিজের পক্ষ হতে যুক্ত করে দিয়েছেন। সহীহ হাদীস জাল হয়ে যায় এভাবেই। আমি ভাবছি, লেখক জাল হাদীসের কবল হতে সালাতকে মুক্ত করার অভিযানে নেমে  নিজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাতকে  জাল হাদীসের কবলে নিক্ষেপ করলেন না তো? নিজেই নিজের জালিয়াতির জালে আটকা পড়ে গেলেন না তো?

লেখক এরপর লিখেছেন, ‘আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা সর্বোত্তম হিসাবে রাসূল (ছাঃ) খুব ভোরে ছালাত আদায় করতেন। পূর্ব আকাশ ফর্সা হওয়ার পর ছালাত শুরু করতে হবে মর্মে কোন ছহীহ দলীল নেই।’ বোঝা যাচ্ছে, লেখক ফজরের মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় ওয়াক্ত কোনটি তা নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে লেখকের উচিত ছিল এই কথা লেখা ‘পূর্ব আকাশ ফর্সা হওয়ার পর ছালাত শুরু করা মুস্তাহাব এই মর্মে কোনো সহীহ দলীল নেই’ । কারণ, ‘করতে হবে’ আর ‘করা মুস্তাহাব’ কথা দুইটির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি অপরিহার্যতা বোঝায় আর দ্বিতীয়টি পছন্দনীয়তা বোঝায়।  করতে হবে মর্মে কোন সহীহ দলীল নেই কথাটি শতভাগ সত্য। এই কারণে আমাদের জানামতে পৃথিবীর কেউ বলেন না যে, পূর্ব আকাশ ফর্সা হওয়ার পর ছালাত শুরু করতে হবে। লেখক দাবি করতে চাচ্ছেন, পূর্ব আকাশ ফর্সা হওয়ার পর ছালাত শুরু করা মুস্তাহাব মর্মে কোন সহীহ দলীল নেই অথচ বাক্য ব্যবহার করলেন, ‘করতে হবে মর্মে কোন সহীহ দলীল নেই।’ এতে পাঠককে বিভ্রান্ত করার একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

লেখক বলেছেন, আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা সর্বোত্তম হিসাবে রাসূল (ছাঃ) খুব ভোরে ছালাত আদায় করতেন। ‘‘আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা সর্বোত্তম’’ কথাটির বরাত দিয়েছেন তিরমিযী শরীফের ১৭০ নং হাদীসের এবং মন্তব্য লিখেছেন, সনদ সহীহ।

তাহকীক: ইমাম তিরমিযী রাহ. হাদীসটির সনদের উপর মন্তব্য করেছেন এই কথা বলে-

حديث أم فروة لا يروى إلا من حديث عبد الله  بن عمر  العمري وليس  هو  بالقوى عند أهل الحديث واضطربوا  عنه  في هذا الحديث  وهو صدوق وقد تكلم فيه يحيى بن سعيد من قبل حفظه

ইমাম তিরমিযী রাহ.-এর এই মন্তব্য হাদীসটির সনদকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করে। অথচ লেখক সনদটিকে সহীহ বললেন। ইমাম তিরমিযীর মন্তব্য অনুযায়ী হাদীসটিতে আব্দুল্লাহ ইব্ন উমার আল-উমারী নামক যে রাবী আছেন তিনি যঈফ। তিনি ব্যতীত উম্মে  ফারওয়া রা.-এর এই হাদীসটি আর কেউ বর্ণনা করেন না। তদুপরি হাদীসটিতে ইযতিরাব রয়েছে। এতসব দোষ থাকা সত্ত্বেও সনদটিকে সহীহ বলা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? হাঁ, শায়খ আলবানী রাহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। লেখক হয়তো তাঁর তাকলীদ করেই বলেছেন, সনদ সহীহ। তাকলীদ যদি করতেই হয় তবে শায়খ আলবানীর কেন, ইমাম তিরমিযীর নয় কেন? তাছাড়া শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সনদটিকে নয়। সনদ সহীহ হওয়া আর হাদীস সহীহ হওয়া এক কথা নয়। পরবর্তী আলোচনায় তা স্পষ্ট হবে। লেখকের উচিত ছিল শায়খ আলবানী রাহ. হাদীসটিকে কেন সহীহ  বলেছেন তা তাহকীক করা ।

শায়খ আলবানী রাহ.-এর তাহকীক ও পর্যালোচনা

 উম্মে ফারওয়া রা.-এর হাদীসটির সনদ শায়খ আলবানীর মতেও যঈফ। তিনি সুনানে আবূ দাউদে হাদীসটির উপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন :

و هذا سند ضعيف، عبد الله بن عمر - هو العمرى المكبر- وهو سيئ الحفظ

(এটি যঈফ সনদ। আব্দুল্লাহ ইবন উমর হচ্ছেন আল-উমারী । তিনি দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন।)   এরপর তিনি হাদীসটির ইযতিরাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পর লেখেন:

وهذا اضطراب شديد مما يزيد فى ضعف الاسناد

(এটা মারাত্মক ইযতিরাব যা হাদীসের সনদকে আরও দুর্বল করে দেয়) অর্থাৎ শায়খ আলবানী বলতে চাচ্ছেন, একে তো যঈফ রাবীর কারণে হাদীসের সনদটি যঈফ, তদুপরি এতে রয়েছে নানারকম ইযতিরাব যা হাদীসের সনদকে আরও যঈফ ও দুর্বল করে দেয়।  এতদসত্ত্বেও  আমাদের আলোচ্য বইয়ের লেখক বলে দিলেন, ‘সনদ সহীহ’।  হাঁ উম্মে ফারওয়ার হাদীসটি  হাকেম কর্তৃক বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ রা.-এর হাদীস দ্বারা  সমর্থিত বলে মনে করার কারণে আলবানী  রাহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে হাদীসটি  সহীহ লিগাইরিহী। কোনো হাদীস অন্য হাদীস দ্বারা সমর্থিত হওয়ার কারণে সহীহ লি-গাইরিহী হওয়া আর সেই হাদীসটির সনদ সহীহ হওয়া এক কথা নয়। বিষয়টি সাধারণ তালিবুল ইলমও জানে। লেখক কেন বিষয়টি জানলেন না তা বোঝা গেল না।

উম্মে ফারওয়া রা.-এর হাদীসটি কি সহীহ, যেমনটা আলবানী রাহ. বলেছেন?

আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রা. কর্তৃক বর্ণিত মুস্তাদরাকে হাকেমের যে হাদীসটির কারণে উম্মে ফারওয়া রা. -এর  হাদীসটিকে  শায়খ আলবানী রাহ. সহীহ বলেছেন সেটি যঈফ। কারণ : বর্ণনাটি শায বা দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। এর বিস্তারিত বিবরণ এই যে, হাকেম হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এইভাবে:

 حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عِيسَى ، فِي آخَرِينَ ، قَالُوا : حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ ، حَدَّثَنَا بُنْدَارٌ ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ ، حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ مِغْوَلٍ ، عَنِ الْوَلِيدِ بْنِ الْعَيْزَارِ ، عَنْ أَبِي عَمْرٍو الشَّيْبَانِيِّ ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، قَالَ : سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ ؟ قَالَ : الصَّلاَةُ فِي أَوَّلِ وَقْتِهَا

 এই হাদীসটিকেই  ইমাম বুখারী রাহ. ভিন্ন শব্দে তাঁর গ্রন্থে গ্রন্থাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন:

 حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ هِشَامُ بْنُ عَبْدِ الْمَلِكِ قَالَ : حَدَّثَنَا شُعْبَةُ قَالَ الْوَلِيدُ بْنُ الْعَيْزَارِ ، أَخْبَرَنِي قَالَ : سَمِعْتُ أَبَا عَمْرٍو الشَّيْبَانِيَّ يَقُولُ ، حَدَّثَنَا صَاحِبُ هَذِهِ الدَّارِ وَأَشَارَ إِلَى دَارِ عَبْدِ اللهِ ، قَالَ : سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ الصَّلاَةُ عَلَى وَقْتِهَا قَالَ ثُمَّ أَيُّ قَالَ ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ قَالَ ثُمَّ أَيُّ قَالَ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ ، قَالَ : حَدَّثَنِي بِهِنَّ وَلَوِ اسْتَزَدْتُهُ لَزَادَنِ

(হাদীস নং-৫২৭)

 লক্ষ  করুন বুখারীর বর্ণনায় শব্দ রয়েছে الصلاة على وقتها  আর হাকেমের বর্ণনায় রয়েছে الصلاة فى أول وقتها  । দুটি কথা সম্পূর্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। সে কথায় পরে আসছি।  বুখারী রাহ. হাদীসটিকে শু‘বার সনদে উল্লেখ করেছেন। শু‘বার সকল শাগরেদ হাদীসটিকে الصلاة على وقتها  শব্দেই বর্ণনা করেছেন। শুধু তাঁর একজন শাগরেদের বর্ণনায় الصلاة فى أول وقتها পাওয়া যায়। তিনি হলেন আলী ইব্ন হাফস। আলী ইব্ন হাফস কর্তৃক বর্ণিত الصلاة فى أول وقتها শব্দ সম্বলিত হাদীসটি হাকেম, বায়হাকী ও দারা কুতনী তাঁদের স্ব স্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আলী ইব্ন হাফস সম্পর্কে দারা কুতনী মন্তব্য করেছেন এই বলে- ما احسبه حفظه لانه كبر وتغير حفظه  (আমি মনে করি না আলী ইব্ন হাফস হাদীসটিকে যথাযথ সংরক্ষণ করেছেন। কেননা, তিনি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন ঘটেছিল।)

আরেকটি সনদে হাদীসটি الصلاة فى أول وقتها  শব্দে বর্ণিত হয়েছে। সনদটি এরূপ-

 الحسن بن على المعمرى عن ابى موسى محمد بن المثنى عن غندر عن شعبة   

কিন্তু আবূ মূসার শাগরেদদের মধ্য হতে হাসান ইবন আলী ব্যতীত আর কেউ হাদীসটিকে ঐ শব্দে বর্ণনা করেন না। বরং তাঁর সকল শাগরেদ তাঁর বরাতে الصلاة على وقتها শব্দেই বর্ণনা করেন। দারা কুতনী রাহ. এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন,

  تفرد به المعمرى فقد رواه أصحاب أبي موسى بلفظ الصلاة على وقتها

(অর্থাৎ আল-মা‘মারী এইরূপ একাই বর্ণনা করেছেন। আবূ মূসার সকল শাগরেদ হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন الصلاة على وقتها  শব্দে।)  এই মন্তব্যের পরে দারা কুতনী রাহ. আবূ মূসার অপর এক শাগরেদ মাহামিলীর বরাতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন الصلاة على وقتها  শব্দে। ঠিক যেমনটা আবূ মূসার অন্যান্য শাগরেদগণ বর্ণনা করেন। আবূ মূসার ন্যায় গুনদারের সকল শাগরেদ হাদীসটিকে الصلاة على وقتها  শব্দেই বর্ণনা করেন। হাফেয ইবন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, প্রকাশ্যত এটাই বোঝা যায় যে, হাসান ইবন আলী আল-মা‘মারী তাঁর বর্ণনায় ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। কারণ, তিনি তাঁর স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন।

বাকী  রইল মুস্তাদরাকে হাকেমের উপরিউক্ত ঐ বর্ণনাটি যার দ্বারা উম্মে ফারওয়ার হাদীসটি সমর্থিত বলে শায়খ আলবানী রাহ. মনে করেন। হাদীসটি সম্পর্কে বক্তব্য হল, হাদীসটি মালেক ইবন মিগ্ওয়ালের শাগরেদদের মধ্য হতে একমাত্র উসমান ইব্ন উমার ব্যতীত আর কেউ الصلاة فى أول وقتها  শব্দে বর্ণনা করেন না। তাঁর সকল শাগরেদ তাঁর বরাতে হাদীসটিকে الصلاة على وقتها  শব্দেই বর্ণনা করেন। হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, وتفرد عثمان بذلك’ والمعروف عن مالك بن مغول كرواية الجماعة 

(অর্থাৎ এইরূপ বর্ণনায় উসমান নিঃসঙ্গ। মালেক ইবন মিগ্ওয়াল হতে যা প্রসিদ্ধ তা হল الصلاة على وقتها  শব্দে অন্যান্য সকলের অনুরূপ বর্ণনা।)

 আপনি বলতে  পারেন যে, হাকেম তো হাদীসটিকে على شرط الشيخين  তথা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের মানে উত্তীর্ণ বলে ব্যক্ত করেছেন।

এর জবাবে বলব যে, على شرط الشيخين কথাটি কোন্ হাদীসের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় বা করা হয় তা নিয়ে বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, কোনো হাদীসের সনদে উল্লেখকৃত রাবীগণের সকলেই যদি বুখারী ও মুসলিমের রাবী হন তাহলে সেই হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين  বা বুখারী ও মুসলিমের  হাদীসের মানসম্পন্ন। কেউ বলেন, যে হাদীসটির সনদ হুবহু  বুখারী ও মুসলিমের সনদ সেই  হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين । কেউ বলেন, বুখারী ও মুসলিমের রাবীগণ যে সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধিকারী সেই সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধিকারী রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين  । দ্বিতীয় মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ বলে মনে হয়। এর কারণ কী সে আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। তবে সবকটি মতের সার কথা হল, যে হাদীসটিকে على شرط الشيخين  বা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের মানে উত্তীর্ণ বলে ব্যক্ত করা হয় তার রাবীগণ উচ্চমান সম্পন্ন সত্যবাদি ও বিশ্বস্ত। কিন্তু কোন হাদীস সহীহ ও দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য রাবীগণের সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি গুণই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁদের বর্ণনাটি শায বা দল-বিচ্ছিন্ন না হওয়াও জরুরী। এটি একটি স্বীকৃত মূলনীতি। দল বিচ্ছিন্নতা হাদীস সহীহ হওয়ার পথে একটি বড় বাধা। হাকেমের  হাদীসটি এই বাধাকে অতিক্রম করতে পারেনি। কেননা পূর্বেই আমরা দেখিয়েছি যে, الصلاة فى أول وقتها  শব্দে হাদীসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে উসমান ইব্ন উমার নিঃসঙ্গ। তাঁর উস্তায মালেক ইবন মিগ্ওয়ালের শাগরেদগণের কেউই হাদীসটিকে ঐ শব্দে বর্ণনা করেন না।

 সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও যে সকল রাবী হাদীসটিকে الصلاة على وقتها  -এর স্থলে  الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণনা করেছেন তাঁদের কেউবা স্মৃতি দুর্বলতার শিকার হয়েছেন, আর কেউ সম্ভবত কথা দুটোর অর্থ অভিন্ন বলে ধারণা করে الصلاة على وقتها -এর  স্থলে الصلاة فى أول وقتها  বর্ণনা করেছেন। হাফেজ ইব্ন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন,وكأن من رواها كذالك ظن ان المعنى واحد   (যারা হাদীসটিকে এইভাবে বর্ণনা করেছেন তারা হয়তো মনে করেছেন যে, উভয়টির অর্থ এক।)  শায়খ আলবানীও (রাহ.) কথা দুটোর অর্থ অভিন্ন বলে  ধারণা পোষণ করেন। কেননা তিনি হাকেমের হাদীসের উদ্ধৃতি দেওয়ার পর বলেন: وهو فى الصحيحين وغيرهما بلفظ ,على وقتها، والمعنى واحد عندنا  (সহীহাঈন ও অন্যান্য গ্রন্থে হাদীসটি على وقتها শব্দে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের মতে অর্থ একই।) শায়খ আলবানীর সঙ্গে এ ক্ষেত্রে আমি সহমত পোষণ করি না।

 কারণ, দ্বিতীয় কথাটির অর্থ হল, ওয়াক্তের শুরুতে সালাত আদায় করা। আর প্রথম কথাটির স্পষ্ট অর্থ হল, সময়মত সালাত আদায় করা। অর্থাৎ সালাতকে তার ওয়াক্তচ্যুত না করা। প্রতিটি সালাতের শুরু ও শেষের যে  নির্ধারিত ওয়াক্ত আছে সেই ওয়াক্তের মধ্যেই সালাত আদায় করা। কাযা না করা।

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

কেউ বলতে পারে যে, الصلاة على وقتها  কে তো আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় বলে বলা হয়েছে। কোনো বিষয় অধিক প্রিয় তখনই হয় যখন ঐ বিষয়টির মধ্যে একাধিক ঐচিছকতা বিদ্যমান থাকে এবং তন্মধ্য হতে একটি ঐচ্ছিক বিষয় অন্যটির তুলনায় প্রিয় হয়ে থাকে। সময়মত সালাত আদায় করা  বা কাযা না করা তো অপরিহার্য। অপরিহার্যের মধ্যে কোনো ঐচ্ছিকতা থাকে না। সুতরাং বোঝা যায় যে, হাদীসটিতে বলা হয়েছে, যে কোনো সময়ে সালাত আদায় করা বৈধ তবে অন্য যে কোনো সময়ে আদায় করার তুলনায় আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব বা অধিক প্রিয়।

এর জবাবে বলব যে, কথাটি যুক্তিযুক্ত। তবে কথাটি আলোচ্য বিষয়ে প্রযোজ্য হত যদি প্রশ্ন করা হত যে, কোন্ সময়ে সালাত আদায় করা উত্তম। এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে, কোন্ আমলটি সর্বাধিক উত্তম? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, الصلاة على وقتها  অর্থাৎ অন্যান্য আমলের তুলনায় সালাতকে সময়মত আদায় করা এবং কাযা না করা অধিক প্রিয়। তুলনা করা হয়েছে অন্যান্য আমলের সঙ্গে। বলা হয়েছে, সালাত কাযা না করা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল। সালাতের পূর্ণ সময়ের একটি অংশকে অপর অংশের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি।

কথা আরও আছে। তা হল, একাধিক ঐচ্ছিক সময়ের মধ্য হতে আউয়াল বা শুরু সময়ের কথাটি বোঝা গেল কোত্থেকে? এ অর্থ কেন হবে না যে, একাধিক ঐচ্ছিক সময়ের মধ্য হতে মধ্যবর্তী সময়ে বা শেষ সময়ে সালাত    আদায় করা অন্য সময়ের তুলনায় অধিক প্রিয়?

এই দীর্ঘ আলোচনার সার দাঁড়ালো এই যে, হাদীসটিকে যাঁরা الصلاة فى أول وقتها  শব্দে বর্ণনা করেছেন তাঁরা হয় স্মৃতি বিভ্রাটের শিকার হয়েছেন নয় তো অর্থ বিভ্রাটের শিকার হয়েছেন। কারণ যা-ই হোক, তাঁদের বর্ণনাটি দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনাকে মুহাদ্দিসগণ যঈফ বলেন। সম্ভবত এই কারণেই ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রাহ. তাঁদের গ্রন্থে ঐ শব্দ সম্বলিত হাদীসটিকে  স্থান দেননি। যদিও এর বর্ণনাকারীগণের বর্ণিত অন্য হাদীস তাঁরা গ্রহণ করেছেন। আর এই কারণেই ইমাম নববী রাহ. الصلاة فى أول وقتها  শব্দে বর্ণিত সকল হাদীসকে যঈফ বলে মত প্রকাশ করেছেন। হাফেয ইব্ন হাজার আসকালানী রাহ. তাঁর ফতহুল বারী গ্রন্থে ইমাম নববী রাহ.-কে উদ্ধৃত করে বলেছেন,

وقد اطلق النووى فى شرح المهذب أن واية فى أول وقتها ضعيفة

অর্থাৎ শরহুল মুহায্যাব গ্রন্থে নববী রাহ. ব্যাপকভাবে (কোন ব্যতিক্রম উল্লেখ না করে) বলেছেন যে, فى أول وقتها  বর্ণনা যঈফ।

উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত হাফেজ ইবন হাজার আসকালানীকে উদ্ধৃত করে  আমি যা লিখেছি তা যাচাই করতে দেখুন ফাতহুল বারী ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ১১ ও ১২, প্রকাশক: দারুল হাদীস, কায়রো।

সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা না যথার্থ ব্যাখ্যা ?

লেখক এরপর লিখেছেন, মূলত ছহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে দেরী করে ছালাত আদায় করা হয়।

এ সম্পর্কে পরে আলোচনা আসছে। এরপর লেখক লিখেছেন, অনেক মসজিদে ফর্সা হলে ছালাত শুরু করা হয় এবং বিদ্যুত বা আলো বন্ধ করে কৃত্রিম অন্ধকার তৈরি করা হয়। এটা শরীয়তের সাথে প্রতারণা করার শামিল।  হাঁ, অবশ্যই এটা প্রতারণা। লেখক স্পষ্ট করেননি, কারা এই কাজটি করে থাকে। কারণ, বিষয়টি এমনিতেই স্পষ্ট। এটা করে থাকে তারা যারা অন্ধকারে ফজর আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে মনে করে। যারা ফর্সা করে ফজর আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে মনে করে তারা এটা করবে না। তারা বরং উল্টোটা করবে। তারা অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে কৃত্রিম ফর্সা তৈরির চেষ্টা করবে।

মুহতারাম,

 লেখক এই অধ্যায়ে মূলত ফজরের সালাত  অন্ধকারে আদায় করা তথা তাগলীস বিল ফাজর যে মুস্তাহাব    তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করতে চাইছেন। আপনি জানেন যে, কারও কারও মতে ফজরকে ফর্সা করে আদায় করা তথা  ইসফার বিল ফাজর মুস্তাহাব। লেখক এই দ্বিতীয় মতটির পক্ষের হাদীসগুলোকে জাল প্রমাণ করতে চাইছেন।  এ জন্য তিনি শুরুতেই হযরত মুআজ ইবন জাবাল রা.-এর একটি হাদীস উপস্থাপন করেছেন যা দ্বিতীয় মতটিকে সমর্থন করে। লেখক বলছেন, হাদীসটি জাল। আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ এই হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে কোথাও উপস্থাপন করেছেন বলে আমার জানা নাই। এই মতের অনুসারীদের কেউ বিচ্ছিন্নভাবে এটিকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করলে করতেও পারে কিন্তু তার দায় দায়িত্ব এই মতের প্রবক্তাগণের উপর কিংবা এই মতের অনুসারীদের সকলের উপর চাপানোকে আমি ন্যায়সংগত মনে করি না।

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ যে সব সহীহ হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন লেখকের মতে সেসব হাদীসের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। এইজন্য তিনি এরপর ‘ছহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা’ নামে একটি শিরোনাম কায়েম করেছেন। এই শিরোনামের অধীনে তিনি রাফে‘ ইব্ন খাদীজ রা.-এর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি এই-

عَنْ رَافِع بْنِ خَدِيْجٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ أَسْفِرُوْا بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ 

হাদীসটির প্রথম বাক্যের অনুবাদ তিনি করেছেন এইভাবে: ‘তোমরা ফজরের মাধ্যমে ফর্সা কর। অনুবাদের সামান্য হেরফেরে বাক্যের মর্ম ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটে যায়। মর্ম ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটানোর উদ্দেশ্যেই লেখক এইরূপ অনুবাদ করেছেন, না অনুবাদে অদক্ষতার কারণে বা আরবী ভাষায় দখল না থাকার কারণে এইরূপ অনুবাদ করেছেন তা আল্লাহই ভাল জানেন। সঠিক অনুবাদ এইরূপ হবে বলে আমি মনে করি: ‘তোমরা ফজরকে (তথা ফজরের সালাতকে) ফর্সায় উপণীত কর।’  কারণ, اسفار  শব্দটি سفر হতে গঠিত। سفر  অর্থ আলো ও উজ্জ্বলতা। বলা হয়, سفر الصبح  (অর্থাৎ প্রভাত আলোকোজ্জ্বল হয়েছে।) বাবে ইফ্আলে এর অর্থ হল, প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ করা, প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় উপণীত হওয়া। বলা হয়, اسفر بلال  তথা دخل بلال فى سفر الصبح  (অর্থাৎ বেলাল প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ করেছে।) যেমন বলা হয় اصبح بلال  (অর্থাৎ বেলাল প্রভাতে প্রবেশ করেছে, প্রভাতে উপণীত হয়েছে। তথা প্রভাত করেছে।) কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:  فسبحان الله حين تمسون و حين تصبحون  [তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যা কর ও সকাল কর। (তথা সন্ধ্যায় ও সকালে।) - সূরা রূম, আয়াত ১৭] অতএব إسفار  মাসদার হতে গঠিত আদেশ সূচক শব্দ أسفروا -এর অর্থ হল, তোমরা প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ কর তথা ফর্সা কর। এরপর  যখন بالصبح  বলে  حرف الجر -‘با’  (preposition) দ্বারা ক্রিয়াটিকে সকর্মক ক্রিয়া (متعدى) বা transitive verb-এ পরিণত করা হল তখন নিয়ম অনুযায়ী এর অর্থ হবে তোমরা ফজরের সালাতকে ফর্সায় উপণীত কর। এতদ্বারা ইসফার বিল ফাজর -এর প্রবক্তাগণের মতের পক্ষে সমর্থন মেলে।

এরপর লেখক এই হাদীসের সমার্থক আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীস দুটি ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ তাঁদের মতের সপক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে থাকেন। লেখক হাদীস দুটিকে সহীহ বলেছেন। কিন্তু তাঁর দাবি হল, ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ হাদীস দুটির অপব্যাখ্যা করে থাকেন। তাঁর এই দাবি প্রমাণ করার পূর্বে তিনি প্রসঙ্গত বলেছেন,‘ ‘হেদায়া’ কিতাবে প্রথম আলোচনায় সঠিক সময় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরে পৃথক আলোচনায় বলা হয়েছে, ويستحب الإسفار بالفجر  ‘ফর্সা করে ফজর ছালাত আদায় করা মুস্তাহাব’। অথচ উক্ত ব্যাখ্যা চরম বিভ্রান্তিকর এবং ছহীহ হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী।’ (দ্রষ্টব্য পুস্তকের ১২৫নং পৃষ্ঠা)

হেদায়া প্রণেতা কী বলেছেন আর মুযাফফর সাহেব কী বুঝলেন

মুহতারাম,

লেখকের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি যে, হেদায়া কিতাবটি বুঝতে লেখকের একটুখানি স্খলন ঘটে গেছে। কারণ, হেদায়া প্রণেতা সালাত অধ্যায়ে প্রথমে সালাতের মূল ওয়াক্তের বিবরণ দান করেছেন। কোন্ সালাতের ওয়াক্ত কখন শুরু হয় আর কখন শেষ হয় তার বিবরণ দান করেছেন। বলেছেন :

أول وقت الفجر إذا طلع الفجرالثانى وهو البياض المعترض فى الأفق و آخر وقتها مالم تطلع الشمس

এইভাবে প্রতিটি সালাতের শুরু ও শেষ ওয়াক্ত বর্ণনা করার পর তিনি ভিন্ন অনুচ্ছেদে প্রতিটি সালাতের মুস্তাহাব ওয়াক্তের বিবরণ দান করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ويستحب الإسفار بالفجر ‘এবং মুস্তাহাব হল ফজরকে ইসফার করা।’ লেখকের মন্তব্য দ্বারা বোঝা যায় যে, হেদায়া প্রণেতা পরষ্পর বিরোধী দুইটি কথা বলেছেন। অথচ কোনোটির সাথে কোনোটির বিরোধ নেই। তাছাড়া লেখক বলেছেন. হেদায়া কিতাবে  প্রথম আলোচনায় সঠিক সময় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু......।

প্রশ্ন হল, লেখক তো ফজরের মুস্তাহাব ওয়াক্ত নিয়ে আলোচনা করছেন। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলছেন, হেদায়া কিতাবে প্রথমে সঠিক সময় উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে কি লেখকের মতে ফজরের
মুস্তাহাব ওয়াক্ত সুবহে সাদেক থেকে শুরু করে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত? সুবহানাল্লাহ! একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সকল দোষ ত্রুটি হতে মুক্ত। লেখক  তাঁর নিজের রচিত জালেই আটকে গেলেন।   

লেখক বলছেন, উক্ত হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা করে বলা হয় যে, ফর্সা হওয়ার পর ফজরের ছালাত শুরু করতে হবে। কারণ এটাই সর্বোত্তম। এরপর তিনি হেদায়ার প্রসঙ্গ টানার পর বলেছেন, অথচ উক্ত ব্যাখ্যা চরম বিভ্রান্তিকর এবং ছহীহ হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী। কারণ,-

(ক) ইমাম তিরমিযী (২০৯-২৭৯ হিঃ) উক্ত হাদীস বর্ণনা করে বলেন,

قَالَ الشَّافِعِىُّ وَأَحْمَدُ وَإِسْحَاقُ مَعْنَى الْإِسْفَارِ أَنْ يَّضِحَ الْفَجْرُ فَلَا يُشَكُّ فِيْهِ وَلَمْ يَرَوْا أَنَّ مَعْنَى الْإِسْفَارِ تَأْخِيْرُ الصَّلَاةِ

ইমাম শাফেঈ, আহমাদ ও ইসহাক্ব বলেন, ‘ইসফার’ হল, ফজর প্রকাশিত হওয়া, যাতে কোন সন্দেহ না থাকে। তারা কেউ বর্ণনা করেননি যে, ইসফার অর্থ ছালাত দেরী করে পড়া।

পর্যালোচনা:

দেখুন, লেখক দাবী করছেন উক্ত ব্যাখ্যা চরম বিভ্রান্তিকর এবং সহীহ হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী। কীভাবে সহীহ হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী হল তার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ইমাম তিরমিযী কর্তৃক উদ্ধৃত ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যার উল্লেখ করেছেন অতঃপর ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। কোনো সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতি তিনি পেশ করেননি। তিনি সূক্ষ্মভাবে ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যা এবং ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর বক্তব্যকে  সহীহ হাদীস বলে চালিয়ে দিলেন। লেখকের ধারণায়, পাঠক তাঁর এই সূক্ষ্ম কৌশল অনুধাবন করতে পারবে না। এটা পাঠককে অবমূল্যায়ণ করার শামিল। আর আমানতের খিয়ানতের প্রশ্ন তো থেকেই যায়। তাছাড়া কারও বক্তব্যকে, কারও ব্যাখ্যাকে হাদীস বলা, তাও আবার সহীহ হাদীস? নাউযুবিল্লাহ। এটা তো হাদীস জাল করার নামান্তর।

  ইমাম তিরমিযী রাহ. রাফে‘ ইবন খাদীজের রা. হাদীসটি উল্লেখ করার পর যা বলেছেন লেখক তার অর্ধেক উদ্ধৃত করেছেন আর অর্ধেক গোপন করে গেছেন। ইমাম তিরমিযীর পুরো কথাটি এইরূপ :

وَقَدْ رَأَى غَيْرُ وَاحدٍ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عليه و سلم وَالتَّابِعِيْنَ اَلْإِسْفَارَ بِصَلَاةِ الْفَجْرِ وَبِهِ يَقُوْلُ سُفْيَانُ الثَّوْرِي وَقَالَ الشَّافِعِيُّ وَ أَحْمَدُ وَ إِسْحقُ مَعْنَى الْإِسْفَارِ أَنْ يَّضِحَ الْفَجْرُ فَلَا يُشَكُّ فِيْهِ وَلَمْ يَرَوْا أَنَّ مَعْنَى الْإِسْفَارِ تَأْخِيْرُ الصَّلَاةِ

অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের মধ্য হতে এবং তাবেঈগনের মধ্য হতে একাধিক আহ্লে ইল্ম সাহাবী ও তাবেঈ ইসফার বিল ফাজ্র তথা ফজরকে ফর্সা করে আদায় করার মত পোষণ করেছেন। সুফ্ইয়ান সাওরীও এই মত ব্যক্ত করেন এবং ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক্ব বলেন... (উপরে দেখুন)

আসল ব্যাপার হল, ইমাম তিরমিযী রাহ. প্রথমে একটি অনুচ্ছেদে তাগলীস বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীস উল্লেখ করে ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের মত উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁরা তাগলীস বিল ফাজরকে মুস্তাহাব বলেন। অতঃপর পরবর্তী  অনুচ্ছেদে তিনি ইসফার বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীস উল্লেখ করে বললেন যে, একাধিক সাহাবী ও তাবিঈ - যাঁরা ইলমের অধিকারী- ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে মত পোষণ করেন। এদিকে ইসফার বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীসটি যেহেতু ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের মতের বিপক্ষে যায় সেহেতু  তাঁদের নিকট এই হাদীসের কী ব্যাখ্যা আছে তা জানান দেওয়ার জন্য ইমাম তিরমিযী তাঁদের কৃত ব্যাখ্যাটি এখানে উল্লেখ করে দিলেন।

