Show Posts

This section allows you to view all posts made by this member. Note that you can only see posts made in areas you currently have access to.


Topics - mrchawdhury

Pages: 1 2 [3]
31
জীবনের অঙ্গন অতি বিস্তৃত এবং অতি বৈচিত্রময়। ইসলাম যেহেতু পূর্ণাঙ্গ দ্বীন তাই তা জীবনের সকল বৈচিত্রকে ধারণ করে। জীবনের সকল বিভাগ তাতে নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত। ইসলামী জীবন-দর্শনের পরিভাষায় মানব-জীবনের মৌলিক বিভাগগুলো নিম্নোক্ত শিরোনামে শ্রেণীবদ্ধ হয়েছে : ১. আকাইদ (বিশ্বাস), ২. ইবাদাত (বন্দেগী ও উপাসনা), ৩. মুআমালাত (লেনদেন), ৪. মুআশারাত (পারিবারিক ও সামাজিক নীতি এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা) ও ৫. আখলাক (চরিত্র, আচরণ ও নৈতিকতা)। বলাবাহুল্য যে, প্রতিটি বিষয়ের অধীনে প্রচুরসংখ্যক মৌলিক শিরোনাম ছাড়াও রয়েছে প্রাসঙ্গিক বহু বিষয়। আমাদের সামনে হাদীস ও ফিকহের বহু বিষয়ভিত্তিক সংকলন বিদ্যমান রয়েছে। এসব গ্রন্থের সূচিপত্রে নজর বুলালে উপরোক্ত প্রতিটি বিষয়ের ব্যাপকতা অনুমান করা যাবে। ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, তার মৌলিক দুই সূত্র-কুরআন ও সুন্নাহ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

পূর্ণ কুরআন মজীদ এবং হাদীস ও সুন্নাহ্‌র উল্লেখযোগ্য অংশ ‘তাওয়াতুরে’র মাধ্যমে এসেছে। হাদীস ও সুন্নাহর অপর অংশটিও এসেছে ‘রেওয়ায়েত’ ও ‘আমলে’র নির্ভরযোগ্য সূত্রে। হাদীসের মৌলিক গ্রন্থসমূহে প্রতিটি হাদীস সনদসহ সংকলিত হয়েছে। এতে যেমন রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ও কর্ম তেমনি রয়েছে মুজতাহিদ সাহাবা ও তাবেয়ী ইমামগণের ফতোয়া ও আমলের বিবরণ। পরবর্তী যুগের মুজতাহিদ ইমামগণের ফতোয়া ও আমলও ফিকহের মৌলিক গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহকে দুটি মহান জামাতের ঋণ স্বীকার করতে হবে। তাঁরা হলেন আইম্মায়ে হাদীস ও আইম্মায়ে ফিকহ। হাদীসের ইমামগণ যেমন হাদীস ও আছারকে সূত্রসহ সংরক্ষণ করেছেন তেমনি ফিকহের ইমামগণ সংরক্ষণ করেছেন হাদীসের মর্ম ও আমলের ধারাবাহিকতা।

বর্ণনা ও রেওয়ায়েতের শুদ্ধাশুদ্ধির বিষয়ে আমরা যেমন হাদীস-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের মুখাপেক্ষী তেমনি হাদীস ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণের ক্ষেত্রে ফিকহের ইমামগণের উপর নির্ভরশীল। আপনি যে বিষয়েরই হাদীস অধ্যয়ন করুন, তা ইমামগণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সংকলিত হয়েছে এবং আজ আমরা তা পাঠ করে ধন্য হচ্ছি। অতএব হাদীসকে হাদীস হিসাবে জানার ক্ষেত্রে আমরা হাদীস-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের মুকাল্লিদ। তদ্রূপ কুরআন-সুন্নাহ থেকে হালাল-হারামের বিধান, ইবাদতের সঠিক নিয়ম-কানুন, হুকুক ও অধিকার ইত্যাদি সঠিকভাবে জানার ক্ষেত্রে ফিকহ-শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসারী। এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার জন্য একটি মৌলিক বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার। তা এই যে, কুরআন-সুন্নাহর উপরোক্ত সকল নির্দেশনা মৌলিক দুই ভাগে বিভক্ত : ১. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। ২. যা অনুধাবনে ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য নয়।

প্রথম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত ‘আহকাম’ বিষয়ক। ‘আহকাম’ অর্থ হালাল-হারাম, জায়েয-না জায়েয এবং কর্তব্য ও কর্মপদ্ধতি বিষয়ক বিধান। দ্বিতীয় শ্রেণীর নির্দেশনাগুলো মূলত বিশ্বাস ও চেতনা এবং চরিত্র ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা মানুষকে আখিরাতের চেতনায় উজ্জীবিত করে এবং ঈমান ও ইয়াকীনে সমৃদ্ধ করে। পাশাপাশি তা উন্নত মানবিক বোধ জাগ্রত করে এবং উত্তম হৃদয়-বৃত্তির অধিকারী করে। সর্বোপরি তা দান করে জীবন-যাপনের আদর্শ নীতিমালা। এই বিষয়বস্তুগত পার্থক্য অনুধাবনের জন্য আমরা কুরআন মজীদের মক্কী ও মাদানী সূরাগুলি তুলনা করে পাঠ করতে পারি। মক্কী সূরা বলতে বোঝানো হয় যে সূরাগুলি হিজরতের আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মাদানী সূরা অর্থ যা হিজরতের পর অবতীর্ণ হয়েছে। এদের মধ্যে বিষয়বস্তুগত মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মক্কী সূরাগুলোতে বিশ্বাস, চেতনা ও নীতি-নৈতিকতাই প্রধান। পক্ষান্তরে মাদানী সূরাসমূহে হুকুক ও আহকামের প্রাধান্য। হাদীস শরীফের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য অনুধাবন করা কঠিন নয়। তবে হাদীস শরীফের মৌলিক গ্রন্থসমূহে অর্থাৎ ‘মাসানীদ’, ‘জাওয়ামি’, ‘মা‘আজিম’, ‘সুনান’ ইত্যাদিতে উভয় ধরনের হাদীস সংকলিত হয়েছে। ‘সুনান’ গ্রন্থসমূহে আহাদীসে আহকাম বিশেষভাবে সংকলিত হলেও অন্যান্য প্রসঙ্গও তাতে সন্থান পেয়েছে। এই উৎস-গ্রন্থসমূহ থেকে আলিমগণ বহু ধরনের হাদীস-গ্রন্থ সংকলন করেছেন। পাঠক যদি মুনযিরীর ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’ ও নববীর ‘রিয়াযুস সালেহীন’কে হাফেয যায়লায়ীর ‘নাসবুর রায়াহ’ ও হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর ‘আলতালখীসুল হাবীরে’র সঙ্গে তুলনা করেন তাহলে উপরোক্ত দুই শ্রেণীর হাদীসের বিষয়বস্তুগত পার্থক্য তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এরপরের পর্যায়টি বেশ কঠিন। তা হচ্ছে হুকুক ও আহকাম বিষয়ক আয়াত ও হাদীস সম্পর্কে মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। এটা করতে সক্ষম হলে স্পষ্ট হবে যে, কুরআন-সুন্নাহর এই অংশটি প্রকৃতপক্ষেই ইজতিহাদের ক্ষেত্র। এই দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। আশা করি উপরের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে যে, কুরআন-সুন্নাহর আহকাম শ্রেণীর নির্দেশনাগুলোই মৌলিকভাবে ইজতিহাদ ও তাকলীদের ক্ষেত্র। এগুলো ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের ফলপ্রসূ অধ্যয়নের জন্য দ্বীনের সঠিক রুচি ও বিষয়বস্তু সঠিকভাবে অনুধাবনের যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট। এজন্য হক্কানী উলামা-মাশায়েখের সোহবতের দ্বারা সঠিক দ্বীনী রুচি অর্জনের পর সাধারণ পাঠকও কুরআন-সুন্নাহ্‌র এই অংশ সরাসরি অধ্যয়ন করতে পারেন এবং তা থেকে দ্বীনী চেতনা আহরণ করতে পারেন।

পক্ষান্তরে আহকাম বিষয়ক অধিকাংশ নির্দেশনা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে বোঝার জন্য ইজতিহাদী পর্যায়ের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য। তাই তা অনুসরণের শরীয়তসম্মত পন্থা হচ্ছে : ১. যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী তিনি ইজতিহাদের ভিত্তিতে আমল করবেন। ২. যার ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তিনি মুজতাহিদের তাকলীদ করবেন। এটিই হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের কুরআন-সুন্নাহসম্মত পন্থা। পক্ষান্তরে তৃতীয় পদ্ধতি, অর্থাৎ ইজতিহাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইজতিহাদের প্রচেষ্টা কিংবা ইজতিহাদের যোগ্যতাহীন লোকের অনুসরণ, দু’টোই শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত। এই ভূমিকাটুকুর পর এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি ।

শিরোনামে ‘ফিকহ’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ্‌য় উল্লেখিত হুকুম-আহকাম এবং পরবর্তীতে উদ্ভূত নানাবিধ সমস্যার কুরআন-সুন্নাহ্‌ভিত্তিক সমাধানের সুসংকলিত রূপকেই পরিভাষায় ফিকহ বলা হয়। যে ইমামগণ তা আহরণ করেছেন তাদের সঙ্গে সম্বন্ধ করে এর বিভিন্ন নাম হয়েছে। যেমন ফিকহে হানাফী, ফিকহে মালেকী, ফিকহে শাফেয়ী ও ফিকহে হাম্বলী। এই সব ফিকহের, বিশেষত ফিকহে হানাফীর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

প্রথম বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার স্বীকৃত পদ্ধতি
ফিকহে হানাফী ও অন্যান্য ফিকহের প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের স্বীকৃত ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। চার মুজতাহিদ ইমামের ইজতিহাদী যোগ্যতা এবং তাঁদের সংকলিত ফিকহের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত। সর্বযুগের আলিমগণের স্বীকৃতি ও অনুসরণের দ্বারা এই সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল উযীর (মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম) ইয়ামানী (মৃত্যু : ৮৪০ হি.) বলেন, ‘তাঁর (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর) মুজতাহিদ হওয়ার বিষয়ে (মুসলিম উম্মাহর) ইজমা রয়েছে। কেননা, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মতামতসমূহ তাবেয়ী যুগ থেকে আজ নবম হিজরী পর্যন্ত গোটা মুসলিম জাহানে সর্বজনবিদিত। যারা তা বর্ণনা করেন এবং যারা অনুসরণ করেন কারো উপরই আপত্তি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মুসলিম উম্মাহর (আলিমগণের) অবস্থান হল, তাঁরা হয়তো সরাসরি তার অনুসরণ করেছেন, কিংবা অনুসরণকারীদের উপর আপত্তি করা থেকে বিরত থেকেছেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এভাবেই ইজমা সম্পন্ন হয়ে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বহু মনীষী আলিম পরিষ্কার বলেছেন যে, মুজতাহিদ যখন ফতোয়া দান করেন এবং সাধারণ মানুষ তার অনুসরণ করে তখন সমসাময়িক আলিমগণ আপত্তি না করলে প্রমাণ হয় যে, তিনি প্রকৃতপক্ষেই মুজতাহিদ। (পরবর্তী যুগের) আলিমদের জন্য যদি এ নীতি প্রযোজ্য হয় তাহলে তাবেয়ী যুগের কথা তো বলাই বাহুল্য। কেননা, তা ছিল জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের যুগ। আর ইমাম আবু হানীফা রাহ. তাঁদেরই সমসাময়িক ছিলেন।’-আর রওযুল বাছিম, মাকানাতুল ইমাম আবী হানীফা ফিল হাদীস পৃ. ১৬৪-১৬৫ এ বিষয়টি শুধু ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর ক্ষেত্রেই নয়, তাঁর মনীষী সঙ্গীদের ক্ষেত্রে এবং অন্য তিন ইমামের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার আশংকা না হলে এখানে মুসলিম জাহানের ওইসব মনীষীর একটি তালিকা উল্লেখ করা যেত, যাঁরা হাদীস-শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ হওয়া সত্ত্বেও ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা রা.-এর মতামত অনুসরণ করেছেন।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : কুরআন-সুন্নাহর আহকাম ও ফিকহুস সালাফের উত্তম সংকলন
এ কথা বলাই বাহুল্য যে, ফিকহে হানাফী কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। উপরের আলোচনা থেকেও তা বোঝা যায়। ফিকহে হানাফীর সকল সিদ্ধান্ত কুরআন-সুন্নাহ ও আছারে সাহাবার ভিত্তিতে প্রমাণিত। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর ফিকহ-সংকলনের নীতিমালা সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তাদের এ বিষয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। এ প্রসঙ্গে আমি উস্তাদে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের একটি মূল্যবান প্রবন্ধ থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : ‘ফিকহে মুতাওয়ারাছ’ (ফিকহের যে অংশ নবী-যুগ থেকে চলে আসছে) সংকলন এবং সাহাবা ও শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ীগণের যুগ শেষ হওয়ার পর উদ্ভূত নতুন সমস্যাবলির সমাধানের জন্য ইমাম আবু হানীফা রাহ.কে কী কী কাজ করতে হয়েছিল এবং এ বিষয়ে তাঁর কী কী অবদান রয়েছে-এ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে গ্রন্থ রচনা করতে হবে। তাই আমি এখানে তাঁর নিজের ভাষায় শুধু এ বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই যে, ফিকহ ও ফতোয়ার বিষয়ে তাঁর মৌলিক নীতিমালা কী ছিল। ‘এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সহীহ সনদে ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে নীতিমালা উল্লেখিত হয়েছে তার সারকথা এই- ১. মাসআলার সমাধান যখন কিতাবুল্লাহ্‌য় পাই তখন সেখান থেকেই সমাধান গ্রহণ করি। ২. সেখানে না পেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ এবং সহীহ হাদীস থেকে গ্রহণ করি, যা নির্ভরযোগ্য রাবীদের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সহীহ হাদীস আমাদের জন্য শিরোধার্য। একে পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর শরণাপন্ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ৩. এখানেও যদি না পাই তবে সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্তের শরণাপন্ন হই। ৪. কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহ ও ইজমায়ে সাহাবার সামনে কিয়াস চলতে পারে না। তবে যে বিষয়ে সাহাবীগণের একাধিক মত রয়েছে সেখানে ইজতিহাদের মাধ্যমে যার মত কিতাব-সুন্নাহ্‌র অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয় তা-ই গ্রহণ করি। ৫. মাসআলার সমাধান এখানেও পাওয়া না গেলে ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছে থাকি। তবে এক্ষেত্রেও তাবেয়ীগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হই না।-আলইনতিকা ফী ফাযাইলিল আইম্মাতিছ ছালাছাতিল ফুকাহা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬১, ২৬২, ২৬৭; ফাযাইলু আবী হানীফা, আবুল কাসিম ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ. ২১-২৩ মাখতূত; আখবারু আবী হানীফা ওয়া আসহাবিহী, আবু আবদুল্লাহ আসসাইমারী (মৃত্যু : ৪৩৬ হি.) পৃ. ১০-১৩; তারীখে বাগদাদ, খতীবে বাগদাদী ১৩/৩৬৮; উকূদূল জুমান, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ সালিহী পৃ. ১৭২-১৭৭; মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা, মুয়াফফাক আলমাক্কী ১/৭৪-১০০ ‘ফিকহে মুতাওয়ারাছ সংকলন এবং ‘ফিকহে জাদীদ’ আহরণের যে নীতিমালা ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর নিজের ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে তা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সকল ইমামের সর্বসম্মত নীতি। কোনো ফিকহ তখনই ইসলামী ফিকহ হতে পারে যখন তা উপরোক্ত নীতিমালার ভিত্তিতে সংকলিত ও আহরিত হয়। ‘ফিকহ-সংকলন এবং ফিকহ-আহরণের ক্ষেত্রে উপরোক্ত নীতিমালা অনুসরণে তিনি কতটুকু সফল হয়েছেন তা তাঁর সমসাময়িক তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ইত্যাদি সকল ইসলামী শাস্ত্রের স্বীকৃত ইমামগণের বক্তব্য থেকে জানা যেতে পারে। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহ. (মৃত্যু : ১৬১ হি.) বলেন, ‘আবু হানীফা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইলম অন্বেষণ করেছেন। তিনি ছিলেন (দ্বীনের প্রহরী) দ্বীনের সীমানা রক্ষাকারী, যাতে আল্লাহর হারামকৃত কোনো বিষয়কে হালাল মনে করা না হয়, কিংবা হালালের মতো তাতে লিপ্ত থাকা না হয়। যে হাদীসগুলো তার কাছে সহীহ সাব্যস্ত হত, অর্থাৎ যা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিগণ বর্ণনা করে এসেছেন, তার উপর তিনি আমল করতেন এবং সর্ববিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ আমলকে গ্রহণ করতেন। কুফার আলিমগণকে যে আমল ও ধারার উপর প্রতিষ্টিত দেখেছেন তিনিও তা থেকে বিচ্যুত হননি (কেননা, এটাই ছিল সাহাবা যুগ থেকে চলমান আমল ও ধারা)।-আলইনতিক্বা, ইবনে আবদিল বার পৃ. ২৬২; ফাযাইলু আবী হানাফী, ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ.. ২২ (মাখতূত)। ‘... এজন্য হাদীস শাস্ত্রের সর্বজনস্বীকৃত মনীষী ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. (১৮১ হি.) বলেছেন, ‘আবু হানীফার ফিকহকে নিছক রায় (মত) বলো না। প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে হাদীসের ব্যাখ্যা।’-ফাযাইলু আবী হানীফা,, ইবনু আবিল ‘আওয়াম পৃ. ২৩’’ (ফিকহে হানাফীর সনদ, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, মাসিক আলকাউসার জুলাই ’০৭ পৃ. ৯) যোগ্য ব্যক্তির জন্য সরাসরি পরীক্ষা করে দেখারও সুযোগ রয়েছে। হাফেয যায়লায়ী রাহ. (৭৬২ হি.) কৃত ‘নসবুর রায়া ফী তাখরীজি আহদীছিল হিদায়া’ গ্রনে'র ভূমিকায় আল্লামা যাহিদ কাওছারী রাহ. লেখেন, ‘পাঠক যদি এই গ্রনে'র পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকেন এবং বিভিন্ন অধ্যায়ে সংকলিত হাদীসগুলো পাঠ করেন তাহলে তার প্রত্যয় হবে যে, হানাফী মনীষীগণ শরীয়তের সকল বিষয়ে হাদীস ও আছারের নিষ্ঠাবান অনুসারী।’ (ভূমিকা, নাসবুর রায়াহ পৃষ্ঠা : ১৯) ইমাম আবদুল ওয়াহহাব আশশা’রানী রাহ. (৮৯৮-৯৭৩ হি.) বলেন, ‘আমি যখন (চার) মাযহাবের দলীল বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছি তখন, আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. ও তাঁর সঙ্গীদের মতামত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। আমি লক্ষ করেছি যে, তাঁদের সিদ্ধান-গুলোর সূত্র হচ্ছে কুরআন মজীদের আয়াত, (সহীহ) হাদীস ও আছার অথবা তার মাফহুম, কিংবা এমন কোনো হাদীস, যার একটি সনদ যয়ীফ হলেও মূল হাদীস একাধিক সনদে বর্ণিত, অথবা নির্ভরযোগ্য উসূলের উপর কৃত কিয়াসে সহীহ।’-আলমীযান পৃ. ৫২; আবু হানীফা ওয়া আসহাবুহুল মুহাদ্দিসূন পৃ. ৬১

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : শূরাভিত্তিক সংকলন
ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর একটি বিশেষত্ব এই যে, তিনি ছিলেন সঙ্গী-সৌভাগ্যে অতি সৌভাগ্যবান। সমকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর সঙ্গে ছিল। কুরআন-সুন্নাহ, হাদীস, আছার, ফিকহ, ইজতিহাদ, যুহদ ও আরাবিয়্যাতের দিকপাল মনীষীরা ছিলেন তাঁর শীষ্য। এঁদের সম্মিলিত আলোচনা ও পর্যালোচনার দ্বারা ফিকহে হানাফী সংকলিত হয়েছে। সমকালীন হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমামগণও ফিকহে হানাফীর এই বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে সচেতন ছিলেন। কুফা নগরীর বিখ্যাত মনীষী ইমাম সুলায়মান ইবনে মিহরান আমাশ রাহ. (১৪৮ হি.) কে এক ব্যক্তি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন (ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে) বললেন, এঁদের জিজ্ঞাসা করুন। কেননা, এঁদের নিকট যখন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তখন তারা সম্মিলিতভাবে মতবিনিময় করেন এবং (সর্বদিক পর্যালোচনার পর) সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’-জামিউল মাসানীদ, আবুল মুআইয়াদ খুয়ারাযমী ১/২৭-২৮ ইবনে কারামাহ বলেন, ‘আমরা একদিন ওকী ইবনুল জাররাহ রাহ. এর মজলিসে ছিলাম। জনৈক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে বললেন, ‘আবু হানীফা এখানে ভুল করেছেন।’ ওকী বললেন, আবু হানীফা কীভাবে ভুল করতে পারেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আবু ইউসুফ, যুফার ইবনুল হুযাইল ও মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের মতো ফকীহ ও মুজতাহিদ, হিব্বান ও মানদালের মতো হাফিযুল হাদীস, কাসিম ইবনে মা’ন-এর মতো আরাবিয়্যাতের ইমাম এবং দাউদ ইবনে নুছাইর ত্বয়ী ও ফুযাইল ইবনে ইয়াযের মতো আবিদ ও যাহিদ? এই পর্যায়ের সঙ্গী যাঁর রয়েছে তিনি ভুল করবেন কীভাবে? কখনো যদি তাঁর ভুল হয় তবে তো এঁরাই তাকে ফিরিয়ে আনবেন।’-প্রাগুক্ত পৃ. ৩৩ ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত রাহ. (২১৩ হি.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর চল্লিশজন সঙ্গী গ্রন্থসমূহ (ফিকহে হানাফী) সংকলন করেছেন। তাঁদের শীর্ষ দশজনের মধ্যে ছিলেন আবু ইউসুফ, যুফার, দাউদ ত্বয়ী, আসাদ ইবনে আমর, ইউসুফ ইবনে খালিদ ও ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদা। শেষোক্ত জন সিদ্ধান-সমূহ লিপিবদ্ধ করতেন। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।’-ইবনু আবিল ‘আওয়াম-এর সূত্রে যাহিদ হাসান কাওছারী-ভূমিকা, নসবূর রায়াহ ১/৩৮