একাধিক আহলে ইলম সাহাবী ও তাবিঈ ইসফার বিল ফাজরকে মুস্তাহাব বলে মনে করেন। একাধিক অর্থ দুই চারজন নয়। দুই চারজন হলে ইমাম তিরমিযী তাঁদের নাম উল্লেখ করে দিতেন, যেমনটা উল্লেখ করেছেন তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে মত পোষণকারীগণের নাম। غير واحد  বা একাধিক বলে সাধারণত প্রচুর সংখ্যক বোঝানো হয়। তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে মত পোষণকারী কোনো সাহাবী আছে কি নাই বা থাকলে তাদের সংখ্যা কী পরিমান সেটি ভিন্ন বিষয়। আমাদের আলোচনা চলছে ইমাম তিরমিযীর মন্তব্য নিয়ে। তো ইমাম তিরমিযীর বক্তব্য অনুযায়ী বহু সংখ্যক সাহাবী ও তাবিঈ ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তা। আমাদের দেশে বা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা ফজরকে ইসফার তথা ফর্সা করে আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে জ্ঞান করেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করেন লেখকের বক্তব্য মতে তাঁরা যদি জাল হাদীসের ভিত্তিতে এবং সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে এরূপ আমল করেন তাহলে ঐ সকল সাহাবী ও তাবিঈগণও কি জাল হাদীস অনুযায়ী আমল করতেন? তাঁরাও কি সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে ইসফার বিল ফাজর করতেন? নাউযুবিল্লাহ। কথা বলতে বা লিখতে অসাবধানতাবশত ভুল হতেই পারে। কিন্তু তারও একটা মাত্রা থাকা উচিত। নইলে সেটাকে অসাবধানতাজনিত ভুল বলা যাবে না, ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি ও ধৃষ্টতা বলতে হবে।

ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক্ব (রাহিমাহুমুল্লাহ) রাফে‘ ইবন খাদীজ রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের যে ব্যাখ্যা করেছেন সে সম্পর্কেও কিছু কথা আছে। তা যথাস্থানে আলোচিত হবে ইনশাআল্লাহ। লেখক এরপরে ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তাহাবীর দুটি বক্তব্যের প্রথমটির অনুবাদ করতে গিয়ে লেখক বন্ধনী যুক্ত করে লিখেছেন, (উক্ত হাদীছের অর্থ হল)...।  না, বক্তব্যটি হাদীসের অর্থ বা ব্যাখ্যা নয়। বরং এটি ইমাম তাহাবীর সিদ্ধান্ত। তিনি তাগলীস বিল ফাজর ও ইসফার বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীসসমূহের উপর পর্যালোচনা করার পর এই সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছেন। হাঁ উদ্ধৃত দ্বিতীয় বক্তব্যটিতে ইমাম তাহাবী হাদীসের অর্থ ও মর্ম ব্যক্ত করেছেন। ইমাম তাহাবী রাহ. ও শায়খ আলবানী রাহ. উভয়ই ইসফার বিল ফাজর ও তাগলীস বিল ফাজর সংক্রান্ত সব হাদীসের আলোকে মত ব্যক্ত করে যা বলেছেন তার সার কথা হল, ফজরের সালাত শুরু করা উচিত অন্ধকারে এবং কিরাআত লম্বা করে শেষ করা উচিত ফর্সায়। এখানে লক্ষণীয় যে, ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানী রাহ. কিন্তু ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেননি।

লেখক এরপর ফজর ছালাতের সঠিক সময় শিরোনাম দিয়ে লিখেছেন, রাসূল (ছাঃ) কোন্ সময়ে ফজরের ছালাত আদায় করতেন , তা নিমেণর হাদীছগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। যে সকল হাদীস এরপর তিনি উল্লেখ করেছেন সেগুলো বাহ্যত প্রমাণ করে যে, তাগলীস বিল ফাজর তথা অন্ধকারে ফজরের সালাত শুরু করা এবং অন্ধকার থাকতেই সালাত শেষ করা মুস্তাহাব। কিন্তু লেখক স্পষ্ট করেননি যে, তিনিও এইরূপ মত পোষণ করেন ও তদনুযায়ী  আমল করেন, না তিনি ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানী রাহ. যা বলেছেন সেইরূপ মত পোষণ করেন ও তদনুযায়ী আমল করেন। ইসফার বিল ফাজর-এর প্রবক্তাগণের ব্যাখ্যা যে অপব্যাখ্যা তা প্রমাণ করতে তিনি তো তাহাবী ও আলবানী (রাহিমাহুমাল্লাহ) -এর ব্যাখ্যাকেই পেশ করেছেন। বোঝা যায় যে, তাঁদের ব্যাখ্যাটি তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য। কাজেই লেখকের আমলও ঐরূপ হওয়া উচিত।  কিন্তু  তিনি ‘ফজর ছালাতের সঠিক সময়’ শিরোনামের অধীনে যেসব হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেগুলোর সবই  যেহেতু তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ তাঁদের মতের সপক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন  সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি যে, তিনি শায়খ আলবানীর তাকলীদ না করে এক্ষেত্রে এই মতই পোষণ করেন যে, ফজরের সালাত অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারেই শেষ করা মুস্তাহাব।

এর পক্ষে তিনি প্রথম যে হাদীসটি এনেছেন তা হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত। হাদীসটি এই-

 عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : إِنْ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَيُصَلِّي الصُّبْحَ فَيَنْصَرِفُ النِّسَاءُ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ مَا يُعْرَفْنَ مِنَ الْغَلَسِ

আয়েশা রা. বলেন, রাসূল (ছাঃ) ফজরের সালাত আদায় করতেন। অতঃপর মহিলারা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘরে ফিরত। কিন্তু অন্ধকারের কারণে তাদেরকে চেনা যেত না।

আয়েশা রা. -এর এই একটি হাদীসকেই লেখক তিনবার এনেছেন তিনটি নম্বর লাগিয়ে। এটা একটা বড় বিপদ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে একাধিক কিতাবে বর্ণিত কিংবা একাধিক সনদে বর্ণিত একই হাদীসকে স্বতন্ত্র হাদীস হিসাবে  উল্লেখ করে দেখানো যে, আমাদের পক্ষে এত এত হাদীস রয়েছে। অথচ হাদীস মাত্র একটিই।

যাকগে সে কথা। আসল কথায় আসি। আয়েশা রা. -এর হাদীসটি সম্পর্কে ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের বক্তব্য হল, হযরত আয়েশা রাঃ -এর বক্তব্য আসলে مايعرفن  পর্যন্ত। অর্থাৎ হযরত আয়েশা রা. বলেছেন, ‘অতঃপর মহিলারা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘরে ফিরে যেত, তাদেরকে চেনা যেত না।’  তাঁদের দাবি হল, হযরত আয়েশা রা. বলতে চাচ্ছেন যে, মহিলারা ফজরের সালাতে যখন আসত তখনও তারা পর্দার প্রতি কঠোর যত্নবান থাকত ফলে তারা যখন ফিরে যেত তখন তাদেরকে চাদর মুড়ি দেওয়া অবস্থায় থাকার কারণে চেনা যেত না। অর্থাৎ তাদেরকে না চেনার কারণ ছিল চাদর মুড়ি দেওয়া। অন্ধকার নয়। কিন্তু তাঁদের বিরূদ্ধে তখন প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, হাদীসে তো স্পষ্ট বলা হয়েছে, من الغلس  বা অন্ধকারের কারণে। তাঁরা বলেন যে, من الغلس  বা ‘অন্ধকারের কারণে’ কথাটি হযরত আয়েশার নয়। বরং তা কোনো রাবীর সংযোজন, হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ইদরাজ এবং সংযোজিত অংশকে বলা হয় مُدرَجٌ مِنَ الرَّاوِىْ  (মুদরাজ মিনার রাবী)। তাঁদের এই দাবির পÿÿ হাদীস থেকেই শক্তিশালী প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ, সুনানে ইব্ন মাজায়  হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে এইভাবে।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ ، عَنِ الزُّهْرِيِّ ، عَنْ عُرْوَةَ ، عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : كُنَّ نِسَاءُ الْمُؤْمِنَاتِ ، يُصَلِّينَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ صَلاَةَ الصُّبْحِ ، ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى أَهْلِهِنَّ ، فَلاَ يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ ، تَعْنِي مِنَ الْغَلَسِ.

অর্থ: হযরত আয়েশা বলেন, মুমিন নারীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে ফজরের সালাত আদায় করত অতঃপর তারা তাদের ঘরে ফিরে যেত, তাদেরকে কেউ চিনত না। তিনি (হযরত আয়েশা রা.) বোঝাতে চাচ্ছেন, অন্ধকারের কারণে।

 হাদীসটির সনদ অত্যন্ত শক্তিশালী। হাদীসটিতে تعنى  শব্দটি আমাদেরকে জানান দিচ্ছে যে, من الغلس  শব্দটি হযরত আয়েশার নয়। কারণ, تعنى বা ‘তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন’ কথাটি হযরত আয়েশার হতে পারে না। হযরত আয়েশার হলে শব্দটি হত أعنى  অর্থাৎ আমি বোঝাতে চাচ্ছি, অথবা এই জাতীয় কোনো শব্দই থাকত না। আসলে হযরত আয়েশা রা.   এতটুকু পর্যন্ত বলেছেন,  مَا يُعْرَفْنَ  বা فَلَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ  (তাদেরকে চেনা যেত না বা তাদেরকে কেউ চিনত না)। পরবর্তী কোন রাবী মনে করেছেন যে, না চেনার কারণ হল, অন্ধকার। তাই তিনি ব্যাখ্যা করে বলে দিয়েছেন, হযরত আয়েশা বোঝাতে চাচ্ছেন, অন্ধকারের কারণে। এরপর আরও পরের কোন রাবী تعنى  (তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন) শব্দটিকে বাদ দিয়ে من الغلس  শব্দটিকে রেখে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফলে হয়ে গিয়েছে ما يعرفن من الغلس  ।

উপরিউক্ত দাবি সম্পর্কে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

এই ইদরাজ তথা হাদীসের মধ্যে রাবী কর্তৃক হাদীসের কোনো অংশের ব্যাখ্যা বা মন্তব্য অন্তর্ভুক্তির ঘটনা কিছু হলেও ঘটেছে। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী রাহ. আবূ হাতেমের সনদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল বলেন,

 كان وكيع يقول فى الحديث _ يعنى كذا وكذا _ وربما حذف "يعنى" وذكر التفسير فى الحديث 

অর্থাৎ ওয়াকী‘ (বিখ্যাত মুহাদ্দিস) হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেন -অর্থাৎ এইরূপ এইরূপ- এবং অনেক সময় তিনি ‘অর্থাৎ’ কথাটিকে অনুচ্চারিত রেখেছেন এবং হাদীসের মাঝে স্বীয় ব্যাখ্যা উল্লেখ করে দিয়েছেন। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী বলেন,

 وكذا كان الزهرى يفسر الأحاديث كثيرا وربما أسقط أداة التفسير فكان بعض أقرانه ربما يقول له: افصل كلامك من كلام النبى – صلى الله عليه وسلم-

অর্থাৎ, তদ্রূপ যুহরী অনেক সময় হাদীসের  ব্যাখ্যা করতেন এবং ব্যাখ্যা নির্দেশক অব্যয়কে ছেড়ে দিতেন। এই কারণে তাঁর সঙ্গীদের কেউ একজন তাঁকে বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা হতে আপনার কথাকে পৃথক রাখুন। দ্রষ্টব্য: النكت على كتاب ابن الصلاح  , বিশ নম্বর অধ্যায়, মুদরাজ সংক্রান্ত আলোচনা পৃষ্ঠা ৩৪৯।

তবে  মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন নিদর্শনাবলী দ্বারা এইসব ইদরাজকে চিw‎হ্নতও করেছেন। উসূলে হাদীস ও মুহাদ্দিসগণের পরিভাষা সংক্রান্ত শাস্ত্রে এতদসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।

মূল আলোচনায় প্রত্যাবর্তণ

তো ইবন মাজার হাদীসে تعنى  শব্দটি প্রমাণ করে যে, من الغلس  বা অন্ধকারের কারণে কথাটি কোনো রাবী কর্তৃক সংযোজিত, হযরত আয়েশার কথা নয়। ‘শরহু মাআনিল আছারে’ ইমাম তাহাবী রাহ. কর্তৃক তাখরীজকৃত একটি হাদীসে শব্দটির কোন অস্তিত্বই নাই। হাদীসটি এই :

حَدَّثَنَا يُونُسُ قَالَ: ثنا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ , عَنِ الزُّهْرِيِّ , عَنْ عُرْوَةَ , عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا , قَالَتْ: " كُنَّا نِسَاءً مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ يُصَلِّينَ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةَ الصُّبْحِ , مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ , ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى أَهْلِهِنَّ , وَمَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ

হাদীসটির সনদ অত্যন্ত শক্তিশালী। হাদীসটি ইদরাজের দাবিকে আরও জোরালো করে। কাজেই হযরত আয়েশার  হাদীস দ্বারা তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে প্রমাণ গ্রহণ শক্তিশালী নয়, দুর্বল বলেই প্রতীয়মান হয়।

তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে লেখকের দ্বিতীয় দলীল

নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদের একটি হাদীস। হাদীসটি হযরত আনাস রা. কর্তৃক বর্ণিত।

পূর্বেই বলেছি যে, হযরত আয়েশা রা.-এর একটি হাদীসকেই লেখক তিনবার এনে তিনটি নম্বর লাগিয়েছেন। উদ্দেশ্য, পক্ষের দলীলের আধিক্য দেখানো। অতএব উক্ত হাদীসকে একটি দলীল হিসাবেই গণ্য করা উচিত। এজন্য আমি বলছি, লেখক চতুর্থ নম্বরে যে হাদীসটি পেশ করেছেন তা তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে তাঁর দ্বিতীয় দলীল। হাদীসটির শেষে বলা হয়েছে, وَالصُّبْحَ اِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ إِلَى أَنْ يَنْفَسِحَ الْبَصَرُ (এবং ফজরের সালাত আদায় করতেন ফজর যখন উদিত হত তখন থেকে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত।)

হাদীসটি তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে  দলীল হয় না । কারণ, ‘দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত’ কথাটির অর্থ হল, ফর্সা হওয়া পর্যন্ত। হাদীসটির এক মর্ম হতে পারে এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন ফজর উদিত হওয়া থেকে শুরু করে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত  সালাত দীর্ঘ করে সালাত আদায় করতেন। তাই যদি হয়  তাহলে তাগলীস বিল ফাজর মুস্তাহাব প্রমাণিত হয় কী করে? তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের দাবি তো এই যে, অন্ধকারে শুরু করা এবং অন্ধকারেই শেষ করা মুস্তাহাব। অথচ হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত শুরু করতেন অন্ধকারে আর শেষ করতেন ফর্সা করে।  হাদীসটির আরেকটি মর্মও হতে পারে। তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর উদিত হওয়া থেকে শুরু করে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সালাত আদায় করতেন। কোনোদিন অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারে শেষ করতেন। কোনোদিন অন্ধকারে শুরু করে ফর্সা করে শেষ করতেন। কোনোদিন ফর্সা করে শুরু করে ফর্সা করে শেষ করতেন। এই মর্ম গ্রহণ করলেও হাদীসটি  দ্বারা তাগলীস বিল ফাজর মুস্তাহাব প্রমাণিত হয় না।

পাঁচ নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের তৃতীয় দলীল

 হযরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। হাদীসটির শেষে আছে والصُّبْحَ بِغَلَسٍ  অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করতেন অন্ধকারে।

 হাঁ, এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে ফজর আদায় করতেন। তবে এই দলীল সম্পর্কে এই লেখার শেষ দিকে কিছু বলব ইনশাআল্লাহ।

উল্লেখ্য , লেখক হাদীসটির বরাত দিয়েছেন, ‘সহীহ আবু দাউদ হা/৩৯৭। অথচ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে ও সহীহ মুসলিমেও  আছে। (বুখারী হাদীস নং ৫৬৫, মুসলিম হাদীস নং ৬৪৬)  কোনো হাদীস বুখারী ও মুসলিম শরীফে থাকলে তো কথাই নেই এতদুভয়ের কোন একটিতে থাকলেও  অন্য কিতাবের বরাত দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হলেও  সঙ্গে বুখারী ও মুসলিমের বরাত অবশ্যই দেওয়া হয়। তার কারণ ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। সম্ভবত লেখকের খবরই নেই যে, হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে। এই যদি লেখকের অবস্থা হয় তাহলে তাঁর মনে যা আসবে তাই তিনি লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি সহীহ হাদীসের আলোকে আদায়কৃত সালাতকে, সাহাবী ও তাবেঈগণের সালাতকে জাল হাদীস দ্বারা আক্রান্ত মনে করবেন এটাই স্বাভাবিক। থাকুক সে কথা। আমাদের আলোচনায় ফিরে আসি।

ছয় নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের চতুর্থ দলীল

সহীহ বুখারীর এই হাদীস :

 وَكَانَ يُصَلِّى الصُّبْحَ وَمَايَعْرِفُ أَحَدُنَا جَلِيْسَهُ الَّذِىْ كَانَ يَعْرِفُهُ وَكَانَ يَقْرَأُ فِيْهَا مِنَ السِّتِّيْنَ إِلَى الْمِأَةِ 

অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) ফজরের ছালাত এমন সময়ে পড়তেন, যখন আমাদের কেউ পার্শেব বসা ব্যক্তিকে চিনতে পারত না, যাকে সে আগে থেকেই চিনে। তিনি ফজর ছালাতে ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত তেলাওয়াত করতেন। (লেখকের অনুবাদ)

 ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের পক্ষে পেশকৃত আবূ বার্যাহ আসলামী রা. কর্তৃক বর্ণিত বুখারী শরীফেরই একটি  হাদীসের সঙ্গে আলোচ্য হাদীসটির বাহ্যত বিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবূ বারযাহ আসলামী রা-এর হাদীসটিকে আমার এই লেখনীতে ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে চতুর্থ দলীল হিসাবে দেখানো হয়েছে। সেই হাদীসটিতে বলা হয়েছে,

 وّكَانَ يَنْفَتِلُ مِنْ صَلَاةِ الْغَدَاةِ حِيْنَ يَعْرِفُ الرَّجُلُ جَلِيْسَهُ 

(এবং তিনি ফজরের সালাত সম্পন্ন করতেন যখন ব্যক্তি তার পার্শেব উপবিষ্ট ব্যক্তিকে চিনতে পারত।) এই বিরোধ নিষ্পত্তির  উপায় কী লেখক তা বলেননি। কেন বলেননি? এটিও তো বুখারীর হাদীস। তাহলে এটিকে আমলে না নিয়ে এটির বিরোধী হাদীসকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন কি একদেশদর্শিতা নয়? আমরা অবশ্য এই বিরোধের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে তা নিয়ে পরে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। 

সাত নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের পঞ্চম দলীল

 তা হল, সুনানে আবু দাউদের একটি হাদীস। যাতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ফজরের সালাত অন্ধকারে আদায় করলেন অতঃপর একবার আদায় করলেন ইসফার করে। অতঃপর আমৃত্যু তাঁর সালাত ছিল অন্ধকারে। তিনি আর ইসফার করেননি।

লেখক হাদীসটির যে তরজমা করেছেন এবং অতঃপর যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে পরে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তার পূর্বে হাদীসটি নিয়েই কিছু আলোচনা আছে।

এই হাদীসটি আসলে লম্বা একটি হাদীসের টুকরা। পুরো হাদীসটি এইরূপ:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلَمَةَ الْمُرَادِىُّ حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ اللَّيْثِىِّ أَنَّ ابْنَ شِهَابٍ أَخْبَرَهُ أَنَّ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ كَانَ قَاعِدًا عَلَى الْمِنْبَرِ فَأَخَّرَ الْعَصْرَ شَيْئًا فَقَالَ لَهُ عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ أَمَا إِنَّ جِبْرِيلَ -صلى الله عليه وسلم- قَدْ أَخْبَرَ مُحَمَّدًا -صلى الله عليه وسلم- بِوَقْتِ الصَّلاَةِ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ اعْلَمْ مَا تَقُولُ.فَقَالَ عُرْوَةُ سَمِعْتُ بَشِيرَ بْنَ أَبِى مَسْعُودٍ يَقُولُ سَمِعْتُ أَبَا مَسْعُودٍ الأَنْصَارِىَّ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « نَزَلَ جِبْرِيلُ -صلى الله عليه وسلم- فَأَخْبَرَنِى بِوَقْتِ الصَّلاَةِ فَصَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ». يَحْسُبُ بِأَصَابِعِهِ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- صَلَّى الظُّهْرَ حِينَ تَزُولُ الشَّمْسُ وَرُبَّمَا أَخَّرَهَا حِينَ يَشْتَدُّ الْحَرُّ وَرَأَيْتُهُ يُصَلِّى الْعَصْرَ وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ بَيْضَاءُ قَبْلَ أَنْ تَدْخُلَهَا الصُّفْرَةُ فَيَنْصَرِفُ الرَّجُلُ مِنَ الصَّلاَةِ فَيَأْتِى ذَا الْحُلَيْفَةِ قَبْلَ غُرُوبِ الشَّمْسِ وَيُصَلِّى الْمَغْرِبَ حِينَ تَسْقُطُ الشَّمْسُ وَيُصَلِّى الْعِشَاءَ حِينَ يَسْوَدُّ الأُفُقُ وَرُبَّمَا أَخَّرَهَا حَتَّى يَجْتَمِعَ النَّاسُ وَصَلَّى الصُّبْحَ مَرَّةً بِغَلَسٍ ثُمَّ صَلَّى مَرَّةً أُخْرَى فَأَسْفَرَ بِهَا ثُمَّ كَانَتْ صَلاَتُهُ بَعْدَ ذَلِكَ التَّغْلِيسَ حَتَّى مَاتَ وَلَمْ يَعُدْ إِلَى أَنْ يُسْفر

আলোচ্য  হাদীসটি আন্ডার  লাইন  করা  অংশের অংশ বিশেষ। আর এই আন্ডার লাইন করা অংশ তথা ওয়াক্তের বিশদ বিবরণ সম্বলিত অংশটুকুকে ইমাম আবু দাউদ রাহ. মা‘লূল বা দোষযুক্ত সাব্যস্ত করেছেন।   কারণ, ইব্ন শিহাব যুহরীর শাগরেদদের মধ্য হতে এক উসামা ইব্ন যায়দ আল-লাইছী ব্যতীত আর কেউ   এই অংশটুকু বর্ণনা করেন না। মা‘মার, ইমাম মালেক, সুফইয়ান ইব্ন উয়াইনাহ, শুআইব ইব্ন আবূ হামযাহ, লাইছ ইব্ন সা‘দসহ ইব্ন শিহাব যুহ্রীর অন্যান্য হাফেজে হাদীস শাগরেদগণ এই অংশটুকু বর্ণনা করেন না। আবার উরওয়া হতে হিশাম ইব্ন উরওয়া ও হাবীব ইব্ন আবূ মারযূকও যুহরীর এই শাগরেদগণের অনুরূপ বর্ণনা করেন। তাঁরা সকলেই يحسب باصابعه خمس صلوات  পর্যন্ত বর্ণনা করেন। পরবর্তী অংশটুকু তাঁদের কেউই বর্ণনা করেন না। দেখুন, বুখারী ও মুসলিম রাহিমাহুমাল্লাহ তাঁদের গ্রন্থে হাদীসটি সন্নিবেশিত করেছেন কিন্তু তাঁদের কেউই এই অংশ সম্বলিত হাদীসটি গ্রহণ করেননি। তার কারণ, সম্ভবত এই ইল্লাত বা দোষ। ইমাম আবূ দাউদ রাহ.-এর মন্তব্যটি হুবহু তুলে ধরছি, দেখুন।

قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَى هَذَا الْحَدِيثَ عَنِ الزُّهْرِىِّ مَعْمَرٌ وَمَالِكٌ وَابْنُ عُيَيْنَةَ وَشُعَيْبُ بْنُ أَبِى حَمْزَةَ وَاللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ وَغَيْرُهُمْ لَمْ يَذْكُرُوا الْوَقْتَ الَّذِى صَلَّى فِيهِ وَلَمْ يُفَسِّرُوهُ وَكَذَلِكَ أَيْضًا رَوَاهُ هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ وَحَبِيبُ بْنُ أَبِى مَرْزُوقٍ عَنْ عُرْوَةَ نَحْوَ رِوَايَةِ مَعْمَرٍ وَأَصْحَابِهِ

অতএব বোঝা গেল, আলোচ্য  হাদীসটি উসামা ইবন যায়দ আল-লাইছীর শায বা দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর হাদীস সহীহ হওয়ার পথে দলবিচ্ছিন্নতা একটি বড় বাধা। যে সম্পর্কে পূর্বে আমি বিশদ আলোচনা করে এসেছি। কাজেই তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে দলীল হিসাবে এই হাদীসটিকে উপস্থাপন করা সঠিক বলে মনে করি না।

প্রসঙ্গত বলছি, লেখক হাদীসটির  ثم صلى مرة اخرى فاسفر بها  এই অংশের তরজমা করেছেন এইরূপ : ‘অতঃপর একবার পড়তে পড়তে ফর্সা করে দিয়েছিলেন।’ তরজমাটি ভুল বলে মনে হয়। অংশটির তরজমা এইরূপ হওয়া উচিত: অতঃপর আরেকবার তিনি সালাত আদায় করলেন, তো ফর্সা করে আদায় করলেন। লেখক এরপর লিখেছেন : উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, একবার তিনি দীর্ঘ ক্বিরাআত করে ফর্সা করেছিলেন। যা সর্বাধিক উত্তম। এরপর থেকে অন্ধকার থাকতেই ছালাত শেষ করতেন।

বিস্ময়কর! যা সর্বাধিক উত্তম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা একবারমাত্র পালন করে সারাজীবন তা পরিহার করে গেলেন? হাঁ কোনো কারণে তা হতে পারে, কিন্তু কী সে কারণ? লেখক কেন তা উল্লেখ না করে এড়িয়ে গেলেন? এড়িয়ে গেলেন, না তার নিকট এ সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই? আল্লাহই ভাল জানেন।

তাগলীস বিল ফাজরের পÿÿ লেখকের পেশকৃত দলীলসমূহের আলোচনার একটি পর্যায় এখানে শেষ হল।

ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে দলীল

এবার ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ যেসব হাদীসকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন সেগুলোর এদিক সেদিক নিয়ে আলোচনা করা যাক। তাঁদের একটি দলীল রাফে‘ ইবন খাদীজ রা. কর্তৃক বর্ণিত তিরমিযী শরীফের একটি হাদীস। লেখক যেটিকে সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা শিরোনামে প্রথমেই উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি সহীহ। লেখক তা স্বীকারও করেছেন। তবে লেখকের দাবি হল, হাদীসটির অপব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এই প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন তার এদিক সেদিক নিয়ে পূর্বে কিছুটা আলোচনা করেছি। অবশিষ্ট ছিল হাদীসটির যে ব্যাখ্যা ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ করে থাকেন তা কি অপব্যাখ্যা -লেখক যেমনটা বলেছেন - না যথার্থ ব্যাখ্যা তা নিয়ে আলোচনা এবং লেখক যে ব্যাখ্যাটিকে সহীহ বলছেন তা কতটুকু সহীহ তা নিয়ে আলোচনা।

اسفروا بالفجر এর ব্যাখ্যা : তাদের ও প্রতিপক্ষের

ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ)কৃত যে ব্যাখ্যার উদ্ধৃতি ইমাম তিরমিযী দিয়েছেন তা নানাবিধ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হয়।

কারণ, প্রথমত : ব্যাখ্যাটি হাদীসের স্পষ্ট শব্দানুগ নয়। শব্দ হতে প্রথমেই যা বোঝা যায় তা হল, তোমরা ফজরের সালাতকে ফর্সায় উপণীত কর। ফর্সা করে সালাত আদায় কর। এ সম্পর্কে পূর্বে আমি বিশদ আলোচনা করে এসেছি।

দ্বিতীয়ত : তাঁদের কৃত ব্যাখ্যাটির সার কথা হলো, তোমরা ফজর তথা সুবহে সাদিককে স্পষ্ট কর যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে। অর্থাৎ সুবহে সাদিক উদিত হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হও, তারপর সালাত আদায় কর। সুবহে সাদিক উদিত হয়েছে - এটা নিশ্চিত না হলে সালাত আদায় করো না। এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে হাদীসে বর্ণিত -فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ - (কারণ, তা সওয়াবের জন্য সর্বোত্তম বা তা বৃহৎ সওয়াব আনয়ণকারী-) রাসূলের এই কথাটির কোনো যথার্থতা থাকে না। কেননা, সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত না হয়ে সালাত আদায় করলে তো কিছুমাত্র সওয়াব হবে না, অধিক সওয়াব তো দূরের কথা। কারণ, তখন  সালাত শুদ্ধই হবে না। আমল শুদ্ধ হবার পর আমলে সুন্নাত ও মুস্তাহাব জাতীয় কিছু সংযুক্ত হবার কারণে যখন আমলে অতিরিক্ত কিছু মাত্রা যোগ হয় তখনই তাতে অধিক সওয়াব লাভ হয়। আমল যদি শুদ্ধই না হয় তাহলে ঐ আমলের জন্য নির্ধারিত  মূল সওয়াবই তো লাভ হবে না, অধিক সওয়াব আসবে কোত্থেকে? অথচ উক্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী বোঝা যায় যে, সুবহে সাদিক হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়ে সালাত আদায় করলে অধিক সওয়াব লাভ হবে আর নিশ্চিত না হয়ে সালাত আদায় করলে অধিক সওয়াব না হলেও আসল সওয়াব লাভ হবে। লক্ষ করলেন নিশ্চয়ই ব্যাখ্যাটির ফল কী দাঁড়াল?  বিষয়টি একজন সাধারণ লোকেরও বোঝার কথা, আর আপনি তো অত্যন্ত মেধাবী আলেম।

তৃতীয়ত : সুনানে নাসাঈতে একটি হাদীস আছে এইরূপ - مَا أَسْفَرْتُمْ بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ بِالْأَجْرِ  (তোমরা যতবেশী ফজরকে ইসফার করবে ততবেশী তা অধিক সওয়াবের কারণ হবে। হাদীস নং-৫৪৯) শায়খ আলবানী বলেছেন,  صحيح الإسناد  অর্থাৎ হাদীসটির সনদ সহীহ।

কথাটি আরও স্পষ্টরূপে ব্যক্ত হয়েছে আল্লামা হাফেয ইবন হাজার আসকালানীর أَلْمَطَالِبُ الْعَالِيَةُ  গ্রন্থে মুসনাদে মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়াহইয়া আল-আদানীর বরাতে সন্নিবেশিত এই হাদীস দ্বারা - أَصْبِحُوْا بِصَلَاةِ الصُّبْحِ فَإِنَّكُمْ كُلَّمَا أَصْبَحْتُمْ بِهَا كَانَ أَعْظَمَ لِلأَجْرِ   (তোমরা ফজরের সালাতকে আলোকিত করে আদায় কর। কেননা, যতবেশী আলোকিত করবে ততই তা অধিক সওয়াবের কারণ হবে। হাদীস নং- ২৯৫)

সহীহ ইব্ন হিববানে রাফে‘ ইবন খাদীজ রা. -এর হাদীসটি এই শব্দে বর্ণিত হয়েছে -  أَصْبِحُوْا بِالصُّبْحِ فَإِنَّكُمْ كُلَّمَا أَصْبَحْتُمْ بِالصُّبْحِ كَانَ أَعْظَمَ لِأُجُوْرِكُمْ  (তোমরা ফজরের সালাতকে আলোকিত করে আদায় কর। কেননা তোমরা ফজরের সালাতকে যত বেশী আলোকিত করে আদায় করবে ততই তা তোমাদের সওয়াব বৃদ্ধির কারণ হবে। হাদীস নং- ১৪৮৯)

 এই সব হাদীস প্রতিপক্ষের ব্যক্ত ব্যাখ্যাকে (যে ব্যাখ্যা ইমাম তিরমিযী রাহ. উদ্ধৃত করেছেন) অসার প্রমাণ করে। কেননা ফজর বা সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার ঘটনাটি প্রলম্বিত হওয়ার মত ঘটনা নয়। বিষয়টি এরকম নয় যে, ফজর বা সুবহে সাদিক একটু উদিত হলে ফজরের ওয়াক্ত একটু শুরু হয়, সালাত একটু শুদ্ধ হয় আর  একটু একটু করে যতবেশী উদিত থাকে সালাতও ততবেশী শুদ্ধ হতে থাকে আর সওয়াবও ততবেশী বৃদ্ধি পেতে থাকে। না বিষয়টি এরকম নয়। কাজেই হাদীসের অর্থ যদি তেমনটাই হয় যেমনটা তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ বলেছেন তাহলে

فإنه أعظم للأجر

বা

كلما أصبحتم بها كان أعظم للأجر

এবং

كلما أصبحتم بالصبح كان أعظم لأجوركم

রাসূলের এই কথাগুলোর কোনো অর্থ থাকে না। জানি না তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ এই সকাল করবে ততই তা তোমাদের সওয়াব বৃদ্ধি

 হাদীসের কী ব্যাখ্যা করবেন।

চতুর্থত : লেখক মুসনাদে তায়ালিসীর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেলাল রা.-কে নির্দেশ দেন - أَسْفِرْ بِصَلَاةِ الصُّبْحِ حَتَّى يَرَى الْقَوْمُ مَوَاقِعَ نَبْلِهِمْ  । লেখক শায়খ আলবানীর মন্তব্যও উল্লেখ করেছেন যে, শায়খ আলবানী বলেন, وهذا إسناد صحيح إن شاء الله  । আল্লাহ চাহেন তো এটি সহীহ সনদ।

লক্ষ  করুন, হাদীসটিতে বলা হয়েছে- সালাতে সুব্হকে এমনভাবে ইসফার বা আলোকিত কর, যেন লোকেরা তাদের নিক্ষিপ্ত তীর কোথায় পতিত হল তা দেখতে পায়। হাদীসটি ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণেরই পÿÿ যায়। ইসফার বিস্ সুবহের অর্থ যদি তেমনটাই হয় যেমনটা তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ বলেন, তাহলে এই হাদীসের অর্থ দাঁড়ায়- তুমি সুবহে সাদিক এমনভাবে উদিত কর যাতে লোকেরা তাদের নিক্ষিপ্ত তীর কোথায় পতিত হল তা দেখতে পায়। সুবহানাল্লাহ! তাহলে অন্ধকারে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব তো দূরের কথা, বৈধ হওয়াই মুশকিল। কেননা, তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিক্ষিপ্ত তীর কোথায় পতিত হল তা দেখতে না পাওয়া গেলে তো সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার ব্যাপারটি সন্দেহযুক্ত থেকে যাবে, নিশ্চিত হবে না। ফলে তার পূর্বে ফজরের সালাতও আদায় করা যাবে না।

 এই হাদীসে আরেকটি বিষয় লÿ করম্নন। হাদীসে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে بصلاة الصبح  । الصبح  বা الفجر  শব্দ নয়। শেষোক্ত শব্দ দুটির অর্থ ‘সুবহে সাদিক’ হতে পারে আবার ‘ফজরের সালাত’ও হতে পারে কিন্তু প্রথমোক্ত শব্দটি শুধু ‘ফজরের সালাত’ অর্থ নির্দেশ করে। তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ ইসফারের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা এই হাদীসের সাথে কোনোভাবেই মেলানো যায় না। কারণ, তাঁরা ইসফারের অর্থ করেছেন সুবহে সাদিক এমনভাবে স্পষ্ট হওয়া যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে। এখানে সুবহে সাদিকের কথা বলা হয় নি সালাতে সুব্হ বা ফজরের সালাতের কথা বলা হয়েছে। একে তো হাদীসটিতে এতটুকু ইসফারের কথা বলা হয়েছে যাতে নিক্ষিপ্ত তীরের গন্তব্যস্থল দেখতে পাওয়া যায় তার উপর আবার শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ‘বিসালাতিস্ সুবহি’। আর এ কারণেই তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ ইসফারের যে ব্যাখ্যা করেছেন সেই ব্যাখ্যাটি যে  হযরত বেলালের এই হাদীসটির কারণেই অগ্রহণযোগ্য তা হাফেজ ইবন হাজার আসকালানীও স্বীকার করেছেন। মনে রাখতে হবে যে, হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী রাহ. শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং শাফিঈ মাযহাবের পক্ষে অন্যতম ব্যারিস্টার ছিলেন। তিনি স্বীয় ইমাম ইমাম শাফিঈ ও আহমাদ ও ইসহাকের এই ব্যাখ্যা উল্লেখ করার পর বলেন,

  وَيَرُدُّهُ رِوَايَةُ إِبْنُ أَبِىْ شَيْبَةَ وَ إِسْحَاقَ وَغَيْرِهِمَا بِلَفْظِ ثَوِّبْ بِصَلَاةِ الصُّبْحِ يَا بِلَالُ حَتّى يُبْصِرَ الْقَوْمُ مَوَاقِعَ نَبْلِهِمْ 

অর্থাৎ এই ব্যাখ্যাটিকে খন্ডন করে দেয় ইব্ন আবি শাইবা, ইসহাক প্রমূখের রেওয়ায়েত এই শব্দে- ثوب بصلاة الصبح يا بلال حتى يبصر القوم مواقع نبلهم  (হে বেলাল, ফজরের সালাতের ইকামত দাও এমন সময়ে যাতে লোকেরা তাদের নিক্ষিপ্ত তীরের আপতনস্থল দেখতে পায়। (দ্রষ্টব্য আত্ তালখীসুল হাবীর, ২৬১ নং হাদীসের অধীনে আলোচনা।)

হাফেজ সাহেব হাদীসটির সনদে কোন আপত্তি উত্থাপন করেননি। বোঝা যায় হাদীসটি তাঁর মতে সহীহ।

 তবে হাফেজ সাহেব এরপর কিছুটা দুর্বল ভাষায় বলেছেন

 لَكِنْ رَوَى الْحَاكِمُ مِنْ طَرِيقِ اللَّيْثِ عَنْ أَبِي النَّضْرِ عَنْ عَمْرَةَ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: مَا صَلَّى رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بالصلاة لِوَقْتِهَا الْآخِرِ حَتَّى قَبَضَهُ اللَّهُ.

(কিন্তু হাকেম তাঁর সনদে আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন, আয়েশা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সালাতকে তার শেষ ওয়াক্তে আদায় করেননি।)  হাফেজ সাহেব বলতে চাচ্ছেন, হযরত বেলালের প্রতি ইসফারের নির্দেশ সম্বলিত হাদীসটি  ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যাকে খন্ডন করে ঠিক কিন্তু তা হযরত আয়েশার এই হাদীসের বিরোধী। এটি হাফেজ সাহেবের পক্ষ হতে হযরত বেলালের প্রতি নির্দেশ সম্বলিত হাদীসটির প্রতি একটি আপত্তি। কিন্তু ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের নিকট এই আপত্তির শক্তিশালী জবাব আছে এবং তাঁদের নিকট হাদীস দুটির বাহ্য বিরোধের মীমাংসাও আছে। তাঁরা এই আপত্তির জবাবে বলেন, আসলে হাদীস দুটির মাঝে কোনো বিরোধ নেই। কারণ, হযরত আয়েশা রা.-এর হাদীসের অর্থ হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সালাতকে একদম  শেষ ওয়াক্তে আদায় করেননি যাতে সালাত ফউত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। আর ইসফার সেইরকম শেষ ওয়াক্ত নয়। কারণ ইসফার করে সালাত শুরু করে সুন্নত  কিরাআতের মাধ্যমে সালাত শেষ করার পরও কমপক্ষে পনের থেকে বিশ মিনিট সময় অবশিষ্ট থাকে সূর্য উদিত হতে।

 ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের ব্যাখ্যাকে লেখক অপব্যাখ্যা বলেছেন। হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যা কোনটি তা তিনি বলেননি। তিনি ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যা ও ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানী রাহ.- এর ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। অথচ ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যা এবং ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর ব্যাখ্যা দুইটির মাঝে বিস্তর ভিন্নতা রয়েছে। এই উভয় ব্যাখ্যা  একই সাথে সঠিক হতে পারে না । লেখক যদি একই সাথে এই উভয় ব্যাখ্যাকে সঠিক মনে করেন তাহলে ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের ব্যাখ্যাকে কেন সঠিক মনে করবেন না? অথচ তাঁদের ব্যাখ্যাটি ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর ব্যাখ্যার কাছাকাছি।  যা হোক, আমরা বোধ হয় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যা হাদীসটির যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা নয়। হাঁ ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানী রাহ. কর্তৃক কৃত ব্যাখ্যা হাদীসটির শব্দ ও ভাষার সঙ্গে মোটামোটি সংগতিপূর্ণ। কিন্তু অন্যান্য হাদীসের আলোকে বলতে হয় যে, ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের ব্যাখ্যাই অধিক সংগতিপূর্ণ। দেখুন, হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী রাহ. ইব্ন আবি শাইবার  যে হাদীসটির প্রেক্ষিতে ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাকের ব্যাখ্যাকে মারদূদ ও প্রত্যাখ্যাত বলেছেন সেই হাদীসটিতে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ثوب بصلاة الصبح يا بلال حتى يبصر القوم مواقع نبلهم   (ফজরের সালাতের ইকামত দাও হে বেলাল, এমন সময়ে যেন লোকেরা তাদের তীর কোথায় নিক্ষিপ্ত হল তা দেখতে পায়।)  এতদ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইসফার করেই ফজর শুরু করতে চাচ্ছেন। এই হাদীসটির অন্যান্য বর্ণনায় نَوِّرْ শব্দ রয়েছে যা أسفر শব্দের সমার্থক। أسفر শব্দটিরই বহুবচন اسفروا । যা ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের পক্ষের প্রথম হাদীসের শব্দ। হাদীসটির অর্থ নিয়ে পূর্বে আলোচনা করেছি যে, এর অর্থ হল, তোমরা ফজরের সালাতকে ফর্সায় উপণীত কর। এর ব্যাখ্যা দুই রকম হতে পারে। এক: যেমনটা ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ বলেছেন। অর্থাৎ তোমরা ফজরের সালাতকে ফর্সায় শুরু করে ফর্সায় শেষ কর। দুই: যেমনটা ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানী বলেছেন। অর্থাৎ তোমরা ফজরের সালাতকে অন্ধকারে শুরু করে ফর্সায় শেষ কর। সেই হিসাবে نَوِّرْ  শব্দ সম্বলিত হযরত বেলাল রা. -এর হাদীসটিও এই দুই ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে বলে কেউ দাবি করতে পারে। কিন্তু মুহতারাম, আমার মতে হযরত বেলাল রা. -এর হাদীসটি এই উভয় ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। কারণ, এখানে সম্বোধন করা হয়েছে হযরত বেলালকে যে, তুমি ফজরকে ফর্সায় উপণীত কর। সম্বোধনটি সাধারণের উদ্দেশে নয়। বিশেষভাবে হযরত বেলালকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কিছু নয় যে, বেলাল যেন ফর্সা করে সালাতের একামত দেয়। যুহর সালাতের ক্ষেত্রে যেমন হযরত বেলালকে সম্বোধন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَبْرِدْ بِالظُّهْرِ   (যুহরকে ঠান্ডায় উপণীত কর) অর্থাৎ ঠান্ডা হওয়ার পর যুহরের একামত দাও।  এ ছাড়া ثوب  শব্দটি স্পষ্টভাবেই আমাদেরকে জানান দিচ্ছে যে, হযরত বেলালকে ফর্সা করে সালাতের একামত দিতে বলা হচ্ছে। সুতরাং হাদীসটি ফর্সা করে সালাত শুরু করার পক্ষে শক্তিশালী দলীল হয় বলে আমি মনে করি এবং এই হাদীসটিই أسفروا  শব্দ সম্বলিত হাদীসটির সম্ভাব্য দুটি ব্যাখ্যার মধ্য হতে ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের ব্যাখ্যাকে নির্দিষ্ট করে দেয় এবং ইমাম তাহাবী ও শায়খ আলবানীর ব্যাখ্যার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।  আল্লাহু আ‘লাম।     

মুহতারাম,

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ যে সকল হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন লেখক তন্মধ্য হতে দুটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীস দুটি সম্পর্কে তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের বক্তব্য নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার ফাঁকে সুনানে নাসাঈ, মুসনাদে মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া আল-আদানীর বরাতে আল-মাতালিবুল ‘আলিয়া ও ইব্ন হিববানের যে হাদীস তিনটির প্রসঙ্গ এসেছে সেগুলোও  ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের দলীল এবং সেগুলো তাঁদের তৃতীয় দলীল।

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের চতুর্থ দলীল

 বুখারী শরীফের হযরত আবূ বারযাহ আল আসলামী রা. -এর একটি লম্বা হাদীস। যেটিতে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাতের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন,  وَكَانَ يَنْفَتِلُ مِنْ صَلَاةِ الْغَدَاةِ حِيْنَ يَعْرِفُ الرَّجُلً جَلِيْسَهُ  আর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজরের সালাত সম্পন্ন করতেন যখন ব্যক্তি তার পার্শ্বে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে চিনতে পারত। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪৭)

 দেখুন, মসজিদে নববীর দেয়াল ছিল মাটির এবং উচ্চতা ছিল স্বল্প। অর্থাৎ মসজিদের অভ্যন্তর ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। এতদসত্ত্বেও সালাত শেষে মসজিদের অভ্যন্তরে একজন যখন তার পাশের ব্যক্তিকে চিনতে পারত তখন বোঝা যায় যে, মসজিদের ভিতরটা তখন আলোকিত হয়ে যেত। তাহলে মসজিদের বাইরে তখন নিশ্চয়ই আরও বেশী আলোময় হয়ে উঠত, নয় কি? অতএব হাদীসটি দ্বারা বুঝা যায় যে, সালাত শেষ করা হয়েছিল ফর্সা করে। তবে ইসফার বা ফর্সা করে ফজর শুরু করা হয়েছিল কি না তা হাদীস দ্বারা স্পষ্ট নয়। কাজেই আমার দৃষ্টিতে হাদীসটি ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের পক্ষে শক্তিশালী দলীল নয়। তবে হাদীস দ্বারা এতটুকু তো স্পষ্ট যে, সালাত যখন শেষ করা হয়েছিল তখন আকাশ বেশ ফর্সা হয়ে গিয়েছিল। কাজেই হাদীসটি তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দলীল অবশ্যই। কারণ, তাঁদের দাবি হল, ফজর অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারেই শেষ করা মুস্তাহাব। তাহলে এই হাদীসের কী জবাব তাঁরা দেবেন ?

পঞ্চম দলীল : হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা.-এর একটি হাদীস। হাদীসটি বুখারী, মুসলিম ও আবূ দাউদের হাদীস। আবূ দাউদে হাদীসটি এভাবে আছে -

عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- صَلَّى صَلاَةً إِلاَّ لِوَقْتِهَا إِلاَّ بِجَمْعٍ فَإِنَّهُ جَمَعَ بَيْنَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ بِجَمْعٍ وَصَلَّى صَلاَةَ الصُّبْحِ مِنَ الْغَدِ قَبْلَ وَقْتِهَا

আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনও দেখিনি কোনো সালাতকে তার সময় ব্যতীত অন্য সময়ে আদায় করতে। মুযদালিফায় ছিল এর ব্যতিক্রম। কেননা তিনি মুযদালিফায় মাগরিব ও এশাকে একসাথে আদায় করেছেন (ফলে মাগরিব আদায় হয়েছে তার সময় ছাড়া এশার সময়ে) এবং পরবর্তী সকালে তিনি ফজর আদায় করেছেন ফজরের ওয়াক্তের পূর্বে। (আবূ দাউদ, হাদীস নং ১৯৩৬ )

বুখারীর হাদীসটি দেখুন এইভাবে এসেছে-

 عَنْ عَبْدِ اللهِ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَلَّى صَلاَةً بِغَيْرِ مِيقَاتِهَا إِلاَّ صَلاَتَيْنِ جَمَعَ بَيْنَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ وَصَلَّى الْفَجْرَ قَبْلَ مِيقَاتِهَا

‘আব্দুলস্নাহ ইবন মাসউদ রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিনি কোনো সালাতকে তার ওয়াক্ত ছাড়া আদায় করতে। দুটি সালাত ব্যতীত । তিনি মাগরিব ও এশাকে একসাথে আদায় করলেন এবং ফজর আদায় করলেন তার ওয়াক্তের পূর্বে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৮২)

লক্ষ করুন, হাদীসটিতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ফজর আদায় করেছেন ফজরের ওয়াক্তের পূর্বে। এদিকে এটা সর্বসম্মত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ফজর আদায় করেছেন সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পরে, পূর্বে নয়। তাহলে ‘ওয়াক্তের পূর্বে, কথাটির অর্থ কী? ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের সর্ববাদীসম্মত অভিমত এই যে, এর অর্থ হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত যে ওয়াক্তে ফজর আদায় করতেন তার পূর্বে। এর দ্বারা বোঝা গেল যে, রাসূল সাধারণত ইসফার করে ফজর আদায় করতেন। কারণ, তিনি যদি অন্ধকারে সাধারণত ফজর আদায় করতেন তাহলে তার পূর্বের ওয়াক্তটি হত সুবহে সাদিকের পূর্বে। অথচ আমরা একটু পূর্বে বলে এসেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ফজর আদায় করেছেন সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পরে, পূর্বে নয়।

হাদীসটি আরও স্পষ্ট ও মজার ভাষায় বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে। ১৬৭৫ নং হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা.-এর উক্তি বর্ণিত হয়েছে এইভাবে - 

فَالَ عَبْدُ اللهِ هُمَا صَلاَتَانِ تُحَوَّلاَنِ عَنْ وَقْتِهِمَا صَلاَةُ الْمَغْرِبِ بَعْدَ مَا يَأْتِي النَّاسُ الْمُزْدَلِفَةَ وَالْفَجْرُ حِينَ يَبْزُغُ الْفَجْرُ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَفْعَلُهُ

অব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ রা. বলেন, দুটো সালাতকে তার ওয়াক্ত হতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাগরিবের সালাত লোকেরা মুযদালিফায় আসার পরে এবং ফজরের সালাত যখন ফজর বা সুবহে সাদিক উদিত হয়। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এইরূপ করতে দেখেছি।

আর ১৬৮৩ নং হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি বর্ণিত হয়েছে এইভাবে-

إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ : إِنَّ هَاتَيْنِ الصَّلاَتَيْنِ حُوِّلَتَا عَنْ وَقْتِهِمَا فِي هَذَا الْمَكَانِ الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ فَلاَ يَقْدَمُ النَّاسُ جَمْعًا حَتَّى يُعْتِمُوا وَصَلاَةَ الْفَجْرِ هَذِهِ السَّاعَةَ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর) বললেন, এই দুই সালাতকে তাদের ওয়াক্ত হতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এই জায়গায় (তথা মুযদালিফায়) মাগরিব ও এশা, অতএব রাত না করে লোকেরা মুযদালিফায় আসবে না। আর ফজরের সালাতকে এই সময়ে।

উল্লেখ্য, হাদীসটিকে ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের পক্ষে একটি শক্তিশালী দলীল বলে মনে করা হয়। ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ যে হাদীসকে নিজেদের পক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপনই করেন না সেইরূপ একটি  জাল হাদীস অনুযায়ী আমল করার অভিযোগ উত্থাপন করে লেখক সেটিকে  উদ্ধৃত করলেন অথচ  ইসফারের পক্ষের এই হাদীসটিকে তিনি উল্লেখ করলেন না। লেখকের এই আচরণের কারণ অজ্ঞতা না জ্ঞানপাপিতা, তা বোঝা গেল না। আল্লাহ আমাদের সকলকে ক্ষমা করুন।

  মুহতারাম, তাগলীস বিল ফাজর ও ইসফার বিল ফাজর - এই উভয় মতের পক্ষের ও বিপক্ষের হাদীস, ব্যাখ্যা ও যুক্তি প্রমাণ নিয়ে আমার দীর্ঘ আলোচনার পর নিশ্চয়ই আপনি যথাযথভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন যে, ‘জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহর ছালাত’ নামক পুস্তিকাটির লেখক কতটুকু সত্যাশ্রয়ী, কতটুকু মিথ্যাশ্রয়ী। কতটুকু ন্যায়পরায়ণ, কতটুকু অবিমৃষ্যকারী ও হঠকারী। তাঁর তাহকীক ও গবেষণা কতটুকু জ্ঞাননির্ভর, কতটুকু অজ্ঞতানির্ভর। 

দীর্ঘ আলোচনার ফসল

মুহতারাম, উভয় পক্ষের হাদীসগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনার পর যে বিষয়গুলো বেরিয়ে আসল তা সংক্ষেপে এই :

এক:  হাদীসের ভান্ডারে ইসফার বিল ফাজর ও তাগলীস বিল ফাজর - এই উভয় সংক্রান্ত হাদীস পাওয়া যায় এবং সহীহ হাদীস পাওয়া যায়। ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ জাল হাদীসকে তাঁদের মতের ভিত্তি বানাননি।

দুই: ইসফার বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মধ্যে উভয়বিধ হাদীস পাওয়া যায়। কওলী ও ফে‘লী। অর্থাৎ কিছু হাদীস এরূপ যেগুলো আমাদের জানান দেয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসফার করে ফজর আদায় করেছেন। আর কিছু হাদীস এরূপ যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসফার করতে নির্দেশ দান করেছেন। পক্ষান্তরে তাগলীস বিল ফাজর সম্পর্কে  শুধু ফে‘লী হাদীস পাওয়া যায় কোনো কওলী হাদীস পাওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, যে সকল হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো কাজের বিবরণী পাওয়া যায় সেসব হাদীসকে ফে‘লী হাদীস বলে। যে সকল হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো উক্তি উদ্ধৃত হয় সেসব হাদীসকে কওলী হাদীস বলে।

তিন: ইসফার বিল ফাজর সম্পর্কে একাধিক সহীহ ও দ্ব্যর্থহীন হাদীস পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে তাগলীস বিল ফাজর সম্পর্কে  সহীহ ও দ্ব্যর্থহীন এই উভয় গুণসম্পন্ন  হাদীস  মাত্র একটি পাওয়া যায়। সেটি হল, লেখক কর্তৃক পাঁচ নম্বরে উল্লেখকৃত তাগলীসের পক্ষে তৃতীয় দলীল। যা হযরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত। তবে এই হাদীসটিও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারেই ফজর শেষ করেছেন। হাদীসটিতে শুধু ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি ফজর আদায় করেছেন অন্ধকারে। তা সত্ত্বেও আমি হাদীসটিকে দ্ব্যর্থহীন বলেছি এইজন্য যে, হাদীসটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে এটাই বুঝা যায় যে, তিনি অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারেই শেষ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে ফজর শুরম্ন করেছেন এটি নিশ্চিত কিন্তু অন্ধকারেই শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত নয়, তবে অন্ধকারে শেষ করেননি সে কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

এখন প্রশ্ন হল, এই দুই প্রকারের হাদীসগুলোর মধ্য হতে আমলের জন্য উসূলের আলোকে কোন হাদীসগুলো অগ্রগণ্য? ইসফারের হাদীস না তাগলীসের হাদীস?

এর জবাব হল, শাস্ত্রীয় নীতি অনুযায়ী যে কোনোটাকে কেউ যদি গ্রহণ করে এবং সেটাকে মুস্তাহাব বলে তাহলে বলা যায় না যে, সে মুস্তাহাব পরিপন্থী কাজ করেছে। কারণ, সব কয়টির  পক্ষে মুস্তাহাব হওয়ার সম্ভাব্য  দলীল বিদ্যমান। প্রশ্ন হল, যদি কোনো একটিকে প্রাধান্য দিতে চাই তখন ?

উত্তরে বলব, আপনি যদি নিবন্ধটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করে থাকেন এবং নিরপেক্ষ মস্তিষ্কে চিন্তা করেন তাহলে আপনিই বলবেন যে, শাস্ত্রীয় বিচারে ইসফারকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, ইসফার বিল ফাজর সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মধ্যে কওলী ও ফে‘লী উভয় প্রকার হাদীস রয়েছে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ইসফার করে ফজর আদায় করেছেন তেমনি সাহাবায়ে কেরামকেও ইসফার করে ফজর আদায় করতে নির্দেশ দান করেছেন। পক্ষান্তরে তাগলীস বিল ফাজর সম্পর্কে শুধু ফে‘লী হাদীস পাওয়া যায়। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তাগলীস বিল ফাজর করেছেন -(এখানে তাগলীস বিল ফাজর বলে আমি শুধু বুঝাতে চাচ্ছি অন্ধকারে শুরু করাকে। সুতরাং অন্ধকারে শেষ করাও এর অন্তর্ভুক্ত এবং ফর্সা করে শেষ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।) এই তথ্য তো হাদীসে পাওয়া যায় কিন্তু তিনি তাগলীস বিল ফাজর করতে নির্দেশ দান করেছেন - এইরূপ কোনো হাদীস পাওয়া যায় না। আর ফে‘লী হাদীসের বিপরীতে যখন কওলী হাদীস পাওয়া যায় তখন কওলী হাদীসকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অর্থাৎ রাসূলের কর্মের বিপরীত কোন উক্তি বা নির্দেশ পাওয়া গেলে তাঁর উক্তি বা নির্দেশকে তাঁর কর্মের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর কারণ সহজবোধ্য। আর তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নির্দেশ দেন একরকম আর তিনি নিজে করেন অন্যরকম তখন এ ছাড়া আর বলার কিছুই থাকে না যে, নিশ্চয়ই স্বীয় নির্দেশের বিপরীত কর্ম সাধনের পিছনে বিশেষ কোনো কারণ নিহিত আছে। অন্য ভাষায় বললে, রাসূলের ফে‘ল বা কর্ম নানারকম ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। কিন্তু উক্তি বা নির্দেশ কোনো ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। তা পালনীয় বিধান বলে পরিগণিত হয়। অতএব যেখানে রাসূলের কর্ম হয় একরকম আর নির্দেশ হয় তার বিপরীত তখন তাঁর নির্দেশই অধিকতর অনুসরণযোগ্য। আলোচ্য বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর  অন্ধকারে ফজর আদায় করণের বিপরীতে ফর্সা করে ফজর আদায় করার না শুধু নির্দেশ পাওয়া যাচ্ছে বরং ফর্সা করে ফজর আদায় করা সম্পর্কে তাঁর কর্মেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। তিনি উম্মতকে ফর্সা করে ফজর আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন আবার নিজেও ফর্সা করে ফজর আদায় করেছেন । দেখুন ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে পেশকৃত প্রথম তিনটি দলীল।

মুহতারাম,

আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিতই তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। মসজিদে নববীতে যাঁরা ফজর আদায় করতেন তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী। তাঁরাও সাধারণত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। সম্ভবত এই কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত সাধারণত অন্ধকারেই আদায় করতেন যাতে বিলম্বজনিত কারণে মসজিদে নববীতে সালাত আদায়কারী সাহাবীগণের কষ্ট না হয়।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে ফজর আদায় করতেন - এই কথার অর্থ এই নয় যে, তিনি এত অন্ধকারে ফজর শুরু করতেন যে, দীর্ঘ কেরাতে নামায আদায় করা সত্ত্বেও তা অন্ধকারেই শেষ হয়ে যেত। কারণ, হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসঊদ রা.-এর হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফজর শুরু করতেন না যেমনটি তিনি করেছেন মুযদালিফায়। তাঁর হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পরপরই ফজর শুরু করেছিলেন যা ছিল তাঁর স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত। বুঝা যায় যে, তাঁর সাধারণ নিয়ম ছিল, সুবহে সাদিক হওয়ার বেশ কিছু পরে সালাত শুরু করা। এদিকে লেখক কর্তৃক ছয় নম্বরে উল্লেখকৃত চতুর্থ দলীল দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাতে ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত তেলাওয়াত করতেন। তো  সুবহে সাদিক উদিত  হওয়ার বেশ কিছু পরে সালাত শুরু করে ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত তেলাওয়াত করলে ফর্সা হয়ে যাওয়ার কথা, অন্ধকার থাকার কথা নয়। অতএব, পাঁচ নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের তৃতীয় দলীল তথা হযরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস

والصبح بغلس

(এবং তিনি ফজর আদায় করতেন অন্ধকারে)-এর মর্ম এটাই বলতে হবে যে, তিনি অন্ধকারে সালাত শুরু করতেন। অন্ধকারে শেষ করতেন কি না হাদীসটি তা ব্যক্ত করে না। হাদীসটিকে অন্ধকারে শেষ করার প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। বিশেষত যখন এক হাদীসে বলা হয়েছে যে, তিনি ফজরের সালাত সম্পন্ন করতেন যখন ব্যক্তি তার পার্শেব উপবিষ্ট ব্যক্তিকে চিনতে পারত। দ্রষ্টব্য, ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে আমার এই লেখনীতে চতুর্থ দলীল হিসাবে উল্লেখকৃত হাদীস। আপনি বলতে পারেন যে, তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে উল্লেখকৃত চতুর্থ দলীলের হাদীসটি দ্বারা তো অন্ধকারেই শেষ করার কথা বুঝা যায়। এর জবাব হল, না তা বুঝা যায় না। কারণ, ঐ হাদীসটিতে শুধু এতটুকু ব্যক্ত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত এমন সময়ে পড়তেন যখন আমাদের কেউ তার পার্শেব বসা ব্যক্তিকে চিনতে পারত না যাকে সে আগে থেকেই চেনে। কিন্তু না চেনার ঘটনাটা কখনকার, সালাত শেষের না সালাত শুরুর তা হাদীসে ব্যক্ত হয়নি।  আপনি বলতে পারেন যে, ঐ হাদীসের জালীস শব্দ কি প্রমাণ করে না যে, ঘটনাটি সালাত শেষের ? আমি বলব যে, জালীস শব্দটি দিয়ে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না যে, ঘটনাটি সালাত শেষের। কারণ জালীস শব্দটি উপবিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কেই বলা হয়েছে তা নিশ্চিত নয়। একই মজলিসে উপস্থিত পার্শবস্থ ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। উপবিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে ব্যবহার হয়ে থাকলেও তা দ্বারা সালাত শেষের ঘটনা বুঝা যায় না। কারণ প্রথম রাকআতে উভয় সেজদার মাঝখানের সময়টিতেও  উপবিষ্টতা পাওয়া যায়। দেখুন, ইসফার বিল ফাজরের পক্ষের চতুর্থ দলীলের হাদীসে কিন্তু স্পষ্টতই সালাত শেষের কথা ব্যক্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষের চতুর্থ দলীলের হাদীসে এইরূপ স্পষ্ট কোনো শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। হাদীস দুইটি আবার দেখুন। তাগলীস বিল ফাজরের হাদীসে বলা হয়েছে وكان يصلى الصبح ====  (তিনি সালাত আদায় করতেন), পক্ষান্তরে ইসফার বিল ফাজরের পক্ষের হাদীসটিতে বলা হয়েছে وكان ينفتل من صلاة الغداة ====  ( এবং তিনি ফজরের সালাত সম্পন্ন করতেন)।

পূর্বে বলেছিলাম, হাদীস দুইটি সাংঘর্ষিক। বলেছিলাম, এই সংঘর্ষ নিরসনের উপায় কী তা নিয়ে পরে আলোচনা করব। পর্যালোচনা দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়েছে আশা করি যে, হাদীস দুইটির মাঝে প্রকৃতপক্ষে কোনো সংঘর্ষ ও বিরোধ নেই। যে বিরোধ বোঝা যায় তা বাহ্যিক, প্রকৃত নয়। হাদীস দুইটির সমন্বিত মর্ম এক ও অভিন্ন। আর তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে সালাত শুরু করতেন এবং ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত তেলাওয়াত করে যখন সালাত শেষ করতেন তখন ফর্সা হয়ে যেত।

এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ১৪৩১ হিজরীতে আমি সপরিবারে হজ্ব আদায় করতে যাই। মদীনা হতে জিদ্দায় আসার পথে এক জায়গায় এসে আমরা আসরের সালাত আদায় করলাম। এরপর চা নাস্তা গ্রহণ করার পর দেখলাম মাগরিবের সময় হতে মাত্র আধঘন্টা খানেক সময় বাকী আছে। ড্রাইভারকে বললাম, আমরা এখানেই মাগরিবের সালাত আদায় করে রওয়ানা হব। সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের অপেক্ষা করতে থাকলাম । ফাঁকা মরুভূমি। কাজেই সূর্যাস্তের দৃশ্যটা সরাসরি দেখতে পাচ্ছি। সূর্য পুরোপুরি দৃশ্যের অন্তরালে চলে গেলে একমিনিট অপেক্ষা করলাম এবং একজনকে বললাম আযান দিতে। পথের ধারের ঐ সকল মসজিদে নিয়মিত মুয়ায্যিন ও ইমাম নিযুক্ত থাকেন না। আপনি তা ভালই জানেন। কাজেই আযান শেষে আমিই ইমামতি করলাম। দুই রাকআত সুন্নতও আদায় করলাম। সালাত শেষে যখন মসজিদ থেকে বের হলাম তখন সেই মুহূর্তে আগত একটি বাসের যাত্রীরা বলাবলি করতে থাকল, ওয়াক্ত না হতেই মাগরিবের সালাতের জামাআত শেষ হয়ে গেল? আমি তাদের কথার কোন জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম না। আমরা যখন সালাত শেষ করে বের হলাম তখন দেখলাম, পুরো মরুভূমি তখনও আলোয় পূর্ণ। তীর নিক্ষেপ করলে তীর কোথায় গিয়ে পড়ল তা স্পষ্ট দেখা যাবে। এটাই ছিল সমালোচনার কারণ। ঐ যাত্রীদের ধারণা অনুযায়ী আমরা ওয়াক্ত না হতেই সালাত আদায় করেছি। যা হোক আমি যুবায়েরকে বললাম, ‘বুখারী ও মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে রাফে‘ ইবন খাদীজ রা. বলেন,