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : অবিরাম আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত
ইতিহাসের বাস্তবতা এই যে, চার ইমামের সমকালে মুসলিম-জাহানে অনেক অগ্রগণ্য মুজতাহিদ বিদ্যমান ছিলেন। নিজ নিজ অঞ্চলে তাঁদের তাকলীদও হয়েছে। কিন্তু চার ইমামের বৈশিষ্ট্য এই যে, মনীষী সঙ্গীগণ তাঁদের মতামতকে সংরক্ষণ করেছেন এবং আলোচনা ও পর্যালোচনা দ্বারা সুসংহত করেছেন, যা অন্যদের বেলায় হয়নি। বস্তুত চার মাযহাবের দীর্ঘায়ু ও বিপুল বিস্তারের এটি অন্যতম প্রধান কারণ। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রাহ.-এর একটি পরিসংখ্যান থেকে তা অনুমান করা যাবে। তিনি ‘ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন’ গ্রন্থে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন ভূখণ্ডের ফকীহ ও মুজতাহিদদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ‘তবাকা’ অনুসারে উল্লেখ করেছেন। এতে কুফা, শাম, মিসর প্রভৃতি বিখ্যাত কেন্দ্রের আলোচনা এসেছে। কুফা নগরীর আলোচনায় ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর সমসাময়িক সাতজন ফকীহর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা, আবদুল্লাহ ইবনে শুবরুমা, সায়ীদ ইবনে আশওয়া, শরীক ইবনে আবদুল্লাহ, কাসিম ইবনে মা’ন, সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই। পরবর্তী তবাকায় উল্লেখিত হয়েছেন সর্বমোট ১৪ জন। লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এঁদের মধ্যে ৮ জনই ‘আসহাবু আবু হানীফা’ শিরোনামে। পক্ষান-রে সুফিয়ান ছাওরী ও হাসান ইবনে হাই রাহ. প্রত্যেকের ২ জন করে সঙ্গীর নাম উল্লেখিত হয়েছে। অবশিষ্ট দু’জন হলেন, হাফছ ইবন গিয়াছ ও ওকী ইবনুল জাররাহ। (ইলামুল মুয়াককিয়ীন ১/২৬) উল্লেখ্য, ইবনুল কাইয়িম রাহ. এ দু’জনকে আলাদাভাবে উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁরাও ‘আসহাবু আবী হানীফা’র অন্তর্ভুক্ত। তদ্রূপ ইমাম আবু হানীফার সমসাময়িকদের মধ্যে কাসিম ইবনে মা’নকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ তিনিও ইমাম আবু হানীফার সঙ্গী এবং ফিকহে হানাফীর অন্যতম ইমাম। অন্য ফকীহদের কোনো শাগরিদ এই তবাকায় উল্লেখিত হননি। এ থেকে ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মনীষী শীষ্যদের প্রাচুর্য সম্পর্কে অনুমান করা যায়। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর মাঝে ব্যক্তিত্ব তৈরির অতুলনীয় যোগ্যতা ছিল। তাই তাঁর সোহবত ও তরবিয়ত থেকে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান প্রমুখ মুজতাহিদ তৈরি হয়েছেন। পরবর্তীতে এই বৈশিষ্ট্য তাঁর শীষ্যদের মাঝেও বিকশিত হয়েছিল। সম্ভবত একটি দৃষ্টান্তই এক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে যে, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ.-এর সোহবত থেকে তৈরি হয়েছেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশশাফেয়ী। স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী রাহ. তা কৃতার্থ চিত্তে স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন ‘ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে আমার প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহ করেছেন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান।’ (তারীখে বাগদাদ ২/১৭৬) তিনি আরো বলেছেন, ‘ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে সকল মানুষ (ইমাম) আবু হানীফার কাছে দায়বদ্ধ।’ (তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৬) তাই প্রতি যুগেই যোগ্য পূর্বসূরী থেকে যোগ্য উত্তরসূরী পয়দা হয়েছেন এবং কখনো ফিকহে হানাফীর ধারক ও বাহকের অভাব হয়নি। পঠন-পাঠন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়েছে। মূল আলোচনায় ফিরে আসি। কুফা নগরীর পর ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. শামের মুজতাহিদ ইমামদের তালিকা উল্লেখ করেছেন। এতে যাঁদের নাম এসেছে তারা হলেন : ইয়াহইয়া ইবনে হামযা, আবু আম্‌র আবদুর রহমান ইবনে আম্‌র আওযায়ী, ইসমাইল ইবনে আবিল মুহাজির, সুলায়মান ইবনে মূসা উমাভী ও সায়ীদ ইবনে আবদুল আযীয রাহ.। পরবর্তী তবাকায় ‘ছাহিবুল আওযায়ী’ উপাধী শুধু একজনের নামের সঙ্গেই দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আব্বাস ইবনে ইয়াযীদ ছাহিবুল আওযায়ী। (ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন ১/২৭) ইমাম আওযায়ী রা. ছিলেন মুসলিম জাহানের বিখ্যাত মুজতাহিদদের অন্যতম। কিন্তু যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে তাঁর মাযহাব দীর্ঘায়ূ হয়নি। ফিকহের ইতিহাস লেখকরা বলেন, শাম ও আন্দালুসে ইমাম আওযায়ী রাহ. (১৫৭ হি.)-এর মাযহাব প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু হিজরী তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন শুধু ফিকহে মুকারান অর্থাৎ তুলনামূলক ফিকহের গ্রন্থাদিতে তাঁর মতামত পাওয়া যায়। মিসরের মুজতাহিদ ইমামদের মধ্যে উল্লেখিত হয়েছেন-আমর ইবনুল হারিছ, লাইছ ইবনে সা’দ ও উবাইদুল্লাহ ইবনে আবু জা’ফর। পরবর্তী তবাকা সম্পর্কে ইবনুল কাইয়েম রাহ.-এর বক্তব্য-‘এঁদের পর (মিসরের মুফতী ও মুজতাহিদ হলেন) ইমাম মালিক রাহ.-এর ‘আসহাব’ যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহব, উছমান ইবনে কিনানা, আশহাব ও ইবনুল কাসিম রাহ.। এঁদের পর ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর ‘আসহাব’ যেমন, মুযানী, বুওয়াইতী ও ইবনু আব্দিল হাকাম। এরপর (সে অঞ্চলে) ব্যাপকভাবে ইমাম মালিক রাহ. ও ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর তাকলীদ হতে থাকে। কিছু মনীষী ব্যতিক্রম ছিলেন, যাঁদের নিজস্ব মতামত ছিল। যেমন মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে ইউসুফ ও আবু জা’ফর তহাবী।’(ই’লামুল মুয়াককিয়ীন ১/২৭) মিসরের বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ রহ. সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, ‘তিনি ফিকহ ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে ইমাম মালিকের চেয়েও অগ্রগামী ছিলেন, কিন্তু সঙ্গীগণ তাঁর মতামত সংরক্ষণ করেনি।’ (তাযকিরাতুল হুফফায ১/২২৪) এই সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে, চার মাযহাবের প্রচার ও সংহতির পিছনের যোগ্য ধারক ও বাহকদের অবদান অনস্বীকার্য। হাফেয আবদুল কাদের আলকুরাশী রাহ. (৬৯৬-৭৭৫ হি.) এর একটি বিবরণ উল্লেখ করে এই আলোচনা সমাপ্ত করব। ফিকহে হানাফীর মনীষীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থ ‘আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা’র ভূমিকায় তিনি লেখেন, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীগণ তাঁদের মনীষীদের উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের কাউকে হানাফী মনীষীদের জীবনী সংকলন করতে দেখিনি। অথচ (তা একটি দীর্ঘ গ্রন্থের বিষয়বস্তু। কেননা, বিভিন্ন ভূখণ্ডের) হানাফী মনীষীদের সংখ্যা এত প্রচুর যে, তা গণনা করে শেষ করা যায় না। (কয়েকটি দৃষ্টান- দেখুন : ইমাম বুরহানুদ্দীন যারনুজী লিখিত) ‘কিতাবুত তা’লীম’-এ বলা হয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে যে মনীষীগণ তাঁর ফিকহ বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। আর বলা বাহুল্য যে, তাঁদের প্রত্যেকের ছিল বহু সঙ্গী, যারা ওই ইলম ও ফিকহকে ধারণ করেছেন। ইমাম সামআনী বলেন, বুখারার খাইযাখাযা শহরে ইমাম আবু হাফস আলকাবীরের এত শাগরিদ রয়েছেন যে, গণনা করে শেষ করা যায় না। লক্ষ্য করুন, এটি বুখারার একটি মাত্র এলাকার কথা। ইমাম কুদূরী রাহ.-এর আলোচনায় বলেন, তিনি বিখ্যাত ‘মুখতাছার’-এর রচয়িতা। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে (তালিবে ইলমকে) উপকৃত করেছেন। আমাদের একজন হানাফী মনীষী আবু নাসর আলইয়াযী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, শাহাদত বরণের সময় তিনি এমন চল্লিশজন সঙ্গী রেখে গেছেন, যারা ইমাম আবু মানসুর মাতুরীদীর সমসাময়িক। তদ্রূপ ‘আসহাবুল আমালী’ যারা ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. থেকে ‘আমালী’ বর্ণনা করেছেন তাঁদের সংখ্যাও অগণ্য। সমরকন্দ ও মা-ওয়ারাউন্নাহ্‌রে ফিকহে হানাফীর কত মাশায়েখ ছিলেন তা কি গণনা করা সম্ভব? একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, যাকরদীজাহ শহরে একটি কবরস্থান আছে যার নাম ‘তুরবাতুল মুহাম্মাদীন’। এখানে প্রায় চারশ’ মনীষী শায়িত আছেন, যাঁদের সকলের নাম মুহাম্মাদ এবং প্রত্যেকে ছিলেন ফকীহ ও মুসান্নিফ (গ্রন্থকার)। (বুখারার), কালাবায শহরে ‘মাকবারাতুস সুদূর’ কবরস্থানে অসংখ্য হানাফী ফকীহ শায়িত আছেন। তদ্রূপ বুখারার নিকটে ‘মাকবারাতুল কুযাতিস সাবআ’তে সমাহিত হয়েছেন অসংখ্য ফকীহ, যাদের অন্যতম হলেন ইমাম আবু যায়েদ আদ-দাবূসী। তদ্রূপ (পশ্চিম বাগদাদে) শূনীযে ‘মাকবারা আসহাবে আবী হানীফা’তে অসংখ্য হানাফী ফকীহ সমাহিত আছেন। তদ্রূপ কত বিখ্যাত পরিবার ছিল, যাতে অসংখ্য ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দামাগানী পরিবার ও সায়েদী পরিবারের গ্রহ-নক্ষত্রদের কে গণনা করে শেষ করতে পারে? ... কাযিল কুযাত আবু আবদুল্লাহ দামাগানীর ঘরানা থেকে তো অসংখ্য ফকীহ বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। আমাদের একজন ফকীহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদিল মালিক হামাযানীর একটি বৃহৎ গ্রন্থ আমি দেখেছি, যাতে আবু আবদিল্লাহ দামাগানী ও ইমাম সায়মারীর শুধু ওইসব সঙ্গীর আলোচনা করা হয়েছে, যারা তাদের নিকট থেকে সরাসরি (ইলম ও ফিকহ) গ্রহণ করেছিলেন। তদ্রূপ ছাফফারিয়্যাহ পরিবার, নূহিয়্যা পরিবার ও লামগানী পরিবারেও অসংখ্য আলিম, যাহিদ, কাযী ও ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/৫-৯

পঞ্চম বৈশিষ্ট্য : মুসলিম জাহানে কুরআন-সুন্নাহর আইন হিসেবে গৃহীত
ফিকহে হানাফী ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজশক্তিগুলোর রাষ্ট্রীয় আইন। বিভিন্ন সালতানাতের সময় কুফা ও বাগদাদ থেকে শুরু করে পূর্ব দিকে কাশগর ও ফারগানা পর্যন্ত, উত্তরে হালাব, মালাত্‌ইয়া ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ান পর্যন্ত ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালিত হয়েছে। তাই মুসলিম জাহানের এই সুবিস্তৃত অঞ্চলে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন এবং সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ফিকহে হানাফীর অবদান অনস্বীকার্য। হিজরী দ্বিতীয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় যখন ফিকহে হানাফী সংকলিত হল তখন থেকেই মুসলিম জাহানের বিস্তৃত ভূখণ্ডে তা বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। হাদীস ও ফিকহের ইমামগণের মাধ্যমে বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর বহু কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে কুফা নগরীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. এবং অন্যান্য ফকীহ সাহাবীদের মাধ্যমে ফিকহে ইসলামীর যে বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছিল তা ইরাকের সীমানা অতিক্রম করে গোটা মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রবল প্রতাপান্বিত আব্বাসী শাসনের পূর্ণ যৌবন। এ সময় ফিকহে হানাফীই রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গৃহীত হল। খেলাফতে রাশেদার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদিও ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ’ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, কিন্তু আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর শাসন অক্ষুণ্ন ছিল। আর এর পিছনে মৌলিক অবদান ছিল কুরআন-সুন্নাহ থেকে আহরিত ফিকহে ইসলামীর। আব্বাসী শাসন ছাড়াও ছামানী, বনী-বুওয়াইহ, সালজুকী, গযনী ও আইয়ুবী শাসনামলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। রাজ্যশাসন মুসলিম শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বিচার-বিভাগ ছিল ফিকহে ইসলামীর অধীন। তাই আঞ্চলিক প্রশাসকদের কথা তো বলাই বাহুল্য, সালতানাতের প্রধান ব্যক্তিকেও কখনো কখনো সাধারণ বাদীর সঙ্গে বিবাদীর কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়েছে। এটি ইসলামী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আর যখন এর ব্যতিক্রম হয়েছে তখন মুসলিম বিচারপতিগণ তাদের দৃঢ়তা ও আসম সাহসিকতার দ্বারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা সমকালীন বিশ্বের উজ্জ্বলতম ইতিহাস। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এই প্রবন্ধে নেই। সচেতন ব্যক্তিদের তা অজানাও নয়। হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধে ইমাম আবু হানীফা রা.-এর বিখ্যাত সঙ্গীগণ কাযা ও বিচারের মসনদ অলংকৃত করেন। ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. (১৮৩ হি.) ছিলেন গোটা মুসলিম জাহানের কাযিউল কুযাত। হারুনুর রশীদের সময় দারুল খিলাফা রাক্কা শহরে স্থানান্তরিত হলে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহ. (১৩১-১৮৯ হি.) সে শহরে কাযার দায়িত্ব পালন করেন। তদ্রূপ ইমাম যুফার ইবনুল হুযাইল (১৫৮ হি.) বছরায়, ইমাম কাসিম ইবনে মা’ন (১৭৫ হি.) কুফায়, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবী যাইদাহ (১৮৪ হি.) মাদায়েনে, ইমাম আবু মুহাম্মাদ নূহ ইবনে দাররাজ (১৮২ হি.) কুফায়, ইমাম হাফস ইবনে গিয়াছ (১১৭-১৯৪ হি.) কুফা ও বাগদাদে (কুফায় তেরো বছর, বাগদাদে দুই বছর) আফিয়া ইবনে ইয়াযীদ আওদী (১৮০), বাগদাদে কাযা পরিচালনা করেন। তদ্রূপ হুসাইন ইবনুল হাসান আওফী (২০১) পূর্ব বাগদাদে, আলী ইবনে যাবইয়ান আবসী (১৯২ হি.), ইউসুফ ইবনে ইমাম আবু ইউসুফ (১৯২ হি.) বাগদাদে, মুহাম্মাদ ইবনে মুকাতিল রাযী (২২৬ হি.) ও নাসর ইবনে বুজাইর যুহলী রায় শহরে কাযার দায়িত্বে ছিলেন। ইমাম ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা (২১২ হি.) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সামাআ (১৩০ হি.-২৩৩ হি.) ইমাম ঈসা ইবনে আবান ইবনে সাদাকা (২২১ হি.), আবদুর রহমান ইবনে ইসহাক (২২৮ হি.), বিশর ইবনুল ওয়ালীদ কিনদী (২৩৮ হি.), হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.), হাসান ইবনে উছমান যিয়াদী (২৪৩ হি.), উমার ইবনে হাবীব (২৬০ হি.) ইবরাহীম ইবনে ইসহাক (২৭৭ হি.), বুহলূল ইবনে ইসহাক (২৯৮ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আলবিরতী (২৮০ হি.) কাযী আবু খাযিম আবদুল হামীদ ইবনে আবদুল আযীয (২৯২ হি.), কাযী আহমদ ইবনে ইসহাক ইবনে বুহলূল (২৩১-৩১০ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ নাইছাবুরী (৩৫১ হি.), আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ, আবু বকর দামাগানী, তহাবী ও কারখীর শীষ্য, হুসাইন ইবনে আলী সাইমারী (৩৫১-৪৩৬ হি.) প্রমুখ ফিকহ ও হাদীসের বিখ্যাত ইমাম ও তাঁদের শীষ্যদের উপর কাযার দায়িত্ব অর্পিত ছিল। বাগদাদ, কুফা, বছরা, আম্বার, হীত, মাওসিল, ওয়াসিত, মাম্বিজ, রায় প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তাঁরা ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনা করেছেন। মুসলিম জাহানের এই কেন্দ্রীয় শহরগুলিতে এত অধিক সংখ্যক ফকীহ ও কাযী বিদ্যমান ছিলেন, যা অনুমান করাও কঠিন। ইমাম সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ ‘কিতাবুল ইতিকাদ’ গ্রন্থে আবদুল মালিক ইবনে আবিশ শাওয়ারিব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বসরার প্রাচীন ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এই গৃহ থেকে সত্তরজন বিচারক বের হয়েছেন, যারা প্রত্যেকে ফিকহে হানাফী অনুসারে ফয়সালা করতেন ...।’-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ২/২৬৭ ইরাক যেহেতু ফিকহে হানাফীর মাতৃভূমি তাই এ সম্পর্কে অধিক আলোচনা বাহুল্য মনে হতে পারে। তাই ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের আলোচনা এখানেই সমাপ্ত করে অন্যান্য ভূখণ্ডের আলোচনায় প্রবেশ করছি।

খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহরে আগেই বলা হয়েছে যে, হিজরী দ্বিতীয় শতকেই ফিকহে হানাফী মুসলিম জাহানের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হাদীস ও ফিকহের বিখ্যাত ইমাম, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (১০৭-১৯৮ হি.)-এর একটি উক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘‘আমার ধারণা ছিল যে, ইরাকের দুটি বিষয় : আবু হানীফার ফিকহ ও হামযার কিরাআত কূফার পুল অতিক্রম করবে না, অথচ তা পৃথিবীর প্রান্তসমূহে পৌঁছে গিয়েছে।’-তারীখে বাগদাদ ১৩/৩৪৮ তাঁর এই বক্তব্যের বাস্তবতা এভাবে বোঝা যায় যে, হিজরী দ্বিতীয় শতক সমাপ্ত হওয়ার আগেই খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহ্‌র অঞ্চলেও ফিকহে হানাফী অনুযায়ী কাযা ও বিচার পরিচালিত হতে থাকে। ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর শীষ্যদের মধ্যে হাফস ইবনে আবদুর রহমান নাইছাবুরী (১৯৯ হি.), নাইছাবুরে, নূহ ইবনে আবী মারইয়াম মারওয়াযী (১৭৩ হি.) মার্ভে, ইমাম উমার ইবনে মায়মূন বলখী (১৭১ হি.) বলখে (২০ বছরেরও অধিক) ও ইমাম আবু মুতী হাকাম ইবনে আবদুল্লাহ বলখী (১৯৭ হি., ৮৪ বছর বয়সে) বলখে (১৬ বছর) কাযার দায়িত্ব পালন করেন। বলখের শাসকের সঙ্গে তাঁর একটি চমৎকার ঘটনা ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ৪/৮৭ কুনা অংশ) খোরাসান ও মাওয়ারাউন্নাহর হচ্ছে মুসলিম জাহানের এমন এক ভূখণ্ড,যা ইরাক ও হারামাইনের মতো হাদীস ও ফিকহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। বহু বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। তদ্রূপ বিভিন্ন সময় তা ছিল মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতারও প্রধান কেন্দ্র। আল্লামা তাজুদ্দীন আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আলী আস-সুবকী রাহ. (৭২৭-৭৭১ হি.) লেখেন, ‘খোরাসানের কেন্দ্রীয় শহর চারটি : মার্ভ, নিশাপুর, বলখ ও হারাত। এগুলি খোরাসানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর। এমনকি গোটা মুসলিম জাহানের কেন্দ্রীর শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা, এগুলো ছিল উলূম ও ফুনূনের মারকায এবং বিখ্যাত মুসলিম শাসকদের রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতার কেন্দ্র।’’-তবাকাতুশ শাফেইয়্যাতিল কুবরা ১/৩২৫ বিখ্যাত আব্বাসী খলীফা মামূনুর রশীদ দীর্ঘদিন মার্ভে ছিলেন। সে সময়ের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসের গ্রন্থে তা বিস্তারিতভাবে আছে। সংক্ষেপে ঘটনাটি এই যে, খোরাসান অঞ্চলে ফিকহে হানাফীর ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করে কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন এবং ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর গ্রন্থসমূহ জলাশয়ের পানিতে ধুয়ে ফেলতে আরম্ভ করেন। বিষয়টি খলীফার দরবার পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তিনি তাদের তলব করে এ কাজের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। তারা বললেন, এই ফিকহ হাদীসবিরোধী! মামুন নিজেও ছিলেন হাদীস ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত। যখন সুনির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু হল তখন মামুন নিজেই তাদের সকল অভিযোগ খণ্ডন করে ফিকহে হানাফীর ওই সিদ্ধান্তগুলো হাদীস দ্বারা প্রমাণ করে দিলেন। তারা লা-জবাব হয়ে গেলে মামুন তাদের সাবধান করে দিলেন এবং বললেন, ‘এই ফিকহ যদি প্রকৃতপক্ষেই কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হত তবে আমরা কখনো তা রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে গ্রহণ করতাম না।’ (মানাকিবুল ইমাম আযম, সদরুল আইম্মা; ইমাম ইবনে মাজাহ আওর ইলমে হাদীস (টীকা) পৃ. ১০) হিজরী তৃতীয় শতকে ফিকহে হানাফীর যেসব মনীষী এ অঞ্চলে কাযা পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন এই - নসর ইবনে যিয়াদ, আবু মুহাম্মাদ (২৩৩ হি.) ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর শীষ্য; নাইছাবুর দশ বছরেরও অধিক। হাইয়ান ইবনে বিশর (২৩৮ হি.), ইমাম আবু ইউসুফ রাহ.-এর শীষ্য; আসবাহান, পরে পূর্ব বাগদাদ। হাসসান ইবনে বিশর নাইছাবুরী (২৪৪ হি.), ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদের শীষ্য; নাইছাবুর। সাহল ইবনে আম্মার নাইছাবুরী (২৬৭ হি.), প্রথমে তূছ পরে হারাত। মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে মূসা বুখারী (২৮৯ হি.) বুখারা। মুহাম্মাদ ইবনে আসলাম আযদী (২৬৮ হি.) সমরকন্দ। ইবরাহীম ইবনে মা’কিল নাসাফী (২৯৫ হি.) নাসাফ। হাফিযুল হাদীস হিসেবেও বিখ্যাত ছিলেন। হাফেয যাহাবী রাহ. (৬৭৩-৭৪৮ হি.) ‘তাযকিরাতুল হুফফায’ গ্রন্থে শানদার ভাষায় তাঁর আলোচনা করেছেন। ইমাম বুখারী রাহ. (১৯৪-২৫৬ হি.) থেকে তাঁর যে চারজন শীষ্য সহীহ বুখারী রেওয়ায়েত করেছেন তিনি তাদের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনে সালামা, ইবনে সালমূয়াহ (২৯৮ হি.) নাইছাবুর। বিখ্যাত মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযাইমা রাহ. (৩১১ হি.) মাযহাবের ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁর বিশ্বস-তা ও জ্ঞান-গরিমার কারণে কাযার জন্য তাঁর নামই প্রস্তাব করেন। চতুর্থ হিজরী শতকের মনীষীদের মধ্যে আহমদ ইবনে সাহল (৩৪০ হি.) ও ইসহাক ইবনে মুহাম্মাদ, আবুল কাসিম (৩৪২ হি.) সমরকন্দ, তাহির ইবনে মুহাম্মাদ বাকরাবাযী (৩৬৯ হি.) মার্ভ, হারাত, সমরকন্দ, শাশ, বলখ ও ফারগানায়, আতা ইবনে আহমদ আরবিনজানী (৩৬৯ হি.) সমরকন্দের আরবিনজান শহরে, আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মাদ ফুযযী (৩৭৪ হি.) তিরমিয শহরে, কাযিল কুযাত আহমদ ইবনুল হুসাইন মারওয়াযী (৩৭৭ হি.) খোরাসানে, উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আননাযরী (৩৮৮ হি.) নাসাফে, উতবা ইবনে খাইছামা নাইছাবুরী (৪০৬ হি.) খোরাসানে (৩৯২-৪০৫ পর্যন্ত) কাযা পরিচালনা করেন। শেষোক্তজন ছিলেন খোরাসানের বিখ্যাত ফকীহ। সমকালে ফিকহ, ফতোয়া ও অধ্যাপনায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। হাকিম আবু আবদুল্লাহ নাইছাবুরী বলেন, ‘... তিনি নিজ যুগে অপ্রতিদ্বন্দী ছিলেন। খোরাসানে হানাফী মাযহাবের কোনো কাযী এমন ছিলেন না যিনি কোনো না কোনো সূত্রে তাঁর শীষ্য নন।’ (আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ২/৫১১) এছাড়া কিছু পরিবার এমন ছিল, যাতে শত শত বছর পর্যন্ত বহু ফকীহ ও কাযী জন্মগ্রহণ করেছেন। ইমাম সায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ (৪৩২ হি.)-এর আলোচনায় হাফেয সামআনী রাহ. (৬১৫ হি.) বলেন, আজ পর্যন্ত নিশাপুরের কাযা ও বিচার সায়েদী পরিবারেই রয়েছে। একই কথা আবদুল কাদের কুরাশী (৭৭৫ হি.)ও বলেছেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ২/২৬৫ কাযিল কুযাত ইমাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনুল হুসাইন নাসিহী (৪৪৭ হি.) সুলতান মাহমুদ ইবনে সবক্তগীনের সময় বুখারার বিচারপতি ছিলেন। পরবর্তীতে নাসিহী পরিবারে বহু আলিম, ফাযিল, কাযী ও ফকীহ জন্মগ্রহণ করেছেন। দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/২৮১, ১/৪০৯ মোটকথা, খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহরে এত অসংখ্য ফকীহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন এবং এত উঁচু পর্যায়ের মনীষীগণ কাযা ও বিচারের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, যা আজ অনুমান করাও সহজ নয়। উল্লেখ্য, খোরাসান, মা-ওয়ারাউন্নাহর ও বর্তমান ইরানের বিস্তৃত অঞ্চল আব্বাসী শাসন ছাড়াও বিভিন্ন সময় ছামানী, (২৬১-৩৯৫), বনী বুওয়াইহ (৩২০-৪৪৭ হি.), গযনভী (৩৬৬-৫৮২ হি.), সালজূকী (৪২৯-৫৫২ হি.) ইত্যাদি শক্তিশালী সালতানাতের অধীন ছিল। তাই বাগদাদের মতো এ অঞ্চলও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কর্মতৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা ও জীবনযাত্রার মানের বিচারে এই ভূখণ্ড বাগদাদ ও ইরাকের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। ঐতিহাসিক মাকদিসী লেখেন, ‘‘খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহর গোটা সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক উন্নত। এটি একটি সমৃদ্ধ জনপদ। প্রচুর কৃষিজমি, জলাশয় ও ফলমুলের বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। নাগরিকরা অত্যন্ত সৎ, দানশীল ও অতিথিপরায়ণ। শহরগুলোতে সুশাসন ও নিরাপত্তা রয়েছে। গোটা ভূখণ্ডে অনেক মাদরাসা। আলিমদের সংখ্যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। ফকীহগণ বাদশাহর মতো প্রতাপ ও মর্যাদার অধিকারী। বিদআতী কর্মকাণ্ড নেই। মানুষ সীরাতে মুসতাকীমের উপর রয়েছে। মুসলমানগণ বাস্তবিকই এই ভূখণ্ডের উপর গর্ববোধ করতে পারেন।’-আহসানুত তাকাসীম ফী মা’রিফাতিল আকালীম পৃ. ২৬০; মিল্লাতে ইসলামিয়া কী মুখতাসার তারীখ ১/২৪৭ তদ্রূপ সমরকন্দ, নিশাপুর, রায় প্রভৃতি শহরের যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন তাতে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান ইউরোপ-আমেরিকার শ্রেষ্ঠ শহরগুলোর চেয়েও মুসলিম জাহানের এই ভূখণ্ডগুলো শান্তিশৃঙ্খলা এবং সভ্যতা ও সুশাসনে অগ্রগামী ছিল। (প্রাগুক্ত) হিজরী সপ্তম শতকে তাতারীদের বর্বর আক্রমণে গোটা মুসলিম জাহান ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সেই সমৃদ্ধি আর ফিরে আসেনি। শুধু তাই নয় এর পরের ইতিহাস তো শুধু অশ্রু ও রক্তের ইতিহাস।