 كُنَّا نُصَلِّى الْمَغْرِبَ مَعَ رَسُوْلِ الله صلى الله عليه وسلم فَيَنْصَرِفُ أَحَدُنَا وَإِنَّهُ لَيُبْصِرُ مَوَاقِعَ نَبْلِهِ 

অর্থাৎ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করতাম, অতঃপর আমাদের কেউ  ঘরে ফিরতে মসজিদ থেকে বের হত আর তখন সে তার নিক্ষিপ্ত তীরের আপতনস্থল দেখতে পেত। (বুখারী হাদীস নং ৫৫৯, মুসলিম হাদীস নং ১৪৭৩) দেশে আমরা সবসময়ই মাগরিবের আযানের পরপরই সালাত আদায় করে থাকি, কিন্তু সালাত শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর দেখি আমাদের চারপাশ এরূপ অন্ধকার হয়ে যায় যে, সেই অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত তীরের আপতনস্থল দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। হাদীসটির মর্ম ও বাস্তবতা এখানে বুঝলাম। আমরা সালাত শেষ করে বের হয়েছি কিন্তু এখনও দেখ কিরকম আলো বিরাজ করছে। এর কারণও তার নিকট ব্যাখ্যা করলাম। বললাম, সূর্য অস্ত যায় আমাদের দৃশ্যপট হতে কিন্তু সূর্যের অস্তিত্ব তো আর বিলুপ্ত হয় না। ফলে ভূপৃষ্ঠের মানুষের দৃশ্যপট হতে সূর্য অস্তমিত হলেও এবং ভূপৃষ্ঠ হতে সূর্যের সরাসরি আলো বা রোদ দূরীভূত হলেও আকাশের উঁচুতে সূর্য অস্তমিত হওয়ার  বেশ কিছুক্ষণ পর পর্যন্তও সূর্যের আলো ও রোদ্দুর বিদ্যমান থাকে। আর সেই আলোর রেশই ফাঁকা ও কঙ্করময় মরুভূমিতে বেশ কিছুসময় পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে। ফলে মাগরিবের সালাত যথাসময়ে আদায় করার পরও এতটুকু আলো বিদ্যমান থাকে যাতে নিক্ষিপ্ত তীরের আপতনস্থল দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু গাছপালা বিশিষ্ট ও ঘনবসতিপূর্ণ ভূপৃষ্ঠে ঐ ক্ষীণ আলো তার প্রভাব ফেলতে পারে না। ঐ জাতীয় স্থানে সূর্য অস্তমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অাঁধার নেমে আসে।’

মুহতারাম,

সূর্য উদিত হওয়ার কালেও একই জাতীয় ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ তখন ফাঁকা মরুভূমিতে একই কারণে খুব দ্রুত ভূপৃষ্ঠ আলোকিত হয়ে যায়। সুতরাং বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর যখন  ফজর শুরু করতেন তখন  ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত সালাতে তেলাওয়াত করলে সালাত শেষ হতে হতে ফর্সা হয়ে যাওয়া অনিবার্য বলে মনে হয়, তখনও অন্ধকার বহাল থাকা কিছুটা অসম্ভব বলেই মনে হয়।

যা হোক, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কারণে ফজরের সালাতকে অন্ধকার থাকতে শুরু করতেন। আর তা হল তাহাজ্জুদ আদায়কারী সাহাবীগণের সুবিধার প্রতি লক্ষ রাখা। বিলম্বজনিত কারণে তাঁদের  যেন  কষ্ট না হয় সেই দিকটা বিবেচনা  করেই অন্ধকারেই শুরু করতেন।  দেখুন,  তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে লেখক কর্তৃক পাঁচ নম্বরে উল্লেখকৃত তৃতীয় দলীলের হাদীসটিতে আছে  وَالْعِشَاءَ إِذَا كَثُرَ النًّاسُ عَجَّلَ وَإِذَا قَلُّوْا أَخَّرَ  ‘এবং এশা, যখন লোক বেশী হত তাড়াতাড়ি আদায় করতেন আর লোক কম হলে বিলম্ব করে আদায় করতেন।’ লোক কম হলে বিলম্ব করতেন আরও কিছু লোক আসে কি না সেই অপেক্ষায়। আর লোক বেশী হলে তাড়াতাড়ি আদায় করতেন যাতে  তাঁদের কষ্ট না হয়। উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনায় রাখা রাহমাতুল লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লামের এক বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি বলেছেন, لولا أن أشق على أمتى لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة ولأخرت صلاة العشاء إلى ثلث الليل  অর্থাৎ আমি যদি আমার উম্মতের উপর কষ্ট চাপিয়ে দেওয়ার আশংকা না করতাম তাহলে প্রত্যেক সালাতের সময় তাদেরকে মিসওয়াক করতে নির্দেশ দিতাম এবং এশার সালাতকে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিলম্ব করতাম। (তিরমিযী, হাদীস নং ২৩)

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ এই বিষয়টিকেও সামনে রাখেন এবং রাসূলের যে মোটিভ ছিল অন্ধকারে ফজর শুরু করার সেই মোটিভ অনুযায়ী তাঁরা আমল করেন। এইজন্য আমরা দেখি রামাদান মাসে তাঁরা ফজরের সালাতকে সুবহে সাদিকের ১০/১৫ মিনিট পরেই শুরু করেন। তথা অন্ধকারেই শুরু করেন। যাতে ইসফার করে শুরু করার কারণে মুসল্লীরা কষ্ট না পায়।

বলছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত ফজর অন্ধকারে শুরু করতেন এবং শেষ করতেন ফর্সা করে। কিন্তু উম্মতের জন্য তাঁর পছন্দ ছিল ইসফার করে শুরু করা। তিনি নিজেও ফর্সা করে শুরু করেছেন বলে হাদীসে পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং ফর্সা করে শুরু করাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দেখুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার সালাত বেশী বিলম্ব করে আদায় করতেন না। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল এশার সালাতকে বিলম্ব করে আদায় করা। তিনি বলেছেন,   لولا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة ولأخرت صلاة العشاء الى ثلث الليل অর্থাৎ আমি যদি আমার উম্মতের উপর কষ্ট চাপিয়ে দেওয়ার আশংকা না করতাম তাহলে প্রত্যেক সালাতের সময় তাদেরকে মিসওয়াক করতে আদেশ করতাম এবং এশার সালাতকে রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিলম্ব করতাম। (তিরমিযী, হাদীস নং ২৩) এই জাতীয় আরও হাদীস আছে। এইসব হাদীসের প্রেক্ষিতেই এশার সালাত বিলম্ব করে আদায় করাকে দল মত নির্বিশেষে সকলেই মুস্তাহাব বলে থাকেন।

তাহলে রাসূলের পছন্দের কারণে যদি ইসফার করে ফজর আদায় করাকে কেউ মুস্তাহাব বলে তবে তাকে দোষ দেওয়া যায় কি ?

তবে ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের অভিমত হল, যদি কোনো ব্যক্তি অধিক দীর্ঘ কিরাআত করে সালাত আদায় করে তবে তার উচিত অন্ধকারে শুরু করা। যাতে সালাত শেষ হওয়ার পরও এতটুকু সময় অবশিষ্ট থাকে যেন  কোনো কারণে সালাত ফাসেদ হয়ে গেছে জানতে পারলে পুনরায় সুন্নত কিরাআতের মাধ্যমে সালাত আদায় করে সূর্যোদয়ের পূর্বেই  সালাত শেষ করা যায়। আর এ কারণেই তাঁরা সাধারণত সূর্যোদয়ের ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ মিনিট পূর্বে ফজরের সালাত শুরু করেন। কারণ, তিওয়ালে মুফাস্সালের যে কোনো দুইটি সূরা দিয়ে দুই রাকআত সালাত শেষ করতে বড় জোর পনের মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়। অতঃপর সালাত শেষে আরও পনের বিশ মিনিট সময় অবশিষ্ট থাকে সূর্য উদিত হতে। অতএব আপনি ভেবে দেখুন কাদের আমল ইফরাত ও তাফরীত তথা ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ি হতে মুক্ত, কাদের আমল অধিকতর মধ্যপথ আশ্রয়ী ও ন্যায়ানুগ, কাদের আমল সকল হাদীসের অধিকতর কাছাকাছি এবং অধিকতর সুন্নাহ সম্মত। মুযাফ্ফর বিন মুহসিন সাহেবদের না ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের?

আরও অনেক কথাই বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আপনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে বিধায় আলোচনা শেষ করছি। যতটুকু আলোচনা হয়েছে তদ্বারা একজন আলেম হিসাবে আপনি অনেক কিছুই উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে আমার বিশ্বাস।

বলেছিলাম, পুরো বইটি সম্পর্কে কিছু মৌলিক বক্তব্য তুলে ধরব। কিন্তু তাতেও এত সময় ও এত লেখার প্রয়োজন যে, এই মুহূর্তে আমার পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। হাতে অন্য কাজ জমা হয়ে আছে যা অল্প কয়েকদিনে শেষ করতে হবে। তবে বইটি প্রেরণ করে আপনি আমার হাতে একটি গবেষণার কাজ  তুলে দিয়েছেন। এজন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা আছে, পুরো বইটির বক্তব্য নিয়ে এই নিবন্ধের মত পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা পর্যালোচনা করার। আপনি আমার জন্য দুআ করবেন। আমরাও আপনার জন্য দুআ করছি এবং করতে থাকব।

মুহতারাম,

আপনি জানেন, বহু আমলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে একাধিক পদ্ধতির সন্ধান পাওয়া যায়। কোনো কোনো ÿÿত্রে একটি মানসূখ বা রহিত এবং অপরটি নাসিখ বা রহিতকারী বলে উলামায়ে কেরাম চিহ্নিত করেছেন। কোনো কোনো আমলের ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতির সবকটিকেই উলামায়ে কেরাম সুন্নাহ বলে নির্দেশ করেছেন। তন্মধ্য হতে কেউ একটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন কেউ অপরটিকে এবং প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রত্যেকেই দলীলের আশ্রয় নিয়েছেন। দলীল ছাড়া ইচ্ছামত কেউ কোনো পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেননি। সুতরাং কোনোটিকে তাচ্ছিল্য করা কিংবা কোনোটিকে প্রত্যাখ্যাত বা হাদীস বিরোধী বলা চরম অন্যায় এবং সুন্না্হ বিরোধী বক্তব্য।

নানাবিধ কারণে সালাতসহ শরীয়তের বহু মাস্আলা মাসায়েলে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। এই মতভেদ সাহাবী যুগেও ছিল। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম কেউ কাউকে পথচ্যুত আখ্যায়িত করেননি। বলেননি যে, সে হাদীস বিরোধী আমল করছে।

শুধু সাহাবা যুগে নয় বরং রাসূলের জীবদ্দশায় তাঁর উপস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরামের মতভেদ ঘটেছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকেই বলেননি যে, তোমার কর্মটি শরীয়ত বিরোধী বা আমার আদেশ ও সুন্নাহ বিরোধী হয়েছে। আপনি জানেন, খন্দকের যুদ্ধ হতে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিব্রাঈল আ. আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়েছেন? আল্লাহর শপথ, আমি তো অস্ত্র-শস্ত্র এখনও রাখিনি। আপনি ওদের উদ্দেশে বের হোন। রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, কোন দিকে? জিব্রাইল আ. বনু কুরায়যার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ঐ দিকে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরূদ্ধে অভিযানের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন এবং হযরত বেলালকে ঘোষণা দিতে বললেন-

من كان سامعا مطيعا فلا يصلين العصر إلا فى بنى قريظة 

‘যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর বাধ্য ও অনুগত সে যেন বনূ কুরায়যায় গিয়েই আসরের সালাত আদায় করে।’

ঘোষণা শোনামাত্রই সবাই অস্ত্র হাতে রওয়ানা হলেন। অনেকেই সময়মত পৌঁছে গেলেন। কিছু সাহাবী  পথে থাকা অবস্থাতেই আসরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। তখন তাঁদের মাঝে মতভেদ হল যে, সালাত কোথায় পড়া হবে। কিছু সাহাবী বললেন, আমরা সেখানেই সালাত আদায় করব যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় করতে আমাদের নির্দেশ দান করেছেন। তথা বনূ কুরায়যায় গিয়ে। অন্যরা বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, আমরা সালাত কাযা করে হলেও বনূ কুরায়যায় পৌঁছেই সালাত আদায় করি। তো কিছু সাহাবী পথেই সালাত আদায় করে রওয়ানা হলেন, অন্যরা বনূ কুরায়যায় পৌঁছে সালাত আদায় করলেন ততÿণে সূর্য ডুবে গেছে। পরবর্তীতে রাসূলকে ঘটনাটি জানানো হলে রাসূল কাউকেই তিরস্কার করলেন না। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪১১৯ ; সহীহ মুসলিম কিতাবুল জিহাদ হাদীস নং ১৭৭০; সীরাতে ইবন হিশাম খন্ড ৬, পৃ. ২৮২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন কোন দলকেই তিরস্কার করলেন না ? করলেন না এজন্য যে, দুই দলেরই উদ্দেশ্য ছিল রাসূলের আনুগত্য। তবে একদল রাসূলের উক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল সেদিকে দৃষ্টি দেননি। তাঁর উক্তির বাহ্য অর্থ অনুযায়ী অনুযায়ী আমল করেছেন। তা হোক, উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত নাই বা করলেন কিন্তু বাহ্য অর্থে হলেও তাঁরা আমল তো করেছেন তাঁর উক্তি অনুযায়ী। অপর দল তাঁর উক্তির মর্ম ও উদ্দেশ্য বুঝার চেষ্টা করেছেন এবং তদনুযায়ী আমল করেছেন । বাহ্যত তাঁরা রাসূলের নির্দেশের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা বাহ্যত রাসূলের নির্দেশের বিরোধিতা করলেও প্রকৃত অর্থে তাঁরা রাসূলের নির্দেশের বিরোধিতা করেননি।  অতএব উভয় দলই স্ব স্ব স্থানে ছিলেন সঠিক। এ কারণেই রাসূল কাউকেই তিরস্কার করেননি। উভয় দলের আমলকেই গ্রহণযোগ্যতার সীমাভুক্ত সাব্যস্ত করেছেন।  উভয় দলের মধ্য হতে কোন দলের আমলটি উত্তম ছিল তা স্বতন্ত্র এক আলোচ্য বিষয়। তবে একজন সাধারণ লোকের সামনেও যদি আপনি ঘটনার বিশদ বিবরণ দেন তাহলে সে বলবে দ্বিতীয় দলের আমলটিই উত্তম ও যথার্থ ছিল। কারণ, তাঁরা সালাতও কাযা করেননি আবার যথাসম্ভব দ্রুত বনূ কুরায়যায় পৌঁছেও গেছেন। এজন্যই আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রাহ. ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে লিখেছেন যাঁরা সালাত কাযা করেননি তাঁদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তাঁরা দুই সওয়াবের অধিকারী। আর অন্যরা যেহেতু রাসূলের নির্দেশের বাহ্য অর্থ অনুযায়ী আমল করেছেন এবং তাঁদেরও উদ্দেশ্য ছিল রাসূলের আনুগত্য তাই তারা মাযূর এবং এক সওয়াবের অধিকারী। (যাদুল মাআদ, খন্ড ৩, পৃ. ১১৮-১১৯)

 বলছিলাম যে, সালাতসহ শরীয়তের বহু মাস্আলা মাসায়েলে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এই মতভেদের কারণ একাধিক এবং এই মতভেদ নতুন নয়, সাহাবী যুগ থেকেই চলে আসছে। কিন্তু দলীলভিত্তিক মতভেদকে কেউ কখনও কলহ বিবাদের উপলক্ষ বানাননি। দলীলভিত্তিক মতভেদ শুধু  বৈধ নয় প্রশংসনীয়। মতভেদ তখনই নিন্দনীয় হয় যখন তা হয় দলীলবিহীন বা মতভেদকে যখন কলহ বিবাদের উপলক্ষ বানানো হয়। সাম্প্রতিক কালে শ্রদ্ধেয় মুযাফ্ফর বিন মুহসিনসহ বেশ কিছু আলেম চিরায়ত এই দালীলিক মতপার্থক্যকে কলহ বিবাদের উপলক্ষ বানাচ্ছেন। তাঁরা সহীহ হাদীসের আলোকে সালাত আদায় করার তথাকথিত আহবান জানিয়ে মূলত মতপার্থক্যের পরিধিকে আরও বিস্মৃত করে চলেছেন। কারণ, তাঁদের বক্তব্য হল, কারও অনুসরণ নয় সহীহ হাদীসের অনুসরণ কাম্য। কথাটি সত্য কিন্তু কথাটির ফল খারাপ। প্রত্যেকেই যদি নিজ গবেষণা অনুযায়ী সহীহ হাদীসের আলোকে সালাত আদায় করার চেষ্টা করে তাহলে যত ব্যক্তি তত মত সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাছাড়া তখন জনসাধারণ সালাত পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে। না তারা নিজেরা গবেষণা করতে পারবে, না মুযাফ্ফর সাহেবদের অনুসরণ করতে পারবে। কারণ, মুযাফ্ফর সাহেবদের বক্তব্য তো এই যে, অন্য কারও  অনুসরণ করা যাবে না। তাঁরাও তো সেই ‘অন্য কেউ’ এর অন্তর্ভুক্ত। সহীহ হাদীসের অনুসরণ কাকে বলে, মতপার্থক্য দোষণীয় কি না, উম্মাহকে এক প্লাটফরমে কী করে আনা যায় ইত্যাদি বিষয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব (আমীনুত তালীম, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা) । প্রবন্ধটি তিনি একটি সেমিনারে পাঠ করেছিলেন। পরবর্তীতে তা পুসত্মক আকারে ‘উম্মাহর ঐক্য: পথ ও পন্থা’ নামে প্রকাশিত হয়। সম্ভব হলে পুস্তকটি আপনার নিকট পাঠিয়ে দেব। মনোজ্ঞ ও গবেষণাপূর্ণ আলোচনা সমৃদ্ধ ঐ পুস্তকটি পাঠ করলে শুধু জনসাধারণ নয় আলেম উলামাও প্রভূত উপকার লাভ করবেন এবং বহু প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং মনের সকল সন্দেহ ও সংশয় বিদূরীত হবে ইনশাআলস্নাহ।

আজ বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে মুসলমানেরা ব্যাপকভাবে ইরতিদাদের শিকার হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে। নাস্তিকতাকে তারা যদি নিজেদের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে ক্ষান্ত হত তাহলেও তার বিরূদ্ধে আমাদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন ছিল, ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য ছিল। কিন্তু অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। নাস্তিকতাকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাচ্ছে। ইসলাম ও মুসলমানের বিরূদ্ধে তারা অনবরত বিষোদগার করে যাচ্ছে। অশ্লীল ভাষায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু মুযাফ্ফর বিন মুহসিন সাহেবরা তাঁদের সকল সংগ্রামী শক্তি ব্যয় করছেন সুন্নাহ সম্মত মতপার্থক্য বিদূরীত করণের পিছনে। সুন্নাহ সম্মত পন্থায় সালাত আদায়কারীকে পথভ্রষ্ট আখ্যা দেওয়ার পিছনে। আর ইরতিদাদ ও নাস্তিকতার বিরূদ্ধে না তাদের কলম চলছে, না তাদের জিহবা চলছে। দুর্ভাগ্য এই জাতির, মহাদুর্ভাগ্য।

শেষ কথা

   সালাতে দলীলভিত্তিক শাখাগত মতপার্থক্যের কারণে সালাত আদায়ের পদ্ধতিতে যে পার্থক্য দেখা যায় তাকে আমি বিভেদ বলতে নারাজ। আমি এই পার্থক্যকে বৈচিত্র বলতে ইচ্ছুক, যে  বৈচিত্র সালাতকে আরও সৌন্দর্যময় করে তোলে, ইসলামকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে। আপনি গোটা জগতকে বাদ দেন, শুধু পৃথিবীর দিকে তাকান। আপনি আপনার চতুর্পার্শ্বে ঐক্যের তুলনায় পার্থক্যই বেশী দেখতে পাবেন। পৃথিবীতে আছে জড়বস্ত্ত, উদ্ভিদ, প্রাণীকূল। কেন এই বিভেদ? সব কেন জড়বস্ত্ত হল না, সব কেন উদ্ভিদ হল না, সব কেন প্রাণী হল না? তারপর দেখুন, সব জড়বস্ত্ত একরকম নয়। কোনোটি পাথর, কোনোটি লোহা, কোনোটি সোনা কোনোটি রূপা, কোনোটি মুক্তা কোনোটি মানিক। আরও কত শত রকমের পার্থক্য। উদ্ভিদ জগতেও ভিন্নতা বিদ্যমান। কোনোটি কান্ডবিশিষ্ট, কোনোটি লতাবিশিষ্ট। কোনোটি ফলজ, কোনোটি ঔষধি, কোনোটি এর কোনোটাই নয়। কোনোটি আম দেয় তো অন্যটি জাম দেয়। কোনোটি কাঁঠাল কোনোটি তাল। এরূপ হাজার রকমের পার্থক্য। প্রাণীকূল দেখুন। কোনোটি বাকশক্তিহীন, কোনোটি বাকশক্তিসম্পন্ন সৃষ্টির সেরা মানুষ। কোনোটি গৃহপালিত, কোনোটি বন্য। আরও কত রকমের পার্থক্য। এক বাঘকে দেখুন। একটি চিতা তো অপরটি নেকড়ে কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পাখী দেখুন। কত প্রজাতির পাখী । এই জীববৈচিত্রসহ নানারকম সৃষ্টি বৈচিত্র এই মাটির পৃথিবীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। শৈল্পিক সৌন্দর্য দিয়ে তাকে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলেছে। তদ্রূপ সালাত আদায়ের পদ্ধতিতে নানারকম দলীলনির্ভর পার্থক্য আমার চোখে বৈচিত্র হয়ে দেখা দেয়। আর সেই বৈচিত্রের মধ্যেও এক মহান ঐক্য আরও স্পষ্ট হয়ে  বিশ্ববাসীকে চমকিত করে। মসজিদে নববীতে কিংবা হারাম শরীফে দেখি একজন সালাত আদায় করতে গিয়ে হাত বুকের উপর রাখে তো অপরজন নাভীর নীচে। আবার অপরজন আদৌ হাত বাঁধেই না, হাত ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একজন আমীন বলে নিঃশব্দে তো অপরজন সশব্দে। একজন রাফয়ে ইয়াদাইন করে তো অপরজন করে না। এইরকম আরও কত পার্থক্য। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এইরকম বিপুল পরিমান পার্থক্যসহ সালাত আদায় করার পরও  যখন দেখা যায় কেউ কারও সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে না  বরং একে অপরের সঙ্গে উৎফুল্লচিত্তে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় হাতে হাত মিলিয়ে তার নিকট  হতে বিদায় নিচ্ছে তখন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের মহাদিগন্ত বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। বৈচিত্রের মাঝে এক মহা ঐক্যের সুর প্রতিধ্বনিত হয়। সে এক অনির্বচনীয় দৃশ্য বলে মনে হয় এবং শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। আমি কবি নই। ফলে ভাষার তুলিতে এই বৈচিত্রের প্রকৃত চিত্র যথাযথ অাঁকতে পারলাম না। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটির এখানেই ইতি টানছি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হায়াতে তাইয়েবা দান করুন। আমীন।

মা‘আস্সালাম

আপনার একামত্ম সেণভাজন

আব্দুল গাফফার,  শহীদবাগ, ঢাকা (১৭ মে ২০১৪)                                                                                         

  পুনশ্চ: আমার এই লেখাটির কোনো খসড়া আমি তৈরী করিনি। কাগজ কলম ব্যবহার না করে সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে কম্পিউটারে লেখাটি কম্পোজ করেছি। ফলে  বিষয়বস্ত্তর দুর্বল উপস্থাপন কিংবা উপস্থাপনে কিছুটা ধারাবাহিকতার অভাব এবং ভাষাগত ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। তারপরও লেখাটি যদি আপনার আদেশ পালনে কিছুটা সফল হয়ে থাকে তাহলে আমি নিজেকে ধন্য ও গর্বিত মনে করব। কম্পিউটারের হিসাবে লেখাটিতে সর্বমোট ১২৮৭৪টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সময় ব্যয় হয়েছে ৭৬ ঘন্টা ৪২ মিনিট। অবশ্য ফাইল খোলা রেখে যখন খানা খেতে বসেছি কিংবা অন্য কাজ করেছি তখন সেই সময়টিকেও কম্পিউটার এডিটিং সময় হিসাবে কাউন্ট করে নিয়েছে। হায়! কম্পিউটার যদি আরেকটু বুদ্ধিমান হত!

 (এ কথা মূল লেখার বিষয়ে। লেখাটি প্রকাশের সময় কিছু সংযোজন বিয়োজন হয়েছে।)

বর্ধিত অংশ : ‘জাল হাদীসের কবলে রাসূলুল্লাহ্র ছালাত’ গ্রন্থের লেখক এই অধ্যায়ের শেষে আরও কিছু দলীল উল্লেখ করেছেন ‘আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায়ের গুরুত্ব’ শিরোনামে। এতদ্বারা তিনি ‘আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় সর্বোত্তম’ তাঁর এই দাবি প্রমাণ করতে চেয়েছেন।  প্রথমে উল্লেখ করেছেন কুরআন মজীদের আয়াত إِنَّ الصّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتَابًا مَوْقُوْتًا  ‘নিশ্চয় মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ছালাত ফরয করা হয়েছে।’ (সূরা নিসা ১০৩)

আয়াতটি দ্বারা লেখকের দাবি প্রমাণিত হয় না। কারণ, আয়াতটিতে নির্দিষ্ট সময় বলতে সালাতের পূর্ণ  সময় বোঝানো হয়েছে। যে সময়ের কোনো একটি সময়ে সালাত আদায় করলে সালাত আদায় হয়ে যাবে। সালাত কাযা হয়ে গেছে বলা হবে না। আউয়াল ওয়াক্ত বোঝানো হয়নি। লেখক যদি একটু মনোযোগ সহকারে আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করতেন তাহলে আয়াতটিকে তিনি তাঁর ঐ দাবির পক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করতেন না। আয়াতটির যে তরজমা তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন সেটি সঠিক তরজমা। আয়াতে  বলা হয়েছে নিশ্চয় মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে সালাত ফরয করা হয়েছে। আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় করা তো  মুস্তাহাব, ফরয নয়।

 এরপর লেখক পুনরায় উম্মে ফারওয়া রা.-এর হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি নিয়ে পূর্বেই আলোচনা করেছি যে, হাদীসটি যঈফ।

এরপর আবূ কাতাদাহ রা.-এর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন হাদীসটি এই:

عَنْ أَبِىْ قَتَادَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ الله صلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الله تَعَالَى إِنِّىْ فَرَضْتُ عَلَى أُمَّتِكَ خَمْسَ صَلَوَاتٍ وَعَهِدْتُ عِنْدِىْ عَهْدًا أَنَّهُ مَنْ جَاءَ يُحَافِظُ عَلَيْهِنَّ لِوَقْتِهِنَّ أَدْخَلْتُهُ الْجَنَّةَ

আবূ কাতাদাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছি এবং আমি একটি অঙ্গীকার করেছি যে, নিশ্চয় যে ব্যক্তি সেগুলোকে ওয়াক্ত অনুযায়ী যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে উপস্থিত হবে, আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। আর যে সেগুলোকে সংরÿণ করবে না , তার জন্য আমার কোনো অঙ্গীকার নেই।

পর্যালোচনা

লেখক লিখেছেন, হাদীসটি উপমহাদেশীয় ছাপা আবূ দাঊদে নেই। আমার বক্তব্য হল, তা-ই যদি হয় তাহলে লেখকের উচিত ছিল হাদীসটির সনদ উল্লেখ করা। তিনি তো বইটি এইদেশীয় মুসলমানদের উদ্দেশে লিখেছেন। সনদ উল্লেখ করলে সকলের পক্ষেই সনদটি যাচাই করার সুযোগ হত এবং লেখকের সততার উপর প্রশ্ন উঠত না। হাদীসটিকে লেখক হাসান বলেছেন। হাসান লিযাতিহী, না লিগাইরিহী তা বলেননি। আমার মতে হাদীসটি যঈফ। কারণ, হাদীসটিতে বাকিয়্যাহ নামক একজন রাবী আছেন যিনি মুদাল্লিস। আর মুদাল্লিসের রেওয়ায়েত তখনই গ্রহণযোগ্য হয় যখন তিনি মারবী আনহু হতে শ্রবণ করেছেন বলে স্পষ্ট ভাষায় বলেন। যেমন বলেন, আমি অমুক থেকে শুনেছি। কিংবা বলেন, আমাকে অমুকে বলেছেন বা জানিয়েছেন। মুদাল্লিস যদি এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেন যা দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না যে, তিনি হাদীসটি মারবী আনহু হতে শুনেছেন না অন্য কোনো ব্যক্তি হতে শুনে তার নাম অনুচ্চারিত রেখে মারবী আনহুর নাম উল্লেখ করে দিয়েছেন তখন তার হাদীস অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। পরিভাষায় বলা হয় যে, মুদাল্লিস কর্তৃক বর্ণিত হাদীস তখনই গ্রহণযোগ্য হয় যখন সে سماع -এর تصريح  করে। যেমন বলে, سمعت فلانا يقول  (আমি অমুককে বলতে শুনেছি) বা বলে, حدثنى فلان أو أخبرنى فلان  (অমুকে আমার নিকট বর্ণনা করেছে বা অমুকে আমাকে জানিয়েছে।)  পক্ষান্তরে মুদাল্লিস যদি سماع  -এর تصريح  না করে, বরং قال فلان  (অমুকে বলেছে) বা ذكر فلان  (অমুকে বলেছে) বা عن فلان  (অমুক হতে) - এই জাতীয় কোনো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে তবে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে না। আলোচ্য হাদীসটির বাকিয়্যাহ নামক রাবী মুদাল্লিস এবং তিনি عن  শব্দ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ইবন হাজারের মতে তিনি صدوق كثير التدليس عن الضعفاء  । ইব্ন মাঈন তাঁর সম্পর্কে বলেন,

 كان يحدث عن الضعفاء بمأة حديث قبل أن يحدث عن الثقة بحديث

ইমাম নাসাঈ তাঁর সম্পর্কে বলেন,

إذا قال حدثنا أو أخبرنا فهو ثقة

তাছাড়া  বাকিয়্যাহ হাদীসটিকে যার বরাতে বর্ণনা করেছেন তিনি হলেন

 ضبارة بن عبد الله بن ابى سليك 

 হাফেজ ছাহেবের মতে তিনি মাজহুল। ইত্যাদি কারণে হাদীসটি যঈফ। হাদীসটি হাসান লি-গাইরিহী হতে পারত যদি সেটি একাধিক সনদে বর্ণিত হত। কিন্তু লেখক তেমন কিছুই বলেননি। প্রতিপক্ষের বিরূদ্ধে লেখক অনবরত চিৎকার করতে থাকেন যে, তাদের অমুক হাদীসটি যঈফ, তমুক হাদীসটি যঈফ। অথচ নিজে যঈফ হাদীসকে দলীল হিসাবে উল্লেখ করলেন। এটা কিরূপ ন্যায়পরায়ণতা তা আপনিই বিচার করম্নন। অতঃপর আমার বক্তব্য হল, হাদীসটি যদি সহীহও হত তবুও হাদীসটিকে লেখকের দাবির পক্ষে দলীল হিসাবে উল্লেখ করা সমীচীন হত না। কারণ, ওয়াক্ত অনুযায়ী যথাযথ সংরক্ষণ করার অর্থ হল, কাযা না করা। প্রতিটি সালাতের জন্য যে আউয়াল ও আখের ওয়াক্ত নির্ধারিত আছে সেই ওয়াক্তের মধ্যেই সালাত আদায় করা।  আউয়াল ওয়াক্তের কথা লেখক কোত্থেকে বুঝলেন জানি না।

এরপর তিনি  ফাদালাহ রা.-এর একটি হাদীস উলেস্নখ করেছেন। হাদীসটি এই: 

   عَلَّمَنِى رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَكَانَ فِيمَا عَلَّمَنِى « وَحَافِظْ عَلَى الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ ». قَالَ قُلْتُ إِنَّ هَذِهِ سَاعَاتٌ لِى فِيهَا أَشْغَالٌ فَمُرْنِى بِأَمْرٍ جَامِعٍ إِذَا أَنَا فَعَلْتُهُ أَجْزَأَ عَنِّى فَقَالَ « حَافِظْ عَلَى الْعَصْرَيْنِ ». وَمَا كَانَتْ مِنْ لُغَتِنَا فَقُلْتُ وَمَا الْعَصْرَانِ فَقَالَ « صَلاَةٌ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَصَلاَةٌ قَبْلَ غُرُوبِهَا

ফাদালাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আমাকে কিছু বিষয় শিক্ষা দান করলেন। তার মধ্যে ছিল, তুমি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হও। আমি বললাম, এই সময়গুলো আমার জন্য খুব ব্যস্ততার। সুতরাং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে নির্দেশ দিন, যখন আমি তা করব তখন আমার জন্য তা যথেষ্ট হবে। তিনি বললেন, তুমি দুই আছরকে সংরক্ষণ কর। এই ভাষা আমার জানা ছিল না। আমি বললাম, দুই আছর কী? তিনি বললেন, সূর্য উঠার পূর্বের ছালাত এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বের ছালাত।

এই হাদীস থেকে ‘আউয়াল ওয়াক্তে সালাত মুস্তাহাব’ কীভাবে প্রমাণিত হয় লেখক তা উল্লেখ করেননি।

আমার তাহকীক মতে  হাদীসের ব্যাখ্যা কেউ কেউ এইভাবে করেছেন যে, ফাদালাহ রা.কে রাসূল প্রথমে সকল সালাতকেই আউয়াল ওয়াক্তে  আদায় করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ফাদালাহ রা. যখন বললেন, ঐ সময়ে আমার অনেক ব্যস্ততা থাকে তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিশেষভাবে ফজর ও আসরকে আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে নির্দেশ দিলেন। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী হাদীসটি লেখকের দাবির পক্ষে দলীল হয়।

কিন্তু  এটি সম্ভাব্য একটি ব্যখ্যা। আরও ব্যাখ্যা হতে পারে। সেটি এই:  সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া বা সালাতকে যথাযথ সংরক্ষণ করার অর্থ হল, সালাত নিয়মিত আদায় করা, সালাতের যাবতীয় হকসমূহের প্রতি যথাযথ লক্ষ্য রেখে সালাত আদায় করা। ফাদালাহ রা. যখন বললেন, ঐ সময়ে আমার ব্যস্ততা থাকে, ফলে অনেক সময় আমার পক্ষে সালাতের যথাযথ হক আদায় করা সম্ভব হবে না তখন রাসূল তাঁকে বিশেষভাবে ফজর ও আছরের প্রতি যত্নবান হতে বললেন। এর নজীর আমরা সূরা বাকারার ২৩৮ নং আয়াতে পাই। যেখানে বলা হয়েছে حافظوا على الصلوات والصلاة الوسطى  (তোমরা সকল সালাতের প্রতি, বিশেষভাবে সালাতে উসতার প্রতি যত্নবান হও) এই আয়াতের তাফসীরে তাফসীরকারগণ ঐ ব্যাখ্যাই উল্লেখ করেছেন যা আমি এইমাত্র উল্লেখ করলাম।

হাদীসটিতে যখন স্পষ্ট ভাষায় আউয়াল ওয়াক্তের কথা বলা হয়নি, আউয়াল ওয়াক্ত বুঝতে যখন হাদীসটির ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হয় এবং সেই ব্যাখ্যাটিও চুড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়, বরং সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তখন হাদীসটি দ্বারা দলীল গ্রহণ কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা আপনিই বিচার করুন।

যদি আমরা মেনেও নেই যে, হাদীসটিতে আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায়ের গুরুত্বই ব্যক্ত করা হয়েছে তবুও হাদীসটিকে সকল সালাতের জন্য প্রযুক্ত করা যায় না। কারণ, এই হাদীস-নির্ভর দলীলটি عام  বা সাধারণ ও নির্বিশেষ। সুতরাং তা  خاص  বা নির্দিষ্ট ও বিশেষ দলীলের মুকাবিলা করতে পারে না। দেখুন, এশার সালাত বিলম্বে আদায় করা সর্বসম্মতভাবে মুস্তাহাব। কারণ, এশার সালাত বিলম্বে আদায় করার পক্ষে বিশেষ দলীল রয়েছে। অর্থাৎ যে দলীলটি বিশেষভাবে এশার সালাতের কথাই বলে। তদ্রূপ যোহরের সালাত গ্রীষ্মকালে বিলম্ব করে আদায় করা সর্বসম্মতভাবে মুস্তাহাব। কারণ, এর পক্ষে বিশেষ দলীল রয়েছে।  যে দলীলটি  গ্রীষ্মকালে যোহরের সালাতকে বিলম্ব করে আদায় করার কথা বলে।  অতএব ফজরের সালাত ইসফার করে আদায় করার পক্ষে যখন বিশেষ দলীল পাওয়া যাচ্ছে তখন ফজরের ক্ষেত্রে সেই বিশেষ দলীলটিই অগ্রগণ্য হবে।

24
রশ্ন : কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে নামাযের নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘নামাযে বুকের উপর হাত রাখা সুন্নাহ। হাদীস শরীফে এই নিয়মটিই আছে। অন্য কোনো নিয়ম নেই। সহীহ বুখারীতে সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে, সহীহ ইবনে খুযায়মায় ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এবং মুসনাদে আহমদে হুলব আতত্বয়ী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে বুকের উপর হাত বাঁধার কথা আছে। এছাড়া তাউস রাহ. থেকে একটি মুরসাল হাদীসে এবং হযরত আলী রা. থেকে সূরায়ে কাওসারের তাফসীরে নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার কথা বর্ণিত হয়েছে।

‘পক্ষান্তরে নাভীর নীচে হাত বাঁধার কোনো প্রমাণ সহীহ হাদীসে নেই। এ সম্পর্কে যত হাদীস ও আছার আছে সব জয়ীফ।’

আমার বন্ধুটি একজন আলেম। আমারও উলূমুল হাদীস বিষয়ে কিছু পড়াশোনা আছে। তার সাথে আলোচনার পর আমি বিষয়টির উপর কিছু পড়াশোনাও করেছি।

নামাযে হাত বাঁধার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এবং উপরোক্ত বিষয়ে ইলমী সমাধান আপনাদের নিকট কামনা করছি।  আল্লাহ তাআলা আপনাদের জাযায়ে খায়ের দান করুন।

 

রাইয়ান ইবনে লুৎফুর রহমান

পল্লবী, ঢাকা-১২১৬

 

উত্তর : নামাযে হাত বাঁধা সুন্নত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে হাত বেঁধেছেন। তাঁর ডান হাত থাকত বাম হাতের কব্জির উপর। সাহাবায়ে কেরামকে এভাবেই নামায পড়ার আদেশ করা হত এবং তাঁরাও এভাবেই হাত বেঁধে নামায পড়তেন।

নামাযে হাত বাঁধা

হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর দিয়ে দুই হাত তুললেন। রাবী বলেন, দুই কান বরাবর। এরপর পরিধানের চাদর গায়ে জড়িয়ে নিলেন, এরপর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন ...।

عن وائل بن حجر : أنه رأى النبي صلى الله عليه وسلم رفع يديه حين دخل في الصلاة كبر، وصف همام حيال أذينه، ثم التحف بثوبه، ثم وضع يده اليمنى على اليسرى ...

 

-সহীহ মুসলিম ১/১৭৩

হযরত হুলব আতত্বয়ী রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ইমাম হতেন এবং তাঁর ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরতেন।

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه. رواه الترمذي وقال : حديث حسن.

-জামে তিরমিযী ১/৩৪; ইবনে মাজাহ ৫৯

  হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. বলেন, লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন নামাযে ডান হাত বাম বাহুর উপর রাখে।’-সহীহ বুখারী ১/১০৪

كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة. قال أبو حاتم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم.

হযরত জাবির রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নামাযরত ব্যক্তির নিকট দিয়ে গমন করছিলেন, যিনি ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে নামায পড়ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত খুলে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫০৯০

مر رسول الله صلى الله عليه وسلم برجل وهو يصلي قد وضع يده اليسرى على اليمنى فانتزعها ووضع اليمنى على اليسرى. قال الهيثمي في مجمع الزوائد ٢/٢۷٥ : رجاله رجال الصحيح.

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আমরা নবীগণ আদিষ্ট হয়েছি দ্রুত (সময় হওয়ামাত্র) ইফতার করতে, বিলম্বে (সময়ের শেষের দিকে) সাহরী খেতে এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে।’

سمعت نبي الله صلى الله عليه وسلم  يقول : إنا معاشر الأنبياء أمرنا بتعجيل فطرنا وتأخير سحورنا وأن نضع أيماننا على شمائلنا في الصلاة. قال الهيثمي  في مجمع الزوائد ١/ ٢۷٥: رجاله رجال الصحيح.

-সহীহ ইবনে হিববান ৩/১০১, হাদীস : ১৭৬৬; আলমুজামুল কাবীর ১১/১৫৯, হাদীস : ১১৪৮৫

হারিছ ইবনে গুতাইফ রা. বলেন, ‘আমি এটা ভুলিনি যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখতে দেখেছি, অর্থাৎ নামাযে।’

مهما رأيت نسيت لم أنس أني رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم وضع يده اليمنى على اليسرى يعني : في الصلاة.

-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৫৬; মুসনাদে আহমদ ৪/১০৫, হাদীস : ১৬৯৬৭-৬৮, ২২৪৯৭

মোটকথা, নামাযে হাত বেঁধে দাঁড়ানো সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক সাহাবী তা বর্ণনা করেছেন। এ কারণে নামাযে হাত ছেড়ে দাঁড়ানো, যা মালেকী মাযহাবের কোনো কোনো ইমাম গ্রহণ করেছেন, মূল সুন্নাহ নয়।

মালেকী মাযহাবের প্রাচীন গ্রন্থ ‘‘আলমুদাওয়ানাতুল কুবরা’’য় আছে, আবদুর রহমান ইবনুল কাসিম রাহ. ইমাম মালিক রাহ. থেকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখার বিষয়ে বর্ণনা করেছেন যে, ‘ফরয নামাযে এই নিয়ম আমার জানা নেই এবং তিনি তা অপছন্দ করতেন। তবে নফল নামাযে কিয়াম যখন দীর্ঘ হয় তখন হাত বাঁধতে বাঁধা নেই।’

قال : وقال مالك في وضع اليمنى على اليسرى في الصلاة قال : لا أعرف ذلك في الفريضة وكان يكرهه، ولكن في النوافل إذا طال القيام فلا بأس بذلك يعين به نفسه.

 কিন্তু এ রেওয়ায়েত উল্লেখ করার পর সুহনূন (গ্রন্থকার) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব রাহ. সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর সূত্রে একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে দেখেছেন।

قال سحنون عن ابن وهب عن سفيان الثوري عن غير واحد من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم أنهم رأوا رسول الله صلى الله عليه وسلم واضعا يده اليمنى على اليسرى في الصلاة.

-আলমুদাওয়ানাহ ১/৭৬

ইমাম মালেক রাহ.-এর অন্য অনেক শাগরিদ তাঁর থেকে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণনা করেছেন। মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত মনীষীদের অনেকেই তাঁর এই রেওয়ায়েতকেই বিশুদ্ধ ও অগ্রগণ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

ইমাম মালিক রাহ.-এর ‘আলমুয়াত্তা’য় এ নিয়মই বর্ণিত হয়েছে।

‘আততাজ ওয়াল ইকলীল লিমুখতাসারিল খালীল’ কিতাবে ইমাম মালেক রাহ. থেকে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণনা করার পর ইবনে রুশদ মালেকীর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘এটিই অগ্রগণ্য ও শক্তিশালী। কারণ প্রথম যুগে মানুষকে এরই আদেশ করা হত।’

ابن رشد : وهذا هو الأظهر، لأن الناس كانوا يؤمرون به في الزمان الأول.

তদ্রূপ কাযী ইয়ায মালেকী রাহ. থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আমাদের শায়খগণ ডান হাতের পাতা বাম হাতের কব্জির উপর মুঠ করার নিয়মই গ্রহণ করেছেন।’

عياض : اختار شيوخنا قبض كف اليمنى على رسغ اليسرى.

-আততাজ ওয়াল ইকলীল, আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আলমাওওয়াক আলমালেকী (৮৯৭ হি.) মাওয়াহিবুল জালীলের সাথে মুদ্রিত ২/২৪০

ইমাম কুরতুবী মালেকী রাহ.ও (৬৭১ হি.) হাত বাঁধার রেওয়ায়েতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করে বলেন, ‘এটিই সঠিক। কারণ হযরত ওয়াইল রা. ও অন্যান্য সাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাত বাম হাতের উপর রেখেছেন।’ -আলজামি লিআহকামিল কুরআনিল কারীম ২০/১৫০ এ প্রসঙ্গে মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত মনীষী ইমাম ইবনে আবদুল বার রাহ. (৪৬৩ হি.) শক্তিশালী আলোচনা করেছেন। তিনি হাত বাঁধার নিয়মকে শুধু অগ্রাধিকারই দেননি; বরং এর বিপরীতে ইমাম মালেক রাহ. থেকে যা কিছু বর্ণনা করা হয় তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় খন্ডনও করেছেন। তাঁর আলোচনার কিছু অংশ মূল পাঠসহ তুলে দেওয়া হল।

তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে (নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ভিন্ন কিছু বর্ণিত হয়নি এবং কোনো সাহাবী এ নিয়মের বিরোধিতা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। শুধু আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের রা. সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়, তিনি নামাযে হাত ছেড়ে রাখতেন, তবে এর বিপরীত কথাও তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইতিপূর্বে আমরা তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করেছি যে, ‘সুন্নাহ হচ্ছে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা।’

জুমহূর তাবেয়ীন ও মুসলিম উম্মাহর আহলুর রায় ও আহলুল আছর উভয় ঘরানার অধিকাংশ ফকীহ এই নিয়মই গ্রহণ করেছেন।’

لم تختلف الآثار عن النبي صلى الله عليه وسلم في هذا الباب ولا أعلم عن أحد من الصحابة في ذلك خلافا الاشيء روي عن ابن الزبير أنه كان يرسل يديه إذا صلى وقد روى عنه خلافه مما قدمنا ذكره عنه وذلك قوله صلى الله عليه وسلم (كذا) وضع اليمين على الشمال من السنة، وعلى هذا جمهور التابعين وأكثر فقهاء المسلمين من أهل الرأي والأثر.

-আততামহীদ ২০/৭৪-৭৫

তিনি আরো বলেন, ‘ইবনুল কাসিম ছাড়া অন্যরা ইমাম মালেক রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ফরয-নফল কোনো নামাযেই হাত বাঁধতে বাধা নেই। আর এটিই তাঁরা মদীনাবাসী শাগরিদদের বর্ণনা।’

... وقال عنه (أي عن مالك) غير ابن القاسم : لا بأس بذلك في الفريضة والنافلة، وهي رواية المدنيين عنه.

-প্রাগুক্ত

এরপর কোনো কোনো তাবেয়ী থেকে নামাযে হাত ছেড়ে রাখার যে বর্ণনা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি বলেন, ‘এই হচ্ছে কতিপয় তাবেয়ীর (আমলের) কিছু বিবরণ। তবে তা (আলোচিত সুন্নাহর) খিলাফ ও বিরোধিতা নয়। কারণ তাদের কেউ (হাত বাঁধা) অপছন্দ করতেন এমনটা পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও তা দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যেত না। কারণ সুন্নাহর অনুসারীদের জন্য সুন্নাহই হচ্ছে দলীল। আর যারা এর বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধেও দলীল হচ্ছে সুন্নাহ, বিশেষত যে সুন্নাহয় কোনো সাহাবীর ভিন্নমত নেই।

فهذا ما روي عن بعض التابعين في هذا الباب وليس بخلاف، لأنه لا يثبت عن واحد منهم كراهية، ولو ثبت ذلك ما كانت فيه حجة، لأن الحجة في السنة لمن اتبعها، ومن خالفها فهو محجوج بها، ولا سيما سنة لم يثبت عن واحد من الصحابة خلافها.

-প্রাগুক্ত ২০/৭৬

তিনি আরো বলেন, ‘(হাত বাধার ক্ষেত্রে) ফরয-নফলে পার্থক্য করার কোনো যুক্তি নেই, যদিও কেউ বলে থাকেন যে, হাত বাঁধার নিয়মটি নফল নামাযের ক্ষেত্রে, ফরযের ক্ষেত্রে নয়। কারণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত নফল নামায ঘরে আদায় করতেন। সুতরাং এটা যদি তাঁর ঘরের নামাযের নিয়ম হত তাহলে তা বর্ণনা করতেন তাঁর স্ত্রীগণ। কিন্তু তাঁরা এ বিষয়ে কিছুই বর্ণনা করেননি। যাঁরা বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন তাঁরা তাঁর নিকট রাত্রিযাপন করতেন না এবং তাঁর ঘরেও প্রবেশ করতেন না। তাঁরা তো তা-ই বর্ণনা করেছেন, যা তাঁকে করতে দেখেছেন তাঁর পিছনে ফরয নামায আদায়ের সময়।’

وكذلك لا وجه للتفرقة بين النافلة والفريضة، ولو قال قائل إن ذلك في الفريضة دون النافلة، لأن أكثر ما كان يتنفل رسول الله صلى الله عليه وسلم في بيته ليلا، ولو فعل ذلك في بيته لنقل عنه ذلك أزواجه ولم يأت عنهن في ذلك شيء، ومعلوم أن الذين رووا عنه أنه كان يضع يمينه على يساره في صلاته لم يكونوا ممن يبيت عنده، ولا يلج بيته، وإنما حكوا عنه ما رأوا منه في صلاتهم خلفه في الفرائض، والله أعلم.

-প্রাগুক্ত ২০/৭৯

হাত কোথায় বাঁধা হবে

তো এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে হাত বাঁধতেন এবং সাহাবায়ে কেরামও হাত বাঁধতেন। এখন প্রশ্ন হল, কোথায় তাঁরা হাত বাঁধতেন? মৌখিক বর্ণনায় হাত বাঁধার মূল প্রসঙ্গ যত পরিষ্কারভাবে এসেছে কোথায় বাঁধতেন তা সেভাবে আসেনি। কেন আসেনি? আসার প্রয়োজন হয়নি। কারণ সবাই হাত বাঁধছেন। কোথায় বাঁধছেন তা সবার সামনেই পরিষ্কার। কাজেই তা মুখে বর্ণনা করার প্রয়োজন হয়নি। তো যে সুন্নাহ কর্মে ও অনুসরণে ব্যাপকভাবে রয়েছে তা মৌখিক বর্ণনায় সেভাবে নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে পরের যুগের লোকদের জন্য সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁরা ঐ সময়ের কর্ম ও অনুশীলনের প্রত্যক্ষদর্শী।

নামাযে হাত বাঁধার সুন্নাহর উপর সাহাবা-তাবেয়ীন কীভাবে আমল করেছেন-এ বিষয়ে ইমাম তিরমিযী রাহ. (২৭৯ হি.) বলেন-

والعمل على هذا عند أهل العلم من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم والتابعين ومن بعدهم، يرون أن يضع الرجل يمينه على شماله في الصلاة، ورأى بعضهم أن يضعهما فوق السرة، ورأى بعضهم أن يضعهما تحت السرة، وكل ذلك واسع عندهم.

অর্থাৎ আহলে ইলম সাহাবা-তাবেয়ীন ও তাঁদের পরবর্তী মনীষীগণ এই হাদীসের উপর (ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরা) আমল করেছেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে, নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতে হবে। তাঁদের কেউ নাভীর উপর হাত রাখার কথা বলতেন, আর কেউ নাভীর নিচে রাখাকে (অগ্রগণ্য) মনে করতেন। (তবে) দুটো নিয়মই তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল।-জামে তিরমিযী ১/৩৪

বস্ত্তত এটা হচ্ছে হাত বাঁধার হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক পদ্ধতি। সাহাবা-তাবেয়ীনের যমানা থেকে এ দুটি নিয়মই চলে আসছে। পরবর্তীতে জুমহূর ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমামগণ এ দুই নিয়ম গ্রহণ করেছেন। এভাবে উম্মাহর তাওয়ারুছ ও ব্যাপক চর্চার মাধ্যমে নামাযে হাত বাঁধার যে নিয়ম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছেছে তা উল্লেখিত হাদীসসমূহেরই ব্যবহারিক রূপ। এ কারণে পরবর্তী যুগে বিচ্ছিন্ন কোনো নিয়ম আবিষ্কার করে তাকে হাদীস শরীফের উপর আরোপ করা হাদীসের তাহরীফ ও অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।

নাভীর নিচে হাত বাঁধা

উপরোক্ত দুই নিয়মের মাঝে নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মটি রেওয়ায়েতের বিচারে অগ্রগণ্য। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. (২৩৮ হি.) বলেছেন, ‘নাভীর নিচে হাত বাঁধা রেওয়ায়েতের বিচারে অধিক শক্তিশালী এবং ভক্তি ও বিনয়ের অধিক নিকটবর্তী।’

تحت السرة أقوى في الحديث تحت السرة أقوى في الحديث وأقرب إلى التواضع

 তাবেয়ী আবু মিজলায লাহিক ইবনে হুমাইদ রাহ. (মৃত্যু : ১০০ হি.-এর পর) নামাযে কোথায় হাত বাঁধবে-এ প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬৩

এই রেওয়ায়েতের সনদ সহীহ।

সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই -

حدثنا يزيد بن هارون قال : أخبرنا الحجاج بن حسان قال : سمعت أبا مجلز ـ أو سألته ـ قال : قلت كيف أصنع؟ قال : يضع باطن كف يمنيه على ظاهر كف شماله ويجعلها أسفل من السرة.

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.ও (মৃত্যু : ৯৬ হি.) এই ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬০

এই রেওয়ায়েতের সনদ হাসান। সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই-

حدثنا وكيع، عن ربيع، عن أبي معشر، عن إبراهيم قال : يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة.

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশশাইবানী রাহ. (১৮৯ হি.) বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. নাভীর নিচে হাত বাঁধতেন। এরপর তিনি বলেন, ‘আমরা এই নিয়মই অনুসরণ করি এবং এটিই (ইমাম) আবু হানীফার সিদ্ধান্ত।’-কিতাবুল আছার, হাদীস : ১২১

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

قال محمد : أخبرنا الربيع بن صبيح، عن أبي معشر، عن إبراهيم : أنه كان يضع يده اليمنى على يده اليسرى تحت السرة. قال محمد : وبه نأخذ وهو قول أبي حنيفة رحمه الله. (كتاب الصلاة، باب الصلاة قاعدا والتعمد على شيء أو يصلي إلى سترة)

প্রসঙ্গত আগেই বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল হচ্ছে হাত বাঁধা সংক্রান্ত মারফূ হাদীসসমূহের ব্যবহারিক রূপ। এ কারণে মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ-এর সূত্রে হাত বাঁধার মরফূ হাদীস বর্ণনা করার পর এই নিয়ম দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।

রেওয়ায়েতটি এই-

أخبرنا أبو حنيفة، عن حماد عن إبراهيم أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يعتمد بإحدى يديه على الأخرى في الصلاة، يتواضع لله تعالى. قال محمد : ويضع بطن كفه الأيمن على رسغه الأيسر، تحت السرة، فيكون الرسغ في وسط الكف، (كتاب الأثار، كتاب الصلاة، باب الصلاة قاعدا والتعمد على شيء أو يصلي إلى سترة)

ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে এক হাতের উপর অন্য হাত বাঁধতেন। এভাবে তিনি আল্লাহর সামনে বিনীত হতেন।’

(ইমাম) মুহাম্মাদ বলেন, ‘ডান হাতের তালু বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে, নাভীর নিচে; সুতরাং কব্জি থাকবে হাতের তালুর মাঝে।’-কিতাবুল আছার, হাদীস : ১২০

খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণও নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করেছেন।

ইমাম ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. (৬২০ হি.) বলেন, নামাযে কোথায় হাত বাঁধা হবে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা আছে। (ইমাম) আহমদ রাহ. থেকে বর্ণিত, দুই হাত নাভীর নিচে রাখবে। এটি (হযরত) আলী রা., আবু হুরায়রা রা., আবু মিজলায রাহ., ইবরাহীম নাখায়ী রাহ., (সুফিয়ান) ছাওরী রাহ., ইসহাক (ইবনে রাহুয়াহ) রাহ. থেকে বর্ণিত।-আলমুগনী ২/১৪১

উল্লেখ্য, ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. ‘আলমুগনী’তে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. থেকে মোট তিনটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন। তবে মূল মতন অর্থাৎ ‘মুখতাসারুল খিরাকী’তে শুধু নাভীর নিচে হাত বাঁধার কথাই বলা হয়েছে।

আরবী পাঠ-ويجعلهما ويجعلهما تحت سرته

‘মুখতাসারে’র ভূমিকায় লেখক ইমাম আবুল কাসিম উমার ইবনুল হুসাইন আলখিরাকী (৩৩৪ হি.) বলেছেন, ‘আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-এর মাযহাব অনুসারে (শরীয়তের মাসাইল) এই কিতাবে সংকলন করেছি।’

اختصرت هذا الكتاب ليقرب على متعلمه على مذهب أبي عبد الله أحمد بن محمد بن حنبل رضي الله عنه.

-আলমুগনী ১/৭-৮

শায়খ আবুল হুসাইন ইয়াহইয়া ইবনে আবুল খায়ের রাহ. (মৃত্যু  ৫৫৮ হি.) বলেন, (ইমাম) আবু ইসহাক (আলমারওয়াযী) রাহ. বলেছেন, ‘এক হাত অন্য হাতের উপর নাভীর নিচে রাখবে।’-আলবায়ান ফী মাযাহিবিল ইমামিশ শাফেয়ী ২/১৭৫

উল্লেখ্য, ইমাম আবু ইসহাক আলমারওয়াযী রাহ. শাফেয়ী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ মনীষী। ইমাম শাফেয়ী রাহ. নাভীর উপর (বুকের নিচে) হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করলেও আবু ইসহাক মারওয়াযী নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মকেই অগ্রগণ্য মনে করেছেন।

ইমাম নববী রাহ. (৬৭৬ হি.) বলেন, (ইমাম) আবু হানীফা, (সুফিয়ান) ছাওরী ও ইসহাক (ইবনে রাহুয়াহ) বলেন, ‘দুই হাত নাভীর নিচে রাখবে। আমাদের (শাফেয়ী মাযহাবের) মনীষীদের মধ্যে আবু ইসহাক আলমারওয়াযী রাহ.ও তা গ্রহণ করেছেন। আর ইবনুল মুনযির তা বর্ণনা করেছেন আবু হুরায়রা, (ইবরাহীম) নাখায়ী ও আবু মিজলায রাহ. থেকে।

তিনি আরো বলেন, ‘আলী ইবনে আবী তালিব রা. থেকে দুটি রেওয়ায়েত আছে : এক. নাভীর উপর হাত বাঁধা, দুই. নাভীর নিচে হাত বাঁধা।

-আলমাজমূ শরহুল মুহাযযাব ৪/৩৩০

উল্লেখ্য, জনৈক গবেষক একটি রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধার অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তার এই প্রয়াস যথার্থ নয়। কারণ হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত মনীষীগণ ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম গ্রহণ করেছেন। ইবনুল মুনযির রাহ. (৩১৮ হি.) স্বয়ং ইসহাক ইবনে রাহুয়াহর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, ‘নাভীর নিচে হাত বাঁধা রেওয়ায়েতের বিচারে শক্তিশালী এবং ভক্তি ও বিনয়ের অধিক নিকটবর্তী।’

সুতরাং এখানে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। আর যে রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, তিনি বুকের উপর হাত বাঁধতেন ঐ রেওয়ায়েতেও তা নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি। বলা হয়েছে, তিনি বিতর নামাযে বুকের উপর হাত বাঁধতেন বা বুকের নিচে।

আরবী পাঠ-

كان إسحاق يوتر بنا ... ويضع يديه على ثدييه أو تحت الثديين.

আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে, নাভীর নিচে ও নাভীর উপরে (বুকের নিচে) দু’ জায়গায় হাত বাঁধার নিয়মই সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল। তাঁরা একটিকে অগ্রগণ্য মনে করলেও কেউ অন্যটিকে অনুসরণযোগ্য মনে করতেন। তো ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. যদি নাভীর নিচে হাত বাঁধাকে অগ্রগণ্য মনে করার পর কখনো কখনো নাভীর উপরে হাত বাঁধার নিয়ম অনুসরণ করে থাকেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই একটি অস্পষ্ট রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে কোনো একটি বিচ্ছিন্ন মত কারো উপর আরোপ করার  অবকাশ নেই। এটি বরং আরোপকারীর দলীল-প্রমাণের দৈন্য এবং শুযূয ও বিছিন্নতাকেই প্রকটভাবে প্রকাশিত করে দেয়।

মূল আলোচনায় ফিরে আসি। এ পর্যন্ত আমরা খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণের ফতোয়া ও আমল লক্ষ্য করেছি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের যমানায় নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছে, যা হাত বাঁধার মরফূ হাদীসমূহেরই ব্যাখ্যা ও ব্যবহারিক রূপ।

নাভীর নিচে হাত বাঁধা যেমন সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া দ্বারা প্রমাণিত তেমনি মারফূ রেওয়ায়েতের সূত্রেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত।

নাভীর নিচে হাত বাঁধার মারফূ রেওয়ায়েত

১. হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নীচে রেখেছেন।

সনদসহ রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-

حدثنا وكيع، عن موسى بن عمير، عن علقمة بن وائل بن حجر، عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم  يضع يمينه على شماله في الصلاة تحت السرة.

-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৫১

এই বর্ণনার সনদ সহীহ।  ইমাম কাসেম ইবনে কুতলূবুগা রাহ. (৮৭৯ হি.) বলেন-وهذا إسناد جيد এটি একটি উত্তম সনদ।-আততা’রীফু ওয়াল ইখবার রিতাখরীজি আহাদীছিল ইখতিয়ার-হাশিয়া শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা

উল্লেখ্য, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবার একাধিক পান্ডুলিপিতে হাদীসটি এভাবেই অর্থাৎ ةحة السرة  (নাভীর নিচে) কথাটাসহ আছে। এর মধ্যে ইমাম মুরতাযা আযাবীদী-এর পান্ডুলিপি ও ইমাম আবিদ আসসিন্দী রাহ.-এর পান্ডুলিপি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইমাম কাসিম ইবনে কুতলূবুগা রাহ., আল্লামা আবদুল কাদির ইবনে আবু বকর আসসিদ্দীকি ও আল্লামা মুহাম্মাদ আকরাম সিন্ধীর পান্ডুলিপিতেও হাদীসটি এভাবে আছে। পক্ষান্তরে অন্য কিছু পান্ডুলিপিতে এই বর্ণনায় ةحة السرة   (নাভীর নিচে) কথাটা নেই। এ কারণে ভারতবর্ষে মুদ্রিত মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবার পুরানো সংস্করণে এই হাদীসে ةحة السرة  (নাভীর নিচে) অংশটি ছিল না। বর্তমানে মদীনা মুনাওয়ারার বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামার তাহকীক-সম্পাদনায় মুসান্নাফের যে মুদ্রণ পাঠক-গবেষকদের কাছে পৌঁছেছে তাতে হাদীসটি ةحة السرة (নাভীর নিচে) অংশসহ রয়েছে। কারণ শায়খের সামনে প্রথমোক্ত পান্ডুলিপি দুটিও ছিল। এ বিষয়ে
বিস্তারিত আলোচনার পর শায়খ বলেন-

ومن نقل الحديث من إحدى النسخ الأربع خ. ظ. ن. ش. التي ليست فيها هذه الجملة : معذور في عدم إثبات هذه الزيادة، ولكنه ليس معذورا في نفي ورودها، ومن نقله عن إحدى النسختين اللتين فيهما هذه الزيادة هو معذور في إثباتها، بل واجب عليه ذلك ولا يجوز لها حذفها فعلى م التنابز والتنابذ؟

উৎসাহী আলিমগণ শায়খের পূর্ণ আলোচনা মুসান্নাফের টীকায় দেখে নিতে পারেন।

উল্লেখ্য, যারা মুআম্মাল ইবনে ইসমাইলের মুনকার রেওয়ায়েত অবলীলায় গ্রহণ করেন তাদের তো এই রেওয়ায়েত গ্রহণে দ্বিধা থাকার কথা নয়। কারণ এক. এই রেওয়ায়েতের সনদ ইবনে খুযায়মার ঐ রেওয়ায়েতের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। দুই. ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে অন্য সূত্রে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়েতেও এর বেশ সমর্থন পাওয়া যায়। ইমাম তবারানী রাহ. হুজর আবুল আম্বাসের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর এই বিবরণ উল্লেখ করেছেন। তাতে আছে, ‘তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন এবং তা রাখলেন পেটের উপর।’

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

حدثنا أبو مسلم الكشي ثنا حجاج بن نصير ثنا شعبة عن سلمة بن كهيل قال : سمعت حجرا أبا العنبس يحدث عن وائل الحضرمي أنه صلى مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ...، ثم وضع يده اليمنى على اليسرى وجعلها على بطنه.