দামেশক, হলব ও মালাত্‌ইয়ায়
ইমাম আবু হানীফা রাহ. এর সময়ে শামের ফকীহ ছিলেন ইমাম আবু আম্‌র আবদুর রহমান ইবনে আম্‌র আওযায়ী (১৫৭ হি.)। তিনি ফিকহে হানাফী সম্পর্কে অবগত ছিলেন। প্রথমদিকে অস্পষ্টতা থাকলেও ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ.-এর মাধ্যমে তাঁর ভুল ধারণার অবসান ঘটেছিল। ফিকহে হানাফীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের পর তিনি তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হল এবং উভয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করলেন তখন এই মুগ্ধতা বিস্ময় ও ঈর্ষায় পরিণত হয়েছিল। (দেখুন : মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা, কারদারী, আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃ. ১১২) হিজরী তৃতীয় শতক ও তার পর দামেশক, হলব, হামাত ও শামের অন্যান্য শহরে, এমনকি সুদূর মালাত্‌ইয়াতেও ফিকহে হানাফীর কাযী বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবু খাযিম আবদুল হামীদ ইবনে আবদুল আযীয (২৯২ হি.), ইমাম তহাবী ও ইমাম আবু তাহির আদদাববাসের শায়খ; আবু জা’ফর আহমদ ইবনে ইসহাক, আবুল হাসান আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া উকাইলী, আবুল হাসান আহমদ ইবনে হিবাতুল্লাহ, (৬১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শামের দামেশক, হলব প্রভৃতি বিখ্যাত শহরে তাঁরা কাযার দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া আবদুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম ও আহমদ ইবনে আবদুল মজীদ মালাত্‌ইয়ার কাযী ছিলেন। কাযী আবদুল্লাহ ইবনে ইবরাহীম রাহ.-এর পিতা ইবরাহীম ইবনে ইউসুফ মাকিয়ানী (২৪১ হি.) ফিকহে হানাফীর বিখ্যাত ইমাম ছিলেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/১১৯) তদ্রূপ আহমদ ইবনে আবদুল মজীদের পিতা আবদুল মজীদ ইবনে ইসমাইল হারাভী (৫৩৭ হি.) বিলাদুর রোমের কাযী ছিলেন। হিজরী সপ্তম শতকে দামেশকের শাসক ছিলেন ঈসা ইবনে আবু বকর ইবনে আইয়ুব (৫৬৭-৬২৪ হি.)। আট বছরেরও অধিক কাল তিনি দামেশকের শাসক ছিলেন। তিনি ও তাঁর বংশধরগণ ছিলেন ফিকহে হানাফীর অনুসারী। এ শতকে ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা পরিচালনাকারী কয়েকজনের নাম এই : ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম শাইবানী (৬২৯ হি.) দামেশক; খলীল ইবনে আলী হামাভী (৬৪১ হি.) দামেশক; আবুল কাসিম উমার ইবনে আহমদ (৫৮৮-৬৬০ হি.) হলব; আবদুল কাদের (৬২৩-৬৯৬ হি.) হলব; ইবরাহীম ইবনে আহমদ (৬৯৭ হি.) হলব; মাজদুদ্দীন আবদুর রহীম ইবনে উমার ইবনে আহমদ (৬৭৭ হি.) শাম; কাযিল কুযাত সুলায়মান ইবনে উহাইব, ইবনু আবিল ইয (৬৭৭ হি.) মিসর ও শাম, কাযিল কুযাত ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আযরায়ী (৫৯৫-৬৭৩ হি.) দামেশক; কাযিল কুযাত ইমাম আবদুল আযীয ইবনে মুহাম্মাদ, হামাত; কাযিল কুযাত হাসান ইবনে আহমদ (৬৩১ হি.-৬৯৯ হি. আনু.) মালাত্‌ইয়াতে বিশ বছরের অধিক, অতঃপর দামেশকেও বিশ বছরের অধিক, সবশেষে মিসরে। ৬৯৯ হিজরীতে তাতারীদের আক্রমণের সময় নিখোঁজ হন। এঁদের পর কাযিল কুযাত আলী ইবনে মুহাম্মাদ, সদরুদ্দীন (৬৪২-৭২৭) দামেশক; কাযিল কুযাত আহমদ ইবনুল হাসান (৬৫১-৭৪৫ হি.) দামেশক; তাঁর পিতা ও দাদাও কাযিল কুযাত ছিলেন। কাযিল কুযাত আহমদ ইবনে আলী (৭১১ হি.) দামেশক; উমার ইবনে আবদুল আযীয, ইবনে আবী জারাদা (৬৭৩ হি.-৭২০ হি.) হলব, তার মৃত্যুর পর তার পুত্র নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ কাযিল কুযাত হন; কাযিল কুযাত আলী ইবনে আহমদ তরাসূসী (৬৬৯-৭৪৮ হি.) দামেশক; প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের পরিচয় ও অবদান সম্পর্কে জানার জন্য আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ, আল-ফাওয়াইদুল বাহিয়্যা ও অন্যান্য জীবনী-গ্রন্থ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

পশ্চিমে মিসর ও কাইরাওয়ানে
লোহিত সাগরের পশ্চিমে মিসরেও ফিকহে হানাফী হিজরী দ্বিতীয় শতকেই প্রবেশ করেছিল। এ অঞ্চলে ফিকহে হানাফীর প্রথম কাযী ছিলেন আবুল ফযল ইসমাইল ইবনুন নাসাফী আলকুফী। তিনি মাহদীর সময় ১৬৪ হি. থেকে ১৬৭ হি. পর্যন্ত কাযার দায়িত্বে ছিলেন। মিসরের বিখ্যাত মুজতাহিদ লাইছ ইবনে সা’দ রাহ. ফিকহী মতভেদ সত্ত্বেও তাঁর যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ১/৪৩৮-৪৩৯) এছাড়া মুহাম্মাদ ইবনে মাসরূক আল কিনদী ১৭৭ হি. থেকে ১৮৫ হি. পর্যন্ত, হাশিম ইবনে আবু বকর আলবাকরী (১৯৬ হি.) ১৯৪ হি. থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মিসরে কাযার দায়িত্বে ছিলেন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরুতে কাযী ইবরাহীম ইবনুল জাররাহ (২১৭ হি.) ২০৫ থেকে ২১১ হি. পর্যন্ত কাযা পরিচালনা করেন। তবে এ শতাব্দীতে যিনি দীর্ঘ সময় মিসরের কাযার দায়িত্বে ছিলেন এবং গোটা মিসরে যাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল অতুলনীয় তিনি হলেন ইমাম বাক্কার ইবনে কুতাইবা রাহ. (২৭০ হি.)। ২৪৬ হিজরীতে কাযার দায়িত্ব নিয়ে মিসরে এসেছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ২৩ বছরেও অধিককাল গোটা মিসরের অপ্রতিদ্বন্দী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক আরেকজন হানাফী মনীষী হলেন ইমাম আবু জা’ফর আহমদ ইবনে আবী ইমরান (২৮০ হি.) ২০ বছরেরও অধিক কাল তিনি মিসরে অবস্থান করেছেন। হিজরী তৃতীয় শতকের বিখ্যাত মুজতাহিদ আবু জা’ফর তহাবী (মৃ. ৩২১ হি.) উপরোক্ত দু’জনেরই সাহচর্য পেয়েছিলেন। তদ্রূপ মুহাম্মাদ ইবনে আবদা ইবনে হারব, আবু আবদিল্লাহ বসরী (৩১৩ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। ছয় বছর সাত মাস প্রতাপের সঙ্গে কাযা পরিচালনা করেছেন। তাঁর দুটি মজলিস হত : হাদীসের মজলিসে মুহাদ্দিসগণ ও ফিকহের মজলিসে ফকীহগণ শরীক হতেন। এছাড়া ইসহাক ইবনে ইবরাহীম শাশী (৩২৫ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে বদর ইবনে আবদুল আযীয, আবু বকর মিসরী (২৬৪-৩৩০ হি.) (ইমাম তহাবীর শীষ্য) ও ইমাম আবুল আব্বাস ইবনু আবিল আওয়াম (৪১৮ হি.) প্রমুখ মিসরে কাযা পরিচালনা করেছেন। ইমাম ইবনু আবিল আওয়াম রাহ. ১২ বছর ছয় মাস ২৫ দিন কাযার দায়িত্বে ছিলেন। (দেখুন : আলউলাতু ওয়াল কুযাত, টীকা হুসনুল মুহাযারা ২/১৪৮) হিজরী সপ্তম শতকের মাঝামাঝিতে আল মালিকুয যাহির বাইবার্‌ছ (৬২৫-৬৭৬ হি.) প্রথমে কাহেরা (কায়রো) পরে দামেশকে প্রত্যেক মাযহাবের আলাদা কাযী নিয়োগের নিয়ম জারি করেন। ওই সময় থেকে দশম শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত যারা ফিকহে হানাফী অনুযায়ী কাযা পরিচালনা করেছেন তাদের একটি তালিকা হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ. (৯১১ হি.) উল্লেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন, সদরুদ্দীন সুলায়মান, ইবনু আবিল ইযয (৬৭৭ হি.), মুয়িযযুদ্দীন আন-নু’মান ইবনুল হাসান (৬৯২ হি.), হুসামুদ্দীন আলহাসান ইবনে রাযী (৬৯৯ হি. আনু.), শামছুদ্দীন আহমদ ইবনে ইবরাহীম আস-সারুজী (৭০১ হি.) শামছুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে উছমান (৭২৮ হি.), ইমাম বুরহানুদ্দীন আলী ইবনে আহমদ (৭৪৪ হি.), আলাউদ্দীন আলী ইবনে উছমান (৭৪৫ হি.) এরপর তাঁর পুত্র জামালুদ্দীন আবদুল্লাহ ইবনে আলী ইবনে উছমান (৭৬৯ হি.), কাযিল কুযাত আসসিরাজুল হিন্দী উমর ইবনে ইসহাক গযনবী (৭৭৩ হি.), জামালুদ্দীন মাহমুদ ইবনে আলী আলকায়সারী (৭৯৯ হি.), কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ তরাবলুসী (৭৯৯ হি.), কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ মাকদিসী (৮২৭ হি.), কাযিল কুযাত যাইনুদ্দীন আবদুর রহীম ইবনে আলী আততাফাহ্‌নী (৮৩৫ হি.), কাযিল কুযাত বদরুদ্দীন মাহমুদ ইবনে আহমদ আলআইনী (৮৫৫ হি.) সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার; কাযিল কুযাত সা’দুদ্দীন ইবনে কাযিল কুযাত শামসুদ্দীন (৮৬৭ হি.) প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (দেখুন : হুসনুল মুহাযারা ২/১৮৪-১৮৭) তাঁর আরেকটি তালিকার শিরোনাম হল, ‘ফিকহে হানাফীর যে মনীষীগণ মিসরে ছিলেন’। এই তালিকার অধিকাংশ নাম পূর্বের তালিকাতেও এসেছে, কিছু নাম আছে, যা ওই তালিকায় নেই। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকজন হলেন-ইমাম জামালুদ্দীন আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলায়মান বলখী (৬৯৮ হি.), আবুল হাসান আলী ইবনে বালবান (৭৩১ হি.) সহীহ ইবনে হিব্বান বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে তিনিই বিন্যস- করেছেন; ফখরুদ্দীন উছমান ইবনে ইবরাহীম মারদীনী, ইবনুত তুরকুমানী (৭৩১ হি.) ইনি আল জাওহারুন নাকী রচয়িতা আলাউদ্দীন ইবনুত তুরকুমানীর পিতা; কানযুদ দাকাইক গ্রন্থের ভাষ্যকার ফখরুদ্দীন উছমান ইবনে আলী আযযায়লায়ী (৭৪৩ হি.); আমীর কাতিব আলইতকানী (৭৫৮ হি.); আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ-গ্রন্থকার আবু মুহাম্মাদ আবদুল কাদির ইবনে মুহাম্মাদ আলকুরাশী (৭৭৫ হি.); আকমালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ আলবাবরতী (৭৮৬ হি.), সিরাজুদ্দীন উমর ইবনে আলী কারিউল হিদায়া (৮২৯ হি.); ফাতহুল কাদীর রচয়িতা ইমাম ইবনুল হুমাম কামালুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহিদ (৮৬১ হি.); আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আশশুমুননী (৮৭২ হি.), সাইফুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উমর ইবনে কুতলূবুগা (৮৮১ হি.) প্রমুখ। এই তালিকায় সুয়ূতী রাহ. তাঁর উস্তাদ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে কুতলূবুগা (৮৮১ হি.) পর্যন্ত ৫৮ জন বিখ্যাত ফকীহর নাম উল্লেখ করেছেন। (দেখুন : হুসনুল মুহাযারা ১/৪৬৩-৪৭৮) আফ্রিকার কাইরাওয়ানে কাযা পরিচালনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুন আর-রূআইনী (২৯৯ হি.)। বিভিন্ন তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, প্রায় ত্রিশ বছর যাবত তিনি কাইরাওয়ানে অবস্থান করেছেন। তিনি ফিকহে হানাফীর উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। (দেখুন : আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ৩/১৮৯) তারও আগে কাইরাওয়ানের কাযী ছিলেন ইমাম আসাদ ইবনুল ফুরাত (২১৩ হি.) তিনি যেমন ফিকহে মালেকীর ইমাম তেমনি ফিকহে হানাফীরও ইমাম ছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে খিল্লিকান বলেছেন, আফ্রিকায় ইমাম আবু হানীফার মাযহাবই ছিল সর্বাধিক প্রচারিত ও অনুসৃত। হিজরী পঞ্চম শতকে মুয়ীয ইবনে বাদীছ (৩৫৮-৪৫৪ হি.) এর হাতে কর্তৃত্ব আসার পর তিনি এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ফিকহে মালেকী অনুসরণে বাধ্য করেন।-আলজাওয়াহিরুল মুযিয়্যা ১/৯

মোটকথা, মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত মুসলিম জাহানের বিখ্যাত শহরগুলোতে ফিকহে হানাফীর দ্বারা কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তখন মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য এবং মুসলিম উম্মাহ ছিল পৃথিবীর সেরা শক্তি। মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থান ও প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় পর্বে সালতানাতে উছমানিয়া ও বৃটিশের অনুপ্রবেশের আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশেও ফিকহে হানাফী অনুসারে কাযা ও বিচার পরিচালিত হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, এই পর্বের ইতিহাসও ফিকহে ইসলামীর যেকোনো পাঠককে উদ্দীপ্ত করবে।

আজ মুসলিম সমাজের যে শ্রেণী রোমান ল’ ও বৃটিশ আইনের প্রতি অতিমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন এই ইতিহাস তাদের চরম দৈন্যকে প্রকাশ করে। তদ্রূপ যারা আল্লাহর যমীনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী তাদের জন্যও এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
পুনশ্চ : এই লেখাটি যখন আরম্ভ করি তখন শিরোনাম ছিল, ‘ইমাম আবু হানীফা ও ফিকহে হানাফী : কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য।’ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর যখন প্রথম অংশটি দীর্ঘ হতে আরম্ভ করল তখন তা রেখে দিয়েছি। আবার নতুন করে অনুভব করেছি যে, ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর জীবনের যে কোনো একটি দিক তুলে ধরতে হলেও স্বতন্ত্র প্রবন্ধ; বরং গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন। বর্তমান আলোচনা থেকেও তাঁর প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্ব এবং কুরআন-সুন্নাহ্‌য় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য অনুমান করা সম্ভব। মুসলিম জাহানের চরম উন্নতির যুগে ফিকহে হানাফীর বিপুল গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে, তা পরিপূর্ণভাবে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক এবং এর সংকলকগণ ছিলেন কুরআন-সুন্নাহর মুজতাহিদ ইমাম। তবে কেউ যদি গোটা বিশ্বের সকল মানুষকেই নির্বোধ মনে করেন তাহলে তার সঙ্গে আর আলোচনার সুযোগ থাকে না। আমরা তার জন্য শুধু দুআ করতে পারি, আল্লাহ যেন তাকে হেদায়েত দান করেন।

32
লোকমুখে প্রসিদ্ধ, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম একবার আল্লাহকে বললেন, হে আল্লাহ আমি সকল সৃষ্টিজীবকে এক বছর খাওয়াতে চাই। আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান তুমি তা পারবে না। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, আল্লাহ! তাহলে এক সপ্তাহ। আল্লাহ বললেন, তুমি তাও পারবে না। সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে একদিন। আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান তুমি তাও পারবে না। একপর্যায়ে আল্লাহ এক দিনের অনুমতি দিলেন। সুলাইমান আলাইহিস সালাম জিন ও মানুষকে হুকুম করলেন, পৃথিবীতে যত প্রকার খাদ্য শস্য আছে এবং হালাল যত প্রকার প্রাণী আছে সব হাযির কর। তারা তা করল। এরপর বিশাল বিশাল ডেগ তৈরী করা হল এবং রান্না করা হল। তারপর বাতাসকে আদেশ করা হল, সে যেন খাদ্যের উপর দিয়ে সদা প্রবাহিত হতে থাকে যাতে খাবার নষ্ট না হয়। তারপর খাবারগুলো সুবিস্তৃত যমিনে রাখা হল। যে যমিনে খাবার রাখা হল তার দৈর্ঘ্য ছিল দুই মাসের পথ। খাবার প্রস্ত্তত শেষ হলে আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান! কোন্ প্রাণী দিয়ে শুরু করবে? সুলাইমান আ. বললেন, সমুদ্রের প্রাণী দিয়ে। তখন আল্লাহ সাগরের একটি বড় মাছকে বললেন, যাও সুলাইমানের যিয়াফত খেয়ে এস। তখন মাছটি সমুদ্র থেকে মাথা উঠিয়ে বললো, হে (আল্লাহর নবী) সুলাইমান, আপনি নাকি যিয়াফতের ব্যবস্থা করেছেন? তিনি বললেন, হাঁ, এইতো খাবার প্রস্ত্তত, তুমি শুরু কর। তখন সে খাওয়া শুরু করল এবং খেতে খেতে খাবারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৌছে গেল। সব খাবার শেষ করে ফেলল। তারপর বলল, আমাকে আরো খাবার দিন, আমি এখনও তৃপ্ত হইনি। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, তুমি সব খাবার খেয়ে ফেলেছ তাও তোমার পেট ভরেনি। তখন মাছ বলল, মেজবান কি মেহমানের সাথে এভাবে কথা বলে? হে (আল্লাহর নবী) সুলাইমান! শুনে রাখুন, আমার রব আমাকে প্রতিদিন এর তিন গুণ খাবার দেন। আজ আপনার কারণে আমাকে কম খেতে হল। এ কথা শুনে সুলাইমান আ. সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন...।

এ ঘটনাটি একেবারেই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। হাদীস, তাফসীর বা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া এ ঘটনার মাঝে এমন কিছু বিষয় আছে যা নিজেই প্রমাণ করে যে, ঘটনাটি সত্য নয়।   

১. একজন নবী এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক আবদার করবেন তা হতে পারে না। এর অর্থ দাড়ায় আল্লাহর মাখলুক সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণা নেই। একজন নবীর শানে এ রকম ধারণা করা সমীচীন নয়। ২. আল্লাহ নিষেধ করার পরও একজন নবী এরকম আবদার করতে থাকবেন। আর আল্লাহও তাকে এমন অযৌক্তিক বিষয়ের অনুমতি দিয়ে দিবেন তা কীভাবে হয়? 

৩. পৃথিবীর সকল প্রাণীই কি রান্না করা খাবার খায়? মাছ কি রান্না করা খাবার খায়? ৪. ঘটনায় বলা হয়েছে, খাবার যে যমীনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তার দৈর্ঘ্য দুই মাসের পথ। মাছটি কি দুই মাসের পথ মুহূর্তেই অতিক্রম করে ফেলল? বা এত দীর্ঘ পথ জলের প্রাণী স্থলে থাকল কীভাবে?   ৪. যে মাছের পেটে এত খাবার সংকুলান হয় সে মাছটি কত বড়! ৫.শুধু বাতাস প্রবাহিত হওয়াই কি পাক করা খাদ্য নষ্ট না হওয়ার জন্য যথেষ্ট? এ ধরনের আরো অযৌক্তিক কথা এ কিচ্ছায় রয়েছে। যা এ ঘটনা মিথ্যা হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন ঘটনা  বর্ণনা করা যেমন বৈধ নয় তেমনি বিশ্বাস করাও মূর্খতা ছাড়া কিছু নয়।

কোনো প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়াই শোনা কথা বলা থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

33
মূসা আ. ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন হয়েছে এটা কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। এজন্য মূসা আ.-কে মূসা কালিমুল্লাহ বলা হয়। এটাকেই পুঁজি করে এক শ্রেণীর কাহিনীকার ‘মূসা আ. ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন’ শিরোনামে সমাজে বহু আজগুবি ঘটনা বলে থাকে, যা ওয়াজের মাঠ গরম করে ঠিকই কিন্তু সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।

এগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি কথোপকথন হল সুস্থতার নিআমত বিষয়ে। ‘‘মূসা আ. আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! আপনি যদি মূসা হতেন আর আমি যদি আল্লাহ হতাম তাহলে আপনি কী চাইতেন? আল্লাহ বললেন, এটা আমার শান না। মূসা বললেন, তা তো জানি, কিন্তু হলে কী চাইতেন। তখন আল্লাহ বলেন, সুস্থতা চাইতাম।’’

সুস্থতা কত বড় নিআমত একথা বোঝাতে এই বানোয়াট কিচ্ছা বলা হয়, যার সাথে মূসা আ.-এর কোনোই সম্পর্ক নেই।

এমন কথোপকথনের অর্থ দাঁড়ায় মূসা আ. আল্লাহর সাথে মশকরা করছেন। (নাউযুবিল্লাহ) যা একজন নবীর জন্য কখনোই শোভন নয়। একজন নবীর শানে এধরনের কথা বলা বড়ই বেআদবী ও গর্হিত কাজ, যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

সুস্থতার নিআমতের ব্যাপারে তো হাদীস শরীফে কত সুন্দর সুন্দর কথা এসেছে সেগুলোই বলা উচিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ

 ‘‘দুটি নিআমতের ব্যাপারে মানুষ বড়ই ক্ষতির মধ্যে (লসের মধ্যে) রয়েছে। একটি হল, সুস্থতা, অপরটি হল, অবসর। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪১২)

সুস্থতা ও অবসরকে মানুষ যথাযথ কাজে লাগায় না। যখন অসুস্থ হয় বা ব্যস্ততা বেড়ে যায় তখন বলে, এখন আমি সুস্থ থাকলে বা আমার অবসর থাকলে অমুক ভাল কাজ করতাম। অথবা বলে, সুস্থ হলে বা অবসর পেলে অমুক ভাল কাজ করব। অথচ আগের সুস্থতার সময় বা অবসর সময়কে সে হেলায় নষ্ট করেছে। এদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে হাদীস শরীফে।
সুতরাং সহীহ বর্ণনা থাকতে ভিত্তিহীন কথা বলা মূর্খতা বৈ কিছুই নয়। আমরা তা থেকে বিরত থাকব এবং যাচাই বাছাই ছাড়া কিছু বলব না এবং কোনো কিছু শোনামাত্রই বলে বেড়াব না।

34
অনেক মানুষকে বলতে শোনা যায়, ‘শুকর’-এর নাম উচ্চারণ করলে চল্লিশদিন মুখ নাপাক থাকে; শুকুর না বলে ‘খিনযীর’ বলতে হবে। একথাটি একেবারেই অমূলক।

শুকরকে আল্লাহ তাআলা হারাম করেছেন, আর হারাম বস্তুর প্রতি ঘৃণা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে শুকরের নাম মুখে উচ্চারণ করলেও মুখ নাপাক হয়ে যাবে -একথার কোনো ভিত্তি নেই।
এরপর শুকর বাংলা শব্দ, এর আরবী হল খিনযীর। একই প্রাণীর নাম বাংলায় উচ্চারণ করলে মুখ নাপাক হবে আর আরবীতে উচ্চারণ করলে নাপাক হবে না এরই বা কী অর্থ? আল্লাহ আমাদের অমূলক কথা বলা থেকে হেফাযত করুন।

35
Allah: My belief / ব্লাসফেমী কেন দরকার
« on: November 19, 2014, 02:55:11 PM »
গত এক-দেড় মাস সময়ের মধ্যে দেশে-বিদেশে দৃষ্টি ও মনযোগ আকর্ষণ করার মতো বেশ কটি ঘটনা ঘটেছে। সেসবের মধ্য থেকে তিনটি বিষয় নিয়ে এখানে পাঠকের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকের ঘটনা। পবিত্র হজ্বের একদম আগ মুহূর্তেই বলা যায়। এদেশের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ব্যক্তি বিশ্ব মানবতার মহান ত্রাণকর্তা, নবী ও রাসূলদের সরদার, দোজাহানের বাদশাহ হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করেছে। আব্দুল লতীফ ছিদ্দিকী নামধারী ঐ পক্ককেশী লোকটি ইসলামের অন্যতম রুকন হজ্বের প্রতি তার বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রকাশ করতে গিয়ে সরাসরি রাসূলে কারীমের প্রতিই তার অন্তরের বিষ প্রকাশ করে দিয়েছে। সে ওই বক্তব্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানব-কাফেলা হযরাত সাহাবায়ে কেরামকেও ‘ডাকাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই সে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ‘টাঙ্গাইল সমিতি’ নামের একটি অপদার্থ আঞ্চলিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব বক্তব্য রাখে (যদি তারা পদার্থ হত তবে কি এসব নিরবে শুনে যেত)। তার কুৎসিত বক্তব্যের সবটুকুরই অডিও-ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের আর্কাইভসহ ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে সংরক্ষিত আছে। সে বিষয়ে সবাই কমবেশি জানেন। এর পর সে বক্তব্য নিয়ে দেশব্যপি কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে সেটাও কারো অজানা নয়। কিছুদিনের মধ্যে তাকে মন্ত্রীসভা থেকে ও সরকারী দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সে এখন ভারতে পালিয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করে এনে শাস্তি দেয়ার দাবিতে কয়েকটি ইসলামী দলের ডাকে গত ২৬ অক্টোবর রোববার দিনব্যাপি একটি হরতালও পালিত হয়েছে।

  প্রায় ৯০% মুসলমানের দেশের ট্যাক্সের টাকায় বেতন-ভাতা পাওয়া ও প্রাচুর্যের জীবন-যাপনকারী মন্ত্রী পদবিধারী ওই লোকটি তাদেরই খরচে বিদেশে গিয়ে যে অসভ্যতা ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে তার সম্পর্কে এখানে বিশেষ আলোচনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং এ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় পাঠকদের সামনে নিয়ে আসা আমরা প্রয়োজনীয় বোধ করছি। প্রথমত সরকারপন্থী ও সেক্যুলার গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে- ‘হজ্ব ও তাবলিগ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে’ ওই ব্যক্তিকে মন্ত্রীত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ইত্যাদি। তবে ওই কারণ দুটি সঠিক হলেও মূল বিষয়বস্তু আরো ভয়ংকর ও সাংঘাতিক। সে মূলত নবীজীর প্রতি এবং নবীজীর সাহাবীদের প্রতি চরম কুৎসা রটনা ও বিষোদ্গার করেছে। তার বিষোদ্গারের ভাষা ও বিষয়বস্তু ছিল এতটাই জঘন্য যে, স্মরণকালের মধ্যে পৃথিবীর কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম মন্ত্রীও এ ভাষায় প্রকাশ্যে উক্তি করেছেন বলে শোনা যায়নি। তাকে চরম বেয়াদব, ধৃষ্ট ও শয়তান বললেও কম বলা হবে। মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে নিশ্চিতভাবেই সে এক পরিণত মুরতাদের দৃষ্টান্ত।