-আলমুজামুল কাবীর ২২/৪৪, হাদীস : ১১০

তেমনি সুনানে দারেমী ও আলমু’জামুল কাবীর তবারানীতে আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইলের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর যে বিবরণ বর্ণিত হয়েছে, তাতে আছে, ‘তিনি ডান হাত বাম হাতের উপর কব্জির কাছে রাখলেন।’ সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

قال الإمام الدارمي في السنن (باب وضع اليمين على الشمال في الصلاة) : أخبرنا أبو نعيم، ثنا زهير، عن أبي إسحاق، عن عبد الجبار بن وائل، عن أبيه قال : رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى قريبا من الرسغ. انتهى

  ورواه الطبراني بطريق عبدان بن أحمد، ثنا عمرو بن عثمان الحمصي، ثنا إسماعيل بن عياش، عن يونس بن أبي إسحاق عن أبي إسحاق به.

-সুনানে দারেমী ১/২২৮; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২২/২৫, হাদীস : ৫২

এই রেওয়ায়েতগুলো সামনে রাখলে বোঝা যায়, আসিম ইবনে কুলাইবের সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর যে বিবরণ যাইদা ইবনে কুদামা বর্ণনা করেছেন, যাতে ‘ডান হাত বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর’ রাখার কথা আছে, তার অর্থ ‘বাহু বাহুর উপর’ রাখা নয়; বরং ডান হাতের পাতা এমনভাবে রাখা যে, তা বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর থাকে। এ সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বুকের উপর হাত বাঁধার মতটি পর্যালোচনা করার সময় ইনশাআল্লাহ।

নাভীর নিচে হাত বাঁধার বিষয়ে জয়ীফ সনদে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়েতও আছে। তবে রেওয়ায়েতগুলোর বিষয়বস্ত্ত উপরে বর্ণিত হাদীস, আছার ও আমলে মুতাওয়ারাছ দ্বারা সমর্থিত।

২. হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সুন্নাহ হচ্ছে নামাযে হাতের পাতা হাতের পাতার উপর নাভীর নিচে রাখা।’-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৮৭৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৬; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৩৯৬৬

সনদসহ রেওয়ায়েতটির পূর্ণ আরবী পাঠ এই-

حدثنا محمد بن محبوب، حدثنا حفص بن غياث، عن عبد الرحمن بن إسحاق، عن زياد بن زيد، عن أبي جحيفة أن عليا رضي الله عنه قال : السنة وضع الكف على الكف في الصلاة تحت السرة.

 قال المزي في تحفة الأشراف ٨/٤٥٨، هذا الحديث في رواية ابي سعيد بن الأعرابي، وابن داسة وغير واحد عن أبي داود، ولم يذكره أبو القاسم.

৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘নামাযে হাতের পাতাসমূহ দ্বারা হাতের পাতাসমূহ নাভীর নীচে ধরা হবে।’

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

حدثنا مسدد، حدثنا عبد الواحد بن زياد، عن عبد الرحمن بن إسحاق الكوفي، عن سيار أبي الحكم، عن أبي وائل قال : قال أبو هريرة رضي الله عنه : أخذ الأكف على الأكف في الصلاة تحت السرة.

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৮, তাহকীক : শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ; তুহফাতুল আশরাফ, হাদীস : ১৩৪৯৪

এই দুই রেওয়ায়েতের সনদে আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক নামক একজন রাবী আছেন। ইমাম তিরমিযী রাহ. তার সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসকে হাসান বলেছেন। দেখুন : জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩৪৬২; আরো দেখুন : হাদীস ২৫২৭

আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের সূত্রে হাদীসটি (২৫২৬) বর্ণনা করার পর ইমাম তিরমিযী বলেন, কোনো কোনো মনীষী এই আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন। আরবী পাঠ-

ا هذا حديث غريب وقد تكلم بعض أهل العلم في عبد الرحمن هذا من قبل حفظه وهو كوفي، وعبد الرحمن بن إسحاق القرشي مديني وهو أثبت من هذا. انتهى

উল্লেখ্য, শায়খ আলবানী রাহ.ও আবদুর রহমান ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসকে শাওয়াহেদের (অন্যান্য বর্ণনার সমর্থনের) কারণে সিলসিলাতুস সহীহায় উল্লেখ করেছেন। দেখুন : সিলসিলাতুস সহীহা হাদিস

৪. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘তিনটি বিষয় (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) নবী-স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত: ইফতারে বিলম্ব না করা, সাহরী শেষ সময়ে খাওয়া এবং নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর নাভীর নিচে রাখা।’

ثلاث من أخلاق النبوة : تعجيل الأفظار، وتأخير السحور، ووضع اليد اليمنى على اليسرى في الصلاة تحت السرة.

-আলমুহাল্লা ৩/৩০; আলজাওহারুন নাকী ২/৩১

উল্লেখ্য, ইবনে হাযম রাহ. (৪৫৬ হি.) তাঁর নামাযে হাত বাঁধার আলোচনায় নাভীর নিচে হাত বাঁধার একটি মারফূ হাদীস ও একটি আছর উল্লেখ করেছেন। তবে সেগুলোর সনদ উল্লেখ করেননি।

পক্ষান্তরে এ আলোচনায় বুকের উপর হাত বাঁধার একটি রেওয়ায়েতও উল্লেখ করেননি, না সনদসহ না সনদ ছাড়া। তদ্রূপ হাত বাঁধার নিয়ম উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘মুস্তাহাব হল, নামাযী তার ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে।’

ويستحب أن يضع المصلي يده اليمنى على كوع يده اليسرى في الصلاة، في وقوفه كله فيها.

-আলমুহাল্লা ৩/২৯

সারসংক্ষেপ : নামাযে হাত বাঁধা সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনেক সাহাবী তা বর্ণনা করেছেন। এই সুন্নাহর ব্যবহারিক রূপ খাইরুল কুরূনে কী ছিল তা সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল ও ফতোয়া এবং সে যুগ থেকে চলে আসা ‘আমলে মুতাওয়ারাছ’ দ্বারা প্রমাণিত, যা ইবাদত-বন্দেগীর সঠিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী সূত্র। এ সূত্রে নামাযে হাত বাঁধার দু’টি নিয়ম পাওয়া যায় : নাভীর নিচে হাত বাঁধা ও নাভীর উপর (বুকের নীচে) হাত বাঁধা। দু'টো নিয়মই আহলে ইলম সাহাবা-তাবেয়ীনের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল, যা ইমাম তিরমিযী রাহ. জামে তিরমিযীতে বর্ণনা করেছেন। তবে রেওয়ায়েতের বিচারে নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়মটি অগ্রগণ্য। ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ রাহ. তা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন।

খাইরুল কুরূন ও পরবর্তী যুগের হাদীস-ফিকহের বড় বড় ইমাম এই নিয়ম গ্রহণ করেছেন। এঁদের মধ্যে ইমাম ইবরাহীম নাখায়ী, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপরন্তু বেশ কিছু মরফূ হাদীসেও নাভীর নিচে হাত বাঁধার নিয়ম বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং এটি নামাযে হাত বাঁধার মাসনূন তরীকা। এ সম্পর্কে দ্বিধা ও সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। 

25
‘‘নামাযে হাত বাঁধা ও নাভীর নিচে হাত বাঁধা’’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে হাত বাঁধার দুটো নিয়ম চলে আসছে : বুকের নীচে হাত বাঁধা ও নাভীর নীচে হাত বাঁধা। মুসলিম উম্মাহর বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণও এ দুটো নিয়ম গ্রহণ করেছেন।

নিকট অতীতে হাত বাঁধার নতুন কিছু নিয়ম আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল না এবং কুরআন-সুন্নাহর প্রাজ্ঞ মনীষী ও মুজতাহিদগণের সিদ্ধান্তেও তা পাওয়া যায় না। বলাবাহুল্য, এসব নিয়ম ‘শুযুয’ ও বিচ্ছিন্নতা বলে গণ্য, যা দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, সম্প্রতি এইসব বিচ্যুতি ও বিচ্ছিন্নতাকেই ‘সুন্নাহ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং চরম দায়িত্বহীনতার সাথে সাধারণ মানুষের মাঝেও তা প্রচার করা হচ্ছে।

আমরা মনে করি, সাধারণ মুসলমানদেরকে দলীল-প্রমাণের শাস্ত্রীয় জটিলতার মুখোমুখি করা অনুচিত, কিন্তু এ সকল অনাচারের প্রতিরোধ ও আম মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষার জন্য এখন কিছু বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিকল্প নেই। যথাসম্ভব সহজ ভাষায় আমরা তা উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হেদায়েতের উপর থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নামাযে হাত বাঁধার ক্ষেত্রে যেসব শুযুয ও বিচ্ছিন্নতা দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

শুযুয ১ : বুকের উপরের অংশে থুতনীর নিচে হাত রাখা

সমসাময়িক গায়রে মুকাল্লিদ আলিমরাও এই নিয়মকে খন্ডন করেছেন। শায়খ বকর বিন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ ‘‘লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ’’ পুস্তিকায় আরো কিছু নতুন নিয়মের সাথে এ নিয়মটিকেও খন্ডন করেছেন। ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘আমরা দেখেছি, কিছু লোক কোনো শায ও বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে তার প্রচারে কিংবা কোনো দুর্বল রুখসত ও অবকাশ গ্রহণ করে তার প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। এদের খন্ডনের জন্য মনীষী আলিমদের এই নীতিই যথেষ্ট যে, ‘ইলমের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন মত এবং (বিধানের ক্ষেত্রে) কোনো অপ্রমাণিত অবকাশ সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

‘কিন্তু সম্প্রতি যে দলটির উদ্ভব ঘটেছে, তাদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানদের প্রতিদিনের ইবাদত-বন্দেগীর ওয়াজিব-মুস্তাহাব বিষয়ে, যে ইবাদত-বন্দেগী ইসলামের মহান নিদর্শন ও প্রতীকও বটে, এমন সব ধারণার
বিস্তার ঘটছে যেগুলোর সাথে কোনো যুগে আলিমসমাজের কোনো পরিচিতি ছিল না। অতিনমনীয় ভাষায় বললে, এসব ধারণার কোনো কোনোটির সূত্র হচ্ছে বহুকাল আগের বর্জিত কিছু মত।

‘আর কোনো ধারণা পরিত্যক্ত হওয়ার জন্য তো এ-ই যথেষ্ট যে, তা সকল আলিমের মতামত থেকে বিচ্ছিন্ন।

‘ইসলামের দ্বিতীয় রোকন নামাযের ক্ষেত্রেও এমন নতুন কিছু কাজ ও অবস্থা আবিষ্কার করা হয়েছে, যার কোনোটা নামাযীকে একটা অস্বাভাবিক রূপ দান করে, অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সম্পর্কে বলেছেন-

وما انا من المتكلفين

 ‘... এবং আমি ভনিতাকারীদের
অন্তর্ভুক্ত নই।’-সূরা সোয়াদ (৩৮) : ৮৬

‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

بعثت بالحنيفية السمحة

 ‘তেমনি তা নামাযীর মাঝে একটা উদ্যত ভঙ্গি সৃষ্টি করে, অথচ নামায হচ্ছে আপন রব ও মাবুদের সামনে বান্দার বিনয় ও অক্ষমতার অবস্থা!

‘কোনো কোনো ধারণার অর্থ দাঁড়ায়, ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গোটা মুসলিম উম্মাহ ছিল সুন্নাহ বর্জনকারী ও সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত। অন্যভাষায়, তারা ছিল সম্মিলিতভাবে পাপী ও অপরাধী।

‘তো এই সকল ভ্রান্তির কারণ কী?

‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে অতিশয়তা, আর কখনো (আরবী) ভাষার বাকরীতি ও হাদীস-ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কে উদাসীনতা।

‘এই সকল বিভ্রান্তি হচ্ছে দলীলের বিষয়ে মূলনীতি বর্জনের এবং নামাযের স্বাভাবিক অবস্থা ও ফিকহ-খিলাফিয়াতের কিতাব থেকে বিমুখতার কুফল। অথচ ঐ সকল কিতাবে আহকাম ও বিধানের তত্ত্ব, কারণ ও বিশেষজ্ঞদের মতভিন্নতার আলোচনা থাকে। ...’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ পৃ. ৩-৪

বুকের উপরের অংশে গলদেশে হাত বাঁধার ‘দলীল’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কুরআন মজীদের আয়াত-

فصل لربك وانحر

-এর তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়। বায়হাকী তা বর্ণনা করেছেন (২/৩১) এবং তার সূত্রে তাফসীরের বিভিন্ন কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে। যেমন দেখুন : আদ্দুররুল মানছূর ৮/৬৫০-৬৫১

‘এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। কারণ এর সনদে রওহ ইবনুল মুসাইয়াব আলকালবী নামক একজন রাবী আছেন। তার সম্পর্কে দেখুন : আলমাজরূহীন ১/২৯৯

সূরায়ে কাওসারের ঐ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, তার অর্থও তা-ই যা নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে-

قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين

 (বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহর জন্য, যিনি রাববুল আলামীন।’

অর্থাৎ ঐ আয়াতে وانحر অর্থ কুরবানী, গলদেশে হাত রাখা নয়।)

‘ইবনে জারীর এই তাফসীরকেই সঠিক বলেছেন এবং ইবনে কাছীর তা সমর্থন করেছেন। তাঁর
মন্তব্য-এটি অতি উত্তম (ব্যাখ্যা)।’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ, বকর আবু যায়েদা পৃ. ৯

উপরে যে রেওয়ায়েতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তার পূর্ণ আরবী পাঠ সনদসহ তুলে দেওয়া হল-

أخبرنا أبو زكريا بن أبي اسحاق، أنبأ الحسن بن يعقوب بن البخاري، انبأ يحي بن أبي طالب، انبأ زيد بن الحباب، ثنا روح بن المسيب، قال : حدثني عمرو بن مالك النكري عن أبي الجوزاء عن ابن عباس رضي الله عنهما في قول الله عز وجل "فصل لربك وانحر" قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة عند النحر.

-সুনানে বায়হাকী ২/৩০-৩১

রওহ ইবনুল মুসাইয়্যাব সম্পর্কে ইবনে হিববান রাহ. (৩৫৪ হি.) বলেন, ‘সে ছিকা রাবীদের সূত্রে মওযু রেওয়ায়েত বর্ণনা করে। তার থেকে বর্ণনা করা বৈধ নয়।’

يروي الموضوعات عن الثقات لا تحل الرواية عنه

-কিতাবুল মাজরূহীন

ইবনে আদী বলেন, ‘সে ছাবিত ও ইয়াযীদ আররাকাশী থেকে এমন সব রেওয়ায়েত বর্ণনা করে, যা মাহফুয নয় (সঠিক নয়)।’

يروي عن ثابت ويزيد الرقاشي أحاديث غير محفوظة

-আলকামিল ফী জুয়াফাইর রিজাল ৩/১৪৩

আরো দেখুন : মীযানুল ইতিদাল ২/৫৭; লিসানুল মীযান ২/৪৬৮

সারকথা : এই রেওয়ায়েত নির্ভরযোগ্য নয়। আর এর দ্বারা উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর করা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়াতের সঠিক তাফসীর তা-ই যা ইবনে জারীর তাবারী রাহ. গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে কাছীর যাকে ‘অতি উত্তম’ বলেছেন।

শুযুয ২ : নামাযে যিরার উপর যিরা রাখা

আরবীতে হাতের আঙুলের মাথা থেকেই কনুই পর্যন্ত অংশকে ‘যিরা’ বলে। সম্প্রতি কিছু মানুষ যিরার উপর যিরা রাখাকে সুন্নাহ মনে করেন এবং ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর না রেখে ডান হাতের যিরা বাম হাতের যিরার উপর রাখেন। হাত বাঁধার ক্ষেত্রে এটাও একটা বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতা। কোনো সহীহ হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং কোনো মুজতাহিদ ইমাম এই নিয়মের কথা বলেননি। যারা একে সুন্নাহ মনে করেন তারা এ বিষয় কোনো সহীহ-সরীহ নস (বিশুদ্ধ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য) উপস্থাপন করতে পারেননি। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলীল হচ্ছে, দুটো সহীহ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা।

নীচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

প্রথম হাদীস : সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, ‘লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন তার ডান হাত বাম যিরার উপর রাখে।’

হাদীসটির আরবী পাঠ এই-

كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة. قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم.

-মুয়াত্তা মালিক পৃ. ৫৫ ; সহীহ বুখারী ১/১০৪

এই হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই। বাম যিরার উপর ডান হাত রাখার কথা আছে।

দ্বিতীয় হাদীস : ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের একটি পাঠ। তাতে আছে, ‘(আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর রাখলেন।’

রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد

-মুসনাদে আহমদ ৩১/১৬০, হাদীস : ১৮৮৭০; সুনানে আবু দাউদ ১/৪৮৩, হাদীস : ৭২৭

এই বর্ণনাতেও বলা হয়নি ডান যিরা রেখেছেন। বলা হয়েছে, ডান হাত রেখেছেন।

এই দুই হাদীসে ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরা-এর কোনো প্রমাণ নেই; বরং এই ব্যাখ্যা করা হলে তা হবে এই দুই হাদীসের শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা। কারণ হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমাম ও ভাষ্যকার এই ব্যাখ্যা করেননি।

উল্লেখিত পাঠটি কি ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের মূল পাঠ

ওয়াইল ইবনে হুজর রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে নামায পড়েছেন এবং যেভাবে তাঁকে নামায পড়তে দেখেছেন তা বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই বিবরণ বেশ কয়েকজন রাবীর সূত্রে পাওয়া যায়। যেমন : ১. আলকামা ইবনে ওয়াইল ২. আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল। (এরা দু’জন ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর পুত্র। আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল তার বড় ভাই আলকামা ইবনে ওয়াইল রাহ. থেকেই পিতার বিবরণ গ্রহণ করেছেন। দেখুন : সহীহ মুসলিম ফাতহুল মুলহিম ২/৩৯) ৩. হুজর ইবনুল আম্বাস, ৪. কুলাইব ইবনে শিহাব, প্রমুখ। শেষোক্ত কুলাইব ইবনে শিহাব রাহ.-এর বর্ণনাই আমাদের আলোচ্য বিষয়।

কুলাইব ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন তার পুত্র আসিম ইবনে কুলাইব রাহ.। আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. থেকে অনেক রাবী এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমন

শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ

বিশর ইনুল মুফাদ্দাল

কায়স ইবনুর রাবী

আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ

খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ

আবু ইসহাক

আবুল আহওয়াস

আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস

মুসা ইবনে আবী আয়েশা

আবু আওয়ানা ও

যাইদা ইবনে কুদামা প্রমুখ।

শেষোক্ত রাবী যাইদা ইবনে কুদামা-এর বর্ণনার পাঠ সকলের চেয়ে আলাদা। এ কারণে তার পাঠকে আসিম ইবনে কুলাইবের বর্ণনার মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

এই সকল বর্ণনা সামনে রাখলে প্রতীয়মান হয়য, ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস থেকে যিরার উপর যিরার নিয়ম গ্রহণ করার অবকাশ নেই।
কারণ :

এক. আগেই বলা হয়েছে, আসিম ইবনে কুলাইব থেকে অন্যান্য ছিকা রাবী উপরোক্ত শব্দে বর্ণনা করেননি। যাইদার রেওয়ায়েতের পাঠ তাদের সবার রেওয়ায়েতের পাঠ থেকে আলাদা। সুতরাং যাইদার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, এটিই আসিম ইবনে কুলাইবের পাঠ। অর্থাৎ আসিম ইবনে কুলাইব হুবহু এই শব্দে বর্ণনা করেছেন।

দুই. আলোচিত হাদীসের মূল রাবী হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.। আসিম ইবনে কুলাইবের সূত্র ছাড়া আরো বেশ কিছু সূত্রে তাঁর বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে। সেসব রেওয়ায়েতের পাঠও যাইদার পাঠের চেয়ে আলাদা। সুতরাং তাঁর পাঠটিকেই ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর বিবরণের মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

তিন. যাইদার পাঠটিও স্পষ্টভাবে ‘যিরার উপর যিরার’ নিয়ম নির্দেশ করে না; বরং সামান্য চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই পাঠের অর্থও তা-ই যা এ হাদীসের অন্য সকল পাঠ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে পূর্ণ ‘সায়িদ’ (যিরা) উদ্দেশ্য নয়। সায়িদের কিছু অংশ উদ্দেশ্য, যা কব্জি সংলগ্ন।

চার. আসিম ইবনে কুলাইবের বিবরণ বহু সনদে বর্ণিত হয়েছে। এসব বিবরণের মৌলিক পাঠ দু’ ধরনের : ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরা এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। যেসব রেওয়ায়েতে أخذ বা إمساك (ধরা) শব্দ আছে সেখানে হাত দ্বারা যে হাতের পাতা উদ্দেশ্য তা তো বলাই বাহুল্য। আর যেসব রেওয়ায়েতে وضع (রাখা) শব্দ আছে সেখানে কনুই পর্যন্ত হাত বোঝানো হয়েছে-এই দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ এর অর্থ হবে আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. ওয়াইল ইবনে হুজরের যে বিবরণ উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী রাবীদের বর্ণনায় শব্দগত পার্থক্যের কারণে একে দুই বিবরণ ধরে নেওয়া হয়েছে : একটি হল, ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাত ধরা। আরেকটি ডান যিরা বাম যিরার উপর বিছিয়ে রাখা!

এক্ষেত্রে সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তা হচ্ছে, যেসব বর্ণনায় ‘ডান হাত রাখা’ আছে তারও অর্থ ডান হাতের পাতা রাখা, কনুই পর্যন্ত রাখা নয়।

পাঁচ. এটা আরো শক্তিশালী হয় যখন দেখা যায়, এ হাদীসের অসংখ্য বর্ণনার মাঝে একটি সহীহ রেওয়ায়েতেও ‘ডান হাতের যিরা’ বাম হাতের উপর রেখেছেন এমন কথা পাওয়া যায় না।

সুতরাং যিরার উপর যিরা একটা আরোপিত ব্যাখ্যা, হাদীস শরীফের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণেই হাদীস ও ফিকহের কোনো নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে হাদীসের এই ব্যাখ্যা এবং হাত বাঁধার এই নিয়ম বর্ণনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, উপরোক্ত নিয়মটি যেমন হাত বাঁধার বিচ্ছিন্ন ও নবউদ্ভাবিত একটি নিয়ম তেমনি এই নিয়ম দ্বারা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যাও একটি শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা।

ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ কী ব্যাখ্যা করেছেন

যাইদা ইবনে কুদামার এই পাঠ হাদীস ও ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উদ্ধৃত হয়েছে। বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ তার অর্থ করেছেন ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর রাখা।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা রাহ. (৩১১ হি.) সহীহ ইবনে খুযায়মায় হাদীসের এই পাঠ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘যিরার উপর যিরা’র অর্থ গ্রহণ করেননি। তিনি এই হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন-

باب وضع بطن الكف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد جميعا.

অর্থাৎ ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখা। (দেখুন : সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, বাব : ৯০)

বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, নামাযে হাত এমনভাবে রাখা উচিত, যাতে ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার কিছু অংশ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর থাকে। তাঁরা ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের এই পাঠ এবং হযরত সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. (৬২০ হি.) বলেন, (নামাযে) ডান হাত বাম হাতের কব্জি ও তৎসংলগ্ন অংশের উপর রাখা মুস্তাহাব। কারণ হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামাযের বিবরণ দিয়েছেন এবং সে বিবরণে বলেছেন, ‘অতপর তিনি তাঁর ডান হাত রাখলেন তার বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর।’

ويستحب أن يضعهما على كوعه وما يقاربه لما روى وائل بن حجر أنه وصف صلاة النبي صلى الله عليه وسلم وقال  في وصفه : ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد.

-আলমুগনী ২/১৪১

একই কথা বলেছেন আল্লামা ইবনে কুদামা মাকদেসী রাহ. (৬৮২ হি.)। তাঁর বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-

ويضعهما (كذا) على كوعه أو قريبا منه لما روى وائل بن حجر أنه وصف صلاة النبي صلى الله عليه وسلم وقال  في وصفه : ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد.

-আশশারহুল কাবীর (আলমুগনীর সাথে মুদ্রিত) ১/৫৪৯

ইমাম নববী রাহ. (৬৭৬ হি.) ‘‘শরহুল মুহাযযাব’’ গ্রন্থে (৪/৩২৭) শাফেয়ী মাযহাবের মনীষীদের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন যে, ‘সুন্নাহ হচ্ছে, তাকবীরে (তাহরীমার) পর দুই হাত নামিয়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখবে এবং ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাতের পাতার গোড়া এবং কব্জি ও বাহুর কিছু অংশ ধরবে। কাফফাল বলেছেন, ডান হাতের আঙ্গুল আড়াআড়িভাবে কব্জির উপর রাখা বা বাহুর উপর ছড়িয়ে দেওয়া দুটোরই অবকাশ আছে।

এরপর বলেন, (পৃ. ৩২৯) আমাদের মনীষীগণ সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীস দ্বারা এ নিয়ম প্রমাণ করেছেন। তেমনি ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘অতপর (আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত রাখলেন বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর।’

واحتج أصحابنا أصحاب بحديث أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل يده اليمنى على ذراعه في الصلاة، قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم، رواه البخاري وهذه العبارة صريحة في الرفع إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم، وعن وائل بن حجر أنه رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم رفع يديه حين دخل في الصلاة، ثم التحف بثوبه، ثم وضع يده اليمنى على اليسرى، رواه مسلم بهذا اللفظ، وعن وائل بن حجر ايضا قال : قلت لانظر إلى صلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم كيف يصلي فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم فاستقبل القبلة فكبر فرفع يده حتى حاذى أذنيه، ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد، رواه أبو داود بإسناد صحيح ... .

ইমাম আবুল ওয়ালিদ আলবাজী রাহ. (৪৯৪ হি.) হযরত সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হাদীসের অর্থ হচ্ছে, ডান হাত কব্জির উপর রাখবে। কারণ ডান হাত বাম হাতের পাতার উপর রাখা যাবে না। তা রাখতে হবে বাম হাতের গোড়া ও কব্জির উপর। আর তার উপর ভর দেওয়া যাবে না। আরবী পাঠ এই-

قوله أن يضع الرجل يده اليمنى على ذراعه اليسرى، يريد أن يضعها على رسغه، لأن يده اليمنى لا يضعها على كف يده اليسرى، وإنما يقتصر بها على المعصم والكوع من يده اليسرى، ولا يعتمد عليها.

-আলমুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা ২/১৬৪

ইমাম আবুল আববাস আহমদ ইবনে উমার আলকুরতুবী রাহ. সহীহ মুসলিমে বর্ণিত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের আলোচনায় বলেন, ইবনুল মাজিশূন ইমাম মালিক রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, (নামাযী) ডান হাত দ্বারা তার বাম হাতের গোড়া ও কব্জি পেঁচিয়ে ধরবে। উপরের হাদীসটি তার দলীল। ...

আরবী পাঠ -

قوله : ثم وضع يده اليمنى على اليسرى اختلف فيه على ثلاثة أقوال : فروى مطرف وابن الماجشون عن مالك أنه قال : يقبض باليمنى على المعصم والكوع من يده اليسرى تحت صدره، تمسكا بهذا الحديث، وروى ابن القاسم : أنه يسدلهما وكره له ما تقدم، ورأى أنه من الاعتماد على اليد في الصلاة المنهي عنه في كتاب أبي داود، وروى أشهب التخيير فيهما والاباحة.

-আলমুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীসি কিতাবি মুসলিম ২/২১

ইবনে তাইমিয়া রাহ. ও ইবনে হাযম রাহ.

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. নামাযে হাত বাঁধার নিয়ম সম্পর্কে বলেন, ‘তাকবীর সমাপ্ত হওয়ার পর দুই হাত ছেড়ে দিবে এবং ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর এমনভাবে রাখবে যে, ডান হাত দ্বারা কব্জির গোড়ার হাড় পেঁচিয়ে ধরবে কিংবা ডান হাত কব্জির উপর এমনভাবে বিছিয়ে দিবে যে, হাতের আঙ্গুলিসমূহ যিরার দিকে (ছড়ানো) থাকে। ডান হাত যদি কব্জির ওপরের দিকে (যিরার উপর) কিংবা কব্জির  নিচে বাম পাতার উপর রাখে তবে সেটাও জায়েয।’

এরপর তিনি হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস, যাইদা ইবনে কুদামার বর্ণনা, সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীস ও হুলব রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন।

আলোচনার আরবী পাঠ এই-

يعني : إذا انقضى التكبير فإنه يرسل يديه ويضع يده اليمنى فوق اليسرى على الكوع، بأن يقبض الكوع باليمنى، أو يبسط اليمنى عليه، ويوجه أصابعه إلى ناحية الذراع، ولو جعل اليمنى فوق الكوع أو تحته على الكف اليسرى، جاز لما روى وائل بن حجر أنه رأى النبي  صلى الله عليه وسلم حين دخل في الصلاة، ثم التحف بثوبه ثم وضع يده اليمنى على اليسرى، رواه مسلم، وفي رواية لأحمد وأبي داود : وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد، وعن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة، قال أبو حازم : ولا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم. رواه أحمد والبخاري.

وعن قبيصة بن هلب عن أبيه قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يؤمنا فيأخذ شماله بيمينه، رواه أحمد وأبو داود وابن ماجه والترمذي وقال : حديث حسن، وعليه العمل عند (أكثر) أهل العلم من أصحاب النبي والتابعين ...

-শরহুল উমদা পৃ. ৬৫-৬৬

আল্লামা ইবনে হাযম রাহ. (৪৫৬ হি.) ‘‘আলমুহাল্লা’’ গ্রন্থে (৩/২৯-৩০) নামাযে হাত বাঁধার বিষয়ে বলেছেন, ‘মুস্তাহাব এই যে, নামাযী কিয়ামের হালতে তার ডান হাত বাম হাতের পাতার গোড়ায় রাখবে।’

এরপর তিনি সাহল ইবনে  সাদ রা.-এর হাদীসসহ আরো কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আলোচনার শেষে বলেন, ‘আবু মিজলায, ইবরাহীম নাখায়ী, সায়ীদ ইবনে জুবাইর, আমর ইবনে মায়মূন, মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন, আয়্যুব ছাখতিয়ানী ও হাম্মাদ ইবনে সালামা থেকেও আমরা বর্ণনা পেয়েছি যে, তাঁরাও (নামাযে) এভাবে করতেন (হাত বাঁধতেন)।

আর এটি আবু হানীফা, শাফেয়ী, আহমদ ও দাউদ-এর সিদ্ধান্ত। আরবী পাঠ এই-

مسألة : ويستحب أن يضع المصلي يده اليمنى على كوع يده اليسرى في الصلاة في وقوفه كله فيها ... ومن طريق مالك عن أبي حازم عن سهل بن سعد قال : كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة ... وروينا فعل ذلك عن أبي مجلز، وإبراهيم النخعي، وسعيد بن جبير، وعمرو بن ميمون، محمد بن سيرين، وأيوب السختياني، وحماد بن سلمة : أنهم كانوا يفعلون ذلك، وهو قول أبي حنيفة، والشافعي، وأحمد، وداود.

আল্লামা শাওকানী রাহ.ও (১২৫৫ হি.) ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের এই ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাদীসের অর্থ এই যে, ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও বাহুর উপর রাখবে। তবারানীর রেওয়ায়েতে আছে, (আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামাযে তাঁর ডান হাত রাখলেন বাম হাতের পিঠের উপর কব্জির কাছে। (ইমাম) শাফেয়ী রাহ.-এর শাগরিদরা বলেছেন, ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাতের পাতার গোড়া, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশ পেঁচিয়ে ধরবে। হাদীসটি হাতের পাতা হাতের পাতার উপর রাখার বৈধতা প্রমাণ করে। এটিই অধিকাংশ মনীষীর গৃহীত নিয়ম। ...’ এরপর তিনি নামাযে হাত ছেড়ে রাখার প্রসঙ্গ আলোচনা করেন।

তার আলোচনার আরবী পাঠ এই-

والمراد أنه وضع يده اليمنى على كف يده اليسرى ورسغها وساعدها. ولفظ الطبراني : وضع يده اليمنى على ظهر اليسرى في الصلاة قريبا من الرسغ، قال أصحاب الشافعي : يقبض بكفه اليمنى كوع اليسرى وبعض رسغها وساعدها.

والحديث يدل على مشروعية وضع الكف على الكف، وإليه ذهب الجمهور ...