  দ্বিতীয়ত, তার ওই জঘন্য উক্তি প্রকাশের পর তার সামনে দুঃখ ও অনুতাপ প্রকাশের বেশ কয়েকটি সুযোগ পার হয়েছে। সে কোনো সুযোগেই নিজের অপকর্ম থেকে ফিরে আসার মনোভাব দেখাতে পারেনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এবং সর্বশেষ দলীয় কারণ-দর্শানো নোটিশের জবাবেও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের প্রতি তার অনমনীয় শয়তানীর পক্ষেই সে অবস্থান নিয়েছে। তার কাছ থেকে কোনো অনুতাপই পাওয়া যায়নি। এমনকি তার রাজনীতিক ছোটভাই তার পক্ষে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ায় সে তার প্রতিও প্রকাশ্যে রুষ্টতা প্রকাশ করেছে। শেষ পর্যন্ত সরকার ‘নিরাপদে’ তাকে সরিয়ে দিয়েছে। দলকেও তার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, ওই ব্যক্তিকে সরকার ও সরকারী দল থেকে সরিয়ে দেওয়ার বড় কারণ ছিল অন্য জায়গায়। সেটা হচ্ছে, ওই বক্তব্যেই ওই মন্ত্রী (এখন সাবেক) প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় সম্পর্কেও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভঙ্গিতে একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল। ধর্ম অবমাননার কারণে নয়- সে কারণেই তার উপর এসব শাস্তি নেমে এসেছে। যারা ওই ব্যক্তিটি সম্পর্কে সরকারি সিদ্ধান্তের এমন ব্যাখ্যা করেন তারা হয়ত ইসলামধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যুতে এ সরকারের নানা আচরণ ও অবস্থানের সূত্র ধরেই এমনটা করে থাকেন। সে বিষয়ে আমরা যেতে চাই না। আমরা বরং এক ব্যক্তির ধৃষ্টতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সিদ্ধান্তকে গণমানুষের দাবি ও চেতনারই প্রতিফলনের অংশ মনে করতে চাই। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদও জানাতে চাই।

  সেজন্য আমরা এটাও চাই যে, ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই অমার্জনীয় অপরাধের হোতাকে দেশে ধরে এনে কমপক্ষে বর্তমান আইনের আওতায় হলেও শাস্তি দেওয়া হোক। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কারণ, পাশের দেশে তাকে পালিয়ে থাকতে দিয়ে কিছু গ্রেফতারি পরোয়ানার তাৎপর্যহীন খবর ওই ব্যক্তির জন্য কোনো শাস্তিই নয়। তবে তার শাস্তি কার্যকরের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি আহবানকারীদের সমালোচনা করে কোনো কোনো মহল পরামর্শ দিয়ে বলেছে যে, সরকার তো সম্ভব সব কিছুই তার বিরুদ্ধে করেছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করার মতো ক্ষমতা ও সুবিধা তো সরকারের নেই। এর উত্তরে আমরা বলব, যারা এমন পরামর্শ দিচ্ছেন, তারা যুক্তি ও আবেগের দিক থেকে মুসলমানদের হৃদয়ের উত্তাপ ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা কেবল দায় সারার জন্য শুকনো কিছু কথা উগড়ে দিয়েছেন। কারণ, ইন্টারপোল ছাড়াও ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের বন্দিবিনিময় ও অন্য কিছু ‘বিনিময়মূলক’ চুক্তিও রয়েছে। যে কারণে দুটি সরকারই পরষ্পরের স্বার্থ অনুযায়ী অপর দেশে থেকে নিজ দেশের অপরাধী নিতে-আনতে পারে। ইতোমধ্যেই সে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। শুধু যে কোনো সরকারের ইচ্ছা ও প্রাধান্যের বিষয়টিই এখানে মুখ্য। তা ছাড়া যদি তা না-ও পারা যায়, তার মতো ধৃষ্ট ও অমার্জনীয় অপরাধের হোতাকে যদি দেশে না-ও আনা যায়, আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে অবস্থিত তার বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি সব ক্রোক করে তাকে দেউলিয়া করে তো ছেড়ে দেয়া যায়। এরও নযীর এ সরকারের আমলে স্থাপিত হয়েছে। অবশ্য এসকল দূর্নীতিবাজদের বিদেশে গচ্ছিত অর্থের কথা চিমত্মা না করাই ভাল। এছাড়া সে যে বর্বর বক্তব্য দিয়েছে তার জন্য প্রকাশ্যে না হলে ইসলামবিদ্বেষী দেশি-বিদেশীদের করুণা তো পাবেই।

  সুতরাং এ ধৃষ্ট ব্যক্তিটির শাস্তির জন্য মন্ত্রীসভা ও দল থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট হয়ে গেছে - এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একইসঙ্গে এটাও প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ইসলাম অবমাননার শাস্তির জন্য প্রচলিত আইনই যথেষ্ট, নতুন আইনের প্রয়োজন নেই বলে যারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন তারা সঠিক কথা বলেন কি না। তাদের দাবি সঠিক হলে ওই পলাতক ব্যক্তিকে এখন নিশ্চয়ই কারাগারের ভেতরে থাকতে হত। সে পালানোর সুযোগই পেত না। কিংবা পালানোর চেষ্টা করলেও আইন ও প্রয়োগের কঠোরতার কারণেই তাকে আমরা শাস্তির আওতার মধ্যে দেখতে পেতাম। সুতরাং ধর্মপ্রাণ জনগণের পক্ষে এ সিদ্ধান্তে আসাই সঙ্গত যে, প্রচলিত আইন এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, রাসূল অবমাননা ও ইসলাম-অবমাননার জন্য ব্লাসফেমী-জাতীয় কঠোর আইন এ দেশে পাশ করাই দরকার। তা না হলে কিছু সংখ্যক ধৃষ্ট ইসলামবিদ্বেষী বস্নগারের মতো তাদের কিছু পক্ককেশী পৃষ্ঠপোষককেও শাস্তির আওতায় আনা যায় না। এখানে আরেকটি বিষয়ও প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে, যে লোক জাতিসংঘের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে নিউইয়র্কে গেল, সে এরপর নিজের সটকে পড়ার পথ নিজেই ঠিক করে নিতে পারল কীভাবে? এসব দুষ্ট-দূর্নীতিবাজদের লালন করার ক্ষতি এখন শুধু সরকারই বহন করবে না। এ গ্লানি বইছে পুরো জাতি। সরকারের আগের ৫ বছর পাটমন্ত্রণালয়ে থেকে দেশের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি করার ক্ষেত্রে তার দূর্ণীতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন আগেও প্রকাশিত হয়েছে। তবুও নতুন সরকারে সে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেয়েছে। সরকার তো তাৎক্ষণিকভাবে তার ভিসা প্রত্যাহার করাতে পারতো। তা হলে ভারতে না গিয়ে ওই পলাতক আসামীটিকে বাংলদেশেই ফিরতে বাধ্য হতে হতো। হয় সরকার তাকে নিরাপদে সটকে পড়ার সুযোগ দিয়েছে, অথবা অতি স্পর্শকাতর বিষয়টির গুরুত্ব তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়েছে। নতুবা এ বিষয়ের আইনে প্রয়োজনীয় পরিমাণ কঠোরতা নেই। সে ক্ষেত্রে নতুন ব্লাসফেমী আইনের যৌক্তিকতাই প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত রাসূল অবমাননার মধ্য দিয়ে যারা কোটি কোটি বিশ্বাসী মানুষের হৃদয়ে ছুরি চালিয়ে একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে- তাদের সর্বোচ্চ কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পৃথিবীবাসীর শান্তি ও স্বস্তির জন্যেই হওয়া দরকার। তাদের অমার্জনীয় পাপের দায় কেউ নিতে পারে না। তাই সে চেষ্টাও কারো করা উচিত নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের শৃঙ্খলা ও শান্তি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য রাসূল ও ধর্ম অবমাননা বিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে যত বিলম্ব হবে ততই এসব ক্রিড়নকরা তাদের মতলবী ঔদ্ধত্য দেখাতে থাকবে।

  দুই. অন্যান্য মন্ত্রী ও পদস্থ আমলাদের সাথে বর্তমান সরকারের দুজন মন্ত্রী এবার পবিত্র হজ্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। সে দুজনই মূল শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত দুটি শরিক বামদলের প্রধান। সে কারণে তাদের হজ্ব পালন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের খবর ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। অন্য দেশগুলোর মত এদেশেও বাম রাজনীতি মানে সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি ধর্মহীনতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠারও রাজনীতি। তবে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার চেয়ে বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় চেষ্টাটাই বামরাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য। তো সেই রাজনীতির দুই সরব ও সোচ্চার কা-ারির হজ্ব-গমন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন কথা ও মন্তব্য উচ্চারিত হয়েছে। তাদের পক্ষের ও বিপক্ষেরর লোকজন উভয়েই তাতে অংশ নিয়েছে। পক্ষের লোকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আক্ষেপভরা স্বরে লিখেছে -‘লেলিন ও কার্ল-মার্কসের আত্মা এবার কষ্ট পাচ্ছে’ ‘শেষ পর্যন্ত দুই কমরেডও হজ্বে গেল’ এ জাতীয় বহু বাক্য। আবার বিপক্ষের লোকজন বিদ্রম্নপ করে লিখেছে -‘লাখো চুহা মারকে বিল্লি চলে হজ্ব মে’ ‘ঈমানের ঠিক নেই হজ্বের নামে পেরেশান’ - এ জাতীয় কিছু কিছু বাক্য। এমনকি সংবাদ মাধ্যমে ‘কমরেড হাজ্বী’ শিরোনামে খবরও ছাপা হয়েছে। আমরা অবশ্য তাদের এই হজ্ব পালনের বিষয়টিকে উপরোক্ত যে কোনো একটি প্রান্ত থেকে দেখতে আগ্রহী নই।

  আমরা মনে করি মুসলমানের সমত্মান জীবদ্দশায় যে কোনো সময় তার দ্বীন-বিরোধী চিন্তা, বোধ কিংবা কর্মকাণ্ড থেকে তওবা করে আল্লাহর ঘরে হাজির হতেই পারেন। এটা অবশ্যই তার দ্বীনী বোধ ও চিন্তার বিষয়। এখানে দ্বার রুদ্ধ হওয়ার বা করার কোনো ব্যাপার নেই। তবে একথা সত্য যে, এ দু’জন মন্ত্রী এদেশের প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত সেক্যুলার রাজনীতি ও জীবনধারার প্রকাশ্য প্রবক্তা রূপেই পরিচিত। সে হিসেবে বিভিন্ন সময় নাসিত্মক্যবাদী ইসলামবিদ্বেষী মহল তাদের-সমর্থন সহানুভূতি পেয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তারাও তাদের পক্ষে উচ্চকণ্ঠে দাঁড়িয়েছেন। নারী, জীবন, অর্থ, শাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য ও অবস্থানে হজ্বে যাওয়ার আগ পর্যন্তও তারা অটল ছিলেন। ষড়যন্ত্রকারী মুরতাদ কাদিয়ানীদের পক্ষে সহযোগিতার জন্য তারা বকশিবাজারের কাদিয়ানীকেন্দ্রে গিয়ে সম্মাননাপ্রাপ্ত হয়েছেন। এসবই সত্য। এর সঙ্গে এটাও সত্য যে, তারা হজ্বে গিয়েছেন। খবরে জানা গেছে, একজন সরকারী খরচে, আরেকজন সস্ত্রীক ব্যক্তিগত খরচে হজ্ব করতে গিয়েছেন। আমরা জানি, মৌলিক বিষয়ে ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধিতা আর ইসলামের একটি মহান রুকনের পালন একসঙ্গে গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই আমরা এটাই ধরে নিতে চাই যে, একজন মুসলিম যেমন অতীত ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে হজ্বে পবিত্র হওয়ার চেষ্টা করেন- তেমনি তারাও সেই চেষ্টা আন্তরিকভাবে করেছেন। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক বোধ ও চেতনার ইসলামরৈরী জায়গাগুলো থেকে তওবা করেছেন। তাদের মনের খবর জানার ক্ষমতা আমাদের কেন জগতের কোনো মানুষেরই নেই। সে হিসেবে হজ্ব-উপযোগী যে মনো-মানসিক অবস্থান কাম্য, আমরা তাদের ক্ষেত্রে সেটাই প্রত্যাশা করি। এখানে একটি কথার উল্লেখ আমরা প্রাসঙ্গিক মনে করি। সেটি হচ্ছে, তারা তো হজ্বে অবশ্যই তালবিয়া পড়েছেন। লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক... (হাজির হে প্রভু আমি হাজির)। তালবিয়ার একটি বাক্য হচ্ছে - ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা লাকা ওয়াল মুলক...’ (নিশ্চয়ই সব প্রশংসা ও অবদান তোমার এবং রাজত্ব তোমারই)। তালবিয়ার এ বাক্যগুলো যদি তারা পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করেই থাকেন তাহলে অবশ্যই রাজত্বের অধিকারী এবং রাজত্ব চালানোর নীতি সম্পর্কেও তারা যথাযথ উপলব্ধী উচ্চারণ করেছেন। বিশ্ব প্রতিপালকের প্রভুত্ব ও নিজ দাসত্বের সুখকর অনুভূতি নিজেদের মধ্যে জাগ্রত করেছেন। স্বীকৃতি দিয়েছেন ও সমর্পিত হয়েছেন। এবার সে হিসেবেই ভবিষ্যত-জীবনের রাজনৈতিক কর্মপ্রয়াস তারা পরিচালনা করতে পারেন। আমরা তাদেরকে দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রম্নতি রক্ষাকারী মনে করতে চাই বলেই এমন প্রত্যাশা তাদের ব্যাপারে পোষণ করতে চাই।

  বিপক্ষের লোকেরা তাদের হজ্ব পালন নিয়ে অনেক রকম কথাই বলেন। আমরা শুরুতেই সে পথে হাঁটা সমীচীন মনে করি না। আমরা বরং দেখতে চাই নিন্দুকের মুখে ছাই ছিটিয়ে দিয়েই তারা প্রকৃত হাজ্বীর নীতি, বোধ ও চরিত্র গ্রহণ করবেন। নিছক রাজনীতির জন্য যে তাদের হজ্বযাত্রা নয়, এটা অবশ্যই তারা ইসলামের বিধানাবলী ও মুসলমানদের সম্পর্কে তাদের বক্তব্য ও আচরণে দেখাবেন বলে আমরা আশা রাখি। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা গায়ে পড়ে আমাদের হতাশ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থান ও চিমত্মা নিয়েই আমরা তাদের হজ্ব পালনের বিষয়টি দেখতে চাই। আল্লাহ রাববুল আলামীন তাওফীকদাতা।

  তিন. সপ্তাহ খানেক আগে নাটোরে এক মর্মামিত্মক সড়ক দুর্ঘটনার খবর দেশকে নাড়া দিয়ে গেল। বহু মানুষ হতাহত হয়েছে ওই ঘটনায়। মাস দেড়েক আগে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রেল দুর্ঘটনায় কয়েকটি প্রাণ ঝরে গেল। এরও আগে পদ্মায় মাদারিপুর-মুন্সিগঞ্জের পথে এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় বহু মানুষের সলিল সমাধি হয়ে গেল। বহু লাশ নিখোঁজ থাকা অবস্থাতেই উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হল। এরকম দুর্ঘটনা বহু। দিনে দিনে, মাসে মাসে এসব দুর্ঘটনা এবং এসবের ফলে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছেই। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অত্যন্ত গর্হিত এবং বেদনাদায়ক বিষয়। ইসলাম মানুষের জানমালের স্বাভাবিক নিরাপত্তা দিয়েছে। এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার বা প্রশাসনের। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এসব দুর্ঘটনার দায় কোনোভাবেই সরকার বা প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না।

  সড়কপথ, নৌপথ বা রেলপথ-যাই বলি না কেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমেই দায়ী করা হয় গণপরিবহনের চালক ও মালিককে। বলা হয় চালকের খামখেয়ালির জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। মালিকপক্ষ ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী উঠিয়েছিল। এসব দোষারোপ একদিক থেকে ঠিক। কিন্তু দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দোষারোপের ভূমিকা কিছুতেই সঠিক হতে পারে না। কারণ, এসব খামখেয়ালি ও অতিব্যবসা প্রবণতা বন্ধের দায়িত্ব তো প্রশাসনেরই।

 ঐ গণপরিবহনগুলো তো পানি বা মাটির নীচ দিয়ে চলাচল করে না। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সম্মুখেই প্রকাশ্যে চলাচল করে আর তাদের ফিটনেস ও চলাচলের লাইসেন্সও দিয়ে থাকে সরকারী কর্তৃপক্ষ।  সে হিসেবে মূল গাফলতির দায় তো তাদেরই। বরং বারবার মারাত্মক সব দুর্ঘটনার পরও চালকদের প্রতিযোগিতা ও খামখেয়ালি প্রমাণ করে যে, দুর্ঘটনার শাস্তি বা দায় নিয়ে তারা মোটেও চিমিত্মত নয়। প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে তাদের দুশ্চিমত্মার কিছুই নেই। একই সঙ্গে প্রশাসনের চূড়ায় বসে থাকা অদক্ষ ও উন্নাসিক চালক-শ্রমিকদের উস্কানিদাতা মন্ত্রীদের দায়ও এক্ষেত্রে কম হতে পারে না। ‘শ্রমিকের জান’ এবং এ ধরনের বিভিন্ন খেতাব নিয়ে যারা বলেন, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য চালকের শিক্ষা-দীক্ষা ও সচেতনতার কোনো প্রয়োজন নেই, গরু-ছাগল চেনাই যথেষ্ট-তারাই প্রকারান্তরে রাস্তায় রাস্তায় চালকদেরকে খুনের লাইসেন্স তুলে দেন। তাদের কারণেই একশ্রেণীর চালক নির্বিকার ভঙ্গিতে পথচারীদের খুন করতে উৎসাহিত বোধ করে। এজন্যই বলতে হয় যে, দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো উপায় নেই। ইসলাম তো দায়িত্বশীলদের এসুযোগ দেয়-ই না, আইন, নৈতিকতা ও মানবতার কোনো দৃষ্টিতেই এ সুযোগ পাওয়ার পথ নেই।

প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি দুর্ঘটনার জন্য উপর-নিচ, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কিংবা মূল বা গৌন যে পর্যায়ের ব্যক্তিরাই দায়ী থাকুক, তাদের নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় আইনের প্রয়োগ নয়। বরং আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি শ্রেণী ও চরিত্রের মাঝেই নৈতিকতা সৃষ্টি ও দায়িত্ববোধ বাড়ানোর মেহনত করা। এ জন্য প্রয়োজন দ্বীনী শিক্ষা ও চেতনার প্রশিক্ষণ প্রদান। এর কোনো বিকল্প হতে পারে না। জাগতিক সব দায়, সব শাস্তি এবং ভীতির উর্ধ্বে হল পরকালীন জীবনের কঠোর জবাবদিহি কিংবা বিপর্যয়ের আশংকা। কারো হৃদয়ের ভেতর সে জবাবদিহির চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারলে ইনশাআল্লাহ এসব খামখেয়ালি ঘটিত দুর্ঘটনার পরিমাণ এমনিতেই কমে যাবে। (source:http://www.alkawsar.com/article/1206)

36
Allah: My belief / Being true with Allah.
« on: November 19, 2014, 02:07:45 PM »
This book was translated from the collection of Shaykh ‘Abdullāh ‘Azzām’s transcribed lectures called‘at-Tarbiyah al-Jihādiyyah wal-Binā’’ (1/30-40)

In the name of Allah, The most gracious the most merciful

Verily,all praise is due to Allāh. We praise Him, seek refuge with Him, and seek His Forgiveness. We seek refuge with Allāh from the evils of our souls, and the mistakes in our actions. Whoever Allāh Guides, there is none who can misguide him, and whoever Allāh misguides, there is none who can guide him. And I testify that there is none worthy of being worshipped except Allāh, and I testify that Muhammad (صلى اﷲ علیھ وسلم) is his servant and Messenger.
یَا أَیُّ ھَا الَّ ذِینَ آمَنُواْ اتَّ قُواْ اللّھَ حَقَّ تُقَاتِھِ وَلاَ تَمُوتُنَّ إِلاَّ وَأَنتُم مُّ سْلِمُونَ
{“O you who believe! Have taqwā of Allāh as He deserves, and do not die except as Muslims.”}
یَا أَیُّ ھَا النَّ اسُ
اتَّ قُواْ رَبَّ كُمُ الَّ ذِي خَلَقَكُم مِّ ن نَّ فْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ
مِنْھَا زَوْجَھَا وَبَثَّ
مِنْھُمَا رِجَالاً كَثِیراً وَنِسَاء
وَاتَّ قُواْ اللّھَ الَّ ذِي تَسَ
اءلُونَ بِھِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللّھَ
كَانَ
عَلَیْكُمْ رَقِیبً
ا
“O people! Have taqwā of your Lord, Who Created you from a single soul, and Created from it its mate, and sprouted from it many men and women. And have taqwā of Allāh, from Whom you demandyour mutual rights, and do not cut off the relations of the womb. Verily, Allāh is Ever-Watching over you.”}
یَا أَیُّ ھَا الَّ ذِینَ آمَنُوا اتَّ قُوا اللَّ ھَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِیدًا
یُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَیَغْفِرْ لَكُمْ
ذُنُوبَكُمْ وَمَن یُطِ
عْ اللَّ ھَ وَرَسُولَھُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِیمًا
{“O you who believe! Have taqwā of Allāh, and say that which is truthful. He
will rectify your actions for you and Forgive you your sins, and whoever obeys Allāh and His Messenger has indeed achieved a great success.”}
(To be continued inshaAllah........)

37
Faculty Forum / All Nobel Prizes in Chemistry
« on: April 17, 2012, 09:45:32 AM »



The Nobel Prize in Chemistry has been awarded 103 times to 161 Nobel Laureates between 1901 and 2011. Frederick Sanger is the only Nobel Laureate who has been awarded the Nobel Prize in Chemistry twice, in 1958 and 1980. This means that a total of 160 individuals have received the Nobel Prize in Chemistry.