-নায়লুল আওতার ২/১৮১

এরপর হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে বলেন, ‘যিরার কোন অংশে ডান হাত রাখা হবে তা এ হাদীসে অস্পষ্ট। তবে আহমদ ও আবু দাউদের রেওয়ায়েতে (যাইদা ইবনে কুদামার সূত্রে ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস) যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে তা পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায়।

قوله على ذراعه اليسرى أبهم هنا موضعه من الذراع، وقد بينته رواية أحمد وأبي داود في الحديث الذي قبله

-প্রাগুক্ত ২/১৮৯

সুতরাং শাওকানী রাহ.-এর মতেও সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসের অর্থ হাতের পাতা হাতের পাতার উপর রাখা, তবে এমনভাবে, যেন তা যিরার কিছু অংশের উপর থাকে।

সারকথা

নামাযে ‘যিরার উপর যিরা’ রাখা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে পরবর্তী শত শত বছর এই নিয়মের কোথাও কোনো অস্তিত্ব ছিল না। নিকট অতীতে আবিষ্কৃত এই নিয়ম প্রমাণের জন্য হযরত সাহল ইবনে সাদ রা. ও হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত দুটি হাদীসের যে ব্যাখ্যা করা হয় তা ভুল ব্যাখ্যা। হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমাম এই ব্যাখ্যা করেননি। বস্ত্তত এই ভুল ব্যাখ্যাই হচ্ছে উপরোক্ত শায ও বিচ্ছিন্ন নিয়মটির প্রধান সূত্র।

শুযুয-৩ : বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ ও একমাত্র সুন্নাহ মনে করা।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে বুকের উপর হাত বাঁধার নিয়ম পাওয়া যায় না। কোনো সহীহ মরফূ হাদীসেও এই নিয়ত বর্ণিত হয়নি। মুসলিমউম্মাহর কোনো মুজতাহিদ ইমাম থেকেও নিখুঁত ও অগ্রগণ্য বর্ণনায় এই নিয়ম পাওয়া যায় না। কিছু শায ও মুনকার রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, যেগুলো হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। তেমনি কোনো কোনো মুজতাহিদ ইমাম থেকে পরবর্তীদের অসতর্ক কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলো ঐ ইমামের বিশিষ্ট শাগরিদ ও মনীষীদের বর্ণনার বিরোধী।

এ ধরনের একটি মতকে সুন্নাহ ও একমাত্র সুন্নাহ মনে করা যে মারাত্মক বিভ্রান্তি তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

রেওয়ায়েতসমূহের পর্যালোচনা

বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব রেওয়ায়েতের সহযোগিতা নেওয়া হয় এখানে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করছি।

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের রেওয়ায়েত

তাঁর বিবরণ অনুযায়ী সুফিয়ান ছাওরী রাহ., আসেম ইবনে কুলাইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামায পড়লাম ... তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের উপর রাখলেন।

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

أخبرنا أبو طاهر، نا أبو بكر، نا أبو موسى، نا مؤمل، نا سفيان، عن عاصم بن كليب، عن أبيه، عن وائل بن حجر قال : صليت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، ووضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره.

-সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, হাদীস : ৪৭৯

মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইলের পূর্ণ বিবরণ সঠিক নয়। হাদীস শাস্ত্রের নীতি অনুসারে এ বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা ‘মুনকার’। অর্থাৎ সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর বর্ণনায় তা ছিল না। মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল ভুলক্রমে তা বাড়িয়ে দিয়েছেন।

কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে এই হাদীস মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ ফিরয়াবী ও আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ রাহ.ও বর্ণনা করেছেন।

তাঁরা দু’জনই ছিকা ও শক্তিশালী রাবী। তাঁদের রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই। দেখুন : মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮; আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/৩৩

রেওয়ায়েত দুটির সনদসহ আরবী পাঠ নিম্নরূপ :

قال الإمام أحمد : حدثنا عبد الله بن الوليد، حدثني سفيان، عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال : ... ورأيته ممسكا بيمينه على شماله في الصلاة ...

وقال الإمام الطبراني : حدثنا عبد الله بن محمد بن سعيد بن أبي مريم ثنا محمد بن يوسف الفريابي ثنا سفيان عن عاصم بن كليب عن أبيه عن وائل بن حجر قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يضع يده اليمنى على اليسرى وإذا جلس افترش رجله اليسرى ...

قال الراقم : ومحمد بن يوسف الفريابي ذكره المزي في الرواة عن الثوري وابن عيينة كلهيما إلا أنه يستظهر برواية الدارقطني أنه الثوري. ففي إتحاف المهرة 13/662 تحت حديث : سمعت النبي صلى الله عليه وسلم إذا قال غير المغضوب عليهم ولا الضالين قال آمين، يمد بها صوته : قط في الصلاة ... وعن يحي بن صاعد، عن ابن زنجوية، عن الفريابي، عن الثوري، عن سلمة، نحوه. أي عن حجر أبي العنبس عن وائل بن حجر.

وقد ذكرهما صاحب أنيس الساري 10/335 في الرواة عن الثوري. رقم الحاشية : (1)

এটা শুধু পাওয়া যায় মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল রাহ.-এর বর্ণনায়, যাঁর সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামদের সিদ্ধান্ত এই যে, তিনি সাধারণভাবে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী হলেও রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে তাঁর প্রচুর ভুল হয়েছে। এমনকি ইমাম বুখারী রাহ. তাকে ‘মুনকাররুল হাদীস’ বলেছেন।ইমামগণের মন্তব্য নীচে উল্লেখ করা হল-

قال البخاري : منكر الحديث، وقال أبو حاتم الرازي : صدوق شديد في السنة كثير الخطأ، يكتب حديثه، وقال أبو زرعة الرازي : في حديثه خطأ كثير، وقال ابن سعد : ثقة كثير الغلط، وقال الساجي : صدوق، كثير الخطأ وله أوهام يطول ذكرها. وقال الدارقطني : ثقة كثير الخطأ.

 দেখুন : তাহযীবুল কামাল ১৮/৫২৬; তাযীবুত তাহযীব ১০/৩৪০; মীযানুল ইতিদাল ৮৯৪৯; আলমুগনী ফী যুআফা ৬৫৪৭

শায়খ আলবানীও সিলসিলাতুয যয়ীফার অনেক জায়গায় তাঁকে জয়ীফ বলেছেন এবং তাঁর সম্পর্কে ইমামগণের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

 দেখুন : সিলসিলাতুয যয়ীফা ১/১৩১; ২/২৪৬, ৩/১৭৯; ৩/২২৭; ৪/৪৫৫ ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত : সুফিয়ান ছাওরী রাহ. ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর বিবরণ বর্ণনা করেছেন আসিম ইবনে কুলাইব থেকে। আসিম ইবনে কুলাইব থেকে এই হাদীস আরো বর্ণনা করেছেন :

১. শোবা ইবনুল হাজ্জাজ,

২. বিশর ইবনুল মুফাদ্দাল

৩. কায়স ইবনুর রাবী

৪. যাইদা ইবনে কুদামা

৫. আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ

৬. খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ

৭.আবু ইসহাক

৮. আবুল আহওয়াস

৯. আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস,

১০. মুসা ইবনে আবী আয়েশা

১১. আবু আওয়ানা প্রমুখ হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও ছিকা রাবীগণ। তাঁরা সকলে আসিম ইবনে কুলাইব থেকে নামাযে হাত বাঁধার হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কেউ على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা বর্ণনা করেননি।

এঁদের রেওয়ায়েতগুলোর জন্য দেখুন যথাক্রমে :

১. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৯, হাদীস : ১৮৮৭৮

২. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭২৬; সুনানে নাসায়ী, কুবরা, হাদীস : ১১৮৯; মুজতাবা, হাদীস : ১২৬৫; মুসনাদে বাযযার-আলবাহরুয যাখখার, হাদীস : ৪৪৮৫; আলমু’জামুল কাবীর তবারানী ২২/৩৭

৩. আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২২/৩৩

৪. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৮; আলমুজামুল কাবীর ২২/৩৫

৫. মুসনাদে আহমদ ৪/৩১৬

৬. সুনানে কুবরা বায়হাকী ২/১৩১

৭. আলমুজামুল আওসাত তবারানী ২/৪২৩

৮. মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী ২/৩৫৮, হাদীস : ১১১৩; আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/৩৪

৯. সহীহ ইবনে হিববান ৫/২৭১; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৩/৩১৭

১০. মুসনাদে বাযযার আলবাহরুয যাখখার, হাদীস : ৪৪৮৯

১১. মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার বায়হাকী ৩/৫০

এ থেকে বোঝা যায়, আসিম ইবনে কুলাইব বুকের উপর হাত বাঁধার কথা বর্ণনা করেননি। তাহলে সুফিয়ান ছাওরীর সঠিক বর্ণনায় তা কীভাবে থাকতে পারে?

তো এই সকল ইমাম ও ছিকা রাবীর বর্ণনার সাথে তুলনা করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, এ হাদীসে على صدره অংশটা মুনকার তথা অগ্রহণযোগ্য।

উল্লেখ্য, কুলাইব ইবনে শিহাব ছাড়া অন্যদের সূত্রেও ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর এই হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোনো সহীহ সনদে على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা পাওয়া যায় না।

দেখুন : বুগয়াতুল আলমায়ী ফী তাখরীজিয যায়লায়ী, নসবুর রায়াহর হাশিয়ায় ১/৩১৬

২. হুলব আতত্বয়ী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসে মুসনাদে আহমদের ‘শায’ অংশ

বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণ করার জন্য হুলব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসের উদ্ধৃতিও দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ ঐ হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় ‘বুকের উপর হাত বাঁধা’র কথা নেই। একটিমাত্র বর্ণনায় এই অতিরিক্ত কথাটি পাওয়া যায়, যা অন্য সকল বর্ণনার পরিপন্থী। রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই -

أحمد : حدثنا يحي بن سعيد عن سفيان : ثني سماك عن قبيصة بن هلب عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم ينصرف عن يمينه وعن يساره، ورأيته ـ قال ـ يضع هذه على صدره. وصف يحي اليمنى على اليسرى فوق المفصل.

-মুসনাদে আহমদ ৫/২২৬

এই রেওয়ায়েতে দেখা যাচ্ছে, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ রাহ. এই হাদীসটি সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে এই হাদীস আরো বর্ণনা করেছেন

১. ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ

২. ইমাম আবদুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম

৩. ইমাম আবদুর রহমান ইবনে মাহদী

৪. মুহাম্মাদ ইবনে কাছীর

৫. আবদুস সামাদ ইবনে হাসসান

৬. হুসাইন ইবনে হাফস

প্রমুখ ইমাম ও ছিকা রাবীগণ। তাঁদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই।

দেখুন যথাক্রমে : ১. মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ১/৩৯০; ২. মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২/২৪০; ৩. সুনানে দারাকুতনী ২/৩৩, হাদীস : ১১০০;
৪. আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/১৬৫; ৫. মারিফাতুস সাহাবা, আবু নুয়াইম ১৯/১৭২

৬. সুনানে কুবরা বাইহাকী ২/২৯৫

তদ্রূপ সিমাক ইবনে হারব থেকে সুফিয়ান ছাওরী রাহ. ছাড়া আরো বর্ণনা করেছেন :

১. আবুল আহওয়াস

২. হাফস ইবনু জুমাই

৩. শরীক

৪. আসবাত ইবনে নাসর

৫. শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ

৬. যাইদা ইবনে কুদামা আলকূফী প্রমুখ রাবীগণ।

এঁদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা নেই।

(দেখুন যথাক্রমে : ১. জামে তিরমিযী ১/৩১২, হাদীস : ২৫০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৮০৯; আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/১৬৫;
২. আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২২/১৬৫; ৩. মুসনাদে আহমদ ৫/২২৬, হাদীস : ২১৯৬৯; ৪. আলমুজামুল কাবীর তাবারানী ২২/১৬৫; ৫. ইবনে আবী আসিম ২৪৯৫-আনীসুস সারী ১০/৩৪৩; ৬. ইবনু কানি ৩/১৯৯-আনীসুস সারী ১০/৩৪৩)

এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ছিমাক ইবনে হারবের বর্ণনায় এ অংশটি ছিল না। সুতরাং সুফিয়ান ছাওরী রাহ.-এর বিশুদ্ধ বর্ণনায় তা কীভাবে থাকতে পারে?

দ্বিতীয় কথা এই যে, ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানের রেওয়ায়েত মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার বসরী-এর সূত্রে ‘‘মুখতাসারুল আহকাম’’ তূসীতেও (২/৯৭, হাদীস : ২৩৪) রয়েছে। কিন্তু ঐ কিতাবে ‘আলা সাদরিহী’ নেই।

সনসদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

أخبرنا بندار محمد بن بشار، قال : ثنا يحي وهو ابن سعيد عن سفيان، عن سماك، عن قبيصة بن الهلب عن أبيه قال : رأيت النبي صلى الله عليه وسلم ينصرف عن شقيه عن يمينه وعن يساره ويضع اليمنى على اليسرى.

তৃতীয় কথা এই যে, মুসনাদে আহমদেও বর্ণনাটি যেভাবে আছে, তা গভীরভাবে পাঠ করলে আল্লামা নীমভী রাহ. যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তা বেশ শক্তিশালী মনে হয়। তা এই যে, মুসনাদে আহমদের বর্ণনাতেও على صدره বুকের উপর কথাটা ছিল না। এটা লিপিকারের ভ্রান্তিপ্রসূত। মূল রেওয়ায়েত সম্ভবত এ রকম -

يضع هذه على هذه

শেষোক্ত هذه লিপিকরের ভ্রান্তির কারণে صدره তে পরিণত হয়ে থাকতে পারে। প্রাচীন হস্তলিখিত পান্ডুলিপিতে এ ধরনের ভ্রান্তি বিরল নয়। এসব ভ্রান্তি চিহ্নিত করার নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে হাদীসশাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং মুহাদ্দিসগণ সফলভাবে তা প্রয়োগও করেছেন।

রেওয়ায়েতের বিশুদ্ধ পাঠ যদি সেটিই হয়, যা আল্লামা নীমাভী রাহ. বলেছেন তাহলে এর অর্থ হবে-‘তিনি এই হাত এই হাতের উপর রাখলেন।’ হাদীসটি বর্ণনা করার পর রাবী ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ রাহ. ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রেখে দেখালেন।’’

রেওয়ায়েতের শেষ বাক্যটিও এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।

মোটকথা, এ রেওয়ায়েতেও على صدره বুকের উপর কথাটা ‘শায’ বা মুসাহহাফ, যা পরিত্যক্ত।

এই দুটি রেওয়ায়েত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের আগে আরো যে বিষয়গুলো চিন্তা করা উচিত তা এই যে, ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস ও হুলব আতত্বয়ী রা.-এর হাদীস, উভয় হাদীসেরই রাবী ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহ.। এই দুই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره থাকলে অবশ্যই তিনি বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ মনে করতেন এবং বুকের উপর হাত বাঁধতেন। কিন্তু তিনি হাত বাঁধতেন নাভীর নিচে, বুকের উপর নয়। দেখুন : আলমুগনী ইবনে কুদামা ২/১৪১; আলমাজমূ শরহুল মুহাযযাব ৪/৩৩০

দুই. মুসনাদে আহমদের সহীহ রেওয়ায়েতে ‘‘আলা সাদরিহী’’ থাকলে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. কেন বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলেননি? তেমনি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ, ইবনে হাযম ও দাউদ জাহেরী রাহ. থেকেও কেন বুকের উপর হাত বাঁধার নিয়ম পাওয়া যায় না?

তিন. দু’ দুটি স্পষ্ট হাদীস বিদ্যমান থাকলে মুসলিম জাহানের কোনো মুজতাহিদ ইমাম বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলবেন না তা কীভাবে সম্ভব? তবে কি বলতে হবে আল্লাহর রাসূলের হাদীস ত্যাগ করার বিষয়ে হাদীস ও ফিকহের সকল ইমাম একমত হয়ে গেছেন? (নাউযুবিল্লাহ)

৩. সূরায়ে কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে একটি বর্ণনা

হযরত আলী রা. থেকে সূরায়ে কাওছারের দ্বিতীয় আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করা হয় যে, তিনি বলেছেন, ‘ডান হাত বাম হাতের মাঝে রাখা, অতপর তা রাখা বুকের উপর।’

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

حماد بن سلمة : ثنا عاصم الجحدري، عن أبيه، عن عقبة بن صهبان قال : إن عليا رضي الله عنه قال في هذه الآية : فصل لربك وانحر، قال : وضع يده اليمنى على وسط يده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.

-সুনানে বায়হাকী ২/৩০; আসলু ছিফাতিস সালাহ, আলবানী পৃ. ২১৭

এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। আল্লামা ইবনুত তুরকুমানী রাহ. (৭৪৫ হি.) বলেছেন, ‘এই রেওয়ায়েতের সনদ ও মতনে ইযতিরাব রয়েছে।’

وفي سنده ومتنه اضطراب

-আলজাওহারুন নাকী, সুনানে বায়হাকীর সাথে মুদ্রিত ২/৩০

শায়খ আলবানীও এর সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ রেওয়ায়েতের সনদের ইযতিরাব স্বীকৃত। সুতরাং এ সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন নেই। ...’

وأما الاضطراب في السند : فهو مسلم، فلا حاجة لإطالة الكلام ببيانه ...

-আসলু ছিফাতিস সালাহ, পৃ. ২২১

মতনের (বক্তব্যের) ক্ষেত্রেও ইযতিরাব স্বীকার করতে হবে কিংবা বলতে হবে, এই রেওয়ায়েতেও على صدره ‘বুকের উপর’ কথাটা শায্ ও বিচ্ছিন্ন এবং এ হাদীসের যে বর্ণনা على صدره ছাড়া সেটিই অগ্রগণ্য। কারণ এ হাদীসের কেন্দ্রীয় বর্ণনাকারী আসিম আলজাহদারী রাহ.। তার থেকে বর্ণনা করেন হাম্মাদ ইবনে সালামা ও ইয়াযীদ ইবনে আবী যিয়াদ। হাম্মাদ ইবনে সালামার বর্ণনায় ‘ইখতিলাফ’ ও ভিন্নতা পাওয়া যায়। হাম্মাদ ইবনে সালামা থেকে মিহরান, আবু সালেহ খুরাসানী ও শাইবানের বর্ণনা এবং মুসা ইবনে ইসমাইলের এক বর্ণনায় على صدره আছে। মুসা ইবনে ইসমাইলের দ্বিতীয় বর্ণনায় এবং আবদুর রহমান-এর বর্ণনায় على صدره নেই। তাদের রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-

قال ابن جرير الطبري : حدثنا ابن حميد، قال : ثنا مهران، عن حماد بن سلمة، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن أبيه، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر قال : وضع يده اليمنى على وسط ساعده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.

وقال الطبري : حدثنا ابن حميد، قال : ثنا أبو صالح الخراساني، قال : ثنا حماد، عن عاصم الجحدري، عن أبيه، عن عقبة بن ظبيان، أن علي بن أبي طالب رضي الله عنه قال في قول الله تعالى : فصل لربك وانحر، قال : وضع يده اليمنى على وسط ساعده الأيسر، ثم وضعهما على صدره.

وقال البيهقي في السنن : أخبرنا أبو بكر أحمد بن محمد بن الحارث الفقيه أنبأ أبو محمد بن حيان أبو الشيخ، ثنا أبو الحريش الكلابي، ثنا شيبان ثنا حماد بن سلمة ثنا عاصم الجحدري عن أبيه عن عقبة بن صهبان كذا قال أن عليا رضي الله عنه قال في هذه الآية فصل لربك وانحر قال : وضع يده اليمنى على وسط يده اليسرى، ثم وضعهما على صدره.

وقال البخاري في التاريخ الكبير : قال موسى : حدثنا حماد بن سلمة : سمع عاصما الجهدري عن أبيه عن عقبة بن ظبيان عن علي رضي الله عنه : فصل لربك وانحر. وضع يده اليمنى على وسط ساعده على صدره. (2911)

وقال الطبري : حدثنا ابن بشار، قال : ثنا عبد الرحمن، قال : ثنا حماد بن سلمة، عن عاصم ابن ظبيان،عن أبيه، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر قال : وضع اليد على اليد في الصلاة.

وقال الحاكم في المستدرك في تفسير سورة الكوثر: ... منهما ما حدثناه علي بن حمشاذ العدل، ثنا هشام بن علي ومحمد بن أيوب قالا : ثنا موسى بن إسماعيل، ثنا حماد بن سلمة، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن صهبان، عن علي رضي الله عنه فصل لربك وانحر، قال : هو وضع يمينك على شمالك في الصلاة.

-তাফসীরে তবারী (সূরাতুর কাউছার) ১২/৭২১-৭২২; আততারীখুল কাবীর, বুখারী ৬/৪৩৭; মুসতাদরাকে হাকিম ৩/৩৩৯; সুনানে বায়হাকী ২/৩০

পক্ষান্তরে ইয়াযীদ ইবনে আবী যিয়াদ থেকে ওকী ইবনুল জাররাহ, মুহাম্মাদ ইবনে রবীআ ও হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান প্রমুখ বর্ণনা করেছেন। তাদের কারো বর্ণনায় على صدره ‘বুকের উপর’ নেই। তাদের রেওয়ায়েতের আরবী পাঠ এই-

قال الطبري : حدثنا أبو كريب، قال : حدثنا وكيع، عن يزيد بن أبي زياد، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن علي رضي الله عنه : فصل لربك وانحر. قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة.

وقال : حدثني عبد الرحمن بن الأسود الطفاوي، قال : ثنا محمد بن ربيعة، قال : ثني يزيد بن أبي زياد بن أبي الجعد، عن عاصم الجحدري، عن عقبة بن ظهير، عن علي رضي الله عنه في قوله تعالى فصل لربك وانحر. قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة.

قال البخاري في التاريخ الكبير : وقال قتيبة، عن حميد بن عبد الرحمن عن يزيد بن أبي الجعد عن عاصم الجحدري عن عقبة من أصحاب علي عن علي رضي الله عنه : وضعها على الكرسوع.

-তাফসীর তবারী (সূরাতুল কাউছার) ১২/৭২১-৭২২; আততারীখুল কাবীর, বুখারী ৬/৪৩৭; সুনানে বায়হাকী ২/২৯

শায়খ আলবানী মতনের (বক্তব্যের) ইযতিরাব অস্বীকার করেছেন এবং على صدره রেওয়ায়েতকে অগ্রগণ্য বলেছেন। তার এই প্রয়াস যথার্থ নয়। কারণ তিনি শুধু হাম্মাদ ইবনে সালামার রেওয়ায়েতের ইখতিলাফ ও ভিন্নতা উল্লেখ করে মুসা ইবনে ইসমাইলের বর্ণনাকে ‘গরীব’ আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে ওকী ইবনুল জাররাহ, মুহাম্মাদ ইবনে রবীআ ও হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণিত ইয়াযীদ ইবনে যিয়াদের রেওয়ায়েত, যেগুলোতে على صدره নেই, সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। বলাবাহুল্য, এভাবে মূল মতনের ইযতিরাবহীনতা প্রমাণ হয় না। তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্ম আপত্তিমুক্ত নয়।

হাম্মাদ ইবনে সালামা রাহ.-এর রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ কথার সমর্থনে আরেকটি রেওয়ায়েত পেশ করা হয়। কিন্তু তা সঠিক নয়। কারণ : এক. ঐ রেওয়ায়েতে على صدره ‘বুকের উপর’ শব্দই নেই। তাতে আছে فوق السرة নাভীর উপর।

দুই. ঐ রেওয়ায়েতের অগ্রগণ্য বর্ণনায় فوق السرة শব্দটিও নেই।

বর্ণনাটি এই-

গযওয়ান ইবনে জারীর আদদাববী রাহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, ‘আলী রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন তার ডান হাত কব্জির উপর রাখতেন। কাপড় গোছানো বা শরীর চুলকানোর প্রয়োজন না হলে রুকু পর্যন্ত এভাবেই থাকতেন।’ সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

حدثنا وكيع قال : حدثنا عبد السلام بن شداد الجريري أبو طالوت، عن غزوان بن جرير الضبي، عن أبيه قال : كان علي إذا قام في الصلاة وضع يمينه على رسغه، فلا يزال كذلك حتى يركع متى ما يركع، إلا أن يصلح ثوبه أو يحك جسده.

-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৩/৩২২, হাদীস : ৩৯৬১

ইমাম বায়হাকী রাহ.ও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তার সনদে এই হাদীসের রাবী জারীর আদাদাববী রাহ. সম্পর্কে আছে যে, ‘তিনি ছিলেন হযরত আলী রা.-এর সার্বক্ষণিক সহচর।’

বায়হাকী আরো বলেন, ‘এই হাদীসের সনদ হাসান।’

বায়হাকীর বর্ণনার সনদসহ আরবী পাঠ এই-

... ثنا مسلم بن إبراهيم ثنا عبد السلام بن أبي حازم ثنا غزوان بن جرير عن أبيه أنه ـ وكان شديد اللزوم لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه ـ قال : كان علي إذا قام إلى الصلاة فكبر ضرب بيده اليمنى على رسغه الأيسر، فلا يزال كذلك حتى يركع، إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبه، ... هذا إسناد حسن.

-সুনানে কুবরা ২/২৯

ইমাম বুখারী রাহ. এই আছরটি সহীহ বুখারীতে এনেছেন। তবে সনদ উল্লেখ করেননি। তার বর্ণনার আরবী পাঠ এই-

ووضع علي رضي الله عنه كفه على رصغه الأيسر إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبا. (كتاب العمل في الصلاة. باب استعانة اليد في الصلاة إذا كان من أمر الصلاة)

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. সনদসহ মূল পাঠ উদ্ধৃত করেছেন। তার আলোচনার আরবী পাঠ এই-

وكذلك رواه مسلم بن إبراهيم أحد مشائخ البخارى عن عبد السلام بن أبي حازم عن غزوان بن جرير الضبي عن أبيه ـ وكان شديد اللزوم لعلي بن أبي طالب رضي الله عنه ـ قال : كان علي إذا قام إلى الصلاة فكبر ضرب بيده اليمنى على رصغه الأيسر، فلا يزال كذلك حتى يركع، إلا أن يحك جلدا أو يصلح ثوبا، هكذا رويناه في السفينة الجرائدية من طريق السلفي بسنده إلى مسلم بن إبراهيم.

-ফাতহুল বারী ৩/৮৭

এই বর্ণনাগুলোতে হযরত আলী রা.-এর নামাযে হাত বাঁধার বিবরণ আছে। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় :

এক. এই বিবরণ বর্ণনা করেছেন জারীর আদদাববী রাহ., যিনি ছিলেন হযরত আলী রা.-এর সার্বক্ষণিক সহচর।

উপরের নির্ভরযোগ্য একাধিক বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, এই বিবরণে ডান হাত (ডান হাতের পাতা) বাম হাতের কব্জির উপর রাখার কথা আছে। কিন্তু فوق السرة নাভীর উপরে রাখার কথা নেই।

দুই. ইমাম বুখারী রাহ. সহীহ বুখারীতে এই বর্ণনাটিই (تعليقا) উল্লেখ করেছেন। সহীহ বুখারীতে উল্লেখিত রেওয়ায়েতে فوق السرة (নাভীর উপর) শব্দ নেই।

তিন. ইমাম বায়হাকী রাহ. এই রেওয়ায়েতের, অর্থাৎ فوق السرة বিহীন রেওয়ায়েতের সনদকেই হাসান বলেছেন।

চার. এই রেওয়ায়েতের পরবর্তী বর্ণনাকারী আবদুস সালাম ইবনে আবী হাযিম থেকে একাধিক রাবী এই বিবরণ বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে ইমাম ওকী ইবনুল জাররাহ ও মুসলিম ইবনে ইবরাহীম (যিনি ইমাম বুখারীর উস্তাদ)-এর বর্ণনায় فوق السرة ‘নাভীর উপর’ নেই। এটা শুধু পাওয়া যায় আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনায়, যিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ছিলেন না।

শুজা ইবনুল ওয়ালীদের রেওয়ায়েত সনদসহ তুলে দেওয়া হল-

حدثنا محمد بن قدامة بن أعين، عن أبي بدر، عن أبي طالوت عبد السلام، عن ابن جرير الضبي، عن أبيه قال : رأيت عليا رضي الله عنه يمسك شماله بيمينه فوق السرة،

قال المزي : هذا الحديث في رواية أبي الحسن بن العبد، وأبي سعيد بن الأعرابي وغير واحد، عن أبي داود، ولم يذكره أبو القاسم.

-সুনানে আবু দাউদ ১/৪৯৫, হাদীস : ৭৫৭; তাহকীক শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা, টীকা

তুহফাতুল আশরাফ ৭/৩৪৯, হাদীস : ১০০৩০

আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদ রাহ. ছিলেন কুফার অন্যতম আবিদ ও নেককার ব্যক্তি। তবে বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি শক্তিশালী ছিলেন না। ইমাম আবু হাতিম রাযী রাহ. তার সম্পর্কে বলেন-

ولين الحديث، شيخ ليس بالمتين، لا يحتج به، إلا أن عنده عن محمد بن عمرو أحاديث صحاح.

অর্থাৎ তিনি শক্তিশালী রাবী নন, তাঁর দ্বারা দলীল দেওয়া যায় না। তবে মুহাম্মাদ ইবনে আমরের সূত্রে তিনি কিছু সহীহ হাদীস বর্ণনা করেন। -মীযানুল ইতিদাল ২/২৪৪

আলোচিত বর্ণনাটি ঐ সহীহ বর্ণনাগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এটা আবু তালূত আবদুস সালাম থেকে তার বর্ণনা।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-

صدوق ورع له أوهام

অর্থাৎ তিনি সত্যবাদী, নেককার। তবে বর্ণনায় ভুল-ভ্রান্তি আছে।-তাকরীবুত তাহযীব পৃ. ২৯৮

শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. আবু দাউদের সূত্রে এই রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করেছেন। তবে সনদ উল্লেখ করেছেন আবু বদর-এর পর থেকে! এরপর বলেছেন, বায়হাকী এই সনদটিকে হাসান বলেছেন! ... এবং বুখারী আলী রা. থেকে তার (?) এই হাদীস দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের আরবী পাঠ এই-

ويشهد لرواية علي : ما أخرجه أبو داود (1/120) من طريق أبي طالوت عبد السلام عن ابن جرير الضبي عن أبيه قال : رأيت عليا رضي الله عنه يمسك شماله بيمينه على الرسغ فوق السرة، وهذا إسناد قال البيهقي (2/30) : حسن ... وقد علق البخاري حديثه هذا مطولا في صحيحه 3/55، بصيغة الجزم عن علي.

-আসলু সিফাতিস সালাহ ১/২১৭-২১৮

অথচ ইমাম বায়হাকী আবু বদর শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা সম্পর্কে উপরোক্ত মন্তব্য (হাসান) করেননি। করেছেন মুসলিম ইবনে ইবরাহীমের বর্ণনা সম্পর্কে, যে বর্ণনায় فوق السرة নেই।

দ্বিতীয়ত ইমাম বুখারীও সহীহ বুখারীতে শুজা ইবনুল ওয়ালীদের বর্ণনা উল্লেখ করেননি। তিনি যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তাতে فوق السرة  নেই।

গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য কি না তা পাঠক ভেবে দেখবেন।

৪.  সুলায়মান ইবনে মুসা-এর সূত্রে একটি মুরসাল রেওয়ায়েত

তাউস রাহ. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন এবং তা বুকের উপর রাখতেন।

সনদসহ রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

قال الإمام أبو داود : ثنا أبو توبة، ثنا الهيثم ـ يعني : ابن حميد، عن ثور عن سليمان بن موسى عن طاؤو‍س قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يضع اليمنى على يده اليسرى، ثم يشد بينهما على صدره، وهو في الصلاة.

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৯; মারাসীলে আবু দাউদ, তুহফাতুল আশরাফ, হাদীস : ১৮৮২৯

তাউস রাহ. পর্যন্ত এ হাদীসের সনদ গ্রহণযোগ্য, যদিও মাঝের তিনজন রাবী সম্পর্কে কিছু আপত্তিও আছে।

এ বর্ণনার রাবী সুলায়মান ইবনে মুসা রাহ. সম্পর্কে ইমামগণ প্রশংসা করেছেন, তবে তার কিছু রেওয়ায়েত ‘মুনকার’ ছিল। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী রাহ. তার সমালোচনা করেছেন। ইমাম আবু হাতিম রাযী তার বর্ণনায় কিছু ইযতিরাব ও ইমাম ইবনে আদী রাহ. তার ‘তাফাররুদে’র কথা উল্লেখ করেছেন। দেখুন তাহযীবুল কামাল ২৫৫৪

আরবী পাঠ এই-

قال البخاري : عنده مناكير، قال النسائي : أحد الفقهاء وليس بالقوي في الحديث، وقال أبو حاتم : محله الصدق، وفي حديثه بعض الاضطراب، ولا أعلم أحدا من أصحاب مكحول أفقه منه ولا أثبت منه، وقال ابن عدي : وسليمان بن موسى فقيه راوٍ، حدث عنه الثقات من الناس، وهو أحد علماء الشام، وقد روى أحاديث ينفرد بها يرويها، لا يرويها غيره، وهو عندي ثبت صدوق.

এছাড়া এ রেওয়ায়েত দুটি মৌলিক কারণে মা’লুল।

এক. রেওয়ায়েতটি মুরসাল এবং এর সমর্থনে অন্য সনদে বর্ণিত কোনো মারফূ হাদীস বা আছর পাওয়া যায় না। ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাইল এর বর্ণনা এবং হুলব রা. এর হাদীসের মুসনাদে আহমদের বর্ণনাকে এর সমর্থনে পেশ করা হয়, কিন্তু ইতিপূর্বে দেখানো হয়েছে যে, এ দুটো বর্ণনা শায ও মুনকার। আর শায, মুনকার রেওয়ায়েত শাহিদ (সমর্থক বর্ণনা) হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

দুই. মুসলিম জাহানের কোনো প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুজতাহিদ ইমাম বুকের উপর হাত বাঁধাকে সুন্নাহ বলেছেন এমনটা পাওয়া যায় না। এমনকি শাম অঞ্চলের বিখ্যাত ফকীহদের থেকেও পাওয়া যায় না। অথচ উপরোক্ত মুরসাল রেওয়ায়েতের সবকজন রাবী শাম ও শামের নিকটবর্তী অঞ্চলের এবং অধিকাংশ রাবীরই ফকীহ-পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু না শামের ফকীহগণ বুকের উপর হাত বাঁধার ফতোয়া দিয়েছেন, না শামের সাধারণ আলিমগণ এই নিয়মের সাথে পরিচিত ছিলেন। এটি এ রেওয়ায়েতের একটি ‘ইল্লত’ (ত্রুটি), যাকে পরিভাষায় ইল্লতে মান’বিয়্যাহ বা শুযূযে মানবী বলে।

উল্লেখ্য, ইমাম শাফেয়ী রাহ. সম্পর্কে কোনো কোনো কিতাবে বলা হয়েছে যে, তাঁর মাযহাব, বুকের উপা হাত বাঁধা। এই বর্ণনা সঠিক নয়। ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর মাযহাব হচ্ছে বুকের নীচে (নাভীর উপর) হাত বাঁধা।

ইমাম নববী রাহ. বলেন-

ويجعلهما تحت صدره وفوق سرته، هذا هو الصحيح المنصوص، وفيه وجه مشهور لأبي إسحاق المروزي أنه يجعلهما تحت سرته، والمذهب الأول.

-আলমাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/২৬৮। আরো দেখুন : আলমিনহাজ ‘আননাজমুল ওয়াহহাজ-এর সাথে মুদ্রিত’ ২/১৮০; আলমাজমূ ৩/২৬৯

সারকথা

রেওয়ায়েতসমূহের পর্যালোচনা থেকে যা পাওয়া গেল তা এই-

১. ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই। কারণ সুফিয়ান ছাওরী রাহ. থেকে দু’জন শক্তিশালী রাবী আবদুল্লাহ ইবনুল ওয়ালীদ ও মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ এবং সুফিয়ান ছাওরীর উস্তাদ আসিম ইবনে কুলাইব থেকে অন্তত ১১জন ইমাম ও ছিকা রাবী এই হাদীসের হাত বাঁধার বিবরণ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কারো বর্ণনায় على صدره নেই। একমাত্র মুয়াম্মাল ইবনে ইসমাঈলের বর্ণনায় এটা পাওয়া যায়, যার বর্ণনার ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে জারহ-তাদীলের ইমামগণ বিশেষভাবে সাবধান করেছেন। এ কারণে হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী তাঁর বর্ণনার অতিরিক্ত অংশটি ‘মুনকার’ ও অগ্রহণযোগ্য।

২. হুলব রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনাতেও على صدره নেই। শুধু মুসনাদে আহমদে ও যেসব কিতাবে মুসনাদে আহমদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে সেইগুলোতেই হাদীসটি
 على صدره সহ পাওয়া যায়।

এই হাদীসের অন্যান্য বর্ণনার সাথে তুলনা করলে এমনকি মুসনাদে আহমদের বর্ণনাটিও গভীরভাবে পাঠ করলে প্রতীয়মান হয় এই হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় على صدره নেই।

৩. সূরা কাউসারের তাফসীরে হযরত আলী রা. থেকে যে রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয় তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। সনদ-মতন দুদিক থেকেই তা ‘মুযতারিব’। এই হাদীসের على صدره ওয়ালা রেওয়ায়েতটিকে কোনোভাবেই অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করা যায় না।

শায়খ আলবানী সনদের ইযতিরাব স্বীকার করেছেন, কিন্তু মতনের ইযতিবাব খন্ডন করতে গিয়ে এমন কিছু কাজ করেছেন, যা দুঃখজনক।

৪. সুলায়মান ইবনে মুসার সূত্রে বর্ণিত যে মুরসাল রেওয়ায়েতটি উদ্ধৃত করা হয়, তাউস রাহ. পর্যন্ত এর সনদ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও তা অন্তত দুটো কারণে ‘মা’লূল’। সুতরাং তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

26
ওয়ায়েস করনীর দাঁত ভাঙার গল্প লোকমুখে খুবই প্রসিদ্ধ। ঘটনাটি নিমণরূপ- ওহুদ যুদ্ধে যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবারক শহীদ হল তখন ওয়ায়েস করনী বিষয়টি জানতে পারলেন এবং যারপরনাই ব্যাথিত হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ছিল। এ ঘটনা শুনে তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁত মোবারক যখন শহীদ হয়েছে তো আমার এ দাঁতের কী অর্থ! তিনি নিজের একটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। পরক্ষণে চিন্তা করলেন, আমি যে দাঁত ভেঙেছি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হয়ত এ দাঁত ভাঙেনি অন্য দাঁত। তাই ভেবে তিনি নিজের আরেকটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। এভাবে তিনি নিজের সবগুলো দাঁত ভেঙে ফেললেন।

নবীজীর প্রতি উম্মতের ভালবাসা প্রকাশের চূড়ান্ত নযীর হিসেবে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে এ ঘটনা বলে থাকেন। কিন্তু এ ঘটনার কোনোই ভিত্তি নেই। মোল্লা আলী কারী রাহ. বলেন, এ ঘটনা প্রমাণিত নয়। (দ্র. আলমা‘দিনুল আদানী, আলবুরহানুল জালি ফী তাহকীকি ইনতিসাবিস সুফিয়্যাতি ইলা আলী, পৃ. ১৬৪-১৬৫) ওয়ায়েস  করনী (উয়াইস আলকারানী) একজন বড় মাপের তাবেয়ী ও বুযুর্গ ছিলেন। ইয়ামানের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ৩৭ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ তার হয়নি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ছিল। তার বৃদ্ধা মা ছিলেন। মায়ের সাথে তিনি সদাচরণ করতেন। মায়ের সেবাযত্ন করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিনতেন। হাদীস শরীফে এসেছে, ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়ামান থেকে উয়াইস নামে এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আসবে। ইয়ামানে মা ছাড়া তার আর কেউ নেই। তার শ্বেত রোগ ছিল । সে আল্লাহর কাছে দুআ করলে আল্লাহ তার রোগ ভাল করে দেন, কিন্তু তার শরীরের একটি স্থানে এক দিনার অথবা এক দিরহাম পরিমাণ স্থান সাদাই থেকে যায়। তোমাদের কেউ যদি তার সাক্ষাৎ পায় সে যেন তাকে নিজের জন্য ইস্তেগফার করতে বলে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪২

ওয়ায়েস করনীর সাথে সাহাবীদের সাক্ষাতের ঘটনাও হাদীস শরীফে এসেছে। কিন্তু কোথাও এমন কিচ্ছার কথা নেই। সহীহ মুসলিমে এসেছে, ওমর রা.-এর সাথে ওয়ায়েস করনীর সাক্ষাত হলে তাকে সনাক্ত করার জন্য তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  বলে দেয়া সব আলামত জিজ্ঞাসা করেন। এ বর্ণনায় আছে ওমর রা. নবীজীর কথা অনুযায়ী তাকে নিজের জন্য ইস্তিগফার করতে বলেন, তিনি ওমর রা.-এর জন্য ইস্তিগফার করেন। পরবর্তী বছর হজ্বের মৌসুমে ওয়ায়েস করনী যে এলাকায় বসবাস করছিলেন সেখান থেকে এক ব্যক্তি এলে ওমর রা. তার (ওয়ায়েস করনীর) খোঁজ খবর নেন। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪২)

27
অনেক মানুষকে দেখা যায়, মাসবুক অবস্থায় যদি ইমামের সাথে দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে ফেলে তাহলে মনে করে যে তার নামায বাতিল হয়ে গিয়েছে। ফলে আবার নতুন করে শুরু থেকে নামায পড়ে।

এ আমলটি ভুল। মাসআলা না জানার কারণেই হয়তো তারা এমনটি করেন। এক্ষেত্রে নিয়ম হল, দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে ফেললেও, যদি নামায ভেঙে যায় এমন কোনো কাজ না করা হয় তাহলে উঠে যাবে এবং বাকী রাকাত আদায় করবে। শেষে সাহু সিজদা আদায় করবে।

আর একথা তো সবারই জানা যে, মাসবুক ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাম ফেরাবে না। বরং ইমামের দুই দিকে সালাম ফেরানো হলে উঠে বাকী রাকাত আদায় করবে।

আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে মাসআলা জেনে আমল করার তাওফীক দান করুন।

28
Hadith / সহজ আমল অনেক সওয়াব
« on: November 19, 2014, 04:21:28 PM »
পূর্ণাঙ্গ অযু ‘অযু’ পবিত্রতা অর্জনের উপায়। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মাসনুন তরীকায় অযু করা হলে তা একটি নেক আমলও বটে। এটি অতি সহজ আমল, যা আমরা সকলেই করি এবং দিনে একাধিকবার করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে অযুর প্রয়োজন হয়। আমরা যদি একটু খেয়াল করে মাসনূন তরীকায় এই সহজ ও প্রয়োজনীয় আমলটি সম্পাদন করি তাহলে অতি সহজে আমরা পেতে পারি অনেক বড় বড় পুরষ্কার। হাদীস হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে কোনো ব্যক্তি অযু করে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে অযু করে অতঃপর বলে- (আরবী) তবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা, সে প্রবেশ করতে পারবে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৫ ব্যাখ্যা এটি একটি সুসংবাদবাহী সুন্দর হাদীস। এখানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযুর ফরয, সুন্নাত ও আদাবের প্রতি লক্ষ রেখে উত্তমরূপে অযু করার এবং অযুর শেষে দুআ পড়ার একটি সহজ আমলের কথা বলেছেন। যা দেহকে সজীব ও পবিত্র করে, মনে প্রশান্তি ও প্রফুল্লতা দান করে। এই সহজ আমলের জন্যও আল্লাহ তাআলা তার বান্দাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করবেন বলে সু-সংবাদ দেওয়া হয়েছে। তার জন্য জান্নাতের কটি দরজা খুলে দেওয়া হবে এবং সে নিজের ইচ্ছামতো যে কোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। অন্যান্য হাদীসে অযুর আরো ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন হযরত ওসমান ইবনে আফফান রা. হতে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অযু করে এবং উত্তমরূপে অযু করে, তার শরীর থেকে, এমনকি নখের নিচ থেকেও গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৪৫ হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে আছে, নবীজী বলেছেন, মুসলিম বা মুমিন বান্দা যখন অযু করে, যখন সে মুখমণ্ডল ধৌত করে তখন পানির সঙ্গে বা পানির শেষ কাতরার সঙ্গে ওই সমস্ত গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে দু চোখ দ্বারা করেছিল। যখন সে দুই হাত ধৌত করে তখন পানির সঙ্গে ওই সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে হাত দ্বারা করেছিল। যখন সে দুই পা ধৌত করে তখন পানির সঙ্গে ওই সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যার দিকে সে চলেছিল। এভাবে সে গুনাহ থেকে পাকসাফ হয়ে যায়।-সহীহ মুসলিম হাদীস ২৪৪ অন্য হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সামনে হাউযে কাউসারের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, মানুষ যেমন তার হাউয থেকে অন্য মানুষকে সরিয়ে দেয় তেমনি আমিও সেদিন কিছু মানুষকে সরিয়ে দিব। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, সেদিন কি আপনি আমাদের চিনতে পারবেন? নবীজী ইরশাদ করলেন, বল তো, কারো যদি হাতে ও পায়ে সফেদ চিহ্ন বিশিষ্ট কিছু ঘোড়া থাকে এবং সেগুলোকে অসংখ্য কালো রংয়ের ঘোড়ার মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে সেই ব্যক্তি কি তার ঘোড়াগুলো চিনতে পারবে না? সাহাবারা বললেন, হ্যাঁ, পারবে। ইয়া রাসূলুল্লাহ! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তেমনি তোমাদেরও এমন কিছু চিহ্ন হবে যা অন্য কোনো উম্মতের হবে না। কিয়ামতের দিন তোমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও অযুর কারণে ঝলমল করতে থাকবে।’-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৪৬-২৪৯ অবলম্বনে। অন্য একটি সহীহ হাদীসে আরো একটি সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। হযরত উকবা ইবনে আমের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলিম যখন সুন্দরভাবে অযু করে অতঃপর চেহারা-মন উভয়কে আল্লাহ অভিমুখী করে দণ্ডায়মান হয় এবং করে দু রাকাত নামায আদায় করে তখন তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।-সহীহ মুসলিম হাদীস ২৩৪ শিক্ষা উপরের হাদীসগুলো থেকে অযু ও আনুষঙ্গিক কয়েকটি আমলের নির্দেশ পাওয়া যায়-১. মাসনূন তরীকায় উত্তমরূপে অযু করা। ২. অযুর পর হাদীসে উল্লেখিত দুআ পাঠ করা। ৩. দু রাকাত‌ তাহিয়্যাতুল অযুর নামায পড়া। আমলগুলো খুবই সহজ কিন্তু বিনিময়ে রয়েছে বড় বড় কয়েকটি সুসংবাদ। ১. অযুর পানির সাথে গুনাহসমূহ বের হয়ে যাবে। ২. কিয়ামতের দিন অযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ঝলমল করবে। ৩. জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। ৪. জান্নাতের সবকটি দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অতএব সকলের উচিত, মাসনূন তরীকায় আমলটি করে এসব পুরস্কার লাভে প্রতিযোগিতা করা।

29
অনেক সময় সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতির দিকে লক্ষ্য করে কিংবা কোনো বাস্তবতা বোঝানো কঠিন মনে হলে অনেকে চুপ থাকার পথ বেছে নেন। অথবা দু’ একবার বলে চুপ হয়ে যান। এটা এ কারণে অনুচিত যে, এতে প্রকৃত বিষয় মানুষের অজানা থেকে যাবে এবং ভুল কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

ঈদ ইসলামের শাখাগত বিষয় নয়। এটি দ্বীনের ‘শিআর’ তথা প্রতীকের অন্তর্ভুক্ত এবং এমন একটি বিষয়, যা সম্পূর্ণরূপে শরীয়তের নির্ধারণ ও নির্দেশনার উপর নির্ভরশীল

 (أمر تعبدي وتوقيفي )। অর্থাৎ এটি শুধু বিবেকবুদ্ধি ও কিয়াস দ্বারা অনুধাবন করা যায় না। সরাসরি শরীয়তদাতার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট আদেশ দ্বারাই বিধিত হয়। এজন্য সুন্নতে মুতাওয়ারাসা, স্পষ্ট হাদীস ও ইজমায়ে উম্মতের বিপরীতে তৃতীয় ঈদ আবিষ্কার করা বিদআতই হবে।

আর এখন তো বিষয়টি শুধু এই নয় যে, একটি বিদআতকে সুন্নতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সম্মিলিতভাবে উদযাপন করা হচ্ছে; বরং এটিকে বানানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহববতের মাপকাঠি ও প্রতীক। অথচ শরীয়ত বলে সুন্নাহর অনুসরণ, উসওয়ায়ে হাসানাহ অনুযায়ী জীবনযাপন, সুন্নতকে যিন্দা করা ও বিদআত নির্মূল করার মেহনত হচ্ছে মুহববতের মাপকাঠি ও নিদর্শন।

সাদাচোখে এটি কারো কাছে সামান্য বিষয় মনে হলেও বাস্তবে তা একটি মারাত্মক চিন্তাগত বিকৃতি। আর এই নবআবিষ্কৃত ‘ঈদ’কে জশনে জুলুস আকারে পালন করতে গিয়ে যেসব গর্হিত কাজ, আচরণ ও ভিত্তিহীন বর্ণনার আশ্রয় নেওয়া হয় সে বিষয় তো রইলই।

মনে রাখা উচিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হকসমূহ আদায় করা থেকে উদাসীন হয়ে অন্যায় পন্থায় হক আদায়ের বাহানার দ্বারা নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া নিজের প্রতি ও গোটা উম্মতের প্রতি মারাত্মক জুলুম। আল্লাহ তাআলার নিকট দাবি নয়, আমল গ্রহণযোগ্য। বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, অন্তরের তাকওয়াই তাঁর নিকট পৌঁছে। বিদআত নয়, শুধু সুন্নতই তাঁর নিকট বরণীয়।

একটু ভেবে দেখুন, যে নাসারাদের পথ থেকে আমরা সূরায়ে ফাতিহায় প্রতিদিন কমপক্ষে বিশবার আল্লাহ তাআলার নিকট ولا الضالين   বলে আশ্রয় প্রার্থনা করি তাদের থেকে নেওয়া রসম-রেওয়াজে কি উম্মতের কোনো কল্যাণ থাকতে পারে?

اهدنا الصراط المستقيم، صراط الذين انعمت عليهم غير المغضوب عليهم ولا الضالين

30
রশ্ন : আমরা জানি যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ইসলামী শরীয়তের অনেক বড় ইমাম ছিলেন। এ কারণেই আমরা তাঁর নির্দেশনামত কুরআন-সুন্নাহর বিধি বিধানের উপর আমল করি। কিন্তু কদিন আগে আমার এক বন্ধু  বললেন, জনৈক আহলে হাদীস তাকে বলেছেন, ‘আবু হানীফা হাদীস ও সুন্নাহর আলিম ছিলেন না। তিনি না হাফিযুল হাদীস ছিলেন, না হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ছিকা ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন।

একথা  শুনে  আমি খুব আশ্চর্য হলাম। কারণ তিনি যখন হাফিযুল হাদীসও ছিলেন না, হাদীসশাস্ত্রে পারদর্শীও ছিলেন না, এমনকি হাদীসের বিষয়ে ছিকাও ছিলেন না তখন তার  তাকলীদ করা কীভাবে বৈধ হবে? আমরা তো তাকলীদ এজন্যই করি, যাতে কুরআন কারীম এবং হাদীস-সুন্নাহর উপর আমাদের আমল নির্ভুল হয়।

আমার ধারণা, ঐ আহলে হাদীস ভাইয়ের কথা ঠিক নয়। কারণ মুসলিম উম্মাহর ফিকহ-ফতোয়ার একজন ইমাম হাদীস-সুন্নাহর বিষয়ে অজ্ঞ হবেন তা কী করে হয়? ফিকহ ও ফতোয়ার মূল ভিত্তিই তো কুরআন-সুন্নাহ।

এখন আমার আবেদন, হাদীসের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর অবস্থান সম্পর্কে আমাকে কিছু তথ্য সরবরাহ করবেন এবং এ বিষয়ে আরবী-উর্দূ কিছু কিতাবের নামও জানাবেন।

আরো আবেদন, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর জীবনীর উপর বাংলা ভাষায় একটি সমৃদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ প্রস্ত্তত করে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন।

উত্তর : আপনার এ কথা ঠিক যে, ফিকহ ও ফতোয়ার একজন ইমাম হাদীস ও সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়া অসম্ভব। এ তো সাধারণ বুদ্ধির কথা। আপনি যে ঐ আহলে হাদীস ব্যক্তির কথা শোনামাত্র সংশয়গ্রস্ত হননি; বরং সাধারণ বিচার-বুদ্ধি কাজে লাগিয়েছেন এজন্য আপনাকে মোবারকবাদ।  ইমাম আবু হানীফা রাহ. সম্পর্কে ঐ ব্যক্তি যা বলেছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। আল্লাহ তাআলা তাকে হেদায়াত দান করুন এবং ইমামগণের প্রতি কুধারণা পোষণের ব্যাধি  থেকে মুক্তি দান করুন।

বাস্তবতা এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাদীসের অনেক বড় আলিম ছিলেন। তিনি হাফিযুল হাদীসও ছিলেন এবং হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ছিকা ও নির্ভরযোগ্যও ছিলেন।

উসূলে হাদীস ও উসূলে ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি এই যে, উম্মাহর ইমামগণের বিষয়ে এই প্রশ্নই ভুল যে, ‘কে তাদেরকে ছিকা বলেছে’। কারণ, এ ধরনের প্রশ্ন তো হয় সাধারণ রাবীদের ক্ষেত্রে, ইমামগণের ক্ষেত্রে নয়। কারণ ইমামগণের বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা; বরং উম্মাহর ইমামের মর্যাদায় উপনীত হওয়া তো এক দুই ব্যক্তির স্বীকৃতির দ্বারা নয়  ইজমা ও তাওয়াতুর (তথা ঐকমত্য ও ব্যাপক বর্ণনা) দ্বারা প্রমাণিত।

এরপরও আপনি যদি প্রশান্তির জন্য ‘হাদীস শাস্ত্রে ইমাম আবু হানীফার অবস্থান’ সম্পর্কে বিস্তারিত ও প্রামাণিক জ্ঞান অর্জন করতে চান তাহলে নিম্মোক্ত কিতাবসমূহ পাঠ করতে পারেন।

বলাবাহুল্য যে, এখানে শুধু নমুনা হিসেবে কয়েকটি কিতাবের নাম লেখা হচ্ছে। এ বিষয়ের সকল রচনাবলির তালিকা দেওয়া তো কোনো সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের দ্বারা সম্ভব নয়।

১. ‘‘ইমাম আযম আওর ইলমে হাদীস’’, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সিদ্দীকী কান্ধলভী।

২. ‘‘মাকামে আবু হানীফা’’, মাওলানা সরফরায খান সফদর

৩. কিতাবুল আছার, ইমাম আবু হানীফা-এর বিভিন্ন ভূমিকা। যেমন :

ক. মুফতী মাহদী হাসান শাহাজাহানপুরী রাহ.-এর ভূমিকা (কালাইদুল  আযহার)

খ. মুহাদ্দিস আবুল ওয়াফা আফগানী রাহ.-এর ভূমিকা (ইমাম মুহাম্মাদ (রাহ)-এর রেওয়ায়েতের উপর)

গ. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ.-এর ভূমিকা (উর্দু, আররহীম একাডেমী, করাচী থেকে প্রকাশিত)

৪. মুসনাদে ইমাম আযম-এর ভূমিকা, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নুমানী রাহ.

৫. ‘‘মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস’’, মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নু’মানী  (১৪২০হি.)

৬. ‘‘আল-ইমাম আবু হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসুন’’, আল্লামা যফর আহমদ উছমানী রাহ. (১৩৯৪ হি.)

৭. ‘‘উকূদুল জুমান ফী মানাকিবিল ইমামিল আযম আবু হানীফাতান নু’মান’’, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আসসালেহী আশ-শাফেয়ী (৯৪২হি.)

৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, শামসুদ্দীন আযযাহাবী রাহ. (৭৪৮হি.) খন্ড : ৬; পৃষ্ঠা : ৩৯০-৪০৩

৯. আল ইনতিকা ফী ফাযাইলিছ ছালাছাতিল ফুকাহা (মালিক ইবনু আনাস ওয়া মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস আশ-শাফেয়ী, ওয়া আবী হানীফা) ইবনু আব্দিল বার আলমালেকী (৩৬৩হি.)

১০. ‘‘ফাযাইলু আবী হানীফা ওয়া আখবারুহূ ওয়া মানাকিবুহু’’, আবুল কাসিম ইবনু আবিল আওয়াম (৩৩৫হি.)

এ বিষয়ে আরো কিতাবের নাম জানতে চাইলে ‘‘উকূদুল জুমানের’’ শুরুতে আল্লামা আবুল ওয়াফা আফগানী রাহ.-এর ভূমিকা অবশ্যই পাঠ করুন। তদ্রূপ ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আল-হুসাইন ইবনে আলী আস-সাইমুরী (৪৩৬ হি.)-এর কিতাব- ‘আখবারু আবী হানীফাতা ওয়া আসহাবিহী’, যা আফগানী রাহ.-এর তাহকীকে ছাপা হয়েছে, এর ভূমিকাও পাঠ করতে পারেন।

মারকাযুদ দাওয়াহ-এর দারুত তাসনীফ থেকে এ বিষয়ে একাধিক কিতাব প্রকাশের বিষয়টি পরিকল্পনাধীন আছে। তবে আলকাউসারে একটি ধারাবাহিক লেখা অতি শীঘ্রই শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।

আপাতত শুধু দুইটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি :

এক. ইমাম আবু হানীফা রাহ. হাদীসেরও ‘হাফিয’ ছিলেন।

এটি একটি বাস্তবতা, যার অনেক দলীল আছে। এখানে শুধু একটি বিষয় নিবেদন করছি। তা এই যে, মুসলিম উম্মাহর হাফিযুল হাদীসগণের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণ আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার অধিকাংশই এখন মুদ্রিত ও প্রকাশিত। এগুলোর কোনো একটি গ্রন্থ আপনি হাতে নিন। তাতে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আলোচনা পাবেন। যেমন :

১. তাযকিরাতুল হুফফায, শামসুদ্দীন আযযাহাবী (৭৪৮হি.)

যাহাবী রাহ. এই কিতাবের শুরুতে লিখেছেন-

هذه تذكرة بأسماء مُعَدلي حملة العلم النبوي، ومن يرجَع إلى اجتهادهم في التوثيق والتضعيف والتصحيح والتزييف.

   অর্থাৎ এ গ্রন্থে ইলমে নবুওয়াতের ঐ বিশ্বস্ত ধারক-বাহকগণের আলোচনা রয়েছে, যাদের সিদ্ধান্ত ও গবেষণার শরণাপন্ন হতে হয়  ছিকা ও যয়ীফ রাবী নির্ণয় এবং সহীহ ও যয়ীফ হাদীস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে।’

এরপর যাহাবী রাহ. এ গ্রন্থের খন্ড ১ পৃষ্ঠা ১৬৮-এ ইমাম আবু হানীফা রাহ-এর আলোচনা লিখেছেন। আলোচনার শিরোনাম-‘আবু হানীফা আল-ইমামুল আযম’

(أبو حنيفة الإمام الأعظم)

২. আল মুখতাসার ফী তবাকাতি উলামাইল হাদীস, শামসুদ্দীন ইবনু আব্দিল হাদী (৭৪৪হি.)

এর কিছু অংশ মুদ্রিত। এর হস্তলিখিত পান্ডুলিপি জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় সংরক্ষিত আছে।

৩. আত তিবয়ান লিবাদীআতিল বায়ান আন মাওতিল আ’য়ান, শামসুদ্দীন ইবনু নাসিরুদ্দীন (৮৪২হি.)

এ গ্রন্থের পান্ডুলিপি মদীনা মুনাওয়ারার ঐতিহাসিক কুতুবখানা মাকতাবা আরিফ হিকমত-এ সংরক্ষিত আছে।

৪. তবাকাতুল হুফফায, জামালুদ্দীন ইবনুল মিবরাদ (৯০৯হি.)

এ কিতাব থেকে মুহাদ্দিস আবদুল লতীফ সিদ্দিকী রাহ. ‘‘যাববু যুবাবাতিদ দিরাসাত আনিল মাযাহিবিল আরবাআতিল মুতানাসিবাত’’ গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর আলোচনা উদ্ধৃত করেছেন।

৫. ‘‘তবাকাতুল হুফফায’’, জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (৯১১হি.)

৬. ‘‘তারাজিমুল হুফফায’’, মুহাম্মাদ ইবনে রুসতম আল হারিছি আলবাদাখশী

এ গ্রন্থের পান্ডুলিপি নদওয়াতুল উলামা লাখনৌতে রয়েছে। এই পুরো আলোচনার জন্য হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রশীদ নু’মানী রাহ.-এর কিতাব ‘‘মাকানাতুল ইমামি আবী হানীফাতা ফিল হাদীস’’ (পৃ. ৫৮-৬৮) পাঠ করুন। ওখানে আরো তথ্য রয়েছে। উপরোক্ত তথ্যগুলোও ওখান থেকে নেওয়া হয়েছে ।

দুই. ইমাম আবু হানীফা ‘হাফিযুল হাদীস’ হওয়া একটি সহজ সত্য

দ্বিতীয় যে বিষয়ে আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করছি তা এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ‘সুন্নতে মুতাওয়ারাছা’ এবং হাদীস ও আছারের হাফিয হওয়া এমন এক সহজ স্বাভাবিক বাস্তবতা, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কারণ ঐতিহাসিক সত্য এই যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ফিকহ ও ফতোয়ার প্রথম সংকলক। আর এ তো বলাই বাহুল্য যে, শরীয়তের এই সকল বিধান তিনি ফিকহের কিতাব থেকে সংকলন করেননি। কারণ ফিকহের প্রথম সংকলকই তো তিনি। তাহলে এই সকল বিধান তিনি কোথা থেকে সংকলন করেছেন? নিশ্চয়ই সুন্নতে মুতাওয়ারাছা, আছারে সাহাবা ও ফতওয়ায়ে তাবেয়ীন থেকে। তাহলে তাঁর উপরোক্ত সকল বিষয়ের হাফিয হওয়া দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

এখানে ঐ ঘটনাটি উল্লেখ করা সমীচীন মনে হচ্ছে, যা মুয়াফফাক আলমক্কী রাহ. (৫৬৪ হি.) ‘মানাকিবু আবী হানীফা’’ গ্রন্থে (খন্ড ২, পৃষ্ঠা : ১৫১-১৫২) আবু ইসমা সা’দ ইবনে মুয়ায রাহ.-এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি আবু সুলায়মান জুযাজানী থেকে, তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. থেকে, আর তিনি ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন-

كنا نكلم أبا حنيفة في باب من أبواب العلم، فإذا قال بقول واتفق عليه أصحابه درت على مشايخ الكوفة هل أجد في تقوية قوله حديثا أو أثرا؟ فربما وجدت الحديثين أو الثلاثة فآتيه بها، فمنها ما يقبله ومنها ما يرده، فيقول : هذا ليس بصحيح أوليس بمعروف، وهو موافق لقوله! فأقول له : وما علمك بذلك؟ فيقول : أنا عالم بعلم الكوفة.

 ‘আমরা আবু হানীফা রাহ.-এর সাথে একটি অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করতাম। এরপর যখন তিনি সিদ্ধান্ত দিতেন এবং তার সঙ্গীরাও একমত হতেন তখন আমি কুফার শায়েখগণের  কাছে যেতাম তার সিদ্ধান্তের সমর্থনে আরো কোনো হাদীস বা আছর পাই কিনা। কখনো দুইটি বা তিনটি হাদীস পেতাম। তাঁর কাছে পেশ করার পর তিনি কোনোটি গ্রহণ করতেন আবার কোনোটি এই বলে বর্জন করতেন যে, এটি সহীহ নয় বা মারুফ নয়। অথচ তা তার সিদ্ধান্তের অনুকূলে। আমি বলতাম, এ সম্পর্কে  আপনার ইলম কীরূপ। তিনি বলতেন, আমি কূফা নগরীর ইলমের ধারক।

এই ঘটনা বর্ণনা করার পর আবু ইসমা যা বলেছেন তার সারকথা এই যে, ‘ইমাম রাহ. সত্য বলেছেন। সত্যি তিনি ছিলেন কুফার মনীষীগণের কাছে সংরক্ষিত ইলমের ধারক। শুধু তাই নয় (হাদীস আছার এবং কুরআন-সুন্নাহর) অন্যান্য শহরের অধিকাংশ ইলমেরও তিনি ধারক ছিলেন। এর প্রমাণ পেতে চাইলে তাঁর কিতাবসমূহ দেখ, তাঁর সঙ্গীদের কাছে সংরক্ষিত তাঁর বর্ণনাসমূহ দেখ, কিতাবুস সালাত থেকে শুরু করে এক একটি অধ্যায় এবং প্রতি অধ্যায়ের এক একটি মাসআলা পাঠ করতে থাক, তাহলেই দেখতে পাবে, কীভাবে তিনি হাদীস ভিত্তিক জবাব দিয়ে চলেছেন এবং চিন্তা কর, হাদীস ও সালাফের আছারের সাথে তার জবাবসমূহ কত সামঞ্জস্যপূর্ণ।’’

আপাতত শুধু এই কটি কথা বলেই আলোচনা সমাপ্ত করছি। ইনশাআল্লাহ অতি শীঘ্র আলকাউসারের পাতায় আপনি ইমাম ছাহেব রাহ.-এর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ দেখতে পাবেন। আল্লাহ তাআলাই তাওফীকদাতা। তিনিই আমাদের সাহায্যকারী।

Pages: 1 [2] 3