2011
Dan Shechtman
2010
Richard F. Heck, Ei-ichi Negishi, Akira Suzuki
2009
Venkatraman Ramakrishnan, Thomas A. Steitz, Ada E. Yonath
2008
Osamu Shimomura, Martin Chalfie, Roger Y. Tsien
2007
Gerhard Ertl
2006
Roger D. Kornberg
2005
Yves Chauvin, Robert H. Grubbs, Richard R. Schrock
2004
Aaron Ciechanover, Avram Hershko, Irwin Rose
2003
Peter Agre, Roderick MacKinnon
2002
John B. Fenn, Koichi Tanaka, Kurt Wüthrich
2001
William S. Knowles, Ryoji Noyori, K. Barry Sharpless
2000
Alan J. Heeger, Alan G. MacDiarmid, Hideki Shirakawa
1999
Ahmed H. Zewail
1998
Walter Kohn, John A. Pople
1997
Paul D. Boyer, John E. Walker, Jens C. Skou
1996
Robert F. Curl Jr., Sir Harold W. Kroto, Richard E. Smalley
1995
Paul J. Crutzen, Mario J. Molina, F. Sherwood Rowland
1994
George A. Olah
1993
Kary B. Mullis, Michael Smith
1992
Rudolph A. Marcus
1991
Richard R. Ernst
1990
Elias James Corey
1989
Sidney Altman, Thomas R. Cech
1988
Johann Deisenhofer, Robert Huber, Hartmut Michel
1987
Donald J. Cram, Jean-Marie Lehn, Charles J. Pedersen
1986
Dudley R. Herschbach, Yuan T. Lee, John C. Polanyi
1985
Herbert A. Hauptman, Jerome Karle
1984
Robert Bruce Merrifield
1983
Henry Taube
1982
Aaron Klug
1981
Kenichi Fukui, Roald Hoffmann
1980
Paul Berg, Walter Gilbert, Frederick Sanger
1979
Herbert C. Brown, Georg Wittig
1978
Peter D. Mitchell
1977
Ilya Prigogine
1976
William N. Lipscomb
1975
John Warcup Cornforth, Vladimir Prelog
1974
Paul J. Flory
1973
Ernst Otto Fischer, Geoffrey Wilkinson
1972
Christian B. Anfinsen, Stanford Moore, William H. Stein
1971
Gerhard Herzberg
1970
Luis F. Leloir
1969
Derek H. R. Barton, Odd Hassel
1968
Lars Onsager
1967
Manfred Eigen, Ronald George Wreyford Norrish, George Porter
1966
Robert S. Mulliken
1965
Robert Burns Woodward
1964
Dorothy Crowfoot Hodgkin
1963
Karl Ziegler, Giulio Natta
1962
Max Ferdinand Perutz, John Cowdery Kendrew
1961
Melvin Calvin
1960
Willard Frank Libby
1959
Jaroslav Heyrovsky
1958
Frederick Sanger
1957
Lord (Alexander R.) Todd
1956
Sir Cyril Norman Hinshelwood, Nikolay Nikolaevich Semenov
1955
Vincent du Vigneaud
1954
Linus Carl Pauling
1953
Hermann Staudinger
1952
Archer John Porter Martin, Richard Laurence Millington Synge
1951
Edwin Mattison McMillan, Glenn Theodore Seaborg
1950
Otto Paul Hermann Diels, Kurt Alder
1949
William Francis Giauque
1948
Arne Wilhelm Kaurin Tiselius
1947
Sir Robert Robinson
1946
James Batcheller Sumner, John Howard Northrop, Wendell Meredith Stanley
1945
Artturi Ilmari Virtanen
1944
Otto Hahn
1943
George de Hevesy
1942
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was with 1/3 allocated to the Main Fund and with 2/3 to the Special Fund of this prize section.
1941
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was with 1/3 allocated to the Main Fund and with 2/3 to the Special Fund of this prize section.
1940
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was with 1/3 allocated to the Main Fund and with 2/3 to the Special Fund of this prize section.
1939
Adolf Friedrich Johann Butenandt, Leopold Ruzicka
1938
Richard Kuhn
1937
Walter Norman Haworth, Paul Karrer
1936
Petrus (Peter) Josephus Wilhelmus Debye
1935
Frédéric Joliot, Irène Joliot-Curie
1934
Harold Clayton Urey
1933
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was with 1/3 allocated to the Main Fund and with 2/3 to the Special Fund of this prize section.
1932
Irving Langmuir
1931
Carl Bosch, Friedrich Bergius
1930
Hans Fischer
1929
Arthur Harden, Hans Karl August Simon von Euler-Chelpin
1928
Adolf Otto Reinhold Windaus
1927
Heinrich Otto Wieland
1926
The (Theodor) Svedberg
1925
Richard Adolf Zsigmondy
1924
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was allocated to the Special Fund of this prize section.
1923
Fritz Pregl
1922
Francis William Aston
1921
Frederick Soddy
1920
Walther Hermann Nernst
1919
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was allocated to the Special Fund of this prize section.
1918
Fritz Haber
1917
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was allocated to the Special Fund of this prize section.
1916
No Nobel Prize was awarded this year. The prize money was allocated to the Special Fund of this prize section.
1915
Richard Martin Willstätter
1914
Theodore William Richards
1913
Alfred Werner
1912
Victor Grignard, Paul Sabatier
1911
Marie Curie, née Sklodowska
1910
Otto Wallach
1909
Wilhelm Ostwald
1908
Ernest Rutherford
1907
Eduard Buchner
1906
Henri Moissan
1905
Johann Friedrich Wilhelm Adolf von Baeyer
1904
Sir William Ramsay
1903
Svante August Arrhenius
1902
Hermann Emil Fischer
1901
Jacobus Henricus van 't Hoff

38
ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শৈশব-কৈশরই হচ্ছে শিক্ষার ভিত্তিকাল। স্বচ্ছ মেধা, সুস্থ বুদ্ধি, সরল চিন্তা ও স্পষ্ট মনোযোগের কারণে শিশুরা সহজেই সবকিছু আয়ত্ত করতে পারে। সঙ্গত কারণেই তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিও অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম।

এখানে মনে রাখা উচিত, শরীয়তের দৃষ্টিতে শিশুদের পরিচয়, তারা গায়রে মুকাল্লাফ তথা দায়ভার ও জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত। তারা শারীরিকভাবে যেমন দুর্বল তেমনি মানসিকভাবেও  কোমল। তাই তাদের সাথে কোমল ও নরম আচরণ করতে হবে। তাদেরকে শিক্ষাদান করতে হবে মায়ের স্নেহ-মমতা দিয়ে। এক্ষেত্রে ডাঁট-ধমক ও কঠোরতা  পরিহার করে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে হবে। যে নম্রতা ও কোমলতার আচরণ করতেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবার সাথে করতেন। আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. হতে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসের শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে হঠকারী ও কঠোরতাকারীরূপে প্রেরণ করেননি; বরং সহজ-কোমল আচরণকারী শিক্ষকরূপে প্রেরণ করেছেন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪৭৮

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম গাযালী রাহ. বলেন, এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, শিক্ষার্থীর ভুল-ত্রুটিগুলো যথাসম্ভব কোমলতা ও উদারতার সাথে সংশোধন করতে হবে এবং দয়া ও করুণার পন্থা অবলম্বন করতে হবে। ধমক ও ভৎর্সনা নয়।-আর রাসূলুল মুয়াল্লিম, পৃ. ১১

খতীবে বাগদাদীখ্যাত ইমাম আবু বকর আহমদ ইবনে আলী রাহ. শিক্ষকের আদাব সম্পর্কিত আলোচনায় বলেন, শিক্ষকের উচিত, ভুলকারীর ভুলগুলো কোমলভাবে ও নরম ভাষায় বলে দেওয়া, কঠোর আচরণ ও রুক্ষ ভাষার মাধ্যমে নয়।-আলফকীহ ওয়াল মুতাফাককিহ ২/২৮৪

তিনি তার এ বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণস্বরূপ অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি।

১. হযরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম রা. বর্ণনা করেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে নামাযরত ছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি (নামাযের মধ্যে) হাঁচি দিল। প্রতিউত্তরে আমি ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বললাম। লোকজন তখন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। আমি বলে উঠলাম, আপনাদের কী হয়েছে? আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? লোকজন তাদের উরুতে হাত চাপড়িয়ে আমাকে শান্ত ও চুপ হতে ইঙ্গিত করল। আমি চুপ হয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করলেন। আমার পিতামাতা তার প্রতি উৎসর্গিত হোন, তার মতো এত উত্তম ও সুন্দর শিক্ষাদানকারী কোনো শিক্ষক তার পূর্বেও কাউকে দেখিনি এবং তার পরেও দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে না প্রহার করলেন, না তিরস্কার করলেন, না ধমক দিলেন; তিনি বললেন, আমাদের এই নামায মানষের কথাবার্তার উপযোগী নয়। (অর্থাৎ নামাযে এ ধরনের কথা বলা যায় না।) বরং এ  তো হল তাসবীহ, তাকবীর ও তেলাওয়াতে কুরআন।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৫৩৭; আবু দাউদ, হাদীস : ৯৩০

২. হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা কোমল আচরণকারী, তিনি সর্বক্ষেত্রে কোমলতাকে ভালবাসেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬০২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১৬৫

মুসলিম শরীফের অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হে আয়েশা! আল্লাহ তাআলা নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতা পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার জন্য এমন কিছু দান করেন, যা কঠোরতার জন্য দান করেন না।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৯৩

৩. হযরত জারীর রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে প্রকৃত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৯০; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪৮০৭

৪. হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোমলতা যে কোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমন্ডিত করে। আর কোনো বিষয় থেকে কোমলতা দূর হয়ে গেলে তাকে কলুষিত করে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৯৪

ইমাম মুহিউদ্দীন নববী রাহ. শিক্ষকের আদাব সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনায় বলেন, শিক্ষকের উচিত, তার ছাত্রের সাথে নরম ব্যবহার করা, তার প্রতি সদয় হওয়া। তার কোনো ভুল হলে বা অসৌজন্যমূলক আচরণ প্রকাশ পেলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা। বিশেষত শিশু-কিশোরদের বেলায়।

তিনিও এ বিষয়ে অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। একটি হাদীস এই- হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই মানুষ তোমাদের অনুসারী হবে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন দ্বীন শেখার জন্য তোমাদের নিকট আগমন করবে। যখন তারা আগমন করবে, তোমরা তাদের হিতকাঙ্খী হবে এবং তাদেরকে সদুপদেশ দিবে।-জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৬৫০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৪৯; (আততিবয়ান পৃ. ৫৬-৫৭)

রাগান্বিত অবস্থায় শিশুদের প্রহার করা অন্যায় স্বভাব-প্রকৃতির কারণেই শিশুরা অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তাই শিশুদের শিক্ষাদান খুবই কঠিন। শান্ত-শিষ্টতার চেয়ে চপলতা ও চঞ্চলতাই তাদের মধ্যে প্রবল। ফলে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করাও বেশ কষ্টকর। কখনো কখনো পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে, শিক্ষকের মধ্যে ক্রোধের ভাব সৃষ্টি হয়ে যায় এবং প্রহার করার অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। এ সময় শাস্তি দিবে না; বরং  নীরব-নিশ্চুপ থেকে নিজের রাগ দূর করবে। তারপর করণীয় ঠিক করবে। এটাই ইসলামের শ্বাশ্বত শিক্ষা ও ধর্মীয় নির্দেশনা।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা শিক্ষাদান কর, সহজ ও কোমল আচরণ কর; কঠোর আচরণ করো না। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক। যখন তুমি রাগান্বিত হবে তখন চুপ থাক (এ কথা তিনবার বললেন)।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৫৫৬, ২১৩৬; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ২৫৮৮৮; মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১৫২, ১৫৩; মুসনাদে আবু দাউদ ত্বয়ালিসী, হাদীস : ২৬০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস : ২৪৫,

আল-আদাবুল মুফরাদের অন্য বর্ণনায় আছে, ‘তোমরা শিক্ষাদান কর এবং সহজ-কোমল আচরণ কর’ এ কথা তিনবার বলা হয়েছে।-হাদীস : ১৩২০

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস আমাকে আল্লাহর গযব থেকে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, ‘তুমি রাগ করো না।’-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬৬৩৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ২৯৬

রাসূলের জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণিত,  এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, ‘তুমি রাগ করো না।’ লোকটি বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা বলার পর আমি চিন্তা করে দেখলাম, ক্রোধই হল সকল অনিষ্টর মূল।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩১৭১; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস : ২০২৮৬;

শিশুদেরকে বা অন্য  কাউকে প্রহার করা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে প্রহার করবে কিয়ামতের দিন তার থেকে এর প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে।-আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস : ১৮৬, মুসনাদে বাযযার, হাদীস-৩৪৫৪, তাবারানী, হাদীস-১৪৬৮

এ সম্পর্কে হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. বলেন, কখনো রাগান্বিত অবস্থায় শিশুকে প্রহার করবে না। পিতা ও উস্তাদ উভয়ের জন্যই এ কথা। এ সময় চুপ থাকবে। যখন ক্রোধ দূর হয়ে যাবে তখন ভেবেচিন্তে শাস্তি দিবে। এতে শাস্তির মাত্রা ঠিক থাকবে।  সীমালঙ্ঘন হবে না। কিন্তু যদি রাগান্বিত অবস্থায় মারতে আরম্ভ কর, তাহলে এক থাপ্পড়ের জায়গায় দশ থাপ্পড় দিয়ে ফেলবে। এর কারণে একে তো গুনাহ হল। কেননা, প্রয়োজনের অধিক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত এতে শিশুর ক্ষতি হবে। কেননা, সকল বিষয়ই মাত্রা অতিক্রম করলে ক্ষতি হয়ে যায়। তৃতীয়ত এর জন্য পরে অনুতাপ করতে হবে। তাই তিনি বলেছেন, ক্রুব্ধ অবস্থায় শাস্তি দিবে না।

মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. বলেছেন, শিশুদেরকে প্রহার করা খুবই ভয়াবহ। অন্যান্য গুনাহ তো তওবার মাধ্যমে মাফ হতে পারে। কিন্তু শিশুদের উপর জুলুম করা হলে এর ক্ষমা পাওয়া খুবই জটিল। কেননা এটা হচ্ছে বান্দার হক। আর বান্দার হক শুধু তওবার দ্বারা মাফ হয় না। যে পর্যন্ত না যার হক নষ্ট করা হয়েছে সে মাফ করে। এদিকে যার উপর জুলুম করা হয়েছে সে হচ্ছে নাবালেগ। নাবালেগের ক্ষমা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য এ অপরাধের মাফ পাওয়া খুবই জটিল। আর তাই শিশুদেরকে প্রহার করা এবং তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার করার বিষয়ে সাবধান হওয়া উচিত।-ইসলাহী মাজালিস, মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী।

আল্লামা ইবনে খালদূন ছাত্রদের প্রহার ও কঠোরতাকে ক্ষতিকর আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, খুব স্মরণ রাখবেন। শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে প্রহার করা এবং ডাঁট-ধমক দেওয়া শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটা উস্তাদের অযোগ্যতা ও ভুল শিক্ষা পদ্ধতির নমুনা। প্রহার করার ফলে শিশুদের মনে শিক্ষকের কঠোরতার প্রভাব বিরাজ করে। তাদের মন-মানসিকতায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং তারা লেখাপড়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কঠোরতা তাদেরকে অধঃপতনমুখী করে তোলে। অনেক সময় তাদের মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, প্রহার ও কঠোরতার কারণে শিশুদের মাঝে মিথ্যা বলা ও দুষ্কর্মের মানসিকতা সৃষ্টি হয়। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ ও উচ্চ চেতনা দূর হয়ে যায়। শিক্ষকের মারধর থেকে বাঁচার জন্য তারা নানা অপকৌশল, মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। পরবর্তীতে এই সকল ত্রুটি তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায়। উত্তম চরিত্র ও সুন্দর মানসিকতার পরিবর্তে অসৎ চরিত্র ও অনৈতিকতার ভিত রচিত হয়।

এসব ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা ও নীতি নৈতিকতার বিষয়টি বাদ দিলেও শিশুদের প্রহারের অশুভ প্রতিক্রিয়া হয় বহুরূপী ও বহুমুখী। প্রথমত যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সুনামের সাথে তার শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে আসছে মারধরের দু-একটি ঘটনাই তার সুনাম ক্ষুণ্ণ করার জন্য যথেষ্ট।

দ্বিতীয়ত দ্বীনী শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি বিরূপ মানসিকতার সৃষ্টি হয়। অনেক দ্বীনদার মুসলিম পরিবারেও এ অভিযোগ শোনা যায় যে, বাচ্চারা মাদরাসায় যেতে চায় না শিক্ষকের মারধর ও কঠোরতার কারণে। তৃতীয়ত, বাইরে মাদরাসার শিক্ষকদের ব্যাপারে দুর্নাম রটে যায় যে, তারা সবাই ছাত্রদের প্রহার করে। দুয়েকজনের অজ্ঞতামূলক আচরণের কারণে গোটা শিক্ষক সমাজকে দুর্নাম বহন করতে হয়।

একদিকে জাগতিক শিক্ষার জন্য দুনিয়াবী লোকেরা শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন নিয়ে শিশু-কিশোরদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে এবং ইসলামের দেওয়া উন্নত চরিত্র ও মহৎ আচরণ, কোমল ও বিনম্র ভাষায় কথা বলে তাদেরকে জাগতিক শিক্ষার সুফল দেখাচ্ছে, অন্যদিকে দ্বীনী শিক্ষার সঙ্গে জড়িত দু-একজন ব্যক্তি ইসলামী দিক-নির্দেশনা ও শিক্ষার সুন্দর বৈশিষ্ট্য, উলামায়ে কেরামের মহৎ গুণাবলী পরিত্যাগ করে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা অত্যন্ত নাজুক বিষয়। এ জন্য উপযুক্ত শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু করা এবং তাতে অংশ গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের জন্য এ বিষয়ের প্রাচীন ও আধুনিক কিছু বইপত্র অধ্যয়ন করাও জরুরী। ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে আগামীতেও কিছু লেখার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

39
বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস বৈশাখ এবং ইংরেজী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস জানুয়ারি। আমাদের দেশে পয়লা বৈশাখে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ আর থার্টি ফার্স্ট নাইটে উদযাপিত হয় ইংরেজি নববর্ষ। আর সারা বছর কাটে এক মিশ্র ও শংকর অবস্থায়। আরবী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। কিন্তু পয়লা মহররম কোথাও নববর্ষ উদযাপিত হয় না। আসলে নববর্ষ উদযাপন আমাদের সংস্কৃতি নয়। এটা বাইরে থেকে মুসলিমজাহানে প্রবেশ করেছে। একজন ঈমানদারের চিন্তা হচ্ছে-‘নওরোযোনা কুল্লা ইয়াওম’। আমাদের ‘নওরোয’ তো প্রতিদিন। প্রতিদিনের ভোর আমাদেরকে দান করে রাববুল আলামীনের শোকর গোযারির প্রেরণা। একটি নতুন দিবসের সজীব উদ্দীপনা। জীবনের প্রতিটি ভোর আমাদেরকে আরো দান করে জীবন-সন্ধ্যার প্রস্ত্ততির চেতনা। সুতরাং বর্ষপঞ্জির একটি বা দুটি দিন নয়, জীবনের প্রতিটি দিন মুমিনের উৎসবের দিন, কর্ম-উৎসব-দিবস। এই সাধারণ কথাটি যে কোনো দিবস পালনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য । তবে পয়লা বৈশাখ, এখন যেভাবে পালন করা হয়, তা শুধু দিবস-পালন বা নববর্ষ উদযাপন নয়, অনেক ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার ‘মাজূনে মুরাক্কাব’। কিছুটা তরল ভাষায়, ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। এ দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো পয়লা বৈশাখে যে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং এলিট শ্রেণীর শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীরা যে সকল বাণী ও আলোচনা পেশ করেন তাতে চোখ বুলালে যে কেউ আমার সাথে একমত হবেন।

চিন্তাগত ভ্রষ্টতাগুলোর মধ্যে দু’টো বিষয় খুব মারত্মক সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বা জাহেলী আসবিয়াত।

পয়লা বৈশাখের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলা হয়, এটি বাঙালী জাতির সর্বজনীন উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রাণের উৎসব। কোনো কোনো সময় আরো স্পষ্ট করে বলা হয়, মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব ঈদ, হিন্দুর ধর্মীয় উৎসব পুজা, আর হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালির  উৎসব পয়লা বৈশাখ।

এ জাতীয় বক্তব্যে সেক্যুলারিজম ও ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা বলুন জাতিসত্তার পরিচয়ে ধর্মকে বর্জন করার চিন্তাই কার্যকর। এ যে একটি কুফরী চিন্তা তা তো বলাইবাহুল্য। মুসলমানের ধর্ম ইসলাম, মুসলমানের আদর্শ ইসলাম এবং মুসলমানের প্রকৃত পরিচয় ইসলাম। বংশ, গোত্র, ভাষা ও ভূখন্ড-এগুলোও আমাদের পরিচয়, তবে আদর্শিক পরিচয় নয়, প্রাকৃতিক পরিচয়। আমাদের আদর্শিক পরিচয় ইসলাম। সুতরাং ইসলামই আমাদের চিন্তা ও কর্মের নিয়ন্ত্রক।

তো পয়লা বৈশাখের উৎসব-অনুষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্ব দাখিল করে এর একটি দর্শনগত ভিত্তি দাঁড় করানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এটা কি বাঙালী মুসলিম সমাজের ইসলাম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ-প্রচেষ্টা?

পয়লা বৈশাখের তাৎপর্য বর্ণনা করে আরো বলা হয়, এ সকল জাতি বিনাশী চিন্তাভাবনাকে কুরআনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। মুসলমানদের বলা হয়েছে-

يا ايها الذين آمنوا ادخلوا فى السلم كافة. ولا تتبعوا خطوات الشيطان، انه لكم عدوم مبين.

হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হও। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।-সূরা বাকারা (২) : ২০৮

সুতরাং ধর্মপরিচয়ে মুসলিম আর পর্ব-উৎসবে অন্যকিছু এমনটির সুযোগ ইসলামে নেই।

পয়লা বৈশাখের তাৎপর্য বর্ণনা করে আরো বলা হয়, ‘এ হচ্ছে শেকড় সন্ধান, শেকড়ের দিকে ফিরে যাওয়া।’ কিন্তু কী অর্থ শেকড়ের? কোন অতীতকে নির্দেশ করে এই ‘শেকড়’ শব্দটি? এই প্রশ্নের জবাব পেতে খুব বেশি দূর যেতে হবে না। পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা গুলোতে যেসব মূর্তি, মুখোশ বহন করা হয় তার সূত্র সন্ধান করলে শেকড় সন্ধানের তাৎপর্যও বের হয়ে আসবে।

যাদের অন্তরে ঈমানের কণিকা আছে তারা স্মরণ করুন আল্লাহর রাসূলের বাণী-

ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الإيمان، من كان الله ورسوله أحب إليه مما سواهما، ومن أحب عبدا لا يحبه إلا لله، ومن يكره أن يعود في الكفر بعد أن أنقذه الله منه كما يكره أن يلقى في النار.

তিনটি গুণ যার আছে সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে : যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবার চেয়ে প্রিয়, যে কোনো বান্দাকে ভালবাসলে আল্লাহর জন্যই ভালবাসে এবং আল্লাহর রহমতে কুফর থেকে মুক্তিলাভের পর পুনরায় সে দিকে প্রত্যাবর্তন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো ভয়াবহ মনে করে।-সহীহ বুখারী, মুসলিম

যে মুসলিমের হৃদয় ও মস্তিস্ক এই শ্বাশত সত্যের আলোয় আলোকিত তার সামনে কোনো মিথ্যা, কোনো কপটতা মুখ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। ‘সর্বজনীন উৎসব’ ‘বাঙালী জাতির নিজস্বতা’ ‘সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান’ ইত্যাদি আবেগ উদ্দীপক শব্দসম্ভারের প্রকৃত পরিচয় তার কাছে গোপন থাকবে না। তিনি জানবেন, কুরআনের ভাষায় এগুলোকে বলে-‘তাযঈনুস শয়তান’ বা শয়তানের মায়াজাল বিস্তার।

এই মিথ্যার মরিচিকা থেকে রক্ষার জন্যই যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وعادا وثمود وقد تبين لكم من مسكنهم وزين لهم الشيطان اعمالهم فصدهم عن السبيل وكانوا مستبصرين.

এবং আদ ও সামুদকে (ধ্বংস করেছিলাম)। তাদের বাড়িঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান তাদেরকে সুপথ থেকে নিবৃত্ত করেছিল। অথচ তারা ছিল বিচক্ষণ।-সূরা আনকাবূত (২৯) : ৩৮

শেষ বাক্যটি-‘অথচ তারা ছিল বিচক্ষণ’ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। বর্তমান সময়ের জ্ঞানগর্বী সম্প্রদায়ের জন্য এতে আছে সুস্পষ্ট বার্তা।

পয়লা বৈশাখের উদযাপন-পদ্ধতিতে আরো যেসব অনাচার রয়েছে তার মধ্যে মারাত্মক কয়েকটি হচ্ছে, মুসলিমসমাজে শিরক ও পৌত্তলিকতার বলদর্পী মহড়া, বেশ-ভূষা এবং আচরণেবিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ এবং গান-বাজনা; বেপর্দা-বেহায়াপনা;অপচয়-অপব্যয় ইত্যাদি হারাম ও মুনকার কাজ। এরপরও কি ঈমানদার মুসলিমের কর্তব্য হবে না, এই উৎসব থেকে নিবৃত্ত হওয়া?

40
Faculty Forum / The Importance of Education in Islam
« on: April 05, 2012, 10:37:37 AM »


To seek knowledge is a sacred duty, it is obligatory on every Muslim, male and female. The first word revealed of the Qur?an was "Iqra" READ! Seek knowledge! Educate yourselves! Be educated.

Surah Al-Zumr, ayah 9 reveals: "Are those equal, those who know and those who do not know?" Surah Al-Baqarah, ayah 269 reveals: "Allah grants wisdom to whom He pleases and to whom wisdom is granted indeed he receives an overflowing benefit."

Centuries old monarchy, colonialism and the oppressive rule of their own people have brought about moral and spiritual degeneration of Muslims throughout the world. To retrieve them from this degeneration, it?s about time that the Muslim Ummah restructures its educational priorities along Islamic lines, fulfilling the existing needs as well. By virtue of such an educational program, the future generations will become the torch-bearers of Islamic values and play an effective role in the present world. The challenges of modern times call for rebuilding the structure of our educational program on such a foundation as to fulfil our spiritual as well as temporary obligations. Today we need an education system which can produce, what the late Sayyid Abul A?la Mawdudi said, "Muslim philosopher, Muslim scientist, Muslim economist, Muslim jurist, Muslim statesman, in brief, Muslim experts in all fields of knowledge who would reconstruct the social order in accordance with the tenets of Islam."

The Muslims today are the most humiliated community in the world. And should they persist in following the same educational program as given by their colonial masters, they will not be able to recover themselves from moral and spiritual decadence.

Ibn Masu'd (Allah be pleased with him) reported that the Messenger of Allah (S) said: The position of only two persons is enviable; the person whom Allah bestowed wealth empowering him to spend it in the way of righteousness, and the person whom Allah gave wisdom with which he adjudges and which he teaches to others.

According to Tirmidhi and Ibn Majah, Ibn Abbas (Allah be pleased with him) narrated that the Messenger of Allah (S) said: A single scholar of religion is more formidable against shaytaan than a thousand devout persons.

Islam is our greatest gift. We have to be thankful for this gift. We have to render to Allah His due. Allah has given us so much by making us a part of the Ummah of the Prophet Muhammad (S) so we must totally commit ourselves as followers of the Prophet (S). We must become true Muslims.

Now how can we become Muslims in the true sense of the word? First let?s define what a Muslim is. A Muslim is not a Muslim simply because he?s born one. A Muslim is a Muslim because he is a follower of Islam, a submitter to the Will of Allah. We?re Muslim if we consciously and deliberately accept what has been taught by the Prophet Muhammad (S) and act accordingly. Otherwise we?re not true Muslims.

The first and most crucial obligation on us is to acquire knowledge and secondly to practice and preach this knowledge. No man becomes truly a Muslim without knowing the meaning of Islam, because he becomes a Muslim not through birth but through knowledge. Unless we come to know the basic and necessary teachings of the Prophet Muhammad (S) how can we believe in him, have faith in him, act according to what he taught? It is impossible for us to be a Muslim, and at the same time live in a state of ignorance.

It is essential to understand that the greatest gift of Allah ? for which we are so over whelmed with gratitude ? depends primarily on knowledge. Without knowledge one can?t truly receive Allah?s gift of Islam. If our knowledge is little, then we will constantly run the risk of losing that magnificent gift, which we have received unless we remain vigilant in our fight against ignorance.

A person without knowledge is like someone walking along a track in complete darkness. Most likely his steps will wander aside and he easily can be deceived by shaytaan. This shows that our greatest danger lies in our ignorance of Islamic teachings and in our unawareness of what the Qur?an teaches and what guidance has been given by the Prophet (S). But if we are blessed with the light of knowledge we will be able to see plainly the clear path of Islam at every step of our lives. We shall also be able to identify and avoid the dangerous paths of Kufr, Shirk and immorality, which may cross it. And, whenever a false guide meets us on the way, a few words with him will quickly establish that he is not a guide who should be followed.

On this knowledge depends whether our children and we are true Muslims and remain true Muslims. It is therefore not a trivial to be neglected. We do not neglect doing whatever is essential to improve our trades and professions. Because we know that if we do neglect, we will starve to death and so lose the precious gift of life. Why then should we be negligent in acquiring that knowledge on which depends whether we become Muslims and remain Muslims? Does such negligence not entail the danger of losing an even more precious gift ? our Iman? Is not Iman more precious than life itself? Most of our time and labor is spent on things, which sustain our physical existence in this life. Why can we not spend even a tenth part of our time and energy on things, which are necessary to protect our Iman, which only can sustain us in the present life and in the life to come? It is not necessary to study extensively to become a Muslim. We should at least spend about one hour out of twenty-four hours of the day and night in acquiring the knowledge of this Deen, the way of life, the Islam.

Every one of us, young or old, man or woman, should at least acquire sufficient knowledge to enable ourselves to understand the essence of the teachings of the Qur?an and the purpose for which it has been sent down. We should also be able to understand clearly the mission, which our beloved Prophet (S) came into this world to fulfil. We should also recognize the corrupt order and system, which he came to destroy. We should acquaint ourselves, too, with the way of life which Allah has ordained for us.

No great amount of time is required to acquire this simple knowledge. If we truly value Iman, it cannot be too difficult to find one hour every day to devote for our Iman.

Knowledge is identified in Islam as worship. The acquiring of knowledge is worship, reading the Qur?an and pondering upon it is worship, travelling to gain knowledge is worship. The practice of knowledge is connected with ethics and morality ? with promoting virtue and combating vice, enjoining right and forbidding wrong. This is called in the Qur?an: amr bil-l ma?ruuf wa nah-y ?ani-l munkar.

Not only should we seek knowledge, but when we learn it, it becomes obligatory on us to practice it. Though we must remember that correct knowledge should come before correct action. Knowledge without action is useless because a learned person without action will be the worst of creatures on the Day of Resurrection. Also, action should not be based on blind imitation for this is not the quality of a thinking, sensible human being.

Knowledge is pursued and practiced with modesty and humility and leads to beauty and dignity, freedom and justice.

The main purpose of acquiring knowledge is to bring us closer to God. It is not simply for the gratification of the mind or the senses. It is not knowledge for the sake of knowledge or science for the value of sake. Knowledge accordingly must be linked with values and goals.

One of the purposes of acquiring knowledge is to gain the good of this world, not to destroy it through wastage, arrogance and in the reckless pursuit of higher standards of material comfort.

Another purpose of knowledge is to spread freedom and dignity, truth and justice. It is not to gain power and dominance for its own sake.

Obviously, what we may call the reservoir of knowledge is deep and profound. It is a vast and open field that is not limited.

It is impossible for anyone to gain anything more than a fraction of what there is to know in the short span of one?s life. We must therefore decide what is most important for us to know and how to go about acquiring this knowledge.

The following ahadith shows how important and how rewarding knowledge is.

"He who acquires knowledge acquires a vast portion." AND "If anyone going on his way in search of knowledge, God will, thereby make easy for him the way to Paradise."

We, the children, are the future. The future lies in our hands, but only through knowledge because whoever neglects learning in youth, loses the past and is dead for the future.

May Allah (SWT) give us strength to behave and act just as He likes us to do and be pleased with us, and that should be the purpose of our lives. Rabbi zidnee ilma (O Lord, increase us in knowledge). Aameen.

41
প্রশ্নোত্তর পর্ব

প্রশ্ন : দালাল কাজ করলে পারিশ্রমিক পাবে, কাজ না করলে পাবে না। এর উদাহরণ তো ফিকহের কিতাবে আছে। সুতরাং সে অনুযায়ী ক্রেতা-পরিবেশক কোম্পানির নির্ধারিত টার্গেট পূরণ করলে কমিশন পাবে, না হয় পাবে না। এতে তখন বিনিময়হীন শ্রমের ত্রুটি
থাকবে না।

উত্তর : কাজ করলে পারিশ্রমিক পাবে আর কাজ না করলে পাবে না-এটি أجير مشترك -এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর এমএলএম-এ পরিবেশক তথা দালালকে আলআজীরুল মুশতারাক বলা যায়। (দেখুন : ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৫/৯৭) কিন্তু আজীরে মুশতারাক অল্প কাজ করলেও সে অনুপাতে তাকে উজরত দিতে হবে।

(এ প্রসঙ্গে ফিকহী হাওয়ালা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এমএলএম কোম্পানিতে যেহেতু অল্প কাজ করলে, যদি টার্গেট পূর্ণ না হয়, কমিশন দেওয়া হয় না তাই এটি বিনিময়হীন কাজের মধ্যে পড়বে। যেমন অনেক কোম্পানিরই এমন শর্ত রয়েছে যে, ডান-বাম  উভয় দিকে দুইজন করে নেট চলতে হবে। যদি কোনো এক দিকে চলে অন্য দিকে না চলে অথবা একজন জোগাড় হয় দুইজন না হয় তাহলে কমিশন দেওয়া হয় না।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, তারা কাজ ছাড়া বিনিময় নেয়। অথচ তাদের সকলের কাজ করার কথা ফরমে লেখা আছে। অর্থাৎ ডাউন লেভেলের লোকদের জন্যও আপ লেভেল ওয়ালাকে অনেক শ্রম দিতে হয়।

উত্তর : এমএলএম বিষয়ে প্রথম ফতোয়াটি প্রকাশের পর তারা ফরমে ঐ কথাগুলো লিখেছে। ফরমে লিখার আগেই বলত, এখানে কেউ কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। নেট চালানোর জন্য কষ্ট করতে হয়, দৌড়াতে হয়। এর জবাব খুবই স্পষ্ট। একটা কথা হল, কাজ করা, কাজের জন্য দৌড়ঝাপ দেওয়া, কিন্তু তা যদি হয় অন্যের কাজ, সেই কাজটি যদি লেখা হয় অন্যের নামে তখন তো আর সেটিকে নিজ কাজ বলা চলবে না। অর্থাৎ এখানে দেখতে হবে কাজের নিসবত কার দিকে হয়েছে। এখানে প্রথম ব্যক্তি (উদাহরণস্বরূপ ‘ক’) যদি তৃতীয় লেভেলে কাউকে ভিড়ানোর জন্য কাজ করে তবে সেটি পরবর্তী
স্তরের লোকের কাজ। ‘ক’ কেবল তাকে তার কাজে সহযোগিতা করছে। কোম্পানি বলেন, শরীয়ত বলেন, আইন বলেন, কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি ক-এর কাজ নয়; বরং দ্বিতীয় স্তরের লোকের কাজ। যদি এটি ‘ক’-এর কাজ হত তাহলে ঐ পরিমাণই কমিশন পেত, যে পরিমাণ পেয়েছিল প্রথম দুজনকে বানিয়ে। যদি এ রকম হত যে, ‘ঙ’ যা পাচ্ছে এর একটি অংশ ‘ক’কে দিয়ে দিচ্ছে তাহলে দাবিটার কিছু যুক্তি থাকত। কিন্তু সে দিবে না; বরং উল্টো বলবে, আরে মিয়া! আর কত খাবেন। তো সে কাজ করেছে অন্য ব্যক্তির জন্য। আর বিনিময় দিচ্ছে কোম্পানি। কাজের সম্পর্ক একজনের সাথে আর বিনিময়ের সম্পর্ক আরেকজনের সাথে। দেখুন এ দুটিতে কি মিল আছে!!

 

খোদ কোম্পানির সফটওয়ারেই ঐ ব্যক্তিকে নিম্নস্তরের ব্যক্তি কর্তৃক নিয়ে আসা লোক হিসাবে ধরা হয় এবং রেফারেন্স হিসেবে তার নম্বরই ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এটি যেহেতু প্রথম ব্যক্তির কাজ নয় তাই ঐ কাজের জন্য প্রাপ্ত কমিশন উজরত বেলা আমল তথা কাজহীন বিনিময়ের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন : সে তো কোম্পানির আজীর তথা পরিবেশক।

উত্তর : সে কোম্পানির পরিবেশক তা ঠিক। কিন্তু সে চাকরিজীবি নয়। কোম্পানি তাকে এমন কোনো পদে নিয়োগ দেয়নি যে, সময় দিলেই সে বেতন পেতে থাকবে। বরং কোম্পানি বলছে, আপনি চারজন লোক কোম্পানিতে ভেড়ালে তারা এবং তাদের অধস্তনরা আরো যত লোক নিয়ে আসবে সকলের জন্য আপনাকে কমিশন দেওয়া হবে। এখানেই শরীয়তের আপত্তি।

প্রশ্ন : বেফাকের ফতোয়াতে صفقة في صفقتين -এর কথা আছে। এটি কিভাবে হয়? তারা বলে, পণ্যের সাথে পরিবেশক সুবিধা ফ্রি দেওয়া হচ্ছে। যেমন হারপিকের সাথে মগ ফ্রি দেওয়া হয়। এখানেও চুক্তি একটিই হয়।

উত্তর : হারপিকের সাথে মগ, দুটো মিলে একটি পণ্য হয়েছে। অর্থাৎ একই মূল্যে আপনি ২টি পণ্য পাচ্ছেন। আর এখানে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির সাথে ইজারা চুক্তিকে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। ২টা পণ্যকে এক করা আর ২টা চুক্তিকে এক করা এক বিষয় নয়। ফিকহে ইসলামীর সাধারণ তালিবুল ইলমও এ ফরক বুঝে থাকে।

প্রশ্ন : ‘আলজুআলা’ চুক্তি কোনো কোনো মাযহাবে জায়েয আছে। অতএব বিষয়টিকে যদি আলজুআলা চুক্তি ধরা হয় তাহলে তো উপরোক্ত ত্রুটি থাকবে না। এভাবে চিন্তা করা সহীহ হবে কি?

উত্তর : আলজুআলার জন্যও কাজ শর্ত। কিন্তু  এখানে তা নেই। কেননা পরবর্তী স্তর থেকে যে কমিশন আসে সেখানে প্রথম ব্যক্তির নিজস্ব কোনো কাজ নেই।

جاء في الموسوعة الفقهية الكويتية 15/210: أركان الجعالة أربعة : الأول : الصيغة، الثاني : المتعاقدان، الثالث : العمل، الرابع : الجعل.

وراجع أيضا : الجعالة وأحكامها في الشريعة الإسلامية والقانون، للشيخ الدكتور راشد الجماني.

প্রশ্ন : বাংলাদেশের ৩ ভাগের ২ ভাগ মানুষ যদি এমএলএমে শরিক হয় তাহলে তা তাআমুলের পর্যায়ে পড়বে কি না? এবং সে ভিত্তিতে তা জায়েয হবে কি না?

উত্তর : না। ১৬ কোটি মানুষও যদি এতে শরিক হয (যা অসম্ভব) তবুও তা জায়েয হবে না। তাআমুল ঐ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে বিষয়টি সরাসরি শরীয়তের নুসূস ও উসূলের পরিপন্থী নয়। তাআমুলের উপর বর্তমানে পৃথক কিতাবাদিও এসেছে। পড়লেই বুঝতে পারবেন।

প্রশ্ন : উপর স্তর যেমন-ক এবং নিম্ন স্তর যেমন-ঙ উভয়ে পরস্পরে যদি কমিশন পাওয়ার ব্যাপারে রাজি থাকে তাহলে কমিশন গ্রহণ বৈধ হবে কি না? আমরা তো অনেক কিছুই বিনা পরিশ্রমে পেয়ে থাকি।

উত্তর : চুক্তি হয়েছে ক-এর সাথে কোম্পানির। আর কমিশনও দিচ্ছে কোম্পানি। ক-এর সাথে ঙ-এর আকদ হয়নি। সুতরাং তারা উভয়ে রাজি হওয়া না হওয়ার প্রশ্নটি অবান্তর। এছাড়া রাজি হলেই কি সব বৈধ হয়ে যায়। দুনিয়ার কত নিষিদ্ধ কারবার যেমন-সুদ, জুয়া ইত্যাদি সবই তো পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : এমএলএমের মধ্যে Buy back কিভাবে হয়? একটু বুঝিয়ে বলবেন।

উত্তর : Buy back হল পণ্যটা বিক্রেতা কর্তৃক কম মূল্যে পুনরায় খরিদ করে নেওয়া। এটি আগে ছিল। এখন আছে কি না জানি না। দুই কারণে এমনটি করা হত : এক. ৩ হাজার টাকার পণ্য ৭ হাজার দিয়ে মানুষ কিনতে চাইত না। তাই কোম্পানি বাধ্য হয়ে বাই ব্যাকের প্রচলন শুরু করে। দুই. আরেকটি কারণ হল, হুজুগের তালে এত লোক টংচেং জিঞ্জিয়ানে যোগ দিতে লাগল যে, এত বেশি পণ্য দিয়ে কোম্পানি কুলিয়ে উঠতে পারত না। তাই এ পদ্ধতি জারি করেছিল তারা।

প্রশ্ন : ট্রি প্ল্যান্টেশনের হুকুম জানতে চাই।

উত্তর : পূর্বে বলেছি, এমএলএম সিস্টেমটা যেমনিভাবে নাজায়েয, তেমনিভাবে এ সিস্টেমভিত্তিক যেসব কোম্পানি রয়েছে সেগুলোও নাজায়েয। তবে অধিকাংশ এমএলএম কোম্পানিতে নেট পদ্ধতির ত্রুটি ছাড়াও অন্যান্য উপাদানও থাকে। যেমন এমএলএমভিত্তিক একটি কোম্পানি ইউনি পে টু ফর ইউ তাদের কারবারটা ছিল লোকদের থেকে টাকা নিয়ে নিত প্রথম ধাপেই ২২% লাভের চুক্তিতে। ১ লক্ষ টাকায় ২২ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলত। তো লাভ নির্ধারিত হওয়ার কারণে কারবারটি নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যায়। অন্য কিছু দেখার দরকার হয় না। অতি মুনাফালোভী সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর কিছুদিন আগে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ঐ কোম্পানিটি।

এ ধরনেরই আরেকটি কোম্পানি হল, ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেড। সদস্যদের কাছে গাছ বিক্রি করে চলেছে তারা। কত কোটি গাছ (!) ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে তার হিসাব শুধু তারাই বলতে পারবে। আমাকে কেউ যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে তখন সহজে বোঝানোর জন্য বলি, বাংলাদেশের মোট আয়তন কতটুকু? বনায়নের জন্য কতটুকু জায়গা খালি আছে? ঐ এমএলএম কোম্পানিকে সরকার কতটুকু জায়গা লীজ দিয়েছে? কৃষি বিজ্ঞানে কত হাত পর পর কয়টা গাছ লাগানোর কথা আছে? সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ কতটি গাছ লাগানো যাবে?

তাদের অফিসে হাজার হাজার লোক ভীড় করে। প্রত্যেককে ৩০টি করে গাছ দিলে কয় লক্ষ গাছের প্রয়োজন? এগুলো তারা কোথায় লাগিয়েছে? এবং আকদ যখন হয় তখন বাস্তবে গাছ ছিল কি না? এতটুকু বললে সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলে এবং বলে, তার মানে এ ধরনের কাজ থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়। আর আলেমদেরকে বলতে হলে, ফিকহী ভাষায় বলতে হয়। যেমন তাদের বইয়ে আছে, কোনো গাছ অগ্নিকান্ড অথবা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সংশ্লিষ্ট প্যাকেজ অনুযায়ী অর্থাৎ গোল্ডেন প্যাকেজের ক্ষেত্রে প্রতি সনদপত্রের বিপরীতে ছয় বছর পর মোট ২০,০০০/- টাকা এবং ক্ল্যাসিক প্যাকেজের ক্ষেত্রে প্রতি সনদপত্রের বিপরীতে ১২ বছর পর মোট ৫০,০০০/- টাকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনোরূপ প্রভাব ফেলবে না। (পরিচিতি, শর্ত ও নিয়মাবলি, ৯ নং অনুচ্ছেদ)

এবার বুঝুন, গাছ বিক্রি করা হল, না কি বেশি টাকা দেওয়ার শর্তে কম টাকা নেওয়া হল। এখন এটি নাজায়েয হওয়ার জন্য অন্য কিছুর দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। এমএলএম সিস্টেম ছাড়াই এটি নাজায়েয।

এছাড়া তাতে নাজায়েয ইন্সুরেন্সও যুক্ত রয়েছে।

প্রশ্ন : বেফাকের ফতোয়া আসার পর তারা আপনাদের নিকট এমএলএম-এর বিকল্প চেয়েছিল কি না?

উত্তর : ফতোয়া আসার পর তারা আমাদের নিকট এসেছিল। বলেছিল, আপনারা ফতোয়া দিয়েছেন। এটি শরীয়তের বিষয়। আমাদের কিছু বলার নেই। এবার আপনি আমাদের পরামর্শ দিন। আমার শরীয়া অনুযায়ী চলব। আপনারা যা যা শর্ত দিবেন সব মানব। আমি বললাম, আপনারা মানতে পারবেন না। তারা বলল, না, মানব। প্রয়োজনে লিখে দিতে পারি।

আমি জানতাম, তারা মানবে না। তাদের না মানার কারণ স্পষ্ট। এমএলএমের আসল রহস্য নেট সিস্টেম। এর মাধ্যমেই মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। যা হোক, আমি বললাম, যদি শরয়ী তরীকায় আসতে চান তাহলে এই নেট সিস্টেম তুলে দিতে হবে। শুধু এক স্তর থাকবে। এবং দুইটা চুক্তি ভিন্ন ভিন্ন হবে। সাধারণ ব্যবসার মতো ক্রেতা ভিন্ন থাকবে। পরিবেশক ভিন্ন থাকবে। বড় বড় কোম্পানিকে দেখবেন, তারা মাঝেমধ্যে পরিবেশক সম্মেলন করে। যারা তাদের পণ্য বা সেবা বেশি পরিবেশন করেছে তাদেরকে কোম্পানি নিজের টাকা থেকে বিভিন্ন পুরস্কার প্রদান করে। বোনাস, ইনসেনটিভ নামে অনেক কিছু দেয়।

আমি জানি আপনারা এ পথে আসবেন না। কারণ আপনাদের মূল আকর্ষণ নেট সিস্টেম। সেটা বাদ দেওয়ার চিন্তা আপনারা করবেন না।

প্রশ্ন : এমএলএম পদ্ধতির কারবার ও অন্যান্য কারবারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

উত্তর : দুনিয়ার অন্যান্য কারবারে মূল উদ্দেশ্য হয় সেবা/পণ্য বিক্রি করে লাভবান হওয়া এবং ক্রেতার ক্ষেত্রে পণ্য/সেবা দ্বারা উপকৃত হওয়া। কিন্তু এখানে পণ্য কারোরই মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য হল পণ্যকে ছুঁতা বানিয়ে মানুষকে নেট সিস্টেমের ভিতরে নিয়ে এসে তাদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। আর ক্রেতাগণ এ পদ্ধতিতে বাধ্য হয়েই পণ্য নিয়ে থাকে। কারণ তারা পণ্য খরিদের জন্য এসব কোম্পানিতে যায় না; বরং কমিশন ও বোনাস লাভের উদ্দেশ্যেই যায়।

আপনি গুগলে সার্চ করলে দেখতে পাবেন তাতে অনেক এমএলএম কোম্পানির এ্যাড আছে। একটা এ্যাডের শিরোনাম এ রকম-এক মাসে টাকা দ্বিগুণ করুন। বুঝে দেখুন, কোন কৌশলে টাকা কামাতে চায়। যেখানে ব্যাংকে টাকা দ্বিগুণ করতে লাগে ৫-৬ বছর। তাও যদি মাঝে টাকা না ওঠানো হয়। ফিক্সড ডিপোজিট করা হয় তখন। এর বিপরীতে এখানে মাত্র এক মাসে টাকা দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে!

প্রশ্ন : বাস্তবে এমএলএম-এর কোনো বিকল্প আছে কী?

উত্তর : ফিকহের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের উচিত সম্ভাব্য বিকল্পও বলে দেওয়া, কিন্তু এটি কখন? সবক্ষেত্রেই কি বিকল্প বলা যাবে, সবকিছুর বিকল্প হয় না। তাই সব কিছুর বিকল্প বলা সম্ভবও নয়। এমন জিনিসেরই বিকল্প হয় যেটা বিকল্পযোগ্য। মদ নিষিদ্ধ। এর কি বিকল্প আছে? কোকাকোলা বা এ জাতীয় পাণীয় কি মদের বিকল্প? না। কারণ নেশা জাতীয় দ্রব্য ছাড়া মদের বিকল্প হবে না। আর নেশা সৃষ্টিকারী সবকিছুই ইসলামে নিষিদ্ধ। সুতরাং এমএলএম-এর কোনো বিকল্প নেই। এটি মূল থেকেই হারাম। এ পদ্ধতি এ রকমই একটি বিষয়, যার বিকল্প নেই। যেমন সুদ। এর সত্যিকারের বিকল্প ইসলামের নেই। মুদরাবা সুদের বিকল্প নয়। কেননা, মুদারাবাতে লোকসানের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। পক্ষান্তরে সুদখোর কখনো লোকসানের ঝুঁকি নিতে রাজি হয় না। পঁচা জিনিসের বিকল্প হয় না। পঁচা জিনিসের বিকল্প আনলে সেটাও পঁচা হবে। এক্ষেত্রে করণীয় হল, পঁচাটা বাদ দিয়ে সহীহটা নেওয়া। এমএলএম সিস্টেমটাই পঁচা। এর সহীহ বিকল্প নেই। তাই বিকল্প না চেয়ে এ কথা বলুন, অনেকেই এর সাথে জড়িয়ে গেছে। তাদের রুজি-রোজগারের কী ব্যবস্থা হবে। তারা জায়েয পন্থায় কীভাবে ব্যবসা করবে। তখন বলব, হালাল রোজগারের অনেক পথ আছে। কিন্তু সেগুলো খোঁজ না করে আপনি যদি বলেন, এমএলএম-এর সুবিধাযুক্ত বিকল্প দিন তাহলে এটি সম্ভব নয়। কেননা, ঐ সুবিধাগুলোই নিষিদ্ধ। সুতরাং ঐসব সুবিধাযুক্ত বিকল্প আসলে সেটাও নিষিদ্ধ হবে।

পরিশেষে বলব, এখনও যদি কেউ সহীহ পন্থায় সততা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করে তাহলে সে মানুষের টাকা রাখার জায়গা পাবে না। মানুষ এখনো তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় রাখার জন্য শরীয়াসম্মত বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান চায়। এতে লাভ কম হলেও তারা রাজি থাকে।

সবকিছুর বিকল্প হয় না এ বিষয়টি হযরত মাওলানা তকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম ‘উকূদুল মুস্তাকবিলিয়াত’-এর আলোচনায় (বুহুছ ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুআছিরা ১/১৪৩) ব্যাখ্যাসহ লিখেছেন।

প্রশ্ন : পিরামিড স্কীম আমাদের দেশে ছিল কি না?

উত্তর : হুবহু ছিল না। এর কাছাকাছি কারবার কিছুদিন চালু ছিল। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কারো নামে অজ্ঞাত স্থান থেকে টাকা পাঠানো হত। সাথে লেখা থাকত, আপনি এ পরিমাণ টাকা অমুক দুইজনকে পাঠাবেন এবং এতে তার উপকারের বিষয়টি বলা থাকত এভাবে সামনের দিকে নেট চলতে থাকত। এক সময়ে স্বাভাবিক নিয়মেই এ অভিনব কারবারটি বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু ততদিনে বহুলোক নিজ অর্থ সম্পদ হারিয়ে বসে।

প্রশ্ন : এমএলএম ওয়ালাদের একটি বই-এ লেখা আছে, আমাদের এই সিস্টেমে বহু স্তর থাকলেও এর দ্বারা বৃহত্তর ভোক্তাশ্রেণী উপকৃত হয়। প্রথাগত পদ্ধতিতে শুধু এজেন্ট, ডিলার, পাইকারী বিক্রেতা ও খুõ

42
শরীয়তের দৃষ্টিতে এমএলএম

যেহেতু এই মজলিসে উপস্থিত সকলেই কোনো না কোনো ফতোয়া বিভাগ বা তাখাসসুস-এর সাথে জড়িত তাই এমএলএম-এর শরয়ী হুকুম নিয়ে আলোচনার পূর্বে ফিকহুল মুআমালা তথা ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেন সংক্রান্ত কিছু মৌলিক কথা আরজ করছি। সীমিত সময়ে অনেক কিছুই হয়ত বলা সম্ভব হবে না। তাই মোটা মোটা কয়েকটা কথা বলব।

ফিকহুল মুআমালার মাসআলাগুলোর জবাব দেওয়ার পূর্বে করণীয়

১. নতুন কোনো বিষয় সামনে এলে প্রথমে তা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাড়াহুড়ো করা যাবে না। প্রশ্নের বিষয়টি বুঝে না এলে প্রশ্নকারীকে ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কারবার সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছেন এমন ব্যক্তিদের থেকেও তথ্য ও ব্যাখ্যা নেওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, লেনদেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ যে কোনো নতুন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত বিষয়টি যথাযথ উপলব্ধি করা সঠিক জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।

২. বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার পর এ ক্ষেত্রে শরীয়তের কী কী মৌলিক নীতি তথা উসূল ও যাওয়াবেত রয়েছে সেগুলো মাথায় হাযির করতে হবে।

৩. নীতিমালা ও যাওয়াবেতের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম যেসব সমাধান দিয়ে গেছেন তাতে যদি বিষয়টা পেয়ে যাই এবং উত্থাপিত মাসআলাটির বর্তমান বিবরণ ও প্রেক্ষাপট যদি পূর্বে বর্ণিত মাসআলার মতোই হয় তাহলে সেখান থেকেই তথা ফিকহি জুযইয়াত থেকেই সমাধান দেওয়া হবে।

৪. আর যদি বিষয়টা একেবারেই নতুন হয় অথবা মাসআলা পুরাতন হলেও এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয় বা উদ্দেশ্য ও পারিপার্শ্বিক দিক থেকে নতুনত্ব থাকে তবে দুইটি কাজ একসাথে করতে হবে : ক) ফিকহি জুযইয়্যাত দেখতে হবে। খ) উসূল ও যাওয়াবিত দেখতে হবে।

এবং দেখতে হবে যে, উসূলের সাথে জুযইয়্যাত সাংঘর্ষিক তো নয়। সাংঘর্ষিক হলে ফিকির করতে হবে। কেননা
বাস্তবেই সাংঘর্ষিক হলে জুযইয়া গ্রহণযোগ্য হবে না।

ফিকহুল মুআমালা সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা (উসূল)

শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় মুআমালার ক্ষেত্রেও এমন কিছু না সূচক উসূল ও যাওয়াবিত রয়েছে, যেগুলো খুবই মজবুত এবং সুদূর ফলপ্রসু। এখনো যদি এসব উসূলের আলোকে অর্থ ও বাণিজ্যব্যবস্থা সাজানো হয় তাহলে তা অবশ্যই সফল হতে বাধ্য।

বর্তমানে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা পতনের দিকে চলেছে, ইসলামের ঐ উসূলগুলো মেনে নিয়ে নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে যদি বেঁচে থাকা হত তাহলে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখাপেক্ষী হওয়া লাগত না।

ফিকহুল মুআমালা তথা লেনদেন বিষয়ক শরীয়তের সেই মৌলিক নির্দেশনাগুলোর কয়েকটি এই :

১. الأكل بالباطل তথা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা।

কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

ولا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل

তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। (সূরা বাকারা : ১৮৮)

‘আকলবিল বাতিল’ বিষয়ে ফিকহের একটি বড় অধ্যায় রয়েছে।

২. ‘আলগারার’ বা প্রতারণা।

হাদীসে এসেছে-

نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن بيع الغرر

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘গারার’যুক্ত বেচাকেনা থেকে নিষেধ করেছেন।-সহীহ মুসলিম,
হাদীস : ৩৭৮১; মুসনাদে আহমদ ১/৩০২, হাদীস : ২৭৫২

এ বিষয়েও ফিকহুল মুআমালার একটি অধ্যায় রয়েছে।

৩. ‘বাই ওয়া শর্ত’।

হাদীস শরীফে আছে-

لا يحل سَلَفٌ وبيع ولا شرطان في بيع

-জামে তিরমিযী, হাদীস : ১২৩৪; মুসনাদে আহমদ ২/১৭৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৫০৪; জামিউল মাসানিদ ২/২২

এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৪. ‘আলগাবানুল ফাহিশ’। এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৫. ‘আলগাশশু ওয়ালখিদা’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

من غشنا فليس منا

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৩১৫; মুসনাদে আহমদ ২/২৪২

৬. ‘তালাক্কিল জালাব’।

হাদীস শরীফে আছে-

نهى أن يتلقى الجلب

-জামে তিরমিযী, হাদীস : ১২২১; মুসনাদে আহমদ ২/২৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯২

এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৭. ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘আসসামাসিরা’ তথা দালালি।

৮. ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘বাইয়ুল হাযিরি লিলবাদী’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

نهى أن يبيع حاضر لباد

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯৭

৯. ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘আননাজাশ’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن النجش

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯১

এতক্ষণ যে সকল বিষয়ের কথা বললাম সেগুলোর ব্যাখ্যা আপনাদের অনেকেরই জানা আছে। প্রসঙ্গের প্রয়োজনে কয়েকটির আলোচনা ও বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ।

আমি এগুলোকে ফিকহের একেকটি অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করলাম। এর অর্থ এই নয় যে, ফিকহের কিতাবে এসব শিরোনামে পৃথক পৃথক বাব রয়েছে। তবে আপনি লক্ষ্য করবেন যে, লেনদেন বিষয়ক মাসআলাগুলোর আলোচনা ও হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে ফুকাহায়ে কেরাম উপরোক্ত নীতিগুলোর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। আর বর্তমান সময়ের অনেক লেখক এসব বিষয়ে পৃথক পৃথক বই লিখেছেন। যেমন এ কিতাবটি দেখুন-نظرية الشرط في الفقه الإسلامي। এ মোটা কিতাবটি শুধু ‘শর্ত’ সম্পর্কে লেখা হয়েছে। এমনিভাবে ‘আলগারার’ সম্পর্কে শাইখ ছিদ্দীক আদদারীরের কিতাব الغرر وآثره في العقود দেখুন, এক বিষয়ে কত বড় কিতাব। যারা বিভিন্ন দারুল ইফতায় দায়িত্বরত আছেন তাদেরকে বলছি, আপনারা এ কিতাবগুলো পড়ুন। দেখবেন লেনদেনের মাসআলা ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে এই ৯-১০টি বিষয়ের কত বেশি প্রভাব রয়েছে।

শরয়ী হুকুম

এদেশের এমএলএম ব্যবসার শুরুতেই আমরা বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মুফতী বোর্ডে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। বেফাকের মুফতী বোর্ড দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, এমএলএম পদ্ধতি নাজায়েয। এরপর প্রায় এক বছরজুড়ে পুরো বাংলাদেশের প্রায় সব বড় মাদরাসা ও দারুল ইফতা থেকে তাসদীক তথা সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।

আমাদের জানা মতে, এখনো ঐসব ফতোয়া বিভাগগুলোর মত আগের মতোই বহাল আছে। নির্ভরযোগ্য কারো থেকে এখন পর্যন্ত ভিন্ন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এটি ছিল বেফাকের বড় কাজ। উক্ত ফতোয়ায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয় : ১. এমএলএম সিস্টেমটাই নাজায়েয।

২. এ সিস্টেম অনুসরণ করে যেসব কোম্পানি চলে তার ব্যবসার ধরনের কারণে প্রথমে তা নাজায়েয। এরপর তাতে শরীয়ত নিষিদ্ধ অন্য কোনো কারণ থাকলে তো নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি আরো দৃঢ় হবে। বস্ত্তত এমএলএম পদ্ধতির অনেক প্রতিষ্ঠানেই শরীয়তপরিপন্থী অনেক বিষয় থাকে।

এমএলএম নাজায়েয কেন

এমএলএম নাজায়েয হওয়ার কারণগুলোকে দু ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : ক) মৌলিক কারণ খ) শাখাগত কারণ।

সাধারণ শিক্ষিত লোকদের প্রশ্নের জবাবে আমরা সাধারণত মৌলিক বিষয়গুলো উল্লেখ করে থাকি। তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝিয়ে সেগুলোর সাথে এমএলএম কীভাবে সাংঘর্ষিক তা বোঝানোর চেষ্টা করি। যেমন-১. শরীয়তের একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হল, বেচাকেনা হবে সরাসরি। বিনা কারণে মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি হবে না। বিক্রেতা ও ভোক্তার মাঝে অযাচিতভাবে বিভিন্ন স্তর ও মাধ্যম সৃষ্টি করা শরীয়তের পছন্দ নয়। এজন্যই হাদীসে ‘তালাক্কির রুকবান ও বাইয়িল হাযিরি লিলবাদী’ ইত্যাদির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। অর্থাৎ ক্রেতাবিক্রেতার মাঝে অযাচিত মধ্যসত্ত্বভোগী প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। বিক্রেতাকে সরাসরি বাজারে ঢোকার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। মাঝপথে থামিয়ে দিতে বারণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন বাজারে ঢোকা তো অনেক দূরের কথা, বিক্রেতার বাড়ি থেকেই পণ্য নিয়ে আসা হয়। দাদন ব্যবসায়ীরা প্রথমে কৃষকদেরকে সুদের শর্তে ঋণ দেয়। সাথে এ শর্তারোপও করে যে, উৎপাদিত ফসল তার কাছে বা তার লোকদের কাছেই বিক্রি করতে হবে। পরিশেষে সুদে আসলে শোধ করতে গিয়ে কৃষকের তেমন কিছু আর বাকি থাকে না। আপনারা জানেন এক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা হল মুযারাআ করা। তা করা হলে কৃষকগণ সুদের গুনাহ থেকেও বাঁচত এবং ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সর্বনাশ হত না।

২. ভোক্তা বা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থ ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিস্বার্থের উপর প্রাধান্য পাবে।

এজন্য শরীয়ত ‘আননাজাশ’ বা দালালিকে অপছন্দ করে। কারণ এর দ্বারা দালাল উপকৃত হলেও ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আপনি শরীয়তের পুরো উসূল পড়লে দেখবেন, পুরোটা ভোক্তার পক্ষে, তবে বিক্রেতার বিপক্ষেও নয়। তাই বিক্রেতার ক্ষতি হোক শরীয়ত এটা চায় না। এজন্য সাধারণ অবস্থায় পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার বিধান নেই।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, আল্লাহর রাসূল! দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে। আপনি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। আমি বরং দুআ করব যেন দম কমে যায়।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৪৫০

উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাম নির্ধারণ করে দেননি। কারণ হতে পারে একটি পণ্যে বিক্রেতার খরচ পড়েছে ১০/-টাকা। এখন ৯/- টাকা নির্ধারণ করা হলে বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হোক শরীয়ত এটা চায় না। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর অংশ তথা ক্রেতা বা ভোক্তার ক্ষতি না হওয়ার বিষয়টি শরীয়তে অগ্রাধিকারযোগ্য।

এখন আমরা দেখব, শরীয়তের এ দুটি দৃষ্টিভঙ্গি এমএলএম-এর সাথে কিভাবে সাংঘর্ষিক। প্রথম উসূলটি ছিল, বেচাকেনায় অযাচিত মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি না হওয়া। কিন্তু এমএলএম-এর মধ্যে একটি পণ্য বা সেবার উপকারভোগী হয় বহু স্তরের লোক। অসংখ্য মধ্যস্বত্ত্বভোগী তাতে বিদ্যমান। তারা বলে, আমরা এ পদ্ধতি অনুসরণ করি ভোক্তাদের উপকারের জন্য। অন্যান্য কোম্পানি বিজ্ঞাপণের পিছনে যে অর্থ খরচ করে আমরা তা না করে ঐ পরিমাণ অর্থ ক্রেতাদেরকে কমিশন আকারে দেই। এবং তারা আরো বলে, আমরা মধ্যস্বত্ত্বভোগী উঠিয়ে দিয়ে ঐ মুনাফা ক্রেতাদেরকে কমিশন আকারে দেই।

আসলে এসব কথা সত্যের অপলাপমাত্র। কেননা তাদের ভাষায় তারা পণ্যের মূল্যের ৪৫% ভোক্তাদের দিয়ে দেয়। দেখুন, তারা বহু স্তর বানিয়ে প্রত্যেক স্তরকে যে কমিশন দেয় সেটা ভোক্তাদের অর্থ থেকেই দেয়। যেমন, ১০,০০০/- টাকা গাছের মূল্য হলে এর ৪৫% হল ৪,৫০০/- টাকা। এই ৪,৫০০/- টাকা তাদের ভাষায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী নিয়ে নেয়। বাকি থাকে ৫,৫০০/- টাকা। এর ভিতরে কোম্পানির লভ্যাংশও ধরা আছে। তাহলে এখানে ভোক্তার লাভ হল না; বরং আরো বেশি ক্ষতি হল। ৫,৫০০/- টাকার পণ্য ১০,০০০/- টাকায় নিতে হচ্ছে।

একটি বহুল প্রচলিত এমএলএম কোম্পানি বলে থাকে, তারা পণ্যের লভ্যাংশের ৮৮% পরিবেশককে দিয়ে দেয়। অবশিষ্ট ১২% নিজেরা রাখে। আমরা বলব, ১২% এর স্থানে ২০% যদি কোম্পানি লাভ করত তবুও ভোক্তা বেশি উপকৃত হত যদি কিনা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের উঠিয়ে দেওয়া হত। তারা বলে, ৮৮% লাভ পরিবেশকদেরকে দেয়। কিন্তু চেইন যদি লম্বা হতে থাকে তাহলে তো ১০০%ও ছাড়িয়ে যাবে।

কিভাবে তারা এত বিপুল পরিমাণ কমিশন দেয়

তারা আরো বলে, ক্রেতাদেরকে লাভবান করার জন্য বিজ্ঞাপনের খরচ বাঁচিয়ে সেটা তাদেরকে ফেরত দেই।

প্রথম কথা হল, তারা বিজ্ঞাপন দেয় না-কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। দ্বিতীয়ত ক্রেতাদেরকে লাভবান করাই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে প্রথমেই পণ্যের মূল্য ঐ পরিমাণ কমিয়ে দিন এবং সরাসরি ক্রেতাকে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করুন। তাহলেই তো হল। তা না করে স্তর সৃষ্টি করে ঘুরিয়ে দেন কেন?

আমি তাদের অনেককে বলেছি, আপনাদের পণ্য বা সেবা যদি যথাযথ মূল্যেই বিক্রি করে থাকেন তবে যতটুকু আপনার লাভ দরকার তা রেখে দাম নির্ধারণ করে বাজারে ছাড়ুন। যেমন, ১০,০০০/- টাকায় যদি আপনার ৪,৫০০/-টাকা লাভ থাকে এবং তা থেকে পরিবেশকদেরকে ৪,০০০/- টাকা দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি পণ্যটি সরাসরি ৬,০০০/- বা ৬,৫০০/- মূল্যে বাজারে ছাড়ুন দেখবেন কোনো বিজ্ঞাপন দরকার হবে না, পরিবেশকও লাগবে না, খুচরা বিক্রেতারা দলে দলে এসে আপনার কাছে ভিড় করবে কারণ আপনাদের ভাষ্যমতে এমনিতেই আপনাকে পণ্যের মূল্য বাজার দরের সমান বা কম। এসব কথা শুনে তাদের অনেক কর্মকর্তা চুপ মেরে গেছে। দ্বিতীয় উসূলটির সাথেও যে এমএলএম সাংঘর্ষিক তা বলা হয়নি।

মোদ্দাকথা : বহু স্তরে বিপণনের এ পদ্ধতি শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি এবং উসূল যাওয়াবেতের সাথে সাংঘর্ষিক।

৩য় উসূল

 আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল (বাতিল পন্থায় অন্যের সম্পদ গ্রহণ)।

কুরআনুল কারীমের আয়াত-

لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل

 এর ব্যাখ্যায় রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেছেন, أن يأكله بغير عوض (শর্তযুক্ত আকদে) বিনিময়হীন উপার্জনই হল বাতিল পন্থার উপার্জন। (আহকামুল কুরআন, জাসসাস ২/১৭২)

হযরত হাসান বসরীসহ অন্যান্য অনেক তাফসীরবিদও আয়াতটির একই ধরনের তাফসীর করেছেন (দ্রষ্টব্য: রূহুল মাআনী ২/৭০, ৫/১৫; তাফসীরুল মানার ৫/৪০)

এমএলএম-এর মধ্যে ‘আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল’-এর উপস্থিতি

এমএলএম কারবারগুলোতে ডাউনলেভেল থেকে আপ লেভেলে যে কমিশন আসে তা বিনিময়হীন হাসিল হয়। কারণ ১ম স্তরের সরাসরি জোগাড় করা ক্রেতারা ছাড়া ২য় স্তরের পরবর্তী স্তরগুলোতে যে সকল ব্যক্তি যুক্ত হয় তারা কোম্পানিতে যোগ হয়েছে অন্যান্য লোকজন কর্তৃক এবং তাদের স্বাক্ষরে। সুতরাং যে কমিশন বা পারিশ্রমিক নিম্নস্তর থেকে আসছে তা বিনিময়হীন হওয়ার কারণে ‘আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল’ তথা (অন্যের সম্পদ বাতিল পন্থায় আহরণ)-এর অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে একটু পরে আরো কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

৪র্থ উসূল

লেনদেনের ক্ষেত্রে শরীয়তের একটি উসূল হল, আকদ তথা চুক্তির সময় পণ্য সুনির্ধারিত হওয়া। যেন পরবর্তীতে এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ না হয়। দেখুন, কোনো কিছুর প্রতিকার করা থেকে তা প্রতিরোধ করা অর্থাৎ গোড়া থেকেই হতে না দেওয়া অনেক ভালো। অসুখ হওয়ার পর চিকিৎসা করে ভালো হওয়ার চেয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকা উচিত

43
উলামায়ে কেরামের অনুরোধে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ের উপর মুহাযারার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিগত ৬-১২-১৪৩২ হি. মোতাবেক ৩-১১-২০১১ ঈ., বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় মাল্টিলেভেল মার্কেটিং সম্পর্কে একটি মুহাযারা। বিভিন্ন মাদরাসার ফিকহ-ফতোয়া বিভাগে অধ্যয়নরত তালিবানে ইলম ও দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে মুহাযারাটি পেশ করেন মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার মুদীর, মারকাযের ফতোয়া বিভাগ ও আততাখাসসুস ফিল ফিকহি ওয়াল ইফতা’র রঈস মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেব।

 মুসাজজিল থেকে আলোচনাটি পত্রস্থ করেছেন : মাওলানা আবদুল্লাহ মাসুম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে উপকৃত করুন। আমীন।

হামদ ও সালাতের পর

মারকাযুদ দাওয়াহ কর্তৃপক্ষ ফিকহুল মুআমালাত বিষয়ে কিছু আলোচনা ও প্রশ্ন-উত্তর এর আয়োজন করেছেন। দীর্ঘদিন থেকেই আবেদন ও অনুরোধ করা হচ্ছিল, এ বিষয়ে বড় আকারে

মুহাযারা ও প্রশিক্ষণ মজলিস করার। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকুলতার কারণে এতদিন তা হয়ে উঠেনি। ধীরে ধীরে দাবিটা যখন ব্যাপক হল এবং এর প্রয়োজনীয়তাও বাড়ল তখন সিদ্ধান্ত হল, আপাতত স্বল্প পরিসরে শুরু করা হোক এবং মুহাযারা আকারে হোক। আল্লাহ তাআলা চাহে তো বড়ভাবে, তাদরীবী আকারে পরে আয়োজন করার চেষ্টা করা হবে। তাই ব্যাপক জানাজানি করা হয়নি এবং ব্যাপক প্রস্ত্ততি ছাড়াই আজকের মজলিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা ঠিক হাকীকী মুহাযারা বলতে যা বুঝায় তা-ই।

কথা ছিল প্রথম দিকে তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার : ১. মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ২. শেয়ারবাজার ও ৩. মাল্টি পারপাস সোসাইটি ও এ জাতীয় সংস্থা।

একদিনের সামান্য সময়ে এ তিন বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই যে কোনো একটি বিষয়কেই বেছে নিতে হবে। অনেকে বলেছেন, এমএলএম দিয়ে শুরু করতে। তাই আমরা এ বিষয় দিয়েই আলোচনা শুরু করছি।

এমএলএম-এর ইতিহাস

এমএলএম-এর ইতিহাস অনেক বেশি দিনের নয়। অর্ধশতাব্দীর কিছু বেশি এর বয়স। ইনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১৯৪৫ সাল থেকে এর যাত্রা শুরু। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমএলএম ভিত্তিক কোম্পানি চালু হয়েছে। এর অধিকাংশগুলোই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে গেছে। আমেরিকাসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই আইন করে বন্ধ করা হয়েছে বহু এমএলএম কোম্পানিকে। কিন্তু এতে থেমে যায়নি এ কারবারের আগ্রহী ব্যক্তিরা।

ঠিক এখন আমাদের দেশে এমএলএম যেরূপে প্রচলিত শুরুতে এমন ছিল না। তবে এর পুরান পদ্ধতিটা ঐ নামে আমাদের দেশে না থাকলেও ঐ পদ্ধতিটা ভিন্নভাবে প্রচলিত ছিল। আপনাদের কারো কারো হয়ত মনে আছে, এ দেশে একসময় পোস্ট অফিসগুলোতে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে-বেনামে অপরিচিত জায়গা থেকে মানি অর্ডারে টাকা আসার হিড়িক পড়েছিল। প্রাপককে লিখে দেওয়া হত দুটি ঠিকানা এবং ঐ ঠিকানাগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠানোর জন্য বলে দেওয়া হত। যার মাধ্যমে বড় লাভ পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হত। প্রতারণার এই ফাঁদ ব্যাপক হওয়ার পর কর্তৃক্ষের টনক নড়ে এবং ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়। যাই হোক, আমেরিকাতেও এর কাছাকাছি একটি কারবার পিরামিড স্কীম নামে শুরু হয়েছিল। এটিই এমএলএম-এর সনাতনি পদ্ধতি।

পিরামিড স্কীম-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

টাকা দিয়ে সদস্যপদ খরিদ করা। একজন লোক নির্ধারিত ফী দিয়ে সদস্য হবে। এরপর সে আরো সদস্য বানাবে। এভাবে নেট পদ্ধতিতে এগিয়ে যাবে এবং উপরওয়ালারা নীচেওয়ালাদের থেকে কমিশন পাবে। পিরামিড স্কীম কিছুদিন চলার পর স্বাভাবিক নিয়মেই তা বন্ধ হয়ে যায়। যখন মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তখন পিরামিড স্কীম আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমেরিকাতে আইন হয়েছে। আরো কিছু দেশেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এরপরও তারা থেমে থাকেনি। নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এমএলএম-এর বর্তমান পদ্ধতিটি (পণ্য বা সেবার পদ্ধতি) শুরু হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এর বয়স মোটামুটি হয়ত দুই দশকের বেশি হবে না।

এদেশে যখন তারা আসে তখন মারকাযুদ দাওয়াহ প্রতিষ্ঠার সম্ভবত তৃতীয় বছর। বেকার ও স্বল্প আয়ের লোকদের মধ্যে হিড়িক পড়ে গিয়েছিল এতে অংশগ্রহণ করার। রাতারাতি বড় লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল তারা। কিছু কিছু অবুঝ মাদরাসাছাত্র ও দ্বীনদার শ্রেণীর লোকও এ মিছিলে যোগ দিয়েছিল। এমনি পরিস্থিতিতে মারকাযুদ দাওয়াহসহ অন্যান্য দারুল ইফতাগুলোতে ব্যাপকভাবে মানুষ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা শুরু করে।

বিষয়টি ছিল তখন নতুন। এ পদ্ধতিতে পরিচালিত কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক পলিসি বুঝানোর জন্য বিভিন্ন সেমিনার ও লেকচারের আয়োজন করত। মানুষ তাতে ৫/-টাকা ফি দিয়ে অংশগ্রহণ করত। লেকচার ফি ৫/-টাকা। গুলশান এলাকায় তাদের বক্তৃতা হত। সেখানে এ কারবারের উপকারিতা এবং এতে অংশগ্রহণ করে কিভাবে অল্প দিনে অনেক টাকার মালিক হওয়া যায় তা বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বুঝানো হত।

শুরুতে টংচেং ও জিজিয়ান এ দুটি কোম্পানি বেশ চলেছিল। টংচেং পানি বিশুদ্ধকরণ মেশিন বিক্রি করত। তারা যে মেশিন বিক্রি করত ঐ মানের মেশিন বাইরে অর্ধেক দামে পাওয়া যেত। তবে তাদের মেশিনটি ছিল ভিন্ন নাম ও ভিন্ন ব্র্যান্ডের। যা বাজারে নেই। এটি এমএলএম কোম্পানির একটি বিশেষ ব্যবসায়িক পলিসি। তারা এমন ব্র্যান্ডের পণ্য আনে, যা বাজারে থাকে না। ফলে সাধারণ মানুষ এই নামে আর দামের তুলনা করতে পারে না।

আমাকে প্রথম যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন শুনেই বলেছিলাম, ব্যবসার যে চক্করটা শুনলাম শরীয়তে এ ধরনের ব্যবসা বৈধ হওয়ার কথা নয়। তবে আমি সিদ্ধান্তও দিচ্ছি না। এটি এককভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো নয়। অন্যান্য দারুল ইফতার সাথে কথা বলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এরপর ঢাকাস্থ বেফাকের মুফতী বোর্ডের নিকট এটি পেশ করা হল। তারা দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনার পর তাহকীক করে দলিলভিত্তিক সিদ্ধান্ত দিলেন যে, এটি বৈধ নয়। অতপর ফতোয়াটি পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের অন্যান্য জেলার বড় বড় মাদরাসাগুলোতে। এবং প্রায় সকল বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাতে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর আসে।

ফতোয়া আসার কিছুদিনের মধ্যে কোম্পানি দুটি (টংচেং ও জিজিয়ান) বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তারা বসে থাকেনি। আবার ভিন্ন নামে শুরু করার জন্য চেষ্টা আরম্ভ করে।

তখন ফতোয়ার প্রভাব এখনের চেয়ে ভালো ছিল। ফলে এমএলএম কারবারিগণ বাধ্য হয়ে মুফতীদের নিকট ও বিভিন্ন দারুল ইফতায় ছুটে এসেছিলেন।

তারা বিভিন্ন লোক মারফত খবর পাঠিয়েছিলেন, আলেমগণ রাজি হলে সোনাগাঁও হোটেলে তারা আলোচনার আয়োজন করবেন। তারা হয়ত ভেবেছিল, ৫ তারকা হোটেলের চাকচিক্য দেখে হুজুরররা ফতোয়া বাতিল করে ফেলবেন। আমি তখন বলেছি, দুনিয়াদাররা আলেমদেরকে কিনে ফেলতে চায়। আলেমদের দায়িত্ব তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং মুখের উপর তিরস্কার করা।

আমাকে যখন একথা শুনানো হয়েছিল তখন তাদের মুখের উপর বলেছিলাম, আমরা চাটাইয়ে বসে যে মাসআলা দিয়েছি সোনারগাঁও হোটেলেও মাসআলা তাই থাকবে। জায়গার চাকচিক্যে মাসআলার কোনো পরিবর্তন হবে না। আপনাদের কিছু প্রয়োজন হলে, আমাদের ফতোয়ার উপর কোনো কথা থাকলে আপনারা আমাদের অনাড়ম্বর দফতরে আসুন, আমরা কথা বলতে প্রস্ত্তত। সোনারগাঁও যেতে হবে কেন? এরপর তারা ঠিকই আমাদের চাটাইয়ের দফতরে এসেছিলেন এবং দুঃখও প্রকাশ করেছেন। ফতোয়া নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য ছিল না তবে তারা বিকল্প চেয়েছেন। আমরা তখন যা বলার বলেছি। এ বিষয়ে ইনশাআল্লাহ পরে আলোচনায় আসছি।

মোটকথা, ফতোয়া আসার কারণে কোম্পানি দুটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তারা থেমে থাকেনি। অন্য নামে আরো কোম্পানি চালু করেছে। এই লাইনে আরো নতুন নতুন লোকের আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই একই জিনিস। শুধু নামের পরিবর্তন। এবং আগের কোম্পানিগুলোতে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই এ কোম্পানিগুলোতে যোগ দিয়েছেন। এটি এমএলএম কোম্পানির স্বভাবজাত ধর্ম। একটা বন্ধ হলে তারা ভিন্ন নামে আরেকটা চালু করে। আগের লোকেরাই নতুন নামে চালু করে।

আমাদের দেশেও এখন এমনি একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজ চালু আছে। দেশের আনাচে কানাচে বহু বছর মেয়াদী গাছ বিক্রয়ের ব্যবসাসহ বহুমুখী প্রোডাক্ট নিয়ে তারা এখন অনেক বড় একটি গ্রুপ। তাদের কারবারের বৈধতা নিয়ে জাতীয় সংসদেও বারবার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আবার অজানা কারণে সেগুলো অগ্রসরও হয়নি।

আগেই বলে রাখি, কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপ বা ব্যক্তি চাই সে এমএলএম তরীকার হোক বা অন্য কোনো পন্থায় ব্যবসাকারী হোক তাদের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক বা খারাপ সম্পর্ক কিছুই নেই। এবং শুধু মুসলমানদের হালাল-হারামের বিষয় জিজ্ঞাসাসমূহের সার্বিক উত্তরের ব্যাপারে আমাদের দায়বদ্ধতা না থাকলে আমরা তাদেরকে নিয়ে ভাবতামও না।

এটি এজন্য যে, এ বিষয়ে শরঈ সমাধান পাওয়ার আগেই দ্বীনদার কিছু মুসলমান এতে জড়িয়ে পড়েছে। গুজবে কান দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের বাঙালিদের ক্ষতির (!) পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও শরঈ চিন্তা ছাড়াই একটা কিছুতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা স্পষ্ট হল। ‘নেহি মালুম মানযিল হ্যায়, কিদহর কিস সামেত জাতে হ্যাঁ।/মাচা হ্যায় কাফেলে মে শোর, হাম ভি গুল মাচাতে হ্যাঁয়।’

অর্থনীতি বিষয়ে জড়িত হওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা, চিন্তা-ভাবনা করা এটাকে আমরা অনেকে দরকারি মনে করি না।  অথচ ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি এসব তো ইসলাম নামক বৃক্ষেরই বিভিন্ন শাখা। এগুলোকে দ্বীন/ইসলাম থেকে ভিন্ন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এটা হল খৃস্টানদের বৈশিষ্ট্য। তারা মনে করে ধর্ম হল শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম। আর অন্যান্য বিষয়গুলো একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। খৃস্টানদের এই প্রভাবটা ধীরে ধীরে মুসলমানদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। (আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাযত করুন।)

এখন আমরাও যদি কোনো মুয়ামালায় জড়িত হওয়ার পূর্বে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করি তাহলে তো আমরাও তাদের মতো হয়ে গেলাম, যারা ইবাদত ও দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ফরক করে। মোটকথা, এসব প্রেক্ষাপটেই মুফতী বোর্ড ঢাকার পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম এমএলএম ব্যবসার ব্যাপারে ফতোয়া দেওয়া হয়। তো এই ছিল আমাদের তখনকার তিক্ত অভিজ্ঞতা যে, দ্বীনদার শ্রেণীর লোকেরা যাচাই-বাছাই না করেই এতে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন যত দিন যাচ্ছে এ তিক্ত অভিজ্ঞতা ততই বাড়ছে। দ্বীনদার শ্রেণীর এই বিশাল গোষ্ঠিকে বাঁচানোর জন্যই আমরা ফতোয়া দিতে তৎপর হই।

এমএলএম পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত পরিচয়

এমএলএম এখন বেশ প্রসিদ্ধ একটি কারবার। অনেকেই এখন তা মোটামুটি চিনে। এরপরও প্রসঙ্গের টানে সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা দরকারী মনে হচ্ছে। এর আগে একটি ঘটনা শোনাই।

এমএলএম বিষয়ে প্রথম ফতোয়া আসার পর দূর থেকে অনেকেই বলত, যারা ফতোয়া দিয়েছেন তারা কি গুলশানে গিয়ে লেকচার শুনেছেন। তারা বিষয়টি  না জেনেই ফতোয়া দিয়েছেন। আমরা সেসব রাস্তাঘাটের মানুষের কথার জবাব দেইনি। একদিন টংচেং এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ সম্ভবত ওদের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ, আমাদের সাথে আলোচনায় বসলেন। তাদের মাঝে পাগড়িওয়ালা এক মুরববীও ছিলেন। আলোচনার মাঝে তিনি বলে উঠলেন, আপনারা যে ফতোয়া দিয়েছেন, আপনি কি গুলশানে গিয়ে লেকচার শুনেছেন? আমি বললাম, কোন লেকচারের কথা বলছেন? লোকটি বললেন, এমএলএম-এর মার্কেটিং পদ্ধতি বুঝতে হলে কোর্স করতে হয়, লেকচার শুনতে হয়। কর্মকর্তাদের কেউ এ কথা বললে অন্যভাবে জবাব দিতাম। তাকে বললাম, মুফতীকে ফতোয়া দিতে হলে ৫/-টাকার কোর্স করতে হবে-এটা আপনি ভাবলেন কি করে? মুফতী বোর্ডের ফতোয়ায় শরঈ হুকুম বলার আগে কারবারটির একটি বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ মুফতী বোর্ড দিয়েছেন তাতে কী ভুল আছে বলুন। এমন কিছু কী বাদ থেকে গেছে যা থাকলে আজকের মাসআলার জবাব ভিন্ন হতে পারত? আমরা কি এমন কিছু লিখেছি, যা আপনারা বাস্তবে করেন না? বা আপনাদের স্বপক্ষে যেতে পারে এমন কোনো পয়েন্ট কি বাদ গেছে? তখন কর্মকর্তারা বললেন, না। আপনারা এই কারবারের যথাযথ বিশ্লেষণই করেছেন। কোনো কিছু ভুল বলেননি বা কিছু গোপনও করা হয়নি। তারা ঐ মুরববীকে চুপ থাকতে বললেন।

উক্ত ঘটনাটি এজন্য বললাম যে, অনেক হারাম কারবারীই আপনাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। প্রচলিত ভাষায় হাইকোর্ট ইত্যাদি দেখাতে পারে। কিন্তু ফতোয়ার কাজ যারা করবে তাদেরকে বিচলিত বা প্রভাবিত হলে চলবে না। যাহোক, এমএলএম-এর ব্যাখ্যা এই : Multi Level Marketing (M = Multi, L = Level, M = Marketing) Multi  : বহু, নানা। যেমন : Multi Color (বহু বর্ণ), Multi National  : (নানা দেশে সক্রিয়, বহুজাতিক), খবাবষ : স্তর, Marketing : ক্রয়বিক্রয়, বাজারে

পণ্য ছাড়া।

এককথায় এর অর্থ দাঁড়ায়,

বহুস্তরবিশিষ্ট বিপণন। এই অর্থ থেকেই অনেক কিছু বুঝে আসে। যেমন-

ক. বহু স্তরবিশিষ্ট বিপণন মানে প্রথম ক্রয়বিক্রয়ের পরই কারবার শেষ হয় না; বরং সামনে বহু স্তরে এটি চলমান থাকবে। (ব্যাখ্যা সামনে আসছে)।

খ. এখানে দুইটা জিনিস বা দুইটা পদবি একত্রে অর্জিত হয় ১. ক্রেতা ২. পরিবেশক। ওদের ফরমেই তা লেখা আছে। দুনিয়ার অন্যান্য কারবারে কেনা শেষ হওয়ার পর কেবল একটি পদবি অর্জিত হয়। তা হল ক্রেতা এবং জিনিসও একটিই অর্জিত হয় তা হল পণ্য বা নির্ধারিত সেবা। কিন্তু এখানে পদবী দুইটি, জিনিসও দুইটি। একটি হল পণ্য আর অপরটি হল ডিস্ট্রিবিউটরশীপ বা পরিবেশক হওয়ার যোগ্যতা। যেমন-ট্রি প্লান্টেশন। আপনি দশ হাজার টাকা দিয়ে ১২টি গাছ ক্রয় করলেন। এখানে আপনি একটি কিনলেন পণ্য। আরেকটি হল, উক্ত কোম্পানি থেকে কমিশন লাভের যোগ্যতা। আপনি আরো লোক যোগাড় করে দিতে পারলে কমিশন পাবেন। এতে বুঝা গেল, বিক্রয়টা এক স্তরে শেষ হয় না; বরং আপনার মাধ্যমে এবং আপনার পরবর্তী লোকদের মাধ্যমে তা বহু স্তরে বিস্ত&#

44
‘‘নামাযে হাত বাঁধা ও নাভীর নিচে হাত বাঁধা’’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে যে, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে হাত বাঁধার দুটো নিয়ম চলে আসছে : বুকের নীচে হাত বাঁধা ও নাভীর নীচে হাত বাঁধা। মুসলিম উম্মাহর বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণও এ দুটো নিয়ম গ্রহণ করেছেন।

নিকট অতীতে হাত বাঁধার নতুন কিছু নিয়ম আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল না এবং কুরআন-সুন্নাহর প্রাজ্ঞ মনীষী ও মুজতাহিদগণের সিদ্ধান্তেও তা পাওয়া যায় না। বলাবাহুল্য, এসব নিয়ম ‘শুযুয’ ও বিচ্ছিন্নতা বলে গণ্য, যা দ্বীন ও শরীয়তের বিষয়ে সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, সম্প্রতি এইসব বিচ্যুতি ও বিচ্ছিন্নতাকেই ‘সুন্নাহ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং চরম দায়িত্বহীনতার সাথে সাধারণ মানুষের মাঝেও তা প্রচার করা হচ্ছে।

আমরা মনে করি, সাধারণ মুসলমানদেরকে দলীল-প্রমাণের শাস্ত্রীয় জটিলতার মুখোমুখি করা অনুচিত, কিন্তু এ সকল অনাচারের প্রতিরোধ ও আম মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষার জন্য এখন কিছু বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিকল্প নেই। যথাসম্ভব সহজ ভাষায় আমরা তা উপস্থাপনের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হেদায়েতের উপর থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

নামাযে হাত বাঁধার ক্ষেত্রে যেসব শুযুয ও বিচ্ছিন্নতা দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

শুযুয ১ : বুকের উপরের অংশে থুতনীর নিচে হাত রাখা

সমসাময়িক গায়রে মুকাল্লিদ আলিমরাও এই নিয়মকে খন্ডন করেছেন। শায়খ বকর বিন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ ‘‘লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ’’ পুস্তিকায় আরো কিছু নতুন নিয়মের সাথে এ নিয়মটিকেও খন্ডন করেছেন। ভূমিকায় তিনি লেখেন, ‘আমরা দেখেছি, কিছু লোক কোনো শায ও বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে তার প্রচারে কিংবা কোনো দুর্বল রুখসত ও অবকাশ গ্রহণ করে তার প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। এদের খন্ডনের জন্য মনীষী আলিমদের এই নীতিই যথেষ্ট যে, ‘ইলমের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন মত এবং (বিধানের ক্ষেত্রে) কোনো অপ্রমাণিত অবকাশ সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

‘কিন্তু সম্প্রতি যে দলটির উদ্ভব ঘটেছে, তাদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানদের প্রতিদিনের ইবাদত-বন্দেগীর ওয়াজিব-মুস্তাহাব বিষয়ে, যে ইবাদত-বন্দেগী ইসলামের মহান নিদর্শন ও প্রতীকও বটে, এমন সব ধারণার
বিস্তার ঘটছে যেগুলোর সাথে কোনো যুগে আলিমসমাজের কোনো পরিচিতি ছিল না। অতিনমনীয় ভাষায় বললে, এসব ধারণার কোনো কোনোটির সূত্র হচ্ছে বহুকাল আগের বর্জিত কিছু মত।

‘আর কোনো ধারণা পরিত্যক্ত হওয়ার জন্য তো এ-ই যথেষ্ট যে, তা সকল আলিমের মতামত থেকে বিচ্ছিন্ন।

‘ইসলামের দ্বিতীয় রোকন নামাযের ক্ষেত্রেও এমন নতুন কিছু কাজ ও অবস্থা আবিষ্কার করা হয়েছে, যার কোনোটা নামাযীকে একটা অস্বাভাবিক রূপ দান করে, অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সম্পর্কে বলেছেন-

وما انا من المتكلفين

 â€˜... এবং আমি ভনিতাকারীদের
অন্তর্ভুক্ত নই।’-সূরা সোয়াদ (৩৮) : ৮৬

‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

بعثت بالحنيفية السمحة

 â€˜তেমনি তা নামাযীর মাঝে একটা উদ্যত ভঙ্গি সৃষ্টি করে, অথচ নামায হচ্ছে আপন রব ও মাবুদের সামনে বান্দার বিনয় ও অক্ষমতার অবস্থা!

‘কোনো কোনো ধারণার অর্থ দাঁড়ায়, ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত গোটা মুসলিম উম্মাহ ছিল সুন্নাহ বর্জনকারী ও সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত। অন্যভাষায়, তারা ছিল সম্মিলিতভাবে পাপী ও অপরাধী।

‘তো এই সকল ভ্রান্তির কারণ কী?

‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে সুন্নাহ বোঝার ক্ষেত্রে অতিশয়তা, আর কখনো (আরবী) ভাষার বাকরীতি ও হাদীস-ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কে উদাসীনতা।

‘এই সকল বিভ্রান্তি হচ্ছে দলীলের বিষয়ে মূলনীতি বর্জনের এবং নামাযের স্বাভাবিক অবস্থা ও ফিকহ-খিলাফিয়াতের কিতাব থেকে বিমুখতার কুফল। অথচ ঐ সকল কিতাবে আহকাম ও বিধানের তত্ত্ব, কারণ ও বিশেষজ্ঞদের মতভিন্নতার আলোচনা থাকে। ...’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ পৃ. ৩-৪

বুকের উপরের অংশে গলদেশে হাত বাঁধার ‘দলীল’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কুরআন মজীদের আয়াত-

فصل لربك وانحر

-এর তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করা হয়। বায়হাকী তা বর্ণনা করেছেন (২/৩১) এবং তার সূত্রে তাফসীরের বিভিন্ন কিতাবে তা বর্ণিত হয়েছে। যেমন দেখুন : আদ্দুররুল মানছূর ৮/৬৫০-৬৫১

‘এই রেওয়ায়েত সহীহ নয়। কারণ এর সনদে রওহ ইবনুল মুসাইয়াব আলকালবী নামক একজন রাবী আছেন। তার সম্পর্কে দেখুন : আলমাজরূহীন ১/২৯৯

সূরায়ে কাওসারের ঐ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, তার অর্থও তা-ই যা নিম্নোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে-

قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين

 (বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহর জন্য, যিনি রাববুল আলামীন।’

অর্থাৎ ঐ আয়াতে وانحر অর্থ কুরবানী, গলদেশে হাত রাখা নয়।)

‘ইবনে জারীর এই তাফসীরকেই সঠিক বলেছেন এবং ইবনে কাছীর তা সমর্থন করেছেন। তাঁর
মন্তব্য-এটি অতি উত্তম (ব্যাখ্যা)।’-লা জাদীদা ফী আহকামিস সালাহ, বকর আবু যায়েদা পৃ. ৯

উপরে যে রেওয়ায়েতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তার পূর্ণ আরবী পাঠ সনদসহ তুলে দেওয়া হল-

أخبرنا أبو زكريا بن أبي اسحاق، أنبأ الحسن بن يعقوب بن البخاري، انبأ يحي بن أبي طالب، انبأ زيد بن الحباب، ثنا روح بن المسيب، قال : حدثني عمرو بن مالك النكري عن أبي الجوزاء عن ابن عباس رضي الله عنهما في قول الله عز وجل "فصل لربك وانحر" قال : وضع اليمين على الشمال في الصلاة عند النحر.

-সুনানে বায়হাকী ২/৩০-৩১

রওহ ইবনুল মুসাইয়্যাব সম্পর্কে ইবনে হিববান রাহ. (৩৫৪ হি.) বলেন, ‘সে ছিকা রাবীদের সূত্রে মওযু রেওয়ায়েত বর্ণনা করে। তার থেকে বর্ণনা করা বৈধ নয়।’

يروي الموضوعات عن الثقات لا تحل الرواية عنه

-কিতাবুল মাজরূহীন

ইবনে আদী বলেন, ‘সে ছাবিত ও ইয়াযীদ আররাকাশী থেকে এমন সব রেওয়ায়েত বর্ণনা করে, যা মাহফুয নয় (সঠিক নয়)।’

يروي عن ثابت ويزيد الرقاشي أحاديث غير محفوظة

-আলকামিল ফী জুয়াফাইর রিজাল ৩/১৪৩

আরো দেখুন : মীযানুল ইতিদাল ২/৫৭; লিসানুল মীযান ২/৪৬৮

সারকথা : এই রেওয়ায়েত নির্ভরযোগ্য নয়। আর এর দ্বারা উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর করা তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আয়াতের সঠিক তাফসীর তা-ই যা ইবনে জারীর তাবারী রাহ. গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে কাছীর যাকে ‘অতি উত্তম’ বলেছেন।

শুযুয ২ : নামাযে যিরার উপর যিরা রাখা

আরবীতে হাতের আঙুলের মাথা থেকেই কনুই পর্যন্ত অংশকে ‘যিরা’ বলে। সম্প্রতি কিছু মানুষ যিরার উপর যিরা রাখাকে সুন্নাহ মনে করেন এবং ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর না রেখে ডান হাতের যিরা বাম হাতের যিরার উপর রাখেন। হাত বাঁধার ক্ষেত্রে এটাও একটা বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতা। কোনো সহীহ হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই, সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং কোনো মুজতাহিদ ইমাম এই নিয়মের কথা বলেননি। যারা একে সুন্নাহ মনে করেন তারা এ বিষয় কোনো সহীহ-সরীহ নস (বিশুদ্ধ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য) উপস্থাপন করতে পারেননি। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলীল হচ্ছে, দুটো সহীহ হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা।

নীচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

প্রথম হাদীস : সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত, ‘লোকদেরকে আদেশ করা হত, পুরুষ যেন তার ডান হাত বাম যিরার উপর রাখে।’

হাদীসটির আরবী পাঠ এই-

كان الناس يؤمرون أن يضع الرجل اليد اليمنى على ذراعه اليسرى في الصلاة. قال أبو حازم : لا أعلمه إلا ينمى ذلك إلى النبي صلى الله عليه وسلم.

-মুয়াত্তা মালিক পৃ. ৫৫ ; সহীহ বুখারী ১/১০৪

এই হাদীসে যিরার উপর যিরা রাখার কথা নেই। বাম যিরার উপর ডান হাত রাখার কথা আছে।

দ্বিতীয় হাদীস : ওয়াইল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসের একটি পাঠ। তাতে আছে, ‘(আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর ডান হাত বাম হাতের পাতা, কব্জি ও যিরার উপর রাখলেন।’

রেওয়ায়েতটির আরবী পাঠ এই-

ثم وضع يده اليمنى على ظهر كفه اليسرى والرسغ والساعد

-মুসনাদে আহমদ ৩১/১৬০, হাদীস : ১৮৮৭০; সুনানে আবু দাউদ ১/৪৮৩, হাদীস : ৭২৭

এই বর্ণনাতেও বলা হয়নি ডান যিরা রেখেছেন। বলা হয়েছে, ডান হাত রেখেছেন।

এই দুই হাদীসে ডান হাত অর্থ ডান হাতের যিরা-এর কোনো প্রমাণ নেই; বরং এই ব্যাখ্যা করা হলে তা হবে এই দুই হাদীসের শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা। কারণ হাদীস ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কোনো ইমাম ও ভাষ্যকার এই ব্যাখ্যা করেননি।

উল্লেখিত পাঠটি কি ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের মূল পাঠ

ওয়াইল ইবনে হুজর রা. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে নামায পড়েছেন এবং যেভাবে তাঁকে নামায পড়তে দেখেছেন তা বর্ণনা করেছেন। তাঁর এই বিবরণ বেশ কয়েকজন রাবীর সূত্রে পাওয়া যায়। যেমন : ১. আলকামা ইবনে ওয়াইল ২. আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল। (এরা দু’জন ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর পুত্র। আবদুল জাববার ইবনে ওয়াইল তার বড় ভাই আলকামা ইবনে ওয়াইল রাহ. থেকেই পিতার বিবরণ গ্রহণ করেছেন। দেখুন : সহীহ মুসলিম ফাতহুল মুলহিম ২/৩৯) ৩. হুজর ইবনুল আম্বাস, ৪. কুলাইব ইবনে শিহাব, প্রমুখ। শেষোক্ত কুলাইব ইবনে শিহাব রাহ.-এর বর্ণনাই আমাদের আলোচ্য বিষয়।

কুলাইব ইবনে শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন তার পুত্র আসিম ইবনে কুলাইব রাহ.। আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. থেকে অনেক রাবী এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমন

শো’বা ইবনুল হাজ্জাজ

বিশর ইনুল মুফাদ্দাল

কায়স ইবনুর রাবী

আবদুল ওয়াহিদ ইবনে যিয়াদ

খালিদ ইবনু আবদিল্লাহ

আবু ইসহাক

আবুল আহওয়াস

আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস

মুসা ইবনে আবী আয়েশা

আবু আওয়ানা ও

যাইদা ইবনে কুদামা প্রমুখ।

শেষোক্ত রাবী যাইদা ইবনে কুদামা-এর বর্ণনার পাঠ সকলের চেয়ে আলাদা। এ কারণে তার পাঠকে আসিম ইবনে কুলাইবের বর্ণনার মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

এই সকল বর্ণনা সামনে রাখলে প্রতীয়মান হয়য, ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীস থেকে যিরার উপর যিরার নিয়ম গ্রহণ করার অবকাশ নেই।
কারণ :

এক. আগেই বলা হয়েছে, আসিম ইবনে কুলাইব থেকে অন্যান্য ছিকা রাবী উপরোক্ত শব্দে বর্ণনা করেননি। যাইদার রেওয়ায়েতের পাঠ তাদের সবার রেওয়ায়েতের পাঠ থেকে আলাদা। সুতরাং যাইদার বর্ণনার উপর ভিত্তি করে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, এটিই আসিম ইবনে কুলাইবের পাঠ। অর্থাৎ আসিম ইবনে কুলাইব হুবহু এই শব্দে বর্ণনা করেছেন।

দুই. আলোচিত হাদীসের মূল রাবী হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রা.। আসিম ইবনে কুলাইবের সূত্র ছাড়া আরো বেশ কিছু সূত্রে তাঁর বিবরণ উল্লেখিত হয়েছে। সেসব রেওয়ায়েতের পাঠও যাইদার পাঠের চেয়ে আলাদা। সুতরাং তাঁর পাঠটিকেই ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর বিবরণের মূল পাঠ সাব্যস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

তিন. যাইদার পাঠটিও স্পষ্টভাবে ‘যিরার উপর যিরার’ নিয়ম নির্দেশ করে না; বরং সামান্য চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই পাঠের অর্থও তা-ই যা এ হাদীসের অন্য সকল পাঠ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে পূর্ণ ‘সায়িদ’ (যিরা) উদ্দেশ্য নয়। সায়িদের কিছু অংশ উদ্দেশ্য, যা কব্জি সংলগ্ন।

চার. আসিম ইবনে কুলাইবের বিবরণ বহু সনদে বর্ণিত হয়েছে। এসব বিবরণের মৌলিক পাঠ দু’ ধরনের : ডান হাত দ্বারা বাম হাত ধরা এবং ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। যেসব রেওয়ায়েতে أخذ বা إمساك (ধরা) শব্দ আছে সেখানে হাত দ্বারা যে হাতের পাতা উদ্দেশ্য তা তো বলাই বাহুল্য। আর যেসব রেওয়ায়েতে وضع (রাখা) শব্দ আছে সেখানে কনুই পর্যন্ত হাত বোঝানো হয়েছে-এই দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ এর অর্থ হবে আসিম ইবনে কুলাইব রাহ. ওয়াইল ইবনে হুজরের যে বিবরণ উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী রাবীদের বর্ণনায় শব্দগত পার্থক্যের কারণে একে দুই বিবরণ ধরে নেওয়া হয়েছে : একটি হল, ডান হাতের পাতা দ্বারা বাম হাত ধরা। আরেকটি ডান যিরা বাম যিরার উপর বিছিয়ে রাখা!

এক্ষেত্রে সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তা হচ্ছে, যেসব বর্ণনায় ‘ডান হাত রাখা’ আছে তারও অর্থ ডান হাতের পাতা রাখা, কনুই পর্যন্ত রাখা নয়।

পাঁচ. এটা আরো শক্তিশালী হয় যখন দেখা যায়, এ হাদীসের অসংখ্য বর্ণনার মাঝে একটি সহীহ রেওয়ায়েতেও ‘ডান হাতের যিরা’ বাম হাতের উপর রেখেছেন এমন কথা পাওয়া যায় না।

সুতরাং যিরার উপর যিরা একটা আরোপিত ব্যাখ্যা, হাদীস শরীফের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণেই হাদীস ও ফিকহের কোনো নির্ভরযোগ্য ইমাম থেকে হাদীসের এই ব্যাখ্যা এবং হাত বাঁধার এই নিয়ম বর্ণনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, উপরোক্ত নিয়মটি যেমন হাত বাঁধার বিচ্ছিন্ন ও নবউদ্ভাবিত একটি নিয়ম তেমনি এই নিয়ম দ্বারা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যাও একটি শায ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা।

ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ কী ব্যাখ্যা করেছেন

যাইদা ইবনে কুদামার এই পাঠ হাদীস ও ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থসমূহে উদ্ধৃত হয়েছে। বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ তার অর্থ করেছেন ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর রাখা।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা রাহ. (৩১১ হি.) সহীহ ইবনে খুযায়মায় হাদীসের এই পাঠ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘যিরার উপর যিরা’র অর্থ গ্রহণ করেননি। তিনি এই হাদীসের উপর শিরোনাম দিয়েছেন-

باب وضع بطن الكف اليمنى على كف اليسرى والرسغ والساعد جميعا.

অর্থাৎ ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখা। (দেখুন : সহীহ ইবনে খুযায়মা ১/২৭২, বাব : ৯০)

বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, নামাযে হাত এমনভাবে রাখা উচিত, যাতে ডান হাতের পাতা বাম হাতের পাতার কিছু অংশ, কব্জি ও বাহুর কিছু অংশের উপর থাকে। তাঁরা ওয়াইল ইবনে হুজর রা.-এর হাদীসের এই পাঠ এবং হযরত সাহল ইবনে সাদ রা.-এর হাদীসকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কুদামা হাম্বলী রাহ. (৬২০ হি

Pages: 1 2 [3]